মাজিদ মিঠু ও মাহমুদ বিপ্লব
প্রকাশিত ০৫ ডিসেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
চারুলতা-চৈতি বোস, একুশ শতকে ‘সত্যজিতীয় নারী’র পুনর্নির্মাণ
মাজিদ মিঠু ও মাহমুদ বিপ্লব
1670262319.jpg)
বন্দী হয়ে আছো তুমি সুমধুর স্নেহে
অয়ি গৃহলক্ষ্ণী, এই করুণ ক্রন্দন
এই দুঃখদৈন্যে-ভরা মানবের গেহে।১
কলকাতাকেন্দ্রিক বাংলায় নবজাগরণের সুর বাজছে। সমাজ,পরিবার,রাষ্ট্রের গঠন ও প্রকৃতি ভিন্নমাত্রা ধারণ করতে শুরু করেছে;গড়ে উঠেছে উচ্চবিত্ত-শিক্ষিত-রাজনীতি সচেতন পরিবার-এমন এক পরিবারের গৃহবধূ ও তার জগৎ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখলেন ‘নষ্টনীড়’।ঠাকুরের ‘নষ্টনীড়’ একস্তরের আপোসমূলক বৈবাহিক জীবনের গল্প বলে। যার প্রধান চরিত্র চারুলতা;ধনী,শিক্ষিত গৃহবধূ। রবীন্দ্রনাথ যখন লিখছেন,তখন সময় ১৯ শতকের শেষভাগ। ‘নষ্টনীড়’ প্রকাশ হয় ১৯০১ সালে। এটি সবে ২১-এ পা ফেলা চারুলতার গল্প,যে বালিকা বধূরূপে ১০ কি ১৫ বছরের বড়ো স্বামীর ঘর করছে। স্বামীর সংসারে চারুলতা মানসিক ও শারীরিক দিক দিয়ে পরিপক্ক হয়ে উঠলেও কাজ-পাগল সম্পাদক স্বামীর নজরে তা পড়ে না। একা চারুলতার সঙ্গী হয়ে আসে ঠাকুরপো অমল; যাকে ঘিরে গড়ে ওঠে চারুর অন্য এক জগৎ। যেখানে স্বামীর প্রতি দায়িত্ববোধ পূর্ণমাত্রায় থাকলেও মনজুড়ে কেবলই অমল।
এ গল্পের আলোকে ১৯৬৪-তে সত্যজিৎ নির্মাণ করলেন চারুলতা। তাতে চারুর যে উপস্থাপন তা রবীন্দ্রনাথের চারুরই প্রতিরূপ। পরিপাটি করে সাজানো-গোছানো অন্দরসজ্জায় চারুলতার বসবাস হলেও উচ্চবংশীয় অভিজাত পরিবারের লোকাচারের ফলে তিনি বাইরের পৃথিবীর আলো-বাতাস বঞ্চিত। চারুর এ অভাব মেটাবার প্রচেষ্টা আমরা দেখি অপেরা গ্লাসে২ বাইরের পৃথিবী দেখার মাধ্যমে। একসময় নিঃসঙ্গ চারুর জীবনে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে বাইরের দুনিয়া থেকে হাজির হওয়া অমল। কিন্তু সেখানেও তার পরাজয়। ১৯০১ থেকে ১৯৬৪-প্রায় ৬৪ বছরের ব্যবধানে সমাজ,পরিবার ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় অনেক পরিবর্তন আসলেও সত্যজিতের চারুলতায় রবীন্দ্রনাথের চারুর উপস্থিতি ও রঙ প্রায় এক। যদিও অশোক রুদ্রসহ কিছু চলচ্চিত্র সমালোচক অভিযোগ তুলেছেন,সত্যজিতের চারুলতায় রবীন্দ্রনাথের 'নষ্টনীড়' সঠিকভাবে রূপায়ণ করা হয়নি। জবাব সত্যজিতের ভাষায়,‘নষ্টনীড়ের প্রধান সম্পদ হল এর চারটি প্রধান চরিত্রের মনোভাব ও পারস্পরিক সম্পর্কের সূক্ষ্ণ ও দরদী বিশ্লেষণ।এই সম্পর্ক ফুটিয়ে তুলতে যেসব ঘটনার সাহায্য নেওয়া হয়েছে,তা থেকেই একটা কাহিনীর সূত্র গড়ে উঠেছে। ...আমার মতে এ-থীম অটুট রয়েছে।’৩
এরপর ২০১২ সালে অগ্নিদেব চট্টোপাধ্যায় নির্মাণ করলেন চারুলতা (২০১১)।এ গল্প চৈতি বোসরূপী চারুর।তাকে কেন্দ্র করেই এ ছবিটি আবর্তিত। দাম্পত্য জীবনে চরমভাবে অসুখী,অতৃপ্ত ও নিঃসঙ্গ এক গৃহবধূ চৈতি। ঘরের সচ্ছলতা,স্বাচ্ছন্দ্য, বাহ্যিক সুখ,আর্থিক নিরাপত্তা সবই আছে। কিন্তু মানুষ হিসেবে তার চাওয়াগুলো মিলছে না কোনোভাবেই। তাই তিনি প্রচলিত সামাজিক মূল্যবোধের দেয়াল ভেঙে বেরিয়ে আসতে চান। কিন্তু ১৯০১ থেকে ২০১২-তে এসে সমাজে কী এমন পরিবর্তন এসেছে? সমাজ কি এতোটা বদলেছে,যাতে মানুষ হিসেবে চারু কিংবা চৈতিদের অধিকার,স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে,নাকি নতুন বোতলে পুরনো মদ পরিবেশনই সার? পাঠক,আসুন চারু হয়ে চৈতিদর্শন করে আসা যাক।
১.
সত্যজিৎ ও অগ্নিদেবের প্রায় ৪৮ বছরের ব্যবধানে নারীর অবস্থা নিয়ে কথা বলতে গেলে চলচ্চিত্র দুটির কিছু চরিত্রের সঙ্গে পরিচিত হওয়া জরুরি। এ পর্বে আমরা দেখবো,সত্যজিতের চারুলতায় ভূপতি,চারুলতা,অমল,চারুর ভাই উমাপদ ও বৌদি মন্দাকিনিকে। একই সঙ্গে অগ্নিদেবের চারুলতার বিক্রম,চৈতি,সঞ্জয়,চৈতির ভাই উৎপল,বৌদি কেয়া,কাজের মেয়ে পুষ্প ও মীরা এবং চৈতির বন্ধু অর্ণবিকে।
২০ শতকের মাঝের দিকে নবজাগরণকেন্দ্রিক কলকাতায় যে কয়টি শিক্ষিত ও উচ্চবিত্ত সমাজ,রাষ্ট্র,রাজনীতি সচেতন পরিবার গড়ে উঠেছিলো তাদের প্রতিনিধি ভূপতি। আপাত দৃষ্টিতে চিন্তাশীল,নরম প্রকৃতির,দায়িত্বনিষ্ঠ ভূপতি ছিলেন ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ;যা তাকে স্ত্রী চারুলতা সম্পর্কে করে তোলে উদাসীন। সত্যজিতের মতে,‘বিশ্বস্ততা ও প্রিয়জনের প্রতি দায়িত্ববোধই প্রেম।’ আর আত্মকেন্দ্রিক ভূপতির দায়িত্ববোধের অভাবেই নষ্ট হয় তার নীড়। ‘নষ্টনীড়’-এর ভূপতির একশ বছর পরের প্রজন্ম বিক্রম। মধ্যবিত্ত সেন্টিমেন্ট থেকে পরিবারের প্রতি স্বামী-স্ত্রীর যে দায়িত্বের কথা বিক্রম বলেন,তা নিজেই মানতে পারেন না। মানুষের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করলেও চারদিকে একটি অদৃশ্য দেয়াল তুলে রাখেন। তার কাছে স্বাধীনতা মানে,‘self control’ আর পুরুষতান্ত্রিকতার বেড়াজালে আজ সেই ‘self control’ শুধু নারীর জন্য। তাই স্ত্রীর প্রতি চরম মনোদৈহিক অবহেলা বিক্রমের উপলব্ধির বাইরেই রয়ে যায়। শিক্ষিত,সৎ,দায়িত্ববান,নীতিবান,আধুনিক বিক্রমের খোলসের আড়ালে বাস করে মধ্যবিত্ত সেন্টিমেন্টের আত্মকেন্দ্রিক,অসচেতন,দায়িত্বজ্ঞানহীন এক মানুষ। ভূপতির মতো তার কাছেও মানবীয় সম্পর্কে বিশ্বাস,নীতি-নৈতিকতা সব হলেও এগুলোর আপেক্ষিকতা তিনি স্বীকার করেন না।
চারুলতার মধ্য দিয়ে উচ্চবিত্ত পরিবারের গৃহবধূর নিঃসঙ্গতা,নারীর অসহায়ত্ব ও পরাধীনতার শক্তিশালী এক অদৃশ্য জাল এঁকেছেন রবীন্দ্রনাথ। আর সত্যজিৎ সেই জাল দৃষ্টিগোচর করেছেন নিপুণ হাতে। কাজ-পাগল স্বামীর উদাসীনতা, দায়িত্বজ্ঞানহীনতা তাকে করে তোলে একা,বিষণ্ণ;কিছুটা বদরাগী। শিক্ষা, লেখনীশক্তি ও অন্যান্য গুণে গুণান্বিতা হয়েও ২০ শতকের শুরুতে পুরুষতান্ত্রিক পরিবার কাঠামোয় স্বামীর এ ‘অবহেলা’ মেনে নিয়েছিলেন চারু;একইভাবে আধুনিক নারী চৈতি বোসও। সচ্ছলতা, স্বাচ্ছন্দ্য, আর্থিক নিরাপত্তা,বন্ধু-বান্ধব থাকলেও স্বামীর মনোদৈহিক উদাসীনতা তাকে করেছে অসুখী,অতৃপ্ত ও একা। প্রচলিত সামাজিক মূল্যবোধ ভেঙে মানসিক ও শারীরিকভাবে নিজস্ব চিন্তা ও চাহিদা অনুযায়ী তিনি চলতে চান। কিন্তু তার প্রতিপদে বাধা হয়ে দাঁড়ায় সেই মূল্যবোধ ও নীতি-নৈতিকতা।
জটিল ও কুটিল মানুষ উমাপদ। শিক্ষিত হলেও তা সঠিক পথে কাজে না লাগিয়ে বাঁকা পথে খরচ করতেই বেশি ভালোবাসেন;বিশ্বাসঘাতকতা করতেও তার বাধে না। কুটিল এ মানুষটি সমাজের এমন একশ্রেণির প্রতিনিধি,যারা নিজের স্বার্থে সবকিছুই করতে পারেন। তাই ভূপতির স্বপ্ন,বিশ্বাস ভেঙে টাকা নিয়ে পালিয়ে যেতে তার একটুও বাধে না। তেমনি আরেকজন,এ যুগের উৎপল;যার কাছে জীবনের মানে দাঁড়ায় টাকা। দৃশ্যত প্রজ্ঞাবান মনে হলেও,তার জ্ঞান কোনো ‘সৎ’ কাজেই লাগে না। কারণ সততা,বিশ্বাস,নীতি-নৈতিকতা,মূল্যবোধের সংজ্ঞা তার কাছে আলাদা;অর্থের অভাব সবার ওপরে। তাইতো বিক্রমের সঙ্গে উৎপলের প্রতারণা আরেকবার স্মরণ করিয়ে দেয় সেই উমাপদকেই। উমাপদের স্ত্রী মন্দাকীনি। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়,‘মূঢ়’ মন্দার আর যা কিছু গুণ থাক,কল্পনা ছিলো না। নবজাগরণকালীন শিক্ষিত উচ্চবিত্ত গৃহবধূর বিপরীতে সেই সমাজের আরেকটি দিক উন্মোচনে রবীন্দ্রনাথ তাকে গড়েছেন দক্ষ হাতে। নিম্নবিত্ত পরিবারের সরল,সাধারণ অশিক্ষিত এ প্রতিনিধিটি জানতেন না সমাজে তার অবস্থান কোথায়। তাইতো অমলের প্রশ্ন,‘বৌদি তুমি নবীনা নাকি প্রাচীনা?’ এতে তার সরল জবাব,‘জানি না।’ এ যুগে আমরা দেখি কেয়াকে। দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়তে লড়তে জীবন দর্শন ও মূল্যবোধ হয়ে উঠেছে অর্থকেন্দ্রিক,দুর্বল ও হীনমন্য। তবে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এখনো কেয়া’রা কঠোর মধ্যবিত্ত সেন্টিমেন্টের অধিকারী। চৈতির একজন মেয়ে হয়ে দুই পুরুষকে একসঙ্গে ভালোবাসার কথা শুনে তাই চমকে উঠে তিনি বলেন, ‘এ বাবা, এসব কী বলছিস তুই!’
রবীন্দ্রনাথ অমলকে উপস্থাপন করেছেন চারুলতার গোপন অবলম্বন হিসেবে। দাদার সংসার বাঁচাতে চারুকে ছেড়ে যাওয়ায় পুরুষতান্ত্রিকতার ‘মহৎ’ তকমাটি ঝুলছে অমলের গলায়। যার ছায়াতে ঢাকা পড়ে স্বার্থপর ও পুরুষতান্ত্রিকতার ধ্বজাধারী এক মুখ। যতোই বলি, চারুলতার জীবনের সব কুসুম-কোমল অমলের জন্যই প্রস্ফুটিত হয়েছে,কিন্তু অমল তার ধার ধারে না। অন্যদিকে এ কালের অতি আধুনিক মানুষ সঞ্জয়। জীবন সম্পর্কে তার দর্শন,‘কারো জন্যই কোনো কিছু থেমে থাকে না, জীবন বয়ে চলে আপন গতিতে।’ স্পষ্টবাদী এ তরুণ গানের শিক্ষকটিও একসময় হয়ে ওঠেন দায়িত্বজ্ঞানহীন,স্বার্থপর। দাদার বিশ্বাসের মর্যাদা রাখতে পালিয়ে যান চৈতিকে ছেড়ে। বিগত সম্পর্ক তার ভাষায় আখ্যা পায়,‘এ প্রতারণা,এ অন্যায়,এ পাপ।’ অথচ কিছুক্ষণ আগেও তার কাছে তা পাপ ছিলো না। ‘আধুনিক’ ও ‘স্বাধীন’ নারী অর্ণবি। জীবন সম্পর্কে তার ধারণা প্রয়োজন নিমিত্ত। তাই চৈতি-সঞ্জয়ের সমাজ নিষিদ্ধ সম্পর্ক তার ভাষায়,‘এটা কোনো অন্যায় না। তাছাড়া এটা তোর দরকার।’ স্বাধীনতার মানে তার কাছে সম্পূর্ণ মুক্তি;চারদিকে সীমানা একে দিয়ে তার ভিতরে ছেড়ে দিয়ে বলা
হলো যেখানে খুশি যাও,এর নাম স্বাধীনতা নয়।পরিবার তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ,যদিও তা দেখার দৃষ্টিভঙ্গিতে রয়েছে ভিন্নতার ছোঁয়া।
স্বামী-সন্তান হারিয়ে মীরার আশ্রয় চৈতির পরিবারে। একমাত্র সন্তান;যাকে তার শশুড়বাড়ির লোকেরা পুড়িয়ে মারে শুধু কন্যাসন্তান পেটে ধরার ‘অপরাধ’-এ। চৈতির আরেক গৃহপরিচারিকা পুষ্প;স্বনির্ভর, সক্ষম,উপার্জনক্ষম;যার আয়ে পঙ্গু স্বামী ও সন্তানের পেট চলে। তারপরও প্রতিনিয়ত তিনি স্বামীর কাছে নির্যাতিত;তবুও পুষ্প সুখী। তার ভাষায়,‘তবুতো লোকটা মাথার উপর ছায়া হয়ে আছে।’
২.
বাংলার সমাজ যখন পরিবর্তনের আভায় রঙ বদলাচ্ছে,রবীন্দ্রনাথ তখন লিখছেন ‘নষ্টনীড়’। বিনয় ঘোষের বরাত দিয়ে বলা যায়,সেসময়ে ‘নতুন ভাবধারা,নতুন আদর্শ,নতুন রুচি ও নীতি চলাফেরা করে। ...মানুষ থাকে মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে,অথচ প্রত্যেকেই স্বতন্ত্র ও সম্পর্কশূন্য।’৪ যার আলোকে নির্ধারিত হয় সমাজের বিভিন্ন চলক। ১৯ শতকের শেষ ভাগ ও ২০ শতকের গোড়ার দিকে এসব পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলার সামাজিক প্রতিষ্ঠান,সংস্কৃতিতে আসতে থাকে নতুন রূপ। পরিবর্তিত ‘গ্রাম্য সমাজে নতুন জমিদার শ্রেণী,বৃহৎ একটি জমিদারী-নির্ভর মধ্যস্বত্বভোগী এ গ্রাম্য মধ্যশ্রেণী,এবং নাগরিক সমাজে নতুন অর্বাচীন অভিজাত-ধনিকশ্রেণী,খুদে ব্যবসায়ী দোকানদার চাকরিজীবী প্রভৃতিদের নিয়ে বড় একটি নাগরিক মধ্যশ্রেণী এবং তার মধ্যে সোনার চাঁদের মতো একদল ইংরেজশিক্ষিত ‘elite’’৫ গড়ে ওঠে। সে সমাজে সবকিছুর ঊর্ধ্বে জায়গা করে নেয় অর্থ,মানে টাকা। ভূমি মালিকানায় আসে পরিবর্তন-অর্থনৈতিক কাঠামো পরিবর্তিত হতে থাকে,হতে থাকে শিল্পায়ন,গড়ে ওঠে নগর;আর গ্রাম থেকে মানুষ ক্রমেই হয়ে ওঠে নগরমুখী। সামাজিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেমন :পরিবার,ধর্ম,শিক্ষাসহ সব ক্ষেত্রে আসতে থাকে পরিবর্তন।
এতোসব পরিবর্তনের মধ্যে উঠে আসে নারী-শিক্ষা ও স্বাধীনতার কথা;মোটের ওপর নারীর পরিবর্তনের কথা। ১৯ শতকের ৬০ ও ৭০ দশকে কেশবচন্দ্র সেন স্ত্রীশিক্ষা, স্ত্রীস্বাধীনতা,অসবর্ণ বিবাহ প্রভৃতি বিষয়ে ব্রাহ্মসমাজকে উজ্জীবিত করতে চেয়েছিলেন। ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনকারী হিন্দু পুনরুত্থানবাদীদের ভাবাদর্শ ছিলো সাম্য,গণতন্ত্র,স্ত্রীশিক্ষা-স্বাধীনতা,পুরুষ-নারীর সামাজিক সমান অধিকার,ধর্মীয় স্বাধীনতা ইত্যাদি। বিদ্যাসাগরের বিধবা বিবাহ আন্দোলন,যা আইনি স্বীকৃতি লাভ করে ১৮৫৬-তে। এছাড়াও নারীর অর্থনৈতিক পরাধীনতা,যৌথপরিবার,পুরুষের বহুবিবাহ,বাল্যবিবাহসহ নারী মুক্তির বিভিন্ন আন্দোলন দেখা যায় এ সময়টিতে। কিন্তু নারী মুক্তি,বিভিন্ন কুসংস্কার দূর,কঠোর বর্ণপ্রথাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিবর্তনের জন্য লড়তে থাকা বিদ্যাসাগর,রামমোহন,দ্বারকানাথ, দক্ষিণারঞ্জন,রামগোপাল,তারাচাঁদ,দেবেন্দ্রনাথ,কেশবচন্দ্র,রাধাকান্ত,ভূদেব,বিবেকানন্দ,ইয়ং বেঙ্গল সোসাইটি,সৈয়দ আমীর আলী,আব্দুল লতিফ খাঁসহ অনেকের এ আন্দোলনকে বিদ্যাশিক্ষিত মুষ্টিমেয় এলিটের মস্তিষ্কের আন্দোলন ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। প্রমাণ হিসেবে কয়েকটি নমুনা দেওয়া যেতে পারে,যে মূলনীতিতে ব্রাহ্মসমাজ শুরু হয়েছিলো কেশবচন্দ্র তা থেকে দূরে সরে এসে মিশে যান আদি হিন্দুবাদে,মূলনীতি হয় ‘Brahmoism is Hinduism’ ।১৮৫৬-তে বিধবাবিবাহ আইন চালু হলেও ১৯ শতকের শেষ পর্যন্ত দেখা যায় গুটিকয়েক;তাও হয়েছিলো বিদ্যাসাগরের উদ্যম ও অর্থব্যয়ে অথবা তার একান্ত ঘনিষ্ট ভক্তদের চেষ্টায়।
এতে সমাজের মূল অর্থনৈতিক ভিত্তির কোনো পরিবর্তনই আসেনি। আর সমাজের মূল অর্থনৈতিক ভিত্তির আধুনিক রূপান্তর ছাড়া নারীর অবস্থান পরিবর্তন হতে পারে না। ‘তাই বিধবাবিবাহ ব্যর্থ হয়েছে,নারীর পরাধীনতা,যৌথ পরিবার সবই বজায় থেকেছে,এবং বহুবিবাহ ও বাল্যবিবাহ নিবারণের জন্য শেষ পর্যন্ত ইংরেজরাই কোন আইন পাস করতে চান নি।’৬ রাষ্ট্র এগিয়ে না আসায়,ধর্মীয় সংস্কার না হওয়ায় নারীর অবস্থান থাকে আগের মতোই। নারীর আবদ্ধতা,পরাধীনতা রয়ে যায় মধ্যযুগীয় কায়দায়। উচ্চবিত্ত শিক্ষিত পরিবারে নারী শিক্ষার কদাচিৎ মূল্য দেওয়া হলেও তা নারীর স্বাধীনতা ও স্বকীয়তা বলতে যা বোঝায়,তা থেকে ছিলো অনেক দূরে। খুব কম বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেওয়া হতো তার চেয়ে দ্বিগুণ বা তিনগুণ বয়স্ক ব্যক্তির সঙ্গে। তারপর সে হয়ে পড়তো সংসারবন্দি। এক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যেমন :ননদ,জা,দেবর,শাশুড়ি ও অন্যান্যদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক হতো পারিবারিক ফর্মের ভিতরেই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এমন কোনো সম্পর্ক তাদের সঙ্গে গড়ে উঠতো না যে,গৃহবধূরা তাদের মনের কথা তাকে বলতে পারেন। আর স্বামীকে তো নয়ই;কারণ সে যে নারীর দেবতা!
এমতাবস্থায় বাইরের কারো সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে উঠাতো অকল্পনীয়। এমনিভাবে বেশিরভাগ নারীকেই সংসারে কাজ-কর্ম,স্বামীর পূজা করেই একসময় স্বর্গের পথে পাড়ি দিতে হতো;এর অন্যথা হলে,নারীর জীবন হয়ে উঠতো নরকময়।স্বামী বিদ্যা-বুদ্ধিতে চাঁদে পাড়ি দিতেন,স্ত্রীরা চেয়ে থাকতেন পথপানে। কিছু ক্ষেত্রে যদিও স্বামীরা তাদের পড়িয়ে নিতেন,তাদের সঙ্গী হতো বঙ্কিম,শরৎ।এদের গল্প-উপন্যাস পড়ে কখনো হেসে,কখনো কেঁদে কাটতো নারীর ঘরের জীবন। স্বামীর সঙ্গে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মানসিক ও শারীরিক দূরত্ব ছিলো চিন্তা ও মানসিক দূরত্বের মতোই অনতিক্রান্ত;যার রূপ আমরা দেখি রবীন্দ্রনাথের ‘নষ্টনীড়’ ও পরবর্তী সময়ে সত্যজিতের চারুলতায়।
প্রতিটি যুগ, প্রতিটি কাল তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য,রূপ নিয়ে বদলে দিয়েছে পৃথিবী। সেই সঙ্গে বদলেছে মানুষের বৈশিষ্ট্য,মানবিকতা,মনুষ্যত্ব। তেমনি আধুনিক এই সমাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ‘ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ ও বিচ্ছিন্নতা আমাদের ব্যক্তিজীবন, সমাজজীবন,রাষ্ট্র,শিল্প-সংস্কৃতি সবকিছুকেই রুগ্ন,ফ্যাকাশে আর জিরজিরে করে দিয়েছে।’৭ রাষ্ট্র,শাসনতন্ত্র,প্রশাসনিকতায় এসেছে নবরূপ;পরিবর্তন হয়েছে বিশ্বাস, মূল্যবোধ,ধর্ম,যৌনতা,আচার,প্রথা,রীতি-নীতি। বদলেছে সামাজিক সম্পর্কের ধারা-গতিপথ। প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক এই সমাজে তাই নারীর অবস্থানও নেই আর আগের মতো। কিন্তু প্রশ্ন হলো নারীর সেই পরিবর্তনের রূপটি কেমন?
‘সমাজবিশ্লেষক জিয়াউদ্দিন সরদারের মতে গত শতকের নারী বন্দী হয় রান্নাঘরের বন্দীশালায়,এই শতকের নারী বন্দী তার নিজ দেহের কারাগারে।’৮ নারী স্বাধীনতার নামে যা হচ্ছে,বেশিরভাগই নারীর চাওয়া-পাওয়া থেকে স্বাধীনভাবে সৃষ্ট নয়;তা গড়ে উঠছে পুরুষতান্ত্রিক নজরদারি অনুসারে পুরুষরা যেভাবে চাচ্ছে। তাই নারী আজ কথিত ‘স্বাধীনতা’ নামের খাঁচাতেই বন্দি। ‘দণ্ডকারণ্যে সীতাকে গণ্ডি এঁকে দিয়েছিলেন লক্ষণ।রামায়ণ অনুযায়ী সীতা সেই গণ্ডির বাইরে যাওয়ায় কী অনর্থই না ঘটেছিলো!রবীন্দ্রনাথ মেয়েদেরকে বলেছেন স্বর্গের ইন্দ্রাণী। প্রশ্ন হলো,এই স্বর্গের সীমা কতদূর? লক্ষণের গণ্ডিই বা কত বড়?’৯ এখনো নারী লক্ষণের গণ্ডির কূলকিনারা করতে পারেনি। বর্তমানেও বেশিরভাগ নারীর যোগাযোগক্ষেত্র সীমিত, বিচরণক্ষেত্র,কাজ বা অবসরের সীমাও নির্দিষ্ট। ‘পিতৃতান্ত্রিক সংস্কৃতির’ বেঁধে দেওয়া এ নিয়মে নারী আজও পরিবারবন্দিনী। চারুলতা যেমন পরিবারের মধ্যে থাকতে গিয়ে একাকী নিঃসঙ্গ,তেমনি আজকের চৈতি বোসও সাজানো গোছানো পরিবার টিকিয়ে রাখতে গিয়ে বিপন্ন।
কোনো শিশুই নারী হয়ে জন্মায় না। আমাদের সমাজ,পরিবার,সংস্কৃতি তাকে ধীরে ধীরে মানুষ হিসেবে নয় বরং ‘আদর্শ নারী’ হিসেবে গড়ে তোলে। নাসরিন খন্দকারের ভাষায়,‘শৈশবে শিশুর চোখ দিয়ে আমরা নারী-পুরুষ চিনেছি। তাদের পৃথক ভূমিকা চিনেছি। চিনেছি বাবা (সংসারের প্রধান)রোজগার করে আর মা রান্না করে,ঘর সামলায়। বুঝে নিয়েছি বিয়ের পর মেয়েকে ‘বউ’ হতে হয়,‘মা’ হতে হয়। সেই সঙ্গে শিখেছি এই পৃথক ভূমিকার সঙ্গে সঙ্গে তাদের মর্যাদাও কিভাবে ভিন্ন হয়ে যায়;এসব কিছুই যেন কত স্বাভাবিক,প্রশ্নহীন,সর্বজনীন।’১০ নারীর এই যে বেড়ে ওঠা এবং তার দৃষ্টিভঙ্গির পিছনে সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামো দায়ী। বাংলার সমাজ ব্যবস্থায় আজও পরিবারের উপার্জন ও পরিবার চালানোর ‘ভার’ পুরুষের ওপর। পুরুষ আয় করে,সংসার চালায়;তাই সংসারের দণ্ডও থাকে তার হাতে। তাই আজ কথিত আধুনিক বিশ্বে,সমাজে বাস করেও নারীর বাহ্যিক পোশাকি পরিবর্তন ছাড়া আর কিছু চোখে পড়ে না।
তার মানে, আমরা বলছি না আজ পরিবারের গুরুত্ব নেই বা পরিবার অপ্রয়োজনীয়; কিন্তু যে পরিবারে পুরুষ-নারীর সম্পর্ক রাজা-প্রজা বা প্রভু-দাসত্বের,সেখানে নারীর মূল্যায়ন কোথায়? নারীর প্রতি এই মানসিকতা,শোষণ,নিপীড়ন-তা যুগের আধুনিকায়নও রোধ করতে পারছে না;বাহ্যিক ও পদ্ধতিগত কিছু পরিবর্তন আসলেও মূল থাকছে একই। মনে পড়ছে মার্কসের কথা,‘সমাজ যত উন্নত হয়েছে মানুষ কর্তৃক মানুষের শোষণ নিপীড়ন চালানোর ঘটনাও অনুরূপভাবে ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই মানুষের জীবনে উন্নয়ন ও আধুনিকতা সাময়িক কিছু যান্ত্রিক সুযোগ-সুবিধা উপস্থাপন করতে পারলেও তা সমাজের বৃহত্তর ও দীর্ঘমেয়াদি প্রশ্নে কখনই সহায়ক ভূমিকা অতীতেও নিতে পারেনি এবং ভবিষ্যতেও নিতে পারবে এমনটি না ভাবাই ভাল।’১১
৩.
আধুনিকতার প্রধানতম লক্ষণ ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদ। ‘‘আমার মালিক আমিই’-এই বোধ, সমাজ নয়,জাতি নয়,রাজা নয়,গোষ্ঠী নয়,এমনকি পরিবারও নয়,এই বোধেরই ভদ্রদস্তর নাম ব্যক্তি স্বাধীনতা বোধ। ...যে দৈহিক ও মানসিক ব্যবস্থার (তন্ত্রের system-এর) ভিতরে ব্যক্তির বাস,তার শাসক বা পরিচালক হবেন সেই ব্যক্তিই, অন্য কেউই নয়।’১২ কিন্তু আজকের নারীর কি সেই ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবোধ আছে? নারী কি পারে তার দৈহিক ও মানসিক ব্যবস্থার শাসন পরিচালনা করতে,নাকি সেখানে আজও পুরুষতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রয়েছে? অগ্নিদেব চৈতিকে আধুনিক নারী হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। চৈতি চরিত্রে রূপদানকারী ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত নিজে চৈতি সম্পর্কে বলেছেন এভাবে,‘সত্যজিৎ রায়ের চারুলতা ছবির নায়িকা চারুলতার সঙ্গে অনেকে চৈতির মিল খুঁজে পেতে পারে,তবে চৈতি কোন ভাবেই চারুলতা নন।তিনি এ যুগের নারী,অনেক সাহসী এবং স্বাধীন।’১৩ কিন্তু ঋতুপর্ণার এ কথার সঙ্গে একমত হওয়া কষ্টকর। জানি না,তিনি নারী স্বাধীনতা বলতে কী বুঝিয়েছেন;দিনভর সাইবার দুনিয়ায় ঘোরাঘুরি,শপিং করা আর দু-একজন বন্ধু থাকলেই কি নারী স্বাধীন হয়ে যায়? বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে প্রতিনিয়ত অপরাধবোধে,হীনমন্যতায় ভুগে,মনে মনে আড়ষ্ট হয়ে থেকে,শেষ পর্যন্ত গর্ভে অন্যের সন্তান ধারণ করে স্বামীর কাছে নিজের বলে চালিয়ে দেওয়া কি নারীর সাহসিকতার পরিচয়? তা না হলে,এটা কি ২০ শতকের শুরুর দিকের চারুলতার মতো পরাধীনতা, নিজের কথা না বলার অক্ষমতা ও পুরুষের কর্তৃত্ব মেনে নিজের মনের বিরুদ্ধে গিয়ে অবশেষে যন্ত্রণায় বুঁদ হয়ে নিজের মধ্যেই ডুবে যাওয়ার পরিচয় দেয় না?
আধুনিক সময়ে নারী স্বাধীনতার অন্যতম দাবি,দাম্পত্য সম্পর্কে সমমর্যাদা। কিন্তু তা কি আজ প্রতিষ্ঠিত? যদি তাই হতো,তবে চৈতি বোস রাতের পর রাত স্বামীকে থ্রিডি গ্লাসে দেখে কাটাতেন না,শারীরিক ও মানসিক চাহিদা মেটাতে সাইবার জগতে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়াতেন না। তার গর্ভে অন্যের সন্তান আসতো না। কলিম খান বলছেন,‘সম্বন্ধ যথাযথ হলে পাওয়া যাবে স্বাধীনতা,মিলবে মুক্তি। সম্বন্ধ অযথার্থ হলে জুটবে অধীনতা,পাওয়া যাবে শৃঙ্খল।’১৪ এই সম্বন্ধের যথার্থতার পরিচয় পাওয়া যায় একে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা,দায়িত্বশীলতা ও ভালোবাসায়। ‘যে কোনও সম্বন্ধের মধ্যে উভয় পক্ষের সমমর্যাদা থাকা একান্তই বাধ্যতামূলক হতে হবে,একজন শাসক অন্যজন শাসিতে পরিণত হবে না। তাতেই ইতিবাচক স্বাধীনতার সূত্রপাত হয়।’১৫ কিন্তু ওই যুগের ভূপতি,উমাপদ আর এ যুগের বিক্রম,উৎপল কিংবা পুষ্পের স্বামীর মধ্যে কোনো পার্থক্য কি আমরা দেখি? তারা সবাই নারীর দেবতা। সমমর্যাদার পরিবর্তে এখানে জায়গা করে নিয়েছে কর্তৃত্ব,শোষণ,অবহেলা আর নির্যাতন। ‘শোষণে সব শ্রেণীর পুরুষ অভিন্ন;শোষণে মিল রয়েছে মার্কিন কোটিপতির সাথে বিকলাঙ্গ বাঙালি ভিখিরির,তারা উভয়েই পুরুষ,মানবপ্রজাতির রত্ন। ...অন্ধ,বিকলাঙ্গ,নির্বোধ পুরুষও অধিষ্ঠিত শ্রেষ্ঠ নারীর ওপরে।’১৬ আমাদের সমাজ,রাষ্ট্র,পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থা নারীকে অধস্তনতা শিখিয়েছে,কখনো বল প্রয়োগ করে, কখনোবা স্তবস্তুতি পান করিয়ে। আর সক্ষম,উপার্জনক্ষম পুষ্পদের মুখ দিয়ে বলিয়ে নিয়েছে,‘সে যে পল্টুর বাপ,পা’টা নেইতো,তাই মনে অতো রাগ,দুঃখ, অভিমান;সবকিছু আমার ওপরেই দেয়। তবুওতো মানুষটা মাথার ওপরে আছে, বেঁচে আছে।’
স্বনির্ভর,সক্ষম পুষ্পের মাথার ওপরে আমাদের সমাজব্যবস্থা তার পঙ্গু স্বামীকে রেখেছে;যার ছায়া ছাড়া পুষ্প বাঁচতে পারে না! কারণ একটাই,সে পুরুষ;যদিও অক্ষম,বেকার ও নির্দয়;তবুও সে নারীর রক্ষাকর্তা,তার মাথার ছায়া। চারুলতাকে বাধ্য করেছে মনের মধ্যে শত বেদনা,অভিযোগ,অভিমান থাকা সত্ত্বেও ভূপতির সেবা করতে। তার জন্য অতি যত্নে তরকারি রান্না করতে,আর পাখার বাতাসে সামনে বসে খাওয়াতে। মন্দা ও কেয়াকে করেছে স্বামীর ওপরে অতিনির্ভরশীল; যাদের সংসারে অবদান রাখার কোনো উপায় নেই। তাই স্বামীর সব কথা মেনে নেওয়া ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় থাকে না। আর আধুনিক চৈতি বোস, যার জীবনে বাহ্যিক কোনো কিছুর অভাব না থাকলেও শুধু স্বামীর অবহেলাতে তার জীবন হয়ে ওঠে বিষাদময়। বন্ধু-বান্ধব, বাইরের দুনিয়া, প্রযুক্তি-এসবের কোনো কিছুই চৈতিকে সুখী করতে পারে না। একশ বছর আগের চারুলতার পাশে এসব কিছু না থেকেও স্বামীর অসচেতনতা আর অবহেলা যেমন তার জীবনকে করেছিলো একা, বিষন্ন; আজ আধুনিক চৈতির অবস্থাও প্রায় একই। স্বামী-স্ত্রীর একে অপরের প্রতি যে দায়িত্বশীলতার কথা আমরা বলছি, তার অভাব যেমন ১৯ শতকের শেষের দিকে ছিলো; যা উঠে এসেছে রবীন্দ্রনাথের ‘নষ্টনীড়’ ও পরবর্তীকালে সত্যজিতের চারুলতায়, তা আজকের কথিত আধুনিক সময়ে এসেও খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। চৈতি বোসরা আজও স্বাধীনতা নামের খাঁচাতেই বন্দি।
৪.
‘পিতৃতন্ত্র সৃষ্টি করেছে নানা রকম সংস্থা, তার মধ্যে প্রধান হচ্ছে পরিবার। সমাজ ও রাষ্ট্র নরনারীদের সব সময় সরাসরি শাসন করতে পারে না, তাই পিতৃতন্ত্র পরিবারের সাহায্যে শাসন ও নিয়ন্ত্রণ করে প্রতিটি ব্যক্তিকে।’১৭ পরিবার অনেকটা পিতৃতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভিতরে রাষ্ট্র; আর পরিবার-রাষ্ট্রের প্রধান হচ্ছে পরিবারের পুরুষ; পতি। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র-পিতৃতন্ত্রের এ সংস্থা তিনটি পুরোপুরি পরিচালিত হয় পুরুষ দ্বারা। যেখানে নারী প্রজা, পুরুষ রাজা; পিতা কুলপতি, তিনিই সবকিছুর মালিক। ‘মনুসংহিতায় বলা হয়েছে,‘পিতা রক্ষতি কৌমারে, ভর্তা রক্ষতি যৌবনে। রক্ষন্তি স্থবিরে পুত্রা ন স্ত্রী স্বাতন্ত্রমর্হতি' : কুমারীকালে পিতা, যৌবনে স্বামী ও বার্ধক্যে পুত্ররা রক্ষা করবে নারীকে; নারী স্বাধীনতার অযোগ্য।’১৮ তাই মুখ রক্ষার জন্য নারীবান্ধব যে আইনগুলো রাষ্ট্র করে, তারও বাস্তবায়ন নির্ভর করে পুরুষেরই ওপর। নারীর চলাফেরা, মতপ্রকাশ সবকিছুই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ করে পুরুষতন্ত্র।
রবীন্দ্রনাথ হয়ে সত্যজিতের চারুলতাকে আমরা দেখেছি, তার গোটা জীবন, পরিবারের ভিতরে স্বামীর আনুগত্য করে কাটিয়ে দিতে। তাকে কখনো বাড়ি ছেড়ে বাইরেও বেরোতে দেখিনি; বাহির দেখার সাধ মেটাতে হয়েছে অপেরা গ্লাসে। তার চলাফেরা, তার স্বকীয়তা এমনকি মনের ভিতরের একান্ত অনুভূতিগুলোও পরিবার নিয়ন্ত্রিত। ইচ্ছা করলেই তিনি সবকিছু করতে পারতেন না। এ আবদ্ধতা যতোটুকু দৃশ্যমান, তার চেয়ে হাজারগুণে অদৃশ্য। অধীনতার যে চাদর চারুর মানসজগতকে তার অবচেতনেই ঢেকে রেখেছে, তাতে এমনিতেই তিনি স্বামীর সব কর্তৃত্বকে মেনে নিতে বাধ্য হন। পুরুষতান্ত্রিক পরিবারের হাজার বছরের গঠন কাঠামো এমনিতেই নারীর মন ও বাহ্যিক জগতকে নিয়ন্ত্রণ করেছে অতি সুদক্ষ হাতে। আজকের সময়ে এসে কি এ নিয়ন্ত্রণের কোনো পরিবর্তন হয়েছে?
চারুলতা ২০১১-তে দেখি, আধুনিক বিক্রমের কাছেও মানুষের টিকে থাকার মূলমন্ত্র সেই একই সমাজ, রাষ্ট্র, পরিবার। বিক্রমের ভাষায়,‘একটি নারী এবং একটি পুরুষ, তাদের সন্তান; এই হলো পরিবার, আর দেশ বা রাষ্ট্র হলো বৃহত্তর পরিবার। এবং রাষ্ট্রের ভালোর জন্যে, দেশের ভালোর জন্যে এই পরিবারকে, মানে আমাদের নিজের নিজের পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।’ চৈতি প্রশ্ন করেন,‘স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে সবারই স্বাধীনভাবে বাঁচার আর স্বাধীনভাবে ভাববার অধিকার আছে বিক্রম। একটি মেয়ে, যদি সে দুটি পুরুষকে একই সঙ্গে ভালোবাসতে পারে তাহলে অসুবিধাটা কোথায়, ক্ষতি কী?’ এর উত্তরে স্বাধীনতার স্বরূপ তুলে ধরে বিক্রম বলেন,‘স্বাধীনতার মানে কী? স্ব-অধীন,self control, সংযম; মানুষের জীবনে যদি সংযমই না থাকলো তাহলে মানুষ দাঁড়াবে কোথায়?’ এর প্রত্যুত্তরে চৈতির মুখে আমরা কোনো কথা শুনি না। তবে কি চৈতি বোস তা মেনে নিয়েছেন, নাকি পুরুষতান্ত্রিকতার সেই অদৃশ্য চাদর আজও আটকে দিয়েছে তার মুখ? কেননা, তার প্রশ্ন শুনেই কেয়া চমকে উঠে বলেন,‘এ বাবা, এ কী বলছিস তুই!’ সমাজের অধিকাংশ আধুনিক পুরুষই শুধু লোকদেখানো যুক্তির কারণে চৈতির এ প্রশ্নকে বাহবা জানালেও শেষ পর্যন্ত কেয়ার মতোই চমকে ওঠেন; রাঙা চোখে বলেন, এ কী ঔদ্ধত্য! এ সমাজ চৈতিদের জন্য পরিবার ছাড়া আর কোনো স্থান তৈরি করেনি। তাই মনোদৈহিক শত অপূর্ণতা সত্ত্বেও পরিবার আঁকড়ে থাকতে চান চৈতিরা। যদিও সঞ্জয়ের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক হয়, কিন্তু শেষাবধি ফিরে আসতে হয় প্রথাগত পরিবারেই;‘স্বাধীনতাবাদী’ স্বামীর কাছে। এরপরেও কি বলা উচিত হবে, চারুলতা ছিলেন ‘পরাধীন’ আর চৈতি ‘স্বাধীন’?
নিজের অস্তিত্ব নারীর স্বায়ত্তশাসিত নয় কোনো কালেই। তাই বেশিরভাগ নারী জীবনভর স্বাধীনতাবঞ্চিত থেকেও বুঝতে পারেন না, তারা পরাধীন। পুষ্পরা সক্ষম, উপার্জনক্ষম হয়েও বিকলাঙ্গ, কর্মহীন পুরুষকে তাদের মাথার ছায়া হিসেবে পেয়ে স্বস্তি বোধ করেন। মীরার একমাত্র সন্তানকে পুরুষতন্ত্র বলি দিলেও প্রতিবাদ করার শক্তি নেই তার। এ সমাজ নারীকে ওই শক্তি দেয়নি। পুরুষতো পুরুষই। তাই চৈতি, অর্ণবি আধুনিক হলেও মনোদৈহিক নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ তাদের হাতে থাকেনি। মধ্যবিত্তীয় মানসিকতা, ধর্ম, সমাজ, রাষ্ট্র, পরিবারের হাতে আজও তারা বাঁধা।
কারণ, খুব কম নারীকেই সম্মানের আসনে বসিয়েছে পুরুষ, কিন্তু সবাইকে করেছে দাসী। এমনকি ক্ষমতাশালী রানিরাও তাদের স্বামীর কাছে পরিচারিকার বেশি কিছু ছিলেন না। বঙ্কিমের সাহসী, স্বাধীনচেতা দেবী চৌধুরানীও শেষ পর্যন্ত স্বামীর পায়ে মাথা ঠুকেছেন। তারা সব শান্তির উৎস খুঁজে পেয়েছেন সন্তান জন্ম দিয়ে, বাসন মেজে আর স্বামী দেবতার পূজা করে। সুয়োরানি-দুয়োরানি, হিরামন পাখির রাজ্যের রানিসহ কল্পকাহিনীর সব রানিকেই দেখেছি স্বামী দেবতার পূজা করতে। যে রানিরা শক্তিশালী, কঠোর ছিলেন, অনেকক্ষেত্রে তারা খেতাব পেয়েছেন ‘ডাইনি’। আমরা ছোটোবেলা থেকেই ঘৃণা করে এসেছি সেই ‘ডাইনি’রূপী ক্ষমতাবান রানিদের। আর নরম, কোমল স্বভাবের যে রানিরা হাজারো অবহেলা-অত্যাচার সয়ে ঘরে থেকেছেন, জীবন দিয়েছেন কোনো অভিশাপ কাটাতে, দীর্ঘ বনবাসে একাকী থেকেছেন, তারা হয়েছেন মহৎ। সঙ্গে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে ত্যাগ, কোমলতা, পতিব্রতা, একাকীত্ব, সতীত্ব, সহনশীলতা নারীর মহৎ গুণ। এর সমন্বয়ে নারীকে কাঙ্ক্ষিত রানি বানাতে পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থা আজও তৎপর; অন্যদিকে রানি হয়ে উঠার স্বপ্নে আজও নারী বিভোর। নারীমুক্তি আন্দোলনগুলো এ থেকে মুক্ত করতে পারছে না নারীকে। নারীমুক্তি আন্দোলন হয়ে পড়েছে কোটাভিত্তিক। বর্তমান বাংলায় যে নারীমুক্তি আন্দোলনগুলো প্রচলিত, তার বেশিরভাগের ক্ষেত্রেই এ কথাগুলো প্রযোজ্য। ‘যিনি নারী পুরুষের সাম্যে ও সমান অধিকারে বিশ্বাস করেন, তিনিই নারীবাদী। আমাদের নারী-অধিকারবাদীরা নারীর অধিকারের চেয়ে স্ত্রীর অধিকার নিয়েই বেশি ব্যস্ত, তাঁরা স্ত্রীবাদী বা ভদ্রমহিলাবাদী।’১৯ যার ফলে নারী হয়ে উঠছে আগে স্ত্রী, তারপর নারী। স্বামীর নির্যাতন, দ্বিতীয় বিবাহ, স্বামীর চাপে অতিরিক্ত সন্তান ধারণ, আর পোশাক পরিবর্তনের কথা ছাড়া তারা যেনো আর কিছুই চায় না। বেশিরভাগ নারীমুক্তি আন্দোলনই পরিণত হয়েছে দাতাদের অর্থগ্রাস সর্বস্ব এনজিওতে; যাদের কাছে শুধু শারীরিকভাবে নারীর ঘরের বাইরে বেরোনো আর পোশাকি পরিবর্তনের নামই নারীমুক্তি। নারীর প্রকৃত অধিকার আদায়ের পথের ধারেও তারা হাঁটেন না।
৫.
নারী স্বাধীনতার প্রাথমিক স্তর বলে আমরা বিবেচনা করি শিক্ষাকে। কিন্তু নারী এখনো শিক্ষার খুব কাছে যেতে পারছে না, আর যারা পারছে তা নিয়েও উঠছে প্রশ্ন; নারীর সেই শিক্ষা কি তাদের প্রকৃত মুক্তিতে সহায়ক? ‘উনিশশতকের বাঙলার শিক্ষার এ-রূপ সম্পর্কে রাজনারায়ণ বসু বলেছেন,‘স্ত্রীলোকদিগকে যেরূপ শিক্ষা দেওয়া হইতেছে, তাহা তাহাদিগকে কেবল অশ্লীল গল্প ও নাটক পাঠে পারগ করে।’২০ পুরুষতন্ত্র প্রথমে নারীকে কোনো শিক্ষাই দিতে রাজি হয়নি। পরবর্তীকালে দিলেও এমন শিক্ষা দিতে আগ্রহী হয়েছে, যাতে শেষপর্যন্ত পুরুষেরই উপকার হয়। হুমায়ুন আজাদ বলেছেন,‘উনিশশতকের দ্বিতীয় ভাগ থেকে বাঙলায় নারীদের শিক্ষার যে-ধারা শুরু হয়, তার উদ্দেশ্য নারীকে স্বাধীন স্বায়ত্তশাসিত করা নয়, তার লক্ষ্য উন্নত জাতের স্ত্রী বা শয্যাসঙ্গিনী উৎপাদন। নারীশিক্ষাও প্রভু পুরুষেরই স্বার্থে।’২১ সত্যজিতের চারম্নলতায় দেখি, ভূপতি অমলকে বলেন চারম্নলতাকে সাহিত্য শিক্ষা দেওয়ার জন্য। তাছাড়া ভূপতির গৃহে চারুলতা আসার পরে তিনি বাংলা পড়তে শেখেন; যদিও ভূপতির বাংলা সাহিত্যে তেমন রুচি নেই। আর চারুলতাকে ইংরেজি শেখানোর কোনো মানেও হয় না। তাই চারুলতার সঙ্গী হয় বঙ্কিম। কিন্তু এ শিক্ষা চারুলতার জীবনে তেমন কোনো ইতিবাচক বোধ তৈরি করে না।
অবশেষে অমলের ওপর রাগ করে চারু পত্রিকায় লেখা ছাপালে, তা স্ত্রী-চারুর চেয়ে স্বামী-ভূপতির আত্মসম্মানই বৃদ্ধি করে! আমরা দেখি, ইংল্যান্ডের পছন্দনীয় দলের বিজয় উপলক্ষে দেওয়া এক ঘরোয়া পার্টিতে চারুর এ লেখা ভূপতির বন্ধুদের কাছে তার সম্মান আরো বাড়িয়ে দেয়। শেষপর্যন্ত চারুকে শিক্ষা দেওয়ার, তাকে গড়ে তুলবার সমস্ত কৃতিত্ব জমা হয় ভূপতির ঝোলায়। হিপ হিপ হুর্ রে ধ্বনিতে ভূপতিকে সবাই তুলে ধরেন উঁচুতে। অথচ ভূপতি জানতোই না চারুর সেই লেখার কথা। পুরুষতন্ত্র প্রণীত এ শিক্ষাব্যবস্থা যেমন পারেনি চারুলতার জীবনকে বদলাতে, তার স্বাধীনতা দিতে; তেমনি পারেনি শিক্ষিত, আধুনিক চৈতিকেও পুরুষতন্ত্রের উপনিবেশ হতে স্বাধীন করতে।
৬.
পাঠক আসুন দেখি, নারীর প্রতি পুরুষের এ উপনিবেশিকতার রূপটি কেমন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সম্পদে যখন থেকে ব্যক্তি মালিকানা শুরু হয়েছে, তার কিছুকাল পর থেকে অন্যান্য সম্পদের মতো নারীও পুরুষের সম্পদ বলে বিবেচিত হতে শুরু করে। রাষ্ট্রে রাজা যেমন তার সমস্ত প্রজাদের শাসক, তেমনি ঘরে ঘরে পুরুষ তার নারীর শাসক। আর এ শাসন চলেছে দুটি উপায়ে-কর্তৃত্ব ও আধিপত্য। গ্রামসির মতে,‘আধিপত্য হলো শক্তি প্রয়োগের বদলে ‘সম্মতির’ দ্বারা একটি শ্রেণী কর্তৃক অপরাপর শ্রেণীর উপর ‘প্রাধান্য’ প্রতিষ্ঠা।’২২ আর কর্তৃত্বকে তিনি বলেছেন, ‘পশুশক্তি’ অর্থাৎ আইন-কানুন তৈরি করে গায়ের জোরে শাসন। হাজার বছরের পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যের মাধ্যমে নারী চেতনায় যে উপনিবেশ স্থাপিত হয়েছে, তার বিরুদ্ধে কেউ বিদ্রোহ করলে তাকে দ্বিতীয় পদ্ধতি প্রয়োগ করে শায়েস্তা করে পুরুষ সরকার।
ভূপতিকে আমরা কখনোই কঠোর গলায় চারুকে শাসন করতে দেখি না। তার কোনো কাজে বাধা-নিষেধও আরোপ করেন না তিনি। তাহলে কি চারু আধিপত্যমুক্ত? তবে বলতেই হয়, না! নিজেকে ঘরে বন্দি রাখতে, শারীরিক-মানসিক চাহিদার অপূর্ণতায় ভুগতে, একাকিত্ব অনুভব করতে চারুকে বাহ্যিক কোনো চাপ দেয়নি ভূপতি। পুরুষতান্ত্রিকতার ধ্বজাধারী ভূপতির কঠোর হওয়ার কোনো প্রয়োজন পড়ে না। হাতে-পায়ে লোহার বেড়ি না পরালেও শাঁখার শিকলে বন্দি ছিলেন তিনি। চারুর ওপর আধিপত্য ফলাতো অমল, স্নেহ ও মায়ার ঘেরাটোপে। লেখক হবার পরে তা প্রকাশ্য রূপ ধারণ করে। আমরা দেখি, অমল চারুকে এড়িয়ে চলতে শুরু করে, লেখক হিসেবে সে তার প্রাপ্য সম্মান দাবি করে। স্নেহ আর মমতার কোনো মূল্য থাকে না; সম্পর্ক হয়ে যায় স্বার্থবাদী। তাই চারুর লেখা ছাপা হলে অমল মনে শান্তি পান না।
এ যুগে দেখছি-বিক্রম, উৎপল, সঞ্জয়, পুষ্পের স্বামী বা মীরার মেয়ের বর-সবাই নারীর শাসক। স্বামী অক্ষম, পঙ্গু হয়েও পুষ্পকে প্রতিনিয়ত মনোদৈহিক নির্যাতন করেন। তার শরীরে মারের যে অসংখ্য দাগ দেখি, তা শুধু লাঠির আঘাত নয়, এ দাগ হাজার বছর ধরে চলে আসা নারীর ওপর পুরুষের আধিপত্য ও কর্তৃত্বর দাগ। পুরুষের এ কর্তৃত্ব কোনোক্ষেত্রে আদিম-বন্য। মীরার একমাত্র মেয়েকে এ উপনিবেশিক শাসকরা পুড়িয়ে মারে, শুধু কন্যা সন্তান পেটে ধরার অপরাধে। আধুনিক এ সমাজে পুরুষের শুক্রকীটেই সৃষ্ট নারীর দায় বহন করছে আরেক নারী। শুধু অশিক্ষিত, নিম্নবিত্ত মানুষগুলোর শাসনই এমন নয়। আধুনিকতার ধারক-বাহক উচ্চবিত্ত শিক্ষিত শ্রেণিতেও এ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে পূর্ণমাত্রায়। তবে তা হয়তো ‘কর্তৃত্বের’ চেয়ে ‘আধিপত্যের’ মাধ্যমেই বেশি। বিক্রম, উৎপল বা সঞ্জয় নারী স্বাধীনতার কথা বললেও তারা নারীর মন ও বহির্জগতের একচ্ছত্র অধিপতি। আমরা দেখি, বিক্রম ও উৎপলের কথার বাইরে তাদের স্ত্রীরা যেতে পারেন না, মেনে নিতে হয় সবকিছু। নিজের দুর্বলতা, অপারগতার কথা না ভেবেই চৈতির গলা চেপে ধরেন বিক্রম। এ আশঙ্কায় যে, চৈতি তার সীমা ছাড়িয়ে গেছে। সঞ্জয় আধুনিকতার বুলি আওড়িয়ে চৈতিকে ব্যবহার করে যৌনদাসীর মতো। তারপর যখন তার পুরম্নষতান্ত্রিক ‘নীতি-নৈতিকতা’য় টান পড়ে, চলে যায় তাকে ছেড়ে।
৭.
মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও আরব ভূখণ্ডের কিছু রাষ্ট্রে নারীকে খতনা করে যৌনাঙ্গ সেলাই করে দেওয়া হয়; তাকে করা হয় যৌন অনুভূতিহীন। সমস্ত যৌন অনুভূতি, সুখ, আনন্দ থাকে পুরুষের জন্য, আর নারী হয়ে পড়েন সন্তান জন্মদানের যন্ত্রমাত্র। নারীর যৌন দায়িত্ব দুটি-পুরুষের মনোরঞ্জন করা ও সন্তান জন্ম দেওয়া। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সে সন্তান জন্মদানের সিদ্ধান্তও পুরুষ নেয় একচেটিয়াভাবে, আর নারীর যৌন চাহিদার প্রশ্নে পুরুষ থাকে নীরব। যে নারী অন্য যেকোনো উপায়ে তার যৌন চাহিদা মেটাতে চান, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ তাকে আখ্যা দেয় অসতী বলে। মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা বা আরব ভূখণ্ডের মতো বাংলার নারীর খতনা হয় না ঠিকই, তবে তাদের যৌনতা নিয়ন্ত্রিত হয় ভিন্ন উপায়ে। পুরুষতান্ত্রিক এ সমাজে পুরুষের চাহিদার সামনে নারীর সম্মতির প্রয়োজন পড়ে না, কিন্তু নারীর প্রয়োজনে পুরুষ সাড়া দেয় খুব কমই। আর নারীও মুখফুটে বলতে পারেন না, তার চাহিদার কথা। পুরুষতান্ত্রিকতা নারীকে সে অধিকার দেয়নি। তাই পুরুষের অবহেলা সয়ে কেটে যায় নারীর ‘নারীবেলা’। সত্যজিৎ দেখিয়েছেন, চারুলতা কতোটা তার স্বামীর অবহেলার শিকার হয়েছেন। তার প্রমাণ পাই, ভূপতি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের বয়ানে,‘সে যতদিন কাগজ লইয়া ভোর হইয়া ছিল ততদিনে তাহার বালিকা বধূ চারুলতা ধীরে ধীরে যৌবনে পদার্পন করিল। খবরের কাগজের সম্পাদক এই মস্ত খবরটি ভালো করিয়া টের পাইল না।’২৩ ভূপতির এ অবহেলার জবাবে সেই সমাজে চারুর মতো গৃহবধূর পক্ষে তা মেনে নিয়ে চুপচাপ থাকা ছাড়া কিছুই করার ছিলো না।
চারুর এ অক্ষমতা রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ফুঠে উঠেছে এভাবে,‘এমন অবস্থায় সুযোগ পাইলে বধূ স্বামীকে লইয়া অত্যন্ত বাড়াবাড়ি করিয়া থাকে, দাম্পত্যলীলার সীমান্তনীতি সংসারের সমস্ত সীমা লঙ্ঘন করিয়া সময় হইতে অসময়ে এবং বিহিত হইতে অবিহিতে গিয়া উত্তীর্ণ হয়। চারুলতার সে সুযোগ ছিলো না।’২৪ এমনিভাবে ভূপতির বিভিন্ন অবহেলা আর দায়িত্বজ্ঞানহীনতায় চারুর জীবন হয়েছিলো দুঃসহ। তাই সন্তানহীনা চারুলতা পাশের বাড়ির মায়ের কোলে সন্তান দেখে, তার মন অমলের দিকে তাকিয়ে আশা খোঁজে। কিন্তু সে সমাজ, রাষ্ট্র, বাস্তবতা, মূল্যবোধ বাধা হয়ে দাঁড়ায় চারুর পথে; তিনি বাধ্য হন চোখ ফিরিয়ে নিতে।
এদিকে চৈতিকে দেখি দিনের পর দিন স্বামীর অবহেলা সইতে। নিজের কাম মেটাতে তাই তাকে করতে হয় স্বমেহন। সমাজ, পরিবার, মূল্যবোধের বিধিনিষেধ না শুনে সঞ্জয়ের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে জড়ালেও মধ্যবিত্ত মানসিকতার চাবুকে প্রতিনিয়ত ঘায়েল হতে থাকেন চৈতি। পিতৃতন্ত্র কখনই নারীর স্বামী-বহির্ভূত কামকে প্রশ্রয় দেয়নি। এমনকি যে ‘মাতৃত্বের জয়গান গাওয়া পিতৃতন্ত্রের অভ্যাস, কিন্তু পিতৃতন্ত্র বিশুদ্ধ মাতৃত্বে বিশ্বাস করে না; বিশ্বাস করে বিবাহিত মাতৃত্বে।’২৫ যাতে পুরুষতন্ত্রের রক্তের স্বচ্ছতা বজায় থাকে। তাই রক্ত কলুষিত হওয়ার আশঙ্কায় চৈতির গলা চেপে ধরেন বিক্রম। আর বহু কাঙ্ক্ষিত সন্তান পেটে আসার পরও তা মেনে নিতে পারেন না চৈতি। কারণ সে তো সঞ্জয়ের, বিক্রমের নয়। পুরুষতান্ত্রিক এ ‘মানসিকতা’ নারীকে আজো করে রেখেছে পুরুষের যৌনদাসী।
৮.
আধুনিক এ যুগেও ঘরে ঘরে নারীদেরকে সংসার জীবনের প্রায় সবকিছুতেই মানিয়ে চলতে হচ্ছে। বিয়ের সময়ই মা কানে কানে বলে দেন,‘মা একটু মানিয়ে চলিস।’ জামাই যদি খারাপ আচরণ করে বা দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন না করে, তবুও নারীকে মুরুব্বিদের মুখে শুনতে হয়,‘মা, ছেলেরা একটু-আধটু এমনই হয়, মেয়েদের কাজ তাদের আঁচলে বেঁধে রাখা। এতে সংসারে সুখ থাকে।’ এভাবে নারীকে শেখানো হয়, কিভাবে প্রভুর আধিপত্য মেনে নিয়ে সংসার করতে হয়। আমাদের সমাজ নারীকে এ শিক্ষা দেয়; দিয়ে আসছে নারী (যদিও ‘নারী’ হয়ে কেউ জন্মায় না) জন্মাবার পর থেকেই। ফলে স্বামীর দায়িত্বহীনতা আর অবহেলায়ও নারী থাকে নির্বিকার। তার শরীর-মন অনেক কিছু চাইলেও তা থাকে অপ্রকাশিত। প্রভু করুণা করে যেটুকু দেন, প্রসাদের মতো জোড়হাতে তা নিয়ে কৃতজ্ঞ চিত্তে মাথায় ঠেকিয়ে, অতি ভক্তি সহকারে তা ভক্ষণ করেন নারী। পেট ভরলো কি না তা যেমন প্রভু জানতে চান না, তেমনি উপোসি পূজারিনীও প্রভুর সম্মানার্থে ক্ষুধিত পেটে যাপন করেন কালের পর কাল। এ ব্যবস্থা আর কতো কাল চলবে? একটি ক্রোমোসোমের পার্থক্যের কারণে নারী আর কতোকাল পুরুষের দাসত্ব করবে? আর কতোদিনই বা পুরুষ নিয়ন্ত্রণ করবে নারীর অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ? আর এ অবস্থায় নারী কী-ই বা করতে পারে? এ লক্ষ্যে হুমায়ুন আজাদের প্রেসক্রিপশন অনুসরণ করা যেতে পারে। তিনি লিখেছেন, ‘নারীকে ত্যাগ করতে হবে পিতৃ-ও পুরুষতন্ত্রের সমস্ত শিক্ষা ও দীক্ষা; ছেড়ে দিতে হবে সুমাতা, সুগৃহিণী, সতীর ধারণা; তাকে আয়ত্ব করতে হবে শিক্ষা, এবং গ্রহণ করতে হবে পেশা। তাকে হ’তে হবে আর্থনীতিকভাবে স্বাধীন, স্বায়ত্তশাসিত। নারীকে ঘৃণা করতে শিখতে হবে সম্ভোগের সামগ্রী হ’তে, এবং হ’তে হবে সক্রিয়, আক্রমণাত্মক। নিজের ভবিষ্যৎ সৃষ্টি ক’রে নিতে হবে নিজেকেই, পুরুষ তার ভবিষ্যৎ সৃষ্টি করবে না। নারীর ভবিষ্যৎ মানুষ হওয়া, নারী হওয়া নারী থাকা নয়।’২৬
লেখক : মাজিদ মিঠু ও মাহমুদ বিপ্লব রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ ও দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
mazid.mithu@gmail.com
biplob.ammm@yahoo.com
তথ্যসূত্র
১. ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ (১৩৭১:৩);‘সোনার বাঁধন’;সোনার তরী; বিশ্বভারতী, কলকাতা।
২. অপেরা গ্লাস : অল্প ক্ষমতা সম্পন্ন দুরবিন। এর সাহায্যে সাধারণত কোনো বস্তু বা দৃশ্য আড়াই থেকে চারগুণ বড়ো করে দেখা যায়। প্রাচীন অপেরা বা মঞ্চ নাটক দেখার জন্য এটি ব্যবহার হতো। এতে কোনো বিশেষ ব্যক্তিকে নয় বরং একসঙ্গে গোটা মঞ্চকে কাছে নিয়ে এসে দেখা যেতো। ১৯ শতকে শিক্ষিত ধনীগৃহের বিনোদনের অন্যতম অনুষঙ্গ ছিলো এ যন্ত্রটি।
৩. রায়, সত্যজিৎ (২০০২:১৮২,১৯৬);‘চারুলতা প্রসঙ্গে’;সত্যজিতের রবীন্দ্রনাথ; সম্পাদনা-আনোয়ার হোসেন পিন্টু; চট্টগ্রাম সত্যজিৎ চর্চাকেন্দ্র, চট্টগ্রাম।
৪. ঘোষ, বিনয় (১৪০২:২,৩);বাংলার নবজাগৃতি; ওরিয়েন্ট লংম্যান লিমিটেড, কলকাতা।
৫. প্রাগুক্ত; ঘোষ, বিনয় (১৪০২:১৫২)।
৬. প্রাগুক্ত; ঘোষ, বিনয় (১৪০২:১৫৮)।
৭. সরকার, এম জিয়াউল হক;‘হুমায়ূনের চলচ্চিত্র : আধুনিকতার অন্তরালে মানুষের স্বরূপ সন্ধান’;ম্যাজিক লণ্ঠন; সম্পাদনা-কাজী মামুন হায়দার;বর্ষ-২, সংখ্যা-২, জানুয়ারি-২০১৩, পৃষ্টা-১১, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী।
৮. খন্দকার, নাসরিন (২০১১:২২);‘পুতুল খেলার রাজনীতি। বারবি কাহিনী’;প্রবল ও প্রান্তিক ১; সম্পাদনা-রেহনুমা আহমেদ; পাবলিক নৃবিজ্ঞান, ঢাকা।
৯. গায়েন, কাবেরী;‘গ্রামের মহিলাদের কোন বন্ধু নাই’-শেষ পর্ব; www.guruchandali.com।
১০. প্রাগুক্ত; খন্দকার, নাসরিন (২০১১:৪, ৫)।
১১. কার্ল মার্কস, উদ্ধৃত; সরকার, এম জিয়াউল হক;‘হুমায়ূনের চলচ্চিত্র : আধুনিকতার অন্তরালে মানুষের স্বরূপ সন্ধান’;ম্যাজিক লণ্ঠন; সম্পাদনা-কাজী মামুন হায়দার; বর্ষ-২, সংখ্যা-২, জানুয়ারি-২০১৩, পৃষ্টা-১২, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী।
১২. খান, কলিম (১৪১৬:১১৯);‘প্রাগাধুনিকতা আধুনিকতা ও অধুনান্তিকতা’;দিশা থেকে বিদিশায় নতুন সহস্রাব্দের প্রবেশ বার্তা; হাওয়া ঊনপঞ্চাশ প্রকাশনী, কলকাতা।
১৩.‘চরিত্রকে প্রতিষ্ঠিত করতে যা প্রয়োজন তা-ই করেছি : সাক্ষাৎকার’;কালের কণ্ঠ, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১২।
১৪. প্রাগুক্ত; খান, কলিম (১৪১৬:১২০)।
১৫. প্রাগুক্ত; খান, কলিম (১৪১৬:১২০)।
১৬. আজাদ, হুমায়ুন (২০০৪:১৪,২৪);নারী; আগামী প্রকাশনী, ঢাকা।
১৭. প্রাগুক্ত; আজাদ, হুমায়ুন (২০০৪:৩০)।
১৮. প্রাগুক্ত; আজাদ, হুমায়ুন (২০০৪:৩১)।
১৯. প্রাগুক্ত; আজাদ, হুমায়ুন (২০০৪:১৬)।
২০. প্রাগুক্ত; আজাদ, হুমায়ুন (২০০৪:৩৫)।
২১. প্রাগুক্ত; আজাদ, হুমায়ুন (২০০৪:১৫)।
২২. রহমান, সাদিকুর (২০০৯;৬৫);আন্তোনিও গ্রামসির সহজপাঠ জীবন চিন্তা ও সংগ্রাম; ঘাস ফুল নদী, শাহবাগ, ঢাকা।
২৩. ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ (১৯৯৫:২৭৮);‘নষ্টনীড়’;গল্পগুচ্ছ; নওরোজ সাহিত্য সংসদ, ঢাকা।
২৪. প্রাগুক্ত; ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ (১৯৯৫:২৭৯)।
২৫. প্রাগুক্ত; আজাদ, হুমায়ুন (২০০৪:২৩৮)।
২৬. প্রাগুক্ত; আজাদ, হুমায়ুন (২০০৪:৩৭১)।
বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৩ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের চতুর্থ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন