Magic Lanthon

               

আশফাক দোয়েল

প্রকাশিত ০৮ ডিসেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

রাজনৈতিক-মঞ্চে বন্দি চলচ্চিত্র : আলো হাতে মেহেরজুই সঙ্গে দ্য কাউ

আশফাক দোয়েল


শিল্প, সাহিত্য বিকাশের অন্যতম প্রধান তীর্থভূমি পারস্য। দীর্ঘকাল ধরে শিল্প, সাহিত্যে নিজেদের জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও সৃষ্টিশীলতাকে ধারণ করে এই দেশটি অর্জন করেছে জগৎজোড়া খ্যাতি। সারা বিশ্বের অগণিত মানুষের পছন্দের জায়গায় রয়েছে পারস্যের চিত্রকলা, নৃতত্ত্ব, সাহিত্যসহ আরও অনেক মাধ্যম। পাঠক, আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে ইরানের সুবিখ্যাত কবি ফেরদৌসের কথা। যার রচিত ‘শাহানামা মহাকাব্যটি আজও সাহিত্যের অমর সৃষ্টি বলে মনে করা হয়। তিনি ছাড়াও ১৩ থেকে ১৪ শতকে পারস্যের কবিতার স্বর্ণযুগের সূচনা করেছিলেন সাদী, রুমি, হাফিজসহ আরও অনেক নামকরা কবি। তাদের প্রচেষ্টা ও সৃষ্টিশীলতার বহিঃপ্রকাশে শিল্প-সাহিত্য পেয়েছিলো চরম উৎকর্ষতা, পূর্ণতা।

তবে শুধু রচনা ও প্রকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে পরবর্তীতে ইরানের সামাজিক রাজনৈতিক সমস্যা নিয়েও শিল্প-সাহিত্যকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার শুরু হয়েছিলো সেখানে। যা ১৮ শতকের শেষ দিকে ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করে। এ-সময় স্বদেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদকে উপজীব্য করে বেশকিছু নাটকও রচিত হয়। পারস্যের মানুষের জাগরণে এসব রচনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরবর্তীতে শিল্প সাহিত্য বিকাশের ঠিক এই স্রোতধারার সঙ্গে আরেকটি নতুন বিষয় যুক্ত হয়-যার নাম চলচ্চিত্র। এ-অঞ্চলে চলচ্চিত্র আসে ১৯০০ সালের শুরুর দিকেই। কিন্তু সর্বকনিষ্ঠ মাধ্যম হিসেবে শিল্প সাহিত্যের মতো এটি আর সেভাবে নিজেকে বিকশিত করার সুযোগ পায়নি। যার অন্যতম প্রধান কারণ ছিলো রাজনৈতিক পট পরিবর্তন। রাজনীতির কালো থাবা কখনও এই মাধ্যমটিকে ঠেলে দিয়েছে ধ্বংসের পথে, আবার এই রাজনীতির শুভদৃষ্টিতেই তা পেয়েছে পরিপূর্ণতা; মাথা তুলবার ক্ষমতা। ফলত রাজনীতির ইচ্ছা-অনিচ্ছার একটি দীর্ঘ টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে ইরানের চলচ্চিত্র দাঁড়িয়ে আছে আজকের এই অবস্থানে।

  

উপনিবেশিকতাই যখন বিষবৃক্ষ

পশ্চিমা মদদে ইরানের রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিচালনা করতেন কমান্ডার রেজা খান। সেটা ১৯২১ সালের কথা। এরপর ১৯২৫ সালে পার্লামেন্টে ভোটাভুটির মধ্য দিয়ে রেজা শাহ পাহলভি ক্ষমতা দখল করেন। ১৯০৭ সালে করা ইরানের সাংবিধানিক আইনকে লঙ্ঘন করে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তিনি দেশকে নিয়ে যান ভয়াবহ এক অবস্থার দিকে; যা ছিলো সম্পূর্ণ গণবিরোধী। এ-সময় দেশের সাধারণ মানুষ চরমভাবে রাজনৈতিক হয়রানির শিকার হয়। একের পর এক কট্টরপন্থি ও হঠকারি সিদ্ধান্তে রাষ্ট্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণক্ষেত্র ধ্বংসের মুখে পড়ে। যা থেকে বাদ যায়নি সেদেশের শিল্প, সংস্কৃতি ও বিশেষভাবে চলচ্চিত্র। এর প্রধান কারণ ছিলো শাসক রেজা শাহ পাহলভির পশ্চিমাপ্রীতি। তিনি বরাবরই পশ্চিমা অনুকরণে রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিচালনা করতে তৎপর ছিলেন। যার ফলে সে-দেশের সংস্কৃতি হয়ে ওঠে পশ্চিমা ধাঁচের এবং গণমাধ্যমে গুরুত্ব পেতে থাকে বাহিরের চাপিয়ে দেওয়া নানা মতাদর্শ। উপনিবেশিকতার ছোবলে এভাবেই ইরান হারিয়ে ফেলতে থাকে তার নিজস্বতা।

উপনিবেশিকতার করাল গ্রাস যে-শুধু ইরানকেই বিধ্বস্ত করেছিলো তা নয়, ঠিক এ-রকম অবস্থা ঘটেছিলো তুরস্ক কিংবা কিউবার মতো দেশগুলোতেও। এ-সব দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থা নিয়ন্ত্রণ হতো ওই উপনিবেশিক আদেশে। একটি জিনিস খেয়াল রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি ধ্বংসই ছিলো উপনিবেশিক শাসকদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। কারণ, এই দেশগুলোর সাংস্কৃতিক রূপান্তর ঘটিয়ে পশ্চিমা দেশগুলো এমন এক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চেয়েছিলো যাতে জনগণ বুঝতেই না পারে, তারা উপনিবেশবাদের আশ্রয়ে চলে যাচ্ছে। একই সঙ্গে তারা এ-ও অনুভব করতে দিতো না যে, এই রূপান্তর পাল্টানোর প্রয়োজন আছে। আর এই শিল্প-সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ একটি মাধ্যম চলচ্চিত্র হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই তা উপনিবেশবাদের নিয়ন্ত্রণ থেকে রেহাই পায়নি। ইরানের শাসন ব্যবস্থা পশ্চিমাদের মদদপুষ্ট হওয়ায়, ঠিক এখানেও চলচ্চিত্রের স্বাভাবিক বিকাশ নানাভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছিলো। আর তার সঙ্গে এর আধেয়তে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিলো পশ্চিমাদের শিল্প-সংস্কৃতির প্রভাবকসমূহকে।

এরপরেও ইরানের চলচ্চিত্র নিজ পায়ে দাঁড়াতে চাইলে, রাষ্ট্রের নানা বেড়াজালে তা সঠিকভাবে দাঁড়াতে পারেনি। কারণ, ইরানের রাষ্ট্রব্যবস্থা এই চলচ্চিত্রকে নানাভাবে দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে। এর কৌশল হিসেবে রাষ্ট্র চলচ্চিত্রের ওপর চালু করে নানা নিয়মাবলী, কঠোর সেন্সরশিপ। আর এটি এমন এক সময় করা হয়েছিলো যখন একদিকে সামাজিক অস্থিরতা, হানাহানি ও উগ্র ইসলামি জঙ্গিপনায় উদ্বুদ্ধ সশস্ত্র গোষ্ঠী মাথাচাড়া দিয়ে উঠছিলো, অন্যদিকে মার্কিন ও পশ্চিমা পুঁজিবাদী শক্তির বৈরিতা পৌঁছেছিলো চরমে। ফলে বিদেশি ছবির প্রদর্শন বৃদ্ধি পেলেও সামাজিক অস্থিরতার বিরুদ্ধে দেশিয় চলচ্চিত্রনির্মাতারা কোনোভাবেই চলচ্চিত্রকে ব্যবহার করার সুযোগ পাননি। ফলে স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাণ না হওয়ায় দেশিয় চলচ্চিত্র বিরাট বাধার সম্মুখীন হয়।

 

রাজনৈতিক অস্থিরতার বলি চলচ্চিত্র

চলচ্চিত্র নির্মাণের পিছনে অনেকগুলো বিষয় জড়িত থাকে। এটি অনেকগুলো শিল্পের সমাহার হওয়ায় এর সঙ্গে থাকে ঘাম ঝরানো শ্রমের সমাবেশ, আর অনেক ক্ষেত্রেই লাগে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা। বলাবাহুল্য, ১৯১৭ সালে অক্টোবর বিপ্লবের পর রাশিয়ার মহান নেতা লেনিন সর্বপ্রথম চলচ্চিত্রের অবকাঠামোগত উন্নয়নে সচেষ্ট হন। কারণ তিনি জানতেন-চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বিশ্বের কাছে নিজের দেশ ও সংস্কৃতিকে যতোটা তুলে ধরা সম্ভব, হয়তো অন্য কোনো মাধ্যমে ততোটা সম্ভব হবে না। তাই তিনি চলচ্চিত্রকে অন্যান্য অনেক প্রভাবকের সঙ্গে মুক্তির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। কিউবার মতো ভঙ্গুর অর্থনীতির ছোট দেশটির দিকে তাকালে দেখা যায়-শুধু চলচ্চিত্রকর্মীদের নিরন্তর প্রচেষ্টা ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার বদৌলতেই চলচ্চিত্রকে তারা অনেক দূর নিয়ে গেছেন। আর এ-ক্ষেত্রে বিপ্লবের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারী বাতিস্তা সরকারের পতনের পর ফিদেল কাস্ত্রো চলচ্চিত্রের উন্নয়নে বিশেষভাবে ভূমিকা পালন করেন।

তবে স্বৈরাচারী শাসকের দোর্দণ্ড প্রতাপের মধ্যে থেকেও চলচ্চিত্রকে শিল্প হিসেবে এগিয়ে নেওয়ার উদাহরণও আছে। পৃথিবীতে এর সবচেয়ে বড়ো উদাহরণ সৃষ্টি করেছে ইরান। ইসলামি বিপ্লবের প্রায় ১০ বছর আগে সেই দেশের চলচ্চিত্রনির্মাতারা পথ চলতে শুরু করেছিলেন প্রগতির পথে। সেই মহাকাব্যিক বয়ান শুরুর আগে জেনে নিই তারও প্রায় ৫০ বছর আগে অপ্রত্যক্ষ চরম উপনিবেশের মধ্যে কেমন ছিলো ইরানের চলচ্চিত্রের অবস্থা। পশ্চিমাদের চাটুকারিতা ও গণতন্ত্রের বিকাশকে রাজনৈতিকভাবে দমনের মধ্য দিয়ে ১৯২৫ সালে দেশটির সিংহাসনে বসেন স্বৈরাচারী শাসক রেজা শাহ পাহলভি। ঠিক সেই সময়ই ইরানের নিজস্ব চলচ্চিত্রের যাত্রা শুরু। আভানেস ওহানিয়ান নামের এক চলচ্চিত্রনির্মাতা তৈরি করেন আবিরাবি (১৯৩০), যা ছিলো ইরানের প্রথম নির্বাক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। এর তিন বছরের মাথায় নির্মাণ হয় ইরানের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র লরের মেয়ে (১৯৩৩)। তবে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাব ও হলিউড সিনেমার আমদানির সঙ্গে পেরে উঠতে না পারায় ইরানের এই চলচ্চিত্রের যাত্রা বেশি দূর এগোতে পারেনি।

এরপর ১৯৪১ সালে রুশ-বৃটিশ আক্রমণে ক্ষমতা হারান রেজা শাহ; ক্ষমতায় বসেন তারই পুত্র শাহ মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভি। আর সে-থেকেই শুরু হয় ইরানের সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক এমনকি সাংস্কৃতিক অবস্থার চরম অবনতি। স্বাভাবিকভাবে চলচ্চিত্র এখানেও সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়। এই সময় পশ্চিমের আধুনিকতার ধরন ও মার্কিনিদের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সুসম্পর্ক থাকায় ইরানের সব প্রেক্ষাগৃহ হলিউডের দখলে চলে যায়। শুধু হলিউডই নয়, এ-সময় বলিউডের সিনেমাতেও ভরপুর হয়ে ওঠে ইরানের প্রেক্ষাগৃহগুলো। ফলে দীর্ঘ প্রায় তিন দশক জুড়ে ইরানের জনগণ দেখতে থাকে বাণিজ্যিক ধারার বস্তাপঁচা সব ছবি। তবে এ-সময় ইরানের পরিচালকরা যে-একেবারে বসে ছিলো তা নয়, হলিউডি মারপিট আর বলিউডি নাচ-গানে ভরা ছবির অনুকরণে তারা নির্মাণ করে চলচ্চিত্রের বিশেষ এক ধরন-ফিল্ম জাহেলি।


দারিউস মেহেরজুই


১৯৫৯-এ এসে দূরে একটু আলো দেখা যায় চলচ্চিত্রের আঙিনায়। এবার আলো হাতে হাজির হন ফারুক জেফারি। তিনি ইউরোপিয় শৈল্পিকতা ও ইতালিয় নিও-রিয়ালিজমে প্রভাবিত হয়ে নির্মাণ করেন সাউথ অব দ্য সিটি (১৯৫৮) চলচ্চিত্রটি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে ফ্যাসিবাদী মুসোলিনীর অমানবিক তাণ্ডবলীলা, ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যে একদল স্বপ্নবান চলচ্চিত্রনির্মাতা সৃষ্টি করেছিলেন নিও-রিয়ালিজম নামে অসাধারণ শিল্পতত্ত্ব। তারা চলচ্চিত্রকে স্টুডিওর বাইরে নিয়ে এসে সহজ-সরল-সাবলীলভাবে মানবিকতাবোধ, যুদ্ধের বিপরীতে শান্তির স্বপক্ষে চলচ্চিত্র তৈরি করে চলচ্চিত্রকে নিয়ে গেলেন নতুন এক মাত্রায়।

ইতালির মতো অবস্থা ইরানে বিরাজ না করলেও রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ না পাওয়ায়, এখানকার চলচ্চিত্রনির্মাতারা একেবারেই কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলো। এই পরিস্থিতিতে তারা অন্তত একটি বিষয় বুঝতে পারলো যে, চলচ্চিত্রকে স্টুডিওর বাইরে এনে মুক্ত ও স্বাধীন করে দিতে হবে। যে কেউ, যে-কোনোভাবেই চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে পারবে। এই চিন্তায় কিছুটা কাজ হয়েছিলো। ৬০র দশকে এসে এই ধারায় নির্মিত হলো আরও কিছু চলচ্চিত্র। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো জেফারের দ্য নাইট অব দ্য হান্সব্যাক (১৯৬৩) ও অসাউদ কিমায়ির ঘেউসার (১৯৬৬)।

তবে এরপরও কিন্তু ঠিক সেই অর্থে সামনে এগোতে পারেনি দেশটির চলচ্চিত্রমাধ্যম। চরম রাজনৈতিক আক্রোশের মধ্যে হতাশ মানুষ যখন আত্মহত্যার পথকে বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছিলো, মানুষে মানুষে আর রাষ্ট্রের সঙ্গে জনগণের মানবিক সম্পর্ক যখন শূন্যের কোঠায়-এরকম একটা সময়ে এবার বাতি হাতে হাজির হলেন তরুণ চলচ্চিত্রনির্মাতা দারিউস মেহেরজুই। প্রমাণ করতে তৎপর হলেন, পৃথিবী ক্রমশ ধূসর হয়ে যাচ্ছে, মানুষের প্রতি মানুষের বিশ্বাস আজ শুধুই কথার কথা, রাষ্ট্র ক্রমশ মানুষের প্রতি অমানুষ হয়ে উঠছে, তার ভিতরে এতোটুকু পরিমাণ মানবতাবোধও আর অবশিষ্ট নেই-একথাগুলো মিথ্যে। তিনি বলতে চাইলেন, শুধু মানুষে মানুষে নয়, অবলা পশুর প্রতিও মানুষের ভালোবাসা এখনও হারিয়ে যায়নি। তার সেই বোধের কাছে রাষ্ট্রের মানবিকতাবোধ চাপা পড়ে যায়, পরাজিত হয়। এই বোধে উদ্বুদ্ধ হয়েই মেহেরজুই নির্মাণ করেন দ্য কাউ (১৯৬৯)। যা ইরানের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তৈরি করে এক নতুন দিগন্তের। 

চরম স্বৈরশাসনের মধ্যে মেহেরজুইয়ের এই চলচ্চিত্রটিই পরবর্তীতে ইরানে অনেক স্বাধীনতাকামি চলচ্চিত্রনির্মাতার কাছে মডেল হিসেবে দেখা দেয়। এরই পথ ধরে পরবর্তীতে আব্বাস কিয়োরোস্তামির ব্রেড অ্যান্ড অ্যালি (১৯৭০) এবং হাজির দারউস-এর বিটা (১৯৭২) এর মতো যুগান্তকারী কিছু চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়। কিন্তু এতো কিছুর পরেও শাহ মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভির স্বৈরাচারী মনোভাবের কোনো পরিবর্তন লক্ষ করা যায়নি। বরং ১৯৭২ সালে পারস্য সংস্কৃতির আড়াই হাজার বৎসর উদযাপন উপলক্ষে শাহ মোহাম্মদ রেজা ভাড়া করে আনেন হলিউডের এক পরিচালককে। উদযাপন অনুষ্ঠানের প্রদর্শনীতে তিনি দেখালেন পশ্চিম কীভাবে পারস্যকে উপনিবেশে পরিণত করেছে। এতেই বোঝা যায়, ইরানের জনগণ ও তাদের নিজস্ব চলচ্চিত্র তখনও কতোটা রাষ্ট্রের হাতে নিষ্পেষিত হচ্ছিলো। তবে সরকারের এই দমননীতির বহিঃপ্রকাশে যখন ইরানি জনগণ একেবারে কোণঠাসা হয়ে পড়ে, তখন তারা রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিবর্তনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়। এক পর্যায়ে সরকার বিরোধী আন্দোলনে গড়ে ওঠে সশস্ত্র সংগ্রাম।

এরই ফলে ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শাহ মোহাম্মদ রেজা সরকারকে গণঅভ্যূত্থানের দ্বারা পতন ঘটিয়ে আয়াতুল্লাহ্ খোমেনির নেতৃত্বে ইরানে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামি বিপ্লব। বিপ্লব পরবর্তী কয়েক বছর চলচ্চিত্রের জন্য ছিলো খারাপ সময়। যেকোনো বিপ্লবের পর পরিবর্তনমান সময়টা সাধারণত অস্থির হয়। ইরানের ক্ষেত্রেও তেমনই ঘটেছিলো। বিদেশী ছবির প্রদর্শন নিষিদ্ধ হয়। নারীকে ঢাকা হয় বোরকার কালো সন্ত্রাস দিয়ে। উদার মানবিক মূল্যবোধের মানুষ, বিশেষত বুদ্ধিজীবীদের ওপর নেমে আসে ধর্মের খড়গ। বিপ্লব পরবর্তী কয়েক বছর চলচ্চিত্র নির্মাণের সংখ্যা এসে দাঁড়ায় বছরে চার-পাঁচটি। এতো দমন ও নিপীড়নের পরও ইরানি চলচ্চিত্র-নির্মাতাদের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ হয়নি। বছরের পর বছর যতোই গড়াতে থাকে অবস্থা ধীরে হলেও পাল্টাতে থাকে। বিদেশী ছবি নিষিদ্ধ হওয়ায় দেশীয় ছবির প্রতি দর্শকদের আগ্রহ দেখা দেয়। ইরানের চলচ্চিত্রকাররা এই সুযোগ নিতে একটু কার্পণ্য করেননি। তারা আবার ফিরে গিয়েছিলো বিপ্লবের ১০ বছর আগে মেহেরজুইয়ের হাত ধরে শুরু হওয়া নতুন চলচ্চিত্রের কাছে।  

 

হাল ধরেছিলেন মেহেরজুই

একটি দেশে যখন খারাপ অবস্থা বিরাজ করে, তখন কোনো না কোনো নেতৃত্ব দাঁড়িয়ে যায় সেই খারাপ অবস্থার পরির্বতনে। এই খারাপ অবস্থা হতে পারে কখনও রাজনৈতিক, কখনও সামাজিক, সাংস্কৃতিক কিংবা অর্থনৈতিক। ইরানের খারাপ অবস্থা ছিলো সবদিক থেকেই। আগেই বলেছি, ইসলামি বিপ্লবের প্রায় ১০ বছর আগে ইরানের চলচ্চিত্রনির্মাতারা উজানে চলতে শুরু করেছিলেন। সেই ১৯৬৯ সালে এই উজানযাত্রায় কাণ্ডারি ছিলেন দারিয়ুস মেহেরজুই। তার ব্যবহৃত চলচ্চিত্র হাতিয়ারের প্রথম নির্মাণ ছিলো দ্য কাউ (১৯৬৯)। যা দিয়ে ইরানে আজকের জাতীয় চলচ্চিত্রের যাত্রা শুরু হয়েছিলো। ভাবুন, রাষ্ট্রের প্রচলিত মানবিকতা যখন নাগরিকদের ঘৃণার পাত্র, ঠিক তখন কত্তো (!) বড়ো সাহস নিয়ে তিনি দেখালেন সামান্য পশুর প্রতি ভালোবাসা, মানবিকতা।    

ছবিটির কাহিনী দক্ষিণ ইরানের বিচ্ছিন্ন একটি গ্রামের সহজ সরল অধিবাসী হাসান ও তার গরুর মধ্যকার সম্পর্ককে নিয়ে। গরুটিকে অত্যন্ত মমতার সঙ্গে লালন-পালন করে হাসান। দেখলে যেনো মনে হয়, সে গরুটিকে তার নিজের চাইতেও বেশি ভালোবাসে। সামান্য এই পশুর প্রতি সরল-সুন্দর-প্রগাঢ় সম্পর্ক দেখে প্রতিবেশীরা আশ্চর্য বনে যায়। হাসান একটি কাজে বাড়ির বাইরে থাকলে, একদিন সকালে গ্রামের মানুষ দেখতে পায়-গোয়ালঘরে গরুটি মরে পড়ে আছে। গ্রামের মানুষ হাসানের অনুপস্থিতিতে গরুটিকে কবর দেয়। হাসানের কথা চিন্তা করে, গ্রামের মানুষ বুদ্ধি করে তাকে বলে-গরুটি পালিয়ে গেছে। কিন্তু হাসান ঠিকই বুঝতে পারে, তার আদরের গরু আর নেই। এরপর সে পাগলের মতো গরুর কবর খুঁজতে থাকে। শেষ পর্যন্ত প্রিয় গরুর কবর খুঁজে না পেয়ে, হাসান আত্মহত্যা করতে উদ্যত হয়। তবে শেষাবধি হাসানের বন্ধুরা তাকে ওই পথ থেকে ফিরিয়ে আনে। মোটাদাগে এই ছিলো দ্য কাউ-এর কাহিনী। দ্য কাউ ছিলো সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত ইরানের প্রথম চলচ্চিত্র।

মজার ব্যাপার হলো, সরকারের টাকা নিয়ে সরকারকে কটাক্ষ করেই চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন মেহেরজুই। জনগণের মঙ্গলের নাম করে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র যখন সেই নাগরিকদের ওপর চালাচ্ছিলো দমন-পীড়ন, হত্যা-তখন মেহেরজুইয়ের সাহস দেখে অবাকই হয়েছিলেন নাগরিকেরা। তবে একটু দেরিতে হলেও মেহেরজুইয়ের প্রতিবাদ বুঝতে পেরেছিলো পাহলভি সরকার। রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে তৈরি হলেও রাষ্ট্র তথা শাসকদের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে-এই অজুহাতে ইরানে নিষিদ্ধ করা হয় দ্য কাউ

এখানে একটি কথা না বললেই নয়, চলচ্চিত্রটি অনন্য হয়ে ওঠার পিছনে ইরানি সাহিত্যের এক বিশেষ ভূমিকা ছিলো। বলা চলে, চলচ্চিত্রের প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে দেশটির প্রাচুর্যময় সাহিত্য। দ্য কাউ-এর কাহিনী নেওয়া হয়েছিলো সাহিত্যিক গোলাম হোসেন সাইদির ছোটগল্প থেকে। পৃথিবীর খুব কম দেশই রয়েছে যাদের চলচ্চিত্রের ভিত্তিভূমি নির্মাণে সে-দেশের সাহিত্য এতোটা প্রভাব রেখেছে। বলা যায়, অনেকটা সাহিত্যের সঙ্গে গভীর আত্মিক সম্পর্কের মধ্য দিয়েই মেহেরজুই সচেষ্ট হয়েছিলেন তার-মানে, ইরানের চলচ্চিত্র নির্মাণে। আর এই পথ পরিক্রমার মধ্য দিয়েই ইরানের চলচ্চিত্র আধুনিক চলচ্চিত্রের পথে যাত্রা শুরু করে। একথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে আহমেদ সামলু, নিমা ইউসজি, পারোখ্ ফারখযাদের মতো কবি; সাদেম হেদায়েত, হোউসাং গোশিরির মতো গল্পকার; ঔপন্যাসিক জালাল আলি আহেমেদের সমাজভাবনা ইরানের নতুন চলচ্চিত্রের প্রথম প্রজন্মের নির্মাতাদের মানস জগত তৈরি করে দিয়েছে এবং আজও সে-ধারা কমবেশি অব্যাহত।

ইরানে সাহিত্য নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের পথিকৃৎ দারিয়ুস মেহেরজুই তার সৃজনশীলতা দিয়ে চলচ্চিত্রের সঙ্গে যোগ করেছিলেন বাস্তববাদ, প্রতীকীবাদের মতো বিষয়গুলোকে। আর সিনেমা যে-অসংখ্য শিল্পমাধ্যমের সূক্ষ্ম উপস্থাপন হতে পারে তাও তিনি তুলে এনেছিলেন সরস ভঙ্গিমায়। এজন্য তাকে জগতখ্যাত চলচ্চিত্রনির্মাতা রবার্তো রোসেলিনি, ভিত্তেরিয়ো ডি সিকা ও সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গেও তুলনা করা হয়। কিন্তু তার চলচ্চিত্রে, বিশেষ করে ইরানের মূলধারার বাইরে এসে পার্থক্যসূচক কিছু বিষয় যুক্ত হওয়ায় তাকে চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রধান আধুনিক ধারার জনক বলে বিবেচনা করা হয়। তার উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে-পোস্টচি (১৯৭০), আগা ইয়ে হাল (১৯৭০), দ্য সাইকেল (১৯৭৩), হায়াত-ই-পসতি মদরিসি ইয়ে-আদ-লি আফ্গ (১৯৮০), সিরক (১৯৮৮), হামুন (১৯৯০), পারি (১৯৯৫) ইত্যাদি।

মহান এই চলচ্চিত্রকার ইরানের তেহরানে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে ১৯৩৯ সালের ৮ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তার বেড়ে উঠার সময়ে চলচ্চিত্র নিয়ে সারা বিশ্বে দাপিয়ে বেড়াচ্ছিলো হলিউড। তাই দেখেই হয়তো এক পর্যায়ে চলচ্চিত্রের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন মেহেরজুই, বিশেষ করে হলিউডের চলচ্চিত্রের ওপর। প্রস্তুতি চলতে থাকে, বিদেশি চলচ্চিত্রকে ভালোভাবে বোঝার জন্য তিনি ইংরেজি সাহিত্য চর্চা শুরু করেন। ১৯৫৯ সালে চলচ্চিত্রনির্মাতা হওয়ার স্বপ্নে পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে ভর্তি হন ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস এঞ্জেলস (ইউসিএলএ)-এর চলচ্চিত্র অধ্যয়ন বিভাগে।

ইউসিএলএ-তে মেহেরজুই শিক্ষক হিসেবে পান বিখ্যাত ফরাসি চলচ্চিত্রনির্মাতা জ্যঁ রেনোয়াকে। এ-সময় তিনি অভিনেতাদের সঙ্গে কাজ করার কৌশলসহ আরও নানা বিষয় শিখে নেন তার কাছে। তবে চলচ্চিত্র নিয়ে পড়াশোনার অনেক আগ্রহ থাকলেও, হলিউডি ধারায় চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তুর চেয়ে কারিগরি দিকের ওপর অত্যধিক গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতাটি তিনি মেনে নিতে পারেননি। এমনকি এ-ধরনের চিন্তাকে পুঁজি করে শিক্ষকদের পড়ানোর যে-ধরন, সেটিও ছিলো তার অপছন্দ। এ-কারণে ১৯৬৪ সালে চলচ্চিত্র অধ্যয়ন বাদ দিয়ে মেহেরজুই ওই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনের ওপর ডিগ্রি নেন। একই বছরে তিনি ফার্সি সাহিত্যের ওপর ইংরেজি ভাষায় একটি পত্রিকা বের করেন; উদ্দেশ্য ছিলো পারস্যের সমৃদ্ধ শিল্প-সাহিত্য সম্পর্কে পশ্চিমাদের জানান দেওয়া।

১৯৬৫ সালে দেশে ফিরে আসেন মেহেরজুই। তবে আসার আগ মুহূর্তে আমেরিকায় বসেই রচনা করেন জীবনের প্রথম চিত্রনাট্য। দেশে ফিরে এসে তিনি প্রথমে সাংবাদিকতা এবং পরে চিত্রনাট্যকার হিসেবে চাকরি জীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৮ এই দুই বছর তেহরানে বিদেশি ভাষা অধ্যয়ন কেন্দ্রে শিক্ষকতা করেন ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের ওপর। এরই ফাঁকে ১৯৬৬ সালে মেহেরজুই নির্মাণ করেন জেমস বন্ড সিরিজের প্যারোডি, ডায়মন্ড ৩৩ নামের চলচ্চিত্র। আর এর মধ্য দিয়েই চলচ্চিত্রকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে পশ্চিমাপড়ুয়া মেহেরজুই-এর। তবে এই চলচ্চিত্রটি আর্থিকভাবে সাফল্য লাভে ব্যর্থ হয়। না হওয়ার হয়তো কারণও ছিলো, পশ্চিমে পড়াশোনা করলেও মেহেরজুই কখনই হলিউডের ওই ধারা মেনে নিতে পারেননি। তাই তার বানানো ডায়মন্ড ৩৩-এ ছিলো ইরানি আয়োজন, তাই হয়তো হলিউডি সিনেমার ইরানি প্যারোডি সংস্করণকে গ্রহণ করেনি দেশটির দর্শক। অবশ্য এতে নিরাশ হননি মেহেরজুই। তার পরের ছবিই ছিলো দ্য কাউ (গাভ)। এই চলচ্চিত্রটি মেহেরজুইকে এনে দিয়েছিলো জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।

নির্মাণ শেষে দ্য কাউ এক বছর নিষিদ্ধ থাকার পর ১৯৭০ সালে মুক্তি পায়। মজার ব্যাপার হলো, যে-সরকার অনুদানের এই চলচ্চিত্রটি নিষিদ্ধ করেছিলো, তারাই আবার উৎসব আয়োজন করে এই চলচ্চিত্রটিকে পুরস্কৃত করে। তবে নিজ দেশে প্রশংসিত হলেও এই চলচ্চিত্রটিকে বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজটি এতো সহজ ছিলো না। কারণ, সরকার তখন পর্যন্ত দ্য কাউ-কে দেশের বাইরে পাঠানোর অনুমতি দেয়নি। তারপরও সরকারের চোখ ফাঁকি দিয়ে ১৯৭১ সালে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে চলচ্চিত্রটি পাঠানো হলে সেখানে বেশ কয়েকটি পুরস্কার জিতে নেয় দ্য কাউ। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক সমালোচক পুরস্কার অন্যতম। এছাড়াও পরের বছরে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত শিকাগো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে চলচ্চিত্রটির প্রধান অভিনেতা ইন্তেযামি সেরা অভিনেতার পুরস্কার লাভ করেন। 

দ্য কাউ ছাড়াও সেই সময় নির্মিত মাসুদ কিমাইস-এর কুয়েভসার ও নাসির তাকভাই-এর কাম ইন ফ্রন্ট অব আদারস চলচ্চিত্র দুটি ইরানের নিউওয়েভ সিনেমার আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলো। দ্য কাউ-এ বাণিজ্যিক কোনো উপাদান না থাকলেও দেশের অগণিত সাধারণ মানুষ খুব উৎসাহ নিয়ে তা দেখেছিলো। তাই দ্য কাউ-এর সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে পরের বছরই মেহেরজুই নির্মাণ করেন আগা ইয়ে হালু (১৯৭০) ও দ্য পোস্টম্যান (১৯৭০)। একটু বিরতি দিয়ে ১৯৭৩ সালে মেহেরজুই শুরু করেন স্থানীয় ব্লাড ব্যাঙ্কে বেআইনি ও অনিরাপদ রক্তদানের কাহিনী অবলম্বনে দ্য সাইকেল। চলচ্চিত্রটি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অনুদানে থাকা সত্ত্বেও ইরানি চিকিৎসক সংস্থার চাপের মুখে তিন বছর নিষিদ্ধ করে সরকার। অবশ্য শেষ পর্যন্ত ইরানের বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার সাহায্যে ১৯৭৭ সালে ছবিটি নির্মাণের অনুমতি মেলে। চলচ্চিত্রটি নির্মাণের পর এর প্রথম প্রদর্শন করা হয় প্যারিসে। ছবিটিকে অনেকে লুই বুনুয়েলের লস অলভিদাদোস (Los Olvidados) এর সঙ্গে তুলনা করেন। এখানে একটি বিষয় না বললেই নয়, চলচ্চিত্রের পুরো কাজের সঙ্গে সবসময় মেহেরজুইয়ের পাশে ছিলেন তার সাহিত্যিক বন্ধু গোলাম হোসেন সাইদী। সরকার বিরোধী এই মানুষটিকে ইরানের স্বৈরাচারী সরকার কারাগারে পুরেছিলো কমপক্ষে ১৬ বার। নাট্যকার, বিপ্লবী এই মানুষটি মেহেরজুইয়ের পাশে থেকে আরেক ধরনের বিপ্লবকে সহায়তা করেছিলেন একাগ্রচিত্তে।

১৯৮১ সালে স্বপরিবারে প্যারিসে যান মেহেরজুই। তিনি সেখানে ভয়েজ আউ পেজ দি রিমবাউদ (১৯৮৩) নির্মাণ করেন। দেশে ফেরেন ১৯৮৫ সালে, নির্মাণ করেন হামুন (১৯৯০) ও পারি (১৯৯৫)। এরপরও দারিয়ুস মেহেরজুই নির্মাণ করে চলেছেন একের পর এক দৃষ্টিনন্দন চলচ্চিত্র। যা কিনা তাকে তার স্বদেশ ও বিশ্বের অগণিত চলচ্চিত্রপ্রেমীদের অন্তরে ঠাঁই করে রাখবে।

 

শেষ কথা

বর্তমান সময়ে বিশ্ব রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ নাম ইরান। পরমাণু স্থাপনা থেকে শুরু করে বিশ্বে নানা ধরনের কার্যকলাপে পশ্চিমা মোড়ল ও তোষামদকারীদের একেবারে ঘুম হারাম করে দিয়েছে দেশটি। তবে ইরান এখন শুধু সামরিক দিক দিয়েই নয়, সংস্কৃতির প্রধান অনুষঙ্গ হয়ে চলচ্চিত্র এগিয়েছে অনেক দূর। আর তাই হয়তো আন্তর্জাতিক নানা আসরে হলিউডসহ পশ্চিমের বিভিন্ন ছবিকে পিছনে ফেলে ইরানি ছবি প্রমাণ করছে তাদের আড়াই হাজার বছরের পুরনো পারস্য সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে। তবে বলতে দ্বিধা নেই-আজকের চলচ্চিত্রনির্মাতাদের এই এগিয়ে চলার শুরু করেছিলেন মেহেরজুই। হাজারো বিক্ষুব্ধ পথ পাড়ি দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেন নিজ দেশের চলচ্চিত্রকে। চলচ্চিত্রের জন্ম পাশ্চাত্যে হলেও প্রাচ্যের বুকে নিজ সংস্কৃতির মধ্যে আবর্তিত থেকেও ইরানের চলচ্চিত্রের ভাষা ও আঙ্গিক যোগ করেছে এক নতুন মাত্রা। খোদ রাষ্ট্রের চেয়ে চলচ্চিত্রের দাপট বেশি, এর কাছে রাষ্ট্র যে-ধরাশায়ী তাই বারবার প্রমাণ করেছে মেহেরজুই ও তার উত্তরসূরীরা। যা বিশ্বের চলচ্চিত্রপ্রেমীদের অনুপ্রাণিত করেছে, করছে এবং করবে অনেক কাল। মহাকাল মেহেরজুইদের এভাবেই স্মরণ করে।  

 

লেখক : আশফাক দোয়েল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।

ashfaquldoyel@yahoo.com

 

তথ্যসূত্র

১. রিবেরু, বিধান (২০১১ : ১১৩; ইসলামী বিপ্লবোত্তর ইরানি চলচ্চিত্র : পশ্চিমা ভুরুর আকাশে উড্ডয়ন;চলচ্চিত্রের পাঠ সহায়িকা; রোদেলা প্রকাশনী, ঢাকা।

২. মানজারেহাসীন;সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের জাতীয় চলচ্চিত্র;যোগাযোগ; সম্পাদনা-ফাহমিদুল হক; সংখ্যা-৭, ফেব্রুয়ারি-২০০৫, পৃষ্ঠা : ৪৭-৪৮, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

৩. প্রাগুক্ত; মানজারেহাসীন (২০০৫ : ৪৬)।


বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৩ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের চতুর্থ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন