Magic Lanthon

               

আমজাদ হোসেন

প্রকাশিত ১৭ ডিসেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

‘এখনতো সংস্কৃতি নির্বাসনে, তাই রাজনীতিতে আছে শুধুই দুর্নীতি’

আমজাদ হোসেন


আমজাদ হোসেন; অভিনেতা, পরিচালক, প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার, কাহিনীকার, সংলাপকার, গীতিকার, নাট্যকার, গল্পকার, ঔপন্যাসিক-শিল্প-সাহিত্যের সব শাখায় তার বিচরণ চোখে পড়ার মতো। জন্ম ১৪ আগস্ট ১৯৪২ জামালপুরে। সাহিত্য চর্চার সূত্রপাত কিশোর বয়সে। ৫০র দশকে ঢাকায় এসে সাহিত্য ও নাট্যচর্চার সঙ্গে জড়িত হন। চলচ্চিত্রে পথচলা শুরু অভিনয়ের মাধ্যমে। প্রথম অভিনীত সিনেমা তোমার আমার (১৯৬১)। চলচ্চিত্রে কাহিনীকার হিসেবে যাত্রা শুরু ধারাপাত দিয়ে। আমজাদ হোসেনের নাটক ধারাপাত-এর কাহিনী নিয়ে পরিচালক সালাউদ্দিন নির্মাণ করেন চলচ্চিত্র ধারাপাত। এই চলচ্চিত্রে অবশ্য তিনি নায়কের ভূমিকায় অভিনয়ও করেন।

এরপর আমজাদ হোসেন জড়িত হন পরিচালক জহির রায়হানের ইউনিটে। জহিরের বেহুলাতে আমজাদ হোসেন সংলাপ রচনার সঙ্গে সঙ্গে অভিনয়ও করেন। সংলাপ রচনা করেন জহিরের বিখ্যাত চলচ্চিত্র জীবন থেকে নেয়ারও। প্রথম পরিচালিত চলচ্চিত্র নুরুল হক বাচ্চুর সঙ্গে যৌথভাবে আগুন নিয়ে খেলা। পরে পরিচালিত সিনেমার মধ্যে রয়েছে জুলেখা, বাল্যবন্ধু, পিতাপুত্র, এই নিয়ে পৃথিবী, বাংলার মুখ, নয়নমনি, গোলাপী এখন ট্রেনে, সুন্দরী, কসাই, জন্ম থেকে জ্বলছি, দুই পয়সার আলতা, সখিনার যুদ্ধ, ভাত দে, হীরামতি, গোলাপী এখন ঢাকায়, গোলাপী এখন লন্ডনে। কাহিনী লিখেছেন আবার তোরা মানুষ হ, সুজনসখী। নিজের পরিচালিত বেশিরভাগ সিনেমার প্রযোজক আমজাদ হোসেন নিজে। ১৯৯২ সালে পান রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ একুশে পদক। এছাড়াও পরিচালক, কাহিনীকার, সংলাপরচয়িতা, চিত্রনাট্যকার ও গীতিকার শাখায় ১৬ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হন আমজাদ।

প্রকাশিত গ্রন্থ-উপন্যাস : অবেলায় অসময়, নিরক্ষর স্বর্গে, অস্থির পাখিরা, আমি এবং কয়েকটি পোস্টার, উঠোন; গল্পগ্রন্থ : কাল সকালে; কিশোর উপন্যাস : জন্মদিনের ক্যামেরা। ২০০৪ সালে গুণী এই মানুষটি বাংলা একাডেমী পুরস্কারও পান। প্রবীণ এই চলচ্চিত্রনির্মাতার সঙ্গে ম্যাজিক লণ্ঠন-এর হয়ে কথা বলেছেন সেলিম আহমেদরাজীব আহসান

ম্যাজিক লণ্ঠন : একটি আমজাদ হোসেন চলচ্চিত্র-এই বাক্যে কেনো নিজেকে পরিচিত করলেন?

আমজাদ হোসেন : বিষয়টা কিন্তু খুব সরল ছিলো, অ্যা ফিল্ম বাই আমজাদ হোসেন। বাংলা তো এমনই হবে। সবাই অবাক হলো, অনেকে বিস্ময় প্রকাশ করলো কিন্তু আমার ফিল্ম তো ওই বাক্যেই হওয়ার কথা, তাই না? একটি আমজাদ হোসেন চলচ্চিত্র। আমি সিনেমা বানাবো যখন সিদ্ধান্ত নিলাম, তখন এই পৃথিবীর সব সিনেমার মতো তো আমার সিনেমা হবে না। আমার দেশিয় উপাদান, আমার দেশের গল্প, লোকগল্প, আমাদের সমাজ, আমাদের সাহিত্য আর আমার একান্ত দৃষ্টিভঙ্গি; একান্ত আমার মতো, অন্য কারো মতো নয়-এই মূলকথা।

জীবন থেকে নেওয়া, এরপর মুক্তিযুদ্ধ, আর মুক্তিযুদ্ধের পর আমি একটা সিনেমা বানালাম বাংলার বউ; স্বাধীন দেশের প্রথম সিনেমা। সিনেমাটা আজ পর্যন্ত রিলিজ হয় নাই, পুরো সিনেমাটা এফডিসি থেকে হারিয়ে যায়। ক্ষোভে-দুঃখে-রাগে আমি এই সিনেমা জগৎ থেকে চলে গেলাম, অন্য ব্যবসা করতে আরম্ভ করলাম। এরপর একজন ভদ্রলোক এসে বললো আমি প্রযোজক হবো আপনি সিনেমা তৈরি করেন।

আমি বসে বসে তখন ভাবছি দিন-রাত। পৃথিবীর সব ভালো চলচ্চিত্রকারের সিনেমাতো আমি দেখতে পারি নাই, খুবই আংশিক দেখা। একটা চিন্তা এলো, আমার সিনেমা এমন হতে হবে, পৃথিবীর যে-কোনো জায়গায় গেলে মনে হবে এই সিনেমা আলাদা, এর কম্পোজিশন, এর গল্প বলা, যে-কোনো কিছু আলাদা। স্বীকৃত বা নন্দিত ওসব অন্যকথা, সিনেমা একদম আলাদা হতে হবে। আমার চোখ যদি ক্যামেরা হয় তবে আমার ছেলেবেলা থেকে এ-পর্যন্ত জগৎ সংসারে আমার দেখা তো একদম নিজস্ব সঞ্চয়, আর সেই দেখা থেকেই একদম নতুন পথচলা নয়নমনি সিনেমা। তারপর গোলাপী এখন ট্রেনে, তিন বয়সের তিন চরিত্র-গোলাপী, ময়না আর বুড়ি। এই যে-গল্প বলায় তিন বয়সের তিন চরিত্রের কম্পোজিশন, এই যে-তিন চরিত্রের হাঁটা-চলা, কথা বলা, হাট-বাজার করা, থ্রি-শট্স সব তো আমার দেখা। সবার থেকে আলাদা, এইভাবেই একটি আমজাদ হোসেন চলচ্চিত্র

ম্যাজিক লণ্ঠন : আপনি ছেলেবেলা থেকেই সিনেমার প্রতি অনুরক্ত ছিলেন? না অন্য কোনো স্বপ্নে আচ্ছন্ন ছিলেন?

আমজাদ : মানুষ চলচ্চিত্রে আসার জন্য যেভাবে চিন্তা করে, আমার এমন কোনো ভাবনাই ছিলো না। আমি লিখবো, আমি লেখক হবো-এই ছিলো আমার প্রস্তুতি; প্রচুর পড়তাম। আমি নিজেকে সেইভাবে তৈরি করছিলাম। তখন কল্লোল যুগ চলছে বাংলা-সাহিত্যে, ইংরেজি-সাহিত্যে পড়া সব মানুষগুলো বাংলা লিখছে। ইংরেজিতে এমএ পাস করে বাংলা সাহিত্য রচনা করছে। বিষ্ণু দে, সুধীন দত্ত, বুদ্ধদেব বসু এমনকি আমাদের জীবনানন্দ দাশ-সবাই ইংরেজি সাহিত্যের মানুষ। আমি তখন ছড়া লিখছি। শপাঁচেক ছড়া লিখেছি, এর কম হবে না। কোনোদিন বই হয়ে প্রকাশ পায় নাই বটে, কিন্তু পত্রিকায় প্রচুর ছাপা হয়েছে খেলাঘর,কচিকাঁচার আসর , মিল্লাতসহ বিভিন্ন জায়গায়।

আমার প্রথম ছড়া ছাপা হয় মুকুলের মহফিল আজাদ পত্রিকায়। ১৯৫৮ সাল হবে, আমার একটা কবিতা ছাপা হলো  দেশ পত্রিকায়, তখন আমি সম্ভবত সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি। দেশ পত্রিকার সম্পাদক সাগরময় ঘোষ আমাকে আমন্ত্রণ জানালেন কলকাতায়, আমি পৌঁছে গেলে আমার থাকা-খাওয়া-পড়াশোনা সবকিছুর দায়িত্ব তিনিই নিবেন। আমার সে-আমন্ত্রণে সাড়া দেওয়া হয় নাই। আমি বড়ো ছেলে, তাই দরিদ্র একটি সংসারের কর্তব্য ঠেলে চলে যাওয়া যায় না। দেশ পত্রিকায় চাকরি করলে হয়তো লেখক হয়ে উঠতাম, এই আর কী। সিনেমা বানানো হতো না। অনেকদিন পর সাগরময় ঘোষের সঙ্গে অনেকবার দেখা হয়েছে, উনি আমার গোলাপী এখন ট্রেনে দেখেছেন।

ম্যাজিক লণ্ঠন : আপনি কাহিনী লিখছেন, লিখছেন সংলাপ-চিত্রনাট্য; তারপর করছেন দৃশ্য পরিকল্পনা। যেহেতু আমাদের সিনেমায় গান আছে, গানও লিখছেন। এই যে, পুরো সিনেমার সঙ্গে আপনার প্রত্যেকটা প্রক্রিয়ায় ভীষণ অন্তরঙ্গতা। আপনি চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে এখন নতুন পরিচালকদের এইসব গুণাবলি দেখতে পাচ্ছেন?

আমজাদ : এখনকার ছেলেরা একটা কথা জানে না, বোঝে না অথবা মানে না। একজন বিখ্যাত লেখক হোক আর যে-কোনো লেখকই হোক, কারও লেখা থেকে একজন চলচ্চিত্র নির্মাণ করবে মানে তখন থেকে সেই চলচ্চিত্রকার একজন কাহিনীকার। শট্ অনুযায়ী সংলাপ যখন সে ভাববে তখন সে-ই একজন সংলাপ লেখক। তারপর সে-ই স্ক্রিনপ্লে করছে বলে সে-ই ফার্স্ট স্ক্রিনপ্লে রাইটার। গান সে লিখতে পারে বা কাউকে বলে সেই আবহ অনুযায়ী গান লিখিয়ে নিচ্ছেন, মানে অনুভূতির ওপর বাক্য গঠন। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় সবকিছু তাকে বুঝতে হবে, অনুভূতিতে ডুবতে হবে। আর যদি না পারে তবে ওর অস্তিত্বই থাকবে না, ক্যামেরাম্যান হয়ে যাবে ডিরেক্টর; তাই তো হচ্ছে। আমার কম্পোজিশন সেন্স আছে, কিন্তু নতুন ছেলেটা তা জানে না; তখন ক্যামেরাম্যান বলবে এই যে-দেখেন, এটাই ভালো।

একজন চিত্রকর সারাজীবন এই ফ্রেম নিয়ে ভাবে, এই কম্পোজিশন নিয়ে ভাবে। এইটা মাথায় রাখতে হবে, না হয় সবাই নতুন ডিরেক্টরকে ঠকাবে। ওই ছবি কিচ্ছু হবে না। একজন পরিচালক কম্পোজিশন জানবে; ফলে সে ওই স্বপ্ন থেকে ক্যামেরার লেন্স ঠিক করবে, সেটে লাইট করবে তারপর নিজের দেখা সিনেমাটা তৈরি হবে। আমাদের এখানে যারা ব্যবসায়িক সিনেমা তৈরি করে তারা পছন্দ করে কন্ট্রাকটর। এক একজন এক একটা কাজ করবে, তারপর জোড়া দিলে তৈরি হবে সিনেমা। আমি এইসব সিনেমা বলবো? আর এখন যারা কিছু না বুঝেই সিনেমা বানাচ্ছে সেগুলো সিনেমা? আমি বলবো-না, এসব সিনেমা না।

ম্যাজিক লণ্ঠন : আপনার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার কথা বলবেন?

আমজাদ : জীবনের শুরুটাই কমিউনিস্টদের সঙ্গে। ৪৭-এ দেশভাগের পর আমাদের এলাকায় সব বিপ্লবীরা জেলখানা থেকে ফিরছে, তখন বড়ো বড়ো নেতাদের পাশে পাশে থাকি। আমার খুব অল্প বয়স; বাম নেতাদের পান-সিগারেট আনি, কাছে কাছে ঘোরাফেরা করি। কলেজে ভর্তির পর স্টুডেন্ট ইউনিয়ন করেছি একদম স্বজ্ঞানে। সব মানুষের একটি জিনিস জানা প্রয়োজন তাহলো, রাজনীতির কথা মানে রাজনৈতিক চেতনা। লেখক, গায়ক, ফিল্মমেকার ছাড়া আমি সাধারণ মানুষের কথা বলছি। বাম রাজনীতির সঙ্গে পরিচয় থাকলে সমাজের শ্রেণিগুলো বুঝতে সহজ হয়। গোলাপী এখন ট্রেনে তো শ্রেণিসংগ্রামের সিনেমা। বুঝতে হবে না?

আবার লেখক যখন গল্প-উপন্যাস লিখবেন তখন এই রাজনৈতিক জ্ঞান কাজে লাগবে। কিন্তু সাহিত্য যেনো আবার রাজনীতির গন্ধে নষ্ট না হয়, সাহিত্যের অবশ্যই আলাদা ভাষা আছে। এই জ্ঞানটা সাহিত্যে আসবে লবণের মতো, ঠিক যতোটুকু দরকার; তার বেশি না, আবার কমও না। একটা হাসির কথা বলি, অনেকে বলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের তো ক্লাস স্ট্রাগল নাই; ইনি জমিদারের মতো লিখেছেন। রক্ত করবী বা অচলায়তন পড়লে ঠাকুরের রাজনৈতিক জ্ঞানটা পুরো বোঝা যায়। আবার মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে তার লেখায় বেশি রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে পাওয়া যায়। আবার এখনকার দায়িত্বজ্ঞানহীন রাজনীতি মানুষকে কিছুই শেখায় না।

সমাজতন্ত্র নাই, কিন্তু তার আবহ কী শেষ হয়ে গেছে? রাজনীতির দর্পণে আমরা আমাদের দেখবো। দেখো লুটতরাজের নীতি তো কিছু শেখায় না। পাশের দেশে একটা মৌলবাদী দলেরও কাঠামো আছে, এটা নিয়ম। আমাদের এখানে কোন্ দলের কী আছে, কাউকেই চেনার উপায় নাই। আমাদের জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সরকারি অংশগ্রহণ আছে, নাকি এ-আমাদের নিজেদের অর্জন? এই যদি উন্নতি হয়, তবে জীবনধারণ এতো কঠিন হয়ে পড়েছে কেনো? আমরা তো ১৯৭১ সালের মুক্তি সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধা চিনি এবং জানি; অথচ এই ৪০ বছরে এ-দেশের মানুষ তিনগুণ হয়ে যাওয়ার পরও যে কৃষকেরা আমাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করছে তারাই প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা, ওদের যুদ্ধ কেউ জানে না।

এই অচেনা অবহেলিত কৃষক একজমিতে ফসলের পর ফসল বাড়িয়ে আমাদের অর্থনীতিকে বেগবান করে প্রচুর দেনা রেখে, খাবার-চিকিৎসা না পেয়ে অকাতরে জীবন দেয়। আর আপনাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার বাড়ে। নতুন এক শ্রেণি তৈরি হয়েছে, সব প্রবৃদ্ধি তাদের কাছে চলে যায়। গার্মেন্টস এতো প্রবৃদ্ধি বাড়ালো কিন্তু সামান্য নিরাপত্তা নাই গার্মেন্টস কর্মীদের জীবনে; সব পুড়ে মরছে। একজন নাট্যকার, একজন চলচ্চিত্রকার যদি সমাজের এই সংগ্রাম বোঝে তাহলে তার দৃষ্টি একদম ভিতর থেকে দেখা এক বিষয় হয়ে উঠবে; যেমন একমাত্র রাজনৈতিক এবং শ্রেণি-সংগ্রামের সিনেমা হলো জীবন থেকে নেওয়া

ম্যাজিক লণ্ঠন : আমরা আজকাল মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলি, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় কি কোনো সিনেমা নির্মিত হয়েছে?

আমজাদ : খুব ভাল কথা, চেতনা তো অনেক পরের বিষয়। আমার মনে হয়, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যে-সিনেমাগুলো হয়েছে তা আদৌ সিনেমা হয়েছে কি না ভেবে দেখতে হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঘিরে অনেক মহান সিনেমা আছে পৃথিবীজুড়ে, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আছে অনেক মহান গল্প-উপন্যাস; সে-সব কি সিনেমা হয়েছে? একটাও না। মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে ১৯৭১ সালে কিন্তু এর একটা দীর্ঘ পটভূমি আছে। হঠাৎ করে শুরু হলো নাকি? লাখ লাখ ঘটনা আছে, একজন সামরিক অফিসার ওই সুসজ্জিত সংঘবদ্ধ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী থেকে বিদ্রোহ করে পালিয়ে আমাদের জন্য মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে, কতোজনের এই কাহিনী আছে। তাদের কতো ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর সময়ের সব কাহিনী আছে, সেগুলোও তো মুক্তিযুদ্ধের গল্প। চায়না আট-দশ লাখ সৈন্য বর্ডারে হাজির করছে, মার্কিন সপ্তম নৌবহর বঙ্গোপসাগর দিয়ে এগিয়ে আসছে, রাশিয়ার অষ্টম নৌবহর, ভারতের তোড়জোর-সেতো বিশ্বজুড়ে এক কাহিনী। এমন হাজারো বিষয় সিনেমা হতে পারে। আবার আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসটা স্বচ্ছ না। আমরা এসব নিয়ে এখনও তর্ক-বিতর্ক করছি।

ম্যাজিক লণ্ঠন : আপনার স্মৃতির মুক্তিযুদ্ধ আগামী প্রজন্মকে বলে যেতে চান না?

আমজাদ : ইচ্ছা তো আছে। হয়তো আমার ছেলে, তারপর তার ছেলেমেয়ে বিদেশ থেকে আসবে; তার ইচ্ছা হতে পারে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সিনেমা বানাবে। দেখেন সে হয়তো বানাবে একটা সংঘর্ষ, একটা রূপকথা, রাম-সীতার কল্পকাহিনীর মতো; সে একটা দেশাত্মবোধক মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা বানাতে পারে। আমাদের এই কিছুদিন আগে দেখা স্মৃতি ওদের কখনও হবে না। আমাদের চোখে দেখা অভিজ্ঞতা তো ওদের থাকবে না। দরকারও নাই, একটা মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা হলেই ভালো। হয়তো একটা পরিবার নিয়ে সিনেমা বানাতে পারে-সেই পরিবারের যুদ্ধের নয় মাস। আমাদের তো মুক্তিযুদ্ধের নামে বানানো সিনেমায় শুধু গোলাগুলি।

ম্যাজিক লণ্ঠন : এখন কোনো সিনেমার পরিকল্পনা করছেন?

আমজাদ : একদম না, চারিদিকে সব নিষ্প্রাণ। পূর্ব-পাকিস্তানেও তো বাসায় বাসায় হারমোনিয়াম থাকতো, রবীন্দ্র-নজরুল-আধুনিক গান হতো; পাড়ায় একটা বিচিত্রানুষ্ঠান হতো। আর এখন তো কেউ গান শেখে না, হারমোনিয়াম চেনে না। আমরা এখন সংস্কৃতির শিকড়ের বাইরে আছি।

ম্যাজিক লণ্ঠন : ঊনসত্তরের কথা বলুন।

আমজাদ : আমি কোথায় যে-ছিলাম ঠিক মনে পড়ছে না; খবর পেলাম আসাদ নাই। দৌড়ে মিছিলে গেলাম। গিয়ে দেখি মাওলানা ভাসানী নিজে লাশ কাঁধে নিয়ে মিছিল করছেন। সারাদিন মিছিল চললো। মাওলানা ভাসানী আমাকে ডেকে বললেন, আমরা আসাদের ওপর একটা ডকুমেন্টারি করবো, তুমি তাড়াতাড়ি একটা স্ক্রিপ্ট রেডি করো। স্ক্রিপ্ট রেডি হলো, কাজী জাফরকে বললাম। চেওড়া গ্রামে লাখ লাখ মানুষের সামনে মাওলানা ভাষণ দিচ্ছেন; আমি ক্যামেরা নিয়ে শ্যুট করছি। মঞ্চ থেকে উনি ঘোষণা করছেন ডকুমেন্টারির কথা। মঞ্চ থেকে এই মানুষের জমায়েতে মাওলানা আমাকে আশীর্বাদ করছেন। খুব উত্তেজনায় কাটছে, কিন্তু রাতে টেলিফোন এলো আসাদের পরিবার এ-ধরনের ডকুমেন্টারি করতে দিতে রাজি না। মাওলানা সাহেব অনেক কাঁদলো আবার নামাজ পড়লো, আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করলো। কারণ, মাওলানা সাহেবের খুব ইচ্ছা ছিলো আসাদের এই ডকুমেন্টারি সারা পৃথিবীর মানুষ দেখবে, সারা দুনিয়া জানবে। এই ডকুমেন্টারিটাই জীবন থেকে নেওয়া-তে ঢুকে গেছে।

ম্যাজিক লণ্ঠন : ঊনসত্তরের কথা হলো, একটু ভাসানীর কথা বলেন।

আমজাদ : উনি তো বড়ো মাপের মানুষ, নেতা। ওনার আবার ছিলো তিন নেতা-শেখ মুজিবুর রহমান, কাজী জাফর ও রাশেদ খান মেনন। বঙ্গবন্ধু ছাড়া বাকি দুই নেতা ভাসানীর কথা বলে না, বঙ্গবন্ধু মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত ভাসানীর সব খবর রাখতেন। জামা-কাপড়, জুতা অথবা পেটে গ্যাসের ঔষধ সব বঙ্গবন্ধু পাঠিয়ে দিতেন। বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পনের দিন আগের কথা, দুররানী নামে একটা ছেলে ছিলো, কাজী জাফরের সঙ্গে সঙ্গে থাকতো। দুররানীকে একটা চিঠি দিয়েছিলেন মাওলানা সাহেব, চিঠি দিয়ে বলেছিলেন এইটা মুজিবের কাছে পৌঁছায়ে দিবা। দুররানী বাসের ভিতর বসে হঠাৎ চিঠিটা পড়ে ফেলে এবং ভয়ে কাঁপতে থাকে। সন্ধ্যায় বাস থেকে নেমে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর বাসায় চলে যায় এবং তার ভয়ের কথা খুলে বলে। কিছুক্ষণ পর বঙ্গবন্ধুরই ফোন আসে এবং সকালে নাস্তার টেবিলে তিনি থাকবেন কাদের সিদ্দিকীর অপেক্ষায়-এমন কথা হয়। ফোনেই কাদের সিদ্দিকী বলেন-বঙ্গবন্ধু, হুজুর আপনাকে চিঠি পাঠিয়েছে খুব জরুরি, আমি নিয়ে আসবো।

চিঠি পেয়েই বঙ্গবন্ধু উচ্চস্বরে হাসতে থাকেন আর এরিনমোর টোব্যাকোর ধোঁয়া ছাড়তে থাকেন। চিঠিতে লেখা ছিলো যে,আমার ভয় হচ্ছে মুজিব। তুমি যে-বাসায় থাকো ছেলে-মেয়ে নিয়া, তুমি তাড়াতাড়ি বাসা বদলাও। দু-একদিনের মধ্যেই বদলাও, আমি খুব দুঃস্বপ্ন দেখতেছি। চিঠি পড়ে বঙ্গবন্ধু হাসতে হাসতে বলেন, আমার চিন্তায় চিন্তায় হুজুরের ঘুমও বন্ধ হয়ে গেছে। নাকি ঘুমাতে পারেন না ওই ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা মনে করে; কাদের হুজুরকে জানায়ে দাও বিশ্ববিদ্যালয়ে আরও চার লাখ টাকা আমি পাঠাচ্ছি। তার কিছুদিনের মধ্যেই বঙ্গবন্ধু ওই বাড়িতেই সপরিবারে নিহত হন। মাওলানা ভাসানীর কিছু অন্য শক্তি বোধহয় ছিলো, অনেক বেশি মানুষ যখন কাউকে ভালোবাসে তখন একটা শক্তি তৈরি হয় মনের ভিতর। তখন বোধহয় কোনো কোনো মানুষ, অন্য মানুষের চোখ দেখলেই সব বলতে পারে। আসলে তারা হয়ে ওঠে জনমানুষের জ্যোতিষী। 

ম্যাজিক লণ্ঠন : মানুষকে একটু সংস্কৃতিবান হতে বলবেন, না অন্যকিছু-একটা পথ তো চাই।

আমজাদ : যদি মানুষ সংস্কৃতিবান হয় তবে দুর্নীতি অনেক কমে যাবে। ভারতে দেখা যায় মৌলানা আবুল কালাম আজাদ সংস্কৃতিতে অনেক পুরস্কার প্রবর্তন করেছিলেন, এখনও সে-সব পুরস্কার চালু আছে। জিয়াউর রহমান কিন্তু এইরকম অনেক পুরস্কার প্রবর্তন করলেন এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে তা সবাই গ্রহণ করতে শুরু করলো; প্রেসিডেন্ট জিয়া একদম মৌলানা আবুল কালাম আজাদকে পুরোপুরি কপি করেছিলেন। তখন সমাজে একটা প্রতিযোগিতা আরম্ভ হয়েছিলো সংস্কৃতির। রাষ্ট্রীয় পুরস্কারগুলো খুব কাজের, খুব উৎসাহের।

চারিদিকে এখন সব শূন্য, মানুষের লুকানোর জন্যও তো কিছু গাছপালা লাগে। স্বাধীনতার ৪১ বছরে তো এখন শুধুই হতাশা, আমাদের এমন হলো কেনো? আশাতো ছাড়তে পারি না। ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের আন্দোলন আবার একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রাম সবই তো এই দেশে হয়েছে। আবার যদি মুক্তির জন্য আন্দোলন করতে হয়, আবার যদি গৃহযুদ্ধ একটা হয়-তবেই বোধহয় এ জাতি রাহুমুক্ত হবে। এখন রাহুর গ্রাসে আছে। বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী সব দুই ভাগে বিভক্ত। কিন্তু, এদের ভাগ হলে চলবে না। এই ভাগাভাগি আমাদের শেষ করে দিচ্ছে। রাজনীতির এখন শিক্ষা নাই, শুধু দুর্নীতি। সব সংস্কৃতিকর্মী এখন দাস, মোসাহেব বাহিনী। এখনতো সংস্কৃতি নির্বাসনে, তাই রাজনীতিতে আছে শুধুই দুর্নীতি।

ম্যাজিক লণ্ঠন : আপনি গীতিকার হিসেবে দীর্ঘ সময় ধরে পরিচিত; আবার ঔপন্যাসিকও, এখন নতুন কিছু পাচ্ছি না কেনো?

আমজাদ : ওই দেশ পত্রিকা লিখেছিলো-আমজাদ হোসেন ও আলাউদ্দীন আলীর মিলন স্রোতে বহু দশক; আবদুল হাদী বা সাবিনা ইয়াসমিনের কথা নাই। কিন্তু আমরা এই চারজন অনেক কাজ করেছি। এখন তো আর প্রয়োজন হচ্ছে না, তাই মনের তাগিদও নাই।

 



সেলিম আহমেদ স্নাতক করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউট থেকে ভাস্কর্যে। দীর্ঘসময় হস্তশিল্প, ফ্যাশন ও গ্রাফিক্সের সঙ্গে তার বসবাস। বর্তমানে তৈরি হচ্ছেন চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য। রাজীব আহ্সান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাতত্ত্ব বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী। বর্তমানে হাসান আজিজুল হকের একটি গল্প নিয়ে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণে ব্যস্ত আছেন।

razibaahsan@gmail.com

selim24march@yahoo.com

 

 

বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৩ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের চতুর্থ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন