তানভীর শাওন
প্রকাশিত ২৫ অক্টোবর ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
অস্তিত্ববাদের চেম্বারে ‘ব্যাডল্যান্ডস্’-এর কাহিনি কীর্তন
তানভীর শাওন

সামাজিক জাল ও পোড়োভূমি পেরোতে চাওয়া মানবজীবন
সমাজতাত্ত্বিক জিসবার্ট একদা সমাজকে বলেছিলেন ‘সামাজিক সম্পর্কের জটিল জাল’১। জাল বিছানো এক মহাক্ষেত্রে হামাগুড়ি দিতে থাকা অদ্ভুত চিড়িয়াই যে সমাজ সে তো সহজ অনুমেয়। তবে জিসবার্ট নির্দিষ্ট করে বললেন, এই জালটা আসলে সামাজিক সম্পর্কের। বলাটা দরকারি, এই উক্তিতে জিসবার্ট আসলে অনেক ‘জাল’ উহ্য রেখে মামুলি সম্পর্কের জালে নিজেকে আটকে রেখেছেন। ভীষণ জরুরি কথাটা হলো, মানবসভ্যতার আদিতে সমাজ গঠনের মূল শর্তে যে শাসনগুলো জারি হয়েছিলো সেগুলো সবই একেকটা জাল। নয়তো আকাশে, পাতালে, জঙ্গলে, মরুতে বসবাসকারী অসভ্য-বর্বর পশু বা দেবতাকে টুটি চেপে নির্দিষ্ট সম্পর্কের সেফটিপিনে আটকিয়ে, নির্দিষ্ট গরাদে পুরে, ‘সভ্যতা শেখার নোটবুক’ হাতে ধরিয়ে দেওয়ার কাজ রাষ্ট্রগুলো করতো না আজ। এ রকম মামুলি ছদ্ম জালে আটকে থাকা আরেক ধ্রুপদী দার্শনিক অ্যারিস্টটল বলেছিলেন, ‘সমাজবহির্ভূত সব জীব পশু নয়তো দেবতা’। অর্থাৎ এরা সমাজকে মানুষের এক্সটেনশন হিসেবে দেখেছে। সমাজকে জাহির করেছে মানবজীবনের ধারক রূপে। এদের চোখে সমাজ এমন এক দরিয়া যেখানে একটা মানবজীবন সহজেই পার হয়ে যায়। কিন্তু আসলেই কি তাই?
আধুনিক ধনবাদী সমাজ মানুষের জন্য যে ‘ম্যানুয়াল বুক’ তৈরি করে পূর্বনির্ধারিত, একঘেয়ে, চর্বিতচর্বণ, নৈরাশ্যপূর্ণ জীবন বেঁধে দিয়েছে, তা কি সবসময় মনুষ্যবান্ধব? ‘ল অব ন্যাচার’-এর অনুগামী? নাকি প্রাকৃতিক আসমান থেকে অসম্ভব খাটো করে নেওয়া ‘সামাজিক আসমান’, ‘ল অব ন্যাচার’কে তোয়াক্কা না করে তৈরি পুঁজিবলয়ের নিরাপদ সঙ্গী হওয়া যাবতীয় ল, ধেবড়ে যাওয়া সমূহ প্রতিষ্ঠান যেমন পুঁজিবাদী রাষ্ট্র, প্রতিক্রিয়াশীল সমাজ, অনু-বীজানুরূপ যাবতীয় পরিবার--এসবই যে একেকটা কূটজাল তা ঢাকতে গিয়েই জিসবার্ট’রা ‘বেচারা সামাজিক সম্পর্কে’র গায়ে জালের তিলক পরিয়ে দিয়ে জাল শব্দটাকে শুদ্ধস্বরে তিলাওয়াত করলো। পুঁজিবাদে কামিয়াব হলো। তাই যদি না হবে তাহলে কেনো মুহম্মদ’কে ‘গোছানো’ সমাজ ছেড়ে হেরা গুহায় ধ্যান করে তারপরে ‘মহানবী’ হতে হয়। কেনো সাধু সন্ন্যাসীরা, আউল-বাউল-ফকিররা একটা ‘সহজ-নিরাপদ-টেকসই’ জীবন ছেড়ে, জীবনবীমা না করে, পরিবার গঠন না করে বেছে নেয় গভীর নির্জন পথ? সেই পথ কি প্রথাগত সমাজের ধার ধারে? একমাত্র উত্তর হলো, না। সেই পথ আসলে প্রথাগত সমাজের ভিতরের যাবতীয় ‘নাই’-এর রূপায়ণ, যাবতীয় মিথ্যার বিপরীতে ‘সত্যি’র ভাস্কর্য। প্রথাগত সমাজের অসুস্থতা, ফাপড়বাজি, ধৃষ্টতার জোয়ারে যারা গা ভাসাতে পারে না তাদেরকে সমাজচ্যুত করা হলে, ব্রাত্য ঘোষণা করা হলে, পরে তারা ওই পথেই হাঁটে।
প্রশ্ন হলো, এই গভীর নির্জন পথের পথিক আর কারা? যাবতীয় আর্ট মিডিয়াম এই পথে সাধু-সন্ন্যাসী, ধর্মপুরুষ (স্পষ্টতই ধর্মনারী না), মহাপুরুষদেরকে যতোটা হাঁটিয়েছে ততোটা নিজেদের গাত্র পার্শ্বের পথিকদের হাঁটায়নি। কেনো হাঁটায়নি সে পুঁজিগ্রাহী শিল্প-ফকিররাই ভালো জানে। সেজন্যই সেই বিকল্প পথিকগণের নমুনা উদাহরণ দিতে গেলে আমাদের মুখে আসতে চায় না। বেশ্যা, দালাল, বেকার, ভবঘুরে, যাবতীয় সর্বহারা প্রভৃতি হলো বিকল্প দলীয়। প্রথম দলের সঙ্গে এ দলের পার্থক্যের জায়গা প্রথমত, এরা ভান ধরতে পারে না, ভাববাদী দার্শনিক সাজতে জানে না, কথায় কথায় ‘দুনিয়াকে উদ্ধার করবো’ টাইপ স্লোগান আওড়াতে পারে না। তাই তাদের আওয়াজ কিংবা মুখচ্ছবি শিল্পের দামি বারান্দায় গীত বা প্রদর্শিত হয় খুবই কম। দ্বিতীয়ত, এরা আসলে তথাকথিত ‘গভীর নির্জন পথে’ তাদের সজ্ঞা দিয়ে হাঁটতে পারে না, ভদ্দরলোকের সমাজে এই ‘অভদ্র’দের জায়গা যখন হয় না, তখন এরা আপনিই হয়ে যায় ওই পথের পথিক। কেউ সচেতনভাবে কেউবা অসচেতনে। কেউ রেবেলিওনের চূড়ান্তে গিয়ে হয়ে ওঠে সশস্ত্র, মারমুখী, কেউ ভোরের কুয়াশা--পুঁজিবাদী সূর্য যাকে আঁচ দিয়ে খেয়ে নেয় নিয়মিত।
আলোচনায় ওঠা চলচ্চিত্রখানি যা ব্যাডল্যান্ডস্ (১৯৭৩) নামে পরিচিত, তা তার বারান্দায় এমনই গভীর নির্জন পথে হাঁটা বিকল্প দলের এক পথিকের মুখ দেখাবার চেষ্টা চালিয়েছে। এই আলোচনার উদ্দেশ্য হলো চলচ্চিত্রের সেই চেষ্টাকে দর্শকের পাঠের সঙ্গে মিলিয়ে একটা চিন্তামুখের জন্ম দেওয়া, যেখানে এসে ‘কিয়ের্কেগার্ড-জ্যঁ পল সার্ত্রের অস্তিত্ববাদ’২, ‘কামু-বেকেটের অ্যাবসার্ডিজম’৩ একসঙ্গে একটি যৌথ ধ্বনি তুলতে সচেষ্ট হবে।
ব্যাডল্যান্ডস্ সহজ আবার সহজ নয়
হলি ও কিট হলো ব্যাডল্যান্ডস্-এর প্রোটাগনিস্ট পাত্রপাত্রী, যাদেরকে সমঝে চলচ্চিত্রের গল্পটা এগোয়। ২৫ বছর বয়সি স্কুল পালানো কিট কাজ করে নগর পরিষ্কারের মিউনিসিপাল গাড়ির সহায়ক হিসেবে। চিত্রকর বাবার ১৫ বছর বয়সি স্কুলপড়ুয়া মেয়ে হলি’দের পাড়ায় তার নিত্য যাতায়াত। ঘটনাক্রমে কিট আর হলি একটা সম্পর্কে জড়ায়--বালখিল্যসূচক অপরিণত প্রণয় যার নাম। গল্পের একপর্যায়ে হলি’র বাবা এই সম্পর্কটা মেনে নেয় না এবং কিটকে অসম্ভব বকে দেয়। এরপর অনেকটা অনিশ্চিত আবেগের নাটকীয়তায় হলির স্কুল ছুটির এক বিকেলে কিট পৌঁছে হলির বাড়িতে। হলির বাবার সঙ্গে সহিংস বাচিকতায় জড়ানোর ফাঁকে কিট তাকে গুলি ছোড়ে এবং লাশসহ গোটা ঘরদোর জ্বালিয়ে সম্বিতহীন হলিকে নিয়ে পালিয়ে যায়। এরপর যথাযথই শুরু হয় আইনি খোঁজাখুঁজি--কখনো কিট ও হলি সভ্যতার যোজন দূর বনভূমি খুঁজে নেয় ওদের মতো করে, কখনো আত্মরক্ষার্থে আরো অসংখ্য প্রাণের সংহারের কারণ হয় ওরা। এভাবে চলচ্চিত্র শেষদশা খুঁজতে থাকে।
দুটো সহজ কথায় এই হলো চলচ্চিত্রের স্টোরিলাইন। জরুরি কথাটা হলো, চলচ্চিত্রটি না দেখে স্টোরিলাইন শুনলে গল্পটা খুবই গতানুগতিক মনে হওয়া এক সহজ স্বাভাবিক উপভোক্তার ভঙ্গি বৈ কিছু নয়। কিন্তু পাঠক যখন চলচ্চিত্রটি দেখবে তৎক্ষণাৎ চলচ্চিত্রটির গতরে লাগাতার অসংখ্য ডিটেইলস্ যুক্ত হয়ে গল্পটাকে মনে হবে বহুচিন্তার বীজ ছড়ানো উপকূল। সচেতন দর্শক তাতে অনায়াসে চিন্তা-সাঁতার দিতে চাইবে। গল্পের সেই সুন্দর ক্ষেত্রগুলো ধরতে গেলে প্রাথমিকভাবে তিনটি দার্শনিক টুল বেছে নেওয়া জরুরি। ভূমিকায় উল্লেখ্য অস্তিত্ববাদ (এক্সিজটেনশিয়ালিজম) ও অনর্থবাদের (অ্যাবসার্ডিজম) সঙ্গে নাস্তিবাদ (নিহিলিজম) খানিকটা আসবে।
অনর্থবাদের দুনিয়ায় প্রয়োজনই যখন ভীষণ অপ্রয়োজনের
আমাদের গল্পের তরুণ কিট প্রত্যেকদিন সকালে ডাউনটাউনের সব বাড়ি ঘেঁটে আবর্জনা ট্রাশভ্যানে তুলে নেয়। সে এই কাজটাকে বেশ উপভোগই করে। মাঝে মধ্যে সে কোনো বাড়ির ঝুড়িতে খুঁজে পায় অপরিশোধিত বিদ্যুৎ বিলের নথি, কখনো দামি জুতো--যেগুলোর উপযোগ এখনো রয়ে গেছে। কখনো সে খুঁজে পায় কোনো বাড়ির একসময়ের অসামান্য যত্নে বড়ো হওয়া পোষা কুকুরের মৃতদেহ। সে এসব দেখে, ব্যথিত হয়। এ রকম নানা পাবলিক ন্যুইসেন্স প্রত্যক্ষ করে সে মাঝে মাঝে বিরক্তও হয়। আসলে কিট এই কাজ করতে করতে অনেকটা দ্বিধায় পড়ে যায় যে, যন্ত্রসভ্যতার বমি করা এতোসব পণ্যের কোনটা গার্বেজ আর কোনটা নয়! কিংবা অতিপ্রিয় কুকুরছানাটাও যখন হয়ে যাচ্ছে সস্তা আবর্জনা, তখন কিটের এই মানসিকতায় অ্যাবসার্ডিজম বেশ বড়ো করে দাগ কাটে; ক্রিয়াশীল হয়।
পেইন্টার (আসলে ওয়াল, সাইনবোর্ড, ব্যানার ইত্যাদি পেইন্টিং) বাবার নামমাত্র স্নেহে বেড়ে ওঠা মেয়ে হলি। এক অবসরে বাড়ির উঠোনে সে যখন খেলতে থাকে তখন পথিক কিট তাকে ডাকে, একটু কথা বলতে চায়। কী নিয়ে কথা বলবে, হলির এ প্রশ্নকে নিবৃত্ত করতে কিট বলে, যদিও সিংহভাগ মানুষের বলার মতো কোনো কথাই নেই এই সময়টায়, কিন্তু তার বলবার মতো কথা আছে। কিটের এ ভাবনায় রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে দমে যাওয়া, বোবাধরা মানুষের সংখ্যাটা যে সমাজে ক্রমবর্ধমান তা যেনো পরিষ্কার হয়ে ওঠে। তারপর আরেক বিকেলে কিটের সঙ্গে হাঁটতে গিয়ে হলি যখন প্রণয় প্রস্তাবের উত্তরে কিটকে বলে যে ময়লা ফেলা কোনো তরুণের সঙ্গে সম্পর্ক করলে বাবা সেটা মানবে না, তখন রাগতস্বরে কিট বলে ওঠে, তোমার বাবা ‘আবর্জনা’র বোঝেটা কী? আসলে কিটের এই প্রশ্নে সমাজের উচ্চবিত্ত বুদ্ধিজীবীদের ‘ফাঁকা উদোর’ এর বুদ্ধিবৃত্তিক মিথ্যা বুলি বেচে খাওয়ার প্রক্রিয়াটা ধরা পড়ে যায়। এছাড়া মূর্ত হয় কিটের মনোভূমির অ্যাবসার্ডিটি; যেটা প্রচলিত সমাজের ‘ঠিক’ বাতলে দেওয়া সিরিয়াস ভুলগুলোকে ছুঁতে চায়।
কোনো একদিন কিট তার কাজের আস্তানায় ফিরে বুড়িয়ে যাওয়া সহকর্মীর কাছে শুনতে পায় তার চাকরি চলে গেছে। তারপর দেখা যায়, সে গজরানো রাগের ঝাপ্টায় পকেট থেকে কর্মসূত্রে পাওয়া চাবি ছুড়ে ফেলে দেয় ময়লা ফেলার ঝুড়িতে। তার রাগের উত্তরে বুড়ো সহকর্মীও হাতে ধরা লাল আপেল তার দিকে ছুড়ে দেন। লক্ষণীয়, চলচ্চিত্রের এই জায়গায় কিন্তু অ্যাবসার্ডিজম গাঢ় হচ্ছে। কিটের পেটে ভাত জোটানো চাকরির প্রত্যেকটা বাঁধার আনলক করতো যে চাবি সকাল বিকেল, সেই নিত্যসঙ্গীও স্রেফ একটা খবরে হয়ে যাচ্ছে আবর্জনা। কিংবা বুড়োর হাতের দামি ফলটাও পেটে না গিয়ে শুধু রাগ মেটানোর একটা আলঙ্কারিক আবর্জনায় ভূপাতিত হচ্ছে।
আসলে অ্যাবসার্ডিজম আর নিহিলিজম অনেক সময় এভাবেই হাত ধরাধরি করে খেলতে থাকে। যা আমার নয় তা যেনো আর কারোর নয় কিংবা যা আমার হতে পারলো না, তার নাস্তি কায়েম সর্বাগ্রে--রবীন্দ্র রচনার কোথায় যেনো পড়েছিলাম এ ধরনের একটা কথা। অনেক সময় যা আমার প্রয়োজনীয় নয় তা-ও যেনো আবর্জনায় পর্যবসিত হয়--সেই সদা সতর্ক খেয়ালও রাখা চাই আমারই। অসংখ্য উচ্চবিত্তের জীবনযাপনেই শেষোক্ত কথাটার প্রয়োগ দেখতে পাই। যেখানে অনাহারে, অপুষ্টিতে একটা বড়ো জনগোষ্ঠী মৃত্যমুখীন, সেখানে তাদের ডাস্টবিনেও দেখা যায় অসংখ্য খাবারের ছড়াছড়ি। ঠিক এইভাবেই অনর্থবাদ আর নাস্তিবাদের যুগলবন্দি ঘটে। রবীন্দ্র রচনাতেও এই দুইয়ের হাত ধরাধরি দেখতে পাই অনেক সময়ে।
হলি যখন কিটের সঙ্গে সখ্য পাতে, ততোদিনে কিট রীতিমত কাউবয়। কিটের নেওয়া গরুর যত্ন আর হলিকে আদর করার ডাইলেকটিক দৃশ্যায়ন অনেক কিছুই বলতে চায় এখানে। একপর্যায়ে আরেকটি দৃশ্যায়ন অনেক কিছু বলেও দেয়, যখন দেখা যায় হলির প্রেমে সম্মতি আদায়ের পর সম্পর্কের ‘সহজ’ হওয়ার দৃশ্য আর গরুর গলায় বন্ধন জড়িয়ে গরুকে খাবার খাওয়ানোর দৃশ্য পাশাপাশি দেখানো হচ্ছে। এই প্রক্রিয়া একটা সুন্দর মন্তাজ ঘটায়। এখানে সামাজিক সম্পর্কের নির্মাণ প্রক্রিয়া থেকে সম্পর্কগুলোর প্রকৃতির সঙ্গে গরুকে ফাঁদবন্দি করার ব্যাপারটা যেনো মিলিয়ে পাঠ করান নির্মাতা, এমনটাই মনে হয়। যেনো তিনি আধুনিক সম্পর্কগুলার ভিতরের সমস্ত কৃত্রিমতা আর অসারতার ইঙ্গিত দিয়ে সেগুলোকে বরং ফাঁদ প্রতিপন্ন করাতে চান। এই ব্যাপারটার মধ্যে আছে গভীর হাস্যরস আর ট্র্যাজেডি। সেই সঙ্গে আমরা আরো দেখি একসময় হলি তার অ্যাকুরিয়ামের দুর্বল হয়ে পড়া মাছ বাগানে নিক্ষেপ করে। এ সময় ধারা বর্ণনায় হলি বলে, আমি প্রায়ই একটা ভুল করি, অনেকটা ইচ্ছে না থাকলেও, অ্যাকুরিয়ামের দুর্বল হয়ে যাওয়া মাছকে ভালো হওয়ার সুযোগ দিই না; ফেলে দিই। এখানেও আমাদের সামাজিক সম্পর্কগুলোর সংকীর্ণতা ফুটে ওঠে। আমরা অসীম সম্ভাবনা আর আশাবাদ নিয়ে যে সম্পর্ক শুরু করি, তা অনেক সময়ই আমাদের সামান্য ভুলও মেনে নেয় না। স্রেফ ব্রাত্য প্রতিপন্ন করে, হলির রঙিন মাছটার মতো দুর্বল ঘোষণা করে ফেলে যায়। চলচ্চিত্রের এই জায়গায় সম্পর্কের অ্যাবসার্ডিটি ভাষা পায়।
ছোটো হলির বাবা-মার দশম বিবাহবার্ষিকীর আগেই মা মারা যান। বাবা তাদের ১০ বছর ধরে জমানো বিয়ের কেকটা কবর খোড়ককে দিয়ে দেন সে রাতেই। আসলে দাম্পত্য তাৎপর্যে ভর্তি ওই কেক-ও যেনো স্ত্রীর মৃত্যুর পর একটা আবর্জনা হয়ে যায় হলির বাবার কাছে। কিংবা ওটার হঠাৎ অর্থহীনতা উনি সহ্য করতে পারেন না। এখানে বুর্জোয়া অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান পরিবারের শরীরহীন অপারঙ্গমতার ইঙ্গিত ফুটে ওঠে। মানে পরিবার অর্থ আর শরীর যেকোনো একটার অভাবে অনেকটাই নুয়ে পড়ে। বাঙালি নারীদেরকে যেমন স্বামীর দেহ-মনের সঙ্গে যতোটা নয় তার চেয়ে বেশি ‘স্বামী’ নামক ‘মহান’ ভাবটার সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়। এজন্যই বাঙালি নারীরা ব্যক্তি স্বামীর যাবতীয় দোষ-ত্রুটি অনেককাল মেনে নিয়ে ‘স্বামী’ ভাবটার সঙ্গে ঘর করছে। ফলে ব্যক্তি স্বামীর মৃত্যুতে তাদের মহান ‘স্বামী’ ভাব অক্ষত থাকতো এবং পুরুষতন্ত্র তাদের শেখালো এটাকে সম্বল করেই বাঁচতে। ফলে বিধবা বিবাহ ছিলো এই দেশে বহুকাল অকল্পনীয়। কিন্তু পরিবারের এইসব ধরাবাঁধা নিয়ম যে প্রকৃতি বিরুদ্ধ; আসলে ভাবের সঙ্গে নয়, শরীরের সঙ্গে থাকে দাম্পত্য অস্তিত্ব, শরীর গেলে সে-ও চলে যায়।
অর্থনীতিবাদী বুর্জোয়া পরিবার বাচ্চাদের সহিংসতা শিক্ষার প্রথম বিদ্যালয়--এই ইঙ্গিত যেনো স্পষ্ট পাওয়া যায়, যখন দেখি হলির বাবা তাদের পোষা কুকুরটিকে গুলি করে হলির সামনেই। এরপর বস্তাবন্দি করে সেতু থেকে কুকুরটাকে জলে নিক্ষেপ করবার দৃশ্যটায় হলি যেভাবে নির্বিকারত্ব দেখায়, তাতে এই সমাজের বিরোধাত্মক শিক্ষার দশাটা চোখে ভাসে। সমাজ আমাদেরকে যা শেখায় তা অনেক সময়ই চর্চা করতে দেয় না। কিংবা আমাদের চোখের গোড়ার সমাজটাকে এড়িয়ে একটা আদর্শ, কল্পনাবাদী সমাজকে মানদণ্ড ধরে সে অনুযায়ী শিক্ষাদান করায়। যেখানে হত্যা পাপ, অত্যাচার গর্হিত। অথচ পাঠ্যবই থেকে চোখ ফেরালেই শিশুদের চোখে পড়ে অবিরত সহিংসতা। বুর্জোয়াগোষ্ঠী দীর্ঘ এক দীক্ষায়নের ভিতর দিয়ে মানুষের ভিতরের বৈশ্বিক আত্মীয়তার ক্ষুধাকে প্রচ্ছন্নরূপ দিয়ে পরিবারকে শিশুর কাছে করে দিয়েছে একমাত্র আশ্রয়। সেই পরিবারও কি তার জন্যে শতভাগ নিরাপদ হতে পেরেছে? এই সহিংস পরিবারেই তো শিশু শারীরিক, মানসিকসহ যৌন অত্যাচারের ভিতর দিয়ে যায় অনেক সময়ই। একই সঙ্গে শিশু আয়ত্ত করে নেয় সহিংসতার ভাষা।
‘ব্যাডল্যান্ডস্’ পেরোতে চাওয়া অস্তিত্ববাদী এক তরুণ
ডেনমার্কের দার্শনিক সোরেন কিয়ের্কেগার্ডের একটি বই আছে ‘ইদার/নর’ নামে। বাংলায় বইটির নাম ‘হয়/নয়’। বোঝাই যাচ্ছে অস্তিত্ববাদের পরাঙ্কমুখ দেখানো এই বইয়ের নামের মধ্যেই অস্তিত্ববাদ ক্রিয়াশীল। অস্তিত্ব ভাবে নাকি বস্তুতে ক্রিয়া করে এই তর্কে ভাববাদীগণ আর বস্তুবাদীগণ যখন মুখর তখন কিন্তু কিয়ের্কেগার্ডরাই প্রথম বলে, আসলে অস্তিত্ব থাকে ‘সিদ্ধান্ত নিতে পারায়’। আর এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা আসে পৃথিবী-ভর্তি যাবতীয় সাফারিংস্ থেকে। অর্থাৎ যেখানে সঙ্কট (রোগ, শোক, দুঃখ-কষ্ট, অভাব, মহামারি প্রভৃতি) সেখানেই সিদ্ধান্তের মহাপ্লাবন জারি হয়। আলবেয়ার কামু তার ‘প্লেগ’ ও ‘আউটসাইডার’ উপন্যাস দুটোতে এসবের ইমেজারি টেনেছেন বেশ সুন্দর করে। তাই এটা নাকি ওটা, হ্যাঁ নাকি নাসহ নানাবিধ বাছাই করবার মাধ্যমে জীবনের প্রত্যেক মুহূর্তে বোঝাপড়া করার সময় আমাদের অস্তিত্ব ক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে। সেজন্যই বোধহয় কিয়ের্কেগার্ড তার বইয়ের নামকরণ করেছেন এমনতর, এটা ভাবা যেতেই পারে।
পরবর্তী সময়ে জ্যঁ পল সার্ত্ররা যা বোঝাতে চাইলো তার সারকথা এইরূপ, প্রচলিত যে ‘ঠিক করা’ সমাজ আর প্রকৃতি বহমান--যেমন, ধর্মবিশ্বাস, সামাজিক আইনকানুন, দায়িত্ব-কর্তব্য এসবে ক্রমাগত বয়ে যাওয়ার অর্থ হলো আসলে মরে যাওয়া। মানে নিজের অনস্তিত্ব ঘোষণা। যেনো সাগরের ঢেউ যেদিকে বহমান সেদিকেই গা ভেসে চলা। অর্থাৎ তাতে নিজের চেষ্টা লীন রাখার অর্থ হলো নিজেকে নাই ঘোষণা করা, মৃত করা। কারণ একমাত্র যে মুহূর্তে আমি ঢেউ ভাঙতে শুরু করবো, সে মুহূর্তেই আসলে ঢেউ ছাড়াও সেখানে আমি থাকবো। তাই মানুষের কর্তব্য হলো কিছু না বুঝে নিছক ঈশ্বরে বিশ্বাস স্থাপন না করা। আরো যতো সামাজিক-রাষ্ট্রীয় মাথা আছে এ কথা তাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। অর্থাৎ বোঝা যায়, এ তত্ত্বে একটা প্রথা-আনুগত্যের বিরুদ্ধে কার্যকর হওয়ার মধ্যেই সৃষ্টিশীলদের জীবনের মাহাত্ম্য লুকিয়ে আছে এবং সেখানেই পরম অস্তিত্বের সাক্ষাৎ পাওয়া যাবে বলে মনে করা হয়। তাই এটুকু ধরে নেওয়াই যায়, প্রচলিত কলুষিত রাষ্ট্র-সমাজের বিরুদ্ধে মাথাচাড়া দিতে গেলে অস্তিত্ববাদ কখনো কখনো হয়ে উঠতে পারে মতাদর্শগত হাতিয়ার। এ তত্ত্বের নানাবিধ ভ্রান্তি যে নেই তা নয়--বলে নেওয়া ভালো এই তত্ত্ব জাতে ভাববাদাশ্রয়ী। এতদসত্ত্বেও চিত্তের কোথাও একটা এইরূপ মেনে নেওয়ার বিষয় এসে যায় যে, প্রাচীনতার বিরুদ্ধে নতুনের নৈরাজ্যিক৪ সৃষ্টিশীলতার স্বপক্ষের একটা বিশেষ প্রাণবীজ এই তত্ত্বে আছে।
কিট যখন হলির বাবাকে হত্যা করে হলিকে নিয়ে সমাজছুট দিতে উদ্যত, তখন কয়েকটা বিষয় ঘটে যায় একেবারে পলকেই। এক, চোখের সামনে বাবাকে খুন হতে দেখে হলি প্রথমটায় চুপসে গেলেও পরক্ষণেই কিটকে থাপ্পড় দেয়। কিন্তু সেই বালকোচিত থাপ্পড় যা হলির সামাজিক প্রতিষ্ঠা না পাওয়া ক্রোধ থেকেই আগত; তার ঝাঁজ পুরুষতন্ত্রের প্রতিনিধি কিটকে টলাতে পারে না। কিটের পুরুষতান্ত্রিক বোধে বালিকার এই আক্রোশের ছোড়াছুড়ি সহজ নিরাময়যোগ্য ‘মেয়েলি’ রাগ বা অভিমানেই মাত্র পর্যবসিত হয়। এই রাগ-অভিমান প্রচণ্ড সহিসংতাপূর্ণ ঘৃণা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। ঠিক যেভাবে সমাজের ‘স্বাভাবিক’ করিডোরে নারীর ‘চুপ’ থাকাকে সম্মতি ভেবে নেওয়া হয়, কিংবা ভাবা হয় লজ্জা। এ নিশ্চুপতাকে কখনো ঘৃণা বা রাগ ভাবতে পারে না পুরুষতন্ত্র। একই কারণে নারীর ‘মুচকি হাসি’ দুষ্টুমি মার্কা হাসি হয়ে চারপাশে ছড়িয়ে থাকে। সেই হাসি চারপাশের শত ইচ্ছের প্রদীপের তলার সলতে হয়ে কতোজনকে কতো কিছু করবার অনুমতিপত্র বিলোচ্ছে তার হিসাব রাখা অসম্ভবপর। আসলে নারীর রাগকে স্বীকার না করতে চাওয়া পুরুষতন্ত্র, নারীর প্রতিবাদটাও ফেইস করতে চায় না। ফলে রাগ, ঘৃণা তথা প্রতিবাদের কিছু একবগ্গা, ছুরি-কাঁচিমার্কা ভাষাকেই পুরুষতন্ত্র তার নিজস্ব সম্পত্তি করে নিয়েছে। শোষিত ‘নারী’ নামক নিম্নবর্গটা প্রতিবাদের ভাষা ভিজ্যুয়ালাইজ যতোটুকু করতে পারে, যেনো ততোটুকু পর্যন্ত ওটা প্রতিবাদই নয়; সম্মতি। তাই দেখা যায়, দ্বিমুখী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে কিট একইসঙ্গে হলির বাবার হন্তারক ও হলির আশ্রয়দাতা হতে চায়। প্রস্থানের আগে হলি তার কাছেই যেনো কেমন একটা আরোপিত সান্ত্বনা খুঁজতে চায়, একটা আশ্রয় চায়--হলির যাবতীয় ‘চুপভাষা’র এই একটাই মানে কিটের হাতে থাকে মাত্র। ফলে কিট দেরি না করে হলিকে সঙ্গী করবার প্রত্যয়ে বাবার লাশসহ পুরো বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়।
আগুনে যেহেতু গোটা বাড়িটাই জ্বলে, তাই কিছুই বাদ যায় না--পুড়ে যায় খাবার টেবিল, ঝুড়িতে রাখা ফলমূল, সামোভার ভর্তি পানীয়, এরপর পুড়তে থাকে হলির ছোটোবেলাকার ছবি, জুতোজোড়া, খেলনা--শখের ডলহাউজ, পুতুলসহ টেবিল-চেয়ার হয়ে যায় কয়লা মানে আবর্জনা। চলচ্চিত্রের এইখানে নির্মাতা যেনো অ্যাবসার্ডিজমের জোয়ার এনে আমাদের ঘর-সংসার, সভ্যতার সারাৎসার টেনে তার ভিতরের অন্তঃসারশূন্যতায় রেখাপাত করেন--এমনটাই মনে হয়। এক দৃশ্যে দেখাচ্ছেন সংসার সংসার খেলার উপকরণ, খাট-টেবিল-চেয়ার আবার এরপরেই দেখাচ্ছেন ছোট্ট জ্বলন্ত ডলহাউজ। যেনো একটা অন্যটার তুল্য-মূল্যতা মেটাচ্ছে। এভাবে কোনটা বাচ্চার খেলাঘর কোনটাইবা সংসার--আলাদা করা যায় কি? পুড়ে যাওয়ার পুরো সময়টায় ঈশ্বরের প্রত্যাদেশ দানের ভঙ্গিমায় যে গানটি জ্বলন্ত শিখায় ভেসে বেড়ায় তার কিছুটা এমন--ÔWhen Jesus walked into the garden and his suffering began, everything mourned that was there. Even the foliage and the green grassÕঅর্থাৎ মানবজীবন যেনো সাফারিং দিয়ে ভরা। জীবন সায়াহ্নে যে কষ্ট বুকে নিয়ে পবিত্র রাস্তা ধরে ঈশ্বরপুত্র যিশু হেঁটেছেন, সেই কষ্ট যেনো গোটা মানব সন্তানকেই তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। যে যেভাবেই চলুক আদিপিতার রেখে যাওয়া সাফারিং আস্বাদিত করতেই হবে। আসলে এই ভাবটার দুইটা ব্যাখ্যা আছে। প্রথমটা হলো, যা হচ্ছে, যেভাবে হচ্ছে সেটাই মাথা হেট করে মেনে নেওয়া; আদর্শ নাগরিক, পেয়ারের বান্দা হয়ে পরজনমের স্বর্গটা হাতে রাখা। এই ধান্দাটুকু মগজগত হওয়ার পরেও বলা যায় এই ভাবটুকুর আধ্যাত্মিক মূল্যও কিছু আছে।
হলি কিন্তু কিটের কাজে প্রচণ্ড ভয় পেয়ে বিভ্রান্তির সাক্ষাৎ পেলেও আরেকটা জিনিসের স্বাদ জীবনে প্রথমবারের মতো পায়। সেটা হলো ‘আদর্শ’ নারী কিংবা পুরুষ সন্তান হয়ে থাকবার ভ্রান্তি পেরিয়ে শুধুই মানুষ হয়ে বাইরে বেরিয়ে পড়ার স্বাধীনতা। যেটা সে চেয়েছিলো বহু আগে থেকেই। এক্ষেত্রে হলি যেহেতু স্রেফ বাবাকে হারিয়েই পারিবারিক কর্তৃত্বের পরভূমটা পেরোনোর একটা সুযোগ পায়, তাই সে পিতৃবিচ্ছেদটুকু বেমক্কা মেনে নেয়। বিনিময়ে যেনো হঠাৎই একটা মহৎ সংযোগ টের পায় ভিতরে ভিতরে। যদিও সেটা চিরস্থায়ী হওয়ার মতো কিছু ছিলো না। হলি তার এই বেরিয়ে পড়াকে বলে বসে ‘নতুন জীবন’। তাই সে সঙ্গে করে প্রচলিত সভ্যতার শেষ জীবন্ত ও সজীব জিনিসগুলা নিতে ভোলে না; সে অসংখ্য বই নেয়। এরপর তারা দুজনের নাম বদলে রাখে। তাদের দুজনের ভঙ্গি চিনে বোঝা যায় তারা প্রচলিত সভ্যতার ‘প্রশ্ন’কে ভয় পায়। তাই তারা এমন জায়গায় যাবে যেখানে কেউ তাদের প্রশ্ন করবে না। আসলেই এই সমাজে প্রশ্ন বলতে বোঝায় কিছু কিছু দাগ টেনে দেওয়া রাষ্ট্রীয় বিরোধাত্মক আদেশ নিষেধের পালাপর্ব। প্রশ্ন তাই মারাত্মক, প্রশ্ন অত্যাচার।
হলি-কিট সভ্যতার অংশ হয়ে ওঠা রাস্তা ধরে সভ্যতাকে ছাড়াতে চেয়ে একটা বনে নিজেদের আরোপিত করে। বনের ভিতর ওদের চোখে পড়ে একটা মৃত গাছের গুড়ি জলাশয়ের স্রোতে ভেসে যাচ্ছে। প্রেমে পড়ার দিনগুলোতে ওরা প্রতিদিনের সাক্ষাৎ করবার জায়গায় অর্ধমৃত যে গাছটার জলে পতনের অপেক্ষা প্রত্যক্ষ করেছিলো, এবার যেনো সেটারই চূড়ান্ত দেখা পেলো। যেনো সমাজচ্যুত হতে গেলে মরে যেতে হয়। সভ্যতার বাইরে পাড়ি দেওয়ার সমূহ উদ্বেগ যেনো মৃত্যু পথযাত্রীর সুপ্ত বাসনা। গাছটি যেমন মরে গিয়ে তবেই সব মায়া কাটিয়ে জলের মুক্ত স্রোতে ভেসে যেতে পারলো, তেমনই বেরিয়ে পড়ার সময় ওরাও সমস্ত সামাজিক সম্পর্ক মাটিচাপা দিয়ে বেরিয়েছে। ওরা নাম বদল করেছে। অথবা নাম রাখবার দরকারই বা কী ছিলো! সভ্যতার বাইরে বেরোলে ‘সভ্য’ হওয়ার যাবতীয় বন্ধন যেমন ভাষা, পোশাক ইত্যাদিও তো ঝেড়ে ফেলাই যায়। তাই যেনো মৃত গাছের গুড়ির ভেসে যাওয়া দেখিয়ে ওদের দুজনের সামাজিক মৃত্যুটাকেই বোঝাতে চাইলেন নির্মাতা। যেই ‘মৃত্যু’টা হয়তো হলির ভাষ্যেই বলা যায়, ওদেরকে একটা ‘নতুন জীবন’ দিলো।
‘নতুন জীবন’ প্রাপ্তির পর ওদের জীবনযাপনের চমৎকারিত্বটাও দেখবার মতো। বনের গভীরে বৃক্ষকে পটভূমি মেনে টামারিক গাছের আবেষ্টনী আর উইলো গাছের ছাঁদ দিয়ে সুন্দর ঘর বানালো ওরা। খাবারদাবারের ক্ষেত্রে বনমুরগী ও মাছ শিকারসহ বন্য নানা প্রজাতির কর্ণ ও মেলন সংগ্রহ করলো। এই সময়ে ব্যাকগ্রাউন্ডে ওদের নয়া অনুভূতিগুলোই যেনো গীত হতে থাকলো--‘I know the stars, I know the trees, I know the flowers, I set the breezeÕ। যেনো কোনো একটা অশুভ সম্মোহনীবলে ওরা অথবা ওদের পূর্বপুরুষ ভুলতে বসেছিলো খুব চেনা আকাশের তারা, গাছ, ফুল ও বাতাসকে। এক্ষণে প্রকৃতির সহযোগী হওয়ার ফলে ওদের সামনের সব ভুল ভুলাইয়া সরে গিয়ে কিছু সহজ অথচ আদিম স্বচ্ছতা সর্ব ইন্দ্রিয়জুড়ে ভর করেছে; যার কিছুই ওরা অস্বীকার করতে পারছে না। সম্পদের মত্ততা শেখানো রাক্ষস পুঁজির শিক্ষাও তো এভাবেই আমাদেরকে গাছ, জল, বাতাস বুঝতে দেয় না; ভুলিয়ে রাখে।
সভ্যতাকে যথাসম্ভব এড়িয়ে চলার চেষ্টা যদিও কিট-হলি করেছে, কিন্তু সভ্যতার লেজটা একেবারে এড়িয়ে যেতে পারেনি ওরা। মাঝে মধ্যে ভীষণ অভাববোধ থেকেই প্রচলিত সভ্যতার ধনী বাড়িগুলোতে হানা দিতে হয়েছে ওদের। এভাবে ওরা সংগ্রহ করেছে পর্যাপ্ত খাবার, গাড়ি, পোশাকসহ যাবতীয় কিছু। এ থেকে বলা যায়, যে মানুষ হাজার বছরের ধারাবাহিক চর্চায় ‘সভ্য’ হতে চেয়েছে, মনোভূমির সেই পরিবর্তন অস্বীকার করবার তাগুদ ক’টা দিনে আর কতোটুকুইবা সম্ভব। সেজন্যই জার্নির শেষভাগে এসে হলিকে বিচলিত বোধ করতে দেখা যায়। অনিয়মিত গোসল, খাওয়ার জন্য ওর মাঝে মাঝে নিজেকে পশু মনে হতে থাকে। ওরা একপর্যায়ে খাবারের অভাবে মরুর সল্ট গ্রাশ খেয়ে নেয়, যা ওদের কাছে ক্যাবেজের মতো লাগে। এই যে ওরা নিজেদেরকে খাদ্যে, আচরণে, সম্পর্কবাসে নিয়ত পরীক্ষায় ফেলে এগোয়, এই আসলে অস্তিত্ববাদের সুরেলা অংশ। কেননা ওরা নিজেদের জীবনকে প্রথার মাপে বয়ে যেতে দিলো না, ওদের সঙ্গে যা হচ্ছে তা মেনে নিলো না, নিয়ত পরীক্ষার ভিতর দিয়ে জীবনকে প্রবাহিত করার সিদ্ধান্ত নিলো। পরীক্ষামূলক এই জীবনই কিন্তু পরিবর্তনের ইঙ্গিতবাহী। এই জীবন যেমন হয়ে উঠতে পারে আশাবাদে পূর্ণ এক জীবন, সমস্ত অনাচারের ধ্বংস টেনে শান্তি আনবার পথ, তেমনই কখনো এর ফল হতে পারে ভয়ঙ্কর।
চলচ্চিত্রের বেশকিছু জায়গায় কিট-এর অস্তিত্ববাদী মনোভাবের পূর্ণ অবয়ব পাওয়ার ভাব চিত্রিত হয়। সে কখনো খোদ প্রকৃতির কাউন্টার অপোজিশনে দাঁড়াতে চায়, কখনো সমাজ বা রাষ্ট্রের বিরোধে এক অসম্ভব সত্ত্বা হয়ে ওঠে কিংবা উঠতে চায়। চলচ্চিত্রের ১২ মিনিট ১৫ সেকেন্ডে দেখা যায়, কিট একটা বৈদ্যুতিক তারের পিছনে দাঁড়িয়ে আছে। এখানে তার তথাকথিত সমাজের বাইরে দাঁড়ানোর আইসোলেটেড অবস্থাই যেনো প্রকাশ পায়। আবার চলচ্চিত্রের এক ঘণ্টা পাঁচ মিনিট ২৬ সেকেন্ডে দেখা যায়, কিট বন্দুক কাঁধে দিগন্তের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। এক্ষেত্রে প্রকৃতির সঙ্গে কিটের কাউন্টার অপোজিশন স্পষ্ট হয়। যেনো তার পুরোটা জুড়ে যে বিদ্রোহ তাতে প্রকৃতিও তার বিরুদ্ধশক্তি। শেষোক্ত এক ঘণ্টা সাত মিনিটে কিটকে দেখা যায় একটা রাগ্বি বল নিয়ে দলন-মন্থন করতে, সেটাকে গুলি করে দিতে। আসলে এ বলটাই যেনো সেসময়ে পৃথিবীর রিপ্রেজেন্টেশন হয়ে ওঠে। তার নিহিলিস্ট মন যেটাকে সময়ে সময়ে ধ্বংস করে দিতে চায়।
নাস্তিবাদের ঘোড়ায় চেপে সভ্যতার পোড়োভূমি পেরোবার অহং
এক ঘাট স্বাধীনতাকে পুঁজি করে চলতে চলতে একটা সময় কিটের সঙ্গবাস হলিকে স্বস্তি দেয়। সে বলে ওঠে, ‘... এমনকি অনেক বছর একা বাঁচার চেয়ে ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে একটা সপ্তাহমাত্র বাঁচাও শ্রেয়।’ এই কথা শুনে মনে হয়, হলি বাবার ঘাতক কিটের প্রেমে পড়েছে। কিন্তু না, এই ধারণায় মিথ্যের আঁচ পড়ে আপাত সত্যিটা গলে যায়; যখন এক বিকেলে দিগন্তরেখার দিকে ওদের গাড়ি ছুটে যেতে যেতে ওরা একে অন্যকে ম্যাগাজিন পড়ে শোনায়। হলিউডের তারকাদের নিয়ে গুজব ও তাকে লক্ষ করে তারকাদের কাউন্টার রিপ্লাই পড়তে থাকে হলি। সে পড়ে, রিউমার (Rumor) হলো ফ্রাঙ্ক সিনাত্রা ও রিটা হেওয়ার্থ প্রেমে পড়েছে। তবে সত্যিটা হলো তারা প্রেমে পড়েছে ঠিকই কিন্তু একে অন্যের সঙ্গে নয়। ওরা এক আবেশী ভঙ্গিতে এই ব্যাপারটা উপভোগ করে। তাতে দুজনের চোখেমুখে যে সম্মতির হাসি ফুটে ওঠে, মনে হয় যেনো এটা ওদের জীবনে ঘটে চলা কৌতুকেপনার একাংশ। যেনো ওরাও প্রেমে পড়েছে দুজনেই কিন্তু দুজনার সঙ্গে নয়। কিট প্রেমে পড়ে গেছে তার স্যাডিস্টিক মননের গভীরে সাঁতরাবার এক কূলের, তাই সে যেনো পুরুষোচিত রেপ্রিজেন্টেশন দ্বারা যৌনতার মনোভূমি গঠনে পাগলপ্রায়। অথবা সে বুর্জোয়া প্রথা-প্রশ্ন-নিয়মের শৃঙ্খল ছেড়ে যেতে চাইছে এক ‘নৈরাজ্যে’র বিরান ভূমিতে; যেখানে সে আপাতত হলিকে পাশে চায়।
আবার হলি মোটেও কিটের প্রেমে পড়ে না। এক বান্ধবপূর্ণ সহচর কিটের ব্যবহার তাকে হয়তো ঘাতক কিটকে ভুলিয়ে রাখে কিন্তু প্রেমে ফেলতে পারে না। সে আসলে রোজকার স্বাধীন ছুটে চলা, পারিবারিক কারাগারটা ভাঙবার আজন্ম সাধের পূর্ণতা পাওয়ার প্রেমেই পড়ে পুরোপুরি। এজন্যই বোধহয় সে মাঝে মাঝে তার বাবা-মার সাংসারিক নথিপত্র আঁকা পুরনো অ্যালবামে চোখ বুলায়। তার ভাবনায় আসে অসম্ভব সব বাসনার কথা, একসঙ্গে কয়েকটা জীবন ছুঁয়ে ফেলবার ইচ্ছেটা থাকে প্রথমভাগে। হলি কল্পনা করে, তার মা’র অকালমৃত্যু না হলে তার বেড়ে ওঠাটা কেমন হতো, কিংবা কিটের সঙ্গে না বেরিয়ে যদি তার অন্য কোথাও প্রণয় অথবা পরিণয় হতো সে জীবনটা কেমন হতো। হলির একটা সম্পর্কবাসের সমসাময়িকে আরো ভিন্ন মাত্রার সম্পর্কগুলোর কামনা কিন্তু সহজ ব্যাপার নয়; বিশেষত যখন তার বয়স মাত্র ১৫। কেননা সমাজবদ্ধ অগুনতি মানুষ প্রতিদিন বুঝে কিংবা না বুঝে গলায় অসংখ্য সম্পর্কের মালা বা হাতের কব্জিতে, আঙুলে অসংখ্য প্রতিজ্ঞার অলঙ্কার পরছে। তারপর পুরো জীবন ব্যয় করে তবেই সম্পর্কের ভিতরের মুখস্থ ভাবটা মগজজাত করতে পারছে। পুরো জীবন খরচ করেও তথাকথিত সম্পর্ককে সেই মানুষগুলো কিন্তু প্রতিরোধ জানাতে পারছে না। হলি সেখানে প্রথমেই কল্পনার মনোভূমিতে ভিন্ন ভিন্ন সম্পর্কের বীজ বপন করে দেখতে চায়। কোন সম্পর্কের বীজে ফসলের অঙ্কুরোদগম বেশি কিংবা কোন সম্পর্কের বীজে পরিবেশীয় তাপ-চাপের সহনশীলতা বেশি--হলি এটা পরীক্ষা করে দেখতে চায়।
প্রথাগত গোষ্ঠী হলিদের একসঙ্গে থাকবার কারণ হিসেবে প্রেম বা বিবাহ নামক কারণগুলো দেখতে চাইতো, তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু নির্মাতার কিট-হলির একত্রবাসের চিত্রায়ণে ওই প্রেম-প্রেম ‘খেলা’টা তার সিরিয়াসনেস হারিয়ে যারপরনাই খোলতাই ভাব ধারণ করে। সেজন্যই বোধ হয় অজুহাত হিসেবে নির্মাতা এই একত্রবাসের মেইন-টাইমজুড়ে সঙ্গীতের ছলে বলতে চাইছেন, ÔLove, Love is strange. Lot of people, take it for a game. ’; আসলেই তো তাই। শুধু ‘প্রেম’ এর নামে পৃথিবীতে প্রতিদিন কতো অত্যাচার, শোষণ লোকে মাথা পেতে নেয়। প্রেমের নামেই কতো ধর্ষণ হয়ে যায় ‘স্বাভাবিক’ দাম্পত্য আচরণ। প্রথাগত প্রেমের কথা যদি বাদও দিই, তবুও বলতেই হয় বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রত্যেকটা পরিবারে ‘মাতৃপ্রেম’ বা ‘মাতৃস্নেহ’ বস্তুগুলোর অবলম্বন করে কতো কতো নারীর শ্রম শোষণ করে পুরুষতন্ত্র। ‘ভালোবাসা’র প্রমাণ দিতে গিয়ে শরীরভোগের কনসেন্ট কতো নারীকে/পুরুষকে(?) দিতে হয় অবলীলায়, খরচ করতে হয় কতো অর্থ! তাই গান যথার্থই বললো, অসংখ্য মানুষ ভালোবাসাকে স্রেফ একটা খেলা হিসেবে ব্যবহার করে। বুর্জোয়া মনোভূমিতে ভালোবাসার চাষাবাদ হয় তাই পণ্যায়িত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা নিয়েই। এও এক পুঁজি তৈরির মতাদর্শিক হাতিয়ার।
পুলিশের তাড়া খেয়ে কিট এর মনোজগৎ যেনো অ্যাবসার্ডিজমের এক সুষম প্রবাহে তাড়িত হয়। চমৎকারভাবে দেখতে পাই একটা পুরো মানবজীবনের পণ্যায়িত ও বিপণ্যায়িত হওয়ার প্রদর্শন। যেখানে দেখি কিট-হলি একটি গাড়িতে জীবনের সব দৈনন্দিন প্রয়োজনকে সঙ্গী করে পলায়নপর ভ্রমণ আরম্ভ করে। কিন্তু পুলিশের অবিরত তাড়া খেয়ে একে একে তাদের জীবনে সব জিনিস গুরুত্ব হারিয়ে আবর্জনায় পরিণত হতে থাকে। প্রথমত কিট কম গুরুত্ববহ জিনিসগুলো যেমন সাজসজ্জা দ্রব্য, নানা রকম কস্টিউম ফেলে দেয়--যেগুলো আসলে পলায়নপ্রবৃত্ত মানুষের গতিই কমাতে পারে মাত্র। পরিস্থিতি আরেকটু কঠিন হলে ওরা ওদের সমস্ত স্মৃতি--ছবি, স্মারক ইত্যাদি ফেলে দেয়। কেননা বর্তমানটাই ওদের কাছে একমাত্র প্রাধান্যপ্রদায়ী হয়ে ওঠে, যেখানে স্মৃতির কানাকড়ির দাম থাকে না। এরপর যখন পুলিশি বাঁধা পেরোতে গেলে দুয়েরই দলছুঁট হতে হবে, তখন কিট একা পালাতে বাধ্য হয়, কেননা হলি ততোক্ষণে ভীষণ ক্লান্ত। এভাবে পর মুহূর্তেই কিটের গাড়িতে হলির পোশাকও আবর্জনা হয়ে যায়, কিট ওগুলো রাস্তায় ফেলে দেয়।
পুলিশের হস্তগত হওয়ার পর কিটের হ্যাট খুলে ছুড়ে মারে পুলিশ। রাষ্ট্রীয় হ্যাট পরিহিত পুলিশ কিটকে বুঝিয়ে দেয় আইনের আওতায় আসার পর জনসাধারণের তিলেকমাত্র গোয়ার্তুমি পছন্দ করে না রাষ্ট্র। বিশেষত ‘সেকেন্ড ডিগ্রি’৫ পেরোবার পরে একজন মানুষের শেষ ব্যক্তি স্বাধীনতাও রাষ্ট্র যখন কেড়ে নেয়, তখন যেনো পুলিশ কিটের অযাচিত হ্যাটটা সহ্য করতে পারে না। কিট যখন আইনের আওতায়, ততোদিনে তার পলায়নপর যাবতীয় কর্মকাণ্ড অনেকেই জেনে গেছে। স্বাভাবিকভাবেই রাষ্ট্রীয় মূল্যবোধে দীক্ষিত অসংখ্য মানুষ কিটের এতোদিনের কর্মকাণ্ডের ‘মানে’ করতে পারে না। কেননা, কিট ঠিক সেগুলোই করেছে যা যা রাষ্ট্র করতে নিষেধ করে। সেজন্যই বোধহয় এক পুলিশ সদস্য কিটকে তার জীবনের লক্ষ্য জিজ্ঞেস করলে কিট জানায়, সে সবসময় ‘অপরাধী’ হতে চেয়েছে। রাষ্ট্রের চোখে যা অপরাধ সে কাজগুলোই সে বেছে বেছে করতে চেয়েছে। কিট এর এই ‘বলা’টা যেনো বের হয় এক বিপ্লবীর জবানিতে; যে প্রচলিত ব্যবস্থার পরিবর্তন চায়, বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থার ধ্বংস চায়। কিট আসলে বুঝে গেছে রাষ্ট্রের পছন্দের ‘বৈধ’ কাজগুলো করে এই ব্যবস্থা আরো সংহতই হবে শুধু; শাসনের নানা শৃঙ্খল নিয়ে রাষ্ট্র চেপে বসবে মানুষের সত্তাজুড়ে। বর্তমান রাষ্ট্রের চোখে ‘অবৈধ’ বিশেষ কিছু কাজ৬ বাদ দিয়ে বাকিগুলো ক্রমাগত করে যাওয়ার মধ্যে, রাষ্ট্রকথিত ‘ক্রিমিনাল’ সাজার মধ্যেই হয়তো সুপ্ত আছে ভবিষ্যতের মহামুক্তি।
উচ্চ আদালতে প্রেরণ করার আগেভাগে এয়ারফিল্ডে কিটকে ঘিরে অনেক সেনা ভিড় করে। তাদের সঙ্গে হাতকড়া লাগানো নিরাপদ দূরত্বে থাকা কিট এর হাস্যরসাত্মক বচসা হয়। সেসবের ফাঁকে কিট যেনো বুঝতে পারে তার দম দেওয়া বিদ্রোহের ঘড়িটার দম ফুরিয়ে গেছে। যেহেতু ততোক্ষণে তার পুরো ‘লড়াই’টা তাকে ভিড় করা সমস্ত শ্রোতার কাছেই এক ধরনের হাস্যকর উন্মাদনা ছাড়া কিছুই নয়। তাই কিট যেনো এক ভয়ঙ্কর অনর্থকতা খুঁজে পেলো তার বুকপকেটে রাখা চিরুনিটার মধ্যে। সবসময়ের সঙ্গী লাইটারে হঠাৎই ভিড় করলো অ্যাবসার্ডিটি। তাই এ দুই’কেই সে ছুড়ে দিলো সেনাদের মধ্যে। এভাবে সে নিজের নাস্তিত্বই যেনো ঘোষণা করলো, রাষ্ট্রীক কোনো বিচার বিভাগীয় পরিণতিকে পাত্তা না দিয়ে।
অতঃপর ‘কিট’রা যা চেয়েছিলো কিংবা চাইবে
অদ্য পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়ানো আছে অসংখ্য ব্যাডল্যান্ডস্। তাতে কিটরা কিন্তু নগন্য নয় বরং সংখ্যাটা বাড়ছে। আসলে আজকের কিটরা কী পাচ্ছে তা হয়তো ততোটা জরুরি কথা আর নয়, তারা কী চাইলো সেটা যতোটা জরুরি। তারা যা না পেয়ে যুগে যুগে রাষ্ট্র কর্তৃক অন্তর্হিত হচ্ছে, সেই না পাওয়াগুলো আরো জরুরি। কারণ, অপ্রাপ্তির এই লম্বা তালিকাটাই ভবিষ্যতের বেহিসাবি কিটদের অধিকার বোধটা বাড়িয়ে দেবে হাজারগুণ। এরপরে ব্যাডল্যান্ডস্ জুড়ে জারি হবে স্বাধীনতার পরোয়ানা। পাশাপাশি এ রকম একটা ব্যাডল্যান্ডস্-এ কিট যাওয়ার আগে আরো যা বলে গেলো তা মনে রাখাও বেশ জরুরি।
কিট এয়ার ভ্যানে ওঠার আগে তার কাছে থাকা শেষ প্রয়োজনীয় বস্তু কলমটাও ছুড়ে দেয় সেনাবাহিনীর সদস্যদের মধ্যে। সে কি এই ছুড়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে শুধুই নিজের নাস্তি ঘোষণার দফা টানলো, নাকি বলতে চাইলো আরো অনেক কিছু! হয়তো সে পৃথিবীর নতুন ইতিহাস লিখবার জন্য কলমের উপযুক্ততার নাস্তি ঘোষণা করলো। কেননা কালে কালে শাসকরা তাদের এলেবেলে, হঠকারি কাজকর্মের শুদ্ধতা টেনে নতুন বানোয়াট ইতিহাস লেখে এই কলম দিয়েই। আসলে এই ইতিহাস গুটিকয়েক শাসক-বুর্জোয়া পরিবারের ভালো করে মাত্র। তাই হয়তো কিট সেই কলম ছুড়ে দিলো যুবক সেনাবাহিনীর হাতে। কলমের সাহায্য নিয়ে তো বটেই; কিট হয়তো গুরুত্ব দিলো আগামীর তরুণদের পরিবর্তনকে ছুঁয়ে দেখবার বাসনা তথা সমূহ চেষ্টাকে। যেনো তরুণ সেনারা রাষ্ট্রীয় মতাদর্শ ভুলে একবার মানুষের আত্মা-চোখ দিয়ে মানুষের দিকে তাকালে ওরাও হয়ে উঠতে পারে মুক্তির দূত।
ব্যাডল্যান্ডস্ এর পিছনের ‘কীট’ মানে বর্তমান চলচ্চিত্রটির যিনি নির্মাতা তিনি টেরেন্স মালিক নামেই খ্যাত। অ্যামেরিকান এই নির্মাতার ডেব্যু হলো এই ব্যাডল্যান্ডস্ (১৯৭৩)। মালিকের চলচ্চিত্র দর্শনের প্রধানতম ভাবনা হলো জীবন। তিনি জীবনকে, জীবনের জায়মানতাকে স্থান দেন সবকিছুর ঊর্ধ্বে। এক্ষণে বলাই বাহুল্য লেখাটিতে বর্তমান তিনটি দার্শনিক প্রপঞ্চ হলো তার গোটা চলচ্চিত্রযাত্রার প্রধান সঙ্গী। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ বিষয়ে নির্মিত দ্য থিন রেড লাইন (১৯৯৮) চলচ্চিত্রেও মালিক অ্যাবসার্ডিজম নিয়ে যারপরনাই প্রমত্ত। যেখানে যুদ্ধরত সৈন্যদলের সারিকে তিনি অনন্য সিনেমাটোগ্রাফির সহায়তায় পিঁপড়ার সারির মতো করে দেখান। এখানেও যেনো দম্ভিত মানবজাতির যাবতীয় আগ্রাসী চেতনাকে তিনি শোনাতে চান খোদ মানুষের ক্ষুদ্রতার গল্প। আসলে ব্যাডল্যান্ডস্-ও এক মহাপৃথিবীতে ছুটে চলা ক্ষুদ্র মানবজীবনের যাবতীয় অনর্থকতার গল্প বলতে চায়। কিন্তু সে অনর্থকতায় আছে তীব্র প্রতিবাদ, আছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে চোখ গরম করা চাহনি। এ রকম অসংখ্য অনর্থকতা ধারণ করে এই চলচ্চিত্র নিজেই হয়ে উঠেছে অ্যাবসার্ডিটির এক মহাবয়ান। অ্যাবসার্ড চলচ্চিত্রধারায় চ্যাপলিন, কিটন-এর পরে বলবার মতো নাম খুবই কম। তবে মালিক পেরেছেন ভিন্নভাবে একটা নেশাতুর অ্যাবসার্ডিটির জগৎ, মানবজীবনে ভর করা একটা ‘আছি-নেই’য়ের এক্সিজটেন্সকে তুলে ধরে দারুণ একটা গল্প বলতে! জয় মালিক!
লেখক : তানভীর শাওন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী।
shawonmcj26@gmail.com
https://www.facebook.com/tanveeshawon
তথ্যসূত্র ও টীকা
1. https://rb.gy/yib0zd; retrieved on: 25.11.2020
২. অস্তিত্ববাদের সার্বিক ক্ষেত্র নয়; বরং আলোচ্য চলচ্চিত্রে বিশেষ ধরনের অস্তিত্ববাদের প্রয়োগ ঘটেছে।
৩. আলবেয়ার কামু বা স্যামুয়েল বেকেটের অ্যাবসার্ডিজমের এক বিশেষ চওড়া ধরনের বয়ান বর্তমান চলচ্চিত্রের সর্বাঙ্গে লক্ষণীয়। তাই এক্ষেত্রে বিভ্রান্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
৪. শব্দখানার প্রয়োগ এখানে প্রচলিত অর্থে বিশৃঙ্খলা নয় বরং সমাজব্যবস্থার এক মতাদর্শের নাম; যার যথাযথ নাম অরাজপন্থা।
৫. নাগরিক স্বাধীনতা হরণ করে কোনো ব্যক্তিকে পুলিশ আটক করলে তাকে বলা হয় ফার্স্ট ডিগ্রি। ব্যক্তিকে থানায় স্থানান্তর করাকে বলে সেকেন্ড ডিগ্রি; অতঃপর সহিংস পদ্ধতিতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলো থার্ড ডিগ্রি। বলা প্রয়োজন, তৃতীয়টি সংবিধানবিরোধী।
৬. জনগণের চোখে ন্যায়ের দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করতে গিয়ে কিছু কাজকে রাষ্ট্রের অবশ্যই অবৈধ ঘোষণা করতে হয়। যদিও সেটা রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব ফলানোর আরেকটা ছুঁতো মাত্র!
বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ২০তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২১ এ প্রকাশিত হয়েছে।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন