কিবরিয়া জুয়েল
প্রকাশিত ১১ ডিসেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
তিতাস-এর ৪০ বছর ও একজন ঋত্বিক : একটি পুনর্মূল্যায়ন
কিবরিয়া জুয়েল

আমি ছাড়া তিতাস সৃষ্টি হতো না। তিতাস ছিল আমার স্বপ্ন। আমার মতো মমতা দিয়ে এ কাহিনীকে কেউ তুলে ধরতে আগ্রহী হতেন না।১ ভীষণ একরোখা ও জেদি ঋত্বিক অনেকটা অভিমান নিয়েই এ-কথা বলেছিলেন। এর অবশ্য যথেষ্ট কারণও ছিলো। ১৯৭৩ সালে তিতাস একটি নদীর নাম মুক্তির পর থেকেই শুরু হয় নানান সমালোচনা। অদ্বৈত মল্লবর্মণের তিতাসকে আঁকতে ব্যর্থ হয়েছেন ঋত্বিক বাবু, ছবিতে আগাগোড়া অবহেলা, সম্পাদনায় ত্রুটি আরও কতো কী। যেকোনো ছবির বিভিন্ন দিক নিয়ে সমালোচনা হতেই পারে, কিন্তু সমালোচনার বিষয়বস্তু যখন চলচ্চিত্রকে ছাড়িয়ে পরিচালকের ব্যক্তিগত জীবন হয়, তখন সেটি আর সৎ সমালোচনা থাকে না। হাতে সামান্য কটা টাকা আর ঘণ্টা-তিনেক সময় থাকলে যে কেউ প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে চলচ্চিত্র দেখতে পারে, তা নিয়ে সমালোচনাও করতে পারে। সেই সমালোচনা যদি পাড়ায় বা বন্ধুদের সঙ্গে চায়ের আড্ডায় সীমাবদ্ধ হয়, তাহলে কোনো সমস্যা থাকে না। কিন্তু মূল সঙ্কট অন্যখানে; যারা তিতাসকে নিয়ে কিংবা ঋত্বিককে নিয়ে সেইসময় সমালোচনা করে পত্র-পত্রিকার পাতায় রীতিমতো ঝড় তুলেছিলেন তারা যে-খুবই শিক্ষিত চলচ্চিত্র বোদ্ধা ছিলো-এমন নয়। তারা হয়তো সাহিত্য ভালো বুঝতেন; কিন্তু তাদের মনে রাখা জরুরি-সাহিত্য আর চলচ্চিত্র কিন্তু এক নয়, দুটো ভিন্ন শিল্পমাধ্যম।
নদী নিয়ে অনেক রকম চলচ্চিত্রই হয়তো হয়েছে, কিন্তু তিতাস-এর মতো নদীকেন্দ্রিক মানুষের জীবন-সংগ্রাম খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তুলে আনার চেষ্টার এমন ছবির সংখ্যা হয়তো কম। ঋত্বিক ঘটকের চলচ্চিত্র ভাবনায় আইজেনস্টাইন, পুদভকিনের মতোই সবসময় ছিলো সাধারণ মানুষ। চলচ্চিত্রকে কীভাবে এই সাধারণ মানুষের হৃদয়ের গভীরে পৌঁছে দেওয়া যায়, কীভাবে এই অবহেলিত সংখ্যাগরিষ্ঠ নিম্নবর্গকে সেলুলয়েডে ধারণ করা যায়-সেই চিন্তা সবসময় তাকে তাড়া করে ফিরতো। রাজশাহীতে থাকাকালেই বাম আন্দোলনে জড়ানো ঋত্বিকের প্রাণ ছিলো ওই শ্রমজীবী মানুষেরাই। প্রগতিবাদী ঋত্বিক এই নিম্নবর্গীয় শ্রমজীবীদের কথা বলার জন্য শুধু চলচ্চিত্রকেই মাধ্যম হিসেবে বেছে নিতে চাননি। এর চেয়ে ভালো মাধ্যম পেলে তিনি সেই মাধ্যমেই ওই শ্রেণিরই কথা তুলে ধরতে চেয়েছেন। মাধ্যমটা তার কাছে বড়ো কোনো বিষয় ছিলো না।
জীবনের সবচেয়ে সুখকর দিনগুলো তিনি কাটিয়েছিলেন পুনের ফিল্ম ইন্সটিটিউটে শিক্ষকতায়। সেখানেও তার মন টেকেনি; টিকবেই কীভাবে, তার মতো কমরেডেরতো তখনও অনেক কাজ বাকি। সেই কাজ করতে গিয়েই জীবন সায়াহ্নে নিদারুণ খাদ্যাভাবে পড়তে হয়েছিলো ঋত্বিককে। সেটিও তাকে পারেনি কর্মবিমুখ করতে। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি স্বল্পদৈর্ঘ্য, তথ্যচিত্র, পূর্ণদৈর্ঘ্য মিলে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন ১৯টি। তার প্রতিটি শিল্পকর্মই ছিলো সাধারণের জন্য উৎসর্গীকৃত; তিনি অবশ্য এদেরকে (সাধারণ) বাদ দিয়ে কিছু করাকে ‘পাপ’ মনে করতেন। এরই এক পর্যায়ে আবহমান বাংলার এসব মানুষকে নিয়ে লেখা জেলে সন্তান অদ্বৈত মল্লবর্মণের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাস অবলম্বনে ঋত্বিক নির্মাণ করলেন নতুন এক তিতাস। আজ ৪০ বছর পরে এসে তিতাসকে নিয়ে নতুন করে চিন্তা-ভাবনাই এই লেখা।
তিতাস : মানবিক মূল্যবোধের দলিল
উপন্যাস ‘তিতাস একটি নদীর নাম’-এর স্রষ্টা অদ্বৈত মল্লবর্মণ নিজেই ছিলেন জেলে পরিবারের সন্তান। জেলেদের জীবনযুদ্ধকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। তিতাসের পাড়ে গড়ে উঠা মালোদের সমাজ-মূল্যবোধ-সংস্কৃতি, সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নাকে লেখক যতোটা কাছ থেকে দেখেছেন আর কারও পক্ষে হয়তো তা সম্ভব নয়। ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ প্রকাশিত হয় ১৯৫৬ সালে, এর কুড়ি বছর আগে ১৯৩৬ সালে প্রকাশিত হয় মানিকের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’; মাঝখানে মালো সমাজকে কেন্দ্র করে নদীভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ আর কোনো উপন্যাস লেখা হয়নি। মানিক পদ্মা পাড়ের সেই কেতুপুরকে, সেই মালোদেরকে দেখেছিলেন বাইরে থেকে; যদিও তার দৃষ্টি ছিলো সমাজভেদী। তিনি অত্যন্ত দরদে সমাজের এই প্রান্তজনের জীবনালেখ্য নির্মাণের প্রয়াস চালিয়েছিলেন। এদিকে অদ্বৈতের মালো পরিচয়ের এই প্রত্যক্ষতাই তাকে নিম্নবর্গীয় মালোদের জীবনযুদ্ধকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখার, জানার ও লেখার সুযোগ করে দিয়েছিলো।
‘পদ্মা নদীর মাঝি’-র পর জেলেজীবন নিয়ে আর কোনো উপন্যাসের প্রয়োজন আছে কি-এমন প্রশ্নের জবাবে অদ্বৈত মল্লবর্মণ বলেছিলেন, ‘মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বড় আর্টিস্ট, মাস্টার আর্টিস্ট, কিন্তু বাওনের পোলাÑরোমান্টিক। আর আমি তো জাউলার পোলা।’২ ৪০’র দশকের শেষভাগে অদ্বৈত মল্লবর্মণ কলকাতার এক খালাসী পাড়ায় ছিলেন। সে-সময় জেলেদের অধিকাংশই ছিলো উদ্বাস্তু। তিতাস পাড়ের অনেক জেলে পরিবার তখন খাদ্যের সন্ধানে পশ্চিমবঙ্গে। তাদের দুর্দশা দেখে কেঁদেছিলেন লেখক। পরে এক বন্ধুর পরামর্শে মালোদের জন্য লিখতে বসেন। সৃষ্টি হয় মহাকাব্যিক উপন্যাস ‘তিতাস একটি নদীর নাম’। ১৯৫৬ সালে যখন উপন্যাসটি ছাপানো হয় তখন লেখক পরপারে। এর প্রায় দুই দশক পর সেলুলয়েডের ফিতায় তিতাসকে আঁকেন ঋত্বিক কুমার ঘটক।
চলচ্চিত্রে দেখা যায়, অর্থনৈতিক টানাপোড়েনে ক্ষত-বিক্ষত মালোদের ব্যক্তি ও সমাজজীবন। মালোদের এই অর্থনৈতিক সংঘাত মূর্ত হয়েছে তিতাসকে ঘিরেই। ঋত্বিক বাবুর তিতাস একটি নদীর নাম-এ দ্বন্দ্বের দুটি স্বরূপ খুবই স্পষ্ট। মানুষের সঙ্গে যুগপৎ প্রকৃতি ও মানুষের দ্বন্দ্ব। দুই বাংলার কোথাও যখন এসব প্রান্তজনের কথা আন্তরিকতার সঙ্গে সিনেমার পর্দায় উঠে আসেনি; প্রমোদ ছবির গড্ডালিকা প্রবাহে যখন চলচ্চিত্র নির্মাতারা গা ভাসিয়েছেন, ঠিক তখন ঋত্বিক হয়েছিলেন সাহসী। তিতাস পাড়ের কয়েক ঘর মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, আশা-আকাক্সক্ষার মধ্য দিয়ে তিনি নদীমাতৃক বাংলার অধিকাংশ মানুষ যে-সত্যের মধ্যে বাস করে তার ইতিহাসনিষ্ঠ চিত্র তুলে ধরতে চেয়েছেন।
তিতাস-এ হাজার বছরের বাঙালির সমাজ ও জীবনচিত্র ঋত্বিকের হাতে মানবিক মূল্যবোধের দলিলে পরিণত হয়েছে বললে বোধহয় বেশি বলা হবে না। গোকর্ণঘাটের সেই মালোদের জীবন, রৌদ্র-ঝড়ে নৌকা ভাসানো, দিন-রাত নদীতে ভেসে মাছ ধরা; নারীদের উঠোনে চরকি-টেকো-তকলী দিয়ে সুতো কাটা। এরই মধ্যে তারা কালুর মা’র উঠোনে উদয়তারার কাছে শ্বশুরের তুমরি খেলার বেত্তান্ত শোনে, খোশগল্প করে, র্পসতাব শোনে। পৌষ সংক্রান্তির দিনে ঘরে ঘরে চলে পিঠা উৎসব। ধুমধাম করে পূজা-পার্বণ আসে। মালোরা শুধু মাছ ধরে না, ফি বছর নৌকাবাইচ করে। এই ছিলো বাংলার নিম্নবর্গের মানুষের বিনোদন ব্যবস্থা। আনন্দের বিপরীতে অভাবী এই মালোদের মধ্যেও ছিলো দ্বন্দ্ব-সংঘাত। বাসন্তী ও তার মায়ের চুলোচুলি, কাদের মিয়ার সঙ্গে তার ছেলের বৌ খুশীর কথাকাটাকাটি, দুই বেয়াইয়ের তর্ক, পুঁজিপতিদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব-সবই আবহমান বাংলার প্রতিনিধিত্ব করে। ‘...সুখ-আনন্দ-গান-পূজা-পার্বণ-দারিদ্র্য-অভাব-অসুন্দর-ঈর্ষা-ঝগড়া-বিবাদ-মৃত্যু-এগুলোর মুখোমুখি ঋত্বিক ঘটক তাঁর ক্যামেরার চোখকে এনে দাঁড় করিয়েছেন। এর প্রত্যেকটা এপিসোড জীবনের টুকরো টুকরো ছবি-সমগ্রতায় ‘তিতাস একটি নদীর নাম’।৩
ঋত্বিক নিজে বিশ্বাস করতেন যে, যদি কোনো শিল্পকর্ম মানুষকে তার সঙ্গে একাকার করতে না পারে তাহলে সেটা কিছুই নয়। ‘তাই ‘তিতাস’-এর চলচ্চিত্রায়ণ হয়ে যাওয়ার পর কলকাতার নিউ থিয়েটার্স স্টুডিওর ভিতরে ছোট প্রেক্ষাগৃহে ঋত্বিক ঘটকের ব্যক্তিগত আমন্ত্রণে তাঁর পাশে বসে ছবিটি দেখার পর তিনি বাঁধন সেনগুপ্তকে বলেছিলেন,‘কেমন দেখলি? তোর বাড়ি তো কুমিল্লা। তিতাসের মাটির গন্ধ পেলি ছবিতে? ...যদি ছবি দেখে বুঝিস তি্তাসের মাটির গন্ধ অন্তত তোরা পাচ্ছিস তবেই বুঝবি ব্যাপারটা উতরেছে, নইলে সবটাই বোগাস, নাথিং...।”৪
নদী বয়ে যায়, সভ্যতাও থেমে থাকে না
সমাজ বদলায়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এগিয়ে চলে। একই সঙ্গে বদলে যায় সমাজ ব্যবস্থাও। কিন্তু নিম্নবর্গের ওপর শোষকের চাবুক যেনো আর থামে না, শুধু শোষণের কৌশল বদলায়। এই মৌলিক সত্যটিকেই কলমের আঁচড়ে উন্মোচন করেন অদ্বৈত মল্লবর্মণ। অন্যদিকে, পরিচালক ঋত্বিক প্রগতি ও জীবনের প্রবাহমানতায় বিশ্বাস করতেন। তিনি তিতাস-এ তার এই ধ্যান-ধারণা প্রকাশের সুযোগটা তাই হাতছাড়া করতে চাননি। তার ভাষায়,‘সভ্যতার মৃত্যু নেই। সভ্যতা পরিবর্তিত হয় কিন্তু সভ্যতা চিরদিনের। যেখানে তিতাসের ক্ষেতে ধান জন্মেছে সেখানে আর একটা সভ্যতার আরম্ভ। সভ্যতার মৃত্যু নেই। মানুষ অমর, ইনডিভিজুয়াল মানুষ মরণশীল। কিন্তু মানুষ অমর। সে একটা ধাপ থেকে আরেকটা ধাপে গিয়ে পৌঁছয়। সেই কথাটাই ছবিতে বলার চেষ্টা করেছি।’৫ ফুল যেমন নতুন কুঁড়ির ইশারায় ঝরে যায়, তেমনই পুরাতনও নতুনের আগমনে তলিয়ে যায় কালের অতল গহ্বরে। এই সত্যকেই শেষ পর্যন্ত মেনে নিয়েছিলেন ঋত্বিক।
ছবির শেষাংশে এসে ঋত্বিক বাসন্তীর করুণ মৃত্যু দিয়ে মালোদের জীবন-সংগ্রামের ইতি টানেন। তিতাসের পানি শেষ হয়ে আসছে। মালোদের ঘরে ঘরে হাহাকার, কারো ঘরে অন্ন নেই। এক পর্যায়ে নদীতে চর পড়ে, জেলেদের জীবনে নেমে আসে দারিদ্র্য আর অত্যাচারের খড়গ। শেষ পর্যন্ত এক সময়ের স্বনির্ভর জেলেদের ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে নামতে হয় পথে। অন্যদিকে, তিতাসের চরে প্রতিষ্ঠিত হয় কৃষকের ‘আধিপত্য’। এক সময়ের প্রতিবাদী কণ্ঠ বাসন্তী আজ বড়োই ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত। ছেঁড়া কাঁথা জড়িয়ে সে পানির সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে। এক সময়ের প্রমত্তা তিতাস এখন শুকনো মরুভূমি। নদীমাতা যতোক্ষণ বেঁচে থাকে ততোক্ষণ কতোগুলো জীবনও বেঁচে থাকে। নদীর সঙ্গে তার সন্তানরাও মরে যায়। ‘নদী সভ্যতা আর জীবনাচারের সূত্র-এই ঐতিহাসিক সত্যই তিতাসের মাধ্যমে পরিচালক ঘটক আবার মূর্ত করলেন।’৬
চলচ্চিত্রে আমরা দেখি, বাসন্তী কোনোরকমে তিতাসের বুকে এসে পানির আশায় বালু খুঁড়তে শুরু করে। বাসন্তীকে তিতাসমাতা শেষ পর্যন্ত পানি দিলেও তার অলস হাত থেকে সবটুকু জল পড়ে যায়। মুহূর্তে ওই তিতাসের বালুই শুষে নেয় সবটুকু পানি। এবার ক্লোজ-আপে বাসন্তীর তৃষ্ণার্ত মুখ। হঠাৎ ভেসে এলো পাতার বাঁশির সুর। বাসন্তী দেখে-দূরে কৃষকদের দখল করা চরে সবুজ ফসলের দোলা, তারই মধ্য থেকে খালি গায়ে বাঁশি বাজিয়ে দৌড়ে আসছে একটি শিশু। বাসন্তীর ঠোঁটের কোণে একচিলতে হাসি। সে যেনো ওই হাসি দিয়েই বরণ করে নিলো নতুন ভবিষ্যতকে। বাসন্তীর মুখের হাসি দিয়ে ঋত্বিক নতুন সভ্যতাকে স্বাগত জানালেও এর পরিণতি সম্পর্কে সচেতন ছিলেন বলে মনে হয় না। সভ্যতা পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে যায় পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। ‘উৎপাদন সম্পর্ক’-এ পরিবর্তন নিয়ে আসে ‘উৎপাদন উপকরণ’-এর পরিবর্তন। তিতাস-এ মালোসমাজের পতনের সঙ্গে তাদের জায়গায় কৃষকদের ‘আধিপত্য’ প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু সেখানে ঋত্বিক নবাগত সভ্যতার ‘উৎপাদন উপকরণ’ ও ‘উৎপাদন সম্পর্ক’ কী হবে তা নিশ্চিত করে বলেননি। শুকনো তিতাসের বুকে তিনি যে-কৃষিভিত্তিক সমাজের স্বপ্ন দেখিয়েছেন তা আদৌ স্থায়ী হবে কি না, এ নিয়ে যথেষ্ট সংশয়ের অবকাশ থেকে যায়।
নদীর মৃত্যু কোনো সভ্যতার জন্য ইতিবাচক হতে পারে কি? নদীর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে নেতিবাচক পরিবর্তন আসে গোটা প্রকৃতিতে। আবহাওয়া ও জলবায়ুতে পড়ে বিরূপ প্রভাব। নদী শুকানোর সঙ্গে সঙ্গে জেগে ওঠে চর, পুরো ইকো-সিস্টেম তথা বাস্তুসংস্থানে আসে ব্যাপক পরিবর্তন। ঋতু-চক্র আর নিয়ম মেনে চলে না। এক পর্যায়ে উন্মত্ত নদী পরিণত হয় মরুভূমিতে। তিতাস-এ আমরা দেখি নদী একা মরে না, নদী মরে তার সন্তানদের নিয়ে। তাই কৈবর্তসমাজের মালোরা তিতাসের জল কমতে দেখে তাদের জীবিকা নিয়ে শঙ্কিত হয়। তিতাসের মৃত্যুতে বাসন্তীর বাবা তার শেষ সম্বলও হারায়। এক পর্যায়ে সব পুড়িয়ে ছাই করে দেয় মহাজনের লোকেরা। বাসন্তীর ছেলেবেলার সই মুঙলী এখন ভিক্ষা করে দূর-দূরান্তের গ্রামে। উদয়তারা আজ দু’মুঠো অন্নের জন্য আসামের চা বাগানে নিজের যৌবন বিক্রি করতেও কুণ্ঠিত হয় না। এক সময়ের কৈবর্তসমাজের সবচেয়ে অবস্থাসম্পন্ন কালুর মায়ের কোমরে দড়ি দিয়ে সব নিয়ে যায় মহাজনের লোকেরা। কিশোরের বৃদ্ধ বাবা শেষ পর্যন্ত শূন্য হুকা টানতে টানতে মারা যায়। তাদের এই করুণ পরিণতি তিতাসের জীবন ক্ষয়ে আসে।
তিতাসের মৃত্যুতে নতুন সমাজের আগমনে বাসন্তীর ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে ঋত্বিক প্রগতিকে স্বাগত জানান; কিন্তু প্রশ্ন ওঠে, সেই প্রগতি বা পরিবর্তন কতোটুকু পরিণত? অবশ্য এর অর্থ এই নয়-আমরা পরিবর্তন চাই না। কিন্তু যে-তিতাসের বাঁচা-মরার সঙ্গে প্রকৃতির বাঁচা-মরার প্রশ্ন-সেই তিতাসের বুকে ধানি জমিকে যখন ঋত্বিক নতুন সভ্যতা বলে স্বাগত জানান, তখন আমরা শঙ্কিত হই। প্রশ্ন ওঠে, ওই নতুন সভ্যতার ধানি জমির জন্য পানি কোত্থেকে আসবে? নদীতে জাগা চরের মালিকানা যখন কৃষকশ্রেণিকে নিশ্চিন্তে দিয়ে দেওয়া হয় তখন কৈবর্তদের জীবিকার ব্যবস্থাই বা কী হবে? তার সমাধান ঋত্বিকের তিতাস-এ নেই। যে দূরন্ত শিশুকে দিয়ে তিনি নতুন সভ্যতাকে বরণ করে নিচ্ছেন, সেই শিশুটির ভবিষ্যতইবা কী হবে?
পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও বাসন্তীর প্রতিষ্ঠান ভাঙার চেষ্টা
ঋত্বিক যে-মালো সমাজের চিত্র সেলুলয়েডে এঁকেছেন সেই গোষ্ঠীবদ্ধ সমাজের যূথবদ্ধ কঠোরতা আমাদের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি। আমরা দেখছি, সেই সমাজে পুরুষের কাছে নারী নির্দ্বিধায় নিজেকে সমর্পণ করছে। আর পুরুষ সেই সুযোগ শতভাগ কাজে লাগিয়ে তার ফায়দা হাসিল করছে। সে নারীর ওপর বিস্তার করছে একক ‘আধিপত্য’। এ-বৃত্তায়ন হাজার বছরের। পুরুষ নদীতে মাছ ধরবে, নারীরা জালের সুতা কাটবে, সংসার সামলাবে আর সন্তান জন্ম দিবে তিতাস পাড়ের জীবনও এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
কিন্তু তিতাস-এ বাসন্তী ও তার সই মুঙলীকে দিয়ে ঋত্বিক এই নিয়ম ভাঙতে চেয়েছেন। কৈবর্তসমাজের অন্যান্য নারীর মতো বাসন্তীরও বিয়ে দেওয়া হয়েছিলো শিশুকালে। কোনো কিছু বুঝে উঠার আগেই স্বামীকে হারায় বাসন্তী। কিন্তু শাস্ত্রের বিধান তাকে বোঝে না। যৌবনা বাসন্তী, হয়ে যায় রাঢ়ী বাসন্তী। তারপরও সে সমাজিক ‘অনুশাসন’ মেনে নিয়েছিলো। ভরা যৌবনে শরীরে জড়িয়ে নিয়েছিলো সাদা শাড়ি। পতিহারা-সন্তানহীনা বাসন্তী অনন্তর প্রতি আগ্রাসী সন্তানবাৎসল্য দেখিয়ে স্বামীহারা রাজলক্ষ্মীর সঙ্গে নিজের দুঃখকে ভাগ করে নিতে চেয়েছিলো। রাজলক্ষ্মী যখন অনন্তকে সঙ্গে নিয়ে গোকর্ণঘাটে পৌঁছায়, তখন বাসন্তী আর মুঙলী তাদের সাদরে অভ্যর্থনা জানায়। তাদের থাকা-খাওয়ার বন্দোবস্ত করে দেয়। কিন্তু সেখানেও আসে বিপত্তি। কৈবর্তসমাজে রাজলক্ষ্মীকে নিয়ে শুরু হয় নানা কানা-ঘুষা। শেষ পর্যন্ত মরদের বাড়িতে সভা ডাকা হয়। সেখানে রাজলক্ষ্মীর সন্তানের পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলেন কেষ্ট চন্দ্র, এতে ক্ষুব্ধ রামপ্রসাদের সঙ্গে প্রতিবাদ করে মুঙলীও।
১০ জনের বৈঠকে সে একা দাঁড়িয়ে কেষ্ট চন্দ্রের কটূক্তির জবাব দেয় এভাবে-‘রামপ্রসাদ জ্যাডা আমাগো এই ১০ জনার আসরে কিছু কিছু মানুষ আছে যারা ঘুষ খাইয়া প্যাট মোটা করছে, কিন্তু ঘরের চালে নাই এক মুঠা ছন। এই যে সব কানা মানুষ না, এনারা ম্যাইনষের বিচার করতে গিয়া শ্বউরের বিছনায় বউরে হোতায়, আর জামাইয়ের বিছনায় হাউড়ি হোতায়।’ অনগ্রসর মালো সমাজেও ১০ জনের সভায় নারীর এই প্রতিবাদ আশা জাগায়।
ঋত্বিক তৎকালীন মালো সমাজের কতিপয় নারীদের দিয়ে সমাজ কাঠামোকে তথা প্রতিষ্ঠানকে যেভাবে আঘাত করার সাহস দেখিয়েছেন, আজকে একবিংশ শতাব্দীতে এসে আমরা সেই সাহস অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছি। তাই আজকের ‘অগ্রসর সমাজ’-এও নারীদের ওপর অন্যায় সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়। ফতোয়ার নামে তাদের দোররা মারা হয়, গাছের সঙ্গে বেঁধে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন করা হয়। কিন্তু কেউ বাসন্তী কিংবা মুঙলীর মতো রুখে দাঁড়ায় না। অন্যদিকে, পাগল কিশোরের বাবার কাছে মাতব্বরের লোকেরা চাঁদা চাইতে আসলে বৃদ্ধ কিশোরের বাবা তার শেষ সম্বল জালটা মুঙলীকে দিতে চায়। কিন্তু মুঙলী মালোদের প্রাণের ধন জাল নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে নিজেই মাতব্বরকে বুঝিয়ে বলার দায়িত্ব নেয়। মুঙলীর এই ভূমিকা তৎকালীন পিছিয়ে পড়া কৈবর্তসমাজেও নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের দৃষ্টান্ত উন্মোচন করে।
অন্যদিকে, বাসন্তীর বাবা-মা তার এই অনন্তপ্রীতি মেনে নিতে চায় না। এবার বাসন্তী হয়ে ওঠে প্রতিবাদী। এতোদিন যে বাসন্তী সামাজিক অনুশাসনের বেড়াজালে আবদ্ধ ছিলো এবার সে ওই বেড়াজাল ছিঁড়তে চায়, বিলোতে চায় তার এতো দিনের বাঁধা যৌবন। এক পর্যায়ে বাসন্তীর পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে এভাবে-একলা গতর আমার লুটাইয়া দিমু, বিলাইয়া দিমু, নষ্ট কইরা দিমু। যা মনে লয় তাই করুম। মনে কইরা দ্যাহ কোনকালে বিয়া দিছিলা। মইরা গেছে। জানলাম না কিছু বুঝলাম না কিছু, সেই অবুঝকালে ধম্মে কাঁচা রাঢ়ী বানাইয়া থুইছো, পোড়া কপাল লইয়া বনে বনে কাইন্দা ফিরি। তোমরা কী বুঝবা, আমার দুঃখের গাঙ কতো গহীন।’
বাসন্তী তার পরিবারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে তার দাবি শেষ পর্যন্ত ঠিকই আদায় করে নেয়। আবার সমবায় সমিতির ফিশারি শাখার ব্যবস্থাপক যখন বাসন্তীর কাছে কু-মতলবে আসে তখন নিজেই তাকে শায়েস্তার ব্যবস্থা করে। কালুর মা আর মুঙলীকে সঙ্গে নিয়ে সে ঝাঁপিয়ে পড়ে ব্যবস্থাপকের ওপর। অন্যদিকে, রাস্তায় বাসন্তীকে দেখে কুরুচিপূর্ণ কবিতা পড়ে ওই ‘শিক্ষিত’ লোকেরা, এখনকার ভাষায় যাকে ইভটিজিং বলা হয়। মালো সমাজের কেউই এর প্রতিবাদ করে না। কিন্তু বাসন্তী এসব মেনে নেয় না। সে একা এর প্রতিবাদে সালিশ ডাকে। মালোদের নীরবতার প্রতিবাদ করে বলে, ‘মালো সমাজের গায়ের রক্ত কি তিতাসের জল অইয়া গেছে?’
ঋত্বিক একদিকে বাসন্তীর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানকে ভাঙার চেষ্টা করছেন অন্যদিকে রাজলক্ষ্মীর সংলাপে আবারও ওই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কাছেই নিজেকে সমর্পণ করেছেন। বাসন্তী যেখানে জীবন চালাতে পুরুষের প্রয়োজনকে এড়িয়ে একলা পথে চলে, রাজলক্ষ্মী সেখানে বলে পুরুষ ছাড়া জীবন চলে না। রাজলক্ষ্মীর ভাষায়, ‘আমি কেবল জানি একলা জীবন চলে না, পাগলেরে পাইলে তারে লখ্ কইরা জীবন কাটাই।’ যৌবনের এই বিচিত্রতায় বাসন্তী নিজে একলা চলার নীতি গ্রহণ করলেও রাজলক্ষ্মীকে বুঝতে তার কষ্ট হয় না। তাই রাজলক্ষ্মীকে বাসন্তী বলে, ‘তোমার মন এখন উতলা করছে দিদি, তোমার এহন একজন পুরুষ মানুষ দরকার।’
শিল্প সৃষ্টির খাতিরে কোনো আপোস নয়
উভয় বাংলায় যে কয়জন মুষ্টিমেয় জীবনবাদী চলচ্চিত্রকার বাংলা ছবিকে দিয়েছেন ভিন্ন মাত্রা, ঋত্বিক তাদের মধ্যে প্রথম সারিতে স্থান করে নিয়েছেন। তিনি ছিলেন পুনে ফিল্ম ইন্সটিটিউটের উপাধ্যক্ষ এবং ভারতের ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলনের পুরোধা। স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ঋত্বিক যেকোনো বিষয়কে দেখতেন-অন্য ১০ জনের চেয়ে একটু ভিন্নভাবে। আমরা যা দেখি টু-ডাইমেনশনে বা দ্বিমাত্রিক দৃষ্টিতে, ঋত্বিক তাই দেখেন থ্রি-ডাইমেনশনে বা ত্রিমাত্রিক দৃষ্টিতে। তার এই দৃষ্টিশক্তিই তাকে করে তোলে আত্মবিশ্বাসী। ঋত্বিকের কথাবার্তায় এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তার ভাষায়,‘আমি বিশ্বাস করি আমার ভালো লাগাটাই আর দশজনের কাছেও ভালো লাগবে। কারণ আমি শিল্পী। সমাজের আর দশ জনের মন ও দৃষ্টি নিয়ে আমি সবকিছু প্রত্যক্ষ করি। যদি আমার ভালো লাগাটা আর দশজনের কাছে ভালো না লাগে তাহলে আমি শিল্পী নামের যোগ্য হতে পারি না।’৭ তার এই দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই আমরা তার কাছ থেকে পেয়েছি জীবনঘনিষ্ঠ সব ছবি।
এবার সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের তুলনামূলক পর্যালোচনায় আসা যাক। উপন্যাস আর চলচ্চিত্র কি একই জিনিস? যখন কোনো উপন্যাসের চিত্রায়ণ করা হয়, তখন বিবেচ্য হলো-এর মূল সুর ও মূল্যবোধ ঠিক রাখা হচ্ছে কি না? সাহিত্য থেকে উপাদান সংগ্রহ করা হলেও চলচ্চিত্র কখনও মূল সাহিত্য হতে পারে না। একজন সাহিত্যিকের যেকোনো সৃষ্টির মূল উপাদান বা কাঁচামাল যেখানে শব্দ, সেখানে একজন চলচ্চিত্রকারের প্রধান হাতিয়ার হলো ইমেজ। তিতাস মুক্তির পর থেকেই সমালোচকরা বারবার অভিযোগ করেন, ঋত্বিক অদ্বৈতের মূল উপন্যাস থেকে অনেকটাই দূরে সরে গেছেন। একই অভিযোগ করা হয়েছিলো রবীন্দ্রনাথের নষ্টনীড় অবলম্বনে সত্যজিতের চারুলতা সম্পর্কেও। কিন্তু ‘এমন অনেক নজির আছে : চলচ্চিত্রে রূপান্তরিত হওয়ার পর দেখা গেছে, এর সাফল্যে মূল উপন্যাসটির ব্যর্থতা ঢাকা পড়ে গেছে। অথচ পুস্তকাকারে প্রথম প্রকাশিত হওয়ার পর মূল লেখাটির ভাগ্যে না জুটেছে ভালো সমালোচনা, না বাজারি কাটতি। মূলত চলচ্চিত্র তৈরি হওয়ার পরই দেখা গেছে, মূল লেখক ও উপন্যাস রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে গেছেন।’৮
আমি কোনোভাবেই তিতাস-এর মূল স্রষ্টা অদ্বৈতকে ছোট করছি না। তবে একটা বিষয় তো সত্য যে, যেসব দর্শক বা চলচ্চিত্র সমালোচক তিতাস একটি নদীর নাম-এর চিত্ররূপ দেখে সমালোচনা করছেন তাদের কতোজন অদ্বৈতের মূল উপন্যাস পুরোটা পড়েছেন বা পড়বেন? তারা বুঝতে চান না যে, চলচ্চিত্র ও উপন্যাস দুটো ভিন্ন শিল্পকীর্তি। তাই ঋত্বিক তিতাস-এ বেশ কিছু জায়গায় মূল উপন্যাসের বাইরে এসে নিজের মতো করে চিত্রায়ণ করেছেন। কিন্তু তাতে কি খুব বেশি কিছু এসে যায়?
এক্ষেত্রে ‘সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’র কথা বলা যায়। বিভূতিভূষণের ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসকে সম্পূর্ণ অনুসরণ না করেও সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’ চলচ্চিত্র সম্পূর্ণ স্বাধীন, ভিন্নমাত্রার এক চলচ্চিত্র হয়ে উঠে এর আঙ্গিক, দৃশ্যপট, শব্দের ব্যবহার, প্রতীক সব কিছু মিলিয়ে। উপন্যাস ও চলচ্চিত্র প্রতিটি শেষ পর্যন্ত আলাদা এবং স্বাধীন শিল্পমাধ্যম। চলচ্চিত্র তার নিজস্ব ভাষায় কথা বলবে, চলচ্চিত্রের প্রয়োজন নেই সাহিত্যের গা-ঘেঁষে থাকার।’৯
কাজেই কোনো উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র করার অর্থ এই নয় যে, তাতে অক্ষরে অক্ষরে উপন্যাসের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। এখানে মনে রাখতে হবে, চলচ্চিত্রে একটা কাহিনী তুলে ধরার জন্য পরিচালক পান খুবই সীমিত সময়। দুই-তিন ঘণ্টায় একটা উপন্যাসের সব বিষয় তাই পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে চলচ্চিত্রে নিয়ে আসা পরিচালকের জন্য একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ। অদ্বৈত মল্লবর্মণের তিতাসকে সেলুলয়েডে আঁকতে পারবেন কি না সাংবাদিকদের-এমন প্রশ্নের জবাবে ঋত্বিক তাই বলেছিলেন,‘কাজটা খুবই কঠিন। তিতাসের পাড়ে পাড়ে গড়ে ওঠা জেলেদের সমাজ-সংস্কৃতি, ওদের হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখকে অদ্বৈত মল্লবর্মণ যত আপনার করে বুঝতে পেরেছিলেন, আর কারো পক্ষে তা সম্ভব নয়। তবুও তাঁর সমগ্র বইটা পড়ে যতটুকু বুঝেছি তাতে মনে হয় মল্লবর্মণের মূল বক্তব্যটাকে আমি বুঝতে পেরেছি, আমি তারই ছবি তুলবো। সে বিশ্বাস আমার আছে।’১০
চলচ্চিত্রের শুরুতেই লালনের গানের সঙ্গে পর্দায় ভেসে ওঠে-এই চিত্র শাশ্বত বাংলার আবহমান সূত্রের ধারক বাংলার খেটে খাওয়া অখ্যাত জনের উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত।’ তিতাস পাড়ের মালোরা যে-ওই শ্রেণিরই প্রতিনিধিত্ব করে। শুধু তাই নয়, ঋত্বিক শুরু থেকেই চেয়েছিলেন-ছবিতে কোনো প্রকার কৃত্রিমতাকে আশ্রয় না দিতে। এক্ষেত্রে তার সঙ্গে লুই বুনুয়েলের তুলনা চলে। তিনিও কৃত্রিমতাকে এড়িয়ে চলতেন সচেতনভাবে, বিভিন্ন সৃষ্টিতে তিনি তার প্রমাণ রেখেছেন। তার বিখ্যাত প্রামাণ্যচিত্র ল্যান্ড উইদাউট ব্রেড-এ তিনি মধ্য স্পেনের সালামানকার পাহাড় ঘেরা অঞ্চলের সত্যকে তুলে ধরেছেন। সেখানে তিনি দীর্ঘদিন অবস্থান করে যা দেখেছেন তাই হুবহু তুলে ধরেন এই তথ্যচিত্রে। সেখানে মানুষের খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির অভাব, মানুষ আর পশুর যুগপৎ একই ঘরে বসবাস, ম্যালেরিয়ার প্রকোপ, মৌমাছির আক্রমণে পশুর মৃত্যু, বন্ধুর পথে চলতে গিয়ে গবাদিপশুর মৃত্যু প্রভৃতি ঘটনার সত্য চিত্র বুনুয়েল এঁকেছেন সেলুলয়েডে। সত্য যে-কতোটা নির্মম হতে পারে তা বুনুয়েল ল্যান্ড উইদাউট ব্রেড-এ দেখিয়েছেন। তাই বলা হয়,‘এই ছবিতে অন্যকে দেখার সুযোগ নেই, অন্যের চোখ দিয়েও দেখার সুযোগ নেই-দুঃখ এবং বিবেক-বিলাসে পরিত্রাণ নেই-এর গল্প একরৈখিক নয়, যা চেখে সুখ আছে। এর বাস্তবতা সাজিয়ে গুছিয়ে পরিবেশিত নয়, যা পর্যটনের আনন্দ দেয়। দর্শকের জন্য এ এক অমোঘ, নির্মম সত্য-যাত্রা।’১১
যাহোক আবারও আলোচনায় ফিরে আসি। ঋত্বিক তিতাস-এ চেষ্টা করে গেছেন মাটি আর মানুষের কাছাকাছি যেতে, রাজরোগও তাকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। মহাখালীর যক্ষ্মা হাসপাতালে ভর্তি হয়েও তিনি কাজ থামাতে দেননি, সহকর্মীদের কাজ চালিয়ে যেতে বলেছেন। সে-সময় যখন কমার্শিয়াল ছবি তৈরির হিড়িক পড়ে গিয়েছিলো তখন ঋত্বিক এমন একটা মহাকাব্যিক উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র করার যে-সাহস দেখিয়েছেন তা শুধুমাত্র তার দক্ষ পরিচালনা গুণেই শেষ পর্যন্ত উতরে গিয়েছিলো।
তিতাস ১৯৭৩ সালের ২৭ জুলাই ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জে একযোগে মুক্তি পায়। কিন্তু ভোগবাদী ছবির দৌরাত্ম্যে জীবনবাদী ছবিটি টিকতে পারে না। চট্টগ্রামের ‘জলসা’ প্রেক্ষাগৃহ ছাড়া বাকি সব ক’টা প্রেক্ষাগৃহে ছবিটি মাত্র দুই-তিন দিন চলে। এরপর আর ছবিটি প্রদর্শন হয়নি।১২ ভোগবাদী ছবির দৌরাত্ম্যে আরও একবার তিতাস-এর মতো একটি জীবনবাদী ছবি টিকতে পারলো না। তাতে কী? এজন্য কি তিতাস-এর মতো ছবি হবে না? দর্শক কী খাবে আর কী খাবে না, তার ওপর ভিত্তি করে যদি চলচ্চিত্র নির্মাণ হয় তাহলে সেখান থেকে কি জীবনঘনিষ্ঠ ছবি আশা করা যাবে?
তিতাস সৃষ্টি করতে গিয়ে ঋত্বিক মূল উপন্যাসের সঙ্গে যতোটুকুই থাকুন না কেনো-এর চিত্রায়ণ, পরিচালনা, চিন্তা, ব্যবসার ক্ষেত্রে অনমনীয়তা; তাকে অনন্য আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ‘‘তিতাস’-এর অন্যতম সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন ওয়াহিদুল হক। তিনি বলেছেন, বাহাদুর হোসেন খান টাইটেল মিউজিকের জন্যে যে সঙ্গীত কম্পোজ করেছেন তা ছিল পাশ্চাত্য প্রভাবিত এবং ছবির থীম ও আবহের সঙ্গে সঙ্গতিহীন। ফলে তাঁদের এটা বর্জন করতে হয়েছিল। তাঁরা আরিচাঘাটের পঁচানব্বই বছরের এক বৃদ্ধকে দিয়ে দু’টি গান রেকর্ড করান, সঙ্গে ঢোল বাজান ঐ বৃদ্ধেরই ভ্রাতুষ্পুত্র। বৃদ্ধের গাওয়া প্রথম গানটি তিতাসের বিশাল ফ্রেমে টাইটেল মিউজিক হিসেবেই শুধু ব্যবহৃত হয় নি, ছবির সঙ্গীত কাঠামোকেও তা নিয়ন্ত্রন করেছিল।’১৩
কচুরিপানার মতোই ভাসমান অনন্তদের জীবন
‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসের স্রষ্টা অদ্বৈত মল্লবর্মণ নিজেই ছিলেন সমাজের ভাসমান মানুষের প্রতিনিধি। অপরিণত বয়সেই মা-বাবাকে হারান তিনি। শীর্ণদেহী অদ্বৈতকে বালক বয়সে অনেক গুরুদায়িত্ব নিতে হয়। দারিদ্র্যকে জয় করে অদ্বৈত প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেন এবং এরপর জনৈক শিক্ষকের আর্থিক সহায়তায় প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ হন। আত্মশক্তিতে বলিয়ান অদ্বৈত এবার কলেজে ভর্তি হন; আশ্রয় হয় কুমিল্লায়, কল্পনা দেবীর বাড়িতে। কিন্তু বিপ্লবী আন্দোলনে জড়িত থাকায় কল্পনা দেবী গ্রেপ্তার হলে আবারও আশ্রয়হীন হয়ে পড়েন অদ্বৈত। ‘১৯৩৪ সালের মে-জুন মাসে অদ্বৈতর প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে অদ্বৈত কলকাতায় পৌঁছালেন। তারপরের ইতিহাস অন্য রকমের-জীবন ও মরণের।’১৪
কৈবর্তসমাজের মানুষ হিসেবে তিতাসের অনেক নির্মমতার প্রত্যক্ষ সাক্ষীও অদ্বৈত। মালোদের ওপর বিভিন্ন সময় যম হয়ে আসে নানা দুর্যোগ। প্রকৃতির সঙ্গে এই যুদ্ধ করে সবাই টিকতে পারেনি। তাই দেখা যায়, কারও বাবা বেঁচে আছে তো মা নেই, মা আছে তো বাবা নেই। তিতাস-এ যে বাপ-মা হারা অনন্তকে দেখানো হয়েছে সেটা ঋত্বিক বা অদ্বৈতের মনগড়া কোনো চরিত্র ভাবার অবকাশ নেই। এই অনন্তরাই কৈবর্তসমাজের নিষ্ঠুর বাস্তবতা। কাদের মিয়া যখন বনমালীকে লক্ষ্য করে বলে ‘বুঝলা বড় অভাগ্যা এরা, কেউর মা নাই, বাপ নাই, লাথি-ঝাঁটা খায়; কেউর মা আছে, কিন্তু দানা দিতে পারে না, কেউর বাপ আছে মা নাই।’ বনমালী তখন অনন্তকে দেখিয়ে দেয় ভাসমান মালো-সন্তানদের প্রতিনিধি হিসেবে।
জন্মের পর থেকেই অনন্ত বাবার স্নেহ থেকে বঞ্চিত। যে মা তাকে পরম স্নেহে আগলে রেখেছিলো সেই মায়ের মৃত্যুর পর অনন্তর জীবন হয়ে ওঠে আরও দুর্বিষহ। বাসন্তী তার দায়িত্ব নেয়। কিন্তু মালো-পাড়ার দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের যেখানে নিজেরই নুন আনতে পানতা ফুরায় সেখানে অনন্তের মতো ছিন্নমূল শিশুরা সবার কাছে তো বোঝা-ই। বাসন্তী অনন্তের দায়িত্ব নিলে তার বাবা-মা এটা ইতিবাচকভাবে নেয়নি। তাই অনন্ত নতুন আশ্রয়ের সন্ধানে থাকে। হাটে আলু আনতে গিয়ে বনমালীর সঙ্গে পরিচয় হয় তার। বনমালীরা নৌকা নিয়ে খালে খালে ঘুরে, মাছ ধরে-মাছ বেচে, নৌকায় রাঁধে-নৌকায় খায়। তারা ঠাট্টা করে অনন্তকে সঙ্গে নিতে চায়। ঘরহারা অনন্ত দু’মুঠো অন্নের নিশ্চয়তায় তাদের সঙ্গে যাবার জন্য নাছোড়বান্দা হয়। সে শক্ত করে নৌকা ধরে থাকে, ওই নৌকাই যেনো তার শেষ আশ্রয়। বনমালীরা তাকে সঙ্গে নেয় না। তিতাসের জলে পড়ে থাকে অনন্ত, তার পাশ দিয়ে ভাসতে থাকে কচুরিপানা।
ঋত্বিক তার ক্যামেরায় সবসময়ই অনন্তর মতো ভাসমানদের তুলে ধরেছেন। কারণ, একদিক থেকে ঋত্বিক নিজেও ছিলেন ভাসমান মানুষ। ৪৭’র দেশভাগ-বিশেষ করে, বাংলার ভাগ ঋত্বিক কোনোদিনই মেনে নিতে পারেননি। তার চলচ্চিত্রে বারবার দেশভাগের ফলে সৃষ্ট উদ্বাস্তুদের দুর্বিষহ জীবনের ছবি তিনি তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। মেঘে ঢাকা তারা, কোমল গান্ধার ও সুবর্ণরেখা-তে তাই তিনি দেখিয়েছেন জন্মভূমি হারানোর যন্ত্রণা। ‘ঋত্বিক ঘটক তাঁর ‘সুবর্ণরেখা’ ছবিটি সম্পর্কে বলেছেন,‘ছবিটিতে প্রথমত: উদ্বাস্তু বলতে শুধুমাত্র পূর্ববাংলা থেকে তাড়িয়ে দেয়া লোকজনকেই বোঝানো হয় নি; আমার জন্যে সে শব্দটির আরও একটা অর্থ আছে। আমি যা বলতে চাই তা হচ্ছে, আমরা সবাই কোন না কোনভাবে জীবন থেকে উদ্বাস্তু হয়ে পড়েছি। এটা ভৌগোলিক অবস্থানের চেয়ে অনেক-ওপরকার সমস্যা।’১৫
সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ সরকার অবিভক্ত ভারতে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে দিয়েছিলো। তাদের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতির কারণে মুসলমান আর হিন্দুদের মধ্যে দেখা দেয় পারস্পরিক অবিশ্বাস। ক্ষমতাবানরা তখন ‘নতুন জীবন’-এর ধোঁয়া তুলে পৃথক রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখাতে থাকে। সেই স্বপ্নে বিভোর হয়ে মানুষ নতুন জীবনের আশায় সীমানা তুলে নিজেদেরও ভাগ করেছিলো। কিন্তু যে-জীবনের আশায় তারা ‘জীবন’কে ভাগ করেছিলো সেই জীবন আর তাদের কাছে ধরা দেয়নি। পৃথক মাটি, পৃথক দেশ অনেক কিছু দিয়েও, অনেক কিছুই দিতে পারেনি। উল্টো সেই কাঙ্ক্ষিত ‘জীবন’-এ মানুষগুলো হয়ে পড়েছিলো উদ্বাস্তু।
ঋত্বিক এই উদ্বাস্তু দলেরই একজন। দেশভাগ হলে তিনি তার শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত রাজশাহী ছেড়ে যেতে বাধ্য হন। বাংলা-ভাগ তাকে শুধু ভৌগোলিকভাবেই দূরে নিয়ে যায়নি, মানসিকভাবেও সরিয়ে নিয়েছিলো অনেক দূরে। তাই স্বাধীনতার পর তিতাস করতে বাংলাদেশে আসলেও তিনি তার শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত পদ্মায় কিংবা রাজশাহীর মিয়াপাড়ার পৈতৃক ভিটায় আর আসেননি। হয়তো নিজের পৈতৃক ভিটায় তাকে পাসপোর্ট হাতে নিয়ে যেতে হবে একথা তিনি কখনও কল্পনাও করেননি।
আবারও তিতাসে ফিরে আসি। তিতাসের জল শুকিয়ে আসছে, মালোদের ঘরে অন্ন নেই-জান বাঁচানোর মতো পানি নেই। সব হারিয়ে বাঁচার আশায় তিতাস পাড়ের মালোরা শহরের পানে ছুটছে। এমন এক সময় বাসন্তীর সঙ্গে দেখা হয় বনমালীর বোন উদয়তারার। একসময় অনন্তকে নিয়ে তিতাস পাড়ে এই উদয়তারার সঙ্গেই ঝগড়া হয় বাসন্তীর। কিন্তু আজ অনন্তকে নিয়ে তার কোনো ভাবনা নেই, কারণ এখন তার ভাবনায় আছে মুমূর্ষু তিতাস। উদয়তারার কাছ থেকে বাসন্তী জানতে পারে, অনন্ত এখন তার কাছ থেকে পালিয়ে শহরে চলে গেছে। সেখানে সে ভদ্রলোকদের সঙ্গে থাকে। তিতাসের এমন পরিণতির কারণে যখন তিতাস পাড়ের উদ্বাস্তুরা শহরের পথে ছুটছে তখন সেই একই পথ ধরতে হচ্ছে অনন্তকেও। উদয়তারা বা বাসন্তী অনন্তের এই প্রবণতাকে তার স্বার্থপরতা হিসেবে দেখলেও আসলে কৈবর্তসমাজে অনন্তের মতো ছিন্নমূলদের সামনে আর কোনো পথ খোলা থাকে না।
মালোদের কাছে তিতাসই ঈশ্বর
যদি প্রশ্ন করা হয় তিতাস একটি নদীর নাম-এর প্রধান চরিত্র কে? দর্শকদের পক্ষে এর উত্তর দেওয়াটা বোধহয় সহজ হবে না। কারণ, অদ্বৈতর মূল উপন্যাসে যেমন প্রতিটি চরিত্রই নিজ নিজ গুণে ভাস্বর, ঠিক তেমনি ঋত্বিকও তিতাস নির্মাণে অদ্বৈতকে এক্ষেত্রে অনুসরণ করেছেন। কাজেই এসব বিষয় বিবেচনায় তিতাস একটি নদীর নাম-এ তিতাসকেই প্রধান চরিত্র বলে ধরে নেওয়া যায়। এই তিতাসকে কেন্দ্র করেই বাসন্তী, রাজলক্ষ্মী কিংবা কিশোরদের আবির্ভাব। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিতাসের পাড়েই গড়ে উঠেছে কৈবর্তসমাজ। তিতাসই তাদের খাওয়ায়-পরায়, বাঁচিয়ে রাখে। মালোরা তিতাসে নৌকা বাইচ করে, হোলি খেলে কিংবা দোল-লীলায় মেতে ওঠে। কখনও কখনও আবার এই তিতাসই তাদের সঙ্গে নিষ্ঠুর আচরণ করে, কাঁদায়, ভিটে-মাটি থেকে উচ্ছেদ করে কখনওবা না-খাইয়ে মারে। তাই তিতাস যেমন মালোদের জীবিকা সংগ্রহের প্রধান ক্ষেত্র একই সঙ্গে পূজ্য দেবতাও বটে। আর তাই মালোদের মাঝে যে-সমস্ত সংস্কার ও বিশ্বাস গড়ে উঠেছে তা মূলত তিতাসকে ঘিরেই।
ঋত্বিকের তিতাস-এ আমরা দেখি, কৈবর্তসমাজ এক বর্ণময় ও স্বতন্ত্র সংস্কৃতি ধারণ করে। তাদের দৈনন্দিন জীবনাচারে, হাসি-ঠাট্টায়, প্রবাদে, পার্বণে এসব ফুটে ওঠে। আপাতদৃষ্টিতে ধর্মবিশ্বাসকে আলাদাভাবে বিবেচনা করা হলেও আসলে কৈবর্তসমাজের প্রাত্যহিকতার মধ্যেই তাদের ধর্মবিশ্বাস লুক্কায়িত। মালোদের তাই দেখা যায় বিভিন্ন ব্রত ও অনুষ্ঠানাদি পালনে তিতাসের জল ব্যবহার করতে। আবার ‘তিতাসপারের মালোদের দৃঢ় বিশ্বাস,‘গাঙের ডর মাঝ গাঙে না, গাঙের বিপদ পারের কাছে। বা’র গাঙে মা-গঙ্গা থাকে, বিপদে নাইয়ারে রক্ষা করে।’১৬ আবার তিতাসের পানি যখন কমে আসছে, যখন মাছ ধরার মতো পর্যাপ্ত পানি তিতাসে নেই তখন বাসন্তীর বাবা রাধাচরণ মালো বলছে,‘স্রোত ঘুইরা গেছে। গাঙের হিসাবে কেমন যেনো একটু লড়চড় হইছে। কুড়–ইলার মুখের স্রোত খালি লাটুমের মতো ঘোরে। হুইয়া হুইয়া চোখের পাতা জোড়া লাগলো স্বপন দেখলাম তিতাস হুকাইয়া গেছে। হুকাইয়া ঠন ঠন করতাছে।’
মূল উপন্যাসে অদ্বৈত তিতাসকে নিয়ে মালোরা যে-কতোটা উদ্বিগ্ন তা তুলে ধরেছেন উপন্যাসের ভাসমান অংশে। সেখানে যখন রাধাচরণ তার দুঃস্বপ্নের কথা বলছিলো অন্যরা তা আগ্রহভরে শুনছিলো। কেউ কেউ একে নিছকই স্বপ্ন বলে উড়িয়ে দিতে চাইলেও অন্যরা মুখ শুকিয়ে বলে স্বপ্ন যদি সত্য হয়! আসলে তাদের প্রাণের তিতাস শুকিয়ে যাবে এটা তারা কল্পনাই করতে পারে না। তাই মোহন তিতাসে জাল ফেলে যখন রীতিমতো হতভম্ব, যখন সে খবর দেয় তিতাস শুকাচ্ছে; তখন মালোরা তা বিশ্বাস করতে পারে না। তাদের একজন মোহনকে বলে,‘কী কইলি, মোহন তুই কলি কী? আরে অ মন-মোহন তুই কলি কী?’
ঋত্বিক যে-তিতাসকে সেলুলয়েডে এঁকেছেন সাদা চোখে দর্শকের মনে হতে পারে সেখানে তিতাসই মালোদের কাছে ঈশ্বর হয়ে উঠেছে। আসলে মানুষ যখন কারো কাছে ঠেকে যায়, তখন তাকেই একমাত্র আরাধ্য জ্ঞান করে; শুরু করে তার আরাধনা। আর এতে ব্যক্তি-মানুষ ক্রমশ নিজের শক্তি বা ক্ষমতাই হারাতে থাকে। একটুতেই সে নিজেকে সমর্পণ করে কল্পিত ঈশ্বরের কাছে। মার্কসও একইকথা বলেন,‘একজন শ্রমিক যত বেশী পরিশ্রম করতে থাকে, তার নিজের হাতে তৈরী বিচ্ছিন্ন বস্তুজগৎ তত বেশী শক্তিশালী হয়ে ওঠে; তার নিজের যা-কিছু, তা সে হারিয়ে ফেলতে থাকে, আর আরো বেশী নিঃস্ব হয়ে ওঠে। ধর্মেও একই জিনিস ঘটে। মানুষ যত বেশী ঈশ্বরকে ক্ষমতা দেয়, তার নিজের শক্তি ততই কমতে থাকে।’১৭ সেই অতিপ্রাকৃত শক্তি তাদের কাছে হয়ে ওঠে ঈশ্বর। তিতাস একটি নদীর নাম-এ অদ্বৈত ও ঋত্বিক উভয়েই দেখিয়েছেন-মালোদের কাছে কীভাবে তিতাস ঈশ্বর হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে, মানিকের পদ্মা-য় উল্টো চিত্র। সেখানকার মালোরা পদ্মাকে ঈশ্বর মনে করে না, তাদের মতে-ঈশ্বর এমন দারিদ্র্যপীড়িত অজপাড়ায় থাকতে পারেন না। ঈশ্বর তাদের থেকে অনেক দূরে, থাকেন ভদ্র-পল্লিতে; তাই পদ্মা পাড়ের মালোরা নিজেদেরকে পদ্মার কাছে সমর্পণ করে না। আর গোকর্ণঘাটের মালোরা তিতাসের কাছে আত্মসমর্পণ করে, তিতাসের পূজা করে। অথচ তিতাস কিন্তু তাদেরকে এমনি এমনি খাওয়ায় না। মালোরা রীতিমতো যুদ্ধ করে তিতাসের বুক থেকে নিজেদের আহার ছিনিয়ে আনে। আবার যখন তিতাস শুকিয়ে যায় তখনও কিন্তু ওই মানুষই তিতাসের বুকে ফলায় সবুজ ফসল। আসলে নিজস্ব উৎপাদন ও সৃষ্টিতেই মানুষের সত্যিকার পরিচয় লুক্কায়িত থাকে। তাহলে দেখা যায়-এখানে তিতাস নয় মানুষই মুখ্য, মানুষই ঈশ্বর। ঋত্বিক আসলে এই কথাটিই বলতে চেয়েছেন।
মালোদের একতার মূলে কুঠারাঘাত
বাংলার মালো সমাজ ঐতিহাসিকভাবেই একসূত্রে আবদ্ধ, সুখে-দুঃখে তারা একসঙ্গে থেকেছে, প্রকৃতির সঙ্গে একসঙ্গে লড়েছে। কিন্তু ওই সমাজেও সৎ লোক যেমন ছিলো, অসৎ লোকেরও তেমন অভাব ছিলো না। একই চিত্র দেখা যায় মানিকের পদ্মা নদীর মাঝি-তে। সেখানে কুবের আর গণেশ প্রতিনিয়ত জাল ও নৌকার মালিক ধনঞ্জয়ের কাছে শোষিত হয়, ঠকতে থাকে; আর তিতাসে শোষিত হয় কাদের মিয়া অথবা সুবলরা। আবার পদ্মা নদীর মাঝি-তে শেতল বাবুর মতো দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তির মতোই তিতাসে আছে বিধুভূষণ পাল, কালোবরণ কিংবা কেষ্ট চন্দ্ররা। অর্থাৎ মালো-সমাজের দুই রূপকারই এক্ষেত্রে একমত হয়েছেন। আর ঋত্বিকও মালো সমাজের পর্দার অন্তরালে থাকা এসব বিষয় সেলুলয়েডে উন্মোচন করেছেন। একই সঙ্গে মূল উপন্যাসে না থাকলেও ঋত্বিক তিতাস-এ মুঙলীকে দিয়ে বলিয়েছেন যে, মালো সমাজে কেষ্ট চন্দ্রের মতো মতমোড়লরা কীভাবে ঘুষ খেয়ে পেট মোটা করে আর স্বার্থবাদী চক্রের হয়ে কাজ করে।
ঋত্বিক যে তিতাস এঁকেছেন সেখানে গোকর্ণঘাটের মালোদের অর্র্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। পদ্মা পাড়ে কেতুপুরের মালোদের কাছে জন্মের অভ্যর্থনা বিষণ্ণ ও নিরুৎসব হলেও গোকর্ণঘাটে জন্মের অভ্যর্থনা জাঁকজমকপূর্ণ, উৎসবমুখর। গোকর্ণঘাটের মালোদের তাই বিভিন্ন রকম পূজা-পার্বণ কিংবা হোলি খেলায় মত্ত হতে দেখা যায়। মূল উপন্যাসে অদ্বৈত বিজয় নদীর পাড়ের মালোদের সঙ্গে তিতাস পাড়ের মালোদের তুলনা করেছেন। সেখানে দেখানো হয়েছে-তিতাস পাড়ের মালোদের অবস্থা তুলনামূলকভাবে সচ্ছল। কিন্তু তারপরও এখানে আছে সুবল কিংবা গগণ মালোদের মতো দরিদ্র। তিতাসের আশীর্বাদের পরও পাগল কিশোরের বাবা রামকেশব, হতভাগিনী রাজলক্ষ্মীর ঘরে প্রত্যহ জ্বলেনা চুলা, উপোস করে দিন কাটাতে হয় তাদের। দারিদ্র্যের কামড়ে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যায় তারা। ঋত্বিক কৈবর্তসমাজের এই শ্রেণিবৈষম্য স্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন। আর এই শ্রেণিবৈষম্যের কারণেই মালোদের একতা শেষ পর্যন্ত আর টিকে থাকেনি।
কৈবর্তসমাজের সঙ্গে প্রতিনিয়ত দ্বন্দ্ব-সংঘাত চলতে থাকে তিতাস পাড়ের অন্যান্য সমাজের। বিধুভূষণের মতো সমাজের পুঁজিপতি-শ্রেণি মালোদেরকে যুগ যুগ ধরে শাসন-শোষণ করতে চায়। কারণ ওদের শ্রম আর ঘামেই বিধুভূষণরা টিকে থাকে, ফুলে কলা গাছ হয়। কিন্তু কৈবর্তদের ওপর শাসনের চাবুক চলতেই থাকে, তাদের অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয় না। মালোদের এই দীনতার সুযোগ নেয় টাকাওয়ালা লোকেরা। নজর দেয় মালোদের বিধবা নারীদের দিকে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত অপমানিত হয়ে মার খেয়ে, ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসতে হয়। কৈবর্তদের একতার কারণে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর উদ্দেশ্য হাসিল হয় না।
এবার তারা ভিন্ন পথে এগোতে চায়; তারা মালোদের একতার মূলে কুঠারাঘাত করে। তামসির বাপের মতো কু-চক্রি মালো, টাকার কাছে আত্মাকে বিক্রি করে দিয়ে নিজের জ্ঞাতিদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে অংশ নেয়। তামসির বাপ তার বাড়ির উঠোনে যাত্রাগানের আসর দিতে পরামর্শ দেয়। মালোদের ওপর চলে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। মালোদেরকে অন্তরে মারার পরিকল্পনা করে তারা। যে-নৈতিকতাই ছিলো মালো সমাজের একমাত্র চালিকা শক্তি, এক পর্যায়ে সেই নৈতিকতা হারিয়ে ফেলে তারা। এভাবেই শতাব্দীর পর শতাব্দী নিম্নবর্গের মানুষ যখনই নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে একতাবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করেছে, তখনই শোষক-শ্রেণি বিভিন্ন ছলে-বলে সেই একতার মূলে কুঠারাঘাত করেছে। তাদেরকে বিভিন্ন দলে-উপদলে বিভক্ত করার চেষ্টা করেছে। ঋত্বিকও তাই দেখিয়েছেন।
ঋত্বিক দেখাচ্ছেন মালোরা যাত্রা-পালা নিয়ে এতোটাই মত্ত হয়ে গেছে যে, তাদের প্রাণের তিতাস শুকিয়ে আসছে এটা তাদের নজরেও আসেনি। এবার মোহন তিতাস থেকে হতাশ হয়ে ফিরে এসে বলে,‘মালোগুষ্টি যাত্রা করুক, কবি গান করুক, নাচুক,মারামারি-কামড়াকামড়ি যা মন চায় করুক। আর ভাবনা নাই। গাঙ হুকাইতাছে।’ রাধাচরণ মালোর স্বপ্ন সত্য হলো; তিতাস এক পর্যায়ে শুকিয়ে গেলো, মালোদের অর্থনৈতিক কাঠামো একেবারে ভেঙে পড়লো। কারণ, কৈবর্তসমাজের অর্থনীতির চালিকাশক্তিই ছিলো তিতাস। পুঁজিপতিরা এই সময় মালোদের অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে দিতে প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে পুঁজিকে। শুধু মালোদের ওপর নয়, এই অস্ত্রের প্রয়োগ চলে সবখানেই। আর তার সঙ্গে যুগপৎ চলে রাজনৈতিক, নৈতিক ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। তিতাস পাড়ের মালোরা ঋণদান সমিতির কাছ থেকে একসময় হুজুগে পড়ে যে-ঋণ নিয়েছিলো এখন তাই চক্রবৃদ্ধি হারে বেড়ে পাহাড়সমান হয়। তিতাসের জল শুকিয়ে যাওয়ায় মালোদের কাছে এখন এক কানা-কড়িও নাই। আর এভাবেই মালোরা প্রমত্তা তিতাসের কাছে, প্রকৃতির কাছে হার না মানলেও শেষ পর্যন্ত পুঁজির কাছে হার মানতে বাধ্য হয়।
শেষ কথা
ঋত্বিকের তিতাস ‘মধুমিতা’ প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় ১৯৭৩ সালে। দেখতে দেখতে কেটে গেলো তিতাস-এর ৪০টি বছর। তিতাস সৃষ্টি করে অনেক আগেই আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন তিনি। বেঁচে ছিলেন মাত্র ৫১ বছর। ঋত্বিক জীবনের শেষদিন পর্যন্ত মানুষ ও সমাজের কাছে ছিলেন নিবেদিত, দায়বদ্ধ। গেলো বছর পালিত হলো ঋত্বিকের ৮৭তম জন্মবার্ষিকী। আজ এতোদিন পরে এসেও আমরা ঋত্বিককে স্মরি সম্ভবত শিল্পের প্রতি তার কমিটমেন্টের কারণে। ঋত্বিক বলেছিলেন,‘শিল্পকে কমিটেড হতেই হবে। সর্ব শিল্পের শেষ কথা মানুষ। যারা শোষিত তাদের স্বার্থের বাইরে কোন শিল্প করা আমি পাপ মনে করি। কমিটেড মানে সংগ্রামী দুঃখী মানুষের সঙ্গী হওয়া যাতে ভালোবাসা ও ঘৃণা দুটোই তীব্রভাবে প্রকাশ পাবে।’১৮ তিনি তার প্রতিটি ছবিতেই সমাজ ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার স্বাক্ষর রেখেছেন যা উপমহাদেশের অনেক প্রখ্যাত চলচ্চিত্রনির্মাতা শেষ পর্যন্ত রাখতে পারেননি। ঋত্বিক তার এই জীবন চেতনার সন্ধান পেয়েছিলেন সম্ভবত মার্কসিয় দর্শন থেকে। কারণ, জীবনের প্রথমভাগে তিনি ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির একজন সক্রিয় সদস্য।
তিতাস-কে বাংলার মাটি ও মানুষের সঙ্গে একাকার করতে চেষ্টার ত্রুটি ছিলো না ঋত্বিকের। তিনি নিজে তিতাস-এ তিলক চাঁনের ভূমিকায় অভিনয়ও করেন। কিন্তু তিতাস দর্শকপ্রিয়তা তো পায়ইনি, তার ওপর সমালোচকদের আক্রমণের শিকার হয়েছে বারবার। ঋত্বিক তারপরও থেমে যাননি। ৭৪ সালে মুহম্মদ খসরুকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ঋত্বিক বলেছিলেন, ‘এখনো তিতাস আমার একটা study আর আমার একটা worship হিসাবে দেখা যেতে পারে।’১৯ বোনের বাড়িতে এক রাতে পুরো উপন্যাস পড়ে ফেলা ও সেই রাতেই খসড়া চিত্রনাট্য তৈরি করার কথা আমরা প্রতীতি দেবীর কাছে শুনেছি। কাগজের অভাবে প্রথমে বোনের শাড়িতে লিখেছিলেন সেই চিত্রনাট্য। ঋত্বিক আসলে অদ্বৈতের তিতাসের সঙ্গে একেবারে মিশে গিয়েছিলেন। তাই উপন্যাসের প্রতি সততা ও বিশ্বস্ততা কোনো মতেই ভাঙতে চাননি। আর এজন্যই আমরা তার কাছ থেকে পেয়েছি এমন একটি জীবনঘনিষ্ঠ চলচ্চিত্র।
লেখক : কিবরিয়া জুয়েল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী।
kibriamcj@gmail.com
তথ্যসূত্র
১. আউয়াল, সাজেদুল সম্পাদিত (২০০১ : ১০৫); ‘ঋত্বিক ঘটক বলেন : আমি ছাড়া তিতাস হতো না-চিত্রালী রিপোর্ট’; ঋত্বিকমঙ্গল; বাংলা একাডেমী, ঢাকা।
২. অদ্বৈত মল্লবর্মণ, উদ্ধৃত; জলদাস, হরিশংকর;‘তিতাস একটি নদীর নাম পাঁচালি নয় মহাকাব্য’;প্রথম আলো এর শুক্রবারের ক্রোড়পত্র সাহিত্য সাময়িকী, ২০ এপ্রিল,২০১২।
৩. বসু, সুকদেব (২০০১ : ১৮৯);‘তিতাস একটি নদীর নাম’;ঋত্বিকমঙ্গল; সম্পাদনা-সাজেদুল আউয়াল; বাংলা একাডেমী, ঢাকা।
৪. কায়সার, শান্তনু (২০০১ : ২০৭);‘তিতাস এর চলচ্চিত্রায়ণ’; ঋত্বিকমঙ্গল; সম্পাদনা-সাজেদুল আউয়াল; বাংলা একাডেমী, ঢাকা।
৫. প্রাগুক্ত; কায়সার, শান্তনু (২০০১ : ২১২)।
৬. চৌধুরী, আহমেদ জামান (২০০১ : ১৬১-১৬২); ‘তিতাস একটি নদীর নাম/জীবন যে-রকম’; ঋত্বিকমঙ্গল; সম্পাদনা-সাজেদুল আউয়াল; বাংলা একাডেমী, ঢাকা।
৭. আউয়াল, সাজেদুল সম্পাদিত (২০০১ : ৩৫);‘চিত্রালী প্রতিনিধির সাক্ষাৎকারÑআমি নতি স্বীকার করিনা’; ঋত্বিকমঙ্গল; বাংলা একাডেমী, ঢাকা।
৮. আজিজ, আলীম;‘সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্র’; কালের কণ্ঠ এর শুক্রবারের সাময়িকী শিলালিপি, ২৩ এপ্রিল, ২০১০।
৯. নাসরীন, শাহনাজ;‘নিরন্তর জনম জনম উপন্যাসের অনুলিপি’; কালের কণ্ঠ এর শুক্রবারের সাময়িকী শিলালিপি, ২৩ এপ্রিল, ২০১০।
১০. তারেক, সাইদ (২০০১ : ১২৩);‘ঋত্বিক ঘটক অদ্বৈত মল্লবর্মণের তিতাস কে আঁকতে পারেন নি’; ঋত্বিকমঙ্গল; সম্পাদনা-সাজেদুল আউয়াল; বাংলা একাডেমী, ঢাকা।
১১. হোসেন, মাহমুদুল (২০১০ : ১১৩);‘প্রামাণ্যচিত্র : সত্যবিষয়ক সমস্যা ও কিছু বিবেচনা’; সিনেমা; ধানমণ্ডী, ঢাকা-১২০৯।
১২. চৌধুরী, শৈবাল;(২০০১ : ২১৩); ‘বিটিভিতে ঋত্বিকের ছবি এবং প্রাসঙ্গিক ভাবনা’; ঋত্বিকমঙ্গল; সম্পাদনা-সাজেদুল আউয়াল; বাংলা একাডেমী, ঢাকা।
১৩. প্রাগুক্ত; কায়সার, শান্তনু (২০০১ : ২১১)।
১৪. জলদাস, হরিশংকর; ‘তিতাস একটি নদীর নাম পাঁচালি নয় মহাকাব্য’; প্রথম আলো এর শুক্রবারের ক্রোড়পত্র সাহিত্য সাময়িকী, ২০ এপ্রিল, ২০১২।
১৫. পাল, স্বদেশ (২০০১ : ২৩১); ‘ঋত্বিক ঘটক : উদ্বাস্তু সুরকার’; অনুবাদ-বাকির আব্দুল্লাহ; ঋত্বিকমঙ্গল; সম্পাদনা-সাজেদুল আউয়াল; বাংলা একাডেমী, ঢাকা।
১৬. প্রাগুক্ত; জলদাস, হরিশংকর।
১৭. খালেদ, আহমেদ; ‘তরুণ মার্কস’; নতুন দিগন্ত; বর্ষ-১০, সংখ্যা-৪, জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০১২, পৃষ্ঠা-৬০, ঢাকা।
১৮. আউয়াল, সাজেদুল সম্পাদিত (২০০১ : ৪২৩); ‘পরলোকে ঋত্বিক কুমার ঘটক : দৈনিক বাংলা ১২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৬’; ঋত্বিকমঙ্গল; বাংলা একাডেমী, ঢাকা।
১৯. খসরু, মুহম্মদ (২০০১ : ৬৩); ‘শেষ সাক্ষাৎকার : প্রথম নমস্কারের আগে’; ঋত্বিকমঙ্গল, সম্পাদনা-সাজেদুল আউয়াল; বাংলা একাডেমী, ঢাকা।
বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৩ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের চতুর্থ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন