Magic Lanthon

               

নাজমা পারভীন

প্রকাশিত ০৩ নভেম্বর ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

দেখা অতঃপর লেখা

অনেক প্রশ্ন তুলে সচেতনভাবে এড়িয়ে যায় ‘আলফা’

নাজমা পারভীন

উপক্রমনিকা

নাসিরউদ্দীন ইউসুফ-এর চলচ্চিত্র আলফা। চলচ্চিত্রটিতে মূলত একজন চিত্রশিল্পীর জীবনচরিত উঠে এসেছে। যেখানে সমাজের কিছু মানুষের সঙ্গে শিল্পীর সম্পর্ক দেখা যায়; কেউবা তাকে সমাদর করে আবার কেউ অহংকারে অবহেলা করে। তবে শিল্পী চলে তার নিজ গতিতে; যদিও সমাজের অস্থিতি তার এই গতিকে বাধা দেয়। আবার সেই সব বাধাও তার শিল্পে রূপান্তর হয়। আধুনিক এক শহরে যখন যানবাহনের ব্যস্ততা; শিল্পীর বাহন তখন গাধা। অদ্ভুত এক জীবন তার! সে জীবনের গল্প নিয়েই নির্মিত আলফা; আর তা নিয়েই লেখা।

আলফার বর্ণনা

আলফার শুরু মহরম-এর উৎসব দিয়ে। যেখানে একটি শিশু হারিয়ে যায়। ছোট্ট সেই শিশুটি কাঁদতে কাঁদতে গিয়ে দাঁড়ায় মৃৎশিল্পের এক দোকানির কাছে। এরপর থেকে সেই মৃৎশিল্পীর কাছেই বড়ো হতে থাকে শিশুটি। পরিণত বয়সে সেই শিশুটিই হয়ে ওঠে চিত্রশিল্পী আলফা। যিনি বাস করেন বস্তির কাছে খালের পানির উপরে একটি ঘরে। সেটিই তার স্টুডিও, সেখানেই তিনি চিত্রকর্ম সৃষ্টি করেন। ঘোরের মধ্যে থাকা আলফার বসবাস একটা বাস্তব-পরাবাস্তব জগতের মধ্যে। ক্যানভাসে তিনি যেসব আঁকেন সেগুলো বাস্তবেও দেখতে পান। আঁকা চিত্রগুলো শহরে নিয়ে যান বিক্রির জন্য। শিল্পকর্মগুলো বহন করেন গাধার পিঠে। সেই গাধার মালিক এক হিজড়া, যার নাম কালী/কালীমা।

কালী ও আরেক নারী গোলেনূর রান্না করা খাবার বিভিন্ন স্থানে পার্সেল করে জীবিকা নির্বাহ করে। গোলেনূরের স্বামী হেকমতউল্লা দুষ্ট, খিটখিটে মেজাজের মানুষ। তাদের কোনো সন্তান নেই। অন্যদিকে কালী রাস্তা থেকে কুড়িয়ে পাওয়া বেশ কয়েক সন্তানের মা। খালের পাড়ের সেই বস্তিতে তাদের বসবাস; সেখানে অনেক পোশাকশিল্পের কর্মীও থাকে। হেকমতউল্লা ছাড়া এদের প্রায় সবার সঙ্গেই আলফার ভালো সস্পর্ক। কখনো গোলেনূর, কখনো কালীর সন্তানেরা গিয়ে আলফাকে খাবার ও পানি দিয়ে আসে। এভাবে দিন চলতে থাকে।

হঠাৎই এক রাতে পানিতে কিছু পড়ার শব্দ পান আলফা। দুইবার একই শব্দ ও কম্পনে তিনি ঘরের নিচের দিকে তাকিয়ে দেখেন, একটি লাশ, হাত বাঁধা অবস্থায় ভাসছে। ভয়ে লাঠি দিয়ে লাশটিকে ঘরের নিচ থেকে দূরে ঠেলে দেন। পরদিন সকালে দেখেন লাশটা সেখানেই রয়েছে। এভাবে লাশকে বার বার সরিয়ে দেওয়ার পরও সেটি ফিরে আসে। নিরুপায় আলফা থানায় যান। কিন্তু পুলিশ এসে কোনো লাশ পায় না। এর পরের দৃশ্যেই অগ্নিকাণ্ডের খবর শোনা যায়। চলন্ত বাসে ও গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিতে আগুন লাগার খবর ভেসে ওঠে টেলিভিশনের পর্দায়। এসব খবরে আলফা পাগলের মতো রাস্তার মধ্যে সাদা কাপড়ে রঙ ছুড়ে অ্যাকশন পেইন্টারদের মতো গড়াগড়ি দেন। অসহ্য যন্ত্রণা প্রকাশের জন্যই হয়তো শিল্পীর এই অভিব্যক্তি!

আলফার দিন কাটে ছবি এঁকে, কখনো বাঁশি বাজিয়ে, কখনোবা ক্যানভাসের সামনে বিশেষ ভঙ্গিতে নাচ করে। আবার কখনো কল্পনায় তিনি ক্যানভাসের নারী চরিত্রে রূপান্তর হন। নারীবেশে চরের মধ্যে চিত্রকর্মের সামনে নাচ করতে থাকেন। কল্পনার ভ্রম কেটে গেলে তিনি আবারও সেই শব্দ পান। লাশটি পুনরায় আসে তার ঘরের নিচে।

একপর্যায়ে লাশের সঙ্গে কথা হতে থাকে শিল্পী আলফার। লাশের পকেটে থাকা সন্তানের ছবির পিছনে বাড়ির ঠিকানা পান তিনি। সেখানেই তার নাম জানা যায়--সোলায়মান। আলফা এবার খোঁজখবর করতে থাকেন তার পরিজনদের। এ সময়ে বস্তির এক প্রবীণ অন্ধ মুদি দোকানদার তাকে বলেন--‘কার ঠিকানা খোঁজো তুমি? তামাম পৃথিবী, গাছ-গাছালি, পাখ-পাখালি সকলই তো সৃষ্টি হলো আগুন আর জল দিয়া। সকল ঠিকানা জলের কাছে খোয়াজ-খিজিরের কাছে।’ কথাটা মনে লাগে শিল্পীর।

এদিকে স্বামী শারীরিকভাবে অসমর্থ হলেও গোলেনূরের অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার কথা জানা যায়। বোঝা যায়, এর সঙ্গে আলফার সম্পৃক্ততা আছে। বিষয়টি হয়তো গোলেনূরের স্বামীও বোঝেন, তারপরও সবকিছু মেনে নেন। অন্যদিকে আলফা খুঁজে বের করেন সোলায়মানের বৌ-বাচ্চাকে। তারা আলফার কথায় সাড়া দেয় না। ফিরে এসে আবার কথা হয় লাশের সঙ্গে। আলফা এবার সোলায়মানের গ্রামের বাড়িতে যান তার মায়ের খোঁজে। মায়ের সঙ্গে দেখা করে যখন তিনি ঘরে ফেরেন, তখন খবর পান পুলিশ ঘরের নিচে লাশ পেয়েছে। আলফা থানায় গেলে, পুলিশ বলে বেওয়ারিশ লাশ। আলফা মর্গে রাখা সেই লাশ দেখার জন্য ডোমকে অনুরোধ করেন। লাশের সঙ্গে দেখা হলে আলফা বলেন--‘সোলায়মান তুই কেমনে বেওয়ারিশ হলি রে!’ তারপর সেই ডোমের সাহায্যে পানিতে সোলায়মানের দাফনের ব্যবস্থা করেন তিনি।

ডিজিটালাইজেশনের যুগে শিল্পকলা এবং ...

বর্তমান সময়ে ডিজিটাল আর্ট এমনভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে, তার নিজস্ব প্রয়োজনেই আলাদা সময়সীমা নির্ধারণ করে নিয়েছে। শিল্প সমালোচকরা ডিজিটাল আর্টের এই সময়কে পোস্ট পোস্ট-মডার্নিজম বলে আখ্যায়িত করে। পোস্ট-মডার্ন-এর পর পোস্ট পোস্ট-মডার্ন শুরু হলেও দুটো সমান্তরালভাবেই চলছে। ডিজিটাল আর্টে কম্পিউটারের ব্যবহার দেখা যায়। এটি এমনই এক শিল্পমাধ্যম যা একেবারে নতুন; নতুন বললেও ঠিক বলা হয় না, একেবারে আলাদা এক শিল্পমাধ্যম। কেননা বহুকাল আগে থেকে নানা শিল্পধারা সৃষ্টি হয়ে, সেগুলোতে নতুন চিন্তাধারা থাকলেও, রঙ-তুলির সঙ্গে সম্পর্ক ছিলো। কিন্তু এই মাধ্যমে শিল্পীরা তুলি ছেড়ে কম্পিউটারের মাউস ধরেছে। কম্পিউটারকে নির্দেশ দিলে প্রয়োজনীয় রঙ এসে হাজির হচ্ছে। কাজ সমাধা হচ্ছে খুব দ্রুত ও স্বল্প পরিশ্রমে।

এই ধারার একেবারের গোড়ার কথা বলতে গেলে চলে যেতে হয় আমেরিকায়। মাইকেল নল নামের এক গবেষক ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে কম্পিউটার ইমেজ সৃষ্টি করেন। যা নিউ ইয়র্কের হাওয়ার্ড ওয়াইজ গ্যাল্যারিতে প্রদর্শন হয় ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে। এ সময়ে আরো তিনজন শিল্পী ইমেজ প্রদর্শন করে; তারা হলেন--বেলা জুডেথ, জর্জ নিস ও ফ্লেভার নেক। তাদের ওই ইমেজগুলোর মধ্যেই ডিজিটাল আর্টের বীজ লুকানো ছিলো। পরবর্তী সময়ে তিন শিল্পী জন হুইটনি, চার্লস কেসুরি ও ভেরা মলনা ডিজিটাল আর্ট সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তবে এদের অনেক আগে দাদাইজম, ফ্লাক্সাস, কনসেপচুল এমনকি পারফরমেন্স আর্টেও কোথাও কোথাও ডিজিটাল আর্টের বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাওয়া যায়। ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দ থেকে এর যাত্রা শুরু হয়। ১৯৬০-১৯৯০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ডিজিটাল আর্টের নামকরণে সমস্যা ছিলো। একেবারে শুরুর দিকে এর নাম ছিলো কম্পিউটার আর্ট, পরে মাল্টিমিডিয়া আর্ট, তারপর সাইবার আর্ট, আর বর্তমানে বলা হয় ডিজিটাল আর্ট বা নিউমিডিয়া আর্ট।

ডিজিটাল আর্ট কম্পিউটারভিত্তিক শিল্প হলেও আসলে এটা একক কোনো শিল্পমাধ্যম নয়। এর মধ্যে আছে ফিল্ম, অ্যানিমেশন ফিল্ম, ভিডিও, ইনস্টলেশন, ইন্টারনেট আর্ট১, নেটওয়ার্ক আর্ট২, ভার্চুয়াল আর্ট ও সফটওয়্যার আর্ট। শিল্পকলায় ডিজিটাল আর্ট কীভাবে ভূমিকা রেখেছে তা বলা যায় এভাবে--

ডিজিটাল আর্ট শিল্পকলায় ভূমিকা গ্রহণ করেছে দুইভাবে। প্রথমত, শিল্পকলা বিশেষ করে চিত্রকলার পুরোনো কাজগুলোকে ত্রুটিমুক্ত করার বা সংরক্ষণের কাজে ব্যবহার করে কম্পিউটারের ব্যবহারে যে নতুন মাত্রা যোগ করা হয়েছে তার ভিত্তি ডিজিটাল প্রযুক্তি। এরই অনুষঙ্গ হিসেবে এসছে ডিজিটাল প্রযুক্তি করে ট্র্যাডিশনাল আর্ট-ফর্ম সৃষ্টি। যেমন, ফটোগ্রাফ, ভাস্কর্য, প্রিন্ট বা মুদ্রণের কাজ। দ্বিতীয় শ্রেণিতে রয়েছে কম্পিউটারে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে শিল্পসৃষ্টি এবং একাধিক সংখ্যায় তার সরবরাহ ও সংরক্ষণ। এই দ্বিতীয় শ্রেণিতে আর্ট ডিজিটাল প্রযুক্তির বৈশিষ্ট্যগুলো আত্মস্থ করে নিজের মাধ্যম বা আঙ্গিক হিসেবে ব্যবহার করেছে। আবার উল্টোভাবে এ-ও বলা যায় যে ডিজিটাল আর্ট ট্র্যাডিশনাল আর্টের বিষয় ও আঙ্গিককে আত্মস্থ করে নিজের পদ্ধতি ও আঙ্গিকের ভিত্তিতে শিল্পসৃষ্টি করেছে।৩

ডিজিটাল আর্টের যে অবদান তার বৈশিষ্ট্যের দিকগুলো বলতে গেলে, হাতে-তুলিতে শিল্প সৃষ্টির বিকল্প হিসেবে এগুলো করা হয়। যা সিরিয়াস কোনো কিছু সৃষ্টি করবে এমন কিছু নয়, বরং এটি হবে র‌্যানডম অ্যাকসেস বা আকস্মিক, এলোমেলো; যা ইচ্ছা তাই ব্যবহার করে শিল্প সৃষ্টি করা যাবে। এখানে বস্তুর থেকে ধারণাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। যেখানে মিডিয়ার বিভিন্ন উপকরণকে ব্যবহার করে সৃজনশীলতার রূপ দেওয়া হয়। শিল্পকলায় এই চিন্তাটা প্রথম করেছিলেন মার্শেল দুশাঁ; দাদাইজমের এই শিল্পী প্রচলিত এই সমাজকে আঘাত করার জন্য ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে এক প্রদর্শনীতে চিনামাটির প্রস্রাবাধার পাঠান। দাদাইজমে৪ বলা হয়, ‘এটি শিল্পকলা ও সুস্থ মনের অনুভূতির সম্পূর্ণ বিপরীত জিনিস। দাদাইজমের উদ্দেশ্য ছিল অগতানুগতিক ও উদ্ভট কাজ দ্বারা মনে আঘাত দেওয়া।’৫ ফলে ডিজিটাল আর্টের সূচনা ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে হলেও এর চিন্তা শুরু হয়েছিলো দাদাইজম থেকে। ডিজিটাল আর্টিস্ট গ্রাহাম উইনব্রান এ সম্পর্কে বলেন, ‘ডিজিটাল বিপ্লব হলো র‌্যানডম অ্যাকসেসের বিপ্লব। অর্থাৎ এই বিপ্লব সম্ভব হয়েছে নতুন করে মিডিয়া উপকরণ সাজানোর সীমাহীন সম্ভাবনার তাৎক্ষণিক ব্যবহারের সুযোগের জন্য।’৬


তবে ডিজিটাল আর্টের স্বীকৃতি নিয়ে বর্তমান সময়ে আর কোনো সন্দিহান নেই। কেননা পৃথিবীব্যাপী বিভিন্ন গ্যালারি ও মিউজিয়ামে এর প্রদর্শন চলছে; যার বিভিন্ন দিক নিয়েও আলোচনা করছে সমালোচকরা। সেই আলোচনায় ভালো-মন্দের বিচার বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে করছে। আলফায় ডিজিটাল আর্টের বিষয় আসে গুরুত্ব সহকারে। চলচ্চিত্রের ২২ মিনিট দুই সেকেন্ডে গভীর এক অরণ্যের মধ্যে শিল্পী অসুস্থ বোধ করেন; একপর্যায়ে ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যান। তার পড়ে যাওয়ার দৃশ্যের পর পরই একটি ডিজিটাল ব্যানার টাঙানোর দৃশ্য দেখা যায়। নির্মাতা হয়তো বোঝাতে চান, একবিংশ শতকে এসে ডিজিটালাইজেশনে প্রবেশের ফলে চিত্রকলা জগৎ মুখ থুবড়ে পড়ে যাওয়ার কথা। এটা ঠিক ডিজিটাল আর্ট আসার ফলে চিত্রকলার কাজের ক্ষেত্র কিছুটা কমেছে। যেমন, ব্যানার, পোস্টার, বইয়ের অলংকরণ, প্রচ্ছদ প্রভৃতি আগে হাতে এঁকে করা হতো। কিন্তু বর্তমানে কাজগুলো সব ডিজিটাল আর্ট-এ করা হয়। যে কারণে চিত্রশিল্পীদের মধ্যে হতাশা দেখা যায়। যা আরো দৃঢ় হয় কালীর এক সন্তানের সংলাপের মধ্য দিয়ে; ২৩ মিনিট সাত সেকেন্ডে আলফা গাধা নিয়ে শহর থেকে ফিরে এলে তাকে ঘিরে ধরে সবকটি সন্তান বলতে থাকে--‘দেখছেন আর্টিস্ট, ওই হেকমতউল্লা কয় ডিজিটাল বোর্ড ওঠাইবো, আর কয় তগো আর্টিস্টের দিন শ্যাষ।’ এছাড়া ১৬ মিনিট ২২ সেকেন্ডে আলফা রিকশা পেইন্টিংয়ের দোকানে ছবি বিক্রির জন্য গেলে, দোকানদার তার তিনটি ছবি কিনে নেন। এ সময় দোকানির সঙ্গে আলফার কথোপকথন ছিলো এমন--

দোকানি : আর্টিস, আপনার আঁকোনের হাত ভালাই। মাগার দিন-দুনিয়ার হালহকিকত আপনার বুজে নাই।

আলফা : ক্যান?

দোকানি : আইজকাল সিনেমার নায়ক নায়িকাগো ছবি চলে? ফিরবার আওনের সময় কিছু মরজিদ-মুনাজাতের ছবি লইয়া আইছো। সিনেমার বিলবোর্ডের খবর কী, কিছু পাইতাছেন আজকাল? নাকি ডিজিটালে সব খায়া ফালাইছে! 

এই ছোটো কথোপকথন থেকেও ধারণা করা যায় ডিজিটালের প্রভাব কেমন বেড়েছে। চলচ্চিত্রের বিলবোর্ড, আগে যা হাতে আঁকানো হতো, সেই কাজটিও এখন ডিজিটালই হচ্ছে।

আলফা ঘরে ফিরে যাওয়ার পর পরাবাস্তব একটি দৃশ্যে দেখা যায়, বনের মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়া আলফাকে সেখানকার আদিবাসীরা তুলে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করছে। তিনি সুস্থ হয়ে উঠছেন। যা কেবল আলফার সুস্থ হয়ে ওঠা নয়, প্রতীকী অর্থে হয়তো এটা পুরো শিল্পকলা জগতের সুস্থতা।

প্রশ্ন জাগে তাহলে কি ডিজিটাল আর্ট শিল্পকলাকে অসুস্থ করে দিচ্ছে? তবে বিষয়টা মোটেও সুস্থ-অসুস্থের বিষয় নয়। আপাত দৃষ্টিতে এটাকে সাময়িক সমস্যা মনে হলেও; আসলে এটা একেবারেই আলাদা এক শিল্পমাধ্যম। যাকে চিত্রকলার শত্রু না ভাবলেও চলে। আলাদা একটি শিল্প মাধ্যম হিসেবেই তার মূল্যায়ন হওয়া বাঞ্ছনীয়।

ওয়ারিশ-বেওয়ারিশের দ্বন্দ্ব

পৃথিবীতে নবাগত শিশুর আগমন এক শুভ সংবাদ। কিন্তু কিছু মানুষের চিন্তা কাঠামো এতোটাই নেতিবাচক যে, তারা সব শিশুর আগমনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখতে নারাজ। সমাজ সংস্কার, অর্থনৈতিক কাঠামো নির্ধারণ করে দেয়, সেই শিশুর আগমন ‘শুভ’ না ‘অশুভ’ সংবাদ বয়ে নিয়ে আসছে। এই উত্তরাধুনিক কালেও মানুষ জারজ শব্দটি ব্যবহার করে। আর মানবিকতার চরম অবমাননায় ডাস্টবিনে মানবশিশু পাওয়া যায়। আলফার ৩১ মিনিটে দেখা যায়, গোলেনূর ও কালী টিফিন বক্স পরিষ্কার করছে। এই সময় কালীকে গোলেনূর তার অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার খবর দেন।

গোলেনূর : কালী, মুই মা হবার যাচ্চু।

কালী : কখন জানলি!

গোলেনূর : আইজ বিয়েনে।

কালী : এ তুই মোক কী শুনালু! আল্লা তোমার রহমতের শ্যাষ নাই। আল্লার রহম হইছে তোর ওপর। কান্দিস ক্যান?

গোলেনূর : (কান্নাস্বরে) কিন্তু কালী, মাইনষেক কী কও কালী আমি।

কালী : রাখ তোর মানুষ, গুষ্ঠী কিলাই তোর মাইনষের। তোর প্যাটত জনম নিছে, তোর ছাওয়া, তোর পুত। বাপের খোঁজের ফের কী দরকার? বাপতো একখান আটকুইড়া, বদ্জাতের হাড্ডি।

গোলেনূর : কালী, মোর তো শরম করে কালী; ভয় লাগে মোর।

কালী : মুই মোর আল্লাক কও; আল্লাহ, পরের জনমে মোক তুমি গোলেনূরের জীবনখান দিও। মোর এই হিজড়া জীবনের দুঃখখ্যান ঘুচি, মোর প্যাট ভরাট করি একখান ছাওয়া দিও। একখান ছাওয়া!

এখানে সন্তানের পরিচয়ের সঙ্কট নিয়ে গোলেনূরকে শঙ্কিত হতে দেখা যায়। বিপরীতে মা হতে না পারার কষ্ট হিজড়া কালীর। তবে তার সাহসী সংলাপ সমাজের চিন্তাকাঠামোকে নাড়িয়ে দেয়--‘তোর প্যাটত জনম নিছে, তোর ছাওয়া, তোর পুত। বাপের খোঁজের ফের কী দরকার!’ দর্শককে মনে করিয়ে দেয় সভ্যতার সূচনালগ্নেরও আগের কথা। যখন সন্তানের পরিচয় বহন করতো মা। এখনো মাতৃতান্ত্রিক সমাজে তাই হয়। মা সন্তানকে পেটে ধরে, প্রসব করে, লালনপালন করে; সহজ হিসাবে মা সেই সন্তানের অবিভাবক হওয়ার কথা। কিন্তু সমাজ-বাস্তবতা বাবাকে করে দিয়েছে অভিভাবক। যে সন্তানের বাবার পরিচয় জানা যায় না, সে জারজ বা বেওয়ারিশ সন্তান। সমাজে অবহেলিত তিরস্কারের পাত্র সে!

অথচ বেওয়ারিশ হওয়ার পিছনে সে সন্তানের কোনো ভূমিকা নেই; তাকে আমন্ত্রণ করে দুটো মানুষ এই পৃথিবীতে এনেছে। সেই দুটো মানুষের দায়িত্বহীনতায় সন্তান হয় ঘৃণিত। আলফার ১৭ মিনিট ১৪ সেকেন্ডের একটি দৃশ্যে দেখা যায়, কালী তার পালক চার সন্তানকে গোসল করানোর সময় তাদের ছিটানো পানি হেকমতউল্লার শরীরে পড়লে তিনি রেগে যান এবং বেওয়ারিশ বলে গালি দেন। আগেই বলেছি এই বেওয়ারিশ কিংবা জারজ হওয়ার পিছনে ওই শিশুদের কোনো ভূমিকা নেই। অথচ সারাটা জীবন তাদের এটা বয়ে বেড়াতে হয়। যখন তারা এই শব্দগুলোর অর্থ বুঝতে শেখে, তখন তাদের মধ্যে নিজেদের জীবন, সমাজ সর্বোপরি রাষ্ট্র নিয়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এখান থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুব কম শিশুরই থাকে। অথচ অন্য আর দশটা শিশুর মতোই তাদের বেড়ে ওঠার কথা।

শিল্পী আলফাও সেই অর্থে বেওয়ারিশ। তাকে ওই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিলো কি না চলচ্চিত্রে সেটা পরিষ্কার নয়। তবে তিনি দুজন শিল্পীর কাছে বড়ো হয়েছেন, যাদের কাছে হয়তো মানুষ পরিচয়ই গুরুত্বপূর্ণ ছিলো, আলফার আচরণে অন্তত তাই বোঝা যায়। আলফায় যেমন বেওয়ারিশ সন্তান আছে; আছে বেওয়ারিশ লাশ। বেওয়ারিশ লাশের জন্ম হয় বলেই কি তবে বেওয়ারিশ শিশুর সংখ্যা বাড়ে? কিংবা বেওয়ারিশ লাশ হওয়ার প্রক্রিয়াইবা কী? কেনোইবা হাত-পা বাঁধা গুলিবিদ্ধ মানুষ রাস্তায় পড়ে থাকে? কেনোইবা ‘অপরাধী’ হলেও বিচার পাওয়ার সুযোগ জোটে না? এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর উত্তর আলফায় খুঁজে পাওয়া যায় না; কিংবা নির্মাতা এড়িয়ে যান।

মানুষ সত্তা প্রশান্তির খোঁজে শিল্প সত্তায় গমন করে

বিশাল এই ব্রহ্মাণ্ডে যা কিছু দেখা যায়, তার বাহিরেও আরো অনেক কিছু রয়েছে। আবার অনেক কিছু আছে যা দেখা যায় না, কেবল অনুভব করা যায়। মানুষ যখন অনুভবের বিষয়গুলোকে গভীরভাবে অনুভব করে, তখন ক্ষণকালের জন্য হলেও বাস্তব ভুলে সেই জগতে অবস্থান করে। শিল্পীদের ক্ষেত্রে এটি আরো বেশি হয়, তারা হয়তো প্রকৃতির সৃষ্ট বা মানুষের সৃষ্ট কোনো জগতে অবস্থান করে না; নিজেদের মতো করে একটা জগৎ তৈরি করে নেয়। এই জগতে নানা প্রয়োজনেই শিল্পীরা ডুব দেয়।

আলফার ৩৪ মিনিট সাত সেকেন্ডে দেখা যায়, পানিতে লাশ পড়ার শব্দে শিল্পীর শিশুসুলভ সজাগ মন তীব্র দৃষ্টিতে খোঁজার চেষ্টা করে কী হচ্ছে। কিন্তু এক আলফার সজাগ দৃষ্টি কি বিশাল এই শহরের লাশ ফেলাকে রুখতে পারে? ততোক্ষণে গুলির শব্দ আকাশে ধ্বনিত হয়, শিল্পীর দৃষ্টি ফাঁকি দিয়েই। এটি নিয়ে শিল্পীকে হতাশ, মর্মাহত হতে দেখা যায় এক ঘণ্টা সাত মিনিট ৩০ সেকেন্ডে--‘আজকাল প্রতিদিন ১০-১৫টা লাশ পড়ে এই শহরে; কী জানি ক্যান মারে, কারা মারে!’ শিল্পী হতাশ হন, কারণ যে সমাজের স্বপ্ন তারা দেখে, সেই সমাজে প্রতিদিন এতো বেওয়ারিশ লাশ তারা মেনে নিতে পারে না। তিনি না চাইলেও বেওয়ারিশ লাশের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। তিনি তার ঘরের নিচের লাশকে যতোই ঠেলে দূরে পাঠাতে চান, ততোই তার কাছে আসতে থাকে। একপর্যায়ে সেই লাশ তার আপন হয়ে ওঠে। তিনি তার নাম-ঠিকানা খুঁজে বের করে মা-স্ত্রী-সন্তানের সঙ্গে দেখা করেন। তার দাফনের ব্যবস্থা করেন। এসব কিছুর ভিতর দিয়ে নিজের জগতে ডুব দিয়ে শিল্পীমন হয়তো প্রশান্তি খুঁজে ফেরে।

শেষকথা

চলচ্চিত্রজুড়ে শিল্পীর যে জীবন তা কিছুটা হলেও সাধারণের থেকে ভিন্ন। শিল্পী যেনো তার সৃষ্ট এক রাজ্যে বসবাস করেন। তার প্রতীকী বাসস্থানও সেই রাজ্যেরই ইঙ্গিত করে। লাশের সঙ্গে কথোপকথন, সোলায়মানের গ্রামের বাড়িতে মায়ের সঙ্গে রাত্রিযাপন, নৌকায় নতুন বউ দেখা, লাশকাটা ঘরে ডোমের তালা লাগানো, সবকিছুর মধ্যে একটা পরাবাস্তবতার ছোঁয়া আছে। দিনশেষে এসব কিছু অনেকগুলো প্রশ্ন তোলে, কিন্তু সেগুলোর উত্তর চলচ্চিত্র আলফা না দিলেও দর্শককে কিছু সময়ের জন্য পরাবাস্তব এক ঘোরের জগতে নিয়ে যায়।

লেখক : নাজমা পারভীন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্রকলা, প্রাচ্যকলা ও ছাপচিত্র বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী।

nazmaparvincharu@gmail.com

https://www.facebook.com/naj.ahmed.583

তথ্যসূত্র ও টিকা

১. একটা বিশেষ শিল্প আন্দোলন, যা ১৯৯০-এর দশকে ইউরোপের কয়েকজন শিল্পী মিলে গড়ে তোলেন। এটি নিরীক্ষাধর্মী ও ন্যারেটিভ ফর্ম নিয়ে কাজ করে। যা অনলাইন গেমস, ফেইসবুকের ব্যবহার, পারফরমেন্স মিডিয়া প্রভৃতির মধ্য দিয়ে কর্মকাণ্ড চালায়।

২. নেটওয়ার্ক আর্ট : ইন্টারনেট আর্ট-এর অধীনে আবির্ভূত আর্ট। যা নেটভিত্তিক বিভিন্ন কার্যক্রম চালায়। নেটওয়ার্ক-এর মাধ্যমে এতে শিল্পকর্ম বিভিন্ন স্থানে প্রেরণ, সংরক্ষণ, কপি সরবরাহ প্রভৃতি করা হয়।

৩. হাই, হাসনাত আবদুল (২০১৯ : ৪৮২); শিল্পকলার নান্দনিকতা; আগামী প্রকাশনী, ঢাকা।

৪. দাদাইজম : দাদাবাদ শিল্প আন্দোলন ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দের দিকে শুরু হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সাহিত্যিক ও শিল্পীদের মনে যে প্রচণ্ড আঘাত সৃষ্টি হয়, তার পরিপ্রেক্ষিতেই এই শিল্প আন্দোলনের সৃষ্টি। যার উদ্দেশ্য ছিলো মানুষের মনে আঘাত দেওয়া। প্রচলিত নিয়মের বাইরে গিয়ে ব্যঙ্গচিত্র রচনা করে এই শিল্পীরা। মার্শেল দুশাঁ’কে দাদাইজমের জনক বলা হয়। যিনি শিল্পকর্ম হিসেবে চীনামাটির একটি প্রস্রাবাধার (ইউরিনাল) প্রদর্শনীতে পাঠান দাদাইজমের আদর্শভিত্তিক শিল্পকর্ম হিসেবে।

৫. আহমদ, কামাল (২০১২ : ১৬৩); শিল্পকলার ইতিহাস; বাংলা একাডেমি, ঢাকা।

৬. গ্রাহাম উইনব্রান, উদ্ধৃত; হাই, হাসনাত আবদুল (২০১৯ : ৪৮৬); শিল্পকলার নান্দনিকতা; আগামী প্রকাশনী, ঢাকা।

বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ২০তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২১ এ প্রকাশিত হয়েছে।

 

 

 

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন