লরেন্তঁ তিরার্দ
প্রকাশিত ১০ ডিসেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
ওং কার-ওয়াইয়ের মাস্টার কামরায়
লরেন্তঁ তিরার্দ
৮০’র দশকের শেষে হংকং-এর সিনেমা ফাইনালি যখন মার্কিন মুভি-মার্কেটে প্রবেশ করতঃ দর্শককুলকে তাদের সিনেমার জন্যে নিয়মিত বিরতিতে ছবিঘরে টেনে আনতে সক্ষম হয়-সে-ক্ষণে সমালোচক ও পত্রিকাওয়ালারা দ্রুততা ও বিচক্ষণতার সঙ্গে রায় দেন হংকং-এর ছবি মানেই বাণিজ্যিক মাসালা মুভি। অনতিবিলম্বে ওং কার-ওয়াইয়ের (১৯৫৮, সাংহাই, চায়না) শুভ আগমনের ডঙ্কা পুরা পরিস্থিতির ভোল পাল্টে দেয়। ওয়াই তার ‘অ্যাকশন-ব্লকবাস্টার’ বুজুর্গ-নির্মাতাদের হাতে বহুল ব্যবহৃত টুলগুলি এস্তেমাল করে আলো-ছায়ার মায়ায় তৈরি করেন ব্যক্তিগত এবং আহা (!) স্বাদের পিওর কাব্যিক মুভি। যার পরতে পরতে জড়িয়ে থাকে ন্যারেটিভ স্টোরিটেলিং এর প্রচলিত বিধির অমান্যতা আর প্রথাগত চৈনিক রীতি-আচারের প্রতি কড়া চ্যালেঞ্জ! ওয়াই যে-কলিজার জোর দিয়ে হ্যাপি টুগেদার-এ সমকামিতাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন তা করবার মতো বুকে বল তার পথের সঙ্গীদের জনা-দুয়েকের মধ্যে থাকলেও শেলসম আঘাত হানতে পারেন নাই কেউই! ওয়াইয়ের কাজ পাকাভাবে আধুনিক ও পোক্তভাবে শৌর্যশালী; কু...ঝিক...ঝিক ঝিম ধরানো চুংকিং এক্সপ্রেস থেকে সম্মোহনী জাদু আক্রান্ত ইন দ্য মুড ফর লাভ সর্বত্র ওয়াইয়ের আলেকবাজি জ্বলজ্বল করছে। ইন দ্য মুড ফর লাভ দেখে আমার এক সমালোচক বন্ধু মুঠো-বার্তায় জানিয়েছিলো ‘মাইরি বলছি! গল্প ছাড়া একটা সিনেমা এমনভাবে খেলে দিলো! আমি তো মুগ্ধ!!’ মন্তব্যেই ওয়াইয়ের পরিচয়...কী বলেন!
ওং কার-ওয়াই আপাদমস্তক এক প্রহেলিকায় মোড়া নাম। নিজেকে কবি(তা)র রহস্যময়তার ট্যাপেস্ট্রিতে সাজিয়ে রাখা ওয়াইয়ের স্বভাব-ধর্ম। সর্বদা রোদ চশমায় ঢাকা চোখে ভূলোক দেখেন বলে এই মনচাষার ইমেজের মেজাজ তথাপি ফ্লাট নয়, পরন্ত-অনেক হাইপার টেক্সচুয়াল...। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপের ক্ষেত্রে পরিমিতিবোধে প্রাজ্ঞ ওয়াইয়ের জবান কখনই লাগামছাড়া হয় না; ছোট ছোট বাক্যে বলা উত্তরগুলি যেনো ওয়াইয়ের রন্ধ্র প্রদেশের সিংহদ্বারে পায়চারি করে অতন্দ্র প্রহরীর মতন। ফলস্বরূপ, ‘মুভিমেকার্স মাস্টার ক্লাস’ সংকলনের জন্য নেওয়া ওয়াইয়ের সাক্ষাৎকারটাই সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎ-এর আকার নিয়েছে। যাই হোক, ছায়াবাজ ওয়াইয়ের খেয়ালি উত্তরগুলি নানাবিধ প্রেক্ষাপট হতে একই নিমিষে বিস্ময়কর ও ভাবনামূলক বটে...।
ওং কার-ওয়াইয়ের শ্রেণিকক্ষে
আমার সিনেমা লাইনে আসার পিছনে অন্য কোনো কিছুর চাইতে ভূগোলের প্রভাব অদ্ভুতভাবে বেশি আছে। জন্মাবধি পাঁচ বছর পর্যন্ত সাংহাইয়ে বেড়ে উঠা এই আমাকে একদিন মা-বাবার হাত ধরে হংকংয়ে অভিবাসী হতে হয়। মহাচীনের ভিতরে হলেও সাংহাইয়ের উপভাষা আর হংকংয়ের উপভাষায় অমিল ছাড়া কোনো মিল নেই।
আমি, আমরা নতুন এলাকায় কারও সঙ্গে ভাব তো দূরের কথা আলাপ জমানোর সুবিধাটুকুনও পেয়ে উঠতাম না। অবস্থাদৃষ্টে প্রতিবেশীদের মুখের ভাষা বোঝার আশা আমরা জলাঞ্জলি দিয়েছিলাম। আম্মাজানের অবস্থা আমার চেয়ে করুণ না হলেও ভালো ছিলো না। সমদশায় থাকা মা-বেটা প্রায়ই ছবিঘরে যেতাম ছায়াছবি দেখতে...মূলত মা-ই আমাকে নিয়ে যেতেন। শুধু এইখানেই সংজ্ঞাপনের জন্য কোনো মাধ্যমিক ভাষা/উপভাষা জানতে হয়নি কখনও। এটি এক জবান-কোলাহল অতীত ভাষা। এটা ইমেজের নিকষিত হেমে জন্ম নেওয়া এক বিশ্বজনীন ভাষা।
আমার জেনারেশনের আর দশটা মানুষের মতো প্রথম অবস্থায় আমিও পৃথিবী চিনতে/জানতে শিখছিলাম সিনেমার হাত ধরে আর পরবর্তীতে অবশ্যই টেলিভিশনের চোখ দিয়ে। তবে বছর কুড়ি আগে হলে আমি গানকে বেছে নিতাম আমার মনের ভাবানুবাদের তরে। আর ৫০ বছর পূর্বে হলে আলবত তা হতো সাহিত্যকর্ম।
আমি বেড়ে উঠেছি ইমেজের গুলিস্তানে। এটা খুব স্বাভাবিক যে, আমি একদিন ভিজ্যুয়াল বা দৃষ্টিনন্দন নিয়ে পড়াশোনা করবো। বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তীর্ণ হবার পর বিষয় হিসেবে আমি গ্রাফিক্স ডিজাইনকে বেছে নিয়েছিলাম; কারণ ওই আমলে হংকংয়ে সিনেমার তরে কোনো শিক্ষালয় স্থাপিত হয়ে থাকে নাই। যেসব বান্দা সিনেমা পড়তে চাইতো তারা ততোদিনে জেনে গেছে হয় য়ুরোপ নতুবা মার্কিন মুলুক তাদের শেষ ঠিকানা। আমার জন্য যা ছিলো তারছিঁড়া কল্পনা। গ্রাফিক্স ডিজাইনে পাঠ চুকিয়ে শ্রমবাজারে যখন ঢুকু ঢুকু করছি তখন পরবাসে শিক্ষিত সিনেমা পড়ুয়ারা মাত্র ঘরে ফিরে আসছে; শুরু থেকে তাদের প্রচেষ্টা ছিলো হংকংয়ের সিনেমা ও শিল্প-কলাকুশলীদের মধ্যে নবতরঙ্গের উন্মেষ ঘটানো। সৌভাগ্যবান আমিও এক পর্যায়ে ভীড়ে গেলাম এই দলের সঙ্গে।
আমার শুরুটা হয়েছিলো টিভি স্টেশনে। সেখানে এক বছর কাজ করেছি। নির্মাতা হিসেবে অভিষেকের আগ পর্যন্ত টানা ১০ বছর আমি সিনেমার জন্য চিত্রনাট্য লিখেছি। ইন দ্য মুড ফর লাভ আমার ১০ নাম্বার সিনেমা। যদি বুকে হাত দিয়ে বলতে বলেন তাহলে একজন সফল (?) ইমেজ কারিগর বা রঙমিস্ত্রি হয়ে উঠতে পেরেছি কি না সে-কথা এখনও বলতে পারবো না! এখনও আমি নিজেকে দর্শক বৈ ভিন্ন কিছু ভাবি না...। সেই দর্শক যে রূপালি পর্দার পিছনে উঁকি দিয়ে ভবিষ্যৎ দেখতে চায়। যখনই সিনেমা করি তখনই আমি ফিরে যেতে চেষ্টা করি চলচ্চিত্রপ্রেমী এক মনস্বিতায় যা কামনা করে নতুন বইয়ের পাতার গন্ধ শুঁকে দেখার মতো আনকোরা অনুভূতি। এবং সতত বিশ্বাস করি আমি প্রথমত শুধু দর্শককূলের জন্য সিনেমা বানাই। এর বাইরে যে-অন্য কোনো কৈফিয়ত নাই তা ভাববেন না। তবে হ্যাঁ, এটি নিঃসন্দেহে অন্যতম কারণগুলির একটি। এবং অন্য কারণগুলি খুবই ব্যক্তিগত ও ততোধিক গোপনীয়।
স্থানের গতরে গল্পের চাষ/কল্পের খামারে নয়
চিত্রনাট্যগুলি আমি নিজেই লিখে থাকি। এইটা ‘ডিরেক্টর’স ইগো’-র জন্য না; সিনেমার মালিকানা বা অঁতরশিপ নিশ্চিতকরণের ফিকির থেকেও নয়...। সত্যি করে বললে, আমার সবচেয়ে বড়ো স্বপ্ন হলো কোনো এক সু-প্রভাতে ঘুম ভেঙে পাশ ফিরতেই দেখবো একটা তরতাজা স্ক্রিপ্ট পাশ টেবিলে আমার জন্য অপেক্ষা করছে...! যতোক্ষণ পর্যন্ত সেটি না হচ্ছে মনে হয়, লেখা করা জারি রাখতে হবে। এও শুদ্ধ লেখাজোখা আয়াসসাধ্য ব্যাপার নয়; এটা প্রমোদ করার মতো বস্তু না। আমি আপ্রাণ চেষ্টা করেছি চিত্রনাট্যকারদের সঙ্গে মিলে কাজ করার কিন্তু দেখলাম কী জানেন..., লিখতে জানা সিনেমা উৎপাদকদের সঙ্গে চিত্রনাট্যকারদের সংজ্ঞাপনে ঝামেলা হয়। ‘কেনো হয়’ তা আমি পরিষ্কার করে বলতে পারবো না। তবে, ক্যাঁচাল যে-লাগবে তা ধ্রুবসত্য। এক্ষণে সিদ্ধান্ত নিলাম যদি আমি-ই লিখতে পারি তাহলে মিছা কেনো লেখক মশাইয়ের সঙ্গে হুজ্জত করা!
আমাকে বলতেই হবে (যেভাবেই হোক না কেনো) আমি চলিত কেতার বাইরে এসে পর্দাকাহিনী লিখে থাকি। আপনি দেখতেই পাচ্ছেন আমি সিনেমা পরিচালকের ভূমিকায় লিখি, কাহিনী প্রকৌশলীর নামে নয়। আমি লিখি চিত্রকল্প দিয়ে। এবং পর্দাকাহিনীর বেলায় আমার কাছে সবচাইতে ইম্পোর্টেন্ট হলো কাহিনীটা কোথায় ঘটছে সেই স্পেসটা।
পরন্ত, আপনি যদি ওইটা জানেন তাহলে চরিত্রগুলির কাজ ইজিলি নির্ধারণ করতে পারবেন। স্পেস আপনাকে এও বলে দেবে সম্ভাব্য চরিত্রগুলি কী হবে, তারা কেনো ওই স্পেসে আছে বা থাকে এবং অন্যান্য আরও যা যা আপনি দেখতে/দেখাতে চান তার সব...। একাদিক্রমে সবকিছুই আপনার লেখার খাতায় ছবি হয়ে ভেসে উঠবে যদি আপনি স্পেসটা একবার মনে মনে বন্দি করতে পারেন। তাই লেখার টেবিলে বসার আগে লোকেশন চষে ফেলার কাজটা সেরে ফেলি। মুসিবত হলো লেখার আগে, লেখার সময় বিবিধ ভাবনার মেঘ বৃষ্টি হয়ে বলপয়েন্টের কালিতে ঝরে পড়ার মেঘ গুড় গুড় আওয়াজ তুলেও শেষমেশ ভাবনাগুলি আর গল্পের দানায় জমে উঠে না। আমি জানি পর্দায় কী কী জরুর দেখতে চাই না। কিন্তু বিলকুল জানি না কী হেরিতে প্রাণ মোর করে জর জর!
চলচ্চিত্র নির্মাণের সমগ্র প্রক্রিয়াটাই আমার নিকট এসব প্রশ্নের উত্তর সংগ্রহের সফর। উত্তরমালা গাঁথা সম্পন্ন হবার আগ পর্যন্ত তাই আমি ছবি করে যেতে চাই। এই জবাবগুলি কখনও পাই সেটে বসে, কখনও পাই এডিটিং টেবিলে, কখনওবা সিনেমার পয়লা স্ক্রিনিংয়ের তিন মাস পর কোনো এক প্রাতরাশের থালায়।
কোনো প্রজেক্টের প্রথম দফায় আমি ঠিক করে ফেলার খুব চেষ্টা করি কোন্ জঁরায় সিনেমাটি তৈয়ার করবো। আমার শৈশব কেটেছে এন্তার জঁরা মুভি দেখে যেমন-ওয়েস্টার্ন, হরর, ক্রাইম এবং সব প্রকার জঁরা মুভি আমাকে মোহিত করতো...। তাই, আমি আমার প্রতিটি সিনেমা রকম রকম জঁরায় বানানোর চেষ্টা করি। আমার মনে হয়, এরূপ প্রতীতিই সিনেমাগুলিকে তাদের মতো করে অরিজিন্যাল হয়ে উঠার অবকাশ দেয়।
নজির হিসেবে ইন দ্য মুড ফর লাভ-এ আমরা দেখি দুইজন মানুষের গল্প, আপনাকে বোরিং করার সমূহ সম্ভাবনা আছে এই গল্পের। কিন্তু, এ-আখ্যানকে দুইজন মানুষের প্রেম-কাহিনীতে পরিণত করার পরিবর্তে সাস্পেন্সের মোড়কে একটি থ্রিলার কাহিনী শোনাতে চেয়েছি। ছায়াচিত্রে চরিত্রদ্বয়ের আবির্ভাব ঘটে ভিক্টিমের চেহারায়, তারপর তারা এহেন দশার কারণ খুঁজে পেতে তদন্তে নামে। বোঝার চেষ্টা করে কেনো তাদের সঙ্গে এমনটা ঘটলো। খুবই সংক্ষিপ্ত দৃশ্যের বিজ্ঞাপনের ফাঁকে ফাঁকে বিরতিহীন উত্তেজনার তাপে নির্মাণ করা হয়েছে ইন দ্য মুড ফর লাভ; কুসুম-কুসুম ওম বিচ্ছুরিত সিনেমার শিরোনামের মেজাজ-ই সম্ভবত দর্শককে অস্বস্তিতে ফেলে দেয়।
না-বলা কথাগুলো মুদ্রিত হোক সুরের মূর্ছনায়
পর্দায় অবিরাম কথার পায়চারি সিনেমার জন্য ফলদায়ক হয় না। গীতবাদ্য ও আবহসঙ্গীত বরাবর আমার সিনেমার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। কদাচিৎ আমি সিনেমার জন্য মৌলিক সুর আয়োজন করেছি। কারণ, সঙ্গীতকারদের সঙ্গে কাজ করাটা আমার কাছে বড্ড খিটমিটে ব্যাপার বলে মনে হয়। বুঝতেই পারছেন...তারা কথা বলে সঙ্গীতের ভাষায়, আমার জবাব হয় ভিজ্যুয়াল ল্যাঙগুয়েজে! ফলাফল-সিংহভাগ সময় আমরা পরস্পরকে বুঝে উঠতে পারি না।
সিনেমার সঙ্গীত মানে শুধু শ্রবণের মামলা নয়, তা পর্দায় প্রজ্জ্বলিত হওয়া চাই। এটি একটি রসায়ন যার দোস্তি কেবলমাত্র ইমেজের সঙ্গে এবং এটি অনুভূতি ও বোধির সংযোগবিন্দুতে হাইপারলিঙ্ক হিসেবে কাজ করে থাকে। সুতরাং, আমি বিষয়টিকে সামাল দেওয়ার জন্য যা করে থাকি তা হলো চলতি পথে যখনই কোনো জাদুকরী সঙ্গীত-মূর্ছনা আমার মনোযোগ ছিনিয়ে নেয় তথা আমাকে চাক্ষুষ কোনো অভিজ্ঞতা দেয় তা আমি ভুলে যাই না; নগদ নগদ তা কপি করে সংরক্ষণ করি পরে কোনো এক সিনেমায় জুড়ে দেবো বলে।
আমার সিনেমা বানানোর প্রতিটা ধাপেই সঙ্গীতের উপর্যুপরি ব্যবহার ঘটে থাকে। স্বভাবতই, এডিটিংয়ের টেবিলে আমি গানের ডালি নিয়ে বসি। সমকালীন ছায়াচিত্রের আদুর গায়ে পুরনো আমলের সাঙ্গীতিক উর্দি চাপিয়ে দিতে আমার বেশ লাগে! কেননা, সঙ্গীত আমার কাছে রামধনুর মতন সাত রঙের সুরবাহার। সঙ্গীত হলো প্রাকৃতিক বিশোধন ব্যবস্থা-যা মননের সর্বত্র ভিন্ন রঙের (আবেগের) আভা ছড়ায়। আমি দেখেছি, বিগত আমলের সঙ্গীত হাল আমলের সিনেমায় যথোপযুক্তভাবে ব্যবহার করলে ন্যারেটিভে তা কিছুটা দ্ব্যর্থকতা, খানিকটা দুরূহতার ছায়া ফেলে বৈকি! আমি শুটিং-সেটেও সঙ্গীত ব্যবহার করে থাকি; তবে সেটি যতোটা না নির্মাণ কর্মীদের উজ্জীবিত করতে তার চেয়ে অধিক কাজের রিদম নির্ণয়ের উদ্দেশ্যে; যেমন, সিনেমাটোগ্রাফারকে কোনো দৃশ্যে ক্যামেরার কাঙ্খিক্ষত চলনের জন্য কেমনতর দ্রুতির শট্ চাই তা ব্যাখ্যার নিমিত্তে হাজার শব্দ ব্যয়ের চেয়ে এক টুকরা মিউজিককে বেশি কার্যকরী বলে মনে হয় আমার।
পায়ে পায়ে রচিত হোক তোমার নিজের ভাষা
টেকনিক্যাল বিষয়-আশয় নিয়া আমার অবসেশন বরাবর কম। আমার হাতে ক্যামেরা ভাব-জগতের অনুবাদযন্ত্র বৈ বিশেষ কিছু নয়। আজতক আমি যখনই পূর্ব নির্ধারিত কোনো দৃশ্য শ্যুট করতে সেটে এসে দাঁড়াই প্রতিবারই আমি শুরু করি ‘ফ্রেম’ থেকে। কারণ, আমাকে জানতে হবে/হয় কোন্ সীমিত বা খালি জায়গায় দৃশ্যটি ফুলে-ফলে বিকশিত হবে। একবার বিষয়টা মাথার মধ্যে গেঁথে গেলে পয়লা দফায় অভিনেতা-অভিনেত্রীরা কে কোথায় পজিশন নিবেন সেই ব্লকিংগুলি ঠিক করে ফেলি। এরপর প্রধান চিত্রগ্রাহক ক্রিস্টোফার ডয়েলকে আমার চাহিদাটা ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দেই...। তার জানার কথা, আমরা একসঙ্গে এতো কাজ করছি যে-এখন আর বেশি কথা খরচ করতে হয় না। ইশারাই কাফি। আমি অ্যাঙ্গেলটা ঠিকঠাক করে দিলে সে নিজেই ফ্রেমটা গুছিয়ে ফেলে এবং ১০টা টেক নিলে নয়টাই আমার মন-পছন্দ হয়। আমাদের বোঝাপড়াটা দারুণ যেমন ধরো, আমি বললাম ‘ক্লোজ-আপ’...ব্যস এটুকুই; ডয়েল কিন্তুক ঠিকই জানে ক্লোজ-আপ বলতে আমি কতোখানি ক্লোজ বুঝাইছি।
শুটিংয়ে আমি সবসময় একটা রুল ফলো করি আর সেটা হলো প্রয়োজনের অতিরিক্ত টেক নেওয়া যাবে না, অযথা শটের কেরদানি করা যাবে না! তবে হ্যাঁ, এইটা অবশ্যই নির্ভর করে সিনের/শটের দাবির উপর। অধিকাংশ সময়ে একটা দৃশ্যকে সর্বোচ্চ একটা উপায়েই সবচেয়ে শান্ত অথচ উত্তেজিত ঢঙে শ্যুট করার রাস্তা খোলা থাকে। পরিস্থিতির কোপে এই কথার হেরফের যে-হয় না তা কিন্তু নয়। বিশেষ করে আসন্ন দৃশ্যটি যদি সিনেমার ধারা বর্ণনা অনুযায়ী ক্রান্তিকালীন পটে এক ঘটনা থেকে অন্য ঘটনায় উত্তরণের মধ্যবর্তী কোনো দৃশ্য হয়; তখন আমি ওই দৃশ্যটা একাধিক মাত্রায় বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে শ্যুট করে থাকি। আর এডিটিং ল্যাবে বসে কেশদাম উৎপাটন করতে আমার ভালো লাগে না। এই দৃশ্যগুলি গল্পের বাঁক বদলের ইশারা ভঙ্গি করে। আমাকে মনে রাখতে হয়-ওই দৃশ্যটা আমাকে বলে দিবে সিনেমার ঘটনাক্রমে একাধিক চরিত্রের মধ্যে কাকে মেজর করে তুলতে হবে।
এখন প্রশ্ন হলো, শট্ নেওয়ার সময় ক্যামেরা কই বসাবেন...মাথার উপরে না হাঁটুর নিচে! সন্তোষজনক জবাব হলো এর জন্য একটা ব্যাকরণ আছে...। পরক্ষণে বলি, আমি পরীক্ষণে বিশ্বাসী। ‘কেনো? কী কারণে ক্যামেরাটা আমাকে এইখানেই খাড়া করতে হবে! অন্যখানে বসালে ক্ষতিটা কিসের?’ সিনেমাবাজ মাত্রই এই প্রশ্ন করার (বদ)অভ্যাস থাকতে হবে। এটা করার পশ্চাতে লজিকটা অন্য কারও মাথায় না প্রবেশিলে কোনো ব্যাপার না, কারিগর নিজে উপলব্ধি করতে পারলেই হবে। মনে মনে জানবেন-কবিতা সিনেমার বোন। মোশন পিকচার আর কবিতা সমমনোভাবাপন্ন প্রতিভাস-আমি এটা সত্য বলে জ্ঞান করি। কথক ঠাকুর মানে কবি সবসময় শব্দ নিয়ে পারম্যুটেশন-কম্বিনেশনের খেলা করেন কখনওবা ছন্দমিলের জন্যে, কখনও স্বর ঐক্যের জন্য আবার কখনওবা অর্থের খাতিরে, এই তালিকা অচিরেই শেষ হবার নয়। একই ভাষা এস্তেমাল করে প্রত্যেকেই যার যার মতো করে পৃথক ভাষা/স্বর সৃজন করে থাকেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত, সেই ভাষাটাকে ভাববাহী হয়ে উঠতে হয়, দুটি মানুষের মধ্যে সংযোগ ঘটাতে পারতে হয়। আমার কথাগুলো বিশ্লেষণাত্মক শোনালেও অস্বীকার করার উপায় নাই।
সেটে বসে নেওয়া আমার সিদ্ধান্তগুলো সাহজিক উপজ্ঞাজাত, মানে ইংরেজিতে আপনারা যেটাকে ইন্সটিঙ্কটিভ বলেন। অবিমিশ্রভাবে আমি বুঝতে পারি কোন্ সিদ্ধান্তটা সৎ এবং কোন্টার লাইন ঠিক নাই। যেভাবেই বলেন না কেনো সি-নে-মা বিষয়টা শব্দঘটিত বচন দিয়া যুৎমতো বিশ্লেষণ করে উঠা যায় না বরং একটু কঠিন আছে! ব্যাপক অর্থে এইটা আহার্য-এর রসনা খালি মুখে বলার বিলাসিতার মতন। যখন কোনো কারির সোয়াদ আপনার মুখগহ্বরে রসকেলি করছে, তখন এক কোটি মুদ্রা দিলেও অন্যের জন্যে সেই অনুভূতির বর্ণনা চিত্রণ করা সম্ভব হয় না। এটা এক ভাষাতীত ফিলিঙস, নির্বস্তুক বা ভাবমূলকও বলতে পারেন। ছায়াছবির বেলায়ও এটা শুদ্ধ। এবং প্রকৃতপক্ষে আমার কাজের রীতি/ভঙ্গি শুরুর রাতগুলিতে যেমন ছিলো আজও তেমনই আছে..., খুব একটা বিকার বা গুণান্তর ঘটে নাই। বিষয়টা খুবই যা তা, কেননা আমি মনে করি-এভ্যুলশন না ঘটাটা নির্মাতার জন্য হিতকর নয়। কিন্তু, নিয়তির নির্মম পরিহাস-আমি এইভাবে ছাড়া অন্য কোনোভাবে সিনেমা করতে জানি না। আমি সবসময় চেয়েছি মহামতি হিচককের ন্যায় শট্ নেওয়ার আগে সেটে ঢুকে যাবতীয় সিদ্ধান্ত দিবো, হুকুম তামিল করাবো। কেনো যেনো আমি এভাবে কাজ করাটা পছন্দ করতে পারি না, বুঝি না! লাইক করতে পারলে এতো কমেন্ট করতে হইতো না।
আর একটা কথা
একজন নির্মাতা হয়ে উঠতে চাইলে আপনাকে সৎ হতে হবে। জানবেন অন্য কারও সঙ্গে নয়, সৎ থাকতে হবে নিজের সঙ্গে। আপনার মগজে জানা থাকতে হবে কেনো আপনি ফিল্ম করতে চান; কোনো বিভ্রান্তি ঘটার মুহূর্ত থেকে, আপনার জানা থাকা চাই-এটি কেনো ঘটছে এবং এর জন্য দায়িত্বশীল অন্য কেউ নয়, আপনি নিজে। সিনেমা কোনো ব্লেম গেম নয়।
ওং কার-ওয়াইয়ের সিনেমাসমূহ : অ্যাজ টিয়ারস্ গো বাই (১৯৮৮), ডেইজ অব বিয়িং ওয়াইল্ড (১৯৯০), চুংকিং এক্সপ্রেস (১৯৯৪), অ্যাশেজ অব টাইম (১৯৯৪), ফলেন অ্যাঞ্জেলস্ (১৯৯৫), দ্য বুয়েন্স আয়ার্স অ্যাফেয়ার (উর্ফে হ্যাপি টুগেদার) (১৯৯৭), ইন দ্য মুড ফর লাভ (২০০০), ২০৪৬ (২০০৪), মাই ব্লুবেরি নাইট (২০০৭), দ্য গ্র্যান্ডমাস্টার (২০১২, নির্মাণাধীন)।
লেখক : ইমরান ফিরদাউস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী। বর্তমানে তিনি ফ্রিল্যান্স গবেষণা ও চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গে জড়িত।
imranfirdaus17@gmail.com
তথ্যসূত্র
১. লরেন্তঁ তিরার্দ রচিত মুভিমেকার্স মাস্টার ক্লাস/প্রাইভেট লেসনস্ ফ্রম দ্য ওর্য়াল্ড ফোরমোস্ট ডিরেক্টরস (২০০২, পৃষ্ঠা : ১৯৫-২০০, ফেবার অ্যান্ড ফেবার, নিউ ইয়র্ক/লন্ডন, ISBN-13 978-0-571-21102-9) থেকে নেওয়া সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে লেখাটি তৈরি করা হয়েছে।
বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৩ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের চতুর্থ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন