Magic Lanthon

               

ইব্রাহীম খলিল ও নাজমুল রানা

প্রকাশিত ০৬ জানুয়ারী ২০২৩ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

রাজনৈতিক চলচ্চিত্রে কাজী হায়াৎ, আইজেনস্টাইন-চ্যাপলিনের ব্যর্থ উত্তরসূরি

ইব্রাহীম খলিল ও নাজমুল রানা


ভারতিয় উপমহাদেশ অনেক ভাষা, ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণির মানুষের আবাসস্থল হলেও জাতিতে সবাই হিন্দু। কারণ হিন্দু কোনো ধর্মের নাম নয়; সিন্ধু নদীর তীরবর্তী মানুষদের বলা হতো হিন্দ। আর এই হিন্দ থেকেই হিন্দু শব্দের ব্যবহার। হিন্দুদের ধর্মীয় আচার মূলত সনাতন বৈদিক ধর্ম বা পৌরাণিক ধর্ম নামে পরিচিত। তাই যদি কেউ মুসলমান বা খ্রিস্টান ধর্মের হয়, তাহলে সে হিন্দু জাতির মুসলমান বা খ্রিস্টান। কোনো হিন্দু পরিবারে এক ভাই খ্রীস্টান এক ভাই মুসলমান ও এক ভাই বৈষ্ণব এক পিতামাতার স্নেহে একত্র বাস করিতেছে এই কথা কল্পনা করা কখনোই দুঃসাধ্য নহে বরঞ্চ ইহাই কল্পনা করা সহজকারণ ইহাই যথার্থ সত্য, সুতরাং মঙ্গল এবং সুন্দর। কিন্তু এখানে তখনই বিপত্তি দেখা দেয়, যখন আধিপত্যের বিষয়টি চলে আসে। প্রশ্ন ওঠে, নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমতা ও রাজনীতির। 

এই নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমতা ও রাজনীতির কেন্দ্রে রয়েছে সাধারণ মানুষ। কিন্তু কথিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কখনোই এ তিনটি বিষয় সরাসরি সাধারণের হাতে থাকেনি। শাসক ও সাধারণের মাঝখানে এ তিনটি উপাদানের যোগসূত্র হিসেবে কাজ করেছে গণমাধ্যম। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই যোগসূত্রে গণমাধ্যম কখনোই সাধারণকে সমান চোখে দেখেনি। কারণ মূলধারার যেকোনো গণমাধ্যম সেটা সংবাদপত্র, বেতার, টেলিভিশন কিংবা চলচ্চিত্রএদের কোনোটিই সাধারণকে নিজের করে দেখে না। কিন্তু সবসময় সাধারণের পক্ষে কাজ করার ভান করে। দৃশ্যমাধ্যম হিসেবে এক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে চলচ্চিত্র। সাধারণের জীবনমানের কথা তুলে কাহিনীর আদি-মধ্য-অন্তে হাততালি কিংবা চোখের জলে বড়ো বড়ো ব্যবসা হলেও তাদের আসল চোখের জল বন্ধে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখেনি মূলধারার এসব চলচ্চিত্র। অথচ রাজনৈতিক চলচ্চিত্র ও চলচ্চিত্রে রাজনীতি সারাবিশ্বের চলচ্চিত্রেই অন্যতম প্রধান উপাদান হয়ে উঠেছে! তাহলে রাজনীতির নামে কী দেখাচ্ছে এসব চলচ্চিত্র?    

 

প্রসঙ্গ রাজনীতি : অহিংস-সহিংস মিথ্যাচার থেকে অনুশাসন

জন্মের পর শিশু যখন কাঁদে; সে তার উপস্থিতি জানান দেয়, প্রয়োজন জানান দেয়সেটাই তার রাজনীতি। মানে আমার নিজের কথা বলা, আমার অধিকারের কথা বলার নাম রাজনীতি। আসলে একক ব্যক্তি যখন তার অধিকারের কথা বলে, তখন কি কেবলই সে তার কথা বলে? আপাত হয়তো এমনটি মনে হয়, কিন্তু সার্বিক বিবেচনায় সে কিন্তু বিশ্বে তার মতো লাখো মানুষের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানসহ মৌলিক অধিকারের কথাই বলে। এই রাজনীতি বর্তমানে ঠেকতে ঠেকতে শুধু প্রাণে বেঁচে থাকার অধিকারে এসে থেমেছে। তবে রাজনীতি নিয়ে সাধারণ মত একটু অন্যরকমরাজনীতি হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে কিছু ব্যক্তির সমন্বয়ে গঠিত কোনো গোষ্ঠী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এখানে রাজনীতি বলতে সাধারণত নাগরিক সরকারের রাজনীতিকেই বোঝানো হয়। তবে ক্ষমতার দ্বন্দ্বকে রাজনীতি বলে অভিহিত করেছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মেকিয়াভেলি।

কৃষ্ণবর্ণ গান্ধীকে দক্ষিণ আফ্রিকায় ট্রেনে শ্বেতাঙ্গদের কামরায় বসার অজুহাতে মেরেছিলো রেলওয়ে পুলিশ; সেটা ছিলো একধরনের রাজনীতি। সেই গান্ধীকে যখন ভারতে সত্যাগ্রহ আন্দোলনের সময় পুলিশ মেরে রক্তাক্ত করলো, তিনি তার কোনো প্রতিবাদ করলেন না; সেটাও একধরনের রাজনীতি। আবার ভারতের উত্তর-পূর্বপ্রদেশের গোরখপুরে কংগ্রেস তার সমর্থন বাড়াতে যখন গান্ধীর মাহাত্ম্য প্রতিষ্ঠায় সাধারণ জনগণের বাড়িতে বিষ্ঠা বর্ষণ করে সেটাও আরেক ধরনের রাজনীতি। তার মানে এক গান্ধী তার রাজনৈতিক জীবনে কখনো সহিংস, কখনো অহিংস আবার কখনো মিথ্যাচারকে আশ্রয় করেছেন। রাজনীতির নানা রূপের এই ধারাবাহিকতা কিন্তু এখনো বিদ্যমান। সময় ভেদে কেবল কৌশলটা, রঙটা একটু বদলেছে। প্রত্যক্ষ-অপ্রত্যক্ষভাবে প্রতিনিয়ত রাষ্ট্রকাঠামো রাজনীতির এই নানা রূপকে কখনো সমর্থন, কখনো বিরোধিতা করেছে। তবে সবকিছুর মধ্যেও রাষ্ট্র সব কাজেই তার নিজের একটা ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছে জোরালোভাবে।

আধুনিক রাষ্ট্র সবসময় জনকল্যাণ কিংবা সামগ্রিক স্বার্থের কথা বললেও কার্যত তা করেনি। তাই কোনো না কোনোভাবে রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আজকের সময়ে রাজনীতির অহিংস রূপ অনশন-লংমার্চ কিংবা অবস্থান ধর্মঘট কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ হলেও গান্ধীর সেই অহিংস নীতি আর নেই। অহিংস আন্দোলন সহিংস হতে এখন আর খুব বেশি সময় লাগে না। কারণ রাজনীতির এই রূপ পরিবর্তন, এখন আর কেবল অধিকার আদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।

অন্যদিকে সহিংসতা ও মিথ্যাচার এখন পাশাপাশি হাত ধরাধরি করে চলছে। মানুষের নিজের কথা বলার জন্য যে রাজনীতি তা আর মানুষের কাছেই থাকেনি। সাধারণ মানুষের অধিকারের কথা বলে রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে গুটিকয়েক মানুষের হাতে। সেখানে মিথ্যাচার হয়ে উঠেছে রাজনীতির অন্যতম হাতিয়ার। তাইতো মধ্যরাতে চাঁদে মহাপুরুষকে দেখিয়ে হাজারো সাধারণ মানুষকে মাঠে নামানো হয় সহিংস করে। লোভ দেখানো হয় শহীদী খেতাবের। রোড শো করে লাখো মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করিয়ে তা লুটে নেওয়া হয়। এসব কিছুর মূলমন্ত্রে থাকে রাজনীতির ওই মিথ্যাচারই।  

এটাতো গেলো রাজনৈতিক দলের রাজনীতির স্বরূপ। এবার বর্তমান তথ্য-প্রযুক্তির যুগে রাষ্ট্রের রাজনীতির কৌশল কেমন সেটাও দেখা প্রয়োজন। এখন সাধারণ মানুষ যে শুধু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে এমনটি নয়। আধুনিক ক্ষমতাতন্ত্র আদৌ সার্বভৌমত্বের ছক মেনে চলে না, চলে অনুশাসন বা ডিসিপ্লিনের ছকে। অর্থাৎ রাষ্ট্র তার জনগণকে সবসময় ক্ষমতা কিংবা অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে থামিয়ে রাখে না। নিরুপায় হয়ে গেলেই সে কেবল এগুলো ব্যবহার করে। তাই এই জনগণকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাই ভিন্ন প্রক্রিয়া, যার নাম অনুশাসন। এটা মানুষের চেতনায় কাজ করে, অবচেতন মনে নিজের দ্বারা নিজেই শাসিত হয়। মজার বিষয় হলো, মানুষ স্বাধীন হয়ে জন্মগ্রহণ করলেও স্বেচ্ছায় অনুশাসনের শিকল পরে তৃপ্তি পায়। তারা কোনো কথা বলে না; ভাবে আমরা স্বাধীন। আর এই সুযোগে রাষ্ট্র নিজের খুশি মতো কাজ করে। এটাই রাষ্ট্রের রাজনীতি, এটাই কাম্য!

 

রাজনৈতিক চলচ্চিত্র ও চলচ্চিত্রে রাজনীতি

১৯১৫ সালে মুক্তি পায় প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র দ্য বার্থ অব অ্যা নেশন। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনকে হত্যা, দক্ষিণের রাজ্যগুলোর পরাজয় এবং সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত দাসদের উদ্ধত আচরণ তথা আমেরিকার গৃহযুদ্ধের পটভূমি নিয়ে নির্মিত এটি। এখানে আমেরিকার রাজনৈতিক অরাজকতার বিষয়টি তুলে ধরতে গিয়ে জাতির মধ্যে যে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব তা প্রকাশ পেয়েছে স্পষ্টভাবে। সেখানে একই জাতি ভিন্ন ধর্ম, বর্ণ, অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ে নিজেদের মধ্যেই যুদ্ধ শুরু করে। কারণ তারা জাতি বলতে বুঝেছে নিজেদের ভাষাভাষী কিংবা বর্ণের মানুষদেরকে। তবে আরেক জাতির ভিন্ন রূপের দেখা মেলে আইজেনস্টাইনের দ্য ব্যাটলশিপ পটেমকিন-এ (১৯২৫)। যেখানে সাধারণ নাবিকদেরকে নষ্ট খাবার দিয়ে কর্মকর্তারা ভালো খাবার খায়। প্রতিবাদ করলেই অপেক্ষা করে মৃত্যু। একসময় নাবিকরা এক হয়ে জাহাজের দখল নেয় এবং তাদের জন্য সাধারণ মানুষের সমর্থন চায়; অত্যাচারিত সহকর্মীর লাশ পাঠায় বন্দরে। এসব দেখে সাধারণ মানুষ তাদের দুর্দশা বুঝতে পারে এবং সমর্থন ও খাবার দিয়ে নাবিকদের সাহায্য করে। আবার যখন এই সাধারণ মানুষের ওপর গণহত্যা চালানো হয়, তখন তাদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় পটেমকিন জাহাজের এই নাবিকেরাই। একই জাতি নিজেদেরকে বাঁচাতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে। তাহলে নেশন, বাংলায় যাকে বলে জাতি কেমন হবে তার চরিত্র? দ্য বার্থ অব অ্যা নেশন নাকি দ্য ব্যাটলশিপ পটেমকিন-এর মতো?

অবশ্য রবীন্দ্রনাথ নেশনের বাংলা প্রতিশব্দ জাতি করতে একেবারেই নারাজ, তিনি নেশনকে নেশন হিসেবেই দেখতে চান। তার কাছে নেশন হলো, যাদের মধ্যে থাকবে সাধারণ সম্মতি, সকলে মিলিয়া একত্রে এক জীবন বহন করিবার সুস্পষ্টপরিব্যক্ত ইচ্ছা। অর্থাৎ একই সঙ্গে ধর্ম, বর্ণ, উচ্চবর্গ, নিম্নবর্গ একত্রে বসবাস করবে। একজনের সমস্যায় অন্যরা এগিয়ে আসবে। তবে আমাদের উপমহাদেশে জাতির ধারণা দুইটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে গড়ে উঠেছে। রাষ্ট্রীয় মহাফেজখানার দলিলে লিপিবদ্ধ রয়েছে যে, আমাদের ভাষা, ধর্ম, বর্ণ আলাদা হলেও আমরা একই জাতিতে বিশ্বাসী; সকলেই ভাই ভাই। এর বিপরীতে জাতির আরেকটি ধারণা রয়েছে, নিজের ধর্ম, শ্রেণি এবং নিজের ভাষাভাষী মানুষ মিলেই একটা জাতি। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো রাষ্ট্রের ক্ষমতায় যারা থাকে, তারা দ্বিতীয় চিন্তাটিকে সমর্থন করে সাধারণ মানুষের মতোই। যে কারণে রামুর বৌদ্ধ বিহার, সংখ্যালঘু হিন্দু কিংবা মুসলমানদের মন্দির ও মসজিদ ভাঙচুরসহ অগ্নি সংযোগ করা হয় অহরহ। সে অপরাধে কারো বিচারও হয় না। কারণ শাস্তি দেওয়ার মানুষই নাই! বরং এগুলো নিয়ে তারা প্রতিনিয়ত রাজনীতির জাল বুনতে থাকে। তাই রাবীন্দ্রিক নেশন এবং দ্য ব্যাটলশিপ পটেমকিন-এ চিত্রিত নেশন এক হলেও আমাদের যে জাতি বা নেশন সেটি এক নয়। সেটা দ্য বার্থ অব অ্যা নেশন-এ চিত্রিত জাতির চেয়ে খুব বেশি হয়তো ভিন্নও নয়। কারণ রাজনৈতিকভাবে জাতিকে আমাদের চলচ্চিত্রেও তুলে ধরা হয় একইভাবে।

মহামতি লেনিন চেয়েছিলেন চলচ্চিত্রের মাধ্যমে মানুষকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করতে, চেয়েছিলেন উন্নয়নের দিকে এগিয়ে নিতে; স্বপ্ন দেখাতে। তিনি এক জায়গার মানুষের ইতিবাচক জীবনচিত্র সেলুলয়েডে ধরে তা দিয়ে স্বপ্ন দেখাতেন আরেক জায়গার মানুষকে। অথচ এই রাশিয়াতেই একসময় চলচ্চিত্রকে ফুর্তির পণ্য করে মানুষকে ভুলিয়ে রাখা হতো। পরে লেনিনের প্রচেষ্টায় মানুষের জীবনযাত্রার মান বদলাতে শুরু করে। তিনি ইঙ্গিত দিলেন মালিক-শ্রমিক সম্পর্কের পরিবর্তনের দিকেও। এভাবে মানুষকে প্রকৃত অধিকারের পথ দেখিয়ে স্বপ্নের জায়গাতে নিয়ে এলেন। মানুষ যে শোষিত হচ্ছে এবং শোষিত হওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে, সেটা ভেঙে ফেলে বের করে নিয়ে আসার পথ দেখালেন লেনিন; স্বপ্নের জায়গায় পৌঁছে দিলেন।

এর খানিক আগেই ১৯১৪ সালে অবশ্য মেকিং অ্যা লিভিং নামের চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে এ মাধ্যমে নাম লেখান আরেক অবিস্মরণীয় স্রষ্টা চার্লি চ্যাপলিন। নিজের জীবনের ভয়ঙ্কর সব বাস্তব অভিজ্ঞতা, চিন্তাশক্তি দিয়ে চ্যাপলিন চলচ্চিত্রের রূপ দিলেন একটু ভিন্ন আঙ্গিকে। জীবনকে খুব কাছ থেকে দেখে সেই জীবনের এক অনন্য রাজনৈতিক অর্থ করলেন চ্যাপলিন। কিছুটা ভাঁড়ামি, কিছুটা ব্যঙ্গময়তা দিয়ে শাসকের মতাদর্শের সামনে জানান দিলেন নিজের উপস্থিতি। ১৯২৮ সালে দ্য সার্কাস-এ তিনি জীবনটাকেই একটা সার্কাস বানিয়ে মালিকের নির্মমতা দেখালেন। পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র দ্য কিড (১৯২১) থেকে শুরু করে দ্য পিলগ্রিম (১৯২৩), অ্যা উইমেন অব প্যারিস (১৯২৩), দ্য গোল্ড রাশ (১৯২৫), সিটি লাইটস (১৯৩১) এবং সর্বশেষ নির্বাক চলচ্চিত্র মডার্ন টাইমস-এ (১৯৩৬) কথা না-বলে নিজের উপস্থিতি জানান দিয়ে বললেন মানুষের অধিকারের কথা।

এরপর আমরা নতুন আরেক চ্যাপলিনকে পেলাম সবাক চলচ্চিত্রে। ১৯৪০ সালে বর্বর ফ্যাসিবাদী শাসকদের উত্থানের বিরুদ্ধে স্বৈরাচারীকে ব্যঙ্গ করে তিনি নির্মাণ করলেন দ্য গ্রেট ডিক্টেটর। উন্মোচন করলেন নিষ্ঠুর শাসকের আসল রূপ। এরপর তিনি একে একে ম্যানসিউর ভারডাস (১৯৪৭), লাইমলাইট (১৯৫২), অ্যা কিং ইন নিউইয়র্ক (১৯৬৭) এবং অ্যা কাউন্টিস ফ্রম হংকং (১৯৬৭) নামের সবাক চলচ্চিত্রে নিজ মুখে সাধারণের অধিকারের কথা বললেন চ্যাপলিন। ৫০ দশকে ফ্রেঞ্চ নিউওয়েভ ধারায় গদার, ত্রুফো, শ্যাব্রল প্রমুখ নির্মাণ করেন নতুন ধরনের রাজনৈতিক চলচ্চিত্র।

এরপর ৬০ দশকে সমাজ-সত্যকে তথা দ্বন্দ্বসমূহের আবিষ্কার ও সমাজ রূপান্তরের প্রয়োজন থেকে লাতিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিলে শুরু হয় নতুন এক চলচ্চিত্র আন্দোলন। যার নাম সিনেমা নোভো। এসব চলচ্চিত্রে দেশজ রাজনীতির বাস্তবতার ইতিহাস গতানুগতিক ধারার বদলে চিত্রিত হলো একটু অন্যভাবে। আসলে এসব চলচ্চিত্র পেটি-বুর্জোয়া চিত্রনাট্যকারদের মতো শেষে এসে কিঞ্চিৎ উপদেশ দিলো না, এমনকি দূর থেকে বাস্তবতাকে পরিদর্শনও করলো না। দর্শক এখানে নিস্ক্রিয় থাকেনি বরং সরাসরি অংশগ্রহণকারী হিসেবে পর্দায় রাজনৈতিক সংলাপেরও অংশীদার হয়েছে। আর্জেন্টিনার ফার্নান্দো সোলানাস ও অক্তভিয়ো গেতিনো, চিলির মিগুয়েল লিত্তিন প্রমুখদের নির্মিত চলচ্চিত্র এর অন্যতম উদাহরণ। তবে ক্ষমতাশীলরা কখনোই এ আন্দোলনকে ভালো চোখে দেখেনি। ফলে ১৯৬৪ সালের দিকে ব্রাজিলে সামরিক সরকার ক্ষমতা দখলে নিলে এ আন্দোলন হুমকির মুখে পড়ে এবং ১৯৭০ সালের মধ্যেই অনেকখানি নিষ্প্রভ হয়। তবে অধিকার আদায় কিংবা উপস্থিতি জানান দেওয়ার আন্দোলন তো আর থেমে থাকে না, পরিবেশ-পরিস্থিতিতে তা কেবল রঙ বদলায়। এক্ষেত্রে নতুন রূপে এ আন্দোলন ধরা দেয় থার্ড সিনেমা হয়ে। যা পরবর্তীকালে শুধু লাতিন আমেরিকা নয়, ছড়িয়ে পড়ে এশিয়া, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে।

এ চলচ্চিত্রগুলো মূলত দর্শককে লড়াকু হতে উৎসাহী এবং রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতা নিরীক্ষণে সহায়তা করে; বিপ্লবী চেতনা, প্রথার বাইরে থেকে প্রথাবিরোধী ভূমিকা পালন করেছিলো। তবে উপমহাদেশে থার্ড সিনেমার আগে চলচ্চিত্রের আরেকটি ধারার জন্ম হয়। যার নাম সেকেন্ড সিনেমা। এই ধারার চলচ্চিত্র বাস্তবতাকে দূর থেকে অবলোকন করে, দর্শকের সাথে বাহাসে যায় না এবং সহনীয় বাস্তবতার রূপায়ণ ঘটায়। তাই কোন্টা রাজনৈতিক আর কোন্টা অরাজনৈতিক চলচ্চিত্র সেটা পার্থক্য করা ছিলো খুবই কঠিন। কারণ প্রত্যেক চলচ্চিত্রই কোনো না কোনো আদর্শের সমর্থক বা প্রচারক, যেখানে চলচ্চিত্রনির্মাতা কিছু বলতে চায়; সে দৃষ্টিকোণ থেকে সব চলচ্চিত্রই রাজনৈতিক। তবে আরো নির্দিষ্ট করে বললে, ব্যক্তির আপন চাওয়া-পাওয়া বা প্রত্যাশা থেকে শুরু করে, ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে গড়ে ওঠা ব্যক্তিসমষ্টির মধ্যকার যে পারস্পরিক সাধারণ ও অভিন্ন দাবি এবং তার জন্য সামাজিক, রাষ্ট্রীয় বা বৈশ্বিক যে আন্দোলন বা সেগুলো অর্জনে সেই ব্যক্তি বা ব্যক্তি সমষ্টির যা কিছু করণীয়এর সবই রাজনৈতিক চলচ্চিত্রের উপাদান।

আর ছবিতে রাজনীতির বিষয়টি প্রাথমিক ভাবে আঙ্গিকের কোন প্রসঙ্গ নয়, ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের প্রসঙ্গ। ...এমন ছবি দর্শককে নান্দনিক অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ করার বদলে মূলত তাকে একটা বিশেষ দৃষ্টিকোণ বা কর্মসূচিতে উদ্বুদ্ধ করে। এ জাতীয় চিত্র নির্মাণে জোর পড়ে বক্তব্যকে সঠিকভাবে সঠিক সময়ে উপস্থাপন করার। যাতে দর্শক দেখে বুঝতে পারে চলচ্চিত্রনির্মাতা কী বলতে চান। কারণ কোনো চলচ্চিত্রে আমাদের কাছে যা রাজনীতির খেলা বলে মনে হয়, সেটা অন্যের কাছে নাও হতে পারে, কখনোবা ভিন্ন কোনো অর্থও দাঁড়াতে পারে।

এটা আসলে দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়। কারণ রাজনৈতিক চলচ্চিত্রকে যে নান্দনিক হতেই হবে সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, আবার সংঘাত থাকতেই হবে এমনটাও নয়। চলচ্চিত্রে রাজনীতির বিষয় হিসেবে দ্য বার্থ অব অ্যা নেশন কিংবা দ্য ব্যাটলশিপ পটেমকিন-এর মতো সরাসরি গৃহযুদ্ধ, যুদ্ধ, গণহত্যা থাকতে পারে আবার দ্য সার্কাস-এর মতো হাসি, কান্নার মাধ্যমে মানুষের অধিকারের কথাও থাকতে পারে। তাই চলচ্চিত্রে রাজনীতির বিষয়টি উপস্থাপন এবং দর্শকের মনোযোগের ওপর নির্ভর করে। কারণ যখন শিল্পীর অভিজ্ঞতা এবং সৃষ্টির মধ্যে কোনো নান্দনিক দূরত্ব থাকে, তখন দর্শক পর্দায় যা দেখেন এবং বাস্তবে যা করেন তার মধ্যেও নান্দনিক এক দূরত্ব থাকবে। তবে দর্শকদেরকে সাময়িকভাবে হলেও যেকোনো চলচ্চিত্রই রাজনৈতিক সমাবেশে পরিণত করতে পারে। তবে সেটা নান্দনিক কোনো গুণাবলীর কারণে নয়, ঐতিহাসিক মুহূর্তের জন্য। ফলে স্পষ্টতই বোঝা যায়চলচ্চিত্রে রাজনৈতিক ভূমিকার সঙ্গে নান্দনিক গুণাবলীর আদৌ কোনো সম্পর্ক নেই।

রাজনৈতিক চলচ্চিত্র তার বক্তব্য উপস্থাপন করে চিত্রপ্রতিমাকে প্রতীক রূপে ব্যবহার করে। তাই এটা সঠিক সময়ে উপস্থাপন করার প্রয়োজন পড়ে। কারণ চিত্রপ্রতিমা যখন সত্য নয় ও যখন তার বুদ্ধিগ্রাহ্য গভীরতাও নেই, বক্তব্যও তখন যথেষ্ট জোরালো হতে পারে না, তার বিশ্বাসযোগ্যতাও বিশেষভাবে ক্ষুণ্ন হয়।১০ বাংলাদেশের অন্যতম রাজনীতি সচেতন নির্মাতা কাজী হায়াতের চলচ্চিত্রে এই রাজনীতির উপস্থাপন কীভাবে হয়েছে কিংবা আদৌ সেটা রাজনৈতিক চলচ্চিত্র কিনা তাই নিয়ে আমরা এবার আলোচনা এগিয়ে নেবো।

 

কাজী হায়াতের চলচ্চিত্রে রাজনীতির নির্মাণ

মানুষ কোনো না কোনোভাবে রাজনীতির মধ্যেই বেড়ে ওঠে। ফলে যে চলচ্চিত্রই হোক না কেনো তা কোনো না কোনোভাবে রাজনৈতিক। বাংলাদেশে নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোর ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে যারা চলচ্চিত্র, নির্দিষ্ট করে বললে রাজনৈতিক চলচ্চিত্র নির্মাণ করে জনপ্রিয় হয়েছেন এবং যারা নিজেদেরকে রাজনৈতিক চলচ্চিত্রনির্মাতা বলে দাবি করেন তাদের মধ্যে কাজী হায়াৎ অন্যতম। প্রথম চলচ্চিত্র দ্য ফাদার (১৯৭৯) থেকে সর্বশেষ ইভটিজিং (২০১৩) দিয়ে তার মুক্তি পাওয়া চলচ্চিত্রের সংখ্যা ৪৩টি। বাম রাজনৈতিক চিন্তাধারার এ নির্মাতা মনে করেন, চলচ্চিত্র এমন একটি বিষয় যার মাধ্যমে পুরো জাতিকে সচেতন করে তোলা সম্ভব। এবং তিনি নিজেও এর মাধ্যমে সমাজের নানা অন্যায়, অত্যাচার আর অবক্ষয়ের ক্ষতস্থানে প্রলেপ দেওয়ার জন্য যুদ্ধ করছেন।১১ তার রাজনৈতিক চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে থেকে ইতিহাস (২০০৪), দাঙ্গা (১৯৯২) ও ধর-কে (১৯৯৯) টেক্সট হিসেবে নিয়ে তা আমরা মূল্যায়নের চেষ্টা করবো। তার আগে চলচ্চিত্র তিনটির কাহিনী সংক্ষেপে জেনে নেওয়া যাক :

স্কুল ছাত্র মারুফ। স্কুলে যাওয়ার পথে একদিন পুলিশ তাকে সন্দেহজনকভাবে ধরে নিয়ে যায় ডেপুটি সেক্রেটারি অতুল বিহারি হত্যা মামলার আসামি হিসেবে। থানায় ওসির আদেশে মারুফকে খুনি প্রমাণের চেষ্টা চলে। কিন্তু মারুফের বাবার সাংবাদিক পরিচয় জানার পর পুলিশ ভয় পেয়ে তাকে হত্যা মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়ে একটি ছিনতাই মামলায় গ্রেপ্তার দেখায়। সৎ সাংবাদিক বাবার চেষ্টায় মারুফকে থানা থেকে ছাড়ানো যায় না; একপর্যায়ে মারুফের বোন তার বাবাকে না জানিয়ে উৎকোচ দিয়ে ছাড়িয়ে আনে মারুফকে। এরপর মারুফকে আমেরিকায় লেখাপড়ার জন্য পাঠানোর ব্যবস্থা করেন তার বাবা। দেশ ছাড়ার দিন বিমানবন্দরে যাওয়ার পথে অন্য একটি মামলায় মারুফকে আবারো গ্রেপ্তার করে পুলিশ। রাষ্ট্রযন্ত্রের নির্মম এ ষড়যন্ত্রে জীবনের সব স্বপ্ন হারিয়ে ফেলে মারুফ। বাবা-বোনের সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সমাজের গ্যাঁড়াকলে পড়ে সে হয়ে ওঠে সিরিয়াল কিলার। সংক্ষেপে এই হলো ইতিহাস 

সমাজের নানা শ্রেণির ক্ষমতাবান মানুষের দুর্নীতির বহুমাত্রিক চিত্রের গল্প হলো দাঙ্গা। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও সাংসদ ত্রাণের মালামাল চুরি করে বেচে দেয়। সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ে স্থানীয় কলেজের ভিপি হাবিব তাদের নিয়ে লুট করে গোডাউন। ক্ষমতার বলয়ে আঘাত আসায় সাংসদের নির্দেশে হাবিবকে খুন করে চেয়ারম্যান। অন্যদিকে, ছবি নামের একটি অভাবী-অসহায় মেয়েকে সামান্য ভাত-কাপড়ের লোভ দেখিয়ে অনৈতিক সম্পর্কে জড়াতে চায় চেয়ারম্যান ও সাংসদ। এতে ব্যর্থ হয়ে একপর্যায়ে তারা ছবি ও তার মাকে গ্রামছাড়া করে কুৎসা রটিয়ে। তাতেও ক্ষান্ত হয় না ক্ষমতাবানরা। নিরুপায় ছবি একপর্যায়ে নিজেকে বাঁচাতে রাষ্ট্রের সাহায্য চায়, এমনকি স্বেচ্ছায় থানায় বন্দি থেকে হলেও নিজেকে বাঁচাতে চায় সে। থানার বদলে তার আশ্রয় জোটে ওই থানার ওসি রাজুর বাসায়। সাংসদের লোকেরা সেখানেও হামলা চালিয়ে ওসির হাত কেটে নেয় ও তার স্ত্রীকে হত্যা করে। অবশেষে সাংসদকে হত্যা করে সবকিছুর প্রতিশোধ নেয় ওসি রাজু।

পিতৃপরিচয়হীন একটি সন্তানের অনাদর-অবহেলায় বেড়ে ওঠা ও তার ভবিষ্যৎ; এবং তাকে ঘিরে  রাজনৈতিক ব্যক্তিদের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার যে খেলা তা চিত্রায়ণ করা হয়েছে ধর-এ। একটি ছেলেসন্তান জন্ম নেয় রাস্তার এক মানসিক ভারসাম্যহীন নারীর গর্ভে, কোনো ঠিকানা তো দূরের কথা; নামও জোটে না তার। শিশুটি একপর্যায়ে সন্ত্রাসী বাবুর আশ্রয়ে এলে তার নাম দেওয়া হয় অপূর্ব। ধীরে ধীরে সে ওস্তাদ বাবুর কথায় খুন, চাঁদাবাজি, হুমকিসহ সব কাজ করতে থাকে। কাজে ভুল হওয়ার অপরাধে অপূর্বকে তার আস্তানা থেকে বের করে দেয় বাবু। অপূর্বকে দলে নিতে উদগ্রীব হয় এমপি-মন্ত্রী সবাই। কিন্তু সে যায় না, ভালো হয়ে স্বাভাবিক জীবনের স্বপ্ন দেখে সে। অন্যদিকে বাবুর ঘরে আশ্রিত আরেক অসহায় বিহারি মেয়ে গুলশান; যে তার স্ত্রী নয় কেবলই রক্ষিতা। সে এ দেশে জন্মগ্রহণ করলেও নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত, কারণ সে জন্মসূত্রে বিহারি! এভাবে রাষ্ট্র-সমাজের কাছে অবহেলিত পৃথক দুই শ্রেণির অধিকারের আরজি নিয়ে শেষ হয় ধর।

 

অধিকারের অনধিকার

আধুনিক রাষ্ট্রে মানুষের ভালোভাবে বেঁচে থাকা, নাগরিক হিসেবে সুযোগ-সুবিধা, নিরাপত্তা সবই তার রাজনৈতিক অধিকার। এই অধিকার নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্র তাকে দিতে বাধ্য। কিন্তু অনেক সময় রাষ্ট্র তাকে নিরাপত্তা তো দেয়ই না বরং জীবনকে আরো হুমকির মুখে ফেলে দেয়। অন্যদিকে সাধারণ নাগরিকের এই অধিকারের ব্যাপারে তারও কিছু দায় থাকে, মানতে হয় রাষ্ট্রিক কিছু নিয়ম। পরিবার থেকে রাষ্ট্র সব জায়গায় তাকে নিজের কথা ভাববার সঙ্গে সঙ্গে অন্যদের কথাও ভাবতে হয়। অথচ সেখানেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চলে একান্তই নিজের মতো করে বেঁচে থাকার চেষ্টা। অবশ্য পুঁজিবাদী সমাজ তার বিভিন্ন উপাদান দিয়ে আমাদের কোনো সমস্যাকে আমাদের নয়, আমার করে ভাবতে শেখায়। ফলে রাষ্ট্র যেমন সুযোগ পেলেই সুযোগ নেয়ঘটে রাষ্ট্রিক সন্ত্রাস (State violence)। একইভাবে রাষ্ট্রের একজন ব্যক্তি-নাগরিকও এই সুযোগ হাতছাড়া করে নাঘটে অপরাধ।

ইতিহাস-এ মারুফকে রাষ্ট্রিক ক্ষমতায় পুলিশ কোনো প্রকার প্রমাণ ছাড়াই ডেপুটি সেক্রেটারি অতুল বিহারি হত্যা মামলার আসামি হিসেবে আটক করে। চেষ্টা চলে জোর করে মারুফের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেওয়ার। পরে পুলিশ মারুফের বাবার সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে তাকে হত্যা মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়ে ছিনতাই মামলায় গ্রেপ্তার দেখায়; এর মাধ্যমে তারা জায়েজ করতে চায় প্রথমে তাকে যে কারণে ধরা হয়েছিলো সেটা কোনো না কোনোভাবে বৈধ। শেষতক ঘুষ নিয়ে পুলিশ তাকে ছেড়ে দেয়। এবার এর বিপরীতে একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে মারুফের বাবা বা তার পরিবার কী করে কিংবা কী করতে পারতো সেটা আমরা দেখি।

আমাদের দেশে যেকোনো সন্ত্রাস, অপরাধের জন্য প্রচলিত আইন রয়েছে। যদি রাষ্ট্রও কোনো সন্ত্রাস কিংবা অপরাধ করে, তাহলে যে কেউ ইচ্ছা করলে আইনের আশ্রয় নিয়ে সেটার মোকাবেলা করতে পারে। আবার এর বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করে আন্দোলনও করা যায়। আর সবশেষে এগুলোর কোনোটি না করে অভিযুক্তের পরিবার সবকিছু মেনে নিতে পারে।

সম্প্রতি ঝালকাঠির কলেজ ছাত্র লিমনের পরিবার কিন্তু প্রথম দুটি করেছে। লিমনকে সন্ত্রাসী সন্দেহে র‌্যাব তার পায়ে গুলি করে এবং হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখায়। তখন তার পরিবার রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায় এবং একই সঙ্গে আইনি লড়াইয়ে নামে। অবশেষে তারা এ লড়াইয়ে জয়ীও হয়। এভাবে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রমাণ রয়েছে ভুরি ভুরি। কিন্তু ইতিহাস-এ মারুফের বাবা আইনি লড়াই কিংবা জনমত তৈরির কোনোটিই করলেন না। তিনি সবকিছু মেনে নিলেন। পুলিশকে ঘুষ দিয়ে মারুফকে থানা থেকে ছাড়িয়ে এনে তার বাবা ও বোন জমি বিক্রি করে তাকে আমেরিকা পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন।

আগেই বলেছি, রাষ্ট্র একবার সুযোগ পেলে আবার সুযোগ নেয়। আর এরই ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্র মারুফকে আবারও গ্রেপ্তার করে তার বাড়ির গেট থেকে। কিন্তু তার পরিবার এর বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ কিংবা আইনি লড়াইয়ে না গিয়ে এবারও সবকিছু মেনে নেয়। রাষ্ট্রীয় এ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কাজী হায়াতের কোনো অবস্থান ইতিহাস-এ নেই। কাঠামো ভেঙে বেরিয়ে আসার কোনো ইঙ্গিতও তিনি দেননি, দেখাননি কোনো স্বপ্ন! ফলে রাষ্ট্র কিন্তু তার চরিত্র থেকে ইতিবাচকভাবে একচুলও নড়েনি কিংবা নড়ানোর চেষ্টাও হয়নি। বরং কাজী হায়াৎ একধরনের পালাবার চেষ্টা করেছেন।

দাঙ্গায় চেয়ারম্যানের কাছে দুঃস্থদের জন্য ত্রাণ সামগ্রী আসে; কিন্তু নাম মাত্র কয়েকটি শাড়ি দিয়ে বাকি সবকিছু তারা আত্মসাৎ করে। তখন বঞ্চিত সাধারণ মানুষ স্থানীয় কলেজ ছাত্রনেতা হাবিবের নেতৃত্বে গোডাউন লুট করে নিজেদের অধিকার বুঝে নেয়। অনেকটা ব্যাটলশিপ পটেমকিন-এর মতো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আশা ধরে রাখা যায় না। হাবিবকে মেরে ফেলার পর শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ করলেও সেটা কৌশলে থামিয়ে দেয় স্থানীয় সাংসদ। প্রতিষ্ঠা হয় শাসকদের আধিপত্য। ফলে দর্শক এখানে নিরাশ হয়। কারণ কাজী হায়াৎ সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের কোনো ইঙ্গিত দেন না। তিনি কেবল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠানকে বিব্রত করেন কিন্তু আঘাত করেন না।

 

জাত অজাতের দ্বন্দ্বে বিপন্ন মানবতা

নেশন ও জাতির ধারণা আমরা আগেই পেয়েছি। সেখানে দেখেছি নেশন ও জাতি দুইটি ভিন্ন বিষয়। নেশনভিন্ন ভাষা, ধর্ম, বর্ণের মানুষের সম্মিলিত রূপ। অন্যদিকে একেকটি ভাষা, ধর্ম, বর্ণের মানুষেরা একেকটি জাতি। ধর-এ রাস্তায় মানসিক ভারসাম্যহীন নারীর অনাকাক্সিক্ষত সন্তান অপূর্ব। সমাজে তার নাম অপূর্ব হওয়ার আগে কখনো পিচ্চি, টোকাই আবার কখনো খানকি মাগির পোলা নামে তাকে বিশেষায়িত করে। পিতৃপরিচয় না থাকায় শেষের নামটিতেই বেশি ডাকা হয় তাকে। অপূর্ব নাম দেওয়ার পরেও সে নাম আর ঘোচে না। তাইতো কারণে-অকারণে তার জন্ম পরিচয়ের দিকে ইঙ্গিত দিয়ে কথা বলে রাজনৈতিক দলের নেতারা, এতে অবশ্য অপূর্ব কিছু মনেও করে না। বরং সে ওস্তাদ বাবুকে বলে, তার যে নামে ইচ্ছা সে নামে তাকে ডাকতে। এমনকি খানকি মাগির পোলা নামে ডাকলেও তার কোনো আপত্তি নেই। কাজী হায়াৎ এখানে সমাজের বাস্তব চিত্র অনেকটাই তুলে ধরেন; কিন্তু সমাজের অনুশাসন ভেঙে বেরিয়ে আসার কোনো পথ দেখান না। তাহলে কি সমাজ কিংবা সাধারণ মানুষের মতো তিনিও মনে করেন, মানুষের মানুষ পরিচয়ের চেয়ে পিতৃ পরিচয়টাই বড়ো?

আবার ধর-এ অবহেলিত, পিছিয়ে পড়া দুই বিহারি বংশোদ্ভূতত গুলশান ও লাভলি এ দেশে জন্মগ্রহণ করলেও নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তাদের অপরাধ ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের পূর্বসূরিরা পাকিস্তানকে সমর্থন দিয়েছিলো। সেসময় অধিকাংশ বিহারি দেশ ছেড়ে চলে গেলেও তাদের কেউ কেউ এদেশে আটকা পড়ে। ফলে এদেরকে গ্রহণ করেনি এদেশের মানুষ, রাষ্ট্র কেউই। বর্তমানে দেশের ১০০টি ক্যাম্পে প্রায় সাত লাখের মতো বিহারি মানবেতর জীবন-যাপন করছে।১২ বড়ো সঙ্কট হচ্ছে অধিকাংশ বিহারি ছেলেরা বিহারি মেয়েদের বিয়ে করতে রাজি হচ্ছে না। ফলে অবিবাহিত বিহারি মেয়ের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০ হাজার।১৩

এ ধরনের পরিস্থিতিতে গুলশানকে বিয়ে করার আশ্বাসে রক্ষিতা করে রাখে বাবু। গুলশানের ছোটো বোন লাভলির লেখাপড়া করে চাকরির ইচ্ছা থাকলেও বাবু সেটা চায় না। বাবু চায় লাভলিও তার বোনের মতোই রক্ষিতা হোক। এজন্য তাদের ওপর চলে নিপীড়ন-নির্যাতন। আর রাষ্ট্রও তাতে মৌন সমর্থন দেয়। লাভলি তার বোনের কাছে ১০ হাজার টাকা নেয় পাসপোর্ট করে বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার জন্য। কাজী হায়াৎ হয়তো এদের জীবন নিয়ে ফ্যান্টাসি করতে করতে ভুলেই গেছেন বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি না পাওয়ায় এরা পাসপোর্ট করার অধিকার রাখে না। হাইকোর্টের একটি রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৮ সালের সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার নাগরিক হিসেবে তাদের স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু এখনো তাদের বিদেশ যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি।১৪ অথচ ১৯৯৯ সালে নির্মিত ধর-এ কাজী হায়াৎ তাকে বাংলাদেশের পাসপোর্ট করতে পাঠালেন। তিনি অবহেলিত বিহারিদের জীবনচিত্র কিছুটা তুলে ধরলেন ঠিকই কিন্তু রাষ্ট্রকে বাঁচিয়ে দিলেন। সাধারণ নাগরিককে অপরাধী বানিয়ে কর্তৃত্বপরায়ণ রাষ্ট্রের দায়ভার এড়িয়ে গেলেন। কিন্তু কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রকে বাঁচিয়ে কি আর রাজনৈতিক চলচ্চিত্র হয়!

 

রাজনীতির ওপিঠ

ধর-এ সন্ত্রাসী বাবু মন্ত্রীর কথা অমান্য করে কমিশনারের সঙ্গে সমঝোতা সভা থেকে বেরিয়ে আসলে, মন্ত্রী তাকে কিছুই বলতে পারে না। তখন মন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী বলে, এই যে বাবু চলে গেলো, কমিশনার চলে গেলো এবং বাবুর সাথে অপূর্ব নাম করে যে ছেলেটি আপনার সাথে দুর্ব্যবহার করে গেলো, এরপরও আপনি ওদের বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারবেন না। পারবেন না এই কারণে যে, রাজনীতি আপনার পেশা। ভোট ওরা আপনাকে দিতে পারে না, কথাটা ঠিক? কিন্তু এলাকায় ঢোকার জন্য, ট্রাক মিছিলের জন্য, মিটিংয়ে লোক আনার জন্য, বস্তি থেকে লোক আনার জন্য বাবুদের প্রয়োজন হয়। কারণ জনগণ এখন আর আপনাদের বিশ্বাস করে না। তাই ওই মিটিংয়ে লোকও হয় না। সেই জন্য ওই বাবুদের প্রয়োজন হয়। আপনারা যতোই চিৎকার করেন সন্ত্রাসী যে দলেই হোক তাদেরকে রাখবেন না, পারবেন না স্যার, পারবেন না। বাবুরা এখন রাজনীতিতে অতীব, অতীব, অতীব প্রয়োজনীয় বিষয়। বাবুদের মাইনাস করে রাজনীতি করা চলবে না।

অন্যদিকে দাঙ্গায় একজন সাংসদ এক ব্যবসায়ীর কাছে পাঁচ লাখ টাকা চায়, কারণ দলকে এই টাকা দিলে তার মন্ত্রী হওয়ার রাস্তা পাকাপাকি হয়। টাকার বিনিময়ে সাংসদ ওই ব্যবসায়ীকে দুঃস্থদের জন্য যাবতীয় ত্রাণ কালোবাজারি করার সুযোগের কথা বলে। আরেকটি দৃশ্যে কালুগুণ্ডার সঙ্গে দেখা করতে যায় সাংসদ, লোক মারফত কালুকে তার (সাংসদের) গাড়ির কাছে আসতে বলে। কিন্তু কালু না গিয়ে উল্টো সাংসদকেই তার কাছে আসতে বলে। তখন বাধ্য হয়ে সাংসদ তার কাছেই যায়।

এ দুটি ঘটনায় কাজী হায়াৎ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকা জনপ্রতিনিধিদের সন্ত্রাসীদের কাছে জিম্মি দেখিয়েছেন। সেখানে সাংসদ, মন্ত্রীরা সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে বেশি কিছু করতে পারে না বললেই চলে। এ দেখে মনে হওয়া স্বাভাবিক, সন্ত্রাসী তৈরিতে রাজনৈতিক নেতাদের কোনো ভূমিকা নেই। কিন্তু বাস্তবে আমাদের রাজনৈতিক ক্ষমতার মেরুকরণের যে মেরুতে একজন সন্ত্রাসী অবস্থান করে, সেখানে সে মূল ক্ষমতা কাঠামোর সঙ্গে কতোটুকু সংযুক্ত? রাজনৈতিক ক্ষমতাকে যদি উল্টো-পিরামিড কাঠামোর সঙ্গে তুলনা করি, তাহলে দেখবো এর উপরের দিকে (অর্থাৎ পিরামিডের যেটা প্রকৃত গোড়া, যেখানে রাজাদের মমির সঙ্গে মূল্যবান রত্ন থাকে) থাকে দলের নীতিনির্ধারণী নেতারা, আর একেবারে নিচের দিকে সাধারণ জনগণ যেখানে থাকেতার একটু উপরে অবস্থান করে তাদেরই বানানো ওই সন্ত্রাসীরা।

অনেক পথ হয়ে উপরের আদেশ চুঁইয়ে নামে এই সন্ত্রাসীদের কাছে। আর এরা তা প্রয়োগ করে সাধারণ জনগণের ওপর। মূলত এরা কোনো নির্দিষ্ট দলের থাকে না, ক্ষমতার পরিবর্তনে এদের অবস্থানও পরিবর্তন হয়। এরা মূলত এক মুহূর্তও ক্ষমতাবানের আশ্রয় ছাড়া টিকে থাকতে পারে না। স্বার্থের হিসাবে সামান্য গড়মিল হলেই এরা বলি হয় পিরামিডের শীর্ষে বসে থাকা রাজনীতিকদের। এটাই বাস্তবতা। কিন্তু সাদা চোখে দেখলে রাজনীতির এই ক্ষমতা কাঠামোর কেন্দ্রেই মনে হয় সন্ত্রাসীদের। কাজী হায়াৎ সেই দেখা থেকে বেরিয়ে আসতে পারলেন না। বরং তিনি বুর্জোয়া ক্ষমতা কাঠামোর আবেগী চিন্তা ধারার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করলেন। যার ফলে ক্ষমতা নিয়ে সাধারণ দর্শকের যে চিন্তা সেটাই পুনরুৎপাদন হলো।

 

কেবল কথার ফুলঝুরি ঝরে

ইতিহাস-এ দেখিরাস্তা থেকে সন্দেহজনকভাবে মারুফকে আটক, তার বাবার পরিচয় জানতে পারা, অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো এবং পরে ঘুষের বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া। এখন প্রশ্ন, র‌্যাবের গুলিতে পা হারানো কলেজ ছাত্র লিমনের বাবা যদি মারুফের বাবার মতো সাংবাদিক হতেন, তাহলে পুলিশ কি লিমনকে তার পরিচয় জানার পরও অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখাতো?

আবার দাঙ্গায় যে পুলিশকে দেখানো হলো সাধারণের স্বপ্নের সুশৃঙ্খল এক প্রতিষ্ঠান হিসেবে। যেখানে পুলিশ ঘুষ খায় না, অন্যায় করে না, তারা যেনো শান্তির দূত। পুলিশ কর্মকর্তা রাজু তাই আশ্রয়হীন ছবি ও তার মাকে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দেয়। স্ত্রী ঘুষ নিতে বললে হাবিলদার তাকে শাসন করে, সাবধান করে দেয় আর কোনোদিন ওই কথার পুনরাবৃত্তি না করার। এমনকি এই পুলিশের কাছে ধনী-গরিব, ক্ষমতাবান-ক্ষমতাহীনের কোনো বৈষম্য থাকে না।

পুলিশের একজন সামান্য কর্মকর্তা রাজু তাই স্থানীয় সাংসদের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতেই তাকে অসৎ-দুর্নীতিবাজ হিসেবে আখ্যায়িত করে উপদেশ দেয়। তার ভাষায়, ...অবশ্যই একজন ইমামকে সৎ চরিত্রের অধিকারী হতে হবে। ঠিক তেমনি রাজনীতির ক্ষেত্রেও অবশ্যই একজন রাজনীতিবিদের স্বজনপ্রীতির ঊর্ধ্বে থাকা উচিত, সৎ চরিত্রের অধিকারী হওয়া উচিত। সাক্ষাৎ শেষে, তাকে গুলি করে মেরে ফেলার সাধ্য থাকলে সে (রাজু) সেটাই করতো বলে সাংসদকে জানায়। অন্যদিকে নীতিবাক্য শুনে সাংসদ রাজুকে বদলির হুমকি ছাড়া আর কিছুই করতে পারে না।

তিনটি চলচ্চিত্র জুড়েই কাজী হায়াৎ সুযোগ পেলেই নীতি, নৈতিকতা ও আদর্শের কথা শুনিয়েছেন দর্শকদের। ইতিহাস-এ মারুফ বাবার কবরের কাছে গিয়ে বলে, তুমি কবরে থাকলে তো হবে না, বাংলাদেশের ইতিহাস কে লিখবে? স্বাধীনতার পরে সাংবাদিক আহাদ চৌধুরীর ছেলের হাতে কীভাবে অস্ত্র এলো এ কথা তুমি ছাড়া কেউ জানে না। শুধু তুমি জানো, তুমি ছাড়া এ ইতিহাস কেউ লিখতে পারবে না। তুমি ওঠো, বাংলাদেশের ইতিহাস লিখো, দেশটাকে বাঁচাও।

দাঙ্গায় দেখি ছাত্রনেতা হাবিব হত্যার সাক্ষী অমূল্য ও সাধু বাবার কথোপকথন-

অমূল্য : সাধু বাবা, আমি তো ইহকাল-পরকাল সবই হারাইছি।

সাধু বাবা : ইহকাল ক্ষণিকের জন্য, পরকাল অনাদি। ইহকাল থেকে সঞ্চয় করে নিয়ে যেতে হয় পরকালে।

অমূল্য : আমার যে কোনো সঞ্চয় নাই। বড়ো একটা পাপের বোঝা আমার মাথায়, ইহকালের ভয়ে নামাইতে পারতাছি না।

সাধু বাবা : এই পাপের ভয়ে তুই পরকাল হারাবি? তুই নরাধম।

আবার ধর-এ অপূর্ব জজ সাহেবকে বলেন, এই অপূর্বগোর জন্য আপনারা নতুন কোনো সমাজ বানাইতে পারেন না? নতুন একটা দেশ বানাইতে পারেন না? একটা নতুন পৃথিবী বানাইতে পারেন না? যে পৃথিবীতে কোনো পাপ থাকবে না। কোনো যুদ্ধ থাকবে না। যে পৃথিবীটা হবে শান্তির পৃথিবী। যে পৃথিবীতে থাকবে, শুধু আমি মানুষআর এটাই হবে তার আসল পরিচয়।

এসব কথায় মন ভোলানো বুলি থাকলেও বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্ক থাকে না। বুর্জোয়াদের টাকায় বুর্জোয়ার মান রক্ষায় যে চলচ্চিত্র হয় তার অন্যতম উপাদান থাকে এই নীতিকথা। তাই এসব কথায় হাততালি, সাময়িক ক্ষোভের জন্ম হয় ঠিকই কিন্তু মূল কাঠামোকে তা সামান্য টোকাও মারে না, কেবল ভুলিয়ে রাখে।

 

অতঃপর সকলে সুখে-শান্তিতে

বসবাস করিতে লাগিলো

জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভালোকে ভালো এবং খারাপকে খারাপ হিসেবে তুলে ধরার একটা প্রবণতা লক্ষ করা যায়। অর্থাৎ আবেগ, প্রেরণা ও নৈতিকতার ধোঁয়া তুলে এ ধরনের চলচ্চিত্রে কালোকে কালো ও সাদাকে সাদাভাবে উপস্থাপন করা হয়।১৫ কিন্তু কেনো এই সাদা, কালো? কেনো সবসময় ভালোর জয় এবং খারাপের পরাজয় দেখানো? অথচ কেনো তারা খারাপ হলো সেটা প্রশ্ন করা হয় না।

আমাদের আলোচিত চলচ্চিত্রগুলোর চিত্রনাট্য, কাহিনী, সংলাপ ভিন্ন ভিন্ন হলেও কাহিনীর পরিণতি সবগুলোর একই। এখানেও সবসময় ভালোরই জয় এবং খারাপের পরাজয়। ইতিহাস-এ মারুফ সন্ত্রাসী কাবিলা, সোবহান এবং ভ-পীরকে মেরে বোনকে বাঁচিয়ে এনে জয়ের পতাকা ওড়ায়। অন্যদিকে ধর-এ মন্ত্রী, বাবুসহ সবাইকে অপূর্ব হত্যা করে নায়িকাকে উদ্ধারের পর আদালতে আত্মসমর্পণ করে। আবার দাঙ্গার শেষে নায়ক রাজু মারা গেলেও মৃত্যুর পূর্বে সে কালুগুণ্ডা, অসৎ মন্ত্রীকে হত্যা করে ভালোর জয় আনে।

আসলে চলচ্চিত্রনির্মাতা যেভাবে জোর করে ভালোর জয় ও খারাপের পরাজয় দিয়ে সব সমস্যার সমাধান করেছেন, সেটা কেবল চলচ্চিত্রেই সম্ভব। বাস্তব কিন্তু ভিন্ন কথা বলে। রাষ্ট্র এমনভাবে তার জাল বিছিয়ে রেখেছে যে, কোনো অশুভ ধ্বংসের ন্যানো সেকেন্ডের মধ্যে সেই স্থান পূরণ হয়ে যায়। তাই কেবল গায়ের জোরে অশুভকে হত্যা করে শুভকে কি টিকে রাখা সম্ভব?

 

এবার সমাপ্ত

তৃতীয় বিশ্বের দুঃখী মানুষেরা সবকিছুর পরও একটু আশা নিয়ে বেঁচে থাকতে চায়। কিন্তু সেটাও শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে না। কেবল রাজা-রাজার লড়াইয়ে বিনা কারণে অবুঝ শিশু চোখ, হাতের কব্জি হারায়; আবার কখনো প্রাণ দিতে হয় পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকে। এসব নিয়ে হাজারো প্রশ্ন জাগে, কিন্তু উত্তরণের কোনো পথ মেলে না। অনেকে প্রতিবাদের-উত্তরের পথ হিসেবে বেছে নেন চলচ্চিত্র নির্মাণকে, চলচ্চিত্রকে; দেখাতে চান সমাজের বাস্তব প্রতিচ্ছবি; জাগাতে চান সাধারণ মানুষকে। এতে হয়তো কিছু কাজ হয়, হয়তো হয় না। তবে এ কথা ঠিক, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষের চলচ্চিত্র আর সাধারণ মানুষের থাকে না। তারপরও যুগে যুগে আইজেনস্টাইন, চ্যাপলিনরা বসে থাকেন না।

 

লেখক : ইব্রাহীম খলিল ও নাজমুল রানা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।

ibrahimrumcj@gmail.com

ranamcj.ru@gmail.com

 

তথ্যসূত্র

১. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, উদ্ধৃত; চট্টোপাধ্যায়, পার্থ (২০০৮ : ৭৭); প্রজা ও তন্ত্র; অনুষ্টুপ, কলকাতা।

২. আহমদ, ড. এমাজউদ্দীন (২০০৭ : ১২৫); রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কথা; বাংলাদেশ বুক করপোরেশন লি., ঢাকা।

৩. গান্ধীকে নিয়ে এই আলোচনার সন্ধান পাইগৌতম ভদ্র ও পার্থ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত নিম্নবর্গের ইতিহাস (২০০৪) গ্রন্থের শাহিদ আমিনের লেখা গান্ধী যখন মহাত্মা প্রবন্ধে। সেখানে বিষয়টি বলা আছে এভাবে৮ ফেব্রুয়ারি মহাত্মা গান্ধী যখন গোরখপুর থেকে বারাণসী ফিরে যাচ্ছিলেন, সালেমপুর স্টেশনে তাঁকে দেখবার জন্য এক বিশাল জনসমাবেশ হয়। সেই জনসভায় এসেছিল এক বাবাই অর্থাৎ পানপাতার চাষির ছেলে। স্টেশনে আসবার সময় এক ব্রাহ্মণীর কাছে সে একটা চাদর চায়। ব্রাহ্মণী সেই অনুরোধ ক্রোধের সঙ্গে প্রত্যাখান করলেন। ছেলেটি কাঁপতে কাঁপতে কোনওমতে স্টেশনে এসে মহাত্মাকে দেখে বাড়ি ফিরে যায়। সকালবেলা আমি গ্রামে গুজব শুনলাম যে সেই ব্রাহ্মণীর গৃহে বিষ্ঠাবর্ষণ হয়েছে। শেষে ব্রাহ্মণী চব্বিশ ঘণ্টা নির্জলা উপোস আর মহাত্মাজির আরাধনায় শাস্তিস্বস্ত্যয়ন করলেন।

৪. মামুন, আ-আল (২০০৬ : ৩০); ভূমিকার বদলে; মানব প্রকৃতি : ন্যায়নিষ্ঠা বনাম ক্ষমতা; ভাব-ভাষান্তরআ-আল মামুন; রোদ প্রকাশনী, রাজশাহী।

৫. প্রাগুক্ত; চট্টোপাধ্যায়, পার্থ (২০০৮ : ৭০)।

৬. আউয়াল, সাজেদুল (২০১১ : ৮৮); চলচ্চিত্রের ধারা সমূহের অন্তর্গত পাঠ; চলচ্চিত্রকলার রূপ-রূপান্তর; দিব্যপ্রকাশ, ঢাকা।

৭. প্রাগুক্ত; আউয়াল, সাজেদুল (২০১১ : ৯১)।

৮. রোবের্জ, গাস্তঁ (১৯৮৪ : ১১৫); নতুন সিনেমার সন্ধানে; অনুবাদসুস্মিতা ভট্টাচার্য; বাণীশিল্প, কলকাতা।

৯. প্রাগুক্ত; রোবের্জ, গাস্তঁ (১৯৮৪ : ১১৭)।

১০. প্রাগুক্ত; রোবের্জ, গাস্তঁ (১৯৮৪ : ১২০)।

১১. যুধ্যমান নির্মাতা কাজী হায়াৎ; দৈনিক ডেসটিনি, ২১ জানুয়ারি ২০১০।

১২.http://risingbd.com/detailsnews.php?nssl=60ad0ddf6788af6c96d80d44f0f0ccf5&nttl=2013100203105215725#.UoHZTFGGY9U

১৩. বিস্তারিত জানতে উইকিপিডিয়ায় দেখুনআটকে পড়া বিহারী নিবন্ধটি।

১৪. বিবিসির সম্প্রচারিত এক প্রতিবেদন থেকে পাওয়া।

১৫. বেনেগাল, শ্যাম (১৯৯৫ : ২৫); Popular Cinema, 100 Years of Cinema; সম্পাদনাপ্রবোধ মৈত্র; নন্দন, কলকাতা।

 

বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৪ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের ষষ্ঠ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন