আসাদ লাবলু
প্রকাশিত ০৬ ডিসেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
চলচ্চিত্র সংসদ নিয়ন্ত্রণ আইন
সুতা তো কেটে গেছে নাটাই ধরে থেকে কী লাভ!
আসাদ লাবলু

১.
মানুষের হাত ধরে কতো কিছুই না পৃথিবীতে এসেছে। এর অনেক কিছুই শেষ পর্যন্ত নিজের অস্তিত্ব ধরে রাখতে পারেনি। উপযোগিতা হারিয়ে আপনা-আপনি হারিয়ে গেছে। আর যেগুলো টিকে আছে তা নিজ গুণে, নিজ বৈশিষ্ট্যের জোরে। আবার এমন অনেক কিছুই এসেছে, যার গায়ে নিছক ‘হেয়ালি’র তকমা লাগিয়ে দেওয়া ছিলো। এতে করে যাদের কাছে নিজেদের সময় ও চিন্তা-ভাবনার মগজটুকু মূল্যবান, তারা সময় অপচয় করে সে-সব ‘হেয়ালি’ বস্তুর উপযোগিতা দেখার প্রয়োজনও অনুভব করেননি। অনেক সময় এ-সব ‘হেয়ালি’ নিজ গুণেই প্রমাণ করে দিয়েছে, যে-তকমা তার গায়ে এটে দেওয়া হয়েছে, তা সত্য নয়। সঙ্গে সঙ্গে এ-ও প্রতিষ্ঠা করেছিলো, তা মানুষের সময়, মগজ ও মনন আকর্ষণ করতে সক্ষম। সম্ভবত এ-জগতে এমনই এক আবিষ্কারের নাম চলচ্চিত্র। যা প্রথমে ছিলো নিছক ব্যবসা-বিনোদনের মাধ্যম। যে-কারণে জন্মদাতা হয়েও ফ্রান্সের মতো দেশ ঠিক সময়ে বুঝতে পারেনি, সে কী জন্ম দিয়েছে। বরং আবিষ্কারটিকে হেয়ালি না ভেবে, মনোযোগ দিয়ে লাভবান হয়েছিলো রাশিয়া-ই। যার লভ্যাংশ এখনও রাশিয়া পায়। চলচ্চিত্র বলতে যে-দৃষ্টিভঙ্গি এখন চিন্তাশীল মাথায় বিদ্যমান, সে-দৃষ্টিভঙ্গির শুরুতে রাশিয়ার নাম থাকতে বাধ্য। ‘জবা ফুল’ দিয়ে সৌন্দর্যবর্ধন (!) করা যায়- ফ্রান্সসহ অনেক দেশ প্রথম দিকে এর বেশি কিছু ভাবতে পারেনি। তবে রাশিয়া বুঝেছিলো, ‘জবা ফুল’ দিয়েও নানান ধরনের ঔষধ তৈরি সম্ভব। যে-ঔষধ মানব-মনকে নানান সংক্রমণের হাত থেকে রেহাই দিতে পারে কিংবা প্রভাবিত করতে পারে। এ-কথা এজন্য বললাম, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে রাশিয়া চলচ্চিত্র নামক‘ঔষধ’ তার সমাজ দেহের বিভিন্ন অঙ্গেই লাগিয়েছে; ইতিবাচক ফলও পেয়েছে।
এখন রাশিয়া কার কাছ থেকে ‘জবা ফুল’-এর ঔষধিবিদ্যার দীক্ষা পেয়েছে তা পরিষ্কার করছি না। তবে রাশিয়াকে দেখে ‘জবা ফুল’ কিংবা চলচ্চিত্রকে নিয়ে কেবল বিনোদনের বাইরে গিয়ে অনেকেই ভাবতে শুরু করেন; যে-ভাবনার অন্যতম ফসল ছিলো চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন। বিশ্বের বিভিন্ন চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের এ-সব ভাবনার যদি বিস্তারিত দেখতে চাই, তাহলে সমার্থক কয়েকটি বাক্যাংশ পাওয়া যাবে। সেই বাক্যাংশগুলো আলোচনার এই পর্যায়ে বলে নেওয়াই ভালো; ভালো ছবি দেখানো, ছবি বিষয়ক আলোচনা, প্রকাশনা, ভাবের আদান-প্রদান, চলচ্চিত্র উৎসব আয়োজন ইত্যাদি।
২.
এ তো গেলো মোটাদাগে সহজ-সরল চিন্তাভাবনা। কিন্তু আমি মনে করি, চলচ্চিত্র সংসদ প্রতিষ্ঠার পিছনের যুক্তিকে এ-কথাগুলো পুরোপুরি প্রতিষ্ঠা করে না। আমার পক্ষে যতোটুকু যুক্তি খোলাসা করা সম্ভব, তা করতে আমি দুটো চলচ্চিত্রকে নমুনা কিংবা উদাহরণ ধরে আলোচনা এগোতে চাই। এর একটি রবার্ট ভিনে-এর দ্য কেবিনেট অব ড. ক্যালিগরি, অন্যটি লুই বুনুয়েল ও সালভাদর দালি’র আশিয়া আন্দালু। চলচ্চিত্র দুটির মর্মকথা কী কিংবা এগুলো কোন্ ধারার চলচ্চিত্র তা আলোচনা করার আগে এর কয়েকটি দৃশ্য তুলে ধরার প্রয়োজনবোধ করছি।
দ্য কেবিনেট অব ড. ক্যালিগরির চিত্রায়ণ, দৃশ্যসজ্জায় ইচ্ছাকৃত বিকৃতি লক্ষ করা যায়। বিকৃত মানসিকতার ডা. ক্যালিগরি ও তার পাগল রোগী ফ্রান্সিসের দৃষ্টিভঙ্গিতে চলচ্চিত্রটি চিত্রায়িত। যার ফলে দর্শক ঘটনা ও এর চিত্রায়ণ অনুভব করেছেন পাগলের দৃষ্টিকোণ থেকে। অন্যদিকে, আশিয়া আন্দালু’তে খুর দিয়ে চোখের মণি কাটা, পিয়ানোর ওপর মরা গাধা পড়ে থাকা কিংবা মানুষের হাত থেকে হঠাৎ পিঁপড়া বের হওয়া এ-রকম আরও অনেক দৃশ্যই দেখা যাবে, যার সঙ্গে আপাতদৃষ্টিতে বাস্তবতার কোনো সেতুবন্ধন খুঁজে পাওয়া মুশকিল।
দুটো চলচ্চিত্রই এ-রকম; তা দেখে পরিচালকদেরও বিকারগ্রস্ত ভাবাটাও অস্বাভাবিক কিছু না। তবে মজার ব্যাপার হলো, চলচ্চিত্র দুটোকে যদি এখনকার ‘দাবাঙ-ভক্ত’দের প্রেক্ষাগৃহে বসিয়ে দেখতে দেওয়া হয়, আমার বিশ্বাস পুরো চলচ্চিত্র দেখার মতো ধৈর্য তাদের হবে না। অথচ প্রশ্ন ওঠে, চলচ্চিত্র দুটিতে কি আসলেই পাগলামি ছাড়া আর দেখার কিছু নেই! আছে। দ্য কেবিনেট অব ড. ক্যালিগরি ১৯১৯ সালে নির্মিত অভিব্যক্তিবাদ ধারার একটি চলচ্চিত্র। অভিব্যক্তিবাদ চলচ্চিত্র-শিল্পে গড়ে ওঠা কোনো আন্দোলন ছিলো না। এই আন্দোলন ‘বিশ শতকের প্রথম দিকে চিত্রকলা, স্থাপত্য ও নাট্যযজ্ঞে অ্যান্টি-ন্যাচারলিষ্টিক শিল্প আন্দোলন হিসেবে দেখা দিয়েছে। এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল মানবিক অনুভব, আবেগ ও যৌনতার শক্তিকে শিল্পকর্মে প্রকাশ করা।’১
এবার আসি আশিয়া আন্দালু’তে। এটি ২০ শতকের গোড়ার দিকে গড়ে ওঠা সুররিয়ালিজম ধারার একটি চলচ্চিত্র। এই আন্দোলনের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে বলতে হয়-‘প্রথম মহাযুদ্ধ ও তারপরের অর্থনৈতিক মন্দায় সমস্ত সভ্যতা যেন ধ্বস্ত হয়ে গেল, পরিচিত অস্তিত্বের উপর যেন সকলের আস্থা টলে গেল। ধনতান্ত্রিক সভ্যতার সংকটে জীবন যতই নিরর্থক হয়ে গেল, ততই চেনা-বাস্তব বিষয়ে তরুণ সংবেদনশীল মন ক্ষুব্ধ অসহিষ্ণু হয়ে উঠল, তাঁরা বাস্তবের অতি-ব্যবহৃত বহিরঙ্গকে চূর্ণ করে নৈরাজ্যের মধ্য দিয়ে চাইলেন বাস্তবের পুনর্গঠন করতে এবং সংগতিবোধের একটি নতুন সূত্র সন্ধান করতে।’২
এ-রকম দুটি চিন্তাভাবনা থেকে দুটি ভিন্ন ধরনের আন্দোলন গড়ে উঠেছিলো। সাহিত্য, চিত্রকলা ও ভাস্কর্যের মতো শিল্পের পাশাপাশি তা প্রবেশ করেছিলো চলচ্চিত্রেও। শুধু এই দুই ধারার আন্দোলনই নয়; সময়কে ধরতে যখন যে-আন্দোলনই সমাজে আত্মপ্রকাশ করেছে, তার প্রত্যেকটিকেই নিজের মধ্যে ধারণ করেছে চলচ্চিত্র। আমরা যদি দাদাইজম, কিউবিজম, ফিউচারিজম ইত্যাদি আন্দোলনে দৃষ্টি দিই, তাহলে সব ক্ষেত্রেই চলচ্চিত্রের উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণের প্রমাণ পাবো।
স্বাভাবিকভাবেই এ-সব ধারার চলচ্চিত্রকে বুঝতে হলে এ-সব ধারার আন্দোলনকে বুঝতে হবে। এখন এ-সব চলচ্চিত্রকে বা যে-কোনো চলচ্চিত্রের অন্তর্নিহিত অর্থকে বুঝতে হলে, একটা আলাদা চোখ দর্শকের থাকতেই হবে এ-আমার বিশ্বাস। কারণ প্রথম চোখ দিয়ে দেখা যাবে, চ্যাপলিন দ্য গ্রেট ডিক্টেটর-এ একটি গ্লোব নিয়ে খেলা করছেন; যা বিনোদনের খোরাক যোগাবে। আর দ্বিতীয় চোখ দিয়ে দেখা যাবে, হিটলার পুরো পৃথিবীকে নিয়ে খেলছেন; যা চিন্তার খোরাক যোগাবে। চলচ্চিত্র আবিষ্কারের প্রথমদিকে দর্শকরা এগিয়েছেন কেবল প্রথম চোখ নিয়ে, দ্বিতীয় চোখের প্রয়োজন তখনও পড়েনি। কিন্তু দ্বিতীয় চোখ দিয়েও দেখতে হবে, এমন চলচ্চিত্র যখন আসা শুরু করলো, তখনই প্রয়োজন পড়লো দ্বিতীয় চোখের। দর্শকের মধ্যে সেই দ্বিতীয় চোখ তৈরি করাই ছিলো চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের প্রধান ও অন্যতম যুক্তি কিংবা উদ্দেশ্য।
৩.
এখন চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের ইতিবাচকতা-নেতিবাচকতা নিয়ে কথা বলা দরকার। একটি ঘটনার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে কর্ম ও কর্তার বিচার জরুরি। কেননা, কর্তা ও কর্মের পরিচিতিই বলে দেয়-ঘটনা ইতিবাচক না নেতিবাচক। চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের কর্ম কী, তা আগের আলোচনায় বলেছি। যে-আলোচনায় আমি চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ইঙ্গিতই দিয়েছি। বাকি থাকে কর্তা। এবার তাই কথা বলবো এই আন্দোলনের কর্তাদের নিয়ে-
আলোচনা কেবল বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের কর্তাদের দিয়েই চালিয়ে নেওয়া যেতো। তবে গ্রহণযোগ্যতার বিচারে আরও দু-একটি দেশের কথা বলে নেওয়া ভালো। ১৯২৫ সালে ইংল্যান্ডে চলচ্চিত্র সংসদের যাত্রা শুরু হয়। এ-সংসদের ‘প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে ছিলেন এইচ. জি. ওয়েলস, জর্জ বার্নাড শ, আইভর মন্টেগু, আগষ্টাস জন, জন মেরার্ড কিনেসসহ তৎকালীন সময়ের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। অবশ্য আরো আগে ১৯২২ সালে ফরাসি নারী আন্দোলনের নেত্রী ও চলচ্চিত্রকার জারমেইন ডুলাক ‘সিনে ক্লাব দ্যু ফ্রান্স’ নামে একটি চলচ্চিত্র সংসদ গড়ে তোলেন বলে জানা যায়। কোনটি প্রথম এই নিয়ে মতভেদ থাকলেও একথা সত্য যে, ১৯২০ সালের গোড়ার দিকে ফ্রান্সে কিছু সংখ্যক সচেতন চলচ্চিত্র দর্শক চারুকলা হিসেবে চলচ্চিত্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ও সম্ভাবনার কথা অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।’৩ আর এই উপমহাদেশে ‘ক্যালকাটা ফিল্ম সোসাইটি’ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৭ সালে। এ-ক্ষেত্রে ‘অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন সত্যজিৎ রায়, চিদানন্দ দাশগুপ্ত, বংশীচন্দ্র গুপ্ত এবং হিরণকুমার সান্যাল’৪ এর মতো ব্যক্তিরা। আর বাংলাদেশের কথা যদি বলি, ১৯৬৩ সালে গঠিত পাকিস্তান ফিল্ম সোসাইটির যাত্রা শুরু হয় আনোয়ারুল হক খান, ওয়াহিদুল হক, আব্দুস সবুর, জামাল খান, ইয়াছির খান ও মনিরুল আলম৫ এর মতো সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের হাত ধরে। যার প্রথম (যদিও প্রতিষ্ঠার পর পর সোসাইটির কোনো সভাপতি ছিলো না, তবে ১৯৬৭ সালে এসে প্রথম সভাপতি পদ সৃষ্টি করা হয়) সভাপতি ছিলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন।
এই হলো চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের কর্ম আর কর্তা। এই কর্তা আর কর্মের বিচারে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনকে ইতিবাচকভাবে দেখলে বিভ্রান্তি থাকার কথা নয়। তো, এ-রকম এক আন্দোলন নিয়ন্ত্রণ করতে আমাদের দেশে ১৯৮০ সালের ৯ জুলাই ‘চলচ্চিত্র সংসদ (রেজিস্ট্রেশন ও নিয়ন্ত্রণ)’ নামের একটি আইন পাশ হয়। আইনের নাম শুনেই অনেকখানি আন্দাজ করা যায়, রাষ্ট্রের বিবেচনায় চলচ্চিত্র সংসদগুলো ‘নিয়ন্ত্রণহীন’ কিছু করছিলো। তবে আইন প্রণয়নকারীদের ‘চাওয়া-পাওয়া’ এক সময় আইনের মধ্য দিয়ে পূরণ হলেও সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে তা আর সেই ‘চাওয়া-পাওয়া’ মেটাতে পারছে না। তাই আইন থাকলেও প্রশ্ন উঠেছে আইনের উপযোগিতা নিয়ে। এ-নিয়ে আলোচনার আগে দেখে নিই মূল আইনটির উদ্দেশ্যে ও কারণ-সম্বলিত বিবৃতিতে কী বলা আছে-
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় একশত ফিল্ম-ক্লাব/সিনে সোসাইটি রহিয়াছে এবং এই ধরনের আরও বহু সংগঠন গঠিত হইতেছে। এই সকল প্রতিষ্ঠানের জন্য এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে কোনো নীতিমালা প্রণীত হই নাই। ফলে এই সকল ফিল্ম-ক্লাব/সিনে সোসাইটি অনেকটা স্বেচ্ছা-প্রণোদিতভাবে বা খেয়াল-খুশি মতো গঠিত হইতেছে এবং নিজ নিজ বিধান অনুযায়ী পরিচালিত হইতেছে। এই সকল ফিল্ম-ক্লাব/সিনে সোসাইটি সাধারণত: নিজ প্রয়োজন অথবা গোষ্ঠীস্বার্থে দেশি-বিদেশি সংস্থা হইতে ছায়াছবি সংগ্রহ ও পরিদর্শন করিয়া থাকে। অনেক ক্ষেত্রে এই সকল ছায়াছবি সংগ্রহ ও প্রদর্শন অত্যন্ত গোপনে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বে-আইনিভাবে আর্থিক লেন-দেন সংক্রান্ত অভিযোগের কথাও শোনা যায়। এই সকল ছায়াছবির মাধ্যমে দেশের কিশোর এবং যুবক গোষ্ঠী অনেক ক্ষেত্রে অবাঞ্ছিত বিদেশি মতবাদে প্রভাম্বিত হওয়ারও সুযোগ পায়। এই পরিপ্রেক্ষিতে, ফিল্ম-ক্লাব সংক্রান্ত তৎপরতা জাতীয় স্বার্থে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার উদ্দেশ্যে উপযুক্ত সরকারি কার্যক্রম অপরিহার্য বিধায় অবিলম্বে একটি আইন প্রণয়নের প্রস্তাব করা যাইতেছে।
এখানকার কয়েকটি বিষয় নিয়ে একটু কথা বলা যেতে পারে। এখানে বলা হয়েছে, এ-সব সিনে-ক্লাব নিজ প্রয়োজন ও গোষ্ঠীস্বার্থে নাকি চলচ্চিত্র পরিদর্শন করে থাকে। একটি চলচ্চিত্র সংসদের নিজস্ব কী স্বার্থ থাকতে পারে তা বোধগম্য নয়। কিংবা কোনো প্রয়োজন থাকলেও তা কীভাবে উদ্বেগের বিষয় তা-ও পরিষ্কার নয়। একই সঙ্গে বলা হয়েছে, এ-সব প্রতিষ্ঠান দেশি-বিদেশি সংস্থা থেকে সিনেমা সংগ্রহ করে প্রদর্শন করে। কিন্তু তাতে কী সমস্যা! আমরা তো ততোদিনে এই শিল্পে ততোটা এগোতে পারিনি; সিনেমা তো সংগ্রহ করতেই হবে। আসলে এ-সব বিষয়ে আইনের কোনো মাথাব্যাথা ছিলো না। ব্যাথা বা আশঙ্কার সন্ধান পাওয়া যায় উদ্দেশ্যর নিচের দিকে। যেখানে বলা হয়েছে, এসব চলচ্চিত্রে দেশের কিশোর এবং যুবকগোষ্ঠী অনেক ক্ষেত্রে বিদেশি মতবাদ দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার সুযোগ পায়। ওই সময়ে আমাদের দেশে রাশিয়ান চলচ্চিত্রের বেশ জনপ্রিয়তা ছিলো। আর গণতান্ত্রিক দেশে রাশিয়ান মতবাদ যদি ঢুকে যায়, তবে তা ‘চিন্তার’ বিষয় বৈকি! এটা আমার একেবারেই একান্ত ধারণা। কারও দ্বিমত থাকতে পারে।
এরপর আইনে কোনো ফিল্ম-ক্লাবের রেজিস্ট্রিকৃত হওয়ার শর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হলো :
(ক) ক্লাবের প্রধান কার্যালয়ের ঠিকানা,
(খ) ক্লাব গঠনের উদ্দেশ্যাবলী,
(গ) ক্লাবের সদস্য হওয়ার শর্তাবলী,
(ঘ) ফিল্ম প্রদর্শনের শর্তাবলী,
(ঙ) ক্লাবের আয়ের উৎসসমূহ,
(চ) ক্লাবের তহবিলের হেফাজত,
(ছ) ক্লাবের তহবিলের বার্ষিক নিরীক্ষা ও নিরীক্ষা পদ্ধতি।
অর্থাৎ, উল্লিখিত এই শর্তগুলো প্রত্যেক ক্লাবকে তার গঠনতন্ত্রে নিশ্চিত করতে হবে। শুধু তাই নয়, আইনে বলা হলো-এ-সব শর্ত পূরণের পর কর্তৃপক্ষ যদি সন্তুষ্ট হয়, তবেই ক্লাবটি স্বীকৃতি পাবে। এখন সন্তোষজনক ব্যাপার তো আপেক্ষিক। ফলে শর্ত পূরণ করেও অনেকে সে-সময় স্বীকৃতি পাননি। ফলে আইনের এই জায়গাতে এসেই অনেক চলচ্চিত্র সংসদের সংখ্যা কমে গেলো। তারপরও যারা টিকলো, তারাও অধিকাংশই বাতিল হয়েছে এই আইনের পাতার নিচের দিকে যেতে-যেতে।
আইনটির প্রতিটি ধারা-উপধারা নিয়ে এভাবে আলোচনা চালিয়ে নেওয়া যেতে পারে। তাতে আলোচনা কেবল দীর্ঘায়িত হবে। বরং আর দু-একটি বিষয় তুলে ধরার পর অন্য আলোচনায় যাবো। সিনেমা আনার ক্ষেত্রে আইনে বলা হলো-
কোনো রেজিস্ট্রিকৃত ফিল্ম-ক্লাব বাংলাদেশে অবস্থিত কোনো বিদেশি কূটনৈতিক মিশন কর্তৃক সরবরাহকৃত কোনো ফিল্ম কেবলমাত্র সেইক্ষেত্রে প্রদর্শন করিতে পারিবে যেক্ষেত্রে ফিল্মটি সরবরাহের জন্য কর্তৃপক্ষের পূর্ব অনুমোদনক্রমে সংশ্লিষ্ট মিশনকে অনুরোধ করা হইয়াছে।
চলচ্চিত্র সংসদগুলো আইনের এই জায়গায় এসে সবচেয়ে বড়ো ধাক্কাটি খেলো। কোন্ চলচ্চিত্র দেখানো যাবে, আর কোনটি যাবে না, তা যখন কর্তৃপক্ষই নির্ধারণের ভার নিলো, তখন ভালো চলচ্চিত্র ও ভালো দর্শক বানানোর পথটা অনেকখানিই অবরুদ্ধ হয়ে গেলো। এরপর কর্তৃপক্ষের ‘পছন্দ মতো’ যে-চলচ্চিত্রগুলো সংসদের হাতে এসে পৌঁছালো সেটি প্রদর্শনের জন্যও আইনে বলা হলো-
কোনো রেজিস্ট্রিকৃত ফিল্ম-ক্লাব কোনো ফিল্ম প্রদর্শনের অন্ততঃ এক সপ্তাহ পূর্বে ফিল্মটি প্রদর্শনের স্থান, তারিখ ও সময় কর্তৃপক্ষকে এবং যে জেলায় ফিল্মটি প্রদর্শিত হইবে সেই জেলার ডেপুটি কমিশনারকে লিখিতভাবে অবহিত করিবে।
খুব স্বাভাবিকভাবেই এখন প্রশ্ন জাগে, এতোকিছুর পর কীভাবে আর সংসদগুলো টিকে থাকে। থাকে না, থাকেনি, থাকার কথাও নয়। আর না থাকার পিছনে সবচেয়ে ভয়াবহ কারণ ছিলো আইন না-মানায় আইনে যে-বিধান রাখা হয়েছিলো তার জন্য। আইন অমান্য করার ক্ষেত্রে আইনে বলা হলো-
উহা যে নামেই অভিহিত হউক না কেন উহার প্রত্যেক সদস্য বা কর্মকর্তা, যদি তিনি প্রমাণ করিতে না পারেন যে তাহার অজ্ঞাতসারে কিংবা সম্মতি ব্যতীত উক্ত বিধান বা বিধি লঙ্ঘন করা হইয়াছে তাহা হইলে, তিন মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা এক হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হইবে।
এভাবেই, এই আইনের কবলে পড়ে সে-সময় দেশের বেশিরভাগ চলচ্চিত্র সংসদ নিজেদের কার্যক্রম গুটিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়। নিয়ন্ত্রণের নামে যে-আইন প্রবর্তিত হয় তা কেবল নিয়ন্ত্রণ নয়, চলচ্চিত্র সংসদগুলোকে এক ধরনের ‘নিরুদ্দেশ’ করতে সক্ষম হয়। আমরা জানি যে, ভারত সরকারও তাদের চলচ্চিত্র সংসদগুলোর ওপর এক ধরনের নিয়ন্ত্রণ আইন জারি করেছিলো। কিন্তু পাশাপাশি ভারত সরকার যা করেছিলো, তার জন্য দেশটিতে চলচ্চিত্র শিল্প বলতে এখনও অনেককিছু আছে। আইন জারির বিপরীতে সে-সময় ফিল্ম আর্কাইভ, ফিল্ম ইন্সটিটিউট, বিভিন্ন পদক, শিশু-কিশোরদের চলচ্চিত্র সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রতিযোগিতা, থিয়েটার, ফেস্টিভ্যাল, প্রকাশনা ইত্যাদির প্রচলন শুরু করেছিলো ভারত সরকার। ফলে বিকল্প একটি রাস্তা সেখানে তৈরি হয়েছিলো, যে-রাস্তায় সচেতন দর্শকরূপী অনেক পথিক তৈরি করা গেছে। সেখানে এখনও ‘ব্যবসায়িক’ বলি আর ‘আর্ট ফিল্ম’ই বলি, সবধরনের চলচ্চিত্রেই দর্শক মেলে। কিন্তু আমাদের দেশে গরু মেরে জুতা দান করার মতোও কিছু হয়নি।
৪.
তারপরও আমরা কি হতাশ? না। কারণ, কর্তৃপক্ষ আইন বাতিল না করলেও, সময় তা অনেকখানি বাতিল করে দিয়েছে। প্রযুক্তির কল্যাণে আজ আইনকে আইনের জায়গায় রেখে নতুন করে পথচলা সম্ভব হচ্ছে। সামিরা মাখমালবাফের ভাষায় ‘সিনেমাকে সবসময় রাজনীতির কৃপায় চলতে হয়েছে, বিশেষ করে পূর্বে, পশ্চিমে দারস্থ হতে হয়েছে পুঁজির, আর পৃথিবীর বাদবাকি জায়গায় মনোযোগ দিয়েছে সৃষ্টিশীলতার দিকে। এই বিংশ শতকে সর্বত্র শক্তির খামখেয়ালি প্রদর্শনীতে একজন শিল্পীর স্বাতন্ত্র্য আর সৃজনশীলতা ভুগেছে বেশি পরিমাণে। একবিংশ শতকে প্রবেশের আগে পরিস্থিতি আমূল বদলে গেছে প্রযুক্তির আশ্চর্যজনক আবিষ্কারে; সময় আসছে যেখানে শিল্পীরা পেয়ে যাবে সব বাধাকে অতিক্রম করার রসদ।’৬ কারণ, এই ক্ষেত্রে বাধা দেওয়াটা খুবই কষ্টকর। ক’দিন আগের কথাও যদি ধরি; মহানবীকে নিয়ে ব্যঙ্গ করে চলচ্চিত্র প্রদর্শনের অভিযোগে ভারত, পাকিস্তান ও মিসরের সঙ্গে একতালে (১৭ সেপ্টেম্বর ২০১২) বাংলাদেশ সরকারও ইউটিউব বন্ধ করে দিলো। তাতে কি কোনো লাভ হলো? প্রযুক্তি সম্পর্কে এখন কর্তৃপক্ষের চেয়ে সাধারণ জনগণই বেশি দক্ষ। এ-কথা এজন্য বললাম যে, বন্ধ করে দেওয়ার পরও মানুষ ইউটিউব কিন্তু ঠিকই ব্যবহার করছে। শুধু হাইপারলিংক (সিকিউর হাইপারলিংক) পরিবর্তন করে দিলেই হয়। আবার, চলচ্চিত্র দেখাতে, আমদানি করতে অনুমতি নিতে হবে, ডেপুটি কমিশনারকে জানাতে হবে-দরকার নেই তো! এখন প্রজেক্টর আছে, ল্যাপটপ আছে। আর কিছু লাগে না। আর চলচ্চিত্র! আপনি কোনটি চান? এমন চলচ্চিত্র খুঁজে বের করা মুশকিল, যা ইন্টারনেটে নেই। আর আজকাল শুধু চলচ্চিত্রই নয়; চলচ্চিত্র সংক্রান্ত সবকিছুই প্রযুক্তির কল্যাণে এখন এক মোবাইল ফোনে ভরে ২৪ ঘণ্টা সঙ্গে নিয়ে ঘোরা যায়।
আরেকটা বিষয়। যে কাজ দৃশ্যত, তাকে বাধা যায়; কিন্তু যা চিন্তায় ক্রিয়ারত, তাকে বাধা দেওয়া প্রায় অসম্ভব। এখনও আমরা আমাদের মতো করে চিন্তা করতে পারি। কিন্তু সেই চিন্তা প্রকাশে এতোদিন বাধা ছিলো। যেমন, দু-এক দশক আগে চলচ্চিত্র দেখানোর ক্ষেত্রে আমার চিন্তায় আসলো, আমি কোরিয়ান চলচ্চিত্রনির্মাতা কিম কি দুকের ব্যাড গাই সিনেমাটি দেখাবো। চিন্তাটা পর্যন্ত করা গেলো। এরপরে যখন সিনেমার জন্য আবেদন করা হলো, তখন কর্তৃপক্ষ মতাদর্শের বিচারে তা আটকে দিলো, কোনো লাভ হলো না। কিন্তু এখন, চিন্তা ও চিন্তার বাস্তবায়ন করাটা আগের চেয়ে অপেক্ষাকৃত অনেক সহজ; আইনের অনেক প্রতিবন্ধকতা এড়িয়েই। কেবল সিনেমা প্রদর্শন নয়, এখন তো সিনেমা নির্মাণই অনেক সহজ হয়ে গেছে। আমরা যদি টালিগঞ্জের ফ্লপ-ই, গান্ডু সিনেমার কথা চিন্তা করি, তাহলে দেখা যাবে এ-ধরনের সিনেমার খরচ বাণিজ্যিক ধারার সিনেমার চেয়ে অনেক কম। তারপরও চলচ্চিত্র দুটি কিন্তু বেশ আলোচনায় এসেছে। নামি কোনো অভিনেতা ব্যবহার না করে কিংবা এসএলআর ক্যামেরা দিয়ে সিনেমা নির্মাণ এবং তার সফলতা কিন্তু এই অঙ্গনে নতুন কিছুকেই ইঙ্গিত করে।
প্রযুক্তিগত এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলেও, চলচ্চিত্র সংসদ নিয়ন্ত্রণ আইন এখনও কার্যকর রাখার যৌক্তিকতা কিংবা ওই আইনের বিভিন্ন ধারা-উপধারাকে অনেকখানিই বাতিল করে দেয়। তারপরও কেবল এই বাধা অতিক্রম করার রসদই নয়। আরও অনেককিছুই আছে যা আইনটির বিভিন্ন অংশের যথার্থতাকে চ্যালেঞ্জ করে।
প্রথমত, যে বিদেশি মতবাদের ভয় কর্তৃপক্ষ করেছিলো, সে বিদেশি মতবাদ কি শেষ পর্যন্ত প্রবেশ করেনি! রাজনৈতিকভাবে না হোক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক বিভিন্ন মতবাদেই তো আমরা আহত হয়েছি। হ্যাঁ, স্বীকার করি তা বিভিন্ন মাধ্যমে হয়েছে। কিন্তু বিদেশি মতবাদ যদি ঠেকাবোই, তাহলে তার অন্যান্য প্রবেশদ্বার বন্ধ করা হলো না কেনো? অর্থনৈতিক ধাক্কা আমরা সামলাতে পারলাম না, পক্ষান্তরে ‘নিরীহভাবে’ বেড়ে ওঠা একটা প্রজন্মের আগাটুকু কেটে দিলাম!
দ্বিতীয়ত, আইনটি জারির মাধ্যমে যে-ক্ষতি হয়েছে তা পুষিয়ে দেওয়ার মতো উল্লেখযোগ্য কোনো উদ্যোগ কর্তৃপক্ষ এখনও নেয়নি। এমনকি আইনটি নিয়েও জোরালো কোনো বিবেচনা করা হয়নি। যেটি হয়েছে, নিবন্ধনের ক্ষমতা কর্তৃপক্ষের হাতে রেখে গত ৭ মার্চ আইনের খসড়া অনুমোদন হয়। যে-খসড়া সম্পর্কে আমার মতামত চলচ্চিত্রনির্মাতা চাষী নজরুল ইসলাম এবং অভিনেতা আলমগীরের মতামতের সমার্থক। চাষীর মতে, ‘...এতে চলচ্চিত্রের কোনো লাভ হলো না। নাটকে কিংবা অন্য সংস্কৃতির বেলায় সংগঠন করতে কোনো নিবন্ধন করতে হয় না। তাহলে চলচ্চিত্রের বেলায় কেন? আমাদের দেশে চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে দেখা যায়-আইনের চেয়ে প্রয়োগ বেশি। আমার মতে এ আইন সংশোধনে চলচ্চিত্রে কোনো প্রভাব ফেলবে না।’৭ আলমগীরের ভাষ্য, ‘...আর দেশের কোনো শিল্প-সংস্কৃতির ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকাটা ইতিবাচক নয়। তবে নিয়ন্ত্রণ আইনই বাতিল করলে অনেক ভালো হতো। কারণ, চলচ্চিত্র সংসদ গঠন করে কেউ যদি চলচ্চিত্রের সম্প্রসারণ করতে চায় তাহলে সেখানে বাধা দেওয়ার কোনো যুক্তি খুঁজে পাই না।’৮ তাই বলছিলাম, সরকার যদি চলচ্চিত্রের জন্য অন্য কোনো রাস্তা তৈরি না করে দেয়, তবে অন্তত আইনটি বাতিল করে এ-পরিমণ্ডলের ‘স্বেচ্ছাসেবকদের’ নির্বিঘ্নে কিছু কাজ করার সুযোগ করে দিতে পারে।
তৃতীয়ত, কর্তৃপক্ষ তো পারিপার্শ্বিকতার বিচার করেও আইনটির যৌক্তিকতা বিচার করে দেখতে পারতো। যে-সব দেশে এ-ধরনের নিয়ন্ত্রণ আইন জারি হয়নি, সে-সব দেশের মতাদর্শ কিংবা সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল কি রসাতলে গিয়েছে? এ আন্দোলনকে সমর্থন দিয়ে, চলার পথকে উন্মুক্ত করে দিয়ে, পৃথিবীর কোনো কর্তৃপক্ষকেও আফসোস করতে হয়নি। বরং পথকে বন্ধুর করে, যাত্রা বন্ধ হওয়ার নমুনাই পাওয়া যাবে। তাহলে যে-আইনে লাভ হলো না, বিস্তর ক্ষতি হলো; সে-আইন রাখার যৌক্তিকতা কোথায়?
চতুর্থত, আমাদের সিনেমার দর্শক তো মৃতপ্রায়। ফলে প্রযুক্তির কল্যাণে ‘শৈল্পিক মানোত্তীর্ণ’ চলচ্চিত্র আসতে বাধা না থাকলেও তা দেখার মতো দর্শক পর্যাপ্ত নেই। আমাদের দর্শকদের মধ্যে কিছু দর্শক আছেন, যারা এখনও প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে আমাদের চলচ্চিত্র দেখেন, এর বাইরে বড়ো একটা অংশ ঘরের মধ্যে টিভি-কম্পিউটারে দেখেন ওই ‘দাবাঙ টাইপ’-এর চলচ্চিত্র। আমি বলতে চাইছি, যে-শ্রেণির দর্শক তৈরি করার জন্য চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন যাত্রা শুরু করেছিলো, সেই শ্রেণির দর্শকের বড়োই অভাব। ফলে, সেই-শ্রেণির দর্শক তৈরি করতে হলে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের বিকল্প নেই। এই অবস্থায় এখনও যদি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাটা সরকারের হাতেই বলবৎ থাকে, তাহলে তো হবে না।
৫.
তারপরও আমরা আশাবাদী। কারণ, এখনও আমাদের দেশের মানুষের চলচ্চিত্র দেখার আগ্রহটা মরে যায়নি। তারা যে-চলচ্চিত্রই দেখুক না কেনো, যে-ভাবেই দেখুক না কেনো, হোক না সে চা-স্টলে সিডি-ভিসিডির সামনে কিংবা ড্রয়িং-রুমে ডিস-সংযুক্ত টেলিভিশনে; আবার একাকী নিজ কক্ষে কম্পিউটার মনিটরের সামনে। এর বাইরেও কিছু থেকে যায়, যারা চলচ্চিত্র কিংবা প্রেক্ষাগৃহের মূল্যসূচক যতো নিচেই নেমে যাক না কেনো, তারা এখনও সিনেমা দেখার ক্ষেত্রে প্রেক্ষাগৃহকেই উত্তম পরিবেশ হিসেবে জানে। এখন কাজ হলো, এসব বিচ্ছিন্ন দর্শককে এক করা। এ-জন্য প্রযুক্তি ইতোমধ্যেই পুঁজি ও অনেক প্রতিবন্ধকতাকে টেক্কা মেরে সহায়তা দেওয়া শুরু করেছে। অর্থাৎ, আমাদের চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের নতুন করে পথচলা কিংবা আগের চলাকেই গতিশীল করার ক্ষেত্রে প্রযুক্তি অর্ধেকের বেশি কাজটুকু করে দিয়েছে। আর যে-টুকু বাকি থাকে, সে-টুকু কাজ চলচ্চিত্র সংসদ নিয়ন্ত্রণ আইন তুলে নিলেই হওয়ার কথা। এখন দেখার বিষয় কর্তৃপক্ষ কী করে? তবে কর্তৃপক্ষের কাছে একটা প্রত্যাশা রেখে আলোচনা শেষ করবো। প্রত্যাশাটা হলো-আমরা দীর্ঘদিন ধরে চ্যাপলিনের সিনেমা দেখে কেবলই হাসি; কিছু ভাবি না; আমাদেরকে একটু ভাবতে দিন, ভাবতে সহায়তা করুন।
লেখক : আসাদ লাবলু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে সদ্য স্নাতকোত্তর পরীক্ষা শেষ করেছেন। বর্তমানে তিনি কালের কণ্ঠ পত্রিকায় শিক্ষানবিশ সহ-সম্পাদক হিসেবে কাজ করছেন।
asadmcru@gmail.com
তথ্যসূত্র
১. কাদের, মির্জা তারেকুল (১৯৯৩ : ৬৪); বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্প; বাংলা একাডেমী, ঢাকা।
২. শিকদার, অশ্রুকুমার (২০১০ : ৬৫৫); ‘র্সুরিয়ালিজ্ম’; বুদ্ধিজীবীর নোটবই; সম্পাদনা-সুধীর চৌধুরী; নবযুগ প্রকাশনী, ঢাকা।
৩. প্রাগুক্ত; কাদের, মির্জা তারেকুল (১৯৯৩ : ৬৩৪)।
৪. প্রাগুক্ত; কাদের, মির্জা তারেকুল (১৯৯৩ : ৬৩৫)।
৫. প্রাগুক্ত; কাদের, মির্জা তারেকুল (১৯৯৩ : ৬৩৬)।
৬. মাখমালবাফ, সামিরা; ‘ডিজিটাল বিপ্লব এবং ভবিষ্যত সিনেমা’; মুভিয়ানা; সম্পাদনা-বেলায়েত হোসেন মামুন; প্রথম সংকলন, মার্চ-২০০৪, ঢাকা।
৭. ‘চলচ্চিত্র সংসদ নিবন্ধন আইন : পক্ষ-বিপক্ষ’; সমকাল, ১৭ মার্চ ২০১১।
৮. প্রাগুক্ত; সমকাল, ১৭ মার্চ ২০১১।
বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৩ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের চতুর্থ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন