তাহ্সিন আহমেদ
প্রকাশিত ১২ ডিসেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
ককতো'র চলচ্চিত্র-গণতন্ত্রায়ণে কলম-কালির পরে এখন ‘খাতার’ খোঁজ
তাহ্সিন আহমেদ

চলচ্চিত্রশিল্প প্যারাডাইমের কেন্দ্রে অবস্থান করে পরিচালক; যাকে ঘিরে শিল্পটি তার নিজস্ব স্বকীয়তা ও বৈশিষ্ট্য তৈরি করে। আর যদি টেকনোলজিকালি এই প্যারাডাইমকে দেখতে চাই তবে এর কেন্দ্রে রয়েছে গতি। এই গতি চলচ্চিত্রকে প্রাণ দান করে, দৃশ্যমান করে। আজ আমরা যে চলচ্চিত্র দেখছি তার রঙ, শব্দ ইত্যাদি প্রাযুক্তিক বিষয়গুলো কিন্তু একদিনে এর সঙ্গে যুক্ত হয়নি। ইতিহাসে দেখেছি, প্রযুক্তির এ রকম মাত্রাগত পরিবর্তন নিয়ে চলচ্চিত্রের কেন্দ্রে থাকা ব্যক্তিরা দুটি পক্ষে ভাগ হয়েছে। যখন শব্দ এলো তখন কেউ তাকে কাজে লাগালো, আর কেউ হায় হায় বলতে শুরু করলো;রঙ এলে তখনও তাই। ডিজিটাল প্রযুক্তি আসার পরেও সেই অবস্থার পুনরাবৃত্তি দেখেছি। তবে প্রযুক্তির অন্যান্য পরিবর্তনের চেয়ে ডিজিটাল প্রযুক্তি কিছু নতুন ক্ষমতা ও সম্ভাবনা নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হয়েছিলো। এই কথাটি শুরুতে অনেকেই বুঝতে পারেনি, তাই বিভিন্ন সময়ে তা নিয়ে নানা সমালোচনা হয়েছে। অথচ সব গুজবকে দূর করে গোটা চলচ্চিত্র-বিশ্বকে নিজের দিকে টেনে নিচ্ছে এই প্রযুক্তি। অন্যদিকে পুঁজির শিল্পে ডিজিটাল প্রযুক্তির সহজলভ্যতা ও ব্যয় শ্রেণিশত্রুকে ধ্বংস করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার একটি সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
‘বহিঃস্থ তিন ধরনের নিয়ন্ত্রণ ঐতিহাসিকভাবে একজন চলচ্চিত্রকারের সৃজনশীলতার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্থ করেছে : রাজনৈতিক, আর্থিক ও প্রাযুক্তিক। আজ ডিজিটাল বিপ্লবের মাধ্যমে ক্যামেরা এই ধরনের সব নিয়ন্ত্রণকে অতিক্রম করবে। ‘ক্যামেরা-কলম’ আবিষ্কারের পর অথর সিনেমার সত্যিকারের জন্ম হতে যাচ্ছে এবং তখন আমাদের পেশার সম্পূর্ণ নতুন সূর্যোদয় দেখতে পাবো। চলচ্চিত্রনির্মাণ লেখার মতোই সস্তা হয়ে যাবে, সৃজনশীল প্রক্রিয়ায় পুঁজির দাপট বৈপ্লবিকভাবে বাতিল হয়ে যাবে।’১ অল্প দিনেই সামিরা মাখমালবাফের কথার মতোই প্রযুক্তি ফল দিতে শুরু করছে। কিন্তু আমাদের মতো দেশ, যেখানে ডিজিটাল প্রযুক্তির চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়তো সম্ভব, সত্যিকার অর্থে এখন হচ্ছেও, কিন্তু প্রদর্শন ব্যবস্থা সেই অনুপাতে এগিয়ে যায়নি কিংবা দেশিয় চলচ্চিত্রের দর্শক তৈরির পথ উন্মুক্ত হয়নি-সেখানে কী হবে? এই প্রশ্ন থেকেই বাংলাদেশের দর্শককে ধরে ডিজিটাল প্রদর্শনের ব্যবস্থা, দর্শক তৈরি, সঙ্গে এই চলচ্চিত্র নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী হতে পারে তা নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন।
ক.
আগেই বলেছি প্রযুক্তি চলচ্চিত্রশিল্পকে নতুন দিগন্তে নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তাই আলোচনার শুরুটাই করতে চাই ডিজিটাল প্রযুক্তি ও চলচ্চিত্রে তার ব্যবহার নিয়ে। সেলুলয়েডের একশ বছরের রাজত্বের পর জর্জ লুকাস ১৯৯৬ সালে জাপানের সনির গবেষণা কেন্দ্রে চিঠি লিখে একটি এইচডি প্রযুক্তি তৈরি করতে অনুরোধ করলেন, যাতে সেকেন্ডে ৩৪ ফ্রেম ধারণ, সংরক্ষণ ও পুনরায় চালনা করা সম্ভব হয়। পরবর্তীকালে এই সেলুলয়েডহীন চলচ্চিত্রনির্মাণ ও প্রদর্শনের পদ্ধতির নাম হলো ডিজিটাল পদ্ধতি। আর এই প্রক্রিয়ায় যে চলচ্চিত্র নির্মাণ ও প্রদর্শন হয়, তাকে বলা হচ্ছে ডিজিটাল প্রযুক্তির চলচ্চিত্র। ডিজিটাল পদ্ধতির জনক বলা হয় পরিচালক জর্জ লুকাস’কে। তবে জেরাল্ড মাস্ট ও ব্রুস এফ কাউইন-এর ভাষ্যমতে,প্রথম ডিজিটাল চলচ্চিত্রের স্বীকৃতি দেওয়া হয় জন এ.ল্যাসেটার, লি উনক্রিক ও অ্যাশ ব্র্যানন পরিচালিত টয় স্টোরি ২ (১৯৯৯)কে। ‘প্রদর্শনসহ পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল চলচ্চিত্র ১৯৯৯ সালে শুরু হলেও, কম্পিউটার নির্ভর ডিজিটাল ইন্টারমিডিয়েট (ডিআই)-এর কাজ হচ্ছিল অনেকদিন ধরেই।ডিআই হলো পোস্ট-প্রডাকশনে শব্দ ও চিত্রের সম্পাদনা বা পরিবর্তন।বেশিরভাগ অগ্রবর্তী ফিল্ম স্টুডিওতে ডিজিটাল পদ্ধতি পোস্ট-প্রডাকশনের জন্য একমাত্র পদ্ধতি হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। প্রডাকশন পর্যায়ে ডিজিটাল পদ্ধতির প্রয়োগ দিনকে দিন বাড়ছে।’২
ব্যয় সুবিধার পাশাপাশি ডিজিটাল পদ্ধতি ইমেজকে যেমন সম্পূর্ণভাবে এবং চিহ্নহীনভাবে পরিবর্তনের সুযোগ করে দিয়েছে, তেমনি অসাধারণ সব স্পেশাল ইফেক্টের সুবিধা দিয়ে চলচ্চিত্রের নতুন ভাষা নির্মাণের পথ উন্মুক্ত করেছে। শুধু তাই নয়, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিচালক প্রয়োজনে সম্পাদনার টেবিলে বসে ক্যামেরাকোণও পরিবর্তন করতে পারেন। বিষয়টিকে এভাবে বলা যায়, ডিজিটাল প্রযুক্তি যেমন নির্মাণব্যয় কমিয়েছে, অন্যদিকে নন্দনতত্ত্বেও এনেছে পরির্বতন।
খ.
‘জর্জ লুকাস বছর কয়েক আগে ঘোষণা করেছিলেন যে, তার পরবর্তী ছবির কোনো প্রিন্ট প্রেক্ষাগৃহগুলোকে সরবরাহ করা হবে না। তার বদলে ব্রড-ব্যান্ড ইন্টারনেট কানেকশনের মধ্য দিয়ে ছবির ডিজিটাল ইমেজ আর শব্দ পৌঁছে যাবে প্রেক্ষাগৃহের ডাটা সার্ভারে আর ডিজিটাল প্রজেকশন সিস্টেমের মাধ্যমে তা দর্শকরা দেখতে পাবেন। কী বলব আমরা একে? ইলিউশনের ইলিউশন? চলচ্চিত্র তো গোড়া থেকেই বাস্তবের বিভ্রম সৃষ্টি করে; আর এখন ডিজিটাল প্রযুক্তির হাত ধরে সেই চলচ্চিত্রের ভারচুয়াল প্রক্ষেপণ দর্শকরা দেখেছেন সিনেমা হলে বসে। লুকাসের নির্দেশিত কারিগরী পদ্ধতিতে যুক্তরাষ্ট্রে এবং ইউরোপে চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়েছে; ভারতেও এভাবে ছবি দেখানো হয়েছে।’৩ যেসব দেশে এখনো হয়নি তারাও এই প্রযুক্তিতে অবকাঠামো নির্মাণের দিকে ঝুঁকছে। বাংলাদেশও সেই পথে হাঁটছে,তবে সেই গতি অনেক মন্থর। আমাদের এখানে যে ডিজিটাল চলচ্চিত্র প্রদর্শন হচ্ছে, তা মূলত পরিবেশনা সংস্থার একজন প্রতিনিধি হার্ডড্রাইভে করে প্রেক্ষাগৃহকে সরবরাহ করে এবং পাইরেসি রোধে সার্বিক তত্ত্বাবধানও করে।জাজ মাল্টিমিডিয়া,বেঙ্গল ফাউন্ডেশনসহ আরো বেশ কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রেক্ষাগৃহ ডিজিটাল করার উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে জাজ মাল্টিমিডিয়ার তত্ত্বাবধানে ৫০টি এবং রেইন পিকচার্স লি.এর তত্ত্বাবধানে ১০টি প্রেক্ষাগৃহ ডিজিটাল চলচ্চিত্র প্রদর্শনে উপযোগী হলেও এখন যে পরিমাণে চলচ্চিত্র তৈরি হচ্ছে, সেই তুলনায় সংখ্যাটি নিতান্তই নগণ্য।
এর বাইরে যেসব প্রেক্ষাগৃহে ইতোমধ্যে ডিজিটাল চলচ্চিত্র প্রদর্শন শুরু করেছে সেখানে শুধু আগের ৩৫ মিমি প্রজেক্টরের জায়গায় নতুন ডিজিটাল প্রজেক্টর লাগানো হয়েছে। কিন্তু সেই পুরনো আমলের কাঠের চেয়ার, মান্ধাতা আমলের সাউন্ডবক্স এখনো রয়েছে। ফলে চলচ্চিত্র ডিজিটাল হলেও তা প্রদর্শনের সময় নতুন কোনো কিছু দর্শককে দিতে পারছে না। আর এসব প্রেক্ষাগৃহে নতুন দর্শক যে খুব একটা বেড়েছে তাও বলা যাচ্ছে না।
গ.
‘যারা এখন ডিজিটাল ফিল্ম বানাচ্ছেন বা বানাতে চান, তাদের ৯৯ ভাগ নির্মাতা ঐ পথে হাঁটতে পারতেন না। সেখানে অনেক নাকাল নাজেহাল হওয়ার প্রশ্ন আছে। ওখানে ছবি নির্মাণের আগে পরিচালক সমিতির সদস্যপদ নিতে হয়। ইন্টারভিউ দিতে হয়, চাঁদা দিতে হয়, ইন্টারভিউ গ্রহণকারীদের সন্তুষ্ট করতে না পারলে আবার ইন্টারভিউ দিতে হয়, সেখানে লবি করার প্রশ্ন আছে, কোনো কোনো ডিরেক্টরের সাথে লবি করতে হয়। আরেকটা পদ্ধতি হলো ৮/১০ বছর আরেকজন ডিরেক্টরের সহকারী হিসেবে কাজ করে এরপর পরিচালক হওয়া। কিন্তু ক্রিয়েশনের প্রশ্নে এত বাধা থাকা উচিত নয়। ডিজিটাল সিনেমা এসব বাধা দূর করেছে। প্রযুক্তি ও তার সহজলভ্যতা এই সুযোগটা দিচ্ছে।’৪
এ বছরের (২০১৩) জানুয়ারি মাসে ‘কালের কণ্ঠ’-তে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়। শিরোনামটি ছিলো ‘বছরের শুরুতেই প্রেক্ষাগৃহগুলো চলচ্চিত্র সংকটে।’ কয়েক মাস যেতে না যেতেই ডিজিটাল চলচ্চিত্রের একটা অভূতপূর্ব পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। এফডিসিকেন্দ্রিক পরিচালকরা নতুন ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে চলচ্চিত্র নির্মাণ ও মুক্তি দিতে থাকে। একে একে মুক্তি পায় শাহিন সুমনের অন্যরকম ভালোবাসা, রেদোয়ান রনির চোরাবালি, ইফতেখার চৌধুরীর দেহরক্ষীসহ বেশকিছু ডিজিটাল চলচ্চিত্র। কিন্তু পরিস্থিতি যা ছিলো তাই হলো। যখন সবাই স্বপ্ন দেখছে নতুন পদ্ধতিতে নতুন চলচ্চিত্রের, তার বিপরীতে তারা উপহার দিলো সেই ফর্মুলার চলচ্চিত্র। তবে তার মানে এই নয়-স্বপ্ন শেষ হয়ে গেলো। এই লাইনে আরো অনেক সম্ভাবনাময় তরুণ আছেন-অনিমেষ আইচ (না মানুষ), শঙ্খ দাস গুপ্ত (হ্যালো অমিত), সামুরাই ফারুক (পারলে ঠেকা), নঈম ইমতিয়াজ নেয়ামুল (এক কাপ চা), স্বপন আহমেদ (পরবাসিনী), সাফিউদ্দীন (পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনী), সোহেল আরমান (এই তো প্রেম), নাবিল আশরাফ (ভালোবাসার রংধনু), খালিদ মাহমুদ মিঠু (জোনাকির আলো), আফসানা মিমি (রান), তন্ময় তানসেন (পদ্ম পাতার জল), রিপন মিয়া (তুমি সন্ধ্যারও মেঘমালা) তাদের মধ্যে অন্যতম। এখন এসব পরিচালক ও তাদের চলচ্চিত্রের মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে দেশিয় দর্শকরা।
ঘ.
এবার বাংলাদেশের দর্শকের শ্রেণি চরিত্র দেখার চেষ্টা করবো।বাংলাদেশে চলচ্চিত্র দর্শকদের শ্রেণিগত প্রাধান্য দেখতে চাইলে এখনো মধ্যবিত্তশ্রেণির সংখ্যাগরিষ্ঠতা লক্ষ করা যায়।যারা কিনা হিন্দি,তামিল কিংবা ভারতিয় বাংলা চলচ্চিত্র বেশি দেখে থাকে।আর বর্তমানে এই বিশাল শ্রেণির দর্শকের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে স্যাটেলাইট টেলিভিশন সঙ্গে ডিভিডি প্লেয়ার।তবে এখন অনেক মধ্যবিত্তের ঘরে ডিভিডি প্লেয়ারের জায়গায় চলচ্চিত্র দেখার মাধ্যম হিসেবে কম্পিউটার চলে এসেছে। আর এই চলচ্চিত্রের দর্শক সংখ্যায় শিশু থেকে শুরু করে সববয়সী থাকলেও তরুণ ও যুবকদের সংখ্যাই বেশি।অন্যদিকে উচ্চবিত্তের দখলে রয়েছে হলিউডি অ্যাডভেঞ্চার কিংবা অ্যাকশনধর্মী চলচ্চিত্রগুলো।এই শ্রেণিতেও তরুণদের আনাগোনাই বেশি।সাধারণ বিচারে একটু বয়স্ক মানুষ যেমন : মা-বাবা কিংবা নানী-দাদী বয়সীরা চলচ্চিত্র খুব একটা দেখছে না,তাদের বিনোদন চাহিদার এই জায়গা দখলে নিয়েছে ভারতিয় চ্যানেলের সোপ অপেরাগুলো। আজ থেকে কয়েক বছর আগেও যে শ্রেণিকে প্রেক্ষাগৃহকেন্দ্রিক বাংলা চলচ্চিত্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ দর্শক বলা হতো,তারা কিন্তু এখনো বাংলা চলচ্চিত্রের প্রধান দর্শক।তবে তারাও আজ প্রেক্ষাগৃহবিমুখ।বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে নিম্নবিত্তের এই বিশাল দর্শকশ্রেণি বেছে নিয়েছে পাড়ার চা-সিনেমা।চা-সিনেমা বলতে আমি রাস্তার পাশের চায়ের দোকানে বসে চা খেতে খেতে ‘বিনে পয়সায়’ চলচ্চিত্র দেখার কথা বলছি আর কী।
এর বাইরেও আরেক শ্রেণির দর্শক আছেন যাদের বেশিরভাগই মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত। যারা মাঝে মাঝে ‘বিশেষ’ কোনো চলচ্চিত্রের বদৌলতে প্রেক্ষাগৃহে ফেরেন। উদাহরণ হিসেবে কয়েক বছর আগে গিয়াস উদ্দিন সেলিমের মনপুরা, গৌতম ঘোষের মনের মানুষ এবং অদূর অতীতের নাসিরউদ্দীন ইউসুফ বাচ্চুর গেরিলা, রেদওয়ান রনির চোরাবালি, মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার ও টেলিভিশন এর কথা বলা যেতে পারে।এই শ্রেণির দর্শক মূলত একটা সময়ে প্রেক্ষাগৃহে গিয়েছেন, এখন ওই যে বললাম কালেভদ্রে যান।
ঙ.
এতোক্ষণের আলোচনায় ডিজিটাল মাধ্যমে নির্মিত চলচ্চিত্র, দর্শক-শ্রেণি সম্পর্কে একটু ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছি।এবার দর্শক মানবিচারে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও আমাদের সম্পর্কে আলোচনা করবো।এখানে আবার দর্শকের দুটি ভাগ করা যেতে পারে, একটি এদেশিয় (বাংলাদেশের)বলিউডি-দর্শক ও অন্যদিকে ভারতে মানে তাদের দেশের বলিউডি-দর্শক।এখন বলিউডি চলচ্চিত্রের প্রচুর দর্শক তৈরি হয়েছে বাংলাদেশে।প্রাযুক্তিক বিকাশে এই চলচ্চিত্র এখন দেশিয় দর্শকের নাকের ডগায় ঝুলছে।বলিউডের নতুন চলচ্চিত্র দেখতে মুক্তির পরে সপ্তাহখানেক অপেক্ষা করতে হয়,তারপরেই ইন্টারনেটে পাওয়া যায় এর পাইরেটেড কপি,ইন্টারনেট থেকে তা ডাউনলোড করে কম্পিউটার কিংবা ডিভিডিতে তা দেখে ফেলা যায়।ভারতিয় গানের চ্যানেলগুলোর প্রভাবে মুক্তির কয়েক মাস আগে থেকেই বলিউডের এসব চলচ্চিত্রের গান, মুক্তির তারিখ,বিশেষ কোনো সংলাপ, অভিনেতা-অভিনেত্রী আমাদের দর্শকদের মুখে মুখে ঘোরে।আমাদেরই যদি এ অবস্থা হয়, ভাবুন তাহলে ভারতের দর্শকদের কথা!তাদের কাছে হয়তো নতুন চলচ্চিত্রটির গানের পাশাপাশি মুক্তির তারিখটি আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।আর মুক্তি পেলেই প্রেক্ষাগৃহে দৌড়;শত কোটি টাকার ব্যবসা দেখে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে,তারা শুধু একা নন বন্ধু-বান্ধব,কেউ পরিবারের সবাইকে নিয়েই হয়তো প্রেক্ষাগৃহে বসে চলচ্চিত্রটি দেখে ফেলে।
সময়ের একটু এদিক-ওদিক করে একই চলচ্চিত্র দুই দেশের দর্শকই দেখছে।কিন্তু পার্থক্যটা হলো আমাদের দেশের দর্শকরা (এখানে দর্শক বলতে বিশেষ করে তরুণদের কথাই বলছি)শুধু এই চলচ্চিত্রই নয় গ্রিফিথ,বুনুয়েল,ভিত্তোরিও থেকে শুরু করে হাল আমলের অ্যাপোক্যালিপ্টো,আভাতার,অ্যাপেল,থ্রি ইডিয়টস্,দাবাং ২,এক থা টাইগার,মাটির ময়না কিংবা রানওয়ে-সবই দেখছে ড্রয়িংরুমে কিংবা পড়ার টেবিলের কম্পিউটারে হেডফোন কানে দিয়ে।তার মানে দুই দেশের দর্শকের মধ্যে মূল পার্থক্যটা দাঁড়াচ্ছে চলচ্চিত্র দেখার ধরনের ওপর।ফলে আমাদের দেশের বর্তমান প্রজন্মের একটি বিশাল অংশের কাছে চলচ্চিত্র যে আসলে প্রেক্ষাগৃহে দেখার একটি বিষয় সেটাই অজানা থেকে গেছে।
তারা কোনোদিন প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে চলচ্চিত্র দেখেনি, শুধু রূপকথার মতো মায়ের কাছে শুনে এসেছে-‘তোর বাবার সঙ্গে কতোবার যে সিনেমা দেখতে গেছি, তখন কতো মজা হতো।’ এই যখন পরিস্থিতি তখন এই প্রজন্মের কাছে চলচ্চিত্রের প্রধান যে বৈশিষ্ট্য গতি দিয়ে পর্দায় ইলিউশন সৃষ্টি, সেটা আর ধরা দেয়নি। চলচ্চিত্র যে একটি নির্দিষ্ট সময়ের (আগের দিনে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা, এখন অবশ্য দেড় থেকে দুই ঘণ্টা) জন্য মানুষের মধ্যে একধরনের বাস্তবতা তৈরি করে, গল্পের সঙ্গে একাত্ম করে নিয়ে যায় ভিন্ন জগতে কিংবা চলচ্চিত্রের যে নিজস্ব একটা ভাষা আছে-তার কোনোটাই এই দর্শকের কাছে আলাদা কোনো বিষয় হিসেবে দেখা দেয়নি।
কারণ কম্পিউটার কিংবা টেলিভিশনের ছোটো মনিটরে অবিরাম চলতে থাকা খবর, মিউজিক ভিডিও,নাটক কিংবা মুঠোফোনের বাড়াবাড়িতে চলচ্চিত্র আলাদা কোনো বৈশিষ্ট্য নিয়ে দাঁড়াতে পারেনি।নাটক,টেলিফিল্ম কিংবা সোপ অপেরায় সে যেমন কেবল একটি স্টোরি টেলিং দেখে,চলচ্চিত্রও তার কাছে কেবল একটা স্টোরি হয়ে উঠেছে মাত্র; চলচ্চিত্রের যে বৃহৎ সামগ্রিকতা সেটা আর থাকেনি।চলচ্চিত্রতো শুধু একটা স্টোরি টেলিং নয়,একজন পরিচালক শটের পর শট্ সাজিয়ে বাস্তবতার যে ইলিউশন তৈরির চেষ্টা করেন,সেই সফলতা একমাত্র বোঝা সম্ভব প্রেক্ষাগৃহের পর্দায় চলচ্চিত্র দেখার মধ্য দিয়ে। সেখানেই কেবল বোঝা যায় এক একটা শটের মাহাত্ম্য,সঙ্গীতের খেলা-চলচ্চিত্রের স্বরূপ।
আজ থেকে এক যুগ আগেও এদেশের অসংখ্য তরুণ স্কুল পালিয়ে প্রেক্ষাগৃহে চলচ্চিত্র দেখেছে।তারও আগে পরিবারসহ প্রেক্ষাগৃহে চলচ্চিত্র দেখার একটা সংস্কৃতি ছিলো আমাদের।কিন্তু সেই সময় কোথায় যেনো হারিয়ে গেছে।চলচ্চিত্রের সেই দর্শককে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে ছোটোপর্দা (ছোটোপর্দা মানে অনেকে টেলিভিশন বোঝেন,আমি কিন্তু টেলিভিশন বোঝাচ্ছি না।আকারে ছোটো মনিটর মানে এক অর্থে পর্দার কথা বলছি)। দর্শক এখন নিজের মতো করে,নিজের সময়ে চলচ্চিত্র দেখার অভ্যস্ততা করে ফেলেছে। তার মানে চলচ্চিত্র দেখার সেই প্রেক্ষাগৃহী সংস্কৃতি আজ বিলুপ্তপ্রায়।অন্যান্য দেশে যখন চলচ্চিত্রের পর্দা বড়ো হচ্ছে,‘জীবন্ত’ হচ্ছে; এসেছে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির আইম্যাক্স থিয়েটার, যার মাপ ৭২ ফুট বাই ৯২ ফুট; তখন আমাদের দর্শকদের চলচ্চিত্র দেখার পর্দা কেবলই ছোটো হয়ে আসছে।
এর জন্য অবশ্য বারবার দায়ী করা হচ্ছে এদেশিয় চলচ্চিত্রকে।সম্প্রতি ডিজিটাল মাধ্যমে চলচ্চিত্র নির্মাণে এর গণতন্ত্রায়ণের কথা বলা হচ্ছে,সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে দেশিয় ভালো চলচ্চিত্র নির্মাণের;অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে চলচ্চিত্রের দর্শক সংখ্যাও অনেক বেড়েছে।কিন্তু ‘চলচ্চিত্র-দেখা’ আর হয়ে উঠছে না। তাহলে কী হলো? এই যে পরিচালক এতো কষ্ট করে ডেপ্থ অব ফিল্ডের জন্য দামি ক্যামেরায় শুটিং করছেন,দিনের পর দিন ঘুরে লোকেশন বাছাই করছেন,দেশের বাইরে গিয়ে সম্পাদনা,সাউন্ড-কালার কারেকশন করছেন তার কী মূল্যায়ন হলো!দর্শকতো এর কোনোটাই বুঝলো না;অন্ধকার ঘরে না পেলো ডলবি-সাউন্ড কিংবা কালারের মজা,না পেলো দামি লেন্সের ওয়াইড অ্যাঙ্গেল শটের মজা!ছোটো পর্দায় তার কাছে তো সবই এক।
এতোক্ষণের আলোচনা থেকে বলতে অসুবিধা হয় না যে,সম্ভাবনাময় ডিজিটাল প্রযুক্তির চলচ্চিত্রেরও আমাদের প্রধান সঙ্কট এখন দর্শক।একসময় যারা ভালো চলচ্চিত্রের অভাবে প্রেক্ষাগৃহবিমুখ হয়েছেন তাদের বেশিরভাগ এখন মধ্যবয়সী,তাই দর্শক হিসেবে তারা গৌণ। আর এখন যারা দর্শক মানে তরুণ প্রজন্ম,তাদের প্রেক্ষাগৃহে চলচ্চিত্র দেখা সম্পর্কে তেমন কোনো ধারণাই নেই।তাই আপনি যতো ভালো চলচ্চিত্রই নির্মাণ করুন,এই প্রজন্মকে হয়তো তা দেখানো যাবে,তবে প্রেক্ষাগৃহে নয়।এই প্রজন্মকে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের তরুণদের মতো প্রেক্ষাগৃহিয় সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত করে তুলতে সময় লাগবে।এখন সঙ্কটের কথা হলো বেসরকারি উদ্যোগে নির্মিত সারাদেশে নতুন গড়ে উঠা এসব ডিজিটাল প্রেক্ষাগৃহ সেই সময় আমাদের দেবে তো? নাকি দর্শক আসছে না,ভবিষ্যতেও আসবে না-এই চিন্তায় তারাও এই সব সম্ভাবনা আবার নষ্ট করে দেবেন!বর্তমান পরিস্থিতিতে এই সঙ্কটকে কোনোভাবেই হেসে উড়িয়ে দেওয়া মনে হয় ঠিক হবে না।
এছাড়া প্রেক্ষাগৃহ ভেঙ্গে বড়ো বড়ো শপিং মল করার প্রবণতাতো আছেই।আবার আকারে বড়ো হওয়ায় কেউ কেউ প্রেক্ষাগৃহকে রূপান্তর করছে চালের গুদামে।আর সরকার চলচ্চিত্রকে নামেই শিল্প ঘোষণা করে নিশ্চিন্তে বসে আছে,প্রেক্ষাগৃহ টিকিয়ে রাখার ব্যাপারে তাদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।নতুন কোনো প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণের পরিকল্পনাও নেই। এই অবস্থায় শুধু বেসরকারি উদ্যোক্তার হাতে এই শিল্প কতোখানি নিরাপদ তাই এখন দেখার বিষয়।
চ.
আমাদের চলচ্চিত্রের কাঠামো ও দর্শক বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিচারে অনেকটাই আলাদা। আমাদের যেমন চলচ্চিত্রের সঙ্কট রয়েছে,তেমনি রয়েছে দর্শকদের প্রেক্ষাগৃহবিমুখীনতা।শুধু ভালো চলচ্চিত্র নির্মাণ করলেই এই বিমুখী-দর্শক প্রেক্ষাগৃহে ফিরবেন এমনটি নয়।একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সিস্টেম তৈরির সঙ্গে সঙ্গে প্রেক্ষাগৃহমুখী-দর্শক তৈরি এখন বড়ো চ্যালেঞ্জ। আর চ্যালেঞ্জকে বৈশ্বিক বিচারে না দেখে দেশিয় প্রেক্ষাপট থেকে চিন্তা করাটা জরুরি হয়ে পড়েছে।এর জন্য আলগা আবেগ নিয়ে এগোলে হবে না,চাই দীর্ঘমেয়াদি ধৈর্যশীল পরিকল্পনা।আর এ পরিকল্পনা যারাই করুক না কেনো তা সরকারকে নিয়েই করতে হবে। পাড়ায় পাড়ায় ‘চা-সিনেমা’র দোকানের মতো কিছু ফিল্ম ক্লাব গড়ে তোলা যেতে পারে। যেখানে নামমাত্র মূল্য দিয়ে বড়োপর্দায় প্রেক্ষাগৃহিয় আমেজে চলচ্চিত্র দেখানো হবে, চলচ্চিত্রের মধ্যে দেশিয় চলচ্চিত্রের সঙ্গে থাকবে ধ্রুপদী বিদেশি চলচ্চিত্রগুলো।তরুণ কোনো নির্মাতা চলচ্চিত্র নির্মাণ করলে এই ক্লাবগুলো তার প্রদর্শনীর দায়িত্ব নিতে পারে।আর পাড়ায়-পাড়ায় যদি না হয়,উপজেলা,জেলা সদরগুলোতে এ ধরনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।এছাড়া সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে ভালো ভালো চলচ্চিত্রগুলো নিয়ে স্কুল ও কলেজগুলোতে বড়োপর্দায় ও ডিজিটাল সাউন্ড সিস্টেমে দেখানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।যাতে করে তারা ছোটোপর্দার সঙ্গে বড়োপর্দার পার্থক্যটা বুঝতে পারে।
ককতো'র চলচ্চিত্র-গণতন্ত্রায়ণ তখনই সম্ভব হবে,যখন এই দেশগুলোতে একটি ভালো প্রদর্শন ব্যবস্থা গড়ে তোলার মধ্যে দিয়ে নতুন দর্শক ও নির্মাতা তৈরির পথ উন্মুক্ত করা যাবে।তার চেয়েও বড়ো কথা দর্শক টানতে অবশ্যই নির্মাতাদের গৎবাঁধা আদি পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে নতুন ভাষা নির্মাণের দিকে নজর দিতে হবে।
লেখক : তাহ্সিন আহমেদ গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী। বর্তমানে তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
tahsin_mcj@yahoo.com
তথ্যসূত্র
১. সামিরা মাখমালবাফ,উদ্ধৃত; হক,ফাহমিদুল (২০১২:১৭); ‘ডিজিটাল চলচ্চিত্র : তত্ত্ব,বিশ্ব ও বাংলাদেশ’; বাংলাদেশের ডিজিটাল চলচ্চিত্র,নতুন সিনেমার সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ;অ্যাডর্ন পাবলিকেশন,ঢাকা।
২. টোকন ঠাকুর,উদ্ধৃত; হক,ফাহমিদুল (২০১২:১৮-১৯); ‘চলচ্চিত্র নির্মাতা ও কর্মীর সাক্ষাৎকার’; বাংলাদেশের ডিজিটাল চলচ্চিত্র,নতুন সিনেমার সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ; অ্যাডর্ন পাবলিকেশন,ঢাকা।
৩. হোসেন,মাহমুদুল (২০১০:১০০); ‘প্রসঙ্গ : ডিজিটাল সিনেমা’; সিনেমা; ধানমণ্ডি, ঢাকা-১২০৯।
৪. প্রাগুক্ত; টোকন ঠাকুর,উদ্ধৃত; হক,ফাহমিদুল (২০১২:১০০)।
বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৩ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের ৫ম সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন