ইমরান হোসেন মিলন
প্রকাশিত ০৬ জানুয়ারী ২০২৩ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
চলচ্চিত্রে পুলিশ নির্মাণ
জনকল্যাণ রাষ্ট্রের দন্তহীন ব্যাঘ্র
ইমরান হোসেন মিলন
যেসব উদ্দেশ্য নিয়ে সমাজে মানুষের বসবাস, এর মধ্যে অন্যতম তার ‘ভালো’ থাকতে চাওয়া। কিন্তু কী সেই ‘ভালো’ থাকা! তবে হ্যাঁ, সেই ‘ভালো’ থাকতে গিয়ে ‘আমরা যে তিনটি সামাজিক সত্তাকে এড়িয়ে চলি, তারা হলো মাস্তান, পুলিশ ও রাজনৈতিক নেতা। মনে মনে আমরা প্রত্যেকেই এদেরকে ঘৃণা করি।’১ আবার এমনও হয়, ঘৃণার পাশাপাশি সেই মানুষগুলোর প্রতি আমরা উল্টো আচরণও করে বসি। অর্থাৎ তাদের কাছেই আশ্রয় চাই, যখন বিপদে পড়ি। কিন্তু এ কথা ঠিক, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সামাজিক এই সত্তাগুলোকে আমরা সাধারণ-স্বাভাবিক বলে ভাবতে পারি না। তাদের নিয়ে কেনো এমন হয়—এটা একটা বড়ো প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। তারা তো আমাদের মতোই মানুষ, কিংবা তারা কেউই তো সমাজের বাইরের নয়, তাহলে সেই ‘ভালো’ থাকতে গিয়ে তাদের প্রতি কেনো এই ভয়, ঘৃণা?
তবে এ কথা ঠিক—ভয়, ঘৃণা সত্ত্বেও এই তিন সত্তার ভিতরে একমাত্র পুলিশই একধরনের আইনি ন্যায্যতার মধ্যে থেকে সমাজে অনেক বিষয়ে সরাসরি ভূমিকা পালন করে। পুলিশের এই বহুমাত্রিক কর্মযজ্ঞে সাধারণ মানুষের ধন্দ লাগে, প্রকৃতপক্ষে পুলিশ তাহলে কী এবং কার? সাধারণের ব্যক্তিগত এই অভিজ্ঞতাকে আরো জটিল করে দেয় গণমাধ্যমে পুলিশের নানা ঢঙের উপস্থাপন। জনগণ পুলিশ সম্পর্কিত যে চর্চার মধ্য দিয়ে যায়, সেখানে গণমাধ্যম একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তারা কখনো বাস্তবের পুলিশের সঙ্গে চলচ্চিত্র কিংবা টিভি-নাটকের পুলিশ, আবার এর উল্টোটাও মেলাতে চায়। ইয়াসমিনকে ধর্ষণকারী কিংবা সার্জেন্ট আহাদের মতো সাহসী পুলিশ যেমন বাস্তবে থাকে, তেমনি চলচ্চিত্রেও মান্না, শাকিব-এর পাশাপাশি কাবিলা, মিশার মতো খলনায়ক পুলিশও থাকে।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জন্মলগ্ন (মুখ ও মুখোশ, ১৯৫৬) থেকে আজ পর্যন্ত নির্মিত মুষ্টিমেয় কিছু চলচ্চিত্র ছাড়া প্রায় সবগুলোতেই পুলিশের উপস্থিতি চোখে পড়ে; সেটা কি বিকল্পধারা, কি স্বাধীনধারা, কি জনপ্রিয়ধারা। গত এক দশক (২০০১—২০১০) বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জন্য খুব একটা সুখকর ছিলো না। এই দশকের বেশিরভাগ সময় জুড়েই চলচ্চিত্র সহিংসতা, ‘অশ্লীলতা’ বা সফ্ট পর্নোগ্রাফিতে ভরপুর ছিলো। তবে এই অভিযোগ অবশ্য শুধু এই সময়ের জনপ্রিয়ধারার চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রেই বেশি প্রযোজ্য। অবস্থা যে ধারার যাই হোক, পুলিশ কিন্তু তার স্ববৈশিষ্ট্য নিয়ে এ দশকের সব চলচ্চিত্রে হাজির থেকেছে। এই দশকের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, বেশিরভাগ চলচ্চিত্রের মূল (নায়ক) ভূমিকায় পুলিশ চরিত্রের উপস্থিতি। তবে এর পাশাপাশি পুলিশ হিসেবে পার্শ্ব অভিনেতা ও খলনায়কও ছিলো।
এই আলোচনায় গত দশকের জনপ্রিয়ধারার চলচ্চিত্র থেকে সাধারণ পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে পুলিশের নানাধরনের উপস্থাপন সম্বলিত তিনটি চলচ্চিত্রকে উদ্দেশ্যমূলক নমুনায়নের ভিত্তিতে বেছে নেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো—মনতাজুর রহমান আকন্দের মাস্তানের উপর মাস্তান (২০০২), এফ আই মানিকের চাচ্চু (২০০৬) এবং শাহাদৎ হোসেন লিটনের বলনা কবুল (২০০৯)।
রাষ্ট্র ও পুলিশ
প্রাচীন গ্রিসে যখন নগর-রাষ্ট্র ধারণার জন্ম হচ্ছে, তখনো রাষ্ট্র বলতে শুধু ভৌগোলিক সীমাকেই নির্দেশ করা হতো। রাষ্ট্র বলতে এখন যে নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, জনসমষ্টি, সরকার ও সার্বভৌমত্বের কথা বলা হয়, তা কিন্তু ছিলো না শুরুর দিকে। যুগে যুগে তা নানা মুনির নানা মতের সমন্বয়ে আজকের এই চিন্তায় এসে দাঁড়িয়েছে। অথচ আজকের রাষ্ট্রের যে ভিত্তি তা কিন্তু তারও (গ্রিস) আগের, সেই দাস সমাজে। অর্থাৎ ‘দাসের শোষণের ভিত্তিতে যে সভ্যতা সমৃদ্ধি লাভ করেছিল সে সভ্যতা খৃষ্টপূর্ব ৪র্থ শতক থেকেই ন্যায়, অন্যায়, আনুগত্য, বিদ্রোহ, ব্যক্তির অধিকার ও ক্ষমতা, গুণ এবং দাবি প্রভৃতি প্রশ্নের মুখোমুখি হতে আরম্ভ করে (করেছে)।’২ যখন মানুষের এই বিষয়গুলো প্রশ্নের সম্মুখীন, তখন থেকে চিন্তার ক্ষেত্রও যায় পাল্টে। সামনে চলে আসে মানুষের জন্য কল্যাণের বিষয়টি। রাষ্ট্র তার সর্বশক্তি দিয়ে যে কাজই করুক না কেনো সেখানে বুলি থাকে জনকল্যাণের। আর এই বুলির বিশ্বাসযোগ্যতা নির্মাণে সেই শুরু থেকে কাজ করেছে স্বয়ং রাষ্ট্রপালিত একটি শ্রেণি। যারা রাষ্ট্রের সেই কাঠামোর ভিতর দাঁড়িয়ে থেকে মানুষের মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছে রাষ্ট্রের সেই ‘মহান’ বাণী।
রাষ্ট্র ধারণার শুরু থেকে এখন পর্যন্ত সেই ‘মহান’ বাণী-কার্য করতে গিয়ে রাষ্ট্রকে নানা প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়েছে। আর এসব বাধা দূর করার স্বার্থে প্রয়োজন পড়ে তার অভ্যন্তরীণ পেটোয়াবাহিনীর। জনগণের কল্যাণের উদ্দেশ্যে এভাবে বিভিন্ন ভাগে বিভিন্ন বাহিনীর জন্ম দেয় রাষ্ট্র। তবে ভাষাতাত্ত্বিক কলিম খান ক্রিয়াভিত্তিক শব্দার্থ তত্ত্ব নিয়ে কথা বলতে গিয়ে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনীর জন্ম নিয়ে যে মত দিয়েছেন তা মোটামুটি উপরের চিন্তার কাছাকাছি। তার ভাষায়, ‘মানবসমাজ তার নিজের সতর্কতার সত্তারূপে আদি ক্ষেত প্রহরীর জন্ম দিয়েছিল সেই সুপ্রাচীনকালে। সেই ক্ষেত প্রহরী, কালের ও সমাজের বিবর্তনের সমান্তরালে ক্রমান্বয়ে বিবর্তিত হয়েছে, এবং সেভাবেই এক সুদীর্ঘ পথ অতিক্রম করে আজকের পুলিশ, মিলিটারি, সীমাসুরক্ষা বাহিনী, ট্রাফিক পুলিশ ইত্যাদি শত শত রূপে রূপান্তরিত হয়ে গেছে, হয়ে যাচ্ছে।’৩ যে প্রহরীর জন্ম হয়েছিলো ক্ষেতের নিরাপত্তার জন্য তা কিন্তু নিয়ন্ত্রণ হতো ক্ষেত বা জমির মালিকদের দ্বারা। সেটিই পরে এসে যখন রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে ঘটলো, তখন বাহিনীগুলোকে স্বয়ং রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করে। তারা হয়ে গেলো রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালনের হাতিয়ার।
আধুনিক রাষ্ট্র আইন, শাসন ও বিচার বিভাগের সমন্বয়ে মূলত তার ক্ষমতা নাগরিকদের ওপর প্রয়োগ করে। যেখানে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকে রাষ্ট্রের শাসন বিভাগ। এ বিভাগের একটা বড়ো অংশে রয়েছে পুলিশ বাহিনী। যারা রাষ্ট্রযন্ত্রকে রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত। সেই আদি থেকে আজ অব্দি রাষ্ট্র ও পুলিশ হরিহর আত্মা। অনেকক্ষেত্রে এই সম্পর্কটা উপর থেকে ঝুলে দেওয়া শিকলের মতো। কেউ যদি ভুলেও শিকলের সবচেয়ে নিচের আংটাটি, মানে পুলিশের কোনো সর্বনিম্ন পদাধিকারীর শরীরেও আঘাত করে, তবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদাধিকারীও এসে সেখানে হাজির হন। এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পদাধিকারী যে স্বশরীরে হাজির হয় এমনটি নয়, তার আদেশ হাজির হয়। কেননা নিচের আংটার এই টান পড়ে সবচেয়ে উপরেরটায়।
তবে রাষ্ট্রের চিন্তাকে গ্রামসি কিছুটা নতুনভাবে হাজির করেন। তিনি আধুনিক রাষ্ট্রের কাঠামোকে দেখেছেন জটিলভাবে। রাষ্ট্র সেখানে ‘আধিপত্য’ আর ‘প্রভুত্ব’ নামে দুটি শব্দের জটিল সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে। প্রথমটি নানা কায়দায় আমাদের সম্মতি আদায় করে বা করার চেষ্টা করে থাকে। যে সম্মতি আদায়ে রাষ্ট্র আমাদের সামনে সেই জনকল্যাণের ধোঁয়া তোলে। শুধু জনকল্যাণের কথায় কাজ না হলে ব্যবহার হয় প্রভুত্ব। যেখানে রাষ্ট্র দমন-পীড়নের সাহায্যে সাধারণ মানুষের ‘ভালো’ করার দিকে নজর রাখে। জনগণের ‘ভালো’র জন্যই রাষ্ট্রের প্রয়োজন পড়ে পুলিশ, মিলিটারি, মিলিশিয়ার মতো বাহিনীর।
পুলিশ নিয়ে সাধারণের মনস্তত্ত্ব
১৭৫৭ সালে রাজা পঞ্চদশ লুই’কে আঘাত করার অপরাধে ফ্রান্সে হোবা ফ্রাঁসোয়া দেমিয়েঁ নামে এক ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। মিশেল ফুকোর লেখায় সেই মৃত্যুদণ্ডের বর্ণনা পাওয়া যায় এভাবে, ‘দেমিয়েঁর বুক, বাহু, উরু এবং পায়ের ডিম হতে গনগনে লাল চিমটার সাহায্যে মাংস ছিড়ে নেওয়া হয়... ছুরিটি পুড়িয়ে দেমিয়েঁর দেহের যে অংশগুলো হতে মাংস ছিঁড়ে নেওয়া হয়েছে সেই সেই অংশে চেপে ধরা হয়, ঢেলে দেওয়া হয় গলিত সীসা, ফুটন্ত তেল, উত্তপ্ত রজন, মোম...।’৪ দণ্ডটি কার্যকর করা হয় চার্চ অব প্যারিসের প্রধান ফটকের সামনে তৈরি করা একটি মঞ্চে। তার চারপাশে প্রজাদের সেই দণ্ড দেওয়ার প্রক্রিয়াটি দেখার ব্যবস্থা করা হয়।
রাজার আদেশে রাজার মতো করে শাস্তির এই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করে রাজার নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। যাদের কেউ সেই গনগনে লাল চিমটা দিয়ে শরীরের মাংস উঠায়, কেউবা সেই ক্ষত স্থানে উত্তপ্ত সব গলিত পদার্থ ঢালে, আবার কেউবা হাত-পায়ে দড়ি বেঁধে চারদিকে ঘোড়া ছুটাতে থাকে। উদ্দেশ্য ছিলো সাধারণ মানুষ যেনো বুঝতে পারে রাজা কতোটা ক্ষমতাবান, সঙ্গে তার নিরাপত্তা বাহিনীও।
মধ্যযুগ পেরিয়ে আমরা এখন আধুনিক যুগে, সর্বশেষ উত্তরাধুনিক সময়ে। শাস্তির ধরন পাল্টে গেছে, পরিবর্তন এসেছে শাস্তিদাতার রূপের। যখন রাজার শাসন চলতো, তখন ক্ষমতার কেন্দ্র ছিলো একটাই। কিন্তু জনকল্যাণ রাষ্ট্রে আর আগের মতো শাস্তিদাতা বা ক্ষমতার দৃশ্যত একক কোনো কেন্দ্র নেই। এখন আদেশ আসে ভিন্ন ভিন্ন কেন্দ্র থেকে। অন্যান্য ব্যবস্থাতেও এসেছে পরিবর্তন। শুধু পরিবর্তন আসেনি শাস্তি কার্যকর করা বাহিনীর। যে বাহিনী রাজার নিরাপত্তা দিতো, সেই বাহিনী এখনো দেয় রাষ্ট্রের নিরাপত্তা; রাজার কথায় যে দণ্ড কার্যকর করা হতো, সেটা এখনো করা হয় রাষ্ট্রের ক্ষমতাবানদের কথায়।
রাজার সেই বাহিনী কালক্রমে পরিবর্তন হয়ে ধারণ করেছে পুলিশ নামটি। অর্থাৎ দেমিয়েঁ’র শাস্তি যারা কার্যকর করেছিলো তাদের শুধু নামের পরিবর্তন হয়েছে, কাজের পরিবর্তন হয়নি। ফলে সাধারণ মানুষের মন থেকে মধ্যযুগীয় শাস্তির সেই ভয়ও কাটানো সম্ভব হয়নি। রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনী আর আধুনিক সময়ের ভেল্কিবাজ গণমাধ্যম সেই ভয় নানাভাবে জিইয়ে রেখেছে।
অথচ আধুনিক রাষ্ট্রে নিরাপত্তা বাহিনী বা পুলিশের জন্ম হয়েছে সাধারণ মানুষের সেবার উদ্দেশ্যে। কিন্তু পুলিশ কখনোই জনগণের সেবক হয়ে উঠতে পারেনি বা উঠতে দেওয়া হয়নি। দাস সমাজে দাস-মালিকদের কথার বাইরে কোনো কাজ করেনি ‘উন্নত’ দাসরা। একই ঘটনা মধ্যযুগেও। সেসময়ও রাজার হুকুমের বাইরে কিছুই করতে পারেনি নিরাপত্তাকর্মীরা। কল্যাণ রাষ্ট্রে পুলিশকে স্বাধীন বলা হলেও তারা কখনোই সেই স্বাধীনতা ভোগ করতে পারেনি; পারেনি তাদের সেই ঐতিহাসিক অবস্থা থেকে বের হতে। যাই হোক, সমাজে ক্ষমতাবান মানুষের মতাদর্শিক চিন্তা প্রতিষ্ঠার একটা হাতিয়ার হিসেবে পুলিশকে ব্যবহার করা হয়েছে বেশিরভাগ সময়।
ফলে মতাদর্শিক চিন্তাকে পাকাপোক্ত করতে পুলিশের ডিসকোর্স নির্মাণ হয়েছে সমাজে। একটা নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে আদিম ক্ষেত প্রহরীর থেকে জন্ম নেওয়া নিরাপত্তা বাহিনী, রাজা পঞ্চদশ লুই-এর হিংস্র রক্ষীবাহিনী কিংবা আধুনিক রাষ্ট্রের ‘সেবাই পুলিশের ধর্ম’ নাম দিয়ে গড়ে ওঠা ‘আধুনিক’ পুলিশ বাহিনী—এরা সবাই কিন্তু ক্ষমতাবান হুকুমদারের গোলামি করে এসেছে, জনগণের নয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বই-পুস্তক, সংবাদপত্র, নাটক, টেলিভিশন, চলচ্চিত্রে পুলিশকে নিয়ে যে চর্চা ও ভাষার নির্মাণ হয়েছে, সেটাও পূর্ববর্তী ওই চিন্তাগুলোকে আরো বেশি স্থায়িত্ব দান করেছে। ফলে পুলিশকে নিয়ে একধরনের জ্ঞান সাধারণের মধ্যে নির্মাণ হয়েছে। এই নির্মাণ ইতিবাচক কি নেতিবাচক সেই প্রশ্নে পরে আসছি।
তবে এর ফলে যেটা হয়েছে, ঐতিহাসিকতা, ভাষা এবং তার চর্চা যেমন পুলিশ নিয়ে একধরনের জ্ঞান উৎপাদন করেছে; একইভাবে পুলিশের সেই ডিসকোর্স প্রতিক্ষণ সেই গতানুগতিক ডিসকোর্সকে বদ্ধমূল ধারণায় পরিণত করছে। ফলে পুলিশ গত কয়েকশো বছরে নির্দিষ্ট কাঠামোর ভিতর থেকে আর বের হতে পারেনি। উল্টোভাবে বললে হয়তো সেই কাঠামো থেকে রাজা-রাজ্য, রাষ্ট্র-সরকার তাদের বের হতে দেয়নি।
ভালো পুলিশ, খারাপ পুলিশ
‘চোরে রে কও চুরি করো, গেরস্তে কও ধরো ধরো’
আগেই বলেছি আধুনিক রাষ্ট্রের যে কাঠামোগত বিন্যাস তা একটা জটিল আকার ধারণ করে চলে। এই বিন্যাসে মানুষকে এতো সূক্ষ্মভাবে শ্রেণিকরণ করে ফেলা হয় যে, সাদা চোখে কোনোভাবেই সেই শ্রেণির অস্তিত্ব ধরা পড়ে না। রাষ্ট্র তার প্রয়োজনে মানুষের পাশাপাশি ভাগ করে ফেলে তার অভ্যন্তরীণ কাঠামো। যে কাঠামোর উপাদান হিসেবে পুলিশও হয় বিভাজিত। সমাজে তার একটা মানদণ্ড খাড়া করা হয়; আরোপ করা হয় ‘ভালো’, ‘খারাপ’ অভিধা। মাস্তানের উপর মাস্তান, বলনা কবুল ও চাচ্চু তিনটি চলচ্চিত্রেই পুলিশ নিয়ে এই বিভাজন লক্ষণীয়। সেখানেও সেই আরোপিত মানদণ্ড, সেই একই বিচার, আর কোন্ স্তরে পড়ছে তার অনিশ্চয়তা।
চলচ্চিত্রগুলোতে পুলিশের মোটামুটি চার ধরনের উপস্থাপন দেখি—খারাপ পুলিশ, ভালো পুলিশ, ভালো-খারাপ মিলে পুলিশ, আরেক ধরন আছে যারা কেবলি ‘পুলিশ’ (মানে পুলিশের পোশাক পরে থাকা কিছু মানুষ, যারা কেবল বিনা বাক্যে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আদেশ পালন করে—এক কথায় আমজনতার মতো ‘আম-পুলিশ’)। এক্ষেত্রে অবশ্য কখনো এই প্রশ্নটা ওঠে না—পুলিশ তো পুলিশই, তার আবার ভালো-খারাপ কী? ভিন্ন ব্যক্তি-মানুষ হলেও সব পুলিশের পুলিশ হয়ে ওঠার ব্যবস্থা, তাদের জন্য নিয়ম-কানুন, রীতি-নীতি সবই তো এক। তাহলে কেনো এই বিভাজন? আমাদের যে রাষ্ট্র কাঠামো সেখানে তো এই ভাগ হওয়ার কথা ছিলো না। তাহলে পুলিশকে কেনো চলচ্চিত্রে এতো এতো ভাগে দেখানো হয়? প্রশ্নগুলো উত্তর খোঁজে।
বাংলাদেশে গত দশকে নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোতে রাজনীতি ও সহিংসতার জায়গা হয়েছে সময়ের প্রয়োজনে, বলাই যায়। এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হতে পারে, তবে এখানে নয়। যা বলছিলাম, রাজনীতিকরা সবসময় ফায়দা লুটার চেষ্টায় থেকেছে মগ্ন; অথচ থেকেছে প্রচ্ছন্ন। তারা যেকোনোভাবেই হোক রাষ্ট্রকে তাদের মতো ব্যবহারে মুখিয়ে থেকেছে, এমনকি করেছেও। অন্যদিকে, রাষ্ট্রও দেখেছে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের স্বার্থ। বলা যায়, দুইয়ে দুইয়ে চার হয়েছে। যে কারণে মাস্তানের উপর মাস্তান-এ ‘সমাজসেবী’ ইমতিয়াজ লস্কর-এর ওঠাবসা, চলাফেরা সমাজের নির্দিষ্ট শ্রেণির সঙ্গে; যাদের কেউ রাজনীতিবিদ, মন্ত্রী কিংবা পুলিশের উচ্চপদস্থ ব্যক্তি। লস্কর নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করেন এই রাজনীতিবিদদের; এমনকি পুলিশকেও।
তাই দেখা যায়, সমাজসেবী লস্কর মাসোয়ারা দেন সাব-ইন্সপেক্টর জাফরকে। যার বিনিময়ে লস্করকে দিতে হয় পুলিশের গোপন খবর, পরিকল্পনা। শুধু তাই নয়, লস্কর যেসব অবৈধ কাজের সঙ্গে জড়িত তার সঙ্গেও থাকেন সাব-ইন্সপেক্টর জাফর, হয়ে ওঠেন ‘খারাপ’ পুলিশ। একই অবস্থা চাচ্চুতে। সেখানেও রাজনীতিবিদ দুলু মির্জার যেনো কেনা গোলাম হয়ে থাকে এক সাব-ইন্সপেক্টর। ‘আইনপ্রণেতা’র কথায় আইনের লোক হয়ে বেআইনি কাজ করে, শুধু উপরি পাওনার আশায়।
এখন তাহলে প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক—পুলিশকে খারাপ করে তোলে কে? সোজা কথায় এর উত্তর দেওয়া হয়তো সম্ভব নয়। তবে এটা বুঝতে কষ্ট হয় না, এর সঙ্গে রাজনীতি-ক্ষমতা-রাষ্ট্রের গভীর সম্পর্ক আছে। তাহলে কি আমরা যে সমাজ, যে প্রতিষ্ঠানে বেড়ে উঠি, সেখানে চাইলেও ভালো থাকা যায় না? এই কারণেই কি মাস্তানের উপর মাস্তান কিংবা চাচ্চুতে পুলিশরা (রাষ্ট্রের মতে, যাদের ভালো থাকারই কথা) ভালো থাকতে পারে না, ‘খারাপ’ পুলিশ হয়ে ওঠে। নাকি পুলিশকে ভালো-খারাপের দ্বন্দ্বে ফেলে শাসকরা-ক্ষমতাবানরা সাধারণের দৃষ্টি অন্যদিকে ফিরে নেয়, ফায়দা লুটে। রাষ্ট্র কি তাদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে ক্ষমতার অপপ্রয়োগের সব বাধা আড়াল করে? এ হয়তো রাজনীতির এক সূক্ষ্ম খেলা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সব ঘটে যায়; ফাঁকে ‘আইনি’ পুলিশ বেআইনি, মানে খারাপ বনে যায়।
কিন্তু কথা হলো সাব-ইন্সপেক্টর জাফররা যে ঘুষ খায়, ক্ষমতাবানদের চামচামো করে, সাধারণ জনগণকে পেটায় কিংবা নিরপরাধ মানুষকে বিনা কারণে জেলে পুরে—পুলিশের এই যে ডিসকোর্স গত ৬০ বছরে বাংলা চলচ্চিত্রে নির্মাণ হয়েছে তা কার বদৌলতে? যারা (লস্কর) জাফরদের মতো পুলিশকে মাসোয়ারা দেয়, তারাই তার বিনিময়ে নেয় রাষ্ট্রেরই গোপন খবর। চাচ্চুতে দুলু মির্জার চক্রান্তে রাষ্ট্রের মালিক (গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকরাই সব ক্ষমতার অধিকারী) পরোপকারী রাজা মিয়া নির্যাতিত হন তারই সেবকের (পুলিশ) হাতে; মিথ্যা খুনের দায়ে তিনি কারাগারে পর্যন্ত যান। রাজার স্ত্রী-সন্তান জীবন বাঁচাতে পুলিশের কাছে গিয়ে সাহায্য না পেয়ে অকাতরে জীবন দেয়; আমাদের সেলুলয়েডিয়-পুলিশ সমাজ-বাস্তবতার বাইরে থেকে তা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে।
সেবাই পুলিশের ধর্ম : ‘সেবা’র চাইতে
বেশি কিছু করিবার নাই
মাস্তানের উপর মাস্তান-এ পুলিশের একজন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ওসি, যিনি সৎ, কাজের প্রতি একাগ্রচিত্ত; নিজেকে তিনি দাবি করেন দেশপ্রেমিক হিসেবে। যেকোনো সন্ত্রাসীকে ধরে ‘ধোলাই’ করাই তার কাজ। অন্যদের থেকে নিজেকে আলাদা করতে ‘বিকৃত’ অঙ্গভঙ্গি করেন; গুলি করে তিনি ‘মানুষ’ না, ‘সন্ত্রাসী’ মারেন। চলচ্চিত্রে তার আবির্ভাব পাশা নামের এক সন্ত্রাসীকে ধরার মধ্য দিয়ে। এই পুলিশ কর্তার নাম বিপ্লব (মান্না)।
একদিন ওসি বিপ্লব পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার (আইজিপি) মেয়েকে উদ্ধার করে সন্ত্রাসীদের খপ্পর থেকে। সৌজন্য হিসেবে তাকে বাড়িতে নিমন্ত্রণের কথা বলেন আইজিপি’র মেয়ে চাঁদ (পূর্ণিমা)। কিন্তু বিপ্লবের জবাব, ‘যেদিন দেশ থেকে সন্ত্রাস নির্মূল করতে পারবো, সেদিনই আসবো।’ বিপ্লব চলে গেলে আইজিপিকে তার মেয়ে বলেন, ‘এই অফিসারের তো দেশের সেবা ছাড়া মাথায় কিছুই নেই।’ পুরো চলচ্চিত্রে ওসি বিপ্লব দেশসেবা ছাড়া আসলে কিছুই যেনো বোঝেন না।
চাচ্চুতেও আমরা একই ঘটনা দেখি, ওসি (আলী রাজ) ও তার ভাই পুলিশের বিশেষ শাখার (স্পেশাল ব্রাঞ্চ) ইন্সপেক্টর বিপ্লবের (শাকিব খান) বেলায়। বিশেষ শাখার কর্মকর্তা হওয়ায় বিপ্লব যেনো কে-কখন-কোথায় ধর্ষণের শিকার হবেন, কে কখন বিপদে পড়বেন—তা আগে থেকেই জানতে পারেন! আর তাদের উদ্ধারে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এদিকে বলনা কবুল-এ এমন এক পুলিশ কর্মকর্তাকে দেখানো হয় যিনি দায়িত্বের বাইরেও অনেক কাজ করেন। পরিস্থিতি এমন হয় যে, ‘ভালোবাসা-রক্ষাকারী’ সেই কর্মকর্তা নিজে দাঁড়িয়ে থেকে অসহায় এক প্রেমিক জুটির বিয়ের ব্যবস্থা করেন, সুযোগ পেলেই নানা উপকার করেন মানুষের।
উপরের তিনটি ঘটনায় পুলিশের যে উপস্থাপন, সেখানে ভালোত্বকেই শুধু দেখানো হয়। সেই ভালোত্ব এমনই যে তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেবত্বকেও ছাড়িয়ে যায়! কিন্তু যেসব গুণাবলির ওপর ভিত্তি করে পুলিশকে দেবতার আসনে বসানো হয়, সার্বিক বিবেচনায় তা রাষ্ট্র বা সমাজের বিদ্যমান কাঠামোয় কোনো পরিবর্তন আনে কি?
নাকি পুলিশের এই দেবতাসুলভ আচরণের আড়ালে ঢেকে দেওয়া হয় তাদের কালোত্ব; যা হয়তো রাষ্ট্র নিজেই করে। ওসি বিপ্লব যখন দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী পাশাকে (মাস্তানের উপর মাস্তান), কিংবা বিশেষ শাখার ইন্সপেক্টর বিপ্লব যখন যুবনেতা ফুলু মির্জাকে (চাচ্চু) গ্রেপ্তার করে, রিমান্ড ছাড়া জিজ্ঞাসাবাদের নামে নির্যাতন করে; তখন সেটা আপাত পুলিশি সেবা মনে হলেও তারা কিন্তু তা অন্যায় করে। কিন্তু চলচ্চিত্রে এই অন্যায়-হত্যার যে উপস্থাপন, তা কোনো প্রশ্ন তোলারই সুযোগ দেয় না; যেমন প্রশ্ন ওঠে না সন্ত্রাস দমনের কথা বলে ‘ক্রসফায়ার’, ‘এনকাউন্টার’-এর নামে নির্বিচারে গুলি করে মানুষ হত্যা করলে। রাষ্ট্র সুকৌশলে তা জায়েজ করে নেয়, অপরাধী নাগরিক হিসেবে সামান্য বিচার কিংবা আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগই তাদের দেওয়া হয় না। আমরা সেলুলয়েডের সেই ‘হাততালি’ দেওয়া হত্যার মতো বাস্তবের নির্মম সেই হত্যাকাণ্ডকে মেনে নিই, মিষ্টি বিতরণ ও আনন্দ মিছিল করি। অথচ সময়ের আবর্তে কখনো আমার-আপনার স্বজনও সেই নির্মমতারই শিকার হয়।
আবার সাধারণ মানুষকে কখনো এটাও খেয়াল করতে দেওয়া হয় না, যে দেবত্ব তারা নির্মাণ করছে তা দিয়ে নিজেদের কতোটা অসহায় করে তুলছে। তাইতো স্বাভাবিক কাজ করলেও পুলিশ গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়, সপ্তাহের নায়ক হয়, ‘মানুষের সেবা করে যেতে চাই।’৫ কিন্তু সেটা যে তার দায়িত্ব এটা গণমাধ্যমও ভুলে যায়, সঙ্গে আমাদেরও ভুলিয়ে রাখে।
নির্বাচিত তিনটি চলচ্চিত্রে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দেখা যায়, দেবতাতুল্য এই পুলিশরা ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বকে সামষ্টিক বা পুলিশি করে তোলে। ফলে মাস্তানের উপর মাস্তান-এ বোন ও তার প্রেমিকের খুন হওয়া, চাচ্চুতে ওসির মেয়েকে অপহরণ ও বলনা কবুল-এ নিজের মেয়ের বিয়ে নিয়ে সমস্যা—সবকিছু ছাপিয়ে পুলিশের ‘জনগণের সেবা’ নামক কাজের কেন্দ্রে চলে আসে। কিন্তু মনগড়া এই পক্ষপাত এতোটাই সূক্ষ্ম যে, সাধারণের চোখে তা ধরাই পড়ে না।
মরিয়া তাহারা কী প্রমাণ করিতে চায়
কিছু কাজ রাষ্ট্র ‘দায়িত্ব’ মনে করে স্বেচ্ছায় পালন করে। তবে এই কথাটি জনগণের দিক থেকে বললে, স্বেচ্ছায় নয়, আসলে সেই দায়িত্ব রাষ্ট্র পালন করতে বাধ্য থাকে। কেননা জনগণের কল্যাণে ‘‘শান্তি বজায় রাখা’ বা ‘আইন-শৃঙ্খলা’ রক্ষা করা, ‘আর্থিক উন্নতি’ ও ‘জনস্বাস্থ্য’ রক্ষা করা রাষ্ট্রব্যবস্থার মুখ্য কর্তব্য বলে ধরা হয়।’৬ যদি রাষ্ট্র তা না পারে তাহলে সেই রাষ্ট্রের পতন অনিবার্য এবং একই সঙ্গে সেটি জনকল্যাণকর রাষ্ট্র থেকে বিচ্যুত হতে বাধ্য। তো, রাষ্ট্র যখন সে কাজগুলো করতে যায়, অনিবার্যভাবে তার কিছু বৈধতারও দরকার পড়ে। রাষ্ট্র তখন ফন্দি-ফিকির খুঁজতে থাকে কীভাবে তা বৈধ করা যায়। এ কারণেই চলচ্চিত্রে বিপ্লবদের মতো পুলিশের পাশাপাশি থাকে ‘আম-পুলিশ’।
মাস্তানের উপর মাস্তান বা চাচ্চুতে এই ‘আম-পুলিশ’দের সন্ত্রাসীদের হাতে জীবন দিতে দেখা যায়। হঠাৎ দেখে মনে হয়, এই পুলিশ শুধু জীবন দেওয়ার জন্যই। এই জীবন পেশার জন্য, দেশের জন্য। জীবনের এই অবগাহনে পুলিশ কি প্রমাণ করতে চায়—জনকল্যাণ রাষ্ট্রের নিমিত্তে তাহারা সকল কিছুই করিতে পারেন! নাকি পুলিশ মরিলে, পুলিশ মারিলে কিছুই হয় না। একটা বিষয় লক্ষ করুন, রাষ্ট্র যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তাদের রাষ্ট্রীয়-সন্ত্রাস পুলিশ বাহিনীর মাধ্যমে অব্যাহত রাখে, সেই সন্ত্রাসকে জায়েজ করতে অন্যান্য অনেক উপাদানের সঙ্গে পুলিশ বাহিনীর নিজ সদস্যের লাশ দরকার পড়ে। আর এই লাশের সূত্র ধরেই আবার সেই পুলিশ বাহিনী দিয়েই সাধারণ জনগণ, যাদের যোগানে রাষ্ট্র চলে, তারা প্রতিদিন-প্রতিক্ষণ ভয়ঙ্কর রকমের নিপীড়নের শিকার হন। প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্র কখনো কখনো কৌশলে সাধারণকে পুলিশের প্রতিপক্ষ কিংবা এর উল্টোটি করে তোলে। আর সেটা যেনো সহজে জনগণ মেনে নিতে পারে তার চর্চা-অনুশীলন চলে চলচ্চিত্রের পর্দায়।
বর্তমানে দেশে শিবির-পুলিশ কিংবা অন্য যেকোনো দলের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের বিষয়টি লক্ষ করুন; যেখানে রাষ্ট্র তার স্বার্থে পুলিশকে ব্যবহার করছে। অন্যদিকে রাষ্ট্রের পুলিশকে ‘মোকাবেলা’ করার জন্য দলগুলোও নিজ স্বার্থে সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে। দুই পক্ষই প্রয়োজনে মরতে ‘প্রস্তুত’ থাকছে। কিন্তু কেউই বুঝছে না, জানছে না কেনো তারা মরতে ‘প্রস্তুত’। আসলে রাষ্ট্র কখনোই এই রহস্যের সমাধান চায় না।
তাহারা পুলিশ, মানুষ নহে
চলচ্চিত্রে পুলিশ নির্মাণ করবার সময় আমরা ভুলে যাই, ওই পুলিশের একটি শ্রেণি-চরিত্র আছে। ইঞ্জিনিয়ার, কেতাদুরস্ত এক্সিকিউটিভ, ডাক্তার পেশাগত পরিচয়ের বাইরে মানুষ হিসেবে গণ্য হয়, কিন্তু পুলিশ আর মানুষ হয়ে ওঠে না। নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্তের যে সঙ্কট সেটা পুলিশেরও আছে। কিন্তু যে মধ্যবিত্ত প্রতিদিন বাসের ভিড় ঠেলে পাট করে চুল আঁচড়িয়ে, ইস্ত্রি করা পোশাক পরে অফিসে যায়, সেই মধ্যবিত্তই মুখ কটমট করে এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে ফাইল পাঠিয়ে খুশি হতে চায়। অন্য পেশার মানুষের এই আচরণ আমরা মেনে নিই, কেবল পুলিশ হলেই যতো সমস্যা।
ফলে তার ঘুষ খাওয়াটা আমাদের চোখে বেশি বেশি পড়লেও, দিনভর কর্মস্থলে ব্যস্ত থাকা পুলিশটি ঠিকমতো খাবার খেয়েছে কি না তা আর চোখে পড়ে না। কিংবা সন্তানকে একটি ভালো স্কুল, ভালো পোশাক পরানোর মধ্যবিত্তিয় যে আবেগ, সেজন্য একজন পুলিশ কনস্টেবল যথাযথ বেতন পান কি না তাও মূল্যায়ন হয় না। তাই মাস্তানের উপর মাস্তান-এ এক হাবিলদার-এর নাম হয় কমিশন আলী। মানুষ-পুলিশের বাইরে তাকে কেবলই পুলিশ হিসেবে দেখিয়ে সবার কাছ থেকে কমিশন নেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। আবার বিপ্লবের মতো ‘ভালো’ পুলিশ কর্মকর্তার যে, প্রেম-ভালোবাসার সংসার থাকতে পারে বাড়াবাড়ি দেশপ্রেম দেখাতে গিয়ে তা যেনো পরিচালক ভুলেই যান।
হ্যান্ডস আপ, কেউ পালাবার চেষ্টা করবে না
পুলিশ নিয়ে যে ডিসকোর্স আমাদের সমাজে নির্মিত সেখানে একটা কথা বলতে শোনা যায় যে, সমস্যার যখন সমাধান তখন আসে পুলিশ। খলনায়ক জিম্মি করেছে নায়কের পরিবারের কোনো সদস্য অথবা তার প্রেমিকাকে (নায়িকা), বীরদর্পে নায়ক হাজির। একটু নাটকীয়তা শেষে খলনায়ক সাঙ্গপাঙ্গসহ পরাজিত। একেবারে শেষে মূল খলনায়ককে খুন করার জন্য উত্তেজিত নায়ক অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ হাজির হয়। বন্দুক তাক করে বলে, ‘হ্যান্ডস আপ, কেউ পালাবার চেষ্টা করবেন না।’ আর নায়ককে বলা হয়, ‘আইন নিজের হাতে তুলে নিবেন না।’ একদিকে পারিবারিক মিলন অন্যদিকে পুলিশের সন্ত্রাসী ধরা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। অথচ বেশিরভাগ চলচ্চিত্রে কিছুক্ষণ আগের সংঘর্ষে নায়ক ঠিক কতোজনকে হত্যা করেছে তার কোনো হিসাব থাকে না, ‘নির্দোষ’ নায়ককে পুলিশ গ্রেপ্তার পর্যন্ত করে না। আর পুলিশই যদি নায়ক হয়, তাহলে তো কথাই নেই। উপর মহল থেকে তাকে ধন্যবাদসহ পাঠানো হয় পুরস্কার। চলচ্চিত্রের এই পুলিশকে মেনে নিতে নিতে দর্শক বাস্তবের পুলিশ নিয়ে প্রশ্ন তুলতেই ভুলে যায়—সে খারাপ-ভালো-আম যাই হোক না কেনো। আর ঠিক এই সুযোগটুকু নেওয়ার জন্যই ওতপেতে থাকে রাষ্ট্র।
লেখক : ইমরান হোসেন মিলন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্বের শিক্ষার্থী।
milonmcru@gmail.com
তথ্যসূত্র
১. খান, কলিম (২০০০ : ৯৬); ‘মাস্তান পুলিশ নেতা : শরণাগতের যম কেন?’; জ্যোতি থেকে মমতায়; হাওয়া ঊনপঞ্চাশ প্রকাশনী, কলকাতা।
২. করিম, সরদার ফজলুল (২০০৬ : ৩১৫); ‘রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাস’; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস প্রকাশনী, শাহবাগ, ঢাকা।
৩. খান, কলিম (বাংলা ১৪০৬ : ১৮); ‘জগৎস্রষ্টার জন্ম-মৃত্যু : শতাব্দীশেষের ঈশ্বরভাবনা’; দিশা থেকে বিদিশায়; হাওয়া ঊনপঞ্চাশ প্রকাশনী, কলকাতা।
৪. http://arts.bdnews24.com/?p=558
৫. ‘মানুষের সেবা করে যেতে চাই’; প্রথম আলোর শুক্রবারের ক্রোড়পত্র ‘অন্য আলো’, ২৯ নভেম্বর ২০১৩।
৬. ভদ্র, গৌতম ও পার্থ চট্টোপাধ্যায় (২০০৪ : ১৬১); ‘শরীর, সমাজ ও রাষ্ট্র : ঔপনিবেশিক ভারতে মহামারি ও জনসংস্কৃতি’; নিম্নবর্গের ইতিহাস; আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লি., কলকাতা।
বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৪ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের ষষ্ঠ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন