মাহমুদুল হাসান
প্রকাশিত ২৯ জুন ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
দেবাশিস-এর জুলাই ‘পোস্টার’১
‘ইতিহাসের সত্য ছবি’র হাজিরা, তার (মাহদীয়) রাজনৈতিকতা এবং বাংলাদেশের ‘অনাগত সমাজ’
মাহমুদুল হাসান

অতীতের [ইতিহাস] সত্য ছবি বা ইমেজ [ডায়ালেক্টিকাল ইমেজ] নূরের ঝলক হয়ে দেখা দেয়। অতীতকে [ইতিহাস] তাই কেবল সেই ইমেজ হিসেবেই পাকড়াও বা গ্রেপ্তার করা সম্ভব, যা তাকে চিনে নেওয়ার মুহূর্তেই হঠাৎ উদ্ভাসিত ও উন্মোচিত হয় এবং এর পরে তাকে আর কখনোই দেখতে পাওয়া যায় না। ... ঐতিহাসিক বস্তুবাদ অতীতের [ইতিহাস] সেই ইমেজকেই সুদৃঢ়ভাবে ধারণ করতে চায়। যা মহাবিপর্যয়ের এক সঙ্কটময় মুহূর্তে ইতিহাসের কর্তার [মসীহ] সামনে আকস্মিকভাবে বিজলির ঝলকের ন্যায় হাজির হতে থাকে।
—ওয়াল্টার বেঞ্জামিন, ‘অন দ্য কনসেপ্ট অব হিস্ট্রি’, (থিসিস নং : পাঁচ-ছয়)
স্বরূপ রূপে নয়ন দে রে/ দেখবি সে রূপের অরূপ/ কেমন স্বরূপ ঝলক মারে/ শূন্য ধ্যানের ধ্বজা স্বরূপ/ তারে আজ ভাবো বে-রূপ/ সিরাজ সাঁই বলে রে রূপ/ সাধবি লালন কেমন করে।।
—লালন ফকির
আদি চন্দ্র নূরি বিন্দু রক্তের বন্যায় ভেসে যায়/ ওই নূর সুষুম্নাতে গিয়া ওরে মন
আলমে জবরূতের দিকে করে আগমন/ অমানিশা অন্ধকারেও বিজলির মতো নূর চমকায়
—রশিদ সরকার
তুমি যে নূরেরও নবী/ নিখিলের ধ্যানেরও ছবি/ তুমি না এলে দুনিয়ায়/ আঁধারে ডুবিতো সবই
চাঁদ সুরুজ আকাশে আসে/ সে আলোয় হৃদয় না হাসে/ এলে তাই হে নব রবি/ মানবের মনের আকাশে
—গোলাম মোস্তফা
হয়তো আমাতে আসিছে কল্কি, তোমাতে মেহেদী ঈসা
কে জানে কাহার অন্ত ও আদি, কে পায় তাহার দিশা?
—কাজী নজরুল ইসলাম
ভূমিকা
কোন রাজনৈতিকতার ভেতর দিয়ে নিখিলের এই ‘ধ্যানের ছবি’, ‘রূপের ঝলক’ বা ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের ‘ইতিহাসের সত্য ছবি’কে পাকড়াও করা যায়? সেই রাজনৈতিকতা কি আমাদের সামনে হাজির হয়েছিলো? হলে তার ছবি কেমন? কিংবা আমাদের সামনে ‘ইতিহাসের যে সত্য ছবি’ [ডায়ালেক্টিকাল ইমেজ] এসে হাজির হয় সেটাকেইবা কীভাবে পাকড়াও করা সম্ভব? আর এই পাকড়াওকরণ কেনোইবা জরুরি? সেটার জরুরত এ কারণেই যে, তার ভেতর দিয়েই নতুন রাজনৈতিক দিশা পাওয়া সম্ভব বলে মনে করেন জার্মান ভাবুক ওয়াল্টার বেঞ্জামিন। এখন প্রশ্ন জাগে, এই ছবি কেমন ছবি? তাকে চিনবো কীভাবে? বা কী তার পরিচয়? তা নতুন করে কী বলতে চায়? বা তার ভেতর দিয়ে কী ধরনের নতুন রাজনৈতিকতার নিশানা পেতে পারি? এখানেই বলে রাখা ভালো, যখনই তা সব ধরনের পরিচয়ের (identity) বাইরে অবস্থান করে, ঠিক তখনই তা ওই ছবির উত্তরসূরি হয়ে ওঠে। এবং ওই ছবি তার সব সম্ভাবনা নিয়ে হাজির হবে, ব্যাপারটা এমনও নয়। বরং বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তার কিছু সম্ভাবনা হাজির হয়, আর কিছু খারিজ হয়ে যেতে থাকে। এবং যে সম্ভাবনাটুকু টিকে থাকে তা বর্তমান ছবির ওপর ভর করে বসে ভূতের [স্পেকটার] মতো।
বেঞ্জামিন তাই বলছেন, ‘এই [ডায়ালেক্টিকাল] ইমেজ হলো সেই ক্ষেত্র বা পাটাতন যেখানে অতীত [ইতিহাস] হঠাৎই বিদ্যুতের ঝলকের ন্যায় হাজির হয়ে বর্তমানের সঙ্গে মিলিত হয়। এবং এই পরিস্থিতি এক নিশানাময় জ্যোতিষ্কপুঞ্জের মতো বর্তমানের আকাশে বিরাজ করতে থাকে। যা নতুনভাবে ইতিহাসকে বিবেচনা করতে বাধ্য করে।’২ ২০২৪ খ্রিস্টাব্দের জুলাইও নানা ধরনের ইমেজ ও ভিজ্যুয়াল নিয়ে হাজির হয়েছিলো। বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তা এবং একটা বিশেষ শ্রেণির বাইরে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষও প্রভাবিত হয়েছিলো সেই ইমেজে। এর ফলেই বলা হচ্ছে, বাংলাদেশের জনগণের সামনে ওই ‘ধ্যানের ছবি’র মতো রাজনৈতিকতা নিয়ে হাজির হয়েছিলো জুলাই। তাহলে তার হাজিরা দেওয়া বা হাজির হওয়া ইমেজগুলো কী? তা কী ম্যানিফেস্ট নিয়ে হাজির হয়েছিলো, তার কতোটুকু বাস্তবে দেখা গেছে পরবর্তী সময়ে, সেসব জিজ্ঞাসাগুলোকেই ক্রিটিকাল থিউরির আওতায় এনে ভাবা, ভাবুকতার আওতাভুক্ত করাই এই আলোচনার কেন্দ্রীয় বিষয়বস্তু।
দেবাশিস চক্রবর্তীর জুলাইজুড়ে করা ভিজ্যুয়াল ‘পোস্টার’কে বিবেচনা করা হয়েছে সেই পাটাতন হিসেবে যা ‘ডায়ালেক্টিকাল’। কারণ এই ‘ডায়ালেক্টিক্সে’র ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের নতুন ফর্ম হাজির হয়েছে বলা চলে। এবং তার হাজির করা ভিজ্যুয়াল ফর্ম আলাদা একটা স্পিরিটের জায়গা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলো। দেবাশিস নিজেই বলেছেন, তার ‘লক্ষ্য একটাই ছিল, [জুলাই আন্দোলন চলাকালীন] প্রতি মুহূর্তে যেকোনো ঘটনাকে কেন্দ্র করে, সাংস্কৃতিক বিষয়াদি নিয়ে বাংলাদেশি জনগণের মধ্যে যে [শাপলা-শাহবাগ] দুই গোত্রে ভাগ হয়ে মারামারির প্রবণতা, তাকে পাশ কাটিয়ে সকল চিন্তা-কল্পনাকে রাষ্ট্র ক্ষমতার দিকে ঠেলে দেয়া। রাষ্ট্রকে সম্বোধন করে বহু মানুষের কল্যাণ এবং মুক্তিকে কল্পনা করে অবিরাম পথ খোঁজার চেষ্টাটাই জ্ঞানে-অজ্ঞানে কাজ করেছে।’৩ কাজেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের যে ব্লাঙ্কস্পট—শাপলা-শাহবাগের বাইনারি, তাকে পাশ কাটিয়ে নতুন রাজনৈতিক চিন্তার যে ফর্মকে তিনি হাজির করতে চেয়েছেন, সেটাকে ধরতে গিয়েই এই বিবেচনা। এবং এই বিবেচনাটাকে মাথায় নিয়ে সেই ভিজ্যুয়ালসমূহের উদ্দেশ্য, দাগ-খতিয়ান, জিনিওলজি এবং পরবর্তী সময়ে তার প্রতিফলন খুঁটিয়ে দেখার কোশেশ করা হয়েছে এখানে।
তত্ত্বীয় কাঠামো
তাত্ত্বিক কাঠামো হিসেবে কয়েকটা তত্ত্ব এই কাজের ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। তবে প্রধান তত্ত্বগত ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের ‘ডায়ালেক্টিকাল ইমেজ’কে। কারণ হিসেবে আগেই বলে নেওয়া হয়েছে, দেবাশিসের কাজ বা ভিজ্যুয়ালকে সেই পাটাতন (threshold) হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে, যা ‘ঐতিহাসিক বস্তুবাদে’র আওতাভুক্ত। এবং মার্কসীয় এই চিন্তাকেই ওয়াল্টার বেঞ্জামিন এমন এক জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছেন, যা ইমেজের মধ্য দিয়ে ফাংশন করে। এবং তা সরল রৈখিক ইতিহাসের ধারণাকে (হোমাজেনাস এম্পটি টাইম) পুরোপুরি ভেঙে ফেলে। বেঞ্জামিন তার ‘অর্কেডস প্রজেক্ট’ নামক বইয়ে এই তত্ত্বকে একটা মজবুত তাত্ত্বিক ভিত্তি দেওয়ার কোশেশ করেছেন। তবে তার গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ ‘অন দ্য কনসেপ্ট অব হিস্ট্রি’তে তিনি এটাকে অনেক বেশি সহজতর ও বোধগম্য করে ব্যাখ্যা করেছেন। ‘অর্কেডস প্রজেক্ট’ বইয়ে তিনি এডমুন্ড হুসার্ল-এর ফেনোমেনোলজি এবং তার ‘ডায়ালেক্টিকাল ইমেজ’ ধারণার মধ্যে ভেদনিরূপণের কোশেশ করেছেন। বেঞ্জামিন বলছেন, হুসার্লের ফেনোমেনোলজি’র যে ‘ধাত’বা ‘ইসেন্স’ তা প্রতিটা বাস্তব ঘটনা এবং তার সম্পর্কিত নানা উপাত্ত থেকে পাওয়া বা জানা সম্ভব। কিন্তু ‘ডায়ালেক্টিকাল ইমেজ’কে কেবল তার ঐতিহাসিকতা এবং ঐতিহাসিক সূচকের মাধ্যমেই সংজ্ঞায়িত করা সম্ভব। এর বাইরে তাকে সংজ্ঞায়নের আওতাভুক্ত করা সম্ভব নয়। অর্থাৎ তার ঐতিহাসিকতাই তাকে বর্তমানের সঙ্গে যুক্ত করে। আর যেখানে ‘ইন্টেনশনালিটি’ [সত্য জানার ইচ্ছা] হুসার্লের ফেনোমেনোলজির পূর্বশর্ত হিসেবে কাজ করে, সেখানে ‘ডায়ালেক্টিকাল ইমেজ’ খোদ সত্য ইতিহাসের [যা আগে ঘটেছে, তার উপস্থাপনা আলাদা হতে পারে] ভেতর দিয়ে আবির্ভূত হতে থাকে। আর এই আবির্ভাব ওই ‘ইন্টেনশনালিটি’র মৃত্যু ঘটিয়ে ছাড়ে। আর ঠিক তখনই গোটা দর্শনের কাজ হয়ে দাঁড়ায় সেই ইমেজগুলোকে ইতিহাস ও ঐতিহাসিকতার ভেতর দিয়ে চিনে নিতে পারা এবং নতুন করে নির্মাণ করতে পারা।
তবে বেঞ্জামিনের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সেই ইমেজগুলোকে দ্বান্দ্বিকতার যে গতিময়তা (dialectical movement), তার মধ্যে নিয়ে এসে সংজ্ঞায়ন করা। আর এই গতিময়তা পাকড়াও হতে থাকে ঠিক তার থেমে যাওয়ার মুহূর্তেই (standstill)। আর এই থেমে যাওয়ার মুহূর্তটা এমন নয় যে, অতীতকে বর্তমানের আলোতে বোঝা বা বর্তমানকে অতীতের আলোতে বোঝা। বরং এই থেমে যাওয়া মুহূর্তের ইমেজ হলো, সেই ক্ষেত্র বা পাটাতন, যেখানে অতীত হঠাৎই বিদ্যুতের ঝলকের ন্যায় হাজির হয়ে বর্তমানের সঙ্গে মিলিত হয়। আর এখানেই ঐতিহাসিকতা তার সরলরৈখিকতা হারায়। এবং মিলিত ওই পরিস্থিতি বর্তমানের আকাশে জ্যোতিষ্কপুঞ্জের ন্যায় বিরাজ করতে থাকে। যা নতুনভাবে ইতিহাসকে বিবেচনা করতে বাধ্য করে। আর জ্যোতিষ্কের সেই আলো নতুন করে পথ দেখায়।৪
অন্যদিকে গাই দেবোর্দ বলছেন, বর্তমান সমাজে পুঁজি আসলে ফাংশন করে ইমেজের ভেতর দিয়ে; আমাদের দৃষ্টির পরিসরকে কেবলই কিছু জৌলুসপূর্ণ, ঝাকমারি ইমেজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে চায়। যা দেখে চোখ ঝলসে যাওয়ার উপক্রম ঘটে। আর এটাকেই বেঞ্জামিন বলেন, ‘ফ্যান্টাসমাগোরিয়া’। মানে ইমেজের ভেতর দিয়ে পুঁজি তো কাজ করেই, উপরন্তু তা মানুষকে চোখ ঝলসানো বাস্তবতার সম্মুখীন করে; লালন ফকিরের বয়ানে ‘... ঝাকমারি দুনিয়াদারি’র মতো ব্যাপার। যাইহোক, এর ফলে ওই ইমেজের দ্রষ্টা তথা মানুষ আলাদা একটা বাস্তবতায় আটকে যায়। আর এই আটকে যাওয়াটাকেই আরো সহজ করে তোলে স্পেক্টাকল (ঝাকমারি দুনিয়াদারি)। তাই স্পেক্টাকল হলো—
‘... মানুষের মধ্যকার সেই সামাজিক সম্পর্ক যা ইমেজের মাধ্যমে মধ্যস্থতা হয়’। অর্থাৎ, মানুষের সামাজিক সম্পর্ক, সেই সামাজিকতাকে কেন্দ্র করে এবং সেগুলোকে ব্যবহারের মাধ্যমে সৃষ্ট প্রবঞ্চনা এবং বিচ্ছিন্নতাই হলো স্পেক্টাকল। অথবা আরো সংক্ষিপ্ত করে বলা যায়—‘স্পেক্টাকল হলো এমন এক পর্যায়ের পুঞ্জীভূত পুঁজি, যা খোদ ইমেজে পরিণত হয়’। আর ঠিক এ কারণেই স্পেক্টাকল আসলে বিচ্ছিন্নতারই এক বিশুদ্ধ রূপ। যখন বাস্তব জগৎ ছবিতে রূপান্তরিত হয় আর সেই ছবিগুলোই বাস্তব হয়ে ওঠে, তখন মানুষের ব্যবহারিকতা বা কার্যক্ষমতা আর তার নিজের কাছে থাকে না। তার নিজের কাছ থেকেই তা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং একটা আলাদা জগতের মতো হয়ে আমাদের সামনে উপস্থাপিত হতে থাকে।৫
এখানে দেবোর্দ ইমেজকে যেমন স্পেক্টাকল হিসেবে বিবেচনা করছেন, একইসঙ্গে বিচ্ছিন্নতার কারণ হিসেবেও। আর ঠিক এখানেই ইন্টারভেনশন ঘটান আগামবেন। তিনি তার ‘দ্য কামিং কমিউনিটি’ বইয়ের ‘শেকিনাহ’ নামক প্রবন্ধে বলেন, স্পেক্টাকল ‘... নীতিগতভাবে খোদ ভাষার মধ্যেও বিচ্ছিন্নতা তৈরি করে; তেমনভাবে বিচ্ছিন্নতা তৈরি করে মানুষের স্বভাবগত ভাষিক স্বভাব ও যোগাযোগমূলক স্বভাবের মধ্যে; এমনকি সেই ভাষার (Logos) মধ্যেও ...। ... আর ঠিক এ কারণেই স্পেক্টাকলের সহিংসতা এতোটা বিধ্বংসী হয়ে ওঠে। কিন্তু ঠিক একই কারণে স্পেক্টাকল এমন এক ধরনের ইতিবাচক সম্ভাবনাকেও ধারণ করে রাখে, যেটাকে শেষ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধেই ব্যবহার করা সম্ভব।’৬অর্থাৎ স্পেক্টাকল ইমেজের ভেতর দিয়ে যেমন সত্তাগত বিচ্ছিন্নতা তৈরি করে, তেমনই তার মধ্যেই সেই সত্তাকে পুনরায় উদ্ধারের সমূহ সম্ভাবনাও থেকে যায়। আর ঠিক এই সম্ভাবনাকেই তিনি বলেন, ‘ইমেজের মাহদীয় ক্ষমতা’, যেটা কেবল ইমেজের মধ্য দিয়েই উদ্ধার করা সম্ভব। এর আগে তিনি বলে নেন যে, এই ইমেজ হলো আমাদের বাসনার রূপ।৭ জিল দ্যেলুজ ও ফেলিক্স গাত্তারি তাদের ‘এন্টি ইডিপাস : ক্যাপিটালিজম অ্যান্ড স্কিজোফ্রেনিয়া’ বইয়ে এই বাসনাকে ফ্রয়েডীয় ‘অবদমনে’র ধারণা থেকে বের করে আনেন। তারা জানান, ‘নন-ফ্যাসিস্ট লাইফ’ যাপনের জন্য তাকে ‘প্রোডাক্টিভ’ ও ‘বৈপ্লবিক’ করে তোলা জরুরি।৮ তাই সেই ‘বৈপ্লবিক’ ও ‘প্রোডাক্টিভ’ বাসনা নামক সম্ভাবনার উন্মোচনের অর্থ দাঁড়ায় মানুষের ভেতরকার বাসনাকেই ভাষিক পরিসরে এনে হাজির করা।
এখানে বলে রাখা ভালো, আগামবেনের হাজির করা ‘মেসিয়ানিক’-এর ধারণাকে জাক দেরিদা’র ‘মাহদীবাদহীন মাহদীয়’ [messianic without messianism] রাজনীতির ধারণার ক্রিটিক হিসেবেও পাঠ করা যায়। ৯০-এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনকে দেরিদা মার্কসবাদের পতন হিসেবে পাঠ না করে বরং তার নতুন রূপ হিসেবে বিকশিত হওয়ার সময় বলে চিহ্নিত করেন। মানে সাম্যবাদের সমাজ বা মসীহকে সবসময় অনাগত, আনট্রেসেবল হিসেবে রেখে তার অনুপস্থিতিকে উদ্যাপনের রাজনীতিই হলো ‘মাহদীবাদহীন মাহদীয়’ রাজনীতি। দেরিদার এই শূন্যতার উদ্যাপন-নির্ভর মেসিয়ানিক তত্ত্ব হয়তো আমাদের সামনে হাজির থাকা আইনের দ্ব্যর্থতা, অর্থহীনতা, জুলুমকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় এবং মতাদর্শ ও রাজনৈতিক প্রকল্পের মুখোশ খুলে উন্মোচন করে তার দানবীয় চেহারা। কিন্তু আবার সেই মুখোশহীন দানবকে তার জায়গাতে স্বগৌরবে বহালও রাখে। কিন্তু আগামবেনের কাছে সেই উন্মোচনই শেষ কথা নয়, বরং তিনি ইবনে আরাবি’র বরাত দিয়ে সেই শূন্যতাকে ফানা করার কথা বলেন। এবং প্রস্তাব করেন সেই অর্থহীনতাকে তার বিরুদ্ধেই ‘ব্যবহার’ ও তাকে নিয়ে লীলা করার।৯ আর ঠিক তখনই সেই মেসিয়ানিকতা নাজাত আকারে হাজির (beatitude of paradise) হতে থাকে। তাই আগামবেন বলেন—
আমাদের এই বাসনার কারণেই ধরাধামে তার [মসীহ] হাজিরা। তিনি সেই বাসনার ভেতরে থাকা ইমেজকে খোদ বাসনা থেকে আলাদা করেন; সেগুলোকে পরিপূর্ণ করেন। বা এটা আমাদের সামনে দেখান যে, সেই বাসনা আগেই পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। অথবা যা কিছু আমরা কল্পনা করেছিলাম তা ইতোমধ্যেই পেয়ে গেছি। কেবল অবশিষ্ট আছে সেই অপূরণযোগ্য ইমেজগুলো, যেগুলো আবার ইতোমধ্যেই পূর্ণ হয়ে থাকা পরিস্থিতিরই ছায়ামাত্র। বাসনা যখন পরিপূর্ণ হয়ে যায়, তখন তিনি সেই বাসনা দিয়েই দোজখ বা জাহান্নাম তৈরি করেন। আর অপূরণযোগ্য ইমেজ দিয়েই নির্মিতি ঘটাতে থাকেন দোজখের দরজা। আর শুদ্ধ শব্দের মাধ্যমিকতার ভেতর দিয়ে উন্মোচিত বাসনা দিয়েই নির্মাণ ঘটান সেই নাজাতের পূণ্যভূমি, যা বেহেশতের সুবাস আর সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে।১০
আগামবেনের এই চিন্তার সঙ্গে বাসনাকে নেতিকরণের সম্পর্ক আছে। আগামবেনের বিবেচনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা যায় এভাবে যে, নিওলিবারেলিজম এই বাসনাকেই ‘প্রোডাক্টিভিটি’র ভেতরে এনে পুঁজির কাজে লাগায়। তাই সেই বাসনার ‘শুদ্ধতম রূপ’কে হাজির করতে গিয়ে যেটার জরুরত পড়ে তা হলো, সেই বাসনাকেই নেতির ভেতর দিয়ে নিয়ে যাওয়া। মানে আগামবেন যেখানে স্পেক্টাকলকে নেতিকরণ করে তার ভেতরকার বাসনাকে উন্মোচন করেন, তেমনই সেই বাসনাকেও আবার নেতিকরণের দরকার পড়ে, অর্থাৎ ‘নেতিরও নেতিকরণ’ বা ‘নফির নফিকরণ’ যাকে বলে। আর তাতেই নিত্য হাজিরা দিতে লালন ফকির ঘোষণা করেছেন, ‘নফি-এজবাত [Negation-Affirmation] যে জানে না/ মিছে রে তার পড়াশোনা/ লালন কয় ভেদ উপাসনা/ না বুঝে চটকে মরে’।
আর এই নফি-এজবাতে’র ভেতর দিয়ে যে সত্তার উন্মোচন ঘটে, সেটাই হলো আগামবেনের ‘হোয়াইভার বিয়িং’।১১ অর্থাৎ তা এমন এক সত্তাগত রূপ যার কোনো পূর্বনির্ধারিত আইডেন্টিটি থাকে না বা নাই। এবং সব ধরনের পূর্ব নির্ধারিত আইডেন্টিটির সে নফিকরণ ঘটায়। এর ফলে সে যেমন একক সত্তা আবার তা সমষ্টির আকাক্সক্ষাতেও পরিণত হয়। আবার সমষ্টি থেকে এককেও পরিণত হয়। জুলাইয়ে আবু সাঈদ তেমনই এক সত্তা হিসেবে হাজির হয়েছিলো। আবার তারই স্পিরিট ধারণ করেছিলো গোটা বাংলাদেশের জনগণ। আর সেই সত্তাগত রূপের পরিচয় লালন ফকিরের বয়ানে পাওয়া যায় এভাবে—
ডানে বেদ বামে কোরান/ মাঝখানে ফকিরের বয়ান
যার হয়েছে দিব্যজ্ঞান সেই জানতে পায়
নফির জোরে পাবি দেখা/ বেদে নাই যা চিহ্নরেখা
সিরাজ সাঁই কয় লালন বোকা/ এসব ধোঁকাতে হারায়।।
আর সেই সব চিন্তার ম্যানিফেস্টেশন জুলাইজুড়ে দেবাশিসে’র ‘পোস্টারে’ পাওয়া যায় নানাভাবে। এখন তা পরবর্তী সময়কার রাজনৈতিক বাস্তবতায় কতোটুকু টিকে থেকেছে সেটাও আলোচনার বিষয়। তাই এখানে তত্ত্বাকারে যেমন উপরে হাজির করা বিষয়গুলোকে আমলে নেওয়া হয়েছে, তেমনই ইমেজের ‘সিম্বলিক লেয়ার’, ‘অর্থ উৎপাদনের প্রক্রিয়া’, ‘অর্থের লড়াইয়ের সাংস্কৃতিক নানা ক্ষেত্র’কে চিহ্নিতকরণ ও ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ‘সেমিওটিক্স’ ও ‘রিপ্রেজেন্টেশন’১২ তত্ত্বকেও কাজে লাগানো হয়েছে। একইসঙ্গে ওই সব ইমেজগুলোর যে বয়ান, এবং তার সঙ্গে বাস্তবতা, বয়ানের তফাত, সেগুলোকে ধরতে গিয়ে ফুকোডিয়ান ‘ডিসকোর্সে’রও শরণাপন্ন হতে হয়েছে।১৩
পোস্টার বাছাইকরণ : কারণ ও যৌক্তিকতা
পুরো জুলাইকে কেন্দ্র করে দেবাশিসের করা পোস্টারের সংখ্যা ১৫০-২০০টার মতো বা তারও বেশি। সবগুলো পোস্টার নিয়ে কাজ করা বেশ দুরূহ ব্যাপার। তাই ‘তাত্ত্বিক বা উদ্দেশ্যমূলক নমুনায়নে’র মাধ্যমে ১০টা পোস্টারকে বাছাই করা হয়েছে।১৪ ২০২৫ খ্রিস্টাব্দে জুলাইয়ের এক বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে ‘বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি’ দেবাশিসে’র জুলাইয়ে করা পোস্টারগুলোকে ‘রাষ্ট্র যন্ত্রণা’ নামে সিরিজ আকারে প্রকাশ করে। সেখানে তার করা মোট ২০টা পোস্টার জায়গা পেয়েছে। সেগুলো যদিও দেবাশিসের নিজেরই বাছাই করা। সেখান থেকে সাতটা পোস্টার এবং জুলাই পরবর্তী বাস্তবতাকে বুঝতে জুলাই পরবর্তী সময়ের তিনটি পোস্টার বাছাই করা হয়েছে এ প্রবন্ধে। আর ভূমিকাতেই বলে নেওয়া হয়েছে, এই কাজ মূলত দুটো বিষয়কে তল্লাশির আওতায় আনে—এক. জুলাইয়ের সময়কার রাজনৈতিকতা, দুই. তার পরবর্তী সময়কার বাস্তবতা ও তার রাজনৈতিকতা। তাই নমুনায়নেও এ বিষয়টা গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় রাখা হয়েছে। বাছাইকরণের ক্ষেত্রে আরো একটা বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে; এবং বলতে গেলে এটাই পোস্টারগুলোকে চূড়ান্তকরণের মূল প্যারামিটার। সেটা হলো—ঘটনাকেন্দ্রিকতা। অর্থাৎ দেবাশিস নিজেই বলেছেন, তার কাজগুলো মূলত ঘটনাকেন্দ্রিক। অর্থাৎ জুলাইয়ের কোনো বিশেষ ঘটনার ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিকতার ইতিহাসে ঘটে যাওয়া তাৎপর্যপূর্ণ পূর্ববর্তী গুরুত্বপূর্ণ কোনো ঘটনার ইঙ্গিত যখনই দেবাশিস টের পেয়েছেন, তখনই সেটাকে নতুন চিন্তার ছাঁচে ফেলে পোর্ট্রে করেছেন। এবং এখানেই তার শিল্পকর্মের ডায়ালেক্টিকাল চরিত্র ধরা পড়ে। তাই নমুনায়নের ক্ষেত্রে সেই রাজনৈতিকতা সম্বলিত ঘটনা এবং তার সঙ্গে হাজির হওয়া পূর্ববর্তী রাজনৈতিক ঘটনার সংযোগ-বিয়োগ ও ডায়ালেক্টিক্সকে মাথায় রাখা হয়েছে। এছাড়া তত্ত্বের ব্যবহার ও তার প্রাসঙ্গিকতা এবং সেই সব তত্ত্বের ওপর দাঁড়িয়ে করা অনুমিতি বা হাইপোথিসিস আরেকটা প্যারামিটার হিসেবেও কাজ করেছে।
প্রাসঙ্গিক পূর্বপাঠ
এর আগে জুলাইয়ের পোস্টারকে এভাবে তত্ত্বায়নের আওতায় আনা হয়েছে কিনা বলা মুশকিল। সম্ভবত একটু বড়ো পরিসরে এবং ‘গবেষণা’ আকারে এটাই প্রথম প্রচেষ্টা। তাই এই পাঠে কোনো পূর্বপাঠ হাজির করা দুরূহও বটে। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে ‘স্ট্যাটাসে’র মাধ্যমে পারভেজ আলম জুলাইয়ের পোস্টারগুলোকে বেঞ্জামিনের ‘ডায়ালেক্টিকাল ইমেজে’র ছাঁচে ফেলে পাঠ করার কোশেশ করেছেন। কিন্তু তা কেবলই ফেইসবুকে দেওয়া ‘স্ট্যাটাসে’র মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো। পরে ‘বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি’র উদ্যোগে দেবাশিসের পোস্টারের যে সিরিজ বের হয়,১৫ সেখানে ওই প্রতিষ্ঠানেরই মহাপরিচালক ড. সৈয়দ জামিল-এর লেখা একটা প্রবন্ধ যুক্ত হয়েছে ‘দেবাশিস চক্রবর্তীর পোস্টার-শিল্প : গণতান্ত্রিক কল্পনা, রাজনৈতিক বিদ্রোহ ও যৌথ স্মৃতির জনশিল্প’ নামে। সেখানে লেখক যুক্তি দেন, এই ‘পোস্টার’গুলোকে বেঞ্জামিনের ‘মহিমা’ ধারণার প্রয়োগ করে পাঠ করা সম্ভব। বেঞ্জামিন জানান, শিল্প যখন তার ‘মহিমা’কে অতিক্রম করে যায়, তথা ‘কাল্ট ভ্যালু’ অতিক্রম করে ‘এক্সিবিশন ভ্যালু’তে গিয়ে পৌঁছায়, তখনই তা গণতন্ত্রের সিম্বল বা হাতিয়ার হয়ে ওঠে। দেবাশিসের পোস্টারগুলোও একই দিক থেকে সেই ‘মহিমা’কে অতিক্রম করে গিয়ে গণতন্ত্রের হাতিয়ার হয়ে উঠেছিলো। জন-গণ-মনের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছিলো। ‘গণবাসনা’কেই ভাষা দিয়েছে তার পোস্টারসমূহ।
আবার একই সিরিজে খোদ দেবাশিস একটা প্রবন্ধ লিখেছেন ‘রাষ্ট্র যন্ত্রণা’ নামে। সেটাকে অনেকটাই ‘কৈফিয়তমূলক’ও বলা চলে। অর্থাৎ কীভাবে তিনি এই শিল্প রচনার প্রয়াস পেয়েছেন, কীভাবে তার উপাদান কর্জ করেছেন, কীভাবে তার এই শিল্প রচনার শুরু, কোন রাজনৈতিকতার ভেতর দিয়ে তার এই অনুভূতিগুলোকে পোস্টারে ভাষা দিয়েছেন, সেখানে রাষ্ট্রের নিপীড়নকে অস্বীকার করার মধ্য দিয়ে যে কর্তাসত্তার আবির্ভাব, তাকে শিল্পের মধ্য দিয়ে ভাষা দেওয়া, এসবই আলোচিত হয়েছে।
সবশেষে ওই সিরিজেই পারভেজ আলম লিখিত একটা প্রবন্ধ সংযুক্ত করা হয়েছে। তার শিরোনাম—‘জুলাইয়ের ধূমকেতু’। সেখানে কেবল একটা পোস্টার নিয়ে আলাপ করেছেন তিনি। ১৬ জুলাই আবু সাঈদকে হত্যা করা হলো। এরপরই ইন্টারনেট ব্ল্যাক আউট করে দেওয়া হয়। প্রথম ইন্টারনেট ব্ল্যাক আউট সমাপ্তির পরে ২৩ জুলাই দেবাশিসের করা ‘রক্তাক্ত জুলাই (Bloody July in Bangladesh)’ নামক পোস্টার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, বিশেষ করে ফেইসবুকে ছড়িয়ে পড়ে ও ভাইরাল হয়। পারভেজ আলম মূলত ওই পোস্টারকে ধরেই তার লেখাটা লিখেছেন। সেখানে তিনি ওই পোস্টারকে বেঞ্জামিনের ডায়ালেক্টিকাল ইমেজ হিসেবে বিবেচনা করেছেন। যা নূরের ঝলকের মতো দেখা দিয়েছিলো বাংলাদেশের নাগরিকের কালেক্টিভ কনশাসে। আর সেটাই তাদেরকে সেই সময়কার রাজনৈতিকতাকে নতুন করে বিবেচনা করতে বাধ্য করেছে।
কিন্তু সিরিজটার ভেতর দিয়ে জুলাইকে ‘আর্কাইভ’ করে রাখাটাই ছিলো মূল প্রচেষ্টা। কিন্তু দেবাশিস তার শিল্পকর্ম জুলাইয়ের পরেও চালিয়ে গেছেন। এমনকি এখনো প্রাসঙ্গিক নানা রাজনৈতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে তার কাজ চলমান। তাই নন-অ্যাকাডেমিক পরিসরে তার শিল্পকর্মে জুলাইয়ের সময়কার রাজনৈতিকতা কীভাবে হাজির হয়েছে সেটার কিছুটা আলামত পাওয়া গেলেও পরবর্তী সময়কার রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে আলোচনা তেমন হয় নাই। সেই দিক থেকে এই কাজের মাধ্যমে যেমন ওই সময়টাকে আরো ভালোভাবে বোঝার কোশেশ করা হয়েছে (অ্যাকাডেমিক পরিসরে এনে), তেমনই পরবর্তী বাস্তবতা নিয়ে যেহেতু তেমন কোনো আলোচনা নাই, তাই সেটাকেও আলোচনার আওতাভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া ওই সব ছবির সঙ্গে ডায়ালেক্টিকাল সম্পর্ক তৈরি করা রাজনৈতিক ইতিহাসকে সামনে এনে বর্তমান রাজনৈতিকতাকে ঐতিহাসিকতার সঙ্গে মিলিয়ে পাঠের চেষ্টা করা হয়েছে।
‘ইতিহাসের সত্য ছবি’ ও তার ‘মাহদীয় ক্ষমতা’র ওজুদ-মজুদ
এক. ‘রক্তাক্ত জুলাই (Bloody July in Bangladesh)’
‘রক্তাক্ত জুলাই (Bloody July in Bangladesh)’ পোস্টারের একটা বিশেষত্ব আছে। শহীদ আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যার পরে [১৬ জুলাই], এটা ভাইরাল হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। তাকে [আবু সাঈদ] খসে পড়া ‘উল্কা’র প্রতীকে ছবিতে হাজির করেছেন দেবাশিস। আর তা সবচেয়ে বেশি গণআকাক্সক্ষাকে ধারণ করেছে বলেই মনে হয়। যেনোবা ওই রকম খসে পড়াই রাষ্ট্রের নাগরিকের নিয়তি। যেনো শাহাদাতের অনন্ত পুনরাবৃত্তিই ছবিটার মূল ফিগারের সিম্বলিক তথা রাষ্ট্রের নাগরিকের একমাত্র পরিণতি। কিন্তু সেই মৃতদেহকে দুই হাতে উঁচিয়ে নির্বিকার দৃষ্টিতে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা যুবক তাহলে কীসের প্রতিনিধিত্ব করে? সে সেই মৃত্যুর সাক্ষ্যদাতা। সে সাক্ষ্য দিতে এসেছে আর বিচার চাইতে এসেছে, ন্যায় চাইতে এসেছে, প্রতিবাদ, প্রতিরোধ করতে এসেছে। রাষ্ট্রের জুলুমকে নেতিকরণ করার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক এবং ঐতিহাসিক কর্তাসত্তার সার্বভৌমত্বের যে স্বীকৃতি, সেটাই তার একমাত্র মাকসাদ। কাজেই তার রাজনৈতিকতা হলো দুনিয়াবি শয়তানের সার্বভৌমত্বকে (রাষ্ট্র ও অ্যাপোক্যালিপ্টিকতা) নফি করে সেখানে খোদার ন্যায়ভিত্তিক সার্বভৌমত্বের পুনঃপ্রতিষ্ঠা [জনগণের সার্বভৌমত্ব, মাহদিয়াত] করার রাজনৈতিকতা। যা খোদার সৃষ্টি মানুষকে জুলুম থেকে রক্ষা করে। নিজের কর্তাসত্তাকে নতুন করে চিনে নিতে শেখায়। আগামবেন তার ‘কামিং কমিউনিটি’ বইয়ে বলছেন, এই মাহদিয়াত কেবল সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিতেই সীমাবদ্ধ না, এমনকি তা ভবিষ্যতের কোনো অনাগত চরিত্রকেও কল্পনা করে না, বরং ‘হোয়াটইভার বিয়িং’ হয়ে ওঠার ভেতর দিয়ে গোটা সমাজ, কওম সেই মাহদীয় চিন্তাধারায় নিজেদেরকে রূপান্তরিত করতে সক্ষম হয় এবং বর্তমানতায় হাজিরা দেয়। তখন খোদ গোটা সমাজই নবযুগের কল্কি, মাহদী, ঈসা, মুসা হয়ে ওঠে। এই ইমেজ সবার সামনে সেই তলব জানিয়ে যায়।
আবার খেয়াল করলেই দেখা যাবে, এই যে ‘উল্কা’র পতন, তা নতুন করে কর্তাসত্তা গঠনের দিকে ধাবিত করে রাষ্ট্রের নাগরিককে। কর্তাকে তার ঐতিহাসিকতায় স্থাপন করে তার মধ্যে কালেক্টিভ কনশাসনেস জাগিয়ে তুলতে চায় ওই ছবি। যেনোবা সেই ‘উল্কা’ এসে আঘাত করছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নাগরিকের ঘুমন্ত কনশাসে। আর তার আঘাতেই চৈতন্য ফিরে তারা সামনে দেখে আবু সাঈদের লাশ। মূলত এই লাশ তার নিজেরই লাশ। সে যেনো জীবন্মৃত। তার ধরেই প্রাণ বা চৈতন্য ফিরায় ওই ইমেজ। এর সঙ্গে মিশেল ফুকোর ‘হোয়াট ইজ ক্রিটিক?’ নামক আলাপের কিছুটা মিল পাওয়া যায়। ফুকো জানান, ‘ক্রিটিক’ আসলে কর্তার পরিগঠনের গুরুতর উপায়। এর ভেতর দিয়েই কর্তা তার রূপ পরিগঠন করতে সক্ষম হয়। মানে রাষ্ট্রের ‘রাখালি ক্ষমতা’র (pastoral power) মাধ্যমে হাজির করা ‘গভার্নমেন্টালিটি’র ‘সত্য বয়ানের রাজনীতি’র বিপরীতে দাঁড়িয়ে ‘কর্তা সেই ক্ষমতার তাবেদারি থেকে নিজের আজাদিকরণ’ (de-subjugation of the subject) ঘটায় বা ‘সেই সত্য বয়ানের রাজনীতির বিপরীতে নিজেকে দাঁড় করিয়ে তার সঙ্গে লীলা করতে পারে’ (de-subjectification in the play of […] the politics of truth)।১৬ কিন্তু পোস্টারে ফুকোর এই ‘ক্রিটিকে’র ভেতর দিয়ে হাজির হওয়া পরোক্ষ প্রতিরোধই কেবল না, একইসঙ্গে জিসমি-ভাব বা প্রতিবাদ-প্রতিরোধের সরাসরি শরীরী উপস্থিতিও আছে। যা কর্তার বিশেষ পরিগঠন ও বিশেষ প্রতিবাদ-প্রতিরোধকেই উন্মোচন করে। এই ভাবনার সঙ্গে আরো দুটো পোস্টারের তুলনামূলক আলোচনা বা সেই পোস্টারগুলোকে একই চিন্তার ছাঁচে ফেলে পাঠ করা সম্ভব। সেগুলো হলো—‘আমি যুগে যুগে আসি, আসিয়াছি পুনঃ মহাবিপ্লব হেতু’ এবং ‘এই স্রষ্টার শনি মহাকাল ধূমকেতু’ (নমুনায়নে এই দুটো পোস্টার নাই)। দেবাশিসের সময়কে ধরে পোস্টারের মাধ্যমে হাজির করা এই ধরনের রাজনৈতিকতাকে পারভেজ আলম ‘মাহদীয় শিল্প’ বলে গণ্য করেছেন।১৭ এর সঙ্গে তিনি নজরুলের চিন্তাকেও যুক্ত করেছেন; দেবাশিসও তার শিল্পকর্মের উপকরণ সংগ্রহ করেছেন নজরুলের কাছ থেকে। মাহদীয় সময় ও রাজনীতি নিয়ে নজরুলের ভাবনা—
হয়তো আমাতে আসিছে কল্কি, তোমাতে মেহেদী ঈসা
কে জানে কাহার অন্ত ও আদি, কে পায় তাহার দিশা?
দুই. ‘আওয়াজ উডা কথা ক রাষ্ট্র সংস্কার লাগব’
‘আওয়াজ উডা কথা ক রাষ্ট্র সংস্কার লাগব’ পোস্টারটাতে দেখা মিলবে নয়া রাজনৈতিক ভাষার, নয়া-নিশানার [new signifier]। যা বাংলাদেশের বিগত সময়কার কিছু গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রসঙ্গকে চিন্তার জগতে প্রাসঙ্গিক করে তোলে। এবং নতুন করে নয়া রাজনৈতিকতা নিয়ে ভাবায়। শিক্ষক-গবেষক আ-আল মামুন এ বিষয়ে বলছেন—
গত দশকে মিসরের তাহরির স্কয়ারের সামাজিক আন্দোলন, ওয়াল স্ট্রিটের আন্দোলন, স্পেন বা তুরস্কের আন্দোলন—সবই বেহাত হয়েছিল। আর তখন সেসব আন্দোলনের ব্যর্থতা পর্যবেক্ষণ করে হোমি ভাবা, হামিদ দাবাসি, আলাঁ বাদিউ, এমনকি আগামবেনের মতো নন্দিত তাত্ত্বিকেরা বলেছিলেন যে ‘স্বাধীনতা’ বা ‘গণতন্ত্র’ ইত্যাদি আমাদের পুরোনো রাজনৈতিক পরিভাষাগুলো ‘এম্পটি সিগনিফায়ার’ বা ‘ফাঁপা চিহ্ন’ হয়ে উঠেছে। কিন্তু নতুন সময়ের রাজনৈতিক ভাষা এখনো গড়ে ওঠেনি বলেই এসব আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছে। তবে আমাদের তারুণ্য পুরো দুনিয়াকে দেখিয়ে দিল, তারা খুঁজে পেয়েছে এক নতুন ভাষা, যা নতুন রাজনৈতিক বিন্যাসও গড়ে দেওয়ার সম্ভাবনা রাখে।১৮
খেয়াল করলে দেখা যাবে, পোস্টারটার টেক্সটগুলো জুলাইয়ের সময়কার র্যাপ গান থেকে নেওয়া। ‘আওয়াজ উডা’ র্যাপটার রচয়িতা হান্নান হোসাইন শিমুল আর ‘কথা ক’-এর রচয়িতা র্যাপার শেজান। এর সঙ্গে ‘সংস্কার’-এর ধারণাকে যুক্ত করা হয়েছে; যা ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের ‘কোটা সংস্কার আন্দোলন’ থেকে কর্জ করেছেন কলাকার দেবাশিস। এই তিনটা বিষয় এক জায়গায় এসে জুলাইয়ের মাধ্যমে আম-পাবলিকের চেতনাকে ধারণ করে। উচ্চ-মধ্যবিত্তের প্রশাসনিক ভাষাকে ‘এম্পটি সিগনিফায়ার’ হিসেবে চিহ্নিত করে তাকে খারিজ করে। এতোদিন যা উপেক্ষিত ছিলো সেই মানুষের ভাষাতেই কথা বলতে শুরু করে জনগণ, বেঞ্জামিনের ‘পিওর ল্যাঙ্গুয়েজ’ [reine sprache]১৯ ধারণার মতো।
আরেকটা বিষয় এখানে গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো পোস্টারের ভিজ্যুয়াল ফর্ম। সবগুলো ছবির ব্যাকগ্রাউন্ডই লাল রঙের। এখানে এই প্রসঙ্গটা আনার কারণ এটাই যে, ওই সময়কার র্যাপ গানের থাম্বনেলগুলোও একই ধরনের ছিলো। এই পোস্টারটার সঙ্গে [কেবল এই পোস্টার নয়, সবগুলো পোস্টারই] র্যাপ গানগুলোর থাম্বনেলের একটা তুলনামূলক আলোচনা হাজির করার মওকা হয়তো মিলবে এখানে। এই লাল রঙ এক ধরনের সহিংসতাকে রিপ্রেজেন্ট করে। কিন্তু সেই সহিংসতা কেমন সহিংসতা? তা মোটেও সিস্টেমকে প্রিজার্ভ করার মতো সহিংসতা না, বরং সেই সিস্টেমকে খারিজ করার সহিংসতা। প্রথমটাকে বেঞ্জামিন বলেছেন ‘পৌরাণিক সহিংসতা’ এবং পরেরটাকে বলেছেন ‘দিব্য সহিংসতা’। এবং এই ‘দিব্য সহিংসতা’ এমন এক মুহূর্তে এবং মুহূর্ত হয়ে হাজির হয়, যা সময়ের ক্রনোলজিকে ভেঙে ফেলে। তখন সেই সময় হয়ে ওঠে বৈপ্লবিক ও মাহদীয়। বেঞ্জামিন বলছেন—
যদি পৌরাণিক সহিংসতা [mythic violence] আইনকে প্রতিষ্ঠিত করে, তবে দিব্য সহিংসতা [divine/pure violence] সেই আইনকেই ধ্বংস করে। যদি প্রথমটা কোনো সীমারেখা দাঁড় করায়, তবে দ্বিতীয়টা সেই সীমারেখাকেই খারিজ করে দেয়। যদি পৌরাণিক সহিংসতা পাপবোধ আর শাস্তির কথা বলে, তবে দিব্য সহিংসতা কেবল নিদান বা সেই পাপবোধের প্রায়শ্চিত্তের কথা বলে। প্রথমটা যদি হুমকি হয়ে ওঠে, তবে দ্বিতীয়টা সরাসরি তাতেই আঘাত হানে। প্রথমটা যদি রক্তপাত ঘটায়, তবে দ্বিতীয়টা রক্তপাত না ঘটালেও প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। [এই ধরনের সহিংসতার নজির হিসেবে বেঞ্জামিন নিয়োবি [Niobe] এর কাহিনির সঙ্গে কোরাহ [Korah] এর শিষ্যদের ওপর খোদার বিচারকার্যের তুলনা করেছেন।]২০ ... পৌরাণিক সহিংসতা তার নিজ স্বার্থে নিছক জীবনের ওপর তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু দিব্য সহিংসতা খোদ জীবনের স্বার্থেই বিশুদ্ধ ক্ষমতার প্রায়োগিকতার কথা বলে। প্রথমটা বলি দেয়, আর দ্বিতীয়টা সেই বলিকেই কবুল করে নেয়। ... তাই দুনিয়াবি সবকিছুই দিব্য সহিংসতার জন্যই নিবেদিত। কিন্তু আইন সেটাকেই পৌরাণিক সহিংসতায় রূপান্তরের মাধ্যমে কুলষিত করে। দিব্য সহিংসতা যেমন যুদ্ধবিগ্রহের ভেতর দিয়ে নিজের আত্মপ্রকাশ ঘটাতে পারে, তেমনই কোনো অপরাধীর বিরুদ্ধে জনগণের খোদায়ী বিচারের মাধ্যমেও তার উন্মোচন ঘটতে পারে। কিন্তু সমস্ত পৌরাণিক সহিংসতাই আইন প্রতিষ্ঠাকারী সহিংসতা; এটাকে আমরা ‘কার্যনির্বাহী সহিংসতা’ও বলতে পারি, যা অকল্যাণকর ও বিধ্বংসী; একইভাবে তা আইন-সংরক্ষণকারী। আর আইন-সংরক্ষণকারী এই প্রশাসনিক সহিংসতাও [administrative violence] অকল্যাণকর, কারণ তা ওই ব্যবস্থারই সেবাদাস হয়ে কাজ করে। অন্যদিকে দিব্য সহিংসতা হলো সেই নিশানা ও তার সিলমোহর, যাকে আমরা ‘সার্বভৌম’ সহিংসতা বলতে পারি; এবং যা পবিত্রতার নামে কোনো বিধান জারি করে না।২১
র্যাপ গান ও দেবাশিসের করা পোস্টারগুলোতেও একই ব্যাপার লক্ষণীয়। এবং যে সহিংসতাকে ওই ছবিগুলো পোর্ট্রে করে তা দিনশেষে ন্যায়বিচার জারি আর আইনের প্যারাডক্সকেই বাতিল করে চায়। আর তখনই তা ‘দিব্য সহিংসতা’র রূপ ধারণ করে। এই জের ধরে সাম্প্রতিক শেজানেরই ‘সিস্টেম’ টাইটেলে র্যাপ গানটার একটু আলাপ করা দরকার। গানটার কয়েকটা লাইন এমন—
আই ফাক ইউর সিস্টেম, দ্যাশে অশান্তির ঝড় ক্যা? সিস্টেম/ এনে তরা আমরা পর ক্যা? সিস্টেম
কথা কইতে জবান ঝরে ক্যা? সিস্টেম/ আমার কলমরে এতো ডর ক্যা?
...
ছড়াবি গুজব তগো গজব ওইয়া যামু/ তুই রাইতের ডর দেহাস আমি ফজর ওইয়া আমু২২
গানটাকে শেজানের ‘কথা ক’ গানটার পববর্তী বাস্তবতা হিসেবে পাঠ করা যেতে পারে। জুলাইয়ে তার ‘কথা ক’ গানটা বৈপ্লবিক ভাষা দিয়েছিলো বাংলাদেশের জনগণকে। কিন্তু পরবর্তী বাংলাদেশে দুর্নীতি, গুম, খুন, ধর্ষণের আদৌ কোনো পরিবর্তন হয়নি। গানের একটা লাইন এমন—‘পল্লবির ফ্ল্যাটে কাটলো বাংলাদেশের মাথাডাই’ [রামিসা হত্যাকাণ্ড]। সেটাই বেশ জোরালো ভাষায় প্রকাশ করেছেন শেজান। আর এর ভেতর দিয়ে বেঞ্জামিনের ‘দিব্য সহিংসতা’ হয়ে ওঠে একমাত্র ভাষা এবং আশার বাণী তথা ‘ফজরে’র সুবহে সাদিকের ইমাজিনেশন।
তিন. ‘আমাকে তুমি দাঁড় করিয়ে দিয়েছ বিপ্লবের সামনে এখন আমার আর ফেরার উপায় নেই’
আমাকে তুমি দাঁড় করিয়ে দিয়েছ ইতিহাসের সামনে
...
উত্তাল ঊনসত্তুর আমাকে ডেকে এনেছে রাস্তায়
প্রণয়ীর মতো মাটিকে আলিংগনে বেঁধে রাখে যে চাষা
তার ঔরসে আমার জন্ম
প্রতিটি কৃষক বিদ্রোহে আমি ছিলাম উলংগ শড়কির হিংসা
পলাশীর আম্রকাননে আমি ছিলাম মীরমদনের তলোয়ার
১৮৫৭য় সিপাহী বিদ্রোহী বিদ্রোহের কার্তুজ
আমি ছিলাম তীতুমীরের বাঁশের কেল্লা
ইংরেজদের বিরুদ্ধে ওয়াহাবীদের ঘৃণা
একাত্তরে শত্রু’ভুক স্টেনগানের বঙ্কিম ভংগী নিয়ে
ঘুরে বেড়িয়েছি মুক্তিযোদ্ধাদের সংগে
...
আমাকে তুমি দাঁড় করিয়ে দিয়েছ বিপ্লবের সামনে
এখন আমার আর ফেরার উপায় নেই।২৩
ফরহাদ মজহারের কবিতার একটা পঙক্তি নিয়ে দেবাশিস এই পোস্টার করেছেন, বোঝাই যাচ্ছে। কিন্তু গুরুতর বিষয় হলো এর সঙ্গে ঐতিহাসিকতা যুক্ত। পোস্টারটাতে দেখা যাচ্ছে, একজন নারী ও পুরুষ কালো পোশাকে বিরান ভূমিতে মুষ্টিবদ্ধ হাত উঁচু করে নির্বিকারচিত্তে দাঁড়িয়ে আছে। গোটা দেহে তাদের আগুনের ফুলকি জ্বলছে। এ আগুন বিপ্লবের আগুন। তারাই যেনো একেকটা বিপ্লব। কিন্তু প্রশ্ন, বিপ্লব কী? মিশেল ফুকো বিপ্লবকে বোঝেন সেই গাঠনিক ভিত্তি দিয়ে যা বৈপ্লবিক কর্তাসত্তাকে গঠন-পরিগঠন করে। সেই অর্থে বিপ্লব হলো ক্ষমতার বিরুদ্ধে কর্তার দায়েমি ভাবে দাঁড়িয়ে তার চিন্তায় সমালোচনাত্মক দৃষ্টিভঙ্গির উদ্ভাসিকরণ এবং তার ভেতর দিয়ে নিজের কর্তাসত্তাকে চিহ্নিত করতে পারা।২৪ তাই এই দৃষ্টিভঙ্গি এবং কর্তাসত্তার চিহ্নিতকরণের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিকতা এক জরুরি উপাদান। বিপ্লবের পূর্বশর্ত তৈরি হয় তখনই, যখন কর্তা ওই ঐতিহাসিকতার ভেতর দিয়ে নিজেকে বর্তমানের রাজনৈতিকতার মধ্যে লোকেট করতে পারে এবং ওই ইতিহাসের কর্তা হয়ে উঠতে পারে।
দেবাশিসের পোস্টারটা আসলে ওই কর্তাসত্তাকেই ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতে স্থাপন করে। কর্তাকে ইতিহাসের ধারক-বাহক হিসেবে চিহ্নিত করে এবং কর্তার চিন্তার দিগন্তকে প্রসারিত করে। সেই বিবেচনায় জুলাই হলো সেই হলমার্ক, বিরতি এবং ডায়ালেক্টিক্সের জমিন, যেখানে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের গণকর্তাসত্তা তার ইতিহাস ও সেই ইতিহাসের ভেতর দিয়ে তার নিজের গঠন-গাঠনের দিকে ঘুরে তাকাতে সক্ষম হয়েছে।
চার. ‘RAB DB DGFI AGENCIES INVOLVED IN ENFORCED DISAPPEARANCES’
এই পোস্টারটার দিকে আলাদা করে নজর দিতে হয়, কারণ সচরাচর এই প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে তেমন কোনো কথাবার্তা হয় না। কারণ এসব প্রতিষ্ঠানের বাহ্যিক গঠন এবং কার্যক্রম এমনভাবে পরিচালিত হয়, যেনো তারা সমাজে বিরাজই করে না। যাকে বলা হয় ‘ইনভিজিবল স্টেট’। কিন্তু তারাই হাসিনাশাহীর আমলে [কেবল হাসিনা না যেকোনো রাষ্ট্রকাঠামোতেই এসব প্রতিষ্ঠান ফাংশন করে] এমন এক সাবটল রূপ ধারণ করেছিলো যে, সরকার সেসবের যথেচ্ছা ‘ব্যবহার’ করেছে। এইসব প্রতিষ্ঠানকে একযোগে প্রচলিত ‘ডিপ স্টেট’ শব্দটা দিয়ে চিহ্নায়িত করা হয়ে থাকে। কিন্তু এর বিস্তৃতি আরো ব্যাপক। মাইক লফগ্রিন তার ‘দ্য ডিপ স্টেট : দ্য ফল অব দ্য কন্সটিটিউশন অ্যান্ড দ্য রাইজ অব আ শ্যাডো গভার্নমেন্ট’ বইয়ে জানাচ্ছেন, ‘ডিপ স্টেট’ গোটা সরকার নিয়ে গঠিত হয় না, বরং তা ‘জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ’ এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর একটা হাইব্রিড রূপ। যার সঙ্গে সরকারের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ যুক্ত থাকে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এবং বিচার বিভাগ, সবই এই ডিপ স্টেটের অংশ। এর সঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয়ও যুক্ত থাকে। এইসব সংস্থার কার্যক্রম সমন্বয় করা হয় রাষ্ট্রপতির [বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী] নির্বাহী কার্যালয়ের মাধ্যমে, বিশেষ করে ‘জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদে’র অধীনে। বিচার বিভাগেরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ ডিপ স্টেটের আওতাভুক্ত। যার বিচারকদের নিয়োগ দেন প্রধান বিচারপতি। কিন্তু এই আদালতের কার্যক্রম এতোটাই গোপন যে, সরকারের কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিও তা জানতে পারে না। ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ সংক্রান্ত ‘স্পর্শকাতর’ মামলার বিচারিক কার্যক্রম এখানে পরিচালিত হয়।২৫
এখানে ম্যাক্স ওয়েবার-এর আলাপটা বেশ প্রাসঙ্গিক। ওয়েবারের মতে, আমলাতন্ত্র মূলত যুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়ার কথা। কিন্তু এর ভেতরে কাজ করা ব্যক্তিরা শেষ পর্যন্ত টোটালিটারিয়ান, অথোরিটারিয়ান আচরণে লিপ্ত হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং আদালতের মতো প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে ওঠে মূলত নাগরিকের জীবন এবং নাগরিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য। কিন্তু এইসব প্রতিষ্ঠানই নাগরিকের জীবন এবং নাগরিক স্বাধীনতার ওপর একচেটিয়া কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ভিত্তিতে কাজ করে।২৬
বাংলাদেশে গত দেড় দশকের আওয়ামী শাসনামলে আসলে আলাদা করে ‘ডিপ স্টেট’ বলে কিছু ছিলোই না। গোটাটাই ‘ডিপ স্টেটে’ পরিণত হয়েছিলো। তার সর্বোচ্চ পদে আসীন ছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তারই নির্দেশে প্রতিনিয়ত গুম, খুন, ‘বিচারবহির্ভূত’ হত্যাকাণ্ড পরিচালিত হয়েছে। ব্যাপারটা আরো পরিষ্কার হয় ২০২৫ খ্রিস্টাব্দের ৪ জুন ‘গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনে’র [২০০৯ খ্রিস্টাব্দের ৬ জানুয়ারি থেকে ২০২৫ খ্রিস্টাব্দের ৫ আগস্ট পর্যন্ত] জমা দেওয়া ‘আনফোল্ড দ্য ট্রুথ : আ স্ট্রাকচারাল ডায়াগনোসিস অব এনফোর্স ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স’ নামক প্রতিবেদনে। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘তিন স্তরের পিরামিড’-এর মাধ্যমে গুমের বিষয়টা বাস্তবায়ন করা হতো। এই পিরামিডের সর্বোচ্চ স্তরে ছিলো ‘কৌশলগত নেতৃত্ব’। যেখানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তৎকালীন প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ বিগত আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা ছিলেন। দ্বিতীয় স্তরে ছিলেন বিভিন্ন বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার [র্যাব, ডিবি, সিটিআইবি, ডিজিএফআইসহ আরো যতো সংস্থা আছে] শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা। আর পিরামিডের তৃতীয় স্তরে থাকা বিভিন্ন বাহিনী ও সংস্থার সদস্যরা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশ বাস্তবায়ন করতো। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কমিশনের কাছে এখন পর্যন্ত ১৮৫০টি অভিযোগ এসেছে। এর মধ্যে ১৩৫০টি অভিযোগ যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। এখনো নিখোঁজ ৩৪৫ জন।২৭ দেবাশিসের পোস্টারটা এই বিষয়গুলো সম্মুখে নিয়ে আসে। একইসঙ্গে বিচারহীনতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
পাঁচ. ‘স্বাধীনতা, এখন রাষ্ট্র সংস্কার লাগবে সেনা শাসন না, আরেকটা ১/১১ না,
এই অভ্যুত্থানের প্রথম অংশীদার ছাত্র জনতা’
মুক্তি [liberation] আশীর্বাদ, নাকি অভিশাপ? এটা কি আশীর্বাদের ছদ্মবেশে অভিশাপ, নাকি অভিশাপ বলে ভীতিকর বলে মনে হওয়া এক আশীর্বাদ? এ ধরনের প্রশ্ন আধুনিক যুগের অধিকাংশ সময় জুড়ে চিন্তাশীল মানুষদেরকে তাড়া করে ফিরেছে। কারণ, আধুনিক যুগ রাজনৈতিক সংস্কার কর্মসূচির শীর্ষে ‘মুক্তি’কে এবং মূল্যবোধের তালিকার শীর্ষে ‘স্বাধীনতা’কে [freedom] স্থান দিয়েছিলো। কিন্তু একইসঙ্গে ধীরে ধীরে এটাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছিলো যে, স্বাধীনতার আগমন অত্যন্ত মন্থর আর ধীরগতিতেই হয়, আর যাদের সেই স্বাধীনতা উপভোগ করার কথা, তারাও অনেক সময় তাকে সাদরে তাকে গ্রহণ করতে পারে না।২৮
জুলাই পরবর্তী বাস্তবতা বুঝতে জিগমুন্ড বাউম্যান-এর এই কথাটা খুবই তাৎপর্যতা নিয়ে হাজির হয়। ‘মুক্তি’ এবং ‘স্বাধীনতা’ নামক জিনিসটাই এখন সবচাইতে বড়ো গৃহপালিত পশুপাখির খোপে পরিণত হয়েছে। এখনকার জমানায় ‘স্বাধীনতা’ মানেই অনন্ত ভোগবাদের খপ্পরে পরে নিজেই নিজের বিনাশ ঘটানোর মনস্তাত্বিক গেইজ, আর এর ভেতর দিয়ে অজান্তেই ‘অপরে’র ‘স্বাধীনতা’ হরণের দায়েমি ম্যারাথনে পরিণত হয়েছে। তাই ‘মুক্তি’ আর ‘স্বাধীনতা’ই এই জমানার সব চাইতে বড়ো ক্রাইসিস। গবেষণার অর্থ যদি কোনো কিছুর নিগূঢ়ার্থ উন্মোচন হয়, তবে আত্মোন্মোচনও [সেলফ রিফ্লেক্সিভিটি] তার আরেকটা অর্থ দাঁড়ায়। বর্তমান নৃবৈজ্ঞানিক গবেষণার ধাঁচ অন্তত তাই বলে। সেই দিক থেকে লেখকের এটা স্বভাবতই [জুলাই এবং জুলাই পরবর্তী অভিজ্ঞতার জায়গা থেকে] মনে হয়েছে, জুলাই যে ‘স্বাধীনতা’ আর ‘মুক্তি’র স্বপ্ন হয়ে বিজলির ঝলকের মতো ইতিহাসের কর্তার চোখেমুখে দ্যুতি ছড়িয়েছিলো, তাকে আসলে সাদরে গ্রহণ করতে পারা যায় নাই। শাপলা-শাহবাগের ডাইকোটমি ভেঙে যে স্পেসে দাঁড়ানোর কথা ছিলো, যে রাষ্ট্র-কল্পনা তার কর্তার সামনে ঝলক দিয়ে উঠেছিলো, তা অঙ্কুরেই বিনাশ হয়েছে। তবে এটাও অস্বীকার করার কোনো জায়গা নাই যে, জুলাই সেই ঝলক তার ইতিহাসের কর্তাকে দেখাতে সক্ষম হয়েছে।
দেবাশিসের এই পোস্টারটার টেক্সট এবং ভিজ্যুয়ালের দিকে তাকালে সামনের দিনের রাষ্ট্র-কল্পনার একটা বিজলি-ঝলকের মতো রূপরেখা পাওয়া যায়। এবং তা আগের রাজনৈতিক ইতিহাসেরই পরিপ্রেক্ষিতে। ইতিহাসকে সামনে এনেই দেবাশিস ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের রূপরেখা প্রণয়ন করেন। সিম্বলিক দিক থেকে দেখলে দেখা যাবে, ছবিটাতে দুটো হাত। একটা হাত ইংরেজি হরফ ‘ভি’ আরেকটা হাত মুষ্টিবদ্ধ। ‘ভি’ জুলাই আন্দোলনের কর্তাসত্তার (ছাত্রজনতা) প্রতিফলন এবং মুষ্টিবদ্ধ হাত সামনের দিনে দেশকে গড়ে তোলার প্রতীক।
এবার নজর ফিরাবো এই টেক্সট ধরে ছবিতে হাজির করা ঐতিহাসিকতার দিকে। মানে ১/১১-এর রাজনৈতিক ঐতিহাসিকতায়। ২০০৭ খ্রিস্টাব্দের ১১ জানুয়ারি বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের পথকে রুদ্ধ করে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারে’র আব্রু নিয়ে গঠিত হয়েছিলো সেনাসমর্থিত সামরিক ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার’। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিন আহমেদ প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে সরে দাঁড়িয়ে দেশে জরুরি অবস্থা বা কারফিউ জারি করেছিলেন। এবং একইসঙ্গে সে বছরেরই ২২ জানুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচন বাতিল করেছিলেন। এর সূত্র ধরে ক্ষমতায় এসেছিলো সামরিক সরকার। যার প্রধান হয়েছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফখরুদ্দীন আহমেদ। আর তখন সেনাপ্রধান ছিলেন জেনারেল মঈন ইউ আহমেদ। সামরিক শাসন জারি হওয়ার কারণে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন মঈন ইউ আহমেদ। ফলত দেশের সব রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দকে গ্রেপ্তার করা হয়। রুদ্ধ করা হয় সংসদীয় গণতন্ত্রের পথ। আর এই ঘটনাটাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘১/১১’ নামে পরিচিত।
৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পরে রাষ্ট্রক্ষমতায় শূন্যতা তৈরি হয়। সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান তখন আন্দোলন পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বসে ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার’ গঠনের জন্য কাজ করছিলেন। কাজেই সেখানে ২০০৭ খ্রিস্টাব্দের মতো মিলিটারি ক্যু করে সেনাসমর্থিত সরকার গঠনের ব্যাপক আশঙ্কা ছিলো। আর এ ধরনের ঘটনার পূর্ব অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জনগণের আছে। এর ফল সংসদীয় গণতন্ত্র রোধ, অথোরিটারিয়ান ক্ষমতার যাত্রার শুরু। কিন্তু জুলাই আন্দোলনের একটা মজবুত ভিত্তি ছিলো গণতন্ত্র। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে কেউই আসলে পুনরায় সামরিক শাসন চায়নি। তাই সেই ভাবনাকে মাথায় রেখেই সম্ভবত দেবাশিস এই পোস্টারটা নির্মাণ করেন। যা একইসঙ্গে যেমন অথোরিটারিয়ান সেনাশাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলো, তেমনই গণতন্ত্র, জনগণের সার্বভৌমত্ব ও তার অধিকারের দাবি বেশ জোরালোভাবে তুলে ধরে।
ছয়. ‘তুমি কে আমি কে রাজাকার রাজাকার, কে বলেছে কে বলেছে? স্বেরাচার স্বৈরাচার’
হেগেল বলেছিলেন, বিশ্ব-ইতিহাসের রঙ্গমঞ্চে বড়ো বড়ো সব ঘটনা আর মহান ব্যক্তিত্ব কোনো না কোনো রূপে পুনরাবির্ভূত হয়। কিন্তু তিনি শুধু এটুকু যোগ করতে ভুলে গিয়েছিলেন যে, প্রথমবার তা আবির্ভূত হয় ট্র্যাজেডি হিসেবে, আর দ্বিতীয়বার তার দেখা মেলে প্রহসন রূপে। ... মানুষ নিজের ইতিহাস নিজেই নির্মাণ করে, কিন্তু তার নির্মিতি সে তার নিজ খেয়াল-খুশি মতো করতে পারে না। নিজেদের জন্য অনুকূল পরিস্থিতি তারা বেছে নিতে পারে না; বরং যে পরিস্থিতি তারা উত্তরাধিকারসূত্রে পূর্ব-প্রজন্মের কাছ থেকে পায়, সেই পরিস্থিতির মধ্যেই নিজেদেরকে আবিষ্কার করে। ... অতীত তাদের হাতে যে উপাদান বা উপকরণ তুলে দেয়, ইতিহাস নির্মাণের জন্য তাদের সেই উপাদান বা উপকরণকেই রূপান্তর করতে হয়। পূর্ব-প্রজন্মের কাছ থেকে তারা উত্তরাধিকারসূত্রে যা পায়, নতুন প্রজন্মের মস্তিষ্কের ওপর সেটাই এক বিশাল দুঃস্বপ্নের মতো ভর করে বসে থাকে। ... তারা সেই মৃত অতীত প্রজন্মেরই নাম কর্জ করে, পুরনো রণডঙ্কারই পুনরুজ্জীবন ঘটায়। ঐতিহ্যের সেই পোশাক পরে রঙ্গমঞ্চে আবির্ভূত হয়, যাতে করে বিশ্ব-ইতিহাসের নবমঞ্চায়িত দৃশ্যে তারা নিজেদের ভূমিকাকে আরো গৌরবময় আর বীরসুলভ বৈশিষ্ট্যে বিশিষ্ট করে তুলতে পারে। একইভাবে কোনো ব্যক্তি যখন নতুন কোনো ভাষা শেখে, তখন শুরুতে প্রতিটা শব্দ, প্রতিটা বাক্যাংশকে সে তার মাতৃভাষায় তাফসির করে বুঝে থাকে। নতুন ভাষার জগতে সে তখনো স্বাধীন নাগরিকত্ব অর্জন করতে পারে না। ... কেবল তখনই সে সত্যিকার অর্থে সেই ভাষার ঘরে বারাম দিতে সক্ষম হয়, যখন শৈশবে আয়ত্ত করা ভাষার স্মৃতি থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারে এবং পুরনো ভাষার কথা না ভেবেই নতুন ভাষার উপকরণ ব্যবহার করতে সক্ষম হয়।২৯
কার্ল মাকর্স [ফরাসি দেশের] ইতিহাসের এই পুনরাবির্ভাবের কথা বলতে গিয়ে জর্জ দান্তেকে সরিয়ে মার্ক কুসিডারের সেই জায়গায় বসা, রোবোসপিয়ারের স্থানে লুইস ব্লাঙ্কের স্থলাভিসিক্ত হওয়াসহ আরো কয়েকটা নজির হাজির করেছেন। খেয়াল করার বিষয়টা হলো, এখানে কেবল চেহারা-চরিত্রের বদল ঘটলেও ব্যবস্থার কোনো বদল ঘটেনি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বেলাতেও একই বিষয় আবিষ্কার করা অসম্ভব না। জুলাইকেও ঠিক একইভাবে পাঠ করা যায় দেবাশিসের নির্মিত এই ছবির মাধ্যমে। ছবিতে দেখা যায়, কালো পোশাক পরে নর-নারী অবিকারচিত্তে দাঁড়িয়ে আছে। ফোর গ্রাউন্ডে লেখা ‘তুমি কে? আমি কে? রাজাকার, রাজাকার কে বলেছে? কে বলেছে? স্বৈরাচার স্বৈরাচার’। মার্কসের চিন্তানুযায়ী, ইতিহাসের উল্টো গতিবিধির প্রতিফলন দেখা যায় এখানেও। এটাই ঐতিহাসিক হেগেলিয়ান রিভার্স গতিবিধি। ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে শাহবাগে রাতারাতি যা ঘটেছিলো [কালচারালি বাংলাদেশের মানুষ ‘সেক্যুলার’ আর ‘রিলিজিয়াস’ ডাইকোটমিতে ভাগ হয়ে গেলো], ২০২৪-এ এসে সেটা ঐতিহাসিকভাবে উল্টে গেলো। আশ্চর্যের বিষয়, চোখের সামনে একই স্লোগান এখন বিপরীত অর্থ ধারণ করে ফেলেছে—‘তুমি কে? আমি কে? রাজাকার, রাজাকার। কে বলেছে? কে বলেছে? স্বৈরাচার, স্বৈরাচার’। কোনো চেতনা যদি নিপীড়নের মাধ্যম হয়ে উঠে, মানুষ সেটাকে প্রত্যাখ্যান করবে। ঠিক এজন্যই প্রথমদিকে শাহবাগকে ধারণ করা গেলেও পরবর্তী সময়ে শাহবাগকে ধারণ করা যায়নি, কারণ আশঙ্কা ছিলো তা নিপীড়নের মাধ্যম হয়ে যাবে; হয়েছিলোও তাই। এটা ফ্রাংকেন্সটেইনের দানব হয়ে উঠেছিলো। আর সেই দানবকেই বাংলাদেশের মানুষ প্রতিহত করতেই জুলাই ঘটিয়েছে। কিন্তু সেটাও ইডিওলজির লেবু কচলানিতে তিতা তথা দানবেই পরিণত হয়েছে। এর নজির ভূরিভূরি। আশা করা হয়েছিলো, এই আন্দোলনের ভেতর দিয়ে কাউকে তকমায়ন করার মোরাল ব্যাকগ্রাউন্ড শেষ হয়ে গেছে ঐতিহাসিকভাবেই। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেটারই, মার্কসের মতে প্রহসনমূলক রূপ পুনরায় আবির্ভূত হয়েছে।
ঐতিহাসিকভাবে দেখলে ‘রাজাকার’ শব্দটার নেতিবাচক অর্থ দাঁড়িয়েছিলো ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। ’২৪-এ এসে সেটারই নয়া অর্থ দেখা গেলো। হাসিনার শাসন এই শব্দটাকেই তার শাসন জারির হাতিয়ার বানিয়ে ফেলেছিলো, যার কারণে হাসিনা যখন শিক্ষার্থীদেরকে ‘রাজাকারের বাচ্চা’ বললেন, সেটাকেই প্রহসনমূলকতার ভেতর দিয়ে গ্রহণ করেছিলো এদেশের নাগরিকরা। খেয়াল করার বিষয়, ‘রাজাকারে’র বিপরীত অর্থকে ধারণ করেও কিন্তু জনগণ মুক্তিযুদ্ধকে বাতিল করেনি। বরং শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনেরই নফিকরণ ঘটিয়ে আরো বেশি করে মুক্তিযুদ্ধকেই ধারণ করেছে। কাজেই এই স্লোগানটার ভেতর দিয়ে ’২৪ কে ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের বিপরীতে দাঁড় করালে তার গূঢ়ার্থ ধরতে পারা যাবে না। এটাকে ঐতিহাসিকতার ভেতর দিয়ে এমন এক সিম্বলিক রিপ্রেজেন্টেশন হিসেবে পাঠ করতে হবে, যেখানে বাংলাদেশের নাগরিক ‘রাজাকার’ শব্দটার অর্থ বদলানোর ভেতর দিয়ে যেমন ’২৪-এর সঙ্গে ’৭১-এর সমন্বয় ঘটিয়েছে, তেমনই হাসিনা-রেজিমের নফিকরণও ঘটিয়েছে।
সাত. ‘সব অন্ধকার ৪০১*’
সমসাময়িক হলেন সেইজন, যিনি নিজে যে সময়ে অবস্থান করেন, কেবল সেই সময়ের আলোটাকে দেখার জন্য নয় বরং সেই সময়কার অন্ধকারটাকে [নোক্তা] উপলদ্ধি করার জন্য সেই সময়ের দিকে সুদৃঢ়ভাবে নিজের নিরিখ [নোক্তা-নিরিখ] ঠিক রাখতে পারেন। সত্যিকার অর্থে যারা সমসাময়িকতাকে অভিজ্ঞতার আওতায় নিয়ে আসতে পারে তাদের কাছে সব জমানাই অন্ধকারাচ্ছন্ন [নোক্তা চুরি হওয়া জমানা]। তাই সমসাময়িক হলেন সেইজন, যিনি সেই অন্ধকারকে [নোক্তা] অবলোকন করতে জানেন এবং বর্তমানের সেই অন্ধকারকে [নোক্তা] কালি বানিয়ে তাতে নিজের কলম ডুবিয়ে লিখতে জানেন।৩০
আলিফে হয় আল্লাহ-হাদি/ মিমেতে নূর-মোহাম্মদী
লামের মানে কেউ জানলো না/ নোক্তা বুঝি হলো চুরি
সিরাজ সাঁই বলে রে লালন/ নোক্তা আগে কর নিরূপণ
নোক্তা-নিরিখ ঠিক হইলে/ থাকবে না আর কোর্ট-কাচারি
নোক্তা হলো এক ফোঁটা কালি। আর কালি হলো সেই অন্ধকার, যা দিয়ে কলম লেখে, আর তা খোদ চিন্তারই অপর নাম।৩১
খোদা কুরআনে শপথ নিচ্ছেন সেই কলমের, যা দিয়ে লাওহে মাহফুজে কালাম বা ওহী লেখা হয়েছে। কুরআনে ‘সুরা কলম’-এর প্রথম আয়াতটা এমন—‘নুন’—কসম কলমের; এবং [কসম], তারা যা লেখে তার।’৩২ এখানে ইসলামি দর্শন, কালামতত্ত্ব এবং সুফি ঐতিহ্য অনুযায়ী ‘নুন’ হরফের অর্থ কালির দোয়াত। এই ‘নুন’ হলো সেই কালির দোয়াতের রূপক, যাতে কলম ডুবিয়ে আল্লাহ লিখেন, তথা সৃষ্টি করেন। অর্থাৎ সূরা কলমের প্রথম আয়াতটাতে আল্লাহর সৃষ্টি-প্রক্রিয়াকে উপস্থাপন করা হয়েছে লেখার রূপকে। এবং কালির দোয়াতকে উপস্থাপন করা হয়েছে সম্ভাবনার রূপকে। ‘নুন’-এর ওপরের নোক্তা, এক ফোটা কালি, এক ফোটা অন্ধকার, তার নিচে অর্ধচন্দ্র আকৃতির কালির দাগটাকে ইবনে আরাবি একদা ব্যাখ্যা করেছিলেন অস্তিত্বের ব্যক্তরূপ হিসেবে, যার বাকি অর্ধেকটা হলো অস্তিত্বের অব্যক্ত তথা গায়েবের রূপক। অর্থাৎ সূরা কলমের প্রথম আয়াতে যে কালির দোয়াতের শপথ নেওয়া হয়েছে, তা লাওহে মাহফুজ তথা সংরক্ষিত স্মৃতিফলকেরই অন্য নাম বা রূপক। অনন্ত সম্ভাবনার রূপক। খোদার নোটবুক, যাতে খোদার লেখালেখি হলো জগতের সৃষ্টি-প্রক্রিয়ার রূপক বর্ণনা।৩৩ সুফি চিন্তক সদর উদ্দীন আহমদ চিশতী তার ‘কোরান দর্শন প্রথম খণ্ড’-এ ‘নুন’ এবং ‘কলম’-এর ব্যাখ্যা হিসেবে বলছেন :
আল্লাহর নূর হইতে নবীর নূর। নবীর নূর হইতে সারা সৃষ্টি। কলম হৃদয়ের কথা প্রকাশের অবলম্বন। সমগ্র হইতে নূর-মোহাম্মদি রূপ সূক্ষ্ম বিজ্ঞানময় কলম হইতে আগত হইতেছে। উহাই আল্লাহর আত্মপ্রকাশের মহান কলম। এই কলম হইতে যাহা কিছু লিখিত হইতেছে তাহাই সৃষ্টি এবং আল্লাহতা’লার অভিব্যক্তির স্বরূপ। আল-কলম এবং আল-কলমে যাহা কিছু লিখে (অর্থাৎ বিকশিত সৃষ্টি) তাহার সকলই ‘নুন’ এর সাক্ষী-প্রমাণ (অর্থাৎ সারা সৃষ্টি নূর নবীর পরিচয়)।৩৪
এই দুই ব্যাখ্যাগত জায়গা থেকে এটা বেশ স্পষ্ট যে, নুন-এর ওই নোক্তারূপী অন্ধকার আসলে সম্ভাবনারই রূপক প্রকাশ। অন্যদিকে ‘৪০১*’-এর ব্যাখ্যা ডিজিটাল পরিসরে দাঁড়িয়ে সেই অন্ধকার হিসেবেই ধরে নেওয়া যেতে পারে। তবে সাধারণ অর্থে এর অর্থ হলো, তা এমন এক ধরনের এইচটিটিপি স্ট্যাটাস কোড, যার মানে ‘অননুমোদিত’ [unauthorized]। যখন অনলাইনের কোনো ওয়েবসাইটে প্রবেশের চেষ্টা করা হয়, তখন প্রবেশকারীর পরিচয় [আইপি এড্রেস] যাচাই করার জন্য লগইন করার সঠিক তথ্য যাচাই করা হয়। সেই লগইন করার তথ্যে যদি কোনো ভুল থাকে বা সেই তথ্যের মেয়াদ শেষ হয়ে যায় কিংবা রিসোর্সের তথ্য যে বৈধ তা প্রমাণ করা যায় না, তখন সার্ভার ‘৪০১*’ এই ত্রুটিটা দেখায়। আরেকটা ব্যাপার হলো, অনেক সময় তথ্য ঠিক থাকলেও সার্ভার তার প্রবেশ সীমাবদ্ধ করে রাখে, তখনো এটা দেখানো হয়।
দেবাশিসের পোস্টারে দেখা যায়, একজন যুবক, তার চোখ দুটো অন্ধকার বা নাইও বলা যায়, কিংবা তুলে নেওয়া হয়েছে হিসেবেও ধরে নেওয়া যায়। সেই অন্ধকারের ছোটো ছেটো ছিটেফোঁটা তার পুরো মুখজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। যেনো একেকটা ব্লাকহোল। ফোরগ্রাউন্ডে লেখা—‘সব অন্ধকার ৪০১*’। ১৬ জুলাই আবু সাঈদকে হত্যা করা হলো এবং এর পরেই ইন্টারনেট ব্লাক আউট করে দেওয়া হয়। এবং গণহত্যা চালানো হয় গোটা দেশজুড়ে। সম্ভবত সেই সময়ে এই ছবিটা নির্মাণ করেছিলেন দেবাশিস। তো এই ছবিতে হাজির করা অন্ধকাররূপী ব্লাকহোল, এবং সেটাকে ডিজিটাল যুগ তথা ইন্টারনেট ব্ল্যাক আউট হওয়ার সঙ্গে প্রাসঙ্গিকীকরণ করে যে অন্ধকারের ধারণা দেবাশিস হাজির করেছেন, তা একইসঙ্গে যেমন রাষ্ট্রের টোটালিটারিয়ান খাসলতকে প্রকাশ করে, তৎকালীন ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের বক্তব্য—‘ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়নি, নিজে নিজেই বন্ধ হয়ে গেছে’—থেকে তা স্পষ্ট হয়ে যায়, তেমনই তা জুলাইকে আরো বেশি করে সম্ভাবনাময় করে তোলে। যেমনটা আগামবেন বলেন, ‘... কালি হলো সেই অন্ধকার, যা দিয়ে কলম লেখে, আর তা খোদ চিন্তারই অপর নাম।’ তাই সেই অন্ধকার আসলে চিন্তারই উদ্রেক ঘটিয়েছিলো। আর তার ভেতর দিয়েই জেগে উঠেছিলো জনগণের জুলাই-স্পিরিট।
‘হোয়াটইভার বিয়িং’ থেকে ‘অনাগত সমাজে’র বাসনা : বাস্তবতা ও পরিণতি
আট. ‘সমতল থেকে পাহাড় এবারের মুক্তি সবার’
জাত গেলো জাত গেলো বলে/ এ কি আজব কারখানা
ব্রাহ্মণ চণ্ডাল চামার মুচি/ এক জলে সব হয় গো শুচি
দেখে শুনে হয় না রুচি/ যমে তো কাউকে ছাড়বে না
জুলাই অভ্যুত্থানের পরে পরেই ফেনীতে যে বন্যা হয়েছিলো, সেখানে তরুণদেরকে দেখা গেলো লালন ফকিরের এই গান গেয়ে গেয়ে টাকা কালেকশন করছে তারা। হঠাৎ করেই এক বৃদ্ধ এসে তাদের সঙ্গে গলা মেলাচ্ছেন—‘জাত গেলো জাত গেলো বলে/ একি আজব কারখানা।’ গোটা দেশ সেসময় একযোগে দাঁড়িয়েছিলো বন্যার্তদের পাশে। এর উল্টো দিকও যদিও রয়েছে। ঠিক তখনই সম্ভবত কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাটেও ভয়াবহ বন্যা হয়েছিলো। সেদিকে কম লোকেরই নজর পড়েছে। জুলাইয়ের সঙ্গে ফেনীর বন্যার সম্পর্ক থাকাতেই [মূলত ভারত-বিরোধীতা] হয়তোবা এমনটা হতে পারে। জুলাই বলে কথা!
সে যাইহোক, ফেনীর বন্যায় আরেকটা ছবি নেট দুনিয়ায় বেশ চাউর হয়েছিলো, দুই কিশোরী বয়সি নারী পানির মধ্যে একটা কুকুরের দুই পা ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে—মূলত উদ্ধার করছে বলা যায়। তখনকার সময়ে বাংলাদেশের নাগরিকের মনস্তত্ত্বে দেশ গড়ার যে মানসিকতা হাজির হয়েছিলো, সেখানে যেমন নাগরিক হিসেবে মানুষকেও ন্যায্যতার ভিত্তিতে বিবেচনা করা হয়েছে, তেমনই প্রাণ-প্রকৃতি তথা জীবের জীবন রক্ষাকেও প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। ওই ছবিটাই তার সাক্ষ্য দেয়। আর এটাকেই জর্জিও আগামবেনের ভাষায় বলা যায়, ‘হোয়াইভার বিয়িং’-এর ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের ‘অনাগত সমাজে’র কল্পনার ওজুদ-মজুদ।
এর কিছুদিন পরে এমনকি জুলাই চলাকালীনও দেখা গেলো, পার্বত্য এলাকাগুলোতে ব্যাপক নির্যাতন। অনেককেই প্রতিবাদ করার কারণে গুম করা হয়েছে, এমনকি ধর্ষণের মতো ঘটনাও ঘটে চলেছিলো। আর তখনই দাবি ওঠে পাহাড় থেকে সেনা সরিয়ে নেওয়ার। সবচেয়ে বড়ো প্যারাডক্স হলো, সমতলের ‘বাঙালি’ নাগরিক ‘১/১১’ না চাইলেও পাহাড়ে ঠিকই সেনা শাসনের পক্ষে সমর্থন দিচ্ছিলো। তখনই সম্ভবত দেবাশিস তার এই ছবিটা নির্মাণ করেন। ছবিটাতে দেখা যায়, দুজন নারী মুষ্টিবদ্ধ হাত উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। দেখেই বোঝা যায় একজন সমতলের, তার গায়ে হিজাব, ‘বাঙালি মুসলমান’ নারী। আর অন্যজনের গায়ে শার্ট। শার্টের বোতাম খোলা। তিনি ভিন্ন জাতিসত্তাগত আইডেন্টিটি ধারণ করেন। জুলাই আসলে সেই পাটাতন হয়ে উঠেছিলো যেখানে ভিন্ন ভিন্ন জাতিসত্তা, আইডেন্টিটি একই কাতারে এসে শামিল হতে পেরেছিলো। ‘বাঙালি’ আইডেন্টিটিকেও র্যাডিকাল জায়গা থেকে সরিয়ে এনে অন্যান্য আইডেন্টিটির সঙ্গে এক পাটাতনে দাঁড় করিয়েছিলেন দেবাশিস। কিন্তু পরবর্তী বাস্তবতায় সেটা আর প্রতিফলিত হওয়া বা তার চলমানতা বজায় থাকেনি।
১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দের পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় পার্বত্য অঞ্চল বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের কয়েকটা জেলাতে সেনাবাহিনীর ক্যাম্প স্থাপন করা হয় ‘জাতীয় নিরাপত্তা’র স্বার্থে। এরপর ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দের ২ ডিসেম্বর তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি’র [জে এস এস] সঙ্গে চুক্তি করে, সেটাই ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি’ নামে পরিচিতি পায়। সেই চুক্তিতে সেনা ক্যাম্পগুলো প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু করার প্রতিশ্রুতি তৎকালীন সরকার দিয়েছিলো। কিন্তু তিন দশক পার হয়ে গেলেও ‘স্থায়ী শান্তি’ এবং ‘জাতীয় নিরাপত্তা’র স্বার্থের কথা বলে সরকার এখনো সেখানে [বিশেষ করে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান] সেনা শাসন জারি রেখেছে।
আরো একটা ঘটনা এখানে না বললেই নয়। তা হলো রাঙামাটিতে নির্মিত কাপ্তাই লেকের [১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত] আড়ালের ঘটনা। কাপ্তাই বাঁধ আগে নির্মাণের কথা ছিলো শুভলংয়ের চিলকধার নামের জায়গায়। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে তা সরিয়ে আনা হয় রাঙামাটিতে। এর ফলে প্রায় ৫৪ হাজার একর জমি পানিতে তলিয়ে যায়, পুরো একটা গ্রাম পানির নিচে, নাম তার ‘উগলছড়ি’। ভিটেছাড়া হয় প্রায় ১৮ হাজার পরিবার। তাদের প্রায় ৭০ শতাংশই ছিলো চাকমা জাতিসত্তার। ভিটেমাটি হারিয়ে কেউ কেউ চলে যায় ভারতে; প্রথমে দেমাগ্রী, তারপর নেফা [বর্তমানে অনরুনাচল নামে পরিচিত]। কেউবা অন্যত্র আশ্রয় খুঁজেছে, আবার কেউ শরণার্থীর খাতায় নাম লিখিয়েছে। আর এই ভিটেমাটি ছাড়ার যাত্রাই পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে ‘বর-পরং’ মানে পরিচিত। যা তাদের ভাষায়, ১৯৪৭ খিস্টাব্দের দেশ বিভাজনের মতোই ব্যাপার! তবে সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, এই লেক তৈরির ফলে যে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে সেখানে তাদের অধিকারের কথা বলা হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। এমনকি বাঁধ নির্মাণের অনেক আগে থকেই ওই গ্রামের গাছ কেটে ফেলা হয়েছে, যাতে করে নৌকায় ভ্রমণ করতে কোনো অসুবিধা না হয়! লেকের আশপাশে গড়ে তোলা হয়েছে রিসোর্ট। অনেক বাঙালি বসতিও গড়ে উঠেছে ওই পর্যটন কেন্দ্রকে কেন্দ্র করে। অথচ উদ্বাস্তুদেরকে যে জায়গাতে পুনর্বাসন করা হয়েছিলো [মারিশ্যার রূপকারীতে নির্ধারিত কাজলং রিজার্ভ ফরেস্ট এলাকায়], সেখানে সূর্যের আলো কখনোই মাটিতে পড়ে না। জঙ্গলের কারণে ম্যালেরিয়া, কলেরাসহ অনেক রোগে ভুগে মারা গেছে অসংখ্য মানুষ। এই লেকের পানিতে ডুবে আছে সেই গ্রাম উগলছড়ি। স্থানীয় এক বাসিন্দা সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘সেই থেকে ডুবুরির জীবন আমাদের। বাঁধের পানিতে ভেসে গেছি আমরা। ডুবসাঁতার দিয়ে একেকজন উঠেছি একেক দেশে। এই কাপ্তাই লেক হাজারো মানুষের কান্নার চোখের জল।’৩৫ সূক্ষ্মভাবে বিবেচনা করলে দেখা যাবে, পার্বত্য অঞ্চলের প্রত্যেকটি জাতিসত্তাই আসলে ‘ডুবুরি’র মতো। তাদের অধিকার নিয়ে সরকার কখনোই কোনো পদক্ষেপ তো দূরে থাক, উল্টো সেসব জায়গা দখল করে বসতি এবং পর্যটনকেন্দ্র তৈরি করেছে।
জুলাই যে সাম্যের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছিলো, সেই বিবেচনায় পার্বত্য অঞ্চলের দুরবস্থা এবং সেনা শাসনের যে আগ্রাসন, সেখান থেকে তাদের মুক্তি পাওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু তা এখনো অধরাই থেকে গেছে। এর কারণগত জায়গায় সমতলের ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ও কম দায়ি নয় বলেই মনে হয়। ফরহাদ মজহার পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাটাকে একইসঙ্গে যেমন ‘জাতীয়তাবাদে’র সমস্যা বলে চিহ্নিত করেছেন, তেমনই সাংবিধানিক সমস্যা আকারেও হাজির করেছেন। সংবিধানের প্রথম ভাগের ৬(২) নং ধারায় বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসেবে বাঙালী এবং নাগরিকগণ বাংলাদেশী বলিয়া পরিচিত হইবে।’৩৬ কিন্তু ঐতিহাসিকভাবেই এই অবস্থান সমস্যাজনক। কারণ ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদে’র শেষ পরিণতি স্পষ্টভাবেই ফ্যাসিবাদে পরিণত হয়েছে। এর বিপরীতে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ও দাঁড়াতে পারেনি। বলতে গেলে উভয়ই একই মুদ্রার দুই পিঠ হয়েই থেকে গেছে। ফলে এই ‘জাতীয়তাবাদী’ চিন্তার ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র জাতিসত্তার আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকেও ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতা ১৯৯৭-এর ‘চুক্তি’। ফরহাদ মজহার এখানেই প্রশ্ন তুলেছেন, ‘চুক্তি বা ‘treaty’ হয় একটি রাষ্ট্রের সঙ্গে আরেকটি রাষ্ট্রের। রাষ্ট্রের নাগরিকের সঙ্গে সরকারের কীসের চুক্তি?’৩৭ রাষ্ট্রের সঙ্গে তার নাগরিকের তো কোনো ‘চুক্তি’ হতে পারে না। তাই প্রশ্নটা জরুরি, কারণ এর ভেতরে রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে ক্ষুদ্র জাতিসত্তাকে অপরায়নের রাজনীতি রয়েছে। একইসঙ্গে প্রশ্ন তোলা যায়, সরকার যে ‘চুক্তি’ করেছে তাতে জনগণের ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ কতোটুকু? আবার ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি’ইবা [জেএসএস] ওইসব জাতিসত্তার প্রতিনিধিত্ব করে কিনা। এইসব বিবেচনায় নিয়ে এই ‘চুক্তি’কে ফরহাদ মজহার ‘আবদুল্লাহ্-লারমা চুক্তি’ বলে সাব্যস্ত করছেন। এছাড়া সার্বিক দিক বিবেচনায় নিয়ে তিনি এর কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং সাংবিধানিক জটিলতাকে। জাতীয়তাবাদ নিয়ে মজহার বলছেন, ‘বাঙালী জাতীয়তাবাদীরা তাদের [ক্ষুদ্র জাত্তিসত্তা] অধিকার স্বীকারই করে নি, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদীরা অস্ত্র দিয়ে তাদের দাবিদাওয়া খামোশ করে দিতে চেয়েছে। পাহাড়ীদের দমন করার অজুহাত দেখিয়ে বাংলাদেশে বড়ো ও শক্তিশালী স্থায়ী সেনাবাহিনী গড়ে তোলার শর্ত তৈরি করা হয়েছে।’৩৮ তিনি আরো বলছেন, “ভুল সংবিধান যে একটি রাষ্ট্রকে বিচ্ছিন্ন বা ধ্বংস করতে পারে সেই বোধ আমাদের হয়নি। আমরা ধরেই নিয়েছিলাম আদিবাসীদের আমরা সংবিধানের জোরেই ‘বাঙালী’ বানিয়ে ফেলতে পারবো।”৩৯
বিষয়টাকে বুঝতে একটা উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। যদিও এর সঙ্গে ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ নামক বায়বীয় বিষয়টাও জড়িত। জুলাই চলাকালীন একটা গ্রাফিতি আঁকা হয়েছিলো, ‘পাতা ছেঁড়া নিষেধ’। এবং তা মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তকে যুক্তও করা হয়। এটা নিয়ে আপত্তি উঠার পরে তা সরিয়ে নিতে বাধ্য হয় সরকার। সেখানে বাংলাদেশের সব জাতিসত্তার একটা স্বীকৃতির রূপ দেখা যায়। কিন্তু যখনই তা নিয়ে আপত্তি ওঠে এবং তা সরিয়ে নেওয়া হয়, তখন সেই পক্রিয়ার ভেতর দিয়ে আসলে পার্বত্য এলাকার নাগরিকদেরকে জাতিসত্তাগত জায়গা থেকেই ‘অপর’করে দেওয়ার রাজনীতিই প্রতিষ্ঠা পেয়েছে জোরেশোরে। ঐতিহাসিক এই বিষয়টা নিয়ে ঐতিহাসিকভাবেই প্রশ্ন তুলেছে কেবল এদেশের বামপন্থিরাই, কিন্তু ফরহাদ মজহারের মতে সেটাও কোনো না কোনোভাবে জাতীয়তাবাদীদের পালেই হাওয়া দিয়েছে। আর ঘোর-জাতীয়তাবাদী এবং ফার-রাইটরা অনবরত আদিবাসীদেরকে ‘অপর’করতে চেয়েছে, এবং রীতিমতো তার উদযাপনে লিপ্তও হয়েছে। তাই এর সমাধান কী, এই মুহূর্তের বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে তা আন্দাজ করা মুশকিল। বেঞ্জামিনের ভাষা এবং ধারণা ধার করে এই প্রশ্ন ‘ইতিহাসের সেই ফেরেশতা’র [angel of the history] হাতেই ন্যস্ত করা গেলো। আর কেবলই বব ডিলান-এর কথাটাকে উল্টে দিয়ে সর্বোচ্চ বলা যে পারে, ‘বন্ধু, বাতাসে এখন প্রশ্ন উড়ে বেড়াচ্ছে’, আমাদের কাজ এখন ইতিহাসের কর্তারূপে আবির্ভূত হয়ে সেই প্রশ্নটাকে ধরতে পারা।
নয়. ‘৭২ না ১৪ না ২৪’র সংবিধান সকল জাতি ধর্ম শ্রেণী লিঙ্গের গণমানুষের সংবিধান, সংবিধান বলতে আমরা বুঝি গঠনতন্ত্র, এখন সময় গঠিত হওয়ার’
সংবিধান একটা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন। গোটা রাষ্ট্রকাঠামো পরিচালিত হয় তার ওপর ভর করে। কিন্তু তাতে কার কথার প্রতিফলন ঘটে? নিঃসন্দেহে তার নাগরিকের আশা-আকাঙ্ক্ষার। কিন্তু বাংলাদেশের সবিধানের জন্ম থেকে এখন অব্দি যে সরকারই ক্ষমতায় এসেছে, তারা কোনো না কোনোভাবে সেটাকে তাদের ক্ষমতার মসনদকে স্থায়িত্ব দিতেই পরিবর্তন, পরিবর্ধন করে গেছে। বাংলাদেশের সংবিধানের জন্ম ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের সংবিধানের মধ্য দিয়ে। কিন্তু তাতেও কি এদেশের নাগরিকের বাসনার পূর্ণ প্রতিফলন ঘটেছিলো? না ঘটেনি। এ নিয়ে চিন্তক ফরহাদ মজহার বলছেন,
সংবিধান রচনা করবার জন্য মুক্তিযুদ্ধ শেষ হবার পর স্বাধীন বাংলাদেশের নতুন সংবিধান সভা ডাকবার প্রয়োজনীয়তা ছিল। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয় নি। যাঁরা পাকিস্তানের সংসদে নির্বাচিত হয়েছিলেন তাঁরাই নিজেদের সংবিধান সভা বলে দাবি করেছে। রাষ্ট্রগঠনের গোড়াতেই এই মারাত্মক ও বিপজ্জনক দুর্বলতা পরবর্তীতে রাজনীতি স্থায়ী অসুখে পরিণত হয়। ... একাত্তরে যদি গণতান্ত্রিক সংবিধান রচনার জন্য আমাদের সমাজে স্বাধীন ও মুক্ত ব্যক্তির আবির্ভাবের অভাব দেখে থাকি তাহলে বিচার করতে হবে আদৌ আমরা নাগরিক হয়ে উঠেছি কিনা। ... গণতান্ত্রিক সংবিধান ও রাষ্ট্র কায়েমের মুহূর্তে আমাদের ইতিহাসে হাজির না হওয়ার এটা একটা প্রধান কারণ বলে অনুমান করি। জাতিগতভাবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্ন শ্রেণী অংশগ্রহণ করলেও যুদ্ধে সেই শ্রেণীই ক্ষমতায় এসেছে যার বিরুদ্ধে লড়াই করেই বাংলাদেশে গণতন্ত্র কায়েম করতে হবে। বাংলাদেশের সংবিধান বাংলাদেশের জনগণ প্রণয়ন করে নি, এই গোড়ার গলতি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের চরম দুর্বলতার কারণ। জনগণের ইচ্ছা ও অভিপ্রায়কে ধারণ করবার জন্য যে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া স্বাধীন বাংলাদেশে প্রয়োজন ছিল, সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয় নি।৪০
ফরহাদ মজহার আরো দাবি করেছেন, বাংলাদেশের সংবিধান ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দ থেকেই অগণতান্ত্রিক, গণবিরোধী, সম্পত্তির অধিকারের প্রশ্নে ধর্মীয় বিধানে ছুতা তুলে নারীকে বঞ্চিত করার দলিল। এবং সর্বোপরি সংসদীয় পদ্ধতির নামে মূলত প্রধানমন্ত্রীর হাতে কেন্দ্রীভূত একনায়কতান্ত্রিক ব্যবস্থারই একটা জগাখিচুড়ি দাসখত ছাড়া আর কিছুই না।৪১ ফলে যে সংবিধানে জনগণের ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষা তার মাতৃভাষায় প্রকাশ হয়, সেই ভাষাই ওখানে প্রাধান্য পায় নাই। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের লড়াই মানে প্রথমেই সহজসরল বাংলাভাষায় সংবিধান রচনার লড়াই, যে সংবিধান যেকোনো নাগরিক অনায়াসে বুঝতে সক্ষম। কিন্তু তা হয়নি বরং সংবিধান রচনা করা হয়েছিলো ইরেজি ভাষায়, পরে তার দাপ্তরিক অনুবাদ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশের নাগরিকের ওপরে। ফলে বাংলাদেশের পরবর্তী রক্তাক্ত ইতিহাস এই সংবিধানেরই ইতিহাস, রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ গঠন প্রক্রিয়ার ভয়ানক দুর্বলতারই কাফফারা গুনছি আমরা আজ অবধি।৪২
এই কথার ব্যবহারিক জায়গাতে যদি যাওয়া যায়, তাহলে দেখা যাবে, সংবিধানের যে মূলনীতি সেখানেই গোজামিল থেকে গেছে। সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগের ৮(১) নং ধারায় বলা হয়েছে, ‘জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা - এই নীতিসমূহ এবং তৎসহ এই নীতিসমূহ হইতে উদ্ভূত এই ভাগে বর্ণিত অন্য সকল নীতি রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি বলিয়া পরিগণিত হইবে।’৪৩ অথচ প্রথম ভাগের ২(ক) নং ধারায় বলা হলো, ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম হবে ইসলাম, তবে হিন্দু বৌদ্ধ, খ্রীষ্টানসহ অন্যান্য ধর্ম পালনে রাষ্ট্র সমমর্যাদা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করিবেন।’৪৪ আবার প্রস্তাবনার শুরুতে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ‘বিসমিল্লাহির-রহমানির রাহিম’ যুক্ত করা হয়েছে।৪৫ খেয়াল করলেই মূলনীতিগুলোর সঙ্গে এসব ধারার বিরোধ যেমন রয়েছে, খোদ মূলনীতিগুলোরও একে-অন্যের সঙ্গে পূর্ণ বিরোধ বিদ্যমান এবং তা একেবারেই স্পষ্টভাবে চোখে পড়বে। কাজেই ’৭২-এর সংবিধান বাংলাদেশের জনগণের জন্য প্রাথমিক রোডম্যাপ হলেও তার যথেষ্ট খুঁত থেকে গেছে এখন অব্দি।
২০১৪ খ্রিস্টাব্দের ১৭ সেপ্টেম্বর ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে ’৭২ খ্রিস্টাব্দের সংবিধানের ৯৬ নং ধারা সংবিধানে প্রতিস্থাপন করা হয়। ’৭২-এর সংবিধানের মূল কথা ছিলো, সংসদের মোট সদস্যের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে কোনো বিচারককে অপসারণ করা যাবে। এর ভেতর দিয়ে কোনো বিচারককে অপসারণের অধিকার ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে’র কাছ থেকে নিয়ে সংসদ সদস্যদের ওপর ন্যস্ত করা হয়। ফলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপ ঘটে এবং আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ ও প্রশাসনিক বিভাগের মধ্যকার যে জুদাকরণনীতি, তার বিপরীতে গিয়ে দাঁড়ায় এই সংশোধনী। যদিও পরে সেই সংশোধনী বাতিল করে সেই অধিকার ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে’র হাতেই পুনর্বহাল রাখা হয়।
দেবাশিস তার নির্মিত ছবিতে সংবিধানের ওপরে স্থান দিয়েছেন ‘গঠনতন্ত্র’কে। ছবিতে দেখা যায়, এর একেবারে নিচে, মাঝ বরাবর একজন পুরুষ এবং একজন নারী দাঁড়িয়ে আছে। পুরুষের হাত উপরের দিকে উঠানো এবং মুষ্টিবদ্ধ। তার ঠিক উপরেই লেখা, ‘৭২ না ১৪ না ২৪’র সংবিধান সকল জাতি ধর্ম শ্রেণী লিঙ্গের গণমানুষের সংবিধান, সংবিধান বলতে আমরা বুঝি গঠনতন্ত্র, এখন সময় গঠিত হওয়ার’। গঠনতন্ত্র সম্ভবত তার ভাবনায় সংবিধানের ভেতর দিয়ে জনগণের ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা, ভাষার বাস্তবায়ন। এবং জুলাইকে তিনি সেই গঠনের চরম ওয়াক্ত বলে চিহ্নিত করেছেন যেখানে জনগণের ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা, ভাষার স্বতঃস্ফূর্ত গঠন ও বাস্তবায়নের আশার প্রদীপ জ্বলেছিলো। এ নিয়ে ফরহাদ মজহার হেগেলকে রেফার করে বলেন :
অধিকারের ভিত্তি হচ্ছে মন - এর উৎপত্তির সুনির্দিষ্ট জায়গা ও বিন্দু হচ্ছে ইচ্ছা। ইচ্ছা মাত্রই স্বাধীন কারণে অধিকারের সারকথা ও লক্ষ উভয়ই হচ্ছে স্বাধীনতা। ... (ইচ্ছা মাত্রই সে স্বাধীন বা মুক্ত) এই প্রমাণের গোড়ার ভিত্তি হচ্ছে এই যে মন মানে হচ্ছে চিন্তা, যে চিন্তা উপলব্ধি থেকে প্রকাশমূলক চিন্তা ও চিন্তার খোদ স্বভাব নিয়ে আবির্ভাবের আগে যে সকল পর্যায় পেরিয়ে আসে সেই পরিভ্রমণেরই এক পর্যায়ে নিজেকে সে ইচ্ছা আকারে উৎপন্ন করে; সেই ইচ্ছা - চিন্তার সাধারণ ব্যবহারিক রূপ হিশাবে যার আবির্ভাব হচ্ছে চিন্তারই সত্য, চিন্তার পরবর্তী পর্যায়। চিন্তা, ইচ্ছা বা অভিপ্রায় মাত্রই মুক্ত ও স্বাধীন - চিন্তা নিজের ভেতর থেকেই নিজেকে পয়দা করে, সংবিধান, আইন ও রাষ্ট্র তৈরি করে। ... মানুষ নিজেকে মুক্ত ও স্বাধীন-ঘোষণা দেওয়া-সংবিধান ও আইন তাকে রক্ষিত করবার আয়োজন ...।৪৬
কিন্তু জুলাই পরবর্তী বাস্তবতার দিকে নজর দিলে দেবাশিস তার শিল্পকর্মের ভেতর দিয়ে যে গঠন এবং গঠনতন্ত্রের কথা বলেছিলেন তার বাস্তবায়ন দেখা যায় না। ‘জুলাই সনদে’‘হ্যাঁ ভোট’ জনগণ দিলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর তা আরো প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে। ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার’ও ‘জনগণের ইচ্ছা’র বাস্তবায়ন কতোটুকু করেছে, বা করতে চেয়েছে সেটাও প্রশ্নসাপেক্ষ বিষয় হয়েই থেকে গেছে। ‘মব’ গণ-সার্বভৌমত্বের নামে তারই অপভ্রংশকে দেখা গেছে ‘মব’ আকারে হাজির হতে। তা তো মোটেও ‘গঠন’ বলে বিবেচিত হতে পারে না। ফলে ‘গঠন’ এক অলীক, মেটাফিজিকাল প্রশ্ন আকারেই রয়ে গেছে জন-রাষ্ট্রীক পরিসরে।
দশ. ‘এলিটদের রাষ্ট্রব্যবস্থা না গণমানুষের রাষ্ট্রব্যবস্থা রাষ্ট্র সংস্কার লাগবে’
‘এলিট’ বলতে যদি দেবাশিস ‘বুর্জোয়া বণিক শ্রেণি'কে বুঝিয়ে থাকেন, তবে সেক্ষত্রে বিনয় ঘোষের আলাপটা প্রাসঙ্গিক হতে পারে এখনো। বিনয় ঘোষ তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘বাংলার নবজাগগৃতি’তে জানাচ্ছেন, বৃটিশ শাসনামলে বাংলার পুঁজি যেটুকু তার বণিক শ্রেণির হাতে পুঞ্জীভূত হয়েছিলো তা বৃটিশ উপনিবেশিক চক্রান্তের ফ্যারে পড়ে আবার জমিদারিতেই ব্যয় হয়। ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে’র মাধ্যমে বণিক শ্রেণির রাতারাতিই জমিদার শ্রেণিতে রূপান্তরের পথ উন্মুক্ত হয়ে যায়। তখন তারা ভোগবিলাসের পরে উদ্বৃত্ত টাকা প্রধানত জমিদারি কিনতে ব্যয় করে। কার্ল মার্কস তার ‘নোটস অন ইনডিয়ান হিস্ট্রি’ গ্রন্থে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলাফল নিয়ে লিখেছেন -এই বন্দোবস্তের ফলে ‘রাতারাতিই প্রদেশটার [ভারত উপমহাদেশ] অধিকাংশ জমির মালিকানা গুটিকয়েক শহুরে বণিক শ্রেণির হাতে কেন্দ্রীভূত হতে থাকে। তারা বিপুল পরিমাণ মূলধনের মালিক হয় এবং লাভজনক বিনিয়োগ হিসেবে জমিদারি কিনতেই তার লগ্নি ঘটায়। [... greater part of the province’s landholdings fell rapidly into the hands of a few city-capitalists who had spare capital and readily invest it in land.]৪৭ ফলে এখানে শিল্পভিত্তিক বুর্জোয়া শ্রেণির বিকাশের পথ ভয়াবহভাবেই ব্যাহত হয়েছে। এবং ‘ব্রিটিশ পুঁজিপতিদের আওতায় বাঙলার বণিক মুৎসুদ্দী দালাল ও শিল্পোদ্যোগী পুঁজিপতিরা ধীরে ধীরে ঔপনিবেশিক বুর্জোয়াশ্রেণীতে পরিণত হন।’৪৮ বিনয় ঘোষ আরো বলছেন,
ঊনবিংশ শতাব্দী থেকেই বাঙালী কম্প্র্যাডোর বুর্জোয়াশ্রেণীর যে নিশ্চিত বিকাশ শুরু হয়েছিল তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। এই বিকাশ মন্দগতিতে অসমতল পথে হওয়াই স্বাভাবিক। কারণ প্রথমত, ব্রিটিশ উপনিবেশ, দ্বিতীয়ত, ঊনবিংশ শতাব্দী হল সামন্তযুগ থেকে ধনতান্ত্রিক যুগে পদার্পনের সন্ধিক্ষণের যুগ। উপনিবেশ বলে ব্রিটিশ বুর্জোয়াশ্রেণীর পক্ষে এদেশের বুর্জোয়াশ্রেণীকে স্বাভাবিক বিকাশের সুযোগ দেওয়া কদাচ সম্ভব নয়। স্বার্থসচেতন ব্রিটিশ পুঁজিপতিরা এদেশের শিল্পোদ্যোগী ব্যবসায়ীদের তাই বাণিজ্যের অথবা প্রাথমিক মূলধন সঞ্চয়ের অথবা সেই সঞ্চিত মূলধন শ্রমশিল্পের ক্ষেত্রে নিযুক্ত করার অবাধ স্বাধীনতা দেননি। কিন্তু স্বার্থের খাতিরেই এদেশের নতুন জমিদারশ্রেণীর ও উদীয়মান বুর্জোয়াশ্রেণীর আনুগত্য তাঁদের একান্ত প্রয়োজন ছিল। তাই এদেশের বণিক ও উদ্যোগী ব্যক্তিদের বাধ্য হয়ে তাঁদের বেনিয়ান মুৎসুদ্দী দেওয়ান এজেন্ট, এমনকি ব্যবসায়ের অংশীদার পর্যন্ত করতে হয়েছে। তেমনি, রাজভক্তির ছায়ায় ভিন্ন এদেশের বণিকদের প্রাথমিক মূলধন সঞ্চয়ের কোন সুযোগও ছিল না। তাই এসময়ে রাজানুগত্য এদেশীয় প্রত্যেক প্রভাবশালী ব্যক্তির অন্যতম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ছিল দেখা যায়। রাজানুগ্রহের ছায়াতলে, ব্রিটিশ পুঁজিপতিদের পার্শ্বচর ও অনুচর হয়ে এদেশের বুর্জোয়াশ্রেণীর বাল্যকাল কেটেছে।৪৯
কাজেই এদেশে যে এলিট বা বুর্জোয়া শ্রেণির উদ্ভব ঘটলো রাজশক্তি এবং ক্ষমতার বগলদাবার গুটি হিসেবে, সেখানে তাদের সঙ্গে ক্ষমতার দেওয়া-নেওয়া [দাদ-সিদাত] এবং মিথোজীবিতমূলক সম্পর্কই প্রবল। এমনকি তা বর্তমান ও সমসাময়িক বাংলাদেশের এলিট এবং বুর্জোয়া শ্রেণির মধ্যেও আবিষ্কার করা অসম্ভব নয়। রাষ্ট্রের ক্ষমতাকাঠামোর ছায়াতলেই তারা আশ্রিত এবং সুবিধার দাদ-সিদাতমূলক সম্পর্কই বহাল-তবিয়তে হাজির আছে।
ফলে রাষ্ট্রকাঠামোর যে প্রথাগত ক্ষমতাকাঠামো, সেটা তাদের মাধ্যমেই টিকে থেকেছে। সেইখানে দাঁড়িয়ে দেবাশিস যে ছবি তৈরি করেছেন, তাতে এই এলিটদের ক্ষমতাকে নেতিকরণ করা হয়েছে। ছবিটাতে দেখা যায়, দুজন নারী সামনের দিকে হাত উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। একজনের পরনে গেঞ্জি এবং জিন্স, সে ‘ভি’ তথা বিজয়ের প্রতীকী প্রকাশ হিসেবে হাজির হচ্ছেন। অন্যজন হিজাব পড়া, মুষ্টিবদ্ধ হাত। পেছনে কালো রঙ্গে আঁকা অসংখ্য মানুষ কেউ ‘ভি’, কেউবা আঙুল উঁচিয়ে আবার কেউবা হাত মুষ্টিবদ্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। সামনের দুজন নারী সেই ‘গণে’রই রিপ্রেজেন্টেটিভ হয়ে উঠেছে।
জুলাইয়ের সময়ে এই ‘গণ’কে একটি মাত্র ক্যাটাগরি হিসেবেই বিবেচনা করা হয়েছিলো। কিন্তু এই ‘গণ’ কে? সেই প্রশ্ন তার পরবর্তী বাস্তবতা বুঝতে গেলে তুলতেই হবে। ‘গণ’-এর ভিড়ে ব্যক্তি-বাসনা ‘মব’ তথা গণের [ছদ্মবেশে তার অপভ্রংশ] রূপ ধারণ করে ফ্যাসিবাদেরও জন্ম দিতে পারে; জুলাই পরবর্তী বাস্তবতায় তার চিহ্নায়ন, দাগ-খতিয়ান ভূরিভূরি। বিশেষ করে মাজারকে কেন্দ্র করে ক্রমাগত সহিংসতা তারই নজিরবিহীন প্রামাণ্যতা হাজির করে [এক্ষেত্রে বিস্তারিত জানতে পাঠক ‘মাকাম : সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজ’-এর প্রতিবেদনটা দেখে নিতে পারেন]। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে বহুদলীয় গণতন্ত্র ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য বজায় রেখে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন ছাত্র-জনতা দেখেছে সেই স্বপ্নকে সর্বপ্রথম নস্যাৎ করা হয়েছে মাজারে আক্রমণের মধ্য দিয়ে।’৫০‘গণ’-এর সার্বভৌমত্বের দাবি তখন খোদ ফ্যাসিবাদকে পুষ্ট করার পুষ্টি যোগায়।
উপসংহার
দেবাশিসের পোস্টারগুলো এমন কিছু প্রশ্ন সামনে এনে হাজির করে যা নয়া বিবেচনার ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিকতার নিশানা [ট্রেস] পাওয়া সম্ভব। তিনি তার নির্মিত ছবিগুলোর ভেতর দিয়ে সেই নয়া রাজনীতিকে ধরতে চেয়েছেন এবং সেটা করতে গিয়ে ঐতিহাসিকভাবে ইতিহাসের কর্তারূপে বাংলাদেশের নাগরিককে তার কর্ম-করণ নিরূপণ এবং তার কী কী করণে হতে পারে, তাও নিরূপনের ইশারা দিয়েছেন বলেই মনে হয়েছে। তার শিল্পকর্ম তাই ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের মতে, ‘ইতিহাসের সেই ফেরেশতা’ [angel of the history] হয়ে হাজির হয়। যে বা যা বর্তমানে দাঁড়িয়ে অতীতের দিকে তার নজর ফেরায় এবং অতীতকে ক্রনোলোজিকাল ঘটনার সমাহার হিসেবে পাঠ না করে বরং পাঠ করে এক বিশাল ধ্বংসস্তুপে চাপা পড়ে থাকা ধ্বংসাবশেষ হিসেবে, যা ক্রমাগতভাবে ইতিহাসের ঘাড়ে এসে জমা হতে থাকে। অথচ ‘প্রগতি’ বা ‘অগ্রগতি’ নামক মহাপ্রলয় তাকে ঠেলে নিয়ে যায় ভবিষ্যতের দিকে। বেঞ্জামিন তার ‘অন দ্য কনসেপ্ট অব দ্য হিস্ট্রি’ নামক প্রবন্ধের ৯ নম্বর থিসিসে বলছেন,
তার [ইতিহাসের ফেরেশতা] চোখ বিস্ফোরিত, মুখ খোলা, ডানাগুলো প্রসারিত। ইতিহাসের ফেরেশতার চেহারা নিশ্চয়ই এমনই। তার মুখ অতীতের দিকে ফেরানো। আমাদের সামনে যেখানে ঘটনাবলি একটা ধারাবাহিকতা নিয়ে দৃশ্যমান হয়, সেখানে সে এক দায়েমি মহাবিপর্যয় দেখতে পায়। যা ধ্বংসাবশেষের স্তূপাকারে জমা হয়ে তার পদতলে নিক্ষিপ্ত হতে থাকে। ইতিহাসের সেই ফেরেশতা স্তব্ধ হয়ে থাকতে চায়, মুর্দাকে জাগিয়ে তুলতে চায়। যা কিছু চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে তাকে পুনরায় জোড়া লাগাতে চায়। অথচ বেহেশত থেকে এক ঝড় এসে তার ডানায় এমনভাবে ঝাপটা মারে যে, সে আর তার ডানাগুলোকে বন্ধ করতে পারে না। ঝড় তাকে অপ্রতিরোধ্য গতিতে ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে নিয়ে যায়। অথচ সেই ভবিষ্যতের দিকেই তার পিঠ ফিরে আছে [আর সে মুখ ফিরিয়ে আছে অতীতের দিকে]। এদিকে তার সামনে ধ্বংসাবশেষের স্তুপ আকাশছুঁয়ে যায়। আর সেই ঝড়কেই আমরা ‘প্রগতি’ বলে থাকি।৫১
জুলাই যদি সেই ঐতিহাসিক কেয়ামত বা মহাবিপর্যয়ের ওয়াক্ত হয়ে থাকে, তবে দেবাশিসের পোস্টার হলো ইতিহাসের সেই ফেরেশতা, যে কিনা অতীত বর্তমান আর ভবিষ্যতের ডায়ালেক্টিকাল জমিনের ওপর দাঁড়িয়ে সেই কেয়ামতকে প্রত্যক্ষ করতে সক্ষম। যে কিনা ‘প্রগতি’র বিপরীত দিকে মুখ ফিরিয়ে, তাকে স্থগিত করে ইতিহাসের সেই ধ্বংসস্তুপ নামক হাশরের মাঠে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে তারই নয়া পাঠ হাজির করতে চায়। ওজুদ-মজুদ করতে চায় ইতিহাসের সেই ধ্বংসস্তুপে চাপা পড়া ধ্বংসাবশেষরূপী জবান।
লেখক : মাহমুদুল হাসান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্বের শিক্ষার্থী। চলচ্চিত্র নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি ও অনুবাদ করছেন।
hasanalmahmud60@gmail.com
https://www.facebook.com/mahmud.alhasan.14418
তথ্যসূত্র ও টীকা
১. ‘পোস্ট-ফটোগ্রাফিক’ জমানায় দাঁড়িয়ে দেবাশিসের করা শিল্পকর্মকে স্রেফ ‘পোস্টার’ বলে দাগিয়ে দেওয়া যায় না। তাতে তার শিল্পভাবকে পুরোপুরি বোধগম্যতার আওতায় আনা যায় না। এ বিষয়ে তিনি নিজেই বলেন, আর্টের “এস্থেটিক্সের সমাধা করতে গিয়ে, জনপরিসর থেকে উপাদান-অনুপ্রেরণা সংগ্রহ করেছি। মানেই হলো, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় প্রচলিত-পরিচিত বিভিন্ন ফর্ম, সিনেমার পোস্টার, রাজনৈতিক ব্যানার, বিজ্ঞাপন, বিভিন্ন পণ্যের প্যাকেজিং, এমনকি হাল আমলের মিম সংস্কৃতি থেকেও ফর্ম সংক্রান্ত উপাদান সংগ্রহ করে এস্থেটিক্সের মামলার সমাধান করা হয়েছে।” কাজেই ব্যাপারগুলোকে মাথায় রেখেই কাজের সুবিধার্থে মোটাদাগে তার কাজগুলোকে চিহ্নিত করতে গিয়ে পোস্টার শব্দটাই ব্যবহার করা হয়েছে এখানে।
২. Benjamin, Walter (2002: 462-463, 929-945); ‘On the Theory of Knowledge, Theory of Progress’, ‘Dialectics at a Standstill’; The Arcades Project; Translated by: Howard Eiland and Kevin MacLaughlin; Cambridge, Massachusetts, UK.
৩. চক্রবর্তী, দেবাশিস; ‘রাষ্ট্র যন্ত্রণা’; দেবাশিস চক্রবর্তী’র পোস্টারে জুলাই অভ্যুত্থান, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, ঢাকা।
৪. প্রাগুক্ত; Benjamin (2002: 462-463, 929-945).
৫. Agamben, Giorgio (2007: 79); ‘Shekinah’; The Coming Community; Translated by: Michael Hardt; University of Minnesota Press, USA.
৬. প্রাগুক্ত; Agamben (2007: 79).
৭. Agamben, Giorgio (2020: 53); ‘Desiring’; Profanations; Zone Books, USA.
৮. Deleuze, Gilles and Guattari, Felix (1983: xiii-xiv); ‘Preface by Michel Foucault’; Ani-Oedipus: Capitalism and Schizophrenia; University of Minnesota Press, USA.
৯. আলম, পারভেজ (২০২৫ : ৪৫-৪৬); ‘স্বকালের মোরাকাবা’; কাশফ, আদর্শ, ঢাকা।
১০. প্রাগুক্ত; Agamben (2007: 53).
১১. প্রাগুক্ত; Agamben (2007: 07).
১২. Hall, Stuart (1997: 13); ‘The Work of Representation’; Representation: Cultural Representations and Signifying Practices; Sage Publications Ltd, UK.
১৩. Foucault, Michel (1981: 48); ‘The Order of Discourse’; Untying the Text: A Post-Structuralist Reader, Edited and Introduced by: Robert Young; Routledge & Kegan Paul Ltd, USA.
১৪. Emmel, Nick (2013: 46); ‘Theoretical or Purposive Sampling’; Sampling and Choosing Cases in Qualitative Research: A Realist Approach; Sage Publications Ltd, UK.
১৫. বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির করা ‘দেবাশিস চক্রবর্তী’র পোস্টারে জুলাই অভ্যুত্থান’ সিরিজ; প্রকাশকাল : ২০২৫।
১৬. Foucault, Michel (2024: 05); ‘Introduction’; What Is Critique? and the Culture of the Self’; Translated by: Clare O’Farrel, Edited by: Henri-Paul Fruchaud, Daniele Lorenzini and Arnold I. Davidson; The University of Chicago Press, USA.
১৭. পারভেজ আলমের ফেইসবুক পোস্ট; ‘নজরুল ও দেবাশিসের মাহদিয় শিল্প’; দেখুন :https://www.facebook.com/story.php?story_fbid=10164932761359134&id=735969133&rdid=2Q0jFaWCaQ7xPBkY#;retrieved on: 01.06.2026
১৮. মামুন, আ-আল; ‘গণ-অভ্যুত্থানে তারুণ্যের র্যাপ’; দেখুন:https://www.prothomalo.com/onnoalo/2rtzxsbsga;retrieved on: 21.05.2026
১৯. Benjamin, Walter (2004: 253); ‘The Task of the Translator’; Walter Benjamin: Selected Writings, Vol: 1, 1913-1926, Edited by: Marcus Bullock and Michael W. Jennings; Harvard University Press, USA.
২০. আইনের সার্বভৌম ক্ষমতা ও তার সহিংসতা [পৌরাণিক সহিংসতা] এবং এর বিপরীতে দিব্য সহিংসতার মধ্যকার তফাত বা ভেদ বুঝাতে গিয়ে বেঞ্জামিন গ্রিক পুরাণ-এর একজন রানি—নিয়োবি [Niobe] এবং বাইবেল-এর ‘বুক অব নাম্বারস’-এ উল্লেখ করা কোরাহ [Korah] এর কাহিনির তুলনা করেছেন। রানি নিয়োবির অনেকগুলো সন্তান থাকায় তিনি তা নিয়ে বেশ গর্ব করতেন। এবং তা নিয়ে গ্রিক দেবী লেটো’কে অপমান করেন এই বলে যে, তার অনেকগুলো সন্তান কিন্তু লেটোর মাত্র দুজন সন্তান—অ্যাপোলো ও আর্টিমিস। যার কারণে লেটোর সন্তান অ্যাপোলো ও আর্টিমিস নিয়োবির সবগুলো সন্তানকে হত্যা করে; কিন্তু নিয়োবিকে বাঁচিয়ে রাখে। ফলে নিয়োবি ক্রমাগত অপরাধবোধ, শোকতাপে ভুগতে থাকেন আর দেবতাদের ক্ষমতার কাছে মাথানত করতে বাধ্য হন। বেঞ্জামিন নিয়োবির এই পরিস্থিতিকেই ‘পৌরাণিক সহিংসতা’ বলে আখ্যায়িত করেন। কারণ নিয়োবি এখানে সেই সিম্বল, যিনি দেবতাদের ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারেন না বা দেবতাদের ক্ষমতাকে উতরে যেতে পারেন না, সেই ক্ষমতাকে তার মেনে নিতে হয়। আর এই মেনে নেওয়া, উতরে যেতে না পারা বা না যাওয়াটাই নতুন আইন হয়ে ওঠে; আইনের সহিংসতাকে নতুন আইন দিয়ে বৈধতা দেওয়া হয়। অন্যদিকে ‘বাইবেল’-এর চরিত্র কোরাহ বনি ইসরাইল গোত্রভুক্ত। যিনি নবী মুসা (আ.) ও তার ভাই হারুন (আ.) এর কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। ফলে খোদা তাকে শাস্তি দেন—হঠাৎ করেই জমিন দুই ভাগ হয়ে যায় এবং কোরাহ ও তার অনুসারীদেরকে জীবন্ত গিলে ফেলে। একই কাহিনি কুরআনেও বর্ণিত হয়েছে ‘সুরা কিসাস’-এ [২৮ : ৭৬-৮২]। এখানে দেখা যায়, নতুন কোনো আইনের হাজিরা নাই, বরং তা বিশেষ কোনো অবস্থা বা পরিস্থিতির বিনাশ ঘটাতেই কাজ করে। এবং তা খোদার ন্যায় বিচারের প্রতীক ও সেই মুহূর্তকেই উন্মোচন করে, যা মাহদীয়। আর সেই মাহদীয় মুহূর্তের বিচারকার্য ও তার সহিংসতাকেই বেঞ্জামিন ‘দিব্য সহিংসতা’ বলে আখ্যায়িত করেন।
২১. Benjamin, Walter (2004:249-252); ‘Critique of Violence’; Walter Benjamin Selected Writings: Volume: 01, 1913-1926, Translated by: Edmund Jephcott, Edited by: Marcus Bullock and Michael W. Jennings; Harvard University Press, UK.
২২. ‘Shezan-System’;দেখুন:https://www.youtube.com/watch?v=xCHqud3kIyQ&list=RDxCHqud3kIyQ&start_radio=1; retrieved on: 04.06.2026
২৩. মজহার, ফরহাদ (১৯৮৩ : ১০-১১); ‘আমাকে তুমি দাঁড় করিয়ে দিয়েছ বিপ্লবের সামনে’; আমাকে তুমি দাঁড় করিয়ে দিয়েছ বিপ্লবের সামনে, প্রতিপক্ষ প্রকাশনা, ঢাকা।
২৪. Foucault, Michel (2007: 83); ‘What is Revolution?’; The Politics of Truth; Translated by: Lysa Hochroth & Catherine Porter, Edited by: Sylvere Lotringer, Semiotext(e), USA.
২৫. Lofgren, Mike (2016: 34); ’What is the Deep State?’; The Deep State: The Fall of the Constitution and the Rise of a Shadow Government, Penguin Books, USA.
২৬. প্রাগুক্ত;Lofgren (2016: 46-47).
২৭. হাসান, আহমদুল; ‘তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন : গুম করা হতো তিনটি ধাপে’; দেখুন :
https://www.prothomalo.com/bangladesh/crime/xpsdh2pi9v; retrieved on: 05.06.2026
২৮. Bauman, Zygmund (2000: 18); ‘Emancipation’; Liquid Modernity; Polity Press, USA.
২৯. Marx, Karl (1943: 23); ‘Chapter One’; The Eighteen Brumaire of Luis Bonaparte, George Allen & Unwin Ltd, UK.
৩০. Agamben, Giorgio (2011: 13); ‘What Is Contemporary’; Nudities, Stanford University Press, USA.
৩১. Agamben, Giorgio (1999: 244); ‘Bartleby, or On Contingency’; Potentialities: Collected Essays in Philosophy, Stanford University Press, USA.
৩২. The Qur’an (86: 01); ‘The Pen (Al-Qalam)’; Translated by: M. A. S. Abdel Haleem, P: 384, University of Oxford Press, UK.
৩৩. আলম, পারভেজ (২০২৫ : ৩৩-৩৪); ‘স্বকালের মোরাকাবা’; কাশফ; আদর্শ, ঢাকা।
৩৪. চিশতী, সদর উদ্দিন আহমদ (২০১০ : ১৬); “‘মোকাত্তাআত্ বা কোরানুল হাকীমে সূরার প্রারম্ভে ব্যবহৃত সাংকেতিক অক্ষরসমূহের পরিচয়”; কোরান দর্শন প্রথম খণ্ড, সদর প্রকাশনী, ঢাকা।
৩৫. মিত্র, অপরাজিতা; ‘সুবিশাল কাপ্তাই লেক : শুধুই কি আনন্দ ভ্রমণের জায়গা?’; সম্পাদনা : আনু মুহাম্মদ, সর্বজনকথা; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, নভেম্বর ২০১৮-জানুয়ারি ২০১৯, বর্ষ : ৫ম, সংখ্যা : ১ম, পৃ. ৬৮।
৩৬. গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান; প্রথম ভাগ; ধারা নং ৬(২)।
৩৭. মজহার, ফরহাদ (২০২২ : ৩৪৯-৩৫০); “গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েমের সংগ্রাম ও পার্বত্য ‘শান্তি চুক্তি’”; সংবিধান ও গণতন্ত্র; আগামী প্রকাশনী, ঢাকা।
৩৮. প্রাগুক্ত; মজহার (২০২২ : ৩৫৩)।
৩৯. প্রাগুক্ত; মজহার (২০২২ : ৬৬)।
৪০. মজহার, ফরহাদ (২০২২ : ১১-১৯)।
৪১. প্রাগুক্ত; মজহার (২০২২ : ৭১)।
৪২. প্রাগুক্ত; মজহার (২০২২ : ৭৪-৭৫)।
৪৩. গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান; দ্বিতীয় ভাগ; ধারা নং ৮(১)।
৪৪. গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান; প্রথম ভাগ; ধারা নং ২(ক)।
৪৫. গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান; প্রস্তাবনা।
৪৬. প্রাগুক্ত; মজহার (২০২২ : ১৫-১৬)।
৪৭. ঘোষ, বিনয় (১৩৫৫ : ১৪৬); ‘বাংলার নবজাগরণ : সমীক্ষা ও সমালোচনা’; বাংলার নবজাগৃতি; ওরিয়েণ্ট লংম্যান লিমিটেড, কলকাতা।
৪৮. প্রাগুক্ত; ঘোষ (১৩৫৫ : ৫২-৫৩)।
৪৯. প্রাগুক্ত; ঘোষ, বিনয় (১৩৫৫ : ৬১)।
৫০. ‘“২০২৪-২০২৫ সালে সারাদেশে সংঘটিত মাজারে হামলা” বিষয়ে ৮টি বিভাগীয় প্রতিবেদন’; ‘ভূমিকা’; মাকাম : সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজ; সম্পাদনা : মোহাম্মদ আবু সাঈদ, প্রকাশ : জানুয়ারি, ২০২৬, পৃ.৮।
৫১.Benjamin, Walter (2006: 392); ‘On the Concept of History’; Walter Benjamin Selected Writings: Volume: 04, 1938-1940, Translated by: Harry Zohn, Edited by: Howard Eiland and Michael W. Jennings, Harvard University Press, UK.
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন