Magic Lanthon

               

এ বি এম সাইফুল ইসলাম

প্রকাশিত ১৪ ডিসেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

অ্যাপোক্যালিপ্টো : আদিম ভয়ের তথ্য অনুসন্ধান

এ বি এম সাইফুল ইসলাম


গ্রিক শব্দ apokalupto একটি ক্রিয়াপদ। যার অর্থ হচ্ছে uncover-উন্মোচিত/উদ্ঘাটন/ব্যক্ত করা, disclose-অনাবৃত/প্রকাশ করা অথবা reveal-দৃষ্টিগোচর করানো/জানিয়ে দেওয়া। এই চলচ্চিত্রে মেল গিবসন অ্যাপোক্যালিপ্টো বলতে মূলত বোঝাতে চেয়েছেন a new beginning বা নতুন জীবনের শুরু প্রসঙ্গে। বাইবেলের শেষ অধ্যায়কে বলা হয়`দ্য অ্যাপোক্যালিপস। এই অধ্যায়ে রোজ কেয়ামত বিষয়ে সেন্ট জন এর ঈশ্বরলব্ধ দিব্যজ্ঞান লিপিবদ্ধ আছে, যা মহাপ্রলয়তুল্য। মেল গিবসনের অ্যাপোক্যালিপ্টো মূলত একটি মহাকাব্যিক দুঃসাহসিক অভিযান, যা উত্তরোত্তর স্তিমিতকালীন মায়া সভ্যতার প্রেক্ষাপট নিয়ে নির্মিত। বাইবেলের শেষ অধ্যায় ও অ্যাপোক্যালিপ্টো প্রসঙ্গে গিবসনের ভাষ্য হলো,প্রত্যেকটি জিনিসেরই শুরু ও শেষ আছে, সভ্যতার ক্ষেত্রেও একই কথা বলা যায় গিবসন অবশ্য অ্যাপোক্যালিপ্টোর একটি বিষয়বস্তুর কথা বলেছেন, তা হলো-the cxploration of primal fears বা আদিম ভয়ের তথ্য অনুসন্ধান।

 

দৃশ্যপট

মায়া সভ্যতায় শান্তিকামি একটি উপজাতি গ্রাম হঠাৎ একদল ধর্ষকাম আক্রমণকারীদের হাতে নির্যাতিত হয়ে বন্দি হয় ক্রীতদাস ও দেবতার বলির জন্য। আক্রমণের প্রথম দিকে জাগুয়ার পো তার গর্ভবতী স্ত্রী ও পুত্রকে নিবাসের কাছের একটি গুহায় নিরাপদ স্থানে রেখে সতীর্থদের বাঁচাতে ফিরে আসে। জিরো উল্ফ-এর নেতৃত্বে আক্রমণকারীরা গ্রামবাসীর অনেককে হত্যা ও ধর্ষণ করে। এবং শেষ পর্যন্ত জাগুয়ার পো নিজেও বন্দি হয়। পথিমধ্যে আরেক দল বন্দিসহ তাদেরকে আক্রমণকারীরা মায়া সিটিতে নিয়ে যায়। বন্দিদের কয়েকজনকে পালাক্রমে ডেথ মাচ এ বলি দেওয়া হয়; জাগুয়ার পো-কে বলি দেওয়ার পূর্ব-মুহূর্তে দৈবাৎ সূর্যগ্রহণ দেখা দেয়-তখন পুরোহিত উপস্থিত জনতার উদ্দেশে ঘোষণা দেয় যে, দেবতা কুকুলক্যান তাদের প্রদত্ত বলিতে সন্তুষ্ট হয়েছে, তাই এবারের মতো বলি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর জিরো উল্ফ অবশিষ্ট বন্দিদের বল কোর্টে নিয়ে আসে। কোর্টের একপ্রান্তে একসঙ্গে দুজন করে বন্দির হাতের বাঁধন কেটে দিয়ে দৌড়াতে বাধ্য করা হয়, আর জিরো উল্ফ তার অস্ত্রের পসরা বিছিয়ে তার লোকদেরকে টার্গেট প্র্যাকটিস করতে বলে। অন্য প্রান্তে অপেক্ষা করে জিরো উল্ফ এর ছেলে কাট রক; তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়-যদি এরপরও কোনো বন্দি বেঁচে যায়, তাকে নিজ হাতে মেরে ফেলতে। বুদ্ধি ও আত্মপ্রত্যয়ের জোরে জাগুয়ার পো এখান থেকে পালিয়ে বাঁচে এবং তার প্রিয় পরিবারকে রক্ষা করে।

 

কথকতা     

অ্যাপোক্যালিপ্টোর পাণ্ডুলিপি ও নির্মাণশৈলী নিয়ে নৃতাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক, লেখক, অধ্যাপক, সমালোচক থেকে শুরু করে সাধারণ দর্শক-শ্রোতার ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া উভয়ই আছে। একপক্ষ এর পরিচালনা, পাণ্ডুলিপি, অভিনয়, সঙ্গীত থেকে শুরু করে পোশাক, মেকআপ, সেট-ডিজাইন, সাউন্ডট্র্যাকসহ অনেক কিছুরই ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। অন্যদিকে, একেবারে ছবির প্রথমে ব্যবহৃত একজন ঐতিহাসিকের উক্তি থেকে শুরু করে শেষভাগে স্প্যানিশদের জাহাজের যে-দৃশ্য দেখানো হয়েছে-এর সবকিছু নিয়ে অপরপক্ষ নেতিবাচক ভাবনা পোষণ করেছেন। উভয় পক্ষের মধ্যেই আছে কিছু দ্বন্দ্ব।

 

প্রথম দ্বন্দ্ব

আমেরিকান লেখক, ঐতিহাসিক ও দার্শনিক William james Durant এর একটি  উক্তি, A great civilization is not conquered from withoutuntil it has destroyed itself from within ব্যবহার করা হয়েছে। সমালোচকদের মতে, এই উক্তির মাধ্যমে মায়া সভ্যতার পতন সম্পর্কে ভুল তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। অতিরিক্ত জনসংখ্যা, অনাবৃষ্টি, চাষাবাদের জন্য জমির অতিরিক্ত ব্যবহার, মহামারি, নিপীড়ন ও নিজেদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব-এসব বিষয়কে ঐতিহাসিকরা মায়া সভ্যতা ধ্বংসের কারণ হিসেবে দাবি করেন। কিন্তু এ-সভ্যতা ধ্বংসের সুনির্দিষ্ট কারণ এখন পর্যন্ত অজানা। অথচ গিবসন ছবির শুরুটাই করেছেন এমন একটি উক্তির মাধ্যমে যার দ্বারা প্রমাণ হয়-মায়া সভ্যতা ধ্বংসের অন্যতম প্রধান কারণ মায়াদের নিজেদের মধ্যে প্রকট অন্তর্দ্বন্দ্ব। যা অনেক নৃতাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক ও সমালোচক মেনে নিতে পারেননি।

 

দ্বিতীয় দ্বন্দ্ব

গিবসনের ভাষ্যমতে, মায়া সভ্যতার প্রেক্ষাপটে ছবিটি নির্মাণ হয়েছে। অথচ মায়া সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য সিনেমায় একেবারেই নেই বলে অনেকেই দাবি করেছেন। আবার অনেকে মনে করছেন, এই সিনেমায় মায়াদের সঙ্গে প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। তাদের মধ্যে সাউদার্ন মেথডিস্ট ইউনিভার্সিটি ইন ডালাস, টেক্সাস-এর নৃবিজ্ঞান বিভাগের ডিসটিঙগুইশ প্রফেসর ডেভিড ফ্রেইডেল অন্যতম। এ প্রসঙ্গে তার বিট্রেইং দ্য মায়া শিরোনামের প্রবন্ধটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত এবং নজর কেড়েছে। ফ্রেইডেলের মতে, অ্যাপোক্যালিপ্টো প্রচণ্ডভাবে অদ্ভুত ও সামঞ্জস্যহীন বলেই হাস্যকর ও পরাবাস্তববাদ-যা শিল্পকৌশলের আত্মনিয়োজনে আনুপুঙ্খিক তথ্য কিন্তু ঐতিহাসিক সঙ্গতি এবং সারবস্তুকে অবজ্ঞা ও তাচ্ছিল্য করেছে। বেশিরভাগ সমালোচক ও সিনেমাপ্রেমী ইতিবাচকভাবে দেখলেও ফ্রেইডেল মনে করেন, এটা একটি বিরাট মিথ্যাচার এবং মায়া সভ্যতার সঙ্গে অসভ্যতা। মায়া সভ্যতা ছিলো মেসোআমেরিকান সমাজের অন্যতম কর্তৃত্বময় জাতি। তাদের ছিলো পূর্ণাঙ্গ লিখিত ভাষা, শিল্পকর্ম, স্থাপত্যশিল্প, গণিতবিদ্যা ও জ্যোতির্বিদ্যায় সমান পারদর্শিতা-যা ছবিতে একেবারেই অনুপস্থিত।

 

তৃতীয় দ্বন্দ্ব  

এই দ্বন্দ্বটা সিনেমার শেষ পাঁচ মিনিটের দৃশ্য নিয়ে। যেখানে গিবসন বোঝাতে চেয়েছেন ত্রাণকর্তা খ্রিস্টান মিশনারিদের আগমন, ইতিহাস বলে স্পষ্টত কনকুইসটেডরদের১০ আগমন। সত্যিকারের ইতিহাস বলে মায়ারা মায়া সিটি ছেড়ে চলে যাওয়ার ৩০০ বছর পর স্প্যানিশরা এখানে আসে।১১ মূলত ৩০০ থেকে ৯০০ খৃষ্টাব্দের মধ্যে মায়া সভ্যতার চরম বিকাশ ঘটে। এ-সময় মায়া সভ্যতা মেক্সিকোর ইউকাতান উপদ্বীপেও প্রসার লাভ করে। এর পরবর্তী ১০০ বছর মায়া সভ্যতা বিভিন্ন প্রতিকূল অবস্থার মুখে নিষ্প্রভ হয়ে থাকার পর পুনরায় উৎকর্ষ লাভ করে এবং ১৫০০ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত তা বিস্তৃত ছিলো।১২ মায়া সাম্রাজ্য নিয়ে কাজ করা মিয়ামি বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ট্রেসি আড্রিন-ও দাবি করেন-মায়া সাম্রাজ্যের ধ্বংস ও স্প্যানিশদের আগমনের যে-সময় ছবিতে উপস্থাপন করা হয়েছে তা ঐতিহাসিকভাবে অযথার্থ। কারণ, মায়া সিটির ধ্বংস হয় ৯০০ খৃষ্টাব্দে। আর চলচ্চিত্রের কাহিনী মায়া সিটি ধ্বংসের সময়ের।

উল্লিখিত বিষয়গুলোই মোটাদাগে অ্যাপোক্যালিপ্টোর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া। ডকুমেন্টারি আর সিনেমার মধ্যে একটি পার্থক্য আছে। কিন্তু চলচ্চিত্রকলা যতোই স্বাধীন বা সৃষ্টিশীল কাজ হোক না কেনো, ঐতিহাসিক সিনেমার সংজ্ঞা ও অর্থ অনুযায়ী-চিত্রনাট্য রচনা ও পরিচালনার ক্ষেত্রে লেখক কিংবা পরিচালকের একটা দায়বদ্ধতা কিন্তু থেকেই যায়। মেল গিবসন হয়তো তার রূপক বর্ণনা, দক্ষ পরিচালনা ও শৈল্পিক স্বাধীনতায় অনেকটাই উতরে গেছেন। সত্যজিৎ রায়ের মতে,চিত্রনাট্য হল ছবির কাঠামো। ইমেজ ও ধ্বনির দ্বারা পর্দায় যা ব্যক্ত হবে, এ হল তার লিখিত ইঙ্গিত। এই কাঠামোকে অবলম্বন করেই চলচ্চিত্রের কলা-কুশলীগণ পরিচালকের নির্দেশে সমবেতভাবে কাজ করে চলচ্চিত্রকে সাবয়ব, সজীব করে তোলে। চিত্রনাট্য তাই অবহেলার জিনিস নয়। এতে যদি খুঁত থাকে তাহলে ছবির অঙ্গসৌষ্ঠবে তার প্রতিফলন হতে বাধ্য, তা সেই পরিচালনা যতই সুষ্ঠু হোক। আবার চিত্রনাট্য ভালো হলেও নিশ্চিন্ত হওয়া চলে না, কারণ দুর্বল পরিচালনার ফলে তা নষ্ট হতে পারে।১৩ ছবির মূল কাহিনী নির্বাচন-প্রযোজক/পরিচালক/চিত্রনাট্যকারের রুচি, অভ্যাসও বিবেচনার বিষয়। ঐতিহাসিক চলচ্চিত্রে অতীতকে ধরতে চাওয়ার চেয়ে মিথের কাঠামোয় বর্তমানকে নতুন করে যোজনা করা বোধহয় পরিচালকের আরও যোগ্য কাজ; কারণ মিথের কথাই সত্যিকারের আজ-কাল-পরশুর কথা।১৪ অ্যাপোক্যালিপ্টোতে মেল গিবসন এই কাজটি বেশ দক্ষ হাতেই করেছেন বলে মনে হয়েছে।

 

অ্যাপোক্যালিপ্টোর আজ-কাল-পরশু

ছবির মূল কাহিনী শুরুর পূর্বেই উইল ডুরান্টের যে-উক্তিটি উদ্ধৃত করা হয়েছে, আমার মনে হয় এর মধ্যেই এই সিনেমার মূল উদ্দেশ্য অনেকটাই দৃষ্টিগোচর হয়েছে। নির্মাতার উদ্দেশ্য ছিলো মায়া সিটি পতনের বর্ণনার মাধ্যমে সমসাময়িক সমাজের প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরা। অ্যাপোক্যালিপ্টোর সহ-লেখক ফারহাদ সাফিনিয়া বলেন, মায়ারা তাদের সময়কালে যে-সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিলো তা আমাদের বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায়ও একই রূপে প্রতীয়মান হচ্ছে; বিশেষ বিস্তৃত পরিসরে দেখলে পরিবেশগত বিপর্যয়, অতিরিক্ত ভোগ ও রাজনৈতিক পচন।১৫ গিবসন নিজেও বলেছেন, এই ছবির প্রচেষ্টা ছিলো-পূর্বের গুরুত্বপূর্ণ সাম্রাজ্য পতনের সঙ্গে বর্তমান সাম্রাজ্য পতনকে সমান্তরালভাবে বিবেচনা করা। মানুষ মনে করে, আধুনিক সমাজ সংস্কারমুক্ত কিন্তু আমরা একই শক্তি, বীরত্ব ও সীমাতিক্রমীয়র প্রতি সংবেদনশীল।১৬ নির্মাতার কথা অনুযায়ী অ্যাপোক্যালিপ্টোতে মায়াদের উপস্থিতি ছিলো নিছক প্রেক্ষাপট মাত্র। সর্বজনীন কাহিনী বিস্তার লাভ করেছে সভ্যতা ও আমাদের অধঃখাত নিয়ে।১৭ মায়া সাম্রাজ্য বিশেষজ্ঞ, আমেরিকান লেখক, নৃবিজ্ঞানী ও প্রত্মতাত্ত্বিক মাইকেল ডি. কোঈ এর মতে, অ্যাপোক্যালিপ্টোর মাধ্যমে সব মানব ইতিহাসের সুগভীর সামাজিক ও  জনসংখ্যাতাত্ত্বিক বিপর্যয় পরিস্ফুটিত হয়েছে। এর সঙ্গে মায়া নিয়ে তিনি যুক্ত করেন নিজেদের অন্তর্দ্বন্দ্ব, অনাবৃষ্টি ও পরিবেশ দূষণকে।১৮

নির্মাতার সারবস্তুর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন প্রমাণ আমাদের বর্তমান সমাজেও অস্তিত্বমান। নিজেদের অন্তর্দ্বন্দ্বের ফলেই আজ ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া পুড়ছে আর ভুগছে। অদূর ভবিষ্যতে অপেক্ষা করছে সিরিয়া! বা অন্য কেউ। ড. কমলেশ চট্টোপাধ্যায়ের মতে, আজকের এই বৈজ্ঞানিক প্রগতি ও বস্তুগত বৈভব মানুষকে সমৃদ্ধি দান করেছে অথচ বিনাশের ভয় তার আগের তুলনায় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ঐতিহাসিক নিয়তিবাদে কবলিত কবি-শিল্পীরা পলায়নবৃত্তি অবলম্বন না করে মিথ-পুরাণের আদিম কাহিনীবিন্যাসের আশ্রয়ে জীবনের সত্যরূপ আরো গভীর অনুসন্ধান করতে চাইছেন।১৯ মেল গিবসনও সম্ভবত জীবনের সত্যরূপ অনুসন্ধানের জন্য ইতিহাস ও মিথ-পুরাণের প্রসঙ্গের আলোকে তার চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেছেন।

 

নির্মাতার সাফাই

চলচ্চিত্রটি তৈরিতে পরিচালকের কোনো চেষ্টার কমতি ছিলো না। গুয়েতেমালা সংগৃহীত পৌরাণিক-ঐতিহাসিক কাহিনীসমৃদ্ধ ধর্মীয় গ্রন্থ পপল ভ্য থেকে শুরু করে মায়া ইতিহাসের সৃষ্টি ও ধ্বংস উভয় মিথ বা অতিকথা স্টাডি করে পুরাণ শ্যাম্যান কাহিনীর সম্মিলন ঘটিয়ে একটি যথার্থ মেসোআমেরিকান কাহিনী তৈরি করেন বলে দাবি করেন সহ-লেখক ফারহাদ সাফিয়ানা।২০ যা ইউকেটেক মায়া ভাষায় রূপান্তর করেন তরুণ মায়া অধ্যাপক হিলেরিও শি ক্যানাল। তিনি পরবর্তীতে এই ছবির ডায়ালগ কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর গিবসন ও সাফিনিয়া গুয়েতেমালা কোস্টারিকা ও ইউকাতানে যান মায়াদের সার্বিক পরিস্থিতি নিজে অবলোকন করতে এবং ফিল্ম লোকেশন ঠিক করতে।

ঐতিহাসিক যথার্থতা রক্ষার জন্যও প্রাণপণ চেষ্টা করা হয়। এছাড়া পরিচালক একজন কনসালটেন্ট বা পেশাদার উপদেষ্টা নিয়োগ করেন। ইডাহো স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও মায়া সাম্রাজ্যর ওপর কাজ করা এই ব্যক্তির নাম রিচার্ড ডি হ্যানসেন। হ্যানসেনের সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে গিবসন বলেন,রিচার্ডের প্রবল উৎসাহ আমাদেরকে দ্রুত প্রভাবিত করে এবং আমাদেরকে পুনঃনিশ্চয়তা দিতে সক্ষম হয়। আমাদেরকে নিশ্চিত করে যে, আমরা যথার্থ কাহিনী পেয়েছি।২১ একইভাবে সেট-ডিজাইনের ক্ষেত্রে কম্পিউটারের আশ্রয় না নিয়ে প্রোডাকশন ডিজাইনার থমাস ই স্যার্ন্ডাসের মডেল বাস্তবে তৈরি করার মাধ্যমে সত্যিকারের মায়া সিটির লুক দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। রিচার্ড হ্যানসেনের মতে, পোস্ট-ক্ল্যাসিক সময়ে মায়াদের এমন কিছুই অবশিষ্ট ছিলো না, যা ছবির পিরামিডের আয়তন ও রাজকীয় ক্ষমতার সঙ্গে মানানসই হবে। কিন্তু চেষ্টা করা হয়েছে প্রাচুর্য, বিশাল সম্পদ ও ভোগকৃত সম্পদের নিদর্শন দেখাতে।

 

পরিচালনা ও অভিনয়ের দক্ষ সম্মিলন

চলচ্চিত্রবোধ, প্রস্তুতি, গবেষণা, অনুশীলন ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই তৈরি হয় একটি সফল চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রনির্মাতা হিসেবে মেল গিবসন সবসময়ই সাহসী ও দুর্দান্ত; এর প্রতিফলন হয়েছে অ্যাপোক্যালিপ্টো-তেও। গাস্তঁ রোবের্জ বলেছেন, চলচ্চিত্র হলো চিত্রনির্মাণের পুঙ্খানুপুঙ্খ পরিকল্পনা, রচনা ও সেই পরিকল্পনার রূপায়ণ। অ্যাপোক্যালিপ্টো-তে গিবসন এর পুরোটাই করতে পেরেছেন বলে আমার মনে হয়। পরিচালনা ও অভিনয়ে সত্যিই আমি চমৎকৃত। এখানে উদাহরণ হিসেবে আমি কয়েকটি দৃশ্য আলোচনা করার চেষ্টা করেছি।

শান্তিকামি উপজাতি গ্রামটি ধর্ষকাম আক্রমণকারীদের হাতে নির্যাতিত হয়ে বন্দি হওয়ার প্রথম পর্যায়ে ছবির মূল চরিত্র জাগুয়ার পো তার গর্ভবতী স্ত্রী ও ছেলেকে আক্রমণকারীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে নিবাসের পাশের একটি গুহায় রেখে তার সতীর্থদের বাঁচাতে ফিরে আসে। এ-সময় তার স্ত্রী ও ছেলে ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে বারবার অনুরোধ করে-সে যেনো তাদের সঙ্গে গুহায় অবস্থান করে; কিন্তু জাগুয়ার পো তাদেরকে ভয় না পেয়ে দৃঢ় হতে বলে এবং প্রতিজ্ঞা করে-সে ফিরে আসবেই। শেষ পর্যন্ত সে নিজেও বন্দি হয় এবং ভাগ্য, বুদ্ধি ও আত্মপ্রত্যয়ের জোরে ফিরে আসে। তার এই ফিরে আসাটা সহজ ছিলো না। জাগুয়ার পো-এর এই ফিরে আসা এবং তার ফিরে না-আসা পর্যন্ত অসহায় গর্ভবতী স্ত্রী ও ছেলের গুহায় অবস্থানকালে বেঁচে থাকার যুদ্ধ; এই দুটি বিষয় আমার এখনকার আলোচ্য।

অ্যাকশন চেসিং ফিল্মে সাধারণত এক বা একাধিক হিরো অভিঘাত করে শ্রেণি পরস্পরে। যেখানে প্রয়োজন হয় শারীরিক কৃতিত্ব, বিস্তৃত লড়াই ও ক্ষিপ্ত অভিযানের। এখানে চরিত্রগুলোর প্রবণতা থাকে বিস্ময়কর প্রতিকূলতা অতিক্রম করা, যেখানে দুষ্কৃতিকারীর হাতে জীবন থাকে আশঙ্কাজনকভাবে হুমকির মুখে। কঠিন শারীরিক প্রচেষ্টা ও হিংস্রতার ক্রমাগত তাড়া থেকে শেষ পর্যন্ত জয়ের প্রচেষ্টা করা হয়।২২ প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতির মাধ্যমে যেটিকে ফুটিয়ে তোলা হয়। যেমন : কম্পিউটার অ্যানিমেশন, মোটরগাড়ি, বাইক বা এয়ারক্র্যাফ্ট ব্যবহার অবধারিত। গিবসনের কৃতিত্বটা এখানেই, যেখানে প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতির ঊর্ধ্বে শুধু জীবনের জন্য একজন লোকের নিরবচ্ছিন্ন দৌড়কে পুঁজি করে সত্যিকারের একটি অ্যাকশন চেসিং ফিল্ম নির্মাণ করেছেন। জাগুয়ার পো-এর এই ফুট চেসিং, কার, বাইক বা বিমান চেসিং থেকে কোনো অংশেই কম ছিলো না। যা পরিচালক ও অভিনেতাদের যৌথ প্রয়াসে সম্ভব হয়েছে।

অ্যাকশন চেসিং-টি শুরু হয় ছবির ৮৬ মিনিট থেকে। কাকতালীয়ভাবে, দৈবাৎ সূর্যগ্রহণের ফলে নরবলি থেকে মুক্তি পায় অবশিষ্ট বন্দিরা। এরপর তাদেরকে নিয়ে আসা হয় বল কোর্টে। বল কোর্টের একপ্রান্তে জোড়া করে অর্থাৎ একসঙ্গে দুজন করে বন্দিকে হাতের বাঁধন কেটে দৌড়াতে বাধ্য করা হয়, আর অন্য প্রান্তে ফিনিশার হিসেবে পাঠানো হয় জিরো উল্ফ এর ছেলে কাট রক-কে। প্রথম দুজনের একজন ভারি পাথরের আঘাতে ধরাশায়ী হওয়ার পর, তাকে শেষ করার কাজটি করে কাট রক এবং অন্যজন লুটায় পড়ে থাকে বল্লম বিদ্ধ হয়ে। এর পরের পালা জাগুয়ার পো এবং শরণার্থী নেতার-যার সঙ্গে ছবির প্রথমেই শিকার করার সময় দেখা হয়েছিলো জাগুয়ার পো-এর। প্রথম দুজন বন্দি সোজাসুজি বল কোর্টের অন্য প্রান্তে পৌঁছানোর চেষ্টা করলেও জাগুয়ার পো ও তার জোড়সঙ্গী আঁকাবাঁকাভাবে দৌড়ানো শুরু করে যাতে সহজে লক্ষ্যভ্রষ্ট না হয়। প্রায় সফলও হয়েছিলো তারা, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পিছন থেকে তীর ছুড়লে শরণার্থী নেতার মাথার মাঝামাঝি হয়ে মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায়, আর জাগুয়ার পো-কে কেউই কোনোভাবে কোনো অস্ত্রই লাগাতে পারছিলো না। শেষ পর্যন্ত জিরো উল্ফ-এর নিজের মারা একটি তীর জাগুয়ার পোর ডান দিকে কোমরের ঠিক একটু উপরে পার্শ্বভাবে বিদ্ধ হয়। উল্ফ শিবিরে অনেকটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফিরে আসে। কিন্তু এরপর ফিনিশার হিসেবে কাট রক কাছে আসলে তাকে পিছন থেকে পা ধরে আটকায়ে দেয় জাগুয়ার পোর বন্ধু; যে প্রথম জোড়ায় বল্লম বিদ্ধ হয়ে পড়েছিলো, সে বন্ধু জাগুয়ার পোকে পালাতে বলে। কাট রক তার বন্ধুকে সজোরে মারতে থাকে, ইতোমধ্যে জাগুয়ার পো তাকে বিদ্ধ তীরের অর্ধেকটা ভেঙে বের করে ফেলে। এরপর কাট রক তার কাছে আসলে তার গলা কেটে ভূপাতিত করে। অন্য প্রান্ত থেকে এই দৃশ্য দেখার পর জিরো উল্ফ শিবিরের চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়, তারা ক্ষিপ্র গতিতে রকের কাছে আসে কিন্তু ততোক্ষণে জাগুয়ার পো তীরের বাকি অংশটা বের করে হোঁচট খেতে খেতে জঙ্গলের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে।

অদূরে সুসজ্জিত প্রতিপক্ষ, জীবন যেখানে আশঙ্কাজনকভাবে হুমকির মুখে, তারপরেও হামলাকারী দলনেতার ছেলেকে মেরে শারীরিক প্রচেষ্টায় পালিয়ে যাবার আত্মপ্রত্যয়ী বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত; পরিচালনা, অভিনয়, দৃশ্য পরম্পরার একটি বাস্তবিক যথার্থ প্রয়োগ মনে হয়েছে। ফিল্ম চেসিং এর গভীরতাটাও এখান থেকে ক্ষিপ্র থেকে ক্ষিপ্রতর হয়।

জাগুয়ার পো বল কোর্ট থেকে বেরিয়ে শুকিয়ে যাওয়া ভুট্টার ক্ষেত ও উন্মুক্ত ভাগাড়ের উপর দিয়ে দৌড়াতে থাকে। ক্রুদ্ধ জিরো উল্ফ ও তার আট সহযোগী তাকে ধরতে পিছন পিছন দৌড়াতে থাকে। শেষ পর্যন্ত জাগুয়ার পো একটি গাছে ওঠে। ক্রমাগত তাড়াকারীরা তাকে অতিক্রম করে চলে যায়। জাগুয়ার পো অনেকটা হাফ ছেড়ে বাঁচে। ধাওয়াকারীরা তাকে অতিক্রম করার সময় জাগুয়ারের তীরবিদ্ধ স্থান থেকে এক ফোঁটা রক্ত পড়ে হামলাকারীদের সেকেন্ড ইন কমান্ড মিডল আই-এর পিঠে এবং দুর্ভাগ্যক্রমে গাছটি ছিলো একটি কালো জাগুয়ারের২৩ আস্তানা। এখান থেকে বাঁচতে আবার শুরু হয় পো-র পালিয়ে বাঁচার লড়াই; দৌড়াতে আরম্ভ করে পো। দুই জাগুয়ারের দৌড়! ইতোমধ্যে কিছুদূর যাওয়ার পর জিরো উল্ফরা বুঝতে পারে যে, এ-পথে শিকার পো আসেনি, তাই তারা থেমে যায়। এমন সময় এক সহযোগী দেখতে পায় তাদের সেকেন্ড ইন কমান্ডের পিঠের উপর এক ফোঁটা রক্ত; তখন তাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, শিকার গাছের উপর লুকিয়েছে, তাই তারা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এবার টার্গেট গাছের উপর। কিছুক্ষণ পর হামলাকারীরা দেখতে পায় পো তাদের দিকে এগিয়ে আসছে, তারা শিকার পাকড়াও করতে এগিয়ে যায়। কিন্তু এ-লড়ায়ে জাগুয়ার পোই জয়ী হয়। তার ক্ষিপ্র গতির দৌড়ে কালো জাগুয়ার হেরে যায়; কিন্তু হামলাকারীর একজনকে শিকারে পরিণত করে। দলের একজনকে হারিয়ে জিরো উলফের এক সহযোগী বলে, এটা অশুভ কোনো কিছুর পূর্ব লক্ষণ। দলকে উদ্যোমী করতে প্রতিউত্তরে দলনেতা জিরো উল্ফ বলে, এসব কিছুই না; সে প্রাণপণে ছুটছে কারণ সে ভয় পেয়েছে।

এই দৃশ্যে অভিনয়, পরিচালনা, ক্যামেরাম্যান থেকে শুরু করে অ্যানিমেল ট্রেইনার পর্যন্ত এমন দক্ষ নিপুণ কারুকার্য দেখিয়েছেন যে, উত্তেজনাকর এই দৃশ্যকে কাল্পনিক সৃষ্টি ভাবতে বেশ সময়ের প্রয়োজন। পথিমধ্যে হামলাকারীদের আরেকজন বিষধর সাপের কামড়ে মৃত্যুবরণ করে। জাগুয়ার পো সারারাত ধরে বিরামহীনভাবে দৌড়াতে থাকে। অবশেষে একটি উঁচু জলপ্রপাতের সামনে উপস্থিত হয় সে। সামনে জলপ্রপাত আর পিছনে আক্রমণকারীরা। এ-অবস্থায় কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে জাগুয়ার পো সিদ্ধান্ত নিয়ে লাফিয়ে পার হয় জলপ্রপাত। তারপর চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বলে,আমি জাগুয়ার পো, ফ্লিন্ট স্কাইয়ের সন্তান, আমার বাবা আমার আগে এই বনে শিকার করতো, আমি একজন শিকারি, এটা আমার বন, আমি মারা যাওয়ার পর আমার ছেলে তার সন্তানদের নিয়ে এই বন শিকার করবে, আসো! ধরতে পারলে, আমাকে ধরো! জলপ্রপাতের উপরে দাঁড়িয়ে থাকা আক্রমণকারীরা এই চ্যালেঞ্জ শোনার পর তারাও জলপ্রপাত পাড়ি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

নিজ বনে অনেকটা আত্মবিশ্বাস নিয়ে গন্তব্যে যাত্রা শুরু করে জাগুয়ার পো। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই হোঁচট খেয়ে সে চোরাবালিতে পড়ে যায়। চোরাবালি থেকে উপরে উঠতে সে অবলম্বন হিসেবে একটি ঝুলন্ত গাছের লতা পেয়ে যায়, সেটাকে আঁকড়ে তীরে উঠার চেষ্টা করে। কিন্তু লতাটি এক পর্যায়ে ছিঁড়ে যায়। চোরাবালিতে সর্বস্ব ডুবে যায় পো। অবশেষে ডুবন্ত অবস্থায়ই কোনো রকমে তীরে উঠতে সক্ষম হয়। চোরাবালির কাদা তার সারা শরীরে এমনভাবে লেগে যায় যে, তাকে চেনার উপায় থাকে না, গায়ে লাগানো কাদা এবং চেনা বনের অস্ত্র হিসেবে সে প্রথম একটি ভীমরুলের বাসা শত্রুপক্ষের দিকে ছুড়ে মারে। দ্বিতীয় অস্ত্র হিসেবে সে ব্যবহার করে ট্রি টোডে২৪ বিষ, এটিকে গাছের বড়ো বড়ো কাঁটার মধ্যে লাগিয়ে শাণিত ক্ষেপণাস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। এ-বিষ কাজে লাগিয়ে জলপ্রপাত পাড়ি দেওয়া আরেকজনকে মারতে সক্ষম হয় পো।

একজনকে ধরাশায়ী করতে পেরে পো আরও আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে নিজের শক্তির প্রতি আবারও বিশ্বাস ফিরে পায়। ধরাশায়ীর অস্ত্র নিতে পো তার কাছে আসতে থাকে। কিন্তু সামনে দেখতে পায় দলের সেকেন্ড ইন কমান্ড মিডল আইকে; যে-গ্রাম আক্রমণের সময় জাগুয়ার পোর বাবাকে তার সামনে গলা কেটে মেরে ফেলেছিলো। রাগ-ক্ষোভের পুরো অভিব্যক্তি ফুটে ওঠে ক্ষিপ্ত জাগুয়ার পো ও মিডল আই-র অভিব্যক্তিতে; এরপর দুজনই ছুটছে! মুখোমুখি লড়বে এবার। জাগুয়ার অস্ত্রহীন আর আই অস্ত্রসজ্জিত, কাছাকাছি দুজন, জাগুয়ার এর কাছ থেকে অস্ত্রটি মাত্র হাত তিনেক দূরে, মিডল আই দুই হাত উঁচিয়ে সর্বশক্তি দিয়ে আঘাত করতে চেষ্টা করছে, আঘাত এড়ানোর জন্য জাগুয়ার চলন্ত হাঁটুগেড়ে মাথাটা হেলিয়ে টার্গেট করে অস্ত্রটি হাতে নেওয়ার! উদ্দেশ্য দুটি-মিডলের আঘাতকে লক্ষ্যভ্রষ্ট করা আর অস্ত্রটিকে হাতের মুঠোয় নেওয়া। আত্মদীপ্ত জাগুয়ার এবার অনেকটা সফল। মিডল পিছন ফিরে তাকানোর আগেই জাগুয়ার পিছন থেকে সজোরে আঘাত করে মিডল-এর মাথায়। আঘাতপ্রাপ্ত  মিডল আই-এর মাথায় ডানদিকে কানের ঠিক উপর দিয়ে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরুতে থাকে। জাগুয়ারের ক্ষোভ যেনো থামে না, আবার সজোরে আঘাত করে, এবার সম্পূর্ণভাবে ভূপাতিত মিডল। এই দৃশ্যটি আমার কাছে ফিল্মের সবচেয়ে জীবন্ত দৃশ্য মনে হয়েছে। অ্যাকশন পরিকল্পনা, অভিনয়ের শারীরিক কসরত, মানসিক অভিব্যক্তি, পরিচালনার এক অদ্ভুত সম্মিলন, বিশেষত মিডল আই এর মাথা দিয়ে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হওয়ার দৃশ্যটি। এটি করার জন্য পরিচালকের পরিকল্পনা কী ছিলো আমি জানতে পারিনি, তবে তা কোনোভাবেই বাস্তবের থেকে একটুও কম মনে হয়নি।

একটু হাফ ছেড়ে বাঁচার আগেই বৃষ্টি শুরু হয়, জাগুয়ারের চোখেমুখে আতঙ্কের ছাপ। নিজের জন্য নয়, পরিবারের জন্য। শেষ অবধি, সে প্রতিজ্ঞা অনুযায়ী ফিরে আসে গুহার কাছে, স্ত্রী ও ছেলে আকুতি জানায় তাদেরকে গুহা থেকে দ্রুত উদ্ধার করতে। স্ত্রী ও ছেলেকে কিছু বলার আগেই পিছনে উল্ফের অবশিষ্ট তিন সদস্য তীর মারতে থাকে, ফলে আবার বাঁচার জন্য দৌড়াতে শুরু করে পো। একটু পরেই হঠাৎ থেমে যায় জাগুয়ার পো, দেখতে পায় তাদেরই পশু শিকারের একটি ফাঁদ পাতানো আছে। একটু পাশ কাটিয়ে সামনে গিয়ে দাঁড়ায় পো, ততোক্ষণে জিরো উল্ফ ফাঁদের হাত পনেরো দূর থেকে তাকে লক্ষ্য করে একটি তীর মারে, চেষ্টা করেও নিজেকে তীরের লক্ষ্য থেকে বাঁচাতে পারে না, তীর গিয়ে বিদ্ধ হয় পো-এর বুকের বাম দিকের উপরে। উল্ফ এবার অবশেষে শিকার ধরতে পেরেছে বলে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে।

জাগুয়ার বিদ্ধ তীরটি টেনে বের করে উঠে দাঁড়ায়, আর উল্ফ তীর-ধনুক ফেলে দিয়ে হাতের ছোরাটি বের করে এবং জাগুয়ার পো-র দিকে এগুতে থাকে, এই ভেবে যে-নিজ হাতে তাকে মারবে। আর জাগুয়ার পো অনেকটা আত্মবিশ্বাসের স্বরেই উল্ফকে তার কাছে আসতে স্বাগত জানায়! কারণ জাগুয়ার জানতো, সে এমন জায়গায় আছে-তাকে যদি উল্ফ ধরতে আসে তাহলে ফাঁদ অতিক্রম করে আসতে হবে। ছোরা হাতে দৌড় শুরু করে উল্ফ, টার্গেট জাগুয়ার, দাঁড়িয়ে আছে! এক-দুই-তিন এভাবে ১৫ কদম ফেলতেই কিছু বুঝে উঠার আগেই ফাঁদে আটকে পড়ে উল্ফ। শারীরিকভাবে অক্ষম হয়ে পড়লেও উল্ফ দাঁত-মুখ-চোখ খেঁচিয়ে হাতের ছোরা উঠাতে উদ্যত হয়, ততোক্ষণে পুরোপুরি ঢলে পড়ে জিরো উল্ফ।

কিন্তু মৃত উল্ফ-এর পিছনে হাজির অবশিষ্ট দুজন আক্রমণকারী ও তীরবিদ্ধ জাগুয়ার পো আবার ছুটতে শুরু করে। জাগুয়ার পো উপস্থিত হয় সমুদ্র তীরে, পিছনে হাজির বাকি দুই উল্ফ সদস্য। অপ্রত্যাশিতভাবে তিন জনেই দেখতে পায় কনকুইসটেডর এর নোঙ্গর এবং তারা ডাঙ্গার দিকে আসছে। এই প্রচণ্ড বিস্ময়ই জাগুয়ার পো-কে শেষ পর্যন্ত মুক্ত করে।

গুহায় অবস্থানকালীন প্রতিকূল অবস্থায় জাগুয়ারের গর্ভবতী স্ত্রী ও ছেলে সন্তানের বেঁচে থাকায় লড়াই এবং মা ও সন্তানের যে-সম্পর্ক তুলে ধরেছেন গিবসন তা সত্যিই হৃদয়স্পর্শক। গুহায় যখন বৃষ্টির পানি পড়ছে, তখন মা চেষ্টা করছে সন্তানকে তুলনামূলক উঁচু জায়গায় রাখতে। আবার মা যখন প্রসব বেদনায় কাতরাচ্ছিলো সন্তান তখন ছুটে আসে পানিতে মায়ের কাছে; মা তখন অনেকটা আদেশের সুরেই বলে, যাও! ফিরে যাও! এবার যখন গুহায় পানি মাথা পর্যন্ত পৌঁছে গেছে মা তখন সন্তানকে ঘাড়ের উপর নিয়ে, নিজে পানির মধ্যে ডুবে থাকে আর নিশ্বাস নেওয়ার জন্য উঁচু একটু জায়গা খুঁজতে থাকে; অবশেষে পানির নিচে একটি পাথরের সন্ধান পায় এবং তার উপর দাঁড়িয়ে থাকে। মায়ের প্রসব বেদনা তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। শেষ পর্যন্ত বাচ্চা প্রসব করে হাতে নেয়। ঘাড়ে এক ছেলে, আর হাতে এক ছেলে। এমন কষ্টের মধ্যেও পরিবারে নতুন সদস্যর আগমনের যে-কী আনন্দ! তা ক্ষণিকের জন্য হলেও বোঝা গেলো মা ও বড়ো ছেলের চোখেমুখে। জাগুয়ার পো মুক্ত হয়ে ফিরে এসে দেখতে পায়-তার স্ত্রী সেভন ঘাড়ে এক সন্তান আর হাতে এক সন্তান নিয়ে জাগুয়ারের ফিরে আসার প্রতীক্ষায় পথ চেয়ে অপেক্ষা করছে।

জাগুয়ার পো তার স্ত্রী ও পুত্রের কাছে ফিরে আসা এবং তার ফিরে না আসা পর্যন্ত গর্ভবতী স্ত্রী ও ছেলের অসহায় গুহায় অবস্থানকালীন বেঁচে থাকার যুদ্ধ; ব্যক্তির মন ও পরিবেশের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ীই ঘটেছে, কাল্পনিক কিছু নয়। কারণ ব্যক্তি-মন শুধু সচেতন নয়; ব্যক্তি-মন আত্মসচেতন। ব্যক্তি তার পরিবেশের উপর ক্রিয়া করে এবং সে তার পরিবেশ ও প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে সচেতন। ব্যক্তি-মন আত্ম-নির্ধারণের ও আত্ম-নিয়ন্ত্রণের অধিকারী। এর মাধ্যমেই সূচিত হয় ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব। প্রতিটি মুহূর্তে তাকে অসংখ্য মনস্তাত্ত্বিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। ক্রিয়া করাই ব্যক্তি-মনের ধর্ম। মানুষ তার পরিবেশের উপর ক্রিয়া করে পরিবেশের মধ্যে পরিবর্তন আনে, আর পরিবেশ মানুষের উপর ক্রিয়া করে তার কর্মশক্তিকে উদ্বুদ্ধ করে।

 

সহিংসতা বা হিংস্রতা নয়; বিরোধ, মনোভাব ও প্রত্যাশার যোগাযোগ

জেমস ড্রেভার তার A dictionary of psychology গ্রন্থে বলেছেন, বিরোধ হলো পরস্পর-বিরুদ্ধ আবেগ বা ইচ্ছার মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, যা আবেগগত উত্তেজনা সৃষ্টি করে, যা প্রায়ই খুব অসন্তোষজনক হয় এবং যা মনাঃসমীক্ষণ সম্পর্কীয় মতবাদ অনুসারে কোনো একটি আবেগের অবদমনে পরিণতি লাভ করে। আর লেউইন বিরোধ সম্পর্কে বলেন, এটা এমন একটা পরিস্থিতি, যে-পরিস্থিতিতে পরস্পর বিপরীত দিকে চালিত, যুগপৎ কার্যকর প্রায় সমক্ষমতাসম্পন্ন শক্তি ব্যক্তির উপর ক্রিয়া করে।২৫ অর্থাৎ বিরোধ বলতে আমরা বুঝবো পরস্পরবিরোধী আবেগ, বাসনা বা প্রবণতার যুগপৎ ক্রিয়া বা কোনো ব্যক্তির সেই অবস্থা যখন পরস্পর-বিরুদ্ধে আবেগ বা প্রতিক্রিয়া-প্রবণতা তার মধ্যে সক্রিয় হয়ে ওঠে। সুতরাং বিরোধের মূল কথা হলো, কোনো ব্যক্তির বা গোষ্ঠীর অন্য ব্যক্তির বা গোষ্ঠীর প্রচেষ্টাতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা, যখন উভয় দলই একই বস্তু কামনা করে। যেমনটি আমরা অ্যাপোক্যালিপ্টোতে দেখতে পেয়েছি। জাগুয়ার পো, জিরো উলফে ওপর ক্ষিপ্ত, কারণ তারা তাদের শান্তি বিনষ্ট করে হত্যা, ধর্ষণ ও বন্দি করেছে। অন্যদিকে, উল্ফ গ্রুপ জাগুয়ারের উপর ক্ষিপ্ত কারণ সে তাদের অবাধ্য হয়েছে; এমনকি দলনেতার ছেলে কাট রককে মেরে পালিয়েছে। এভাবেই তাদের মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়।

বিরোধ থেকেই অনেক সময় মানুষের মনোভাব তৈরি হয়। সমাজ মনোবিজ্ঞানীগণ মনোভাবকে বিভিন্নভাবে দেখার চেষ্টা করেছেন। অলপোর্ট এর মতে,পারিপার্শ্বিক বস্তু ও অবস্থার প্রতি ব্যক্তির অভিজ্ঞতালব্ধ গতিশীল প্রতিক্রিয়া ও মানসিক প্রস্তুতি। অর্থাৎ কোনো বিষয় বা বস্তুর প্রতি ব্যক্তির অপেক্ষাকৃত স্থায়ী ক্রিয়াশীল প্রতিক্রিয়া বা ব্যক্তির মূল্যায়ন করার প্রবণতা। বল কোর্ট থেকে বেরিয়ে, জাগুয়ার পো-এর এক ধরনের মনোভাব তৈরি হয়, সুযোগ যেহেতু এসেছে পুনঃজীবনের-তাই সেটাকে কাজে লাগায় পো। এর প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই, জলপ্রপাতের নিচ থেকে উল্ফ গ্রুপকে যখন জাগুয়ার পো চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় তখনও। অন্যদিকে, উল্ফ বাহিনীরও এক ধরনের বিরোধী-মনোভাব ছবিতে লক্ষ করা যায় বিভিন্ন সময়ে; এমনকি জাগুয়ার পো-কে ধরতে পারলে তার গায়ের চামড়া খুলে নিজের গায়ের পোশাক বানানোর মনোভাবের কথা পর্যন্ত বলে।

বিরোধ ও মনোভাব থেকেই শুরু হয় চেসিং-বা ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া। বাঁচা ও টিকে থাকার লড়াই। ব্যক্তিগত গুণাবলির প্রভাব ছাড়াও নির্দিষ্ট ফলাফল লাভের জন্য ব্যক্তির যে-প্রত্যাশা থাকে, তা তার আচরণকে এমনভাবে পরিচালিত করতে পারে যার ফলে ব্যক্তির ওপর তার অনিচ্ছাকৃত প্রভাব পড়ে। এর ফলে তার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ভ্রান্তভাবে সমর্থিত হতে পারে। যেসব আচরণ প্রত্যাশার প্রভাব বহন করে বলে ধারণা করা হয়, সেগুলো নানাবিধ কৌশল অবলম্বন করে। আত্মরক্ষামূলক মনোভাবে বিভিন্ন বিষয়ের প্রতি সংবেদনশীল হয় এবং নিজেকে রক্ষা করতে সেগুলো সে ব্যবহার করে। অ্যাপোক্যালিপ্টো-কে অনেক সমালোচক নৃশংস, বর্বর, হিংস্র ও সহিংস বলেছেন। কিন্তু আমার কাছে তা মনে হয় না। কারণ, অ্যাপোক্যালিপ্টো-এর কাহিনী বিন্যাস অনুযায়ী মানব প্রকৃতির স্বরূপ অন্বেষণ করলে প্রত্যেকটি বিষয়কে প্রাসঙ্গিক মনে হয়। এমনকি নরবলি নিয়েও আমার কোনো অভিযোগ নেই। কারণ, ইতিহাস বলে-মায়ারা তাদের দেবতাকে খুশি করার জন্য নরবলি দিতো। গিবসন মায়াদের একটি বৈশিষ্ট্যই তুলে ধরেছেন।

 

গিবসনের দ্য নিউ বিগিনিং

সিনেমার একেবারে শেষ দৃশ্যে, লড়াই শেষে মুক্ত জাগুয়ার পো পরিবার যখন সমুদ্রতীরে আসে; তখন কনকুইসটেডরদের নোঙর করা জাহাজের দিকে নির্দেশ করে স্ত্রী সেভন; সে স্বামী জাগুয়ার পো-র কাছে জানতে চায়, তীরে নোঙর করা জাহাজগুলো কার, তারা কারা? জাগুয়ার পো বলে, তারা মানুষ (আমাদেরকে) নিতে এসেছে। স্ত্রী অনেকটা আশা ও মিনতির সুরে বলে, আমাদের কি তাদের সঙ্গে যাওয়া উচিত? প্রত্যুত্তরে সবকিছু হারিয়ে একঅর্থে নিঃস্ব জাগুয়ার কিছুক্ষণ ভেবে আবেগতাড়িত কণ্ঠে বলে, নতুন জীবনের অন্বেষণে আমাদের উচিত বনেই থেকে যাওয়া! এ-বলেই জাগুয়ার পো বড়ো ছেলের মাথায় একটু নাড়া দিয়ে বনের ভিতরে নতুন জীবনের আহ্বানে চলতে শুরু করে। এতে ছেলেকে খানিকটা আনন্দিতই দেখায়, কিন্তু স্ত্রী একটু দাঁড়িয়ে জাহাজগুলোর দিকে তাকিয়ে অনেকটা নিরাশভাবেই স্বামী-সন্তানের পিছনে নতুন যাত্রায় সামিল হয়।

সামনে তথাকথিত নতুন সভ্য জীবনের হাতছানি থেকে মুখ ফিরিয়ে বনের মধ্যেই নতুনভাবে জীবন শুরু করার দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেয় জাগুয়ার পরিবার। এটাই হচ্ছে গিবসনের ভাষ্যমতে,দ্য নিউ বিগিনিং। কারণ, আমরা জানি মানুষের আচরণ তার পরিবেশ, জ্ঞান, চিন্তাধারা, বিশ্বাস, মনোভাব প্রভৃতি দ্বারা পরিচালিত হয়। আমার মনে হয়, এর মাধ্যমে গিবসন সামাজিক প্রেষণার ইঙ্গিত করেছেন। কোনো একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে কেনো দুজন ব্যক্তি দুভাবে প্রতিক্রিয়া করে, কেনো একজনের কাছে যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, অন্যজনের কাছে তা অতি তুচ্ছ বিষয়-তা বিশ্লেষণ কেবল পারিপাশ্বিক পরিবেশগত উপাদান দ্বারা ব্যাখ্যা সম্ভব নয়। পরিবেশ থেকে শিক্ষালব্ধ ব্যক্তির অন্তর্নিহিত চাহিদা বা প্রেষণার বিশ্লেষণেই এই ব্যক্তি-পার্থক্যের ব্যাখ্যা দিতে পারে। ব্যক্তির অভ্যন্তরের এই প্রেষণা বা চাহিদাগুলো সে অর্জন করে সমাজ থেকেই। আর সেই অর্জিত বা শিক্ষালব্ধ সামাজিক প্রেষণাগুলোই তার সামাজিক আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে। সামাজিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া এবং সেই থেকে সম্বন্ধযুক্ত কিছু ব্যক্তির ঐক্য হলো গোষ্ঠী। পরস্পরবিচ্ছিন্ন বা স্বতন্ত্র এই ঐক্যকে যদি ফলপ্রসূ করে তুলতে হয়, তাহলে ব্যক্তিদের পৃথক ও ভিন্নপথগামী প্রকৃতির ওপর এই ঐক্যকে ছেড়ে দিলে চলে না। এই ঐক্যকে কার্যকরী করে তোলার দায়িত্ব ন্যস্ত হয় কোনো নেতার ওপর, যার মধ্যে গোষ্ঠীর অন্যান্য ব্যক্তিদের তুলনায় গোষ্ঠীর মূল্য, গোষ্ঠীর অস্তিত্ব ও স্থায়িত্ব মূর্ত হয়ে ওঠে।

 

শেষ কথা

দক্ষ নির্মাতা হিসেবে মেল গিবসনের অ্যাপোক্যালিপ্টো একটি অসাধারণ, চমৎকার, সাড়ম্বরপূর্ণ ও জমকালো সিনেমা এতে কোনো সন্দেহ নেই। নির্দেশনা, পোশাক-পরিচ্ছদ, আনুষঙ্গিক উপকরণ ও অন্যান্য খুঁটিনাটির ব্যাপারে নির্মাতার একপ্রকার স্বাধীনতা থাকেই; তার বহিঃপ্রকাশ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ছবিতে আমরা দেখেছি, যেমন-পাল্ হার্বার-এ আধুনিক যুদ্ধ জাহাজের ব্যবহার করা হয়েছে, দ্য লাস্ট সামুরাই-এ ক্ষেতমজুরকে কাণ্ডজ্ঞানহীনভাবে জাপানিদের ঐতিহ্যবাহী ঢিলা আলখাল্লা জাতীয় ব্যয়বহুল পোশাক পরানো হয়েছে, আবার খাবার হিসেবে জই মণ্ড এর বদলে সাধারণ ভাত খাওয়ানো দেখানো হয়েছে। এরকম অনেক ইস্যু নিয়ে গিবসন কঠিন সব কাজ করেছেন এবং এক্ষেত্রে সে অনেকটা সফলও বলা চলে। কিন্তু গিবসন মায়া সিটির বিলুপ্তি, স্প্যানিশদের আগমন ও মায়াদের বৈশিষ্ট্য সঠিকভাবে তুলে ধরতে না পারায় অ্যাপোক্যালিপ্টো ঐতিহাসিক সিনেমার গুণাগুণ ধরে রাখতে পারেনি। তবে অ্যাকশন চেসিং ফিল্ম হিসেবে অ্যাপোক্যালিপ্টো নতুন এক দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছে। সামাজিক বিবৃতি হিসেবে চলমান সমাজ ব্যবস্থায় অবক্ষয়ের কারণও রূপক অর্থে সঠিকভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন।

 

লেখক :এ বি এম সাইফুল ইসলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়ান।

mon_mcru@yahoo.com

 

তথ্যসূত্র

১. http://www.languagehat.com/archives/002165.php.Retrieved on December 13, 2012

২. http://abcnews.go.com/Primetime/Story?id=2670750&page=1#.UM1KW6xCjmA. Retrieved on December 13, 2012

৩. Reed Johnson (October 29, 2005). "Mel Gibson's latest passion: Maya culture". Los Angeles Times. Retrieved on December 13, 2012

৪. http://abcnews.go.com/Primetime/Story?id=2670750&page=1#.UM1KW6xCjmA. Retrieved on December 13, 2012

৫. "Lost Kingdom: Mel Gibson's Apocalypto". ABC Primetime. Retrieved on December 10, 2012

৬. মায়া সংস্কৃতিতে বলি ছিলো একটি ধর্মীয় আচার। দেবতাকে খুশি করার জন্য পশু বা মানুষকে কমিউনিটি মানুষদের সম্মুখে নির্দিষ্ট স্থানে মাথা কেটে উৎসর্গ করা হতো।

৭. http://www.history.com/topics/maya Retrieved on December 10, 2012

৮. এ-নিবন্ধটি বিস্তারিত পড়তে লগইন করতে পারেন

http://web.ebscohost.com/ehost/pdfviewer/pdfviewer?vid=3&hid=21&sid=c60091ff-2d89-448d-a627-81b09de731a9%40sessionmgr12 Retrieved on December 13, 2012

৯. ১৬০০ খৃষ্টাব্দের পূর্বে স্প্যানিশ বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত মেক্সিকো ও সেন্ট্রাল আমেরিকান জনগণকে বর্ণনা করতে এই টার্মটি ব্যবহার করা হতো।

১০. যেসব স্প্যানিশ নাগরিক ১৬০০ খৃস্টাব্দে মেক্সিকো ও পেরুতে প্রভুত্ব স্থাপন করতে আসে।

১১. http://www.archaeology.org/online/reviews/apocalypto.html Retrieved on December 13, 2012

১২. http://www.history.com/topics/maya Retrieved on December 13, 2012

১৩. রায়, সত্যজিৎ (১৯৮২ :৪৮); চলচ্চিত্র-রচনা : আঙ্গিক, ভাষা ও ভঙ্গি; বিষয় : চলচ্চিত্র; আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, ১৯৮২।

১৪. দাশগুপ্ত, ধীমান (২০০৩ : ৬); চিত্রনাট্য রচনা ও চিত্রনাট্য বিশেষণ; বাণীশিল্প, ১৪এ টেমার লেন, কলকাতা।

১৫. http://www.wildaboutmovies.com/movies/ApocalyptoMovieTrailerPosterMelGibson.php Retrieved on December 16, 2012

১৬. http://today.msnbc.msn.com/id/15001985#.UNAcYqxCjmA Retrieved on December 16, 2012

১৭. Reed Johnson (October 29, 2005). "Mel Gibson's latest passion: Maya culture". Los Angeles Ti Retrieved on December 16, 2012mes.

১৮. http://www.cinemareview.com/production.asp?prodid=3773 Retrieved on December 16, 2012

১৯. চট্টোপাধ্যায়, কমলেশ (১৯৮০ : ৮); বাংলাসাহিত্যে মিথের ব্যবহার : বুদ্ধদেব বসুর তপস্বী ও তরঙ্গিণীর ভূমিকা, মডার্ণ বুক এজেন্সী প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা।

২০. http://www.wildaboutmovies.com/movies/ApocalyptoMovieTrailerPosterMelGibson.php Retrieved on December 16, 2012

২১. প্রাগুক্ত; চট্টোপাধ্যায়, কমলেশ (১৯৮০ : ৮)।

২২. http://www.nytimes.com/1993/05/09/movies/film-battle-of-the-action-heroes.html?src=pm Retrieved on December 16, 2012

২৩. মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকায় বিড়ালজাতীয় বৃহৎকায় মাংসাশী জন্তুবিশেষ।

২৪. অমসৃণ ত্বক বিশিষ্ট ব্যাঙ জাতীয় প্রাণী, যারা প্রজনন-ঋতু ছাড়া ডাঙায়ই বাস করে। এদের মাথার উপর এক ধরনের বিষাক্ত তরল থাকে।

২৫. সেনগুপ্ত, প্রমোদবন্ধু (১৯৯০ : ১৬১ ); সমাজ-মনোবিজ্ঞান; ব্যানার্জী পাবলিশার্স, ৫/১এ, কলেজ রোড, কলিকাতা-১৯৯০।

 

বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৩ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের চতুর্থ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন