Magic Lanthon

               

কাজী মামুন হায়দার

প্রকাশিত ০৮ ডিসেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

সরকারি অনুদানের চলচ্চিত্র

স্বপ্নভঙ্গের জীবন্মৃত দীর্ঘ উপাখ্যান

কাজী মামুন হায়দার


ঘটনাটা হয়তো অনেকেরই জানা, তারপরও নতুন করে অবতারণার চেষ্টা। সত্যজিৎ ততোদিনে পথের পাঁচালীর শুটিং অনেকখানি শেষ করে ফেলেছেন। নিজের জমানো কিছু টাকা, ইন্স্যুরেন্স ও অন্যান্য জায়গা থেকে সংগৃহীত অর্থের সাহায্যে বাকি শুটিং চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন; আর আশায় বুক বাঁধছেন, নিশ্চয় একজন ভালো পরিবেশক (ডিস্ট্রিবিউটর) পাবেন। সেই আশায় যাচ্ছেনও অনেক পরিবেশকের কাছে। প্রথমে পরিবেশকদের অনেকে আগ্রহ প্রকাশ করলেও, গল্প-চিত্রনাট্য শুনে পিছিয়ে যাচ্ছেন। অনেকেই বলছেন-ছোট, নবিশ ছেলেকে দিয়ে কি কমার্শিয়াল গল্প হয়? অনেকে বললেন, পথের পাঁচালী আবার সিনেমা হওয়ার মতো গল্প নাকি! প্রেম নেই, গান নেই-ওসব ব্যাঙ, ঘুঘুর ডাক, পাখির কিচিরমিচির নিয়ে কী আর সিনেমা হয় ভাই-ইত্যাদি ইত্যাদি। এভাবে বিভিন্ন পরিবেশকের দরজা থেকে বিমুখ হয়ে ফিরে আসছিলেন পরবর্তীর স্বনামধন্য চলচ্চিত্রনির্মাতা সত্যজিৎ রায়।

দিন যায়, পরিবেশক আর জোটে না। এ-দিকে তোলা ফিল্ম বাক্সবন্দি হয়ে পড়ে আছে। এভাবে বেশিদিন থাকলে নেগেটিভ নষ্ট হয়ে যাবে; জ্বলেও যেতে পারে। অন্যদিকে চুনীবালা দেবীরও বয়স হয়েছে, সেদিক দিয়েও আশঙ্কার কারণ রয়েছে, যদি খারাপ কিছু হয়ে যায়। সব মিলিয়ে সত্যিই অনেকখানি মুষড়ে পড়েন সত্যজিৎবাবু। ঠিক এমন একটা সময় নিরুপায় সত্যজিতের পাশে দাঁড়ায় পশ্চিমবঙ্গ সরকার। পশ্চিমবঙ্গ সরকার যে-একেবারে স্বপ্রণোদিত হয়ে এমনটি করেছে তা বলা বোধ হয় ঠিক হবে না। এ-ক্ষেত্রে হয়তো সত্যজিতের পারিবারিক ঐতিহ্য কিছুটা ভূমিকা রেখেছিলো। কিন্তু তারপরও যেটি গুরুত্বপূর্ণ, সেটি হলো পশ্চিমবঙ্গ সরকার শেষ পর্যন্ত টাকা দিয়েছিলো, তা না হলে হয়তো পথের পাঁচালী তৈরিই হতো না।

এরপর শুটিং পুরোদমে শুরু হলো। সমস্যার এখানেই শেষ হলে ভালো হতো। কিন্তু রাজ্য সরকারের ঠিক কোন্ দপ্তরের অধীনে এই বিষয়টি থাকবে, তাই নিয়ে মহাকরণে শুরু হলো তুমুল বিরোধ। রোজই তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ডা. বিধান রায়ের কাছে বিভিন্ন বিভাগীয় সেক্রেটারিরা ধর্না ও তদ্বির চালাতে লাগলেন। শিক্ষা দপ্তরের প্রবল দাবি, ছবি তাদের খবরদারিতে হতে হবে; প্রচার বিভাগেরও একই অবস্থা। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো রাজ্য সরকারের পিডব্লিউডি (এই বিভাগটি সাধারণত রাস্তা নির্মাণের কাজ করতো) দাবি করলো, সিনেমার নাম যখন পথের পাঁচালী তখন এটা তাদের আওতায় থাকবে।

সব শেষে কমিউনিটি ডেভলপমেন্ট ডিপার্টমেন্ট দাবি তুললো-এসব তদ্বির তদারকের ভার তাদের ডিপার্টমেন্টকেই দেওয়া হোক। তারা আরও বললো, পথের পাঁচালী সিনেমার সঙ্গে আরও খানিকটা এক্সট্রা রিল দেখাতে হবে। কারণ দর্শককে বোঝাতে হবে পথের পাঁচালী সিনেমায় গ্রামবাংলার যে-দৃশ্য দেখানো হয়েছে সেটি আগের অবস্থা। এখন স্বাধীনতার পর বঙ্গদেশ সুজলা-সুফলা হয়েছে। এ-ধরনের নানা রসিকতার মধ্য দিয়ে পেরিয়ে আসতে হয়েছে পথের পাঁচালীকে। শেষ পর্যন্ত শুভদিন আসে ১৯৫৫ সালের ২৬ আগস্ট, শুক্রবার-একযোগে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় পথের পাঁচালী। এর পরের ইতিহাসটা সবার জানা।

পথের পাঁচালী আর সত্যজিতের এই পুরনো কাসুন্দি ঘাটলাম কয়েকটি বিষয় নিয়ে একটু কথা বলার জন্য। প্রথমত, নামহীন, যশহীন কোনো তরুণ পরিচালককে সিনেমা নির্মাণের জন্য কতো ভোগান্তির মধ্য দিয়ে যেতে হয় তা বলা। দ্বিতীয়ত, সরকার চাইলে সিনেমা-পাগল এই তরুণদের পাশে দাঁড়াতে পারে-সেটা জানান দেওয়া। তৃতীয়ত, সরকারের যে-বিভাগগুলো এ-নিয়ে কাজ করে, তারা এসব বিষয়ে কতোখানি অজ্ঞ! এবং শেষতক যেটি, সেটি হলো-সরকারের ভাবমূর্তি এতোটুকু ক্ষুণ্ণ হবে-এমন আশঙ্কা থাকলে সরকার সেখানে নাক গলাবেই এটা বলা।

সত্য বলতে কী ১৯৫৫ সালে সরকারের সঙ্গে একটি চলচ্চিত্র নিয়ে লেনদেনে সত্যজিৎকে যে-সমস্যার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, আজ একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকেও এ-সব বিষয়ের নেতিবাচক দিকগুলো নিয়ে একজন পরিচালককে ওই বিষয়গুলোরই মুখোমুখি হতে হয়। তবে এর মধ্যেও যে-বিষয়টি লক্ষ্য করার মতো তা-হলো, বিভিন্ন সঙ্কটে বিশ্বের নানা দেশে সরকার কখনও কখনও চলচ্চিত্রের পাশে থেকেছে, আবার কখনও কখনও বৈরী আচরণ করেছে। বিপ্লব-পরবর্তী সোভিয়েত রাশিয়া, বিপ্লব-পূর্ব ইরান, লাতিন আমেরিকার ব্রাজিল ও কিউবা, তুরস্ক, শ্রীলংকা, ভারত এর বড়ো উদাহরণ। ১৯১৭ সালের বিপ্লবের দুই বছরের মাথায় মহামতি লেনিন ডিক্রি জারি করে চলচ্চিত্রকে জাতীয়করণ করেন। একই সঙ্গে চলচ্চিত্রের প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নে সচেতন হয় সোভিয়েত সরকার। ইসলামি বিপ্লব-পূর্ব ইরানের কথাই ধরুন, কী নগ্নভাবে সরকার চলচ্চিত্রকে ধ্বংসের চেষ্টা করেছে, নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে। বিপরীতভাবে বিপ্লবের পর সরকার প্রথমে কয়েক বছর কড়া নিয়ম করলেও পরে তাদের উদ্যোগেই তৈরি হতে থাকে ইরানের নতুন জাতীয় চলচ্চিত্র। সরকার নিজ উদ্যোগে নির্মাণ করে ৫০০টি প্রেক্ষাগৃহ, আয়োজন করা হয় একের পর এক আন্তর্জাতিক সব চলচ্চিত্র উৎসবের। প্রায় একই ধরনের অবস্থা আমরা দেখি কিউবাতেও। 

ভারতে ১০ বছর আগেও অনেক রাজ্যে প্রেক্ষাগৃহে টিকিটের ওপর বিনোদন কর ছিল ১৫০ শতাংশ। চলচ্চিত্রকে সে-সময় ভাবা হতো অভিজাতদের চিত্তবিনোদনের মাধ্যম, এটা ছিলো ব্রিটিশ আইন। ১৯১৮ সালের পুরনো লাইসেন্স দেওয়ার আইনে নতুন প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণ ছিলো অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও কষ্টসাধ্য ব্যাপার। ২০০১ সালে ভারতে চলচ্চিত্র সংক্রান্ত সবকিছুই প্রায় বদলে যায়। সরকারি সব নীতিমালা সহজ করা হয়। নতুন মাল্টিপ্লেক্স নির্মাণের ক্ষেত্রে পাঁচ বছরের কর অবকাশ ঘোষণা করা হয়। টিকিটের ওপর কর রাজ্যভেদে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। এর ফলে কয়েক বছরের মধ্যে চলচ্চিত্রের নাটকীয় পরিবর্তন ঘটতে থাকে। শ্রীলংকাতেও নতুন প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণের জন্য ১০ বছর কর মওকুফ করা হয়। ১৯৮৪ থেকে নামতে নামতে ১৯৮৯ সালে সিংহলি চলচ্চিত্র নির্মাণের সংখ্যা বছরে যখন ১১টিতে নেমে আসে, ঠিক সেই সময় সরকার এর পাশে দাঁড়ায়। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি রানাসিংহে প্রেমদাসের উদ্যোগে চলচ্চিত্র নির্মাণে আর্থিক অনুদানের পাশাপাশি একে এগিয়ে নেওয়ার জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা করা হয়। একই ধরনের অবস্থা নেপালেও। চলচ্চিত্রের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে সরকারের সহযোগিতার এ-রকম উদাহরণ অনেক। তার মানে একটু সচেতন হলেই চলচ্চিত্র ও সরকার সমান্তরালে উন্নতির দিকে এগিয়ে যেতে পারে।

 

২.

এ-তো গেলো চলচ্চিত্র নিয়ে সরকারের ভূমিকার সার্বিক চিত্র। এখন একটু নির্দিষ্ট এলাকায় আসা যাক। চলচ্চিত্র উন্নয়নের জন্য সরকার নিয়মিতভাবে যে-কাজটি গুরুত্ব সহকারে করে তাহলো প্রতি বছর তারা কিছু চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য অনুদান দেয়। যেটা আমরা শুরুতেই সত্যজিতের চলচ্চিত্রের বেলায় দেখলাম। যদিও ১৯৫৪-৫৫ তে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অনুদান নিয়ে এই ভূমিকা খুব পরিকল্পিত ছিলো না। কারণ, কেন্দ্রীয়ভাবে ভারত সরকার চলচ্চিত্রে অর্থ সাহায্য দেওয়ার জন্য ফিল্ম ফাইন্যান্স করপোরেশন (এফএফসি) নামে যে-প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলে তা প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৬০ সালে। পরে অবশ্য ১৯৮০ সালের ১১ এপ্রিল থেকে এফএফসি পরিবর্তন হয়ে নাম হয় ন্যাশনাল ফিল্ম ডেভলপমেন্ট করপোরেশন (এনএফডিসি)। মূলত এফএফসি ও এনএফডিসি শুরু থেকেই ভারতের নানান আঞ্চলিক ভাষার যে-সব প্রযোজক-পরিচালকেরা জীবন-নির্ভর ভালো ছবি করতে চেয়েছেন, তাদের আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। এছাড়া বাণিজ্য করার জন্যও যারা একটু ভালো ছবি করতে চেয়েছেন, তারাও এই সংস্থার কাছে আর্থিক সহায়তার জন্য এসেছেন।

একইভাবে শ্রীলংকায় ১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় ন্যাশনাল ফিল্ম ডেভলপমেন্ট ফান্ড। তৎকালীন তথ্য-সংস্কৃতিমন্ত্রী টি ফার্নান্ডোর উদ্যোগে এই ফান্ডে পুঁজি রাখা হয় দেড় কোটি টাকা। তিনটি প্রধান উদ্দেশ্য সামনে রেখে কাজ শুরু করে এই প্রতিষ্ঠান-প্রথমত, উৎকৃষ্ট সিনেমা-নির্মাণে আর্থিক সহায়তা; দ্বিতীয়ত, প্রেক্ষাগৃহগুলোর আধুনিকায়ন; তৃতীয়ত, কলাকুশলীদের অগ্রসর কারিগরিবিদ্যা লাভে সহায়তা করা। প্রতি ক্ষেত্রেই ঋণের বার্ষিক সুদের হার ঘোষণা করা হয় মাত্র পাঁচ শতাংশ। এই দৃঢ় পদক্ষেপের সুফল পেতে খুব বেশিদিন দেরি করতে হয়নি শ্রীলংকার চলচ্চিত্রকে। বন্ধ প্রেক্ষাগৃহগুলো খুলতে শুরু করে, দু-একটি অত্যাধুনিক প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণের কাজ শুরু হয়। ২৫টি নতুন সিনেমা যেমন মুক্তি পায়, তেমনি বাক্সবন্দি থাকা প্রায় ১০০টি সিনেমা মুক্তির ব্যবস্থা করা হয়।

ব্রিটেনেও পরিচালকদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার জন্য ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় ন্যাশনাল ফিল্ম ফাইন্যান্স করপোরেশন (এনএফএফসি)। এই প্রতিষ্ঠানটি সিনেমাটোগ্রাফ ফিল্ম প্রডাকশন স্পেশাল লোন অ্যাক্ট ১৯৪৯ এর আওতায় প্রতিষ্ঠা হয়। টানা ২০ বছর এনএফএফসি ব্যবস্থাপকের দায়িত্বে ছিলেন স্যার জন টেরি (১৯৫৮-১৯৭৮)। তার বয়ানে এই প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা ছিলো এমন-এই কয়েক বছরে আমরা শত শত পরিচালককে চলচ্চিত্র নির্মাণে আর্থিকভাবে সহায়তা করেছি। এদের মধ্যে তরুণরা যেমন ছিলো, ছিলো রিডলে স্কট ও ডেভিড প্যুটন্যামের মতো বিখ্যাত পরিচালকরা। ১৯৮৫ সালে এসে অজানা কারণে আইন করে সরকার এই প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে দেয়।

অনুদান নিয়ে ভিন্ন চিত্রও আছে। আগেই বলেছিলাম তুরস্কের কথা,৯০র দশকে সেখানে চলছিলো সামরিক জুন্তা সরকারের শাসন। সরকারি নীতির একটু বাইরে গেলেই তখন নির্মাতাদের ওপর চলতো নিপীড়ন-নির্যাতন। এমনকি সিনেমার নেগেটিভ পুড়িয়ে ফেলার মতো ঘটনাও ঘটেছে। এক পর্যায়ে চলচ্চিত্রকাররা বাধ্য হয়ে একেবারে সরল চলচ্চিত্র করতে থাকেন, আবার কেউ হাত গুটিয়ে বসে থেকেছেন। ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত তিন বছর ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম গাইডে তুরস্কের চলচ্চিত্র নিয়ে কিছুই প্রকাশ হয়নি। তবে ১৯৮৬ তে অন্য একটি কাজ হয়; চলচ্চিত্রকর্মীরা সিনেমা, ভিডিও ও সঙ্গীত নিয়ে যে-আইনটি সংসদে পাশ করার জন্য দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছিলো সেটি জুন্তা সরকার পাস করে। আইনে চলচ্চিত্র নির্মাণে সরকারি সহায়তা ও যৌথ প্রযোজনার ব্যাপারটিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু শর্ত দেওয়া হয়-সেই সব চলচ্চিত্র এই অনুদানের আওতায় আসবে যেগুলো জাতীয় সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ এর অনুসারী। ফলে স্বৈরাচারী জুন্তাবিরোধী পরিচালকদের সুযোগই থাকে না সরকারি অনুদান পাবার। চলচ্চিত্রের গুণগত মান নয়, জুন্তাকে সমর্থন দেওয়াই মুখ্য হয়ে ওঠে অনুদান পাওয়া-এইসব ছবির কাজ। তার মানে চলচ্চিত্রের অনুদান নিয়ে দুই রকম উদাহরণই আছে বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে।   

 

৩.

১৯৫৭ সালের ৩ এপ্রিল তৎকালীন প্রাদেশিক আইন পরিষদের শেষ অধিবেশনের দিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তান চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা নামে একটি বিল উত্থাপন করেন। সামান্য সংশোধনীর পর বিলটি বিনা বাধায় আইন পরিষদে পাস হয়। বিলটি পাস হওয়ার এক বছরের মাথায় ১৯৫৮ সালে প্রতিষ্ঠা হয় পূর্ব পাকিস্তান চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা বা ইপিএফডিসি। দৃশ্যত স্বাধীনতার আগে চলচ্চিত্র নিয়ে এটি ছিলো আমাদের সবচেয়ে বড়ো উদ্যোগ। আমাদের স্বপ্নের এফডিসি। এরপর দীর্ঘ চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে ইপিএফডিসি হলো বিএফডিসি। নতুন দেশ, নতুন স্বপ্ন-একটা এগিয়ে চলা। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে চলচ্চিত্রের অন্যতম উপকরণ হয়ে উঠলো মুক্তিযুদ্ধ। সংস্কৃতি কারখানার নির্দিষ্ট মান-প্রমিতকরণ, ছদ্মপ্রাতিস্বিকীকরণের মাধ্যমে নির্মাণ হলো অনেকগুলো ছবি। কিন্তু চলচ্চিত্র কেনো যেনো পাঁচ-ছয় বছরে তেমন কিছু করতে পারছিলো না। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অ্যান্টি-ডিসকোর্সের দু-একটি সিনেমা নিয়ে আলোচনা হলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারেনি।

এর মধ্যে ৭৫-এ ঘটে গেলো একটি বড়ো ধরনের বিপর্যয়। সারা দেশ, দেশের মানুষ তখন টালমাটাল। এ-রকম অবস্থায় ১৯৭৬ এর অক্টোবরে পত্র-পত্রিকায় একটি বিজ্ঞাপন আসলো সরকারের পক্ষ থেকে চলচ্চিত্র তৈরির জন্য অনুদান দেওয়া হবে, আগ্রহীদের দরখাস্ত ও ছবির স্ক্রিপ্ট আহ্বান করা হলো। সরকারি নীতিমালায় বলা হলো,প্রতি বছর চার জন চিত্র নির্মাতাকে আড়াই লাখ টাকা অনুদান দেওয়া হবে এবং প্রদত্ত অর্থ কখনই ফেরত দিতে হবে না। যে চারজনকে অনুদান দেওয়া হবে, তারা নির্বাচিত হবেন সরকারি কর্মকর্তা এবং অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বিচারকমণ্ডলী বা জুরী বোর্ডের মাধ্যমে।

সরকারি অনুদান চালুর ঘোষণাকে সে-সময় বিভিন্ন মহল থেকে স্বাগত জানানো হয়। কারণ চলচ্চিত্রনির্মাতা, তরুণ পরিচালক, কলাকুশলী ও চলচ্চিত্র সংসদকর্মীরা অনুদান পদ্ধতি চালু করার জন্য দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছিলেন। ১৯৭৬-৭৭ অর্থবছরে অনুদান কমিটির জুরি বোর্ড চারজন নির্মাতাকে অনুদান দেওয়ার জন্য সুপারিশ করে। অনুদান পাওয়া এই চার পরিচালক ও ছবিগুলো হলো-মহিসউদ্দিন শাকের ও শেখ নিয়ামত আলীর সূর্য দীঘল বাড়ি, বাদল রহমানের এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী, কবীর আনোয়ারের তোলপাড় এবং বেবি ইসলামের মেহেরজান

এরপর নির্মাণ কাজ শুরু হয় সূর্য দীঘল বাড়ি (সাদা-কালো) ও এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী (রঙিন) এর। চলচ্চিত্র দুটি যথাক্রমে মুক্তিও পায় ১৯৭৯ ও ১৯৮০ সালে। বাকি দুটোর মধ্যে বেবী ইসলামের মেহেরজান-এর কাজ অনুদানের টাকায় সঙ্কুলান না হওয়ায় অর্থাভাবে বন্ধ হয়ে যায়। আর তোলপাড় নিয়ে সঙ্কট দেখা দেয়। তার মানে অনুদানের অর্থ সঙ্কুলান না হওয়ায় চলচ্চিত্রের কাজ বন্ধ হওয়া এবং অনুদান নিয়ে চলচ্চিত্র জমা না দেওয়ার মতো ঘটনা অনুদান-ইতিহাস এর শুরু থেকেই ছিলো। যাক এ-নিয়ে বিস্তারিত কথা পরে বলা হবে। প্রথম সরকারি অনুদানের মুক্তি পাওয়া ছবি দুটি সে-সময় ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয় এবং একাধিক জাতীয় পুরস্কারও লাভ করে। আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়, এই দুটি ছবির পরিচালকরা ছিলেন একেবারেই নতুন এবং এটি ছিলো তাদের জীবনের প্রথম ছবি।

অনুদানের এই চলচ্চিত্রগুলো লক্ষ্য পূরণে বেশ সফলতা অর্জন করলেও সরকার এ-নিয়ে আর এগোয়নি। ফলে ১৯৭৭ সালের পরের দুই বছর আর সরকারি অনুদান দেওয়া হয়নি। সরকারি ঘোষণায় এর কারণ হিসেবে বলা হয়, অনুদান প্রদানের নীতিমালা ও পদ্ধতি লক্ষ্য অর্জনে সন্তোষজনক বলে বিবেচিত হয়নি। তাই অনুদানের নীতিমালা সংশোধন করা হয়। ১৯৭৯-তে এসে সরকার তাই অনুদানের নীতিমালা সংশোধন করে। সংশোধিত নীতিমালা ও পদ্ধতি অনুযায়ী, তখন জাতীয় ঐতিহ্য ও আদর্শ বাস্তবায়নে অনুপ্রেরণাদায়ক মানবিক মূল্যবোধের উপর ভিত্তি করে নির্মিত মৌলিক ও পূর্ণদৈর্ঘ্য সমাপ্ত সিনেমার ভিতর থেকে প্রতি বছর অনধিক তিনটি ছবিকে সরকারি অনুদান দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। আগের নীতিমালা ও পদ্ধতি অনুযায়ী কেবল চিত্রনাট্য বিচারের ভিত্তিতে নির্মিতব্য চলচ্চিত্রকে অনুদান দেওয়ার বিধান ছিলো। কিন্তু সেই নীতিমালায় সরকার প্রদত্ত অনুদানের সদ্ব্যবহার নিশ্চিত ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রযোজকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের উপযুক্ত কোনো বিধান না থাকায় তা লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করা হয়। তাই তারা কোনো রকম ঝুঁকি না নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্রের ওপর অনুদান দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

সংশোধিত নীতিমালায় বলা হয়, অনুদান নীতির সময়কাল হবে ক্যালেন্ডার বছর অর্থাৎ ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর। নির্দিষ্ট ক্যালেন্ডার বছরে সেন্সর সার্টিফিকেট পাওয়া সব সিনেমা অনুদান পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হবে। এই আইনের ফলে একটা বড়ো ধরনের সমস্যা হলো-তরুণ ও একেবারে নতুন, চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন করা নির্মাতাদের জন্য সিনেমা বানানোর সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়। কারণ, স্বপ্নবান এসব নির্মাতা সরকারি অনুদানের সুবাদে চলচ্চিত্র নির্মাণের কথা ভাবলেও তা থেকে সরে যায়। কারণ, আগেতো চলচ্চিত্র বানাতে হবে, তারপর অনুদান। তাহলে চলচ্চিত্র বানানোর টাকা তারা কোথায় পাবে? তবে অনুদানের অর্থ বাড়িয়ে আড়াই লাখ থেকে তিন লাখ করা হয়।

তবে পরের বছর অর্থাৎ ১৯৮০ সালে পুনরায় অনুদান নীতিমালা পরিবর্তন করে সরকার। এবার মূল যে-পরিবর্তনগুলো আনা হয় সেটা হলো : ক. কোনো অবস্থাতেই সমাপ্ত বা মুক্তি পাওয়া ছবি অনুদানের জন্য বিবেচিত হবে না। খ. নির্বাচিত পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের পাণ্ডুলিপির নির্মাণ কাজের ৩০-৪০ ভাগ চিত্রায়ণ শেষে অনুদান কমিটির সদস্যদের চিত্রায়িত সেই অংশ দেখানোর পর তা সন্তোষজনক বলে বিবেচিত হলে অনুদানের টাকার ২৫ শতাংশ দেওয়া হবে। এভাবে প্রযোজনার ক্রম অগ্রগতির সন্তুষ্টি বিচার সাপেক্ষে ভাগে ভাগে বাকি অর্থ দেওয়া হবে। এই নিয়মেও তরুণ-নতুন পরিচালকরা সমস্যায় পড়ে যায়।

নতুন নীতিমালায় ১৯৮১ সালে তিনটি চলচ্চিত্র অনুদান পায়। অধ্যাপক নূর-উল-আলমের স্বামী, (আড়াই লাখ টাকা) এ জে মিন্টুর বাঁধন হারা (আড়াই লাখ টাকা) ও শহিদুল হক খানের কলমীলতা (পাঁচ লাখ টাকা)। তিনটি চলচ্চিত্রই ঠিক সময় মুক্তি পায়। কলমীলতা ছাড়া বাকি দুটো সিনেমা নিয়ে চলচ্চিত্র-গবেষক চিন্ময় মুৎসুদ্দী সেই সময় মন্তব্য করেন এভাবে, ...বাঁধন হারাস্বামী দেখে বলতে দ্বিধা নেই যে, সরকারি অর্থের অপচয় করা হয়েছে। এই ছবি দুটিকে চলচ্চিত্র হিসেবে তৃতীয় শ্রেণীরভূক্ত করা ছাড়া কোনো উপায় নেই।তার মানে দাঁড়ায় অনুদানের লক্ষ্য অর্জনে দুটি চলচ্চিত্র পুরোপুরি ব্যর্থ হয়।

এক বছর বিরতি দিয়ে ১৯৮৩ সালে অনুদান দেওয়া হয় আটটি চলচ্চিত্রকে। নীতিমালার তোয়াক্কা না করে চারটি নির্মাণাধীন চলচ্চিত্রকে দেওয়া হয় চার লাখ টাকা করে। সম্পূর্ণ নির্মিত হিসেবে দুই লাখ টাকা করে অনুদান পায় প্রথমবার অনুদান পাওয়া কবির আনোয়ারের তোলপাড় ও ১৯৮২ সালে মুক্তি পাওয়া আলমগীর কবিরের রঙিন চলচ্চিত্র মোহনা। এছাড়া উজ্জল ফিল্মস এর ব্যানারে নির্মীয়মান উদয়তারা ও চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত ফুলমতী নামের দুটি চলচ্চিত্র আড়াই লাখ করে অনুদান পায়। অনুদানের অর্থ ১৯৮২-৮৩ অর্থবছরে পরিশোধও করা হয়।

নীতিমালার তোয়াক্কা না করে সরকারি অনুদান দেওয়ার এই প্রক্রিয়া দেখে বুঝতে অসুবিধা হয় না, সরকার তার সুবিধা মতো মান বিচার না করেই চলচ্চিত্র নির্বাচন করেছে। দ্বিতীয়ত, অনুদান দেওয়ার সময় চলচ্চিত্রের সম্ভাব্য বাজেট বিচার-বিশ্লেষণ করা হয়নি। ফলে অনেক ছবিই পরের দিকে অর্থাভাবে মুক্তি পায়নি। বর্তমান সময়েও অনুদানের ছবির ক্ষেত্রে নির্ধারিত অর্থ নিয়ে নিয়মিত পরিচালকদের সমস্যায় পড়তে হয়। আমি ঠিক বুঝি না, পরিচালকরাই বা কী বাজেট দেন, আর জুরি বোর্ডই বা সে-বাজেট কীভাবে মূল্যায়ন করে-যাতে চলচ্চিত্র নির্মাণ অর্থাভাবে বন্ধ হয়ে যায়!

১৯৮৩ সালের আটটি ছবির মধ্যে ১৯৮৪-তে পেনসন ও ১৯৮৫-তে দহন মুক্তি পায়। অচেনা বন্দর, উদয়তারা, ডাক দিয়ে যাই, ফুলমতী নামের চলচ্চিত্রগুলো আর মুক্তি পায়নি। অর্থের অভাবে এসব চলচ্চিত্র মুক্তি পায়নি বলে জানা যায়। এসব সিনেমার মধ্যে দহন আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করে। আর কবির আনোয়ারের তোলপাড় বিভিন্ন জটিলতা এড়িয়ে দ্বিতীয়বার অনুদানের পাঁচ বছর পর ১৯৮৮ সালে শেষ পর্যন্ত মুক্তি পায়। ১৯৮৩ সালের পর থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত সরকারি অনুদান বন্ধ রাখা হয়। এই সময়ের মধ্যে সরকার এটা চালুর ব্যাপারে নানা প্রতিশ্রুতি দিলেও কাজের কাজ কিছুই হয় না। 

১৯৭৭-৮৩ পর্যন্ত অনুদানের ছবিগুলো পর্যালোচনা করলে কয়েকটি বিষয় খুব গুরুত্ব সহকারে উঠে আসে। প্রথমত, অনুদানের জন্য যে-অর্থ দেওয়া হয় তা দিয়ে রঙিনতো দূরের কথা, সেই সময় সাদাকালো সিনেমাও বানানো সম্ভব ছিলো না। এই সময়ে তিনবারে ১৫টি চলচ্চিত্রের জন্য সব মিলিয়ে বরাদ্দ করে ৪৫ লাখ টাকা। তার মানে গড়ে একটি সিনেমার ভাগে পড়ে মাত্র তিন লাখ। যে-কারণে এই সামান্য টাকায় চলচ্চিত্র বানাতে গিয়ে পরিচালকদের নাভিশ্বাস বের হয়ে গেছে। এরপরও যারা শেষ পর্যন্ত সিনেমা মুক্তি দিয়েছেন তারা নিজের অনেক কিছু উজাড় করে দিয়ে বানিয়েছেন। আর নিরুপায় বাকিরা চলচ্চিত্র মুক্তিই দিতে পারেননি।

দ্বিতীয়ত, অনুদান দেওয়ার ব্যাপারে অনেক ক্ষেত্রে সিনেমা নির্বাচনে যথাযথ বিচার করা হয়নি। ফলে মুক্তি পাওয়া অনেক চলচ্চিত্রের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তৃতীয়ত, এসব চলচ্চিত্র সেই অর্থে ব্যবসায়িক না হওয়ায় পরিবেশক, প্রযোজকদের ষড়যন্ত্রের শিকার হতে হয়। 

 

৪.   

আগেই বলেছি বাণিজ্য করার জন্যও যারা একটু ভালো ছবি করতে চেয়েছেন, তারাও ভারতের এফএফসি-এর আর্থিক সহায়তা পেয়েছেন। এ-হিসেবে প্রথম বাংলা বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র হিসেবে আর্থিক সহায়তা পায় সাত পাকে বাঁধা। ছবিটি ১৯৬৩ সালে রাষ্ট্রীয় প্রতিযোগিতায় সার্টিফিকেট অব মেরিট সম্মান লাভ করে। একই বছর মস্কো চলচ্চিত্র উৎসবে এই সিনেমার নায়িকা সুচিত্রা সেন শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর দুর্লভ সম্মান লাভ করে। কন্নড় ভাষায় অনুদান পাওয়া সন্ত তুকারাম চলচ্চিত্রটি ১৯৬৩-তে শ্রেষ্ঠ কন্নড় ছবির সম্মান পায়। মারাঠি ছবি ফকিরা একই বছর মহারাষ্ট্র রাজ্য প্রতিযোগিতায় ৬টি সার্টিফিকেট অব মেরিট লাভ করে। পাঞ্জাবি ভাষার সাটলেজ দে কান্ডে ১৯৬৪ সালের শ্রেষ্ঠ পাঞ্জাবি চলচ্চিত্র হয়। ১৯৬৫ সালে ওড়িয়া ছবি কা রাষ্ট্রীয় প্রতিযোগিতায় লাভ করে সার্টিফিকেট অব মেরিট। এই উদাহরণগুলো টানলাম এই কারণে যে, এফএফসি যেসব সিনেমায় আর্থিক সহায়তা দিয়েছে সবকিছুর ওপরে সেগুলোর মান নিয়ে অন্তত প্রশ্ন ওঠেনি। আর একটি বিষয় এখানে গুরুত্বপূর্ণ, এফএফসি/এনএফডিসি সবধরনের প্রযোজক-পরিচালকদের সাহায্য যোগানোর জন্য গড়ে তোলা হলেও ধীরে ধীরে তার ঝোঁক বা সহানুভূতি তৈরি হয় সামাজিক-প্রাসঙ্গিক ও নান্দনিক মূল্যের একটু সিরিয়াস সিনেমার দিকে। ফলে যারা একেবারে চটকদার বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র করতে এসেছেন তারা অর্থের জন্য বাজারের পেশাদার প্রযোজকদের দ্বারস্থ হওয়াকে নিরাপদ মনে করেছেন। আর বড়ো বাজেটের চলচ্চিত্রের জন্য অতো টাকাও এফএফসি/এনএফডিসি থেকে পাওয়া যেতো না।

১৯৬০ থেকে গত তিন দশকে এফএফসি/এনএফডিসি আংশিক ও পুরোপুরি টাকা জুগিয়ে বাস্তবদর্শী ও শিল্পগুণসম্পন্ন যে-সব চলচ্চিত্র তৈরিতে সাহায্য করেছে, মূলত সেই সব ছবিই গোড়ার দিকে ভারতিয় চলচ্চিত্রকে বিশ্ব-দরবারে সগৌরবে প্রতিষ্ঠিত করে। একটা বিষয় লক্ষণীয়, মোট খরচের আংশিক অর্থ জোগানোর পাশাপাশি গোড়া থেকে এফএফসি এবং ১৯৮০ সালের পর থেকে এনএফডিসি চলচ্চিত্র তৈরির পুরো খরচও বহন করে। পুরো খরচ করা এইসব চলচ্চিত্র হতো এনএফডিসি প্রযোজিত। পথের পাঁচালীর পর সত্যজিৎ এফএফসি-এর আর্থিক সহায়তায় প্রথম তৈরি করেন চারুলতা (১৯৬৫)। পরের বছর আংশিক আর্থিক সহায়তায় নায়ক (১৯৬৫) নির্মাণ করেন। এরপর ১৯৬৮-তে গুপী গাইন বাঘা বাইন ও ১৯৭৮-এ শতরঞ্জ কে খিলাড়ি নির্মাণ হয় এফএফসি-এর সহায়তায়। এছাড়া মৃণাল সেনের ভুবন সোম পদাতিক যথাক্রমে ১৯৬৯ ও ১৯৭৩ সালে এফএফসি-এর আর্থিক সহায়তায় নির্মাণ হয়। বিখ্যাত পরিচালকদের চলচ্চিত্র প্রযোজনা করার এই তালিকা আরও অনেক দীর্ঘ। দু-একটি দিয়ে আমি পরিস্থিতিটা বোঝানোর চেষ্টা করলাম। এখানে একটা ব্যাপার না বললেই নয়, দেখুন ভারতে একজন পরিচালক ছবির মানের ওপর আর্থিক অনুদান নিয়ে চার-পাঁচটি পর্যন্ত সিনেমা করেছেন। কিন্তু আমাদের দেশে এই সময়ে এসে অর্থাৎ সরকারি অনুদান নীতিমালা-২০১২ তে বলা আছে একই প্রযোজক/পরিচালককে দুইবারের বেশি অনুদান প্রদান করা হবে না। যদিও শুরুর দিকের নীতিমালায় এ-বিষয়টি  ছিলো না। এখন প্রশ্ন হলো, সৃজনশীল এই পরিচালকরা সরকারি অনুদান ছাড়া চলচ্চিত্র বানানোর এই টাকা কোথায় পাবেন? বাজারের এই যুগে ভালো ব্যবসা হবে না-এমন জানলে কোন্ পুঁজিপতি এসব পরিচালককে অর্থায়ন করতে আসবে?

যাক সেসব কথা; কথা হচ্ছিলো এনএফডিসি-এর কার্যক্রম নিয়ে। তাদের আরেকটি উল্লেখযোগ্য প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে দূরদর্শন-এর সঙ্গে যৌথভাবে চলচ্চিত্র প্রযোজনা করা। এর ফলে সীমিত টাকার চেয়ে একটু বেশি দিয়ে ভালো সিনেমার জন্ম সম্ভব হয়। এ-ক্ষেত্রেও দেশের প্রথম সারির গুণী পরিচালকরা ছিলেন। ১৯৮৮-তে যৌথ প্রযোজনায় তৈরি হয় মৃণাল সেনের একদিন আচানক, ১৯৯০-এ কুমার সাহানির কস্বা, মনি কাউলের নজর, শ্যাম বেনেগালের সুরজ কা সাতবাঁ ঘোড়া, চিদানন্দ দাশগুপ্তের আমোদিনী-এর মতো অনেক বিখ্যাত সিনেমা। আন্তর্জাতিক বাজারেও যৌথ প্রযোজনায় চলচ্চিত্র করেছে এনএফডিসি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য রিচার্ড অ্যাটেনবরোর গান্ধী। আন্তর্জাতিক বাজারে অত্যন্ত ব্যবসা সফল এই ছবিটি থেকে এনএফডিসি-এ লাভ আসে চার কোটি রুপি।

তবে ১৯৯১-৯২ সালে সরকারের নতুন অর্থনৈতিক নীতি ঘোষণার কারণে প্রতিকূল অবস্থায় পড়ে এনএফডিসি। সরকার এনএফডিসি-কে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর পরামর্শ দেয়। বেশ সঙ্কটের মধ্যে পড়ে এনএফডিসি। শিল্পগুণসম্পন্ন সামাজিক প্রাসঙ্গিকতার ভালো ছবির পৃষ্ঠপোষকতার জন্য যে-সংস্থার জন্ম হয়েছিলো, অস্তিত্ব টিকে রাখার জন্য তাকে দূরদর্শনের মেট্রো চ্যানেলে বাণিজ্যিক সিনেমাও দেখাতে হয়। এ-সময় তারা টেলিভিশনের জন্য অনুষ্ঠান বানায়, বিদেশি চলচ্চিত্র আমদানি করে। তবে কিছুদিনের মধ্যে এনএফডিসি অর্থনৈতিকভাবে আবার মজবুত হয়ে ওঠে, কিন্তু ঐতিহ্য অনেকখানিই হারিয়ে ফেলে।

এনএফডিসি নিয়ে এতো কচকচানির কারণ একটিই, এর ভালোটুকু নিয়ে খারাপটা বর্জন করা। ভারতের বিখ্যাত সব পরিচালকদের পরিচালক হয়ে ওঠার পিছনে এনএফডিসি-এর এই যে-ভূমিকা সেটাকে উদাহরণ হিসেবে নেওয়া। ভারত শুরু করেছিলো ১৯৬০-এ, আমরা ১৯৭৬-এ। এক এনএফডিসি-এর বদৌলতে ওখানে পরিচালক গড়েছে কতোজন, আর আমরা!

 

৫.

অনুদানের পাশাপাশি সরকার বাংলাদেশের সিনেমায় নানা ধরনের প্রণোদনা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো এফডিসি থেকে বাকিতে কাঁচা ফিল্ম (পি ফিল্ম) কিনতে পারার সুবিধা। আগে থেকেই এ-সুবিধা চালু ছিলো। কিন্তু সর্বশেষ তত্তা¡বধায়ক সরকার আসার পর পি ফিল্ম দেওয়ার নিয়ম বন্ধ করা হয়। এমনিতেই চলচ্চিত্রের অবস্থা খারাপ, তার ওপর আবার এ-ধরনের সিদ্ধান্তে হতাশ হয়ে পড়ে প্রযোজক-পরিচালকরা। তবে ২০১১ সালের মে থেকে আবার এই প্রথা চালু করা হয়েছে। তবে এবার বিষয়টি কিছুটা নীতিমালার আওতায় আনা হয়েছে। এখন পি ফিল্ম সুবিধা পাওয়ার জন্য ২৫ হাজার ফুট নেগেটিভের মূল্য বাবদ সাড়ে নয় লাখ টাকা এফডিসি-কে জমা দিতে হবে। এরপর সেন্সর প্রিন্ট পর্যন্ত যত খরচ হবে তার সব এফডিসি বহন করবে। তবে কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী সুস্থ ও বিনোদনমূলক চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্যই বাকিতে কাঁচা ফিল্ম দেওয়া হবে। যাদের বিরুদ্ধে অতীতে অশ্লীল চলচ্চিত্র নির্মাণের অভিযোগ এবং যারা ইতিপূর্বে এফডিসির বকেয়া টাকা পরিশোধ করেননি, তারা পি ফিল্ম সুবিধা পাবে না।

দিনের পর দিন সিনেমা নির্মাণ ও মুক্তির সংখ্যা কমে যাওয়ায় ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে এফডিসির তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মমতাজ আলা শাকূর এফডিসির অর্থ দিয়ে বাণিজ্যিক সিনেমা নির্মাণের উদ্যোগের কথা জানান। তিনি জানান, মন্ত্রণালয় সম্মতি দিলে বছরে অন্তত পাঁচটি বাণিজ্যিক সিনেমা এফডিসি থেকে প্রযোজনা করতে চান। তবে শেষ পর্যন্ত এ-উদ্যোগ এখনও আলোর মুখ দেখেনি।

সম্প্রতি চলচ্চিত্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ২০১২ সালের ৩ এপ্রিল শিল্প মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে শিল্প হিসেবে ঘোষণা দেয়। এ-ঘোষণায় চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট অনেকের মধ্যে আশার আলো দেখা দেয়। দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ হওয়ায় অনেকে খুশি হন, আবার অনেকে ঘোষণাতেই যেনো বিষয়টি সীমাবদ্ধ না থাকে সে-ব্যাপারেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন। ১৪ মে ২০১২ এফডিসিতে এ-সংক্রান্ত একটি সভা হয়। সভায় তথ্য মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, রাজস্ব বোর্ড, পরিচালক সমিতি, শিল্পী সমিতি ও প্রযোজক-পরিবেশক সমিতির প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে তথ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব হারুনুর রশীদ জানান, নির্মাতারা ক্ষুদ্রশিল্প হিসেবে চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য সর্বোচ্চ ৬০ লাখ টাকা করে ঋণ সুবিধা পাবে। একই সঙ্গে আগে যেখানে প্রেক্ষাগৃহ এবং চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক হারে বিদ্যুৎ বিল গ্রহণ করা হতো, এখন সেখানে শিল্প নীতিতে বিদ্যুৎ বিল গ্রহণ করা হবে।ফলে বিদ্যুৎ বিল খরচ অর্ধেকে নেমে আসবে।

এছাড়া ২০১২-১৩ অর্থবছরের বাজেটে চলচ্চিত্রে বিদ্যমান ৩৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহারের প্রস্তাব হয়। তবে ১৫ শতাংশ হারে প্রযোজ্য মূল্য সংযোজন কর অব্যাহত থাকার কথা বলা হয়। তবে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর প্রত্যাহারেরও দাবি জানায়। একই সঙ্গে সিনেমা হল ও সিনেপ্লেক্স নির্মাণে কর অবকাশেরও প্রস্তাব করা হয়।১০

আগেই বলেছি, ২০১২ তে এসে যে-প্রস্তাবগুলো সরকার করছে, ২০০১ সালে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত চলচ্চিত্র সংক্রান্ত এই সব সিদ্ধান্ত নেয়। এতে সেখানকার চলচ্চিত্রের সবকিছুই প্রায় বদলে যায়। শুধু ভারতে নয় চলচ্চিত্র খাতের সংস্কার পাকিস্তানের ছবিও পাল্টে দিয়েছে। ...১৯৯০ সালে যেখানে ছিল ৭৫০টি প্রেক্ষাগৃহ, ২০০২ সালে তা দাঁড়ায় ১৭৫টিতে। তখন চলচ্চিত্রকে পুনরুদ্ধার করতে এবং মাল্টিপ্লেক্স নির্মাণকে উৎসাহ দিতে কর ১৫০ শতাংশ থেকে ৬৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। প্রথম মাল্টিপ্লেক্স নির্মাণ হয় ২০০২ সালে, করাচিতে। বছর খানেকের মধ্যে গড়ে ওঠে আরও ডজন খানেক। ২০০৪ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত প্রেক্ষাগৃহগুলোকে বিনোদন কর দেওয়া থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখা হয়।১১

কথা হচ্ছিলো চলচ্চিত্র উন্নয়নে বাংলাদেশ সরকারের ভূমিকা নিয়ে, ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে শোনা যায়-প্রতি বছর মোট ছয়টি সিনেমার রাজস্ব মওকুফ করা হবে। কর মওকুফের ফলে সংশ্লিষ্ট সিনেমার সব দর্শক প্রদর্শনীর প্রতিটি প্রবেশপত্র থেকে শতকরা ৩৫ ভাগ ছাড় পাবে। এছাড়া প্রেক্ষাগৃহের মালিকদের ওই ছবি প্রদর্শনে কোনো রাজস্ব দিতে হবে না। এই প্রস্তাবের অংশ হিসেবে ২০১১ সালের ৩১ জানুয়ারি মুক্তি পাওয়া আবু সাইয়ীদ পরিচালিত অপেক্ষা করমুক্ত করা হয়। এতে প্রেক্ষাগৃহ মালিকরা সিনেমাটি প্রদর্শনে অনেকখানি উৎসাহিত হয়। ভারতে অবশ্য প্রতি বছর বেশ কয়েকটি সিনেমার রাজস্ব মওকুফ করা হয়।১২

কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো, পদক্ষেপগুলো নেওয়া হলেও এর বাস্তবায়নে কতোখানি আন্তরিক ছিলো সরকার, সেটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। গত তিন বছরে চলচ্চিত্র উন্নয়নে সরকার নানা সময় নানা উদ্যোগ নিলেও দৃশ্যত কোনো উন্নয়ন হয়নি। প্রেক্ষাগৃহ ভাঙার মিছিল অব্যাহত, সিনেমা নির্মাণের সংখ্যাও তলানিতে।

 

৬. 

আগেই বলেছি, অনুদানের অর্থ সঙ্কুলান না হওয়ায় চলচ্চিত্রের কাজ বন্ধ হওয়া এবং অনুদান নিয়ে ছবি জমা না দেওয়ার মতো বিষয় অনুদান-ইতিহাস এর শুরু থেকেই ছিলো। সাম্প্রতিক কয়েক বছরের পরিসংখ্যান উপস্থাপন করলে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির চিত্র দেখা যাবে। ২০০৮-২০০৯ অর্থবছরে অনুদান পায় তিনটি চলচ্চিত্র -মোরশেদুল ইসলামের আমার বন্ধু রাশেদ, শাহাজাহান চৌধুরীর মধুমতি ও জুনায়েদ হালিমের স্বপ্ন ও দুঃস্বপ্নের গল্প। এর মধ্যে প্রথম দুটি সিনেমা মুক্তি পেলেও শেষটির দৃশ্যধারণই এখনও শুরু হয়নি।

২০০৯-২০১০ অর্থবছরে অনুদানের সিনেমার সংখ্যা দ্বিগুণ করা হয়। ছয়টি চলচ্চিত্রের মধ্যে দুই বছরে মুক্তি পেয়েছে মাত্র নাসিরউদ্দীন ইউসুফের গেরিলা। ছবিটি অবশ্য দেশে-বিদেশে বেশ প্রশংসা পায়। এছাড়া সংবাদপত্রের বিভিন্ন সময়ের সংবাদ থেকে জানা গেছে, শিশুতোষ চলচ্চিত্র সামিয়া জামানের ছেলেটির শুটিং, সম্পাদনা শেষ। তবে মুক্তির বিষয়টি অনির্ধারিত। প্রয়াত পরিচালক আকতারুজ্জামানের সুচনা রেখার দিকে-এর কাজ শেষ, এখন মুক্তির অপেক্ষায়। আর সজল খালেদের কাজলের দিনরাত্রির কাজ শেষ পর্যায়ে, গত ঈদুল আজহায় চলচ্চিত্রটি মুক্তির কথা ছিলো। কিন্তু এখনও (ডিসেম্বর ২০১২) মুক্তি পায়নি।

বাকি দুটি চলচ্চিত্রের মধ্যে কাজী মোরশেদের একই বৃত্তে ও বেলাল আহমেদের অনিশ্চিত যাত্রার কাজও নাকি (নাকি বলছি এ-কারণে যে, শেষ হওয়ার এ-খবরটি আমি পেয়েছি পরিচিত বন্ধু-বান্ধবদের কাছ থেকে) শেষ পর্যায়ে। তবে সংবাদপত্রের প্রতিবেদন১৩ বলছে, মে ২০১২ পর্যন্ত এ-দুটি ছবির কাজ শুরুই হয়নি। চলচ্চিত্রের অবস্থা যে-পরিস্থিতিতেই থাক, নিয়ম অনুযায়ী এসব সিনেমার চিত্রায়ণ শেষ হওয়ার কথা ছিলো ২০১১ সালের ৩০ জুনের মধ্যে।

২০১০-২০১১ অর্থবছরে ছয়টি চলচ্চিত্রকে অনুদান দেওয়া হয়। এর মধ্যে চারটি পূর্ণদৈর্ঘ্য ও দুইটি শিশুতোষ চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রগুলো হলো মুরাদ পারভেজের বৃহন্নলা, মাসুদ পথিকের নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ, নির্ঝর সাখাওয়াত হোসেনের ধোঁকা, মিঠুন চক্রবর্তীর মুক্তি। শিশুতোষ চলচ্চিত্র দুটি হলো ফারুক হোসেনের কাকতাড়ুয়া এবং মানিক মানবিকের শোভনের স্বাধীনতা। এছাড়া ২০১১-২০১২ অর্থবছরে অনুদান পেয়েছে তানভীর মোকাম্মেলের জীবন ঢুলি, গাজী রাকায়াতের মৃত্তিকা মায়া, মারুফ হাসান আরমানের নেকড়ে অরণ্য, দেলোয়ার জাহান ঝন্টুর হেড মাস্টার। এ-বছর দুটি শিশুতোষ চলচ্চিত্রকে অনুদান দেওয়া হয়েছে-সৈয়দ শামসুল হকের উপন্যাস অবলম্বনে প্রশান্ত অধিকারীর হটসনের বন্দুক এবং ফরিদুর রেজা সাগরের উপন্যাস অবলম্বনে সৈয়দ  সালাউদ্দিন জাকীর একা একা

এবারই প্রথম তরুণ পরিচালক, চলচ্চিত্র সংসদ কর্মীদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে পাঁচজন নির্মাতাকে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য অনুদান দিয়েছে তথ্য মন্ত্রণালয়। স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমাগুলো হলো-সারোয়ার তমিজউদ্দিনের আজো চিঠি আসে, বাহারউদ্দিনের ফ্ল্যাশব্যাক৭১, সারোয়ার জাহানের অপেক্ষা, শিশুতোষ চলচ্চিত্র আশরাফ শিশিরের গাড়িওয়ালা ও তথ্যচিত্রে ফরিদ আহমদের ধনধান্য পুষ্পভরা১৪

২০১২ সালের উন্নতমানের চলচ্চিত্র নির্মাণে সরকারি অনুদান প্রদান নীতিমালা-২০১২১৫ এর অনুদানপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র নির্মাণের শর্তে বলা হয়েছে-অনুদানপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র অনুদানের প্রথম চেক প্রাপ্তির ৯ (নয়) মাসের মধ্যে নির্মাণ কাজ শেষ করতে হবে। তবে বিশেষ অবস্থার প্রেক্ষিতে স্ক্রিপ্টের প্রয়োজনে সরকার উক্ত সময় বৃদ্ধি করতে পারবে। নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, ইতোপূর্বে সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত যে সকল চলচ্চিত্রের নির্মাণ কাজ শেষ হয়নি, সে সকল চলচ্চিত্র এ নীতিমালার আওতাভুক্ত হবে। এখন শঙ্কার কথা হলো, ২০০৮ সালের চলচ্চিত্র ২০১২ শেষেও মুক্তি পায়নি। এছাড়া ২০০৯, ২০১০-এর অনুদান পাওয়া অনেক ছবিরও একই অবস্থা আমরা দেখতে পেলাম। তাহলে অনুদানের চলচ্চিত্রের অবস্থা কী?

সম্প্রতি একাডেমিক একটি কাজে সাক্ষাতের সুযোগ হয়েছিলো পরিচালক জুনায়েদ হালিমের সঙ্গে। কথা প্রসঙ্গে জানতে চেয়েছিলাম উনার অনুদান পাওয়া সিনেমা স্বপ্ন ও দুঃস্বপ্নের গল্প-এর ব্যাপারে। তিনি জানালেন, এখন একটু বাড়ানো হলেও এফডিসির সার্ভিস চার্জসহ তার সময়ে একটি সিনেমা নির্মাণের জন্য অনুদান হিসেবে ২৫ লাখ টাকা দেওয়া হতো। অথচ তার সিনেমার বাজেট ছিলো প্রায় আড়াই কোটি টাকা। চিত্রনাট্যের সঙ্গে বাজেট দেওয়ার সময় কেনো বাড়িয়ে দিলেন না-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানালেন, সমস্যাটা ওখানেই; অনুদান পাওয়ার আগে থেকেই আমার একজন সহ-প্রযোজক ঠিক ছিলো। তার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতির ওপর ভিত্তি করেই আমি কাজ শুরু করেছিলাম। কিন্তু পরে আইনগত একটি সমস্যার কারণে প্রযোজক পিছপা হয়। আর বাড়িয়ে দিলেই বা কী, আড়াই কোটি টাকাতো আর অনুদান দেওয়া হতো না।

তারপর জুনায়েদ হালিম আইনগত সমস্যা নিয়ে যেটা জানালেন, সেটাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নীতিমালায় উল্লেখ আছে, সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে অনুদানপ্রাপ্ত প্রযোজক সরকারি অনুমতি নিয়ে সহযোগী প্রযোজক নিতে পারবে। তবে এ-ক্ষেত্রে মূল প্রযোজকের নিকট চলচ্চিত্রের স্বত্ব থাকবে এবং সহযোগী প্রযোজকের নিকট কোনোভাবেই স্বত্ব হস্তান্তর করা যাবে না। এছাড়া নীতিমালায় আরও বলা আছে, সরকারি অনুদানে নির্মিত চলচ্চিত্র রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবস এবং দেশী-বিদেশী চলচ্চিত্র উৎসবে প্রযোজককে অবহিত রেখে অবাণিজ্যিক ভিত্তিতে প্রদর্শনের অধিকার সরকার সংরক্ষণ করবে।

এখানে একটা বিষয় অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে লক্ষণীয় যে, সহযোগী প্রযোজক সরকারের সমপরিমাণ টাকা বিনিয়োগ করবে কিন্তু তার কোনো স্বত্ব থাকবে না, এটা কীভাবে হয়? এছাড়া প্রয়োজনে অবাণিজ্যিক প্রদর্শনীর সুযোগতো আইন করে থাকছেই, ফলে সহযোগী প্রযোজক অর্থনৈতিকভাবে এমন বিনিয়োগকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেন। তাই ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও অনেকে এ-ধরনের বিনিয়োগে উৎসাহী হয় না।

নীতিমালায় আরও বলা আছে, একই প্রযোজক/পরিচালককে দুইবারের বেশি অনুদান প্রদান করা হবে না। অথচ পার্শ্ববতী দেশ ভারতে কিন্তু এ-ধরনের কোনো নিয়ম নেই। সত্যজিৎ নিজে চারটি চলচ্চিত্র এনএফডিসির সহায়তায় করেছিলেন। কে কয়টি সিনেমা পেলো-না পেলো তার চেয়ে বোধহয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত, কে কতো ভালো সিনেমা নির্মাণ করলো। কিংবা কার ভিতরে কতোখানি সম্ভাবনা আছে, তা বের করে আনতে পারা। এতে প্রতিযোগিতাটা থাকে। কিন্তু বাস্তবে এসব কিছুর বাইরে অনুদান পাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে অন্যকিছু; অন্য কোনো কারণ। যেটা হয়তো চলচ্চিত্রের অংশ নয়। সেটা দেশের অনেক কিছুর মতো রাজনীতিকীকরণের অংশ, অনেক ক্ষেত্রে তাতে রাষ্ট্রের ফ্যাসিবাদী আচরণের বহিঃপ্রকাশও হয়ে থাকে। বাংলাদেশে অনুদানপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রের পরিসংখ্যান করলে এ-ধরনের উদাহরণ ভুরি ভুরি। বাংলাদেশের দুটি মূলধারার রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় তাদের মতাদর্শের এক চুল বাইরে গিয়ে কোনো চলচ্চিত্র অনুদান পায়নি গত ৪০ বছরে।

অথচ চলচ্চিত্র নিয়ে জীবনে কোনো দিন কাজ করেননি, হঠাৎ মনে হয়েছে চলচ্চিত্র করবেন, কারো কাছ থেকে  একটা চিত্রনাট্য করে নিয়ে জমা দিয়েছেন-এমন লোক চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য সরকারি অনুদান পেয়েছেন। আবার চিত্রনাট্যের গল্প নির্ধারণের ক্ষেত্রেও এরা অনেক বেশি সচেতন থাকেন। কারণ, কোন্ সরকারের আমলে কোন্ ধরনের গল্প,কার কার গল্পকাকে মূলে রেখে গল্প দিলে কাজ হাসিল হবে, তাও ৪০ বছরে পরিষ্কার হয়ে গেছে। এছাড়া এ-নিয়ে সুপারিশ, লেজুড়বৃত্তিতো আছেই। ফলে যেটা হয়েছে, তার রূপ অত্যন্ত ভয়ঙ্কর। দিনের পর দিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে যিনি নিজেকে চলচ্চিত্রের জন্য তৈরি করেন, কিন্তু কেবল টাকার অভাবে স্বপ্ন বাস্তবায়নে এগোতে পারেন না, তারা মুষড়ে পড়েন। স্বপ্ন ভেঙে যায় অ-স্বপ্নের কাছে। আর এই স্বপ্নই যদি না থাকে তাহলে দেশ এগোবে কীভাবে?  

 

৭.       

১৯৭৬ সালে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে বলা হয়েছিলো-...তারা নির্বাচিত হবেন সরকারি কর্মকর্তা এবং অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বিচারকম-লী বা জুরী বোর্ডের মাধ্যমে। অথচ ১৯৭৯-এ অনুদানের নীতিমালা সংশোধন করে বলা হলো-জাতীয় ঐতিহ্য ও আদর্শ বাস্তবায়নে অনুপ্রেরণাদায়ক মানবিক মূল্যবোধের উপর ভিত্তি করে নির্মিত ছবিকে সরকারি অনুদান দেওয়া হবে। লক্ষ করুন,জাতীয় ঐতিহ্য ও আদর্শ বাস্তবায়নে অনুপ্রেরণার তকমা। ১৯৮৬-তে তুরস্কের স্বৈরশাসক জুন্তাও অনুদানের সিনেমার মান বিচারের ক্ষেত্রে এই জাতীয় সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ এর অনুসারী তকমাটি ব্যবহার করেছিলেন। ফলে স্বৈরাচারী জুন্তাবিরোধী পরিচালকদের অনুদান পাওয়ার কোনো সুযোগ ছিলো না। তার মানে জাতীয় ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধর এই তকমার আড়ালে একটা মূল্যবোধ থাকে সেটা শাসকের মূল্যবোধ। শাসকের সেই মূল্যবোধ দিয়েই নিয়ন্ত্রণ করতে চাওয়া হয় বাকি সব মূল্যবোধকে।

এটা গেলো রাষ্ট্রের একটা চরিত্র। অন্যদিকটি দেখুন, ভারতে এনএফডিসি সৃজনশীল চলচ্চিত্রের স্বার্থে ভালোই কাজ করছিলো। অন্তত স্বাধীন, বিকল্প চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে অবদান রাখার চেষ্টাটুকু করছিলো। ১৯৯১-৯২ সালে সরকারের নতুন অর্থনৈতিক নীতিতে প্রতিকূলতায় পড়ে এনএফডিসি। সরকার টাকা দেওয়া বন্ধ করে দিয়ে এনএফডিসি-কে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর পরামর্শ দেয়।       

যে-প্রতিষ্ঠানের কাজ ব্যবসায়িক নয়, তার জন্য নিজের পায়ে দাঁড়ানোতো একটু কঠিনই; এ-কারণে এনএফডিসি বৈশিষ্ট্যের অঙ্গহানি হয়। তারা ব্যবসায়িক দিকে ঝোঁকে। একইভাবে ১৯৮৫-তে বৃটিশ ন্যাশনাল ফিল্ম ফাইন্যান্স করপোরেশন (এনএফএফসি) কে অজানা কারণে সরকার বন্ধ করে দেয়। তার মানে মূলধারার ব্যবসায়িক কাঠামোর বাইরে দাঁড়িয়ে যখনই কোনো প্রতিষ্ঠান এগোতে চেয়েছে, সরকার তখনই তার ঘাড়ে চেপে বসেছে। নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছে, তার সব ধরনের কার্যক্রম। পার্থক্য কেবল কোনোটা প্রত্যক্ষ কোনোটা পরোক্ষ।

 

৮.

সত্যজিৎ নাকি জীবদ্দশায় বলিউডের শক্তিমান অভিনেতা অমিতাভ বচ্চনকে নিয়ে চলচ্চিত্র বানাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পারেননি। কারণ বলিউডের সেই সময়ের সুপারস্টার অমিতাভকে নিয়ে চলচ্চিত্র বানানোর জন্য যে-পরিমাণ টাকা দরকার ছিলো, তা দেওয়ার সামর্থ্য সত্যজিতের ছিলো না। তার নিজের ভাষায় বয়ানটি এ-রকম,অমিতাভকে নিয়ে ছবি তৈরির কথা প্রায়ই ভাবি। কিন্তু তাঁর মতো তারকার পারিশ্রমিক অনেক বেশি। এই বিপুল ব্যয় বহন করার মতো সামর্থ্য এ মুহূর্তে বাংলা চলচ্চিত্রের কারও নেই।১৬ অবশ্য এর পরিপ্রেক্ষিতে স্ত্রী বিজয়া রায়, সত্যজিৎকে বলেছিলেন এভাবে, এমন করে বলবেন না। আপনার মতো গুণী পরিচালকের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পাওয়াটাই অনেক বড় পাওয়া। আমি নিশ্চিত, অমিতাভ খুব বেশি পারিশ্রমিক নেবে না আপনার কাছ থেকে।১৭ তারপরও সত্যজিৎ অবশ্য অমিতাভকে নিয়ে কেনো কোনো ছবি করেননি তা জানা যায়নি।

তার মানে সত্যজিতের মতো পরিচালককে সিনেমার কাস্ট অর্থাৎ অভিনেতা/অভিনেত্রী নির্বাচনের সময় টাকার কথা মাথায় রাখতে হয়েছিলো। আসলে চলচ্চিত্রের সঙ্গে টাকার এই সম্পর্কটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটা যতো বড়ো শিল্প, ঠিক ততো বড়োই ইন্ডাস্ট্রি। তারপরও সারা বিশ্বে চাল-চুলোহীন হাজার হাজার চলচ্চিত্রপ্রেমী তরুণ-তরুণী সিনেমা নিয়ে কাজ করা, সিনেমা নির্মাণের কথা ভাবছেন। দিন নেই, রাত নেই নিজেকে সিনেমার জন্য তৈরি করছেন; আবার অনেকে ব্যর্থ হয়ে অন্ধকার পথে কিংবা অ-জীবনের দিকে চলে গেছেন। তারপরও কিন্তু স্বপ্ন দেখা থেমে নেই। তাহলে প্রশ্ন, এই স্বপ্নের বাস্তবায়ন করবে কে/কীভাবে? এ-ক্ষেত্রে আবার ফিরে যেতে হয় সেই রাষ্ট্রের কাছে, যেভাবে পথের পাঁচালীর সময় সত্যজিৎ বেঁচে গিয়েছিলেন অ-জীবনে যাওয়ার পথ থেকে। যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন না থাকলেও সেই সময়ের একেবারে নবিশ নির্মাতা সত্যজিতের মতো আজকের অনেকের কিন্তু বিখ্যাত বাবা-দাদা নেই। অনেকের হয়তো নেই নীতি-নৈতিকতার ঊর্ধ্বে উঠে কোনো দলের প্রতি আনুগত্য। তাহলে তারা কী করবেন? কে তাদের সামনে তৈরি করে দেবে একটু সুযোগ, কে তাদের সৃজনশীলতার একটু হলেও মূল্যায়ন করবে? এ-প্রশ্নের উত্তর শেষতক রাষ্ট্রকেই দিতে হবে।   

 

লেখক : কাজী মামুন হায়দার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়ান।

kmhaiderru@yahoo.com

 



তথ্যসূত্র

১. কাদের, মির্জা তারেকুল (১৯৯৩ : ৫৩১); বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্প; বাংলা একাডেমী, ঢাকা। 

২. সংবাদ; ২৯ জুলাই ১৯৮১; উদ্ধৃত, কাদের, মির্জা তারেকুল (১৯৯৩ : ৫৩২); বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্প; বাংলা একাডেমী, ঢাকা।                 

৩. প্রাগুক্ত; কাদের, মির্জা তারেকুল (১৯৯৩ : ৫৩২)।

৪. চলচ্চিত্র’ ৮১; বিচিত্রা অ্যালবাম ১৫; ১ মার্চ ১৯৮১, পৃষ্ঠা-১৪, ঢাকা।

৫. মুৎসুদ্দী, চিন্ময় (১৯৮৭ : ১১৮); বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সামাজিক অঙ্গীকার; শিল্পকলা একাডেমী, ঢাকা।

৬. ‘বাকিতে কাঁচা ফিল্ম সরবরাহের দাবি মেনে নিয়েছে সরকার’; প্রথম আলো; ১২ মে ২০১১।

৭. ‘জুন থেকে আবার পি-ফিল্ম’; কালের কণ্ঠ, ২৮ এপ্রিল ২০১১।

৮. ‘বাণিজ্যিক ছবি প্রযোজনা করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে এফডিসি’;কালের কণ্ঠ; ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১১।

৯. ‘৬০ লাখ টাকা ব্যাংক ঋণ পাচ্ছেন নির্মাতারা’; কালের কণ্ঠ; ২০ মে ২০১২।

১০. ‘এবারের বাজেটে চলচ্চিত্র’, কালের কণ্ঠ, ১০ জুন ২০১২ ।

১১. ‘চলচ্চিত্রের চালচিত্র : বাংলাদেশ’, ক্যাথরিন মাসুদ, শুক্রবারের বিশেষ ক্রোড়পত্র সাহিত্য সাময়িকী, প্রথম আলো, ২৮ অক্টোবর ২০১১।

১২. ‘প্রতি বছর ছয়টি ছবির রাজস্ব মওকুফ করবে সরকার’; সমকাল, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০১১।

১৩. ‘সেই ১৭টি ছবি’; সমকাল, ২৪ মে, ২০১২।

১৪. ‘স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি তৈরির জন্য অনুদান পাচ্ছেন পাঁচজন’, প্রথম আলো, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১২।

১৫. তথ্যমন্ত্রনালয়ের ওয়েবসাইটে আপনি এই নীতিমালা পেতে পারেন। http://www.moi.gov.bd/Film/Anudan_Nitimala-2012.pdf

১৬. ‘পারিশ্রমিকের কারণে অমিতাভকে নিতে পারেননি সত্যজিৎ রায়’; প্রথম আলো, ৩১ অক্টোবর, ২০১২।

১৭. প্রাগুক্ত; প্রথম আলো, ৩১ অক্টোবর, ২০১২।

 

পাঠ সহায়িকা

আচার্য নির্মাল্য ও দিব্যেন্দু পালিত সম্পাদিত (২০০৯); শতবর্ষে চলচ্চিত্র দ্বিতীয় খণ্ড; আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা।

কাদের, মির্জা তারেকুল (১৯৯৩); বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্প; বাংলা একাডেমী, ঢাকা।

চট্টোপাধ্যায়, চণ্ডীদাস (১৯৯৩); ‘পথের পাঁচালীর নেপথ্য কাহিনী; আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা।


বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৩ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের চতুর্থ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন