Magic Lanthon

               

অনুপম সেন অমি

প্রকাশিত ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

আমার ‘দেবী’ দর্শন

পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়নের সঙ্কট ও বর্জ্য জন-গোষ্ঠীর কল্পিত আবাসন প্রকল্প

অনুপম সেন অমি


প্রিয়াঙ্কা ব্যানার্জি পরিচালিত হিন্দি ভাষার ছোটো চলচ্চিত্র দেবী নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে সবখানেই নানান আলাপ হচ্ছে। ‘প্রথম আলো’ লিখেছে, “কোনো শর্টফিল্মের ক্ষেত্রে সচরাচর ঘটে না এই ঘটনা। কাজল, নেহা ধুপিয়া, শ্রুতি হাসান অভিনীত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘দেবী’ পার করেছে ইউটিউবে ১ কোটি ভিউয়ের মাইলফলক। আরও স্পষ্টভাবে বললে হয়, এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সিনেমাটি দেখা হয়েছে ১ কোটি ১০ লাখ বার।”১

এই চলচ্চিত্রে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছে বলিউডের পরিচিত ও জনপ্রিয় মুখ কাজল ও নেহা ধুপিয়া। নয়টি চরিত্রে আছে আরো অনেকে। দেবীতে দেখানো হয়েছে, যৌন নিপীড়নের শিকার বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার নারীরা এমন একটি ঘরে আশ্রয় পেয়েছে/নিয়েছে, যে ঘরটি হয়ে উঠেছে একটি সামাজিক-সাংস্কৃতিক স্পেইস, যেখানে এক ছাদের নিচে ধর্ম ও বর্ণবৈষম্যের তোয়াক্কা না করেই সব বয়সের, শ্রেণির, ধর্মের, পেশার মানুষ একসঙ্গে থাকতে পারে। আরো একটা বিষয় না বললেই নয়, তা হলো এখানকার সব নারী চরিত্রই আসলে মৃত। এই নারী চরিত্ররা সেইসব নির্যাতিত ও নিপীড়িত নারীদের প্রতিনিধিত্ব করছে, যারা তাদের বিরুদ্ধে হওয়া অপরাধের কোনো বিচার পায়নি রাষ্ট্রের কাছে। যেহেতু এই ঘর মূলত মৃতদের থাকার জায়গা, তাই এই চার দেয়াল এক পারলৌকিক সম্ভাবনা। পরিষ্কার করে বলতে গেলে, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে এই সহাবস্থান মূলত একটা পারলৌকিক ইউটোপিয়া যা আমাদের ইহজাগতিক সম্প্রদায় ও জাতি-সচেতন রাষ্ট্র ব্যবস্থাকেই হয়তো তামাশা করতে প্রস্তুত।

দুই.

দেবী নিয়ে যতো পাঠ-প্রতিক্রিয়া ও পাঠালোচনা আমার নজরে এসেছে তার অধিকাংশই মূলত চলচ্চিত্রটির যে সারফেইস ভাবনা তার আলোকেই সাজানো। এইসব আলাপের সাধারণ কিছু নমুনা আমি এখানে তুলে দিচ্ছি--১. ধর্ষণ যে একটা সামাজিক ব্যাধি হয়ে গেছে দেবী তা ভালোভাবেই ফুটিয়ে তুলেছে; ২. ভারতীয় সমাজে একটা ধর্ষণবিরোধী আওয়াজ খুবই দরকার। আর ‘মেইন্সট্রিম’ সিনেমার শিল্পীরা (অবশ্য বলিউড বলেই এই রকম কথা আসছে, কারণ এই ঘরানার জনপ্রিয় শিল্পীরা যারা সাধারণত প্রধান চরিত্রে অভিনয় করতে অভ্যস্ত, খুব কমই ছোটো সিনেমায় কাজ করে) যখন এই রকম ‘গণ-দাবি নিয়ে আওয়াজ তোলা’ কোনো ছোটো চলচ্চিত্রে কাজ করে তা অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে; ৩. অফ ট্র্যাক চলচ্চিত্রের ‘মেইন্সট্রিমিং’ হওয়া খুবই দরকার; ৪. কাজল যে এখানে অভিনয় করছেন তা খুব সহজেই এই সিনেমার ‘মেইন্সট্রিম’ দর্শকের (পড়ুন, ম্যাস পিপল) কাছে সহজেই নিয়ে গেছে; ৫. এই চলচ্চিত্রের যে দিকটা সবার কাছে পরিষ্কার হয়েছে, তা হলো ধর্ষণ কোনো পোশাক, বয়স, ধর্ম মেনে হয় না; বরং ধর্ষণ একধরনের প্যাথলজি আর পারভার্সনের প্রকাশ; ৬. সিনেমার মুন্সিয়ানা (নির্দেশকের কারিগরি ও কলাকুশলীদের অভিনয় বোঝাতে) নিয়ে কারো কোনো দ্বিমত নেই।

এখন প্রশ্ন হলো, এই বিশেষ আলাপ বা পাঠ-ভাবনাকে তালিকাভুক্ত করার মাধ্যমে আমি আসলে কী বুঝতে অথবা বোঝাতে চাচ্ছি? এর উত্তর সহজ। আমি আসলে এই নমুনা মন্তব্যগুলোকে মাথায় রেখে ভিন্ন একটা পাঠ-ভাবনা এই লেখাতে তুলে ধরতে চাই, যাতে করে উপরে উল্লেখ করা তালিকাভুক্ত এইসব তরিকার বাইরে গিয়ে সিনেমাটার একটা অন্যরকম বয়ান উপস্থাপন করা সম্ভব হয়, অন্তত আমার পক্ষে। সোজা ভাষায় বলতে গেলে, আমি একটু নতুনভাবে বা অন্যরকম করে দেবীকে দেখতে এবং পড়তে চাইছি। সেই ক্ষেত্রে, উপরের এই নমুনা আলাপগুলো আমাকে একই তরিকায় সিনেমাটাকে না দেখতে/পড়তে সাহায্য করবে। অর্থাৎ আমি ভিন্ন পথে টেক্সটের সঙ্গে আমার পড়া ও দেখার বোঝাপড়া করতে চাচ্ছি এই লেখাটিতে। মূলত প্রধানতম বয়ানের বাইরে গিয়ে অন্য স্বরে বুঝতে চাইছি একটা টেক্সটকে। যেমন ধরেন, দেবীর ক্ষেত্রে আমরা যা দেখি তা হলো এটি একটি ধর্ষণবিরোধী চলচ্চিত্র। সমাজে পুরুষ ও পুরুষতন্ত্র দ্বারা নারীরা যে নির্যাতিত হচ্ছে গল্পে তার দৃশ্যমান এবং রূপক উপস্থাপন হাজির করা হয়েছে। ১৩ মিনিটের এই চলচ্চিত্রে এসব বক্তব্যই গল্পের সারফেইসে উঠে এসেছে অনায়াসে।

এই মর্মেই ভারতে (পড়ুন, ভারতীয় উপমহাদেশে) নারী নির্যাতন ও যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে এই চলচ্চিত্রকে সবাই এক অনবদ্য উদাহরণ হিসেবে অ্যাকাডেমি অথবা এর বাইরে হাজির করার ফুরসত হয়তো পাবে (যদি আসলেই কেউ তা চায়)। কিন্তু চলচ্চিত্রের এই যৌন নিপীড়ন/ধর্ষণবিরোধী বক্তব্যের বাইরেও একটা বিষয় আছে। যা সাধারণ আলোচনায় হয়তো এখনো সেরকমভাবে উঠে আসেনি। এই চলচ্চিত্রকে আমরা কিন্তু একই সঙ্গে বর্তমান বিশ্বের রিফিউজি ও গৃহহীন মানুষের সঙ্কটের গল্প হিসেবে পাঠ করতে পারি। অন্তত এই লেখাতে আমি ১৩ মিনিটের এই ভিডিও টেক্সটটিকে এই আঙ্গিক থেকেই পাঠ করতে চাইছি। বলা যেতে পারে, আমার এই পাঠ-প্রচেষ্টা গল্পের যে মূল ভাবনা তার সঙ্গে নতুন একটা মাত্রাই শুধু যুক্ত করবে, কেননা গল্পের মূল ভাবনাকে কোনোভাবে খারিজ না করে বরং ওই আপাত দৃশ্যমান ভাবনার পাটাতনের ওপর ভর করেই আমি আমার আলাপকে এগিয়ে নিয়ে যাবো।

তিন.

প্রিয়াঙ্কা ব্যানার্জির স্বল্পদৈর্ঘ্যরে এই চলচ্চিত্রটি নিয়ে আলাপের আগে আমি পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়নের কালে মানুষ কীভাবে বর্জ্যে পরিণত হয়, তা নিয়ে প্রথমে কথা বলবো। পুঁজি রাষ্ট্রব্যবস্থার সিস্টেমটাই এমন যে অনুৎপাদনশীল ও অক্ষম/বাতিল জনগোষ্ঠী এখানে সহজেই গৌণ ও বাহুল্য হয়ে পড়ে। বাউমেন-এর মতে, ÔRefugees, the displaced, asylum seekers, migrants, the sans papiers, they are the waste of globalization.Õ২ কেনো এরা সহজেই বর্জ্যে পরিণত হয়? কারণটা সহজ। এই শ্রেণির লোকেরা পুঁজিতান্ত্রিক অর্থনীতির বোঝা। বাউমেনের ভাবনা অনুসরণ করেই বলা যেতে পারে, এই বর্জ্য বা উদ্বৃত্ত জনগোষ্ঠীর উৎপাদন ও পুনরুৎপাদন ঘটে আধুনিক বিশ্ব এবং তার পুঁজিতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোর অভ্যন্তরেই। এই বাহুল্য জনগোষ্ঠীকে পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রের নানান সংঘ আর মোটেই প্রয়োজনীয় মনে করে না, আর তাই রাষ্ট্রের অফিসিয়াল ইতিহাসেও এদের অন্তর্ভুক্তির প্রয়োজন হয় না।

পুঁজি রাষ্ট্র তার নিয়ন্ত্রণ কায়েমের জন্যই এই রকম রিডান্ডান্ট মানব-গোষ্ঠী পয়দা করতে থাকে। এই ক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে আমরা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কথা ভাবতে পারি। যখন রাষ্ট্র আইন করেই রোহিঙ্গাদের নাগরিক তালিকার বাইরে বের করে দিলো, তখন এদের স্থান হলো কাঁটাতারের বেড়ার মধ্যে। এমন বাতিল জনগোষ্ঠীর সংখ্যা এই পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়নের যুগে শুধু বেড়েই চলেছে। এর শুরু হিসেবে আমরা ৯/১১ পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময়টাকেই ধরতে পারি। অনন্ত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ যখন থেকে ঘোষিত হলো তখন থেকেই বিশ্বে বর্জ্য ও পরিত্যক্ত জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়তে থাকলো। এই যুদ্ধ আসলে কাদের বিরুদ্ধে? ফরহাদ মজহার তার ফেইসবুকের এক স্ট্যাটাসে লিখেছেন,

এই যুদ্ধ রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের না, বরং যাদের কোন রাষ্ট্র নাই--পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্ব ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্র সমূহের সংঘ যাদের আর মানবেতিহাসে অন্তর্ভুক্ত করে নিতে রাজি না, যারা বাড়তি জনসংখ্যা, বর্জ্য--যুদ্ধ এই ‘অপর’, ‘বাতিল’, ‘বর্জ্য’ ও ‘পরিত্যক্ত’দের বিরুদ্ধে তথাকথিত পুঁজির এবং পুঁজিতান্ত্রিক রাষ্ট্রের। দুনিয়ার ক্ষমতাসীন ও মাতব্বরদের ভাষায় ‘নন-স্টেইট এক্টর’দের বিরুদ্ধে পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্ব রাষ্ট্র ব্যবস্থার। লড়াই এখন আর কোন বিশেষ রাষ্ট্রের পরিমণ্ডলে নাই। জয় পরাজয়ও রাষ্ট্রীয় পরিমণ্ডলে নির্ণিত হবে না। এটা নতুন লড়াই, নতুন মানবেতিহাসের পদধ্বনি।৩

আর এই অনন্ত যুদ্ধের পরিণতিতে বেরিয়ে আসা পরিত্যক্ত ও বর্জ্য জনগোষ্ঠীর জন্য প্রস্তুত করা হয় নানান ডাম্পিং গ্রাউন্ডের। একসময় যা নো ম্যান্স ল্যান্ড ভাবা হতো, সময়ের পরিক্রমায় কাঁটাতার তৈরি করে এখন সেখানে রাখা হয় বাতিল মানুষদের যাদের কোনো রাষ্ট্র নেই, সংঘ নেই, নেই কোনো আওয়াজ। এখানে যারা স্থান পায় তারাই ‘অপর’, তারাই বর্জ্য। বাউমেনের ভাষায়, এই বাতিল মানবগোষ্ঠীরাই হলো Ôhuman waste of modernizationÕ যাদের স্থান ফিজিকালি ও মেটাফরিকালি সবসময় রাষ্ট্রের বাইরে।

চার.

আমার উপরের এই আলোচনা এখন আমাদের বুঝতে সাহায্য করবে কীভাবে প্রিয়াঙ্কা ব্যানার্জির এই অধুনা জনপ্রিয় ছোটো চলচ্চিত্র দেবী পরোক্ষভাবেই আসলে সেই সব মানুষের কথা বলতে চেয়েছে, যারা সমাজের বর্জ্য, অপর ও বাতিল জনগোষ্ঠী। এবং সেই সঙ্গে এটাও জানা যাবে যে, চলচ্চিত্রে যে ঘরটিকে দর্শক দেখে তা কী করে একটা প্রগতিশীল ও উদারমনা স্পেইসের প্রাথমিক সংজ্ঞা পেরিয়ে একটা শরণার্থী শিবির অথবা বর্জ্য জনগোষ্ঠীর ভাগাড়ের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারে।

এজন্যই আলাপের শুরুটা করতে চাই চলচ্চিত্রটিতে দেখানো ঘরটি দিয়ে। দেবীর শুরুতেই এই ঘরটিকে আপাতদৃষ্টিতে একটি প্রগতিশীল ও উদারমনা স্পেইস মনে হয়, কেননা এই আশ্রয়কেন্দ্রে নানা শ্রেণির নিপীড়িত নারীরা তাদের থাকার জায়গা পেয়েছে। এবং এই যে এতো নারী তাদের বিচিত্র শ্রেণি/ধর্ম বয়স ব্যতিরেকে একই সঙ্গে এক ঘরে অথবা একই ছাদের নিচে থাকতে পারছে, শুধু সেই কারণে হলেও প্রাথমিকভাবে এই ঘরটিকে আমরা ‘হেটেরোগ্লোসিক’৪ বলে ভেবে নিতে পারি। হেটেরোগ্লোসিক বলতে এখানে দুই বা ততোধিক সংস্কৃতির এক জায়গায় মিলিত হতে পারার সম্ভাবনাকেই বোঝাচ্ছি। সেই ক্ষেত্রে এটি এমন এক স্থান যেখানে কোনো চিরস্থায়ী সীমানা দেয়াল আরোপ করা থাকে না এবং যে কারণে নানান রঙ ও ঢঙয়ের মিশ্রণ এই রকম অঞ্চলে এক অমিত সম্ভাবনা হিসেবে হাজির হয়। বিষয়টা অবশ্যই পজিটিভ। এছাড়াও যেহেতু নানা কিসিমের মানুষ এসে এই জায়গায় উঠেছে তাই প্রাথমিকভাবেই দর্শকের নজরে এই স্থান বা অঞ্চল একটা মাল্টি কালচারাল আস্তানা হিসেবে চোখের সামনে হাজির হওয়ার অবকাশ পায়। কিন্তু বিষয়টাকে এখন আমরা আরো গভীর থেকে দেখার চেষ্টা করবো। চেষ্টা করবো আমাদের প্রাথমিক ধারণার রঙ বদলাতে। বুঝতে চেষ্টা করবো চলচ্চিত্রটির কনটেক্সটে এই স্থান কেনো একটা ‘থার্ড স্পেইস’৫ হয়ে উঠতে পারলো না।


সেই ক্ষেত্রে, এই চার দেয়ালের কক্ষটিকে আমরা একটা শরণার্থী শিবিরের সঙ্গে তুলনা করে আলাপ এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি। যদিও শুরুতে আমাদের কাছে/চোখে এই রকমের অস্তিত্ব পুরোদস্তুর একটা শ্রেণি-নিরপেক্ষ অঞ্চল মনে হয়, আদতে এটি আসলে একটি শরণার্থী শিবিরের বেশি কিছু নয়। কেননা এই ঘরে কেউ ইচ্ছা করলেই থাকতে পারে না। ইচ্ছা করে কেউ এই ঘরে থাকতে আসেনি। নিপীড়ন অভিজ্ঞতা ও ইতিহাস নিয়েই প্রত্যেকে এই ঘরে থাকার আশ্রয় খুঁজে নিয়েছে। সুতরাং এই ঘর নিপীড়িতদের জন্য নির্মিত।

নিপীড়িতদের জন্য নির্মিত বলার অর্থ এই নয় যে, যে কেউ এখানে আশ্রয় খুঁজে নিতে পারবে। এই ঘরে থাকার যে অধিকার তা মোটেও ব্যক্তির ইচ্ছা সত্তার ওপরে নির্ভর করে না। এমনটাও নয় যে, এই ঘর কেউ পছন্দ করলেই বেছে নিতে পারে। নিতান্ত জীবনহীন ও নিরুপায় না হলে কেউ এই রকম আশ্রয় কামনা করে না। কেননা এটি এমন এক জায়গা যেখানে ‘বাছুরের মতো গাদাগাদি’ করে সবাইকে থাকতে হয়। এই কারণে নতুন কোনো ভিক্টিম আসার সম্ভাবনা তৈরি হলেই, পুরনো ভিক্টিমদের (যারা ইতোমধ্যেই জায়গা পেয়েছে কোনোভাবে মাথা গুঁজবার) মধ্যে এক অস্তিত্বের সঙ্কট তৈরি হতে থাকে। এই সঙ্কটের বহিঃপ্রকাশ হয় বাসিন্দাদের শ্রেণি-সচেতন বাহাসের মধ্যে। কেউ তাদের আপাত অবস্থানকে ‘নতুনের’ কাছে হারাতে প্রস্তুত নয় কোনোভাবেই। নতুন ও পুরাতনের মধ্যে এই চলমান সঙ্কটের লড়াই নিয়ে বাউমেন তার বইয়ের এক জায়গায় বলছেন--

[...] when faced with an influx of "outsiders', [...] the established' (to deploy Norbert Elias's memorable terms) have every reason to feel threatened. In addition to representing the 'great unknown' which all 'strangers in our midst' embody, these particular outsiders, the refugees, bring home distant noises of war and the stench of gutted homes and scorched villages that cannot but remind the settled how easily the cocoon of their safe and familiar (safe because familiar) routine may be pierced or crushed and how deceptive the security of their settlement must be.৬

পুরনোদের যে আপাত সেটেলমেন্ট তা যে নিতান্তই নড়বড়ে, নতুনের আগমন যেনো সেই কথা বার বার মনে করিয়ে দেয়। এ যেনো এক নিরন্তর অস্তিত্বের সঙ্কট। যেখানে টিকে থাকাটাই বড়ো কথা সেখানে সহমর্মিতা প্রকাশ অবান্তর। এটাই হলো পরিত্যক্ত জনগোষ্ঠীর টিকে থাকার লড়াই। যেমন করে বাউমেনের তালিকায় থাকা রিফিউজি, ইমিগ্র্যান্ট এবং এসাইলাম প্রত্যাশীরা প্রতিনিয়ত টিকে থাকার এক অনন্ত সংগ্রাম করছে পুঁজিতান্ত্রিক কাঠামোর সঙ্গে, ঠিক একইভাবে দেবীর নিপীড়িত নারীরা নিজেদের অস্তিত্বের লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে ওই ঘরে। নতুনের আগমন তাই পুরনোদের জন্য এক অশনি সংকেত। আমরা বুঝতে পারি, যারা এখানে আছে প্রত্যেকেই রাষ্ট্রহীন এবং গৃহহীন। তাই যাপিত সমাজ/রাষ্ট্র-জীবনের বাইরের অংশ বলেই ধরে নিতে পারি আমরা তাদের। এরা সবাই ‘অপর’; এরা সবাই ‘বর্জ্য’। পুঁজিতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে এই কতিপয় নারীরা নিতান্তই গৌণ এবং মৃত্যু তাদের আরো প্রান্তিক করে তুলেছে। আরো প্রান্তিক বলছি কারণ নারীরা তো এমনিতেই পুরুষতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোতে প্রান্তিকেই অবস্থান করে।

যাই হোক, এই আশ্রয়স্থল আপাতদৃষ্টিতে নিরাপদ মনে হলেও এখানে থাকা কারো জন্যই স্বস্তির নয়। অথবা এই ঘরে থাকার অধিকার কারো ব্যক্তি ইচ্ছার ওপর মোটেও নির্ভর করে না। বরং আমরা এটা ভালোই ঠাহর করতে পারি, এই আপাত শ্রেণি-নিরপেক্ষ ঘরে তাদের নিজেদের টিকে থাকার লড়াই কীভাবে চালাতে হয়। লক্ষ করলে আরো দেখা যায়, এই ঘর একই সঙ্গে শ্রেণি দ্বন্দ্ব খুব পরিষ্কার করেই বোঝাতে চায়। নিচে যারা বসে থাকে তারা সবাই ‘কামলা শ্রেণির মানুষ’। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা যাদের নেই। দোলনা চেয়ারে বসে থাকা নেহা ধুপিয়া আর সোফাতে বসে থাকা শ্রুতি হাসান উচ্চবিত্ত শ্রেণিরই প্রতিনিধিত্ব করে। হাতে মদের গেলাস, পরনে স্বল্প-পোশাক ও মুখে ইংরেজি বুলি--এ সবই টিপিকাল শ্রেণি রেপ্রিজেন্টেশনের প্রতীক হিসেবেই আমরা বুঝে নিতে পারি।

অন্যদিকে মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রতিনিধি হিসেবে থাকে ডাক্তারি পড়া মেয়েটি, যে কখনোই দেওয়া হবে না এমন এক পরীক্ষা দেওয়ার অনন্ত বাসনা নিয়েই টেবিলে বসে পড়তে থাকে। এছাড়া কাজলের ভূমিকাও এখানে ইন্টারেস্টিং। তিনি একই সঙ্গে এই ঘরের মালকিন--তিনি পারেন এককভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন স্থান-প্রত্যাশীকে দরজা খুলে দিতে--এবং একই সঙ্গে তাকে আবার আধুনিক পুঁজি-রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক/নৈতিক চেহারা হিসেবেও ভেবে নিতে পারি, যেহেতু তিনি সবার মতামতের ভিত্তিতেই বুঝতে/মানতে চান দরজা খোলা ঠিক হবে কি না। যদিও তিনি নিজেই পরে একক সিদ্ধান্তে দরজা উন্মুক্ত করে নতুন ‘শরণার্থী’র জন্য, তবুও তার গণতান্ত্রিক হওয়ার চেষ্টাকে আমরা হয়তো নৈতিকতার মাপকাঠিতে দেখতে পারি।

অবশ্য এই নৈতিক অবস্থান পুরো পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়নের যে অভ্যন্তরীণ সঙ্কট তার প্রতিও এক অচেতন তামাশা হতে পারে। এই সঙ্কটের জায়গাটা আমরা পুঁজির একচেটিয়া অধিকৃত করবার প্রবণতা আর গোলকায়নের প্রাথমিক উদারনৈতিক সীমানা নীতি--এই দুইয়ের আলোকে দেখতে পারি। সেই ক্ষেত্রে, কাজলের অবস্থানও সিম্বলিকালি এই দুইয়ের প্রেক্ষাপট থেকে অনেক পরিষ্কার হয়ে ওঠে। এককভাবে দরজা খুলে দেওয়ার মাধ্যমে গোলকায়িত কালের উন্নত বিশ্বের যে সীমানা রক্ষা নীতি এবং অভ্যন্তরীণ রক্ষণশীল ইমিগ্র্যান্ট পলিসি আছে তার প্রতি একটা সরল ইঙ্গিত হিসেবে দেখতে পারি। এই ইঙ্গিত বর্জ্য প্রান্ত থেকে নিয়ামক ও নিয়ন্ত্রক কেন্দ্রের প্রতি, বাতিল জনগোষ্ঠীর ভাগাড় থেকে পুঁজি কাঠামোর প্রতি। সেই সূত্রে আমরা এই ঘরের নির্যাতিত নারীদের গল্পের সঙ্গে একজন রিফিউজি বা এসাইলাম প্রত্যাশীর অভিজ্ঞতার একটা সমান্তরাল রেখা টানতে পারি, যদিও এই ঘরে সরব প্রতিটা নারী চরিত্রের অভিজ্ঞতালব্ধ নিপীড়নের ইতিহাস এক নয়। আমরা এও চিন্তা করে দেখতে পারি, কীভাবে একজন সিরিয়ান বা ইরাকি বা প্যালেস্টিনিয়ান বা রোহিঙ্গা শরণার্থীর ঘর হারানোর বেদনা এই নারীদের জীবন ও ইজ্জত হারানোর গল্পের সঙ্গে মিলে যেতে পারে। আমরা ভেবে নিতে পারি, একটা সীমান্ত-সংলগ্ন শরণার্থী ক্যাম্পের কথা, যেখানে নানান কিছিমের মানুষ এসে জড়ো হলো। কেউ কি এই অঞ্চলে ইচ্ছা করে এসেছে? ঠিক যেমনটা দেবীতে দেখতে পাচ্ছি আমরা।

নিপীড়নের ইতিহাস ছাড়া কেউ এ রকম ‘ওয়েস্ট ল্যান্ড’ এ পতিত হয় না। যুদ্ধ বিধ্বস্ত শহর যেমন নিয়মিত এই বর্জ্য অথবা বাতিল মানুষের দলকে সীমানা পেরিয়ে ঘরহীন, রাষ্ট্রহীন কোনো শরণার্থী ক্যাম্পে পৌঁছিয়ে দেয় ঠিক তেমনই দেবীর নারীরা তাদের নিপীড়িত ও নির্যাতিত (মৃত) দেহ (যেটিকে রাষ্ট্র সুরক্ষা দিতে পারেনি) বহন করেই এই ভাগাড়ে পতিত হয়েছে। এই অঞ্চল কোনো সুরক্ষিত আস্তানা বা ঘর নয়। বরং নিরন্তর কলিংবেল বেজে চলা ও টেলিভিশনের সংবাদ পাঠ সবাইকেই জানান দেয়, এই পতিত মানুষের দল, বর্জ্য ও বাতিল মানুষের সংখ্যা বাড়তেই থাকবে। পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়নে শুরু হওয়া অনন্ত যুদ্ধের উদাম নৃত্য যেমন করে উৎপাদন ও পুনরুৎপাদন করতে ব্যস্ত থাকবে বাতিল মানুষের স্রোত।

লেখক : অনুপম সেন অমি, ইউনিভার্সিটি অব ইস্টার্ন ফিনল্যান্ড এ ‘সোশ্যাল অ্যান্ড কালচারাল এনকাউন্টার’ বিষয়ে পিএইচ ডি করছেন।

anupams@uef.fi

https://www.facebook.com/omi.sen.902

 

তথ্যসূত্র ও টীকা

১. “১ কোটি পার করল কাজলের ‘দেবী’”, প্রথম আলো, ১১ মার্চ ২০২০।

২. বাউমেন, জিগমুন্ট (২০০৪ : ১১৮); ওয়েস্টেড লাইভস; ব্ল্যাকওয়েল পাবলিশিং, নিউজার্সি, ইউএসএ।

৩. ফরহাদ মজহারের ফেইসবুক পোস্ট লিঙ্ক :https://www.facebook.com/farliadmazhar/posts/101582791557005742; retrieved on: 15/03/2020

৪.Heteroglossiaটার্মটি প্রথম ব্যবহার করেন মিখাইল বাখতিন ‘ডিসকোর্স ইন দ্য নভেল’ নামের প্রবন্ধে।

৫. ‘থার্ড স্পেইস’ ধারণাটি হোমি কে ভাবা’র লোকেশন অব কালচার গ্রন্থ থেকে নেওয়া। হোমি ভাবার তত্ত্বীয় চিন্তার একটা বিস্তর অংশই গড়ে উঠেছে এই ধারণাকে কেন্দ্র করে।

৬. প্রাগুক্ত; জিগমুন্ট (২০০৪ : ১৩৬)।

বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ১৯তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২০ এ প্রকাশিত হয়েছে।

 

 

 

 

 

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন