সৌমিত্র দস্তিদার ও অন্যান্য
প্রকাশিত ১২ জুলাই ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
ম্যাজিক লণ্ঠন বাতচিত ২
দেশভাগের অন্য একটা দিক দেখার, বোঝার চেষ্টা করা দরকার
সৌমিত্র দস্তিদার ও অন্যান্য

১১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, মঙ্গলবার, বিকেল পাঁচটা
১২৩, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একাডেমিক ভবন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
‘ম্যাজিক লণ্ঠন’-এর এই আয়োজন ‘ম্যাজিক লণ্ঠন বাতচিত’। এখানে ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’-এর আয়োজনে একজন নির্মাতা তার চলচ্চিত্র নিয়ে দর্শকের সামনে হাজির হন। চলচ্চিত্র প্রদর্শনী শেষে তিনি বাতচিতে অংশ নেন দর্শকের সঙ্গে। দ্বিতীয় আয়োজনে উপস্থিত হয়েছিলেন প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা সৌমিত্র দস্তিদার তার সীমান্ত আখ্যান নিয়ে। [সম্পাদক]
প্রথম পর্ব.
সঞ্চালক (অধরা মাধুরী) : ‘ম্যাজিক লণ্ঠন বাতচিত’ আয়োজনে আপনাদের সবাইকে স্বাগতম। ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’ দ্বিতীয়বারের মতো এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। এখানে প্রথমেই চলচ্চিত্র প্রদর্শনী হয় এবং পরে নির্মাতার সঙ্গে দর্শক সরাসরি আলাপ-আলোচনায় অংশ নেয়। আজকের আয়োজন দুটি পর্বে বিভক্ত। প্রথম পর্বে প্রদর্শন করা হবে দেশভাগ নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র সীমান্ত আখ্যান । আজকে আমাদের মধ্যে উপস্থিত আছেন চলচ্চিত্রটির নির্মাতা ভারতের সৌমিত্র দস্তিদার। উনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি আমাদের এই আয়োজনে উপস্থিত থাকার জন্য। আর কথা না বাড়িয়ে প্রথম পর্বের সূচনা করছি। যিনি দায়িত্বে আছেন, তাকে অনুরোধ করছি চলচ্চিত্রটি শুরু করার জন্য। তাহলে আপনারা দেখুন সীমান্ত আখ্যান ।
সঞ্চালক : এতোক্ষণ আপনারা উপভোগ করলেন, দেশভাগ নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র সীমান্ত আখ্যান। এবারে আমরা সরাসরি আয়োজনের দ্বিতীয় পর্বে চলে যাবো। দ্বিতীয় পর্বের শুরুতেই আমাদের আজকের অতিথি নির্মাতা সৌমিত্র দস্তিদারকে অনুরোধ করছি মঞ্চে আসন গ্রহণের জন্য। এবারে অতিথিকে শুভেচ্ছা স্মারক তুলে দেওয়ার জন্য মঞ্চে আহ্বান করছি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সভাপতি আ-আল মামুন স্যারকে। এছাড়া অতিথির হাতে ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’-এর সর্বশেষ তিনটি সংখ্যা তুলে দিতে মঞ্চে আহ্বান জানাচ্ছি সাবেক সহকারী সম্পাদক ইব্রাহীম খলিলকে।
আয়োজনের এ পর্যায়ে আমরা সরাসরি নির্মাতার সঙ্গে বাতচিত এবং প্রশ্নোত্তর পর্বে চলে যাবো। দর্শকের মধ্যে নির্দিষ্ট মাইক্রোফোন দেওয়া আছে। যারা প্রশ্ন করতে চান, মানে নির্মাতার সঙ্গে সরাসরি বাতচিতে অংশ নিতে চান, তারা নিজেদের জায়গা থেকেই প্রশ্ন করতে পারবেন। আমাদের অতিথি আপনাদের সঙ্গে সরাসরি বাতচিতে অংশ নেবেন। আমি দর্শকের মধ্য থেকে প্রশ্ন ও মতামত আহ্বান করছি। আমি এখন মঞ্চ ছেড়ে দিচ্ছি সৌমিত্র দস্তিদারকে। এখনকার মতো আমি বিদায় নিচ্ছি, সবাইকে ধন্যবাদ।
সৌমিত্র দস্তিদার : প্রথমত আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ। কারণ এই হলে (কক্ষে) যতো দর্শক ধরে, তার চেয়ে অনেক বেশিই এসেছে, অনেকে দাঁড়িয়েও সিনেমাটি দেখেছে। অনেক অধ্যাপক এসেছেন, শিক্ষার্থীরা তো আছেই। ফলে আমি সত্যিই অভিভূত। আমার ভালো লাগছে। এবং শিল্পের সঙ্গে যুক্ত যেকোনো মানুষ, সিনেমার পরিচালক তো বটেই, তাদের ভালো লাগে যখন একটা প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায় আর কি। আমি জানি না, আমি কতোটা সিনেমা করতে পেরেছি বা কতোটা কমিউনিকেট করতে পেরেছি আপনাদের সঙ্গে। আমি শুধু দুটো-তিনটে কথা বলতে পারি। তারপরে আপনাদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায় তো আমার আছেই। আমি আড্ডা মারতেও ভালোবাসি। কিন্তু এসব সেমিনার-টেমিনারে কতোটা গুছিয়ে বলতে পারবো, সেটা আমি খুব একটা জানি না। চেনা কিছু মুখ সামনের দিকে দেখে কিছুটা ভরসা পাচ্ছি। অপু (জাবিদ হাসান অপু, যমুনা টেলিভিশন) আছে, ওইখানে বকুল (সাজ্জাদ বকুল, শিক্ষক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ) আছে। আমার যেটা বলার সেটা হচ্ছে, অনেকেরই প্রশ্ন আসতে পারে, এই সিনেমাটা হঠাৎ আমি করতে গেলাম কেনো--আমি তো দীর্ঘদিন ধরেই সিনেমা করছি।
২০০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে একটা সময় আমি সাংবাদিকতা করেছি। তারপরে কিছুদিন সিরিয়াল জগতের সঙ্গে একটু যুক্ত ছিলাম। তারপরে পি আর ও ছিলাম একটা করপোরেট গ্রুপে। কোনো কোনো সময় মনে হতো কোনোটাই আমার ঠিক ভালো লাগছে না। সাংবাদিকতা করতে গিয়েও আমার মনে হতো, মেইনস্ট্রিম যে দেশটাকে দেখায় বা যে দুনিয়াটাকে দেখায় তার বাইরে একটা বড়ো দুনিয়া আছে। যেটা হয়তো আমরা সেভাবে দেখতে পারি না বা জানতে পারি না। প্র্যাকটিকালি যদি বলেন, আমি জীবনে প্রথম ধারদেনা করে সিনেমা করতে যাই। ভারতে বিহার একটা রাজ্য আছে, আপনারা সবাই জানেন। ১৯৯৯ বা ২০০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে, যে সময় বিহারে আমি একটা সিনেমা করতে যাই, তখন সেখানকার পরিস্থিতি খুব খারাপ ছিলো। একদিকে দলিত এবং অন্যদিকে জমিদারদের একটা লড়াই চলছিলো; অনেক জাতিগত প্রশ্নও ছিলো। আমি বিশদে যাবো না। কিন্তু আমি গিয়ে যেটা বুঝলাম, যে দেশটাকে আমাদের টেক্সট বইয়ে আমরা দেখি বা মেইনস্ট্রিম আমাদের দেখায় তার বাইরেও একটা অদ্ভুত জগৎ আছে। আমি নিজেও তো একসময় লেখালেখি করতাম। ছোট্ট ছোট্ট দুয়েকটা উদাহরণ আপনাদেরকে দিই, তাহলে আপনারা খানিকটা বুঝতে পারবেন। আমি ২০০০ খ্রিস্টাব্দে অর্থাৎ ১৮/১৯ বছর আগের বিহারের কথা বলছি। তখন ওখানে একটা প্রথা বা নিয়মের কথা আমরা জানতে পারি। সেটা হচ্ছে, ‘ডোলি ওঠানো’। ডোলি বা পালকি ওঠানো। আমাদের অখণ্ড বাংলায় পালকির একটা চল ছিলো, আমরা সবাই জানি। এখনো বিহারের গ্রামে গ্রামে--এখন বলতে ২০০০ খ্রিস্টাব্দের কথা বলছি--পালকি করে কনেকে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু আসলে তখন কনের শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার কোনো অনুমতিই ছিলো না। তাহলে কী করতে হতো! কনেকে প্রথমে পালকি থেকে নামানো হতো জমিদারের দাওয়ায় বা জমিদারের বাড়িতে। জমিদার যতোদিন মেয়েটিকে রাখতে চাইতো, রাখতো। তারপর জমিদারের অনুমতি পেলে মেয়েটি তখন শ্বশুরবাড়ি যেতে পারতো। এইটা একটা ঘটনা আমি আপনাদের বললাম। এই ভারতটা তো একেবারেই অচেনা।
একটা তরুণ ছেলে জিজ্ঞাসা করেছিলো, আমি কলকাতার কি না। আমি আউট অ্যান্ড আউট কলকাতার, মানে কলকাতায় বড়ো হওয়া, সেখানেই স্কুল-কলেজে পড়াশোনা। সুতরাং কলকাতার বাইরের ওই ভারতবর্ষ দেখে আমি নতুন করে ধাক্কা খেলাম।
পালামৌ বলে আরেকটা জায়গা আছে, এখন ঝাড়খণ্ড হয়েছে, আগে বিহার ছিলো। সেখানে একজন জমিদার ছিলেন, শিবনন্দন সিং। কতো বছর আগের কথা! তারপরও নামটা আমার এখনো মনে আছে। স্মৃতিতে তো কিছু কিছু জিনিস দাগ কাটে। আমি তাকে নিয়ে সিনেমাটা করতে পারিনি, কিন্তু স্টোরি পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিলাম। তো সেখানে গিয়ে দেখলাম, জমিদারের বিশাল প্রাসাদতুল্য একটা বাড়ি। সেই বাড়ির নিচেই একটা পরিখা বা পুকুরের মতো ছিলো। সেখানে উনি দুটি কুমির পুষতেন। সারা সপ্তাহ কুমির দুটো কিছুই খেতো না। প্রত্যেক শনিবার জমিদার শিবনন্দন সিং তার দলবল চাটুকারদের নিয়ে বসতেন এবং দোতলা থেকে কুমিরদের খাওয়াতেন। আমি কিন্তু একটুও বাড়িয়ে বলছি না, সেই খাবারের মধ্যে খরগোশ থাকতো, মুরগি থাকতো এবং কখনো কখনো সত্যিই মানবশিশু থাকতো!
এই দেশটাকে দেখার পরে আমার মনে হয়েছিলো, সিনেমাটা কোনো শৌখিনতা নয়, কোনোরকম মনোরঞ্জনী বিষয় নয়। আমার কাছে মনে হয়েছিলো, আমি তাহলে কী করতে পারি! আমার মনে হয়েছিলো, এ রকম অন্য দেশ বা বিদেশ যদি থেকে থাকে, তাহলে সিনেমার মাধ্যমে আমি সেটা শেয়ার করবো। তাই ওই প্রখ্যাত-টখ্যাত যদি বাদও দেন, নিজেকে নির্মাতা পরিচয় দেওয়ার চেয়ে বলি, আমি ক্যামেরা নিয়ে দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়াই আর যা দেখি-শুনি, যেটুকু বোঝার চেষ্টা করি, তা আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করি। লোকে কথাবার্তা-আলোচনার মাধ্যমে শেয়ার করে, লেখার মাধ্যমে শেয়ার করে; তেমনই আমি সিনেমার মধ্য দিয়ে শেয়ার করার চেষ্টা করি। সুতরাং আমাকে আপনারা যদি চলচ্চিত্রনির্মাতা বলেন, তাহলে নির্মাতা; আর যদি বলেন, আমি ক্যামেরা নিয়ে অন্য ধরনের কিছু দেখাবার চেষ্টা করছি--তাতেও আমি রাজি আছি। কিন্তু আমি কখনো মনে করি না, এখন পর্যন্ত আমি খুব বিরাট কিছু কাজ করতে পেরেছি।
দেশভাগ নিয়ে এই সিনেমাটা করার পিছনেও একটা আখ্যান আছে, গল্প আছে। ২০০২-এ গুজরাট গণহত্যা নিয়ে সিনেমাটা করার পর কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমি বুঝতে পারি, ভারতবর্ষের চরিত্রটা কেমন পাল্টে যাচ্ছে। সেক্যুলার জায়গা থেকে কোথায় কোথায় আমরা যেনো একটু বিচ্যুত হচ্ছি। ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে সংবিধানে আমাদের যে ঘোষিত নীতি, তার থেকেও আমরা কোথায় যেনো একটু শিফ্ট করছি। এটা ২০০২-এ। তারপরও সবকিছু ঠিকই ছিলো। একটা সময় গিয়ে আমাদের দেশে রাজেন্দ্র সাচার নামের দিল্লি হাইকোর্টের একজন প্রধান বিচারপতি একটা রিপোর্ট প্রকাশ করেন। পরে রিপোর্টটি ‘সাচার কমিটির রিপোর্ট’ বলে খুব বিখ্যাত হয়। সেই রিপোর্টে দেখা যায়, আমাদের দেশের মুসলমানদের একটা বড়ো অংশ, দেশভাগের পরেও পূর্ব পাকিস্তান ও পাকিস্তানে যায়নি। তারা ভারতকেই নিজের দেশ মনে করেছিলো এবং কখনো ভাবেইনি যে অন্য জায়গায় যেতে হবে। তাদের ওপর কিন্তু অদ্ভুত রকমের একটা বৈষম্য তৈরি হয়েছে। এটা আমার কথা নয়, রাজেন্দ্র সাচারের কথা। রিপোর্টটি এখন তো সবাই জানে, আমার নতুন করে বলার কিছু নেই।
ঘটনাচক্রেই একবার রাজেন্দ্র সাচার দিল্লিতে আমাকে খুব প্রভাবিত করেন। বয়স্ক একজন মানুষ, তখনই তার ৮৪ বছর বয়স। তিনি আমাকে বললেন, ‘তুমি এখানে কী করছো? বাংলায় থাকো, যাও বাঙালি মুসলমান দেখো।’ সত্যি কথা বলতে আপনাদের সামনে আমার কোনো অস্বস্তি বা সঙ্কোচ নেই, আমরা কলকাতায় বসে--এখানে মামুন (আ-আল মামুন) আছে, ও খানিকটা বলতে পারবে, যেহেতু কলকাতায় ছিলো--অনেক রাজা-উজির মারি, কফি হাউসে বসে অনেক সিনেমার গল্পটল্প করি। আরো নানারকম আলোচনা করি, কোথায় আমেরিকার কী হচ্ছে না হচ্ছে। কিন্তু আমার হাড়োয়া বা ভাঙর-এর কী অবস্থা দেশভাগের পরে, কখনো জানতে চাইনি বা পারিওনি! ঘটনাচক্রে আমি ক্যামেরা নিয়ে কিছু শট্ মালদা, বর্ধমান ও অন্যান্য জায়গায় নেওয়ার চেষ্টা করি। মুসলমানের কথা যদি আপনারা দেখে থাকেন লক্ষ করবেন, আমি ওখানে খুব বেশি কথা বলিনি। কিছু লোকের সামনে আমি মাইক্রোফোনটা ধরে রেখেছিলাম মাত্র। তারা তাদের মতো করে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া দুটোই জানিয়েছে। কিন্তু আমি এটা বুঝতে পেরেছিলাম, দেশভাগটা ওপারের (ভারতের) মুসলমানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটা অভিঘাত, আঘাত। এপারে যারা চলে এসেছিলেন, হয়তো বাধ্য হয়ে বা বাধ্য না হয়েও, তাদের অনেকেই ছিলো বুদ্ধিজীবী, এলিট বা মধ্যবিত্ত মুসলমান। কিন্তু পশ্চিম বাংলায় পড়ে থাকলো বেচারা প্রান্তিক কৃষক, ক্ষেতমজুর, মুটে-মজদুর, রেশম শিল্পী, বিড়ি শ্রমিক এই শ্রেণির লোকজন। পড়াশোনা তো দূরের কথা, তারা স্বপ্নেও স্কুলে যাবার কথা ভাবতে পারতো না। এবং ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে তারা কিন্তু মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছে না। একদিকে অর্থনৈতিক সঙ্কট, তার ওপর মহল্লা, পাড়া থেকে চেনা পরিচিত মানুষজন চলে গেছে, জনবিন্যাস পাল্টে গেছে। অন্যদিকে প্রশাসনও খুব ভালো আচরণ করেনি--‘ব্যাটা মুসলমান, তুই তো পাকিস্তানের দালাল।’ যতোবারই পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ হয়েছে, ততোবারই কিন্তু মুসলমানের ওপর আঘাত এসেছে। এগুলো আমি আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি।
আমার খুব কৌতুহল হয়, আমি রাস্তায় হাঁটতে ভালোবাসি। আমি যেকোনো জায়গায় গেলে, নতুন শহরে গেলে হাঁটি। আমি কলকাতা শহরেও হাঁটতে হাঁটতে দেখি, অদ্ভুত তো পুরনো মসজিদে বটগাছের চারা বসে গেছে, একটা বাড়ি পড়ে আছে, দেখেই মনে হচ্ছে মুসলিম স্থাপত্যের ব্যাপার। এই মানুষগুলো গেলো কোথায়! এই কৌতুহল থেকেই মুসলমানের কথা করা। এটা করার পরে আমার মনে হলো, দেশভাগ নিয়ে একটা সিনেমা করবো। পশ্চিম বাংলায় আমরা যারা থাকি, দেশভাগ বলতে আমাদের মধ্যে উদ্বাস্তু, ঋত্বিক ঘটকের সিনেমা, রাজশাহীর ঋত্বিক ঘটকের হাহাকার-যন্ত্রণা, এটা ভীষণভাবে প্রভাবিত করে। আমি বার বার যে রাজশাহীতে আসি, তার কারণ হলো অচেতনেই ঋত্বিক আমাকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করে। আমি এখন যে পদ্মাকে দেখছি, সে তো শীর্ণ হয়ে গেছে। কিন্তু ঋত্বিকের সময় নিশ্চয় উত্তাল পদ্মা ছিলো। ফলে সবমিলিয়ে কিন্তু আমাকে ভাবাতো। ঋত্বিকের এখানেই বেড়ে ওঠা, পড়াশোনা, বন্ধুবান্ধব; তারপরেও তিনি এমন কোনো মুসলিম চরিত্র কি পেলেন না, যে চরিত্রের যন্ত্রণাটা উনার সিনেমায় আসতে পারতো? এই ভাবতে ভাবতে আমি ঠিক করি, দেশভাগের অন্য একটা দিক দেখার, বোঝার চেষ্টা করা দরকার।
যে সিনেমাটা আপনারা দেখলেন, আমি মনে করি না, এটা স্বয়ংসম্পূর্ণ। আমি আগেও বলেছি, এটা একেবারেই প্রথম পর্বের সিনেমা। প্রথম পর্বে আমি কিছু প্রশ্ন এনেছি। আমি দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্বও করবো। তৃতীয় পর্বে অনেক বেশি অর্থনৈতিক দিকগুলো আনার চেষ্টা করবো--কী করে ১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গ থেকে এই শেষ অব্দি হলো। তখন তো শুধু একটা ফেডারেল কাঠামোর কথা হয়েছিলো। পরে সেই দেশটা টুকরো টুকরোভাবে ভাগ হয়ে গেলো। এই সবটা নেওয়ার ইচ্ছা এখনো আছে। এটা একটা এপিক কাজ বলতে পারেন। নিজে করেছি বলে বলছি না, এটা কঠিনতম কাজ; ফিন্যান্সের দিক দিয়ে যদি বলেন; পড়াশোনার দিক দিয়ে যদি বলেন। এই সিনেমাটা করতে গিয়ে আমি তিন বছরের বেশি সময় নিয়েছি। রাজশাহীতে এসেছি এবং অন্যান্য জায়গায় গেছি। বরিশালের দিকটা আমি পরে দেখাবো, দক্ষিণবঙ্গ আর কি।
এছাড়া গান্ধীজি যেখানে অনশন করেছিলেন, সেখানে ছুটে গেছি; সোহরাওয়ার্দী যে বাড়িতে থাকতেন, আমি দৌড়ে গেছি আর কি; আবুল হাশেম যেখানে থাকতেন, আমি উমর (বদরুদ্দীন উমর) ভাইকে জিজ্ঞাসা করে করে গেছি। এমনকি উমর ভাইয়ের সঙ্গে আমার যোগাযোগটাও খুব অদ্ভুতভাবে। আমি ঢাকায় এসে একবার উনাকে ইন্টারভিউ করি। তারপর একদিন শুনি উনি বর্ধমানে এসেছেন। এখন বর্ধমান একটা বিরাট জেলা। উমর ভাই কোথায় উঠেছেন আমি ভাবছি। এ রকম সময়ে একটা বাচ্চা মেয়ে আমার খুব ঘনিষ্ঠ, সবে পিএইচ ডি করছে। সে আমাকে এসে বলে, ‘তোমাকে মামা খুঁজছে, তুমি কোথায় আছো?’ আমি বললাম, ‘আমি তো কলকাতায়। তোর মামাটা আবার কে, যে আমাকে খুঁজছে।’ মেয়েটা বলে, ‘আমার মামা তো বদরুদ্দিন উমর।’ আমি বললাম, ‘কী কাণ্ড! কী কাণ্ড! সেটা তো আমি আজকে জানলাম।’ বর্ধমানে তার (উমরের) বোন এখনো আছে। এই সবটা নিয়ে কিন্তু আসলে প্রথম পর্ব।
আমি আসলে অন্যদিক থেকে দেখার চেষ্টা করেছি, একটা সূচনা বলতে পারেন। অন্যদিকটাও কিন্তু ফেলে দেওয়ার মতো নয়। আমরা যখনই দুঃখের কথা বলি--লিটনের (রাজশাহীর নাট্যকর্মী, নির্মাতা আহসান কবীর লিটন) একটা ইন্টারভিউ আছে--কথাটা সত্যিই কিন্তু ওর মা পদ্মার ওপারে মালদা-মুর্শিদাবাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। আমার মা খুলনা থেকে যখন চলে গেছেন, তিনিও নিশ্চয় একই কষ্ট পেয়েছেন। আমার বন্ধুর মাও নিশ্চয় সেই যন্ত্রণাটাই পেয়েছেন। আমি এদের কথা যদি না বলি, তাহলে আমার মনে হয়, ইতিহাসটার প্রতি একটু অবিচার করা হবে। এবং এই অবিচার থেকে, এই গুজব থেকে, অপপ্রচার থেকে কিন্তু আমাদের সম্পর্কের মধ্যে একটা ফাটল তৈরি হয়; সম্পর্কের মধ্যে কাঁটাতার ঢুকে যায়। জাবিদ অপু একটা কথা বলেছে, আমিও আজকাল খুব বলি সেই কথাটা--সীমান্ত, জটিলতা এগুলো আসলে ভিসা, পাসপোর্ট, কাঁটাতারে নয়; মানুষের মনে। আমি প্রচুর লোককে বলি, বাংলাদেশে আমি প্রচুর ঘুরে বেড়াই। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াই। আমি বোঝার চেষ্টা করি কোথায় কতোটা ঘৃণা আছে; কোথাও সেই ৪৬ আছে নাকি। কারণ নতুনভাবে, ইতিবাচকভাবে সমস্ত জেনারেশন মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে। আমাদের ভারতেও কতো লোক সিঙ্গাপুরে, আমেরিকা, লন্ডনে ঘুরতে যাচ্ছে; থাইল্যান্ডে, ইন্দোনেশিয়ায় বেড়াতে যাচ্ছে। খুব কম লোককেই আমি দেখেছি, যারা বাংলাদেশে আসতে চায়। তাদের মনের মধ্যে কোথাও একটা মাইন্ড সেট তৈরি হয়ে গেছে, ওরে বাবা বাংলাদেশে যাবো! এর মানে সেই গোলমেলে ব্যাপার! আমি এখন চেষ্টা করি, খানিকটা অ্যাম্বাসেডরের ভূমিকা নিয়ে যে, দেখো ভাই, ভালো-মন্দ সব জায়গাতেই আছে; বাংলাদেশেও নিশ্চয় আছে। সবাই একেবারে ভালো আমি তা বলতে পারি না। কিন্তু আমার মনে হয়েছে, এই সাংস্কৃতিক জায়গাগুলো যতো বাড়বে, মেলামেশাগুলো বাড়বে, আমাদের মধ্যে আদান-প্রদান বাড়বে; দেখবেন অনেক ভুল ধারণা আছে, যেগুলো ভেঙে যাবে। আর যখন ভেঙে যাবে, তখন আজ যে রাজনীতিবিদরা বলছেন, প্রতিদিন বাংলাদেশে রেইপ হচ্ছে, নির্যাতন হচ্ছে; দেখবেন তারা তখন পালাবার পথ পাবে না; সে যে পক্ষেরই হোক--এপার বলুন আর ওপার বলুন।
এই সত্যিটা আমি বলার চেষ্টা করেছি। আপনারা যারা নতুন প্রজন্ম, আপনারা যাচাই করবেন, ইতিহাসের ঠিক-বেঠিকের জায়গাগুলোকে কষ্টিপাথরে যাচাই করবেন। কেনো ১৯৪০-এ হঠাৎ দ্বি-জাতি তত্ত্বের প্রশ্ন এলো; সেখানে আদৌ ‘পাকিস্তান’ শব্দটি বলা হয়েছিলো কি না। ১৯০৫ কেনো মুসলমানরা একসেপ্ট করেছিলো; কেনো হিন্দুরা করেনি; কেনো রবীন্দ্রনাথ ‘ঘরে বাইরে’তে তথাকথিত এই জাতীয়তাবাদ নিয়ে প্রশ্ন তুললেন--এই জায়গাগুলো আপনারা যতো পড়বেন, দেখবেন আমাদের যে মিথ, সেগুলোকে চ্যালেঞ্জ করার সময় বোধ হয় এসে গেছে।
আমি এটুকুই শুধু বলবো, অনেক গরমের মধ্যে আপনারা ক্লান্ত হয়ে গেছেন। অনেক কষ্ট দিয়েছি আপনাদেরকে, মাফ করবেন। আপনারা ভালো থাকুন। যদি কোনো প্রশ্ন থাকে, আমাকে প্রশ্ন করতে পারেন।
মো. আমিরুল ইসলাম কনক, শিক্ষক, ফোকলোর বিভাগ : আমি প্রথমেই ‘ম্যাজিক লণ্ঠনকে’ ধন্যবাদ জানাই, তারা এই আয়োজনটি করেছে। আমি বলবো যে, আমাদের চোখের সামনে যেসব ঘটনা ঘটে, প্রতিনিয়ত যে ঘটনাগুলো দেখি, খুব সাধারণ ঘটনা--সেগুলো এখানে উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো, আমরা কি তা দেখি? সেই অর্থে আমি মনে করি, সীমান্ত আখ্যান শুধু প্রামাণ্যচিত্র নয়, এটা একটা চোখ। তিনি যে সমস্যাগুলো দেখিয়েছেন, তার সমাধান দেওয়ার দায়িত্ব হয়তো নির্মাতার নয়। কিন্তু তিনি আমাদেরকে দেখিয়েছেন যে, এগুলো সমস্যা এবং আমরা চাইলে নিরসন করতে পারি। আমার প্রশ্ন হলো, অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক কারণে বিভিন্ন রাষ্ট্রে এখন অভিবাসী বা শরণার্থী সমস্যা তৈরি হচ্ছে। এক্ষেত্রে ভারত, বাংলাদেশ বা পাকিস্তান--এখানে সুশাসনের অভাব এবং দুষ্ট রাজনীতি বিরাজ করছে। এটিই মুখ্য বিষয়, সাম্প্রদায়িকতা মূল সমস্যা নয়। দুষ্ট রাজনীতির এই চরিত্রটি অবশ্যই যেনো সীমান্ত আখ্যান-এর পরবর্তী অংশে আসে, আসবে কি? ধন্যবাদ।
সৌমিত্র : আপনাকে ধন্যবাদ। অবশ্যই ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’কে ধন্যবাদ তো বটেই। ওরা উদ্যোগ নিয়েছিলো বলেই তো আমি আপনাদের মুখোমুখি হতে পেরেছি। এবং তরুণরা যে আন্তরিকভাবে গোটা বিষয়টার উদ্যোগ নিয়েছে, আমি সত্যিই অভিভূত। বিনয় নয়, বাড়িয়েও বলছি না, আজকাল কলকাতাতেও চট করে এতো সুশৃঙ্খল অনুষ্ঠান হয় না। আমি জীবনে প্রথম কোথাও পাঁচটার অনুষ্ঠান পাঁচটাতেই শুরু হতে দেখলাম। গোটা ভারতবর্ষে এমনকি বাংলাদেশের বাইরেও পাঁচটার অনুষ্ঠান পাঁচটাতেই শুরু হবে এটা ভাবাই যায় না। বিশেষ করে কলকাতায় ধরে নেওয়া হয়, পাঁচটার অনুষ্ঠান মানে, ওটা তো ছ’টা হবেই! ফলে আমি অভিভূত!
আর দেখুন, এটা তো ঠিকই সব দেশেই দুষ্ট রাজনীতি আছে। আমার একটা কথা রিপিট করছি, এই গুজব যতো চলে যাবে, আমাদের পারস্পরিক সম্পর্ক ভালো হবে, আমরা পরস্পরকে চিনতে পারবো। আর যারা দুষ্ট রাজনীতির লোক, তারা কিন্তু পিছু হটতে বাধ্য হবে। এটা আমার বিশ্বাস। আমি চেষ্টা করবো সীমান্ত আখ্যান-এর পরবর্তী পর্ব নির্মাণের সময় আপনার পরামর্শ মাথায় রাখার।
সাজ্জাদ বকুল, শিক্ষক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ : আমার শিক্ষার্থী আমাকে পরিচয় দিয়েই কথা বলতে বললো। যদিও সৌমিত্র দা'র সঙ্গে আমার আগে থেকেই পরিচয়। দাদার সঙ্গে কাল সন্ধ্যায়ও বেশ জম্পেশ একটা আড্ডা হয়েছে, এই বিষয়গুলোর কিছুটা আমরা সেখানে আলোচনাও করেছি। আমি সিনেমাটার ঠিক শুরুটা দেখতে পাইনি। আমার ক্লাস ছিলো, সেখান থেকে আসতেই দেরি হয়ে গেলো।
পরে যেটুকু সূত্র ধরতে পেরেছি আমি সিনেমাটার, তাতে প্রথমেই আপনি দেশভাগের প্রেক্ষাপট এনেছেন। এরপরে আপনি ভারত ও বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ কী ভাবছে সীমান্ত, কাঁটাতার, দেশভাগ নিয়ে--এই বিষয়গুলো তুলে এনেছেন খুবই চমৎকারভাবে। আমার মনে হয়, আপনার সিনেমাটা আমাদেরকে বোর করেনি। যদিও অনেক সাক্ষাৎকার, তারপরেও বোর করেনি। ভালো লেগেছে, বিষয়গুলো উঠে আসছে।
একটা বিষয় খালি আমার মনে হলো, যা আপনি আনতে পারতেন কি না বা পরবর্তী সময়ে আনবেন কি না। সেটা হলো, সীমান্তের এই যে সাম্প্রতিক উত্তেজনা, আমি সাম্প্রতিকই বলবো, কারণ আজ থেকে ১০ বছরের মধ্যে সীমান্তের চেহারায় একটু বদল দেখতে পাচ্ছি। দেশভাগ তো আমরা সবাই মেনেই নিয়েছি। কিছু করার নেই এখন, এভাবেই চলছি। হঠাৎ করেই আট-দশ বছরে উত্তেজনাটা একটু বেশি দেখতে পাচ্ছি। সীমান্তজুড়ে কাঁটাতার দেওয়া, সীমান্তে হত্যাকাণ্ড বেড়ে যাওয়া--এই সমস্ত বিষয় আগেও ছিলো। কিন্তু গত এক দশকে অনেক বেড়ে গেছে। এর কারণ আমার মনে হয়, বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে ভারতের একটা আন্তরিক সম্পর্ক আছে--সেটি প্রভাব খাটানোর জন্যই হোক, সৎ উদ্দেশ্যেই হোক। সেই আন্তরিকতা থাকা সত্ত্বেও সীমান্তে উত্তেজনাটা বাড়ছে! এটা কিন্তু ভাবনার বিষয়।
অনেক সময় বাইরের লোকের সঙ্গে আমার যতোই খাতির করি না কেনো, তাদেরকে ঘরে আনি না। বাইরে গল্প করি, চা খাওয়াই, নাস্তা করাই--বাইরে থেকে বিদায় করে দিতে চাই। ঘর পর্যন্ত আনতে অনেক সময় দ্বিধাগ্রস্ত হই। সে আমার ঘরের মধ্যে ঢুকে যাবে, আমার অন্দরমহল চিনে যাবে, পরের দিন এসে সুযোগ বুঝে আমাকে ছুরি বসাবে। এই একটা ভয়েই কোনো কোনো মানুষকে বাইরে থেকে যতোই আপন মনে হোক, ভিতরে সেই খাতিরটা করি না।
এখন ভারত বাংলাদেশকে সেরকম আপন মানুষ ভাবছে কি না? এই বিষয়টা ফিল্মের মধ্যে কারো সাক্ষাৎকারে বা কোনো ইঙ্গিতের মধ্য দিয়ে আসতে পারতো কি না? আমরা জানি, পর পর দুই টার্ম আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছে, নেক্সট আরেক টার্মেও হয়তো এই সরকারই আসবে। এরপরেও হয়তো কোনো না কোনো ফর্মে এই সরকার ক্ষমতায় থাকবে। তাহলে ভারত কি ভয় পাচ্ছে? এরা তো এখন অনেক আন্তরিক, ঘনিষ্ঠ হয়ে যাচ্ছে, তাই এখন এদের আটকাতে হবে সীমান্তে। এই রকম ফরমেটে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া, তারপরে সাম্প্রতিক আসামের ঘটনাটা যদি দেখেন, পশ্চিমবঙ্গেও শুনছি এ রকম হতে পারে। সেই জায়গা থেকেই হয়তো আগাম একটা সতর্কতামূলক--কিন্তু সরকারের সঙ্গে যেহেতু ভারতের ভালো সম্পর্ক, মানুষের সঙ্গেও নিশ্চয় ভালো সম্পর্ক থাকবে। এখন বাংলাদেশের মানুষ ভারতে গিয়ে একটা আশ্রয় গড়ার চেষ্টা করবে, ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করবে--এই জায়গাটা থেকে এমন হতে পারে কি না? এর একটা ইঙ্গিত হয়তো সিনেমায় থাকতে পারতো। এর রাজনৈতিক পার্টটাতে হয়তো থাকবে। সাম্প্রতিক সীমান্ত নিয়ে যতো ঘটনা ঘটছে, তার পিছনে এই কারণটা হয়তো সূক্ষ্মভাবে কাজ করছে।
আর ফিল্ম নিয়ে ছোট্ট আরেকটা সংযুক্তি আছে। যেহেতু ফিল্মে আমরা কিছু অংশে বাংলাদেশ আর কিছু অংশে পশ্চিমবঙ্গ দেখতে পাচ্ছি--কিছু জায়গায় আপনি বাংলাদেশের মানুষের নামের ক্ষেত্রে কমা দিয়ে ‘বাংলাদেশ’ লিখেছেন। কিন্তু কখনো কখনো এটা মেইনটেইন না করায় মনোযোগ দিতে একটু সমস্যা হয়েছে। হঠাৎ করেই বুঝতে সমস্যা হচ্ছে, এটা কি ভারতের মানুষ কথা বলছে নাকি বাংলাদেশের। ফলে এই বিষয়টা ধরতে আমার একটু সমস্যা হয়েছে; হয়তো অন্যদের এ সমস্যাটা হচ্ছে না। আর নেপথ্যে কোনো ভয়েসওভার, আপনি হয়তো ইচ্ছে করেই রাখেননি। কিন্তু কোনোভাবেই প্রসঙ্গগুলোকে রিলেইট করা যেতো কি না? একটা প্রসঙ্গ থেকে আরেকটা প্রসঙ্গে যাওয়ার সময় যদি ছোটো করে লিখে একটা লিঙ্ক আপ থাকতো, তাহলে হয়তো আরো সহজে আমরা কানেক্ট করতে পারতাম। এই হচ্ছে আমার বক্তব্য। দাদাকে ধন্যবাদ। ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’কে ধন্যবাদ এমন চমৎকার একটা আয়োজনের জন্য।
সৌমিত্র : ধন্যবাদ। সাজ্জাদ বকুল আমার খুব পুরনো বন্ধু। দুটো প্রশ্ন ও করেছে, আমি যতোটুকু মনে করতে পারছি। প্রথম বিষয়টা অত্যন্ত জটিল, কঠিন এবং সরকারের বৈদেশিক নীতি সম্পর্কিত। আমি সেটা নিয়ে কিছুই বলবো না, বলতে চাইও না। তবে আমার মনে হয়েছে, যদি আপনি প্রথম থেকে সিনেমাটা দেখেন, তাহলে তাতে যা ইঙ্গিত করেছি, তা খুবই পরিষ্কার। অন্যরাও হয়তো একমত হবে যদি তারা সিনেমাটি শুরু থেকে ফলো করে।
আর দ্বিতীয় ব্যাপারটি হচ্ছে, আমি ইচ্ছে করেই ভয়েসওভার দিইনি। আমি চেষ্টা করেছি, একটা এক্সপেরিমেন্ট করার, একটা ফিল্ম এসে (Film Essay) বানানোর। আপনি যদি সিনেমাকে ‘এসে’ হিসেবে দেখেন, আমার মনে হয় ততোটা কঠিন আপনার মনে হবে না। আর কিছু কিছু জায়গায় আমি নাম দিইনি, এটা ঠিক। সেটাও আমি ইচ্ছে করে করেছি, যাতে দর্শকের টোটাল অ্যাটেনশনটা থাকে। ধরেন আপনি যদি ‘চিলেকোঠার সেপাই’ পড়েন, তাহলে আপনাকে তো সময় দিতেই হবে। আর আপনি যদি ‘বাটুল দি গ্রেট’ বা ‘ঠাকুরমার ঝুলি’ পড়েন, তাহলে কিন্তু ধ্যানটা এক হবে না।
কমিক দেখার সময় আর অন্য ধরনের সিনেমা দেখার সময় আপনার মনোযোগ নিশ্চয় এক হবে না। ফলে আমি ইচ্ছে করেই চেষ্টাটা করেছি যে, দর্শক একটু কোথাও কনসেন্ট্রেড করুক, সিরিয়াস সেরিব্রাল জায়গা থেকে সিনেমাটা দেখুক। এটা অ্যাবসলুটলি একটা ‘ভিজ্যুয়াল এসে’ বলতে পারেন, ‘সিনেমা এসে’ বলতে পারেন। তার পরেও প্রত্যেক নির্মাতার কিছু নিজস্ব ভুল-ভ্রান্তি, ভালো-মন্দ চিন্তাভাবনা থাকে। আমি একশো ভাগ ঠিক, এমন দাবি করবো না। অনেক সময় তো আমার নিজেরও মনে হয়, এটা দিলেও হতো, ওটা কাটলে হতো। সেটা তো কনটিনিউয়াস প্রসেস। এটা তো আমি এখনো ভাবছি। কিন্তু ওই যে পার্টিকুলার দুটো জায়গা--ভয়েসওভার বাদ দেওয়া হয়েছে সচেতনভাবে; আর সিনেমা প্রবন্ধ হিসেবে ব্যাপারটাকে আমি দেখতে চেয়েছি। আরো একটা ব্যাপার হচ্ছে, একটা সেরিব্রাল বই বা ম্যাগাজিন আমরা যে অ্যাটেনশন নিয়ে পড়ি, হালকা চটি বই বা সিরিয়ালের বেলায় দেখবেন আমরা কিন্তু সেই অ্যাটেনশনটা দিই না। আমার মনে হয়েছে, বিষয়টার প্রতি একটা অ্যাটেনশন দেওয়ার দরকার আছে। বিষয়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাই নির্মাণটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি মনে করি।
আবদুল্লাহ আল মারুফ, শিক্ষক, ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগ : প্রথমেই ধন্যবাদ, সীমান্ত আখ্যান খুব এনজয় করলাম। একটা বিষয় একটু সংক্ষেপে বলতে চাই, একটা সময় আমরা আসলে ভালোই ছিলাম। যখন কোনো এক ভাদ্র মাসের রাতে, প্রচণ্ড গরম, ঝিরিঝিরি হাওয়া, ঘরের ভিতরে ঘুমাবো নাকি বাইরে ঘুমাবো--আকাশের দিকে চেয়ে চেয়ে চিন্তা করছি। কখন যেনো ঘুমিয়ে গেলাম। হঠাৎ করেই কোথাও কোনো মসজিদে আজান হলো। তখন মাইকের ব্যবহারটাও খুব একটা ছিলো না। কিন্তু আজান, দূর থেকে শব্দ ভেসে আসার যে প্রক্রিয়া বা অন্য ধর্মাবলম্বী মানুষের রীতিনীতি পরিচালনার প্রথাগুলো, সেটা সত্যিই অসাধারণ ছিলো। সমস্যা যেটা হলো, উন্নয়ন; ডেভেলপমেন্ট। এই ডেভেলপমেন্ট আমাদের তিন বেলা খাবারের নিশ্চয়তা হয়তো দিয়েছে, কিন্তু আমরা আস্তে আস্তে এই কাঁটাতারে জড়িয়ে পড়েছি।
এই কাঁটাতার শুধু সীমান্তেই থেমে থাকেনি। আমার ঘরের বেড়াটা শক্ত হয়েছে। ঘরে নড়বড়ে বেড়া দিয়ে শান্তি পাইনি। পরে পুরো ঘরকে, পরিবারকে, বাড়িটাকে কীভাবে আরো শক্ত কাঁটাতারের বেড়া বা ইটের দেয়াল দিয়ে সংরক্ষিত করা যায় সেই চিন্তা করেছি। ফলে এই যে সীমান্ত আখ্যান, আমার কাছে খুব চমৎকারই মনে হয়েছে। দুই দেশের পার্টিশন নিয়ে যে কথাগুলো, এই যে দোষারোপ; ধর্মীয় দিক দিয়েও মানুষ বলছে অত্যাচারিত হওয়ার কথা, পাশাপাশি এমনও বলছে যে আমাদের মধ্যে এখনো সম্প্রীতি আছে। এই যদি হয়, তাহলে শুধু কি ধর্মীয় কারণেই বা শুরুতে পার্টিশনের যে ফিলোসফি ছিলো বা মেসেজ ছিলো তার কারণেই, নাকি এখানে উন্নয়ন একটি বড়ো ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে। যার ফলে আজকের কাঁটাতারের বেড়া শুধু সীমান্ত নয়, আমাদের মনের মধ্যেও বেড়া তুলে দিয়েছে। আপনার পরবর্তী কোনো পর্বে এ নিয়ে কোনো চিন্তাভাবনা আছে কি না? এ বিষয়ে দয়া করে যদি কিছু বলেন--উন্নয়নের সঙ্গে সীমান্তের যে বিভাজন। ধন্যবাদ।
সৌমিত্র : নিশ্চয় আছে। এখন তো আমি আসাম নিয়ে কাজ করছি--এন আর সি (The National Register of Citizens) ও অন্যান্য বিষয় আছে। সেখানেও দেখছি অর্থনীতি একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছে। আপনি সস্তায় কীভাবে শ্রমিক পাবেন, তার চেষ্টা করা হচ্ছে। ফলে আমি প্রথমেই যেমনটা বললাম, আমার খোঁজাটাই আসল। আমি আপনার কাছে এসেছি, আমি নিজেই সব বলবো আর একশো শতাংশ ঠিক বলবো--তার জন্য না। আমি তো বার বার জানতে চাইছি, উল্টো দিকটা আপনারা কীভাবে দেখছেন, কীভাবে ভাবছেন। অবশ্যই অর্থনীতি বলুন, বাজার বলুন, পুঁজি বলুন, ভোট বলুন, ভোট ব্যাংক বলুন, মেট্রোপলিটন বলুন--এগুলো তো হাত ধরাধরি করেই চলে। আমি কিন্তু বার বার যেটা বলার চেষ্টা করেছি, দেশভাগটা ভাঙতে পারে তখনই, যখন সাধারণ আপনি-আমি অনেক বেশি সোচ্চার হতে পারি। আমার-আপনার যাতায়াত অনেক বেশি বাড়তে পারে। আমার বাড়ির লোককে আমি জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ে না পড়িয়ে যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে পারি। আপনি আমাকে খালি সুচিকিৎসার জন্যে নয়, আপনার মেয়েটা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে নাকি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে সে প্রশ্নটা আমাকে করতে পারেন।
দেখুন বিশ্বায়ন বলতে আসলে যা বলা হয়, সেটা পুঁজির বিশ্বায়ন। বিশ্বায়নে পুঁজির কিন্তু কোনো দেয়াল থাকছে না। এ পুঁজি ওখানে যাচ্ছে, ওখানকারটা এখানে আসছে। কিন্তু মানুষে মানুষে দেয়ালটা তুলে দেওয়া হচ্ছে। পুঁজি যারা নিয়ে যাচ্ছে--পুঁজির কোনো দেয়াল থাকছে না। অথচ যাদের জন্য নাকি পুঁজি তাদের মধ্যে কিন্তু ভাগ ভাগ করতে করতে আজকে আসাম হচ্ছে, সিরিয়া হচ্ছে, পৃথিবীব্যাপী এই জায়গার দিকে যাচ্ছে। তাহলে বাঁচার রাস্তা কী হতে পারে? ঠিকই তো একটা ঘৃণা পরস্পরের মধ্যে সেসময় এপারে-ওপারে থেকে গেছে। তার মূল কারণটা কিন্তু না-চেনা, না-জানা। কেউ তো কাউকে চিনি না সেভাবে। আমার কলকাতায় বেশিরভাগ বর্ণহিন্দু তো জানেই না, শবে বরাতটা কী। এই অজ্ঞতাটাই তো এতো দূরত্ব তৈরি করছে। যেটা আপনি বলছেন, অপুও বলছে, আমিও বলছি--কাঁটাতারটা তো মনের কাঁটাতার।
আমি কি আপনাকে মুসলমান হিসেবে দেখবো, নাকি আপনি আমাকে হিন্দু হিসেবে দেখবেন? আপনি আমাকে পরিচালক হিসেবে দেখবেন, আমি আপনাকে দর্শক হিসেবে দেখবো। আমি তো বার বার বলছি, সব জায়গায় এই সিনেমাগুলো দেখাতে চাই। যাতে সবাই এই জায়গাগুলো ভাবে। নির্মাণে আপনি ভুল বলতে পারেন--এই জায়গাটা এমন হলো না কেনো, এই পয়েন্টটা আরো বেশি থাকলে ভালো হতো, এইটা আরো ছোটো করলে পারতেন--এগুলো বিষয়ে আপনার সঙ্গে আমি একমত। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমি কেনো এই সিনেমাটা করছি? দেখুন, আমার দুঃখটা আমি বলেছি। আমিও খুব একটা তরুণ আর নই। ৫৮ বছর বয়স, আর দুই বছর পর সিনিয়র সিটিজেন হয়ে যাবো। আমার যেটা মনে হয়, আজ অব্দি কখনো যখন দেশভাগের গল্প আসে, পশ্চিম বাংলার কথা আমি বলছি, সেখানে কখনো কিন্তু রাজশাহীর কথা আসে না। কখনো মালদা থেকে বা মুর্শিদাবাদ থেকে যে পরিবারটি রাজশাহীতে চলে এসেছিলো, আমরা কোনোদিন তার যন্ত্রণার কথা বলিনি। এই না-বলাটা আমার কাছে মনে হয়েছে অমার্জনীয় একটা অপরাধ।
আমাদের ওপারে যারা মেজরিটি তাদের স্বীকার করা উচিত যে, ভাই উদ্বাস্তু-শরণার্থী সব বুঝলাম। কিন্তু আমরাও যে একেবারে অন্যায় করিনি, তা নয়। নদীয়া থেকে এক রাতে কতো মাড়োয়ারি চলে এসেছে। এইগুলো আপনি যদি আজকে না বলেন; যদি আজ শুধু নিজেকে বাঁচান, নিজেকে ডিফেন্ড করেন, সাফাই দেন, আমি শ্রেষ্ঠ, তুমি দাঙ্গা করেছো। ৪৬-এ গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং তুমিই করেছো, আমি তো কিছুই করিনি, আমি তো কীর্তন শোনাচ্ছিলাম। সেইটা কিন্তু আজকে স্বীকার করা উচিত যে, এটা ঠিক না। ইতিহাসে সবারই দায় আছে। ইতিহাসে জিন্নাহর যদি দায় থেকে থাকে--ঘটনাচক্রে জিন্নাহর আজকে মৃত্যু দিন--তাহলে কিন্তু সমানভাবে পাটেলেরও দায় আছে। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জিরও দায় ছিলো। তিনি খাঁটি ভবানীপুরের লোক হয়েও বাঙালদের কষ্ট বুঝতে পারেননি। ফলে কী হয়েছে? হিন্দু মহাসভার সবচেয়ে বড়ো ঘাঁটি ছিলো শিবগঞ্জ, বরিশাল--সমস্ত জায়গা থেকে এক বছরের মধ্যে হিন্দুরা অদৃশ্য হয়ে গেলো। তারা দলে দলে কলকাতা চলে গেলো। তারা ভেবেছিলো ওখানে জায়গা পাবে, রাজনীতিতে জায়গা পাবে, ক্ষমতায় জায়গা পাবে। আপনি ইতিহাস দেখুন, কোনো জায়গায় তাদের কোনো অস্তিত্বই ছিলো না।
(চলবে)
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন