কাজী মামুন হায়দার
প্রকাশিত ০৯ ডিসেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
পটের গান : চলচ্চিত্র উদ্ভব-ইতিহাসের নিম্নবর্গীয় পাঠ
কাজী মামুন হায়দার

আমেরিকান উদ্ভিদবিজ্ঞানী বুর ব্যাংক-এর বাড়ির বাগানে কতোগুলো কাঁটা ছাড়া ক্যাকটাস ছিলো। বুর তার লেখা বই ‘দ্য লাইফ অব এন ইন্ডিয়ান ইয়োগি’তে বলছেন এভাবে,‘এই ক্যাকটাসগুলোতে মূলত কাঁটা ছিলো। আমি অনেকদিন ধরে চেষ্টা করে এগুলোকে কাঁটাবিহীন তৈরি করেছি।’ বাগানে লাগানোর পর প্রতিদিন বুর ওই ক্যাকটাসগুলোর কানে কানে বলতেন,‘তোমাদেরকে আমি সেভ করবো,ইউ ডু নট নিড টর্ন’।তিনি আরো বলতেন,‘তোমরাতো শরীরে কাঁটা রাখো নিজেদের আত্মরক্ষার জন্য,আমি কথা দিচ্ছি,এখানে তোমাদের নিজেদের রক্ষার জন্য কাঁটার প্রয়োজন নেই;তোমাদের কোনো বিপদ হবে না।’ পরবর্তী সময়ে ওই ক্যাকটাসগুলোর থার্ড জেনারেশনে দেখা গেলো ওদের কারো শরীরে আর কাঁটা নেই। অনেকের কাছে বিষয়টি হাস্যকর,আবার কারো কারো কাছে অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে। কিন্তু যার কাছে যাই মনে হোক না কেনো,ঘটনাটি কিন্তু বাস্তব। এই বুর ব্যাংকই বিচি ছাড়া লেবু,বিচি ছাড়া কাঁঠাল আবিষ্কার করেছিলেন।
মানুষ-বুর ব্যাংক-এর সঙ্গে প্রকৃতির এই অসাধারণ সম্পর্কের কথা আমি জেনেছিলাম আহমদ ছফার একটি সাক্ষাৎকার থেকে।১ ছফার নিজের লেখা বই ‘পুষ্প, বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ’-এও এই সম্পর্কের ভালো বর্ণনা আছে। মানুষ সেখানে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে একাকার। সেই প্রকৃতিকে জয় করতেই আজ থেকে কয়েক হাজার বছর আগে স্পেনের আলতামিরা গুহায় আঁকা চিত্রে মানুষ গতিকে ধরতে চেয়েছিলো। সেই ছবিতে বাইসনের চার পায়ের জায়গায় ছিলো ছয় পা। গতিকে ধরার সেই স্বপ্ন মানুষের পূর্ণ হয়েছিলো, সেসময় থেকে কয়েক হাজার বছর পর। স্বপ্ন ও প্রাপ্তি নিয়ে দীর্ঘসময় ধরে খেলা চলেছে ‘মানুষ’ আর ‘প্রকৃতি’র মধ্যে। কারণ ‘মানুষ সমাজ থেকে পরিবার থেকে পালাতে পারে মুক্তির নামে,কিন্তু দেহ থেকে পালাতে পারে না। আর দেহের ভিতরে থাকা মানেই প্রকৃতির অধীনে থাকা। ...আর এই পৃথিবীতে জীবিত থাকতে হলে প্রকৃতির সঙ্গে,জীবজগতের সঙ্গে,সমাজের সঙ্গে মানুষের সম্বন্ধ থাকবেই। আর ঐ সম্বন্ধের ভিতরেই রয়েছে স্বাধীনতা ও অধীনতা উভয়ই। সম্বন্ধ যথাযথ হলে পাওয়া যাবে স্বাধীনতা,মিলবে মুক্তি।’২ এই মুক্তির সন্ধান মানুষ সবসময় করেছে,করছে।
মুক্তির লক্ষ্যেই গতিকে ধরার এই খেলায় খ্রিস্টপূর্বাব্দে অ্যারিস্টটল,আর্কিমিডিস কিংবা গণিত শাস্ত্রবিদ ইউক্লিড যেমন ভূমিকা রেখেছেন;তেমনি নবম-দশম শতকে ভূমিকা রেখেছেন আরবের দার্শনিক আল-হাজেন তার ‘অবিরত দৃষ্টিনন্দন তত্ত্ব’ দিয়ে। পরবর্তী সময়ে এই জয়ের পথে সঙ্গী হয়েছে চিনের ধোঁয়া-চিত্র,এসেছে ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’;তারপরও অনেক অনেককিছু। এভাবে একসময় মানুষের কাছে ধরা দিয়েছে গতি,সৃষ্টি হয়েছে নতুন প্রযুক্তি। আর প্রযুক্তির ইতিহাসের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো,এক্ষেত্রে স্বয়ম্ভূ বলে কেউ থাকে না; থাকে শুধুই সমন্বয়। ফলে ‘এই সমন্বয়ের কাজ শেষ অবধি যার হাতে বাণিজ্যিক সাফল্যের প্রথম প্রতিশ্রুতি অর্জন করে,জনপ্রিয় ইতিহাস তাকেই অর্পণ করে উদ্ভাবকের শিরোপা।’৩ আর ইতিহাস নির্মাণের ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় কাজ করে;সেটা হলো,উচ্চবর্গের মানুষের প্রতি পক্ষপাতিত্ব,সেখানেই পিছিয়ে বড়ো একটি অংশ। এক্ষেত্রে মানুষ বলো,দেশ বলো-এরা সবাই বলির শিকার হন,উচ্চবর্গের নামলিপ্সার কাছে।
তবে এ কথাও ঠিক,ঘটনা দৃশ্যত যাই হোক,ইতিহাস কোনো না কোনোভাবে সবকিছুকে ধারণ করে। সেখানে প্রত্যক্ষ-অপ্রত্যক্ষ,প্রাধান্যশীল-অপ্রাধান্যশীলতা থাকতে পারে,তবে এর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে অনেক কিছু। পর্দায় গতিকে ধরার এই ইতিহাসে তেমনি এক উপাদানের নাম ‘পটচিত্র’ বা ‘পটেরগান’।দৃশ্যত,এই উপাদানকে হয়তো চলচ্চিত্রের ইতিহাস ধারণ করতে পারেনি,অন্যভাবে বললে হয়তো ধারণ করতে দেওয়া হয়নি। অথচ আজ এতো বছর পরে এসে চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ভারতিয় উপমহাদেশের আকাশে থাকা এই উপাদানকে যুক্ত করতে হচ্ছে। কারণ,চলচ্চিত্র নিয়ে পশ্চিমের ওই এতো এতো ইতিহাসের পাশে পটেরগান নামক লোকজ এই ধারাকে সম্মান না করলে এই আলোচনা,এই ইতিহাস অনেকখানিই অসম্পূর্ণ থাকবে।
২.
ইতিহাসে কার স্থান হওয়ার কথা ছিলো,কার হয়েছে;কিংবা কে প্রকৃত গুরুত্বপূর্ণ,কে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার ভান করছে-এমন অনেক প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য দীর্ঘদিন ধরে পদ্ধতিগতভাবে কাজ করে যাচ্ছেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গৌতম ভদ্রসহ আরো কয়েকজন। তারা সফলও হয়েছেন;ইতিহাসের নতুন এক আদিকল্পের তারা নাম দিয়েছেন ‘নিম্নবর্গের ইতিহাস’।গৌতম ভদ্র তার এক বক্তৃতায় বলছেন এভাবে,‘আমি অনেক সময় সাহেবদের বলি-সাহেবরা আমার কাছে পিএইচডি করতে আসে,এ্যন্থ্রপলজিক্যাল স্টাডি-আমি বলি যে ভাই আমি ভারতীয়দের পাঠাব ইংল্যান্ডে,ফ্রান্সে,যে তোমাদের কেন ডাইভোর্স হয়,তোমরা কেন বিয়ের আগে আংটি পরাও,তোমরা কেন ইতালিতে ঝর্ণায় পয়সা ফেলতে যাও আর আমেরিকাতে ফাউন্টেইন-এ যাও জল খাওয়ার জন্য যাতে বিয়েটা না ভেঙ্গে যায়;আমাদের সুপারিস্টিশন্স যেমনি করে তোমরা স্টাডি কর,আমিও তেমনি গিয়ে তোমাদের স্টাডি করব।দুর্ভাগ্যক্রমে তোমাদের ক্ষমতা বেশি, এ্যন্থ্রপলজি সাবজেক্টটা তোমরা তৈরি করেছ-আমরা তোমাদের অবজেক্ট, আর এ্যন্থ্রপলজি হলো সাবজেক্ট।’৪
তার মানে দাঁড়ায়,যারা ক্ষমতায় এগিয়ে,তারাই লিখবে তাদের মতো করে ‘গল্প’।সেই গল্পে তারা নায়ক না হলেও তারাই নায়ক,তারাই এগিয়ে। ভারতবর্ষের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।অনেকে মনে করেন,ভারতে আধুনিক ইতিহাসবিদ্যার শুরু ইংরেজি শিক্ষার প্রবর্তন থেকে,কিন্তু বিষয়টি মোটেও সেরকম নয়-এর শুরু ইংরেজ শাসনব্যবস্থা থেকে। তার মানে ‘...সেই শাসনব্যবস্থা ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের চেয়েও পুরনো।’৫মূলত ইংরেজরা ‘১৭৬৫ সালে যখন কোম্পানি দেওয়ানি হাতে পেল কিংবা তারও আগে যখন নবাব তিনটে জেলা (সিডেড ডিস্ট্রিকট্স)তাদের দিয়ে দিলেন-তখন থেকেই ভারতবর্ষের ইতিহাস ইংরেজ শাসনের হাতিয়ার হল।কারণ লুঠপাটই যেখানে দেশজয়ের উদ্দেশ্য সেখানে ইতিহাস অবান্তর।...লুঠেরার কাছে বর্তমানটাই একমাত্র সত্য। কিন্তু জয় যখন বিজিত দেশে ক্ষমতা কায়েম করার আকাঙ্ক্ষায় পরিণত হয়, বিজেতাকে তখন ইতিহাসচেতনা ব্যবহার করতে হয় প্রভু সংস্কৃতির একটি প্রধান উপাদান হিসেবে। সব বিজেতার পক্ষেই একথা খাটে,তবে অবস্থা ভেদে ওই চেতনার বিশিষ্ট রূপটি ধরা পড়ে মৌখিক বা লিখিত বক্তব্যে।’৬তার মানে,বিজেতার ইতিহাস প্রভাব ফেলতে চায় সংস্কৃতিতে।
রাষ্ট্রের ইতিহাস চর্চার এই কাহিনী কেবল দেশের ইতিহাস লেখার ক্ষেত্রে নয়, সামাজিক বিজ্ঞান, নৃবিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও একই। আর বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এটা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। এই এগিয়ে থাকতে চাওয়ার আকাঙ্ক্ষা দিন দিন ক্ষমতাবানদের বেড়েছে। তাই বিজ্ঞানের যেকোনো উদ্ভাবনে তাদের ভাষায় অসভ্য,বর্বরদের (পশ্চিমারা অবশ্য এদেরকে সভ্য করার জন্য এখানে এসেছেন)কোনো ভূমিকা থাকতে পারে,এটা তারা মেনে নিতে পারেন না;যেমন পারেন না নৃবিজ্ঞানের বেলায় পশ্চিমাদের ‘ডাইভোর্স’ নিয়ে প্রশ্ন তুললে-সাধারণ ইতিহাসের এই হলো চরিত্র। আগেই বলেছি এর বাইরেও কথা চলেছে,এখনো চলছে। এই চলার পথে নতুন সংযোজন চলচ্চিত্রের আবিষ্কারের ইতিহাসে ‘বর্বর-অসভ্য’দের লোকজ মাধ্যম পটেরগান-এর সংযোজন।
৩.
মহাদেবের বিনা হুকুমে তার ছবি এঁকেছিলো বিশ্বকর্ম্মার এক বংশধর। এতে তার ভয় হতে থাকে,মহাদেব যদি রাগ করেন। ঠিক সেই সময় মহাদেব ওই পথেই আসছিলেন। পাছে মহাদেব জানতে পারেন,এই ছবি সে-ই এঁকেছে,সেজন্য সে তাড়াতাড়ি ছবি আঁকার তুলিটি মুখের ভিতর পুরে দেয়। এতে তুলিটি সকড়ি (এঁটো বা উচ্ছিষ্ট-লেখক)হয়ে যায়। এটা দেখে মহাদেব এগিয়ে এসে বলেন,তুলিটি সকড়ি করলে কেনো? বিশ্বকর্ম্মার বংশধর বলে,ভয়ে। তখন মহাদেব বলেন,তুলিটা দূরে ফেলে না দিয়ে,মুখে দিয়ে সকড়ি করে তুমি অন্যায় করেছো। রেগে গিয়ে মহাদেব বলেন,‘যা তোরা এজন্য পতিত হলি। তোরা ছোট জাত হয়ে সমাজে থাক গে।’
তারপর বিশ্বকর্ম্মার সব জ্ঞাতিরা কাঁদতে কাঁদতে এসে মহাদেবকে বললো,আমরা এখন খাব কী করে? মহাদেব বলেন,তোরা হিন্দু হবি না,মুসলমানও হবি না। তোরা মুসলমানের রীতি করবি আর হিন্দু কর্ম করবি অর্থাৎ ছবি আঁকবি ও পড়বি। সেই থেকে এরা মুসলমানদের মতো নামাজ পড়ে,আর হিন্দুর মতো দেব-দেবতার ছবি আঁকে এবং সেই সব নিয়ে গান করে। বীরভূমের পানুড়িয়া গ্রামের ৬০ বছর বয়সী পটুয়া ছবিলালের কাছ থেকে শোনা পটুয়াদের বা পটগান-এর জন্মের কথিত ইতিহাস এটি। ব্রহ্মকৈবর্ত্ত পুরাণের (একাদশ বা দ্বাদশ শতাব্দী)দশম অধ্যায়ে চিত্রকর বা পটুয়া জাতির উৎপত্তির যে কাহিনী পাওয়া যায়,তার সঙ্গে অবশ্য গ্রাম্য ওই ‘অশিক্ষিত’ পটুয়ার ‘তথাকথিত’ কাহিনীর মিল অনেকখানিই।৭
এই গেলো পটুয়াদের কথা,এবার আসি পটুয়ারা যা আঁকেন-সেই পটের কথা নিয়ে। মূলত সংস্কৃত ‘পট্ট’ বা পট বলতে প্রধানত কাপড় বা বস্ত্র বোঝায়। প্রাচীন ভারতে বস্ত্রের উপর চিত্র আঁকার রীতি প্রচলিত ছিলো। পট্ট বা বস্ত্রের উপর আঁকা এই চিত্রকলাই হলো পট। পটচিত্র বা পটগান প্রকৃতপক্ষে দৃশ্য ও শ্রাব্য। অর্থাৎ দৃশ্য,গান ও কথকতার সমন্বয়ে এর উপস্থাপন। এখানে কাজ করে সাধারণত দুটি শিল্পদৃষ্টি-প্রথমত,ইউনিট অব লাইন এবং দ্বিতীয়ত,কম্পোজিটনেস।৮তবে শুধু পটেই নয়,সব লোকচিত্রেই এই দুটি তত্ত্ব কাজ করে। বিভিন্ন রঙ ব্যবহারের মধ্যে ঐকতান সৃষ্টি ও মন্ময়তা-এই সব লোকশিল্পীদের শিক্ষাজাত নয়,এটি পরম্পরাগত ও প্রথাগত।৯ শত শত বছর ধরে বাংলার এই ‘অশিক্ষিত’ লোকশিল্পীরা নিজস্ব জ্ঞান,অভিজ্ঞতা দিয়ে পরম্পরাকে সঙ্গী করে এগিয়ে এসেছেন এতো দূর।
এখন প্রশ্ন,কতো দূর অতীত সেই পটের ইতিহাস। সেদিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই,বাণভট্টের ‘হর্ষচরিত’ রচিত হয় সপ্তম শতাব্দীর প্রথমপাদে। সেখানেও যমপট ব্যবসায়ীর কথা লেখা আছে ঠিক এভাবে-‘রাজা প্রভাকরবর্দ্ধনের পীড়ার কথা শুনিয়া হর্ষবর্দ্ধন শিকার হইতে ফিরিয়া রাজধানীতে প্রবেশ করিয়াছিলেন। হর্ষবর্দ্ধন নগরে প্রবেশ করিয়া দেখিলেন-দোকানের পথে অনেকগুলি কৌতুহলী বালকদ্বারা পরিবৃত একজন যমপট্টিক বা যমপট-ব্যবসায়ী পট দেখাইতেছে। লম্বা লাঠিতে ঝুলানো পট বাঁ হাতে ধরিয়াছে,ডান হাতে একটা শরকাঠি দিয়া চিত্র দেখাইতেছে ভীষণ মহিষারূঢ় প্রেতনাথ প্রধান মূর্ত্তি। ...যমপট্টিক গাহিতেছে-
মাতাপিত্রসহস্রাণি পুত্রদারশতানি চ।
যুগে যুগে ব্যতীতানি কস্য তে কস্য বা ভবান...'১০
এই উদাহরণ দিয়ে পটের প্রাচীনতা বোঝাতে চাচ্ছিলাম। তবে কোনো কোনো পুস্তকে আরো আগে অর্থাৎ খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকে পটে ছবি আঁকা হতো বলেও উল্লেখ আছে।১১ গবেষকরা মনে করেন,এর প্রচলন সম্ভবত আরো প্রাচীন কাল থেকেই ছিলো,কারণ সাঁওতাল প্রমুখ আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষেরা এখনো পট আঁকেন তাদের আদিম লোকপুরাণকে অবলম্বন করে।
যাহোক বলছিলাম ‘হর্ষচরিত’-এর কথা;তারও আগে পঞ্চম শতাব্দীর কালিদাসের ‘অভিজ্ঞান শকুন্তলম্’ ও ‘মালবিকাগ্নিমিত্রম্’-এ চিত্র-শিল্প ও চিত্র-দর্শনের কথা আছে।১২ এছাড়া অষ্টম শতকে বিশাখা দত্তের লেখা বিখ্যাত ‘মুদ্রারাক্ষস’ নাটকেও রয়েছে যমপটের উল্লেখ। ‘হর্ষচরিত’ ও ‘মুদ্রারাক্ষস’-এ যে যমপট্টিক অর্থাৎ যমপট ব্যবসায়ীর উল্লেখ আছে, তারা সুদীর্ঘ পটের উপর ধর্ম্মরাজ যমের মূর্ত্তি এবং যমালয়ের নানা ভয়ঙ্কর দৃশ্য লিখে গীতি সহযোগে গৃহস্থ-বাড়িতে সেই পট দেখাতেন।১৩ যমালয়ে পাপী যে নিদারুণ শাস্তি ভোগ করে,চোখের সামনে তা প্রত্যক্ষ করে মানুষকে পাপ ও অন্যায় হতে বিরত করার এই পটগুলো গান সহকারে প্রদর্শন করা হতো। আগেই বলেছি দৃশ্য,গান ও কথকতার সমন্বয়ে পট,তা যেমন হর্ষচরিত-এর আমলে ছিলো,তা এখনো আছে। সন্দেহ নাই এই চিত্রকর জাতি সুপ্রাচীন। প্রাচীনকাল থেকেই এরা চিত্র লিখে (প্রাচীনকালে চিত্রের ক্ষেত্রে আঁকার পরিবর্তে লেখা ব্যবহৃত হতো)লোকের মনোরঞ্জন এবং তাদের মনে ধর্ম্মভাব জাগানোর জন্য কাজ করতো।
আকার ও বিষয়বস্তু,এই দুইয়ের ভিত্তিতে পটচিত্রকে ভাগ করা যায়। বিষয়বস্তুর ওপর ভিত্তি করে পটচিত্র হয় সাধারণত দুই প্রকার-ধর্মাশ্রিত ও ধর্মনিরপেক্ষ।আর আকারভিত্তিক পটচিত্রকে প্রধানত ভাগ করা হয় দুভাগে-দীঘলপট বা জড়ানোপট ও একচিত্র সম্বলিত চৌকোপট। চৌকোপট আকারের ওপর ভিত্তি করে তিন ধরনের হয়-বর্গাকার,আয়তাকার ও বৃত্তাকার।
অন্যদিকে জড়ানোপট হয় দুই প্রকার-১. আড়ে লাটাই পট (আড়াআড়ি অর্থাৎ পাশাপাশি), ২. লাটাই পট (উপর-নিচ অর্থাৎ লম্বালম্বি)।জড়ানো বা দীঘলপট পর পর বহু চিত্রসম্বলিত হয়।এগুলি ১২ ফুট থেকে ৩০-৩৫ ফুট পর্যন্ত দীর্ঘ হয়।এই দীর্ঘ পটে ২০-২২টি আয়তাকার খোপ থাকে। এই সব খোপে কাহিনীর বিবৃতিসূচক পর পর অনেকগুলো চিত্র অঙ্কন করে একটি পূর্ণ গল্পের বয়ান করা হয়।পটুয়ারা নানা জেলায় ঘুরে ঘুরে এই সব ছবি দেখানোর সঙ্গে সঙ্গে ওই কাহিনীগুলি সুর-সহকারে আবৃত্তি করে। প্রত্যেক জড়ানোপটের দুই প্রান্তে দুইটা বাঁশের দণ্ড লাগানো হয়;শেষ প্রান্তের দণ্ড থেকে জড়াতে শুরু করে সমস্ত পটটি গুটিয়ে রাখা হয়।ফলে দীর্ঘপটের প্রথম চিত্রের উপরিভাগের সংলগ্ন দণ্ডটি বাইরে থাকে।
পট দেখাবার সময় জড়ানো পটটির এক প্রান্তের দণ্ডটি বাঁশের একটি চারপায়ার উপর রাখা হয়, প্রদর্শক পটুয়া বাঁ-হাতে উপরের দণ্ডটি তুলে সর্বপ্রথমে প্রথম চিত্রটি খুলে দেখায় এবং ডান-হাতে পটচিত্রে আঁকা বিষয়গুলো নির্দেশ করে তার কাহিনী সুরসহকারে বিবৃত করে। তারপর উপরের দণ্ডটি ঘুরিয়ে প্রদর্শিত প্রথম চিত্রটি তার উপর জড়িয়ে দ্বিতীয় চিত্রটি উন্মোচন করে এবং তার কাহিনীও একইভাবে বিবৃত করে। এভাবে দীর্ঘপটে আঁকা চিত্রগুলো প্রদর্শন করার সঙ্গে সঙ্গে পুরো বিষয়বস্তু গান ও কথকতায় তুলে ধরা হয়।
জড়ানোপটে সাধারণত জনপ্রিয় কাহিনীগুলোর মধ্যে মনসামঙ্গলের কাহিনী, রামায়ণ দশাবতার কাহিনী, কৃষ্ণলীলা, চণ্ডীদাস কথা প্রচলিত। এছাড়া কোনো গুরুতর সামাজিক বা প্রাকৃতিক ঘটনা নিয়েও পটচিত্র অঙ্কন করা হয়ে থাকে। এই হলো ভারতিয় উপমহাদেশের সেই পটচিত্রের কথা।
৪.
এখন আলোচনায় আসি চিত্র ও চলচ্চিত্র নিয়ে। আলতামিরা গুহায় বাইসনের চিত্রের কথা আগেই বলেছি। হাজার হাজার বছর ধরে একটি সমতল দ্বিমাত্রিক সীমাবদ্ধ ক্ষেত্রকে রেখা, রঙ,রূপে সাজিয়ে তোলার চেষ্টা করছেন চিত্রশিল্পীরা। শূন্য ক্ষেত্রকে চিত্রশিল্পী যখন প্রথম একটি বিন্দু বা রেখা দ্বারা আক্রান্ত করে,তখনই গভীরতর এক আততি সঞ্চারিত হয় পটের সীমাবদ্ধ ক্ষেত্রে।অন্যদিকে,চলচ্চিত্রের অনেক উপাদানের মধ্যে এই ছবিই (picture) হচ্ছে প্রধান। সত্যজিতের ভাষায়,‘নাটকের দ্বন্দ্ব,উপন্যাসের কাহিনী ও পরিবেশ বর্ণনা,সঙ্গীতের গতি ও ছন্দ,পেইন্টিং সুলভ আলোছায়ার ব্যঞ্জনা,এ-সবই চলচ্চিত্রে স্থান পেয়েছে।'১৪ ‘পেইন্টিং সুলভ আলোছায়ার ব্যঞ্জনা’-এটাই কি তাহলে চলচ্চিত্রের অন্যতম একটি মাত্রা? অন্যতম,কিন্তু মোটেও সমস্তটা নয়।১৫ পার্থক্যটা সত্যজিৎ বলেন এভাবে, ‘ছবির ছবিত্বেই ছবির শেষ নয়, শুরুও নয়-যেমন শুরু ও শেষ পেইন্টিং-এ।'১৬
আল-হাজেনের অবিরত দৃষ্টিনন্দন তত্ত্ব দিয়ে যার শুরু, লুমিয়েরদের চলচ্চিত্রের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তাই চলতে দেখা গেলো। তার মানে ছবির সঙ্গে যুক্ত হলো গতি। ‘আর গতি মানেই সময়ের একটা মাত্রা। চিত্রের সঙ্গে চলচ্চিত্রের বিভেদের এই হলো প্রথম সূত্র। মানে চিত্র বা ছবি স্থির;চলচ্চিত্র গতিময়। চিত্র স্তব্ধ,একটি মুহূর্তের মধ্যে চিন্তাকে ধরে রাখে। আর চলচ্চিত্র সময়ের মধ্যে প্রবাহিত।’১৭
স্থিরচিত্র মানে আলোকচিত্র কাজ করে সাধারণত স্বাভাবিক বাস্তবকে তুলে ধরার মধ্য দিয়ে। কিন্তু চিত্রকলা কখনোই স্বাভাবিক বাস্তবের অনুকরণ করে না। তাই আলোকচিত্রের প্রবাহ দিয়ে গড়া যে চলচ্চিত্র,তা চিত্রকলার অনুষঙ্গ পায় না। চলচ্চিত্র ও চিত্রকলার মধ্যে বিভেদের এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে।কিন্তু মনে রাখতে হবে,শিল্প হয়ে উঠার জন্য চলচ্চিত্রকে গত একশ বছরে অনেক আঙ্গিকগত উদ্ভাবনের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে। তাই আজকের চলচ্চিত্রের শুরুটা কিন্তু মোটেও গতি কিংবা আলোকচিত্র দিয়ে ছিলো না।
মানুষের একধরনের শারীরিক বা মানসিক বিভ্রমের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে চলচ্চিত্রের অস্তিত্ব। বিষয়টা অনেকটা এ রকম যে,পর্দায় একটি আলোকিত আয়তক্ষেত্রে সেকেন্ডে ২৪ বার ক্রমাগত ফুটে উঠছে আবার মিলে যাচ্ছে এক-একটি আলোকচিত্র। দুটি ছবির মাঝখানে থাকে এক সেকেন্ডের ৪৮ ভাগের এক ভাগ সময়ের অন্ধকার। এই অন্ধকারে আগের ছবির রেশ থাকে আমাদের চোখে বা বোধের মধ্যে। তাই আমাদের অনুভবে আমরা কোনো ছেদকে সনাক্ত করতে পারি না। বর্তমানে পর্দায় আলো প্রক্ষেপণের মধ্যে দিয়ে যে চলচ্চিত্র আমরা দেখছি,তার শুরুটা হয়েছিলো মূলত ম্যাজিক লণ্ঠন-এর মাধ্যমে। পঞ্চদশ শতকে চিত্রশিল্পী লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি (১৪৫২-১৫১৯) যে ক্যামেরা অবসকিউরার বর্ণনা দেন; ১৬২০ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝিতে জার্মানির জোহানেস কেপলার এর উন্নতি সাধন করেন। ১৬৪৬-এ এসে আরেক জার্মান বিজ্ঞানী অ্যাথানেসিয়াস কিরচার বর্ণনা দেন এই ম্যাজিক লণ্ঠন-এর। কাচের উপর কালি দিয়ে ছবি এঁকে কিরচার ম্যাজিক লণ্ঠন-এর সাহায্যে যীশু খ্রিস্টের জীবন কাহিনী দেখাতেন। অর্থাৎ ক্যামেরা অবসকিউরার ব্যবহার করে একটি বাক্সের মধ্যে তীব্র আলো সৃষ্টি করে সেই আলো একটি ফুটো দিয়ে বের করে দেওয়া হতো। সেই তীব্র ‘আলোর সোজা পথে চলা’র বৈশিষ্ট্যের সামনে ধরা হতো ছবি আঁকা কাচ। ফলে এর প্রতিফলন পড়তো সামনের পর্দায়। ধারাবাহিকভাবে একটার পর একটা কাচ ধরে কোনো কাহিনী বর্ণনা করা হতো। এই হলো ম্যাজিক লণ্ঠন। একটু খেয়াল করুন ম্যাজিক লণ্ঠন-এ কিন্তু হাতে আঁকা চিত্র ব্যবহার হয়েছিলো। সেই সময়ে এই ম্যাজিক লণ্ঠন-এর ব্যবহার ক্রমেই জনপ্রিয়তা পায়, ছবি দেখার প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়তে থাকে। ছবিতে গতি না থাকলেও কিন্তু এর মধ্যেই লুকিয়ে ছিলো ভবিষ্যৎ চলচ্চিত্রের সম্ভাবনা।
চলচ্চিত্র উদ্ভব-ইতিহাস নিয়ে আমি আর এগোবো না;কারণ তা হয়তো অনেকেরই জানা। মূলত এবার আমি ম্যাজিক লণ্ঠন-এর ইতিহাস থেকে অনেকখানি পিছিয়েই যাবো। পিছিয়ে যাওয়া এই ইতিহাসে আমার সঙ্গে থাকবে নিম্নবর্গের মানুষের মাধ্যম পটগানের কথা।
৫.
চলমান চিত্র অর্থাৎ চলচ্চিত্র নিয়ে যে চিন্তা,দৃশ্যত তার প্রথম প্রায়োগিক রূপ আমরা দেখি ম্যাজিক লণ্ঠন-এ। মূলত ম্যাজিক লণ্ঠন-এ গণিত শাস্ত্রবিদ ইউক্লিডের তত্ত্ব ‘আলো সরল রেখায় চলে’-এর ব্যবহার,ক্যামেরা অবসকিউরার ও পর্দায় কোনোকিছুর প্রক্ষেপণের বিষয়গুলো ব্যবহার হয়।ম্যাজিক লণ্ঠন-এ কিন্তু সেসময় চলচ্চিত্রের মূল যে বিষয় পর্দায় বিভ্রম সৃষ্টি অর্থাৎ হাজেন-এর ‘অবিরত দৃষ্টিনন্দন তত্ত্ব’ ব্যবহার হয়নি। ফলে যেটা হয়েছে-কাচের উপর আঁকা চিত্র একের পর এক কেবল পর্দায় পড়েছে আর মানুষ তাই দেখে মুগ্ধ হয়েছে। এটাই স্বাভাবিক,কারণ সেসময় অর্থাৎ ১৬৪৬ খ্রিস্টাব্দে মানুষের এই অবদান নিঃসন্দেহে আশ্চর্য হওয়ার মতো। চলচ্চিত্রের উদ্ভব-ইতিহাসে তাই ম্যাজিক লণ্ঠন-এর গুরুত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো জায়গা নেই বলে আমি নিজেও মনে করি।
কিন্তু আমার আলোচনার জায়গা একটু অন্যখানে। এই আলোচনার মাঝামাঝি আমি ভারতিয় উপমহাদেশের লোকজ মাধ্যম ‘পটগান’ নিয়ে কথা বলেছি। আমি ইতিহাস থেকে আলোচনা করে দেখিয়েছি,পঞ্চম-সপ্তম শতকেও এই উপমহাদেশে পটগানের চল ছিলো। পটগানের ধরন ও বৈশিষ্ট্যে দেখানো হয়েছে,এটি একটি দৃশ্য ও শ্রাব্য মাধ্যম। জড়ানো বা দীঘলপট নামে পটের মূল যে ধরনের কথা বলা হয়েছে,সেখানেও দেখা গেছে,চলচ্চিত্রের সেলুলয়েডে আয়তাকার ফ্রেমে যেভাবে একের পর এক ছবি দিয়ে গতি আনা হয়,ঠিক সেভাবে লম্বা পটের আয়তাকার খোপে একের পর এক ধারাবাহিক ছবি এঁকে পটেরগানেও কোনো ঘটনা বয়ান করা হয়।এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো,পটে ছবি দেখানোর সঙ্গে সঙ্গে কিন্তু সঙ্গীত ও কথকতা উপস্থাপন করা হয়।
এমনকি সেলুলয়েড ফিল্ম আবিষ্কারের পর সেটা যেভাবে রোল করে রাখা হতো এবং তা খুলে একটার পর একটা আলোর সামনে আসার পর যেমন অন্যপ্রান্তে আবার প্যাঁচানোর ব্যবস্থা থাকতো,সেটাও পটগানে আছে। তার মানে ছবির মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে কোনো কিছু উপস্থাপন ও সেটার ধারা-বিবরণী বলার ধরন-সেই সপ্তম শতকেও এই উপমহাদেশে ছিলো। এখন প্রশ্ন,১৬৪৬ খ্রিস্টাব্দে আবিষ্কৃত ম্যাজিক লণ্ঠন নিয়ে যদি চলচ্চিত্র উদ্ভাবন ইতিহাসে এতো কথা হয়,তাহলে সেই সময় থেকে প্রায় এক হাজার বছর আগে পঞ্চম কিংবা সপ্তম শতকে যখন পটগান চলচ্চিত্রের মতোই একটি প্রপঞ্চ আমাদের সামনে উপস্থাপন করছে সেটা এই ইতিহাসে যোগ হবে না কেনো?
ম্যাজিক লণ্ঠন-এ ‘অবিরত দৃষ্টি নন্দন তত্ত্ব’-এর প্রয়োগ ছিলো না;কারণ এটার আবিষ্কার নবম-দশম শতকে হয়।তাহলে কী ছিলো ম্যাজিক লণ্ঠন-এ-আলোর সোজা পথে চলা ও প্রক্ষেপণ। মূল যে বিষয়-বিভ্রম ছিলো না। এখন পঞ্চম শতকের পটগানে আলোর সোজা পথে চলার তত্ত্বের প্রয়োগ ছিলো না, ছিলো না প্রক্ষেপণও। কিন্তু ছিলো গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় যেমন, পর পর চিত্র উপস্থাপন করে গল্প বলা,প্রদর্শিত চিত্রের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সঙ্গীত ও তার বর্ণনা এবং সেলুলয়েডের রোলের মতো পটের রোল করা। এছাড়া গণমাধ্যমের যে বৈশিষ্ট্য-একই সঙ্গে দর্শক হিসেবে অচেনা-অজানা মানুষের উপস্থিতি, সেটাও সেই পঞ্চম শতকেই ছিলো এই পটগানের উপস্থাপনে। ফলে ১৬৪৬ খ্রিস্টাব্দের ম্যাজিক লণ্ঠন যদি চলচ্চিত্র উদ্ভাবন ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হয়,পটগান হবে না কেনো?
এই অঞ্চলের আরেকটি বিষয় হলো ‘বায়োস্কোপ’।সাধারণত বায়োস্কোপ বলতে আমরা চলচ্চিত্রকে বুঝি। কিন্তু এই বায়োস্কোপ মোটেও সেই বায়োস্কোপ নয়।গ্রামে-গঞ্জের মানুষেরা একে অনেকে ‘চোখবাজি’ বলেও ডাকে। পটগানেরই একটু কৌশলী সংস্করণ এটি। এডিসনের কিনোটোস্কোপে যেমন প্রক্ষেপণ ব্যবস্থা ছিলো না, যন্ত্রের ফুটোয় চোখ গুঁজে চলচ্চিত্র দেখতে হতো,ঠিক একইভাবে বাক্সের ফুটোয় চোখ গুঁজে চিত্র দেখার ভারতিয় এই পদ্ধতির নাম ছিলো বায়োস্কোপ;পার্থক্য শুধু একটাই,কিনোটোস্কোপের ছবি ছিলো চলমান আর আমাদের বায়োস্কোপের ছবি স্থির।
বায়োস্কোপে পটেরগানের মতোই দুই
পাশে দণ্ড ঘুরিয়ে ধারাবাহিক ছবি এপাশ থেকে ওপাশে নেওয়া হতো। এবং একজন কথক ‘প্রেমঝুরি’ বাজিয়ে
বর্ণনা করতো এভাবে,‘হাই চমৎকার দেখা গেলো,মতি মিয়ার বাড়ি
এলো’; বাক্সের
ভিতরের ছবিতে তখন মতি মিয়ার বাড়ি দেখা যেতো। তারপর কথক সুরে সুরে বলতো,‘মতি মিয়ার
ছেলে এবার ঘোড়াতে উঠিলো’,বাক্সের ছবিতে তখন একটি ছেলের ঘোড়ায়
চড়া দেখানো হতো। হাতে আঁকা এই ছবি ও সঙ্গীতের বর্ণনের মধ্যে দিয়ে বিভিন্ন ধরনের
লোককাহিনী বায়োস্কোপে দেখানো হতো। মূলত প্রকৃত চলচ্চিত্রের বিকল্প হিসেবে বাংলাদেশ
ও ভারতের বিভিন্ন এলাকায় ‘চোখবাজি’ চালু ছিলো।
ঠিক কোন্ সময়কাল থেকে চোখবাজি বা বায়োস্কোপের প্রচলন এই অঞ্চলে তা জানা যায়নি।
তবে এর উপস্থাপনের ধরনের মধ্যে প্রাচীনতার একটা ধাঁচ আছে। যাক সে কথা,এই চোখবাজি
কিংবা বায়োস্কোপ নিয়েও কিন্তু চলচ্চিত্রের ইতিহাসের কোথাও কোনো কথা বলা নেই। তাহলে
কি ভেবে নেবো,এর কারণ কেবলই নিম্নবর্গের মানুষের মাধ্যম হওয়া?
এর বাইরেও এখানে একটি কথা না বললেই নয়,১৯ শতকের শুরুতে জাপানে চলচ্চিত্রের নির্বাক যুগে বেনসি১৮ (benshi)বলে কিছু লোক কাজ করতো। এদের কাজ ছিলো অনেকটা সূত্রধরের মতো। কোনো চলচ্চিত্র শুরুর আগে তারা সেই কাহিনী দর্শকদের বর্ণনা করতো। এমনকি চলচ্চিত্র চলাকালীন ধারাবিবরণীও দিতো তারা। চলচ্চিত্রে আকাশ দেখানো হলে তারা বলতো, ‘এখন আপনারা আকাশ দেখছেন’। নির্বাক যুগে জাপানে এই বেনসিদের প্রভাব ছিলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাহলে দেখুন ১৯ শতকে জাপানে নির্বাক চলচ্চিত্র প্রদর্শনের জন্য যখন বেনসি লাগছে,সেই কাজ পটগান-এ পটুয়ারা করতো পঞ্চম শতকে,অর্থাৎ প্রায় ১৪শ বছর আগে। পটের চিত্র দর্শকদের দেখানোর সঙ্গে সঙ্গে পটুয়ারা তার বর্ণনা ও প্রয়োজনে সঙ্গীত সহযোগে তা উপস্থাপন করতো। জাপানের চলচ্চিত্র ইতিহাসে বেনসিদের কথা উল্লেখ থাকলেও ভারতিয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে পটুয়া কিংবা পটগানের সেই কথকের কথা কিন্তু উল্লেখ নেই।
৬.
বলা হয় ‘চলচ্চিত্রের কারিগরি ইতিহাসে আন্তর্জাতিক মানের কোনো অবদান নেই ভারতের। ভারতীয় চলচ্চিত্রের পথিকৃৎরা সকলেই বিদেশি যন্ত্র নিয়েই ‘আমাদের ফিল্ম’ তৈরি করেছেন।’১৯ কিন্তু মনে রাখতে হবে,চলচ্চিত্রের এই যে উদ্ভব-ইতিহাস,সেটার আদিকল্প উচ্চবর্গীয়। ১৭৬৫ সালের পর থেকে ভারতের যে সাধারণ ইতিহাস লেখা হয়েছে,সেখানে ছিলো কেবলই শাসকেরা। কারণ,শোষণের জন্য রণজিৎ গুহর ভাষায়,‘বিজেতাকে তখন ইতিহাসচেতনা ব্যবহার করতে হয় প্রভু সংস্কৃতির একটি প্রধান উপাদান হিসেবে।’ আর তাই তাত্ত্বিকভাবে পরাজিতদের কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ তখন আর সেখানে স্থান পায় না। কারণ, ইতিহাসবিদরা তখন ব্যস্ত থাকেন কেবল প্রভু সংস্কৃতির প্রয়োজন মেটাতেই।
আমি ঠিক জানি না, ক্ষুদ্র এই আলোচনা চলচ্চিত্রের পাশ্চাত্য ইতিহাসের মোটা দেয়ালে সামান্য কোনো অনুরণন সৃষ্টি করতে পারবে কি না? তবে এ কথা ঠিক,চলচ্চিত্রের ইতিহাসে পটগান সংযুক্ত না থাকলে এই ইতিহাস মোটেও পূর্ণতা পাবে না। চলচ্চিত্র ও পটগান নিয়ে এই আলোচনা মূলত বড়ো পরিসরে কোনো আলোচনার ভূমিকা;আশা রাখছি অচিরেই এ নিয়ে আরো বিস্তারিত তথ্য নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির থাকবো।
লেখক : কাজী মামুন হায়দার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়ান।
kmhaiderru@yahoo.com
তথ্যসূত্র
১. মামুন,নাসির আলী (২০১৩:৫৬);আহমদ ছফার সময়;শ্রাবণ প্রকাশনী,১৩২,আজিজ সুপার মার্কেট,শাহবাগ,ঢাকা-১০০০।
২. খান,কলিম (১৪০৬ বঙ্গাব্দ:১২০); ‘প্রাগাধুনিকতা আধুনিকতা ও অধুনান্তিকতা’;দিশা থেকে বিদিশায়;হাওয়া ঊণপঞ্চাশ প্রকাশনী,কলকাতা।
৩. ঘোষ,সিদ্ধার্থ (১৯৯৬:১২৪); ‘চলচ্চিত্র উদ্ভাবনের বৈজ্ঞানিক ও ঐতিহাসিক পটভূমি’;শতবর্ষে চলচ্চিত্র ১;সম্পাদনা-নির্মাল্য আচার্য ও দিব্যেন্দু পালিত;আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড,কলকাতা ৯।
৪. ভদ্র, গৌতম; ‘আদিকল্পের রূপান্তর : নৃবিজ্ঞান ও ইতিহাসের শাস্ত্রীয় পরম্পরা'; যোগাযোগ; সম্পাদনা-ফাহমিদুল হক;সংখ্যা-৭,ফেব্রুয়ারি-২০০৫,পৃষ্ঠা : ১৮৭-১৮৮, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়,রাজশাহী।
৫. গুহ,রণজিৎ (২০০৪:২৩);‘নিম্নবর্গের ইতিহাস’;নিম্নবর্গের ইতিহাস;সম্পাদনা-গৌতম ভদ্র ও পার্থ চট্টোপাধ্যায়;আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড,কলকাতা ৯।
৬. প্রাগুক্ত;গুহ,রণজিৎ (২০০৪:২৩-২৪)।
৭. দত্ত,গুরুসদয় (২০০৮:৭);‘পটুয়া সঙ্গীত’;বাংলার লোকশিল্প ও লোকনৃত্য;ছাতিম বুক্স্,৭ডি,৯১-এ পার্ক স্ট্রিট,কলকাতা ১৬।
৮. ঘোষ,ড.প্রদ্যোত (২০০৪:৭৩);বাংলার লোকশিল্প;পুস্তক বিতান,২৭,বেনিয়াটোলা লেন,কলকাতা ২৩।
৯. প্রাগুক্ত;ঘোষ,ড.প্রদ্যোত (২০০৪:৭৩)।
১০. প্রাগুক্ত;দত্ত,গুরুসদয় (২০০৮:৫-৬)।
১১. চৌধুরী,ড.দুলাল (২০০৪:৩৭২);বাংলার লোকসংস্কৃতির বিশ্বকোষ;সম্পাদনা-ড. দুলাল চৌধুরী; পুস্তক বিতান,২৭,বেনিয়াটোলা লেন,কলকাতা ২৩।
১২. প্রাগুক্ত;ঘোষ,ড.প্রদ্যোত (২০০৪:৬৭)।
১৩. প্রাগুক্ত;দত্ত,গুরুসদয় ( ২০০৮:৬)।
১৪. রায়,সত্যজিৎ (২০০২:৪৭); ‘চলচ্চিত্র-রচনা : আঙ্গিক,ভাষা ও ভঙ্গি’; বিষয় চলচ্চিত্র; আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড,কলকাতা ৯।
১৫. এই আলোচনার জন্য সাহায্য নেওয়া হয়েছে-ঘোষ,মৃনাল (১৯৯৬);‘চলচ্চিত্র ও চিত্রকলা : চিত্রকল্পের উজ্জীবন';শতবর্ষে চলচ্চিত্র ১; সম্পাদনা-নির্মাল্য আচার্য ও দিব্যেন্দু পালিত; আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড,কলকাতা ৯।
১৬. প্রাগুক্ত; রায়,সত্যজিৎ (২০০২:৪৭)।
১৭. ঘোষ, মৃনাল (১৯৯৬:১৭৭); ‘চলচ্চিত্র ও চিত্রকলা : চিত্রকল্পের উজ্জীবন’;শতবর্ষে চলচ্চিত্র ১;সম্পাদনা-নির্মাল্য আচার্য ও দিব্যেন্দু পালিত;আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড,কলকাতা ৯।
১৮. বসু, সৈকত (২০০৯:২৭৬); ‘জাপানের চলচ্চিত্র’; শতবর্ষে চলচ্চিত্র ২; সম্পাদনা-নির্মাল্য আচার্য ও দিব্যেন্দু পালিত; আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা ৯।
১৯. প্রাগুক্ত; ঘোষ, সিদ্ধার্থ (১৯৯৬:১৩১)।
বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৩ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের ৫ম সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন