Magic Lanthon

               

কিবরিয়া জুয়েল

প্রকাশিত ০৬ ডিসেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

মৃগয়া ও ওকা ওড়ি কথা : মৃণালের ছবিতে প্রতিবাদের দুই রূপ

কিবরিয়া জুয়েল

 

...আমি কেতাবি লোক নই,অ্যাথেন্‌স-নগরের নিকটবর্তী উদ্যানস্থ প্লেটোর বিদ্যালয় আমার কাছে স্বপ্নমাত্র। বিশ্ববিদ্যালয় যে-গবেষণার স্বীকৃতি দিয়ে থাকে, সে অর্থে গবেষকও আমি নই,সদ্বংশজাত পাণ্ডিত্যের অহমিকা তো আমার থাকার কথা নয়,খোলাখুলি একটা কথা বলি,সংরক্ষিত দলিল পত্রাদিতে অনুসন্ধান চালাবার নৈপুণ্য আমার নেই। নিজের সম্পর্কে পদার্থবিদ্যার ছাত্র মৃণাল সেনের মন্তব্য ছিলো এমনই। কিন্তু কে জানতো এই মৃণালই একদিন সত্যজিৎ-ঋত্বিকদের পাশাপাশি নিজের জায়গা করে নিবেন বাংলা চলচ্চিত্রে? আজ এই সময়ে এসে তাই আমরা যারা বাংলা চলচ্চিত্র নিয়ে অল্পবিস্তর চর্চা করতে চাই,মৃণালকে বাদ দিয়ে সেই চর্চা যেনো সম্পূর্ণ হতে চায় না। সত্যজিৎ-ঋত্বিকের সঙ্গে সঙ্গে এখন এক নিঃশ্বাসে উচ্চারিত হয় মৃণালের নাম। মৃণালের চলচ্চিত্রকে বাদ দিয়ে বাংলা চলচ্চিত্র নিয়ে কোনো গবেষণা তাই পূর্ণতা পায় না। ব্যক্তি-মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের জটিলতা,তাদের সংস্কৃতি,মূল্যবোধ প্রভৃতি বিষয়গুলো মৃণাল বেশ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তার চলচ্চিত্রে তুলে এনেছেন।

বাণিজ্য ও বিনোদননির্ভর মূলধারার চলচ্চিত্রের অসম্ভব দৌরাত্ম্যের মধ্যেই সত্যজিৎ তার প্রথম চলচ্চিত্র পথের পাঁচালীর মাধ্যমে সবার নজরে আসেন, পথের পাঁচালী ছিলো তার শিল্পমনস্কতার এক প্রতীকী বিদ্রোহ। অন্যদিকে শিল্পের প্রতি কমিটমেন্টের কারণে সহজেই সাধারণ মানুষের কাছাকাছি যেতে পেরেছিলেন ঋত্বিক। কিন্তু প্রায় একই সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল থেকে আসা সমসাময়িক মৃণাল সেনের অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর ছিলো না। তার প্রথম ছবি রাতভোর দর্শক মহলে তেমন সাড়া জাগাতে পারেনি,অন্যদিকে দ্বিতীয় ছবি নীল আকাশের নীচে জনপ্রিয় হলেও গুণীমহলের কাছে সমাদৃত হয়নি। তৃতীয় ছবি বাইশে শ্রাবণই মৃণালকে প্রথম আলোচনায় এনে দেয়। এরপর ১৯৬৯-এ ভুবন সোম নির্মাণ করে ভারতিয় চলচ্চিত্রে আঙ্গিকগত বিপ্লবের সূচনা করেন তরুণ মৃণাল। সেই সময়ের নবীন নির্মাতারা এই চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়েই এক ভারতিয় নবতরঙ্গ আন্দোলনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন।চলচ্চিত্রবোদ্ধারা বলেন,...ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে পথের পাঁচালী যদি বাস্তববাদের সূচনা করে থাকে তাহলে মৃণাল সেনের ভুবন সোম চলচ্চিত্রের আঙ্গিকতায় আধুনিকতার সূত্রপাত ঘটিয়েছিলো।

মৃণাল যখন ফরিদপুর ছেড়ে কলকাতায় পাড়ি জমালেন তখন চারদিক উত্তাল, অস্থির। নৌ-বিদ্রোহ,দেশভাগ,দুর্ভিক্ষ,তেভাগা আন্দোলন,কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা এসব নাগরিক জীবনে ফেলে ছিলো ব্যাপক প্রভাব। সেসময় সাম্যবাদী আন্দোলন মৃণালকে শোষণহীন সমাজের স্বপ্ন দেখিয়েছিলো। আর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন সর্বহারা মানুষের পাশে। কলকাতায় এসেই মৃণাল যোগ দেন ভারতিয় কমিউনিস্ট পার্টির সাংস্কৃতিক শাখা ভারতীয় গণনাট্য সংঘ-তে। এমন সময় কলকাতায় সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে তিনি জড়িয়ে পড়লেন চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনে। চলচ্চিত্রকে নতুন করে আবিষ্কার করলেন মৃণাল,ভীষণভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন ইতালির নব্য-বাস্তববাদ দ্বারা। এ সময় সাউন্ড টেকনোলজির ওপর প্রবল আকর্ষণ থাকায় অরোরা ফিল্ম স্টুডিওর শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি, পাশাপাশি চলচ্চিত্রের ওপর পড়াশোনাও চালাতে থাকেন সমানে। এরই মধ্যে চার্লি চ্যাপলিনকে নিয়ে একটি বইও লিখে ফেলেন মৃণাল। ১৯৫২ সালে কলকাতায় আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব অনুষ্ঠিত হলে, চলচ্চিত্র নিয়ে মৃণালের আগ্রহ আরো বেড়ে যায়। আর ১৯৫৬ সালে রাতভোর নির্মাণের মধ্য দিয়ে বর্ণিল সেলুলয়েডে শুরু হয় চলচ্চিত্রকার মৃণালের নতুন করে পথ চলা।

 

মৃণালদের হাত ধরে তৃতীয় চলচ্চিত্র

গেলো শতাব্দীর ৫০-এর দশকে ব্রাজিলে নন্দনভাবনা ও শৈলীর দিক থেকে ইতালিয় নব্য-বাস্তববাদ এবং ফরাসি নবতরঙ্গ দ্বারা প্রভাবিত সিনেমা নোভো চলচ্চিত্র আন্দোলনের গোড়াপত্তন হয়।লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতিগত মেলবন্ধন থাকায় খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ব্রাজিলের সীমানা পেরিয়ে পুরো এলাকায় এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে;যেখানে চলচ্চিত্রের মূল বিষয় হয়ে ওঠে দুর্ভিক্ষ,সহিংসতা কিংবা ভূমিহীন কৃষকদের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম। দীর্ঘসময় ঔপনিবেশিক শক্তির অধীনে থাকায় উপনিবেশ পরবর্তী লাতিন আমেরিকায়ও এর বিরূপ প্রভাব পড়ে। সিনেমা নোভো আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত নির্মাতারা উপনিবেশ পরবর্তী শাসক থেকে শুরু করে সাধারণ জনগণের মধ্যে উপনিবেশিকের সঞ্চারিত নানামুখী বৈশিষ্ট্যকে সেলুলয়েডে তুলে আনেন। উদ্দেশ্য,উপনিবেশিতের মনোজগৎ হতে সদ্যবিদায়ী উপনিবেশিকের আধিপত্য দূর করা। আর তাই এই ধারার চলচ্চিত্রে স্বকীয় ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি-প্রথা-মিথ প্রভৃতি বিষয়গুলো আবারও জায়গা পেতে থাকে। আর এসবের মধ্য দিয়েই উপনিবেশায়নের বিরুদ্ধে এসব চলচ্চিত্রের একধরনের প্রতিরোধাত্মক প্রবণতা চোখে পড়ে।

অন্যদিকে,৬০-এর দশকে উপনিবেশবাদের প্রভাবমুক্ত চলচ্চিত্র নির্মাণের লক্ষ্যে বিপ্লব পরবর্তী কিউবায় শুরু হয় তৃতীয় চলচ্চিত্র আন্দোলন। পরবর্তী সময়ে এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে এশিয়া,আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে। আঙ্গিকগত দিক থেকে তৃতীয় চলচ্চিত্র ইতালিয় নব্যবাস্তববাদ ও সোভিয়েত বাস্তববাদী ধারার চলচ্চিত্র দ্বারা প্রভাবিত। এ ধরনের চলচ্চিত্র দর্শককে আনন্দ দেওয়ার পরিবর্তে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে সচেতন করে তোলার ওপরই বেশি জোর দেয়,লড়াকু হতে উৎসাহী করে।

লাতিন আমেরিকার চলচ্চিত্র আন্দোলনের পালাবদল ভারতবর্ষের চলচ্চিত্রকেও ব্যাপকভাবে আলোড়িত করেছিলো। দুটি অঞ্চলই দীর্ঘদিন ঔপনিবেশিক শক্তি দ্বারা শোষিত হওয়ায় উভয় অঞ্চলের অনেক নির্মাতা তৃতীয় চলচ্চিত্র-কেই বি-উপনিবেশায়ন তথা জনগণকে সমাজসচেতন করে তোলার হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেন। পশ্চিম বাংলায় তৃতীয় চলচ্চিত্র-এর প্রকাশ ঘটে গত শতাব্দীর পঞ্চাশ দশকে,প্রধানত নিমাই ঘোষ,বিমল রায়,বারীণ সাহা,ঋত্বিক ঘটক এবং মৃণাল সেনের চলচ্চিত্র সৃষ্টির মাধ্যমে। ঋত্বিক-মৃণালদের চলচ্চিত্রই আমাদেরকে বলে দেয়,তারা রাজনৈতিকভাবে কতোটা সচেতন ছিলেন। ৫০ ও ৬০-এর দশকে কমিউনিস্ট পার্টির সাংস্কৃতিক শাখা ভারতীয় গণনাট্য সংঘ বাংলায় যে সাংস্কৃতিক চেতনা ছড়িয়ে দিয়েছিলো তারই উত্তাপ পেয়েছিলো পশ্চিম-বাংলার চলচ্চিত্র। বলা যায়,গণনাট্য সংঘের ছড়িয়ে দেওয়া সাংস্কৃতিক চেতনাই পরবর্তী সময়ে পশ্চিম-বাংলায় তৃতীয় চলচ্চিত্র আন্দোলনের জন্ম দেয়। ভারতীয় গণনাট্য সংঘ তখন নাচ,গান,নাটক,উপন্যাস,চিত্রকলা,গল্প,প্রবন্ধ প্রভৃতি ব্যবহার করে সাংস্কৃতিক আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে;নিম্নবর্গের ঘুম ভাঙানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। আর গণনাট্য সংঘের সেই সাংস্কৃতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে তখন দিন-রাত, খেয়ে না-খেয়ে শ্রম দিচ্ছেন ঋত্বিক-মৃণালরা। একই সঙ্গে পেট চালাতে মৃণালকে করতে হচ্ছে কাগজের সম্পাদনা,প্রুফ দেখা,গৃহশিক্ষকতা এমনকি মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভের কাজ। কিন্তু তখনো চলচ্চিত্র বানানোর স্বপ্ন শেষ হয়ে যায়নি। তার ভাষায়,এ সময় দিন কাটছে দারিদ্র্যের মধ্যে,দারিদ্র্যের ভয়াবহতার মধ্যে,দিন কাটছে ক্ষুধায়,অপমানে, এক একটা দিন যায় সিনেমার জন্যে আরো ছট্‌ফট্‌ করি। নিওরিয়ালিজ্‌ম্‌ আকর্ষণ করে রাজনৈতিক কারণে।

সত্যজিৎ,ঋত্বিক ও মৃণাল-বাংলা চলচ্চিত্রের এই তিন কিংবদন্তি মতাদর্শের দিক থেকে কমিউনিস্টভাবাপন্ন ছিলেন। এই তিন নির্মাতার চলচ্চিত্র বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখি, সত্যজিতের চলচ্চিত্রে বাস্তবতাকে দূর থেকে দেখার একটা প্রবণতা আছে। তিনি দর্শকের সঙ্গে কোনো প্রকার বাহাসে যেতে চাননি,আবার প্রতিষ্ঠানকে আঘাত করেও কিছু বলতে চাননি;তবে প্রতিষ্ঠানকে বিব্রত করেছেন বারবার। একরকম ভারসাম্য রাখার প্রবণতা তার ছবিতে দেখা যায়। পথের পাঁচালী, হীরক রাজার দেশ কিংবা আগন্তুক-এ তার এই প্রবণতা চোখে পড়ে। অন্যদিকে ঋত্বিকের চলচ্চিত্রে দুঃসহ বাস্তবতার রূপায়ণ অধিক মাত্রায় দেখা যায়। সত্যজিৎ বাবুর মতো তিনি অবশ্য গা বাঁচিয়ে চলার চেষ্টা করেননি,তাই কোনো কিছুকে পরোয়া না করে বারবার প্রতিষ্ঠানকে আঘাত করেছেন,প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন। রাজনীতি,দুঃসহ বাস্তবতার অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে ঋত্বিকের মেঘে ঢাকা তারা,কোমল গান্ধার,সুবর্ণরেখা কিংবা যুক্তি তক্কো আর গপ্পো ছবিতে। অন্যদিকে মৃণালের চলচ্চিত্রগুলো সমকালীন সমাজবাস্তবতাকে ধারণ করেও রাজনৈতিক ছবি হয়ে উঠেছে। তাই দর্শক সম্ভবত মৃণালের ছবিতে অন্যকে দেখার,অন্যের চোখ দিয়ে দেখার কোনো সুযোগ পায় না। তিনি দর্শককে নির্মম সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করাতে চান। এবং এক্ষেত্রে মৃণালকে সত্যজিৎ তো বটেই কোনো কোনো এক্ষেত্রে ঋত্বিকের চেয়েও অনেক বেশি সরব ও স্পষ্টবাদী বলে আমার মনে হয়েছে।

তবে মৃণালকে নিয়ে সমালোচনাও কম হয়নি। নিজেকে প্রাইভেট মার্কসিস্টহিসেবে আখ্যা দেওয়া মৃণাল ৮০র দশকে হঠাৎ করেই পার্টিভিত্তিক মার্কসবাদী আন্দোলনের ওপর তার আস্থাহীনতার কথা জানিয়ে সবাইকে অবাক করে দেন। প্রথম দিকে যে মৃণাল ভারতবর্ষের নিষ্করুণ দারিদ্র্যকে,মর্মান্তিক বাস্তবতাকে,শোষণের ভয়াবহ রূপটিকে দর্শকের সামনে উন্মোচন করেছেন,পরবর্তী সময়ে সেই মৃণালকে চিনতে একটু কষ্ট হওয়ারই কথা। হঠাৎ করেই তার ছবি থেকে হারিয়ে যেতে থাকে নিম্নবর্গের কথা। তাই বলে তিনি যে টালিগঞ্জিয় মিষ্টি প্রেমের ভোগবাদী ছবির গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দিয়েছিলেন ব্যাপারটা মোটেও তেমন নয়। তবে মৃণাল মধ্যবিত্ত-শ্রেণির মূল্যবোধের সংকীর্ণতা-রক্ষণশীলতাকে উপজীব্য করে চলচ্চিত্র নির্মাণে হঠাৎ মনোযোগী হওয়ায় অনেকের মনেই সন্দেহ দেখা দেয়। যিনি এতোদিন নিম্নবর্গের মানুষের কথা বলেছেন, সর্বহারার রাজনীতির কথা বলেছেন,তিনি কি তাহলে মধ্যবিত্ত-মানসিকতার চাপেই পথভ্রষ্ট হলেন? ব্যাপারটা বোধহয় এমন নয়। স্বয়ং মৃণালই এর উত্তর দিয়েছেন এভাবে,যে যাই বলুন বা মনে করুন, সময়কে সমঝে নিয়ে চলার তাগিদ অনুভব করি প্রতিমূহর্তে। ...সময়ের দাসত্ব নয়, সমঝোতা। এই ব্যাপারটাকেই কি পণ্ডিতেরা ডায়ালেকটিক্স বলেন না?

আসলে পশ্চিম-বাংলার চলচ্চিত্রবোদ্ধারা কিংবা মৃণালের ঘনিষ্ঠজনেরা, যারা কিনা মৃণালকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন,তারা মৃণালের এই গতি পরিবর্তনকে ভালোভাবে মেনে নিতে পারেননি। হয়তো মৃণালের কাছে তাদের প্রত্যাশার জায়গাটা একটু বেশিই ছিলো। কিন্তু আমাদের অনেকের মতোই হয়তো বুর্জোয়া ব্যবস্থার মধ্যে থেকে তা ভাঙার প্রবণতা বাসা বেঁধেছিলো মৃণালের। তবে এ কথাও তো ঠিক, সমাজ কাঠামোকে ব্যবচ্ছেদ করে দেখতে হলে শুধু নিম্নবর্গকে বা শাসকশ্রেণিকে দেখলেই চলবে না। ভুলে গেলে চলবে না,আমাদের এই সমাজের একটা বড়ো অংশ মধ্যবিত্ত-শ্রেণি;এই সমাজ ব্যবস্থাকে টিকে রাখতে তাদের ভূমিকাও কম নয়। সম্ভবত এই কারণেই মৃণাল মধ্যবিত্ত-শ্রেণিকে বুঝতে ও বোঝাতে চেয়েছিলেন তার চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। আর একজন চলচ্চিত্রনির্মাতা যে সারাজীবন একই রকম দার্শনিক অবস্থানে দাঁড়িয়ে থাকবেন-এমন প্রত্যাশা করাও নিশ্চয় ঠিক নয়?

তবে সমালোচকরা যে যাই বলুন না কেনো,মৃণাল তার ছবিতে বরাবরই শোষিত নিম্নবর্গকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তাই যখনই শাসকশ্রেণি নিম্নবর্গের ওপর তাদের শোষণ-নির্যাতন বাড়িয়ে দিয়েছে,ঠিক তখনই সেদিকে নজর গিয়েছে মৃণালের। ক্যামেরার চোখে বারবার উন্মোচন করেছেন শাসকশ্রেণির ভয়ঙ্কর চেহারা। তিনি প্রতিষ্ঠানকে বিব্রত না করে সরাসরি আঘাত করে কথা বলেছেন। পশ্চিম-বাংলায় যখন নকশাল আন্দোলন চরম পর্যায়ে,রাষ্ট্র যখন সবরকম নীতি-নৈতিকতা উপেক্ষা করে চালিয়ে যাচ্ছে নির্মম দমন-পীড়ন,তখন মৃণালও ক্ষোভে ফেটে পড়েন। এক এক করে নির্মাণ করলেন মৃগয়া,ওকা ওড়ি কথা পরশুরাম।এবার মৃণালের সমালোচক ও ঘনিষ্ঠজনদের অনেকেরই অভিমান ভাঙলো,যেনো ঘরের ছেলেটি ঘরে ফিরে এসেছে। ৭০ দশকের এমনই দুটো চলচ্চিত্র মৃগয়া (১৯৭৬) ও ওকা ওড়ি কথাকে (১৯৭৭) দিয়ে মৃণালের প্রতিবাদী রূপকে দেখার চেষ্টাই এই লেখা।

মৃগয়াতে শ্রেণি-সংঘাত,ওকা ওড়ি কথাতে বিচ্ছিন্নতা

বুর্জোয়া শাসকরা সবসময় সর্বহারাদের সঙ্গে শ্রেণি-সংঘাত এড়িয়ে চলতে চায়। এজন্য তারা সর্বহারা প্রজাদেরকে দীক্ষা দেয় শাসকশ্রেণির ধারণাসমূহেরমৃগয়ায় ভদ্রলোকের লেবাস পরা বড়ো রাজাবাবুকে এই ভূমিকায় দেখা যায়। এই বড়ো রাজাবাবুরা বিদ্যমান সমাজ-ব্যবস্থাকে টিকে রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা চালায়। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়,শ্রেণিবিভক্ত সমাজে সবসময়ইশ্রেণিসংগ্রাম চলে। তাই শেষ পর্যন্ত ওই বড়ো রাজাবাবুরা ঘিনুয়াদেরকে শ্রেণিসংগ্রাম থেকে বিরত রাখতে পারে না, যেমনটি রাখতে পারেনি শালপু কিংবা তারও আগে সিধু-কানুদেরকে। শাসকশ্রেণির রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে তারা হাতে তুলে নিয়েছে অস্ত্র,নিশ্চিত মৃত্যুকে করেছে আলিঙ্গন। তবে এই শ্রেণি-সংঘাত যে সবসময় প্রকাশ্য লড়াই কিংবা বিদ্রোহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে বিষয়টি এমন নয়।অনেক সময় এই লড়াই সাদাচোখে ধরাও পড়েনি। সমাজ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে শ্রমজীবীদের নিজস্ব ভাবধারা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চলতেই থাকে,তবে প্রতিবাদের ভাষাটা হয়তো একটু অন্যরকম হয়।

মৃগয়ার ঠিক পরের ছবি ওকা ওড়ি কথাতে মৃণাল প্রতিবাদের এই ভিন্ন ভাষাটাও তুলে ধরেন। আমরা জানি যে,নির্দিষ্ট উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে নির্দিষ্ট শ্রেণির নির্দিষ্ট কিছু সম্পর্ক থাকে। তাই ওকা ওড়ি কথাতে আমরা দেখি,ভেঙ্কাইয়া কিংবা কিস্তা শাসকশ্রেণির সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে না জড়ালেও উৎপাদন প্রক্রিয়া থেকে নিজেদেরকে দূরে সরিয়ে রাখেন। তাদের বুঝতে কোনো অসুবিধা হয় না, শাসকশ্রেণি প্রতিনিয়ত তাদের শোষণ করছে;রোদে পুড়ে,শরীরের ঘাম ঝরিয়ে তারা যা উৎপাদন করেন,তার প্রায় সবটাই নিয়ে যায় ওই ভদ্রলোকেরা।আর এজন্যই ভেঙ্কাইয়াদের ঘরের চালা বৃষ্টির পানি ঠেকাতে পারে না,আড়াল করতে পারে না প্রখর রৌদ্রকে। তাদের দারিদ্র যেনো দিনকে দিন বেড়েই চলে,অন্যদিকে শাসকরা আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়।ভেঙ্কাইয়ারা এক্ষেত্রে শাসকদের শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে না পারলেও নিজেরা শোষণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে না।

সমাজ বিকাশের যে ইতিহাস,সেখানে সমাজ একটার পর একটা স্তর অতিক্রম করেছে সময়ের চাহিদায়। পূর্ববর্তী সমাজ-ব্যবস্থাই পরবর্তী সমাজ-ব্যবস্থার আগমনের ক্ষেত্রে প্রস্তুত করে দিয়েছে। আর নতুন সমাজ-ব্যবস্থার আগমনে উৎপাদন উপকরণে যে পরিবর্তন আসে তা পুরো উৎপাদন সম্পর্কে পরিবর্তন নিয়ে আসে। আর এসব পরিবর্তনের ফলেই সমাজে আসে রূপান্তর।মৃগয়ায় যে শ্রেণি-সংঘাত তার পিছনেও ঐতিহাসিকতা আছে। মুখিয়ার কাছ থেকে আমরা জানতে পারি,এর আগে সিধু-কানুরা ওই একই শাসকশ্রেণির সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে প্রাণ দিয়েছিলেন। আর এখন প্রাণ দিতে হলো শালপু আর ঘিনুয়াকে। তাহলে কি এই শ্রেণি-সংঘাতের কোনো শেষ নেই? মার্কসের মতে সমাপ্তিহীন শ্রেণী-সংঘাতের ওপর ইতিহাস ভিত্তিশীল-সমাপ্তিহীন এই অর্থে যে সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার পূর্বপর্যন্ত,যখন শ্রেণীর বিলুপ্তি ঘটবে এবং সেইসাথে সংঘাতেরও।১০ এই শ্রেণি-সংঘাতের কোনো শেষ আছে কি নেই অথবা আদৌ কখনো সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠা হবে কি না-তা নিয়ে সংশয় বা ভিন্নমত থাকতেই পারে। কিন্তু তাই বলে শাসকশ্রেণির শোষণ চুপচাপ মেনে নেওয়া যায় কি? সিধু-কানু-শালপু কিংবা ঘিনুয়ারা তাই বারবার বুর্জোয়া শাসকদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে নেমে পড়েন,স্বাধীনতার-মুক্তির স্বপ্ন দেখতে ও দেখাতে থাকেন।

অন্যদিকে ওকা ওড়ি কথাতে মৃণাল দেখালেন ভিন্ন চিত্র। সেখানে তিনি কেন্দ্রীয় চরিত্র ভেঙ্কাইয়াকে শাসকশ্রেণির সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে লিপ্ত না করালেও তার সত্তাকে শাসকশ্রেণি থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন করে তুলে ধরেছেন। অজপাড়ার অলস চাষা ভেঙ্কাইয়া ঠিকই বুঝতে পারেন,জমিদার তাদেরকে ব্যবহার করে সম্পদের পাহাড় গড়লেও কেনো তাদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয় না;কেনো সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করার পরও তাদের ঘরের চুলা প্রতিদিন জ্বলে না,কেনোই বা তার পূর্ব-পুরুষদের সবাই তার চেয়ে বহুগুণ বেশি পরিশ্রম করেও শেষপর্যন্ত নিজের ভিটে-মাটিও রক্ষা করতে পারেনি? জীবনের এমন সব তিক্ত অভিজ্ঞতা একপর্যায়ে ভেঙ্কাইয়াকে অলস করে দেয়। তিনি পুত্র কিস্তাকেও কঠোর পরিশ্রম করতে দেন না বরং কিভাবে কাজে ফাঁকি দেওয়া যায় তার কৌশল শিখিয়ে দিতে থাকেন। ভেঙ্কাইয়া আসলে পুরো উৎপাদন-ব্যবস্থা থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিলেন, তাই কোনো কাজকেই তিনি নিজের মনে করতে পারেননি। একটু ভালো করে লক্ষ করলে দেখা যাবে,ভেঙ্কাইয়া যে শুধু কাজ থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলেন তা নয়,শেষ পর্যায়ে এসে তিনি আত্মীয়-স্বজন এমনকি আপন সত্তা থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। পুত্রবধূ নীলিমার সঙ্গে তার রূঢ় আচরণ এবং নিজের ভগ্ন দেহের প্রতি উদাসীনতা দেখে অন্তত তাই মনে হয়েছে।

দেশে দেশে শোষিত শ্রমিকশ্রেণির সবার ক্ষেত্রেই এ ধরনের ঘটনা ঘটে। শ্রমিকরা সবসময় ভাবতে থাকেন-এটা তো তাদের নিজের কাজ নয়;মালিকের কাজ,শোষকের কাজ। একই চিত্র আমরা দেখি আমাদের পোশাক-শ্রমিকদের ক্ষেত্রেও। তারা বছরের পর বছর একই মেশিনে বা কারখানায় কাজ করলেও মালিকের শোষণ কিংবা ন্যায্য মজুরির দাবিতে সেই কারখানা বা মেশিন জ্বালিয়ে দিতে তাদের এক মুহূর্ত লাগে না। কারণ তারা জানেন,এই কারখানাই বছরের পর বছর ধরে তাদেরকে শোষণ করছে;এই কারখানারই ভবন ধসে কিংবা আগুনে পুড়ে শত শত শ্রমিকের প্রাণহানি হয়েছে,হচ্ছে। মার্কস এই বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে,...কাজটি শ্রমিকের থেকে বিচ্ছিন্ন,অর্থাৎ,কাজটি তার স্বভাবের সাথে যায় না;সেহেতু কাজটি করে আপন-সত্তাকে সে তৃপ্ত করে না,একপ্রকার যন্ত্রণাবোধ করে একটুও ভালো বোধ করে না,কাজটির মাধ্যমে সে মুক্তভাবে নিজের শারীরিক ও মানসিক বলবৃদ্ধি করতে পারে না,বরং শারীরিকভাবে ভীষণ ক্লান্ত ও মানসিকভাবে ভিত্তিহীন ভাবতে থাকে। সেকারণে শ্রমিক একমাত্র অবসরকালেই স্বস্তিবোধ করে। ...বিচ্ছিন্নতাক্রান্ত্ম কাজ শ্রমিকের মনে এমন ভবোদয় করে যে এটা তার কাজ নয় অন্য কারো,অর্থাৎ কাজের সময় সে আপন সত্তায় থাকে না...।১১ কিন্তু ওই শ্রমিক তার পরও কাজ করতে যান। কারণ তিনি এটাও খুব ভালো করে বোঝেন-আজকে কাজে না গেলে আগামীকাল তাকে না খেয়ে থাকতে হবে। কিন্তু ভেঙ্কাইয়া এসব বুঝেও কাজ করতে চান না,তিনি কাজ করার চেয়ে অনাহারে থাকাকেই সঠিক সিদ্ধান্ত বলে মনে করেন। আর এখানেই সাধারণ শ্রমিকের চেতনার সঙ্গে ভেঙ্কাইয়ার চেতনার মূল পার্থক্য।

রাজারা থাকেন দেবতাদের মতোই আকাশে

শাসকশ্রেণি নিজেদের শাসন-শোষণ দীর্ঘায়িত করতে সবসময়ই নিম্নবর্গের চৈতন্যে প্রভাব বিস্তার করতে চায়। তাদের মধ্যে এমন ধারণা বদ্ধমূল করতে চায়,যেনো তারা নিজেদের দুরবস্থার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে সজাগ হতে না পারে। গ্রামসি একেই আধিপত্য বলেছেন,যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রাষ্ট্র তথা শাসকশ্রেণি বল প্রয়োগের পরিবর্তে ব্যবহার করে। কারণ,যে ক্ষমতা যতো বেশি লুকিয়ে রাখা যায়,সে ক্ষমতা ততো বেশি কার্যকর হয়।মৃণালের দুই প্রতিবাদী চরিত্র ভেঙ্কাইয়া কিংবা ঘিনুয়ারা তাই নিজেদের অজান্তেই অনেক সময় শ্রেণি-শোষণকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেন। এই শাসকরা খুব ভালোভাবেই তাদের মজ্জার ভিতর ঢুকিয়ে দিয়েছেন যে রাজাদের অধীন থাকার জন্যই তাদের জন্ম,তারা পরিশ্রম করবেন আর রাজারা বসে বসে খাবেন এটাই স্বাভাবিক,তারা কুঁড়ে-ঘরে থাকলেও রাজাদের জন্য রাজপ্রাসাদ থাকা চাই,এটাই নিয়ম!ওকা ওড়ি কথাতে তাই ভেঙ্কাইয়া তার দুরবস্থার জন্য একপর্যায়ে ভাগ্যকে দোষারোপ করেন;তাদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত প্রতারণা করা হচ্ছে বুঝতে পেরেও জমিদারেরই জয়গান গায়। তিনি ভাবেন,নিয়তিকে মেনে নেওয়া ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো পথ নেই। আবার মৃগয়াতে সারা বছর কোনো খোঁজ না থাকলেও ফসল উঠার সঙ্গে সঙ্গে দাদনের টাকা তুলে নিতে মহাজনদের ভুল হয় না। কেউ ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে এই মহাজনদের নজর পড়ে কৃষকের স্ত্রী-কন্যার দিকে। কিন্তু এতো কিছুর পরও ঘিনুয়াদের কাছে শাসকশ্রেণি দেবতাই থেকে যায়। এটাই হেগেমনি বা আধিপত্য।

এই আধিপত্য এতোটাই বিস্তৃত যে,প্রতিনিয়ত শোষিত হলেও আমরা তা উপলব্ধি করতে পারি না। একজন পোশাকশ্রমিক বা রিকশাচালক তাই কারখানার কিংবা রিকশার মালিক হওয়ার স্বপ্নও দেখে না। শ্রমিকরা মালিকের,ছাত্ররা শিক্ষকের অন্যায়ের প্রতিবাদ করে না। কিন্তু কেনো এমন হয়? মার্কস বলছেন,সকল কালেই শাসক শ্রেণীর ধারণাগুলোই হলো আধিপত্যকারী ধারণা :অর্থাৎ,যে-শ্রেণীটি সমাজের বস্তুগত শক্তি-সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করে সে-শ্রেণীই বস্তুত বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি-সম্পদও নিয়ন্ত্রণ করে। যে-শ্রেণীটির দখলে সমাজের উৎপাদনের উপায়সমূহ সেই শ্রেণী সমাজের মানসিক উৎপাদনও নিয়ন্ত্রণ করে,এবং ফলত মানসিক উৎপাদনের উপায়গুলো যাদের হাতছাড়া তাদের ধারণাগুলো সাধারণত আধিপত্যকারীদের অধীনস্ত হয়ে পড়ে। ১২ তাই শাসকশ্রেণি যুগে যুগে প্রজাদের শোষণ করলেও আমাদের কাছে তাদের প্রকৃত রূপটি আড়ালে রাখে। তাই সহজ-সরল ঘিনুয়ারা বড়ো রাজাবাবুদের দেওয়া ইনাম আর মিথ্যা ভালোবাসায় বুঝতেই পারে না,এই মানুষগুলোই আড়ালে তাদের শোষণ করে। অথচ গোবিন্দ সরদারের শোষণের রূপটি তার কাছে ঠিকই স্পষ্ট। কিন্তু কেনো? অন্যান্য দেশের মতো ভারতবর্ষেও বৃটিশ উপনিবেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো অস্ত্রবলের সাহায্যে। কিন্তু দেওয়ানি হাতে নিয়েই ইংরেজরা টের পায় যে এ দেশের কৃষিব্যবস্থা অতি প্রাচীন,জমির সঙ্গে রাজা ও প্রজার সম্পর্ক এখানে নানা সনাতন প্রথায় নিয়ন্ত্রিত,এবং জমির মালিকানা,ফসল বোনার কায়দা ইত্যাদি সবকিছুই এক সাবেক সংস্কারের অঙ্গ। অতীতকে উপেক্ষা করে এখানে রাজস্ব সংগ্রহ সম্ভব নয়। ১৩ তাই ওই বড়ো রাজাবাবুরা গোবিন্দ সরদারদেরকে জমিদারি দিয়ে দূরের রাজপ্রাসাদে বসে থাকেন। বছর শেষে জমিদাররা ঠিকই বড়ো রাজাদের হাতে খাজনা পৌঁছে দেন। তাই ঘিনুয়ারা গোবিন্দ সরদারদেরকে চিনলেও বড়ো রাজাদেরকে চিনতে ব্যর্থ হন। তাইতো ঘিনুয়া তাদেরকে দেবতা ভাবেন,বারবার প্রণাম করে;তিনি মনে করে দেবতা-রাজারা তো তাদের থেকে বহু দূরেই থাকবে।

কিন্তু মৃগয়াতে ডুঙরি-ঘিনুয়ারা শাসকদের আলগা ভালোবাসা বুঝতে না পারলেও ওকা ওড়ি কথাতে মৃণাল কিন্তু ভেঙ্কাইয়ার মুখ দিয়ে এই ভালোবাসার উৎসের সন্ধান দিয়েছেন। দেখিয়েছেন মৃগয়ার রাজারা প্রজাদেরকে যে ইনাম দেয় কিংবা ওকা ওড়ি কথাতে মহারাজ যে কাঙালিভোজের আয়োজন করে,তা আসলে কোনো ঈশ্বরের আশীর্বাদ থেকে নয়,ওই প্রজাদের শ্রম-ঘাম থেকে অর্জিত মুনাফা থেকেই আসে। অন্যদিকে প্রজারা যাদেরকে রক্ষাকর্তা-দেবতা মনে করে, সেই জমিদাররাই নিজেদের আনন্দ-উল্লাসের জন্য প্রজার কাছ থেকে তার রক্ত-ঘামের টাকায় কেনা জিনিসগুলো লুটে নিতেও কুণ্ঠিত হয় না। ওকা ওড়ি কথাতে দেখা যায়, নারসামার বাড়ি থেকে তার সবচেয়ে বড়ো ছাগলটি কেড়ে নিয়ে যাওয়া হয় জমিদারের অতিথি আপ্যায়নের জন্য। কিন্তু সেখানেও শোষিতদের একই রকম চৈতন্য দেখা যায়।

নারসামাকে গ্রামের অন্যরা এসে সান্ত্বনা দেয় এই বলে,এটাই আমাদের কপালের লিখন, আমাদেরকে এভাবেই টিকে থাকতে হবে। অর্থাৎ তারা জমিদারদের কাছে নিজেদেরকে একরকম সমর্পণ করে দেন। কিন্তু নিম্নবর্গের ঘুম যে একেবারেই ভাঙে না,বিষয়টি কিন্তু মোটেও এমন নয়। তাই খানিকটা দেরিতে হলেও ঘিনুয়া বড়ো রাজাবাবুর আসল চেহারাটা ধরতে পারে। সে বুঝতে পারে,গোবিন্দ সরদার আর বড়ো রাজা আসলে শোষকের দুটি ভিন্নরূপ মাত্র। মহারাজাদের কাছে ঘিনুয়া-ডুঙরিরা শুধুই অবজেক্ট। তাই তারা ওদের ছবি আঁকতো,শিকার করিয়ে নিতো,ইনাম দিতো। আসলে যুগে যুগে শাসকরা প্রজাদের ওপর নিজেদের আধিপত্যকে সুসংহত করার জন্য ভালো মানুষের মুখোশ পরে থেকেছে। প্রজাদের কাছে থেকেছে দেবতা হয়ে।

মানুষ হত্যার পুরস্কার পাঁচশ রুপি

জানোয়ার হত্যার পুরস্কার মৃত্যুদণ্ড

মৃগয়াতে আদিবাসী সাঁওতাল সম্প্রদায়ের সহজ-সরল জীবনাচার তুলে এনেছেন মৃণাল। এই মানুষগুলো সবসময়ই দ্বন্দ্ব-সংঘাত এড়িয়ে চলতে চেয়েছে। কিন্তু ঔপনিবেশিক শক্তির নির্যাতনের স্টিমরোলার কখনো থামেনি। তাই অনেকটা বাধ্য হয়েই তালডাঙার শালপু মুক্তির আশায় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে যোগ দেন,শেষ পর্যন্ত্ম হাতে অস্ত্র তুলে নেন। কিন্তু রাষ্ট্র শালপুদেরকে কখনো বাঁচতে দেয়নি,কারণ ওই শালপুরা বেঁচে থাকলে নিম্নবর্গকে ইচ্ছেমতো শোষণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ এনে জীবিত অথবা মৃত পাওয়ার জন্য পাঁচশ রুপির পুরস্কার ঘোষণা করা হয়।অন্যদিকে,অত্যাচারী গোবিন্দ সরদারকে হত্যার অপরাধে ঘিনুয়াকে দেওয়া হয় মৃত্যুদণ্ড। আদালত ঘিনুয়াদের কোনো কথাই শুনতে চায় না। এভাবে যুগ যুগ ধরে রাষ্ট্র তার ক্ষমতা প্রয়োগ করে নিম্নবর্গের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। কিন্তু কিভাবে? সামাজিক ক্ষমতা নিয়ে মিশেল ফুকোর যে বিশ্লেষণ,সেখানে ক্ষমতার তিনটি পৃথক মাত্রা পাওয়া যায়। এর একটি হলো সভারেনটি বা সার্বভৌমত্ব। এই সার্বভৌমত্ব হল সনাতন রাষ্ট্রক্ষমতা,যার এক বা একাধিক নির্দিষ্ট কেন্দ্র থাকে,যার প্রতিভূ রাজা অথবা আইনানুগভাবে প্রতিষ্ঠিত কোনও রাষ্ট্রপ্রধান। এই সার্বভৌমত্ব প্রয়োগ করা হয় কোনও নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের ওপর অথবা কোনও নির্দিষ্ট প্রজামণ্ডলীর ওপর। সার্বভৌম ক্ষমতার প্রধান প্রকাশ হলো আইন প্রণয়ন করা,সেই আইন প্রয়োগ করা,আইন লঙ্ঘিত হলে লঙ্ঘনকারীকে শাস্তি দেওয়া। এই অর্থে সার্বভৌমত্বের আর এক নাম দণ্ড।১৪ অর্থাৎ সবমিলে বলা যায়, কথিত আধুনিক রাষ্ট্র হলো এমন এক ব্যবস্থা,যার দ্বারা জনসাধারণকে জোর করে কোনো বিশেষ কায়দায় চলতে বাধ্য করা হয়।রাষ্ট্র যখন কাউকে তার অস্তিত্বের জন্য হুমকি মনে করে তখন সেখানে এই ক্ষমতা প্রয়োগ করে,যেমনটি করেছিলো ঘিনুয়া কিংবা শালপুর ওপর।

ঔপনিবেশিক শাসনের আগে ভারতবর্ষের চেহারাটা সম্পূর্ণ আলাদা ছিলো। তবে শোষণ যে একেবারেই ছিলো না-এমন নয়,কারণ শ্রেণি-বিভক্ত সমাজে শোষণ থাকবে,এটাই স্বাভাবিক। এখন প্রশ্ন হলো,সেসময় কি তাহলে নিম্নবর্গ এই শোষণ মুখ বুজে সহ্য করতো? নিম্নবর্গের রাজনীতির ঐতিহাসিক উৎপত্তি ও বিকাশের দিকে লক্ষ রেখে বলা যায়,শোষণের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিরোধাত্মক প্রবণতা নতুন নয়। সামন্ত প্রভুদের বিরুদ্ধে তখনো নিম্নবর্গ বারবার বিদ্রোহ করেছে। কিন্তু ইংরেজরা আসার সঙ্গে সঙ্গে নিম্নবর্গের রাজনীতির পুরো আঙ্গিকই পাল্টে যায়। নতুন অবস্থার সঙ্গে একরকম সঙ্গতি রেখে আন্দোলনের ধারাতেও আসতে থাকে পরিবর্তন। তাই একসময়ের সিধু-কানু যেভাবে আন্দোলন করেছে,সেই একই আন্দোলন সময়ের প্রয়োজনে শালপু-ঘিনুয়ারাও করেছে;কিন্তু একটু অন্যভাবে। কারণ এই ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী দেখতে গেলে ইংরেজ আসার আগে ক্ষমতা বা রাজশক্তি সম্পর্কে আমাদের ধারণাচিন্তা যা ছিল তার মধ্যে পলিটিকসের লেশমাত্র নেই, এগুলি নেহাৎ সনাতন সংস্কার মাত্র। তারা এসে তাদের শাসনকে রূপায়িত করল নানা ঔপনিবেশিক সংস্থায়,তা পরিচালনার জন্যে নিয়ম বেঁধে দিলো। নিয়ম ভাঙলে কী সাজা হবে তাও ঠিক করে দিল আইনকানুন দিয়ে এবং ওইসব কিছু যাতে উচ্চবর্গের বোধগম্য হয় তার জন্য একটা সংস্কৃতিকেও চালু করে দিল রাষ্ট্রক্ষমতা কায়েম ও বিস্তার করার উদ্দেশ্যে।১৫ কিন্তু এতো কায়দা-কানুন করেও কি ঔপনিবেশিক শক্তি নিম্নবর্গকে থামাতে পেরেছিলো? না,কারার লৌহ কপাটও তাদেরকে বেশিদিন আবদ্ধ রাখতে পারেনি।

আমরণ অনশন,জেল বিদ্রোহ,এমনকি জেল ভেঙে বের হয়ে এসেছেন তারা, কারাপ্রাচীর তাদের সামনে শ্রদ্ধায় নত হয়ে এসেছে। শেষ পর্যন্ত তথাকথিত আধুনিক রাষ্ট্র এই নিম্নবর্গকে থামানোর সবরকম চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে দমদম,বহরমপুর,শিলিগুড়ি,পুরুলিয়া,আসানসোল,কোচবিহার,বর্ধমান,আলিপুর প্রভৃতি জেলে বন্দিদের ওপর চালিয়েছে নির্মম হত্যাযজ্ঞ। তারপরও নিম্নবর্গের শান্তি পালরা বারবার বিদ্রোহ করেছেন,জেল পালিয়েছেন। ১৯৭১-এর ২১ ফেব্রুয়ারি এমনই এক জেল ভাঙার অভিযানে অংশ নেন মাত্র ১১ জন কমরেড।১৬ আর আজ একবিংশ শতাব্দীতে এসেও নিম্নবর্গের সেই সংগ্রাম চলছেই।

ওকা ওড়ি কথাতে প্রধান চরিত্র ভেঙ্কাইয়া সরাসরি কোনো সংঘাতে যেতে না চাইলেও তাকে অনেকটা সচেতন বলেই মনে হয়। পশু তাড়ানোর প্রেক্ষাপটে তিনি বলেন,যে কাউকে অন্যের সঙ্গে লড়াই করতে হলে পশুর মতো হতে হয়। এ কথার মধ্য দিয়ে বোঝা যায়,কিছু সীমাবদ্ধতার জন্য হয়তো তারা শাসকদের মুখোমুখি হতে পারছে না,কিন্তু তারাও বোঝেন যে মুক্তির জন্য সংগ্রামের কোনো বিকল্প নেই। এখন প্রশ্ন,সবকিছু বোঝার পরও ভেঙ্কাইয়ারা কেনো শাসকের সঙ্গে সংঘাতে যান না? এর উত্তরের জন্য আবারো ফুকোর কাছে যেতে হয়;তার মতে,এখানে সেই সামাজিক ক্ষমতাই সবচেয়ে প্রবলভাবে কার্যকর যা নিজেকে স্বশাসন-এর চেহারায় উপস্থিত করতে পারে। সম্ভবত রাষ্ট্রের চরিত্রেই তারা স্বশাসিত হয়। একই সঙ্গে পরিবর্তনের জন্য নতুন কোনো পথের দিশাও তারা খুঁজে পান না। তাই ভেঙ্কাইয়ারা হয়তো ভাবেন,প্রতিবাদ-প্রতিরোধ করে কী হবে;যেমন চলছে চলুক না। তাদের চোখের সামনে সিধু-কানু-শালপু কিংবা ঘিনুয়াদের সংগ্রাম এবং এর ফলে তাদের ওপর মহাপরাক্রমশালী রাষ্ট্রের নিপীড়নের চিত্র বোধহয় বারবার ভেসে ওঠে। তাই ভেঙ্কাইয়ারা সবকিছু জেনে-বুঝেও জমিদারের জয়গানে আকাশ-বাতাস মুখরিত করে তোলেন।

 

ঘিনুয়া-শালপুদের পথটা হয়তো বন্ধুর

কিন্তু ভেঙ্কাইয়াদের আদৌ কোনো

গন্তব্য আছে কি?

ভারতবর্ষে ঔপনিবেশিক গোষ্ঠীর যে শোষণ তার প্রতিক্রিয়া নিম্নবর্গ সবসময় একইভাবে দেখায়নি। তারা নিজ নিজ চৈতন্যের জায়গা থেকে শাসকদের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। মৃণালের জীবনের তৃতীয় পর্যায়ের চলচ্চিত্র মৃগয়াওকা ওড়ি কথাতে আমরা তাই নিম্নবর্গের ভিন্ন ভিন্ন চৈতন্য দেখতে পাই। এতে দর্শক হয়তো অনেক ক্ষেত্রে বিভ্রান্ত হতে পারেন,কিন্তু এটাই আসলে নিম্নবর্গের রাজনীতির আদর্শগত বৈশিষ্ট্য। নিম্নবর্গের সামাজিক সত্তা যে সব উপাদানে তৈরি তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা, চৈতন্যের স্তর ও রাজনৈতিক লক্ষ্য সবক্ষেত্রে সমান নয়।তাই তাদের আদর্শগুলির মধ্যে অমিল,এমন কি পরস্পরবিরোধিতাও ছিল,এবং তারই ফলে সেই রাজনীতির সামগ্রিক আদর্শের চেহারাটা অবস্থাভেদে এক-এক রকমের হয়ে দেখা দিত।১৭ এর ফলে মৃগয়ায় আমরা নিম্নবর্গের শালপু কিংবা ঘিনুয়ার যে চৈতন্য দেখি,ওকা ওড়ি কথার ভেঙ্কাইয়া বা কিস্তার চৈতন্য-এর সঙ্গে তাকে ঠিক মেলাতে পারি না।

ঔপনিবেশিক গোষ্ঠী সবসময় নিম্নবর্গের মন-মগজে মিথ্যা-চৈতন্যের বীজ বুনে দিতে চেয়েছে,এর ফলে তাদের পক্ষে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শোষণের পরিস্থিতি উপলব্ধি করা কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু এখানে মৃণাল নিম্নবর্গের দুই রকম চৈতন্য-এর উন্মেষ দেখিয়েছেন,সেই সঙ্গে উভয়পক্ষের পরিণতি দেখাতেও ভোলেননি। ধরুন,মৃগয়ার কথাই,এখানে সাঁওতাল কৃষকদের কষ্টের ফসল বুনো শুয়োরের আক্রমণে নষ্ট হয়ে গেলে সবাই মিলে ক্ষতিগ্রস্তদের দাদনের টাকা পরিশোধের সিদ্ধান্ত নেয়,যা নিম্নবর্গের চিরায়ত একতারই পরিচায়ক। আমরা সাঁওতাল গোত্রপ্রধানের (মুখিয়া) কাছে জানতে পারি,এই শান্তিপ্রিয় মানুষগুলোই চূড়ান্ত পর্যায়ে বৃটিশদের বিরুদ্ধে তীর-ধনুক নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলো। বড়ো রাজাবাবুর হাতে থাকা ইংরেজের মাথার খুলি (সম্ভাব্য)কি তাহলে সিধু-কানুদের প্রতিরোধাত্মক চৈতন্যেরই স্বরূপ আমাদের সামনে উন্মোচন করে? নিম্নবর্গের মানুষগুলো হয়তো সবসময় ঔপনিবেশিক শক্তির সঙ্গে পেরে ওঠে না। তখন হয়তো তাদের ওপর শোষণের মাত্রা আরো বেড়ে যায়। মুখিয়ারা তখন নতুন সিধু-কানুদের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। মৃগয়ার শালপু কিংবা ঘিনুয়ারা তখন নতুন ত্রাতা হয়ে আবির্ভূত হন,আবারো প্রতিরোধ গড়ে তোলেন ঔপনিবেশিক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। কিন্তু প্রতি পদে পদে তারাও প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়,শেষ পর্যন্ত জাতীয়তাবাদী শালপু নিজ গোত্রের বিশ্বাসঘাতক ডোরার হাতে প্রাণ হারান;অন্যদিকে বৃটিশদের ক্যাঙ্গারু কোর্ট-এ ঘিনুয়াকে দেওয়া হয় মৃত্যুদণ্ড।

মৃণাল পরের চলচ্চিত্র ওকা ওড়ি কথাতে নিম্নবর্গের চৈতন্যকে একটু অন্যভাবে তুলে আনলেন। সেখানে আমরা দেখি,জমিদারের লোকেরা ভেঙ্কাইয়ার ছেলে কিস্তার মজুরির অর্ধেক কেটে নিলেও তারা প্রতিবাদ না করে বরং তাদের কাছেই দয়া ভিক্ষা করেন। কিন্তু ওই কেটে নেওয়া মজুরি কার পকেটে যাচ্ছে,সেটা মাতাল ভেঙ্কাইয়া খুব ভালোই বোঝেন। আবার জমিদারের মুনাফা হবে এই যুক্তিতে বাপ-বেটা কাজ বাদ দিয়ে শুয়ে-বসে সময় কাটান,উল্টো কখন জমিদারের ভান্ডার থেকে খাওয়া যাবে তার অপেক্ষায় থাকেন। জমিদারকে মনে মনে ঘৃণা করলেও গলা ফাটিয়ে তারই জয়গান গান তারা। ভেঙ্কাইয়া মনে করেন, জমিদার যেভাবে তাদেরকে দিন দিন নিঃস্ব করে দিচ্ছে,এভাবে চলতে থাকলে হয়তো জমিদারকেও একদিন নিঃস্ব করা সম্ভব হবে। ভেঙ্কাইয়াদের এমন আচরণ দেখে মনে হয়, শাসকশ্রেণির শোষণ সম্পর্কে তারা যথেষ্ট সচেতন;কিন্তু এ ধরনের অলীক চৈতন্যর কারণে তাদের ভিতর প্রকৃত চেতনার উন্মেষ হয়নি। অলস ভেঙ্কাইয়া ও কিস্তা তাই মাঝে মাঝেই অন্যের জিনিস চুরি করেন,কিন্তু যাদেরটা তারা চুরি করছেন,তাদের অনেকেই যে দিনমজুর-কৃষক-সর্বহারা এটাও তারা বুঝতে চান না।

শুধু গুটিকয়েক লোকের ধর্মঘট যে জমিদারের পতন ঘটানোর জন্য যথেষ্ট নয়,এটাও ভেঙ্কাইয়া বোঝেন,কিন্তু কী করলে এ সমস্যা থেকে উত্তরণ হবে তা আর বলেন না। তাইতো অন্য শ্রমিকরা ন্যায্য মজুরির দাবিতে ধর্মঘট করার চিন্তা করলেও শেষ পর্যন্ত কাজে ফিরে যেতে বাধ্য হন;তারা ঠিকই বুঝতে পারেন,না খেয়ে মরার চেয়ে কম মজুরিতে কাজ করে অন্তত টিকে থাকা অনেক ভালো। সার্বিক অবস্থা যখন এই,তখন আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে,ভেঙ্কাইয়া আসলে কী করতে চাইছেন? কোন্‌ যুক্তিতে তারা মানে বাপ-ছেলে অন্যের জিনিস চুরি করছেন? সবশেষে খাদ্য,বস্ত্র,বাসস্থান চেয়ে বাঁচার জন্য তার ওই আকুতি আসলে কার কাছে? তার গন্তব্য আসলে কোন্‌ দিকে?

শালপু-ঘিনুয়া কিংবা ভেঙ্কাইয়া-কিস্তা সবারই নিজ নিজ অবস্থানের পক্ষে যুক্তি হয়তো আছে। কিন্তু একটু ভালোভাবে খেয়াল করলে দেখা যায়,ভেঙ্কাইয়ার যে অলীক চৈতন্য শুধু তা দিয়ে শাসকশ্রেণির পতন কোনোভাবেই সম্ভব না। তাছাড়া ভেঙ্কাইয়ার চোখে শোষককে উৎখাত করার কোনো প্রত্যয়ই দর্শক হিসেবে আমার চোখে পড়েনি,যেমন দৃঢ় প্রত্যয় বা রাজনৈতিক চেতনা দেখেছিলাম ঘিনুয়া কিংবা শালপুদের চোখে। আবার ভেঙ্কাইয়াদের অলীক চৈতন্য থাকার পরও তাদের মধ্যে শোষণের উপলব্ধি যতোটা প্রবল,ঘিনুয়া কিংবা শালপুদের ভিতর উপলব্ধিটা সেরকম নয়।কিন্তু শাসকশ্রেণির পতন ত্বরান্বিত করতে হলে নিম্নবর্গের ভিতর ভেঙ্কাইয়াদের মতো শোষণের উপলব্ধি থাকা যেমন জরুরি পাশাপাশি ঘিনুয়া-শালপুদের মতো রাজনৈতিক চৈতন্যও অবশ্যই থাকা চাই। আর এই দুইয়ের সমন্বিত উপস্থিতি ছাড়া শাসকশ্রেণিকে উৎখাত করা সম্ভব নয়।শালপু,ঘিনুয়া কিংবা সিধু-কানুরা ভেঙ্কাইয়ার মতো আত্মসমর্পণ করেননি,আবার বসেও থাকেনি। শেষ পর্যন্ত তারা অন্তত একটা পথের দিশা পেয়েছিলেন। কিন্তু ভেঙ্কাইয়ারা কি আদৌ নিম্নবর্গকে মুক্তির সেই স্বপ্ন দেখাতে পেরেছিলেন?

উদীয়মান সূর্যে থাকে ঘিনুয়ারা

ভেঙ্কাইয়ারা কালের অতল গহ্বরে

সিধু-কানুরা যে আন্দোলনের সূচনা করেছিলো,শালপু-ঘিনুয়ারা সেই আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়েছিলেন অনেক দূর। হয়তো তারা কাক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেননি। কিন্তু অন্তত নতুন নতুন সিধু-কানু তৈরির পথ বাতলে গেছেন। আর এই শালপু-ঘিনুয়াদের সঙ্গে নিম্নবর্গ সবসময়ই থেকেছেন,প্রয়োজনে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রতিরোধ সংগ্রাম করেছেন। কিন্তু ভেঙ্কাইয়াদের পথের সারথি কেউ হতে চায়নি। মৃগয়ায় আমরা দেখি শালপুকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য বিশ্বাসঘাতক ডোরা যখনপুলিশের সামনে সবাইকে সাক্ষ্য দিতে বলে, তখন কেউ তার পক্ষে কথা বলে না, উল্টো তাকেই মিথ্যাবাদী বলে সাক্ষ্য দেয়। কারণ, ওই মানুষগুলো বিশ্বাস করে, শালপুরাই হয়তো একদিন তাদেরকে শোষণ থেকে মুক্ত করবেন। ওই শালপু-ঘিনুয়াই নিম্নবর্গের কাছে হয়ে ওঠে আদর্শের প্রতীক। কিন্তু ভেঙ্কাইয়া-কিস্তা কারো কাছে আদর্শ তো নয়ই বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।

অন্যদিকে শালপু-ঘিনুয়াদের জন্য নিম্নবর্গের যে সমানুভূতি দেখা যায়, ভেঙ্কাইয়াদের বেলায় তা নেই। কারণ, ভেঙ্কাইয়ারা শেষ পর্যন্ত নিম্নবর্গ থেকেও নিজেদেরকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন, তারা নিজেদের গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়কেও আর ধারণ করেন না। ভেঙ্কাইয়া নিজেকে খুব সমঝদার আর অন্য সবাইকে বোকা মনে করতে থাকেন। গ্রামের লোকজন তাদেরকে চুরি বাদ দিয়ে কাজ করার জন্য বারবার অনুরোধ করলেও তারা কারোই ভালো পরামর্শ নিতে চান না, কারো সঙ্গে মিশতেও চান না। ঝড়ে তাদের ঘরের চাল ভেঙে পড়লে পড়শীদের একজন খোঁজ-খবর নিতে আসে; কিন্তু ভেঙ্কাইয়া তাকে দুর দুর করে তাড়িয়ে দেন। এক্ষেত্রে মৃগয়ায় আমরা নিম্নবর্গের মধ্যে যে পারস্পরিক সম্পর্ক তথা একতা দেখেছিলাম ওকা ওড়ি কথাতে তার ঠিক উল্টো চিত্র দেখতে পাই।

আবার মাতাল অবস্থায় জমিদারের বিরুদ্ধে কথা বলার জন্য ভেঙ্কাইয়ার ওপর জমিদারের পেটোয়া বাহিনীর বর্বরতার বিরুদ্ধে কেউ প্রতিরোধ তো নয়ই, এমনকি ন্যূনতম প্রতিবাদও করেননি। কিন্তু মৃগয়ার কৃষক-মজুরের ওপর কোনো প্রকার অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করেননি শালপু-ঘিনুয়ারা। জানোয়ারের আক্রমণে ডুঙরির বাবা মঙরার ফসল নষ্ট হওয়ায় তিনি যখন বাঁচার ও দাদনের টাকা পরিশোধের চিন্তায় দিশেহারা ঠিক তখনই মুখিয়া নিশ্চিত করেন, যতোক্ষণ গ্রামবাসী বেঁচে থাকবে ততোক্ষণ মঙরাও তার পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকবেন। কিন্তু ওকা ওড়ি কথাতে নীলিমা যখন প্রসব বেদনায় ছটফট করছিলেন, ভেঙ্কাইয়া-কিস্তার অনুপস্থিতিতে গ্রামবাসী প্রথমে এগিয়ে এলেও তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেননি। শেষপর্যন্ত অর্থাভাবে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা হয় না, বিনা চিকিৎসায় মারা যান তিনি। পাঠক ভাবুন, ওই সমাজটি যদি মৃগয়ার সমাজের মতো হতো, তাহলে তারা কি নীলিমাদেরকে এভাবে চোখের সামনে মরতে দিতেন? ভেঙ্কাইয়ার স্ত্রী ও নবজাতকগুলো কি অবহেলায় এক এক করে মারা যেতেন?

এখন প্রশ্ন ওঠে, যে ভেঙ্কাইয়ারা অলীক চৈতন্যর জন্য ক্রমেই নিম্নবর্গ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন, যাদের ভ্রান্ত চিন্তাধারার জন্য নীলিমাদের প্রাণ অকালে চলে যান, সেই ভেঙ্কাইয়াদেরকে কি মানুষ মনে রাখেন? না, বরং নিম্নবর্গের মানুষগুলো নীলিমার মৃত্যুর জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অলস ভেঙ্কাইয়া-কিস্তাকেই দায়ী করতে থাকেন। তারা সারা জীবন সবার ঘৃণা নিয়েই বেঁচে থাকেন। তাদের ভ্রান্ত চৈতন্য সমাজের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনে না। অন্যদিকে ঘিনুয়ারা শাসকের বিরুদ্ধে লড়াই করে কখনো মরেন না, তারা বেঁচে থাকেন সাধারণের মাঝে। এক একজন সিধু-কানু-শালপু কিংবা ঘিনুয়ার মৃত্যু শত-সহস্র সিধু-কানুর জন্ম দেয়। বৃটিশদের ক্যাঙ্গারু কোর্টে ঘিনুয়াকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, ফাঁসি দেওয়ার আগে তাকে স্বজনদের সঙ্গে শেষ দেখাটাও করতে দেয় না নিষ্ঠুর রাষ্ট্র। মুখিয়া জানতে পারে, সোমবার সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ঘিনুয়ার রায় কার্যকর হবে। তারা সেই উদীয়মান সূর্যের মাঝেই তাদের ঘিনুয়াকে খুঁজে নিতে চায়।

শেষ কথা

শাসকশ্রেণি তাদের শাসন-শোষণ দীর্ঘায়িত করতে রাজনৈতিক ক্ষমতার পাশাপাশি সাধারণের ওপর বিস্তার করেছে সাংস্কৃতিক আধিপত্য। আর সাংস্কৃতিক আধিপত্যই হলো রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের পূর্বশর্ত। মৃণাল সেনরা নিম্নবর্গের সংস্কৃতিকে সেলুলয়েডে ধারণ করে বুর্জোয়াদের এই সাংস্কৃতিক আধিপত্যকেই একরকম চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন। ঋত্বিক তো শোষিত নিম্নবর্গের স্বার্থের বাইরে কোনো শিল্প করাকে পাপ মনে করতেন-এ কথা সরাসরি বলেই দিয়েছিলেন। সব শিল্পের শেষ কথা মানুষ-এই চেতনাকে ধারণ করেই ঋত্বিক-মৃণালরা তাদের সাংস্কৃতিক আন্দোলন চালিয়ে গেছেন। আসলে একজন বিপ্লবী শিল্পীর কাছে তার শিল্প আ টুল অব্‌ সোশ্যাল এঞ্জিনিয়ারিং, আ ল্যাবোরেটরি অব্‌ সোশ্যাল চেঞ্জ১৮ কারণ, এই শিল্পীদের কাছ থেকেই যুগে যুগে নিম্নবর্গের মানুষগুলো খুঁজে পেয়েছে মুক্তির দেশে পা বাড়াবার দিক-নির্দেশ। তাই আজ গণনাট্য সংঘের একজন মৃণাল কিংবা একজন ঋত্বিকের মতো নির্মাতারাই পারেন তাদের শিল্প-প্রকরণের ধারালো অস্ত্রটি দিয়ে বুর্জোয়া সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে, তারাই পারেন এদেশের শোষিত নিম্নবর্গের চিরায়ত সাংস্কৃতিক চেতনাকে সুপ্তাবস্থা থেকে পুনরুদ্ধার করতে।

ইতিহাস সবসময়ই ক্ষমতাবানদের পক্ষে কথা বলে এসেছে এবং এখনো অনবরত বলছে; কারণ ওই ইতিহাস আসলে শাসকশ্রেণিই লেখে বা লেখায়। তাই প্রচলিত ইতিহাসে শাসকশ্রেণিরই বীরত্বগাঁথা জায়গা পায়, নিম্নবর্গকে সেখানে একেবারেই আমল দেওয়া হয় না। তাইতো সেখানে সিধু-কানুদের নাম আমরা খুঁজে পাই না, সেখানে শাসকশ্রেণির অত্যাচার-নির্যাতনের কথা সুকৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়, শালপু-ঘিনুয়াদেরকে ওই ইতিহাস পরিচয় করিয়ে দেয় সন্ত্রাসী হিসেবে। নিম্নবর্গের মুক্তি সংগ্রামকে শাসকশ্রেণির ইতিহাসে দেখা হয় নিছকই বিদ্রোহ বা বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন হিসেবে, নিম্নবর্গের জাগরণকে সেখানে স্বীকারই করা হয় না। মৃণাল তার জীবনের তৃতীয় পর্যায়ের চলচ্চিত্র মৃগয়াওকা ওড়ি কথাতে শাসকশ্রেণি যেভাবে নিম্নবর্গকে দেখতে ও দেখাতে চায়, তা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেছেন। তাই মৃগয়ায় আমরা প্রায় হারিয়ে যাওয়া সিধু-কানুদের কথা পুনরায় শুনতে পাই; রাষ্ট্র যে শালপু-ঘিনুয়াদেরকে বারবার সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিতে চেয়েছে, সেই শালপু-ঘিনুয়াদেরকেই মৃণাল সেলুলয়েডে তুলে আনলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন চেহারায়; শাসকের শোষণে ভেঙ্কাইয়া-কিস্তাদের জীবন্মৃত অবস্থা, তাদের হাহাকার, আর্তনাদ এর সবইতো আসলে প্রতিষ্ঠানকেই আঘাত করে। ভারতিয় উপমহাদেশে তৃতীয় চলচ্চিত্র আন্দোলনকে বেগবান করতে ও এখানকার ঘুমিয়ে পড়া নিম্নবর্গকে জাগাতে তিনি তুলে আনলেন চিরায়ত সংস্কৃতি-প্রথা-মিথ ও ইতিহাস-নিম্নবর্গের ইতিহাস। নিম্নবর্গকে স্মরণ করিয়ে দিলেন সিধু-কানুদের কথা; মাতৃভূমির জন্য, মুক্তির জন্য তাদের জীবন বিলিয়ে দেওয়ার কথা। তাইতো বুর্জোয়া শাসকদের রুখতে নিম্নবর্গের কাছে মৃগয়ার শেষে তার আহ্বান-

Stand up

Stand up

Remember the martyrs

who loved

Life and freedom

 

লেখক : কিবরিয়া জুয়েল, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী।

kibriamcj@gmail.com

 

তথ্যসূত্র

১. সেন, মৃণাল (১৯৯৮:১১৪);ছিন্ন চিন্তা ভিন্ন চিত্র;মৃণাল সেন; সম্পাদনা-প্রলয় শূর; নন্দন, কলকাতা।

২. দাশশর্মা, বীরেন (২০১১:৪৮); ভুবন সোম : মৃণাল সেন;১৫ চলচ্চিত্র সমালোচনা; সম্পাদনা-অজয় সরকার; বাণীশিল্প, কলকাতা।

৩. এই অনুচ্ছেদের শুরু এই আলোচনাটুকুর জন্য আমি সাহায্য নিয়েছি : আউয়াল, সাজেদুল (২০১১); চলচ্চিত্রকলার রূপ-রূপান্তর; দিব্য প্রকাশ, ঢাকা-এই বইটির।

৪. প্রাগুক্ত; আউয়াল, সাজেদুল (২০১১:৯০)।

৫. প্রাগুক্ত; আউয়াল, সাজেদুল (২০১১:৯১)।

৬. মৃণাল সেন, উদ্ধৃত; রায়, সরঞ্জন (১৯৯২:১৩৩); চলচ্চিত্র ও শিল্পীর সংকট; প্যাপিরাস, ২ গণেন্দ্র মিত্র লেন, কলকাতা।

৭. প্রাগুক্ত; আউয়াল, সাজেদুল (২০১১:৯২)।

৮. এ বিষয়ে আরো দেখতে পারেন : ভৌমিক, সোমেশ্বর (২০০৯:৪৬১);মৃণাল সেনের অন্তহীন অন্বেষণ; শতবর্ষে চলচ্চিত্র ২; সম্পাদনা-নির্মাল্য আচার্য ও দিব্যেন্দু পালিত; আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা।

৯. প্রাগুক্ত; ভৌমিক, সোমেশ্বর (২০০৯:৪৬২)।

১০. মামুন,আ. আল; মার্কসবাদী মৌল ধারণা ও মিডিয়া বিচারে তার প্রয়োগ; অপ্রকাশিত প্রবন্ধ। ২৮ জুলাই ২০০৬।

১১. প্রাগুক্ত; মামুন,আ. আল।

১২. প্রাগুক্ত; মামুন,আ. আল।

১৩. গুহ, রণজিৎ (২০০৪:২৪);নিম্নবর্গের ইতিহাস;নিম্নবর্গের ইতিহাস; সম্পাদনা-গৌতম ভদ্র ও পার্থ চট্টপাধ্যায়; আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।

১৪. চট্টপাধ্যায়, পার্থ (২০০৭:১৭৩);ক্ষমতা প্রসঙ্গে দুই প্রেক্ষিত : গ্রামশি ও মিশেল ফুকো; মিশেল ফুকো পাঠ ও বিবেচনা; সম্পাদনা-পারভেজ হোসেন; সংবেদ, ঢাকা।

১৫. প্রাগুক্ত; গুহ, রণজিৎ (২০০৪:২৮)।

১৬. পাল, শান্ত;জেলের ভিতরে দুই লাইনের লড়াই এবং জেল ভাঙা;এবং জলার্ক, সম্পাদনা-স্বপন দাসাধিকারী, বর্ষ-১৪, সংখ্যা : ৩-৪, অক্টোবর ২০১১-মার্চ ২০১২, পৃষ্ঠা-৬৬, কলকাতা।

১৭. প্রাগুক্ত; গুহ, রণজিৎ (২০০৪:৩৬)।

১৮. প্রাগুক্ত; রায়, সরঞ্জন (১৯৯২:১৪২)।

বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৩ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের ৫ম সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।       

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন