Magic Lanthon

               

প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় ও অনিলাভ চট্টোপাধ্যায়

প্রকাশিত ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

দর্শকের খিদে বদলেছে, সেই খিদে অনুযায়ী সার্ভ করতে হবে

প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় ও অনিলাভ চট্টোপাধ্যায়


বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি যেনো মরা নদীর মতো। পানির পরিবর্তে সেখানে এখন ধু-ধু বালুচর। বেড়ার ওপারে কলকাতার হালও খুব বেশি ভালো নয়। সোনালি অতীত মানুষকে এখন শুধুই স্মৃতিকাতর করে; আর প্রযুক্তির বদৌলতে ভবিষ্যতের কথা বলা তো মুশকিল। নখের ডগায় থাকা প্রযুক্তি মানুষকে আর চলচ্চিত্র দেখতে প্রেক্ষাগৃহে টানে না। বাধ্য করে আরো আরো বেশি উন্নত প্রযুক্তির দিকে তাকাতে। এই পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়েও কিছু মানুষ প্রযুক্তিকে খুব বেশি পাত্তা দেয়নি। তাদের কাছে মানুষ আর মানবীয় সম্পর্কগুলোই মূল উপজীব্য। আর এ রকম ধাঁচের কিছু চলচ্চিত্র বাংলার মানুষ দেখা শুরু করেছে এবং কোনোটা বাণিজ্যিকভাবে সফলও হচ্ছে। এই চ্যালেঞ্জটা যারা শুরু থেকে নিয়েছেন তাদের অন্যতম নির্মাতা কৌশিক গাঙ্গুলি ও অভিনয়শিল্পী প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। সমসাময়িক বাংলা চলচ্চিত্রের গুরুত্বপূর্ণ এই দুই জন তাদের চলচ্চিত্র দৃষ্টিকোণ নিয়ে কথা বলতে এসেছিলেন ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক অনিলাভ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। তাদের এই আড্ডার মধ্য দিয়ে উঠে আসে কৌশিক ও প্রসেনজিতের চলচ্চিত্রভাবনা ও বাংলা চলচ্চিত্রের অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা আলোচনা, যা দর্শকমনে নতুন আশার সঞ্চার করে। মানুষকে বাংলা চলচ্চিত্র নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে সাহায্য করে। আড্ডাটির ভিডিও ইউটিউব থেকে নিয়ে ম্যাজিক লণ্ঠন-এর পাঠকের জন্য অনুলিখন করা হয়েছে। যে কেউ মূল ভিডিওটি দেখতে চাইলে https://www.youtube.com/watch?v=XKenyMP4CFM&t=759s; retrieved on: 19.09.2019 এই লিঙ্কে গিয়ে ঢু মেরে আসতে পারেন।

অনিলাভ চট্টোপাধ্যায় : সবাইকে বাংলা নতুন বছরের শুভেচ্ছা। আজকে নববর্ষের দিনে আমাদের সঙ্গে আছেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় ও কৌশিক গাঙ্গুলি তাদের নতুন চলচ্চিত্র দৃষ্টিকোণ (২০১৮) নিয়ে। অনেক কিছু আলোচনা হবে। সামনে আরেকটা ভালো খবরও আমরা পেয়েছি--বাংলা ভাষার নতুন দুটো চলচ্চিত্র ময়ূরাক্ষী (২০১৭) ও নগরকীর্তন (২০১৭) জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছে। এই দুটো চলচ্চিত্রেরও খুবই গুরুত্বপূর্ণ দুজন মানুষ আমাদের আজকের অতিথি। সে নিয়েও কথা হবে। আরো কথা হবে বাংলা চলচ্চিত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে এবং অবশ্যই দৃষ্টিকোণ নিয়ে।

তো বুম্বা দা, (প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের ডাকনাম) প্রথমেই আপনাকে শুভ নববর্ষ। প্রত্যেকেরই তো নতুন বছরের কিছু রেজল্যুশন থাকে, বাংলা বছরেরও নিশ্চয় থাকে; তো বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য আপনার কোনো শপথ আছে কি না?

প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় : আমার আলাদা করে কোনো শপথ নেই। তবে হ্যাঁ, সেভাবে দেখতে গেলে নববর্ষ ইংরেজি হোক বা বাংলাই হোক, বাংলা চলচ্চিত্র চলতে হবে। বাংলা চলচ্চিত্র ভালো হতে হবে, বাংলা চলচ্চিত্রকে আরো ভালো জায়গায় নিয়ে যেতে হবে, আরো বড়ো করতে হবে, আরো আন্তর্জাতিক মানের বানাতে হবে, এই তো।

অনিলাভ : কৌশিক দা?

কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় : আমার কাছে মনে হয়, মিনিংফুল চলচ্চিত্রের সংখ্যা আরো বাড়ুক। এন্টারটেইনমেন্টের জায়গা থেকেও বাড়ুক, আর্টের জায়গা থেকেও বাড়ুক। আর আমার রেজল্যুশন হচ্ছে, মেইনস্ট্রিম চলচ্চিত্র এবং আর্ট হাউজ চলচ্চিত্রের মধ্যকার গ্যাপটা কমুক আর সেগুলো ক্রমশ মেইনস্ট্রিমকে আচ্ছন্ন করে ফেলুক এবং সে জগতটাকে জয় করুক। এটা অনেকটা হয়ে এসেছে--২০১৮-এর আগে থেকে আমরা দেখছি--এটা আরো বাড়তে থাকুক। বিসর্জন (২০১৭), দৃষ্টিকোণ বা ময়ূরাক্ষীর মতো চলচ্চিত্র মানুষ প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে দেখুক, এগুলো জনপ্রিয় হোক। এবং সেটাই বাংলা চলচ্চিত্র হয়ে উঠুক, যা আমাদের আগের সংস্কৃতি।

অনিলাভ : এটা নিয়ে আমার পরে প্রশ্ন করার ইচ্ছে ছিলো। কিন্তু যেহেতু প্রসঙ্গ এসেই গেলো, এই যে মেইনস্ট্রিম চলচ্চিত্র--প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় আগে একধরনের চলচ্চিত্র করতেন; এখন সেখান থেকে অন্য একটা জায়গায় শিফ্ট করেছেন। কিন্তু এখন যদি দেখা যায়, বাংলা চলচ্চিত্রে জিৎ বা অঙ্কুশ, এই ধরনের দুয়েকজন নায়ক ছাড়া এমন কেউ নেই, যে মেইনস্ট্রিম বাংলা চলচ্চিত্রটাকে টানতে পারবে। সেটা কোনোভাবে ব্যবসায়িক বাংলা চলচ্চিত্রকে অ্যাফেক্ট করছে বলে তোমার মনে হয়?

কৌশিক : দেখো টু বি ভেরি অনেস্ট, সবাই আমাদের বন্ধুস্থানীয়। কাউকে আঘাত করার জন্য বলছি না, কিন্তু বাস্তবটা তো বাস্তব, রূঢ় বাস্তব। সেই বাস্তবটা হচ্ছে, যে ধাঁচের মেইনস্ট্রিম চলচ্চিত্র হচ্ছিলো, হাজার রকমের কম্বিনেশন করেও আর টানা যাচ্ছিলো না। আমরা মনে হয় নিজেদের নজর বন্ধ করে রেখেছি। আমরা দেখছি না সারা পৃথিবীতে কী হয়ে যাচ্ছে। অতো দূরে যেতে হবে না, আমাদের দেশে কী পরিবর্তন হয়েছে সেটা দেখলেই হবে। মাথায় রাখতে হবে, অমিতাভ বচ্চনও কিন্তু অন্য রকমের চলচ্চিত্র করতেন। আজকে কিন্তু আমরা তাকে দেখি পিঙ্ক, পিকু বা ব্ল্যাক-এর মতো চলচ্চিত্রে। আমার মনে হয়, এই ধরন বদলে যাওয়ার ব্যাপারটা স্টার-সুপারস্টার থেকে শুরু করে আমাদের সবারই মাথায় রাখা দরকার। প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় অনেকদিন আগেই সে রাস্তা দেখিয়েছেন, তার উৎসব থেকে শুরু করে চোখের বালি, দোসর-এর মাধ্যমে।

অনিলাভ : বুম্বা দা একই সঙ্গে করে গেছেন, পাশাপাশি।

কৌশিক : ওটা তখন কেউ টের পায়নি যে, বিশাল বড়ো একটা ডিজল্ভ হয়ে যাচ্ছে। কেউ বুঝতে পারেনি যে, প্রসেনজিৎ আস্তে আস্তে ফেইড ইন, ফেইড আউট করে এই জায়গায় চলে এসেছেন। এখন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় বলতে আমরা মাল্টিপ্লেক্সের চলচ্চিত্রই বুঝি, অন্যকিছু বুঝি না। এই প্রয়াসটা বোধ হয় সব স্টারদেরই করা উচিত।

অনিলাভ : দাদা হিন্দি চলচ্চিত্রের কথা যেহেতু আলোচনায় এসেই পড়লো, একটা প্রশ্ন করেই ফেলি। দেখো যখনই তিনশো কোটি টাকা ব্যবসার কথা হয় তখন কিন্তু টাইগার জিন্দা হ্যায়-এর কথাই আমাদের ধরতে হয়। তুমহারি সুল্লু কিংবা এই ধরনের চলচ্চিত্র কিন্তু কোনোভাবেই ব্যবসাটাকে ওই জায়গায় নিয়ে যেতে পারে না। বাংলা চলচ্চিত্রে এমন একটা জায়গা রয়েছে, একই সঙ্গে প্যারালাল চলচ্চিত্র ...।

প্রসেনজিৎ : আমি তোমাকে দুটো কথা বলি। সরি, তোমার কথার মাঝখানে ঢুকে পড়ছি। তুমি যদি বাংলা চলচ্চিত্রের বক্স অফিস কালেকশন দেখো--আমি তিনটি চলচ্চিত্রের নাম বলবো--আমাদের নিজেদের বক্স অফিস কালেকশনের কথা বলবো। কারণ তিনশো কোটি টাকার ব্যবসা এই মুহূর্তে আমাদের তো হবে না। যদি বাংলাদেশের সঙ্গে কখনো ওপেন হয়, তাহলে হয়তো হবে। কিন্তু এই সময়ে বড়ো কালেকশন তুমি যদি দেখো--মনের মানুষ, চাঁদের পাহাড় এবং কাকাবাবু সেটা মিশর রহস্য হোক বা ইয়েতি অভিযান। শিবুর (শিবপ্রসাদ মুখার্জি) চলচ্চিত্রগুলোকে আলাদা করে বলছি। এই যে চারটি চলচ্চিত্রের নাম বললাম, এগুলো শহরেও ব্যবসা করেছিলো, শহরের বাইরেও ব্যবসা করেছিলো। এই চারটিই কী? উপন্যাস। চারটিই কিন্তু বাংলা সাহিত্য থেকে নেওয়া। চরিত্রগুলোও চেনা, তাই না? কিন্তু ব্যবসাটা কেমন হয়েছিলো তুমি একবার ভাবো, চাঁদের পাহাড়মিশর রহস্য-এর! এবং এখনো ব্যোমকেশ বা ফেলুদা রিলিজ করলে দুর্দান্ত ব্যবসা হবে। আমাদের সমস্যাটা কিন্তু চলচ্চিত্র নয়। এখন শহর বা গ্রাম এভাবে মানুষকে ভাগ করলে চলবে না। আমার কাছে যে ফোন, তাদের কাছেও সেই একই ফোন। মানুষ কিন্তু এখন বেশ ব্র্যান্ড কনসাস। আর কৌশিক, সৃজিত বা শিবুরা যেমন চলচ্চিত্র করছে, এস ভি এফ (প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান) যে চেষ্টাটা করছে--প্রেক্ষাগৃহগুলো উন্নত হলে, সিঙ্গেল সিনেপ্লেক্স থেকে ডুপ্লেক্স হয়ে গেলে--চলচ্চিত্র কিন্তু চলবে। আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি।

অনিলাভ : অ্যাবসল্যুটলি। আমার নিজের একটা অভিজ্ঞতা বলি দুদিন আগের। কলকাতায় এ টি সির পিছনে নতুন একটা বিল্ডিং হচ্ছে, সেখানে আমি দেখি দুজন নির্মাণ শ্রমিক--ভাষা শুনে মুর্শিদাবাদের মানুষ মনে হলো--স্মার্টফোনে নিজেদের মধ্যে মেসির লাস্ট গোলটা দেখাদেখি করছে।

কৌশিক : কার গোল দেখছে একবার চিন্তা করো!

প্রসেনজিৎ : আজকে বিসর্জন সুপারহিট। কিন্তু তুমি বুঝতে পারছো, যদি মেদিনীপুর বা বহরমপুরের মতো জায়গার প্রেক্ষাগৃহগুলোতে সিঙ্গেলপ্লেক্স না হয়ে ডুপ্লেক্স হয়ে যায়, তাহলে ব্যবসাটা কোন জায়গায় যাবে। আমি বলছি না, মেইনস্ট্রিম চলচ্চিত্র থাকবে না। আমি মেইনস্ট্রিম চলচ্চিত্র করে বড়ো হয়েছি, আজ আমি যা আছি মেইনস্ট্রিম চলচ্চিত্রের কারণেই আছি। মেইনস্ট্রিম চলচ্চিত্র থাকবে। তুমি একটা ব্যাপার খেয়াল করো--সালমান খান--ওর থেকে বড়ো স্টার তো এই মুহূর্তে ভারতে আর নেই। স্টার বলতে স্টার, আমার ছেলে থেকে বুড়ো, সবাই ওর ফ্যান। মানে অদ্ভুত একটা ব্যাপার ওর! তুমি টাইগার জিন্দা হ্যায়-এর কথা বলছো তো, সেই সালমান খানই কিন্তু একটা বাজরাঙ্গি ভাইজান করেছে। সেখানে কোনো মারামারি নেই, হাতই তোলেননি কোথাও। সে চলচ্চিত্রটাও মানুষজন পাগলের মতো দেখেছে। অজয় দেবগনের মতো স্টার, সে রেইড করছে, সেটাও তো একশো কোটির ওপরে ব্যবসা করেছে। অক্ষয় কুমার পর পর হিট দিয়ে যাচ্ছে। তার চলচ্চিত্রগুলোর কন্টেন্ট দেখো। আমির খান যে ঘরানার চলচ্চিত্র করে, ইচ্ছা করলে এখনো ১০ বছর করে যেতে পারবে--আমি ওকে জিজ্ঞেস করেছি। আমি বাংলায় এ কাজ করেছি, কিন্তু মুম্বাইয়ে সেই চ্যালেঞ্জটা তো আরো অনেক বেশি। হি টুক দ্য চ্যালেঞ্জ অ্যান্ড বিকেম আ ফাদার! ফাদার মানে ফাদার, দুটো বড়ো মেয়ের বাবা (দঙ্গল চলচ্চিত্রে)! সেটা তো চললো। আমি যেটা বলছি, কৌশিকও বলার চেষ্টা করছিলো, আমরা মেইনস্ট্রিমের একটা সংজ্ঞা বেঁধে রেখে দিয়েছি। সেইটা বোধ হয় একটু বদলানো দরকার।

কৌশিক : সময়ের সঙ্গে বদলাতে হবে তো।

প্রসেনজিৎ : মেইনস্ট্রিম চলচ্চিত্রটাও পাল্টাতে হবে। মেইনস্ট্রিম চলচ্চিত্র হবে, আর মেইনস্ট্রিম চলচ্চিত্র ভালো না হলে আমরা বাঁচবো না।

কৌশিক : এখন যারা স্টার--জিৎ, দেব, অঙ্কুশ ও সোহম--প্রত্যেকের কথা বলছি। এদের তো একটা বিশাল দর্শকশ্রেণি আছে। তাদের এখন খিদে বদলেছে। সেই খিদে অনুযায়ী সার্ভ করতে হবে। এবং যখন ওই চলচ্চিত্রগুলো বেশি চলবে--আমরা তো তৈরিই হয়েছি মেইনস্ট্রিম চলচ্চিত্রের উদ্বৃত্ত টাকায়। ওদের ব্যবসা ভালো হয় বলেই প্রযোজক আমাদের বলে, নে এবার তোরা একটু আর্ট কর। তখন আমরা চলচ্চিত্র করেছি; করতে করতে একটু বেড়ে উঠেছি এই আরকি।

অনিলাভ : বুম্বা দা, দৃষ্টিকোণ-এর দিকে একটু আসি। ঋতুপর্ণা-প্রসেনজিৎ এই জুটি নিয়ে তো অনেক কথাই হয়েছে। তুমি একবার বলেছিলে, যদি কোনো ভালো চরিত্র পাওয়া যায়, তবেই মানুষ এই জুটিকে আবার দেখতে পাবে। তো এই চরিত্রটা কেমন, মানে কী ছিলো এর মধ্যে যা তোমাকে এতোটা আকর্ষণ করলো?

প্রসেনজিৎ : আসলে এই ভদ্রলোক (কৌশিককে দেখিয়ে) আমাকে নিয়ে চলচ্চিত্র করছিলেন না। বহু বছর ধরে এই নিয়ে তার সঙ্গে আমার খুনসুটি চলছিলো। আমি তাকে ইয়ার্কি মেরে, মজা করে, নানাভাবেই এই ব্যাপারে বলতাম। ও ঠিকই বুঝতো আমি মজা করছি না। কারণ ওপেন স্টেজে, ফোরামে, অ্যাওয়ার্ড শোতে ওকে বলেছি। আর আমি তো ভালো নির্মাতার সঙ্গে কাজ করতেই চাই। কিন্তু ওর (কৌশিকের) বক্তব্যটাও ঠিক যে, ঋতু দাকে (ঋতুপর্ণ ঘোষ) নাহয় বাদই দিলাম, তারপরেও সৃজিত তোমাকে নিয়ে যে সমস্ত চলচ্চিত্র-চরিত্র করেছে, ভাঙাচোরা করেছে, আমায় যদি তোমাকে নিয়ে কাজ করতে হয়, আর চরিত্রের মধ্যে সেই ওজনটা না থাকে, ডাইমেনশনটা না থাকে, বোঝাই না যায় যে এটা বুম্বা দা--তাহলে শুধু শুধু একটা সাধারণ চরিত্র আমি করবো না। আর সত্যিকার অর্থে খুব নরমাল চরিত্র, যার মধ্যে প্রচুর কমপ্লিকেশন নেই, চ্যালেঞ্জ নেই, সেরকম চরিত্র আজকাল আমি করতেও চাই না।

তো জিয়ন (দৃষ্টিকোণ-এর প্রধান চরিত্র) নিঃসন্দেহে তেমন একটা চরিত্র। আর শ্রীমতি-জিয়নের কেমিস্ট্রিটা সত্যিই অসাধারণ। লোকে বিশ্বাস করবে যে এটা প্রসেনজিৎ-ঋতুপর্ণা। আরেকটা জিনিস হলো, প্রাক্তন-এ শিবু আর নন্দিতা দি আমাদেরকে ফিরিয়ে এনেছেন। তারপরে আমি মনে করি, ১৫ বছর পরে কাজ করলেও যেনো লোকের মনে আমাদের জুটির ম্যাজিকটা কাজ করে। ম্যাজিকটা কী--স্ক্রিনে এরা প্রেমে পড়বেই। জিয়ন আর শ্রীমতির চরিত্রটাও ওই রকম। আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে যে, এটা আমাদের একসঙ্গে ৪৮তম চলচ্চিত্র। মানুষ আমাদেরকে নানাভাবে দেখে ফেলেছে। এখন আমাদের এমন একজন নির্মাতা চাই, যে একদম নতুন প্রসেনজিৎ-ঋতুপর্ণার গন্ধটা দর্শককে দিতে পারবে। যাতে লোকে বলে, না না এটা কিন্তু প্রসেনজিৎ-ঋতুপর্ণা নয়। এই জায়গাগুলো থেকেই দৃষ্টিকোণ করা।

অনিলাভ : কৌশিক দা, দৃষ্টিকোণ-এর টিজারটা দেখলাম। মনে হলো, শিবুর চলচ্চিত্রের নাম যদি হয় প্রাক্তন, তাহলে তোমারটার নাম হবে পরকীয়া

কৌশিক : আমারটার নাম তাহলে হবে বর্তমান, সরাসরি বর্তমান। দেখে পরকীয়া মনে হচ্ছে, অবশ্যই মনে হচ্ছে। কারণ গান দেখে বোঝা যাচ্ছে লোকটা বিবাহিত, স্ত্রী আছে। তার মানে অন্য নারী, তাহলে নিশ্চয় পরকীয়া। এতো সহজ সমীকরণ কিন্তু নেই। পরতের পর পরত খুলতে খুলতে গল্পের ভিতরে যেতে হবে। দেখো, অনেক কিছুই আমি বলতে পারি না, সাংবাদিকদের ভীষণ ভয় পাই। কারণ তোমাদের প্রশ্ন করার এতো সুন্দর কৌশল থাকে যে, একটা অন্য উত্তর দিলাম তাতেও অনেক কিছু তোমরা বের করে ফেলো। কাজেই খুব সামলে কথা বলতে হয়, সারাক্ষণ ধোঁয়া ধোঁয়া করে রাখতে হয়।

একটা জিনিস মাথায় রাখা জরুরি, জুটি বড়ো (বিখ্যাত) হলে দর্শক চিত্রনাট্য লেখার দায়িত্ব নেয়। তারা মনে মনে ভেবেই নেয়, তাহলে এটা এ রকম হবে, ওটা ও রকম হবে। ফুটবল প্র্যাকটিস করার সময় দেখবে ছোটো ছোটো পিলার থাকে। খেলোয়াড়দের পিলারগুলোতে পা না লাগিয়ে পাশ কাটিয়ে কাটিয়ে যেতে হয়। আমার কাজটাও হচ্ছে ঠিক সেটা, দর্শকের সব প্রেডিকশনকে এড়িয়ে এড়িয়ে যাওয়া। ওদের গায়ে যেনো না লাগে, ওদের ভাবনাকে এড়িয়ে যাওয়া। দর্শককে চিত্রনাট্য বানানোর জন্যই টিজার বানানো হয়েছে। ওরা যাতে একটা চিত্রনাট্য লিখে প্রেক্ষাগৃহে আসে, তার জন্য ট্রেইলারও দিয়ে দেওয়া হয়েছে, গানও ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ব্যাপক লিখে ফেলেছেন তারা--এটা তাহলে ওই, এখানে গণ্ডগোল হবে, বউটা ঝামেলা করবে ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রেক্ষাগৃহে এসে তারা যখন অন্য একটা গল্প দেখবে, কাহিনি অন্য একটা জায়গায় চলে যাবে এবং প্রেমটা অন্য একটা মাত্রা পাবে, তখন তারা ভাববে--আমি এ রকম প্রেম তো কোনো বাংলা চলচ্চিত্রে দেখিনি, কোনো চলচ্চিত্রেই তো এই বিষয় দেখিনি। তখন আমার জিতে যাওয়ার চান্স থাকবে। কাজেই সেই চান্সের খেলা কিন্তু দৃষ্টিকোণ। এবং দৃষ্টিকোণটা এমনভাবে বানানো হয়েছে, যাতে পরিবারের সব লোক এসে চলচ্চিত্রটা একসঙ্গে দেখতে পারে, চলচ্চিত্রের একটা ডিসেন্সি থাকে। আজকে মানুষ প্রেক্ষাগৃহে চলচ্চিত্র দেখতে আসতে ভয় পায়। যাবো কেউ দেখে ফেলবে না তো! নববর্ষের সময়, সবাই আসবেন এবং নিশ্চিন্তে বসে চলচ্চিত্রটা দেখবেন।

সারা ভারতবর্ষে রিজিওনাল চলচ্চিত্র যে এতো ভালো চলছে, সেই তুলনায় বাংলা চলচ্চিত্র কিন্তু কম। এটা দুর্ভাগ্যের; কারণ সারা ভারতবর্ষ কিন্তু বাংলা চলচ্চিত্রের বাজার থেকে শিখেছে। সবার কাছে মডেল আমরা, কিন্তু আমরাই এখন দুর্বল। এটা কিন্তু খুবই আনফরচুনেট।

প্রসেনজিৎ : দর্শককে তো প্রেক্ষাগৃহে আসতে হবে।

কৌশিক : তারাই বাড়িতে বসে বসে একজন আরেকজনকে বলবে, কি রে দেখলি, যাবো? বাড়িতে কোনো কাজ নেই কিন্তু--বসে বসে কুসংস্কারাচ্ছন্ন কিছু জিনিস দেখবে, গসিপ করবে, কাগজ পড়বে। আপনারা আসুন চলচ্চিত্রটা দেখুন, হেলদি জিনিস। দুই ঘণ্টা অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে বসে শান্তিতে একটা গল্প দেখবেন, গল্পের বই পড়ার মতো।

অনিলাভ : অ্যাবসল্যুটলি।

কৌশিক : এই ক্রেইজটা বাংলায় আবার তৈরি হচ্ছে।

আড্ডায়,কৌশিক,প্রসেনজিৎও অনিলাভ (ডান দিক থেকে)

অনিলাভ : এই জায়গায় আমার একটা প্রশ্ন আছে। বুম্বা দা আমি তোমার একটা সাক্ষাৎকারে পড়েছিলাম, আগে নববর্ষের দিন অন্তত ১৫টা চলচ্চিত্রের মহরত হতো। আজকে নববর্ষের দিনে আমরা দেখছি, দুটো বাংলা চলচ্চিত্র মুক্তি পেলো--কবির (২০১৮) এবং আমি আসবো ফিরে (২০১৮)। দৃষ্টিকোণ বেরোচ্ছে ২৭ তারিখ।

প্রসেনজিৎ : আরেকটা আসছে, গুপ্তধনের সন্ধানে

অনিলাভ : আচ্ছা, এই জায়গায় দাঁড়িয়ে তোমার মনে হয় না, বাংলা চলচ্চিত্রের সংখ্যাটাও কমে গেছে?

প্রসেনজিৎ : না না, সংখ্যা তো বেড়ে গেছে।

কৌশিক : বেড়ে বীভৎস আকার ধারণ করেছে!

প্রসেনজিৎ : দেখো, কৌশিকের চলচ্চিত্র ১৩ তারিখেই আসে, মানে পয়লা বৈশাখেই আসে। আর অবশ্যই কৌশিকের এই ঘরানার চলচ্চিত্র পয়লা বৈশাখে আসলে ভালো চলে। আমরা নিজেদের মধ্যে যেখানে সুযোগ-সুবিধা আছে, চেষ্টা করছি অ্যাডজাস্ট করার। যাতে বড়ো চলচ্চিত্রগুলোকে ছাড় দেওয়া যায়, যদি সম্ভব হয়। আমাদের কাছে মনে হয়েছে, দৃষ্টিকোণ এপ্রিলের ২৭ তারিখে আসলেও আমাদের ভালো উইকেন্ড। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না, তখন উই টেক চ্যালেঞ্জ। আর কৌশিক গাঙ্গুলির চলচ্চিত্র দেখার জন্য আমার মনে হয়েছে একটা আলাদা শ্রেণির দর্শক আছে, তার সঙ্গে প্রসেনজিৎ-ঋতুপর্ণা আছে, ভালো গান আছে।

সেটা আমরা অ্যাডজাস্ট করছি। কিন্তু আসল কথা হলো, চলচ্চিত্রের সংখ্যা বেড়ে গেছে! আমিই বললাম, দেবের চলচ্চিত্র আসছে, অঞ্জন দার চলচ্চিত্র আসছে--আমাদেরটা একটু পিছিয়ে দিই। এখন মাসে কিন্তু গড়ে আট থেকে নয়টা চলচ্চিত্র আসে, কখনো কখনো বেশিই আসে। আমাদের সময় এতো চলচ্চিত্র আসতো না। আমাদের সময় বছরে চলচ্চিত্র হতো ৪০৪২টা। এখন তো একশো পাঁচ থেকে একশো ১০! এবার সমস্যাটা কোথায় জানো তো, মানুষ প্রেক্ষাগৃহে আসে না। এখন তো এভরিথিঙস কস্ট হ্যাজ গন হাই, তাই না? সিনেপ্লেক্সে যদি একটা চলচ্চিত্র দেখতে যাও, তাহলে তো শুধু একটা টিকিটই নয়, তার সঙ্গে আরো অনেক খরচ আছে।

কৌশিক : দেড়দুই হাজার টাকা খরচ হয়ে যাবে।

প্রসেনজিৎ : আমি কাউকে ছোটো করতে চাচ্ছি না, কিন্তু ডিজিটাল হওয়ার পরে যে কেউ চলচ্চিত্র বানিয়ে ফেলছে। সেগুলো হয়তো একেবারেই দেখার মতো নয়। দর্শকের তো মনে হতেই পারে--দরকার নেই এই চলচ্চিত্র দেখার, তার চেয়ে বরং একটা ইংরেজি চলচ্চিত্র দেখি, হিন্দি দেখি বা অন্যকিছু দেখি। অতিরিক্ত চলচ্চিত্র কিন্তু আমাদের অ্যাফেক্টও করছে।

কৌশিক : আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে পোস্টার। খারাপ চলচ্চিত্রেরও পোস্টার আন্তর্জাতিক মানের হয় এবং ট্রেইলারও হয় অসামান্য। কিন্তু চলচ্চিত্র পাঁচ মিনিটও দেখা যায় না। লোকজন দুরন্ত ট্রেইলার দেখে প্রেক্ষাগৃহে চলে যায়, কিন্তু তারপরে রেগে যায়। মানে ডিজিটাল প্লাটফর্ম হওয়ায় র‌্যান্ডম চলচ্চিত্র হচ্ছে।

প্রসেনজিৎ : একশো থেকে একশো পাঁচটা চলচ্চিত্র! আমাদের সময় ৩০৩৫টা চলচ্চিত্র হতো বছরে। ২৫টা চলচ্চিত্রের নাম বলতে পারতাম আমরা। এখন একশো ১০টা চলচ্চিত্র হওয়ার পরে, যে কাউকে জিজ্ঞাসা করো, দেখবে গুনে গুনে তারা হয়তো সাতআটটা চলচ্চিত্রের নাম বলতে পারবে। আমার মতে, সেটা তো অ্যাভারেজ হিসেবে খারাপ।

অনিলাভ : কৌশিক দা আপনার চলচ্চিত্রের মধ্যে একটা সাবজেক্ট থাকে। কোনো একটা বিষয়কে ধরে নিয়ে আপনি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। তো চলচ্চিত্র করার সময় আপনার চিন্তায় কী থাকে? কোনটা আপনাকে ভাবায় সবার আগে? পুরস্কারের চিন্তা থাকে?

কৌশিক : দেখো আমার একটা পরিষ্কার পার্টিশান আছে। আর্ট হাউজ চলচ্চিত্র বলতে যা বোঝায়--ফেস্টিভালে যাওয়ার চলচ্চিত্র, যে চলচ্চিত্রের একটা নিজস্ব ভাষা আছে, যার মধ্যে কোনো গ্যালারি শো থাকে না--সেই ধরনের চলচ্চিত্র আমি বছরে একটা করে বানানোর চেষ্টা করি। যেমন, সিনেমাওয়ালা, অপুর পাঁচালি, আরেকটি প্রেমের গল্প, নগরকীর্তন এই ধরনের চলচ্চিত্রগুলো। তার পাশাপাশি কিন্তু আমি অন্য ধরনের চলচ্চিত্রও করেছি, যেমন, বিসর্জন, খাঁদ, বাস্তুশাপ, দৃষ্টিকোণ। যেগুলো পপুলার, যার মধ্যে গান থাকছে, নায়ক-নায়িকা থাকছে, প্রেম থাকছে মানে বাংলা চলচ্চিত্র যেমন হয় আরকি। আমি দুই রকম চলচ্চিত্র করারই চেষ্টা করি; আমার সীমিত ক্ষমতার মধ্যে যতোটা ভ্যারাইটি আনা যায়। দৃষ্টিকোণটা সেই মেজাজের চলচ্চিত্র। এখানে পুরো পরিবার নিয়ে এসে চলচ্চিত্র দেখা যাবে। সবাই পপকর্ন খেতে খেতে চলচ্চিত্রটা দেখবে, গল্প করবে, বেরিয়ে ঝগড়া করবে।

অনিলাভ : কোথাও না কোথাও একটা নগরকীর্তনও চাই আপনার?

কৌশিক : ওটা না হলে তো আমি বাঁচতে পারবো না, ওটা লাগবেই। যে চলচ্চিত্র দীর্ঘদিন থেকে যায় সেটাকে সিনেমা বলে। একটা দেশের ফিল্মের ইতিহাস আর সিনেমার ইতিহাস কিন্তু এক নয়। সিনেমা যদি না থাকে তাহলে ফিল্ম বাঁচবে না। আমি চাই সিনেমার ইতিহাসে প্রতিবছর আমার অন্তত একটা কন্ট্রিবিউশন থাক।

অনিলাভ : মানে নিজের চলচ্চিত্র।

কৌশিক : নিজের চলচ্চিত্র, কাছের চলচ্চিত্র। তবে এটার মানে এই নয় যে, দৃষ্টিকোণ আমার কাছের চলচ্চিত্র নয়। এটাও অত্যন্ত ভালোবেসে বানানো।

প্রসেনজিৎ : কিশোর কুমার জুনিয়রও খুব কাছের ওর।

কৌশিক : হ্যাঁ, খুব কাছের। পাশাপাশি বিসর্জন--আমি কখনো ভাবিনি বিসর্জন জাতীয় পুরস্কার পাবে, বাই চান্স পেয়ে গেছে। দৃষ্টিকোণও জাতীয় পুরস্কার পেয়ে যেতে পারে। চলচ্চিত্র বানানোর সময় তুমি হয়তো বাণিজ্যিকভাবে ভেবেছো, কিন্তু বানাতে বানাতে চলচ্চিত্রের মাউন্টিংটা যখন ভালো হয়ে যায় না, তখন তারও একটা কদর পাওয়া যায়।

অনিলাভ : জাতীয় পুরস্কার পেয়েও যেতে পারে। যাহোক বুম্বা দাকে এখানে নতুনভাবে দেখলাম। তার একটা চোখ নেই, পাথরের চোখ লাগিয়ে অভিনয় করে গেছেন।

কৌশিক : বিপদের কথা হলো, ডাক্তারবাবু শুনলে মেরেই ফেলবে। তিনি পরিষ্কার বলেছিলেন, আপনি কোনো বাড়াবাড়ি করবেন না। এখানকার কোনো লেন্সে হয়নি, বিদেশ থেকে লেন্স আনানো হলো। সেই লেন্সটা পরার পর কিছু দেখা যায় না। ডাক্তারবাবু বললেন, আপনি তাকিয়ে আছেন মানে দেখছেন। এই লেন্স দিয়ে চোখকে ব্লক করে দেড় ঘণ্টার বেশি লাগিয়ে রাখলে কিন্তু চোখের ইমিডিয়েট পাওয়ার বাড়তে শুরু করবে প্রতিদিন। শুধু তাই নয়, যদি ম্যাল হ্যান্ডেলিং হয় কোনোভাবেই, এটা কিন্তু ব্লাইন্ডনেসের পর্যায়ে চলে যেতে পারে। তাই এটা খুব সাবধানে অল্প সময়ের জন্য গ্যাপ দিয়ে দিয়ে ব্যবহার করবেন। আমাদের কি সেটা করা সম্ভব ছিলো, তুমিই বলো বুম্বা দা।

প্রসেনজিৎ : অল্প সময়ে আমরা কাজ করতে পারবো না; বাংলা চলচ্চিত্রে তো নয়ই।

কৌশিক : বুম্বা দা তো আমাদের বান্ধবী পাওলির বিয়েতে পর্যন্ত যেতে পারলো না। ইনফেকশন হয়ে চোখ ফুলে গিয়েছিলো।

প্রসেনজিৎ : বড্ড অভিমান করেছিলো বেচারি।

অনিলাভ : এটার জন্য তৈরি হতে হয়েছিলো, মানে চোখটার শুটিং-এর জন্য?

প্রসেনজিৎ : লেন্সটা পরতে হয়েছে, প্র্যাকটিস করতে হয়েছে।

কৌশিক : ভিডিও করতে হয়েছে; পরে দেখতে হয়েছে কী কী সংশোধন করা দরকার।

প্রসেনজিৎ : এটা একটা দুর্দান্ত অভিজ্ঞতা। অভিনয়শিল্পীদের না অনেক রকম অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এই চরিত্র করতে গিয়ে আমি জানলাম, দুটো চোখে না দেখলে মানুষের কী ধরনের কষ্ট হয়! দুটো চোখে একদম দেখতে পাচ্ছিস না, এমন দিন কাটিয়েছিস কখনো (অনিলাভকে উদ্দেশ করে)?

অনিলাভ : ভাবতেই পারছি না।

প্রসেনজিৎ : আমি কিন্তু কাটিয়েছি। অনেক দিন সাত থেকে ১২ ঘণ্টা আমাকে না দেখে থাকতে হয়েছে।

অনিলাভ : এটা তোমাকে ফিলও করতে হয়েছে।

প্রসেনজিৎ : আরে আমি তো দেখিইনি। চলচ্চিত্রের মধ্যে আমার যখন দুটো চোখই নষ্ট, আমি তো তখন দেখতামই না। বাস থেকে আমাকে ধরে ধরে নিয়ে আসতো ওরা। আবার শট্ শেষে ধরে ধরে নিয়ে গিয়ে বসাতো। আমি আগেই বলেছিলাম যে, নরমাল চোখে আমি মনিটরটাও করবো না। আমাকে খালি তোরা কোথায় কী আছে সেটা বলে ছেড়ে দে। যাতে আমার মধ্যে ওই ব্যাপারটা থাকে। তো আমি পাঁচ-সাত-আট দিন অনেকগুলো ঘণ্টা না দেখে থেকেছি।

অনিলাভ : এটা মূলত লেন্সের কারিকুরি?

প্রসেনজিৎ : একটা চোখ যখন খোলা, তখন তো দেখতে পাচ্ছিলাম। কিন্তু একটা সময় আমার দুটো চোখই অন্ধ ছিলো।

কৌশিক : কর্নিয়াটা কভার করে ফেলা হতো।

প্রসেনজিৎ : তখন আমি বুঝেছি চোখ না থাকার কষ্টটা। কয়েক ঘণ্টা না দেখে থাকা যায় না!

কৌশিক : ওই সময়টা খুব সাফোকেটিং লাগে।

অনিলাভ : চোখ বন্ধ করে ঋতুপর্ণার সঙ্গে অভিনয় করা যায়?

প্রসেনজিৎ : চোখ বন্ধ করে ঋতুর সঙ্গে অভিনয় করতে হয়নি।

কৌশিক : একটা চোখ আমরা অ্যালাও করেছি।

প্রসেনজিৎ : তবে শুটিং-এর প্রথম দিন একটা ইন্টারেস্টিং ঘটনা ঘটে। ঋতু আমার ফাইনাল লুকটা দেখেনি। শুটিং-এর সময় কেউ ছবি-টবি তুলে ফেললে তো ফার্স্টলুকটা প্রকাশ হয়ে যাবে। তো এটা এড়াতে সেদিন একটা কালো চশমা পরে আমি সেটে যাই। তো ঠিক যেসময় আমরা মনিটর করবো, আমি চশমাটা খুলে একটা সাধারণ চশমা চোখে লাগিয়েছি। ওটা দেখে, ঋতু ওয়াজ আউট। সে মনিটর করতে পারেনি। ও কৌশিককে ডেকে বলছে, আমি তাকাতে পারছি না। আসলে আমার চোখ দুটো ওর কাছে তো চেনা। অচেনা চোখের দিকে ও তাকাতে পারছে না। শি টুক টাইম। সেখানে তাকে পর পর শট্ দিতে হয়েছে চোখে চোখ রেখে, এটা কিন্তু কঠিন ছিলো। আর যদি তুমি কাউকে ভালোবাসো, তার একটি চোখ নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে তুমি কিন্তু ভালো চোখটার দিকেই তাকাবে। আর কৌশিক শট্ও নিয়েছে!

কৌশিক : যখন খুব ইনটিমেট কথা হচ্ছে, আমি শুধু একটা চোখেরই শট্ নিয়েছি। কারণ সে তো ওই চোখটার দিকে তাকিয়েই কথা বলছে। আর সেটা এতো ইনটেন্স, এতো নিবিড়! এটুকু আমি লিখে দিতে পারি, দর্শক প্রসেনজিৎ-ঋতুপর্ণাকে এতো ঘনিষ্ঠ মুহূর্তে, এতো নিবিড় সম্পর্কের মধ্যে কখনো দেখেনি।

অনিলাভ : এরপর ঋতুপর্ণা আর প্রসেনজিতের কোন চলচ্চিত্র?

প্রসেনজিৎ : আচ্ছা, ঋতুর সঙ্গে একটা আড্ডায় বসবো না আমরা?

অনিলাভ : বসা তো উচিত।

প্রসেনজিৎ : তাহলে তখনকার জন্যে কিছু বাকি রাখ।

অনিলাভ : কিন্তু তোমাদের পাওয়া যাবে তো ২৭ তারিখের আগে?

প্রসেনজিৎ : হ্যাঁ হ্যাঁ, অনেক আগে আসবো।

অনিলাভ : ভালোবাসা নিয়ে চলচ্চিত্র তো আপনার কাছ থেকে পাই-ই আমরা। কিছুদিন আগে আমি আপনার একটা টুইট দেখছিলাম, আসিফাকে (কাশ্মিরে গণধর্ষণের শিকার আট বছরের শিশু আসিফা) নিয়ে আপনি লিখেছিলেন। হিন্দি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি থেকেও আমরা দেখছিলাম, অনেকেই এই ব্যাপারটা নিয়ে লেখালেখি করছে।

প্রসেনজিৎ : আমরাও টুইট করেছি, সবাই করেছে।

অনিলাভ : তো চলচ্চিত্রে এই প্রতিবাদগুলো করা যায় না?

কৌশিক : দেখো, এক দলের মানুষ আছে যারা সাম্প্রতিক বিষয়গুলোর ওপর চলচ্চিত্র নির্মাণ করে। আমি তো বলবো আসিফার পাশাপাশি যখন শিবুর হামি রিলিজ হবে, সেটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ সেগমেন্ট হয়ে দাঁড়াবে। একটা ছোটো বাচ্চা মেয়ের ওপর নির্যাতনকে আমরা কোন লেভেলে নিয়ে গেছি। বা কী পরিমাণে ইনসিকিউরিটি জমা করেছি, এটা কিন্তু এই চলচ্চিত্রেও বেরোবে। এ ঘটনা কিন্তু অহরহ হচ্ছেই।

আমরা যেমন একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ সোশ্যাল স্টেটমেন্ট করছি নগরকীর্তন-এ। ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পাওয়া মানে কিন্তু একটা পুরো কমিউনিটি পুরস্কারটা পাচ্ছে ওয়ার্ল্ড ওয়াইড। তারা দিনরাত কষ্ট করছে, স্ট্রাগল করছে। তারা নাকি এখনো ক্রিমিনাল!

প্রসেনজিৎ : দৃষ্টিকোণ-এও তো আছে। সেখানে খুবই সুন্দর একটা সংলাপ আছে আমার--প্রত্যেকদিন কতো চোখ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, বলো তো। পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। আমার বউ এসে আমাকে বলছে, তোমার আরেকটা চোখ এসে গেছে, তুমি কি অপারেট করবে? আমি না বলে দিচ্ছি। আমি একটা চোখে তো অন্তত দেখতে পাচ্ছি। আরেকটা চোখ আরেকটা মানুষের কাজে লাগবে। এটাও তো মেসেজ।

অনিলাভ : পরশু যে র‌্যালি হলো, সেটা একটা মেসেজ বহন করে। চলচ্চিত্রটাও তো এ রকমই একটা মেসেজ বহন করে, তাই না?

কৌশিক : আমরা হাইলাইট করছি না, বাট ইট ইজ দেয়ার। নইলে প্রবন্ধের মতো লাগবে।

প্রসেনজিৎ : মানে চলচ্চিত্রে আমরা জ্ঞান দিচ্ছি না। কিন্তু জ্ঞান সেখানে এমনিতেই আছে।

কৌশিক : জ্ঞান জিনিসটা পাচনের মতো, একটা ভালো কিছুর সঙ্গে মিশিয়ে খাইয়ে দিলে ভালো হয়। আমরা পাচনটা খাইয়েছি প্রেমের মধ্য দিয়ে। যেমন, আমরা ছোটদের ছবি করেছি--ডোয়ার্ফদের ক্রিটিকাল সমস্যা নিয়ে এই চলচ্চিত্র। সেটাকে পার করেছি একটা মিষ্টি প্রেমের গল্পের মধ্য দিয়ে। আজকে রাস্তায় দেখলে ওদের আর কেউই টিটকিরি দেয় না।

প্রসেনজিৎ : অসাধারণ একটা চলচ্চিত্র!

অনিলাভ : দাদা আমাদের শেষ করতে হবে, ক্যামেরার পিছন থেকে চাপ আসছে। তো শেষ যে কথা বলবো, আপনার চলচ্চিত্রের একটা গান খুব হিট করেছে--আমি কি তোমায় খুব বিরক্ত করছি?

প্রসেনজিৎ : তাতে তুই আনন্দিত নাকি দুঃখিত?

অনিলাভ : না না, আমি খুব আনন্দিত। তো কৌশিক দা আমার প্রশ্ন হচ্ছে, আপনার জীবনে কি এমন কোনো মুহূর্ত আছে, যেখানে বলতে ইচ্ছে হয়েছে--আমি কি তোমায় খুব বিরক্ত করছি?

কৌশিক : আমি জীবনে এই প্রশ্ন কাউকে করতে পারলাম না। অনেক রোমাঞ্চকর জিনিসই জীবনে করতে পারিনি, সেই ফ্রাস্টেশনগুলো চলচ্চিত্রের মাধ্যমে অন্যদের দিয়ে ঘটিয়ে নিয়েছি।

অনিলাভ : বুম্বা দা তোমার?

প্রসেনজিৎ : আমার তো অগণিত। আমারটা ছেড়ে দে, ওটা নিয়ে পুরো একটা এপিসোড করতে হবে। আমার বইটা পড়িসনি? এখন আমার যেটা ভালো লাগে সেটা শোন। সারাদিনে আমি একশোটা হোয়াটস্ অ্যাপ পাচ্ছি, তার মধ্যে ৮০টায় লেখা আছে, আমি কি তোমায় খুব বিরক্ত করছি। এমনকি আমার ফ্যান ক্লাবগুলো যখন টুইট করছে, তারাও লিখছে, আমি কি তোমায় খুব বিরক্ত করছি। আমাকে আমার মতো থাকতে দাও--একসময় হয়েছিলো না? ছেলেও মাকে বলে, আমাকে আমার মতো থাকতে দাও।

কৌশিক : ২৭ তারিখে দর্শক যখন চলচ্চিত্রটা দেখবে, আমি তাদের কথা দিতে পারি, আমরা কিন্তু আপনাদের বিরক্ত করবো না। এবং সবাই ওই গানটাও গাইতে গাইতে ফিরবে--আমার দুঃখগুলো কাছিমের মতো/ গুটি গুটি পায়ে আর এগোতে পারে না।

 

ভূমিকা ও অনুলিখন আলি আহমেদ নিশান

বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ১৮তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২০ এ প্রকাশিত হয়েছে।

 

 

 

 

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন