Magic Lanthon

               

আসাদ লাবলু

প্রকাশিত ০৭ ডিসেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

বাংলাদেশের নতুন চলচ্চিত্র

সূচনার প্রারম্ভে আত্মতৃপ্তির উঁকিঝুঁকি

আসাদ লাবলু


১.

সমাজের একটি উপাদানের আরেকটি উপাদান সম্পর্কিত-জগতের এ সূত্র আমরা সবাই মোটামুটি মেনে চলি। আর এ সূত্রের অধীনেই অনেকগুলো উপাদানের সম্মুখ যাত্রায় একেক সময়ে এসে অন্তহীন গন্তব্যের এক-একটি পর্যায়ে পৌঁছা যায়। যে উপাদানগুলো এ যাত্রা থেকে ছিটকে পড়ে, চলার একপর্যায়ে তারই অভাববোধ হয়।এ শূন্যতার পূর্ণতা সম্ভব। তবে তার পূর্বশর্ত হলো-কোন কোন উপাদান খোয়া গেছে তার একটা ফর্দ তৈরি করা। শূন্যতার বিপরীতে একটি উপাদান এনে যোগ করে দিলেই হয় না। আবার একাধিক উপাদানের অভাব এক উপাদান দিয়ে পূরণও অসম্ভব।

আমাদের চলচ্চিত্রযাত্রার বর্তমান সময়ে এসে আমরা অনেক উপাদানের অভাব বোধ করছি। অভাব পূরণের একটা প্রচেষ্টা চোখের সামনে স্পষ্টত দেখাও যাচ্ছে। কিন্তু সতর্কতার জায়গা হলো, খোয়া যাওয়া উপাদানগুলো আমরা সনাক্ত করতে পেরেছি কি না! পারলেও কতোখানি? আবার সবগুলো পারলেও কতোগুলো উপাদান পূরণের লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে নির্ধারণ করেছি? চলচ্চিত্রযাত্রার আমরা ঠিক কোন্‌ পর্যায়ে আছি এবং কোন্‌ দিকে যাচ্ছি-এর একটা জবাব পেতে হলে আগের প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা জরুরি। না হলে অভাবকে সচ্ছলতা ভেবে দিনের পর দিন পথ চলতে হবে। আজকের আলোচনায় আমার ইচ্ছে এটি দেখা যে, সম্প্রতি চলচ্চিত্র নিয়ে আমাদের ভিতরে কোনো ধরনের সচ্ছলতার বোধ চলে এসেছে কি না? এক্ষেত্রে আমি বর্তমান সময়ে নির্মিত কিছু চলচ্চিত্র নিয়ে কথা বলবো; অবশ্য অনেকে এগুলোকে নতুন চলচ্চিত্র বলছেন। পাশাপাশি দেখার চেষ্টা করবো এসব চলচ্চিত্রকে ঘিরে সংশ্লিষ্টদের ভাবনা-চিন্তা। তবে নতুন চলচ্চিত্র কী-এ নিয়ে আমি এ লেখায় কোনো সংজ্ঞায় যাবো না। পুরো লেখা জুড়েই এ নিয়ে নানা বৈশিষ্ট্যের উপস্থাপন থাকবে।

২.

গত বছর(২০১২)কালের কণ্ঠ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি খবরে বলা হয়েছে,২০১৩ সালটাই হবে চলচ্চিত্রের চূড়ান্তভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর সময়।কিছু পরিসংখ্যান দিলেই বিষয়টি আরো পরিষ্কার হবে। এ বছর(২০১২)এখন পর্যন্ত মুক্তি পেয়েছে প্রায় ৪৫টি ছবি। নির্মাণাধীন এবং সামনের বছর(২০১৩)মুক্তির অপেক্ষায় আছে কিছু ছবি,যার প্রতিটিরই কোনো না কোনো ভালো বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এ রকম ছবির সংখ্যা প্রায় ৩৫।আগামী বছর(২০১৩)জুড়ে যদি এ ছবিগুলো মুক্তি পেতে থাকে তাহলে দর্শকদের রুচি যেমন বদলে যাবে, বদলে যাবে সিনেমা ব্যবসার আদি অনেক ফর্মুলাও। ছবিগুলোর মধ্যে রয়েছে রেদোয়ান রনির চোরাবালি,ইফতেখার চৌধুরীর দেহরক্ষী,মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর টেলিভিশন,সামুরাই ফারুকের পারলে ঠেকা,মুহাম্মদ মোস্তফা কামাল রাজের ছায়া-ছবি,সানিয়াত হোসেনের অল্প অল্প প্রেমের গল্প,নঈম ইমতিয়াজ নেয়ামুলের এক কাপ চা স্বপন আহমেদের পরবাসিনী,সাফিউদ্দীনের পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনী,অনন্য মামুনের মোস্ট ওয়েলকাম ২,সোহেল আরমানের এই তো প্রেম,অনিমেষ আইচের না মানুষ,নাবিল আশরাফের ভালোবাসার রংধনু,খালিদ মাহমুদ মিঠুর জোনাকির আলো,শঙ্খ দাশগুপ্তর হ্যালো অমিত,শাহীন কবির টুটুলের এই তো ভালোবাসা,আফসানা মিমির রান,তন্ময় তানসেনের পদ্ম পাতার জলরান আউট, রিপন মিয়ার তুমি সন্ধ্যারও মেঘমালা,শাহীন সুমনের অন্য রকম ভালোবাসা,জাকির হোসেন রাজুর পোড়ামন ও প্রশান্ত অধিকারীর হাডসনের বন্দুক

এখন, যে চলচ্চিত্রগুলো মুক্তি পায়নি সেগুলো কেমন হবে, তা তো আর এখনই বলা সম্ভব হচ্ছে না। তাই যেগুলো মুক্তির পর প্রদর্শন হয়েছে সেগুলো নিয়েই কথা বলতে হবে। এখানে দেখার বিষয় মুক্তি পাওয়া চলচ্চিত্রগুলো নিয়ে কী কী মন্তব্য-বক্তব্য এসেছে। এবং সেগুলো যথার্থ কি না! আর যদি ধরেও নিই, আমাদের চলচ্চিত্র যে অর্থে খারাপ ছিলো,এই চলচ্চিত্রগুলো সেই অর্থে ভালো;সেক্ষেত্রে এই ভালো চলচ্চিত্রগুলো আমাদের চলচ্চিত্র-শিল্পে সচ্ছলতা আনার জন্য যথেষ্ট কি না?

উল্লিখিত চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আশার কথা শুনেছি চোরাবালি, টেলিভিশনদেহরক্ষী-এই তিনটি নিয়ে। এর বাইরেও তিনটি চলচ্চিত্র নিয়ে বেশ কথা হয়েছে-প্রজাপতি,লালটিপভালোবাসার রঙ। আমি অবশ্য প্রথম তিনটি চলচ্চিত্রের মধ্য থেকে চোরাবালিদেহরক্ষীকে ধরে আলোচনা এগিয়ে নিবো। প্রথমেই দেখে নিই চোরাবালি নিয়ে পরিচালক স্বয়ং কী বলছেন,প্রথম চলচ্চিত্রটি আমার কাছে নিজের সন্তানের মতো। অনেক যত্নে চলচ্চিত্রটি একটু একটু করে নির্মিত হয়েছে। একেবারে তুচ্ছ থেকে শুরু করে সবগুলো ক্ষেত্রেই সুতীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছিলো আমাদের। একটি পূর্ণাঙ্গ সফল চলচ্চিত্র নির্মাণই ছিলো আমার প্রথম লক্ষ্য। ছবিটি ৩৫ এমএম প্রযুক্তিতে তৈরি করেছি। কিন্তু এখন যেহেতু কিছু প্রেক্ষাগৃহে ডিজিটাল প্রযুক্তি সংযোজন করা হয়েছে,তাই সব প্রেক্ষাগৃহের জন্য ছবির প্রিন্ট ডিজিটাল প্রযুক্তিতে সরবরাহ করা হয়েছে। ভারতের প্রসাদ ল্যাব এবং কারিগরি সহযোগিতায় নির্মিত একটি ব্যতিক্রমধর্মী ছবি এটি। মুক্তির আগে চোরাবালি নিয়ে পরিচালকের এ মূল্যায়নে এটুকু বোঝা গেলো যে, তিনি সন্তুষ্ট এবং তিনি ঠিক যেভাবে বানাতে চেয়েছিলেন, সেভাবেই চলচ্চিত্রটি বানিয়েছেন।

এবার দেখি মুক্তির পর নির্মাতার অনুভূতি কী,আমার প্রথম চলচ্চিত্র চোরাবালি এখন তা প্রদর্শিত হচ্ছে। অনেক যত্নে গড়া এ চলচ্চিত্রটি নিয়ে আমার প্রত্যাশা অনেক ছিল এবং সফলতা পেয়েছি তারচেয়েও বেশি। ...হত্যা,সংঘর্ষ ও প্রেম-এই তিন মিলে শ্বাসরুদ্ধকর, অ্যাকশন, থ্রিলার চলচ্চিত্র চোরাবালি। তিনি চোরাবালি নিয়ে আরো বলেছেন,দর্শকরা প্রত্যাশার চেয়ে বেশি কিছু পাবেন ছবিতে। চোরাবালির প্রোমো দেখে অনেকে বাহ বাহ দিলেও আসল চমক দেখা যাবে প্রেক্ষাগৃহে। তারা বুঝবেন এটা নতুন দিনের ছবি। আমি বিশ্বাস করি দর্শক এ ধরনের ছবির জন্য অপেক্ষা করেন। ...বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পে একটা পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে চোরাবালি

এই হলো চোরাবালিকে ঘিরে পরিচালক রেদোয়ান রনির মূল্যায়ন ও আত্মতৃপ্তি! আর কী লাগে!এবার তাহলে দেখি,যে চলচ্চিত্রকে ঘিরে একজন পরিচালক এতো তুষ্ট, কী আছে সেই চলচ্চিত্রে? চোরাবালির কাহিনীসংক্ষেপ এমন-

রাজনীতিবিদ ওসমান গণির (শহীদুজ্জামান সেলিম) ডান হাত হিসেবে কাজ করেন সুমন (ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত)। তিনি খুন, চাঁদাবাজিসহ সবকিছুই করেন গণির ইশারায়। নবিনী আফরোজ (জয়া আহসান) তরুণ সাংবাদিক। তিনি গণির অপকর্ম নিয়ে একাধিকবার পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ করেন। এদিকে গণির বান্ধবী সুজানা (প্রিয়া)উঠতি মডেল। সুজানা একসময় জানতে পারেন,তার গর্ভে গণির সন্তান।গণি তাকে সন্তান নষ্ট করতে চাপ দেন। কিন্তু সুজানা রাজি হন না। পরে গণির নির্দেশে সুজানাকে হত্যা করেন সুমন। ঘটনাচক্রে সুজানার জীবনের মধ্যে সুমন খুঁজে পান তার মায়ের প্রতিচ্ছবি;যে স্বামীহারা মা গ্রাম্য সালিশে মোড়লের ষড়যন্ত্রে দোররার আঘাত না সইতে পেরে মারা গিয়েছিলেন। মায়ের মৃত্যু সইতে না পেরে শিশু সুমন খুন করেছিলেন সেই মোড়লকে। এরপর আরেকটি খুন সুমনকে নিয়ে যায় গণির কাছে-এই হলো সুমনের অপরাধী হয়ে ওঠা।

সুজানার গর্ভের সন্তান গণির-নবিনী এমন খবর প্রকাশ করেন পত্রিকায়। গণি ক্ষুব্ধ হয়ে সুমনকে পাঠান নবিনীকে খুন করতে। কিন্তু খুন না করে সুমন তাকে একটি নির্জন জায়গায় আটকে রাখেন। একপর্যায়ে তারা প্রেমে জড়িয়ে পড়েন। নবিনী সুমনকে রাজসাক্ষ্য দিতে বলেন। একপর্যায়ে নবিনীকে রেখে সুমন দেখা করতে যান গণির সঙ্গে। এদিকে গণির লোকেরা এসে নবিনীকে ধরে নিয়ে যায়। নবিনীকে বাঁচাতে সুমনের সঙ্গে গণির সামনা-সামনি বন্দুকযুদ্ধ হয়।একসময় সুমন নবিনীকে নিয়ে পালিয়ে যান। পরে রাতে গণিকে খুন করতে আসেন সুমন। কিন্তু সুমন গুলি করার আগেই তার দেহরক্ষীর গুলিতে গণি মারা যান। আদালতে রাজসাক্ষ্য দিলে সুমনের অল্প সাজা হয়।সাজা খেটে কয়েক বছর পর সুমন মুক্তি পান,জেল গেটে দাঁড়িয়ে নবিনী ফুল হাতে তাকে বরণ করে নেন।

এই হলো রেদোয়ান রনির সফল চোরাবালির সারাংশ। এখন একটু কল্পনার আশ্রয় নিই। চোরাবালিতে টালিগঞ্জের ইন্দ্রনীলের জায়গায় প্রথমেই বসিয়ে দিই শাকিব খান,আলেকজান্ডার কিংবা নায়ক মেহেদীকে। আর ডিজিটাল ফরমেটে প্রজেকশনের বিপরীতে ভাবি ৩৫ মিলিমিটারে। কারিগরি সহযোগিতায় কলকাতার প্রসাদ ল্যাবের জায়গায় নিই এফডিসির মান্ধাতা আমলের ল্যাব। এসব মিলিয়ে একই কাহিনী দিয়ে চোরাবালি বানালে তার রূপ কী হতো,সেটি একবার চিন্তা করে দেখুন!আমি মোটেও বলছি না,চলচ্চিত্রের কাহিনীই সব। টাইটেল কার্ডে যতোগুলো শাখা-প্রশাখার উল্লেখ করতে হয়,একটি ভালো চলচ্চিত্র নির্মাণে তার সবগুলোর সুষম মিশ্রণ লাগে। শুধু এটুকুই নয়,দর্শক যে চেয়ারে বসে চলচ্চিত্রটি দেখবে,সেই চেয়ারে ছারপোকা আছে কি না-তা খতিয়ে দেখাও এক্ষেত্রে সমান গুরুত্বপূর্ণ। এসব কথায় পরে আসছি। কাহিনীর কথা আগে বলে নিই। তাই আরো দু-একটি চলচ্চিত্রের কাহিনী-সংক্ষেপ বলা জরুরি মনে করছি।

চলচ্চিত্রের নাম দেহরক্ষীববি গায়িকা। অন্ধকার জগতের মানুষ মিলন পছন্দ করেন তাকে। কিন্তু মিলনকে পছন্দ করেন না ববি। বাবার চিকিৎসার ব্যয় বহন করার জন্য বিভিন্ন হোটেলে শো করেন তিনি। এর মধ্যে বেশ কয়েকবার ববির ভালোবাসা আদায় করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন মিলন। ফলে একদিন তিনি কিডন্যাপ করেন ববির বাবাকে। এদিকে বাবাকে ফিরে পাওয়ার জন্য মিলনের সঙ্গে ভালোবাসার মিথ্যা অভিনয় শুরু করেন ববি। এর মধ্যে মিলন একবার দেশের বাইরে যান। তিনি দেশে না থাকলে প্রতিদ্বন্দ্বী আরেক গডফাদার সিজার তুলে নিয়ে যেতে পারেন ববিকে-এমন আশঙ্কা ছিলো মিলনের মনে। তাই তিনি ববির দেখভালের জন্য দেহরক্ষী হিসেবে নিয়োগ দেন মারুফকে। এই হলো দেহরক্ষীর প্রেক্ষাপট। এভাবে একের পর এক কাহিনী দিলে পাঠক বিরক্ত হতে পারেন। প্রজাপতি,লালটিপ,ভালোবাসার রঙ চলচ্চিত্রগুলোও কাহিনীর দিক থেকে উল্লিখিত চলচ্চিত্রের কাহিনীকে অতিক্রম করতে পারবে না-এ কথা বললে খুব বেশি অন্যায় হবে না।

এখন প্রশ্ন, যে চলচ্চিত্রগুলোকে গতানুগতিক বলার আগ্রহ দেখালাম, সেগুলো যে দর্শকের ভালো লাগেনি তা কে বললো? আমি ব্যক্তিগতভাবে চোরাবালি সম্পর্কে অনেকের অনুভূতি জানতে চেয়েছিলাম। তারা (এরা অবশ্য বেশিরভাগই ঢাকার প্রেক্ষাগৃহের দর্শক) অনেকেই এর ন্যারেশন, দৃশ্যায়ন, সিনেমাটোগ্রাফি, শব্দ প্রক্ষেপণের প্রশংসা করলেও সবমিলিয়ে খুব বেশি সন্তুষ্ট হয়েছেন বলে মনে হয়নি। অনেকে আবার উপহাস করে চলচ্চিত্রটিকে আকর্ষণীয় বোতলে পুরনো মদ বিক্রির কথা বলেছেন।

এবার ডিজিটাল চলচ্চিত্র খ্যাত দেহরক্ষী মুক্তির পর প্রেক্ষাগৃহের অবস্থা ও এর প্রধান চরিত্র অভিনেতা মিলনের মূল্যায়ন শুনবো-ডিজিটাল প্রযুক্তিতে রেকর্ডসংখ্যক প্রেক্ষাগৃহে চলতি এ ছবিটি নিয়ে প্রথমেই আশাহত হয়ে যান চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা। মানবজমিন প্রতিবেদক রাজধানীর একটি সিনেমা হলে ছবিটি মুক্তির দিন দেখেছেন। সেদিন প্রতিটি প্রদর্শনীতেই প্রেক্ষাগৃহ অর্ধেকের বেশি ছিল ফাঁকা। দ্বিতীয় দিন অর্থাৎ শনিবারের অবস্থা ছিল আরও খারাপ। ...এ বিষয়ে মিলনের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন,আমরা দর্শকদের বোকা মনে করি। আসলে দর্শক যে খুব চালাক তা আরও একবার প্রমাণ হলো। আমি প্রেক্ষাগৃহে ছবিটি যখন দেখি,অর্ধেক দেখে আমারই মন খারাপ হয়েছে।

এতোক্ষণের আলোচনা দিয়ে আমি আসলে আপনাদের এই সম্মতি আদায়ের চেষ্টা করলাম যে, কাহিনীগত দিক থেকে নতুন দিনের এ চলচ্চিত্রগুলো আশান্বিত হওয়ার মতো খুব একটা কিছু করতে পারছে না। তাহলে প্রশ্ন, কী জন্য এগুলো নতুন দিনের চলচ্চিত্র? তা কী পরিবর্তন এনেছে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আশাহত হওয়া ছাড়া উপায় দেখছি না। চোরাবালি কিংবা দেহরক্ষীতে চলচ্চিত্রের মোটাদাগের যে পরিবর্তন তা কেবলই প্রাযুক্তিক। কিন্তু চলচ্চিত্রতো কেবল প্রযুক্তি নয়,এর সঙ্গে চলচ্চিত্রের ভাষা ও তার আঙ্গিক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাহলে বাংলাদেশের আগের সেইসব চলচ্চিত্রের (মানে পুরনো) চেয়ে আঙ্গিক,ভাষায় কী পরিবর্তন আনলো চোরাবালি,দেহরক্ষী?

৩.

এখন চোরাবালিসফলতা নিয়ে অনেকে কথা বলতে পারেন। বলতে পারেন, শুধু কলকাতাতেই নয়, ভারতের ইন্দ্রনীল ও বাংলাদেশের জয়া আহসান অভিনীত চলচ্চিত্র চোরাবালি আগামী মার্চ (২০১৩) থেকে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে প্রদর্শিত হবে। এরই মধ্যে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের সিনেমা হলগুলোতে মুক্তির তারিখসহ সিনেমা হলগুলো ট্রেইলর প্রচার শুরু হয়েছে। এ প্রসঙ্গে চোরাবালির অভিনেত্রী জয়া আহসান বলেন, এটি সত্যিই আনন্দের বিষয়। আমাদের চলচ্চিত্র বাইরের দেশ থেকে আয় শুরু করলে অনেক বড় বাজেটের ছবির সম্ভাবনা তৈরি হবে। এটি ইতিবাচক সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রশ্ন, আমাদের সাধারণ দর্শক গড়-পড়তা কতোজন চোরাবালি দেখতে প্রেক্ষাগৃহে এসেছেন? এখন আমরা চলচ্চিত্র নির্মাণ করবো, দেখবে বাইরের মানুষ; লাভ কী? ও দিয়ে কেবল প্রযোজক বাঁচে, দর্শক বাঁচে না, প্রেক্ষাগৃহও না। লেখার শিরোনামে আত্মতৃপ্তি বলে একটা শব্দ ব্যবহার করেছি। এটাও কি আত্মতৃপ্তির একটা কারণ?

আলোচনার শুরুতে রেদোয়ান রনির আত্মতৃপ্তি আমরা দেখেছি। এবার প্রজাপতি ও আসন্ন ছায়া-ছবি সম্পর্কে এর পরিচালক মুহাম্মদ মোস্তফা কামাল রাজের অনুভূতিটা একটু জেনে নিই, আমার প্রথম চলচ্চিত্র প্রজাপতির মতো এবারও থাকছে বেশ কিছু চমক। ছায়া-ছবির চলচ্চিত্রের প্ল্যানিং আমার অনেক দিনের। শুধু অপেক্ষায় ছিলাম প্রজাপতির মুক্তি ও পাবলিক রিঅ্যাকশনের। মুক্তির এক সপ্তাহে বলাকা ও সিনেপ্লেক্সে প্রজাপতির জন্য মানুষের যে ঢল দেখেছি, তাতে আমি উজ্জীবিত। শ্রোতা-দর্শক-ভক্তদের এমন সাড়া পাবো সেটা ভাবিনি।

বোঝেন অবস্থাটা!পরিচালক ঢাকার দুটি প্রেক্ষাগৃহের ওপর ভিত্তি করে সামগ্রিক একটা মূল্যায়ন করে বসলেন। আজকাল তো এটি একটা বড়ো সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে,রাজধানী ঢাকা দিয়ে পুরো দেশ বিচার করা হচ্ছে। দুটি প্রেক্ষাগৃহ দিয়ে তো পুরো দেশ চলে না। আবার মানুষের ঢল নিয়েও আমি সন্দিহান। কারণ,জুয়া নাটকের সম্প্রসারিত রূপ (প্রজাপতি) দেখে কারো কাছেই এই ঢলের আভাস পাইনি। বরং ধোঁকাবাজির অভিযোগ শুনেছি অনেকের কাছে। এখন যদি কেউ বলে বসেন,তরুণ এ নির্মাতারা ভালো চলচ্চিত্র কী-তাই বোঝেন না;তবে তাদের বোঝাবেন কী দিয়ে!মুহাম্মদ মোস্তফা কামাল রাজ বললেন,প্রজাপতির মতো তার নতুন চলচ্চিত্রেও (ছায়া-ছবি)বেশকিছু চমক থাকবে। প্রজাপতিতে চমকের কী আছে বুঝলাম না!বরং অনেকে অবাক হয়েছেন এই ভেবে যে,রাজ একটি টিভি-নাটককে টেনে লম্বা করে চলচ্চিত্র নাম দিয়েছেন। দৈর্ঘ্য আর দু-একজন অভিনয়শিল্পীর পরিবর্তন ছাড়া নাটক জুয়ার সঙ্গে চলচ্চিত্র প্রজাপতির তেমন কোনো পার্থক্যতো দেখিনি। অথচ নির্মাতা চরম আত্মতৃপ্তিতে ভুগলেন!শুধু নির্মাতাই নয়,এর বাইরেও অনেকের কণ্ঠে আশার চেয়ে আশ্বস্ততার বাণী বেশি শোনা গেলো। মুহাম্মদ মোস্তফা কামাল রাজের বক্তব্য যে প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে লিখলাম,সেই প্রতিবেদক রিয়াদ খন্দকার সূচনায় লিখেছেন এভাবে,নতুনদের আগমনে এ বছরটি ছিল অনেক বেশি সরগরম,তাদের কাজে গতানুগতিক ধারা থেকে বেরিয়ে আসার সুস্পষ্ট ইঙ্গিতও ছিল। তাই সাড়া জাগানো কয়েকজন তরুণ চলচ্চিত্র পরিচালকদের নিয়ে জমে উঠেছিল চলচ্চিত্র বিষয়ক এই আড্ডা।

তবে এ কথা ঠিক, নতুন দিনের এসব চলচ্চিত্র মানুষের আলোচনায় এসেছে, একধরনের উদ্দীপনাও কাজ করেছে। কিন্তু এর খুব অল্প কৃতিত্ব আমি নির্মাতা বা চলচ্চিত্রকে দিতে রাজি; কারণ, এর বেশিরভাগই প্রচার-প্রচারণার ফল। চোরাবালি নিয়ে প্রচারণায় চিকামারা থেকে শুরু করে অনেক কিছুই হয়েছে। ফলে প্রথম দু-একদিন মানুষ যে চোরাবালি দেখতে প্রেক্ষাগৃহে যায়নি,তা নয়। এতো এতো নাম শুনলাম;দেখিনা জিনিসটা কেমন বানিয়েছে-মূলত এমন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অনেক দর্শকের প্রেক্ষাগৃহে যাওয়া। কিন্তু প্রেক্ষাগৃহফেরত দর্শক অল্প সময়ের মধ্যে রনির ধোঁকাটা ধরে ফেলেন।

৪.

এবার ডিজিটাল প্রযুক্তি বা ফরমেট নিয়ে কথা বলতে চাই। আমাদের চলচ্চিত্র জগতের আবহাওয়া সম্পর্কে কিছু মানুষ এমন ভাব ধরেন যে, আমাদের আকাশ ডিজিটাল ফরমেটের আগমনের অপেক্ষায় ভালো চলচ্চিত্র বর্ষণ করছিলো না। তাহলে এখন ডিজিটাল ফরমেট এসেছে, এখন চলচ্চিত্রের দিন বদলাবে। কিন্তু কিভাবে? বলবেন, ভালো চলচ্চিত্র বানানোর জন্য বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে এ ধরনের একটি সহজলভ্য উপায় দরকার ছিলো। বুঝলাম, মানলামও। কিন্তু এতে বিবর্তনকে বিপ্লব মনে করে আমরা কোনো ভ্রমে পড়ছি না তো? কারণ, চলচ্চিত্রের ফরমেট ৩৫ মিলিমিটার হবে, নাকি ডিজিটাল হবে-তার ওপর প্রেক্ষাগৃহে দর্শকের উপস্থিতি কতোটুকু নির্ভর করে? আর আপনি যখন ডিজিটাল ফরমেটে ইনপুট নিবেন,তার আউটপুটও তো একই উপায়েই হতে হবে। তা না হলে আপনার কষ্ট,উদ্দেশ্য সবই বৃথা যাবে। আমি মোটেও ডিজিটাল ফরমেটকে ছোটো কিংবা গুরুত্বহীন বলছি না। রুচি,মান ও পারিপার্শ্বিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে হলে ডিজিটালাইজেশনের দরকার আছে। তাই বলে একজন পরিচালক কোনো চলচ্চিত্র ডিজিটাল ফরমেটে নির্মাণ করে শিল্পের অনেক দায় থেকে হাঁপ ছেড়ে বাঁচতে পারেন না। আপনি আইপিএলের (ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ)মতো করে বিপিএলের (বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ)আয়োজন করলেন,দামি-দামি খেলোয়াড় আসলো,কিন্তু দর্শক আসলো না;কী করবেন? তার মানে,আপনি হয়তো দর্শকের রুচি,সামর্থ্য,যাতায়াত ইত্যাদি নিশ্চিত করতে পারেননি। তাই দর্শকও আসেনি। চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রেও একই,কেবল ডিজিটাল করলেই কি চলবে?

৫.

এবার প্রেক্ষাগৃহ নিয়ে কিছু বলার প্রয়োজনবোধ করছি। কারণ, বাংলা চলচ্চিত্রের উদ্ধারকল্পে নির্ধারিত আলোচ্যসূচিতে প্রেক্ষাগৃহের অবস্থান উপরের সারিতে। একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের পর এর সফলতা, ব্যর্থতা সবই রচিত হয় ওই প্রেক্ষাগৃহেই। চলচ্চিত্র দেখতে যান না কেনো-এমন প্রশ্নের যতো উত্তর পাওয়া যায়, তার মধ্যে বেশিরভাগই বলেন, হলের পরিবেশ ভালো না। পরিবেশ ভালো বলতে আসলে দর্শক কী বোঝান? নিশ্চয়ই নিরাপত্তাজনিত কোনো কিছুর দিকে ইঙ্গিত করেন না!যার ভিতর দিয়ে একজন দর্শক নিজের মতো করে চলচ্চিত্রটি উপভোগ করবেন,সেই ভিতরটাই আসলে সমস্যা। বাংলাদেশের প্রায় সবগুলো প্রেক্ষাগৃহের পরিবেশ খুব সংক্ষেপে এ রকম-ঢুকতেই একটা গন্ধ পাবেন;গন্ধটা পুরনো রেল স্টেশনের বর্জিত ওয়েটিং রুমের মতো। ভিতরে অক্সিজেনের চেয়ে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেশি;মানে ভ্যাপসা গরম। চলছে উন্মুক্ত ধূমপান। ভালো একটি আসনও খুঁজে পাওয়া দায়। হল কর্তৃপক্ষ এর মধ্যে দ্রুত লয়ের হিন্দি গান ছেড়ে দিয়েছেন। এ তো গেলো চলচ্চিত্র শুরম্নর আগের চলচ্চিত্র। এরপর শুরু হলো চলচ্চিত্র। ডিজিটাল (এখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাই)হলে রেজ্যুলেশনের মান মোটামুটি ভালো,তবে সমস্যা ছেঁড়া-ফাটা পর্দা আর সাউন্ড নিয়ে!অধিকাংশ প্রেক্ষাগৃহে সাউন্ডের আউটপুট দেওয়া হয় মান্ধাতা আমলের হাতে তৈরি কাঠের বক্সে।ফলে পরিচালকের এতো সাধের ডলবি ডিজিটাল ধরা দেয় চোঙা মাইকের আদলে। আর বিদ্যুৎ গেলে কথাই নেই,জেনারেটর চালুর ১০ মিনিটে আপনি সেদ্ধ থেকে গলতে শুরু করবেন।

এভাবে চলতে চলতে একপর্যায়ে বিরতি। বিরতিতে হলের গেটে বাদাম আর পান-সিগারেটের বাইরে অন্যকিছু মেলা দায়। এখন আপনি বলুন, কেনো একজন দর্শক এই পরিবেশের মধ্যে গাটের পয়সা খরচ করে চলচ্চিত্র দেখবেন? যেখানে চায়ের স্টলে দু-টাকার চা খেতে খেতে সিডিতে কিংবা ডিশ সংযোগে চলচ্চিত্র দেখা যায়! আরেকটি শ্রেণির এসবের বালাই নেই,তারা ঘরে বসে কেব্‌ল টিভিতে টক-শো,মেগাসিরিয়াল দেখার ফাঁকে কখনো কখনো মুভি চ্যানেল ঘুরে আসেন। মেগাসিরিয়ালের দাপটে এদের কাছে চলচ্চিত্র দেখার আগ্রহ অনেকটাই পানসে হয়ে গেছে। এর বাইরে আছে আরেক শ্রেণির দর্শক যারা বাড়িতে কম্পিউটার,টেলিভিশন (এখন অবশ্য এই শ্রেণির অনেক বাড়ির বসার ঘরে ৭২ ইঞ্চির এলসিডি প্রযুক্তির টেলিভিশন শোভা পাচ্ছে)ও ডিভিডিতে চলচ্চিত্র দেখেন।

এখন আপনি দর্শককে ঘর থেকে বের করে আনতে চাইলে কেবল ভালো চলচ্চিত্র দিলেই হবে না। চা-স্টল কিংবা ঘরের চেয়ে ভালো পরিবেশও দিতে হবে। কেবল দু-চারটি ভালো চলচ্চিত্র বানিয়ে বললেন, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পে একটা পরিবর্তন হয়ে গেছে-তা মনে হয় ঠিক হবে না।

সমকাল-এর একটি সংবাদে বলা হয়েছে, বিনোদন দুনিয়ার বর্ণিল ও স্বপ্নিল যাত্রায় রূপালি রঙ ছড়িয়ে দিতে তরুণ নির্মাতারা কাজ করে যাচ্ছেন বেশিদিন হয়নি। এরই মধ্যে দেশে বাণিজ্যিক ধারার ছবির ভাষা এবং অবয়ব দুই-ই পাল্টে যেতে শুরু করেছে। তাদের প্রতি আস্থা রেখে প্রেক্ষাগৃহে দর্শকের সংখ্যাও বাড়ছে।১০ এখন আমার প্রশ্ন, এই কথার ভিত্তি কতোটুকু, প্রেক্ষাগৃহে দর্শকের সংখ্যা কি বাড়ছে? এখানে যদি সামগ্রিকভাবে দর্শক বাড়ার কথা বলা হয়,তাহলে ভুল হবে। আর যদি,বিশেষ চলচ্চিত্রকে কেন্দ্র করে দর্শক বাড়ার কথা বলা হয়,তাহলেও আপত্তি আছে। আমাদের দেশে এক শ্রেণির দর্শক আছে যাদের কাছে চলচ্চিত্রের চেয়ে,কোন্‌ পরিবেশে কোন্‌ প্রযুক্তিতে তারা তা দেখছ্লে-সেটা গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ,চলচ্চিত্রের গুণাগুণ বিচার না করে আধুনিক প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে দুই-আড়াই ঘণ্টা কাটিয়ে বিনোদন নিতে তারা পছন্দ করেন। আমাদের বসুন্ধরা সিনেপ্লেক্সের ক্ষেত্রে এমনটি দেখা যায়। আবার অনেকে আছেন যারা কোনো একটি বিশেষ চলচ্চিত্র দেখতে সিনেপ্লেক্সে যান। তাদের কাছে চলচ্চিত্রটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সারাদেশে দ্বিতীয় ধারার দর্শকের সংখ্যাই বর্তমানে বেশি। এদেরকে সাধারণত চলচ্চিত্র মুক্তির আগে প্রচার-প্রচারণা দিয়ে আগ্রহী করে তোলা হয়। এর বাইরে আরেকটি বিশাল শ্রেণি আছে,যাদের কাছে চলচ্চিত্রের অভিনেতা-অভিনেত্রীরাই বেশি প্রাধান্য পায়। চলচ্চিত্রে কী আছে,কিংবা কোথায়,কিভাবে দেখানো হচ্ছে সেটা মুখ্য বিষয় নয়।

এই বহুমাত্রার দর্শক শ্রেণিকে বিবেচনায় নিয়ে কেউ যদি বলেন, দেশে বাণিজ্যিক ধারার ছবির ভাষা এবং অবয়ব দুই-ই পাল্টে যেতে শুরু করেছে। প্রেক্ষাগৃহে দর্শকের সংখ্যা বেড়েছে-সেটা কতোখানি যুক্তিযুক্ত হবে?

৬.

চলচ্চিত্র নিয়ে তরুণদের আগ্রহ বেড়েছ্লে-এ কথা সত্য। এই ইঙ্গিত অবশ্যই ইতিবাচক। চলচ্চিত্রের জীর্ণদশা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে তরুণদেরই এগিয়ে আসতে হবে;তাদের হস্তক্ষেপ ছাড়া মুক্তি সম্ভব নয়।তবে তরুণদের দৃষ্টি কেবল নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে দিলে চলবে না। পুরো টাইটেল কার্ডটিতেই মনোযোগ দিতে হবে। দেখতে হবে প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা ও পরিবেশ ঠিক আছে কি না। বুঝতে হবে দর্শকের রুচি। তারা কী চায়,কী চায় না। কেবল চলচ্চিত্র বানিয়ে আত্মতৃপ্তিতে ভুগলেই হবে না। নতুন যে উদ্দীপনা শুরু হয়েছে সেখান থেকে উৎসাহ নিতে হবে;আত্মতৃপ্তি নয়।চলচ্চিত্রের সঙ্গে যারা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত শুধু তারাই তাদের দায়িত্ব পালন করলে আত্মতৃপ্তির মতো কিছুই ঘটবে না। কারণ,সরকারকেও এগিয়ে আসতে হবে। সরকারও এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সহায়তা করতে পারে। তরুণরা যে চলচ্চিত্র নির্মাণ করছে,তার পাশাপাশি সবার আগে দরকার তা প্রদর্শনের জন্য আধুনিক প্রেক্ষাগৃহের। সঙ্গে সারাদেশে একটা চলচ্চিত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।সরকারের হাতে অচল হওয়া চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনকে আবার সচল করতে হবে। এজন্য দরকার ১৯৮০ সালে জারি করা সব নিষেধাজ্ঞার প্রত্যাহার।

মুক্তভাবে চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে দিতে হবে;সেন্সর বোর্ডের কারণে যেনো চলচ্চিত্রের কোনো সম্ভাবনা সংকুচিত হয়ে না যায়। কারণ,কোনো কালে,কোনো দেশেই সেন্সর বোর্ডের অভিজ্ঞতা মধুর ছিলো না। সৈয়দ মুজতবা আলীর অভিজ্ঞতা দিয়েই আজকের আলোচনা শেষ করছ্লি-আমার ছেলেবেলায় বায়স্কোপও ছেলেমানুষ ছিল। হরেক রকম ফিলিম তখন আসতো;ছোট,বড় মাঝারি-এখনকার মতো স্টান্ডার্ডাইজ্‌ড নয়। সেনসর বোর্ড-ফোর্ডও তখন শিশু,এখনকার মতো জ্যাঠা হয়ে ওঠে নি-এটা অশ্লীল, ওটা কদর্য, সেটা বড় কর্তাদের নিয়ে মস্করা করেছে বলে দেশের দশের রুচি মেরামত করার মতো হরিশ মুখুজ্যে দি সেকেন্ড হয়ে ওঠে নি। কাজেই হরেক রুচির ফিলিম তখন এদেশে অক্লেশে আসতো এবং আমরা সেগুলো গোগ্রাসে গিলতুম। তার ফলে আমাদের চরিত্র সর্বনাশ হয়েছে,এ কথা কেউ বলে নি। এবং আজ যে সেনসর বোর্ডের এত কড়াক্কড়ি,তার ফলে এযুগের চ্যাংড়া-চিংড়িরা যীশুখেস্ট কিংবা রামকেস্ট হয়ে গিয়েছে এ মস্করাও কেউ করে নি।১১

 

লেখক : আসাদ লাবলু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী। বর্তমানে তিনি কালের কণ্ঠ পত্রিকায় শিক্ষানবিশ সহ-সম্পাদক হিসেবে কর্মরত

 

তথ্যসূত্র

১. রনি,দাউদ হোসাইন; অন্দরে-বাইরে নতুন হাওয়া; কালের কণ্ঠ-এর বৃহস্পতিবারের বিশেষ ক্রোড়পত্র রঙের মেলা,২৯ নভেম্বর ২০১২।

২. চলচ্চিত্র নির্মাণে নতুন প্রজন্ম; দৈনিক ইত্তেফাক,৩ জানুয়ারি ২০১৩।

৩. ‘‘চোরাবালি : নতুন দিনের ছবি; সমকাল,২০ ডিসেম্বর ২০১২।

৪. প্রাগুক্ত; সমকাল,২০ ডিসেম্বর ২০১২।

৫. দেহরক্ষী; প্রথম আলো,১১ এপ্রিল ২০১৩।

৬. দেহরক্ষী নিয়ে মিলনের আক্ষেপ; দৈনিক মানবজমিন,১৯ এপ্রিল ২০১৩।

৭. চোরাবালি এবার ভারত অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের প্রেক্ষাগৃহে; দৈনিক ইত্তেফাক,৩০ জানুয়ারি ২০১৩।

৮. প্রাগুক্ত; দৈনিক ইত্তেফাক,৩ জুলাই ১৩।

৯. প্রাগুক্ত; দৈনিক ইত্তেফাক,৩ জুলাই ১৩।

১০. যুদ্ধে যাওয়ার শ্রেষ্ঠ সময়; সমকাল,৩ জানুয়ারি ২০১৩।

১১. আলী,সৈয়দ মুজতবা (১৪১১ বঙ্গাব্দ:২০৩); চার্লি চ্যাপলিন; সৈয়দ মুজতবা আলী রচনাবলী তৃতীয় খণ্ড; স্টুডেন্ট ওয়েজ,বাংলাবাজার,ঢাকা।

বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৩ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের ৫ম সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।       

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন