Magic Lanthon

               

রাশেদ রিন্টু

প্রকাশিত ২৭ এপ্রিল ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

সমকালীন বাংলাদেশে, দহন-এর পুনর্পাঠ

রাশেদ রিন্টু

কেবল সবই ‘উন্নয়ন’

সরকার পরিবর্তন হলে পরিবর্তন হয় বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির। উদ্যাপন ধরনের পরিবর্তন ঘটে দিবসগুলোর। পরিবর্তন হয় স্লোগানের, নাম পরিবর্তিত হয় স্থাপনা থেকে শুরু করে সড়ক, স্কুল-কলেজের; পরিবর্তন ঘটে ‘উন্নয়নের’ ধারার, চেতনার, এমনকি দেশাত্মবোধক গানেরও। প্রচলিত হয়ে গেছে এই সংস্কৃতি। এটা মানিয়ে নিয়েছে জনগণ কিংবা মানতে বাধ্য হয়েছে। তবে সমস্যাগুলো যেমন রাজনৈতিক, একই সঙ্গে পারিবারিকও। কারণ বাংলাদেশ তো বটেই, এই উপমহাদেশে গণতন্ত্রের নামে দীর্ঘদিন ধরে চলেছে/চলছে ‘রাজতন্ত্র’। এই রাজতন্ত্রে সরাসরি রাজার ছেলে হয়তো রাজা হয় না; তবে পারিবারিক উত্তরাধিকারে কোনো না কোনো ‘রাজা’র ছেলে-মেয়েরাই ‘রাজা’ হয়। তাদের বাইরের কারো ‘রাজা’ হওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই কম। পাকিস্তানের মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, তার বোন ফাতেমা জিন্নাহ; ভারতের জওহরলাল নেহেরু, তার মেয়ে ইন্দিরা গান্ধী, ইন্দিরার ছেলে সঞ্জয় গান্ধী, ইন্দিরার আরেক ছেলে রাজীব গান্ধী, রাজীবের স্ত্রী সোনিয়া গান্ধী, সোনিয়া গান্ধীর ছেলে রাহুল গান্ধী প্রভৃতি নামগুলো পারিবারিক উত্তরাধিকারে রাজনীতিতে আসার বড়ো উদাহরণ। বাংলাদেশও উত্তরাধিকার রাজনীতির ধারাবাহিকতায় এখন তৃতীয় প্রজন্মে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শেখ হাসিনা, সজীব ওয়াজেদ জয়; শহীদ জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া, তারেক রহমানও সেই ধারাবাহিকতার ফসল। বরাবরই এই ‘গণতান্ত্রিক রাজারা’ ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে নিজেদের মতো করে ব্যবহার করেছে/করছে। অবশ্য, ক্ষমতা-নিয়ন্ত্রণকারী আরেক শ্রেণি হলো এদেশের বিত্তবান ব্যবসায়ীরা। রাজনীতিতে অপ্রতিহত বিচরণে তারাই পরিণত হয়েছে দেশের শক্তিশালী শাসকে।

মূলত ৯০-এর দশক থেকেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে ব্যবসায়ী শ্রেণির উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে চোখে পড়ে। পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৫ জন শিল্পপতি-ব্যবসায়ী মনোনয়ন নিয়ে সংসদ সদস্য হয়। ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৪ জনে; ২০০১ খ্রিস্টাব্দে তা বেড়ে হয় ৫৪। ওয়ান-ইলেভেন ঝড়ে সেই সংখ্যা কিছুটা কমে ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে ৩৮ জন ব্যবসায়ী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়। এছাড়া ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টি আই বি) পার্লামেন্ট ওয়াচ-২০০৯ এর এক জরিপে দেখা যায়, নবম জাতীয় সংসদে মোট সাংসদের আনুপাতিক হার বিবেচনায় ৫৯ শতাংশই ব্যবসায়ী। জরিপে আরো উল্লেখ করা হয়, এ সংসদে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংসদদের মধ্যে ৫৩ শতাংশ তাদের পেশা হিসেবে হলফনামায় ব্যবসা উল্লেখ করে। আর বিএনপির নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে পেশা হিসেবে ব্যবসার উল্লেখ করে ৬৯ শতাংশ। এভাবে রাজনীতিটা ধীরে ধীরে রাজনীতিবিদদের হাত থেকে পৌঁছে গেছে ব্যবসায়ীদের হাতে।

মেয়াদে মেয়াদে সরকার পরিবর্তন হয়, ক্ষমতার হাতবদল ঘটে; আসে নতুন কোনো ‘উন্নয়নের’ প্রতিশ্রুতি। ‘ভাগ্যের’ ওপর হাত রেখে জনগণ আশায় বুক বাঁধে, পরিবর্তন আসবে; সেই আশাতেই তারা বেঁচে থাকে। কিন্তু এই আশার জায়গাটা নিয়ে একটু নাড়াচাড়া করলেই দেখা যায়, স্বাধীনতার প্রায় অর্ধ শতকে কী পরিবর্তন ঘটেছে বাংলাদশের! ‘পরিবর্তন’ হয়েছে; চেহারা বদলে গেছে দেশের! রাজধানী ঢাকা বর্তমানে বসবাসের অনুপযোগী শহরের তালিকায় শীর্ষে অবস্থান করছে, এখনো অনেক মানুষ ফুটপাতে ঘুমায়, প্রায় ২৭ লাখ তরুণ বেকার, জনসংখ্যা সমস্যা, সড়ক দুর্ঘটনা, যানজট, শিক্ষা-রাজনীতি-অর্থনৈতিক সঙ্কট, জীবনযাত্রার ব্যয় প্রভৃতি দিনকে দিন বাড়তেই আছে। শুধু তাই নয়, সমস্যা সমাধানের বিপরীতে বাড়ছে নব্য ধনিক শ্রেণি ও তাদের নতুন নতুন ভবন, শপিংমল এবং তাদের আরাম-আয়েশ-বিলাসিতা-বিদেশ সফর ইত্যাদি। ৮০’র দশকে বাংলাদেশের এই সঙ্কটগুলো অনুধাবন করেছিলেন চলচ্চিত্রনির্মাতা শেখ নিয়ামত আলী। তিনি ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে ওই বিষয়গুলোকে উপজীব্য করে নির্মাণ করেন দহনদহন-এ নির্মাতা যা দেখান এবং নির্মাণের তিন দশক পরও বাংলাদেশে দহন-এর বিষয়বস্তুগুলো এখনো কীভাবে জ্বলছে তা বোঝার চেষ্টা থাকবে এ লেখনিতে।

তাকে হারিয়ে ফেলছি

৭০-এর দশকে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের ক’জন নির্মাতা আছে যারা চলচ্চিত্রের শব্দ, ভাষা ও দৃশ্য নিয়ে ভেবেছে! ক’জন নির্মাতা তৎকালীন বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্রগুলোতে শব্দের ব্যবহার শট্ টু শট্ ঘেঁটে ঘেঁটে দেখিয়েছে! হয়তো হাতে গুনলে তার সংখ্যা খুব বেশি হবে না। তবে তা নিয়ে মাথা ঘামিয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত নির্মাতা, চলচ্চিত্র সংসদকর্মী, কাহিনিকার, চিত্রনাট্যকার, প্রযোজক শেখ নিয়ামত আলী। তিনি ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে প্রবন্ধ লিখেছেন ‘চলচ্চিত্রে শব্দের ভূমিকা’ শিরোনামে! সেই প্রবন্ধে শব্দের মতো সূক্ষ্ম বিষয় নিয়ে তিনি বলে গেছেন নানা কথা; যা মাহবুব জামিল সম্পাদিত ‘ প্রেক্ষাপট : বিশ্ব চলচ্চিত্র’ গ্রন্থে প্রকাশ হয়। চলচ্চিত্র নিয়ে তার এই বোঝাপড়া তিনি কাজে লাগিয়েছেন নিজের চলচ্চিত্রেও। তাইতো হাতেগোনা কয়েকটা সৃষ্টি¾সূর্য দীঘল বাড়ি, দহন, অন্যজীবন, রানী খালের সাঁকো, আমি নারী¾দিয়ে তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে জ্বলজ্বল করছেন।

বিভিন্ন নথি থেকে জানা যায়, ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দের ৩০ এপ্রিল ভারতের চব্বিশ পরগণা জেলায় জন্ম এই সৃষ্টিশীল নির্মাতার। তবে তার ছোটো মেয়ে শর্বরী ফাহমিদা আফসোস করে এক গণমাধ্যমকে জানান,

এটা আমাদের জন্য লজ্জা যে তার মতো একজন খ্যাতিমানের জন্ম তারিখটাই ভুল। প্রতিবছর এই ভুলটাই আমরা পালন করছি। কখনো কোনো গণমাধ্যম এ ব্যাপারে জানার প্রয়োজন মনে করেনি। অথচ ব্যক্তিগত উদ্যোগে অনেক সাংবাদিক ভাইকে ৩০ নয় ১২ এপ্রিলে আব্বার জন্মদিনের কথা বলেছি। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি।

শেখ নিয়ামত আলীর চলচ্চিত্রের প্রতি আগ্রহ ছিলো ছোটোবেলা থেকেই। সে কারণে খুব অল্পবয়সে তিনি কলকাতা ফিল্ম সোসাইটি মুভমেন্টের সঙ্গে যুক্ত হন। পরে ৬০-এর দশকে ঢাকায় এসে যুক্ত হন পাকিস্তান চলচ্চিত্র সংসদের সঙ্গে। স্বাধীনতার পর তিনি পত্রপত্রিকায় চলচ্চিত্রবিষয়ক লেখালেখিও করেন। ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে যৌথভাবে সূর্য দীঘল বাড়ী নির্মাণের মাধ্যমে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন নিয়ামত আলী। চলচ্চিত্রটির আরেক নির্মাতা মসিহউদ্দিন শাকের। ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত আবু ইসহাক-এর উপন্যাস ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’ অবলম্বনে চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করা হয়। যার উপজীব্য ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের দুর্ভিক্ষ, যা ‘পঞ্চাশের আকাল’ হিসেবে পরিচিত। এটিই বাংলাদেশের প্রথম সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। মূলত ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে প্রথমবারের মতো সরকারি টাকায় চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য তহবিল চালু করা হয়। ওই সময় যে চারটি চলচ্চিত্র অনুদান পায় তার মধ্যে একটি হলো সূর্য দীঘল বাড়ি

প্রথম চলচ্চিত্রেই নানা মহলে প্রশংসিত হন শেখ নিয়ামত আলী। চলচ্চিত্রটি শ্রেষ্ঠ পরিচালকসহ মোট ছয়টি বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায়। ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে জার্মানিতে ‘ম্যানহেইম চলচ্চিত্র উৎসবে’ তিনটি বিভাগে এবং পর্তুগালে ‘ফিগুএরা দ্য ফোজ চলচ্চিত্র উৎসবে’ একটি বিভাগে পুরস্কার জেতে সূর্য দীঘল বাড়ী

এরপর দহন নির্মাণ শুরু করেন নিয়ামত আলী। সেই চলচ্চিত্র নির্মাণেও সরকারি অনুদান পান। অনুদান চালু হওয়ার তৃতীয় পর্যায়ে ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে যে আটটি চলচ্চিত্র অনুদান পায়, তার মধ্যে দহন একটি। “৪ লাখ টাকা সরকারি অনুদান নিয়ে ৫ লাখ টাকা ধারকর্য করে প্রায় আড়াই বছর ধরে বহু কাঠখড় পুড়িয়ে নিজেকে দহন করে ‘দহন’ বানিয়ে কোনোমতে মুক্তি দিয়েছেন” নিয়ামত আলী। নিজ প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান শেখ নিয়ামত আলী প্রোডাকশন্সের ব্যানারে ঢাকার বাইরে নরসিংদীর ‘সংগীতা’ প্রেক্ষাগৃহে ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দের ২৭ ডিসেম্বর মুক্তি পায় দহন। সে বছরই জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে দহন শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের পুরস্কার পায়। এছাড়া ‘বাচসাস’ পুরস্কারে বিভিন্ন শাখায় চলচ্চিত্রটি ১২টি পুরস্কার লাভ করে। এমনকি চেকোসোভাকিয়ার ‘কারলভি ভারি চলচ্চিত্র উৎসবে’ পুরস্কৃত হয় দহন

১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দে মুক্তি পায় অন্য জীবন। সে বছর চলচ্চিত্রটি শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রসহ ১১টি বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে। চলচ্চিত্রটির উপজীব্য¾একজন শহুরে রাজনৈতিক নেতা নির্বাচনের সময় গ্রামে যান। নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য গ্রামের তাঁতি সম্প্রদায়কে মিথ্যা আশ্বাস দেন। ভোটের রাজনীতি ও তার প্রভাব গ্রামের তাঁতি সম্প্রদায়ের জীবনে নিয়ে আসে চরম দুর্ভোগ। এভাবে নিয়ামত আলী তার প্রত্যেকটি সৃষ্টিতে সাধারণ মানুষ, তাদের সমাজ-বাস্তবতাকে উপস্থাপন করে গেছেন একেবারে নিজস্ব ঢঙে। স্বতন্ত্র সেই উপস্থাপনার জন্য তিনি যে সাধনা আর পরিশ্রম করেছেন, সেটা তার মেয়ে শর্বরী ফাহমিদার বর্ণনায় কিছুটা হলেও বোঝা যায়,

আব্বার লেখার ব্যাপারটি ছিল খুব অদ্ভুত! খালি গায়ে, মাদুরে বসে স্ক্রিপ্ট লিখতেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। যেহেতু খুব বেশি চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে পারেননি তিনি, সেহেতু তাঁর এক একটা গল্প তৈরি হতো বাস্তবতার নিরিখে। তাতে কত ঘষা মাজা। জীবনে চলার প্রতিটি ক্ষেত্রে কি অসীম গভীরতা নিয়ে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করতেন!

এটা সেই পর্যবেক্ষণ, সেই উপলব্ধি যা এখনো নাড়া দেয় হৃদয়কে, সমাজকে। যদিও ২০০৩ খ্রিস্টাব্দের ২৪ নভেম্বর না ফেরার দেশে পাড়ি জমান বাংলাদেশের এই কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার।

দহন-এ যা জ্বলে

সমাজের পোড় খাওয়া দৃশ্যগুলোকে উপজীব্য করে শেখ নিয়ামত আলী নির্মাণ করেন দহন। চলচ্চিত্রটি নির্মাণের প্রেক্ষাপট আরো পরিষ্কার হয় শর্বরী ফাহমিদার বর্ণনায়¾বাবা প্রতিদিন ভোরে চিরতার রস খেয়ে আমাদের নিয়ে হাঁটতে বের হতেন। মায়াকানন, আহম্মদবাগ, কদমতলা, নন্দীপাড়া ঘুরে তারপর বাড়িতে ফেরা। রাস্তার দু’পাশে ছিলো সারি সারি বস্তির ঝুপড়ি ঘর। এই ঘরগুলোকে দেখিয়ে বাবা বলতেন, “‘জীবন্ত চলচ্চিত্র! দেখ, এদের দিকে তাহলে বুঝবি কি সুন্দরভাবে পৃথিবীটা উপভোগ করতে পারছিস।’ দহন-এ উঠে এসেছে ওই সব পোড় খাওয়া জীবনের কথকতা।”

দহন-এ পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রকে বোঝানো কিংবা এর ফলে একক ব্যক্তির অন্তর্দহন দেখাতে মনির নামের এক চরিত্রকে বেছে নিয়েছেন নির্মাতা। নির্মাতার নানা ভাষ্য জানান দিতে পর্দায় আংশিক কথকাকারে হাজির থেকেছেন মনির। স্নাতকোত্তর পাশ মনির (হুমায়ুন ফরীদি) চাকরি না পেয়ে টিউশনি আর লেখালেখি করে টেনেটুনে সংসার চালান। মনিরের মামা (আবুল খায়ের) রাজনীতি করতেন। কিন্তু পরে নোংরা সিস্টেমে নিজেকে খাপ খাওয়াতে না পেরে রাজনীতি ছেড়েছেন। দেশমাতৃকার চিন্তায় তিনি পাগলপ্রায়, ভারসাম্যহীন। একসময় নিখোঁজ হন মনিরের মামা। রাজনীতিতে ‘আদর্শ’, সঙ্কটের কথার বুলি তিনি আউড়িয়ে বেড়ান রাজপথে, শহরের অলিতে গলিতে। টানাটানির সংসারে বোন লিনার (ডলি আনোয়ার) ছবি আঁকার শখ থাকলেও ঠিকমতো রঙের জোগান দিতে পারেন না মনির। সংসার চালাতে খুব বিপদে পড়ে গেলে স্থপতি বন্ধু সুমিতের (আসাদুজ্জামান নূর) কাছে মাঝেমধ্যে তিনি ধার-দেনা করেন।

একসময় চাকরির আশাও ছেড়ে দেন মনির। ঠিক করেন, বন্ধু সাদিকের (ফখরুল হাসান বৈরাগী) সঙ্গে আদম ব্যবসা করবেন। ব্যবসার মূলধনের জন্য স্থপতি বন্ধুর কাছে টাকাও ধার নেন মনির। কিছুদিন সাদিকের সঙ্গে ব্যবসায় ওঠবস করলেও মনির ব্যবসার আগা-মাথা কিছুই ধরতে পারেন না। বিদেশে পাঠানোর কথা বলে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে একসময় অফিসে তালা ঝুলিয়ে উধাও হন সাদিক। ফলে এখানেও মনির বিপর্যস্ত হন। অন্যদিকে তিনি প্রাইভেট পড়ান সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী আইভিকে (ববিতা)। আইভির বড়ো ভাই (বুলবুল আহমেদ) বুর্জোয়া শ্রেণির ব্যবসায়ী। কিন্তু পড়ায় মন বসে না আইভির। আইভি স্বপ্ন দেখতে থাকেন মনিরের সঙ্গে ঘর বাঁধার। মনির সেটা বুঝতে পারেন, কিন্তু চরম বাস্তবতায় আইভির ভালোবাসা গ্রহণ করতে পারেন না। ঘটনা পর্যায়ে আইভির সঙ্গে জার্মানি ফেরত জাফরির (প্রবীর মিত্র) বিয়ের কথা পাকা হয়। ফলে মনিরের টিউশনির উপার্জনও বন্ধ হয়ে যায়। মামার নিখোঁজ হওয়া, বোনের মৃত্যু, আর্থিক সঙ্কট, কাজের সব পথ বন্ধ হওয়া মনিরকে কাঁটাতারে বন্দিদশা দেখিয়ে শেষ হয় দহন

থার্ড সিনেমাকে ছুঁয়ে দহন

১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে ইতালিতে শুরু হওয়া নব্য-বাস্তববাদ ধারায় প্রভাবিত হয়ে নতুন ধারার প্রচলন হয় ব্রাজিলে, নাম সিনেমা নোভো। ১৯৫০-এর দশকের পরবর্তী সময়গুলোতে যখন ব্রাজিলে দুর্ভিক্ষ, মৃত্যু, সহিংসতায় ভরপুর, তখন সেখানে চলতে থাকে চলচ্চিত্রের এই ধারা। এ সময় নির্মাতারা তাদের চলচ্চিত্রের বিষয় করে তোলে ব্রাজিলের ইতিহাস, মিথ, প্রাধান্য বিস্তারকারী জনপ্রিয় সংস্কৃতি, কৃষকদের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম প্রভৃতি। পরে এ ধারায় চলচ্চিত্র নির্মাণ লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়ে। চলচ্চিত্রের এই বিবর্তনের ধারায় ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে আরেকটি নতুন নাম যোগ হয়, থার্ড সিনেমা। লাতিন অ্যামেরিকায় শুরুটা হলেও পরবর্তী সময়ে তা ছড়িয়ে পড়ে এশিয়া ও আফ্রিকায়। বুর্জোয়া কিংবা আধিপত্যশীল সমাজব্যবস্থার নিম্নশ্রেণিদের ‘সস্তা’ জীবনযাপনের একঘেঁয়ে ক্লান্তি, রীতিনীতি, মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে কোনো তেজদীপ্ত চরিত্রকে হাজির করেছে নব্য-বাস্তববাদ ধারার চলচ্চিত্রগুলো। এই ধারাটিকে আরো সামনের দিকে নিয়ে থার্ড সিনেমা যাবতীয় ক্লান্তির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছে। যেখানে মানুষকে লড়াকু করে তোলার একটা প্রবল বাসনা কাজ করে। চলতে থাকে সমাজের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্রচলিত কাঠামোকে নতুন করে বিনির্মাণের ভাবনা।

দহন মুক্তির পর চলচ্চিত্র সমালোচকরা বেশ নড়েচড়ে বসে এবং শুরু হয় এ নিয়ে নানা বিশ্লেষণ। চলচ্চিত্রটিতে সমাজ ও সমকালকে এতো কাছ থেকে দেখানো হয় যে, থার্ড সিনেমা ধারাকে এটি উতরে যায়। মোটাদাগে দহন বাংলাদেশে থার্ড সিনেমার দুয়ারে কড়া নেড়েছে বলে মনে করা যেতে পারে। যা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জন্য মাইলফলক হিসেবেও বিবেচনা করা যায়।

দহন সাদাকালো যুগের বিবর্ণ ফ্রেমে বন্দি কাহিনি হলেও এর প্রত্যেকটি দৃশ্য বর্তমান বাস্তবতার মতোই রঙিন হয়ে আছে। কারণ ১৯৮৩-১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দের ঢাকা তথা সারাদেশের সঙ্কট কিংবা বিশ্ব রাজনীতির যে সাতকাহন দহন-এ দেখা যায়, তার সঙ্গে বর্তমানের ফারাক কেবল সময়ে। জনসংখ্যা সমস্যা, সড়ক দুর্ঘটনা, বেকারত্ব, শিক্ষা, রাজনীতি, অর্থনৈতিক সঙ্কট, জীবনযাত্রার ব্যয়, দাম্পত্য জীবনের ভাঙন, মূল্যবোধের অবক্ষয়ের মতো চলচ্চিত্রে উপজীব্য ব্যাধিগুলোয় কোনো পরিবর্তন আদৌ ঘটেনি। কখনো কখনো এগুলোর নির্মমতা আরো শতগুণে বেড়েছে। মোটাদাগে দেখলে দহন-এ সমাজের খুঁটিনাটি ও চরম সমস্যার কথা উল্লেখ করেছেন নিয়ামত আলী। সেটা তিনি কখনো দেখিয়েছেন সাযুজ্যপূর্ণভাবে, কখনো বিচ্ছিন্ন দৃশ্যাকারে। তবে এই দেখানোর বা বলতে চাওয়ার প্রবণতা ছিলো প্রকট। সম্পূর্ণ একক সৃজনশীলতার কথা বলে কেউ কেউ আবার এই দহনকে অঁতর চলচ্চিত্র আখ্যা দিয়েছে। সেই হিসেবে শেখ নিয়ামত আলী একজন অঁতর নির্মাতাই বটে।

সমকালীন সঙ্কটের পুনর্পাঠ

চলো সনদ বেচে খাই

১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দের প্রেক্ষাপটে যে দৃশ্যপট চিত্রায়িত হয়েছে, ২০১৮-তে এসেও দেশের অধিকাংশ শিক্ষিত তরুণের অবস্থা বেকার মনিরের থেকে আলাদা নয়। লাখ লাখ স্নাতক, স্নাতকোত্তর পাশ তরুণ সনদ নিয়ে ঘুরছে চাকরির আশায়; তাদের কাতারে আরো উচ্চতর ডিগ্রিধারী অনেকেই আছে। তাদের কেউবা আশা ছেড়ে জড়িয়ে পড়ছে বেআইনি কোনো কাজে। দেশে কর্মসংস্থানের সঙ্কটের পাশাপাশি চাকরিপ্রার্থীদের সঙ্কট খুঁজতে বিদ্যাপীঠগুলোর পাঠদান পদ্ধতিও খেয়াল করা যেতে পারে। কঠোর প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষাব্যবস্থায় বর্তমানে লাখ লাখ শিক্ষার্থীর সঙ্গে যুদ্ধ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজে ভর্তি হচ্ছে তারা। এতো বড়ো ভর্তিযুদ্ধে যারা কৃতকার্য হয়, তারা নিঃসন্দেহে ‘ মেধাবী’। কিন্তু নিরাশার কথা, এই মেধাবীদেরই পড়াশোনা শেষে জুটছে না চাকরি। যেমনটা মনিরের ক্ষেত্রেও ঘটেছে। মাস্টার্সের সনদ নিয়ে তিনি চাকরির আশায় ঘুরেছেন দ্বারে দ্বারে; কিন্তু চাকরি জোটেনি। তাহলে সমস্যাটা কোথায়? এই তরুণেরা পড়াশোনা করছে না, নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠদান পদ্ধতিতে সমস্যা?

যদিও জ্ঞানচর্চার বৃহৎ পরিসর হলো বিশ্ববিদ্যালয়। অধ্যয়নের পাশাপাশি গবেষণার মাধ্যমে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নতুন নতুন জ্ঞান উৎপাদনের কথা সেখানে। কিন্তু হচ্ছে এর ঠিক বিপরীত। শিক্ষার্থীরা প্রথম বর্ষে ভর্তি হওয়ার পর পরই শুরু করছে চাকরির পড়াশোনা। সেখানে সম্বল কেবল মুখস্থবিদ্যা। যার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণাগত জায়গার আকাশ-পাতাল ফারাক। শ্রেণিকক্ষের পড়াশোনা বাদ দিয়ে মগজে ঢুকছে কেবল দু’পাতার শিট। আর এই শিট সরবরাহে প্রায় সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বি সি এস) ও অন্যান্য সরকারি চাকরির প্রস্তুতি সহায়তায় কোচিং সেন্টারগুলো নিবেদিত প্রাণে কাজ করছে। ফলে নতুন জ্ঞান উৎপাদনের পরিবর্তে ঘটছে তার অবক্ষয়। অ্যাকাডেমিক পড়াশোনা ছেড়ে শিক্ষার্থীরা ওই দিকেই বেশি ঝুঁকছে। মনির কিন্তু ঠিক পথেই এগিয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় ধারণাকে মাথায় নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। কিন্তু সিস্টেমের খপ্পরে পড়ে তাকে চাকরির আশায় ঘুরতে হচ্ছে। অবশ্য এই অবস্থা একদিনে সৃষ্টি হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে দেশের চাকরির বাজার ও শিক্ষাব্যবস্থার বিপরীতমুখী অভিগমন উচ্চশিক্ষার মানকে ধীরে ধীরে নিম্নগামী করেছে।

দহন’কে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও চাকরির সঙ্কট বিশ্লেষণ করলে অনেক বিষয়ই বোঝা সম্ভব। সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী মনির আইভিকে পড়ান। তার পড়ানোর ধরন, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দেখে বুঝতে কষ্ট হয় না, এই ডিসিপ্লিনে তার ভালো দখল রয়েছে। সাধারণভাবে সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী হিসেবে মনিরের তাই-ই হওয়ার কথা। কিন্তু মনির সে জ্ঞান, বোঝাপড়া কাজে লাগাতে পারছেন না। বরং শেষ পর্যন্ত চাকরি না পেয়ে তাকে ব্যবসা শুরু করতে হয়। মনির অকপটে স্বীকার করেন, এই ব্যবসা তিনি ভালো বোঝেন না। বর্তমানেও ওই একই সঙ্কট কাজ করছে বাংলাদেশের বেশিরভাগ শিক্ষিত তরুণের ক্ষেত্রে। কারণ যে ছবি আঁকতে ভালোবাসে তারা শিল্পী, যে পড়াতে ভালোবাসে তারা শিক্ষক কিংবা মনিরদের সমাজবিজ্ঞানী হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু তারা তা হতে পারছে না। ফলে কৃষি ডিসিপ্লিনের শিক্ষার্থী হচ্ছে ব্যাংকার, ডাক্তারি পাশ করেও বি সি এস পরীক্ষায় অংশ নিয়ে হচ্ছে প্রশাসনিক কর্মকর্তা! অন্যদিকে যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্ম বুঝে কেবল পড়াশোনা করে গেছে; মুখস্থবিদ্যার বদলে বিষয়টিতে দখলে আনতে চেয়েছে, তাদেরও জুটছে না কর্ম। এমনকি যদি কোনো শিক্ষিত তরুণ চাকরিতে না যোগ দিয়ে কৃষিকাজ, খামার বা ব্যবসা করতে চায়, তাকেও এই সমাজ বেকার হিসেবেই গণ্য করে। ফলে ইচ্ছামতো পেশা বেছে না নিতে পারা এবং সমাজের বিদ্যমান কিছু গোঁড়ামির কারণে তারুণ্যদীপ্ত শ্রমগুলোতে বার্ধক্যের পঁচন লাগতে শুরু করে। তখন এই শিক্ষিত শ্রেণি হয়ে ওঠে সমাজের বোঝা!

সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এমপ্লয়মেন্ট রিসার্চের (সিডার) ‘কর্মসংস্থান ও শ্রমবাজার পর্যালোচনা, ২০১৭’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি।’ বিশ্বখ্যাত ব্রিটিশ সাময়িকী ইকোনমিস্ট-এর ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের এক প্রতিবেদন দেখিয়েছে যে, বাংলাদেশের স্নাতক শেষ করা ৪৭ শতাংশ যুবকই বেকার। এছাড়া আফগানিস্তানে ৬৫ শতাংশ, ভারতে ৩৩ শতাংশ, নেপালে ২০ শতাংশের বেশি, পাকিস্তানে ২৮ শতাংশ ও শ্রীলঙ্কায় ৭ দশমিক ৮ শতাংশ স্নাতক পাশ করা যুবকই বেকার।১০

তবে দক্ষিণ এশিয়া কিংবা বাংলাদেশেই যে শুধু বেকার আছে, বিষয়টি এমন নয়। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতেও বেকারত্বের সংখ্যা কম নয়। যুক্তরাজ্যের অফিস ফর দ্য ন্যাশনাল স্টাটিসটিকস (ও এন এস)-এর তথ্য মতে, সেখানে বর্তমানে বেকারের সংখ্যা প্রায় ১৬ লাখ।১১ একই চিত্র বিশ্বের অনেক দেশের ক্ষেত্রেও খাটে। বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে ২০ থেকে ২২ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে।১২ কিন্তু শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও যথাযথ শ্রম প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছে না তারা। ফলে বেকারের খাতায় যোগ হচ্ছে আরো নতুন নাম।

আজ থেকে তিন দশক আগে বাংলাদেশে বেকারত্বের যে সঙ্কট দহন-এ উঠে এসেছে, তা এই সময়ে এসে কতোটা উন্নতির দিকে গেছে তা বেকারত্বের পরিসংখ্যান দেখে সহজেই উপলব্ধি করা যায়। অথচ ‘বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে’, ‘ বেকারত্ব কমছে’¾এমন খবর হরহামেশাই চোখে পড়ে! অন্যদিকে খোদ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউ জি সি) প্রশ্ন তোলে, কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, বিশেষ করে কতিপয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজ থেকে পাস করা স্নাতকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নাকি প্রশ্নবিদ্ধ।১৩ কিন্তু মনির তো তার নিজ ডিসিপ্লিনে দক্ষ ছিলেন। ফলও করেছেন ভালো। কিন্তু চাহিদা মতো নিজেকে বাজারি করে তুলতে পারেননি। তাই হয়তো চাকরির ক্ষেত্রে সুযোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছেন!

অবশ্য চলচ্চিত্রজুড়ে আইভির ভাই আর বিদেশ ফেরত জাফরি ছাড়া সবাই কমবেশি ব্যর্থ-হতাশাগ্রস্ত; তাদের সবারই স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে। মনিরের সমাজবিজ্ঞানী কিংবা ব্যবসায়ী কোনোটাই হওয়া হয়নি। তার মামার স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে রাজনীতিবিদ হতে গিয়ে। আইভির পড়াশোনা শেষ করা কিংবা মনিরের সঙ্গে ঘর বাঁধার স্বপ্ন ভেঙেছে। মনিরের বোনের পড়াশোনা যেমন থেমে গেছে, সংসারী হতে না পেরে পরিবার ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে তাকে। মনিরের স্থপতি বন্ধু তার স্ত্রীকে বাঁচাতে পারেনি চিকিৎসার অভাবে; হতাশা তাকে গ্রাস করেছে। কেবল সফল দু’জনকে দেখানো হয়; যার একজন আইভির ভাই, অন্যজন জাফরি। এই জাফরি আবার বিদেশ ফেরত। তার মানে তার ভাগ্য খুলেছে বিদেশে গিয়ে। অন্যদিকে মনিরদের মাধ্যমে বিদেশে যেতে গিয়ে কিছু যুবকের স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, সবার স্বপ্নভঙ্গের দায়টা আসলে রাষ্ট্রের; রাষ্ট্র আসলে এদের স্বপ্ন পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। কারণ, স্বপ্নবান প্রজা সৃষ্টির কৃতিত্ব যেমন রাষ্ট্রের; উল্টোদিকে প্রজাদের স্বপ্নভঙ্গ কিংবা স্বপ্নহীনতার দায়ও রাষ্ট্র কোনোভাবেই এড়াতে পারে না।

পড়াশোনা শেষে মনিরকে যেমন চাকরি দিতে রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়, মনির যখন ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য ব্যবসা শুরু করে, তখনো কিন্তু রাষ্ট্র তাকে সহায়তা করতে পারে না। ফলে রাষ্ট্র এখানেও ব্যর্থ হয়। অবশ্য চলচ্চিত্রজুড়েই রাষ্ট্রের ব্যর্থতার চিত্র তুলে ধরেছেন নির্মাতা।

সব কিছু নষ্টদের অধিকারে

প্রকৃত রাজনীতি মূলত সূর্যতত্ত্বের মতো। সূর্য না থাকলে আলো থাকবে না। আর আলো না থাকলে সূর্যেরইবা মূল্য কোথায়? গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সূর্যের আলোর মতো জনমানুষের চেতনার প্রতিফলন ঘটে রাষ্ট্রের প্রত্যেকটি সিদ্ধান্তে। যে চেতনা ইতিহাসের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে। বাংলাদেশ কিংবা বিশ্ব রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে রাজনৈতিক চেতনায় জনসাধারণের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকে। এই গণতান্ত্রিক চর্চা মূলত রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে গড়ে ওঠার কথা। কোনো দলের উদ্ভব, গঠন এবং দলভুক্ত হওয়া জাতি-ধর্ম-বর্ণ, জাতপাত, ধনী-গরিব, ধর্ম-অধর্ম নির্বিশেষে সর্বজনীন। ‘কোনো’ ব্যক্তি বা ব্যক্তিসমষ্টি চাইলে কিছু নিয়ম মেনে দল গঠন করতে পারে গণতান্ত্রিক দেশে। সামন্ত শাসনের পরে ইউরোপে শিল্পবিপ্লব থেকে শুরু করে আজবধি যা কিছু ঘটছে তা কেবল ওই ধারার রাজনৈতিক চেতনাকে কেন্দ্র করেই।

দহন-এ রাজনৈতিক চেতনার প্রতিরূপ সৃষ্ট চরিত্র মনিরের মামাও কেবল সূর্যতত্ত্বের মতো দেশের মানুষের জন্য রাজনীতি করেছেন। কিন্তু রাজনীতির ‘নোংরা’ পানিতে নিজেকে ভেজাতে না পেরে শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েছেন সেখান থেকে সরে আসতে। এখন মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে অভাবের সংসারে রাজনীতির সোনালি দিন ও নেতাদের নাম¾মাও সেতুঙ, নেহেরু, লুথার কিং, হো চি মিন¾বলতে বলতে দিন যায় তার। মাঝে মাঝে অবশ্য দেশের রাজনীতির বেহাল অবস্থা এবং তা থেকে উত্তরণে কিছু প্রচলিত বাণীও শোনা যায় তার মুখে। যেমন, ‘সব রসাতলে গেলো’; ‘রাজনীতি করবি মানুষের উপকারের জন্য, দেশের জন্য’; ‘ত্যাগ-ফ্যাগ করতে না শিখলে দেশের সেবা হয় না’; ‘সততা, নিষ্ঠা-ফিষ্ঠা না থাকলি রাজনীতি হয় না’ ইত্যাদি।

দহন যখন মুক্তি পায়, তখন দেশে চলছে সেনাশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের স্বৈরাচারী শাসন। এরশাদ মূলত ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য অগণতান্ত্রিক পদ্ধতি অনুসরণ করেন। তিনি দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমনভাবে সাজান, যা দীর্ঘমেয়াদে গণতন্ত্রের জন্য ভয়ঙ্কর ক্ষতির কারণ হয়। যার খেসারত হয়তো এখনো দিতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। তবে এই সঙ্কট একদিনে তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিনের নানা চড়াই-উতরাই বাংলাদেশের রাজনীতিকে ভয়াবহ বিভেদ, বিভাজন ও অনৈক্যের দিকে ধাবিত করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে রাজনীতি সেই ৮০’র দশকে যেমন নগরমুখী ছিলো, ২০১৮ খ্রিস্টাব্দেও একই রয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষ প্রকৃত রাজনৈতিক চেতনা থেকে যোজন যোজন দূরে অবস্থান করছে। মনিরের মামা কিন্তু ঠিকই বুঝতেন, রাজনীতি করতে চাইলে আগে শিকড়ে যেতে হবে। তা না হলে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। মনিরের মামার উপলব্ধির সঙ্গে মিলে যায় উপমহাদেশের অন্যতম প্রবীণ কমিউনিস্ট নেতা কমরেড জসিম উদ্দিন মণ্ডলের চিন্তাভাবনা; যিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, স্বদেশি আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। তার ভাষ্যমতে, ‘যে কথা আমরা ঢাকায় বলি, সেটি যদি গ্রামে না নিয়ে যাই, আমতলা, বাঁশতলা, কাঁঠালগাছের নিচে, হাটে, ঘাটে, মাঠে, গ্রামের মানুষের কাছে না নিয়ে যাই, তাহলে কিভাবে হবে? ... পার্টিকে গ্রামে নিতে হবে।’১৪

কমরেড জসিম উদ্দিন মণ্ডলের মহৎ রাজনৈতিক চেতনা রাজনীতিবিদদের হাত থেকে ছিটকে চলে গেছে বণিক শ্রেণির হাতে। ফলে রাজনীতি আর গ্রামে নেই, জসিম উদ্দিন মণ্ডলদের হাতেও নেই। ফলে সাধারণ জনগণ এখন হয়ে গেছে ওই ব্যবসায়ীদের হাতের গুটি। এই গুটি তারা ব্যবহার করছে দেশ নয়, একান্ত ব্যক্তিস্বার্থে। এ নিয়ে সত্যি কথাটা বলেই ফেললেন ‘সুশাসনের জন্য নাগরিক’ (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার, ‘জাতীয় সংসদ কোটিপতিদের ক্লাবে পরিণত হয়েছে।’১৫ আর রাজনীতিতে এই কোটিপতিরা ঢুকতে ঢুকতেই হারিয়ে গেছে/যাচ্ছে মনিরের মামার মতো ত্যাগী নেতারা।

মনিরের মামা একদিন বাড়ি থেকে নিখোঁজ হন। তিনি বাংলাদেশের রাজনীতির বেহাল দশার কারণ খুঁজতে থাকেন শহরের অলিতে গলিতে। শহরে তখন কুকুর নিধন চলছে। যা দেখে মামার কণ্ঠে আক্ষেপের স্বরে বাজে, ‘দেশে তো এরকম আরো আছে, ধরতে পারেন না? পারবেন না, ইম্পসিবল, কোয়াইট ইম্পসিবল।’ বুঝতে বাকি থাকে না, মামা কুকুরকে দেখিয়ে সমাজের কোন শ্রেণির ইঙ্গিত করেন। এরপর শেষবারের মতো আরেকটি দৃশ্যে মনিরের মামাকে ভারসাম্যহীনভাবে রাজনীতির যৌক্তিক বাণী শোনাতে দেখা যায়। তারপর চলচ্চিত্রজুড়ে মামা নিখোঁজ! তবে কি চলচ্চিত্রের মাঝপথে মনিরের মামার এই নিখোঁজ হওয়া দিয়ে নির্মাতা কিছু বোঝাতে চাইলেন? মামা নিখোঁজ হওয়ার পর মনিরের পরিবারকে সাময়িক বিচলিত হতে দেখা যায়। কিন্তু কয়েকটা দৃশ্য যেতে না যেতেই সে অবস্থার সামান্যতম উপসর্গও আর চোখে পড়ে না। যে মামা পরিবারের এতো প্রিয়, তিনি হারিয়ে গেলেন, তার পরেও সবাই চুপচাপ! মনিরের মামার হারিয়ে যাওয়ার পরের অবস্থা বাংলাদেশের রাজনীতি সম্পর্কে সাধারণের ধারণার সঙ্গে মিলে যায়¾ ‘যা ইচ্ছে তাই হোক, তাতে আমার কী!’ গণতান্ত্রিক দেশে রাজনৈতিক চেতনা হারিয়ে গেলে তো দেশের অগ্রগতিই উদ্দেশ্যহীন হয়ে পড়ে। তার পরেও কেবল ‘নিজে ভালো আছি’র ভ্রান্ত ধারণায় প্রকৃত চেতনাটি মরলো না বাঁচলো তাতে কারো যেনো কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। ফলে এভাবেই দেশের রাজনৈতিক চেতনার মতো দহন-এর একমাত্র চেতনার অস্তিত্বও বিলীন হয়ে যায়।

কুঁড়ে ঘরে থাকি

করি শিল্পের বড়াই

                                    মুখে আমার মৃদু হাসি

                                    বুকে আমার পুঞ্জীভূত ফুটন্ত লাভা।

                                    সিংহের মতো আধোবোজা চোখে আমি কেবলই দেখেছি

                                    মিথ্যার ভিতে কল্পনার মসলায় গড়া তোমাদের শহর।

                                    আমাকে ঘিরে রচিত উৎসবের নির্মূল অমরাবতী,

                                    বিদ্রুপের হাসি আর বিদ্বেষের আতশবাজী।

                                    তোমাদের নগরে মদোমত্ত পূর্ণিমা।

সমাজের বুর্জোয়া শ্রেণি ও তাদের বলির শিকারে হাহাকার ভরা ‘তৃপ্তি’ এভাবেই কাব্যাকারে ‘শোভা’ পায় মনিরের কণ্ঠে। মনিরের দৃষ্টি দিয়ে নির্মাতা কখনো কখনো বিক্ষিপ্ত আবার কখনো সম্পর্কিত ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণির জীবনমান দেখানোর চেষ্টা করেছেন দহন-এ। এখানে শ্রেণি বলতে অর্থনৈতিক অবস্থায় সৃষ্ট ব্যক্তির ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের কথা বিবেচনা করা হয়েছে। দাস সমাজ থেকেই এই পার্থক্যটা বিদ্যমান রয়েছে। শুরুতে এই শ্রেণি বৈষম্যটা তৈরি হয়েছে জমির মালিকানা ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের মাধ্যমে, কিন্তু পরবর্তী সময়ে বণিক শ্রেণির উদ্ভবে তার নতুন রূপ পেয়েছে। এতে বৈষম্য কমেনি, ধরন বদলেছে।

মনিরের উপলব্ধি হয়, শ্রমিকের ঘামে শহরে ৩০ তলা ভবন উঠছে; রিকশাচালক ন্যায্য ভাড়া চাওয়ায় আরোহী তাকে গালিগালাজ ও মারধর করছে; হু হু করে বাড়ছে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম; মানুষ খুন হচ্ছে; উচ্চবিত্তরা বিদেশি জিনিসপত্রের সঙ্গে আমদানি করছে সংস্কৃতিও। এসব কিছুর পরিণামে বলি হচ্ছে মনিরের মতো নিম্নবিত্ত শ্রেণি। আর এর মূলে ক্রিয়া করছে পুঁজি। পুঁজির বিকাশ যতো হয়েছে অর্থনীতির প্রসারও বেড়েছে। কিন্তু কৃষি অর্থনীতির গুরুত্ব হ্রাস পেয়েছে ক্রমে। যেটা বাংলাদেশের মতো কৃষিপ্রধান দেশের জন্য হুমকিস্বরূপ। কারণ বাংলাদেশের এখনো প্রায় ৮০ ভাগ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল।

মনিরের পরিবার নিম্ন শ্রেণির জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে। তার বাবার প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা শেষ হয়ে গেছে আগেই। ন্যূনতম আয় দিয়ে প্রতিবেলায় ঠিকঠাক চুলো জ্বলে না মনিরদের ঘরে। সমাজের এই শ্রেণির মানুষের কথা সরকারি ভাষ্যে কিংবা গণমাধ্যমে খুব কমই উঠে আসে। সেটা ১৯৮৫ কিংবা ২০১৮ হোক¾এমন দুর্দশার চিত্র কখনো প্রকাশ পায় না। বিপরীতে সরকারি ভাষ্যে তো অবশ্যই, কোনো কোনো গণমাধ্যমও লাগামহীনভাবে প্রচার করে কেবল ‘উন্নয়নের’ খবর। কিন্তু রূঢ় বাস্তবতা এই যে, দেশের প্রায় ২৫ ভাগ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। মনিরের মতো অনেক পরিবারের সদস্যদের দু’বেলা খাবার জোটাতে হিমশিম খেতে হয়।

এর প্রমাণও মেলে পদে পদে। বাংলাদেশে মোট দেশজ উৎপাদন, জাতীয় আয় ও মাথাপিছু আয় ‘বাড়া’ সত্ত্বেও জাকাতের বস্ত্র নেওয়ার সময় ১০ জনের নির্মম মৃত্যুর খবর এখনো পাওয়া যায়!১৬ অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাত্রা এতোটাই প্রকট আকার ধারণ করেছে, সামান্য এক টুকরো বস্ত্রের কাছে তুচ্ছ হয়ে গেছে জীবনের মূল্য! দহন-এও এই বৈপরীত্য দেখা যায়, এক শিশু যখন আইসক্রিম খায়, আরেকজন খাবার খায় ডাস্টবিন থেকে কুড়িয়ে। কেউ যখন কাচ ঘেরা গাড়িতে ঘুরে বেড়ায়, আরেকজন তখন সারাদিন মাটির দিকে তাকিয়ে বোতল কুড়ায়। মাথাটা তাদের উঁচু হয় না; যখন মাথা উঁচু হয়, তখন এ শহর নিশ্চুপ হয়ে যায়। ফলে কেউ দেখে না তাদের উঁচু মাথা। এখন প্রশ্ন, এই বিশাল অর্থনৈতিক বৈষম্য বিদ্যমান রেখে কি দেশ ও সমাজের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব?

টাকায় ‘মৃত্যু’ কিনি

মনির চাকরি খুঁজতে খুঁজতে অতিষ্ঠ; পরিস্থিতি এমন¾প্রয়োজনে তিনি আরেকটি টিউশনি খুঁজে নেবেন, তাও চাকরি খুঁজবেন না। একপর্যায়ে তিনি সিদ্ধান্ত নেন, ব্যবসা করবেন বন্ধু সাদিকের সঙ্গে। মনির জানতেন, তার বন্ধুর সম্পর্কে খুব ভালো কথা সমাজে প্রচলিত নেই। জুয়াড়ি-মদখোর-প্রতারকের মতো বিশেষণগুলো রয়েছে সাদিকের নামের পাশে। স্থপতি বন্ধু সুমিতও সাদিকের সঙ্গে কারবার করতে সাবধান করেছিলো মনিরকে। কিন্তু মনির সব জেনে-বুঝেও সাদিকের সঙ্গে ব্যবসা শুরু করেন¾বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর ব্যবসা। সাদিক ব্যবসাটা আগেই শুরু করেন। তার ভাষ্যমতে, তিনি এ পর্যন্ত ৭৫ জনকে পাঠিয়েছেন কুয়েতে।

প্রতিবছর সাদিকদের মতো কিছু মাধ্যম ব্যবহার করে এদেশ থেকে হাজার হাজার মানুষ পাড়ি জমায় বিদেশে। এই প্রবাসীদের পাঠানো টাকাই হয়ে উঠেছে এদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম উৎস। এইতো ক’দিন আগে এ নিয়ে তৌকির আহমেদ অজ্ঞাতনামা (২০১৬) নির্মাণ করলেন। সেখানে বর্তমান বাংলাদেশের প্রবাসীদের করুণ পরিণতি ও রাষ্ট্রের সঙ্কট নিয়ে কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে প্রায় ৩০ বছর আগে দহন-এ বলা হয় কর্মসংস্থানের সঙ্কট থেকে মানুষ কীভাবে শেষ সম্বল ভিটেমাটি, হালের বলদ বিক্রি করে প্রবাসে যাওয়ার চেষ্টা করে সেই কথা। দীর্ঘ এই সময়ের ব্যবধানে বিদেশ যাওয়ার এই প্রক্রিয়ায় খুব বেশি পরিবর্তন তো হয়নি, বরং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অবৈধ পথে প্রবাসে যাওয়ার নানা পথ উন্মুক্ত হয়েছে। যার নির্মম ফল হিসেবে থাইল্যান্ড ও মালেশিয়ার গহীন জঙ্গলে মিলেছে স্বাপ্নিক বাংলাদেশিদের গণকবর।

দহন-এ সাদিকের আদম ব্যবসার কমিশন এজেন্ট হিসেবে কাজ করেন রমিজ। মূলত তিনি লোকজনদের প্রলোভন দেখিয়ে অফিসে নিয়ে আসেন। আরো সহজ বাংলায় এদেরকে দালাল বলা যায়। সাধারণত এইসব প্রতারক এজেন্সির প্রচারণায় নিয়োজিত থাকে এই দালালরা। জনসাধারণের মনে এরা বিদেশে যাওয়ার উচ্চাভিলাষ সৃষ্টি করে। সেই উচ্চাভিলাষ নিয়ে কোনোমতে অফিস পর্যন্ত এই মানুষগুলোকে এনে সটকে পড়ে নিজেরা। এই কাজে পারদর্শী রমিজ অত্যন্ত মিষ্টভাষী। অল্প সময়ের মধ্যে তিনি মানুষকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করতে পারেন। বলা যায়, সাদিকের এই কারবারের জন্য রমিজ একেবারে যথার্থ।

সাদিক অনেকের কাছ থেকে বিদেশে পাঠানোর নামে টাকা নেন। কিন্তু কেবল সময় পার হতে থাকে, তাদেরকে বিদেশে আর পাঠানো হয় না। মনির জানেন, এভাবে সাধারণ লোকদের কথা দিয়ে কালক্ষেপণ করা ঠিক হচ্ছে না। কিন্তু তিনি সেই বিষয়টি বোঝাতে পারেন না সাদিককে। সাদিকের ভাষায়, ‘এসব কাজ (আদম ব্যবসা) উচিত বিরোধী। কথা দিয়ে তা রাখার মতো সদিচ্ছা নিয়ে কেউ ঘোরে না।’ সাদিক এরকম দ্বায়বদ্ধহীনতার পরিচয় দিয়ে উধাও হলেও থেমে থাকে না ক্ষুব্ধ জনগণ। তারা অফিস ঘেরাও করে। কিন্তু ততোদিনে অফিস গুটিয়ে হারিয়ে গেছেন সাদিক। সঙ্গে নিয়ে গেছেন ব্যবসা করে বড়ো হতে চাওয়া মনিরের স্বপ্নটুকুও। দহন-এর সাদিকরা এখনো বাস্তবের অলিগলিতে বসবাস করে। আর তাদের খপ্পড়ে পড়ে এভাবেই প্রতিদিন স্বপ্ন হারায় হাজারো মানুষ। সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতির কেবল অবনতি হয়েছে এটুকু যে, হজ পালনের মতো স্পর্শকাতর বিষয়েও সাদিকরা যুক্ত হয়েছে। তাই প্রতিবছর অনেক হজযাত্রীর কাছ থেকে হাজার হাজার টাকা নিয়ে সাদিকদের উধাও হওয়ার খবর পাওয়া যায়, ১৭ প্রবাসী শ্রমিক হিসেবে বিদেশে যাওয়ার কথা থাকলেও দালালদের প্রতারণায় পর্যটক হিসেবে ভিসা পাওয়ায় অনেককেই স্বল্প সময়ের মধ্যে ফিরে আসতে হয় দেশে। শেষ সম্বলটুকুও হারিয়ে ফেলে যারা ফিরে আসার সাহস করতে পারেন না, পরিবারের কথা ভেবে লুকোচুরি করে রাতের আঁধারে কর্ম খুঁজতে হয় তাদের, কাউকে আবার গারদে পঁচে মরতে হয় এসব দালালদের প্রতারণায়।

স্বল্প শিক্ষিত কিংবা তথাকথিত অশিক্ষিত মানুষরা দালালদের খপ্পরে পড়ার যথেষ্ট কারণও আছে। দহন-এ সেটাও তুলে ধরেছেন শেখ নিয়ামত আলী। চলচ্চিত্রের ৪৮ মিনিট ৪৫ সেকেন্ডে দেখা যায়, সৌদি আরব আর কুয়েতে যাওয়ার জন্য দু’জন সাদিকের অফিসে আসেন। ওই লোকদের কাছ থেকে অগ্রিম ১৫ হাজার টাকা দাবি করেন সাদিক। বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে নানা জটিলতার কথা বুঝিয়ে মেডিকেল পরীক্ষার পর আরো ২০ হাজার টাকা চান রমিজ। আর বাকি টাকা নেবেন বিমানে ওঠার সময় পাসপোর্ট ভিসা বুঝিয়ে দেওয়ার পর। মূল ফাঁক-ফোকরটা সেখানেই। বিমানে ওঠার একেবারে শেষ সময়ে এসে স্বল্পশিক্ষিত এসব মানুষদের হাতে পাসপোর্ট-ভিসা ধরিয়ে দিয়ে বাকি টাকাটা নিয়ে সটকে পড়েন রমিজ কিংবা সাদিকের মতো দালালরা। সে সময় ওইসব লোকদের পক্ষেও জানার অবকাশ থাকে না, ওই ভিসার মেয়াদ কতোদিন কিংবা কী ধরনের ভিসা। তারা আদৌ শ্রমিক হিসেবে বিদেশে যাচ্ছেন, নাকি পর্যটক ভিসায়; ফলে বিদেশে গিয়ে বিপাকে পড়ে টনক নড়ে তাদের, শুরু হয় নতুন বিড়ম্বনা।

মাছ ধরেছেন, পানিও ছুঁয়েছেন

কার্ল মার্কস তার ‘পুঁজি’ গ্রন্থে পুঁজির ক্রমাগত সঞ্চায়নের ফলে সৃষ্ট ক্রমবর্ধমান আয়-বৈষম্য দেখিয়েছেন; বড়ো পুঁজি কীভাবে ছোটো পুঁজিকে গ্রাস করে দেখিয়েছেন তার চালচিত্রও। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য সৃষ্টিতে পুঁজির ভূমিকা কয়েকটি পরিসংখ্যান দেখলে স্পষ্ট হয়।

১৯৮৩-৮৪ সালে দরিদ্রতম ২০ শতাংশ মানুষের হাতে সম্পদ ছিল ৭.২০ শতাংশ। ২০১০ সালে এটি নেমে এসেছে ৫.২২ শতাংশে। অন্য দিকে, একই সময়ের ধনী ১০ শতাংশের সম্পদ ২৮.৩০ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৩৫.৮৫ শতাংশে। ১৯৭৩ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত দরিদ্রতম ২০ শতাংশের আয় বার্ষিক ০.৭৩ শতাংশ হারে কমে গেছে। অন্য দিকে, ধনী ১০ শতাংশের আয় ০.৭২ শতাংশ হারে বেড়েছে।১৮

সমাজে বৈষ্যমের এই ওঠানামা মূলত গড়ে ওঠে পুঁজির বিকাশের মাধ্যমে। পুঁজিপতিরা নিম্ন শ্রেণির জনগণকে ব্যবহার করে মুনাফা অর্জনের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একক ব্যক্তির সম্পদ বাড়াতে থাকে। যা ধীরে ধীরে পুঁজিপতির শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রকাশ ও বিকাশ আকাশচুম্বীর দিকে নিয়ে যায়। অন্যদিকে দমিয়ে রাখে স্বপ্নবান পুঁজিহীনদের।

দহন-এও আইভির ভাইকে এই রকম বুর্জোয়া শ্রেণির প্রতিনিধিত্বকারী বিশাল ব্যবসায়ী চরিত্রে দেখা যায়। নির্মাতা কৌশলে তাকে এমনভাবে উপস্থাপন করেন, যেখানে দর্শক একটু বেখেয়াল হলে মনে করতে পারেন, এই বুর্জোয়া শ্রেণি কেবল সমাজের মঙ্গলের জন্য কাজ করে! চলচ্চিত্রের ১৪ মিনিটে প্রথমবারের মতো পর্দায় দেখা যায় আইভির বড়োভাইকে, তিনি তার কর্মচারীকে গ্যারেজ থেকে গাড়ি বের করার জন্য বলছেন। এ সময় আইভিকে পড়াচ্ছেন মনির। আইভির বড়োভাই মনিরকে দেখেই তার ও তার পরিবারের সদস্যদের খোঁজখবর নিতে থাকেন। যেমন, মনিরের চাকরি হলো কি না, তার মামা কেমন আছেন ইত্যাদি। আইভির বড়োভাইকে চলচ্চিত্রে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়¾তিনি চাইলেই হয়তো মনিরকে একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দিতে পারতেন কিংবা নিজের প্রতিষ্ঠানেই তাকে নিতে পারতেন। কিন্তু তা তিনি করেন না! চলচ্চিত্রজুড়ে তার আচরণ অনেকটা ওই ছা-পোষা মানুষের মতো। সমাজে আইভির ভাইয়ের মতো এরকম মানুষের অভাব নেই। এরা খুব ভালো করেই জানে, যাদের মাথার ওপর ছাদ বলতে কেবল আকাশ, তাদের ওপর তেঁতুল পাতার ছায়া ফেলতে পারলেই অনেক সময় অনুগত রাখা যায়। আইভির বড়োভাইও তাই করেন। তিনি মনিরের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে চান, তার অবস্থার পরিবর্তন নয়।

৫৬ মিনিট ৩০ সেকেন্ডে আইভির ভাই মনিরের সঙ্গে আইভির বিয়ের কথা তুলতেই এতে বাধ সাজেন ভাবি আসমা। আইভির ভাই বলেন, মনির ভালো, শিক্ষিত ছেলে; তাদের ফ্যামিলি স্ট্যাটাসও ভালো। কিন্তু আসমার জবাব, স্ট্যাটাস রক্ষার জন্য টাকারও দরকার আছে; যেটা মনিরের নেই। অবাক করার বিষয় হলো, আইভির ভাই আর কোনো আপত্তি না তুলে আসমার এই কথাকেই সমর্থন করেন। তিনি চাইলে তার স্ত্রীর কথার যুক্তি খণ্ডন করতে পারতেন। কিন্তু সেটা না করে তার মুখে এমন সব কথা শোনা যায়, মনে হয় তিনি একবারে ধোয়া তুলসী পাতা। যা কিছু অনৈতিক, তা তার মতের বিরুদ্ধে। অন্যদিকে নিজেকে আরো সাধু হিসেবে উপস্থাপনে বোনের বিয়ের বেলাতেও তিনি আইভির মতকেই প্রাধান্য দিবেন বলে জানান। কিন্তু আইভির সঙ্গে তিনি এমনভাবে কথা বলেন, যেনো তিনি পরিবারের ইচ্ছেমতো বিয়ে করতে বাধ্য হন।

আইভির ভাইয়ের স্বভাবের অনেকটায় পুনরাবৃত্তি দেখা যায় মনিরের স্থপতি বন্ধু সুমিতের বেলায়ও। ১৮ মিনিটে পর্দায় দেখা যায় সুমিতকে। তিনি বাইরে থেকে কাজের অর্ডার নিয়ে বাড়িতেই স্থাপত্যের কাজ করেন। সুমিতকেও এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, তিনি উদার ও পরপোকারী। সুমিতের কথাবার্তা শুনে মনে হয়, তিনি সচেতন মানুষ। অথচ তার বাড়িতে কাজ করে এক শিশু! সেই তার যাবতীয় কাজ করে দেয়। মনিরকে ব্যবসা করার জন্য যে স্থপতি বন্ধু ৫০ হাজার টাকা নিজ উদ্যোগে দিচ্ছেন, তিনি ওই শিশুকে স্কুলে পাঠানোর ব্যবস্থা না করে বাড়িতে কাজের লোক হিসেবে রাখেন। আইভির ভাইয়ের মতো তিনিও মনিরের মামার খোঁজ নেন। মূল ব্যাপার হলো, এই দুই শ্রেণির কারণেই সমাজে আত্মকেন্দ্রিকতার বিকাশ, সম্পর্কের যান্ত্রিকায়ন, বিচ্ছিন্নতা ও শোষণ ক্রমাগত বেড়ে চলে। এই শোষণের গল্প চিৎকার করে বলতে পারে না শোষিতরা। শোষণের গল্প শোষিতরা না বলতে পারলেও দহন-এ নির্মাতা অসাধারণভাবে তুলে ধরেছেন শোষকের কথা। সেই উপস্থাপনায় শোষক, শোষিত, শোষণ সবই আছে, যার যার মতো করে।

অতিনাটকীয়তায় ভরা দহন

দহন-এর ৩৬ মিনিটে মনির, বন্ধু সাদিক ও তার কমিশন এজেন্ট রমিজ একটি দোকানে খেতে বসেন। পাশেই দেখা যায়, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তার পেট ধরে বসে কাঁদছে। কী হয়েছে জানতে চাইলে লোকটি উত্তর দেন, তার পেটে খুব ব্যথা। আর অমনি শুরু হয়ে যায় খাবারের ভেজাল নিয়ে নানা কথা। এর পরের দৃশ্যে দেখা যায়, একজন আইনজীবী রাস্তায় এক নারীকে গায়ে সাবান মাখার কথা বলে হাতে টাকা গুঁজে দিচ্ছেন। সঙ্গে বিকেলে ওই নারীকে তার বাসায় যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে থাকার তাগিদও দেন ওই আইনজীবী। কিন্তু ওই নারী তাকে প্রত্যাখান করেন। এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে ওই আইনজীবীকে দেখা যায়, এক আবেদনময়ী নারীর দেয়ালে সাঁটানো ছবিতে থুথু ফেলতে। অদ্ভুতভাবে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ওই দৃশ্যটিও মনির প্রত্যক্ষ করেন।

অন্যদিকে আইভিকে পড়ানোর সময় মনির কেবল নিজ মনে নানা তাত্ত্বিক কথা বলে যান। আইভির তাতে কোনো মনোযোগ দেখা যায় না। মাঝে মাঝে মনে হয়, আইভিকে নয় বরং মনির দর্শককে এসব তত্ত্ব বোঝানোর জন্যই পর্দায় হাজির হয়েছেন। এক ঘণ্টা দুই মিনিট ১৫ সেকেন্ডে বাগানের মধ্যে একটি দৃশ্যে মনিরকে আইভি তার মনের কথা বলার চেষ্টা করেন। এমন সময় পর্দায় হঠাৎই ঢুকে পড়েন একজন প্রতিবন্ধী। ব্যস, অমনি মনির প্রতিবন্ধীদের বিষয়ে আইভিকে বোঝাতে শুরু করেন।

উপরের এই কয়েকটা ঘটনা ছাড়াও দহন-এ এমন অনেকগুলো ছোটো ছোটো ঘটনা নির্মাতা দেখিয়েছেন যেগুলো চলচ্চিত্রটির ন্যারেটিভকে যথাযথ উপস্থাপনে সমস্যার সৃষ্টি করে। দৃশ্যগুলো দেখে মনে হয়, নির্মাতাকে যেহেতু সমাজের সমস্যা দেখাতে হবে, সেহেতু ইস্যুগুলো কোনোভাবে পর্দায় আনার চেষ্টা করেছেন তিনি। আর চলচ্চিত্রজুড়ে এসব সমস্যার গল্প কথকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন মনির। মনে হয়েছে, মনিরই সমাজের একমাত্র বিবেক।

একই মন্তব্য মনিরের মামার ক্ষেত্রেও খাটে। রাজনীতির নানা ভালো ভালো কথা শোনাতে মনিরের মামাকে বেছে নিয়েছেন নির্মাতা। কিন্তু সঙ্কটের বিষয় হলো, মনিরের সংলাপ শুনে মাঝে মাঝে দ্বিধাগ্রস্ত হতে হয়, এগুলো কোনো সাধারণ মানুষের কথা, নাকি কোনো রাজনৈতিক বক্তৃতা। যা তিনি দর্শককে শোনাতেই থাকেন অনবরত।

কী চাই, কী পাই

সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী মনিরের লেখালেখির হাত ভালো। নিজের লেখনিতে সমাজের বাস্তব চেহারা তুলে আনার চেষ্টা করেন। নিজে যা দেখেন, উপলব্ধি করেন, তাই তুলে আনেন লেখনিতে। দহন-এর ১৬ মিনিটে দেখা যায়, মনির তার একটি লেখা সাপ্তাহিক পত্রিকার এক সম্পাদককে দেখাতে নিয়ে যান। সম্পাদক মনিরের লেখা থেকে কয়েকটি লাইন পড়ে শোনান¾ ‘বুদ্ধিজীবীদের আপসমুখী মনোবৃত্তি সমাজে বৈষম্য আর অপরাধ প্রবণতার জন্ম দিচ্ছে। ... উচ্চবিত্তের ধনিক শ্রেণি বিদেশ থেকে আধুনিক টেকনোলজি আমদানির সাথে সাথে আমদানি করে অপসংস্কৃতি। এই অপসংস্কৃতি আমদানির পিছনে কাজ করে তাদের বিকৃত রুচিবোধ। নৈতিকতার পরিবর্তে তারা নিয়ে আসে আমোদ-প্রমোদের সস্তা উপকরণ।’ লেখা পড়ে সম্পাদক প্রশংসা করলেও পরক্ষণেই তিনি নিরাশার বাণী শোনান¾ ‘এ ধরনের লেখা আজকাল আর কেউ পড়ে না।’ মনির এর উত্তরে বলেন, তাতে কী, দুয়েক জন তো পড়বে। সম্পাদকের জবাব, দুয়েক জন পড়লে কী সমাজের কোনো পরিবর্তন আসবে? আর তাছাড়া সাপ্তাহিক পত্রিকায় এসব লেখা ছাপিয়ে পত্রিকা চালানো যায় না। মানুষ আজকাল সেক্স, ভায়োলেন্স, ক্রাইমবিষয়ক লেখা চায়।

সম্পাদকের সেই কথা তো আসলে মিথ্যা নয়। দহন-এর দেড় মিনিটের ওই দৃশ্যে ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দের যে বাস্তবতা দেখানো হয়েছে, ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে এসে সেটা আরো প্রকট আকার ধারণ করেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তি অগ্রসর হয়েছে, বেড়েছে প্রযুক্তির ওপর মানুষের নির্ভরশীলতা। দেশে বেড়েছে গণমাধ্যমের সংখ্যাও। যে গণমাধ্যম বুক উঁচিয়ে সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা বলে, তাতে আজ কেবল ক্ষমতাধরদেরই বদন দেখা যায়! সেখানে প্রতিদিন নানা প্রচারণা হাজির করা হয় গণমানুষের সামনে। আর এই সঙ্কটের মূলে রয়েছে গণমাধ্যমে লাগামহীন করপোরেট বিনিয়োগ। সেখানে আজ সবকিছুই পণ্য। উদ্দেশ্য কেবল মুনাফা অর্জন। আবার এই বিনিয়োগকারীদের একাংশ কোনো না কোনোভাবে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকের ভূমিকা পালন করছে, যার বিরাট অংশ ছদ্মবেশে দেশের ক্ষমতার ধারক, বাহক। আরেক অংশ নিজেদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখার জন্য ঢালস্বরূপ গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে। বলার অপেক্ষা রাখে না, গণমাধ্যমে ‘সত্য’ প্রকাশ করা তাদের ইচ্ছার বাইরে। ফলে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে সত্য উঠে আসার পথ।

দহন-এ পত্রিকার সম্পাদক চাইলেও মনিরের লেখা ছাপতে পারেন না। কারণ যাদের কারণে সৃষ্ট বৈষম্যের কথা মনির লিখেছেন, সেই বৈষম্য সৃষ্টিকারীরাই এই সাপ্তাহিকটি চালু রাখতে পৃষ্ঠপোষকতা করে। ফলে তাদের বিরুদ্ধাচরণ আর প্রতিষ্ঠান অচল হয়ে যাওয়া সমান কথা। দহন নির্মাণের তিন দশক পরের বাংলাদেশে এই অবস্থা আরো ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে! সে কারণে হয়তো বর্তমান সময়ে এসেও অনলাইনে ঢু মারলে দেখা যায়, জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা সংবাদগুলোর বেশিরভাগই যৌনতা, সহিংসতা ও চটুল বিনোদনে ভরা। সংবাদকর্মী ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় এ ধরনের কন্টেন্ট দিতে বাধ্য থাকে। কর্মীদের এর অন্যথায় যেমন যাওয়ার সুযোগ নেই, খোদ কোনো গণমাধ্যমেরও রাষ্ট্রের বেঁধে দেওয়া নিয়মের একচুল বাইরে যাওয়ার অপশনও নেই। গেলেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ফাঁকে আটকানোর শঙ্কা। হুমকি মনে করলেই সেই গণমাধ্যম বন্ধেরও নজির রয়েছে। এই তো ক’দিন আগেই একসঙ্গে ৫৮টি অনলাইন গণমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিলো।১৯ ফলে পথ কেবল খোলা থাকে তাঁবেদারি করা অথবা মুখ বন্ধ রাখার। চলচ্চিত্রটিতেও দেখা যায়, মনিরকে তার লেখা ছাপানোর ব্যাপারে কোনো কথা না দিয়ে, আগের লেখার বিল হয়েছে কি না সে ব্যাপারে খোঁজ নিতে বলেন সম্পাদক। আর মনিরের লেখা চাপা পড়ে থাকে টেবিলে।

এভাবেই আমরা মৃত্যুর মাছি তাড়াই

নিজের চাকরির চেষ্টা আর টিউশনির ফাঁকে হারানো মামাকে খুঁজে বেড়ান মনির। ব্যবসায়িক অংশীদার সাদিকের সঙ্গে আলাপের সময় চলচ্চিত্রের এক ঘণ্টা ১৬ মিনিট ৩০ সেকেন্ডে রাস্তায় জটলা দেখে সেখানে ছুটে যান মনির। ওই সময় সাদিকের সঙ্গে তিনি গুরুত্বপূর্ণ আলাপ করলেও, মরে পড়ে থাকা ব্যক্তিকে নিজের মামা ভেবে তাকে (সাদিককে) কিছু না জানিয়েই দৌড় দেন। তবে ওই ব্যক্তিকে চিনতে না পেরে শুকনো মুখে ফিরে যেতে দেখা যায় মনিরকে।

দ্বিতীয় বারের মতো মনিরকে এভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে দুর্ঘটনাস্থলে ছুটে যেতে দেখা যায় চলচ্চিত্রের এক ঘণ্টা ৫৬ মিনিটে। এবার তিনি ছুটে যান বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়া বোনের কথা ভেবে। দুর্ঘটনায় মরে পড়ে থাকা নারীকে নিজের বোন ভেবে তার মুখটা ভালো করে দেখেন তিনি। তবে সেই নারী মনিরের বোন নন; বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে আকাশের দিকে তাকান মনির। হাঁফ ছেড়ে হয়তো শঙ্কা কিছুটা কমে যাওয়া প্রকাশ করতেই এ ধরনের এক্সপ্রেশন তার। তবে মরে পড়ে থাকা এসব মানুষেরা তো কারো না কারো বোন-মামা ইত্যাদি। সেটা বোঝাতে মনিরের মামা আর বোনের ছবি পর্দায় দেখান নির্মাতা।

দহন-এ মনিরের যে উদ্বেগ, বর্তমানেও সে রকম উদ্বিগ্ন হয়ে প্রতিদিন হাজারো মানুষকে পথ চলতে হয়। এখনো প্রতিদিন অনেককেই শুনতে হয় দুর্ঘটনায় স্বজন হারানোর খবর। পত্রিকার পাতায় কিংবা টেলিভিশনের পর্দায় ভেসে ওঠে দুর্ঘটনায় নিহতের ছবি। চলতি বছরের ৩ এপ্রিল রাজধানীতে বেপরোয়া বাসের চাপায় সরকারি তিতুমীর কলেজের ডিগ্রির ছাত্র রাজীব হোসেনের হাত কাটা পড়া এবং পরে তার মৃত্যুর ঘটনা ব্যাপক আলোচনায় আসে।২০ আর রমিজ উদ্দিন কলেজের দুই শিক্ষার্থী নিহতের২১ পর তো দেশজুড়ে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। ওই সময় রাজধানীতে কয়েকদিন বাস চলাচলও বন্ধ থাকে। সেই উত্তাপ রাজধানী থেকে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। সারাবছর দেশজুড়ে সড়কে নিরাপত্তাহীনতার কারণে ওই আন্দোলন যে গতি পায়, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির সড়ক দুর্ঘটনা পর্যবেক্ষণ সেলের তথ্য মতে, কেবল ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে চার হাজার নয়শো ৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে সাত হাজার তিনশো ৯৭ জন। ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি থেকে শুধু ২০ এপ্রিল পর্যন্ত এক হাজার সাতশো ৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় এক হাজার আটশো ৪১ জনের মৃত্যু হয়েছে; আহত হয়েছে আরো অন্তত পাঁচ হাজার চারশো ৭৭ জন। এছাড়া পঙ্গুত্ব বরণ করেছে দু’শো ৮৮ জন।২২ এরকম পরিস্থিতিতে যে কারো অনুভুতি মনিরের মতো হওয়া অস্বাভাবিক নয়। বরং দিনশেষে নিজেই নিরাপদে বাড়ি ফেরার পর মুখ দিয়ে অজান্তেই বেরিয়ে আসার কথা, যাক আজকের দিনের মতো বেঁচে গেলাম!

লেখার শুরুতে বলেছি, ৮০’র দশকে বাংলাদেশের সঙ্কট অনুধাবন করে নির্মাতা দহন-এ যা দেখিয়েছেন এবং নির্মাণের তিন দশক পরও বাংলাদেশে সেই বিষয়বস্তুগুলো কীভাবে রয়ে গেছে তা বোঝার চেষ্টা থাকবে এ লেখনিতে। এতোগুলো বছরে আসলে দহন-এ দেখানো বিষয়গুলো আরো প্রকট আকার ধারণ করেছে, তখনকার অপছন্দের বিষয়গুলো এখন অসহ্যে পরিণত হয়েছে; সেটা প্রতিটি ক্ষেত্রেই।

লেখক : রাশেদ রিন্টু, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্বের শিক্ষার্থী।

rashed.rin2@gmail.com

 

তথ্যসূত্র

1. http://www.deshebideshe.com/home/printnews/4057; retrieved on: 25.10.2018

2. http://bdn24x7.com/?p=5286; retrieved on: 25.10.2018

3. https://www.bbc.com/bengali/news-45180701; retrieved on: 25.10.2018

4. https://bit.ly/2quDN0d; retrieved on: 25.10.2018

5. https://www.ajkalerkhobor.com/details.php?id=29686; retrieved on: 25.10.2018

6. হায়াৎ, অনুপম (২০১৩ : ১৫৫); সরকারি অনুদানের চলচ্চিত্র ‘দহন’; বাংলাদেশের অন্য সিনেমা ৩য় খণ্ড; সম্পাদনা : সুশীল সাহা; অভিযান পাবলিশার্স, কলকাতা।

7. http://www.filmfree.org/2018/04/30/etc/2240.php; retrieved on: 25.10.2018

8. http://www.filmfree.org/2018/04/30/etc/2240.php; retrieved on: 25.10.2018

9. https://www.prothomalo.com/bangladesh/article/1056393; retrieved on: 25.10.2018

10. https://www.prothomalo.com/bangladesh/article/159088; retrieved on: 25.10.2018

11. http://www.ntvbd.com/opinion/108825; retrieved on: 25.10.2018

12. https://www.jugantor.com/todays-paper/window/6147; retrieved on: 25.10.2018

13. https://www.prothomalo.com/bangladesh/article/159088; retrieved on: 25.10.2018

14. কমরেড জসিম উদ্দিন মণ্ডলের বিশেষ সাক্ষাৎকার ‘এ সমাজ ভাঙিতেই হইবে’; কালের কণ্ঠ-এর শুক্রবারের বিশেষ ক্রোড়পত্র ‘কথায় কথায়’, ২৫ আগস্ট ২০১৭।

15. http://www.kalerkantho.com/online/national/2017/09/16/543413; retrieved on: 25.10.2018

16. http://pbd.news/lead-news/50376; retrieved on: 25.10.2018

17. https://www.prothomalo.com/bangladesh/article/959146; retrieved on: 25.10.2018

18. http://oldmobile.dailynayadiganta.com/detail/news/122032; retrieved on: 25.10.2018

19. http://www.kalerkantho.com/online/national/2018/12/10/713000; retrieved on: 19.12.2018

20. https://bangla.bdnews24.com/bangladesh/article1479018.bdnews; retrieved on: 19.12.2018

21. https://goo.gl/vQfhN5; retrieved on: 19.12.2018

22. https://goo.gl/Znqk3L; retrieved on: 19.12.2018

 

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন