Magic Lanthon

               

নাঈম রেজা

প্রকাশিত ১৫ আগস্ট ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

বগুড়ার প্রেক্ষাগৃহ

পর্দাগুলো হারিয়েছে বহুদিন এখন নামধামও অজানা

নাঈম রেজা


আলোচনা হোক উত্তরণের পথে

চলচ্চিত্র এমন এক যৌগিক শিল্পমাধ্যম, যেখানে জীবনের খুব কাছাকাছি যাওয়া যায়। অবশ্য গল্প-উপন্যাসেও সেটা সম্ভব, তবে সেখানে পাঠককে কল্পনার আশ্রয় নিতে হয়। দৃশ্যগত মাধ্যম চলচ্চিত্রে কল্পনার সুযোগ কম থাকে। মাধ্যম হিসেবে এটি চলচ্চিত্রের ইতি-নেতিবাচক দিকও। যদিও চলচ্চিত্রের ইতিহাস বেশি দিনের নয়; তা সত্ত্বেও চলচ্চিত্র জনপ্রিয়তায় সব মাধ্যমকে ছাড়িয়ে গেছে। সেটা ঘটেছে কেবল মাধ্যম হিসেবে জীবনের খুব কাছাকাছি থাকার ওই গুণটির কারণে। আর এই গুণটি সফলভাবে প্রয়োগ হয় প্রেক্ষাগৃহে। যেখানে চলচ্চিত্র ম্যাজিক হিসেবে হাজির থাকে। প্রেক্ষাগৃহের অন্ধকার ঘরের সেই ম্যাজিকই চলচ্চিত্রকে জীবনের কাছাকাছি নিয়ে যায়। গত দুই দশকে বাংলাদেশে সেই ম্যাজিক দেখাবার ঘর মানে প্রেক্ষাগৃহ ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। বন্ধ হয়ে গেছে দেশের বেশিরভাগ প্রেক্ষাগৃহ। এই রকম একটা পরিস্থিতিতে বিভিন্ন জেলার প্রেক্ষাগৃহ নিয়ে এই আলোচনার অবতারণা করা হয় বেশ কয়েক বছর ধরে।


সংখ্যা ১৭-তে নাটোরের প্রেক্ষাগৃহ নিয়ে লেখা হয়, তারই ধারাবাহিকতায় এবার বগুড়ার প্রেক্ষাগৃহ নিয়ে এই প্রবন্ধ। বগুড়ার প্রেক্ষাগৃহ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে সন্ধান পাওয়া যায় দেশের পুরনো প্রেক্ষাগৃহগুলোর একটি উত্তরার। কাজী নজরুল ইসলাম অভিনীত চলচ্চিত্র ধ্রুব (১৯৩৪)-এর বিজ্ঞাপনেও উত্তরার নাম ছিলো। পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে এ রকম প্রায় নয়টি প্রেক্ষাগৃহ গড়ে ওঠে বগুড়া সদরে--মেরিনা, মাধু, মেট্রো, বাম্বী, সোনিয়া, মধুবন, মাসুম, বীথি। তবে চলচ্চিত্র গবেষক অনুপম হায়াৎ-এর বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস গ্রন্থে আরো একটি প্রেক্ষাগৃহের নাম পাওয়া যায়--মিনার। এটি নাকি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো গত শতাব্দীর ৩০-এর দশকের শেষের দিকে। কিন্তু বগুড়ায় সরেজমিন খুঁজে এ নামে কোনো প্রেক্ষাগৃহ পাওয়া যায়নি। অবশ্য এমন হতে পারে প্রেক্ষাগৃহটির নাম পরিবর্তন হয়েছে। তবে সে ধরনের কোনো তথ্যও পাওয়া যায়নি।


উত্তরায় অতীত খোঁজা


জুলাই মাসে একটা কাজে গাইবান্ধায় গিয়েছিলাম। যেহেতু আগে থেকেই বগুড়ার প্রেক্ষাগৃহ নিয়ে লেখার কথা চিন্তা করে রেখেছিলাম, তাই পরিকল্পনা করি গাইবান্ধা থেকে ফেরার পথে বগুড়ায় নেমে প্রেক্ষাগৃহগুলো সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে যাবো। এদিকে বগুড়া শহর সম্পর্কে খুব একটা জানাশোনা নেই, তাই বগুড়ায় বাড়ি পরিচিত এমন এক বড়োভাইকে জানিয়ে রেখেছিলাম। তবে আমাদের সময় পত্রিকা থেকে আগেই জেনেছিলাম উত্তরা নামে বগুড়ায় অনেক পুরনো একটি প্রেক্ষাগৃহ ছিলো শহরের সাতমাথায়। প্রথম দিন ওই প্রেক্ষাগৃহের জায়গায় যাওয়ার পরিকল্পনা করি। গাইবান্ধা থেকে বাসে বগুড়ায় এসে রেলগেইটে নেমে বড়োভাইয়ের কথা অনুযায়ী রিকশায় শহরের সাতমাতায় পৌঁছাই; এবং তাকে সঙ্গে নিয়েই উত্তরা সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা করি। শুরুতেই এক দোকানদারের কাছে উত্তরা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সাতমাথা থেকে বগুড়া সদর থানার দিকের এগোলে সেন্স বেরি পাবেন, ওটাই উত্তরা সিনেমাহল ছিলো।


উত্তরার ধ্বংসপ্রায় ভবনটি


তার কথা অনুযায়ী রাস্তা ধরে সামান্য এগিয়ে গিয়ে সেন্স বেরি লেখা সাইনবোর্ড পেয়ে যাই। এটা মূলত একটা ডিপার্টমেন্টাল স্টোর। পুরনো একটি ভবনের পরিত্যক্ত অংশে নির্মাণ করা হয়েছে দুটি রাজনৈতিক দলের কার্যালয়, স্কাউট ক্লাব আর সঙ্গে সেন্স বেরি। ভবনটির সীমানা প্রাচীর লাগোয়া কিছু জুতো-স্যান্ডেলের দোকানও রয়েছে। সেসব দোকানের একটিতে বসা মধ্য বয়সি এক দোকানির কাছে প্রেক্ষাগৃহটি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পরিত্যক্ত এই বিল্ডিংটাই উত্তরা সিনেমাহল। এর মালিক বাবলু সাহেব। সামনের এ বড়ো রাস্তাটা হওয়ার সময় যখন ভাঙাভাঙি শুরু হয়, তখনই এটা বন্ধ হয়ে গেছে। সেটাও প্রায় ১৮-১৯ বছর হয়ে গেছে। জায়গাটি নিয়ে অনেকগুলো মামলা চলার কথাও ওই দোকানদার জানান। তার ভাষায়, এটা হলো সরকারি জায়গা; একশো বছরের জন্য লিজ নেওয়া ছিলো। এখন শেয়ার নিয়ে অনেকগুলো মামলা চলছে, তাই সিনেমাহলটা বন্ধ হয়ে গেছে। মালিক বাবলু সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান,--প্রেক্ষাগৃহটির মূল মালিক ডা. হবিবুর রহমান। তিনি অনেক আগেই মারা গেছেন। তার ছেলে মাহবুবুর রহমান বাবলু এখন মালিক। বাবলু পুরো পরিবারসহ ঢাকায় থাকেন। কালেভদ্রে আসেন। ওই দোকানির তথ্য মতে, হবিবুর রহমান ছাড়াও আরো কয়েকজন অংশীদার আছে। প্রেক্ষাগৃহটি সম্পর্কে এর বেশি তথ্য সেদিন সংগ্রহ করতে পারিনি।


দ্বিতীয়বার বগুড়ায় গিয়ে উত্তরার সামনের ফুটপাতের ওই দোকানিদের সঙ্গে কথা বলে প্রথমে মাহবুবুর রহমান বাবলুর বাড়ির ঠিকানা নিই। এরপর বগুড়া শহরের বাদুড়তলায় বাবলুর বাড়ির খোঁজে যাই। সেখানে গিয়ে স্থানীয় এক দোকানদারের সঙ্গে কথা বলে বাবলুর বাড়ির খোঁজ পাই। তবে ওই দোকানদার জানান, বাবলুকে এখন পাওয়া সম্ভব নয়, কারণ তিনি দেশের বাইরে আছেন। এরপর বাবলুর বাড়ির কারো সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে সেদিনের মতো ফিরে আসি। এরপর তৃতীয়বার বগুড়ায় গিয়ে আবারও বাবলুর বাড়িতে তার খোঁজে যাই। এবার তার বাড়িতে কাজ করা এক নির্মাণ শ্রমিক জানান, মালিকের ব্যাপারে তারা কিছু জানে না। বাড়ি লাগোয়া একটি দোকানে খোঁজ নিতে গেলে তিনি জানান, বাবলু কানাডায় আছেন, ফিরবেন পাঁচ-ছয় মাস পরে। ফলে সেদিনও ফিরে আসতে হয়।


তবে এবার উত্তরা নিয়ে জানার জন্য ভিন্ন পথে হাঁটি। যোগাযোগ করি বগুড়া জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি তৌফিক হাসান ময়নার সঙ্গে। তিনি উত্তরা’ সম্পর্কে খুবই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন। তৌফিক জানান, তার কাছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম নির্মিত ও অভিনীত ধ্রুব (১৯৩৪) চলচ্চিত্রটির একটি বিজ্ঞাপন আছে। সেই বিজ্ঞাপনে যেসব প্রেক্ষাগৃহের কথা উল্লেখ আছে, তার মধ্যে উত্তরার নামও রয়েছে। এই তথ্য পাওয়ার পর প্রেক্ষাগৃহটি নিয়ে আগ্রহ বেড়ে যায়। কথা বলি চলচ্চিত্র গবেষক অনুপম হায়াতের সঙ্গে। তিনি জানান, তার কাছে কাজী নজরুল ইসলাম পরিচালিত ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে ২ এপ্রিল মুক্তি পাওয়া বিদ্যাপতি চলচ্চিত্রের একটি বিজ্ঞাপন আছে। নবশক্তি পত্রিকায় প্রকাশিত সেই বিজ্ঞাপনে ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যান্য প্রেক্ষাগৃহের সঙ্গে উত্তরারও নাম আছে। এই দুটো তথ্য থেকে বুঝতে কষ্ট হয় না উত্তরা দেশের পুরনো প্রেক্ষাগৃহগুলোর একটি। এবং যা ১৯৩৮ কিংবা এর আগে প্রতিষ্ঠিত। তবে দুঃখের বিষয় হলো, পুরনো এই প্রেক্ষাগৃহটি সম্পর্কে বিশেষ কোনো তথ্য কোথাও নেই।

বিদ্যাপতি (১৯৩৮) চলচ্চিত্রের বিজ্ঞাপন



খোঁজ পাওয়া যায়নি মেরিনা


উত্তরা, মেরিনা, মাধু, মেট্রো এ প্রেক্ষাগৃহগুলোর অবস্থান শহরের সাতমাথায় প্রায় পাশাপাশি। তাই প্রথম দিন গিয়ে একসঙ্গেই প্রেক্ষাগৃহগুলো সম্পর্কে খোঁজ নিতে পেরেছিলাম। একমাত্র উত্তরা ছাড়া বাকি প্রেক্ষাগৃহগুলো এখন বহুতল বিপণিবিতান। উত্তরার পুরো কাঠামোটি এখন আর নেই। মেরিনা এখন নদী-বাংলা কমপ্লেক্স নামে বহুতল বিপণিবিতান। যতোদূর জানা যায়, মেরিনাও বগুড়ার পুরনো প্রেক্ষাগৃহগুলোর একটি। সংবাদপত্রের একটি প্রতিবেদন থেকে প্রেক্ষাগৃহটি সম্পর্কে আগেই কিছু তথ্য পেয়েছিলাম--


৪০ দশকে বগুড়া এডওয়ার্ড পার্কে ড্রামাটিক হল নির্মিত হয়। শহরের বিনোদনের একমাত্র জায়গা ছিলো ওই হলটি। সেখানে বাংলাদেশ ও কলকাতার নাটক, যাত্রা মঞ্চস্থ হতো। পরে ব্রিটিশ রেলের উর্ধ্বতন ইঞ্জিনিয়ার এম এ খান ভাড়া নিয়ে মেরিনা সিনেমাহল চালু করেন। এরপর মেরিনা সিনেমাহল শহরের সাতমাথায় নিজস্ব জায়গায় স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে সিনেমাহলটি বন্ধ ঘোষণা করে সেখানে নির্মিত হয়েছে নদী-বাংলা কমপ্লেক্স নামের বহুতলবিশিষ্ট বিপণিবিতান।


মেরিনা সম্পর্কে এটুকু তথ্যই ছিলো। প্রথম যেদিন বগুড়ায় যাই সেদিন শুক্রবার হওয়ায় প্রায় সব দোকানই বন্ধ ছিলো। সেজন্য বিপণিবিতানের আশপাশের লোকজন ও ভিতরে যাদের পেয়েছিলাম তাদের অনেককেই মেরিনা ও এর প্রতিষ্ঠাতা এম এ খান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করি। কিন্তু কেউই কোনো তথ্য দিতে পারছিলো না। তাই বিপণিবিতানের কয়েকটি ছবি তুলে মেরিনা যেখানে প্রথম প্রতিষ্ঠা করা হয় সেই ড্রামাটিক হল দেখতে যাই। সেখানেও প্রেক্ষাগৃহটি সম্পর্কে কেউ কিছু বলতে পারেনি। তাই সেদিনের মতো খালি হাতেই ফিরতে হয়।


দ্বিতীয় দিন বগুড়ায় গিয়ে নদী-বাংলা কমপ্লেক্সর ব্যবস্থাপকের খোঁজ করি। এক দোকানদার জানান, ভবনের চারতলায় তার অফিস রয়েছে। সেখানে গিয়ে অফিসে যোগাযোগ করলে অশ্রু নামের একজনের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, প্রেক্ষাগৃহটি বন্ধ হওয়ার দীর্ঘদিন হয়ে গেছে। আর তিনি প্রেক্ষাগৃহের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না, তাই এ সম্পর্কে কিছু জানেন না। তবে তিনি বগুড়ার সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব তৌফিক হাসান ময়নার ফোন নম্বর দেন, যিনি নাকি মেরিনা সম্পর্কে তথ্য দিতে পারবেন। এদিকে বেলা গড়িয়ে দুপুর হয়ে গেছে। সময়টা কাউকে ফোন দেওয়ার জন্য উপযুক্ত নয়। তারপরও অশ্রুর দেওয়া নম্বরে ময়নার সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি এক ঘণ্টা পরে বগুড়ার দৈনিক করতোয়ার অফিসে দেখা করতে বলেন। হাতে এক ঘণ্টা সময় থাকায় এই সুযোগে দুপুরের খাবার সেরে নিয়ে রওনা হই দৈনিক করতোয়ার অফিসের উদ্দেশে। সেখানে গিয়ে দেখা হয় ময়নার সঙ্গে। পরিচয় দিয়ে মেরিনা সম্পর্কে জানতে চাই তার কাছে। কিন্তু তিনিও প্রেক্ষাগৃহটি সম্পর্কে তেমন কোনো তথ্য দিতে পারেন না। তবে তিনি জানান, যতোদূর মনে আছে ৭০ দশকের শেষের দিকে মেরিনায় একবার আগুন লাগে এবং এক মাস বন্ধ থাকে। তার তথ্য মতে, এ ঘটনাটি নাকি পরিকল্পিত ছিলো। ময়না আরো জানান, এম এ খানের এক মেয়ে আছে এবং তার সঙ্গে তিনি যোগাযোগ করিয়ে দিতে পারবেন। তাই পরের বার বগুড়ায় আসলে যেনো তাকে কয়েক দিন আগে জানিয়ে আসি।


তৃতীয়বার যাওয়ার আগে ময়নাকে জানিয়ে বগুড়ায় গিয়েছিলাম। বগুড়ায় পৌঁছে ময়নাকে ফোন দিলে তিনি জানান, মেরিনা বন্ধের আগে এটি দেখাশোনা করতেন এম এ খানের নাতি রনি। নদী-বাংলা কমপ্লেক্সের তিনতলায় রনির অফিস। সেখানে গিয়ে তার সঙ্গে কথা বললেই কাজ হতে পারে। তার দেওয়া তথ্য মতো যাই রনির অফিসে। সেখানে গিয়ে আবার দেখা হয় অশ্রুর সঙ্গে। এবার অবশ্য অশ্রু জানান, রনি ভিতরে মিটিং করছেন, কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। মিনিট ২০ পরে অশ্রু ভিতরে ঢুকতে বলেন। ভিতরে ঢুকলে অশ্রুই পরিচয় করিয়ে দেন রনির সঙ্গে। পরিচয় শেষে মেরিনা নিয়ে কথা বলতে চাইলে রনি জানান, তিনি সারাদিন গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যস্ত থাকবেন, তাই অন্য সময় আসতে হবে এবং আসার আগে যেনো জানিয়ে আসি। রনি তার ফোন নম্বর না দিয়ে অশ্রুর ফোন নম্বর দেন। পরে চতুর্থবারের মতো বগুড়ায় যাওয়ার আগেই অশ্রুর সঙ্গে যোগাযোগ করতে থাকি, কিন্তু তিনি রনির সঙ্গে আমার সাক্ষাতের কোনো ব্যবস্থা করতে পারেননি। তবুও দেখা পাওয়ার আশা নিয়ে যাই বগুড়াতে; চেষ্টা করি আমার আয়ত্তের মধ্যে থাকা প্রায় সবরকম পথেই।


শেষ পর্যন্ত দুপুর ১২টার পরে রনি অফিসে আসবে বলে জানান তার ম্যানেজার শহিদুল। তাই ১২টা থেকেই অপেক্ষা করতে থাকি রনির অফিসের সামনে; কিন্তু দেড়টা বেজে গেলেও আর রনি অফিসে আসেননি। এদিকে মাধুমেট্রোর মালিক ইকবাল হোসেনের ছোটো ছেলে ইমনের সঙ্গে আগে থেকে ঠিক করে রাখা সময়ও চলে আসে। তাই সেখানে আর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে রনির সঙ্গে কথা না বলেই বাধ্য হয়ে রওনা দিতে হয় মাধুর উদ্দেশে।


মিশন মাধুমেট্রো


শহরের সাতমাথায় অবস্থিত মাধুমেট্রো প্রেক্ষাগৃহ দুটি এখন মাধু-মেট্রো টাওয়ার নামে বহুতল বাণিজ্যিক ভবন। প্রথম দিন বগুড়ায় গিয়ে শুধু ভবনটির ছবি ও সামনে বসে থাকা ফুটপাতের দোকানদারের সঙ্গে কথা বলি। কিন্তু তারা প্রেক্ষাগৃহটি সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে পারেনি। দ্বিতীয় দিন সেখানে গিয়ে ভবনটির নিচতলায় থাকা গ্যারেজে কাজ করা মধ্য বয়সি আ. রশিদের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, ভবনটির মালিক চার ভাই--পুটু হাজী, জাকির, শাওন ও ইমন। পুটু হাজী এখন অসুস্থ, তিনি চিকিৎসার জন্য ভারতে আছেন। বাকি ভাইদের মধ্যে শুধু ইমন-ই নিয়মিত অফিসে আসে আর বাকি দুজন দিনে একেকবার এসে খোঁজ নিয়ে যায়। প্রেক্ষাগৃহ সম্পর্কে কে তথ্য দিতে পারবে জানতে চাইলে তিনি জানান, এটি পরিচালনা করতেন পুটু হাজী, তবে অন্যান্য ভাইয়েরাও যুক্ত ছিলেন। এখন ইমনের সঙ্গে কথা বলা যেতে পারে। এদিকে ইমন দুপুরের পরে অফিসে আসেন, তাই দুপুরের পর আসতে বলেন রশিদ।


তিনটার দিকে ইমনের খোঁজে গিয়ে দেখা হয় গ্যারেজের দায়িত্বে থাকা জাহাঙ্গীরের সঙ্গে। রশিদের খোঁজ করলে তিনি জানান, তার ডিউটি শেষ। ফলে জাহাঙ্গীরকে পরিচয় দিয়ে ইমন এসেছে কি না জানতে চাই। তখনো ইমন আসেনি। এরপর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে তার আসার কোনো সম্ভাবনা না দেখে সেদিনের মতো ফিরে আসতে হয়।


তৃতীয়বার বগুড়ায় গিয়েও দেখা হয়নি চার ভাইয়ের কারো সঙ্গেই। তবে এবার ইমনের ফোন নম্বর দিতে রাজি হন জাহাঙ্গীর। এবং রাত ১১টার পরে তাকে ফোন দেওয়ার শর্ত দেন। চতুর্থবার বগুড়ায় যাওয়ার আগে ফোনে বেশ কয়েকবার ইমনের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। তিনি তার অফিসে আসতে বলেন। বগুড়ায় গিয়ে তার কথামতো যোগাযোগ করলে তিনি আসতে বলেন দুপুরের খাবার পর। সে অনুযায়ী দুপুর দুটো নাগাদ সেখানে যাই, ইমন অবশ্য তখনো আসেননি। তবে কাকতালীয়ভাবে পেয়ে যাই চার ভাইয়ের মধ্যে দ্বিতীয় জাকিরকে। মূলত জাহাঙ্গীরের কাছে ইমনের খোঁজ করলে তিনি জানান, ইমন আসেনি তবে জাকির অফিসে আছে। জাকিরের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে জাহাঙ্গীর জানায়, তিনি কাজ করছেন, বের হলে সে কথা বলিয়ে দিবে। কিছুক্ষণ পরে জাকির বের হলে জাহাঙ্গীর আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। পরিচয় শেষে পাশে থাকা চেয়ারে বসেই কথা শুরু হয় জাকিরের সঙ্গে।


কথা বলার প্রথম দিকে প্রেক্ষাগৃহ কখন প্রতিষ্ঠা হয়, কে প্রতিষ্ঠা করেন এ রকম ছোটো ছোটো আলোচনার একপর্যায়ে জাকিরের কাছে জানতে চাই মাধু প্রতিষ্ঠার পিছনের গল্প। জাকির জানান, তার বাবা ইয়াকুব আলী একসময় উত্তরা প্রেক্ষাগৃহে মেশিন অপারেটর হিসেবে কাজ করতেন। আর সেখান থেকেই তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন নিজের একটা প্রেক্ষাগৃহের। জাকির বলেন, বাবার ইচ্ছা ছিলো নিজের সিনেমাহল বানানোর, তাই তিনি খেয়ে না খেয়ে কোনো শেয়ার ছাড়াই ১৯৭২ সালে মাধু প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ছেলে-মেয়েদের মধ্যে মেয়ে মাধুকেই বেশি ভালোবাসতেন ইয়াকুব, তাই মেয়ের নামেই প্রেক্ষাগৃহের নামকরণ করেন তিনি। জাকির আরো বলেন, যখন থেকে বুঝতে শিখলাম তখন থেকেই দেখি বাবা সিনেমাহলে কাজ করেন। আর আমার ছিলো ঘুরে বেড়ানো শখ। অল্প বয়সেই আমি বাংলাদেশ ঘুরে ফেলেছিলাম। তখনই দেখেছিলাম সিনেমাহল এদেশের মানুষের একমাত্র বিনোদন কেন্দ্র। এদিকে ১৯৮৩-তে বাবা মারা গেলেন। তখন আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামের ইতিহাসের প্রথম বর্ষের ছাত্র। বড়োভাই একা ব্যবসা সামলাতে পারছে না। তাই ব্যবসা দেখতে গিয়ে আর বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া হলো না। এখানেই ডিগ্রিতে ভর্তি হয়ে ব্যবসায় জড়িয়ে গেলাম।


জাকির জানান, প্রথমে মাধু ছিলো; ব্যবসা ভালো হওয়ায় এর পরিসর বাড়ানোর চিন্তা করা হয়। এ চিন্তা থেকেই ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে মাধুর উপরে মেট্রো প্রতিষ্ঠা করা হয়। শুধু মেট্রো নয়, পরের বছর ১৯৮৭-তে শিবগঞ্জে তারা সাথি নামে আরো একটা প্রেক্ষাগৃহ প্রতিষ্ঠা করে। ৮০র দশকে অবশ্য সারা বাংলাদেশেই প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণের ঝোঁক লক্ষ করা যায়। সরকারি সিদ্ধান্ত এবং অন্যান্য নানা কারণে সেসময় সারাদেশে প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা বেড়ে যায়। ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে যেখানে প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা ছিলো দুইশো ৯৮টি, ১৯৯০-এ এসে সেই সংখ্যা দাঁড়ায় সাতশো ৬৭টি।


জাকিরের কাছে জানতে চাই প্রেক্ষাগৃহ দুটো বন্ধ করা হলো ঠিক কখন? তিনি জানান, ১৯৯৪-১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দের দিকে বর্তমান ভবনের সামনে কাজী নজরুল ইসলাম সড়ক নির্মাণের সময় প্রেক্ষাগৃহটির সামনের অংশ ভেঙে ফেলা হয়, তখনই মেট্রো বন্ধ হয়ে যায়। তবে তখনো চলচ্চিত্রের ব্যবসা ভালো থাকায় ভবনটি মেরামত করে মাধু চালু রাখা হয়। ২০০০ খ্রিস্টাব্দের পর ধীরে ধীরে চলচ্চিত্রের ব্যবসা খারাপ হতে থাকলে মাধুও ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ২০০৬-এ প্রেক্ষাগৃহটি একেবারে ভেঙে ফেলা হয় এবং ২০০৮-এ নতুন কাজ শুরু হয় বর্তমান ভবন নির্মাণের। জাকির জানান, মাধুতে সর্বশেষ ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র হলো মনের মাঝে তুমি (২০০৩), এটি সেসময় টানা তিন মাস চলেছিলো।


নবাব পরিবারের হাত ধরে বাম্বী


বগুড়ায় প্রথমবার গিয়েই বড়োভাইকে সঙ্গে নিয়ে শহরের সাতমাথা থেকে রওনা হই বাম্বীর উদ্দেশে। করতোয়া নদীর পাশ ঘেঁষে অবস্থিত একসময়ের রমরমা প্রেক্ষাগৃহ বাম্বীর এখন অবশিষ্ট আছে সামান্যই। ভবনের বেশিরভাগটাই ভেঙে নির্মাণ করা হয়েছে বহুতল ভবন। প্রেক্ষাগৃহের যে অংশটুকু অবশিষ্ট আছে সেটা এখন গ্যারেজ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সেই স্থাপনার গায়ে এখনো দুই-এক জায়গায় টিকিট কাউন্টারের নাম ... স্টল, ডি সি লেখা রয়েছে। শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় সেখানে দায়িত্বে থাকা এক প্রহরীকে ছাড়া তেমন আর কাউকে দেখা গেলো না। কথা হয় সেই প্রহরীর সঙ্গেই। তিনি জানান, বাম্বী অনেক দিন আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। ছুটির দিন ছাড়া অন্য দিনে আসলে মালিক কিংবা ব্যবস্থাপকের সঙ্গে কথা বলা যেতে পারে বলে জানান তিনি।


বাম্বি এখন গ্যারেজ


দ্বিতীয়বার বগুড়ায় গিয়ে বাম্বীতে যাই, এবার সঙ্গে ছিলো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের এক ছোটোভাই আসিফ ইমরান। ওর বাড়ি বগুড়া শহরে; একটা কাজে ও বাড়িতেই ছিলো। ফোনে কথা বলে কাজের খানিকটা সুবিধার জন্যই ওকে আমার সঙ্গে থাকতে বলেছিলাম। বাম্বীতে গিয়ে আবারও দেখা হয় সেই প্রহরীর সঙ্গে। তিনি জানান, ভবনের পাঁচতলায় অফিস, সেখানে গেলে ব্যবস্থাপকের সঙ্গে কথা বলা যাবে। তার কথা অনুযায়ী ব্যবস্থাপককে পেয়ে যাই। নাম মো. তৌহিদুল ইসলাম। পরিচয় দিয়ে কথা বলতে চাইলে ভিতরে বসতে বলেন। হাতের কাজ করতে করতেই তৌহিদুলের সঙ্গে কথা শুরু হয়ে যায়। তিনি আগে বাম্বীর বুকিং ক্ল্যার্ক ছিলেন। তৌহিদ জানান, প্রেক্ষাগৃহটি ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে জানুয়ারিতে একেবারে বন্ধ করে দেওয়া হয়। এটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বগুড়ার নবাব পরিবারের সদস্যরা। সেসময় মোহাম্মাদ আলী, ওমর আলী চৌধুরীসহ আরো অনেকে প্রেক্ষাগৃহটি পরিচালনা করতো। তারপর ১৯৯১-১৯৯২ এর দিকে তারা এটি বিক্রি করে দেয়। তৌহিদুলের ভাষায়, তারা ঠিক কেনো এটা বিক্রি করেছিলেন জানা যায় না, জমিসহ সিনেমাহলটা কিনে নেন আলহাজ্ব শেখ শরিফ উদ্দীনের স্ত্রী দেলোয়ারা বেগম। বর্তমানে শেখ শরিফ উদ্দীনের পাঁচ মেয়ে এর মালিক। প্রেক্ষাগৃহের সঙ্গে নবাব পরিবারের সম্পর্ক নিয়ে পরে খোঁজাখুঁজি করেও তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।


বাম্বীর জায়গায় এখন যে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ হচ্ছে, তাতে নতুন করে প্রেক্ষাগৃহ প্রতিষ্ঠার কোনো পরিকল্পনা আছে কি না জানতে চাই তৌহিদুলের কাছে। তিনি বলেন, শহরে একসময় সাতটা সিনেমাহল ছিলো, এখন কোনো রকমে একটা চলছে। তবে এখন একটা সিনেপ্লেক্সের কাজ চলছে। দেখা যাক, সেটা কেমন চলে? তারপর হয়তো মালিকরা সিদ্ধান্ত নেবে। প্রেক্ষাগৃহের এমন দুর্দশার কারণ কী জানতে চাই তৌহিদুলের কাছে। এজন্য তিনি হাতে হাতে স্মার্ট মোবাইল ফোনসেট, টিভিতে একশোর উপরে চ্যানেল ইত্যাদিকে দায়ী করেন। তবে চলচ্চিত্রের মান নিয়েও তিনি সন্তুষ্ট নন। তৌহিদুল বলেন, আমার মনে হয়, যদি টেলিভিশনে ইন্ডিয়ান চ্যানেলগুলো বন্ধ হতো, শিক্ষিত মানুষেরা সিনেমায় আসতো, তাহলে ভালো মানের সিনেমা হতো, সিনেমাহলগুলোও চলতো। আর সিনেমা চললে এতো ছেলে-মেয়ে অন্তত মাদকাসক্ত হতো না কিংবা বিপথে যেতো না। আমরাও বেঁচে থাকতাম। এই সিনেমাহলে ৩০ জন স্টাফ ছিলো। এখন আমরা (পাশে বসা একজনকে দেখিয়ে বলেন) দুজন ছাড়া বাকি সবাই বেকার। আরো কষ্টের ব্যাপার হলো, সিনেমাহলে কাজ করা এই মানুষগুলো অন্য কোনো কাজও জানে না। এখন তাদের সেই বয়সও নেই যে, অন্য কোনো কাজ শিখে সেটা করবে।


তৌহিদুলের সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পারি একটা প্রেক্ষাগৃহ শুধু ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান কিংবা কর্মস্থল নয়, সেখানে জড়িয়ে আছে কতো মানুষের স্মৃতি, ভালোবাসা আর আবেগ। একজন মানুষ প্রেক্ষাগৃহকে কতো আপন করে নিতে পারলে নিজের সন্তানের সঙ্গে তুলনা করতে পারেন, তা বোঝা যায় তার কথায়। প্রেক্ষাগৃহের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে তৌহিদুল আরো বলেন, জীবন চালানোর জন্য সবাই চাকরি করে, আমিও এখানে শুরুতে চাকরিই করতে এসেছিলাম; কিন্তু ধীরে ধীরে এর প্রতি (প্রেক্ষাগৃহ) যে ভালাবাসা তৈরি হলো, তা বুঝতে পেরেছি এটা বন্ধ হওয়ার সময়। আল্লাহ না করুক আমার নিজের সন্তান মরলে যে কষ্ট পাবো, এই সিনেমাহল বন্ধ হয়ে তার চেয়েও বেশি কষ্ট পেয়েছি।


তৌহিদুল বাম্বীতে কাজ করেছেন টানা ২০ বছর। দীর্ঘদিনের এ কর্মজীবনে তিনি দেখেছেন প্রেক্ষাগৃহের উত্থান-পতন, এর প্রতি মানুষের ভালোবাসা, পাগলামি। সেসময় প্রেক্ষাগৃহে নতুন কোনো চলচ্চিত্র আসলে কীভাবে প্রচারণা চালানো হতো আর মানুষ কী আগ্রহ নিয়ে তা শুনতো এর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তৌহিদুল বলেন, কোনো সিনেমা মুক্তি দেওয়ার তিন সপ্তাহ আগে থেকেই আমরা প্রচারণা শুরু করতাম; মানুষ ভিড় করে পোস্টার দেখতো। তা দেখেই আমরা বুঝতাম সিনেমা কেমন চলবে। আর কিছু দর্শক ছিলো যারা সারা শহর ঘুরে ঘুরে দেখতো কোন সিনেমাহলে কী সিনেমা চলছে। যার পোস্টার সব থেকে ভালো মনে হতো, সেটাই প্রথমে দেখতো। তারপর একে একে দেখতো অন্য সব সিনেমা।


সেই ৯০-এর দশক থেকে শুরু করে প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত বেশকিছু ব্যবসাসফল চলচ্চিত্রে কথা জানান তৌহিদুল। তার মধ্যে পিতা মাতা সন্তান চলচ্চিত্রটি নাকি তিন মাস ধরে বাম্বীতে চলেছে; এক ঈদে শুরু হয়ে পরের ঈদ পর্যন্ত। এছাড়া অকৃতজ্ঞ, জয়যাত্রা, চন্দ্রকথা, চাঁদনী, হঠাৎ বৃষ্টি ইত্যাদি চলচ্চিত্রগুলোও বাম্বীতে ভালো ব্যবসা করে।


ফিকে হয়ে আসা স্বপ্ন সোনিয়া


প্রথমবার বগুড়ায় গিয়ে শহরের নবাববাড়ি রোডে আল-আমিন কমপ্লেক্সে অবস্থিত সোনিয়াতেও গিয়েছিলাম। মূলত, বাম্বীর প্রহরীর সঙ্গে কথা বলার পরেই সোনিয়াতে যাই। প্রেক্ষাগৃহটির অবস্থান ভবনের চতুর্থতলায়। সোনিয়ার কারুকাজ ও পরিকল্পনা বগুড়ার অন্যান্য প্রেক্ষাগৃহ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। যা দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। তবে দীর্ঘদিন অযত্নে পড়ে থাকায় সেগুলো কিছুটা নোংরা হয়ে গেছে। সেদিন শুক্রবার হওয়ায় নতুন চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছে সোনিয়াতে--ভারতীয় চলচ্চিত্র কিডন্যাপ। দুপুর ১২টায় কিডন্যাপ-এর প্রথম শোয়ে তেমন দর্শক চোখে পড়লো না। দর্শক না থাকায় গেইটম্যানও এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করছিলো; নিজের পরিচয় দিয়ে কথা বলার চেষ্টা করি তার সঙ্গে, নাম আমিনুল ইসলাম। আলাপের শুরুতেই আমিনুল বলতে থাকেন, দেখেন, একটা সিনেমার প্রথম শো, অথচ কী অবস্থা! কিছুদিন জাজ মাল্টিমিডিয়ার কিছু সিনেমা ভালোই চলছিলো; শুনলাম ওটাও নাকি বন্ধ করে দেবে, মামলা চলছে। জাজ বন্ধ করে দিলে বাংলাদেশের সিনেমাও দেড়-দুই বছরের মধ্যে বন্ধ হয়ে যাবে। জাজের সিনেমার কথা শুনলে তবুও কিছু দর্শক আসতো।


আমিনুলের এসব কথা যদিও অনেক কিছুই ভাবায়, উদ্বেগ সৃষ্টি করে; তারপরও সেদিকে মন না দিয়ে মালিকের কথা জানতে চাই তার কাছে। আমিনুল জানান, সোনিয়ার মালিক রফিকুল ইসলাম। ছুটির দিন তাই আজকে তাকে পাওয়া যাবে না। মালিকের ফোন নম্বর চাইলে তিনি দিতে অস্বীকৃতি জানান। তবে ছুটির দিন ছাড়া মালিককে পাওয়া যাবে বলে তিনি নিশ্চয়তা দেন।


দ্বিতীয়বার সোনিয়ায় গিয়ে মালিকের সঙ্গে দেখা হয় নাটকীয়ভাবে। আগে থেকে ভেবে রেখেছিলাম কাউন্টারের লোকের সঙ্গে গিয়ে কথা বলবো, তারপর যদি মালিককে পাওয়া যায়। তাই সেদিন ১২টার শো শুরুর খানিক আগেই প্রেক্ষাগৃহে পৌঁছাই। তখনো লোকজন খুব একটা আসেনি। সেই সুযোগে কাউন্টারে বসা লোকটির সঙ্গে কথা বলতে চাই। নিজের পরিচয় দিয়ে কথা বলতে চাইলে, পাশে বসা এক ভদ্রলোক বলে উঠেন, কী বলবেন এদিকে এসে বলেন। সোনিয়ার মালিক সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমিই রফিকুল ইসলাম; এই হলের মালিক; বলেন, কী বলবেন? অপ্রত্যাশিতভাবে মালিককে পেয়ে নিজেকে সামলে নিই। এরপর প্রেক্ষাগৃহ নিয়ে কথা শুরু করতে চাইলে তিনি শুরুতে এ নিয়ে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। অনেক অনুরোধের পর সামান্য কথা বলতে রাজি হন তিনি। সেটাও ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই। উপায় না দেখে টিকিট কাউন্টারের বাইরে দাঁড়িয়েই কথা বলা শুরু করি রফিকুলের সঙ্গে। জানতে চাই, এতোসব ব্যবসা থাকতে সেসময় প্রেক্ষাগৃহ প্রতিষ্ঠার পিছনের ইতিহাসটা আসলে কী? রফিকুলের কাট কাট জবাব, এর আবার ইতিহাস কী! ব্যবসা করার ইচ্ছে হয়েছে, ব্যবসা শুরু করেছি। আর এখন যে অবস্থা তাতে এটা তাড়াতাড়িই বন্ধ করে দিবো। একনাগাড়ে খানিকটা রাগ নিয়েই কথাগুলো বলেন রফিকুল। এরপর চরম অনীহা নিয়ে বিক্ষিপ্তভাবে রফিকুল আমার কিছু প্রশ্নের উত্তর দেন। সোনিয়া ২০০৬ খ্রিস্টাব্দে চালু হয়; মেয়ে সোনিয়ার নামে তিনি সেসময় এর নাম রাখেন। রফিকুল জানান, তখন ১৭ জন কর্মচারী নিয়ে সোনিয়া যাত্রা শুরু করেছিলো, এখন তিনি নিজেই কর্মচারীদের কাজ করেন।


নতুন স্বপ্ন নিয়ে মধুবন


আমাদের সময় পত্রিকা থেকে আগেই জেনেছিলাম বগুড়াতে নয়টি প্রেক্ষাগৃহের মধ্যে মাত্র দুটি চালু আছে। প্রথম যেদিন বগুড়াতে যাই মেরিনা, মাধু কিংবা বাম্বী যেখানেই গিয়েছি, সেগুলোর কোনো চিহ্নই পাচ্ছিলাম না। আশপাশের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে প্রেক্ষাগৃহগুলো সম্পর্কে জানার চেষ্টা করছিলাম। ফলে শুরুতে খানিকটা হতাশই হই। এই রকম পরিস্থিতিতে কিছুটা আশার আলো পাই মধুবন-এ। কারণ এই সময়ে এসে মধুবন ভেঙে নতুন করে সিনেপ্লেক্স করার সাহস দেখাচ্ছে মালিকরা। মধুবন-এ গিয়ে প্রথমেই কথা হয় সেখানে কাজ করা কয়েকজন নির্মাণ শ্রমিকের সঙ্গে। তাদের একজন জানান, তিনি পুরনো মধুবন-এর গেইটম্যান, এখন সাময়িক এই কাজ করছেন। প্রেক্ষাগৃহটির প্রতিষ্ঠাতা এ এম ইউনুস মারা গেছেন। তিনি সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন। এখন যিনি দায়িত্বে আছেন তিনি ইউনুসের নাতি রোহান। রোহান বাড়িতেই আছেন, চাইলে তার সঙ্গে কথা বলা যাবে। এরপর ফোনে রোহানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হই। পরে শ্রমিকদের একজন গিয়ে তাকে ডেকে আনেন।

সংস্কারাধীন মধুবন

রোহান এসে তার অফিসে বসান। পরিচয় পর্ব শেষে মধুবন নিয়ে কথা হয় রোহানের সঙ্গে। শুরুতেই রোহান বলে নেন, আমি একা না বলে আপনি প্রশ্ন করলে আমার জন্য ভালো হয়। তাই প্রথমেই জানতে চাই প্রেক্ষাগৃহটি প্রতিষ্ঠার পিছনের ইতিহাস। রোহান বলেন,আমার দাদা ১৯৭৪ সালের রোজার ঈদে এটি চালু করেন। মূলত ১৯৬৮ সালেই সিনেমাহলের কাজ শুরু হয়েছিলো। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ায় তা পিছিয়ে যায়। শুরু থেকে দাদাই সিনেমাহলটি পরিচালনা করতেন। তবে আমার বাবাও জড়িত ছিলেন। সিনেমা চয়েস করা, ঢাকা থেকে আনা এগুলো বাবাই করতেন। তবে বাবা পুরোপুরি সিনেমাহলের দায়িত্ব নেন ২০১৪ সালে।


কথা বলার এ পর্যায়ে রোহানের কাছে জানতে চাই আপনার দাদা সেসময় প্রেক্ষাগৃহ করার কেনো সিদ্ধান্ত নিলেন? রোহান বলেন, আমি দাদার সঙ্গে কথা বলে যতোটা বুঝেছি, যুদ্ধের আগে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ভালো ছিলো না। ফলে অন্য কোনো ব্যবসা করে লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা কম ছিলো। তবে তখন মানুষ বিনোদন প্রিয় ছিলো, কিন্তু এর সুযোগ ছিলো কম। ফলে সিনেমাহলেই সবধরনের মানুষ আসতো। আর শহরে ততোদিনে কয়েকটা সিনেমাহল ছিলো, যেগুলো ভালো করছিলো। সবমিলে দাদা হয়তো এজন্যই সিনেমাহল প্রতিষ্ঠার কথা ভেবেছিলেন। সেসময় ভালো ভালো সিনেমা হতো; রাজ্জাক-কবরী জুটি হলগুলোকে মাতিয়ে রেখেছিলো। দাদা ৭৪ থেকে ৮৭-৮৮ সাল পর্যন্ত একেবারে ফাটিয়ে ব্যবসা করেন। শুধু উনি নন, সব সিনেমাহলেই ভালো ব্যবসা হয়েছিলো।


এই পরিস্থিতিতে কী ভেবে প্রেক্ষাগৃহ নিয়ে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, জানতে চাই রোহানের কাছে। তার ভাষ্যমতে, সিনেমাহলের এ পরিবর্তনের পিছনে আমার ছোটোভাই ও বাবার কিছু ভূমিকা আছে। মূলত ২০১৩ সালে দাদা মারা যাওয়ার আগেই সিনেমাহলটি ভেঙে ফেলার প্লান করেছিলেন। ইচ্ছে ছিলো একটা বাণিজ্যিক ভবন করার। যার নিচে মার্কেট, উপরে আবাসিক ভবন হবে। ২০১৪ সাল পর্যন্ত আমরা এই সিনেমাহলটা কিন্তু তেমন গুরুত্ব দিয়ে চালাইনি। বুকিং এজেন্টরাই এটা ভাড়ায় চালাতো। তারা ঈদে-উৎসবে সিনেমা চালাতো। মাঝে মাঝে পুরনো সিনেমা চলতো। পুরনো সিনেমাগুলো চালাতে গিয়ে দেখা গেলো, দর্শক আসে কিন্তু তারা সন্তুষ্ট হয় না। তারা ভিন্ন কিছুর ইঙ্গিত করছিলো, মানে কাটপিস চাচ্ছিলো। এগুলো না পেয়ে দর্শক কখনো কখনো ব্যবস্থাপক, গেইটম্যান এমনকি মালিককে পর্যন্ত গালিগালাজ করতো।


অনেকটা ক্ষোভের সঙ্গে রোহান বলতে থাকেন, আমি এগুলো বিভিন্ন সময় শুনেছি। কিন্তু আমি কখনোই সিনেমাহলে ইন্টারেস্টেড ছিলাম না। ২০১৪ সালে গ্রাজুয়েশন শেষ করে ঢাকা থেকে ফিরে এসে ভালো কোনো চাকরি বা ব্যবসার চিন্তা করছিলাম। ফলে সিনেমাহল নিয়ে কখনো তেমন কিছু বলিনি। তো একদিন কী হলো, ২০১৫ সালের এক ঈদে শাকিব-অপুর লাভ ম্যারেজ সিনেমাটা মুক্তি পেলো। আব্বুর ব্যস্ততার কারণে ওই ঈদে তিনি ঢাকায় ছিলেন। সেদিন হঠাৎই সিনেমাহল থেকে ম্যানেজারসহ আরো অনেকে ছুটে গেলো বাড়িতে; বলছে, মেশিনের সমস্যার কারণে সিনেমা চালানো যাচ্ছে না। লোকজন চিৎকার-চেঁচামেচি করছে। বেশি সমস্যা হলে ভাঙচুরও হতে পারে! কী হয়েছে আমি যদিও জানি না, তারপরও আমার ল্যাপটপটা নিয়ে হলে আসি; এসে দেখি ভিতরের চেয়ার ভাঙা শুরু হয়ে গেছে। কারণ যিনি সিনেমার রিপ্রেজেন্টেটিভ, তিনি দর্শককে থামানোর জন্যই হোক আর যে কারণেই হোক পর্দায় আনএক্সপেক্টেড কিছু চালানো শুরু করেছেন। দর্শক তাতে আরো বিক্ষুব্ধ হয়। তো আমি এটা দেখে ওই লোককে চিৎকার দিয়ে ঘর থেকে বের করে দিয়ে আমার ল্যাপটপে সিনেমাটা চালানোর চেষ্টা করি এবং তাতে কাজ হয়। দর্শক শান্ত হয়।


এবার খানিকটা হাসি হাসি মুখ নিয়ে রোহান বলেন, এভাবেই সিনেমাহলের সঙ্গে আমার যাত্রা শুরু। এরপর আমি সিনেমাহলের ভিতরে গিয়ে একদিন খেয়াল করলাম, সিটের গদিগুলো বের হয়ে গেছে, ভিতরের পরিবেশটা গুমোট, দর্শক ভিতরে সিগারেট খায়, অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে দর্শক যা খুশি তাই করে। তখন আমি বাবাকে বললাম, তুমি সিটগুলো পরিবর্তন করে দাও। সিট চেইঞ্জ হলে বললাম, প্রজেক্টরটা চেইঞ্জ করে দাও; তাতে দর্শক অন্তত পিকচার কোয়ালিটিটা ভালো পাবে। এভাবেই চলছিলো। দর্শক কিছুদিন এভাবে সিনেমা দেখার পর বলতে থাকলো, ভাই ভালো সাউন্ড সিস্টেম দেন। আমিও দেখলাম ভালো সাউন্ড সিস্টেম দরকার। এর মধ্যে অবশ্য দুই বছর কেটে গেছে। এ সময়ে আমার চিন্তারও একটা পরিবর্তন আসলো। মানে ততোদিনে আমি সিনেমার লাইনটা ধরে ফেলেছি। একদিন কলকাতার শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মস-এর প্রতিনিধি আসলো, তারা কেলোর কীর্তি সিনেমাটা চালাবে। আমি বেনিফিট জানতে চাইলে তারা বললো, প্রজেক্টর দেবে সার্ভারসহ। আমি সুযোগটা নিলাম। কেলোর কীর্তি আমরা তিন সপ্তাহ চালালাম। আমি দেখলাম, যারা সিনেমা দেখা ছেড়ে দিয়েছিলো তাদের অনেকে সিনেমাহলে আসছে। আমাদেরও ভালো ব্যবসা হলো। এর পরে আসলো আয়নাবাজি। বাবা তো ওই সিনেমা নেবেই না। রীতিমতো আমার সঙ্গে তর্কাতর্কি। এর মধ্যে আমি আয়নাবাজির ট্রেইলারটা ৬০-৬৫ বার দেখলাম। একবার দেখে মনে হয় চলবে, একবার দেখলে মনে হয় চলবে না। আবার মনে হয় কিছু একটা রহস্য আছে, চঞ্চল এতোগুলো রূপে কেনো; তাই চলবে।


এবার খানিকটা উচ্ছ্বাস নিয়ে রোহান আবারও শুরু করলো, বাবা সিনেমাটা নিতে চাচ্ছিলো না এ কারণে যে, কেউই এটা নিতে চাচ্ছিলো না। সারা বাংলাদেশে মাত্র ২০টা সিনেমাহলে প্রথমে মুক্তি পেয়েছিলো আয়নাবাজি। সত্যিই মুক্তির প্রথম দিনে তেমন কেনো লোকই হয় নাই; দ্বিতীয় দিনেও একই অবস্থা। বাবা তো আমার ওপরে রেগে গেলেন! আমি বললাম, শান্ত থাকো, হবে। তারপর কোনো একটা কারণে তৃতীয় দিন আমি ঢাকা চলে গেছি। সেই দিন আমাকে ফোন দিয়ে জানালো সিনেমাহল ভরে গেছে। সেই থেকে এমন ভরা ভরলো যে, পরবর্তী ৩৩ দিন আর হল খালি হয় না। ৩৫ দিন পর আমরা সিনেমাটা নামিয়ে ফেলি। কারণ ওইদিন আয়নাবাজির প্রযোজক একটা ভুল করে বসে; তারা সিনেমাটা রবিকে দেয়। রবি সিনেমাটা অনলাইনে ছাড়ে। ফলে মানুষ একবার যখন ঘরে বসে সিনেমা পেয়ে যায়, তখন আর সিনেমাহলে আসতে চায় না সময়-টাকা নষ্ট করে। তখন আমি চিন্তা করলাম, সিনেমাহলে আসলে সময় নষ্ট হয় এ চিন্তাটা মানুষ কেনো করছে! আমার মনে হলো, ইটস আ ডুম প্লেইস। এটা তো আসলে একটা অন্ধকার জায়গা, মানে গুদাম ঘরের মতো। এই পচা গুদামে মানুষ কেনো আসবে!


রোহানের কথা যেনো থামতেই চায় না। তাকে থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞাসা করি, চলচ্চিত্রের জন্য তো অন্ধকার ঘরই দরকার! রোহান আবার বলা শুরু করেন, দেখুন এ প্রজন্মের তরুণদের শুধু ভালো পিকচার বা সাউন্ড হলেই হয় না; তারা আরো কিছু চায়। এখন তাদের ক্লাসরুমেও এ সি লাগে। তারা সবসময় প্লেজার, আরাম চায়। এই সময়ে যদি কোনো দর্শককে গদি ছাড়া লোহার চেয়ারে বসিয়ে দুই ঘণ্টা সিনেমা দেখতে দেওয়া হয়, কেউ কি থাকতে চাইবে! তাই ভালো পরিবেশ দরকার। হলমালিকরা এখন একটা জিনিস ভুল করছেন, তাদেরকে একটা মেসেজ দিয়ে রাখি। যুগ চেইঞ্জ হয়েছে; মানুষের দেখার রুচির পরিবর্তন হয়েছে। ফলে তাদেরও উচিত যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সিনেমাহলগুলোকে আপডেট করা। একই সঙ্গে হলের কর্মচারীদেরও কিছু প্রশিক্ষণ দিয়ে স্ট্যান্ডার্ড করা, যাতে তারা দর্শককে যথাযথ সমাদর করতে পারে।


ব্যবসায়িকভাবে উত্তরবঙ্গের শহরগুলোর মধ্যে খানিকটা এগিয়ে বগুড়া। তবুও মনে সন্দেহ জাগে এখানে সিনেপ্লেক্স কতোটা চলবে; কোন চলচ্চিত্রইবা এখানে দেখাবেন রোহান! এই প্রশ্ন করার লোভ সামলাতে না পেরে জানতে চাই রোহানের কাছে। এবার রোহান একটু আস্থার সঙ্গেই বলেন, বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত যেকোনো সিনেমাই এখানে চালাতে চাই। সেটা হলিউড, বলিউডও হতে পারে। কারণ বাংলাদেশে দুই ঈদ ছাড়া সারা বছর তেমন কোনো সিনেমা মুক্তি পায় না। তাহলে আমি কী সারা বছর হল বসিয়ে রাখবো! আর বাংলাদেশের পরিচালকরা তো সিনেমার স্ট্যান্ডার্ড ধরে রাখতে পারে না, খালি কপি করে। কিন্তু সেই কপিটাও ঠিকমতো করতে পারে না।


বাংলাদেশে বিদেশি যেসব চলচ্চিত্র মুক্তি পায় তার মধ্যে হলিউডের চলচ্চিত্রের সংখ্যাই বেশি। ভারতের চলচ্চিত্র মুক্তি পায় না বললেই চলে। সাফটা চুক্তির আওতায় ভারতের যেসব চলচ্চিত্র মুক্তি পায়, তার বেশিরভাগই টালিগঞ্জের। যদিও এ সংখ্যা খুব বেশি নয়। তাহলে রোহান যে ধরনের চলচ্চিত্রের কথা বলছেন, তা আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ দেখে না বললেই চলে। তবে হাল আমলে হলিউডের কিছু চলচ্চিত্র দেশে ভালো ব্যবসা করেছে। কিন্তু সেটাও শুধু ঢাকা-কেন্দ্রিক। তাহলে বগুড়ার মতো জায়গায় এই চলচ্চিত্র দেখার জন্য সারা বছর দর্শক পাওয়া যাবে? এর উত্তরেও রোহানের কণ্ঠে দৃঢ়তা খুঁজে পাই--অবশ্যই পাওয়া যাবে। ৯০-এর দশকে দেশীয় সিনেমার পাশাপাশি হলিউডের সিনেমাও চলেছে; সেগুলো হয়তো একটু দেরিতে এখানে আসতো। আর এখন যদি ঢাকার স্টার সিনেপ্লেক্স কিংবা ব্লক বাস্টার এর সঙ্গে আমরাও ওই সব সিনেমা মুক্তি দিই, তাহলে মানুষ অবশ্যই আসবে। আর পাবলিসিটির কথা যদি বলেন, বগুড়া শহরে মধুবন সিনেমাহলের একটা নামডাক আছে। এই রোডের নামও মধুবন হয়ে গেছে।


রোহানের কথা অনুযায়ী, এসব চলচ্চিত্র দেখার একটা শ্রেণি বগুড়াতে আগে থেকেই আছে। কিন্তু দেশের অধিকাংশ মানুষ তো ওই শ্রেণির দর্শক নয়। তাহলে রোহানের এই উদ্যোগ কী কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণির দর্শকের জন্য? রোহান খুব দৃঢ়তা নিয়ে বলেন দেখেন, আমি একদম নিম্ন শ্রেণির যে দর্শক তাদের মাথায় রেখে এটা করিনি। তবে বাংলা সিনেমা দেখানোর সময় অবশ্যই টিকিটের দাম কমিয়ে দেওয়া হবে।


সিনেপ্লেক্স তো একটি স্ক্রিনের প্রেক্ষাগৃহ নয়। সেখানে কয়েকটি স্ক্রিন থাকে। রোহান জানান, শুরুতে একটা স্ক্রিন হলেও ধীরে ধীরে তা বাড়ানোর পরিকল্পনা আছে। প্রথমে এটা চালু করে পরে থ্রি ডি, নাইন ডি চলচ্চিত্র দেখার জন্য আলাদা স্ক্রিন হবে। আর এখানে বাইরের খাবার নিয়ে আসা যাবে না, তাই সিনেপ্লেক্সের ভিতরেই ফুড কোটের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া সিনেপ্লেক্সের নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থাও থাকবে।


কথা বলার এ পর্যায়ে রোহানের কাছে জানতে চাই প্রেক্ষাগৃহটির নাম মধুবন কেনো রাখা হলো? রোহান এবার একটু মজা করে বলেন, নামটি রাখার পিছনে কাহিনি আছে। যে জায়গায় এখন সিনেমাহল, এ জায়গাটাতে একসময় ঘন জঙ্গল ছিলো; ওই জঙ্গলে প্রচুর মধু পাওয়া যেতো। তাই এই জায়গাটাকে লোকজন মধুবন নামেই চিনতো। সে কারণেই সিনেমাহলের নাম রাখা হয় মধুবন


মাসুম-এর নাম জানে না নতুন প্রজন্ম


প্রেক্ষাগৃহটির নাম পত্রিকা মারফত জেনেছিলাম আগেই। তবে ওই পর্যন্তই। প্রেক্ষাগৃহটি সম্পর্কে কোনো তথ্য বা এর অবস্থান সম্পর্কে সেখানে কোনো তথ্য ছিলো না। তাই মাসুম সম্পর্কে জানার জন্য সাতমাথায় বিভিন্ন লোকজনকে জিজ্ঞাসা করছিলাম। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, প্রেক্ষাগৃহটি সম্পর্কে কেউ জানেই না। একপর্যায়ে এক দোকানদারের সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে জানতে পারি, প্রেক্ষাগৃহটি চারমাথায় অবস্থিত। এই তথ্য পেয়ে রওনা হই চারমাথার উদ্দেশে। সেখানে পৌঁছানোর আগেই মোটর বাইক থামিয়ে থামিয়ে বিভিন্ন জনকে জিজ্ঞাসা করতে থাকি ঠিক কোন জায়গায় প্রেক্ষাগৃহটি ছিলো। এখানেও একই অবস্থা, কেউই এ সম্পর্কে তথ্য দিতে পারছিলো না। শেষ পর্যন্ত ফিরোজ নামে এক মুদি দোকানদারকে পাই, বয়স ৭০-এর কাছাকাছি। মূলত তার কাছেই মাসুম সম্পর্কে মোটামুটি সব রকম তথ্য পাই।


ফিরোজ জানান--প্রেক্ষাগৃহটি ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠা করেছিলো গোবরা শেখ ও মোসলেম নামে দুজন। তারা সম্পর্কে বাবা ও ছেলে। গোবরা শেখের নাতি মাসুমের নামে এর নামকরণ করা হয়। পরে ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দের দিকে একদিন চলচ্চিত্র দেখা নিয়ে ভয়াবহ গণ্ডগোল হলে প্রেক্ষাগৃহটি বন্ধ হয়। তারপর আর চালু হয়নি। পরবর্তী সময়ে নান্নু ও মতি নামে দুই ভাই জায়গাটি কিনে চাতাল নির্মাণ করে। তবে সে চাতালও এখন পরিত্যক্ত। গোবরা শেখ ও তার ছেলে মোসলেম কেউই বেঁচে নেই।


এরপর ফিরোজের দেখানো পথে গিয়ে দেখে আসি সেই পরিত্যক্ত চাতালটি। সেখানে কাঠের দোকানে বসা সত্তরোর্ধ্ব একজনকে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারি, ঠিক কোন জায়গায় প্রেক্ষাগৃহটি ছিলো। তিনি দেখিয়ে দিলে, কয়েকটা ছবি তুলে রওনা হই চারমাথায় থাকা আরেক প্রেক্ষাগৃহ বিথীর উদ্দেশে।


ধ্বংসস্তুপ বীথি


মূলত মাসুম এর তথ্যদাতা মুদি দোকানদার মো. ফিরোজের কাছেই জানতে পারি, চারমাথার ভবের বাজারে ‘বীথি প্রেক্ষাগৃহটি অবস্থিত। সেখানে গিয়ে দেখি প্রেক্ষাগৃহের ভবনটি পরিত্যক্ত পড়ে আছে। প্রেক্ষাগৃহটির সামনের অংশে গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি ভাঙড়ি ও গ্লাস ফিটিংস করার দোকান। ওই দোকানগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, এর মালিক সাইফুল ইসলাম। এটি ৮০র দশকে নির্মিত। ঋণের কারণে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এটি বন্ধ করে দেয়। কিন্তু সাইফুল সম্পর্কে তারা কেউই কোনো তথ্য দিতে চাচ্ছিলো না। এমনকি প্রেক্ষাগৃহটি বন্ধ হওয়ার ব্যাপারেও ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। তবে তাদের তথ্য থেকে এটুকু বোঝা যায়, বীথির বন্ধ হওয়া এক যুগেরও বেশি সময় হয়েছে।


তবুও আশা বেঁধে রাখি


পৃথিবীজুড়ে চলচ্চিত্রের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে থাকা সত্ত্বেও তা প্রদর্শনের স্থান প্রেক্ষাগৃহের অবস্থা ধীরে ধীরে খারাপের দিকে যাচ্ছে। বাংলাদেশের অবস্থা তো আরো খারাপ। এর কারণ হিসেবে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা বলছেন নানা কথা। তাদের কথায় মোটাদাগে এর কারণ হিসেবে যা দাঁড়ায় তাহলো প্রযুক্তির উত্তরোত্তর উন্নতি। এই ধারাবাহিকতায় প্রথমে সি ডি-ভি সি ডি, স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল, তারপর স্মার্ট মোবাইল ফোনসেট ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা রয়েছে। তবে এতো সঙ্কটের মধ্যেও আশার কথা হলো, বগুড়াতে কেউ একজন তারপরও চলচ্চিত্র ও প্রেক্ষাগৃহ নিয়ে স্বপ্ন দেখছেন। সেখানে একটি সিনেপ্লেক্স নির্মাণের কাজ চলছে, যা ডিসেম্বরে চালু হওয়ার কথা। তার সেই স্বপ্ন দীর্ঘজীবী হউক।


লেখক : নাঈম রেজা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।

nayemreza3@gmail.com

https://www.facebook.com/naimreza.naim

 

তথ্যসূত্র

১. হায়াৎ, অনুপম (১৯৮৭ : ৮); বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস; বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন, ঢাকা।

২. বগুড়ার ৩৮ সিনেমাহল বিলুপ্ত গড়ে উঠেছে বিপণি বিতান; দৈনিক আমাদের সময়, ৩ মে ২০১৬।

৩. কাদের, মির্জা তারেকুল (১৯৯৩ : ৩৯৭); বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প; বাংলা একাডেমি, ঢাকা।


বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ১৮তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২০ এ প্রকাশিত হয়েছে।

 

 

 

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন