শ্যাম বেনেগাল
প্রকাশিত ০৪ জানুয়ারী ২০২৩ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
জনপ্রিয় চলচ্চিত্র
শ্যাম বেনেগাল
সত্যজিৎ পরবর্তী ভারতিয় চলচ্চিত্রে যেকজন নির্মাতা আলো ছড়িয়েছেন তাদের মধ্যে শ্যাম বেনেগাল (Shyam Benegal) অন্যতম। একাধারে নির্মাতা, চলচ্চিত্র-শিক্ষক ও লেখক এই মানুষটির জন্ম ১৯৩৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর ভারতের হায়দ্রাবাদের আলওয়ালে। ১২ বছর বয়সে বাবা শ্রীধর বি. বেনেগালের দেওয়া ক্যামেরা দিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের হাতেখড়ি। হায়দ্রাবাদের ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত নিজাম কলেজ থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর করেন শ্যাম। চলচ্চিত্রের প্রতি চূড়ান্ত ভালোবাসা থেকে কলেজে পড়ার সময় তিনি গড়ে তোলেন হায়দ্রাবাদ ফিল্ম সোসাইটি। ১৯৫৯ সালে বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কপিরাইটারের কাজ দিয়ে কর্মজীবন শুরু। এই কাজে থাকাবস্থায় ১৯৬২ সালে শ্যাম গুজরাটি ভাষায় নির্মাণ করেন ঘের বেথা গঙ্গা (Gher Betha Ganga) নামের প্রামাণ্যচিত্র। ১৯৬৬ থেকে ১৯৭৩ পর্যন্ত শ্যাম শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন পুনে’র ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইন্সটিটিউটে। পরবর্তী সময়ে তিনি দুইবার এই ইন্সটিটিউটের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৩ সালে মুম্বাইয়ে এসে শ্যাম নির্মাণ করেন জীবনের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র অঙ্কুর। তার উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে—নিশান্ত (১৯৭৬), ভূমিকা (১৯৭৭), জুনন (১৯৭৮), ত্রিকাল (১৯৮৫), সুরাজ কা সাতভান ঘোড়া (১৯৯৯), সামার (১৯৯৯), দ্য মেকিং অব দ্য মহাত্মা (১৯৯৬), নেতাজি সুভাস চন্দ্র বসু : দ্য ফরগোটেন হিরো (২০০৫), ওয়েল ডান আব্বা (২০১০) ইত্যাদি।
শ্যাম সাতবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ পদ্মশ্রী (১৯৭৬), পদ্মভূষণ (১৯৯১) ও দাদাসাহেব ফালকে (২০০৫) পদকে ভূষিত হয়েছেন। বর্তমানে তিনি ভারতের সংবিধানের ওপর ১০ পর্বের টেলিভিশন ধারাবাহিক নির্মাণ কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। ১৯৯৪ সালের সেপ্টেম্বরে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উদ্যোগে আয়োজিত প্রথম ‘সত্যজিৎ রায় স্মারক বক্তৃতা’ অনুষ্ঠানে শ্যাম বেনেগাল ‘পপুলার সিনেমা’ নামে একটি বক্তৃতা করেন। বক্তব্যটি ‘জনপ্রিয় চলচ্চিত্র’ শিরোনামে বাংলায় ভাষান্তর করে প্রকাশ করা হলো।
শুভ সন্ধ্যা। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আমন্ত্রণে প্রথম ‘সত্যজিৎ রায় স্মারক বক্তৃতা’ অনুষ্ঠানে কথা বলার সুযোগ পেয়ে আমি অত্যন্ত সম্মানিতবোধ করছি। ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রনির্মাতা ও বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সৃজনশীল চলচ্চিত্রশিল্পীদের অন্যতম সত্যজিৎ রায়। তিনি আজ থেকে ৪০ বছর আগে পথের পাঁচালী দিয়ে যে পথচলা শুরু করেছিলেন, সেটি সৃজনশীল চলচ্চিত্রশিল্পে আজও শ্রেষ্ঠ নির্মাণ বলে বিবেচিত। আর এই চলচ্চিত্রটির মাধ্যমেই ভারতিয় চলচ্চিত্র শিল্পের মর্যাদা পায়, একই সঙ্গে একটি নতুন যুগের সূচনা করে।
বিশ্ব আগামী বছর চলচ্চিত্রের শতবর্ষ উদ্যাপন করতে যাচ্ছে। গত একশো বছরে চলচ্চিত্রশিল্প কৌতূহলের জায়গা থেকে খুবই দ্রুত প্রসার লাভ করেছে। অন্যদিকে, শিল্প-প্রযুক্তির উদ্ভাবনে বস্তুর প্রতিচ্ছবি ধারণ ও তা দৃশ্যমাধ্যমে তুলে ধরতে পারার বদৌলতে বিশ্বে জনসংস্কৃতির সবচেয়ে জনপ্রিয় বিনোদনের মাধ্যম হয়ে উঠেছে এই চলচ্চিত্র। এখন শিল্প-প্রযুক্তির সব পণ্যের মতো একই চলচ্চিত্র চাইলেই খুব সহজে অবিকলভাবে সারাবিশ্বের মানুষের কাছে প্রদর্শন করা যায়। বর্তমানে টেলিভিশন ও ভিডিওর আগমনে চলচ্চিত্র তো একই সঙ্গে ব্যক্তি-মানুষের শয়ন কক্ষ থেকে শুরু করে পৃথিবীর সব প্রান্তে পৌঁছে গেছে। বছরের পর বছর ধরে অন্যান্য যেকোনো বিনোদন মাধ্যমের চেয়ে চলচ্চিত্র আমাদের নগরের সংস্কৃতি, সামাজিক মনোভাব, আচার-আচরণ, জীবনাচরণ ও পৃথিবী সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি গড়তে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখছে।
তবে গত কয়েক দশক ধরে রাজনীতিবিদ, রাজনৈতিক দল, প্রশাসন ও সুশীল সমাজের বড়ো একটা অংশ জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের মাত্রাতিরিক্ত প্রভাব নিয়ে নানাধরনের মন্তব্য ও সমালোচনাও করেছেন। তারা মনে করেন, চলচ্চিত্র মানুষের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। শুধু তাই নয়, শহরাঞ্চলে অপরাধের ঘটনা বেড়ে যাওয়া, নারী নির্যাতন ও প্রায়শই বিশৃঙ্খলাসহ নানাধরনের সামাজিক সমস্যার জন্য চলচ্চিত্রের ওপর দোষ চাপানো হয়। এমনকি ব্যক্তিগত ও সামাজিক অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ আদালতে পর্যন্ত জনপ্রিয় চলচ্চিত্রকে কিছুটা হলেও দায়ী করা হয়। চলচ্চিত্রের প্রভাবে ছোটোখাটো অপরাধ ঘটে—ধরনের বিষয় নিয়েও আইন বিভাগকে কাজ করতে দেখা গেছে। আবার, অভিযুক্তকে মৃত্যুদণ্ডের হাত থেকে রক্ষা করতে এমনও কূটকৌশল ব্যবহার করতে দেখা গেছে যে, আইনজীবী আদালতে প্রমাণ হিসেবে চলচ্চিত্রের কিছু দৃশ্য দেখিয়ে বলেছেন, এ দৃশ্যগুলো তার মক্কেলকে অপরাধ করতে প্রভাবিত করেছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে চলচ্চিত্র নিয়ে নানাধরনের আলোচনা বেড়ে যাওয়ায় তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে সেন্সর বোর্ডে (চলচ্চিত্র সনদ প্রদানকারী কেন্দ্রীয় বোর্ড) একটি সভা হয়। সেখানে সাংসদ, জাতীয় কমিশনের নারী সদস্য, চলচ্চিত্র সমালোচক ও এই শিল্পের অন্যান্য শাখার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। মূলত এই সভায় চলচ্চিত্রে সহিংসতা ও অশ্লীলতার ক্রমাগত বৃদ্ধি এবং তা কমানোর উপায় সংক্রান্ত একটি মাত্র এজেন্ডা নিয়ে কথা হয়।
যদিও চলচ্চিত্রশিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা নিজেদের পক্ষে সবসময় এই সাফাই গায় যে, তারা খাঁটি বিনোদন সৃষ্টিতে কাজ করে যাচ্ছে। তারা এও বলে, দর্শক ও সাধারণ মানুষের চাহিদা ও আগ্রহের কথা মাথায় রেখেই চলচ্চিত্রনির্মাণ করা হয়। অবশ্য জনগণ আগ্রহী হলেই সব বিষয় সবসময় জনসম্মুখে তুলে ধরতে হবে—এ নিয়ে ভিন্নমত আছে। এদিকে এই সভাতে উপস্থিত একজন সাংসদ বলেন, চলচ্চিত্রকে শুধু খাঁটি বিনোদন হিসেবে দেখা ঠিক হবে না, কারণ দর্শকের ওপর চলচ্চিত্র তার নিজস্ব বাস্তবতা আরোপ করে; যা সবার কাছে প্রতিষ্ঠিত ভুল ও ঠিক ধারণার বাইরে নিজেদের মতো করে একটা মতামত তুলে ধরে, একই সঙ্গে সমাজে প্রতিষ্ঠিত কুসংস্কারগুলোকেও আরো মজবুত করে। সভায় উপস্থিত একজন সমাজবিজ্ঞানী বলেন, চলচ্চিত্রের আধেয় গড়ে ওঠে দর্শকের চাহিদার ওপর—এ যুক্তি একান্তই তাদের (চলচ্চিত্রনির্মাতাদের) নিজেদের মতামত। আসলে চলচ্চিত্রে অপরাধের আকর্ষণীয় উপস্থাপন যুবা-তরুণদের অপরাধী হয়ে উঠতে প্রভাবিত করে।
এ কথা ঠিক, চলচ্চিত্রের তথাকথিত ক্ষতিকর সামাজিক প্রভাব কমাতে সেন্সরশিপকে সবসময়ই একটা হাতিয়ার হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে তো এখন সেন্সরশিপই নেই। জনসম্মুখে কোনো চলচ্চিত্র প্রদর্শনের জন্য ভারতে সেন্সরের যে নীতিমালা তা অনেক বছর আগে গৃহীত হয়েছিলো। মূলত যেসব চলচ্চিত্র জাতীয়তাবাদ ও উপনিবেশ বিরোধী চিন্তা জাগ্রত করে, সেগুলোর প্রদর্শন বন্ধ করতে ১৯২০ দশকে ঔপনিবেশিক সরকার সেন্সরশিপ বোর্ড গঠন করেছিলো। এরপর স্বাধীন ভারতে ১৯৫২ সালে এটি সংশোধন করা হয়। অবশেষে ১৯৯১ সালের শেষের দিকে তা পুনরায় সংশোধন করে, সেন্সরশিপ বিষয়টি বাদ দিয়ে এর নাম রাখা হয় ‘ফিল্ম সার্টিফিকেশন বোর্ড’। এখন এই বোর্ডের কিছু মৌলিক নীতিমালা আপনাদের সামনে তুলে ধরছি—
ক) সামাজিক আদর্শ ও মূল্যবোধ বজায় রাখতে চলচ্চিত্রকে যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে হবে।
খ) শৈল্পিক প্রকাশ ও সৃজনশীল স্বাধীনতাকে চলচ্চিত্রে সঙ্গতভাবে উপস্থাপন করতে হবে।
গ) সনদপ্রাপ্তির বিষয়টি সবসময় যেনো সামাজিক পরিবর্তনের অনুকূলে হয়।
ঘ) চলচ্চিত্র যতোদূর সম্ভব রুচিশীল ও মননশীল বিনোদন সরবরাহ করবে এবং সর্বশেষ
ঙ) যতোখানি পারা যায় চলচ্চিত্রের নান্দনিক মান ভালো হতে হবে।
উপরের উদ্দেশ্যসমূহের সাপেক্ষে বোর্ড এই নিশ্চয়তা দেয় যে, চলচ্চিত্রটি সহিংসতা কিংবা এই জাতীয় সমাজবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ড ছড়াবে না।
নীতিমালায় পরের অংশে সহিংসতার বিরুদ্ধে ১৯ ধরনের কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলো হলো—শিশু ও নারী নির্যাতন, বর্ণবাদ, ধর্মীয় বিভক্তিকরণ, সাম্প্রদায়িকতা, বিজ্ঞান বিরোধী মনোভাব, জাতীয়তা বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি ও সংবিধান বিরোধী মনোভাব ইত্যাদি। এ বছর (১৯৯৪) পুনরায় এই নীতিমালা সংশোধন করে স্থূলতা ও সহিংসতাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এ নিয়ে সমাজবিজ্ঞানী বীণা দাস বলেন, পূর্ব নীতিমালার ভিত্তিতেই বর্তমানের নীতিমালাও তৈরি করা হয়েছে—মানব শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যেমন উপস্থাপন করা, না-করার ভিত্তিতে ভাগ করা যায়, তেমনই এ নীতিমালারও রয়েছে কিছু বিভাজন।
চলচ্চিত্রের এই নতুন নীতিমালায় রাজনীতিবিদ ও পুলিশদের খারাপভাবে তুলে না ধরার ব্যাপারে একটি বিধান রাখা হয়েছে। তবে এতো সব নীতিমালা সত্ত্বেও ভারতের চলচ্চিত্রে সেন্সরশিপ কিন্তু কখনোই সফল হয়নি। ভারতে প্রতিবছর প্রায় ৯৫০টিরও বেশি চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়; মূলত এসব চলচ্চিত্রের কোনোটিই সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয় না; কেবল যেসব বিদেশি চলচ্চিত্র ভারতের বৈদেশিক সম্পর্কের জন্য হুমকি মনে করা হয়, সেগুলো প্রদর্শনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। অবশ্য এর কারণটাও খুব সাদামাটা। তবে এ কথা ঠিক, কোনো নীতিমালাই বাস্তব পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করতে পারে না।
চলচ্চিত্র সেন্সরে আগের যেসব নজির রয়েছে, বর্তমানে তার প্রয়োগ অসমঞ্জসই দেখায়। বেশ কয়েক বছর আগে ভূমিকা নামে আমার নিজের একটা চলচ্চিত্রকে শুধু প্রাপ্তবয়স্কদের দেখানোর অনুমোদন দেওয়া হয়েছিলো। কারণ বোর্ড বলেছিলো এর ভাব-বিষয়বস্তু নাকি শুধুই প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য উপযুক্ত। তার মানে কিন্তু এই নয়, ১৮ বছরের কম বয়সীরা এটা দেখতে পারবে না। আমাদের দেশে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সনদ পাওয়া চলচ্চিত্র মানেই সেটা পুরুষদের আগ্রহী করে; ফলে যেটা হলো অনেক নারীই আর আমার এই চলচ্চিত্রটি দেখলো না। সম্প্রতি ভারতের বর্ণবাদী নির্যাতনের ওপর নির্মিত ব্যান্ডিট কুইন চলচ্চিত্রটিতে নিয়ে সেন্সর বোর্ড তেমনই আচরণ করেছে যেমনটি করেছিলো মাত্রাতিরিক্ত ধর্ষকাম ও স্বার্থগত বিষয়ক চলচ্চিত্র আনজাম নিয়ে।
গোবিন্দ নিহালানির নতুন চলচ্চিত্র দ্রোহকাল (Drohkaal) নিয়েও মজার ঘটনা হয়। দ্রোহকাল-এর একটি দৃশ্যকে অত্যন্ত প্রভাবনমূলক বলে সেন্সরবোর্ড তা বাদ দেওয়ার সুপারিশ করে। অথচ দেখুন, এই তারাই কিন্তু বছরের পর বছর, এই ধরনের চলচ্চিত্রনির্মাণে উৎসাহিত করেছে। সেন্সর নীতিমালা মেনে কল্পনাশ্রিত চলচ্চিত্র নির্মাণে ইন্ডাস্ট্রিই কিন্তু আগ্রহ দেখিয়েছে। এটা সত্য যে, রাজনৈতিক বা সামাজিক বিষয় নিয়ে যখন চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়, তখন নির্মাতাদের স্বাভাবিক মনোভাব এ রকম থাকে যে—তারা কোনো ঝুঁকি নিতে চান না। অন্যদিকে, সেন্সরের লোকজনের একটা চিন্তা থাকে যে—নির্মাতারা মানুষের আস্থা, বিশ্বাসকে দুর্বল করতে সবসময় চেষ্টা চালায়। এছাড়া সহিংসতা ও যৌনতা উপস্থাপনের ক্ষেত্রে নির্মাতাদের আরেক ধরনের মনোভাব দেখা যায়; এটা অনেকটা ইঁদুর-বিড়াল খেলার মতো, এসব দৃশ্য চিত্রায়ণের ক্ষেত্রে নির্মাতারা সেন্সরবোর্ডকে একটু বাজিয়ে নিতে চান, তারা দেখতে চান ঠিক কতোখানি পর্যন্ত সেন্সরবোর্ড এগুলো নিতে পারে।
তবে সেন্সরের বাইরেও কিছু উদ্বেগ আছে। মাঝে মাঝে চলচ্চিত্র নিয়ে আইন প্রণয়নকারী, সমাজবিজ্ঞানী, নারী সংস্থা ও বিচার বিভাগের সদস্যরা উদ্বেগ প্রকাশ করে। তাদের মতে, টেলিভিশন ও ভিডিওর আবির্ভাবের সময় থেকে হঠাৎ করেই জনপ্রিয়ধারার চলচ্চিত্রের প্রচার-প্রসার বেড়ে গেছে, সঙ্গে বেড়েছে অস্বস্তি ও উদ্বেগ; দেশজুড়ে এই ভেবে ভয় বাড়ছে যে, সংস্কৃতির সার্বজনীন আচরণবিধি নির্ধারণ করছে জনপ্রিয় চলচ্চিত্র।
এই উদ্বেগের ধরন ও জনপ্রিয় চলচ্চিত্র কেনো এতো জনপ্রিয় তা বুঝতে হলে ভারতিয় প্রেক্ষাপটে নির্মিত জনপ্রিয় চলচ্চিত্রগুলো আমাদের দেখতে হবে। সমগ্র পৃথিবীর বহুত্ববাদী, বহুসংস্কৃতি, বহুভাষা ও বহুধর্মের মানুষের মনোরঞ্জন করে এই হিন্দি চলচ্চিত্র। আমরা ১২টির বেশি ভাষায় চলচ্চিত্র নির্মাণ করি। আঞ্চলিক ভাষায় নির্মিত চলচ্চিত্রগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব অঞ্চলের বাইরে যায় না। তবে আমরা কিন্তু আমাদের চলচ্চিত্র বলতে হিন্দি ভাষার চলচ্চিত্রকেই বুঝি। কারণ দেশের সব অঞ্চলেই এসব চলচ্চিত্রের একটা বাজার আছে। হিন্দি চলচ্চিত্রকে আমরা ভারতিয় চলচ্চিত্রের প্রতিনিধি হিসেবেই বিবেচনা করি। এ কারণে ভারতের অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষায় নির্মিত চলচ্চিত্রের ঢঙ ও ধরন তৈরি করে দিয়েছে এই হিন্দি চলচ্চিত্র।
পৃথিবীর অন্যান্য জায়গায় যে ঢঙে চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়, সেগুলো থেকে হিন্দি চলচ্চিত্র ভিন্ন। এ কারণে জনপ্রিয় হিন্দি চলচ্চিত্র এক অর্থে অদ্বিতীয়। ভারতিয় জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের ঢঙ নিয়ে কথা বলার আগে আমাদেরকে ভারতিয় প্রেক্ষাপটে বিনোদনকে সংজ্ঞায়িত করা জরুরি। মূলত নয়টি মৌলিক রসের সমন্বয়ে এ অঞ্চলের বিনোদন বিষয়টি নির্ধারিত। ঐতিহ্যবাহী ভারতিয় নাট্যকলায় তখনই পূর্ণ বিনোদন সম্ভব, যখন একটি বিশেষ রসকে ঘিরে কাম, ঘৃণা, আনন্দ, দুঃখ, করুণা, বিরক্তি, ভয়, রাগ ও বীরত্ব এই নয়টি রসের সমন্বয় ঘটে। এগুলোর মধ্য থেকে আবেগ প্রকাশে মূল ভূমিকায় হয়তো কাম বা আনন্দ থাকে; কিন্তু অন্যগুলোকে বাদ দিয়ে বিনোদনকে সংজ্ঞায়িত করা যায় না।
ভারতিয় চলচ্চিত্রকে এই ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এখানকার চলচ্চিত্র ঊনবিংশ শতাব্দীতে শহুরে নাট্যকলার ঢঙ, গান, নাচ, হাস্যরসাত্মক ও মিলনাত্মক বিষয় অনুসরণ করতে শুরু করে। এক কথায় বললে বিষয়টা এ রকম দাঁড়ায়—চলচ্চিত্রে পরিপূর্ণ বিনোদন সৃষ্টি করতে প্রয়োজনীয় সব উপাদান এখান থেকেই নেওয়া হয়। এজন্য বিভিন্ন আবেগী উপাদান এক সুতায় গাঁথতে কাহিনী ও গল্প বুনন ব্যবহার করা হয়। সত্যি বলতে কি, বিশ্ব চলচ্চিত্র প্রেক্ষাপটে অথবা পাশ্চাত্য সৌন্দর্যতত্ত্বে এ ধরনের চলচ্চিত্রকে ব্যাখ্যা করা একটু কঠিনই।
ভারতের প্রখ্যাত সমাজচিন্তক আশিস নন্দির মতে, ভারতিয় চলচ্চিত্র শুধুই প্রদর্শনের জন্য; এখানকার চলচ্চিত্রে মোটেও শিল্পের কোনো ছাপ নেই। তিনি বলেন, আবেগ, প্রেরণা ও নৈতিকতার ধোঁয়া তুলে এ ধরনের চলচ্চিত্রে কালোকে কালো ও সাদাকে সাদাভাবে উপস্থাপন করা হয়, এর সঙ্গে যে আরো কিছু বিষয় জড়িত তা সচেতনভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়। ফলে তা দর্শকের মনোরঞ্জন করে ঠিকই কিন্তু যৌক্তিক অবস্থান থেকে দূরে সরে যায়। আর যখন কেউ জনপ্রিয় হিন্দি চলচ্চিত্রের এই ধারা পরিবর্তনের কথা বলে, তখন তা নাটকীয় মনে হয়। এই পরিস্থিতিতে চলচ্চিত্রের চিরাচরিত কাঠামো পরিবর্তনে কাউকে অনুমতি দেওয়া হয় না। তবে কেউ পরিবর্তন করতে চাইলে তার চিন্তাটা অবশ্যই পরিষ্কার ও সু-সংজ্ঞায়িত হতে হবে। গল্পের নায়ক চরিত্রে যদিও ভালো-মন্দ দুটো দিকই থাকে, কিন্তু চলচ্চিত্রে খুব যত্ন সহকারে শুধু ভালো দিকগুলোই দেখানো হয়।
আমি মনে করি, নায়কের চরিত্রায়ণ অবশ্যই ভালো ও মন্দের সমন্বয়ে হতে হয়। জনপ্রিয় এসব চলচ্চিত্রে অবশ্যই নাটকীয়তা (Overstatement) থাকতে হবে। এ রকম চলচ্চিত্র সাধারণত দর্শকের প্রত্যাশার বিপরীতে গিয়ে শেষ হয় না, শেষটা সহজেই অনুমান করা যায়। নতুন কোনো চিন্তা-ভাবনা নিয়েও এসব চলচ্চিত্রের গল্প সৃষ্টি হয় না। সামাজিক প্রেক্ষাপটে নির্মিত এ ধরনের চলচ্চিত্রের গল্প নেওয়া হয় মূলত অন্যান্য চলচ্চিত্র বা খুবই পরিচিত কোনো গল্প থেকে। তবে প্রত্যাশা থাকে, দর্শকরা চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু গ্রহণ করবে এবং বিনোদন পাবে। বস্তুত বিভিন্ন গল্প থেকে নিয়ে গল্প তৈরির এই বিষয়টি চলচ্চিত্রে ভুল উপস্থাপন।
চলচ্চিত্র একটি সম্মিলিত কাজ হওয়ায় নির্মাতারা কারো ব্যক্তিগত বা নিজের সৃষ্ট গল্প থেকে কোনো উপাদান নেয় না। জনপ্রিয় হিন্দি চলচ্চিত্রগুলোর উদ্দেশ্য থাকে এমন সব সাধারণ বিষয়ের উপস্থাপন করা, যেগুলো আমরা অনেক আগে থেকেই দেখে আসছি। এখানে সফল চলচ্চিত্রগুলো অসফল চলচ্চিত্র থেকে সম্পূর্ণ আলাদা; এখানে বিষয়বস্তুর অধিক জনপ্রিয় বা দক্ষ সমন্বয় সাধন করা হয়। আর এটা হয় নানা কৌশল ও চালাকির জোরে।
এসব চলচ্চিত্রে গল্পের মধ্যকার বিভিন্ন উপাদানের সম্পর্ক ও ঐতিহাসিকতা থাকতে হবে। কাহিনীর এক রৈখিকতা উন্মোচনের ওপর জোর দেওয়া যাবে না। এখানে ঘটনার পরম্পরা এমনভাবে সাজানো হয়, যাতে দর্শক আকর্ষিত হয়। শুরু থেকেই দর্শক জানে, একসময় খলনায়কের অন্যায় ও ছলচাতুরি প্রকাশ পাবে এবং অবশেষে তাকে অপমান, কারাগারে পাঠানো কিংবা হত্যা করা হবে। অন্যদিকে, চলচ্চিত্রের প্রথম দিকে নায়ক যদি পথভ্রষ্টও হয়, শেষের দিকে তিনি তার নৈতিক অবস্থায় ফিরে আসবেনই। যেহেতু নায়ক ও খলনায়ক দুজনই নিজ চরিত্রে প্রতিষ্ঠিত এবং ওই চরিত্রে অভিনয়ের জন্য তাদের মানায়, সেহেতু ওই নায়ক বা খলনায়কের অভিনয়ের ঢঙ সম্পর্কে দর্শকের প্রত্যাশায় গতানুগতিক মনোভাব থাকে। ঠিক এই সব বৈশিষ্ট্যের কারণেই জনপ্রিয়ধারার হিন্দি চলচ্চিত্র গতানুগতিক ও গৎবাঁধা। আর এই পথ অবলম্বন ছাড়া তাদের উপায়ও থাকে না।
আমি আবারো বলছি, জনপ্রিয় ধারার হিন্দি চলচ্চিত্র পর্দায় কোনো চরিত্রের একেবারে ভিতরের যে মানুষটি তাকে প্রকাশে আগ্রহী নয়। বরং দর্শক যে মানুষ কিংবা জীবন দেখতে পছন্দ করে, তারা সেটাই দেখায়। এসব চলচ্চিত্রে পরিবেশ-পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে কোনো একটি চরিত্র সৃষ্টি না করে বরং চরিত্রের ওপর ভিত্তি করে বিশেষ কোনো পরিস্থিতির নির্মাণ করা হয়। ধারাবাহিকভাবে নাটকীয় ঘটনা, দুর্ঘটনা, নৃত্য ও গীতের মধ্য দিয়ে এসব চলচ্চিত্রের গল্প এগিয়ে চলে। এছাড়া কাঠামোর যৌক্তিকতা বিচারেও এ ধরনের চলচ্চিত্র মনস্তাত্ত্বিক নয়। এটা সরাসরি গতানুগতিক চলচ্চিত্রের প্রকৃতি অনুসরণ করে। এই পরিপ্রেক্ষিতে জনপ্রিয় এসব চলচ্চিত্র মনস্তাত্ত্বিক না হলেও দর্শকের মনস্তত্ত্বে ঠিকই প্রভাব ফেলার মতো হতে হয়।
সম্ভবত, ‘সমস্যা’ সৃষ্টি করা আধুনিক বা পশ্চিমা সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ এবং ভারতিয় সমাজের ঐতিহ্যকে সমান তালে তুলে ধরার মধ্য দিয়েই হিন্দি চলচ্চিত্র তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক কাজটি করে থাকে। এক্ষেত্রে এই চলচ্চিত্র কয়েকটি বিষয় তুলে ধরে। যেমন—প্রথমত, ভারতিয় সমাজের ওপর পশ্চিমা সংস্কৃতির জেঁকে বসার প্রভাব। দ্বিতীয়ত, সাংস্কৃতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়—এমন কিছু বিষয় যা ভারতে ক্রমাগত বেড়েই চলেছে, তার কুলকিনারা বের করা এবং সর্বশেষ মানে তৃতীয়ত, আধুনিক সময়ে বেঁচে থাকতে ধর্মীয়ভাবে যে বিষয়গুলো নিরপেক্ষ তা গ্রহণ করতে পারা।
আবারো বলছি, আধুনিকতা ও ঐতিহ্যের মধ্যে চিরদিনের যে দ্বন্দ্ব, হিন্দি চলচ্চিত্র তার গভীরতাকে কখনোই স্পর্শ করে না। মূলত হিন্দি চলচ্চিত্র ব্যক্তির মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বকে বাইরে/প্রকাশ্যে নিয়ে আসে এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অন্যান্য লোকজন ও বিভিন্ন ঘটনা থেকে মানুষের মধ্যে যে ঘৃণা-আবেগ জন্ম নেয় তাকে নিয়ন্ত্রণ করে।
এই ঘটনাগুলো ও ব্যক্তিরা উভয়েই আদর্শিক। তারা উভয়েই খণ্ডিত মানসিকতার বিভিন্ন বিষয়ের প্রতিনিধি। যেমন, নায়ক, খলনায়ক; নায়িকা, খল-নায়িকা; ভালো মা, দজ্জাল শাশুড়ি; ভালো শ্বশুর ও মধ্যবয়সী চোরাকারবারী ইত্যাদি। যে মুহূর্তে আপনি এই খণ্ডিত মানসিক অবস্থাগুলোকে একটি একক চরিত্রে সমন্বয় করেন, তখনই তা একটি আদর্শ চরিত্র হয়ে ওঠে। এবং এর মধ্য দিয়ে ওই চরিত্রগুলো ভারতিয়দের মনে দ্বান্দ্বিক পরিস্থিতির একটি মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা তুলে ধরে। (শেষ কিস্তি পরবর্তী সংখ্যায়)
দায়স্বীকার : ‘Popular Cinema’ শিরোনামে শ্যাম বেনেগাল-এর এই বক্তৃতাটি প্রবোধ মৈত্র সম্পাদিত 100 Years of Cinema(১৯৯৫) নামের গ্রন্থ থেকে নেওয়া। গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে নন্দন, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত।
অনুবাদক : আহমেদ মাসুম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
mdmasum540@yahoo.com
বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৪ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের ষষ্ঠ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন