কাজী মামুন হায়দার
প্রকাশিত ২৯ ডিসেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
মৈনাকের বেডরুম ও অন্যান্য চলচ্চিত্র, ‘ভাঙা-ভাঙা’ খেলা আবার ‘গড়া’
কাজী মামুন হায়দার
অ্যাথেন্সের নিকটবর্তী পাইরিউস বন্দরের প্রবীণ বণিক সিফালাসকে প্রশ্ন করেছিলেন সক্রেটিস, ‘...তোমার কাছে আমার সেই জিজ্ঞাসা সিফালাস। কবিরা যাকে বলেন ‘বার্ধক্যের বেলাভূমি’ তুমি আজ সেখানে উপস্থিত হয়েছ। তুমি আমায় বলো, প্রবুদ্ধ! জীবনের দিগন্ত কি সত্যিই দুর্গম?’১ মৈনাকের বেডরুম দেখতে দেখতে সক্রেটিসের এই প্রশ্নের কথা বারবার মনে হচ্ছিলো, জীবনের পথ কি এতোটাই সহজ, যা ইচ্ছে তা করে ফেলা যায়, আবার চাইলেই ফিরে আসা যায়। অবশ্য অনেকে বলতে পারেন, এতো চলচ্চিত্র থাকতে বেডরুম দেখে কেনো! নামটার সঙ্গেই কেমন জানি ‘অশ্লীল-অশ্লীল’, ‘খারাপ-খারাপ’ ভাব তাই না! অবশ্য চলচ্চিত্র হিসেবেও সেটি যে খুব একটা ‘ভালো’, ‘তুলুতুলু’—এমনটি বলবো না। তবে কেমন জানি! জীবন নিয়ে কেমন যেনো সব প্রশ্ন তোলে বেডরুম। চলচ্চিত্রটি দেখছিলাম, আর সেই প্রশ্নগুলো ও সম্ভাব্য উত্তরগুলোর কথা ভাবছিলাম; কেমন যেনো লাগছিলো। ইদানিং কলকাতার টালিগঞ্জের অনেক চলচ্চিত্র দেখেই এই রকমের অনুভূতি, কিছু প্রশ্ন জাগে মনে।
অনেকে অবশ্য বলছেন, realistic cinema! আবার কেউ বলছেন আর্ট ফিল্ম। তখন প্রশ্ন জাগছে real কী, আর্টই-বা কী? অনেকখানি হয়তো মিলে যাচ্ছে বাস্তবের সঙ্গে, আবার মিলছেও না। শিল্পতো, তাই হয়তো এমন হয়। তবে সেটাও ভালো বুঝে উঠতে পারছি না। অনেকক্ষেত্রে শিল্পী সুলতানের মতো অসহায় মনে হয়। বিখ্যাত শিল্পী এস এম সুলতান নিউইয়র্ক শহরের উঁচু দালান-কোঠা দেখে অবাক হয়েছিলেন, ওই শহর নাকি তার প্রাণে কোনো অন্তরঙ্গ অনুভূতির সঞ্চার করেনি। তাই আর্টের পর্যায়ে এই সব দালান-কোঠাকে ফেলতে পারেননি। বিষয়টি তিনি নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবেশে বলেছিলেন এভাবে, ‘যে বস্তু প্রতিক্ষণ মানুষকে তার ক্ষুদ্রতা স্মরণ করিয়ে দেয়, অসহায়বোধ জাগ্রত করে তা সৃষ্টি হতে পারে, কিন্তু আর্ট কখনই নয়।’২
বেডরুম-এর চরিত্রগুলোই দেখুন, কেউ প্রোস্টিটিউট—যাকে খাঁটি বাংলায় বলে বেশ্যা। কেউ কেউ লিভিং করে, মানে কোনো ধরনের ধর্মীয়-আইনি সম্পর্ক ছাড়া একসঙ্গে থাকা আর কি। আরেকজন আছেন চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় অভিনেতা। তার কাজ শুধু নারী সঙ্গ উপভোগ করা, তাদের সঙ্গে শোয়া। আর আছেন সেই so called মধ্যবিত্ত bussiness executive.
এর মধ্যে অবশ্য আরো ভাগ আছে। কেমন যেনো ছাড়া ছাড়া। আচ্ছা বলুন তো, এই এক্সিকিউটিভরা কি আজীবন জেতার ভান করে হেরে যাবে? আর প্রোস্টিটিউটরা মানে তানিশারা কি কেবলই রাজপুত্তুর খুঁজে বেড়াবে? আর সব তরকারির লবণ চেখে দেখা অভিনেতা দেববর্মণ চক্রবর্তীর একসময় আর কোনো তরকারি ভালো লাগবে না; একটা ছাড়া? আর লিভিং শেষে একসময় সবাই মন খারাপ-খারাপ করে বিয়ের পিঁড়িতে বসবে!
দুই.
আচ্ছা চলচ্চিত্রটা কী? ভিত্তোরিও’র মতো সাইকেল চুরি, খুঁজে বেড়ানো, ছেলের সামনে অপমান; নাকি আসিয়া আন্দালু, নসফেরাতু; নাকি সিনেমা ভেরিতে। অবশ্য শরীরী-শরীরী অভিনয়-অভিনয় খেলাও বলতে পারেন; না-হয় দীর্ঘসময়ে পর্দা কালো-অন্ধকার রেখে দর্শকের ঘুমিয়ে পড়া। কারো কাছে আবার চলচ্চিত্র নারী শরীরের ইঞ্চি ইঞ্চি ভাঁজ কিংবা পুলিশ হয়ে কথায় না-কথায় শার্ট খুলে ষাঁড়ের মতো তেড়ে আসা। আবার কখনো ফাটাকেষ্ট হয়ে শ্মশানে লাশ ফেলা কিংবা খাইচস-করচস-আইচস-অসাম-জোশ; আবার সব ভেঙে ফেলা। আসলে কী দিয়ে কী ভাঙছেন বলুন তো?
সেই বেডরুম-এ এক্সিকিউটিভ বন্ধুর বাসায় দাওয়াতে গিয়ে ফটোগ্রাফার ঋতিকা ও অভিনেতা জয় তর্ক-বিতর্ক করেন রান্না করা না-করা নিয়ে, করতে পারা না-পারা নিয়ে। সেখানে সবকিছুর একটা লৈঙ্গিক দ্বন্দ্ব; অনেক ক্ষেত্রে আরোপিত, বাড়াবাড়ি। একসঙ্গে থাকা (লিভিং) ওই দুজনের সমস্যা হলো, কেউই কিন্তু কিছু মেনে নিতে চান না। নিজ অবস্থান থেকে সবাই কাউন্টার দিতে থাকেন। এখন প্রশ্ন, এই দ্বন্দ্ব কি চলতেই থাকবে? এই দ্বন্দ্ব যদি চলেই তাহলে কিন্তু আজীবন তাদের বাড়িতে বিমলা দি’কেই (মানে কাজের লোক) রান্না করতে হবে। অথচ দেখুন যে জায়গা থেকে একসঙ্গে থাকার এই চলন এসেছে, সেখানে কিন্তু তর্ক নয়, সবাই নিজের কাজ নিজেই করে!
যদিও শোনা যায়-একসঙ্গে থাকার এই চলন নাকি মার্কিন থেকে আসেনি। আমাদের এখানেই ছিলো। বেদ-এ নাকি আট প্রকার বিয়ের (অষ্টবিধঃ ব্রাহ্ম, দৈব, আর্য, প্রাজাপাত্য, আসুর, গান্ধর্ব, রাক্ষস, পৈশাচ) কথা বলা আছে। এর মধ্যে গান্ধর্ব বলে যে ধরনটি, সেটি মূলত ‘রীতিবদ্ধ’ বিয়ে না করে থাকা। কিন্তু বেদ-পুরাণ-কোরআন যাই বলুক, সেখানেও জীবনের জন্য কিন্তু শেষ পর্যন্ত ‘ইজমা-কিয়াস’ রাখা হয়েছে। তার মানে ওই সবকিছুর ওপরে মানুষ আর মানুষের সমস্যা। তাই উপর থেকে আসা কিংবা থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, গুরুত্বপূর্ণ হলো জীবনটা—সেই জীবন যাপন করাটা। আমি অবশ্য এভাবেই বুঝি।
আবার দেখুন, সকালের নাস্তার সময় কাজ করা নিয়ে জয়-ঋতিকার মধ্যে যখন কথা হয়, তখন কিন্তু বারবার ঋতিকা মনে করিয়ে দেন জয় টাকা রোজগার করেন না। ঋতিকা ভালো করে জয়কে বুঝিয়ে দেন, দিনে দু-চার ঘণ্টা বাজে ছেলেমেয়েদের সঙ্গে অ্যাক্টিং নিয়ে লেকচার মেরে সময় নষ্ট করে সে। পুরো পরিবারটা তার মানে ফটোগ্রাফার ঋতিকার টাকায় চলে। নারী অধস্তনতার বিপরীতে পুরুষ অধস্তনতা, ভালো। আবার সেই মহামতি মার্কসের উপরি আর ভিত্তি কাঠামোয় ফিরে যাওয়া! আবার সেই ‘অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণবাদ’—কখনো পুরুষ, কখনো নারীর হাতে? আবার রাত জেগে দুজনের অধিকারবাজী আলাপ, কে কতো রোজগার করেন আর এসি চালিয়ে কম্বল মুড়ি দিয়ে একটা চলচ্চিত্র দেখা নিয়েও দ্বন্দ্ব; সঙ্গে মহিলা সমিতি নিয়ে উপহাস। সব মিলে কেমন বলুন তো, আমি বুঝি না। শুধু প্রশ্ন আসে মনে, তাহলে আমরা এগোলাম কতোখানি বলতে পারেন?
শেষে আরো প্রশ্ন আছে, জীবন থেকে চলচ্চিত্র, না চলচ্চিত্র থেকে জীবন? সাহিত্য পড়েও অনেক লোক প্রভাবিত হয়, এটা জানা কথা। সেখানেও সেই একই প্রশ্ন, জীবন থেকে সাহিত্য নাকি সাহিত্য থেকে জীবন?
তিন.
খুব বেশি ক্লাসিক কিংবা বিদেশি চলচ্চিত্র আমার দেখা নেই। তবে মৈনাক যদি বেডরুম-এর শেষ শটটি কোথাও থেকে ‘চুরি’ না করেন। তাহলে চলচ্চিত্র ইতিহাসে একটা অন্যতম শট্ হয়ে থাকতে পারে এটি। পর্দায় লাল রঙের হাই হিল পরা তানিশার ঝুলানো পা, আর কাট্-টুতে জুতার দোকানের সেই ফাঁকা সেল্ফ।
আর জয়, যার আসল নাম রাহুল। অনেক অনেক প্রেমের চলচ্চিত্রে তার চিৎকার, ফাইটিং কিংবা অতি আবেগী সংলাপ দেখেছি—শুধু বেডরুম-এর যে রাহুল, তাকে পাইনি। তার অভিনয় ভালো লেগেছে।
চার.
১৯৭৫ সালে সত্যজিৎ নির্মাণ করলেন জন-অরণ্য। সেই মহানগরী কলকাতা নিয়ে সত্যজিতের বয়ান। এই কলকাতায় জন-অরণ্য থেকে বেডরুম, কেবলই অস্থিরতা। বিষয়-বৈচিত্র্যে বেডরুম খানিকটা এগিয়ে গেলেও চিন্তায় খুব বেশি এগিয়েছে বলে মনে হয়নি। পার্থক্য আছে রঙ আর পাত্র-পাত্রীতেও। জন-অরণ্য’র কমিশনভোগী দালাল আর আজকের কোট-টাই পরা এক্সিকিউটিভদের মধ্যে তো খুব বেশি পার্থক্য খুঁজে পাই না। একই সঙ্গে শিক্ষিত, আধুনিক, মিনি স্কার্ট পরা বেশ্যা আর মঞ্চনাটকে অভিনয় করা শাড়ি পরা সাদাসিধে বেশ্যার মধ্যেও কি খুব একটা পার্থক্য আছে? জন-অরণ্য’র বৌদির স্বামী-শ্বশুর-দেবর সেবা, আর বেডরুম-এর এক্সিকিউটিভ স্বামীর সারাবেলা কাজহীন বউয়ের প্রয়োজন ছাড়া শপিং, পুরনো বন্ধুর সঙ্গে ঘুরে বেড়িয়ে সময় কাটানোর মধ্যে আমি খুব বেশি পার্থক্য দেখি না।
তবে একটা বিষয় হাস্যকর মনে হয়েছে; বেডরুম শুরুর দুই মিনিট ৪০ সেকেন্ডের মাথায় যে প্রিয়াংকাকে (পাওলি) পেলাম, সংসার শুরুর পর সেই প্রিয়াংকা বোস হয়ে গেলো বাংলার পাক্কা গৃহবধূ। টপস আর হাফপ্যান্ট পরে ওয়াইন আর দুই আঙুলের ফাঁকে সিগারেট খেতে খেতে যে প্রিয়াংকার বিবাহিত জীবন শুরু, সেই কিনা পরে পুরোদস্তুর গৃহবধূ, সঙ্গে পতিসেবা! স্বামীর অফিস থেকে ফেরা নিয়ে অপেক্ষা, অভিমান, টিকেট কেটে প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে ম্যাটিনি শো দেখা-আরো কতো কি! অথচ তাকে নিয়ে গানের কথাতে শুনি উল্টোটা—
...দেয়াল আমায় বাঁধতে চায়
তোলে আবার অন্তরায়
চলে যাওয়ার
কথা ছিলো তা ভেঙে দেওয়ার
দেয়াল ভেঙে চলে যাওয়ার
আকাশের সে আশঙ্কায় পূর্ণতায়
দেয়াল ভাঙা হলো না
সে কল্পনা ভুলে যাওয়ার
আমার সে ইচ্ছে শুধু কেঁদেছে যন্ত্রণায়।
পাঁচ.
এবার আসি অন্যান্য চলচ্চিত্রে। শুরুতেই সন্দীপন রায়ের একলা আকাশ। সেখানে শেষ পর্যন্ত অরিজিৎ ও দিশার ফিরে আসা। মধ্যখানের সময়টাতে খ্যাতি, যশ, অর্থ, ক্ষমতার পিছনে ছোটা। তার মানে কখনো কখনো জীবনের কাছে জীবন মূল্যহীন হয়ে ওঠে। তখন মানুষ সবটুকু ছেড়ে জীবনকে মূল্যবান করে তুলতে চায়। বাস্তবে বেশিরভাগই হয়তো পারে না। কিন্তু চলচ্চিত্রে পারে; শিল্প তো, তাই হয়তো জীবনের জয়গান গায়।
এসআর মানে সত্যব্রত রায় (গৌতম ঘোষ), দিশার শিক্ষক, বন্ধু। সম্পর্কের উপস্থাপনায় পরিচালকের একটা অসম্ভব রহস্য আছে। এই সম্পর্ককে আপনি যেকোনো জায়গা থেকে টেক্সট হিসেবে ধরে ডিফাইন করতে পারবেন। সম্পর্কের কী অসাধারণ এক নির্মাণ। শহুরে আধুনিকতাতেই কেবল এমন সম্পর্ক সম্ভব। একটা নির্ভরতা, একটা আস্থা, একটা বিশ্বাস; কিন্তু তার পরও সেই সম্পর্কে কিন্তু অবিশ্বাস ঢুকে যায়। সোশ্যাল ক্যাপিটাল যখন অনেক বেশি আগ্রাসী হয়ে ওঠে, তখন এই সম্পর্কেও টান ধরে।
বোডিং স্কুলে মেয়ে মৃত্যুশয্যায়, সেদিকে মনোযোগ দেওয়ার সময় নেই উঠতি ফিল্মস্টার দিশার। দিশা তখন বিখ্যাত ডিরেক্টর রিজু ভাইয়ের শুটিং নিয়ে ব্যস্ত। এই রকম একটা সময় বোডিং স্কুলে মেয়েকে দেখে এসে এসআর যখন বলে, দিশা তোমার যাওয়া উচিত, তোমার পক্ষে আমি পরিচালকের কাছ থেকে ছুটি নিয়েছি। তখন দিশা এসআর’কে ভুল বোঝে। সোশ্যাল ক্যাপিটালের ধাক্কা এসআর’কেও দিশার কাছে হালকা করে ফেলে। অথচ এই দিশাই জীবনের সবচেয়ে খারাপ সময়ে এসআর-এর কাছে পরামর্শ চায়, বিশ্বাস করে। তাহলে এ কোন্ জীবনের পথে হাঁটছি আমরা। অথচ আবার ফিরেও আসছি।
ছয়.
অরিন্দম শীলের আবর্ততে শ্যামলের এ কোন্ জীবন কিংবা ক্রিকেটার হরি বোস; আর একটু এগিয়ে বললে শ্যামলের কলিগ রুনু স্যানাল কিংবা সেক্রেটারি দুলী। এরা সবাই দালালি করে; কেউ কর্পোরেটের, কেউ চলতি রাজনীতির। কোন্ জীবনের সন্ধানে হরি, রুনু কিংবা শ্যামল খুঁজছে কোন্ জীবন! আবার অন্যদিকে শ্যামলের স্ত্রী কিংবা শ্যামলের বড়ো দাদা-তারাই-বা কোন্ জীবনের কথা বলছেন। একপর্যায়ে জীবনে একধরনের হোঁচট খাওয়া শ্যামল ফিরে যায় দাদার কাছে, তখনই কেবল শ্যামলরা বোঝে। দাদা বলেন, ‘এতো দৌড়ালে তো রাস্তা একদিন শেষ হয়ে যাবে ভালো খোকা, তখন তুই কোথায় যাবি? না পারবি এগোতে, না পারবি পেছাতে।’
তারপর দুই ভাই ছাদে যায়, তখন নেমে আসে রবীন্দ্রনাথের ‘বারিষ ধারার মাঝে শান্তিরও বাণী’। দাদা বলেন, ‘আমি তো জানতাম একদিন আমরা দুই ভাই আবার ছাদের এই জায়গাটায় এসে দাঁড়াবো’। এতো বড়ো এক্সিকিউটিভ শ্যামল জীবনের কাছে ‘পরাজিত’ হয়ে একপর্যায়ে অশ্রু সংবরণ করতে পারেন না। তখন সেই দাদা (যিনি শ্যামলের চেয়েও ভালো ছাত্র, ভালো রেজাল্ট করেও চাহিদার ইঁদুর দৌড়ে নিজেকে বিলিয়ে দেননি) তাকে সান্ত¦না দিয়ে বলেন, ‘এই যে তুই কাদতি পারছিস, তার মানে এখনো তোর মধ্যে ভালো মানুষটা বেঁচে আছে’। অথচ বোঝাবুঝির এই হিসাবটা কিন্তু এতো সহজে শ্যামলদের কাছে ধরা দেয়নি। হিসাবে ধরা খেয়ে তাকে হিসাব পরিষ্কার করতে হয়েছে। কিন্তু ততোদিনে অবশ্য জীবনে অনেক বেশি-বড়ো দাগ পড়ে গেছে।
সাত.
মলি, পূর্ণ, তানিয়াকে নিয়ে সুব্রত সেনের চলচ্চিত্র কয়েকটি মেয়ের গল্প। সঙ্গে আছে দৃষ্টিশক্তি হারানো সাহিত্যিক আর ওই তিন মেয়ের বস্ মনি স্যার। আর আছে মাদকাসক্ত সমকামী তরুণী, প্রোস্টিটিউশন আর সেই মধ্যবিত্ত। তিন মেয়ের পুঁজি তাদের শরীর, তাইতো গানে শোনা যায়, ‘আমার শরীর নাকি শরীরের আমি/ভুলে গেছে ব্যস্ত শহর।’
এই ব্যস্ত মেট্রোপলিটন, কসমোপলিটন শহরে কতো কী-ই না ঘটে। এখানে একই মানুষ যেমন মানুষকে ঠকায় আবার সেই মানুষই মানুষকে বাঁচায়। অথচ এদের মানে এই প্রোস্টিটিউটদের জীবনের কেবল পরিবর্তন হয় না। জীবনটাকে কেউ বুঝতে চায় না। বেডরুম-এর মতো এখানেও শেষ পর্যন্ত প্রোস্টিটিউশন কিন্তু টিকে থাকে। তাহলে এই জীবনের পথ কি আদৌ বদলাবার নয়?
আট.
কমলেশ্বর মুখার্জির উড়োচিঠিতে মোবাইলের কিছু এসএমএস এর সূত্র ধরে এগিয়ে চলে কাহিনী। এখানেও সেই একসঙ্গে থাকা মানে লিভিং, প্রোস্টিটিউশন, কর্পোরেট অস্থিরতা, পরকীয়া, অবৈধ গর্ভপাত, কারখানা বন্ধ পুঁজিবাদের সেই ফ্যাঁকড়া, সন্ত্রাসবাদ আরো কতো কী।
জীবন থেকে একধরনের পালিয়ে দূরে সমুদ্রের ধারের এক হোটেলে অবকাশ কাটাতে যায় অনিকেত। শেয়ারে লোকসান, ইঁদুর দৌড়ে কর্পোরেট চাকরিটা চলে যাওয়া, পরকীয়া সম্পর্কের প্রকাশে বউ মেয়েসহ আলাদা হয়ে যাওয়া-জীবনের এতোগুলো টানাপড়েনের কাহিনী এক এক করে বের হয়ে আসতে থাকে তার স্মার্টফোনের স্ক্রিনে। সঙ্গে তার সফল বাবার গোপন হেরে যাওয়ার কাহিনী তো আছেই।
অনিকেতের স্কুল জীবনের বন্ধু ডেভিস এখন ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের কাজ করে, সঙ্গে জনপ্রিয় ডিজে-ও বটে। তার লিভিং পার্টনার ফ্যাশন ডিজাইনার। ঘরে নতুন অতিথির আগমন বার্তায় তারা খুব খুশি। ছেলে/মেয়ের নাম ঠিক হয়, চলে দুষ্টু তর্ক; প্রস্তুতি চলতে থাকে; কিন্তু শেষ মুহূর্তে পরীক্ষায় ধরা পড়ে গর্ভের শিশুটি প্রতিবন্ধী। নেমে আসে নিকষ আধার। এই শুনে ডেভিসের পার্টনার মানে মা সিদ্ধান্ত নেয় গর্ভপাতের। যদিও বাবা ডেভিস বিষয়টা মেনে নিতে পারছিলো না। মায়ের একটাই কথা-তিনি এই শিশু বড়ো করে তুলতে পারবেন না। তার চেয়ে শিশুটির পৃথিবীর মুখ না দেখাই ভালো। বিজ্ঞানের বদৌলতে সব পার পেয়ে যাই আমরা, শুধু শিশুটি আর পৃথিবীতে আসে না। তবে জীবন কিন্তু থেমে থাকে না। আমাদের বিজ্ঞান, আমাদের আধুনিকতা আরো এগিয়ে যায়; অন্যরকম শাসন করে।
ডেভিসের সঙ্গে অনেকদিন পর হঠাৎ এক ক্লাবে দেখা অনিকেতের। সেই সুবাদেই অনিকেতের সঙ্গে ডেভিসের বন্ধু লিলেট এর পরিচয়। সেই থেকে শুরু, পরে তা রূপ নেয় মানসিক-শারীরিক সম্পর্কে। পেশায় লিলেট ঠিক কী তা পরিষ্কার নয় চলচ্চিত্রে। তবে বোঝা যায়, একটু ‘অন্যরকম’ জীবন-যাপন করেন তিনি। পার্টি, মদ, ছেলেবন্ধু নিয়ে তার সময়। বাবা-মা বাইরে থাকেন। একপর্যায়ে ধরা পড়ে লিলেট এইচআইভি পজেটিভ। নির্মাতার আবার সেই ফিরে আসা কিংবা ফিরে আসায় মনোযোগ দেওয়া।
দেশ-বিদেশে বড়ো চাকরি করে এখন অবসর জীবনে অনির বাবা। একটা বড়ো বাংলো কিনেছেন। সেখানেই থাকেন কয়েকজন বৃদ্ধকে নিয়ে, সোজা কথায় বৃদ্ধাশ্রম। প্রিমিয়াম স্কচ খান, আছে গাছের নেশা। মৃত্যুর আগের রাতে ছেলেকে লেখা চিঠিতে তার বক্তব্য এমন—
অনি,
সময় খুব কম।
আমার মনে হয় তোমার ছোটোবেলা থেকেই আমরা তেমন কাছাকাছি আসতে পারিনি। একটা দেয়াল রয়ে গেছে, তাই কথা হয়নি। মায়ের সঙ্গেই তোমার বন্ধুত্বটা বেশি ছিলো। আমার অ্যাম্বিশন, ভবঘুরে ধাঁচটা আমাকে সংসার করতে দেয়নি। লোভও ছিলো নানারকমের। সমাজে উপরে উঠতে গিয়ে অনেক লোক ঠকাতে হয়েছে, অনেককে ভুলে যেতে হয়েছে। দেশ-বিদেশে অন্যের সংসারে ঘুরে বেড়িয়েছি আর কষ্ট পেয়েছো তোমরা। আজকাল ভয় করে বংশানুক্রমে তুমি আমার ধাঁচটা পাওনি তো? মনে রেখো আমিও আপোস করেছি অনেক, কিন্তু তার যোগফল শূন্য। এ ভুল করো না। আর সিগারেটটা ছেড়ে দাও। বুড়ো বয়সে গাছেদের কাছে আসার সুযোগ পেলাম, গাছগুলোকে দেখো। গাছের মতো হইয়ো। Try being tolerant.
বাবা
এদিকে অনির বাবা যখন এ কথা বলছেন, ততোদিনে অনি পুরোদস্তুর তার জীবন নিয়ে আপোসটা করে ফেলেছেন। কর্পোরেট অস্থিরতার জগতে অনি অবশ্য ততোদিনে কিছুটা হেরেও গেছেন। টিকে থাকতে পারেননি, আসলে টিকে থাকা যায় না। অনির চাকরি চলে যাওয়া সহকর্মী রুহি বা রুহিরা কখনো কখনো আপোস করেন না। তাই তারা মামলা করে তা চালিয়ে যান, কাঠামোটাকে মেনে নিতে পারেন না। আসলে আপোস করা না-করার দ্বন্দ্বটা বড়ো জটিল। তবে এ কথা ঠিক, শেষ পর্যন্ত আপোসের হিসাবটা কিন্তু অনির বাবার ভাষায় একেবারে শূন্য মানে আবার সেই ফিরে আসার ইঙ্গিত দেয়।
নয়.
ঋতুপর্ণ ঘোষের চিত্রাঙ্গদার রুদ্রও কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফিরে এসেছিলো। রুদ্র বেছে নেয়নি বিজ্ঞানের গড়া নতুন শরীর। কারণ হয়তো আমাদের জানা, হয়তো অজানা। বিজ্ঞান কি সবকিছু ঠিক করে দিতে পারে? বিজ্ঞানের কি সেই ক্ষমতা আছে? অনেকে এই প্রশ্নকে ভাববাদী বলতে পারেন? ভাব আর বস্তুর সমাধান কি আসলেই হয় কিংবা হওয়া সম্ভব? আমি জানি না; যদি হতোই তাহলে গর্ভের প্রতিবন্ধী ভ্রুণটির (উড়োচিঠিতে) সমাধান টানতে তার প্রাণের অস্তিত্ব সংহার করতে হতো না! বিজ্ঞান কেবল ছয় মাসের ভ্রুণনষ্টের ক্ষমতা পেয়েছে! পারেনি শঙ্কিত মায়ের প্রশ্নের জবাব দিতে। আমরা কি কেউ সেই প্রশ্নের জবাব দিতে পারি? সেই ক্ষমতা কি প্রকৃতি আমাদের দিয়েছে? যদিও এসব প্রশ্নে বিজ্ঞানের কিছু এসে যায় না। কারণ বিজ্ঞান আলাদা বিষয়। তার চাই প্রমাণের পর প্রমাণ, কিন্তু এখানে বিজ্ঞান ঠিক কী প্রমাণ করে? একটু ভালো করে ভেবে দেখুন, বিজ্ঞানে সৃষ্টির চেয়ে ধ্বংসের উল্লাসই বেশি নয় কি?
দশ.
‘সব সম্ভবের দেশ আমেরিকায় শিশুর বয়স বার বছর হওয়া মাত্র সরবরাহ করা হয় জন্মনিয়ন্ত্রণের সাজসরঞ্জাম। পুরুষে পুরুষে বিয়ে আর হোমোসেক্সুয়ালিটি এখানে বৈধ। রবীন্দ্রনাথও তার কন্যা মীরা দেবীকে এক পত্রে জানিয়েছিলেন, ‘মীরু, এখানে মেয়েদের বেশিদিন থাকার ক্ষতি আছে। তার কারণ এখানকার মানুষ সঙ্কীর্ণ এবং যারা আছে তারা অনেকেই নীচের স্তরের মানুষ’ ইত্যাদি। কিংবদন্তির পিয়ানোবাদক লেবারেচি অবাধ যৌনাচারের ফলে এইডস রোগে মারা গেছেন, এই সংবাদে মর্মাহত হুমায়ূন (হুমায়ূন আহমেদ)। ঐশ্বর্য, প্রাচুর্য বা জৌলুস সত্ত্বেও রবীন্দ্রনাথ থেকে হুমায়ূন—কারও পক্ষে সম্ভব হয়নি এই জীবনকে বেছে নেওয়া। তারা দু’জনই প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের মৌলিক দূরত্বে দাঁড়িয়ে।’৩
অথচ দেখুন সেই রবীন্দ্রনাথ কিন্তু তার নোবেল বক্তৃতায় পশ্চিমের প্রেমে গদগদ হয়ে বলেছিলেন, ‘পাশ্চাত্যের মানুষের হাতে রয়েছে বিশ্বের যাবতীয় ক্ষমতার চাবিকাঠি, তার জীবনচর্চা সব ধরনের সীমাবদ্ধতার গণ্ডিকেই অতিক্রম করেছে। আর সে এখন সুমহান ভবিষ্যতের বার্তাবাহী। আমি গভীরভাবে অনুভব করলাম যে, মৃত্যুর আগে আমাকে পশ্চিমে যেতেই হবে-সেখানে গোপনে মানুষের মধ্যে দেবতার আশীর্বাদ নেমে এসেছে, সেখানেই তার শক্তি আর স্বপ্নের জীবন নিয়ে পশ্চিমেই বসবাস করছে।’৪ তার মানে রবীঠাকুরের মতো এতো বড়ো মানুষও কোথাও ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না। আসলেই কি দাঁড়ানো সম্ভব নয়? তবে কি আমরা এই জীবনে দাঁড়িয়ে ওই জীবনের ভান করছি? আর সব শেষে জীবন থেকে হেরে গিয়ে জেতার ভান করে প্রাচ্যের জীবনে ফিরে আসছি।
রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আরো কথা আছে। অনেকে বলতে পারেন-বারবার রবীকে কেনো টেনে আনছি? কী করবো বলুন, বাঙালির জীবনে রবীকে না টেনে কি উপায় আছে। জীবনের কোথায় নেই তিনি! যাক সেসব কথা, ১৯১৩ সালের মার্চ মাসে Fortnightly Review নামে বিখ্যাত পত্রিকায় আধুনিক কবিতার অন্যতম পথিকৃৎ কবি এজরা পাউন্ড (১৮৮৫-১৯৭২) রবীন্দ্রনাথ ও তার কবিতার একটি সমালোচনা লেখেন। প্রবন্ধে এজরা বলেন, ‘...শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতাগুচ্ছের প্রকাশ (Gitanjali) আমার কাছে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। পাঠক হয়তো আমার বক্তব্য ঠিক বুঝবেন না, আমার বক্তব্য কবির কাব্যে প্রমাণিত।’৫ সুদীর্ঘ এই প্রবন্ধে এক জায়গায় এজরা বলছেন, ‘রবীন্দ্রনাথের উপস্থিতিতে নিজেকে অতিশয় অসভ্য বন্য বর্বর বলে মনে হয়-যেন আদিযুগের মানুষ।’৬ যে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে পাশ্চাত্যের এতো বড়ো কবির এতো বড়ো মন্তব্য, সেই রবীন্দ্রনাথ কিনা কখনো বলছেন, ‘...মৃত্যুর আগে আমাকে পশ্চিমে যেতেই হবে-সেখানে গোপনে মানুষের মধ্যে দেবতার আশীর্বাদ নেমে এসেছে’; আবার কখনো বলছেন, ‘এখানকার মানুষ সঙ্কীর্ণ এবং যারা আছে তারা অনেকেই নীচের স্তরের মানুষ’। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের মতো মানুষও বিভ্রান্ত। শুধু রবী নয়, আমরা আসলে সবাই বিভ্রান্ত, প্রতিদিন প্রতিক্ষণ। আমাদের বিভ্রান্তি পরিস্থিতির ওপর, নিজের সুবিধার ওপর নির্ভর করে। তাইতো মানুষ নিয়ে বিভ্রান্তি প্রকাশ পায় এজরা পাউন্ডের নিজের কবিতায়,
কুকুরের অনুসন্ধিৎসু স্বভাবগুলো সতর্কতার সাথে বিবেচনা করে
এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে বাধ্য হই যে
মানুষ উৎকৃষ্ট জীব
যখন মানুষের অনিসন্ধিৎসু স্বভাবগুলো বিবেচনা করি
স্বীকার করছি, বন্ধু আমার, আমি বিভ্রান্ত।৭
এখন প্রতিদিন কেনো জানি মনে হয়, আমাদের দাঁড়ানোর মতো জায়গা বোধ হয় কমে আসছে। আচ্ছা এই কমে আসাটা ঠিক কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে কেউ বলতে পারেন?
এগারো.
মেট্রোপলিটন, কসমোপলিটন নগরী কলকাতা। সেখানে একটা দৌড়, একটা অস্থিরতা, একটা প্রতিযোগিতা, ভয়ঙ্কর রকমের এগিয়ে যাওয়া—তাই না? সেটা কেমন জানি আমাদের এখানে মানে আমাদের নগরগুলোতে গড়ে ওঠেনি। এর বিপরীতে যেটা হয়েছে সেটা যে কী—তার সংজ্ঞায়ন করাও কঠিন। একটা নগর ঢাকা, ভুল বললাম মহানগর; কী সেই জীবন, কী আছে সেই জীবনে।
এ রকম অনেকগুলো প্রশ্নের উত্তর খুঁজি? তাহলে এই চলচ্চিত্রে কী হচ্ছে? কী এই চলচ্চিত্র, কেনো চলচ্চিত্র—কী আছে এখানে? জীবন তবে কী? এই কি জীবন? নগরের জীবন? তাহলে এই জীবনই কি আমরা চাচ্ছি? যদি তাই চাই, তাহলে আবার সেই ফিরে আসা কেনো? অথচ দেখুন, শুধু ফেরে না ওরা মানে যারা জীবনের দামে কেনে জীবিকা৮। ওরা কি তাহলে কখনোই ফেরে না? এই নাগরিক জীবন, এই হইহুল্লোড়, এই অস্থিরতা, এই আবার ফিরে আসা—সব কি তাহলে মিথ্যে? নাকি সত্য?
আর সব শেষে ফিরে আসাই যদি জীবন হয়, তাহলে ভুল + ভুল + ভুল = শুদ্ধ। হিসাবটা কেমন যেনো হয়ে গেলো না? ভুল-ভুল খেলা—তার মানে ঠিকটা জানি, সময় হলে বেছে নেবো। তবে বেছে নেওয়াটা ‘আমার ব্যাপার’, ‘আমার ব্যাপার’, কেবলি আমার। তো চলুক এবার ‘তোমার-আমার’ খেলা। আমার এখন তোমাকে প্রয়োজন-তাই ‘আমি-তুমি’ এক; আবার তোমাকে আমার প্রয়োজন, ‘তুমি-আমি’ এক। আধুনিকতা নাকি উত্তরাধুনিকতা।
হলিউডের লাস্যময়ী নায়িকা মেরিলিন মনরোর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন বিখ্যাত মার্কিন লেখক নরম্যান রস্টেন। মেরিলিনের মৃত্যুর পর তাকে নিয়ে মার্কিন ম্যাগাজিন ‘লাইফ’-এ যে ফটোস্টোরি প্রকাশ হয়, রস্টেন তার লেখক ছিলেন। ওই ফটোস্টোরি পড়ে মনরো’কে নিয়ে একটি ছোটো ইংরেজি কবিতা লিখে ‘লাইফ’ এর ঠিকানায় পাঠিয়েছিলেন আমাদের সিলেটের ‘মফস্বল’-এর কবি দিলওয়ার। সেই কবিতা পড়ে চমকে উঠেছিলেন নরম্যান রস্টেন। সেই থেকে দিলওয়ারের সঙ্গে রস্টেনের গড়ে উঠেছিলো সখ্য, বন্ধুত্ব।৯ মনরোর মৃত্যু মার্কিন সমাজের বোঝাপড়ায় যখন আজও রহস্যময়, অসমাপ্ত; যখন খোদ আমেরিকাতে খুব সামান্য কজন ব্যক্তিত্ব উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন গ্ল্যামার-কন্যা মনরোর এই অন্তর্গত বিষাদ, ঠিক তখনই কিন্তু আমাদের ‘মফস্বল’-এর কবি দিলওয়ার তা ঠিকই ধরেছিলেন কবিতায়। তার মানে জীবনকে এই প্রাচ্যের মানুষরাও চেনে, জানে। তাই জীবনের সবকিছু যে খালি প্রতীচ্যের নয়, তারও প্রমাণ ভুরি ভুরি। জীবনের বাড়াবাড়ির খেসারত জীবন দিয়ে দিয়েছেন মনরো। সেটা এতো দূর থেকে বুঝেছিলেন দিলওয়ার। আমরা মনে হয় জীবনকে এতো কাছ থেকে দেখেও এখনো তাকে ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারছি না।
বারো.
শেষ করছি মার্কিন কবি অগডেন ন্যাশ-এর (১৯০২-১৯৭১) ‘সবার জন্য একটি সতর্কবাণী’ কবিতা দিয়ে,
খেয়াল করুন;
ওক্ পাখি বিলুপ্তির পথে কেননা ওড়া ভুলে সে শুধু কথাই বলতো।
মানুষের কথা ভাবুন, সম্ভবত তারাও বিলুপ্ত হবে
কারণ হাঁটা ভুলে, ভাবার আগেই তারা ওড়ার শিক্ষা নিচ্ছে।১০
লেখক : কাজী মামুন হায়দার, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়ান।
kmhaiderru@yahoo.com
তথ্যসূত্র
১. করিম, সরদার ফজলুল (২০০০ : ১১); প্লেটোর রিপাবলিক; মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা।
২. হাই, হাসনাত আবদুল (২০০৮ : ১৯৫); সুলতান; দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ঢাকা।
৩. হুদা, নূরুল মুহম্মদ; ‘হুমায়ূন ও চাঁদের মাটি’; সমকাল-এর শুক্রবারের সাময়িকী ‘কালের খেয়া’, ১৯ জুলাই ২০১৩।
৪. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল বক্তৃতা, হায়াত মামুদ সম্পাদিত রবীন্দ্রনাথ থেকে ক্লোজিও পাঁচ মহাদেশের আট সাহিত্যরথী গ্রন্থ থেকে শহীদ ইকবাল সম্পাদিত ছোটকাগজ চিহ্ন-এর আগস্ট ২০১৩, ২৫তম সংখ্যায় পুনর্মুদ্রিত, পৃষ্ঠা-৪৫।
৫. মুখোপাধ্যায়, ভবানী; ‘বিদেশে রবীন্দ্রনাথ’; চিহ্ন; সম্পাদনা-শহীদ ইকবাল; ২৫তম প্রকাশ, পৃষ্ঠা-১৩১, আগস্ট ২০১৩, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
৬. প্রাগুক্ত; মুখোপাধ্যায়, ভবানী (২০১৩ : ১৩২)।
৭. মূর্তালা রামাত অনূদিত অনুবাদ কবিতা (২০০৯ : ১০) গ্রন্থ থেকে এজরা পাউন্ড-এর ‘মেডিটেটিও’ কবিতা থেকে নেওয়া; বাতিঘর প্রকাশনী, ঢাকা।
৮. কুররাতুল-আইন-তাহমিনা ও শিশির মোড়লের লেখা বই বাংলাদেশে যৌনতা বিক্রি, জীবনের দামে কেনা জীবিকা, চাইলে পড়তে পারেন; প্রকাশনায়-সেড, ঢাকা, জুন ২০০০।
৯. এ নিয়ে বিস্তারিত পড়তে চাইলে দেখুন-মফিদুল হকের প্রবন্ধ ‘কবি দিলওয়ার ও তাঁর মাটির ঘর’; প্রথম আলো, ২৯ অক্টোবর ২০১৩।
১০. মূর্তালা রামাত অনূদিত অনুবাদ কবিতা (২০০৯ : ৪৫) গ্রন্থ থেকে অগডেন ন্যাশ-এর ‘সবার জন্য একটি সতর্কবাণী’ কবিতা থেকে নেওয়া; বাতিঘর প্রকাশনী, ঢাকা।
বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৪ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের ষষ্ঠ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন