কাজী মামুন হায়দার ও আমেনা খাতুন
প্রকাশিত ২০ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
শিশু চলচ্চিত্র আন্দোলন, শহরকেন্দ্রিকতা ও গ্রামের শিশুরা
কাজী মামুন হায়দার ও আমেনা খাতুন

শুরুটা রাজশাহী নগরী দিয়ে।
২০১০ সাল। মার্চ মাস। রাজশাহীতে চিলড্রেনস ফিল্ম সোসাইটির ২য় আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজন চলছে। শহরের প্রায় সবগুলো বিদ্যালয়ের সঙ্গে সোসাইটির শিশুরা যোগাযোগ করেছে। কিছু বিদ্যালয়ের শিশুরা নিবন্ধনও করেছে উৎসবে আসার জন্য। উৎসবে সিনেমা দেখানো হবে। ঢাকা থেকে চলচ্চিত্র আন্দোলনের রথী-মহারথীরা আসবেন। শোভাযাত্রা হবে। মাননীয় মেয়র উপস্থিত থাকবেন। সঙ্গে থাকবে চিত্রাঙ্কন ও গল্প লেখার প্রতিযোগিতা। অনেকটা অবিশ্বাস্য শোনালেও (অবিশ্বাস্য বলছি এ কারণে যে, রাজশাহী নগরীর মতো অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে পড়া একটি শহরের শিশুরা চলচ্চিত্র বানাচ্ছে, সেই চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হচ্ছে) সেই উৎসবে সোসাইটির রাজশাহী ইউনিটের শিশুদের নির্মিত আটটি ছবিও দেখানো হবে। সব কিছু মিলে শিশুদের মনে এক ধরনের উৎসব-উৎসব ভাব।
কিন্তু এই আয়োজন নিয়ে কিছু প্রশ্ন উঁকি দেয় মনের মধ্যে। এই যে এতো আয়োজন এটা কাদের জন্য? উত্তর, অবশ্যই শিশুদের জন্য। কোন শিশুদের জন্য? উত্তর, অনেকখানি বিব্রত হয়ে বলতেই হয় শহরের শিশুদের জন্য। শহরের সব শিশু কি এখানে আসার সুযোগ পাবে? উত্তর, অনিবার্যভাবেই না।
তাহলে শিশুদের যে বিশাল অংশটি শহরের খেটে খাওয়া কিংবা শহরের বাইরের গ্রামের, তাদের জন্য কী? তাদের কাছে চলচ্চিত্র কী? তাদের কাছে চিলড্রেনস ফিল্ম সোসাইটি কী? একথা কী একবারও আমরা ভেবেছি। তাদের কাছে চলচ্চিত্র হয়ত টিভি পর্দায় (টিভি পর্দায় বলছি এ কারণে যে, চলচ্চিত্রের মন্দা অবস্থায় সারা দেশে যেভাবে সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এ অবস্থায় আমরা আমাদের সন্তানদের আদৌ সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখাতে পারবো কিনা তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে) দেখা মান্না-মৌসুমী বা শাহরুখ-কাজল এর নাচ কিংবা টারজানের এগাছ থেকে ওগাছে লাফ দেওয়া।
একটু ভাবুন, আমরা তাহলে কী করছি? শহরের শিশুরা চলচ্চিত্র বানাচ্ছে, চলচ্চিত্র দেখছে। সংগঠিত হচ্ছে। রথী-মহারথীরা আসছেন। তাদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছেন, কর্মশালা করাচ্ছেন। তারা শিখছে, তারা বিশ্বায়নের উপযোগী হয়ে উঠছে। হয়ত আমরা অবচেতনভাবেই চাই তারা বিশ্বায়নের উপযোগী হয়ে উঠুক। কিন্তু শহর থেকে দূরে বরেন্দ্র অঞ্চলের সেই প্রত্যন্ত গ্রামের যে শিশুটি গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ে, আমরা তার জন্য কী করছি। তাহলে একই সময়ে সারা দেশে কি আমরা দুটি প্রজন্ম তৈরি করছি না?
এতক্ষণের আলোচনায় অনেকের মনে হতে পারে, আমি হয়ত চিলড্রেনস ফিল্ম সোসাইটির বিপক্ষে কথা বলছি। কিংবা চিলড্রেনস ফিল্ম সোসাইটির এই উদ্যোগকে ভালোভাবে দেখছি না। কিন্তু বিষয়টি মোটেও এরকম নয়। ২০০৫ সালে শুরু হওয়া এ আন্দোলন নিঃসন্দেহে একটা বড় বিষয়। দেশের বর্তমান চলচ্চিত্রের যে অবস্থা তা যেমন একদিনে হয় নি, তা সারানোও একদিনের কাজ নয়। মন্দা পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের যে দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা তার একটি প্রাথমিক ধাপ হতে পারে চিলড্রেনস ফিল্ম সোসাইটি। চিলড্রেনস ফিল্ম সোসাইটি করা এই শিশুরাই হয়ত একদিন আমাদের চলচ্চিত্রের হাল ধরবে। তখন নিশ্চয় আমাদের চলচ্চিত্রের এ অবস্থা থাকবে না। আমরা এখন কেবল ফ্রেমে ফ্রেমে আগামীর স্বপ্ন বুনছি।
অনেকে বললেন, কিছুতো হচ্ছে। রাজশাহীর শিশুরা তো কিছু করছে। এখন প্রশ্ন আসতেই পারে, কিছু হওয়ার চেয়ে না হওয়া ভালো ছিল কিনা। তার উত্তর এই লেখায় দিলাম না। আমি কেবল কিছু প্রশ্ন তুলতে চাই। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৪০ দশমিক ৬৩ ভাগ শিশু।১ এই শিশুদের একটা সামান্য অংশ থাকে আমাদের তথাকথিত শহরগুলোতে। এই কয়েকজন শিশুকে নিয়ে আমাদের আন্দোলন যদি আমরা এগিয়ে নিতে পারি তাহলে কোনো সমস্যা নেই! তাহলে এ আন্দোলন নিয়ে আমারও বলার কিছু নেই। কিন্তু আমরা যদি বক্তৃতা, বিবৃতিতে বলি এ আন্দোলন দেশের সব শিশুর জন্য। আমরা যদি স্পন্সরদের বলি এ আন্দোলন সব শিশুর জন্য, তাহলে প্রশ্ন আছে।
প্রশ্নটা হলো, ছয় বছরের এ আন্দোলনের পুরোটার সুফল ভোগ করেছে শহরের শিশুরা। বিশেষ করে ঢাকার শিশুরা। এরপর রাজশাহী ও চট্টগ্রামে কিছু কাজ হয়েছে, এটা ঠিক। কিন্তু একথাও ঠিক, তার মানে এই নয় আমরা সব শিশুদের কাছে যেতে পেরেছি। একটা কথা না বললেই নয়, শহর শহরই। সে রাজশাহী হোক আর ঢাকাই হোক। আমাদের গ্রামের শিশুরা অবশ্যই শহরের মতো সুবিধা পায় না। তবে এ কথা ঠিক, গ্রামের শিশুরা যে পারে তার প্রমাণ তারা বহুবার দিয়েছে। গ্রামের ছোট শিশুটি যেমন রেললাইন উপড়ানো দেখে বাড়িতে দৌঁড়ে গিয়ে তার মায়ের ছেঁড়া লাল শাড়ি এনে হাজারো মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছে। একই সঙ্গে এবারের প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় প্রত্যন্ত গ্রামের এক শিশু প্রথম হয়ে তার জানান দিয়েছে।
কিন্তু একই সঙ্গে একটা বিষয় ভাববার আছে, ওই শিশুটিও হয়ত বানাতে পারত কোনো চলচ্চিত্র। ওই শিশুটিও নিয়মিত ভালো চলচ্চিত্র দেখে জানতে পারত অন্য দেশকে, অন্য দেশের শিশুকে। কিন্তু আমরা কী তা করতে পারছি।
আমাদের হাসান স্যার, প্রখ্যাত কথসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক বলেন, শিশুদের জন্য আলাদা কোন জগত নেই; যে জগতে আমরা বড়রা থাকি, শিশুরা সেই একই জগতে বাস করে। তবুও এই কথাটির সঙ্গে বিরোধ নেই যে শিশু তার এই জগতের ভিতর থেকে নিজের একটি আলাদা জগত গড়ে নেয়। যে জগতটার সম্মুখীন সে হয়, সেই জগতের খানিকটা সে ছেঁটে-কেটে আলাদা করে নেয়। বহু কিছু বাদ দিয়ে বহু কিছু সে নিজের ভিতর থেকে যোগান দেয়।...আমরা বড়রা তাদের কাছ থেকে তাদের এ জগৎটাকে ছিনতাই করে নিয়েছি। বুভুক্ষের সামনে থেকে ভাতের থালা কেড়ে নেবার মতো। পুরোদস্তুর বড়দের ভোগে, বড়দের স্বার্থে, এমন উৎকট এক দুনিয়া তৈরি করে তুলছি যে, শিশুরা সেই ভয়ঙ্কর দুনিয়াতেই বেঁচে থাকতে বাধ্য হচ্ছে২। আমরা হয়তো আমাদের শিশুদের জন্য স্যারের ভাষায় ভয়ঙ্কর দুনিয়া বানাচ্ছি না, তবে আমাদের নিজেদের অজান্তেই (হয়ত জেনে) তাদের জন্য এক বৈষম্য তৈরি করছি।
স্বাধীনতার আগে শিশু-কিশোরদের জন্য প্রথম ব্যক্তি উদ্যোগে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন মাসিক সিনেমা পত্রিকার সম্পাদক ফজলুল হক। তার স্ত্রী লেখিকা রাবেয়া খাতুনের কিশোর উপন্যাস দু:সাহসিক অভিযান এর কাহিনী অবলম্বনে তিনি প্রেসিডেন্ট নামের চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। সেন্সর বোর্ড ছবির নাম প্রেসিডেন্ট নিয়ে আপত্তি জানালে ছবিটি ১৯৬৬ সালে ‘সন অব পাকিস্তান নামে মুক্তি পায়। এটিই পাকিস্তান আমলের প্রথম শিশুতোষ চলচ্চিত্র৩।
দেশ স্বাধীনের পর ১৯৮০ সালে প্রথমবারের মতো সরকারি অনুদান নিয়ে বাদল রহমান নির্মাণ করেন প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য শিশুতোষ চলচ্চিত্র এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী। সেই শুরু। এরপর বাংলাদেশে শিশুতোষ চলচ্চিত্র সন্তোষজনক হারে নির্মিত না হলেও একসময় বাংলা চলচ্চিত্রে শিশু চরিত্রের বেশ প্রাধান্য ছিল। এমনকি মূলধারার অনেক বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র নির্মিত হতো যেখানে শিশুচরিত্রই প্রধান থাকত এবং তাকে ঘিরেই ছবির কাহিনী আবর্তিত হতো।৪
তার মানে শিশুদের নিয়ে আমরা সব সময় ভেবেছি। এখনও হয়ত ভাবছি। আগামীতেও ভাববো। এই ভাবনারই ফসল ছিল চিলড্রেনস ফিল্ম সোসাইটি। নিশ্চয় আমরা এই আন্দোলনকে একদিন সফল করব। তবে সেটা যেন দেশের সব শিশুদের নিয়ে হয়।
লেখক: আমেনা খাতুন ও কাজী মামুন হায়দার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়ান।
তথ্যসূত্র
১. বাংলাপিডিয়া, ২০০৮।
২. ২০০৯ সালের ১৫, ১৬ ও ১৭ জুন রাজশাহীতে ১ম আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উৎসব অনুষ্ঠিত হয়।উৎসব উপলক্ষে প্রকাশিত সুভ্যেনিরে হাসান আজিজুল হক ওদের ভালবাসা জানাই শিরোনামে শুভেচ্ছাবাণী দেন। উদ্ধৃতিটি সেখান থেকে নেয়া।
৩. কাদের, মির্জা তারেকুল (১৯৯৩:২৭৬); বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প; বাংলা একাডেমী, ঢাকা।
৪. নাসরীন, গীতি আরা ও হক, ফাহমিদুল (২০০৮:১৩৫); বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প সংকটে জনসংস্কৃতি; শ্রাবণ প্রকাশনী; ঢাকা।
সংশ্লিষ্ট বিষয়
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন