সৌমিত্র দস্তিদার
প্রকাশিত ০৮ অক্টোবর ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
গাঁস্ত রোবের্জ এবং প্রামাণ্যচিত্র
সৌমিত্র দস্তিদার

সবে তখন সিনেমা করবো করবো বলে তোড়জোর করছি; কিন্তু করা হয়ে উঠছে না। এ যেনো তেল মেখে পুকুরপাড়ে বসে থাকা; জলে নামা আর হচ্ছে না। এই অবস্থায় কোনো এক কারণে ‘চিত্রবাণী’ যেতে হয়েছিলো। শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতিধন্য মৌলানা আজাদ কলেজের খুব কাছে সাদামাটা এক গীর্জার ভিতরে ‘চিত্রবাণী’ এক ফিল্ম ইন্সটিটিউট। অবশ্য ইন্সটিটিউট না বলে এক স্বপ্নঘর বলা যায়। জেসুইট এক ফাদার গাঁস্ত রোবের্জ তিলে তিলে এই সিনেমা সংগঠনটিকে গড়ে তুলেছিলেন।
সেই কোন অতীতে, ১৯৬১ তে কানাডা থেকে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে পড়াতে এসে সিনেমার প্রেমে পড়ে যাওয়া এক ফাদার কিংবদন্তি হয়ে উঠলেন কীভাবে তা নিয়েই নির্মিত হতে পারে এক চমৎকার সিনেমা। কলকাতায় তখনো সত্যজিৎ রায় বেঁচে। কাজ করে যাচ্ছেন দাপটে। মৃণাল সেন সেলুলয়েডে মাঝে মধ্যেই ফেটে পড়ছেন রাগ ও ঘৃণায়। অশ্লীল এক সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে। তপন সিংহ বানাচ্ছেন অশান্ত সময়ের এক জীবন্ত দলিল, আপনজন (১৯৬৮)। পাশাপাশি চা বাগানের শ্রমিক আন্দোলন, এদেশের বামপন্থি হঠকারী বিচ্যুতি নিয়ে সাগিনা মাহাতো। নিম্নবর্গের মানুষের আখ্যান নির্মিত হচ্ছে তরুণ মজুমদারের পরিচালনায়। সিংহ বিক্রমে রাজত্ব করছেন ঋত্বিক ঘটক। সবমিলিয়ে সত্যি সে এক অন্য সময়। শহরের বাতাসে তখন বারুদের গন্ধ। দেয়ালে দেয়ালে নতুন এক সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান।
নীরবে ফাদার গাঁস্ত রোবের্জ সমাজের রাজনীতি অর্থনীতির যাবতীয় চালচিত্র কীভাবে সিনেমার পর্দায় নিয়ে আসেন, নিয়ে আসা সম্ভব, তাই নিয়ে গড়ে তুললেন এক অভিনব গবেষণা কেন্দ্র--‘চিত্রবাণী’। ‘চিত্রবাণী’ শুধু সিনেমা নয়, ইতিহাস ভূগোল, সমাজতত্ত্ব, সাহিত্য, রাজনীতি, অর্থনীতি, এমনকি কলকাতার বস্তি জীবন সবকিছুর পাঠ দিতো। ‘চিত্রবাণী’ একটি লাইব্রেরিও করেছিলো। পরবর্তী সময়ে সেই লাইব্রেরিতে যাওয়ার সুযোগ হয় আমার। তরুণ বয়সে ‘চিত্রবাণী’ লাইব্রেরি যে কতোটা সমৃদ্ধ করেছিলো আমাদের মতো একবুক সিনেমা করার স্বপ্নালু তরুণদের তা বলে বোঝাতে পারবো না। আসলে ‘চিত্রবাণী’ সর্ব অর্থেই ছিলো স্বপ্ন নির্মাণের কারিগর। আর তার প্রধান স্থপতি ছিলেন সদ্য প্রয়াত ফাদার রোবের্জ।
দুই.
ফাদার কেনো এতো আলাদা! কেনো মৃত্যুর বেশ কয়েক মাস পরেও তাকে নিয়ে লিখতে বা বলতে গিয়ে বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়ি! এটা যারা ফাদারকে চিনতেন, জানতেন তারাই শুধু উত্তর দিতে পারবেন।
ফাদার ছিলেন এমন একজন ব্যক্তি যিনি, ওই যে আগে বলেছি তেল মেখে পুকুর পাড়ে বসে থাকা লোকজন, যারা পুকুরের জলে নেমে চান করতে ভয় পায়। ফলে কোনোদিনই আর কাজের কাজ করা হয় না, সেরকম ভীরু দ্বিধাগ্রস্ত লোকদের তিনি ধাক্কা মেরে জলে ফেলে দিয়ে সাঁতার শেখানোর সাহস দিতেন।
ফাদার কখন কীভাবে যে অল্পবয়সিদের মধ্যে স্বপ্ন চাড়িয়ে দিতেন তা তিনি নিজেও টের পেতেন না। এমনিতে কিন্তু ফাদার খুব রাশভারী, গম্ভীর ছিলেন না। তবে এমন এক ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যাকে সমীহ না করে অস্বীকার করার উপায় ছিলো না। অদ্ভুত কিছু দিক ছিলো গাঁস্ত রোবের্জের। যা প্রথম আলাপেই বুঝে গেছিলাম। সম্ভবত ‘চিত্রবাণী’র লাইব্রেরির সদস্য হবো বলেই গেছিলাম। লাইব্রেরিয়ান ছিলেন অভিনয়শিল্পী পরমব্রত চট্টপাধ্যায়ের মা সুনেত্রা ঘটক। সম্পর্কে ঋত্বিক ঘটকের ভাইঝি। অসম্ভব পড়ুয়া, সিনেমাবোদ্ধা। নানা কারণে আগে থেকেই আমরা দুজন দুজনকে চিনতাম। সুনেত্রা দি-ই পরামর্শ দিলেন, এলেই যখন একবার ফাদারের সঙ্গে আলাপ করে যাও। এখন ঘরে একাই আছেন। তোমাদের মতো তরুণ সিনেমাপ্রেমীদের সঙ্গে আড্ডা দিতে খুব ভালোবাসেন। যাও উনি খুশি হবেন। ভয়ে ভয়ে ফাদারের ঘরের দরজায় টোকা মারবো মারবো করছি। সুনেত্রা দি প্রায় ছুটে এসে ফিসফিসিয়ে বললেন, আচ্ছা শোনো ভুলেও কিন্তু ওনার সঙ্গে ইংরেজি বলবে না। বাঙালি, সে যদি বাংলা না বলে তাহলে কিন্তু উনি ক্ষেপে যেতে পারেন।
টোকা মারতেই ঘরের মধ্যে থেকে জলদগম্ভীর গলায় নির্দেশ এলো, ইয়েস কাম ইন। ভিতরে ঢুকতেই সামান্য হেসে জানতে চাইলেন, বলো ইয়ংম্যান তোমার জন্য আমি কী করতে পারি! মুহূর্তে আমার ভিতরকার যাবতীয় জড়তা কোথায় যেনো মিলিয়ে গেলো। অমন পণ্ডিত ফাদারের সঙ্গে গল্প-আড্ডায় মেতে উঠলাম। ফাদার বক্তা আর আমি মুগ্ধ শ্রোতা। উনি সেই প্রথম দিনেই আমাকে আক্ষরিক অর্থেই জ্ঞান সমুদ্রে ফেলে দিলেন। আর আমি ধূলোবালি কুড়োবার স্বপ্ন নিয়ে শুধুই পাড় দিয়ে দীর্ঘ একসময় হাঁটছি আর হাঁটছি।
কেমন একটা ঘোরের মধ্যে ফাদারের ঘর থেকে বেরিয়ে সোজা বড়ো রাস্তায় নেমে হাঁটতে লাগলাম। কোথায় যাচ্ছি, কেনো যাচ্ছি তাও জানি না। উদ্দেশ্যহীনভাবে পথ চলেছি। আসলে ফাদার প্রথম দিনেই আমার মেজাজ খানিকটা চনমনে করে দিয়েছিলেন। পরেও বহুবার বলতেন যে, মেজাজটাই তো আসল রাজা হে। মনে কোনো হীনমন্যতা নিয়ে বড়ো কাজ করতে পারবে না। একজন ফিল্মমেকার সবসময় রাজা, সম্রাট। প্রত্যেকের মধ্যে একটা কিলার ইনস্টিংক্ট থাকে। সময় মতো যে সেটা বের করে আনতে পারে, সেই সিকান্দার। ফাদার চলে যাবার পর আচমকাই মনে হলো ফাদার আপাত শান্ত মেজাজের হলেও প্রকৃতপক্ষে ছিলেন ফায়ার ফাইটার, আগুনখেকো এক মহাবিপ্লবী। তিনি ছিলেন সেই গোত্রের ধর্মযাজক যারা মনে করেন যিশু স্বয়ং ছিলেন একজন আদি কমিউনিস্ট।
আজ এতো বছর বাদে ফাদার ঠিক কী বলেছিলেন মনে নেই। শুধু এটুকু মনে আছে তিনি বলতে চেয়েছিলেন, সিনেমা এক ম্যারাথন দৌড়। কখনো কখনো বড়ো বেশি একা নিঃসঙ্গ লাগবে। যতো এগোবে ততোই প্রশংসা নিন্দে দুই-ই জুটবে। ধৈর্য ধরে এগোতে হবে। হাল ছেড়ে দিলে চলবে না। ফাদারের দৌলতেই ডকুমেন্টারি ফিল্মকে ভালোবাসতে শিখেছিলাম। উনিই প্রথম বলেছিলেন, ডকুমেন্টারি সিনেমা সিনেমাই। এ এক অন্য ফর্ম মাত্র। অনেকেই ভাবেন যে, প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ আসলে কাহিনিচিত্র নির্মাণের প্রস্তুতি মাত্র। এই মাধ্যমে অ আ ক খ শিখে পরে ফিচার করবে। গাঁস্ত রোবের্জ এই ধরনের চিন্তাভাবনা যারা করেন তাদের অপছন্দ করতেন। তিনি আপাত নীরস ডকুমেন্টারি ফিল্মেও কতো সৌন্দর্য খুঁজে পাওয়া যায় তা সহজ করে মাথায় গেঁথে দিয়েছিলেন। ফলে জীবনে পেইজ থ্রিতে নাম বের হবে না জেনেও পেশা হিসেবে ডকুমেন্টারি ফিল্মকে বেছে নিতে কখনো কোনো দ্বিধা হয়নি।
তিন.
রোবের্জের কলকাতায় তখন কফি হাউসের আড্ডায় তুমুল তর্ক হতো ঋত্বিক ও মৃণালকে বড়ো রাজনৈতিক ফিল্ম মেকার কি না তাই নিয়ে। সত্যজিৎ রায় তখনো বিপ্লবী মহলে পুরোপুরি ব্রাত্য না হলেও নিশ্চিত সংশোধনবাদী। অনেক পরে ফাদার আমাদের সে ভুল ভেঙ্গে দিয়েছিলেন। উনি একের পর এক শট্ বিশ্লেষণ করে বোঝাতে পেরেছিলেন যে, কবিতাও কখনো কখনো রাজনৈতিক স্লোগান হতে পারে। লাউড, উচ্চ কোটি চিৎকার মানেই তা পলিটিকালি কারেক্ট, রাজনৈতিকভাবে ঠিকঠাক; আর নিরুচ্চার, মৃদু গলায় কথা বললেই তা যথার্থ বৈপ্লবিক নয়, এই ভুল ধারণা ফাদার যুক্তি দিয়ে বুঝিয়েছিলেন। এখন এতোদিন বাদে গুপী গাইন বাঘা বাইন, হীরক রাজার দেশে থেকে ফেলুদা সিরিজের একাধিক সিনেমা, গণশত্রু কতোটা রাজনৈতিক তা পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে।
শোলে বা বেদের মেয়ে জোস্না এ ধরনের সিনেমা নিয়ে তর্কেও সমান উৎসাহ ছিলো ফাদারের। শোলের ঠাকুর বনাম ডাকাতদের লড়াইকে ভারতের জাতপাতের রাজনীতির সেলুলয়েড বয়ান ভাবতে ফাদারই শিখিয়েছিলেন। জনপ্রিয় শোলের মধ্যেই কিন্তু উচ্চবর্গের হিন্দু ধনী সম্প্রদায়ের প্রাইভেট আর্মি পোষার বৈধতা জনমনে চাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিলো। এই জায়গায় দাঁড়িয়েই ফাদার আমাদের পরিষ্কার করে দিয়েছিলেন যে, সব সিনেমাই কোনো না কোনোভাবে রাজনৈতিক সিনেমা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সে জেনে অথবা না জেনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্ধ অনুসারীও।
চার.
৭০ দশকের উত্তাল সময়ে পশ্চিমবঙ্গের ডকুমেন্টারি ফিল্মেও এক নিউওয়েভের জন্ম হয়েছিলো। উৎপলেন্দু চক্রবর্তী, গৌতম ঘোষ, পরের দিকে রঞ্জন পালিত, বসুধা যোশী, সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে যে কজন ঝড় তুলেছিলেন এ বঙ্গ থেকে তাদের সবার সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে সম্পর্ক ছিলো ‘চিত্রবাণী’র।
ফাদার গাঁস্ত রোবের্জ ও ‘চিত্রবাণী’ আমাদের মতো একটু অন্যরকম সিনেমা নির্মাণের স্বপ্ন দেখিয়ে তরুণদের সবচেয়ে যে উপকার করেছিলো তা হচ্ছে প্রবল আত্মবিশ্বাসী করে তোলা। ডকুমেন্টারি ফিল্ম কতোটা গুরুত্বপূর্ণ তা শিখতে পেরেছিলাম ফাদারের কাছ থেকেই।
নিজে ডকুমেন্টারি ফিল্মমেকার বলে মনে হতেই পারে যে, বাড়িয়ে বলছি। অবশ্য তর্ক করবো না। কিন্তু এটা ঠিক ডকুমেন্টারি ফিল্মের প্রতি ফাদারের নিশ্চিত কিছু পক্ষপাত ছিলো। মনে আছে তখন সবে গুজরাত গণহত্যা নিয়ে ডকুমেন্টারি করে কলকাতায় ফিরেছি। সে এক অভিজ্ঞতা। সিনেমা করতে গেছি না যুদ্ধ ক্ষেত্রের সৈনিক নিজেরাই বুঝতে পারছি না। কখনো ছুটতে ছুটতে, কখনো পোড়া মসজিদের আড়াল থেকে শট্ নিচ্ছি। এক একটি বিধ্বস্ত মহল্লায় গেছি।
ক্যামেরা খুলতে না খুলতেই শোরগোল পড়ে গেলো, ভাগো ভাগো ও লোগ আ রহা ...; বলাই বাহুল্য ও লোগ হচ্ছে আর এস এস, বজরঙ দল ও অন্যান্য উগ্র হিংস্র হিন্দুবাদী বাহিনী। কলকাতায় ফিরে অন্য একটি ফিল্ম ইন্সটিটিউটে ডিরেক্টর অনিতা অগ্নিহোত্রীর উদ্যোগে রাশ দেখা হবে ঠিক হলো। দুপুরে দেখানোর সময় দেখি ফাদার গাঁস্ত রোবের্জ স্বয়ং এসে হাজির। ফিল্মের বহু শিক্ষার্থীও চলে এসেছে। তখন তো গুজরাত সারা পৃথিবীতে চর্চার বিষয়। পাঁচ ঘণ্টার ফুটেজ পিন পড়লেও শোনা যায়, এমন শীতল ঠাণ্ডা পরিবেশেও সবাই চোখ বড়ো বড়ো করে দেখলো। বন্ধুরা হাত এগিয়ে দিলো। ফাদার মৃদু হেসে বললেন, কাল সকালে তুমি কি ফ্রি থাকবে! তাহলে ফোন করবো। নীরবে চলে যাওয়ার দিকে নির্নিমেষে তাকিয়ে রইলাম।
ঘড়ির কাঁটা মিলিয়ে ঠিক আটটায় ঘরের ল্যান্ড ফোন বেজে উঠলো। তখন তো আর মোবাইলের চল ছিলো না। রিসিভারের উল্টো দিকে গম্ভীর গলায় ফাদার বলে উঠলেন, ওয়েল ডান মাই বয়। মে গড ব্লেস ইউ।
তারপর মেকিং নিয়ে খুঁটিনাটি বহু কিছু জিজ্ঞেস করলেন। আন্দাজ করেছিলাম যে, ফাদার এই নিয়ে বিশদে জানতে চাইবেন। উনি জানতেন কাজটা কতোটা কঠিন! এ ধরনের সিনেমাতে না আছে কোনো নির্দিষ্ট চিত্রনাট্য, না আগাম হোমওয়ার্ক। আগুনজ্বলা এক জনপদে পদে পদে বিপদ মাথায় নিয়ে শুটিং করা।
পাঁচ.
একবার দিল্লির জামিয়া মিলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা স্ক্রিনিং করে আড্ডা মারছি। আমাদের বন্ধু ফিল্মতাত্ত্বিক রাধা ডোরাইস্বামী নিজের একটা লেখা পড়তে দিলো। উল্টে দেখি বিষয়টি ইন্টারেস্টিং। রাধা লিখেছে, মাল্টিপ্লেক্স কালচারের বিরুদ্ধে জনতার মাল্টিপ্লেক্স গড়ে তুলতে হবে। ফাদার বিষয়টা শুনে খুব খুশি হয়েছিলেন। তিনি সবসময় সিনেমাকে কতোটা জনমুখী করা যায়, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করতেন। গাঁস্ত রোবের্জ সিনেমা নিয়ে একাধিক বইও লিখেছেন। তার মধ্যে আমার কাছে অবশ্য পাঠ্য ফাদারের ‘অ্যানাদার ফিল্ম ফর অ্যানাদার সোসাইটি’ বইটি। এ বইয়ে ফাদার বার বার গুরুত্ব দিয়েছেন, নতুন ধারার ফিল্ম বানাতে হলে নতুন এক দর্শক গোষ্ঠীও গড়ে তুলতে হবে।
ছয়.
ডকুমেন্টারি ফিল্মের ফর্ম নিয়ে যতোটা ভাবি আমরা তার চেয়ে সাধারণত কম চিন্তা করি কনটেন্ট বা বিষয় নিয়ে। অথচ কনটেন্ট নিয়েও কতো রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ আছে। একটা ধারণা অনেক সময় তরুণদের মধ্যে দেখি তারা অত্যধিক ঝাঁ চকচকে ডকুমেন্টারি বানাতে চায়। এ এক ধরনের চমক। চমক ও আধুনিকতা এক নয়। ডকুমেন্টারি ফিল্মের নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই। একেকজন কীভাবে বিষয়কে প্রকাশ করবে তার কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম থাকতে পারে না। একটা কঠিন প্রবন্ধ সবার ভালো লাগে না। তার মানে প্রবন্ধটা খারাপ তা কিন্তু নয়। আসলে প্রবন্ধ পড়ার অভ্যাস নেই বলে লেখাটা কঠিন লাগছে। সিনেমা প্রবন্ধ নিয়ে সমালোচনা কম নেই। ওই একই কারণ। দেখার অভ্যাস নেই বলে ভালো লাগছে না। এজন্যই ফাদার গাঁস্ত রোবের্জ বলতেন, সিনেমা করতে গেলে বহু বিষয় আয়ত্ত করতে হবে। পেইন্টিং, কবিতা, রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি, গদ্য সাহিত্য, সঙ্গীত, নানা বিষয় চর্চা না থাকলে ভালো নির্মাতা হওয়া কঠিন।
ফলে একটা ইন্সটিটিউটেও ছোটো ছোটো গ্রুপ তৈরি করে সিনেমার পাশাপাশি সমান্তরাল অন্যান্য বিষয় নিয়ে চর্চা করাটা খুব জরুরি। গাঁস্ত রোবের্জ এক ধরনের টোটাল মেকার গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখতেন। ফাদার সম্পর্কে যতো জানবেন ততোই ডকুমেন্টারি ফিল্ম সম্বন্ধেও আগ্রহ বাড়বে।
লেখক : সৌমিত্র দস্তিদার, ভারতের প্রখ্যাত প্রামাণ্যচিত্রনির্মাতা। তার নির্মিত প্রামাণ্যচিত্রের মধ্যে রয়েছে নাথিং অফিসিয়াল, জেনোসাইড অ্যান্ড আফটার, সীমান্তআখ্যান, মুসলমানের কথা প্রভৃতি।
sdastidar27@gmail.com
https://www.facebook.com/profile.php?id=100008406968120
বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ২০ তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২১ এ প্রকাশিত হয়েছে।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন