Magic Lanthon

               

মাজিদ মিঠু

প্রকাশিত ২৭ অক্টোবর ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

‘লাস্ট ট্যাংগো ইন প্যারিস’

যৌনতার খোলসে আত্ম-নির্মাণ ও বিলীনের ‘নীতিবহির্ভূত’ পথ-পরিক্রমা

মাজিদ মিঠু


 

                                            মনে হয় অজস্র মৃত্যুরে

                                             পার হয়ে আসিলাম

                                             আজি নবপ্রভাতের শিখরচূড়ায়,

                                             রথের চঞ্চল বেগ হাওয়ায় উড়ায়

                                             আমার পুরানো নাম।

                                             ফিরিবার পথ নাহি;

                                             দূর হতে যদি দেখ চাহি

                                             পারিবে না চিনিতে আমায়।

                                             --রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 

ভূমিকা

সময়ের আবর্তে এ ধরায় শ্বাস গ্রহণ থেকে তা শেষবারের মতো ত্যাগ করা পর্যন্ত বহুমাত্রিক অথচ দ্বিমাত্রিক এক গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকে মানুষ। প্রকৃতির আর দশটা উপাদানের মতো মানুষের পরিবর্তন হতে থাকে। বদলে যায় শরীর, মন, বোধ, বুদ্ধি, চিন্তাধারা। তৈরি হয় ব্যক্তি পরিচয়। একসময় সেই ব্যক্তিমানুষ, সামাজিক মানুষ, জৈবিক মানুষ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হয়ে যায় পশ্চাদপদ, বৃদ্ধ, বিলীন। পুরনো সাহিত্য, দর্শন, জীবনাদর্শের মতো সেখান থেকে জন্ম নেয় নতুন মানুষ। তৈরি হয় নতুন শরীর, মন, বোধ, বুদ্ধি, চিন্তাধারা--নতুন পরিচয়। অন্যদিকে সময় নিজে হয় নবযৌবনা। প্রতিনিয়ত সে উৎপাদন করতে থাকে নবপ্রাণ, নবযৌবন, নব-মানব। যা কিনা আসে সেই হৃতযৌবনাদের কাছ থেকেই। আবার শুরু হয় সেই পরিচয় গড়ে তোলার সংগ্রাম। সামগ্রিকভাবে এ অবস্থা থেকে যেনো মুক্তি নেই মানুষের। আর এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে প্রকৃতিই যেনো যুক্ত করে যৌনতা। ধ্বংস থেকে সৃষ্টি সবকিছুই যেনো এক ‘ওয়ান আই জায়ান্ট’ যৌনতার খেলা। যৌনতা নিজেই এখানে একটি পরিচয়। তার নিজস্ব পরিচয় আছে, ভাষা, পক্ষ, অপর, ক্ষমতা, সমাজ আছে; আছে প্রেম, ঘৃণা, ভালোবাসা, বাস্তবতা--কী নেই তার। যেনো যৌনতাতেই আত্মনির্মাণ যৌনতাতেই বিলীন।


নারী, পুরুষ ও হিজড়া--মানুষ মাত্রই যৌন অনুভূতি এক স্বাভাবিক-প্রাকৃতিক বিষয়। কিন্তু মানব সভ্যতা যতোই আদিম সাম্যবাদ থেকে বেড়ে উঠেছে, ততোই গোষ্ঠী, পরিবার, বিয়ে, সমাজ, ধর্ম, রাষ্ট্র, কর্তৃত্ব, ক্ষমতা মানুষের যৌনতাকে বিভিন্ন ছকে ফেলে নিজ সুবিধা মতো সাজিয়েছে। যৌন ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে দাঁড় করিয়েছে যৌন অবদমনকে। মানুষের আত্ম, তার সমাজ, পরিচয় নির্ধারণে যৌনতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে তৈরি হয়েছে পরিবার, বিয়ের মতো সামাজিক প্রতিষ্ঠানের। যেখানে মানবশিশু মানুষ হিসেবে বেড়ে ওঠে না, তাকে বড়ো করা হয় সামাজিক রীতিনীতি অনুযায়ী। যার শুরু হয় বিভিন্ন সামাজিক, ধর্মীয় আইনকানুন, বিধিনিষেধ ঘেরা বিয়ে নামক আরেকটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। সামাজিক-ধর্মীয় প্রথা অনুযায়ী বিয়ে না হলে পরিবার গড়ে ওঠে না। আচারনিষ্ঠ পরিবার না থাকলে আদর্শ সমাজ হয় না। আর যেখানে আদর্শ সমাজ নেই, সেখানে কাম্য আদর্শ রাষ্ট্র থাকে না। তাই প্রতিনিয়ত একই সার্কেলে চলছে আদর্শ রাষ্ট্র গঠনে আদর্শ সমাজ, পরিবার, বিয়ের মতো প্রতিষ্ঠানের গঠন।


মানব সমাজের এই গঠন প্রক্রিয়া ধারায় আদিম সাম্যবাদ থেকে দাস, সামন্ততন্ত্র, পুঁজিবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্র--যতো সমাজের পরিবর্তন ঘটছে, সঙ্গে বদলে গেছে বিবাহ, পরিবার তথা মানুষের যৌনতা নিয়ন্ত্রণের ধ্যানধারণা। যার ওপর নির্ভর করে নির্মিত হচ্ছে মানুষের শৈশব থেকে বার্ধক্যের পথ-পরিক্রমা। যেটা সাদা চোখে ধরা পড়ে না।

১৪ অক্টোবর ১৯৭২। নিউ ইয়র্ক ফিল্ম ফেস্টিভালের রাত। সে রাতে চলচ্চিত্রের দর্শক, চলচ্চিত্রবোদ্ধা, তাত্ত্বিক নতুন করে দেখলো যৌনতার খোলসে আত্ম-নির্মাণ ও বিলীনের সেই পথ-পরিক্রমা। বিয়ে, পরিবারের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলে! দেখালো সমাজ, ধর্ম, রাষ্ট্রের এই পুত-পবিত্র সংস্থাগুলো কীভাবে বিষিয়ে তুলতে পারে মানুষের জীবন। ইতালির নির্মাতা বার্নাদো বার্তোলুচি’র লাস্ট ট্যাংগো ইন প্যারিস নিমিষেই তৈরি করে তুমুল তর্ক-বিতর্ক। সমালোচনার ঝড় সঙ্গে প্রশংসার বর্ষণও। এরপর সময় যতো গড়াতে থাকে ততোই যেনো পরিপক্ক হতে থাকে বার্তোলুচির লাস্ট ট্যাংগো ইন প্যারিস। ৪৭ বছর পর এসেও চলচ্চিত্রটি যেনো আরো প্রাসঙ্গিক। চলচ্চিত্রটি তবে কী দেখালো? কেনো এতো সমালোচনা, এতো প্রশংসা! শুধু কী যৌনতা!


লাস্ট ট্যাংগো ইন প্যারিস-এর মানুষেরা

দুই ঘণ্টা ১০ মিনিট ব্যাপ্তির লাস্ট ট্যাংগো ইন প্যারিস এগিয়েছে মধ্যবয়স্ক প্রায় বিকারগ্রস্ত একজন মানুষের বাস্তবতা থেকে পালিয়ে বাঁচার গল্পকে ঘিরে। যে হঠাৎ করেই ফাঁকা একটি ফ্ল্যাটে যৌন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন তার থেকে অর্ধেকেরও কমবয়সি এক তরুণীর সঙ্গে। মার্লোন ব্র্যান্ডো অভিনীত পল নামের চরিত্রকে ঘিরেই বার্তোলুচির গল্প বলে যাওয়া। চলচ্চিত্রের ২০ মিনিট ৫০ সেকেন্ডে হোটেল পরিচারিকার মুখে পুলিশের বর্ণনায় পলের অতীত পরিচয় পাওয়া যায় কিছুটা। পুলিশের তথ্যমতে, পল জীবনের কোনোকিছুতেই কখনো স্থির থাকতে পারেননি। পলের জন্ম আমেরিকায়। জীবন শুরু বক্সার হিসেবে। তাতে ব্যর্থ হয়ে অভিনয় শুরু করেন। পরে কাজ করেন কিউবায় বাদ্যযন্ত্র বঙ্গ বাদক হিসেবেও। এরপর দক্ষিণ আমেরিকায় বিপ্লবীদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। জাপানে গিয়ে যুক্ত হন সাংবাদিকতায়। প্রথমে তিনি প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত ফ্রান্স অধিভুক্ত দ্বীপ তাহিতিতে যান। সেখান থেকে প্যারিসে। সেখানেই রোসা নামে এক নারীর সঙ্গে পরিচয়। পৈত্রিক সূত্রে রোসা হোটেল ব্যবসায়ী। রোসাকে বিয়ে করে ফ্রান্সে থিতু হন পল। একদিন রোসাও আত্মহত্যা করেন। পল কিছুতেই খুঁজে পান না রোসা তার সঙ্গে এমন কেনো করলেন!


বাকিটুকু চলচ্চিত্রের ৪৬ মিনিট ৪০ সেকেন্ডে পলের মুখেই শোনা যায়, ছোটো একটি শহরে কৃষি ফার্মে বাস করতো আমার পরিবার। বাবা ছিলেন মাতাল ও পরনারী আসক্ত। আর মা ছিলেন কবি তবে মদ্যপ। আমি যখন খুব ছোটো, তখন মা একবার নগ্ন অবস্থায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। বেশিরভাগ সময়ই এমন হয়েছে আমি স্কুল থেকে ফিরে দেখতাম মা হাজতে। আসলে ছোটোবেলার কোনো ভালো, মধুর স্মৃতি আমার মনে পড়ে না। এমন এক বিমর্ষ শৈশব, স্ত্রীর আত্মহত্যা আর জীবনের প্রতিটি ধাপে ব্যর্থতার তীব্র যন্ত্রণা থেকে রক্ষা পেতে সবকিছু ভুলে যেতে চান পল। অস্বীকার করেন প্রচলিত সমাজ, রাষ্ট্র, ধর্ম সবকিছুকে। ভুলে যেতে চান অতীত, এমনকি নিজের নামও। তাই হঠাৎ খুঁজে পাওয়া ওই ফ্ল্যাটের বাইরের দুনিয়াকে অস্বীকার করতে চান পল।


ইংরেজি ও ফরাসি ভাষার মিশ্রণে নির্মিত এ চলচ্চিত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র মারিয়া স্নাইদার অভিনীত জেন চরিত্রটি। ফাঁকা ফ্ল্যাটে প্রথম দেখাতে যৌনতায় জড়িয়ে পড়া জেন, পলের ঠিক উল্টো। জেন সেনা কর্মকর্তা বাবার একমাত্র মেয়ে। তার সবচেয়ে প্রিয় সময় শৈশব। আর যৌবনে দেখা হয় টম-এর সঙ্গে। জেনের বাগদত্তা টম বিভোর চলচ্চিত্র নির্মাণ নিয়ে। তিনি জেনকে ঘিরেই তৈরি করতে চান তার প্রথম মাস্টারপিস। চলতে থাকে চলচ্চিত্রের ভিতরেই আরেক চলচ্চিত্র নির্মাণের কর্মযজ্ঞ। টম চলচ্চিত্রে তুলে আনতে থাকেন জেনের শৈশব, কৈশোর, যৌবন। এ যেনো নতুন করে অতীতকে ফিরে দেখা। জেনের এটা ভালো লাগে। শৈশবের স্মৃতি রোমন্থন করতেও ভালোবাসেন তিনি। পলের সঙ্গে যখন তার ফ্ল্যাটে দেখা হয়, তখন নিজের পরিচয় দিতে তিনি কুণ্ঠাবোধ করেন না। তবে তা মেনে নিতে পারেন না পল। তিনি জেনকে বার বার চুপ করিয়ে দেন। তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করেন নিজের এমনকি জেনের পরিচয় প্রকাশ করাকে।


চলচ্চিত্রের আরেক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র রোসা--পলের স্ত্রী। চলচ্চিত্রে যাকে মৃত অবস্থায় খাটিয়ায় শোয়ানো ছাড়া আর কোনো দৃশ্যে দেখা যায় না। রোসাদের সেই হোটেলেই থাকতো পল-রোসা। তাদের দাম্পত্য সম্পর্ক কেমন ছিলো পল তা ব্যাখ্যা করতে পারেন না। চলচ্চিত্রের এক ঘণ্টা ৩৬ মিনিটে দেখা যায়, বিছানায় নানা রঙের ফুলের মাঝে রোসার সাজানো মৃতদেহ। মৃতদেহের সামনে বসে পল বলতে থাকেন, একজন স্বামী যদি দুইশো বছরও বাঁচে তবুও সে স্ত্রীর আসল পরিচয় উদ্ধার করতে পারবে না। আমি হয়তো গোটা বিশ্বকেই ব্যাখ্যা করতে পারবো, কিন্তু তোমার ভিতরের সত্য আমি কখনোই আবিষ্কার করতে পারবো না। কেননা পল জানতে পেরেছেন, হোটেলেরই এক অতিথি মার্সেল এর সঙ্গে রোসার সম্পর্ক ছিলো। পল এই ঘটনায় দিশেহারা হয়ে যান। তিনি কোনোভাবেই খুঁজে পান না রোসার আত্মহত্যার কারণ। কেননা তিনি স্ত্রীকে ভালোবাসতেন; বিনিময়ে পেয়েছেন শুধুই অবিশ্বাস। এর মানে, অনেক পথ পেরিয়ে পল এমন একটি জীবন, একটি পরিবার চেয়েছেন, যা সমাজের চোখে স্বাভাবিক; যেখানে তিনি সুখী হতে পারেন। যা তিনি পাননি। তবে কি বার্তোলুচি এমন এক মানুষের কথা তুলে ধরেছেন, যিনি শৈশব, কৈশোর, যৌবন কোথাও স্বাভাবিক সম্পর্ক জালে জড়াতে পারেননি।


রোসার মা মেয়ের মৃত্যু সংবাদে হোটেলে আসেন। চলচ্চিত্রের ২৯ মিনিটে দেখা যায়, রোসার মার বিশ্বাস তিনি এমন কিছু খুঁজে পাবেন, যা দিয়ে রোসার আত্মহত্যার কারণ জানতে পারবেন। একপর্যায়ে রোসার মা মেয়ের সৎকার নিয়ে কথা বললে, পল ক্ষেপে গিয়ে বলেন, এমন ঈশ্বরে কে বিশ্বাস রাখে; ধর্ম তো আত্মহত্যা করতে বলে না, চার্চ তো বলে না। তারপরও মা চান পরিপূর্ণ ধর্মীয় আচার মেনে মেয়ের শেষযাত্রা হোক। কিন্তু পল তা মেনে নিতে পারেন না। তার জীবনে ঘটে যাওয়া এসব ঘটনায় ঈশ্বর, চার্চ, ধর্মযাজকের প্রতি তার বিশ্বাস যেনো উবে গেছে!


টম, জেনের সঙ্গে যার বিয়ের কথা। তিনি একটি টিভি চ্যানেলে এক তরুণীর জীবন নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের কাজ পান। জেনকে ঘিরেই তিনি নির্মাণ করতে চান সেই চলচ্চিত্র।


এই চরিত্রগুলোর পাশাপাশি বিচরণে যখন লাস্ট ট্যাংগো ইন প্যারিস-এর গল্প এগিয়ে যায়, তখন মাঝবয়স পেরুনো ব্যর্থ মানুষ পলকে দেখা যায়--পরিবার, বিয়ে, স্ত্রী, ভালোবাসা--কোথাও তিনি তৃপ্ত নন। সমাজ, রাষ্ট্র, ধর্ম তাকে সুখী করতে পারেনি। তাই হয়তো হঠাৎ খুঁজে পাওয়া এক তরুণীর সঙ্গে কেবল যৌন সম্পর্ককে আশ্রয় করে তিনি সুখ খুঁজে পেতে চান। এর বাইরের যে জগৎ, সমাজ এমনকি আত্মপরিচয়কেও তিনি অস্বীকার করেন। কোনোকিছুই তার কাছে আর অর্থ বহন করে না। এই পরিস্থিতিতে জেনের ভালোবাসায় বদলে যান পল। হঠাৎ একদিন তিনি উধাও হন। পলের বিরহে জেন ভেঙ্গে পড়েন; ফিরে যান বাগদত্তা টমের কাছে। কিছুদিন পর পল ফিরে আসেন। তিনি আবার নতুন করে সব শুরু করতে চান--তার উত্তরাধিকার হবে, গড়ে উঠবে আত্মপরিচয়। কিন্তু চাইলেই তো ফিরে আসা সহজ নয়। এটা তো একক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে না। শেষ পর্যন্ত জেনের হাতেই জীবন দিতে হয় পলকে। ফিরে আসা হয় না প্রচলিত সমাজে। জেনের কাছে পল প্রথম দিন যেমন অপরিচিত ছিলেন, শেষে জেন তাকে সেভাবেই ফিরিয়ে দেন। এভাবেই শেষ হয় লাস্ট ট্যাংগো ইন প্যারিস। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, মানুষের জীবনে তবে বিয়ে, পরিবার, ভালোবাসার মতো প্রচলিত ধারণাগুলোর অবস্থান কোথায়?


আত্মপরিচয়ে সঙ্কট ও অন্যান্য

লাস্ট ট্যাংগো ইন প্যারিস-এ বার্তোলুচি দেখিয়েছেন সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিবারের ব্যর্থতা একজন মানুষকে কীভাবে অন্য মানুষ করে তোলে। পুঁজিবাদি সমাজব্যবস্থায় যখন বলা হয়, ব্যক্তি স্বাধীনতা সবার ঊর্ধ্বে তখন একজন ব্যক্তিমানুষ গড়ে তুলতে প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিবারের অবস্থান স্বীকৃতি আর অস্বীকৃতির মাঝখানে দাঁড়িয়ে যায়।


... পরিবার হচ্ছে মানুষের একটি ঐতিহাসিক সামাজিক সংস্থা। এর বৈশিষ্ট্য নির্দিষ্ট হয় মানুষের জৈবিক প্রয়োজন, অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং তার নৈতিক ও মানসিক ধ্যান-ধারণা দ্বারা। মানুষের সামাজিক সংস্থাসমূহের মধ্যে প্রাচীনতম হলেও মানুষের জীবনের আদিতে পরিবারের অস্তিত্ব ছিল না। ... স্বচ্ছন্দ জীবনের জন্য যৌন সম্পর্ক ছাড়া জীবিকার উপায় এবং সম্পত্তির উপর অধিকারের ধারাবাহিকতার প্রয়োজনও মানুষ অনুভব করতে শুরু করেছে। এই প্রয়োজন সাধনের জন্যই প্রথম পরিবারের উদ্ভব ঘটে। ... পুঁজিতান্ত্রিক সমাজেও পরিবারের মূল বৈশিষ্ট্য নির্দিষ্ট হয় ব্যক্তিগত সম্পত্তির স্বার্থ দ্বারা। নারী-পুরুষের সম্পর্কের নিয়ামকও ব্যক্তিগত সম্পত্তি।১


যদিও একদিকে মানুষ হিসেবে নারী ও পুরুষের ব্যক্তিস্বাধীনতা; অন্যদিকে পরিবার তথা একসঙ্গে থাকা-খাওয়া, সন্তান উৎপাদন, লালনপালন, সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া, যৌনাচরণ নির্ধারণের মতো বিষয়গুলো যুক্ত থাকে। আর এইসব কর্মযজ্ঞ পরিচালনায় প্রয়োজন হয় অর্থ-সম্পদের। পুরুষ যদি এক্ষেত্রে একাই অর্থের যোগানদাতা হয় তবে পরিবারের ধরন, রীতিনীতি, পরিচালনা হয় এক ধরনের। আর নারী-পুরুষ উভয়ে যদি অর্থের উৎস হয়, তখন তা অন্য ধরনের হয়। এক্ষেত্রে পরিবারে কর্তৃত্ব তথা আধিপত্যের ধরনেও আসে পরিবর্তন। তার সঙ্গে নারী-পুরুষের ব্যক্তিস্বাধীনতার চর্চা যদি সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তখন পরিবারের যে সন্তান বা উত্তরাধিকার আসে তাদের জীবনে এর প্রভাব পড়ে।


লাস্ট ট্যাংগো ইন প্যারিস-এ এমন দুই ধরনের পরিবার থেকে বেড়ে ওঠা দুজন মানুষের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়। জেনের বেড়ে ওঠা এমন এক পরিবারে যেখানে তার শৈশব কৈশোর কেটেছে প্রথাগত পারিবারিক পরিবেশে মা-বাবার আদর-যত্নে। খেলাধুলার সঙ্গী এমনকি জীবনের প্রথম ভালোবাসাও তিনি পারিবারিক আবহেই পেয়েছেন। পড়ালেখা, নাচগান শেখার পাশাপাশি তার ছিলো নিজের পছন্দের সবকিছুর সমাহার। চলচ্চিত্রের ৩৭ মিনিট থেকে ৪৪ মিনিট ৫০ সেকেন্ড পর্যন্ত টমের নির্মিত চলচ্চিত্রের দৃশ্যধারণের মাধ্যমে যা তুলে ধরেছেন বার্তোলুচি। জেনের মা, কর্নেল বাবার মৃত্যুর দীর্ঘদিন পরও তার স্মৃতি আঁকড়ে ধরে আছেন। চলচ্চিত্রের এক ঘণ্টা ২২ মিনিট ২০ সেকেন্ড থেকে এক ঘণ্টা ২৪ মিনিট ১০ সেকেন্ড পর্যন্ত জেন ও তার মায়ের আলাপচারিতায় জানা যায়, গ্রামের বাড়িতে তাদের পারিবারিক জাদুঘরও তৈরি হচ্ছে। জেনের মা স্বামীর সব স্মৃতি আগলে রাখছেন সযতনে। জাদুঘরে সবকিছু পাঠিয়ে দিলেও তিনি সেনা কর্মকর্তা স্বামীর জুতোজোড়া রেখে দিতে চান নিজের কাছেই। আর জেন রেখে দেন বাবার আগ্নেয়াস্ত্রটি। অর্থাৎ জেন যে পরিবারে বেড়ে উঠেছেন তাতে তার প্রাপ্তি অঢেল।


অন্যদিকে পলের সঙ্গে জেন এসব স্মৃতি ভাগ করতে চাইলে, পল তা তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। তার কাছে এসবের কোনো অর্থ নেই। পরিবার থেকে জেনের একটি আত্মপরিচয় গড়ে উঠলেও পলের তা গড়ে ওঠেনি। পলের শৈশবে কোনো সুখস্মৃতিই নেই। এমনকি মধ্যবয়স পেরুনো পল তার স্থির কোনো আত্মপরিচয়ও নির্ধারণ করতে পারেননি। তাই যখন জেনকে ফাঁকা ফ্ল্যাটে পান, একমাত্র যৌনতা ছাড়া আর সবকিছু তিনি অস্বীকার করেন। চলচ্চিত্রের এক ঘণ্টা তিন মিনিটের একটি দৃশ্যে জেন যখন পলকে প্রশ্ন করেন, এই অ্যাপার্টমেন্টে আমি কী করছি তোমার সঙ্গে? এটা কি ভালোবাসা? পল সেই পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করেন, মনে করো আমরা এখানে উড়তে এসেছি। এখানে আমরা শুধুই যৌনমিলন করতে আসি। জেন তখন প্রশ্ন করেন, তো তুমি মনে করো আমি যৌনকর্মী? পল বলেন, না, তুমি যৌনকর্মী নও। তুমি একজন ওল্ড ফ্যাশন নারী, যে আমার সঙ্গে থাকার চেষ্টা করছে। জেন বলেন, এর চেয়ে বরং আমি যৌনকর্মী হতেই বেশি পছন্দ করবো। জেন এ সময় পলের পরিচয় জানতে চাইলে পুরুষাঙ্গের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, যদি তুমি আমাকে খুব কাছে থেকে দেখো, তবে আমাকে আমার প্যান্টের জিপারের ভিতরেই লুকোনো দেখতে পাবে। অর্থাৎ সেই অ্যাপার্টমেন্টে যৌনতার বাইরে কিছুই রাখতে চান না পল। না আত্মপরিচয়, না বাইরের পৃথিবীর কোনোকিছু।


তাছাড়া পারিবারিক স্মৃতির প্রতিও কোনো শ্রদ্ধাবোধ নেই পলের। চলচ্চিত্রের এক ঘণ্টা ১৪ মিনিটে ফ্ল্যাটে আসেন জেন। যেখানে পল আগে থেকেই ছিলেন। একপর্যায়ে জেন ফ্ল্যাটের মেঝেতে হাত দিয়ে টোকা দিতে দিতে বলেন, দেখেছো নিচে খালি জায়গা আছে। পল বলেন, হ্যাঁ, ওটা লুকোনোর জায়গা। এরপর তিনি হামাগুড়ি দিয়ে জেনের কাছে গিয়ে মেঝের সেই ফাঁপা জায়গা খুলতে চান। জেন বাধা দেন, ওটা খুলো না। সেখানে রত্ন থাকতে পারে, সোনাও থাকতে পারে বলেন পল। পরে জেনকে জিজ্ঞেস করেন, তুমি কি ভয় পাচ্ছো? প্রত্যুত্তরে জেন বলেন, না। পল তখন জেনের দুই পা ধরে নিজের দিকে টেনে নিতে নিতে বলেন, তুমি সবসময় ভয়ের মধ্যেই থাকো। এরপর জেনকে উপুড় করে শুইয়ে দেন পল। জেন তখন বলেন, ওখানে বাড়ির মালিকের পারিবারিক গোপনীয় কিছু থাকতে পারে। এটা শোনার পর পলের ভিতরে যেনো কিছু একটা হয়।


এরপর পিছন থেকে এক টানে জেনের প্যান্ট খুলে ফেলেন পল। বলতে থাকেন, পারিবারিক গোপনীয়তা কী, তা আমি তোমাকে দেখাচ্ছি। এই বলে ফ্রিজে থাকা মাখনের টুকরো থেকে কিছু মাখন নিয়ে তিনি জেনের যৌনাঙ্গে লাগান, আর বলতে থাকেন, পরিবার সম্পর্কে বলছি তোমাকে। বার্তোলুচি এখানে পলের মুখে পরিবারের এক ভয়াবহ দিকের সংজ্ঞায়ন ঘটান। পল বলতে থাকেন, পরিবার একটি পবিত্র প্রতিষ্ঠান, যা অসভ্যদের মধ্যে পুণ্য অর্জনের জন্য ব্যবহৃত হয়। এরপর তিনি জেনকে বলতে বাধ্য করেন, ‘পরিবার হলো ভালো নাগরিকদের জন্য গির্জা স্বরূপ। যেখানে শিশুরা ততোক্ষণ নির্যাতিত হয়, যতোক্ষণ না তারা প্রথম মিথ্যা বলা শুরু করে। যেখানে শিশুরা দমন পীড়নের কারণে একেবারে ভেঙ্গে পড়ে, যেখানে অহংবোধের মাধ্যমে স্বাধীনতা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। সেটাই পরিবার। সেটাই ফাকিং পরিবার।’ এক ঘণ্টা ১৬ মিনিট ৩৭ সেকেন্ড থেকে এক ঘণ্টা ১৯ মিনিট ১০ সেকেন্ডের এই দৃশ্যে পুরোটা সময় জেনকে মেঝেতে উপুড় করে শুইয়ে পিছন থেকে ধর্ষণ করতে থাকেন পল। পুরোটা সময় জেন এটা আওড়াতে থাকে আর ব্যথায় কোঁকড়াতে কোঁকড়াতে বলতে থাকেন, না না।


ধর্ষণের এ দৃশ্যের মাধ্যমে বার্তোলুচি হয়তো দেখান, পরিবার নিয়ে জেনের যে বোঝাপড়া তা ধ্বংস করে দিচ্ছেন পল। কেননা ধর্ষণে শুধু শারীরিক ক্ষতিই হয় না বরং ব্যক্তির আত্ম ধ্বংস হয়ে যায়। যেমনটি ঘটেছে পলের নিজের জীবনেও। তিনি এক ভঙ্গুর পরিবারে বেড়ে উঠেছেন। যখন নিজের পরিবার গুছিয়েছেন সেখান থেকেও পেয়েছেন বড়ো ধাক্কা। যা পলের আত্মকে ধর্ষণের মতোই দুমড়ে-মুচড়ে দিয়েছে। পলের কাছে পরিবার যেনো ধর্ষণ যন্ত্রণারই আরেক নাম।


এরপর কাট-টু-কাট শটে দেখা যায়, পল ও জেন মেঝেতে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে। আর ট্রেন ছুটে চলেছে, প্রথমে একটা; তারপর একই সঙ্গে দুটো। তবে দুটো দুই গন্তব্যের ট্রেন। পরের দৃশ্যে দেখা যায়, জেন রেকর্ড প্লেয়ারে গান বাজাতে গিয়ে শক খান। তিনি পলকে ডেকে বলেন, তোমার জন্য সারপ্রাইজ আছে। এরপর রেকর্ড প্লেয়ারের প্লাগ লাগাতে গিয়ে পলও শক খান। জেনের দিকে তাকিয়ে বলেন, মজা পেয়েছো? বার্তোলুচি হয়তো দেখাতে চেয়েছেন, বর্তমান সমাজব্যবস্থায় পরিবারের হাতে ধর্ষণের শিকার হয়ে সাধারণ মানুষের আর তেমন কিছুই করার থাকে না। প্রথাগত পরিবার আমাদের সঙ্গে যা করছে তা ধর্ষণের মতো প্রচণ্ড বেদনাদায়ক, অপমানজনক; বিনিময়ে কেবল মানুষ হালকা শক দিতে পারে; এর বেশি কিছু না। কেননা,


এই সমাজে সহিংসতা বৈধ। বলপ্রয়োগই রাষ্ট্রের অস্তিত্বের যুক্তি। পরিবার থেকে প্রশাসন পর্যন্ত যাবতীয় প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি বলপ্রয়োগ। বলপ্রয়োগ ও প্রতিশোধ গ্রহণ খোদ আইন-আদালত-বিচারব্যবস্থার সর্বসম্মত ভিত্তি। ... ধর্ষণ জিনিসটা তাই আইনের শাসনের নিছক একটি বিজ্ঞাপন বা প্রকাশ। আইনের শাসনের মুলনীতি বলপ্রয়োগ; আর ধর্ষণের মূলনীতি বলাৎকার। এইটুকুই যা পার্থক্য। আসলে ঐটুকুই তো মিল। অভিধান ও অর্থতত্ত্ব বলছে, বলপ্রয়োগ আর বলাৎকার আদতে একই বস্তু।২


পরের দৃশ্যে রেকর্ড প্লেয়ারে গান বাজতে থাকে, জেন চোখ বন্ধ করে মাথা-শরীর দুলিয়ে গানের সুরে যেনো পালাতে চায় অন্য কোথাও।


একটি ধর্ষণ দৃশ্য এবং একটি প্রশ্ন

লাস্ট ট্যাংগো ইন প্যারিস-এর অন্যতম আলোচিত এবং সমালোচিত দৃশ্যপট হলো ধর্ষণ। এক ঘণ্টা ১৬ মিনিট ৩৭ সেকেন্ড থেকে এক ঘণ্টা ১৯ মিনিট ১০ সেকেন্ড ব্যাপ্তির এ ধর্ষণ দৃশ্যের প্রভাব চলচ্চিত্র ছাড়িয়ে প্রভাব বিস্তার করে জেন চরিত্রে অভিনয় করা মারিয়া স্নাইদারের ব্যক্তিগত জীবনেও। লাস্ট ট্যাংগো ইন প্যারিস-এর আলোচনা যেখানেই হয়েছে, সেখানেই ঘুরেফিরে এসেছে এই দৃশ্যের আলোচনা। কেননা, ধর্ষণ দৃশ্যের চিত্রায়ণে মারিয়া স্নাইদারের অনুমতি ছাড়াই পিচ্ছিলকারী পদার্থ হিসেবে মাখন ব্যবহার করা হয়। দৃশ্যধারণের আগে যা জানতেন কেবল বার্তোলুচি নিজে এবং পল চরিত্রের মার্লোন ব্র্যান্ডো। ২০১১ খ্রিস্টাব্দে মারিয়া স্নাইদার মারা যান। এর আগে ২০০৭-এ দৃশ্যটি সম্পর্কে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,


মার্লোন আমাকে বলতো যে, মারিয়া এ দৃশ্য নিয়ে চিন্তা করো না। এটি তো কেবল চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্য। কিন্তু সেই দৃশ্য ধারণ করার সময়, যদিও মার্লোন এবং আমি দৃশ্যের মধ্যে যা করছিলাম তা সত্য ছিলো না, কেবল ভান ছিলো। তারপরও সত্যি সত্যিই আমি প্রচণ্ড অপমানবোধ করেছিলাম এবং সত্যি সত্যিই কেঁদে ফেলেছিলাম। এবং সত্যি বলতে কি আমার মনে হয়েছিলো মার্লোন ও বার্তোলুচি দুজনের দ্বারাই আমি কিছু মাত্রায় ধর্ষিত হয়েছিলাম।৩


এর উত্তরে মারিয়া স্নাইদারের মৃত্যুর পর ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বার্তোলুচি বলেছিলেন,


ধর্ষণের কথা স্ক্রিপ্টে লেখা ছিলো। কিন্তু সেটি কীভাবে হবে তা পরে সেটে গিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। আমি চেয়েছিলাম এমনভাবে ধর্ষণের দৃশ্যটি ধারণ করতে যেনো মারিয়ার কাছে তা খুবই ভয়াবহ মনে হয়। এ দৃশ্যে আমি অভিনেত্রী হিসেবে মারিয়ার অনুভূতি তুলে ধরতে চাইনি। আমি চেয়েছিলাম, একজন নারী হিসেবেই যেনো মারিয়ার কাছে সেই অনুভূতি পাই। সত্যি বলতে কি, আমি মনে করি, আমি অপরাধ করেছি, কিন্তু সেটা নিয়ে আমার কোনো অনুশোচনা নেই।৪


ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার আগে মারিয়া আরো বলেন, ‘তার প্রথম চলচ্চিত্রে তার সঙ্গে এমন একটি দৃশ্য করার জন্য বার্তোলুচি কখনো ক্ষমা চাননি। আরো বলেন, স্ক্রিপ্টে নেই অথচ এমন একটি অপমানজনক দৃশ্য আমাকে দিয়ে জোর করে করিয়ে নেওয়া হয়েছিলো। যদি আমি আমার অধিকার সম্পর্কে তখন সচেতন থাকতাম তবে অবশ্যই আমি আমার এজেন্ট বা আইনজীবীকে সেটে ডেকে পাঠাতাম।’৫


বাস্তবেও নারীরা প্রতিনিয়ত এভাবেই ধর্ষণের শিকার হয়। তাই তো গণমাধ্যমে এখন মি-টু আন্দোলনে নামতে হচ্ছে নারীকে। পুরুষ প্রাধান্যশীল সমাজে শিশু থেকে শতোর্ধ্ব বৃদ্ধা, এমনকি মৃত নারীও বাদ পড়ছে না ধর্ষণের কবল থেকে। এমনকি বাবার দ্বারা মেয়ের ধর্ষণের ঘটনাও ঘটছে। তাহলে প্রশ্ন পরিবার, বিয়ে, ধর্ম, রাষ্ট্র যৌনতাকে কীভাবে দেখছে? ধর্ষণ কি শুধুই যৌন নিপীড়ন। নাকি পুরুষ প্রাধান্যশীল সমাজে পুরুষের পৌরুষ, আধিপত্য ক্ষমতা প্রদর্শনেরও মাধ্যম।

‘যেহেতু ঘটনাটা বলপ্রয়োগের, আধিপত্যের--টার্গেট সবসময়ই তাই দুর্বল সত্তা। টার্গেট তাই নারী, বৃদ্ধ, বালক, শিশু, গরিব, প্রান্তিক জনজাতি ইত্যাদি। পুরুষ-শিশুও ধর্ষণ এবং সহিংস যৌন নিপীড়ন থেকে রেহাই পায় না। বাসায় না, স্কুলে না, স্কাউট ক্যাম্পে না, ছাত্রাবাসে না, মক্তবে না, মাদ্রাসায় না, এমনকি মসজিদেও না।’৬



যৌন সুখের চেয়ে ধর্ষণের সম্পর্ক মূলত কর্তৃত্ব ফলানোর সঙ্গে। দুর্বলের ওপর সবলের, ক্ষমতাহীনের ওপর ক্ষমতাশালীর। তাই এটিকে সামাজিক ব্যাধি হিসেবে চিহ্নিত না করে বরং ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের বাহন হিসেবে চিহ্নিত করাই শ্রেয়। মুম্বাইয়ে অভয়া ধর্ষণের ঘটনায় দেখা গেছে, ধর্ষকদের উদ্দেশ্য ছিলো ধর্ষণ করে নারী জাতিকে সচেতন করা যে, বেশি রাতে বাড়ির বাইরে থাকতে নেই। কিশোরগঞ্জে যাত্রীবাহী বাসে নার্সকে ধর্ষণের পর হত্যা, তারও আগে টাঙ্গাইলের মধুপুরে বাসে ধর্ষণ করে ঘাড় মটকে শিক্ষার্থীকে হত্যা এবং খোদ ক্যান্টনমেন্টের ভিতরে তনু হত্যা। এমন হাজারো ঘটনার পিছনে দেখলে অন্যান্য অনেক কারণের মধ্যে প্রথম সারিতেই থাকে এই ক্ষমতা বা আধিপত্য। সেটি হোক সমগ্র নারী জাতির ওপর বা একক নারী সত্তার ওপর। আর এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্র, পরিবারের মতো সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যর্থতা সময়ের সঙ্গে আরো উৎকট আকার ধারণ করছে।


দেখা যাচ্ছে চলচ্চিত্রের ফ্রেমের বাইরের যে জীবন তার সঙ্গে ফ্রেমের ভিতরের জীবনের কোনো পার্থক্য নেই। লাস্ট ট্যাংগো ইন প্যারিস-এর এক ঘণ্টা সাত মিনিটের একটি দৃশ্যে টম আর জেনের কথায় ফুটে ওঠে ধর্ষণ আর আধিপত্যের সম্পর্ক। দেখা যায়, ট্রেন স্টেশনে জেনকে টম খুঁজতে থাকেন, দেখা পেলে জেনের কাছে জানতে চান, ফোনে কথা বলোনি কেনো? কী হয়েছে? জেন বলেন, তোমার চলচ্চিত্রের জন্য তুমি অন্য কাউকে খুঁজে নাও। টম জানতে চান কেনো? জেন বলেন, ‘তুমি আমার সুযোগ নিচ্ছো, আমি যা আগে কখনোই করিনি তুমি তা আমাকে দিয়ে করিয়ে নিচ্ছো। তুমি আমার সময় নষ্ট করছো, আমাকে দিয়ে তোমার ইচ্ছেমতো যা খুশি করিয়ে নিচ্ছো। এ চলচ্চিত্র এখানেই শেষ।’ এরপর রাগের মাথায় চিৎকার করে জেন বলতে থাকেন, ধর্ষিত হতে হতে আমি ক্লান্ত। স্টেশনেই টমের সঙ্গে তিনি হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েন; একপর্যায়ে দুজনই একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে বসে পড়ে। পুরোটা সময় ক্যামেরা আর জেনের মাঝ দিয়ে তিনটি ট্রেন পার হয়ে যায়। ট্রেন যদি গতির প্রতীক হয়, তবে বলতে হয় জেনের পরিবর্তন ঘটছে। তিনি সচেতন হয়ে উঠছেন নিজের অধিকার, আত্মমর্যাদা সম্পর্কে। আর এই আত্মমর্যাদার যেকোনো ধরনের বিনাশই ধর্ষণ।


বার্তোলুচি যেমন মারিয়ার কাছে ক্ষমা চাননি, তেমনই আজ পর্যন্ত কোনো ধর্ষকও ক্ষমা চায়নি। ক্ষমতা আর আধিপত্যের জোর এখানেই। আর যারা দুর্বল, যারা ক্ষমতাহীন, যাদের আত্মমর্যাদা রক্ষার ক্ষমতা গড়ে ওঠে না বা গড়ে তোলা হয় না; তাদের সামনে ধর্ষণের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার আর কোনো পথ খোলা আছে কি প্রচলিত গোটা ব্যবস্থার পরিবর্তন ছাড়া?


তবে কি ভালোবাসা, বিয়ে বিজ্ঞাপনের পোস্টার!

লাস্ট ট্যাংগো ইন প্যারিস-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হলো মানবীয় সম্পর্কে ভালোবাসা আর বিয়ের অবস্থান। আর এ দুইয়ের মধ্যেও রয়েছে ব্যক্তির আত্ম ও অপর সম্পর্কের দ্বন্দ্ব; আছে ক্ষমতা, আধিপত্য ও অর্থনৈতিক লেনদেনের দায়-দরবার। কেননা,


বৈষম্য না টিঁকলে কর্তৃত্বতন্ত্রও টেকে না। সব কিছু ভেঙে পড়ে। তাই মালিকের সন্তান যে মালিকেরই, প্রমাণ সহকারে তা চিনতে পারার জন্য বিবাহ বা ‘বিশেষভাবে বহনীয়’ চুক্তির মাধ্যমে নারীকে বন্দি বা নজরবন্দি করে রাখতে হয়। এ ছাড়া উত্তরাধিকারের উপায় নেই। এ ছাড়া বিবাহেরও অর্থ নেই। বিবাহ আসলে একটি রাষ্ট্রীয়, রাজনৈতিক ও আইনগত সম্পর্কচুক্তি যা দিয়ে সম্পদের ব্যক্তি-মালিকানা, যাবতীয় বৈষম্য এবং কর্তৃত্বতন্ত্রকে টিঁকিয়ে রাখা যায়। ... বিবাহ-বিভাজন আছে বলেই ধর্ষণ এবং দাম্পত্য-সহিংসতা আদৌ সম্ভব হয়ে ওঠে।৭


এদিকে সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিবার গঠনের মূলমন্ত্রও এই বিয়ে। বিশুদ্ধ উত্তরাধিকার নির্মাণের প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিয়ে তাই নির্ধারণ করে বিশুদ্ধ যৌন সম্পর্ক। লাস্ট ট্যাংগো ইন প্যারিস-এ পলের জীবনের যাবতীয় কষ্ট, রাগ ঘৃণা তখনই দরজা ভেঙ্গে বেরিয়ে আসে, যখন তার স্ত্রী রোসা আত্মহত্যা করেন। তিনি জানতে পারেন তার স্ত্রীর অন্য প্রণয়ের কথা। তবে যে বিষয়টি পলকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয় তা হলো, তার স্ত্রীর সম্পর্কে না জানা। তিনি না জানেন রোসার অবৈধ প্রণয়ের কারণ, না জানেন আত্মহত্যার কারণ। তিনি স্ত্রীকে ভালোবেসেছেন, বিনিময়ে পেয়েছেন অবিশ্বাস আর একরাশ অজ্ঞানতা।


অন্যদিকে ২০ বছর বয়সি জেনের জীবন কেবল শুরু হতে যাচ্ছে। চলচ্চিত্রের এক ঘণ্টা ২১ মিনিটের একটি দৃশ্যে দেখা যায়, টমের কাঁধে মাথা রেখে বসে আছেন জেন। জেনকে টম জানান, এক সপ্তাহের মধ্যে তিনি বিয়ে করতে চান তাকে। এর সরল কোনো উত্তর দিতে পারেন না জেন। এরপর এক ঘণ্টা ২৩ মিনিটে জেন তার মাকে জানান, তিনি এক সপ্তাহের মধ্যে টমকে বিয়ে করতে যাচ্ছেন। পরের দৃশ্যেই দেখা যায় টমের শুটিং চলছে। জেন কাপড় পরছে। টম জানতে চান, বিয়েকে তুমি কীভাবে দেখো? জেন বলেন, আমি তো সবসময়, সব স্থানেই বিয়েকে দেখি। টম জানতে চান, কীভাবে? জেন বলেন, সব দেয়ালে, সব বিল্ডিংয়েই দেখা যায়। টম বুঝতে চান। জেন বলেন, ‘হ্যাঁ, সব বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ডেই বিয়ে বেচছে তারা।’ টম বলেন, ‘না, সেগুলো তো গাড়ি, কৌটোজাত মাংস, সিগারেটের বিজ্ঞাপন।’


জেন ব্যাখ্যা করে বলেন, দেখো এ পণ্যগুলো সবই আকৃষ্ট করার জন্য, যারা বিয়ে করতে চায়। বিজ্ঞাপনগুলো বলতে চায়, বিয়ের আগে কোনো সন্তান নয়। কিন্তু অবাক করার মতো বিষয় হলো, সেই একই যুবক যুবতীরাই বিয়ে করছে সন্তানসহ। আর বর্তমানে এটাই হলো যথাযথ, আইডিয়াল, সফল বিয়ে। বিয়ে এখন আর চার্চের কুক্ষিগত সম্পদ নয়। যে বিয়েতে স্বামী সব দায়দায়িত্বের বোঝা কাঁধে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, আর স্ত্রী হয় খুঁতখুঁতে বিরক্তিকর। এখন বিয়ে হলো বিজ্ঞাপনের সুন্দর হাসিমাখা মুখের মডেলের মতো; পোস্টারে যার হাসি দেখা যায়।


টম প্রশ্ন করেন, তাহলে পোস্টারগুলো কেনো বিয়েকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখে না? জেন বলেন, কারণ এখন সব বিয়েই পপ কালচারের মতো হয়ে গেছে। পপ বিয়ে। টম বলেন, ওহ, তাহলে পপ-ই হলো ফরমুলা? পপ তরুণদের জন্য পপ বিয়ে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই পপ বিয়ে যদি না টেকে? জেন বলেন, এখন গাড়ি যেভাবে মেকারের কাছে ঠিক করা হয়, বিয়ে তেমনই মেকারের কাছে ঠিকঠাক করে নিতে হবে। টম জানতে চান বুড়ো বয়সে পপ বিয়ের কী অবস্থা হয়। জেনের উত্তর, তখন সেটা ঠিক করতে আরো বেশি মেকারের প্রয়োজন হবে। টম জানতে চান, পপ বিয়েতে ভালোবাসার অবস্থান কোথায়? জেন বলেন, নাহ, পপে কোনো ভালোবাসা নেই, পপ ভালোবাসতে জানে না। তাহলে কী হবে--জানতে চান টম। উত্তরে জেন বলেন, তখন সেই মেকাররা পরিপূর্ণ অবসর নেয়, এবং একটি ফ্ল্যাটে গিয়ে বাইরের সবকিছু ঝেড়ে ফেলে আবার নারী-পুরুষ হয়ে যায়; একে অন্যকে ভালোবাসে।


বার্তোলুচি হয়তো পুঁজিবাদি ব্যবস্থার পুঁজিকেন্দ্রিক এমনই এক অবস্থার কথা তুলে ধরতে চেয়েছেন, যেখানে বিয়েও ধনকেন্দ্রিক-যান্ত্রিক-দ্রুতগতির সফরে তালমিলিয়ে চলতে শিখে গেছে। যেখানে চাইলেই যখন তখন পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে গাড়ির মতোই বিয়েকেও সময়োপযোগী করে নেওয়া যায়। দ্রুত পরিবর্তনশীল এই পপ কালচারের যুগে গাড়ি আর বিয়ের মধ্যেও কোনো পার্থক্য থাকছে না। দুটোই পণ্য। দুটোকেই চটকদার বিজ্ঞাপনে দেখা যায়, নষ্ট হলে মেরামতের জন্য মেকারের কাছে নিতে হয়। আর সবশেষে যখন আর কিছুই কাজ করে না, তখন আবার তাদের সেই আগের অবস্থায় ফিরে যেতে হয়--আদিম মানব-প্রকৃতির কাছে। যেখানে যৌনতা আর প্রেম এক হয়ে যায়।


চলচ্চিত্রে এ পর্যায়ে টমের শুটিং শেষ না করেই স্পট থেকে পালিয়ে যান জেন। পরের দৃশ্যে দেখা যায়, সেই ফ্ল্যাটের নিচে জেন বৃষ্টিতে ভিজে দাঁড়িয়ে আছেন। পল লিফটে ওঠার সময় তাকে ঘরে নিয়ে যান। প্রশ্ন হলো, যে টমকে বিয়ে করতে যাচ্ছে জেন, তার কাছ থেকে পালিয়ে কেনো আবার সেই ফ্ল্যাটে পলের কাছে যান জেন?


বার্তোলুচি এর উত্তর দিয়েছেন চলচ্চিত্রের এক ঘণ্টা ৩০ মিনিটে। যেখানে পলকে জেন বলেন, ‘আমি একজনকে ভালোবেসেছি। আর সেই ব্যক্তি হলো তুমি। আমি তোমাকেই ভালোবাসি।’ এ কথা শোনার পর হঠাৎই পল যেনো বদলে যান, জেনকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘তোমার দুটি আঙ্গুল আমার গুহ্যদ্বারে ঢুকিয়ে দাও।’ পলের মুখ যেনো যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যায়। আদতে যন্ত্রণা নাকি প্রাপ্তির আনন্দে তিনি দিশেহারা তা বোঝার উপায় থাকে না। দিশেহারা পল প্রতিজ্ঞা করাতে থাকেন জেনকে, তিনি যেনো আর তাকে ছেড়ে না যান। এ নিশ্চয়তাটুকু তিনি চান। পল হয়তো বিশ্বাস করতে চান, ‘... প্রেম মানে বলপ্রয়োগের অবৈধতা। প্রেম প্রকৃতিরই নিয়ম। প্রেম মানে পরিচয়, বোঝাপড়া। প্রেম মানে সংহতি, পরস্পর-সহযোগিতা। প্রেম মানে স্বাধীনতা ...।’৮ যে স্বাধীনতা, যে সংহতি, যে পরস্পর-সহযোগিতা পল তার ৪৫ বছরের জীবনে পাননি তা আজ এক নিমেষে তার কাছে ধরা দিয়েছে। তার যে আত্মপরিচয় কোনোদিন গড়ে ওঠেনি, যে বোঝাপড়া হয়নি কোনোদিন, সেই আশায় যেনো বদলে যেতে থাকেন পল।


বার্তোলুচি আগেই দেখিয়েছেন, ভালোবাসার এই রূপ পল আগে কখনো দেখেননি। চলচ্চিত্রের এক ঘণ্টা চার মিনিটে ফ্ল্যাটের বেসিনে পলের কাছে জেন জানতে চেয়েছিলেন, তুমি আমার পরিচয় কেনো জানতে চাও না আমি জানি। কারণ তুমি মেয়েদের ঘৃণা করো। কী করেছে মেয়েরা তোমাকে? পল উত্তর দিয়েছিলো--‘মেয়েরা সবসময়ই আমাকে জানার ভান ধরেছে অথবা এমন ভান করেছে যে আমি তাদের সম্পর্কে কিছুই জানি না। যা সত্যিকার অর্থেই বিরক্তিকর।’ অর্থাৎ পলের ভাষ্য অনুযায়ী, কখনোই তিনি এমন কোনো সম্পর্কে জড়াননি যেখানে পারস্পরিক বোঝাপড়া ছিলো। একজন অন্যজনকে জানার মাধ্যমে যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যেখানে বিশ্বাস, ভালোবাসা, নির্ভরতা থাকে--তেমন সম্পর্ক থেকে আজীবন বঞ্চিত থেকেছেন পল। হয়তো সেজন্যই প্রথাগত সমস্ত সম্পর্ককে তিনি অস্বীকার করতে চেয়েছিলেন। তবে জেনের ভালোবাসা কি আবার পলকে ফিরিয়ে আনছে প্রথাগত সম্পর্কের বেড়াজালে? কিন্তু চলচ্চিত্রের এক ঘণ্টা ৪৫ মিনিটে বার্তোলুচি দেখান, হঠাৎ করেই ফ্ল্যাটের সবকিছু গুছিয়ে অপরিচিতের মতো জেনের জীবন থেকে হারিয়ে যান পল। জেন আর কিছুতেই খুঁজে পান না তাকে। বাধ্য হয়েই তাকে আবার ফিরতে হয় টমের কাছে।


কী নামে ডাকবো তাকে

জীবনের সব না পাওয়া, রাগ, অভিমান, ক্ষোভ, ঈর্ষা, অভিযোগ থেকে মুক্তি পেতেই ঠিকানাহীন এক ফ্ল্যাটে জেনের সঙ্গে বসবাস শুরু হয় পলের। যেখানে সম্পর্কের এক এবং একমাত্র ভিত্তি ছিলো যৌনতা। এর বাইরে সবকিছুকেই অস্বীকার করেছেন পল। মধ্যবয়সি পলের এ জীবন দর্শন কিছুটা ওলটপালট করে দেয় সদ্য কৈশোর পেরোনো জেনকেও। অসম বয়সি দুই মানুষের এই সম্পর্ক একদিকে জেনকে করে তোলে পরিণত, অন্যদিকে পলকে দেখায় নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন। কিন্তু সব স্বপ্নের পূর্ণতাই কি শুধু যে স্বপ্ন দেখে তার ওপর নির্ভর করে? না, করে না।


চলচ্চিত্রের এক ঘণ্টা ৫২ মিনিট; পুনরায় জেনের সামনে এসে দাঁড়ান পল। জেনকে বলেন, ‘আবার সব শুরু করি শুরু থেকে। নাম-পরিচয়হীন সম্পর্ক আর নয়।’ পল চান জেনকে বিয়ে করতে। কিন্তু জেন এবার সবকিছু অস্বীকার করেন। বলেন, টমকে বিয়ে করতে যাচ্ছেন তিনি। পলের সঙ্গে তার আর কোনো সম্পর্ক নেই। পরের দৃশ্যে দেখা যায়, কোনো এক হোটেলের সুবিশাল বলরুমে অনেক নারী-পুরুষ জোড়ায় জোড়ায় ট্যাংগো নাচে অংশ নিচ্ছে। তার পাশে বসে জেনকে বোঝাতে থাকেন পল। একসময় মাতাল হয়ে ট্যাংগো নাচের ভিতর ঢুকে যায় দুজন। নাচের কোনো নিয়ম না মেনে উদ্ভটভাবে নাচতে থাকে তারা। যেনো সমাজে আর দশজন কীভাবে চলছে তা দেখার বিষয় নয়। তারা থাকতে চায় তাদের মতো। কিন্তু সমাজের আইনকানুন, রীতিনীতি না মানলে যেমন সমাজে থাকা যায় না, তেমনই ট্যাংগো পরিচালনাকারী বয়স্ক নারীটিও নাচের ফ্লোর থেকে বের করে দেয় তাদের।


প্রচলিত ব্যবস্থায় রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার, বিয়ের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিবাদে জড়ালে যেমন একঘরে হয়ে থাকতে হয়, পলের অবস্থা যেনো তেমনই। দীর্ঘদিনের চর্চায় গড়ে তোলা এই সমাজ থেকে বের হয়ে গেলে সহজে যে আর ফেরা যায় না তা বার্তোলুচি দেখান। চলচ্চিত্রের দুই ঘণ্টা এক মিনিট; রাস্তায় দৌড়াচ্ছেন জেন, তার পিছু নিয়েছেন পল। তিনি কোনোভাবেই আর জেনকে বোঝাতে পারছেন না তার ভালোবাসার কথা। কারণ যখন জেনের প্রয়োজন ছিলো পলকে, তখন পল ছিলেন না। এখানেই হয়তো ভালোবাসার বোঝাপড়ায় অভাব তৈরি হয়।


রাস্তায় পিছু নিলে জেন উচ্চস্বরে পুলিশ ডাকতে থাকেন। এলিভেটরে উঠতে উঠতে চিৎকার করতে থাকেন। কেউ সাহায্য করো। আর পল উঠতে থাকেন, সিঁড়ি বেয়ে। যেনো কোনো উন্মাদ মানুষ তার ক্ষতি করার জন্য পিছু নিয়েছে। জেন পৌঁছে যান তার মায়ের ফ্ল্যাটে। পিছনে প্রবেশ করেন পলও। জেন গিয়ে আলমিরার ড্রয়ার খুলে সেখানে মাথা ঠুকেন। যেনো কী এক কঠিন সিদ্ধান্ত তিনি নিতে যাচ্ছেন। পল ধীরে ধীরে তার কাছে যান, জেনের দু’গালে হাত বোলাতে বোলাতে বলতে থাকেন, ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি, আমি তোমার নাম শুনতে চাই।’ এরপর নির্লিপ্ত কণ্ঠে নিজের নাম বলেই পলের বুকে গুলি চালান জেন। পল কেঁপে ওঠেন, তারপর খোঁড়াতে খোঁড়াতে বেলকনির দরজা খুলে বাইরে গিয়ে দাঁড়ান। যেতে যেতে বলতে থাকেন--‘আমাদের সন্তান ... আমাদের সন্তানরা মনে রাখবে ... কিন্তু কী মনে রাখবে তা আর বলা হয় না।’ পরের শটে দেখা যায়, বেলকনির মেঝেতে শিশুর মতো বুকে হাত গুঁজে জড়োসড়ো হয়ে পড়ে আছে পলের মৃতদেহ। সেক্সোফনে বাজতে থাকে এক উদাস করা সুর। ক্যামেরা জুম ইন করে দেখায় জেনের হাতে তার বাবার পিস্তল। ক্যামেরায় জেনের থমথমে চেহারা ভেসে উঠতেই তিনি বলতে থাকেন--‘আমি তাকে চিনি না। সে রাস্তা থেকে আমাকে অনুসরণ করে ফ্ল্যাটে এসেছে। আমাকে ধর্ষণের চেষ্টা করেছিলো। সে উন্মাদ। আমি জানি না তাকে কী নামে ডাকতো সবাই। তার নামও জানি না। আমি জানিই না সে কে!’


বার্তোলুচি তো দেখিয়ে গেলেন প্রথাগত পরিবার, বিয়ে, ভালোবাসাহীন সমাজ মানুষের জীবনকে কেমন দুর্বিষহ করে তুলতে পারে। যেখানে মানুষকে বাধ্য হয়ে অস্বীকার করতে শিখতে হয় সবকিছুকে। এমনকি নিজের আত্মপরিচয়কেও। কিন্তু এ থেকে মুক্তির কোনো পথ তো তিনি রাখলেন না। বরং জেনের হাতেই শেষ করে দিলেন পলের নতুন করে সবকিছু শুরুর স্বপ্ন। চলচ্চিত্রের শেষ সংলাপে জেনকে দিয়ে চিনি না, জানি না বলিয়ে বার্তোলুচি আসলে কি তাদের দুজনের এ যাবৎ কালের যাপিত সম্পর্ককে আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেললেন? তিনি তো এ সম্পর্কের কোনো নাম দিলেন না। সমাজের আদিমতম প্রতিষ্ঠান পরিবারের সঙ্গে এর কোনো মিল নেই--সামঞ্জস্য নেই সভ্যতার উৎকর্ষে নারী-পুরুষের মিলনের বৈধতা দেওয়া লিভ-ইন সম্পর্কের সঙ্গেও। অথচ দুই মেরুর দুজন মানুষের মনোদৈহিক, আর্থসামাজিক সমস্যার অসাধারণ সমাধান দিলো যে ‘সম্পর্ক’, তার কোনো নাম নেই। তাহলে হতাশ, আত্মপরিচয় মুছে ফেলতে চাওয়া পলকে যে ‘সম্পর্ক’ পুনরায় ভালোবাসতে শেখালো, আত্মপরিচয়ে বেড়ে ওঠা জেনকে যে ‘সম্পর্ক’ নিজেকে চিনতে শেখালো, কী নামে ডাকবো তাকে!


লেখক : মাজিদ মিঠু, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা ডিসিপ্লিনে পড়ান।

mazid.mithu@gmail.com

https://www.facebook.com/mazid.mithu

 

তথ্যসূত্র

১. করিম, সরদার ফজলুল (২০০২ : ১৬৬—১৬৭); দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা।

২. নিউটন, সেলিম রেজা (২০১৫ : ৬১); অচেনা দাগ : সম্পর্ক স্বাধীনতা সংগঠন; আগামী প্রকাশনী, ঢাকা।

3. Brody, Richard; “Revisiting Bernardo Bertolucci’s Artistic Ambitions, and Abuses, in “Last Tango in Paris””; The New Yorker, 30 Nov 2018.

৪. প্রাগুক্ত;Brody (30 Nov 2018)।

5. Brody, Richard; “Why the ‘Last Tango in Paris’ rape scene is generating such an outcry now”; The Washington Post, 06 Dec 2016.

 ৬. প্রাগুক্ত; নিউটন (২০১৫ : ৬১—৬২)।

৭. প্রাগুক্ত; নিউটন (২০১৫ : ৬২—৬৩)।

৮. প্রাগুক্ত; নিউটন (২০১৫ : ৬৫)।

বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ২০তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২১ এ প্রকাশিত হয়েছে।

 

 

 

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন