মাহমুদুল হক মনি
প্রকাশিত ২৯ ডিসেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
প্রামাণ্যচিত্রের বিবর্তন : সত্যের খোঁজে, শিল্পের তাড়নায়
মাহমুদুল হক মনি

‘Art is a lie that makes us realize the truth’ —Pablo Picasso
এক.
প্রামাণ্যচিত্র কী? এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কঠিন,অনেকের মতে অসম্ভব। তবে সাদামাটাভাবে চিন্তা করলে আসলে যতোটা হয়তো বলা হয়,ততোটা নয়। কেননা, একজন সাধারণ দর্শক তো খুব সহজেই বুঝতে পারেন এটি ‘প্রামাণ্যচিত্র’ না ‘কাহিনীচিত্র’। কিন্তু, একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে বিষয়টাকে কঠিনই মনে হয়। চলচ্চিত্রের মাধ্যমে নিছক সত্য বলা কিংবা তথ্য প্রচারই কি প্রামাণ্যচিত্র? মোটেও তা নয়। প্রামাণ্যচিত্র কথাটির সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ের অবতারণা ঘটে—প্রমাণ, সত্য-মিথ্যা, বাস্তবতা, সত্যতা, সততা, সৃজনশীলতা, বাস্তবতার পুনর্নির্মাণ, প্রোপাগান্ডা ইত্যাদি। এসব বিষয়ই কখনো একটি আরেকটির সহযোগী আবার কখনো দ্বান্দ্বিক। তাই প্রামাণ্যচিত্রকে সংজ্ঞায়িত করা কঠিন ও জটিল; বরং একে বোঝার চেষ্টা করা অনেক সহজ ও যুক্তিগ্রাহ্য।১ চলচ্চিত্র গবেষক হেনরিক জুয়েল-এর মতে, প্রামাণ্যচিত্রকে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা না করে কিছু বিবেচ্য বিষয়ের নিরিখে বিচার করা বাঞ্ছনীয়।২ কিন্তু এতো সব বোঝার আগে প্রামাণ্যচিত্রের ইতিহাস জানা আবশ্যক। কেননা তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক ক্রমবিকাশের মধ্যেই লুকিয়ে আছে বিবেচ্য ওই সব বিষয়ের নানা উপাদান। যদিও এ প্রবন্ধের মূল উদ্দেশ্য শুধু প্রামাণ্যচিত্র কী বা এটি কীভাবে বিকশিত হলো তা বোঝা নয়, তদুপরি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটসহ কিছু বিবেচ্য বিষয়ের বিশ্লেষণ আমাদেরকে প্রামাণ্যচিত্রে গল্প বলার এবং তা কতোটুকু সত্যনির্ভর হওয়া বাঞ্ছনীয় তা বুঝতে সাহায্য করবে।
দুই.
চলচ্চিত্র পৃথিবীর নবীনতম শিল্প। বয়সে নবীন হলেও জনপ্রিয়তা, ক্ষমতা ও মানবমনে প্রভাবের ক্ষেত্রে এ শিল্প প্রায় সবাইকে ছাপিয়ে উঠেছে। মাত্র ১০০ বছর আগে এ শিল্পের জন্ম হলেও অনেক প্রভাবশালী শিল্পচর্চাকে নিজের বলয়ে আবদ্ধ করে নিজে হয়েছে শক্তিশালী। গুহাচিত্র থেকে ম্যাজিক লণ্ঠন,নানা আবিষ্কার আর উদ্যোগের মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত ১৮৯৫ সালে চলচ্চিত্র সফলতার সঙ্গে দর্শকদের সামনে প্রদর্শন হয়। দুই ফরাসি ভাই অগাস্ত ও লুই লুমিয়ের ২৮ ডিসেম্বর প্যারিসে প্রথম চলচ্চিত্র দেখালেন। এখনো অনেকেরই জানতে আগ্রহ জন্মে যে, সেদিন লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয় যে চলচ্চিত্র দেখিয়েছিলেন তা কি ছিলো—‘ফিকশন’, ‘তথ্যচিত্র’ নাকি ‘নন-ফিকশন’? তানভীর মোকাম্মলের ভাষায়,‘৫০ ফুট দৈর্ঘ্য বা ১ মিনিট সময়কালীন প্রথম জমানার ছবিগুলোর বিষয়বস্তু ছিল খুবই সরল ও বাস্তব কিছু। যেমন ‘একটা ট্রেন স্টেশনে ঢুকছে’ (A Train Reaches the Station) বা ‘একটা নৌকা বন্দর ছেড়ে যাচ্ছে’ (A Boat Leaves the Harbour)। ক্যামেরা একটা স্থির জায়গা থেকে একটানা শট নিতো।’৩ এই সব সাধারণ শাব্দিক অর্থে (চলমান অর্থে) চলচ্চিত্র বটে, কিন্তু বাস্তবিক অর্থে কী ছিলো?
এখানে দুটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ—ক্যামেরার স্থিরত্ব এবং বাস্তব ঘটনার সরল চিত্রায়ণ। এ দুটো বিষয়কে একসঙ্গে বিবেচনা করলে খুব সহজেই যে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় তা হলো এই সব চলচ্চিত্র ছিলো নন-ফিকশন। কারণ,ক্যামেরা স্থির রেখে বাস্তবতাকে সেলুলয়েডে বন্দি করার মধ্যে ফিকশন থাকার কোনো অবকাশ নেই। কিন্তু খাঁটি নন-ফিকশন হলে তাকে আর যাই বলা হোক না কেনো প্রায়োগিক অর্থে ‘চলচ্চিত্র’ বলা ঠিক হবে না। যদি এ ধরনের নন-ফিকশনকেও আমরা ‘চলচ্চিত্র’ বলি, তাহলে সিসিটিভির ফুটেজকেও তো ‘চলচ্চিত্র’ বলতে হবে। আর এ দৃষ্টিকোণ থেকে মাহমুদুল হোসেন ‘নন-ফিকশন’ কথাটিকে ‘গোলমেলে’ বলে অভিহিত করেছেন।৪ আবার ওই সব চলচ্চিত্রকে পুরোপুরি তথ্যচিত্র বলাও ঠিক হবে না। কেননা দর্শকদের সামনে অজানাকে উপস্থাপন করার চেষ্টা সেখানে ছিলো না; বরং স্থিরচিত্রকে গতিশীল করে দর্শক ভুলানোই ছিলো মূল উপজীব্য। হয়তো এ বিতর্কের অবসান হবে না, তবে এটুকু বলা বাহুল্য হবে না যে, প্রাথমিক ওই সব চলচ্চিত্র ছিলো নন-ফিকশন ধারার। আর ওই নন-ফিকশন ধারা থেকেই মূলত প্রামাণ্যচিত্রের উদ্ভব।
এ প্রসঙ্গে সত্যজিৎ রায় বলেন, ‘লুমিয়েরের তোলা এই ট্রেনের ছবি ছিল নাটক ও কাহিনী বিবর্জিত সাধারণ দৈনন্দিন ঘটনার শামিল। এর কিছু পরেই ক্রমে ছবিতে গল্প বলা শুরু হয়, এবং এই গল্প বলা থেকেই সিনেমার ভাষা একটা বিশিষ্ট চেহারা নিতে শুরু করে।’৫ জর্জ মেলিয়ের হাত ধরে যে ট্রিকস ফটোগ্রাফির উদ্ভব সেখান থেকে চলচ্চিত্রে ভাষার জন্ম; যাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন অসামান্য প্রতিভাসম্পন্ন মার্কিন চলচ্চিত্রনির্মাতা ডি ডব্লিউ গ্রিফিথ। সেটাই ফিকশন ধারা। তাত্ত্বিক অর্থে চলচ্চিত্রের উদ্ভবও সেখানেই।
আবার চলচ্চিত্র দিয়ে সমাজের বিভিন্ন অসঙ্গতি ও সমস্যা দর্শকদের সামনে তুলে ধরার যে প্রয়াস তারও শুরু বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকেই। গ্রিফিথ-এর বার্থ অব অ্যা নেশন (১৯১৫)ও ইনটলারেন্স (১৯১৬)চলচ্চিত্র দুটিই তার স্বাক্ষর বহন করে। ‘টমাস ডিক্সনের কাহিনী অবলম্বনে আমেরিকার গৃহযুদ্ধের পটভূমিতে নির্মিত হয় ‘বার্থ অব এ নেশন’। যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর ও দক্ষিণের রাজ্যগুলোর সেই রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ, লিঙ্কন হত্যা, ক্লু-ক্লাক্স-ক্লানদের অভ্যুদয়, গৃহযুদ্ধের ভয়াবহতা ও ব্যাপকতাটা বেশ বিশাল ক্যানভাসেই ধরতে চেয়েছিলেন গ্রিফিথ। তবে ছবিটাতে কৃষ্ণাঙ্গ-বিরোধী অনেক বক্তব্য থাকায় সে সময় খুবই হাঙ্গামা হয়েছিল। অনেকেই গ্রিফিথের দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা করেছিলেন তীব্র ভাষায়। ফলে কিছুটা যেনো অভিমানেই গ্রিফিথ তার পরের ছবির নাম রাখলেন ‘ইনটলারেন্স’।’৬
একটু গভীরভাবে দৃষ্টি দিলে এই কথাগুলোতেই চলচ্চিত্রে প্রামাণ্যের গুরুত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। প্রথমত, গ্রিফিথের প্রথম চলচ্চিত্রের পটভূমি ছিলো রাজনৈতিক ও সামাজিক। ফলে চলচ্চিত্রের গল্প হওয়া সত্ত্বেও দর্শক তাকে গুরুত্ব সহকারে নিয়েছিলো বলেই গ্রিফিথের দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা করা হয়েছিলো। দ্বিতীয়ত, গ্রিফিথ চলচ্চিত্রের নান্দনিক দিক বজায় রেখেও চলচ্চিত্র-ভাষায় সেই সমালোচনার জবাব বা তার বক্তব্যকে প্রমাণ ও সমর্থন করার চেষ্টা করেছেন পরবর্তী চলচ্চিত্রটির মাধ্যমে। চলচ্চিত্রে প্রমাণের বিষয়টি এখান থেকেই শুরু হয়। চলচ্চিত্র শুধু দর্শক মনোরঞ্জন বা ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে সিনেমাটিকভাবে তৈরি হলেই হবে না, এর গল্প ও চিত্রায়ণ দর্শকদের কাছে বাস্তবিকভাবে গ্রহণযোগ্য হতে হবে; তবেই তা হবে সফল। সেই ধারার সফলতার দৌড় এখনকার ফিকশন ধারার চলচ্চিত্রেও লক্ষণীয়। উদাহরণ হিসেবে জেমস ক্যামেরন নির্মিত টাইটানিক-এর (১৯৯৭) কথা বলা যেতে পারে; যেখানে একটি সুন্দর গল্পের পটভূমির সঙ্গে সঙ্গে বিশাল আকৃতির জাহাজটাকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে দেখিয়ে সহজেই দর্শকদের প্রেক্ষাগৃহে আনা সম্ভব হয়েছিলো। এই দর্শক ও সমাজ সচেতনতা, দরদি শিল্পী চার্লি চ্যাপলিনের চলচ্চিত্রেও দেখা গিয়েছে।৭ তিনি তার কমেডি দিয়েই দর্শকদের মধ্যে মানবিক আবেদন তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছিলেন।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন যখন এসব নন-ফিকশন চলচ্চিত্রের তথ্য ও প্রামাণ্যের শক্তি সম্বন্ধে সবাই জানতে পারলো, তখন রাষ্ট্রনেতারা এর শক্তিকে প্রোপাগান্ডার কাজে ব্যবহার করলো। চার্লস মুস্যের’র ভাষায়, ‘যদিও প্রথম দিকে সরকার ও তাদের আজ্ঞাবহ শীর্ষ সেনা কর্মকর্তারা চিত্রগ্রাহকদের সারির সামনে দাঁড়াতে বাধা দিয়েছিলেন তথাপি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় নন-ফিকশন ফিল্ম তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তারা সবাই কম বেশি বুঝতে পারে যে, ওই সকল তথ্যপ্রমাণগুলো যেমন তাদের নিজেদের জনসাধারণকেই উদ্বুদ্ধ করার জন্য ব্যবহার করা যায়, তেমনি নিরপেক্ষ কোনো দেশে নিজেদের পক্ষে জনমত তৈরির জন্য খুবই কার্যকর।’৮ (অনুবাদ : লেখক)
সেই সময়কার এ ধরনের প্রোপাগান্ডা চলচ্চিত্রের মধ্যে Britain Prepared (১৯১৫), Deutschwehr War Films (১৯১৫), American’s Answer (১৯১৮)ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এসব চলচ্চিত্রের মাধ্যমে চলচ্চিত্রকর্মী ও সমাজ সচেতন ব্যক্তিরা তথ্যচিত্রের মধ্যে প্রামাণ্যের রাজনৈতিক ব্যবহার,অপব্যবহার দেখতে পেলেন। প্রামাণ্যচিত্রের শক্তি, সামর্থ্য ও এর অপার সম্ভাবনাকে সমাজে কীভাবে ব্যবহার করা যায়, তা নিয়ে শুরু হলো চিন্তা ও গবেষণা। ক্যামেরার মাধ্যমে বাস্তবতাকে নিউজের মতো চিত্রায়ণ করে তাকে উল্টিয়ে-পাল্টিয়ে খেলা করতে গিয়ে অনেকেই বাস্তবতাকে নতুন করে নির্মাণের মধ্যে অন্যরকম এক নেশা খুঁজে পেলো।
তিন.
এভাবেই চলচ্চিত্রে যখন বাস্তবতার অনুশীলন চলছিলো, তখনই কিছু নির্মাতা এই বাস্তবতাকেই (যা নন-ফিকশন ধারা থেকে উদ্ভূত) গল্প বানিয়ে নতুন আঙ্গিকে চলচ্চিত্র বানানোর প্রয়াস পান। সেই সময় ফিকশন ধারার চলচ্চিত্রের ব্যবসায়িক সম্ভাবনা থাকলেও ব্যতিক্রমী চিন্তার ওই সব নির্মাতা চলমান ও ঘটমান সমাজ বাস্তবতাকেই মূল উপজীব্য করে চলচ্চিত্রের অসীম শক্তির মাধ্যমে সমাজব্যবস্থার পরিবর্তনের যে আন্দোলন শুরু করেন, সেটাই প্রামাণ্যচিত্রের প্রতিষ্ঠিত বা জনস্বীকৃত ধারার সূত্র। আর এই প্রতিষ্ঠিত ধারার প্রারম্ভিক নায়ক ছিলেন রবার্ট জোসেফ ফ্ল্যাহার্টি, যিনি ১৯১৪ থেকে ১৯১৬ সাল পর্যন্ত এস্কিমোদের জীবনযাত্রার ওপর একটি ইলাস্ট্রেটেড লেকচার তৈরি করেন। এই লেকচারটিকে ১৯১৭ সালে যখন তিনি একটি পূর্ণাঙ্গ প্রামাণ্যচিত্রে রূপ দিতে চেয়েছিলেন, তখন নেগেটিভগুলো পুড়ে যায়। কিন্তু ফ্ল্যাহার্টি শিল্পের নেশায় এতোটাই মগ্ন ছিলেন যে, তিনি পুনরায় নর্থ কানাডায় গিয়ে কয়েক বছর শুট্ করে তৈরি করেন ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত প্রামাণ্যচিত্র নানুক অব দ্য নর্থ (১৯২২)। এ চলচ্চিত্রে ফ্ল্যাহার্টি প্রথমবারের মতো তথ্যপ্রমাণকে শৈল্পিকভাবে উপস্থাপন করে একে পূর্ণাঙ্গ সফল প্রামাণ্যচিত্র হিসেবে উপস্থাপন করেন। দর্শক প্রথমবারের মতো প্রামাণ্যচিত্রের শৈল্পিক স্বাদ উপভোগ করে সেলুলয়েডে শিল্পচর্চার এক নতুন ধারাকে উদ্ভাবন করে। প্রামাণ্যচিত্রের তাত্ত্বিকতারও শুরু এখানেই। ‘নানুকের মধ্যে (বাস্তবতায়) অংশগ্রহণমূলক চলচ্চিত্র নির্মাণের অনেক উপাদান রয়েছে যা পরবর্তীকালে অভিনব ও প্রগতিশীল চলচ্চিত্রনির্মাতাদের অনেকেই অনুসরণ করেছেন। নির্মাতার বক্তব্যকে ধারাভাষ্যের মতো উপস্থাপন প্রামাণ্যচিত্রটিকে পূর্বের অনেক চলচ্চিত্র থেকে বেশি ‘নৈর্ব্যক্তিক’ করে তুলেছিলো, যদিও নির্মাতা চলচ্চিত্রের উপাদানগুলোকে নিজের ইচ্ছেমতো সাজিয়েছেন।’৯ (অনুবাদ : লেখক)
প্রামাণ্যচিত্রে বস্তুনিষ্ঠতা (Objectivity) ও সৃজনশীলতার (Creativity) মধুর মিলন এ চলচ্চিত্রেই প্রথম দেখা যায়। ফ্ল্যাহার্টির দ্বিতীয় চলচ্চিত্র Moana (১৯২৬) ও ওয়াল্টার রুটম্যানের Berlin :Symphony of City-তে (১৯২৭) সৃজনশীল বস্তুনিষ্ঠতা আরো প্রকটভাবে তুলে ধরা হলে তা সমসাময়িক তাত্ত্বিকদের দৃষ্টি এড়াতে পারেনি। ৩০ দশকের শুরু থেকেই রাজনৈতিক ও সামাজিক সমস্যা কীভাবে প্রামাণ্যচিত্রের উপজীব্য হয়ে উঠেছিলো তাও বিবেচ্য ছিলো। ব্রিটিশ ও কানাডিয় প্রামাণ্যচিত্রের জনক হিসেবে খ্যাত জন গ্রিয়ারসন প্রামাণ্যচিত্রকে ‘বস্তুনিষ্ঠ’ বলেই আখ্যা দিয়েছিলেন।১০ তখন থেকেই চলচ্চিত্র চিন্তাবিদদের মধ্যে প্রামাণ্যচিত্রকে সংজ্ঞায়িত করার একটি প্রচেষ্টা লক্ষ করা যায়। বিশিষ্ট চলচ্চিত্রতাত্ত্বিক গাস্তঁ রোবের্জ বলেন, ‘তথ্যচিত্রের নানা সংজ্ঞা আছে। সবগুলিই চিত্রনির্মাণের কর্মসূচীস্বরূপ। জঁ ভিগোর মতে, ‘তথ্যনির্ভর দৃষ্টিভঙ্গি’। জন গ্রিয়ারসন-এর মতে, ‘বাস্তবের সৃজনশীল ব্যবহার’। পল রথার মতে, ‘বাস্তব জনজীবনের সৃষ্টিধর্মী ও সামাজিক তাৎপর্যমণ্ডিত ব্যাখ্যাকল্পে ফিল্ম্ মাধ্যমের ব্যবহার’।’১১
গ্রিয়ারসন বিশ্বাস করতেন এবং দাবি করেছিলেন, এ মাধ্যমটি মানুষ ও প্রতিষ্ঠানকে পরিবর্তন করতে সক্ষম। এমনকি এটি নড়বড়ে গণতন্ত্রকে শক্তিশালীও করতে পারে।১২ প্রামাণ্যচিত্রকে সংজ্ঞায়িত করার এ প্রয়াস থেকেই তাত্ত্বিক বিতর্কের শুরু। এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে সে বিতর্ক কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়ে। এবং অবাক হওয়ার বিষয় নয় যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও প্রামাণ্য ও তথ্যচিত্রকে প্রোপাগান্ডার হাতিয়ার হিসেবে আবারো ব্যবহার করা হয়।
চার.
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর চলচ্চিত্র ইতিহাসের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিপ্লব হয়েছিলো ইতালিতে। প্রাকযুদ্ধকালীন ইতালিতে ফ্যাসিবাদী মতাদর্শ প্রচারের জন্য তথ্যচিত্র ও কাহিনীচিত্র নির্মাণের জন্য মুসোলিনি Centro Sperienate di Cinematografia নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন।১৩ বাস্তববাদী ও সমাজ সচেতন চলচ্চিত্র নির্মাণের সুযোগ তখন ছিলো না। ফলে ইতালির চলচ্চিত্র শিল্পে ধস নেমেছিলো। যুদ্ধকালীন ও যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ইতালির ভঙ্গুর অর্থনীতির কারণে অনেক নির্মাতা ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও চলচ্চিত্রনির্মাণ করতে পারেননি।
‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিধ্বস্ত ইতালীর চলচ্চিত্র শিল্প যখন অর্থনৈতিক সংকটের মুখে তখন রবার্তো রোসেলিনি, ভিত্তেরিও ডি সিকা, লুসিনো ভিসকন্তি ও ফেলিনি সহ আরও কিছু চলচ্চিত্রকার তাঁদের চলচ্চিত্রের চরিত্রের জন্য অপেশাদার সত্যিকারের পেশাজীবী দিয়ে অভিনয় ও রাস্তা ফুটপাতসহ বিভিন্ন সত্যিকার স্পটে শ্যুটিং করে চলচ্চিত্রে বাস্তবতাকে নতুন রূপ প্রদান করেন। এর ফলে নাটকীয় ব্যবসায়িক ফিচার চলচ্চিত্রেও প্রামাণ্য বিষয়টি জায়গা করে নেয়।’১৪
রবার্তো রোসেলিনির Rome : Open City (১৯৪৫) দিয়ে যে বিপ্লবের শুরু এবং ডি সিকার মাস্টারপিস The Bicycle Thief (১৯৪৮) এর মধ্য দিয়ে যা তাত্ত্বিক রূপ লাভ করে তাই চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ‘নিউরিয়ালিজম’ নামে পরিচিত। এই বিপ্লবের মাধ্যমে মূলধারার ফিকশন-চলচ্চিত্রেও বাস্তবভিত্তিক দৃশ্যধারণ ও সত্য ঘটনার ওপর চলচ্চিত্র নির্মিত হতে থাকলে প্রামাণ্যচিত্রের মৌলিকতা কিছুটা প্রশ্নের সম্মুখীন হয়।
কিন্তু সেই প্রশ্নের উপযুক্ত জবাবই দিয়েছিলেন প্রামাণ্যচিত্র-নির্মাতারা। উদ্ভূত এ চ্যালেঞ্জকে গ্রহণ করে তারা নতুন উদ্যমে নতুন পথে চলতে শুরু করেন। তারা কাহিনীচিত্রের পাশাপাশি বাস্তবতা, রাজনৈতিক ও সামাজিক সঙ্কট এবং সত্যকে পুঁজি করে নতুন নতুন প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করতে থাকেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে পৃথিবীতে অনেক জাতি রাষ্ট্রের জন্ম হয়; পরিবর্তন হয় বিশ্বরাজনীতির প্রেক্ষাপট। আন্তঃরাষ্ট্র যুদ্ধের সংখ্যা কমে আসলেও বাড়তে থাকে অন্তঃরাষ্ট্র কোন্দল ও পরিচয়ের সঙ্কট। নির্মাতারা সমাজের ওই সব সঙ্কটগুলোকে উপজীব্য করে নতুন নতুন প্রামাণ্যচিত্র উপহার দিতে থাকেন। প্রযুক্তির উৎকর্ষে গল্প বলার ধরনেও আসে নতুনত্ব। প্রেরণা ছিলো ‘...ফ্লাহার্টির গীতিময়তা ও ইভেন্সের বাস্তবমনস্কতার সহাবস্থান। হনস্ত্রার অসংখ্য ছবির মধ্যে ‘মিরর অব হল্যান্ড’ (১৯৫০), ‘এপ এন্ড দি সুপার এপ’ (১৯৫১) ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি।’১৫ এভাবে নিউরিয়ালিজম বিপ্লবের পরে প্রামাণ্যচিত্রের ‘ডকুমেন্টারি ভ্যালু’র চর্চায় বৈচিত্র্য দেখা যায়। ফলে গ্রিয়ারসনের প্রামাণ্যচিত্রের মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তন ও গণতন্ত্রায়ন তত্ত্বের ব্যবহারিক প্রয়োগ দেখা যায়।
পাঁচ.
প্রামাণ্যচিত্রের প্রসার ও বিকাশ ঘটেছে মূলত বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে। ব্রিটেনের ফ্রি সিনেমা মুভমেন্ট, ফ্রান্সের সিনেমা ভেরিতে, আমেরিকার ডিরেক্ট সিনেমা—এসব চলচ্চিত্র আন্দোলন প্রত্যক্ষভাবে প্রামাণ্যচিত্রকে প্রভাবিত করেছে।১৬ ৬০ দশকে যখন বিশ্ব উন্নয়ন তত্ত্ব তৃতীয় ও উন্নয়নশীল দেশসমূহে অনুকরণ হতে থাকে, তখন দ্রুত ছড়িয়ে যেতে থাকে প্রযুক্তি। চলচ্চিত্রনির্মাণে নতুন নতুন, অপেক্ষাকৃত কম ব্যয়বহুল প্রযুক্তির সহজলভ্যতার ফলে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রসহ প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণে মধ্যবিত্ত মানুষের মধ্যেও আগ্রহ বাড়তে থাকে। সেই সঙ্গে ৬০ দশকের শেষের দিকে আবির্ভাব ঘটে টেলিভিশন মিডিয়ার। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই টেলিভিশন দর্শকদের কাছে বিপুল জনপ্রিয়তা পায়। টেলিভিশনে তখন নিউজরিলের পাশাপাশি ছোটো ছোটো প্রামাণ্যচিত্র প্রচার করা হতো। আমেরিকা ও ইউরোপে ৭০ দশকের প্রথম দিকে এ ধরনের প্রামাণ্যচিত্রগুলো বেশ জনপ্রিয়ও হয়ে ওঠে। তখন সিনেমা ভেরিতে ধারার খ্যাতনামা প্রামাণ্যচিত্র-নির্মাতা জঁ রোচা’র ‘সিনেমা ট্রুথ’ এবং কেন লাউচ-এর ‘ড্রামা ডকুমেন্টারি’র মিশ্রণে টেলিভিশন ডকুমেন্টারি তৈরি করা হতো। হ্যান্ডহেল্ড ক্যামেরা ব্যবহার করে ঘটনা বাস্তবের মতো করে দর্শকদের সামনে তুলে ধরে যে প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করা হতো, তাকে ‘মকুমেন্টারি’ (Mocumentary) বলা হতো, যা এখনো অনেক প্রামাণ্যচিত্র-নির্মাতাই অনুসরণ করে থাকেন। এমনকি হলিউডের অনেক অ্যাকশনধর্মী ও হরর চলচ্চিত্রে এখন এ শৈলী অনুসরণ করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, জেমস বন্ড সিরিজের চলচ্চিত্রগুলোর কথা বলা যেতে পারে।
৭০ দশকের শেষের দিকে যখন টেলিভিশনে রঙ আসলো এবং মানুষ ঘরে বসে সারাবিশ্বকে এবং নানা অঞ্চলের চলচ্চিত্র উপভোগ করার সুযোগ পেলো; তখন টেলিভিশনে প্রামাণ্যচিত্রও সাপ্তাহিক এবং ধীরে ধীরে দৈনিক আধেয় হিসেবে স্থান করে নিলো। টেলিভিশন ডকুমেন্টারি থেকেই মূলত প্রামাণ্যচিত্রের ব্যবসায়িক সম্ভাবনার বিষয়টি আলোচনায় আসে। টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর নিজস্ব প্রযোজকরা বাদেও ফ্রিল্যান্স অনেক নির্মাতা প্রামাণ্যচিত্র বানিয়ে ওই সব চ্যানেলে বিক্রি করতো। এর ফলে প্রামাণ্যচিত্রের ব্যবসায়িক সম্ভাবনা অনেককে ভাবিয়ে তুলেছিলো। তারপর প্রতিষ্ঠা হলো ডিসকভারি, হিস্ট্রিসহ নানা চ্যানেল, যেখানে সারাদিন নানা ভঙ্গিতে প্রামাণ্যচিত্র দেখানো হতো। আর প্রামাণ্যচিত্র যখন এ রকম সস্তা শিল্প হয়ে গেলো, তখন একেকজন একেকভাবে একেক শৈলীতে শিল্পচর্চা করতে লাগলো। এ সময় POV শট্ প্রামাণ্যচিত্রে বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করে। সেসময় আর্কাইভ ছবির ব্যবহার, কমান্ট্রি, ভিন্ন ভিন্ন এডিটিং স্টাইল নানা কায়দায় প্রামাণ্যচিত্র দর্শকদের সামনে তুলে ধরা হয়। টেলিভিশন রিয়ালিটি শোতেও প্রামাণ্যচিত্রের ধরন অনুশীলনের একটি প্রয়াস তখন দেখা যায়। তাত্ত্বিকরাও অনেকটা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। এজন্য ৭০ দশকের শেষ থেকে ৯০ দশক পর্যন্ত প্রামাণ্যচিত্র নিয়ে তাত্ত্বিক আলোচনাও খুব একটা দেখা যায়নি।
ছয়.
৮০ দশকের শেষ থেকে উন্নত বিশ্বে এবং ৯০ দশকে পুরো বিশ্বে যোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নয়ন প্রামাণ্যচিত্রকে প্রকটভাবে প্রভাবিত করে। প্রথমত, সাংবাদিকসহ গণমাধ্যমকর্মীরা নিউজরিলের মাধ্যমে ‘বস্তুনিষ্ঠ’ প্রামাণ্য তৈরি করতে থাকেন। এসব চলচ্চিত্রে শৈল্পিক দিক খুব একটা খুঁজে পাওয়া যায় না। দ্বিতীয়ত, ইন্টারনেটের উদ্ভাবন ও এর সহজলভ্যতায় প্রামাণ্যচিত্র-নির্মাতার সংখ্যা এবং এর প্রচার অনেক বাড়তে থাকে, বাড়তে থাকে দর্শকও। তৃতীয়ত, প্রামাণ্যচিত্র অনেক প্রতিষ্ঠানেই একটি আলাদা ডিসিপ্লিন হিসেবে অধ্যয়ন হতে থাকে। ফলে, এর তাত্ত্বিক নানা দিক নিয়ে গবেষণা এবং নানা ঢঙে সেগুলোর ব্যবহার দর্শক দেখতে পেয়েছেন। এর ফলে প্রামাণ্যচিত্রের অনেক ধারার উদ্ভব আমরা ওই শতাব্দীর শেষ দিকেই পেয়েছি।
তবে, ওই সময়ের সবচেয়ে আলোচিত প্রামাণ্যচিত্র-নির্মাতা মাইকেল মুর। তার রজার অ্যান্ড মি (১৯৮৯) ও ফারেনহাইট ৯/১১ (২০০৪), যখন শুধু গল্পের মাধ্যমে প্রশ্ন উত্থাপন করেই থেমে থাকলো না, বক্সঅফিসেও রেকর্ড গড়লো, তখন প্রামাণ্যচিত্রের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন হলো; তা ব্যবসায়িক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বের সঙ্গে সঙ্গে দর্শক জনপ্রিয়তাও পেলো। হঠাৎ করেই প্রামাণ্যচিত্রের প্রভাব বাড়তে থাকলো সব শ্রেণির দর্শকদের ওপর। সেই জনপ্রিয়তা ও প্রভাবকে ব্যবহার-অপব্যবহার দুইই করা হলো।১৭ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যখন সমাজ ও উন্নয়ন সম্পর্কিত নানাধরনের প্রামাণ্যচিত্র প্রযোজনা করতে এগিয়ে এলো, তখন সস্তা প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে হারালো নির্মাতার মৌলিকতাও। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠলো প্রামাণ্যচিত্রের স্বাধীনতা নিয়েও।
তবে এতো সব বিতর্কের মধ্যে আজও স্বাধীনভাবে অনেক নির্মাতারাই প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করে চলেছেন; গড়ে উঠেছে ব্যক্তিগত ও বেসরকারি পর্যায়ে অনেক সংগঠনও। আমাদের দেশে ‘বাংলাদেশ ডকুমেন্টারি কাউন্সিল’ বেশ প্রশংসা ও দায়িত্বের সঙ্গেই এ কাজ করে যাচ্ছে। প্রামাণ্যচিত্রের গণতন্ত্রায়ন সম্ভব হয়েছে এ ধরনের সংগঠনের বিভিন্ন উদ্যোগের কারণেই। বিভিন্ন দেশে প্রামাণ্যচিত্রের তাত্ত্বিক গবেষণাসহ বিভিন্ন উৎসবের আয়োজনের মধ্য দিয়ে এসব সংগঠন প্রতিনিয়ত দর্শকদের চাহিদা পূরণ করে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে তৈরি হচ্ছে নতুন দর্শকও। স্বাধীন প্রামাণ্যচিত্র-নির্মাতাদের জন্য এসব সংগঠন নিয়ামকের ভূমিকা পালন করছে। এর জন্যই আমরা আজও সমাজের নানা সমস্যা ও অসঙ্গতি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে দেখি প্রামাণ্যচিত্র-নির্মাতাদের।
সাত.
যে বিষয়টি আলোচনার জন্য রচনাটি অবতারণা করেছি তা পরিষ্কারভাবে বোঝার জন্য উপরিউক্ত ইতিহাস পর্যালোচনা জরুরি ছিলো। প্রামাণ্যচিত্র কী এবং এ চিত্রে কতোখানি সত্য এবং কতোখানি বাস্তবতা প্রয়োজন হয় বা পুনর্নির্মিত হয় তাই মূল বিবেচ্য। রচনার শুরুতেই হেনরিক জুয়েলের যে বিবেচ্য বিষয়গুলোর কথা উল্লেখ করেছিলাম,সেগুলো মোটাদাগে হলো—চলচ্চিত্রের উদ্দেশ্য, বাস্তবতাকে তুলে ধরার বাহন, চলচ্চিত্রের ভাষাগত বিভিন্ন উপাদান, চলচ্চিত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা, পুনর্নির্মাণে সৃজনশীলতার ব্যবহার, পরিচালকের বা চিত্রনির্মাতার কর্তৃত্ব ইত্যাদি বিষয়গুলোই প্রধান।১৮ একটি চলচ্চিত্রকে আমরা সত্যিকার অর্থে প্রামাণ্যচিত্র বলবো কি না তার জন্য উপর্যুক্ত বিষয়গুলোর সঙ্গে আরো যেটা বিবেচনা করা প্রয়োজন তা হলো ফ্ল্যাহার্টির শিল্প আর গ্রিয়ারসনের ‘ডকুমেন্টারি ভ্যালু’। আর যেকোনো প্রামাণ্যচিত্রের ‘ডকুমেন্টারি ভ্যালু’ বিচারের জন্য প্রথমত বুঝতে হবে এর সামাজিক, রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট; তবেই ওই প্রামাণ্যচিত্রে সত্য ও বাস্তবতার বিচারটাও প্রাসঙ্গিক ও যুক্তিযুক্ত হবে।
প্রামাণ্যচিত্রে সত্য ও বাস্তবতার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ভাবার আগেই এটা বুঝতে হবে যে, এক্ষেত্রে নির্মাতা কোনো সমাজ সংস্কারক নন, বরং তিনি প্রথমত একজন সমাজ-সচেতন শিল্পী। তিনি তার শৈল্পিক বোধ থেকেই প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেন। সেখানে সত্য তথ্য পরিবেশনটা প্রত্যাশিত, তবে প্রাথমিক শর্ত নয়। এ প্রসঙ্গে রচনা প্রারম্ভে প্রখ্যাত চিত্রকর পাবলো পিকাসোর উক্তিটি প্রযোজ্য,‘শিল্প হচ্ছে একধরনের ধোঁকা যা আমাদের সত্য অনুধাবনে সাহায্য করে।’ এখানে শিল্পী কী মাধ্যমের আশ্রয় নিলেন, পুরো সত্য বললেন নাকি আংশিক, তা গৌণ বিষয়; মুখ্য বিষয় হচ্ছে প্রামাণ্যচিত্রটি যে প্রেক্ষাপটে তৈরি সে প্রেক্ষাপটে মৌলিক কিছু প্রশ্ন দর্শকদের সামনে ছুড়ে দিতে পারছে কি না। কেননা, ‘তথ্যচিত্র তৈরি হয় বিশেষ বিষয় সম্পর্কে দর্শককে অবহিত করতে। ফলত উদ্দেশ্য থাকে (তার) সমাজের অগ্রগতিকে অব্যাহত রাখা। তথ্যচিত্রনির্মাতা সেদিক থেকে একজন বিপ্লবী ছাড়া কিছু নন।’১৯ আর নির্মাতার সেই বৈপ্লবিক চিন্তা তৈরির জন্য অনেক ছলচাতুরীর আশ্রয়ও নেওয়া যেতে পারে।
এখন যদি আমরা প্রামাণ্যচিত্রের ইতিহাসের মধ্যে প্রামাণ্যচিত্রে সত্য ও বাস্তবতার বিবর্তন খেয়াল করি, তাহলে দেখতে পাই—প্রথমত, যা প্রয়োজন তা হচ্ছে তথ্য ও সত্য (Actuality)। দ্বিতীয়ত,প্রয়োজন সেই তথ্য ও সত্যের সৃজনশীল উপস্থাপন। তৃতীয়ত, সেই উপস্থাপনের মধ্যে বাস্তবতা থাকতে হবে, থাকতে হবে চরিত্র, চেতনা, স্থান, কাল, পাত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা। পরিশেষে থাকতে হবে নির্মাতার স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক কণ্ঠস্বর। আর এসব উপাদান দিয়েই দর্শকদের সঙ্গে নির্মাতার একটি বন্ধন তৈরি হয়, যে বন্ধন বিশ্বাসের।
দর্শক প্রামাণ্যচিত্র দেখে কিছুটা আলোড়িত হওয়ার জন্য, নিছক বিনোদনের জন্য নয়। নির্মাতার ওপরে তাদের দৃঢ় বিশ্বাস থাকে, যা কিছু দেখানো হবে তা সত্যের কাছাকাছি, বাস্তবতার নিরিখে। আর নির্মাতা সেই সত্য ও বাস্তবতাকে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে তা শৈল্পিক ও উপজীব্য করে প্রদর্শন করে দর্শককে চিন্তামগ্ন করেন। তাই, প্রামাণ্যচিত্রের সফলতার বিবেচনায় সত্য ও বাস্তবতার চেয়ে বিশ্বাসযোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতাই বড়ো বিষয়।
লেখক : মাহমুদুল হক মনি, চলচ্চিত্র-গবেষক। বর্তমানে তিনি সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কর্মরত আছেন।
mhmoni24@yahoo.com
তথ্যসূত্র
১. মনি, মাহমুদুল হক; ‘গণহত্যার প্রামাণ্য দলিল ‘রক্তান্ত প্রান্তর’’; বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ জার্নাল; সম্পাদনা—ড. সাজেদুল আউয়াল, বর্ষ—৪, সংখ্যা—৪, জুন ২০১১, পৃষ্ঠা—৮৪।
২. Juel, H.; ÔDefining
Documentary FilmÕ; POV (A Danish Journal of Film
Studies); Edited by Richard
Raskin; Dec 2006, Vol No. 22, p. 10-22, Department of Information
and Media Studies,
৩. মোকাম্মেল, তানভীর (২০০৩ : ১১ ); চলচ্চিত্র কথা; প্যাপিরাস, ঢাকা।
৪. হোসেন, মাহমুদুল; ‘প্রামাণ্যচিত্রে সত্য-মিথ্যা’; প্রামাণ্যচিত্রে বাংলাদেশ-৩; সম্পাদনা—জাকিয়া খান; প্রকাশ ২০০৯, পৃষ্ঠা—৫৪, বাংলাদেশ প্রামাণ্যচিত্র পর্ষদ, ঢাকা।
৫. রায়, সত্যজিৎ (১৯৯৮ : ১৮); ‘চলচ্চিত্রের ভাষা : সেকাল ও একাল’; ফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশন; সম্পাদনা—জহিরুল ইসলাম কচি; বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র, ঢাকা।
৬. প্রাগুক্ত; মোকাম্মেল, তানভীর (২০০৩ : ১৪)।
৭. প্রাগুক্ত; রায়, সত্যজিৎ (১৯৯৮ : ২০)।
৮. ‘Non-fiction film played a crucial role as propaganda during the First World War, although governments and their top military officers at first barred cameramen from the front lines. More or less rapidly they came to recognize that documentary materials could not only inspire or reassure their own civilian populations but be shown in neutral countries, where they could influence public opinion.’
Musser, Charles (1997 :
89); ‘Documentary’, The
9. ‘Nanook exhibits strong elements of participatory filmmaking that has been celebrated by innovative and progressive film-makers of the present day... Confining the film-maker’s voice to the inter-titles and keeping him behind the camera made the film appear more ‘objective’ than earlier practices, even though the filmmaker had, in fact, become more assertive in shaping his materials.’
c‘v¸³; Musser, Charles (1997 : 90 ).
১০. রাইট, বেসিল (১৯৯৮ : ১৪৯); ‘তথ্যচিত্র সম্পর্কে কিছু কথা’; ফিল্ম আপ্রিসিয়েশন, সম্পাদনা—জহিরুল ইসলাম কচি; বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র, ঢাকা।
১১. রোবের্জ, গাস্তঁ (২০০৫ : ১০); ‘তথ্যচিত্রের তত্ত্ব’; তথ্যচিত্রের আর্ট ও টেকনিক; সম্পাদনা—ধীমান দাশগুপ্ত; বাণীশিল্প, কলকাতা।
১২. Aguayo, Angela J; ‘Documentary Film/Vedio and Social Change: A Rhetorical Investigation of Dissent’ শিরোনামের লেখাটি পড়তে এই লিংকে যেতে পারেন http://repositories.lib.utexas.edu/handle/2152/2232
১৩. প্রাগুক্ত; মোকাম্মেল, তানভীর (২০০৩ : ৪২)।
১৪. মনি, মাহমুদুল হক; ‘প্রামাণ্যচিত্রের গল্প’; দৈনিক জনকণ্ঠ, ৫ ডিসেম্বর ২০১৩।
১৫. প্রাগুক্ত; মোকাম্মেল, তানভীর (২০০৩ : ৭৬)।
১৬. প্রাগুক্ত; মোকাম্মেল, তানভীর (২০০৩ : ৭৬)।
১৭. প্রাগুক্ত; দৈনিক জনকণ্ঠ, ৫ ডিসেম্বর ২০১৩।
১৮. প্রাগুক্ত; রোবের্জ, গাস্তঁ (২০০৫ : ১১)।
১৯. প্রাগুক্ত; রাইট, বেসিল (১৯৯৮ : ১৪৯)।
বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৪ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের ষষ্ঠ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন