মাহামুদ সেতু
প্রকাশিত ২৯ ডিসেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
হলিউডি চলচ্চিত্র
শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণ শিল্পে নয়, পুঁজিতে
মাহামুদ সেতু

কাহিনীলেখ্য-এক
দুনিয়ার মসনদ দখল করতে চায় খলনায়ক। বরাবরের মতোই নায়ক বাধা হয়ে দাঁড়ায়। একপর্যায়ে নায়িকাকে ধরে নিয়ে যায় খলনায়ক, সঙ্গে নায়কও ধরা পড়ে। আর নায়ককে বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ দেয় পার্শ্ব-নায়িকা, যে একসময় খলনায়কের দলে যোগ দিয়েছিলো। এরপর খলনায়কের হাত থেকে নিজেকে মুক্ত করে নায়ক। একপর্যায়ে নায়িকা ও রাষ্ট্রপ্রধানকে জিম্মি করে খলনায়ক। অবশেষে প্রাণপণ যুদ্ধ করে নায়িকা ও রাষ্ট্রপ্রধানকে মুক্ত করে নায়ক, খলনায়ক মারা যায় নায়িকার হাতে।ব্যস, অতঃপর তাহারা সুখে-শান্তিতে জীবন কাটাইতে থাকিলো।
কাহিনীলেখ্য-দুই
দত্তক নেওয়া সন্তানদের টানে খারাপ কাজ ছেড়ে দেন একসময়ের মহাসন্ত্রাসী নায়ক। দিন ভালোই কাটছিলো। সেই সময় চুরি হয় অতি গুরুত্বপূর্ণ এক রাসায়নিক পদার্থ। পুলিশের পক্ষ থেকে তখন নায়ককে দায়িত্ব দেওয়া হয় লুট হওয়া সেই পদার্থ খোঁজার। এ কাজে নায়কের সঙ্গী হয় নায়িকা। একত্রে কাজ করতে গিয়ে তারা একে অন্যকে ভালোবেসে ফেলে। কাহিনীর একপর্যায়ে নায়ক-নায়িকা খোঁজ পেয়ে যায় রাসায়নিক পদার্থ লুট করা সেই সন্ত্রাসীর। ক্লাইম্যাক্সের শুরু, খবর পেয়ে ততোক্ষণে সেই সন্ত্রাসী বন্দি করে ফেলে নায়িকাকে। এরপর নায়িকা আর সেই রাসায়নিক পদার্থ উদ্ধারে নায়কের অ্যাকশন। চিরাচরিত নিয়মে নায়ক সফল। অর্থাৎ আবারো সেই মধুরেণ সমাপয়েৎ।
কাহিনীলেখ্য-তিন
এ গল্প একদল সন্ত্রাসীর। তারা অন্যায় কাজ ছেড়ে ভালো হতে চায়। রাষ্ট্র তাদের ক্ষমা করতে রাজিও হয়, তবে এর বিনিময়ে অন্য এক সন্ত্রাসীকে খতম করতে হবে। শুরু হয় চোর-পুলিশ খেলা।যথারীতি জয়ী ‘ভালো’রাই।
পাঠক, বুঝতেই পারছেন এতক্ষণ তিনটি চলচ্চিত্রের গল্প বললাম। তবে কোন্ ইন্ডাস্ট্রির চলচ্চিত্র বুঝতে পারছেন কি? ঢালিউড বা বলিউডের কোনো চলচ্চিত্রের গল্প নয়। এগুলো সেই ইন্ডাস্ট্রির গল্প, যাদের চলচ্চিত্র টিকিট কেটে দেখার জন্য ২০১২-তে প্রায় একশো ৩৭ কোটি মানুষ এক হাজার কোটি ডলারেরও বেশি খরচ করেছে। আর ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড এবং এ রকম বিভিন্ন উপায়ে এই চলচ্চিত্র দেখেছে বিশ্বের মোট চলচ্চিত্র-দর্শকের এক-তৃতীয়াংশ। বলছিলাম হলিউডের কথা। আর উপরের কাহিনী তিনটি যথাক্রমে আয়রন ম্যান থ্রি, ডেসপিকেবল মি টু ও দ্য ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস সিক্স-এর। চলচ্চিত্র তিনটি ২৯ আগস্ট ২০১৩ পর্যন্ত সেই বছরের মুক্তিপ্রাপ্ত সবচেয়ে ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র।১
এ কথাতো ঠিক, চলচ্চিত্রের গল্প দিয়ে ইন্ডাস্ট্রির পরিচয় বোঝা সম্ভব না। তাই এবার আমরা দেখার চেষ্টা করবো, চলচ্চিত্রগুলোতে আলাদা এমন কী থাকে যা এক ইন্ডাস্ট্রি থেকে আরেক ইন্ডাস্ট্রিতে পার্থক্য গড়ে দেয়। তবে এর আগে হলিউডের আদ্যোপান্ত জানাটা জরুরি বোধ করছি।
ইতিহাস সংকলন
চলচ্চিত্রনির্মাণের ইতিহাস যেমন অনেক দিনের তেমনই এতে অবদান রয়েছে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের। অবশ্য কৃতিত্বের বরমাল্য পেয়েছেন ফরাসি লুমিয়ের ভাইয়েরা ১৮৯৫-এ সিনেমাটোস্কোপ আবিষ্কার করে ব্যবসায়িক সাফল্য পাওয়ায়। তারা তাদের আবিষ্কৃত সিনেমাটোস্কোপ দুনিয়ার কোণায় কোণায় ছড়িয়ে দেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রে চলচ্চিত্র প্রথম প্রদর্শন হয় ১৮৯৪ সালে এডিসনের কারখানার কর্মী উইলিয়াম কে. লরি ডিকসনের তৈরি কিনোটোস্কোপে। সেসময় চলচ্চিত্রে কী দেখানো হচ্ছে তার চেয়ে কেবল চলচ্চিত্রটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। তবে সময়ের বিবর্তনে চলচ্চিত্রে কী দেখানো হচ্ছে সেটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। মানুষের বৈচিত্র্যময় চাহিদার কথা স্মরণে রেখে বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন ধারার চলচ্চিত্র হতে থাকে। আমেরিকাও এর বাইরে নয়। সেখানেও নানাধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণ হতে থাকে। তখন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত হলিউডের ইতিহাসকে চারটি পর্যায়ে ভাগ করা যায়।
১. নির্বাক যুগ (১৮৯৪—১৯২৯)
২. ক্লাসিক হলিউড (১৯২৭—১৯৬৩)
৩. নব্য-হলিউড (১৯৬৪—১৯৮২)
৪. সাম্প্রতিক হলিউড (১৯৮৩—বর্তমান)
নির্বাক যুগ (১৮৯৪—১৯২৯) :হলিউডের নির্বাক যুগের শুরুটা ধরা হয় ১৮৯৪-এ এডিসনের কিনোটোস্কোপে চলচ্চিত্র প্রদর্শনের পর থেকে। উদ্ভাবক ও প্রযুক্তি ব্যবসায়ী এডিসন শুরু থেকেই চলচ্চিত্রের আর্থিক ব্যাপারে সচেতন ছিলেন। ১৮৯৮ পর্যন্ত একমাত্র তার স্টুডিওতে নির্মিত চলচ্চিত্রই যুক্তরাষ্ট্রে পাওয়া যেতো। কিন্তু চলচ্চিত্রের রমরমা বাজার দেখে পরবর্তীকালে আরো অনেকেই আসেন এই ব্যবসায়। তবে তারা কেউই চলচ্চিত্রকে ব্যবসার চেয়ে বেশি কিছু মনে করেননি। মূলত ‘একেবারে গোড়ার দিন থেকেই সিনেমা হয়ে উঠেছিল গণ বিনোদনের মাধ্যম।’২ আর চলচ্চিত্র নির্মাণ-প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণ মানুষকে বিনোদিত করে অর্থ আয়ের উদ্দেশ্যেই কাজ করতো। তারা ব্যবসায়িক আধিপত্য ধরে রাখার জন্য মোশন পিকচার পেটেন্টস কোম্পানি গঠন করে। সবচেয়ে বড়ো সাতটি চলচ্চিত্র-নির্মাণ প্রতিষ্ঠান—এডিসন, বায়োগ্রাফ, ভিটাগ্রাফ, সেলিগ, কালেম, লুবিন, এসানি; ফরাসি পাথে ও মেলিয়ে স্টার কোম্পানিকে নিয়ে ১৯০৯-এ এই কোম্পানি গঠিত হয়। তারা সর্বোবৃহৎ ফিল্ম সরবরাহকারী সংস্থা ইস্টম্যান-কোডাকের সঙ্গে চুক্তি করে মোশন পিকচার ছাড়া অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানকে ফিল্ম সরবরাহ না করার। চাপে পড়ে ছোটো প্রতিষ্ঠানগুলো মোশন পিকচারের আওতায় থাকা নিউইয়র্ক ছেড়ে ক্যালিফোর্নিয়ার দক্ষিণে হলিউডে চলে আসে।৩ আর হলিউডের মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ ও সারাদিন থাকা সূর্যের আলো চলচ্চিত্র নির্মাণে অনুকূল হওয়ায় পরবর্তীকালে নিউইয়র্ককে পাশ কাটিয়ে চলচ্চিত্রের রাজধানী হয়ে ওঠে জায়গাটি।
হলিউডের এ পর্বে স্টুডিওগুলো প্রচুর চলচ্চিত্র নির্মাণ করলেও এগুলো ছিলো মূলত একটি আরেকটির নকল। একটি চলচ্চিত্র দর্শক ভালো ‘খাচ্ছে’; ব্যস, শুরু হয়ে গেলো তার অনুকরণে চলচ্চিত্রনির্মাণ।মূলত লাভের নিশ্চয়তা দেখতে পেলেই তারা চলচ্চিত্র নির্মাণে নেমে পড়তো। এক্ষেত্রে অ্যাডুইন এস পোর্টারের দ্য গ্রেট ট্রেন রবারির (১৯০৩) কথা বলা যায়। আসলে ‘কেউই বুঝলেন না, বা বুঝতে চাইলেন না যে, মানবজীবনের বাস্তব সংঘাতকে সিনেমার পর্দায় তুলে ধরলে জনগণের মনকে নাড়া দেওয়া সম্ভব। ‘দ্য গ্রেট ট্রেন রবারি’র সাফল্যে প্রাণিত হয়ে সবাই হাঁটলেন ওই একই পথে।’৪ আর এ পথ ধরে চুরি-ডাকাতি-খুন-মারপিট নির্ভর যে চলচ্চিত্রগুলো নির্মাণ হলো সেগুলোই খেতাব পেলো ‘ওয়েস্টার্ন সিনেমা’ হিসেবে। এই ওয়েস্টার্নেরই আরেক রূপ ‘আন্ডারওয়ার্ল্ড চলচ্চিত্র’। আন্ডারওয়ার্ল্ড চলচ্চিত্রে ওয়েস্টার্নের মতো অ্যাকশন থাকলেও মূল দ্বন্দ্ব দেখানো হতো চোরাকারবারি দলের মধ্যে।
ওয়েস্টার্নের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিলো কমেডি চলচ্চিত্র। ‘বস্তুত প্রথম যুগের নির্বাক ছবিগুলির মূল উপজীব্য বিষয়ই ছিল হাস্যরস।’৫ নানারকম অঙ্গভঙ্গি ও মজার মজার ঘটনা ঘটিয়ে লোক হাসানোই ছিলো এ জাতীয় চলচ্চিত্রের উদ্দেশ্য। অনেক অখ্যাত পরিচালক থেকে শুরু করে গ্রিফিথ-এর মতো নামকরা পরিচালকও কমেডি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। তবে কমেডি চলচ্চিত্রের একমাত্র বিস্ময় হচ্ছেন চার্লস স্পেনসার চ্যাপলিন। কমেডি-অভিনেতা হিসেবে চলচ্চিত্র জীবন শুরু করলেও পরিচালক হিসেবে এমন কতোগুলো চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন যেগুলো আজ পর্যন্ত বিস্ময় জাগায়। চ্যাপলিনের আগে যেসব কমেডি চলচ্চিত্র হতো সেগুলো মূলত ভাঁড়ামো করে লোক হাসিয়ে টাকা আয় করতো। ‘আসলে স্ল্যাপস্টিকের নেহাত মজার বাইরে এসে আলাদা কিছু করতে চাইছিলেন তিনি (চ্যাপলিন)।’৬
কমেডি চলচ্চিত্রের কথা বলা হলে স্বভাবতই তারপর স্থান দিতে হয় অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রকে। মানুষকে আনন্দ দিতে কমেডি আর অ্যানিমেশন কেউ কারো চেয়ে কম যায় না। তবে অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রের স্রষ্টা ওয়াল্টার এলিয়াস ডিজনি’র প্রথম চলচ্চিত্র অ্যালিস ইন কার্টুনল্যান্ড (১৯২৪) কিন্তু সফলতা পায়নি। ব্যর্থ হতে হতে দীর্ঘ চার বছর পর ১৯২৮-এ অসওয়াল্ড দ্য লাকি র্যাবিট দিয়ে সফলতার মুখ দেখেন তিনি। ওই বছরই তৈরি করেন পৃথিবী বিখ্যাত ‘মিকি মাউস’ চরিত্রটি। ‘মিকি মাউস’কে কেন্দ্রে রেখে নির্মিত প্লেন ক্রেজি (১৯২৮) ও গ্যালোপিন গাউচো (১৯২৮) নির্বাক চলচ্চিত্র দুটি দিয়ে সফলতা পান তিনি। আর সবাক চলচ্চিত্র স্টিমবোট উইলি (১৯২৮) দিয়ে জয়যাত্রা শুরু অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রের।এই জয়রথ সবেগে ছুটে চলছে এখনো।
ওয়েস্টার্ন-কমেডি-আন্ডারওয়ার্ল্ড সঙ্গে ‘গ্ল্যামার’-এর যাত্রাও শুরু হলিউডের এই আদি পর্বেই। ১৯১২-তে প্রকাশিত ‘ফটো প্লে’ ম্যাগাজিনের মাধ্যমেই অভিনেতা-অভিনেত্রীদের ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে সাধারণ মানুষ পরিচিত হয়ে ওঠে। কয়েক বছরের মধ্যে এ জাতীয় পত্রিকার সংখ্যাও বৃদ্ধি পায়। নায়ক-নায়িকাদের নিয়ে নানারকম চটকদার সংবাদ প্রকাশ হতো এসব পত্রিকায়। পাশাপাশি তাদের সাক্ষাৎকার, ছবি, গল্পও থাকতো। আর ব্যবসায়িক সাফল্যের দিকে তাকিয়ে প্রযোজকরাও ইন্ধন জোগাতে লাগলেন এ ব্যাপারে।
এভাবে যখন ধীরে ধীরে হলিউড শিল্প হিসেবে গড়ে উঠছে, তখন ডব্লিউ গ্রিফিথ নির্মাণ করেন দ্য বার্থ অব অ্যা নেশন (১৯১৫), যা দিয়ে শুরু পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের। আমেরিকার গৃহযুদ্ধ নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্রটি শ্বেতাঙ্গদের সংগঠন ‘কু ক্লুক্স ক্ল্যান’-এর প্রশংসাকারী ও ‘নিগ্রো বিরোধী’—এমন নানা সমালোচনার সম্মুখীন হলেও বিশ্বজুড়ে সাড়া ফেলে দেয়। সেসময় যখন চলচ্চিত্র হতো মিনিটের হিসাবে তখন গ্রিফিথের পৌনে তিন ঘণ্টাব্যাপী চলচ্চিত্রটি ছিলো ভয়ঙ্কর রকমের সাহসী পদক্ষেপ।
এ সময়ে হলিউডের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্রধারা হলো প্রামাণ্যচিত্র। আমেরিকায় প্রথম প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের কৃতিত্ব দেওয়া হয় রবার্ট ফ্ল্যাহার্টিকে তার নানুক অব দ্য নর্থ (১৯২২) নির্মাণের জন্য। তবে ফ্ল্যাহার্টি কিন্তু আমেরিকার কোনো চলচ্চিত্র নির্মাণ-প্রতিষ্ঠানের হয়ে নানুক নির্মাণ করেননি। তাকে সুমেরুর অধিবাসীদের ওপর প্রামাণ্যচিত্রটি করতে পাঠিয়েছিলো কানাডার রেডিসান ফার নামে কোম্পানি। আর এর সাফল্য দেখে ‘পরের ডকুমেন্টারি ছবি করার জন্য ফ্ল্যাহার্টিকে আমন্ত্রণ জানাল প্যারামাউন্ট কোম্পানি।’৭ তবে তার মোয়ানা (১৯২৬) প্রামাণ্যচিত্রটি ব্যবসা করতে পারলো না। ফলে ফ্ল্যাহার্টিকে প্যারামাউন্ট ছাড়তে হলো। এরপর তিনি মেট্রো গোল্ডউইন মেয়ার (এমজিএম) কোম্পানিতে যোগ দিলেও শেষটা আগের মতোই হলো। এখানেও মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়লো শিল্প ও ব্যবসা।
আসলে ফ্ল্যাহার্টি তার প্রামাণ্যচিত্রগুলোতে সময়কে সেলুলয়েডের ফিতায় বন্দি করতে চেয়েছিলেন। আর্থিক লাভের হিসাবকে কখনোই গুরুত্ব দেননি। কিন্তু প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে লাভের ‘গুড়’টাই ছিলো মুখ্য। ফলে তাকে এমজিএম-ও ছাড়তে হলো। আর ‘হলিউডের ফিল্ম কোম্পানিগুলির এই বেনিয়া মনোবৃত্তির ফলে চলচ্চিত্র শিল্পের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে অনেকবারই।’৮ আমেরিকান নির্মাতা এরিক ফন স্ট্রোহেইমের কথাই ধরুন। চলচ্চিত্রে তার বড়ো অবদান ডিটেইলের কাজ। ২০ দশকের শেষ দিকে চলচ্চিত্র হতো ঘণ্টাখানেকের এবং কোনো রকম একটা সেট বানিয়ে তার শুটিং হতো। কিন্তু স্ট্রোহেইমের চলচ্চিত্রগুলো হতো দুই-আড়াই ঘণ্টার। আর ডিটেইলের কাজও করতেন গুরুত্ব দিয়ে। ফলে একদিকে লম্বা চলচ্চিত্র, অন্যদিকে ডিটেইলের অতিরিক্ত খরচ। তাই প্রযোজকরা শুধু টাকা বাঁচানোর জন্য অর্থাৎ, আর্থিক লাভ-ক্ষতির দিকে তাকিয়ে তাকে দিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করানো ছেড়ে দেন। এভাবে আরো অনেক পরিচালককে প্রযোজকদের চাপের মুখে নিজের শিল্পীসত্তার তাগিদে কাজ করার ইচ্ছা ত্যাগ করতে হয়েছে।
আর হলিউডে যখন চলচ্চিত্র নেহাত টাকা উপার্জনের বস্তু, সেসময়ে সোভিয়েত রাশিয়া চলচ্চিত্রকে নিয়ে অনেক দূর অগ্রসর হয়ে গেছে। রাশিয়ায় চলচ্চিত্র প্রদর্শন শুরু সেই ১৮৯৬ সালে। তবে তাদের নিজস্ব চলচ্চিত্রযাত্রা আমেরিকার অনেক পরে, ১৯০৮-এ স্তেঙ্কা রাজিন দিয়ে। এর আগ পর্যন্ত শুধু ইউরোপ-আমেরিকার চলচ্চিত্রই সেখানে পাওয়া যেতো। তবে হলিউডে চলচ্চিত্রনির্মাণে শুধু ব্যবসায়ীরা যুক্ত থাকলেও রাশিয়াতে প্রথম থেকেই কবি-সাহিত্যিক-নাট্যকার-বিপ্লবীরা এ কাজে যুক্ত হওয়ায় সেখানে চলচ্চিত্র হয়ে ওঠে জীবনের অংশ। সাহিত্যিক লেভ তলস্তয় চলচ্চিত্রনির্মাতার লক্ষ্য নির্ধারণ করেন এভাবে, ‘...কাল্পনিক কাহিনী বর্জন করে সাধারণ রুশ কৃষকের বাস্তব জীবন ছায়াচিত্রে বর্ণিত করা।’৯
সোভিয়েত রাশিয়াই সর্বপ্রথম চলচ্চিত্রকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের চিন্তা-ভাবনা শুরু করে। ১৯১৭-তে লেনিন ক্ষমতা গ্রহণের তিন দিনের মাথায় সোভিয়েত ফিল্ম কমিটি গঠন করেন। হলিউড যে সময় টাকার জন্য ওয়েস্টার্ন, আন্ডারওয়ার্ল্ড, কমেডি প্রভৃতি চলচ্চিত্র নিয়ে কাজ করছে, তখন রাশিয়া চলচ্চিত্রকে প্রচার-প্রচারণামূলক কাজে ব্যবহারের জন্য ১৯১৮-তে অ্যাজিটট্রেনের (Agit-train বিশেষ ধরনের ট্রেন। যেখানে পত্রিকা ছাপানো, নাটক লেখা, চলচ্চিত্র নির্মাণের কর্মী ও সরঞ্জাম সবই ছিলো। রাশিয়ার সেনাদের উদ্দীপ্ত করতে এই ট্রেন সারাদেশ ঘুরে ঘুরে চলচ্চিত্রনির্মাণ ও প্রদর্শন করতো) সূচনা করে। পাশাপাশি চলচ্চিত্রকে অ্যাকাডেমিক জায়গা থেকে দেখার কাজটাও তারাই প্রথম করে ১৯১৯-এ পৃথিবীর প্রথম চলচ্চিত্র শিক্ষাকেন্দ্র ‘অল ইউনিয়ন স্টেট ইন্সটিটিউট অব সিনেমাটোগ্রাফি’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। আর চলচ্চিত্র কেমন হওয়া উচিত তা নিয়ে লেনিনের মত ছিলো, ‘সোভিয়েত রাষ্ট্রে কাল্পনিক কাহিনীমূলক ছবির চেয়ে বাস্তবভিত্তিক ছবির মূল্য বেশি।’১০
চলচ্চিত্র যে মানব জীবনের কঠিন বাস্তবতাকে তুলে ধরতে পারে তাও এই রাশিয়ার চলচ্চিত্র-নির্মাতারাই প্রথম চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন। তারা বিপ্লব পরবর্তী দুর্ভিক্ষে মানুষকে সহায়তা দেওয়ার উদ্দেশ্যে দুর্ভিক্ষ নিয়ে একাধিক চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন, যা ছিলো তলস্তয় ও লেনিনের চলচ্চিত্র-ভাবনার বাস্তব রূপায়ণ। এ চলচ্চিত্রগুলো ‘ইংলণ্ড, ফ্রান্স ও আমেরিকায় দেখানোর ফলে রাশিয়ার অবস্থা সম্পর্কে ব্যাপক সহানুভূতি উদ্রেক করতে সমর্থ হয়েছিল।’১১ আর ১৯০৫-এর বিপ্লব নিয়ে আইজেনস্টাইনের ব্যাটলশিপ পটেমকিন (১৯২৫) তো চলচ্চিত্র ইতিহাসে স্বতন্ত্র জায়গা করে নিয়েছে। চলচ্চিত্রের পটেমকিন শুধু একটি যুদ্ধজাহাজ নয়, একটি দেশের প্রতিরূপ। যা দেশের ক্ষমতা কাঠামো, সাধারণ শোষিত মানুষের সংগ্রামকে তুলে ধরে। পরবর্তীকালে আইজেনস্টাইন, পুদভকিনদের হাত ধরে রাশিয়ায় শুরু হয় সমাজতাত্ত্বিক বাস্তববাদ ধারার চলচ্চিত্রনির্মাণ। ‘জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করার উপযুক্ত হাতিয়ার হিসাবে ও শিল্প/সংস্কৃতি সম্বন্ধে সঙ্কীর্ণ বুর্জোয়া ধারণার বিরোধীতা করার উদ্দেশে’১২ ধারাটির প্রয়োগ শুরু হয়।
অন্যদিকে জার্মানিতে এ সময় অভিব্যক্তিবাদ ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু হয় রবার্ট ওয়েনের দ্য কেবিনেট অব ডক্টর ক্যালিগরির (১৯১৯) মধ্য দিয়ে। এই ধারাটি চলচ্চিত্র নিয়ে শৈল্পিক চিন্তার প্রথম প্রকাশ হিসেবে বিবেচিত। আমেরিকার চলচ্চিত্র ব্যবসা, রাশিয়ার চলচ্চিত্র রাজনীতির বিপরীতে চলচ্চিত্রকে শিল্পের জায়গা থেকে দেখার সূচনা করে জার্মানি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর জার্মানির সমাজ-বাস্তবতা থেকেই উৎসারিত হয়েছিলো এ ধারার সূচনা। এ ধারার অন্যতম বৈশিষ্ট্য, ক্যামেরার সাবজেক্টিভ ব্যবহার দেখা যায় পল ওয়েগনার-এর দ্য গোলেম (১৯২০), ফ্রিট্জ ল্যাং-এর ডেস্টিনি (১৯২১), এফডব্লিউ মুরনাউ-এর নসফেরাতু দ্য ভ্যাম্পায়ার (১৯২২) প্রভৃতি চলচ্চিত্রে। বলে রাখা ভালো, শুধু নান্দনিকতা নয়, বাজার ধরার উদ্দেশ্যও অভিব্যক্তিবাদের বিকাশে সহায়তা করেছিলো। ‘...কারণ প্রযোজক শ্রেণী বুঝে ফেলে যে, এই ধারার গল্প দিয়ে ইউরোপ ও আমেরিকার চলচ্চিত্র বাজার থেকে মুনাফা অর্জন সম্ভব হবে।’১৩ অবশ্য চলচ্চিত্রের নান্দনিক এই ধারাটি স্থায়ী হয়েছিলো ১৯২৪ পর্যন্ত।
সমসাময়িক ফ্রান্সে এ সময় বিকাশ লাভ করে আঁভ-গার্দ চলচ্চিত্র ধারা। ‘আঁভ-গার্দ বস্তুত চলচ্চিত্র-রচনার এক বিশেষ রচনাশৈলী (Style)-এই শৈলীতে সমাজবাস্তবতার উপরিতল যেমন প্রকাশ পেয়েছে তেমনি চরিত্রসমগ্রের অন্তরস্থ স্বরূপ নির্ণয়ের উদ্যোগও নেয়া হয়েছে।’১৪ আসলে আঁভ-গার্দ একক কোনো শিল্পচিন্তা নয়, বরং যেকোনো নতুন শিল্পচিন্তা যা বর্তমানকে পাশ কাটিয়ে আগামীর কথা বলে তাই আঁভ-গার্দ। এক কথায় বললে-আঁভ-গার্দ হচ্ছে বর্তমানে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতকে দেখা, দেখানো। এদিক থেকে পরাবাস্তববাদ, দাদাবাদ, অভিব্যক্তিবাদ সবই এর অন্তর্ভুক্ত। জি. ডুলাকের লা সুরিয়ান্তে মি বুদেৎ (La Souriante Mme Beudet, ১৯২৩) দিয়ে শুরু হয়ে লুই বুনুয়েলের আশিয়ান আন্দালুর (১৯২৯) মধ্য দিয়ে এ ধারা চূড়ান্ত রূপ পায়।
ক্লাসিক হলিউড (১৯২৭—১৯৬৩) :হলিউডের এ পর্বে নির্বাক চলচ্চিত্রের সঙ্গে যোগ হয় শব্দ। শুরু হয় সবাক যুগের যাত্রা; দ্য জাজ সিঙ্গার (১৯২৭) দিয়ে যার পদসূচনা। এরপর থেকে ১৯৬৩ পর্যন্ত সময়কে হলিউডের ইতিহাসে স্বর্ণ যুগ বলা হয়। এ সময়ে স্টুডিও প্রথা হলিউডে জেঁকে বসে। বড়ো পাঁচটি স্টুডিও-ওয়ার্নার ব্রাদার্স, টুয়েনটি সেঞ্চুরি ফক্স, এমজিএম, প্যারামাউন্ট ও আরকেও মূল প্রভাব বিস্তার করে। তবে ১৯৪৮-এ আমেরিকার আদালত পিকচার পেটেন্টস নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। এই প্রথা প্রতিযোগিতামূলক বাজারের অন্তরায় হওয়ায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ফলে অনেক ছোটো প্রতিষ্ঠান চলচ্চিত্রনির্মাণে এগিয়ে আসার সাহস পায়।
সবাক যুগের শুরুর সময়ে হলিউডে সঙ্গীতনির্ভর ‘মিউজিকাল সিনেমা’র জন্ম। আসলে দ্য জ্যাজ সিঙ্গারও ছিলো সঙ্গীতনির্ভর। মিউজিকাল সিনেমার সফলতা দেখে এবার এ ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণের হিড়িক পড়ে যায়। অর্থাৎ আবারো সেই ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি! আর এই ৩০ দশকে আর্থিক মন্দায় পড়ে আমেরিকা। কিন্তু হলিউডে এর প্রভাব পড়তে না দেওয়ার ব্যাপারে চলচ্চিত্র নির্মাণ-প্রতিষ্ঠানগুলো ছিলো সচেতন। ফলে দর্শক ধরে রাখার উদ্দেশ্যে সেক্স, ভায়োলেন্স, হরর, কমেডি এইসব ছবির সয়লাব তখন হলিউডে। শুরু হয় এসবের সংমিশ্রণে চটকদার চলচ্চিত্রনির্মাণ, যাকে হাল আমলে বলা হয় ‘মসলা সিনেমা’। পরবর্তীকালে এই ‘মসলা সিনেমা’ ছড়িয়ে পড়ে সারাবিশ্বে। এখনো সারাবিশ্বে মূলধারার চলচ্চিত্র মানেই ‘মসলা সিনেমা’।
৩০ দশকের শেষে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে। যুদ্ধে অনেক দেশের স্টুডিও ধ্বংস হয়। ফলে সেসব দেশে চলচ্চিত্র রপ্তানির সুযোগ খুলে যায় হলিউডের জন্য। সুযোগটি খুব ভালোভাবেই নেয় তারা। সেই সঙ্গে শুরু হলো প্রচারধর্মী চলচ্চিত্র তৈরির কাজ। মিত্রপক্ষের গুণগান ও সৈনিকদের মনোবল যোগানোর জন্যই এ জাতীয় চলচ্চিত্র নির্মাণ হতো।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ হলিউডে মূলধারার ব্যবসানির্ভর চলচ্চিত্রের পাশাপাশি নতুন ধারার জন্ম দেয়। সমাজ-বাস্তবতা, অন্যায়, অনাচার নিয়ে নির্মাণ হয় নব্য-বাস্তববাদ ধারার চলচ্চিত্র। ১৯৪০ সালে জন ফোর্ডের গ্রেপস্ অব র্যথ দিয়ে শুরু হওয়া পরিবর্তনকে পূর্ণতা দেয় মাইকেল কার্টিজের কাসাব্লাঙ্কা (১৯৪৩)। তবে আমেরিকার ডানপন্থি রাজনীতিকরা এই ধারাটির উদ্ভব ভালোভাবে নেননি। তাদের মতে, ‘এইসব কাজকর্ম আমেরিকার রাষ্ট্রীয় স্বার্থের পরিপন্থী।’১৫ তারা এসব চলচ্চিত্র নির্মাতাদের মধ্যে ‘কমিউনিস্ট’ ছায়া খুঁজতে থাকেন, গঠন করেন ‘হাউস কমিটি ফর আনআমেরিকান অ্যাক্টিভিটিজ’ (১৯৪৫) নামক কমিটি। নির্মাতাদের মধ্যে কমিউনিস্ট খোঁজার কাজ করতে থাকে এই কমিটি। আর এ কমিটিকে সমর্থন করেন না এমন ১৯ নির্মাতাকে সমন পাঠানো হয়; এমনকি কমিটির বিরোধিতা করায় কারাগারে পাঠানো হয় ১০ জনকে। কালো তালিকাভুক্ত করা হয় আরো অনেককে, যারা হলিউডে আর কাজ করার সুযোগ পাননি। এভাবে নব্য-বাস্তববাদ ধারাটির অবসান ঘটে হলিউডে।
হলিউডে নব্য-বাস্তববাদ দাঁড়াতে না পারলেও ইতালিতে তা ঠিকই সফল হয়েছিলো। ১৯৪২-এ ভিসকন্তির ওসেশিয়ন দিয়ে শুরু হয় এ ধারার। অবশ্য ভিসকন্তি এ কাজের শিক্ষা নিয়েছিলেন ফরাসি চলচ্চিত্রনির্মাতা জ্যঁ রেঁনোয়ার সহকারী হিসেবে কাজ করে। ‘ফ্রেঞ্চ পোয়েটিক রিয়ালিস্টিক’ আন্দোলনের কর্মী রেঁনোয়া ১৯৩৪ সালে নির্মাণ করেন নব্য-বাস্তববাদী চলচ্চিত্র টনি। তবে এই ধারার প্রথম সার্থক প্রয়োগ ঘটে ইতালিতে রবার্তো রোসেলিনির রোম ওপেন সিটি (১৯৪৫) দিয়ে। আর ধারাটি শেষ হয় ১৯৫৫ সালে, ডি সিকার দ্য রুফ-এ (The Roof ) এসে। তবে ইতালিতে শেষ হলেও নব্য-বাস্তববাদ ধারাটি ছড়িয়ে পড়ে ফ্রান্স, স্পেন, জাপান এমনকি কলকাতাতেও। নিমাই ঘোষের ছিন্নমূল (১৯৫২) দিয়ে বাংলায় এ ধারার যাত্রা শুরু হয়।১৬
৫০ দশকে ইতালিতে যখন নব্য-বাস্তববাদ স্তিমিত হয়ে পড়ছে তখন ফ্রান্সে নব্য-বাস্তববাদের এক চঞ্চল-অস্থির রূপের উদ্ভব ঘটে। ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানিতে একযোগে এ ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু হয়। ফ্রান্সের চলচ্চিত্র বিষয়ক পত্রিকা ‘কাইয়্যে দ্যু সিনেমা’র সম্পাদকীয় দপ্তরে যাত্রা শুরু হয় ফ্রেঞ্চ নিউ ওয়েভ ধারার। এখানে লক্ষণীয়, আমেরিকায় চলচ্চিত্র বিষয়ক পত্রিকা যখন ‘গ্ল্যামার’ তৈরি করছে, তখন ফ্রান্সে চলচ্চিত্র বিষয়ক পত্রিকা জন্ম দিচ্ছে নতুন ধারার। এই একই সময়ে ৬০ দশকে ফ্রান্সে আরেকটি ধারা বিকাশ লাভ করে। ফরাসি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা জ্যঁ রুশের হাত ধরে ‘সিনেমা ভেরিতে’ নামে নতুন ধারার সূচনা হয়। অবশ্য আমেরিকাতে একই ধারার নামকরণ করা হয় ‘ডিরেক্ট সিনেমা’। এই সিনেমা ভেরিতে বা ডিরেক্ট সিনেমা নির্মাণরীতির দিক থেকে রুশ চলচ্চিত্রনির্মাতা জিগা-ভের্তবের কিনো আই (১৯২৪) থেকে খুব আলাদা কিছু না।১৭
ইউরোপের পাশাপাশি লাতিন আমেরিকাতেও ৫০ দশকে বিভিন্ন চলচ্চিত্র আন্দোলন গড়ে ওঠে। নব্য-বাস্তববাদ ও নবতরঙ্গ দ্বারা প্রভাবিত ব্রাজিলের ‘সিনেমা নোভো’ আন্দোলন এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। ৫০ দশকের প্রথম দিকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন ৬০ দশকে এসে ‘প্রগতিবাদী বৈপ্লবিক চরিত্র ধারণ করে।’১৮ লাতিন আমেরিকার ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, চিলি, বলিভিয়া, কিউবা, কলম্বিয়া, মেক্সিকো প্রভৃতি দেশে উপনিবেশবাদকে প্রতিরোধ করার তাগিদ থেকেই ‘সিনেমা নোভো’ আন্দোলন সংগঠিত হয়।
নব্য-হলিউড (১৯৬৪—১৯৮২) :এ পর্বে হলিউডে নতুন ধারার সূচনা হয়। অবশ্য এ পদক্ষেপও ওই ব্যবসা ধরে রাখার উদ্দেশ্যেই। মূলত ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইতালিয় নব্য-বাস্তবতা, ফরাসি নবতরঙ্গের এবং অন্যান্য ঢেউ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও এসে পড়ে-নতুন প্রজন্মের দর্শক আবিষ্কার করেন বার্গম্যান, বুনুয়েল, কুরোসাওয়ার মতো পরিচালকদের। রুচি ও মূল্যবোধের দিক থেকে নতুন প্রজন্মের দর্শকরা অনেক বেশি সংবেদনশীল হয়ে ওঠে আধুনিক নিরীক্ষামূলক ছবিগুলির প্রতি। স্টুডিয়োর বাইরে তোলা, অতিনাটকীয়তা বর্জিত, আধুনিক মননের ফসল এইসব ছবির পাশে হলিউড ব্যয়বহুল, কিন্তু অন্তঃসারশূন্য, জাঁকজমকভরা ছবির আবেদন ক্রমশ আরও কমে আসতে থাকে।’১৯ তাই হলিউডের নির্মাতারা বাধ্য হন নতুন ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে। মানুষের নৈতিকতাহীন হিংসাচার নিয়ে আর্থার পেন নির্মাণ করেন বনি অ্যান্ড ক্লাইড (১৯৬৭), আর স্ট্যানলি কুব্রিক নির্মাণ করেন সায়েন্স ফিকশন ২০০১ : অ্যা স্পেস ওডেসি (১৯৬৮)। শুরু হয় নব্য-হলিউডের যাত্রা। ধীরে ধীরে হলিউডের চলচ্চিত্রে যোগ হয় আধুনিক ও নাগরিক জীবন, সমাজ-বাস্তবতা, রাজনীতি, রাজনৈতিক হিংসাচার, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস প্রভৃতি বিষয়।
ব্রায়ান ডি-পালমার গ্রিটিংস-এ (১৯৬৮) রাজনৈতিক হিংসাচার, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও ভিয়েতনাম যুদ্ধ নিয়ে সরাসরি তীব্র সমালোচনা করা হয়। তাছাড়া ‘সামাজিক পরিস্থিতির নির্মম বিশ্লেষণ ধরা পড়ে ১৯৬০-এর বা ১৯৭০-এর দশকের বহু ছবিতে।’২০ এতে করে আবারো রাষ্ট্রের কর্তাদের রোষানলে পড়ে চলচ্চিত্র। তবে এবার নির্মাতাদের বাঁচিয়ে দেয় আমেরিকার সুপ্রিম কোর্ট। ১৯৭৩ সালে এক আদেশে চলচ্চিত্রকে মত প্রকাশের সম্পূর্ণ অধিকার দেয় সুপ্রিম কোর্ট।ফলে এ যাত্রায় রক্ষা পান নির্মাতারা। এসবের পাশাপাশি ৬০ দশক থেকেই আমেরিকায় চলচ্চিত্র নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া শুরু হয়, যদিও অনেক আগে থেকেই রাশিয়া, ইতালি প্রভৃতি দেশগুলোতে এ বিষয়ে ইন্সটিটিউট গড়ে ওঠে। পরে ৮০ দশক থেকে হলিউডের চলচ্চিত্রে কম্পিউটার প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়। এ সময় সায়েন্স ফিকশন ঘরানার চলচ্চিত্র ব্যাপক হারে নির্মাণ হতে থাকে।
অন্যদিকে নব্য-উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হিসেবে কিউবায় এই ৬০ দশকে তৃতীয় চলচ্চিত্রের ধারণা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা শুরু হয়। ৭০ দশকের শুরুর দিকে সিনেমা নোভো আন্দোলন থিতিয়ে এলেও এ থেকেই তৃতীয় চলচ্চিত্র উৎসারিত হয়েছে এবং তা ছড়িয়ে পড়ে কিউবাসহ লাতিন আমেরিকা, এশিয়া, আফ্রিকার বহু দেশে।২১ পশ্চিম বাংলায় এ ধারার যাত্রা শুরু নিমাই ঘোষ, বারীণ সাহা, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেনদের হাত ধরে। নাচ-গান-মারপিট সমৃদ্ধ প্রথম চলচ্চিত্র, সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালী (১৯৫৫) নির্মাণের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় চলচ্চিত্র বা ‘আর্ট সিনেমা’র পর এই তৃতীয় চলচ্চিত্রের বিকাশ ঘটে পশ্চিম বাংলায়। ‘‘তৃতীয় চলচ্চিত্র’ একদিকে যেমন জনগণকে সমাজ পরিবর্তনে উদ্বুদ্ধ করার প্রয়োজন অনুভব করে, অন্যদিকে বিষয় হিসাবে রাজনৈতিক ও আর্থনীতিক বাস্তবতাকে বেছে নেয়। প্রথম ও দ্বিতীয় চলচ্চিত্রের যে নন্দনতাত্ত্বিক পরিকাঠামো, তাকেও পুনঃসংজ্ঞায়িত করে। এ-দিক দিয়ে তৃতীয় চলচ্চিত্র কিছুটা আঁভ-গার্দ, কিছুটা ফর্মালিস্ট, কিছুটা কাউন্টার-সিনেমা বলে চিহ্নিত হতে পারে।’২২ বলা হয়, দ্বিতীয় বা ‘আর্ট সিনেমা’র সহনীয় বাস্তবতার বিপরীতে তৃতীয় চলচ্চিত্রে দুঃসহনীয় বাস্তবতাকে দর্শকের সামনে উপস্থাপন করা হয়।
সাম্প্রতিক হলিউড (১৯৮৩—বর্তমান) :হলিউডের বর্তমান সময়টা মূলত প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের মাধ্যমে রচিত। প্রযুক্তির উৎকর্ষ হলিউডে ফিকশন, সায়েন্স ফিকশনসহ বিভিন্ন ধরনের চলচ্চিত্রে নতুন রূপ দিয়েছে। হলিউডে এমন চলচ্চিত্র প্রায় নেই, যে চলচ্চিত্রে প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে বাস্তবতাকে, কখনো কখনো অতি-বাস্তবতাকে দর্শকের সামনে হাজির করা হয় না। এ কথা যেমন জুরাসিক পার্ক (১৯৯৩) এর জন্য সত্য, তেমনি টাইটানিক (১৯৯৭) বা ফরেস্ট গাম্প (১৯৯৫) এর জন্যও সত্য। আর হালের সুপারম্যান, স্পাইডারম্যান সিরিজ তো রয়েছেই। এই ফাঁকে বলে রাখি, সুপারম্যানই হোক আর স্পাইডারম্যানই হোক, তাদের অতি-মানবীয় ক্ষমতা (আকাশে ওড়া, বড়ো বড়ো বিল্ডিং হাতে তুলে নেওয়া প্রভৃতি) কিন্তু ‘রামায়ণ’-এর হনুমানের চেয়ে বেশি নয়। অর্থাৎ হাজার বছরের পুরনো হনুমানের সঙ্গে হালের সুপারম্যানের মিলে যাওয়া কাকতালীয়ই বটে!
সে যাহোক, চলচ্চিত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার কি শুধু চলচ্চিত্রকে আরো বাস্তব করে তুলতে নাকি কাহিনীতে নতুনত্ব দিতে না পারার দুর্বলতা ঢাকতে? বলতে চাচ্ছি, হলিউডের চলচ্চিত্রগুলোতে দিনে দিনে শুধু প্রাযুক্তিক চমকই যুক্ত হয়েছে। সেই আদি যুগের ওয়েস্টার্ন, আন্ডারওয়ার্ল্ড চলচ্চিত্রের আধুনিক রূপই আজকের আয়রন ম্যান থ্রি, ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস সিক্স। তাছাড়া লেখার শুরুতে যে কাহিনীগুলো বর্ণনা করা হয়েছে সেগুলোর মধ্যে কি এমন কোনো পার্থক্য আছে, দৃশ্যায়ন ছাড়া? পার্থক্য শুধু কোনোটায় কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র মারপিট করছে, কোনোটায় অত্যাধুনিক অস্ত্র নিয়ে মানুষ, তো কোনোটায় আবার অ্যানিমেটেড কার্টুন!
আর সাম্প্রতিক হলিউডে প্রাযুক্তিক উৎকর্ষের পাশাপাশি এর সঙ্গে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের সম্পর্কও চূড়ান্ত রূপ পেয়েছে। হলিউডের সঙ্গে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের সম্পর্কের সূচনা অবশ্য ৬০ দশকে গালফ-ওয়েস্টার্ন (ইস্পাত, প্লাস্টিক, খনন প্রতিষ্ঠান) নামে এক প্রতিষ্ঠানের প্যারামাউন্ট কোম্পানিকে অধিগ্রহণের মাধ্যমে। এরপর একে একে বিভিন্ন চলচ্চিত্র নির্মাণ-প্রতিষ্ঠানকে কিনে নেয় বিভিন্ন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান। ৮০ দশকের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ১৭০০ দৈনিক, ১১০০ সাময়িকী, নয় হাজার রেডিও, এক হাজার টিভি, ২৫০০ প্রকাশনা সংস্থা ও সাতটি বড়ো চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের মালিক মাত্র ৫০টির মতো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান।২৩ অর্থাৎ আমেরিকার জনগণ এই ৫০ জন যা দেখাবে, শোনাবে, পড়াবে তা-ই দেখতে, শুনতে ও পড়তে বাধ্য।জনগণের চাওয়া এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়। ‘এই পরিস্থিতিতে চলচ্চিত্র শিল্পও বহুজাতিক সংস্থার নানা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য পূরণে নিয়োজিত (হয়)।’২৪ উদাহরণ হিসেবে বিভিন্ন চলচ্চিত্রের চরিত্রের নামে বাজারজাত করা পণ্যের কথা বলা যায়। যেমন, ‘‘স্টার ওয়ারস্’ ছবির ক্ষেত্রে খেলনা ও ভিডিও গেম-এর ব্যবসায় মূল ছবির চেয়েও বেশি আয় হয়েছে প্রযোজক সংস্থার।’২৫ তাহলে কি চলচ্চিত্র দেখিয়ে আয় নাকি চলচ্চিত্রে দেখানো পণ্য বিক্রির আয়ই প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল উদ্দেশ্য? আবার যুদ্ধ নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্রের ব্যবসার জায়গা তো আরো ভয়ঙ্কর-যুদ্ধাস্ত্র বিক্রি! চলচ্চিত্রগুলো অবশ্য সরাসরি যুদ্ধাস্ত্রের ‘ব্র্যান্ডিং’ করে না, বরং যুদ্ধকে ‘হালাল’ প্রমাণ করে। ফলে যুদ্ধ হতে থাকে আর পাশাপাশি চলে যুদ্ধাস্ত্রের বিক্রি!
ব্যবসার পাশাপাশি জনমত গঠনেও হলিউড কাজ করেছে তার শুরু থেকেই। ‘দুটি বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী অস্থির সময়ে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ‘ঠাণ্ডা লড়াই’-এর যুগে হলিউডের বহু ছবিতেই যে মার্কিন বিদেশনীতির ছায়া পড়েছে, সেকথা চলচ্চিত্রের ঐতিহাসিকেরা আমাদের জানিয়েছেন।’২৬ আর বর্তমানে একই কাজ করা হচ্ছে আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধকে জনগণের কাছে ‘হালাল’ করতে। এক্ষেত্রে অস্কার জয়ী দ্য হার্ট লকার (২০০৮), স্পেশাল ফোর্স (২০১১ ফ্রান্স/২০১২ যুক্তরাজ্য) প্রভৃতি চলচ্চিত্রের কথা বলা যেতে পারে। ইরাক, আফগানিস্তানের মতো দেশগুলোতে আমেরিকার সেনারা কীভাবে মরণপণ যুদ্ধ করছে মানুষকে বাঁচাতে তা-ই এ চলচ্চিত্রগুলোর মূল বক্তব্য। কিন্তু ওই দেশগুলোতে আসলে কী হচ্ছে তা সচেতন মানুষ মাত্রই জানেন।
বাছাইকৃত চলচ্চিত্র ও কয়েকটি প্রশ্ন
উপরে যে তিনটি চলচ্চিত্রের কথা বলা হয়েছে তার কাহিনী নিয়ে আর নতুন করে কিছু বলার নেই। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই কাহিনীগুলো দেখানোর উদ্দেশ্য কী? চলচ্চিত্রে একটি গল্প থাকে, আর নির্মাতার উদ্দেশ্য থাকে তা চিত্তাকর্ষক করে তোলা, যাতে দর্শক তা ‘খায়’।আর বাছাইকৃত চলচ্চিত্র তিনটি দর্শক খেয়েছেও! আয়রন ম্যান থ্রির কথাই ধরুন; ২০১৩ সালের ১৪ এপ্রিল মুক্তি পেয়ে পাঁচ মাসে (২৯ আগস্ট ২০১৩ পর্যন্ত) একশো ২১ কোটি ডলার আয় করে সর্বকালের সেরা ব্যবসাসফল চলচ্চিত্রের তালিকায় পঞ্চম স্থান দখল করেছে। অন্যদিকে ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস সিক্স মুক্তির প্রথম চার মাসে ৭৮ কোটি ও ডেসপিকেবল মি টু মুক্তির প্রথম তিন মাসেই ৮০ কোটি ডলার আয় করেছে। বলা যায়, লোকে চলচ্চিত্রগুলো শুধু খায়নি, ‘গিলেছেও’! কিন্তু চলচ্চিত্র তিনটির মূল বক্তব্যে তো তেমন কোনো পার্থক্য নেই। তিনটি চলচ্চিত্রের একই কথা-আমেরিকার জনগণ সম্ভাব্য সন্ত্রাসী হামলার শিকারে পরিণত হতে পারে। এই সন্ত্রাসীগোষ্ঠী দেশি-বিদেশি উভয় ধরনের হতে পারে। আর এই সন্ত্রাসী হামলা ঠেকাতে সদা তৎপর মার্কিন প্রশাসন। এজন্য তারা যে নানা প্রকল্পও গ্রহণ করেছে তা দেখা যায় ডেসপিকেবল মি টু ও আয়রন ম্যান থ্রি-তে। ‘আয়রন ম্যান’ তৈরি কিংবা ডেসপিকেবল মি টু-এর ছিনতাই হওয়া রাসায়নিক পদার্থ এমনই প্রকল্প। আর এমন সব প্রকল্প দেখানোর উদ্দেশ্য নিশ্চয়ই ‘মানুষকে এমন যুদ্ধবাজ করে তোলা, যাতে নিজেদের ট্যাক্সের পয়সা সামরিক খাতে খরচ হতে দেখলে মানুষ যেন আর আপত্তি না করে।’২৭ অবশ্য এটা শুধু যে মানুষকে যুদ্ধবাজ করে তোলে তা নয়, তার মানসিক ‘নিরাপত্তা’ও নিশ্চিত করে। আর চলচ্চিত্রগুলো কেনো যুদ্ধ, সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কা, সামরিকায়নকে গুরুত্ব দেয় তার উত্তর পেতে হলে আরো গভীরে যেতে হবে।
আলোচ্য চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে আয়রন ম্যান থ্রির নির্মাতা মারভেল মুভিজ। এটা আবার ওয়াল্ট ডিজনি কোম্পানির মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। আর ডিজনি হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো বিনোদন প্রতিষ্ঠান—যার পার্ক, রিসোর্ট, স্টুডিও প্রভৃতি ব্যবসা রয়েছে। আয়রন ম্যান সিরিজের সঙ্গে আবার প্যারামাউন্টেরও প্রদর্শন সংক্রান্ত স্বত্ব রয়েছে। এই প্যারামাউন্টের মাতৃসংস্থা ভায়াকম কোম্পানি। এই ভায়াকম-এর অধিকাংশ শেয়ারের মালিক ন্যাশনাল অ্যামিউজমেন্টস্ আবার সিবিএস কর্পোরেশনেরও বড়ো অংশীদার। আর ভায়াকম হচ্ছে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান।
অন্যদিকে ডেসপিকেবল মি টু ও ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস সিক্স-এর নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ইউনিভার্সাল পিকচারস্, যার মালিক কমকাস্ট কর্পোরেশন। এই কমকাস্ট আয়ের দিক থেকে বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো গণমাধ্যম ও টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান। পাশাপাশি এরা নিরাপত্তা প্রযুক্তি যেমন বার্গলার অ্যালার্ম, সার্ভেইল্যান্স ক্যামেরা, ফায়ার অ্যালার্ম প্রভৃতি সরবরাহ করে। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে বিনোদন, গণমাধ্যম, চলচ্চিত্র, নিরাপত্তা-সবই এক ছাতার নিচে আশ্রয় নিয়েছে।আর তাই গীতি আরা নাসরীন যখন বলেন, ‘মূলধারার গণমাধ্যম মূলত কর্পোরেট গণমাধ্যম, বিশাল সংস্থাগুলো তাদের নিয়ন্ত্রণ করে এবং তাদের এজেন্ডা প্রসারের কাজেই গণমাধ্যম ব্যবহৃত হয়। কর্পোরেট এলিটকূল গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে মস্তিষ্ক ধোলাইয়ের জন্য, মানুষকে তথ্য দান বা সচেতন করে তোলার জন্য নয়।’২৮ তখন চলচ্চিত্রগুলোও এই বক্তব্যের বাইরে যেতে পারে না।
অনেকক্ষণ তো হলিউডে ঘুরলাম। এবারে নিজেদের এলাকার (ঢালিউড) সঙ্গে ওদের কিছু মিল পেলাম কি না তা একটু দেখি। বাছাইকৃত চলচ্চিত্রগুলোর মূল বক্তব্য সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই নিয়ে আমাদের দেশেও অনেক চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়েছে। আসলে আমাদের অধিকাংশ চলচ্চিত্রের বিষয়ও তো সন্ত্রাস, চোরাকারবার, রাজনীতি। এর মধ্যে ২০০৯ সালে মুক্তি পাওয়া খোঁজ : দ্য সার্চ-এর কথা ধরা যাক। যদিও খোঁজ : দ্য সার্চ-এর অভিনয়শৈলী, ব্যবহৃত কম্পিউটার অ্যানিমেশনের নানা ত্রুটি নিয়ে আমরা সমালোচনা করি, অথচ একই ধরনের প্রযুক্তির কারিকুরি ও চরিত্রগুলোর আগ্রাসী অভিনয়ে পরিপূর্ণ হলিউডের একই গল্প দেখে আমরা বাহবা দিই। অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র ডেসপিকেবল মি টু-এর ‘মিনিয়ন’দের কা- দেখে হাততালি দিই। এই ‘মিনিয়ন’ হচ্ছে বাংলা চলচ্চিত্রে যেমন নায়কের সঙ্গে সহকারী ‘জোকার’ থাকে তেমনই সহ-অভিনেতা, যারা নানা কা-কীর্তি করে লোক হাসায়।
মূলত ‘টম অ্যান্ড জেরি’ যেমন ছোটোদের কার্টুন, অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রকে তেমন বড়োদের কার্টুন বলা যেতে পারে। তবে এটাও ঠিক যে, বর্তমানে প্রযুক্তিকে ছোটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই, আর হলিউডের সঙ্গে প্রযুক্তিতে পাল্লা দেওয়াও আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু এর বাইরে কাহিনীর ক্ষেত্রে হলিউড, ঢালিউডে পার্থক্য তো সামান্যই! তাহলে হলিউডকে যে শ্রেষ্ঠত্বের মালা পরিয়ে দেওয়া হয়, তা কিসের ভিত্তিতে? হলিউডের বাজার বড়ো, তাই সে শ্রেষ্ঠ!
এবার প্রশ্ন, হলিউড বাজার ধরলো কীভাবে? মূলত আমেরিকার লোকজনের সামনে এসব দেখা ছাড়া অন্য কোনো রাস্তা খোলা নেই। কারণ হলিউডের বড়ো বড়ো সব চলচ্চিত্র নির্মাণ-প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রক কয়েকটি বড়ো বহুজাতিক কোম্পানি, যা আগেই বলেছি। ফলে তারা যা দেখাবে লোকে তাই দেখতে বাধ্য। তাছাড়া চলচ্চিত্রগুলোর প্রচার চালানোর জন্য বহুজাতিকের নিয়ন্ত্রণাধীন গণমাধ্যম তো আছেই। সাংস্কৃতিক দিক থেকে আমাদের সঙ্গে পশ্চিমের কোনো মিল না থাকলেও শুধু ‘প্রভু’দের চলচ্চিত্র বলেই হলিউডের চলচ্চিত্র এদেশের ‘মাল্টিপ্লেক্সে’ মুক্তি পায়। আমরাও ‘কোক’, ‘পপকর্ন’ গলাধঃকরণ করতে করতে তা দেখি, আর দেশিয় চলচ্চিত্র সম্পর্কে মন্তব্য করি-‘ঢাকাই সিনেমা কোনো সিনেমা হলো!’
নায়ক-নায়িকা সমাচার
নায়ক-খলনায়ক দ্বন্দ্ব, সঙ্গে নায়কের প্রতি নায়িকার অকুণ্ঠ ভালোবাসা বেশিরভাগ চলচ্চিত্রের গল্পকে এগিয়ে নেয়; এ কথা যেমন ঢালিউডের ‘অচলচ্চিত্র’ বা ‘ছিঃনেমা’র জন্য সত্য, তেমনি হলিউডের ‘বিগ হিট’ চলচ্চিত্রের জন্যও সত্য। ঢালিউডের পার্শ্ব-নায়িকাও নায়ককে বাঁচাতে প্রাণ দেয়; হলিউডেও তাই, ট্যাঙ্ক থেকে মাঝ রাস্তায় ফেলে দেওয়া নায়িকা লিটিকে বাঁচাতে নায়ক ডমিনিককে জীবনের ঝুঁকি নিতে হয় (ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস সিক্স) কিংবা নায়িকাকে বাঁচাতে মিসাইলে উঠে বসে নায়ক গ্রু (ডেসপিকেবল মি টু)। আমি কিন্তু বলছি না, নায়ক-নায়িকার প্রেম, খলনায়কের সঙ্গে দ্বন্দ্ব বাদ দিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে হবে। এগুলো ছাড়া শুধু চলচ্চিত্র নয়, অন্য কোনো শিল্পও হয়তো অসম্পূর্ণ হবে। তবে কথা হচ্ছে, ঢালিউডের চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে বলা হয় নায়কের ক্ষমতা বাস্তবতার সীমাকে অতিক্রম করে। কিন্তু হলিউডে বাস্তবতার এমন কোন্ বিশেষ রূপ দর্শক দেখতে পায়?
ঢালিউডে নায়ক খালি হাতে ১০-১৫ জনকে মেরে ‘শুইয়ে’ দেয়, আর হলিউডের নায়ক এ কাজ করে অস্ত্র হাতে। আয়রন ম্যান থ্রি-তে নায়ক টনি, তাকে ধরতে আসা কিলিয়ানের লোকদেরকে মেরে আহত করে আয়রন স্যুট পরে বা ডেসপিকেবল মি টু-তে নায়ক গ্রু ‘লিপস্টিক টিজার’ দিয়ে খলনায়ক এল মাচোকে কুপোকাত করে বা ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস সিক্স-এ নায়কের দলের সঙ্গে খলনায়কের দলের ভারী ভারী অস্ত্র নিয়ে লড়াই হয়-পার্থক্য তো এটুকুই! তাহলে হলিউডের শ্রেষ্ঠত্ব কি এতেই?
মারামারি তো হলো এবার একটু প্রেম দেখে আসি। আমাদের চলচ্চিত্রে নায়ক-নায়িকার প্রেম বোঝাতে আমরা গানের চিত্রায়ণ দেখাই।আমাদের ‘সুশীল’ দর্শকদের কাছে এটা নাকি হাস্যকর, অবাস্তব। বিপরীতে হলিউড যখন প্রেম বোঝাতে নায়ক-নায়িকার চুম্বন ও ঘনিষ্ঠ দৃশ্য দেখায় তখন তা বাস্তব ও ‘সিরিয়াস’। আয়রন ম্যান থ্রি শুরুর দুই মিনিটের মাথায় নায়ক টনি পার্শ্ব-নায়িকা উদ্ভিদবিজ্ঞানী ড. মায়াকে চুমু খান, তার সঙ্গে রাত কাটান। আবার ডেসপিকেবল মি টু-তে একেবারে শেষদৃশ্যে নায়ক গ্রু নায়িকাকে চুমু খান। অর্থাৎ, প্রেমের অন্য নাম ‘যৌনতা’! অথচ ঢালিউডে এই দৃশ্যই হয়ে যায় ‘অশ্লীল’। তবে এটা ঠিক, ঢালিউডে যে সময় কাটপিসনির্ভর চলচ্চিত্র (২০০০-২০০৬ সাল পর্যন্ত) চলছিলো তার পরিপ্রেক্ষিতটা আলাদা ছিলো।
হলিউড, বলিউড কিংবা ঢালিউড সব জায়গাতে চলচ্চিত্রের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো নারী, একটু নির্দিষ্ট করে বললে নারী-শরীর। সবগুলো ইন্ডাস্ট্রিতেই এই গুরুত্বপূর্ণ উপাদানটি অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যবহার হয় নায়িকা চরিত্রে। নায়িকাই হয়ে ওঠে এসব চলচ্চিত্রের সবচেয়ে শক্তিশালী চরিত্র। এ যেমন ঢালিউড-বলিউডের জন্য সত্য, হলিউডের বেলায়ও তাই! ধরুন, আয়রন ম্যান থ্রির কথা। চলচ্চিত্রটিতে গুরুত্বপূর্ণ নারী চরিত্র দুই জন-নায়িকা ও পার্শ্ব-নায়িকা। এর বাইরে আর যে নারীদের দেখা যায় তার মধ্যে কয়েকজন খলনায়কের দলের সদস্য, যাদেরকে সে ভাইরাস প্রয়োগ করে ‘কিলিং মেশিন’-এ পরিণত করেছে। আর বাকিরা সাজানো খলনায়ক মান্দারিন-এর শয্যাসঙ্গী। মান্দারিনকে সাজানো খলনায়ক বলার কারণ, সে একজন অভিনেতা যাকে খলনায়ক কিলিয়ান দুনিয়ার সামনে সন্ত্রাসী হিসেবে প্রচার করে।
অন্যদিকে ডেসপিকেবল মি টু-তে নারী চরিত্রে দেখা যায়, নায়িকা ও নায়কের পালিত মেয়েদের। এর বাইরে আরেকজন নারীকে দেখা যায় নায়কের সঙ্গে ‘ডেটিং’-এ। আর ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস সিক্স-এ নারীদের দেখা যায় নায়কের দলের সদস্য হিসেবে। চলচ্চিত্রগুলোতে নায়িকাদেরকে নায়কের সমকক্ষ দেখানোর চেষ্টা করা হলেও কর্তৃত্ব কিন্তু নায়কের হাতেই। ডেসপিকেবল মি টু-তে নায়ক গ্রু তার পালিত মেয়েদেরকে লড়াইয়ের ময়দানে নিয়ে যেতে চায়নি। তবে মেয়েরা খলনায়কের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অংশ নেয় গ্রুর বন্ধু ড. নেফারিওর সঙ্গে গিয়ে। অর্থাৎ, পুরুষ লড়াইয়ের ময়দানে একা যেতে পারলেও নারীকে কোনো না কোনো পুরুষের সাহায্য নিতেই হবে। আবার আয়রন ম্যান থ্রি-তে নায়ক পার্শ্ব-নায়িকাকে ছেড়ে গেলেও নায়ককে বাঁচাতে সে প্রাণ দেয়। অর্থাৎ পুরুষ নায়কের প্রতি তার মহান ভালোবাসার প্রমাণ করতে হয় প্রাণ দিয়ে। তবে নায়ক কিন্তু তাকে ছেড়ে দিব্যি অন্য নারীর সঙ্গে সুখেই দিন কাটাচ্ছিলো। আর নারীদের সবসময় ত্যাগ স্বীকারের কাহিনী ঢালিউড-বলিউডে ভুরি ভুরি। এছাড়া ঢালিউড-বলিউডের মতো হলিউডের এই চলচ্চিত্রগুলোতেও পর্দায় নারী চরিত্রের উপস্থিতি চলচ্চিত্রের মোট সময়ের এক-তৃতীয়াংশও হবে না। তাহলে নারী স্বাধীনতার ‘অগ্রদূত’রা তাদের চলচ্চিত্রে নারীর জন্য কী করলেন, নায়ক আর খলনায়কের শয্যাসঙ্গী ছাড়া!
এছাড়া হলিউডে পর্দার সামনে নারীর উপস্থিতি যতোটা বর্ণিল, পর্দার পিছনে ততোটাই বিবর্ণ।হলিউডের এই রঙের বাজারে আজ পর্যন্ত অনেক নারীই নিজেকে বিকিয়েছে নায়িকা হিসেবে। কিন্তু অন্য কাজে এখানে তেমন কোনো নারীকে দেখা গেছে কি? অন্য কাজ বলতে বোঝাচ্ছি চলচ্চিত্র নির্মাণ। চরম ‘প্রতিক্রিয়াশীল’, ‘নারী স্বাধীনতা’ না দেওয়া ইরান বা সৌদি আরবের নারীরা চলচ্চিত্র নির্মাণ করে বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হচ্ছেন। অথচ হলিউড?
ব্যবসার যতো কৌশল
চলচ্চিত্র যেমন শিল্প, তেমনি বাণিজ্যও। যুগে যুগে চলচ্চিত্র যেমন মানুষকে লড়াইয়ের অনুপ্রেরণা দিয়েছে, জীবন নিয়ে ভাবিয়েছে, তেমনি ব্যবসায়ীদের টাকার ক্ষুধাও মিটিয়েছে। লাতিন আমেরিকা বা পশ্চিমবাংলার তৃতীয় চলচ্চিত্র যেমন আমাদেরকে মানব জীবনের ‘অসহনীয়’ বাস্তবতার সামনে দাঁড় করায়, তেমনি হলিউড-বলিউড-ঢালিউডের বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র ব্যবসায়ীদের কাছে সোনার ডিম দেওয়া হাঁস হয়ে যায়। হলিউড তো আরো এক ধাপ এগিয়ে; সেই শুরু থেকে তারা চলচ্চিত্রকে টাকা আয়ের রাস্তা ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে চাননি, পারেননি। টাকা, আরো টাকা আয়ের জন্য তারা চলচ্চিত্রকে যেভাবে পেরেছেন, যতোভাবে পেরেছেন ব্যবহার করেছেন, যখন যে ‘মসলা’ প্রয়োজন যোগ করেছেন।
আয়রন ম্যান থ্রি ও ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস সিক্স অ্যাকশন ধারার চলচ্চিত্র, আর ডেসপিকেবল মি টু মূলত কমেডি হলেও অ্যাকশন আছে কিছু। এ সবই করা হয়েছে দর্শক চাহিদার কথা মাথায় রেখে। অবশ্য দর্শক এর বাইরে অন্য কিছু চায় কি না তা নির্ণয়ের কোনো চেষ্টা হলিউডের নির্মাতারা করেননি। করলে নিশ্চয়ই এক ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস নিয়ে ছয়টি চলচ্চিত্র নির্মাণ হতো না। একই বক্তব্য প্রযোজ্য আয়রন ম্যান ও ডেসপিকেবল সিরিজের জন্যও। শুধু এগুলোই নয় হলিউডের আরো অনেক চলচ্চিত্রের সিরিজ রয়েছে। আর সিরিজ চলচ্চিত্র নির্মাণে ব্যবসা ছাড়া আর তো কারণ দেখি না। ব্যবসার এই কৌশল হলিউডের আদি পর্বেও ছিলো। এখন শুধু উপস্থাপনের কৌশল পাল্টে নাম হয়েছে সিরিজ চলচ্চিত্র।
আর ব্যবসার এই ধারাবাহিকতায় এতদিন শুধু চলচ্চিত্রের ‘সিক্যুয়াল’ নির্মাণ হলেও, এবার ‘প্রিকুয়েল’ নির্মাণ করতে যাচ্ছে ডেসপিকেবল মির নির্মাতারা। চলচ্চিত্রটির জনপ্রিয় চরিত্র মিনিয়নগুলোকে নিয়ে হবে এটি। এতদিন চলচ্চিত্র সফল হলে তার সিক্যুয়াল নির্মাণ করা হতো। এবার চরিত্র সফল হয়েছে, অতএব তাকে নিয়েই চলচ্চিত্র নির্মাণ করো। ব্যবসার ‘নতুন দিগন্ত’ উন্মোচন হলো আর কি!
এগুলোর বাইরে আরো বেশকিছু পদক্ষেপ হলিউডের নির্মাতারা নেন তাদের চলচ্চিত্রকে মানুষের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলতে। চলচ্চিত্রের প্রচার-প্রচারণায় কমিক বই, ভিডিও গেমস, ব্যবহৃত কস্টিউম-এর প্রদর্শনী, বিক্রি প্রভৃতি আয়োজন। আয়রন ম্যান থ্রি, ডেসপিকেবল মি টু ও ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস সিক্স-এর কাহিনীর ওপর ভিত্তি করে মুঠোফোনের জন্য ভিডিও গেমস বের হয়েছে। আয়রন ম্যান থ্রির প্রচারে নির্মাণ করা হয়েছে ‘বিকাম আয়রন ম্যান’ সিম্যুলেটর গেমটি। সিম্যুলেটর গেমে খেলোয়াড় লাফ-ঝাঁপের বাস্তব অনুভূতি লাভ করেন। পাশাপাশি আয়রন ম্যান থ্রি নামে মুঠোফোনের জন্যও গেম তৈরি করা হয়েছে। একইভাবে ডেসপিকেবল মি টু-এর জন্য ‘ডেসপিকেবল মি : মিনিয়ন রাশ’ ও ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস সিক্স-এর জন্য নির্মাণ করা হয়েছে ‘কার টাউন’ গেমটি। অবশ্য চলচ্চিত্রের প্রচার-প্রচারণার এই পদ্ধতি এখন বলিউডও অনুসরণ করছে। যেমন কৃষ থ্রি চলচ্চিত্রের গেম এখন বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। এই গেম চলচ্চিত্রকে মানুষের হাতে হাতে পৌঁছে দেয়। ফলে প্রচার-প্রচারণাটা খুব ভালো হয়, আর প্রচারেই তো প্রসার!
এছাড়া আঞ্চলিক বাজার ধরার জন্য চলচ্চিত্রগুলো নির্দিষ্ট দেশের চাহিদাকে প্রাধান্য দিয়ে কিছু অতিরিক্ত দৃশ্যও দেখায়। ব্যাপারটা অনেকটা পত্রিকার বিভিন্ন এডিশনের মতো আর কি! যেমন আয়রন ম্যান থ্রি চিনের দর্শকদের জন্য অতিরিক্ত কয়েক মিনিটের দৃশ্য দেখায়, যেখানে নায়ক একজন চিনা বিজ্ঞানীর সঙ্গে ফোনালাপ করেন। পাশাপাশি এ সময় চিনা কিছু পণ্যও এ দৃশ্যে দেখানো হয়, যাকে ওই পণ্যের বিজ্ঞাপনও বলা যায়। অর্থাৎ, যাই করা হোক না কেনো, মূল কথা পুঁজি।
হাল আমলে প্রচার-প্রচারণার আরেকটি নতুন জায়গা হয়ে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। আর যেকোনো কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের মতো হলিউডও এর ব্যবহারে পিছিয়ে নেই। আয়রন ম্যান থ্রির প্রচারের জন্য ‘ফেইসবুক’-এ খোলা হয় ‘আয়রন ম্যান থ্রি : আর্মর আনলক’ পাতাটি। এ পাতায় দর্শকরা চলচ্চিত্র মুক্তির আগেই ‘আয়রন ম্যান’-এর নতুন পোশাক কেমন হবে তা দেখতে পান। আর এদিক থেকে আরো এক ধাপ এগিয়ে ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস সিক্স। তারা তাদের ফেইসবুক পাতায় দর্শক মতামতের ভিত্তিতে চলচ্চিত্রের ‘টাইটেল’ নির্বাচন এবং নায়িকা চরিত্র ‘লিটি অর্টিজ’কে ফিরিয়ে আনে, যাকে সিরিজের পূর্ববর্তী এক চলচ্চিত্রে নিহত হতে দেখা যায়। ভাবটা এমন-দর্শক, আপনি কী চান আওয়াজ দেন, আমরা তাই হাজির করবো!
‘ইউ ডোন্ট নো মি, ইউ আর অ্যাবাউট টু...’
উপরের অসমাপ্ত বাক্যটি দিয়ে ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস সিক্স সমাপ্ত হয় (বাক্যের বাকি অংশ জানতে আপনাকে চোখ রাখতে হবে সিরিজের পরবর্তী চলচ্চিত্রে)। চলচ্চিত্রটির শেষ দৃশ্যে দেখা যায়, নায়কের দলের এক সদস্যকে খুন করে চলে যান আসন্ন চলচ্চিত্রটির খলনায়ক। অর্থাৎ চলচ্চিত্র শেষ করছি, কিন্তু শেষ নয়! হলিউড আজ পর্যন্ত এ কাজটাই করে এসেছে। কোনো কিছুই শেষ করেনি। যেখান থেকে পুঁজি এসেছে তাকেই ধরে রেখেছে যুগ যুগ।
তবে এ কথা অনস্বীকার্য যে, হলিউড চলচ্চিত্র প্রযুক্তিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে; এটা চলচ্চিত্র নির্মাণ ও প্রদর্শন দুদিক থেকেই। পাশাপাশি মাল্টিপ্লেক্স নির্মাণ ও উন্নত প্রদর্শন ব্যবস্থার মাধ্যমে চলচ্চিত্রকে বিলাসবহুল পণ্যে পরিণত করেছে। অন্যান্য পণ্যের মতো চলচ্চিত্রও তাদের কাছে একটি পণ্য, যেখান থেকে মুনাফা আসাটাই মূল কথা। আর এই মুনাফা করেই তো হলিউড আজ চলচ্চিত্র-জগতে সর্বশ্রেষ্ঠ!
লেখক : মাহামুদ সেতু, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
write2hasan.ru@gmail.com
তথ্যসূত্র
১. http://en.wikipedia.org/wiki/2013_in_film
২. বসু, অর্ণব (২০০৯ : ১০০); ‘হলিউড : প্রথম ৫০ বছর’; শতবর্ষে চলচ্চিত্র ২; সম্পাদনা-নির্মাল্য আচার্য্য ও দিব্যেন্দু পালিত; আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি., কলকাতা।
৩. প্রাগুক্ত; বসু, অর্ণব (২০০৯ : ১০১)।
৪. প্রাগুক্ত; বসু, অর্ণব (২০০৯ : ১০৩)।
৫. প্রাগুক্ত; বসু, অর্ণব (২০০৯ : ১০৯)।
৬. প্রাগুক্ত; বসু, অর্ণব (২০০৯ : ১০৯)।
৭. প্রাগুক্ত; বসু, অর্ণব (২০০৯ : ১১২)।
৮. প্রাগুক্ত; বসু, অর্ণব (২০০৯ : ১১২)।
৯. রায়, সত্যজিৎ (১৯৮২ : ২৭); ‘সোভিয়েত চলচ্চিত্র’; বিষয় : চলচ্চিত্র; আনন্দ পাবলিশার্স লি., কলকাতা।
১০. প্রাগুক্ত; রায়, সত্যজিৎ (১৯৮২ : ৩১)।
১১. প্রাগুক্ত; রায়, সত্যজিৎ (১৯৮২ : ৩১)।
১২. আউয়াল, সাজেদুল (২০১১ : ৬৬৩); চলচ্চিত্রকলার রূপ-রূপান্তর; দিব্যপ্রকাশ, ঢাকা।
১৩. প্রাগুক্ত; আউয়াল, সাজেদুল (২০১১ : ৬৮)।
১৪. প্রাগুক্ত; আউয়াল, সাজেদুল (২০১১ : ৭০)।
১৫. প্রাগুক্ত; বসু, অর্ণব (২০০৯ : ১২৫)।
১৬. প্রাগুক্ত; আউয়াল, সাজেদুল (২০১১ : ৭৯)।
১৭. প্রাগুক্ত; রায়, সত্যজিৎ (১৯৮২ : ৩২)।
১৮. প্রাগুক্ত; আউয়াল, সাজেদুল (২০১১ : ৮৬)।
১৯. দাশশর্মা, বীরেন (২০০৯ : ১৩০); ‘হলিউড : বিগত ৫০ বছরের সংকট ও পরিবর্তন’; শতবর্ষে চলচ্চিত্র ২; সম্পাদনা-নির্মাল্য আচার্য্য ও দিব্যেন্দু পালিত; আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি., কলকাতা।
২০. প্রাগুক্ত; দাশশর্মা, বীরেন (২০০৯ : ১৩১)।
২১. প্রাগুক্ত; আউয়াল, সাজেদুল (২০১১ : ৮৯)।
২২. প্রাগুক্ত; আউয়াল, সাজেদুল (২০১১ : ৯১)।
২৩. প্রাগুক্ত; দাশশর্মা, বীরেন (২০০৯ : ১৩২)।
২৪. প্রাগুক্ত; দাশশর্মা, বীরেন (২০০৯ : ১৩৩)।
২৫. প্রাগুক্ত; দাশশর্মা, বীরেন (২০০৯ : ১৩৩)।
২৬. প্রাগুক্ত; দাশশর্মা, বীরেন (২০০৯ : ১৩৪)।
২৭. নাসরীন, গীতি আরা (২০১৩ : ৩০৮); ‘যুদ্ধবাজ সাংবাদিকতা বনাম মুক্ত-মিডিয়া মিথ’; মিডিয়া সমাজ সংস্কৃতি; সম্পাদনা-ফাহমিদুল হক ও আ-আল মামুন; আগামী প্রকাশনী, ঢাকা।
২৮. প্রাগুক্ত; নাসরীন, গীতি আরা (২০১৩ : ৩০৬)।
বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৪ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের ষষ্ঠ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন