রবার্ট জেনসেন
প্রকাশিত ১১ ডিসেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
পর্নোগ্রাফি ও সেনাবাহিনী
‘কর্তৃত্ব ও আনুগত্যশীলতার যৌনকরণই পর্নোগ্রাফি’
রবার্ট জেনসেন

রবার্ট উইলিয়াম জেনসেন (Robert William Jensen), জন্ম ১৯৫৮ সালের ১৪ জুলাই আমেরিকার নর্থ ডাকোটায়। ১৯৮১ সালে বিএসসি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের মুরহেডের মিনসেটা স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে। পরে সাংবাদিকতা ও লোকপ্রশাসনের ওপর স্নাতকোত্তর করেন আমেরিকান ইউনিভার্সিটি থেকে ১৯৮৫ সালে। পড়াশোনা করা অবস্থায় সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বর্তমানে আমেরিকার টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগে অধ্যাপনা করছেন। দীর্ঘদিন ধরে জেনসেন মূলধারা ও বিকল্প গণমাধ্যম নিয়ে লেখালেখি করছেন। একই সঙ্গে নারীবাদী এই গবেষক পর্নোগ্রাফিতে নারীর প্রতি পুরুষের যৌনশোষণ এবং আমেরিকান সেনাবাহিনীর সাম্রাজ্যবাদ-দুটি বিষয় নিয়ে গত এক দশক ধরে কাজ করেছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী ও তাদের অর্থনৈতিক কর্তৃত্ববিরোধী অ্যাক্টিভিস্ট সংগঠনের সঙ্গেও জড়িত। তার উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে,‘ Writing Dissent: Taking Radical Ideas from the Margins to the Mainstream (2002), Citizens of the Empire: The Struggle to Claim Our Humanity (2004), 'The Heart of Whiteness : Confronting Race, Racism and White Privilege' (2005), 'Getting Off : Pornography and :he End of Masculinity' (2007), `All My Bones Shake: Seeking a Progressive Path to the Prophetic Voice (2009)’, `Arguing for Our Lives: A User's Guide to Constructive Dialog’(2013)আমেরিকার মেরিন সেনাদের পক্ষ থেকে ২০১০ সালে জেনসেনকে `Heroes and Healthy Families' শিরোনামে এক কনফারেন্সে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিলো পর্নোগ্রাফির অপকারিতা নিয়ে বলার জন্য। ৩০ মিনিট দীর্ঘ এই বক্তৃতাটি বাংলায় ভাব-ভাষান্তর করে ছাপানো হলো।
আমি সবসময় পুরুষদের সঙ্গে কথা বলতে বেশি আগ্রহী থাকি। কারণ,আমি মনে করি কোনো পুরুষেরই পতিতালয়ে গিয়ে কিংবা পর্নোগ্রাফি দেখে একটু ভিন্নভাবে নারীদের সঙ্গ নেওয়া উচিত নয়।অবশ্য আমার এ ধরনের যুক্তি পুরুষ প্রাধান্যশীল সমাজে বড়ো ধরনের নারীবাদী সমালোচনা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। এ ধরনের আক্রমণ ও হিংস্রতার মধ্য দিয়ে পুরুষ প্রাধান্যশীলতা স্বাভাবিকভাবেই পুরুষদের উদ্বুদ্ধ করে তাদের কর্তৃত্ব ও বিজয় ধরে রাখতে। আমার কাছে মনে হয়েছে,ঠিক একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীরও উদ্দেশ্য থাকে বিশ্বের সম্পদ ও বাজারের ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার;আক্রমণ ও হিংস্রতা দিয়ে তারা এই পথ সুগম রাখে।
আমার ওই সব যুবকদেরকে (যারা পর্নোগ্রাফি দেখেন ও পতিতালয়ে যান)বলতে ভালো লাগে,শুধু নারীর যৌন-শোষণের বিষয়টি নিয়ে তাদের ভাবা উচিত নয়,সেই সঙ্গে তারা যে সাম্রাজ্যবাদী হত্যাকারীদের অংশ হয়ে উঠেছে তাও তাদের পুনরায় বিবেচনা করা উচিত। এবার আসি আমার সেই কনফারেন্সের বিষয়ে;দিনব্যাপী ওই কনফারেন্সে উপস্থিত ছিলেন প্রায় এক হাজার নন-কমিশন্ড মেরিন অফিসার। সেখানে পর্নোগ্রাফি নিয়ে প্রচুর কথা বলার থাকলেও আমার জন্য বরাদ্দ ছিলো মাত্র ৩০ মিনিট।
এই অল্প সময়ে পর্নোগ্রাফির বিরুদ্ধে নারীবাদীদের অবস্থান নিয়ে আমি বিস্তারিত কথা বলার সুযোগ পাইনি। এ কারণে প্রচণ্ড ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও সাম্রাজ্যবাদের সমালোচনামূলক কথাগুলো আর বলা হয়নি। তারপরও এ ধরনের একটি আলোচনায় উপস্থিত থাকতে পেরে আমার ভালো লেগেছে। মনে হয়েছে,কনফারেন্সে উপস্থিত কিছু কর্মকর্তা এই আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে নিয়েছেন। এ রকম ভাবার অবশ্য কারণও আছে,পর্নোগ্রাফি নিয়ে সাধারণত আমাদের মধ্যে যেসব অন্তর্দ্বন্দ্ব কাজ করে,তা নিয়ে এখানে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলার সুযোগ ছিলো।
আমি ওখানে কর্মকর্তাদের উদ্দেশে যে আলোচনা উপস্থাপন করেছিলাম তা সামান্য সম্পাদনা করে আপনাদের সামনে হাজির করছি। অবশ্য আমি জানি,অধিকাংশ মানুষই পর্নোগ্রাফির এই সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করেছেন;সেই সঙ্গে পুরুষ প্রাধান্যশীলতা ও হিংস্রতা নিয়ে আমার যে বিশ্লেষণ,সেটার ওপরও তাদের খুব একটা মনোযোগ ছিলো না। তবে আলোচনার পর ব্যক্তিগত কিছু কথোপকথনে এই ইঙ্গিত পেয়েছিলাম,অন্তত কিছু সংখ্যক মানুষ আমার ওই আলোচনাটি মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন।
এবার মূল আলোচনায় আসা যাক। শুরুতেই আমি কথা বলতে চাই অনলাইন পর্নোগ্রাফি এবং এ সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে। অনেকেই একমত হবেন যে,আমরা যখন অনলাইন থেকে পর্নো-ভিডিও ডাউনলোড করি,তখন যে দীর্ঘসময় লাগে তা আমাদের মধ্যে একধরনের হতাশা সৃষ্টি করে। সুতরাং এখন আপনাদের মধ্যে থেকে অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন,তাতে সমস্যা কী? মোটের ওপর এটাতো সেক্স,মানুষতো দীর্ঘসময় ধরে সেক্স করেও আসছে। আর এটাতো (পর্নোগ্রাফি) শুধু একধরনের চলচ্চিত্র;এটাকে এতো গুরুত্ব সহকারে নেওয়ার কী আছে। কেউতো কোনো নারীকে পর্নোগ্রাফি করতে বাধ্য করে না। বরঞ্চ এ কাজের জন্য সেই নারী টাকা পান। আর অন্যদিকে এটাওতো ঠিক,আমি যা দেখতে চাই,তা দেখার অধিকার আমার আছে;আমি বোঝাতে চাইছি পর্নোগ্রাফির কারণে ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে,বিষয়টি এমন নয়।
তাহলে প্রশ্ন,এখানে কোন্ বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ? পরবর্তী ৩০ মিনিটে আমি পর্নোগ্রাফির গুরুত্বের দিকটি ব্যাখ্যা করবো এবং একই সঙ্গে পর্নোগ্রাফিতে পুরুষের অবস্থান নিয়ে আমাদের যে কথা বলা উচিত,সেটাও বলবো। তবে এসব বিষয়ে আমার দৃষ্টিভঙ্গি সবসময় একই রকম থাকেনি। যে সময়টাতে আমি পর্নোগ্রাফি দেখতে শুরু করি অর্থাৎ আমার স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে পর্নোগ্রাফি নিয়ে আমার কিছু মধুর স্মৃতি আছে।
সেসময় আমরা অর্থাৎ সহপাঠীরা মিলে পর্নো ম্যাগাজিন কিনে গোপন জায়গায় লুকিয়ে রাখতাম। এবং প্রায় প্রতিদিনই ম্যাগাজিনটি বের করে সেখানে থাকা নগ্ন নারীদের ছবি বড়ো বড়ো চোখ করে দেখতাম। এছাড়াও আমি চুপি চুপি আমার বাবা-মায়ের শোবার ঘরে ঢুকে ‘প্লেবয়’ ম্যাগাজিন পড়তাম। এরই মধ্যে একদিন বন্ধুদের সঙ্গে আমি প্রেক্ষাগৃহে (থিয়েটার)পর্নোগ্রাফি দেখতে যাই। আমার বয়স যখন ২০-এর কোঠায়,তখন আমি মাঝেমাঝেই দোকানে থাকা পর্নোগ্রাফির বুথগুলোতে (Porn Store’s Video booths)চলচ্চিত্র দেখতে যেতাম এবং পর্নো ম্যাগাজিন পড়ার ব্যাপারেও সেসময় আমি অনেকটা অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। আপনারা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন,আমি অভ্যস্ততা বলতে ঠিক কী বোঝাচ্ছি? আমি কিন্তু শুধু পর্নোগ্রাফিই দেখতাম না,সঙ্গে সঙ্গে হস্তমৈথুনও করতাম।
তবে এখনকার দিনের অনলাইনে বেড়ে উঠা যুবকদের কাছে এসব কথা অনেকখানি অকল্পনীয় বা চিন্তার অতীত। কারণ,যে ডিজিটাল সময়ে তারা বেড়ে উঠছে সেখানে যেকোনো বয়সী,যেকোনো মানুষ চাইলেই তার আকাঙ্ক্ষিত যেকোনো ধরনের যৌন উপাদান (পর্নোগ্রাফি)পেতে পারেন। তারপরও আজ এ সময়ে এসেও পর্নোগ্রাফি নিয়ে একটি মৌলিক বিষয়ের কিন্তু পরিবর্তন হয়নি,তাহলো এখনো প্রাথমিকভাবে এই পর্নোগ্রাফিই যুবা-তরুণদের মধ্যে হস্তমৈথুনের সুযোগ করে দেয়।
যে কারো কাছে পর্নোগ্রাফি পাওয়ার ব্যাপারটি এখন অত্যন্ত সহজ হয়ে উঠেছে। তবে এর আধেয়গত দিকের কিন্তু তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। এমনকি কিশোর কিংবা প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের ক্ষেত্রে পর্নোগ্রাফির ব্যবহার নিয়েও তেমন কোনো সমালোচনা লক্ষ করা যায় না। তারা মনে করে পর্নোগ্রাফি শুধুই সেক্স,শুধুই ফ্যান্টাসি,একধরনের বিনোদনের উপায়। পর্নোগ্রাফিকে তারা কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই মনে করেন না।
এখন আমি আপনাদের সামনে পর্নোগ্রাফির গুরুত্বের তিনটি দিক তুলে ধরবো। প্রথমত,পর্নোগ্রাফিতে যে নারীরা কাজ করে তাদের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে,ওই নারীরাও আপনার-আমার মতো মানুষ। আমরা যা অনুভব করি,তারাও তা অনুভব করে। অথচ পুরুষরা তা ভুলে গিয়ে তাদের বেশ্যা বলে ডাকে।
এখন প্রশ্ন,আমরা ‘বেশ্যা’দের সম্পর্কে কতোটুকু জানি? তারা কোনো সচ্ছল পরিবার থেকে এই পথে পা বাড়ায় না।তাদের বেশিরভাগই শিশু অবস্থায় কোনো না কোনো যৌন-নিপীড়নের শিকার হয়।এছাড়া তাদের বেশিরভাগেরই উচ্চমাত্রার মাদক নেওয়ার অভিজ্ঞতাও থাকে। এটা সত্য যে, পর্নোগ্রাফির নারীরা নিজেদের প্রয়োজনে এ কাজ করে এবং বিনিময়ে টাকাও পায়। কিন্তু এটাও ঠিক,বাস্তব জীবনে চলতে গিয়ে তারা যে সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যায়,সেটাই তাদেরকে এ পথে আসতে প্ররোচিত করে। মনে রাখতে হবে,এদের সবাই একই ধরনের সঙ্কট থেকে এ পথে পা বাড়ায় না। অথচ আপনি যখন পর্নোগ্রাফি উপভোগ করছেন,তখন ওই নারীদেরই ব্যবহার করছেন।
নারীদের এই পথ বেছে নেওয়া,না-নেওয়ার ব্যাপারে এই বিতর্ক আপাতত বন্ধ থাক,কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না,পর্নোগ্রাফির নারীরাও মানুষ। পর্নোগ্রাফিতে আমরা দেখি,দুজন পুরুষ একই সময়ে একজন নারীর পায়ু ও যোনিপথে সঙ্গমে লিপ্ত হয়।এটাকে পর্নোগ্রাফির ভাষায় ডাবল পেনিট্রেশন বা ডিপি বলা হয়। মনে রাখতে হবে,এই দৃশ্যে কিন্তু আপনি মোটেও ভান কিছু দেখেন না। এ কাজে অংশ নেওয়া নারীরাও আসলে রক্ত-মাংসের মানুষ।
এখন কিছু সময় নিয়ে আপনি বিষয়টি ভাবার চেষ্টা করুন,পারলে নিজেকে প্রশ্ন করুন,কেমন হতে পারে ওই সময়ে ওই নারীর অনুভূতি? এই বিষয়টি ভাবতে এখানে উপস্থিত কারো যদি সমস্যা হয়,তাহলে আমি বলবো আপনারা যেকোনো তিনজন (একজন নারী ও দুইজন পুরুষ) চাইলে মঞ্চে আসতে পারেন এবং পায়ু ও যোনিপথে সঙ্গমে লিপ্ত হয়ে দেখতে পারেন কেমন অনুভূতি হয়। আমি নিশ্চিত সেই মুহূর্তে ওই নারীর জন্য এটা মোটেও আর ফ্যান্টাসি থাকে না। ওই নারী তখন আর কোনো বেশ্যা নন; তিনি বাস্তবের একজন মানুষ।
দ্বিতীয়ত,পর্নোগ্রাফির গল্পটিও গুরুত্ব দিয়ে দেখার বিষয়। চলুন আমরা এখন পর্নোগ্রাফির নারীদের মুখে,যৌনাঙ্গে লিঙ্গ প্রবেশের দৃশ্যগুলো নিয়ে কথা বলি। এসব দৃশ্যে পুরুষ ইচ্ছে মতন নারীর মুখে তার লিঙ্গ প্রবেশ করান। সাধারণত নিজের যোনি কিংবা অন্যের যোনি থেকে লিঙ্গ বের করেই কোনো নারী তা মুখে পুরে নেন। আগেই বলেছি,গল্পের দিকে খেয়াল রাখতে হবে,পর্নোগ্রাফারের সেই গল্পের অন্যতম উপাদান হলো এগুলো। চলচ্চিত্রে পর্নোগ্রাফি কেবলই সেক্স নয়।এটা একধরনের বিশেষায়িত ধারণার ওপর গড়ে ওঠা বিশেষ ঘরানার সেক্স।পর্নোগ্রাফির এই সেক্স গড়ে উঠেছে কর্তৃত্ব ও আনুগত্যশীলতার ওপর ভিত্তি করে;এই কর্তৃত্ব পুরুষের,আর নারী তার অনুগত। কর্তৃত্ব ও আনুগত্যশীলতার যৌনকরণই পর্নোগ্রাফি।
পর্নোগ্রাফির পরিচালক তার গল্পে নারীকে যেভাবে তুলে ধরেন,তাতে পুরুষের কল্পনায় নারী বেশ্যা হিসেবে ধরা দেয়। পৃথিবীতে বেশ্যা বলে কিছু নেই,যে নারীরা বেশ্যা বলে পরিচিত তারা কেবলই পুরুষের মনোরঞ্জনের জন্য এ কাজ করে থাকেন। ‘বেশ্যার’ অস্তিত্ব কেবল পুরুষের কল্পনাতেই বিদ্যমান। তাই পর্নোগ্রাফি-জগতের সব নারীরাই পুরুষের চোখে বেশ্যা হিসেবে বিবেচিত হয়।পর্নোগ্রাফির গল্পে নারীকে এমনভাবে তুলে ধরা হয়,যেখানে বেশ্যা নয়-এমন নারীরাও পর্নোগ্রাফির নারীদের মতোই যৌনক্রিয়ায় অংশ নিতে চায়। একজন নারী শুধু যে গোপনে এই ধরনের বিষয়ে আগ্রহী হন এমন নয়,বরং নিজেকে একজন পরিপূর্ণ নারী হিসেবে তুলে ধরতে তার এ কাজের কোনো বিকল্প থাকে না। পর্নোগ্রাফিতে দেখানো হয়,নারীর বেশ্যাবৃত্তির বিষয়টি তার ইচ্ছা-অনিচ্ছার বিষয় নয়,যেনো প্রকৃতির নিয়মেই সব নারী বেশ্যা।
তার মানে পর্নোগ্রাফি যে গল্প বলে,সেখানে আপনার চেনা-জানার মধ্যে থাকা সব নারীই বেশ্যা। তাহলে বিষয়টি এমন দাঁড়ায়,আপনার বোন বেশ্যা,আপনার মা বেশ্যা;যে নারী আপনার পাশের বাড়িতে থাকে তিনিও বেশ্যা। এমনকি আপনার প্রিয় যে স্কুলশিক্ষক-যিনি নারী,তিনিও একজন বেশ্যা। আর হ্যাঁ,এই যে আপনারা সবাই চেনেন সুজিকে,সুজি মানে সুজি রোটেনক্রোটস্;যিনি আপনার বন্ধু বা সহকর্মী একজন মেরিন সেনার বান্ধবী,তিনিও কিন্তু তাহলে বেশ্যা। তার মানে,তারা সবাই বেশ্যা;এরা সবাই পর্নোগ্রাফির মতো অনমনীয়,যাচ্ছেতাই,বিকৃত যৌনতায় মেতে উঠতে চায়!
তারা সবাই যৌন সুখ পেতে চায় জডিসদের (jodys)[জডিস মূলত একধরনের গালি। চাকরির কারণে দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকা মেরিন সেনাদের স্ত্রী বা বান্ধবীর সঙ্গে যারা যৌনক্রিয়ায় লিপ্ত হয়,তাদেরকে জডিস নামে ডাকা হয়-অনুবাদক] কাছ থেকে। তারা সবাই চায় পর্নোগ্রাফির মতো তাদের মুখমণ্ডলেও বীর্যপাত করাতে;যা বেশ্যারা চায় অর্থাৎ নারীরা চায়। কিন্তু এ কথা ভুলে যাবেন না,যদি আপনার একটি মেয়ে থাকে,সেও তাই চায়;কারণ সেও একজন বেশ্যা!পর্নোগ্রাফি যদি কোনো দিক থেকে ফ্যান্টাসি হয়;তাহলে আমাদের প্রশ্ন,কেনো এগুলো ফ্যান্টাসি? আরো প্রশ্ন,এই ফ্যান্টাসি আমাদেরকে আমাদের সম্বন্ধে কী বলে?
তৃতীয়ত,পর্নোগ্রাফিতে পুরুষের ব্যবহারের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। পর্নোগ্রাফিতে,এই যে পুরুষ হিসেবে আপনার অবস্থান,সেটা মোটেও আপনাকে প্রভাবিত করে না। আপনিতো এমনিতেই এ বিষয়ে অনেক বেশি স্মার্ট,অভিজ্ঞ,সচেতন,তাই এটি আপনার ওপর কী আর প্রভাব ফেলবে? তাহলে আপনার সঙ্গে যিনি (নারী) থাকছেন,তার ওপর এটি কী প্রভাব ফেলছে?
আমি সেই গল্প নিয়ে কথা বলছি,যে গল্প স্বয়ং পর্নোগ্রাফি বলে;কারণ,সব গণমাধ্যমই গল্প বলে। এমনকি টেলিভিশনের ১৫ সেকেন্ডের বিজ্ঞাপনও একটি গল্প বলে। আমরা মানুষরা গল্প করতে পছন্দ করি এবং সেসব গল্পে বিষয়বস্তু থাকে। এসব গল্প আমাদের মনোগঠনে ভূমিকা রাখে,আর এই মনোগঠন প্রভাব রাখে আমাদের আচরণে। এই গল্পগুলোই বলে দেয়,কিভাবে আমরা চিন্তা করি এবং কিভাবে আমরা কাজ করি।
বিজ্ঞাপনের কথাই ভাবুন। ব্যবসায়ীরা বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে গল্প বলতে প্রতি বছর প্রায় ৪০০ বিলিয়ন ডলার খরচ করছে। এখন প্রশ্ন,বিজ্ঞাপনের ওই সব গল্প যদি মানুষের চিন্তা ও আচরণে কোনো প্রভাবই না ফেলে,তাহলে ব্যবসায়ীদের ওই অর্থ খরচে কী লাভ? মা-বাবার ক্ষেত্রে বিষয়টি ভাবুন,যখন তারা তাদের সন্তানের পড়ার জন্য কোনো বই কেনেন,তখন কি তারা যা ইচ্ছে তাই পছন্দ করেন,নাকি তারা বই কেনার সময় তাদের নির্দিষ্ট কিছু পছন্দের ওপর প্রাধান্য দেন?
পর্নোগ্রাফির প্রভাব সম্পর্কে নানা ধরনের তথ্যের সমন্বয় ঘটে মনোবিজ্ঞানের পরীক্ষাগার,সমাজকর্মী,চিকিৎসক ও বিবাহবিচ্ছেদ নিয়ে কাজ করেন এমন আইনজীবীদের কাছে। অনেক স্ত্রী বর্ণনা করেন এভাবে,পর্নোগ্রাফি আসক্ত স্বামী কিভাবে পর্নোগ্রাফি দেখতে শুরু করলে মানসিক ও শারীরিকভাবে তাদের কাছ থেকে দূরে সরে যান। অন্যদিকে মেয়েবন্ধুরা তাদের পর্নোগ্রাফি আসক্ত ছেলেবন্ধুদের ব্যাপারে অভিজ্ঞতার কথা বলেন,ওই সব ছেলেবন্ধু তাদের সঙ্গে পর্নোগ্রাফির মতো করে যৌনক্রিয়ায় অংশ নিতে চায়,যদিও বিষয়টি তাদের (মেয়েবন্ধু) কাছে অস্বস্তির উদ্রেক করে। নিজেরা উত্তেজিত হওয়ার জন্য জোরালোভাবে পর্নোগ্রাফির সাহায্য নেন-এমন পুরুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এমনকি এদের অনেকে সঙ্গীর সঙ্গে যৌনক্রিয়ায় লিপ্ত হওয়ার আগে পর্নোগ্রাফি না দেখলে উত্তেজনাই বোধ করেন না।
তারপরও নারীদের ওপর পুরুষের হিংস্রতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। দেখুন,পর্নোগ্রাফির কারণে কিন্তু ধর্ষণ হয় না। যখন পর্নোগ্রাফি ছিলো না তখনো সমাজে ধর্ষণ ছিলো;ধরুন,কোনোভাবে যদি আগামীকাল থেকে পর্নোগ্রাফি বন্ধ করে দেওয়া হয়,তারপরও ধর্ষণ থাকবে। আমি বলতে চাচ্ছি,পর্নোগ্রাফি কখনো ভালো মানুষকে খারাপ করে না। পর্নোগ্রাফি কখনো পুরুষদেরকে এটা করার জন্য প্রলুব্ধও করে না। কিন্তু মনে রাখতে হবে,পর্নোগ্রাফি পুরুষেরই সৃষ্টি;এই পুরুষরাই ধর্ষণ করে। অনেক বালকের কাছে পর্নোগ্রাফি কার্যত যৌনশিক্ষার একধরনের পাঠ্যসূচি। এটা এমন একটা জায়গা,যেখানে যৌনশিক্ষার জন্য নারীকে ব্যবহার করা হয়। কিছু পুরুষ পর্নোগ্রাফিকে প্রশিক্ষণের নির্দেশিকা হিসেবে ব্যবহার করে এবং এতে তারা যা দেখে সে অনুযায়ী তাদের বিকৃত যৌনতা প্রকাশ করে। বাদবাকি পুরুষেরা পর্নোগ্রাফির স্থিরচিত্র কিংবা সরাসরি পর্নোগ্রাফি দেখিয়ে তরুণী বা যুবতীদেরকে এমনভাবে প্রস্তুত করে যে,তাদের বোঝানো হয়,বয়স্কদের সঙ্গে যৌনক্রিয়ায় লিপ্ত হওয়ায় কোনো সমস্যা নেই। পুরুষদের অবস্থা একপর্যায়ে এমন হয়,পর্নোগ্রাফির প্রতি মাত্রাতিরিক্ত আসক্তি যৌন ফ্যান্টাসি ও বাস্তবের যৌনতার মধ্যে পার্থক্য বোঝা,তাদের জন্য কষ্টকর করে দেয়।
এখানে অপ্রিয় হলেও বাস্তব যে,আমরা এমন একটি নির্দিষ্ট সামাজিক রীতিনীতি বা কাঠামোর মধ্যে বাস করি যেখানে নারী উপস্থাপিত হয় যৌনতার অবজেক্ট হিসেবে;যেখানে সে একটা অধস্তন পরিস্থিতিতে পুরুষের হিংস্রতার শিকার হয়ে সুখ খুঁজে ফেরে। এখন কম্পিউটারের মাউসে ক্লিক করলেই আমরা পর্নোছবি পাই। একটি ছবি দেখে যদি আপনি কখনো বিরক্তিবোধ করেন,তাহলেও কোনো সমস্যা নেই,মাউসে আরেকটি ক্লিক করুন,আরো ভালো ছবি পেয়ে যাবেন। আপনি যখন যৌনসঙ্গীর সঙ্গে মিশতে চান না,তখন শুধুই ক্লিক করুন।যখন আপনার আবেগকে সামাল দিতে ইচ্ছে করে না,তখনো শুধু ক্লিক করুন,ক্লিক করতেই থাকুন। কম্পিউটারে ক্লিক করা শেষে আপনার অনুভূতিটা কেমন হলো,এ নিয়ে যে আপনি কোনো প্রশ্ন করবেন না,তা পর্নোগ্রাফির সঙ্গে জড়িতরা জানে। ক্লিক করার সময় আপনি মনে করেন,পর্নোগ্রাফি আপনার অধীনে;কিন্তু বাস্তবতা হলো পর্নোগ্রাফি আপনাকে অধীন করে রাখে।
যৌন-শোষণ-ইন্ডাস্ট্রির প্রধান ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে পতিতাবৃত্তি ও নাইটক্লাব গুরুত্বপূর্ণ,তবে এগুলোর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে পর্নোগ্রাফি। এভাবেই পুরুষরা আনন্দের জন্য নারীদের শরীর কেনাবেচা করে। এই কর্তৃত্ব নিজেদের হাতে রাখার মাধ্যমে তারা পুনরায় এটা প্রমাণ করতে চায়,তারা শক্তিশালী ও পৌরুষদীপ্ত। শেষ পর্যন্ত এই পথেই তারা নিজেদেরকে ‘প্রকৃত মানুষ’ ভাবতে শুরু করেন।
যৌন-শোষক প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণভাবেই আমাদের মধ্যে একধরনের সুখানুভূতি তৈরি করে। এবং একই সঙ্গে তারা কোনো মানুষের নিজের প্রতি তার যে নিয়ন্ত্রণ কাঠামো থাকে,তার ওপর একধরনের বিভ্রম প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু তারা এটা কতো টাকায় করে? আর কতো টাকাইবা ওই নারীদের দেওয়া হয়-যাদেরকে পর্নোগ্রাফিতে ব্যবহার করা হয় এবং পরে ছুঁড়ে ফেলা হয়? এখন থেকে মাউসে ক্লিক করার সময় নিজেকে প্রশ্ন করুন,কত মূল্যে আপনি পর্নোগ্রাফির সেই নারীদের পান?
পুরুষরা প্রায়ই বলে,তারা চাপ বা অশান্তি থেকে মুক্তি পেতে পর্নোগ্রাফির আশ্রয় নেন;কিন্তু অনেকের জন্য পর্নোগ্রাফি মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। চিন্তা করুন ওই মুহূর্তের কথা,যখন আপনার যৌন উত্তেজনা সর্বোচ্চ পর্যায়ে,যখন আপনার আনন্দের তীব্রতা শেষ হয়ে গেছে;তখন নিজেকে একবার জিজ্ঞাসা করুন,আপনি কে এবং কী হতে চান? ওই মুহূর্তে আপনি মোটেও এ নিয়ে দুশ্চিন্তা করবেন না,আপনি প্রকৃত মানুষ কি না? বরং আপনি এই চিন্তা করুন, কিভাবে একজন প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠা যায়।
সূত্র : http://www.counterpunch.org/2010/06/18/pornography-and-the-mil
ভাব-ভাষান্তর
আহমেদ মাসুম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৩ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের ৫ম সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন