Magic Lanthon

               

প্রিয়াংকা দেবনাথ

প্রকাশিত ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

থেল্মা অ্যান্ড লুইস

গল্পটা কেবলই থেল্মা-লুইসের নয় পুরুষতন্ত্রে বেড়ে ওঠা অনেকের

প্রিয়াংকা দেবনাথ


আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসাটা ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে। এর আগে ২০১৩—২০১৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বাংলাদেশে পর পর কয়েকজন ব্লগারকে হত্যা করা হয়। সেই সময়টাতে আমি সদ্য ফেইসবুক ব্যবহার শুরু করি। তার আগে বলা দরকার, আমার বেড়ে ওঠা গ্রামে। যে গ্রামে বেশিরভাগ মেয়ের বিয়ে কী এটা বোঝার আগেই বিয়ে হয়ে যায়। আমার মায়ের কারণে আমি তাদের চেয়ে খানিক সুবিধাপ্রাপ্ত ছিলাম, অন্তত বিয়ের ব্যাপারে। যাই হোক, নতুন ব্যবহারকারী হিসেবে ফেইসবুক নিয়ে আগ্রহ একটু বেশিই ছিলো, ফলে অনেক সময় সেখানে পড়ে থাকতাম; সেসময় ব্লগার হত্যা সংক্রান্ত নানা বিষয়, স্ট্যাটাস আমার ফেইসবুক ওয়ালে আসতে থাকে। ওই সব লেখার মধ্যেই তসলিমা নাসরিনের একটি লেখার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। লেখাটা পড়ে ভালো লেগে যায়, আর সেখান থেকেই ওই নামটির সঙ্গে আমার পরিচয়; ধীরে ধীরে তার সম্পর্কে জানা, বোঝাপড়া। তখন আমার বয়স ১৬—১৭।

এর আগে নারীদের নিয়ে কিংবা আমার নিজের অবস্থান নিয়ে যে আলাদাভাবে ভাবার জায়গা আছে, সেটা আমার চিন্তাতেই আসেনি। তবে নারী ইস্যুগুলো নিয়ে মাঝেমধ্যে আমার মনে নানাভাবে প্রশ্ন উঠতো, কিন্তু সত্যিকার অর্থে সেগুলো খুব বেশি ভাবায়নি। আমার চারপাশটা মানে এই সমাজ-রাষ্ট্র হয়তো কোনোভাবে আমাকে এই ভাবনাটা ভাবতেও দেয়নি। তবে সেসময় ব্লগার হত্যা নিয়ে নানা লেখা, তসলিমার আরো লেখা পড়তে গিয়ে আমার মনে নানা প্রশ্ন তৈরি হতে শুরু করে।

আগেই বলেছি পারিবারিকভাবে বিশেষ করে মায়ের কারণে কিছু সুবিধা আমি পেয়েছিলাম। এই যেমন ধরেন, ক্লাস সেভেন থেকেই আমি সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যাওয়া-আসা করতাম। তারপর থেকে টানা ছয়-সাত বছর আমি সাইকেলে যাতায়াত করেছি। সেসময় আমাদের গ্রামে আমিই প্রথম (নারী) সাইকেল চালানো শুরু করি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই আমার বন্ধু, প্রতিবেশীদের আমাকে নিয়ে একটু বেশিই মাথাব্যথা শুরু হয়। সেসময় এমন কোনো দিন ছিলো না, যেদিন আমাকে কোনো কটু কথা শুনে বাড়ি ফিরতে হয়নি। শুধু তাই নয়, আমার গায়ের রঙ নিয়েও প্রতিবেশীদের শুরু হতে থাকে নানা সমস্যা। আমি বড়ো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের এই সমস্যার আকারও বড়ো হতে থাকলো। বুঝতে শেখার পর থেকে নিয়মিত আমাকে এসবের মধ্য দিয়েই যেতে হয়েছে। তাদের ধারণা, শুধু গায়ের রঙের কারণেই পৃথিবীর সব সুযোগ-সুবিধা থেকে আমি বঞ্চিত হবো এবং দিনশেষে আমাকে নিয়ে আমার মা-বাবাকে যথেষ্ট ভুগতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। অবশ্য আমাকে নিয়ে এ ধরনের সমস্যা আমার পরিবারের লোকের হয়তো ছিলো না।

তবে ক্লাস এইটে উঠেই পড়ালেখা বন্ধ করতে বাধ্য হয়ে যাওয়া আমার মা সবসময় আমাকে সার্বিক সমর্থন জুগিয়েছেন। যে সমর্থনটার অভাবে হয়তো অনেক নারীর জীবনই চার দেয়ালের মধ্যে বন্দি হয়। এই সমর্থনটা ছিলো না বলেই হয়তো পাশের বাড়ির আমারই বয়সি খুড়তাতো বোনের ১৪ বছরেই বিয়ে হয়ে যায়। যে সমর্থনটার জন্য আমি আমার মায়ের কাছে মেয়ে নই, শুধুই সন্তান হয়ে উঠি। তাই আশপাশের চিত্রটা দেখে খারাপ লাগলেও বাড়ির মানে মায়ের এই সমর্থনটা আমাকে সাহস জুগিয়েছে।

তবে একটা ব্যাপার লক্ষ করতাম, মা চাইতেন আমাকে ‘ছেলে’ হিসেবে গড়ে তুলতে। ছোটোবেলায় তিনি আমাকে ‘ছেলেদের পোশাক’ পরাতেন। বিষয়টা হয়তো এমন যে, মেয়ে হিসেবে আমার পরিবারের সবার আমাকে মেনে নিতে সমস্যা হয়েছিলো সেসময়। এখানে একটু বলে নেওয়া দরকার, আমার আগে তার আরেক সন্তানও মেয়েই। তবে সে গাত্রবর্ণে আমার চেয়ে একটু এগিয়ে ছিলো, মানে ফর্সা। সেকেলে হিন্দু পরিবারে প্রথম সন্তান হিসেবে মেয়ে ভালোভাবে মেনে নিলেও দ্বিতীয় সন্তান মেয়ে, এটা মেনে নিতে তাদের হয়তো কষ্টই হয়েছিলো। শুনেছি আমার জন্মের পর মনোকষ্টে বাবাও নাকি একা মাঠে গিয়ে বসেছিলেন। অবশ্য শুধু তিনি নন, পরিবারের সবাই চেয়েছিলো একটা ছেলে সন্তান। এরপর দিনে দিনে তাদের, মানে আমার পরিবারের অন্যদের সেই কষ্টের নানামাত্রিক বহিঃপ্রকাশ এসে পড়তে থাকে আমার মায়ের ওপর। কেননা সন্তান যেহেতু আমার মা প্রসব করেছেন, তাই মেয়ে হওয়ার ‘দোষটা’ও তারই!

পরে মায়ের মুখে শুনেছি, পরিবারের অনেকেই সেসময়টাতে আমার মাকে নানাভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিলো--হয়েছে তো মেয়ে তার আবার বিশ্রাম বা অতিরিক্ত যত্নের কী আছে! সুতরাং সন্তান জন্মের পরের সময়টাতে যখন একজন নারীকে স্বাস্থ্য নিয়ে সবচেয়ে বেশি সতর্কতার সঙ্গে থাকতে হয়, তখন আমার মাকে বাড়ির রান্নার প্রায় সব কাজ একা হাতে সামলাতে হয়েছে। সুতরাং ওই সময়টাতে তাকে যে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে, সেগুলোর প্রতিফলনই হয়তো আজকের আমার এই অবস্থান।

সেই দিনগুলোর কষ্ট থেকেই হয়তো তিনি তার সন্তানকে (আমাকে) ‘ছেলের পোশাকে’ বড়ো করে তুলতে চেয়েছিলেন, আমার সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যাওয়াকে সমর্থন দিয়েছিলেন। তবে কখনো কখনো আমার এও মনে হয়েছে, মা হয়তো আমাকে নয়, তার ছেলে সন্তানের সঙ্গে এগুলো করেছেন। হয়তো ছেলে না পাওয়ার অতৃপ্তিটা তিনি আমাকে দিয়ে পূরণ করতে চেয়েছেন। হয়তো তিনিও মনে মনে ছেলে সন্তানই চেয়েছিলেন। আর তাই হয়তো দিনশেষে মেয়েকে ছেলে বানিয়ে চোখের বা মনের শান্তিটা পাওয়ার জন্য এমনটা করেছেন। তবে মাকে নিয়ে আমার এই ধারণাগুলো ভুলও হতে পারে। যদি এই ধারণাটা ভুল নাও হয়, তারপরও আজ আমার কাছে এটা খুব পরিষ্কার যে, ওই সময়টাতে একজন অষ্টম শ্রেণি পড়া নারী কী-ইবা করতে পারতো। তার তো সে ক্ষমতাই ছিলো না; নিজের মতো করে তার চাওয়াটাকে প্রতিষ্ঠার। কারণ আমার বাবার পরিবার তার কাছে সবসময় একটা ছেলে সন্তান আশা করেছিলো। একদিকে তিনি না পেরেছেন সেই ‘আশা পূরণ’ করতে, না পেরেছেন সন্তানকে ফেলে দিতে (পরে অবশ্য আমার মায়ের ছেলে সন্তান হয়েছে)। এই দোটানার মধ্যে থাকতে থাকতে তিনি হয়তো তার নিজের চাওয়াটা, নিজের ইচ্ছেটার কথাই ভুলে গেছেন। আমার মনে হয়নি, তার ইচ্ছাটাকে কখনো জানতে চেয়েছে কেউ।

আবার এর একটি ভিন্ন দিকও থাকতে পারে; তিনি হয়তো সত্যিই আমাকে চেয়েছিলেন তার মতো করে বড়ো করে তুলতে। হয়তো তার না পাওয়া পরিবেশটাকে আমার জন্য তৈরি করে দিয়েছেন; আমার পথটাকে আরো মসৃণ করে দিয়েছেন। তার অল্প বয়সে পড়ালেখা বন্ধ হওয়া বা দিনের পর দিন সংসারের একঘেঁয়ে জীবন কাটাতে কাটাতে সত্যিই হয়তো কোথাও গিয়ে ক্লান্তি বোধ করেছেন। তিনি হয়তো চাননি আমার জীবনে তার পুনরাবৃত্তি হোক।

দুই.

এই প্রবন্ধটি লিখতে বসার আগে মাকে আমার অনেকবার জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছে হয়েছিলো, আসলেই তিনি কোন মনস্তত্ত্ব থেকে এগুলো করেছিলেন। কিন্তু এতোগুলো বছর পরে এসে তাকে এই প্রশ্নগুলো করতে আমার আর সাহস হয়নি। যদি উত্তরটা সত্যিই এমন হয় যে, তিনি আমাকে নয়, একটা ছেলে সন্তান চেয়েছিলেন। যে কিনা তার ‘অবলম্বন’ হবে। তার ও তার স্বামীর বংশের পরম্পরাকে টিকিয়ে রাখবে। আবার পরে ভেবেছি, এর কোনো উত্তরই এখন আর আমার কাছে খুব গুরুত্ব বহন করে না। কারণ এই ২২ বছরের  জীবনে আমি অন্তত এটা বুঝে গেছি, মায়ের চেয়ে আমি খুব বেশি ভালো অবস্থায় নেই কিংবা সেটা থাকা কঠিন।

কেননা নারী হিসেবে প্রত্যেকটা দিনই আমাকে এক একটা কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। কেবল মেয়ে হওয়ার কারণে, রাত করে ঘরে ফিরলেই আমাকে দেওয়া হয়েছে ‘বাজে মেয়ে’র তকমা। মেয়ে কারণেই সন্ধ্যা সাতটার পর আমার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় হলের গেইট বন্ধ হয়। শুধু তাই নয়, মেয়ে কারণেই আমাকে আস্তে কথা বলতে হয়; এই সমাজ আমাকে বার বার বুঝিয়ে দেয়/দিয়েছে, তুমি নারী, তোমার হাঁটা-চলা থেকে শুরু করে তাকানো নিয়মের মধ্যে থাকতে হবে। এই একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও আমাকে এ রকম অসংখ্য নিয়মের মধ্য দিয়ে প্রত্যেকটা দিন পার করতে হচ্ছে/হয়। সুতরাং আমার মায়ের পক্ষে যে তার ওই সময়টাতে নিজের ইচ্ছা, নিজের চাওয়াকে গুরুত্ব দেওয়ার অবকাশ ছিলো না, অন্তত সেটা আমি এখন বুঝি।

এই ধরনের একটা পরিস্থিতির মধ্যে ২০১৯-এ হঠাৎই ইউটিউবে তসলিমা নাসরিনের একটা সাক্ষাৎকার১ চোখে পড়ে আমার। ভারতের একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে তসলিমার তিন পর্বের এই সাক্ষাৎকারটি নেন গায়ক, চলচ্চিত্রনির্মাতা, অভিনয়শিল্পী অঞ্জন দত্ত। সেখানে তিনি তসলিমার নির্বাসিত জীবন, লেখালেখিসহ নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেন। সেই সাক্ষাৎকারের একাংশে তাদের কথোপকথন ছিলো এমন--

অঞ্জন দত্ত : খুব প্রিয় একটা ছবি, যে ছবিটা সত্যিই আপনার মনে খুব দাগ কেটেছে। একটা সিনেমা।

তসলিমা নাসরিন : অনেক সিনেমাই তো আমার মনে দাগ কেটেছে, তবে আমি ‘কেন লচ’-এর ছবি খুব পছন্দ করি।

অঞ্জন : কেনো?

তসলিমা : মনে হয় সেখানে বানানো কিছু থাকে না। যেনো জীবন দেখছি, জীবন। চোখের সামনে। তাই এতো ভালো লাগে। আর, উনি স্ক্রিপ্ট লেখেন না। উনি হয়তো কয়েকজন মানুষকে জড়ো করে বলেন, তোমরা এ বিষয়ে কথা বলো। তো ওরা যেভাবে কথাগুলো বলে, ঠিক সেভাবেই উঠে আসে। এছাড়া একটা ছবি দেখেছিলাম, সেটা খুব বৈষম্য নিয়ে নয়। দুটো মেয়ে, যা ইচ্ছা তাই করছে--থেল্মা অ্যান্ড লুইস।

অঞ্জন : হ্যাঁ, থেল্মা অ্যান্ড লুইস। আরে কী ছবি!

তসলিমা : দারুণ না!

অঞ্জন : কী ফ্যান্টাস্টিক ছবি! রিডলি স্কট।

তসলিমা : [দুজন নারী] মরে গেলো কিন্তু পিছন ফিরলো না, আপস করলো না। খুব ভালো লেগেছে।

অঞ্জন : হ্যাঁ, খুব মেলে, হোয়াট আর ইউ সেইঙ। রিডলি স্কট! দারুণ ছবি! এছাড়া খুব ভালো কোনো প্রেমের ছবি, যেটা আপনার মনে খুব দাগ কেটেছে?

তসলিমা : এই যে একেবারে নতুন ছবি ব্রোকব্যাক মাউন্টেইন। এতো সুন্দর প্রেমের ছবি আমি আর দেখিনি! খুব ভালো লেগেছে।

তাদের এই কথোপকথন শুনে আমার এক ধরনের আগ্রহ জন্মে থেল্মা অ্যান্ড লুইস (১৯৯১) চলচ্চিত্রটি নিয়ে--দুজন নারীর গল্প, সেই গল্পে তারা মারা গেছে, কিন্তু পিছন ফেরেনি, হার মানেনি! তখনই খুব দেখতে ইচ্ছে করেছিলো চলচ্চিত্রটা--তাদের লড়াইটা ঠিক কী নিয়ে! আমি ভাবছিলাম, নারীর অনেক লড়াই-ই তো দেখেছি/দেখছি, শুনেছি; কিন্তু জেতার জন্য জীবন দেওয়া--কী এমন সেই গল্প! সাক্ষাৎকারটা দেখার পর থেকেই আমার কেমন জানি অস্থির লাগছিলো; এমন এর আগে হয়নি কখনো। মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিলো, সেই এক কথা--কী সেই লড়াই যেখানে জেতার জন্য জীবন দিতে হয়! অথচ প্রতিদিন একটু ভালো থাকার জন্য কতোই না সমঝোতা, মানিয়ে চলছি আমরা, সেখানে জীবন দেওয়ার তো প্রশ্নই আসে না!

আমার মনে হয়েছিলো, যতো দ্রুত সম্ভব চলচ্চিত্রটি আমার দেখা দরকার। তখন পর্যন্ত আমার কাছে অজানা ছিলো--বহুদিন, বহুকালের অত্যাচার, অনাচার, শোষণের চাপা ক্ষোভ কোনো কারণে বেরিয়ে আসলে মানুষ ঠিক কী কী করতে পারে! প্রচলিত বাস্তবতার ভিন্নতাও যে থাকতে পারে; পুরুষ প্রাধান্যশীলতার উদরেও যে কখনো কখনো অন্যভাবে কষাঘাত করা যায়, সেটা আমার জানা ছিলো না। শেষ পর্যন্ত থেল্মা অ্যান্ড লুইস দেখে ফেলি। সাময়িক উত্তেজনা অবসান হয় ঠিকই, কিন্তু নতুন উত্তেজনাও ডানা বাঁধে। গল্পটা দুই নারীর--থেল্মা ও লুইস, সম্পর্কে তারা বন্ধু। থেল্মা সহজসরল হাউজওয়াইফ; যিনি কিনা তার স্বামীর কাছ থেকে ন্যূনতম সম্মানটুকুও পান না। তার স্বামী সবসময়ই তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখেন, তাচ্ছিল্য করেন। লুইস একটি রেস্তোরাঁয় কাজ করেন। লুইস-ই পরিকল্পনা করেন তারা দুই দিনের জন্য ঘুরতে যাবেন। কিন্তু থেল্মা তাদের সেই ঘুরতে যাওয়ার কথা তার স্বামীকে বলার সাহসটুকুও পান না। তখন থেল্মাকে লুইস নানাভাবে সাহস জোগান--ডেরেল (থেল্মার স্বামী) যে তার স্বামী, বাবা নয়, সেটা তাকে মনে করিয়ে দেন লুইস। তা সত্ত্বেও থেল্মা তার স্বামীকে বার বার বলতে গিয়ে বলার মতো কোনো সুযোগ বা সাহস করে উঠতে পারেন না। অবশ্য একপর্যায়ে থেল্মা সিদ্ধান্ত নেন, তিনি লুইসের সঙ্গে যাবেন এবং তারা বেরিয়ে পড়েন। বের হওয়ার সময় কী যেনো ভেবে থেল্মা সঙ্গে তার স্বামীর পিস্তলটা নেন। যাত্রার শুরুর পর লুইসকে পিস্তলটা দেখান থেল্মা। এরপর তাদের কথোপকথন ছিলো এমন--

লুইস : তুমি কি এই পিস্তলটির দায়িত্ব নিতে পারবে? তুমি এটা কেনো এনেছো?

থেল্মা : সাইকো কিলার, ভাল্লুক, সাপ, কতো লোকই তো আছে। আসলে আমি এটা চালাতে জানি না। তুমি এটা রাখো।

থেল্মা পিস্তল নেওয়ার কারণ হিসেবে কোনো ‘সুস্থ’ মানুষের কথা বলেননি; বলেছেন সাইকো কিলার, সাপ এবং ভাল্লুকের কথা। কিন্তু চলচ্চিত্রের পরবর্তী সময়ে তাদের বিপদের কারণ হিসেবে এদের কেউই আসেনি, এসেছে ‘সুস্থ’ মানুষ। অর্থাৎ নারীর জন্য সুস্থ-অসুস্থ কোনো ব্যাপার নয়, পুরো সমাজই সমস্যাজনক। এই সমাজ এখনো নিজেকে নারীর জন্য সহায়ক বা সুস্থ করে তুলতে পারেনি। যদি সেটা পারতো, তাহলে চার—পাঁচ—ছয় বছরের শিশু ধর্ষণের শিকার হতো না!

পরিস্থিতি এখানেই শেষ নয়, আপাতদৃষ্টিতে নারীকে যাদের কাছে নিরাপদ মনে করা হয়--মামা, চাচা, খালু, শিক্ষক, বোনজামাই, প্রতিবেশী--তাদের কাছেই নারীদের প্রথম যৌন হয়রানির অভিজ্ঞতা হয়। সুযোগ পেলেই তারা এসব নিরাপদ সম্পর্কের বাইরে গিয়ে পুরুষ হয়ে ওঠে। তারাই থেল্মার ভাষায়, ‘ভাল্লুক, সাপ, সাইকো’ হয়ে ওঠে। ২০১৩ খ্রিস্টাব্দের শেষ দিককার ঘটনা, সেসময় আমাকেও এমন এক ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়। সেদিন রাতে আমাদের পাশের বাড়িতে একটা অনুষ্ঠান ছিলো। পাড়ার ও আমাদের বাড়ির অন্যদের সঙ্গে আমিও সেখানে যাই। অনুষ্ঠান চলছিলো, কিন্তু সামনে এস এস সি পরীক্ষা থাকায় আটটা—সাড়ে আটটার দিকে আমি মাকে বলে বাড়ি চলে আসি। ওই বাড়ি থেকে কয়েকটা ঘর পরেই আমাদের বাড়ি, খুব বেশি হলে মিনিট দুয়েকের পথ। তাই একাই ফিরছিলাম। এই পথটুকু কিছুটা অন্ধকার, গ্রামে যেমনটা হয় আরকি, বেশিরভাগ বাড়ির বাইরে আলো থাকে না; ওই পথটুকুও তেমনই ছিলো। ভালোভাবেই আসছিলাম; আর পনের—কুড়ি পা হাঁটলেই বাড়িতে ঢুকে পড়বো, ঠিক এমন সময়, আমাদের প্রতিবেশী এক পুরুষ হঠাৎই আমার পথ আটকায়। তার উদ্দেশ্য বুঝতে আমার খুব বেশি দেরি হয় না; ফলে মুহূর্তেই আমি বাবু (বাবাকে আমরা বাবু বলি) বলে চিৎকার দিয়ে বাড়িতে ঢুকে পড়ি। বাবু বেরিয়ে আসেন, আমার চিৎকারে সেও পালিয়ে যায়। পরে বাবা বিষয়টা পাড়ার জ্যেষ্ঠদের জানান।

বাস্তবতা হলো, জ্যেষ্ঠরা শুনে কেউই প্রতিবেশী সেই লোকটার ব্যাপারে কিছু বলেনি। উল্টো আমি কেনো রাতে একা বাড়ি ফিরছিলাম, সেই প্রশ্নই করেছে। যদিও ওই লোকটির এ ধরনের স্বভাবের কথা পাড়ার অনেকেই জানতো। তারপরও ওই লোকজন বলেছে--‘মেয়ের যদি সমস্যা না থাকে তবে ওই ছেলেইবা কেনো মেয়ের পিছনে লাগবে।’ তখন এতো বুঝতাম না, কেবল মনে হতো নারী হয়ে জন্ম নেওয়াটাই হয়তো আমার সমস্যা। এই ভেবে অনেকবার আড়ালে কেঁদেছি, কষ্ট পেয়েছি; কাউকে বলারও সাহস করিনি। এখন অবশ্য আর কাঁদি না। শুধু সেদিনের ঘটনা নয়, প্রতিবেশী ওই লোকটি এর আগেও আমাকে নানা সময়ে অশ্লীল কথা, ইঙ্গিত করেছেন; এবং সবচেয়ে সমস্যার কথা হলো, সেদিনের সেই ঘটনার পরও কিন্তু তার সেই কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়নি। পরে আমি জেনেছি, তিনি শুধু আমাকে নয় এলাকার অনেক মেয়ের সঙ্গেই এ ধরনের আচরণ করেন। এরা কিন্তু সমাজে সাইকো নয়, ভাল্লুক কিংবা বন্য কুকুরও নয়। এরা কথিত সুস্থ মানুষ!

কিছুদিন আগে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে এক শিক্ষার্থী ধর্ষণের শিকার হন। ঘটনাটা এমন যে, রাত আটটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইবলিশ চত্বরে বসে ওই শিক্ষার্থী তার বন্ধুর সঙ্গে গল্প করছিলো। এ সময় ওই ছেলের এক বন্ধু তাদের দুইজনকে তার ভাড়া বাসায় আড্ডা দিতে যেতে বলেন। ওই বাসায় যাওয়ার পর, ওই বন্ধু তাদের গল্প করতে বলে কৌশলে বাইরে চলে যান। এই সুযোগে বন্ধুরূপী ওই ছেলেটি মেয়েটিকে ধর্ষণ করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী কিছুক্ষণ পর বাইরে যাওয়া ওই বন্ধু আরো কয়েকজনকে নিয়ে এসে বলতে থাকে, ‘তোরা অসামাজিক কাজ করেছিস’; সাদা কাগজে তাদের দুজনের সই নেয় এবং ৫০ হাজার টাকা দাবি করে। পরে ওই শিক্ষার্থী যাতে মামলা করতে না পারে, সেজন্য কৌশলে তারা আবার মেয়েটিকে শারীরিক সম্পর্কে বাধ্য করে এবং তা ভিডিও করে।২ এই ঘটনাটি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ‘বন্ধুত্ব’ বলে যে বিষয়টি আছে, সেটাকে কতোখানি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, সে কথা না হয় নাই বলি। তবে এ ঘটনার পর আমি অনেক শিক্ষার্থীকেই (নারী-পুরুষ) বলতে শুনেছি, ‘ওই মেয়ে রাতে ইবলিশ চত্বরে কী করে! কেনো ছেলেদের বাসায় যায়!’ কিংবা ‘আচ্ছা মেয়েটা কে রে, দেখার খুব ইচ্ছা’ জাতীয় কথা। অথচ এদের কাউকেই আমি ছেলেটিকে নিয়ে কোনো কথা বলতে শুনিনি। এমনকি ছেলেটি যে ভয়াবহ একটি অপরাধ করেছে, এ নিয়ে তাদের খুব বেশি মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয়নি। উল্টো তাদের কথার মধ্যে বার বার উঠে এসেছে এ ধরনের প্রশ্ন--মেয়েটি কেনো ছেলেটির বাসায় গেলো? নির্মমতা হলো, এই ধরনের প্রশ্ন সবচেয়ে বেশি করছে স্বয়ং নারীরা!

তার মানে বন্ধুর কাছে নারীর নিরাপত্তা নেই। নারীকে বাঁচতে হলে তার নিজের নিরাপত্তার দিকটা নিজেকেই দেখতে হয়। তাই থেল্মা হয়তো অচেতনে নিরাপত্তাহীনতার কথা ভেবেই তার পিস্তলটা সঙ্গে নিয়েছিলেন। এই রাষ্ট্র, সমাজ--সেটা পৃথিবীর যে কোনো রাষ্ট্রই হোক না কেনো--নারীর নিরাপত্তা আমলে নেওয়ার সময় তাদের হয়ে ওঠে না। ফলে এই সমাজ, রাষ্ট্র আর সিস্টেমের ওপর নির্ভর না করে এই অবস্থার মধ্যে নিজেকে টিকিয়ে রাখার দিকটাই ভাবতে হয় নারীকে। তবে এখানে সিস্টেমও যে একেবারে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকে তা কিন্তু নয়। এসবের মধ্যেই এই সিস্টেম নারীর জন্য কিছু কোড আরোপ করতে থাকে। যে কোডগুলো মেনে চললে তাকে ‘ভালো’ আর না মানলে ‘খারাপ’ বলে আখ্যা দেওয়া হয়। অবশ্য এই ‘ভালো-খারাপের’ বিচারটা সবসময় পুরুষের দৃষ্টিকোণ থেকেই হয়। আর সেখানে নারীকে কেবল অসহায়ের মতো বিচারের কাঠগড়াতেই দাঁড়াতে হয়।

তিন.

এমন একটি সময়ে এসে আমি থেল্মা অ্যান্ড লুইস নিয়ে লিখতে বসেছি, যখন প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও নারী, শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। যখন কিনা গণমাধ্যমগুলোতে ধর্ষণের খবর শুনতে শুনতে একপ্রকার ক্লান্ত হয়ে পড়ছি। আমার নিজের মধ্যে ভয় কাজ করছে সমাজের এই ‘ভালুক, সাপ, সাইকো’দের সামনে না জানি কখন পড়ে যেতে হয়! যদিও সেই ছোটো থেকে এদের মধ্যেই বাস করতে হয়েছে আমাকে। পরিসংখ্যান বলছে, গত বছরের প্রথম ছয় মাসে (১ জানুয়ারি থেকে ২০ জুলাই ২০১৯) ধর্ষণ ও নিপীড়নের শিকার হয়েছে অন্তত আটশো ২৬ নারী৩; আরেকটি পরিসংখ্যান বলছে কেবল ধর্ষণের শিকার হয়েছে ছয়শো ৩০ নারী। যার মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ৩৭ জনকে।৪ শুধু তাই নয়, ডি ডব্লিউ-এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে বাংলাদেশে ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে ধর্ষণ বেড়েছে দ্বিগুণ।৫

থেল্মা অ্যান্ড লুইস এর একটি দৃশ্য

এ তো গেলো বাংলাদেশের মতো একটা তৃতীয় বিশ্বের আলাপ। এবার আসা যাক যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশের আলোচনায়। ২০১৯-এর আরেকটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, একশো ১৮টি দেশের মধ্যে চালানো এক জরিপে ধর্ষণের হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ১৪তম।৬ আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতও পিছিয়ে নেই। বিবিসি’র তথ্যমতে, বছরে প্রায় ২০ হাজার কন্যাশিশু ধর্ষিত হয় ভারতে।৭ সারা পৃথিবীতেই যখন নারী এমন একটি পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন নারীর নিরাপত্তা ‘উন্নত-অনুন্নত’ কোনো রাষ্ট্রই যে দেয় না, সেটা অনায়াসেই বলা চলে।

বেড়ানোর শুরুতেই রাস্তায় বিরতির জন্য থেল্মা ও লুইস একটা পানশালায় যায়। সেখানে অল্প সময়ের মধ্যে থেল্মার সঙ্গে হারল্যান নামে এক ব্যক্তির পরিচয় হয়; থেল্মা তার সঙ্গে নাচেনও। হারল্যান একপর্যায়ে থেল্মাকে পানশালার বাইরে নিয়ে যান এবং ধর্ষণের চেষ্টা করেন। এদিকে থেল্মাকে না পেয়ে লুইস বাইরে এসে দেখে এই অবস্থা। লুইস তখন থেল্মাকে বাঁচায় এবং উদ্ভুত পরিস্থিতির একপর্যায়ে হারল্যানকে ওই পিস্তল দিয়ে গুলি করে হত্যা করেন। মূল ঘটনার শুরু এখান থেকেই। এ ঘটনায় থেল্মা খুবই ঘাবড়ে যান; এবং তিনি সব ঘটনার জন্য পুলিশের কাছে যেতে চান। কিন্তু এই সিদ্ধান্তে বাধ সাধেন লুইস। লুইসের সঙ্গে ধর্ষক হারল্যানের কথোপকথন এমন--

লুইস : ছেড়ে দাও ওকে, না হলে এখনই আমি তোমাকে খুন করবো।

হারল্যান : আরে এটা তেমন কিছুই না। আমরা জাস্ট একটু মজা করছিলাম।

লুইস : ধর্ষণ করা তোমার কাছে মজা! শোনো, ভবিষ্যতে কোনো মেয়ে যদি এভাবে কাঁদে তাহলে ভেবো না সে মজা করছে।

এই কথাগুলো বলে থেল্মাকে নিয়ে লুইস সেখান থেকে চলে যেতে থাকেন, ঠিক সেই সময় হারল্যান বলে ওঠেন--‘আমার তো ওকে ধর্ষণ করাই উচিত।’ এতে রেগে লুইস বলেন, ‘কী বললে তুমি?’ হারল্যান আবারও বলেন, ‘আমার ওকে ধর্ষণ করাই উচিত।’ এবার আর লুইস নিজেকে সংযত রাখতে পারেন না, গুলি করেন হারল্যানকে। তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। ঘটনাটা চোখের পলকে ঘটে যায়। চলচ্চিত্রটি প্রথম দেখার সময় মনে প্রশ্ন জেগেছিলো, কেবল এই একটি মাত্র কথার জন্য লোকটাকে মেরে ফেললো লুইস! এর যৌক্তিকতা নিয়ে মনে বার বার প্রশ্ন উঠেছে। ওই দৃশ্যটি এরপর অনেকদিন, অনেকবার দেখেছি আমি; আগে-পিছে ভেবেছি। উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছি। তারপর একদিন হঠাৎই পেয়ে যাই সে উত্তর--এই রাগ তো লুইসের একদিনের নয়, এই কথা তো লুইস-থেল্মার জীবনে প্রথম শোনা নয়। নারী হিসেবে এতো দিন তাকে এই সমাজ, রাষ্ট্রের কতো অবহেলা, শোষণ, অবিচারই না সহ্য করতে হয়েছে! যার শোধ নেওয়ার সুযোগ তার ছিলো না। প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগটা হয়তো তিনি পেয়েছেন। মাথায় রক্তটা উঠে গিয়েছিলো সেই বিশেষ পরিস্থিতিতে।

একটা বিষয় ভেবে দেখেন, এই সমাজেরই কোনো পুরুষ বলছে, ধর্ষণ তার কাছে কেবলই মজা! এই কথা তো আর এক—দুই দিনে ওই পুরুষের মাথায় উড়ে এসে বসেনি। দিনের পর দিন এগুলোর চর্চা হয়েছে এই সমাজেই। এমনকি এই চর্চা থেকে বাদ যায়নি স্বয়ং নারীরাও। অনেক নারীকে আমি অহরহ বলতে শুনেছি, ‘আরে ওতো ছেলে, এ বয়সে এমন একটু করবেই!’ এই ‘এমন একটু’ মানে কিন্তু রাস্তায় কোনো মেয়েকে দেখে বাজে কথা, বাজে ইঙ্গিত করা, ওড়না ধরে টান দেওয়া! আর পুরুষের এই বয়সটা যে কখনো শেষ হয় না, সেটা হয়তো কারো মাথাতেই আসে না। তাই অচেতনে চাপিয়ে রাখা দীর্ঘদিনের সেই রাগ বিশেষ মুহূর্তে লুইসের পিস্তলের নল দিয়ে হয়তো বেরিয়ে এসেছে। এ তো অস্বাভাবিক কিছু নয়। এটাকেই হয়তো বিদ্রোহ বলে। সব বশ্যতা ভেঙে বেরিয়ে আসা। তারপর নিজের মতো করে পথ খুঁজে নেওয়া। যা থেল্মা ও লুইস করেছিলো। কিন্তু কতোজন নারী পারে সেটা!

আমার পিসির কাছে একটা ঘটনা আমি অনেকবার শুনেছিলাম। তার বাবা মানে আমার ঠাকুরদা তাকে এস এস সি পরীক্ষাটা পর্যন্ত দিতে দেননি। টেস্ট পরীক্ষা শেষ; কিছুদিন পরেই ফাইনাল, এমন সময় পিসিকে বলা হলো--‘তোমার আর পড়ালেখা করে কাজ নেই’। এ কথার পরেও পিসি চুরি করে পড়ালেখা করলেন, প্রয়োজনে চুরি করে স্কুলেও গিয়েছিলেন। একদিন স্কুলে যাওয়ার পথে ঠাকুরদার সামনে পড়ে যান, তারপর আর কিছুই করতে পারেননি পিসি। এই আচরণ কিন্তু করেছিলেন একজন বাবা, তার মেয়ের সঙ্গে। কারণ হিসেবে ঠাকুরদার ব্যাখ্যা ছিলো--‘মেয়েমানুষের অতো পড়ে লাভ নেই; যথেষ্ট পড়েছো।’ আমি অন্যদের কাছ থেকেও শুনেছি, বাড়ির সব কাজ পিসিই করতেন। ঠাকুরদা খুব রাগী ছিলেন। তাই বাড়ির কাজ নাকি খুব সময় মেনে করতে হতো। এর হেরফের হলেই নাকি ‘রক্ষে’ থাকতো না। এই ‘রক্ষে’ শব্দটা আমি ঠাকুরমা, পিসির কাছে অনেকবার শুনেছি। বিশেষ করে তারা যখন সেই সময়ের গল্প করতো তখন। কিন্তু আমি আজো ভেবে পাই না, এই ‘রক্ষো’টা আসলে কী থেকে রক্ষা। পুরুষের কাছ থেকে এই রক্ষাটা নারীর কবেইবা আসবে!

এতোসব কাজের মধ্য থেকেও পিসির কেবল আকুতি ছিলো এস এস সি পরীক্ষাটা দেওয়ার; কিন্তু পারেননি। পিসির বয়স এখন ৫৭ বছর। কিন্তু এখনো কথা প্রসঙ্গে যখন তার সেই পড়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার গল্প ওঠে, আমি দেখেছি তার চোখ দুটো জলে চিকচিক করে ওঠে। একটু বেশি সময় ধরে কথা বললে, এখনো পিসি বলেন, ‘ওদের কিন্তু কোনো ক্ষতি হতো না, আমাকে পরীক্ষাটা দিতে দিলে, একপ্রকার জিদ করেই ওরা আমাকে পরীক্ষাটা দিতে দেয়নি। আমি অনেক কাঁন্নাকাটি করেছি, পরীক্ষার টাকাটা নেওয়ার জন্য। ওরা আমাকে সেই টাকাটা দেয়নি।’ এই কথাগুলো পিসি এতোবার আমাকে বলেছেন, এখন আমি আর এগুলো নিতে পারি না। আমারই প্রচণ্ড কষ্ট হয়! তার দীর্ঘশ্বাস, তার চোখের জল, তার কষ্টগুলোই শুধু আমার কানে বাজে। আমি পিসির কাছে জানতে চেয়েছিলাম, মাকে (ঠাকুরমা) বলেননি এসব কথা কিংবা টাকার কথা; বা ঠাকুরমা চেষ্টা করেননি ঠাকুরদাকে রাজি করাতে? দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে পিসিকে তখন বলতে শুনেছি--‘মা টাকা পাবে কোথায়! আর বাবা যা বলবে তার ওপরে কে কথা বলবে! তার কথাই তো শেষ কথা।’ অথচ আমার ঠাকুরদার কিন্তু সে অর্থে টাকার অভাব ছিলো না। কিন্তু আমার ঠাকুরমার হাতে মেয়ের ফরম পূরণ করার মতো টাকাও ছিলো না। কিংবা টাকা থাকলেও ঠাকুরমা হয়তো স্বামীর কথার বাইরে যেতেন না। কারণ এটাই তো বহু দিনের নারীর অবস্থা, নারীর পরিস্থিতি। অথচ সেই একই পরিবারে আমার কাকাকে তিন বার এইচ এস সি পরীক্ষা দিতে দিয়েছেন আমার সেই ঠাকুরদাই! তার জন্য আমার কাকাকে কোনো ধরনের আকুতি, আবেদন কিংবা কসরত করতে হয়নি! নিজের বাবা-মা ও নিজের বাড়িতে, আমাদের নারী-পিসি ও পুরুষ-কাকাদের এই অবস্থান!

চার.

আবার থেল্মা অ্যান্ড লুইস-এ ফিরে আসি। থেল্মা যখন খুনের ব্যাপারটা পুলিশকে জানাতে চাচ্ছিলো, তখন লুইস তাকে একটি কথা স্মরণ করে দেয়--‘ওখানে সবাই সারারাত তোমাকে তার সঙ্গে নাচতে দেখেছে। তোমার এই ধর্ষণের কথা কে বিশ্বাস করবে? আমরা তেমন কোনো পৃথিবীতে বাস করি না থেল্মা!’

আসলেই নারী তেমন কোনো পৃথিবীতে বাস করে না যেখানে নারী বলবে, সে ধর্ষণের শিকার হয়েছে আর আমাদের সমাজ সেটা মেনে নিবে। নারীর জন্য এই পৃথিবী অতোটা সহজ কোনোদিনও ছিলো না। কারো সঙ্গে নাচলে, কারো সঙ্গে হেসে দুটো কথা বলা মানে যে তাকে শারীরিক সম্পর্কের অনুমতি দিয়ে দেওয়া নয়, সেটা হয়তো এই পুরুষ, এই সমাজ বা এই সিস্টেমের বুঝে উঠতে আরো সময়ের প্রয়োজন। এখানে শুধু পুরুষের কথা বললে ভুল হবে, এই গোত্রে নারীর সংখ্যাও কিন্তু কম নয়। যাদের দ্বারা হাজারো প্রশ্নে প্রশ্নবিদ্ধ হতে হয় উল্টো নারীকেই। তবে নারী ঠিক এমন একটি পৃথিবীতে বাস করে যেখানে, ধর্ষণ করার পরদিনই ধর্ষক দেদারসে ঘুরে বেড়ায়। যেখানে নারীকে গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্মমভাবে পেটানো হয়। ‘যেখানে একদল নিজের ভাগে তড়িঘড়ি নিয়ে নেয় গদিওয়ালা চেয়ার, বিছানার পুরু তোশক, সম্পত্তির আশি ভাগ ও মাছের মুড়ো আরেক পাতে পড়ে থাকে কেবল এঁটোকাটা, সস্তা আলতার শিশি, সুগন্ধি কেশতেল।’৮

ঘরছাড়ার দিনে থেল্মা আর লুইসের পাশে প্রকৃত অর্থে কেউ ছিলো না। এমনকি থেল্মার স্বামীও না; যে স্বামীর সঙ্গে সে চার বছর ধরে সংসার করছে। তাদের এই জার্নির মধ্যে থেল্মা ফোনে মাঝেমধ্যে কথা বলেন তার স্বামীর সঙ্গে, কিন্তু তারা বা তিনি যে একটা বিপদে পড়েছে সে কথাটা বলার মতোও কোনো সুযোগই দেয় না তার স্বামী। উপরন্তু তিনি (স্বামী) কাজে বের হওয়ার আগে কেনো থেল্মা ঘরে নেই সেটাই কথোপকথনে মুখ্য হয়ে ওঠে বার বার। থেল্মা তাদের অবস্থার কথা বলতে চাইলেও তার স্বামী টিভিতে খেলা দেখা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। শুধু চলচ্চিত্রেই নয়, যুগের পর যুগ পুরুষ শুধু তার প্রয়োজনেই নারীকে কাজে লাগিয়েছে। কখনোবা সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র হিসেবে। কখনো তার ঘরের সব কাজ করবে বলে; অবশ্য সেই ঘরটাও সবসময় পুরুষেরই থেকেছে।

আমি একটা বউ চাই, যে আমার শারীরিক চাহিদা পূরণ করবে। আমার একটা বউ চাই, যে ঘর পরিষ্কার রাখবে। এমন একটা বউ চাই, যে আমার বাচ্চাদের সবকিছু দেখেশুনে রাখবে, আমার সবকিছু দেখেশুনে রাখবে। আমি একটা বউ চাই, যে আমার জামা-কাপড় পরিষ্কার রাখবে, ইস্ত্রি করবে, রিপু করবে এবং পুরোনো কাপড় বাতিল করে নতুন কিনে রাখবে। আমার ব্যক্তিগত প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ঠিক জায়গামতো সাজানো আছে কি না সে তা দেখে রাখবে।৯

পুরুষ বউ চায় কেবল তাদের প্রয়োজনে। আর তাই খাওয়ার পরেও নিজের থালাটা যে নিজেকেই পরিষ্কার করতে হয়, এই সামান্য ব্যাপারটা পুরুষের মাথায় আসে না। কারণ সে তো জানেই তার সব কাজের জন্য তার বউ আছে। আমি কখনো দেখিনি আমার পরিবারের কোনো পুরুষকে তার থালাটা পরিষ্কার করতে। খাওয়ার পরে ওই এঁটো থালাটাও রেখে দেওয়া হয় বাড়ির নারীর জন্য। আমার বাড়িতেই আমি দেখেছি, যে বয়সটাতে আমাকে বাড়ির সব কাজ শেখানো হয়েছে, ঠিক সেই বয়সি একটি ছেলেকে ভাত তুলে খাওয়ানো হচ্ছে। পুরুষ হিসেবে সে যে তোলা ভাত পাবে, আর নারী কেবল বাসনই পরিষ্কার করবে এই চর্চা একে একে ওই ছেলের মধ্যেও ঢুকে পড়ে। সুতরাং ‘আমার একটা বউ চাই’ প্রবন্ধের বউ চাওয়া, আর তার বউ চাওয়ার মধ্যে দিন শেষে আর কোনো পার্থক্য থাকে না।

অথচ চলচ্চিত্রে থেল্মা আর লুইস সময়ের প্রয়োজনে কী অদ্ভুতভাবে একে অন্যের অভিভাবক হয়ে ওঠে; একে অন্যের সহায় হয়ে ওঠে। থেল্মাকে লুইস তার জঞ্জালময় সংসারের বাইরের পৃথিবীটা প্রথম দেখিয়েছে; যে থেল্মা তার স্বামীর অনুমতি ছাড়া কখনো কোথাও যাননি। যেহেতু সংসার চলে পুরুষের উপার্জন করা অর্থে, তাই সংসারের সব সিদ্ধান্ত, এমনকি নারীকে নিয়েও যে সিদ্ধান্ত সেটা পুরুষই নিয়ে থাকে। এখানে নারীর অর্থনৈতিক অবস্থা একটি বড়ো বিষয়। তবে এটা ঠিক কেবল অর্থনৈতিক মুক্তিই নারীর মুক্তি আনে না, আনবেও না। মার্কসীয় সমাজ কাঠামোয় উৎপাদন ব্যবস্থা বা অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হলো ভিত্তি। আর ভিত্তির ওপর নির্ভর করে গড়ে ওঠে সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা বা উপরিকাঠামো। তবে দুটোই দুটোর পরিপূরক। ফলে নারী অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন হলেই বাকি সব স্বাধীনতা আসবে--এমন ভাবা ঠিক নয়। অর্থনীতি, সংস্কৃতি দুটো সমান্তরালে চললেই না মুক্তি আসবে। আর যদি কেবল অর্থনৈতিক মুক্তিতেই সব হতো, তাহলে ঘরে ঘরে শিক্ষিত, চাকরিজীবী নারীরা শোষণ-বঞ্চনার শিকার হতো না কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকার চোখ উপড়ে ফেলতো না তার প্রকৌশলী স্বামী!১০

চলচ্চিত্রে রেস্তোরাঁয় কাজের সুবাদে আর্থিক দিক দিয়ে লুইস খানিকটা এগিয়ে থেল্মার চেয়ে। সুতরাং সপ্তাহান্তে ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনাটা লুইস অনায়াসেই করতে পারেন। অন্যদিকে থেল্মা যেহেতু হাউজওয়াইফ তাই সামান্য টাকার জন্যও হয়তো তাকে স্বামীর ওপর নির্ভর করতে হয়। সে যে কাজই করুক না কেনো, তার স্বামীর অনুমতি নিয়ে করতে হয়। এমনকি বান্ধবীর সঙ্গে ঘুরতে যাওয়ার জন্যও অনুমতির প্রয়োজন পড়ে তার। সংসারের সব কাজ করেও স্বামীর কাছ থেকে অনীহা, তাচ্ছিল্যই জোটে তার। ধর্ষণ চেষ্টাকারীকে খুন করার পর তারা যখন পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন জেমি’র (লুইসের প্রেমিক) কাছে লুইস টাকা ধার চান। সেই মুহূর্তে জেমি ধার দিতে রাজিও হন। কিন্তু লুইস যখন টাকা পাঠানোর জন্য তাদের ঠিকানা বলেন, জেমি তখন বলেন, তিনি টাকা তুলতে পারেননি; তাই টাকাটা দিবে তার এক বন্ধু। তখন তিনি একটি ঠিকানা লুইসকে দেন। লুইস সেই ঠিকানা অনুযায়ী গিয়ে দেখেন স্বয়ং জেমিই সেখানে উপস্থিত। অর্থাৎ জেমি হয়তো বিপদের সময় তাকে ধারটা দিয়েছে, কিন্তু তার এই সাহায্যের মধ্যেও অন্য একটি বিষয় আছে। লুইস কোথায় আছে, কী করে বেড়াচ্ছে এবং টাকাটা লুইসেরই প্রয়োজন কি না সেসব না দেখে, সার্বিক পরিস্থিতি না বুঝে টাকা দিতে রাজি নন জেমি!

জেমি হয়তো লুইসকে ভালোবাসেন, কিন্তু এ ভালোবাসার পিছনেও আছে অদৃশ্য হাজার শর্ত। যে শর্তগুলো মেনেই নারীকে চলতে বাধ্য করে পুরুষ। লুইস হয়তো জেমির এই চালাকিটা ধরতে পারেন। আমার আশপাশে আমি অনেক প্রেমিকা দেখেছি, প্রেমিকের এই শর্তগুলোকে তারা স্বর্গীয় মনে করে এবং অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলে। আবার এই শর্তারোপকেই তারা প্রেমিকের ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ বলেও দাবি করে। আর এ দাবি পূরণ করতেই, জীবনে কোনোদিন বোরকা না পরলেও, প্রেমে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে অপছন্দ সত্ত্বেও বোরকা পরা শুরু করতে হয় কিংবা হাসি হাসি মুখ করে অপছন্দের ক্রিকেট খেলা নিয়ে আলোচনা করতে হয়। কারণ একটাই, তার প্রেমিককে খুশি করা। নারী বলেই যেনো তাকে সবসময় অন্যকে খুশি করে বা মন জুগিয়ে চলতে হয়। তবে নারী হিসেবে পুরুষের এ ধরনের কর্মকাণ্ড মেনে নিলে বেলাশেষে যে নিজের সত্তাটাই বিলীন হতে থাকে, এটা হয়তো তাদের মাথাতেই আসে না। ফলে নারী যাই করুক না কেনো পুরুষকে বলে, জানিয়েই করতে হয়। জেমিও এই নিয়মের, এই সিস্টেমের বাইরের কেউ না।

পাঁচ.

বেড়ানোর একপর্যায়ে থেল্মা ও লুইসের সঙ্গে পরিচয় হয় আরেক পুরুষ জেডি’র, যার সঙ্গে থেল্মার ‘প্রেমের সম্পর্ক’ গড়ে ওঠে। অথচ জেডি মূলত বিপদের দিনে ভালোবাসার ফাঁদ পাতে এবং জেমির কাছ থেকে ধারে পাওয়া পুরো টাকাটাই চুরি করে নিয়ে পালায়। রাস্তায় আরেকজন গাড়িচালকের সঙ্গে বার বার দেখা হতে থাকে তাদের। যে কিনা প্রত্যেকবার সাক্ষাতেই তাদেরকে নানান ‘অশ্লীল’ কথা, ইঙ্গিত করতে থাকে। একপর্যায়ে থেল্মা আর লুইস কৌশলে একটা জনশূন্য মাঠে ডেকে নেয় তাকে। চালক ভাবে তার ডাকে হয়তো সাড়া দিয়েছে তারা। কিন্তু ওই ফাঁকা মাঠে যাওয়ার পর তাদের কথোপকথন ছিলো এমন--

থেল্মা অ্যান্ড লুইস এর একটি দৃশ্য

লুইস : তোমার চোখ দুটো আড়াল করেছো কেনো? আমি তোমার চোখ দেখতে চাই।

চালক : (চশমা খুলে) হুম, আমিও তোমাকে দেখছি।

থেল্মা : আমার মনে হয় তোমার আচার-ব্যবহার খুব বাজে।

চালক : হ্যাঁ।   

লুইস : নারীদের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করতে হয় তুমি এখনো শেখোনি? তোমার মায়ের সঙ্গে কেউ এমন ব্যবহার করলে তোমার কেমন লাগতো? অথবা তোমার বোন বা স্ত্রীর সঙ্গে?

চালক : কী বলতে চাচ্ছো তুমি?

ল্ইুস : তুমি খুব ভালোভাবে বুঝতে পারছো আমি কী বলছি।

এরপর তার এই ব্যবহারের জন্য তারা চালককে ক্ষমা চাইতে বলে। কিন্তু কোনোক্রমেই তিনি ক্ষমা চাইতে রাজি হন না, বরং ধর্ষণ চেষ্টাকারী হারল্যানের মতো তিনিও ‘অশ্লীল’ কথা বলতে থাকেন। বার বার ক্ষমা চাইতে বললেও কোনোমতেই চালক ক্ষমা তো চানই না, উল্টো ক্ষেপে গিয়ে আরো বাজে কথা বলতে থাকেন থেল্মা আর লুইসকে। পরিস্থিতি এমন হয় যে ক্ষমা চাইতে বলে তারাই যেনো অন্যায় করে ফেলেছে। অন্যদিকে পুরুষ হিসেবে যেনো সঠিক কাজটিই করেছেন ওই চালক। সুতরাং তার ক্ষমা চাওয়ার কোনো মানেই হয় না। নারীকে যা ইচ্ছা তাই বলার অধিকার আছে তার।

তবে নারী জন্যই যে সবসময় তারা শুধু ঘটনার শিকারই হবে, এমনটা কিন্তু নয়। থেল্মা ও লুইস এই সময়ের মধ্যে এতোটুকু বুঝে গেছে যে, তাদের আর পিছু ফেরার সময় বা পথ কোনোটাই নেই। কেননা শুরুতেই একটা সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে তারা তাদের সব সমস্যার সমাধান খুঁজে পেয়েছে। তাই এখন কোনো বাধারই শক্তি নেই, যা তাদের পথ আটকায়। মহাকালের সব শক্তি এখন শুধুই তাদের। যে শক্তি দিয়ে তারা তাদের পথের কাঁটাকে এক নিমিষেই উপড়ে ফেলতে পারবে। তাই কোনো আগপাছ না ভেবেই থেল্মা আর লুইস গুলি করে তার (চালকের) তেল বহনকারী ট্যাঙ্কারের চাকাগুলো একে একে ব্লাস্ট করতে থাকে। একপর্যায়ে ট্যাঙ্কারটা আগুন লেগে বিস্ফোরিত হয়। গাড়িতে আগুন লাগিয়েই যেনো তারা জয়ী হয়। তাদের রাগ-ক্ষোভের কিছুটা হলেও অবসান হয়। অন্যদিকে পুলিশও তাদের খুঁজতে মরিয়া হয়ে ওঠে।

ছয়.

খুবই সাধারণ দুই নারী বেরিয়েছিলো দুই দিনের ছুটি কাটাতে। কিন্তু তাদের সেই ছুটিটা আর কাটানো হয়ে ওঠে না এই সিস্টেম, সমাজ, রাষ্ট্র, সংস্কৃতির মধ্যে। শেষে এমন এক পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে যেতে হয় তাদের, সেখানে শুধু পালিয়ে বাঁচা ছাড়া আর কোনো পথ থাকে না। আর সবকিছু ছেড়েও নিজেদের মতো করে বাঁচাটা ঠিক হয়ে ওঠে না--কখনো টাকার জন্য, কখনো পুরুষের জন্য। বিপদের এমনই অদৃশ্য জাল যেনো ঘিরে রাখে নারীর চারপাশকে। অনেক কষ্টে সেই জাল থেকে বের হলেও নতুন আরেকটি জাল এসে আটকায় তাদের পথ। বাস্তবের নারীর চিত্রও কিন্তু আলাদা নয়। নারীর জন্য এমন এক ফাঁদ পাতা থাকে যেখান থেকে মুক্তি পেতে শেষ পরিণতি হয় থেল্মা আর লুইসের মতোই। যে পরিণতি কোনো পুরুষের কিন্তু হয়নি/হয় না। কালের অতলে হারিয়ে যেতে হয় কেবল নারীকে। যে সীতা তার স্বামীর ১৪ বছরের বনবাসের সঙ্গী হন, ঘটনাক্রমে তাকেই লোকনিন্দার ভয়ে পরিত্যাগ করেন রাম। শুধু তাই নয়, সতীত্বের প্রশ্নে অগ্নিপরীক্ষার কথা বললে মর্মাহত সীতা পাতালে প্রবেশ করেন।

চলচ্চিত্রটি আমি প্রথম দেখেছি ২০১৯ খ্রিস্টাব্দের শুরুর দিকে। এখন ২০২০; এই সময়ের মধ্যে চলচ্চিত্রটি অনেকবার দেখেছি আমি। যতোবারই দেখেছি, মনে হয়েছে নারীকে কেউ এসে টেনে বের করে স্বাধীন করবে না। সীমন দ্য ব্যোভওয়া’র ভাষায়, নারীকে তাদের নিজেদের সমস্যা সমাধানের ভার নিজের হাতে নেওয়ার জন্য প্রকৃত অর্থে নারীবাদী হয়ে ওঠা প্রয়োজন।১১ অর্থাৎ নারীর সবটা নারীকেই করতে হবে, নারীকেই বুঝতে হবে। কোনো বিপদ বা সঙ্কট থেকে উত্তরণের জন্য কারো ওপর নির্ভরশীল না হয়ে বরং নিজের বিপদটা, নিজের সমস্যাটাকে চিহ্নিত করে নিজেকেই সমাধান করতে হবে। কেননা অন্যের ওপর নির্ভর করা মানেই হলো আরো বেশি দুর্বল হওয়া, সময় অতিক্রম করা, আরো বেশি পিছনে হটা। তাই জীবনের শেষ সময় অবধি টিকে থাকার জন্য লড়াই করে যাওয়াটাই জরুরি। কারণ জীবন মানে হেরে যাওয়া নয়। তবে টিকে থাকার জন্য এই চোরাগলিটার মধ্য দিয়ে নারীকেই যেতে হয়। আর তাই তো ধর্ষণের হাত থেকে বাঁচতে পারলেও একের পর এক পুরুষরূপী সাপ, ভালুক বা সাইকোরাও পিছু ছাড়েনি তাদের। তাই বলে নারীও কিন্তু থেমে থাকেনি। কারণ থেমে থাকা তো জীবন নয়। পরিস্থিতির প্রয়োজনেই তারা তাদের শৃঙ্খল ভেঙেছে, চলেছে নিজেদের গন্তব্যহীন পথে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই গন্তব্যহীন পথটাই হয়তো তাদের গন্তব্য হয়ে উঠেছে।

চলচ্চিত্রটি প্রথমবার দেখার পর আমার মনেই হয়নি, এ নিয়ে লিখতে বসে আমার নিজেরই এতোগুলো কথা বলে ফেলবো। কিন্তু চলচ্চিত্রের সঙ্গে নিজেকে মেলাতে মেলাতে কখন যে এতোগুলো কথা বলে ফেলেছি নিজেই টের পাইনি। তবে এখন মনে হচ্ছে, এই সবগুলো কথা তো আমি বলতেই চেয়েছিলাম; এই কথাগুলো হয়তো আমাকে বলতেই হতো। কারণ এগুলোই তো আমার মায়ের, আমার পিসির, আমার কথা। আমাদের নারীদের কথা।

পুলিশ তাড়া করার একপর্যায়ে তাদের হাতে ধরা পড়ে যায় থেল্মা ও লুইস। চারপাশ থেকে পুলিশ তাদের গাড়িটি ঘিরে ফেলে। ফলে পুলিশের কাছে ধরা পড়া ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় থাকে না। থেল্মা ও লুইসের গাড়িটা এমন জায়গায় এসে পৌঁছে, হয় তাদের আত্মসমর্পণ করতে হবে, না হলে সামনের বিশাল খাদে গাড়ি চালিয়ে দিতে হবে। ঠিক এমন সময় থেল্মা আর লুইসের কথোপকথন ছিলো এমন--

থেল্মা : শোনো ধরা পড়া যাবে না।

লুইস : এটা তুমি কী বলছো!

থেল্মা : সামনে চলো।

লুইস : মানে?

থেল্মা : চলো।

লুইস : তুমি শিওর?

থেল্মা : হ্যাঁ।

তারা ধরা পড়তে চায়নি, কারণ তারা তো আদতে কোনো অন্যায় করেনি। তারা কেবল নিজেদের বাঁচাতে চেয়েছে, তারা শুধু বাঁচতে চেয়েছে। হয়তো তারা বেঁচেছে বা বাঁচেনি। তবে লড়াইটা তারা অব্যাহত রেখেছে। এবং শেষ পর্যন্তই লড়েছে। কিন্তু এই সমাজবাস্তবতায় কতোজন নারী থেল্মা আর লুইস হয়ে উঠতে পারে?

লেখক: প্রিয়াংকা দেবনাথ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী।

priyankadebnath422@gmail.com

https://www.facebook.com/priyanka.debnath.31521

 তথ্যসূত্র

1. https://www.youtube.com/watch?v=c9xp34vQepk;retrieved on: 09.02.2020

2. https://bit.ly/3aJTq95; retrieved on: 17.02.2020

3. https://bit.ly/2y8RGJs; retrieved on: 05.03.2020

4. https://bit.ly/35gTYCc; retrieved on: 11.03.2020

5. https://bit.ly/3f2FWZG; retrieved on: 11.03.2020

6. https://bit.ly/2YdFUIo; retrieved on:12.03.2020

7. https://bbc.in/3cWSn7h; retrieved on: 12.03.2020

8. https://www.youtube.com/watch?v=LBOQ98itY_I; retrieved on: 15.03.2020

৯. ব্রাডি, জুডি; ‘আমার একটা বউ চাই’; অনুবাদ : তসলিমা তাহরিন; মুক্তস্বর; সম্পাদনা : নারী সংহতি, কেন্দ্রীয় পরিচালনা কমিটি, ঢাকা, সংখ্যা ৪, নভেম্বর ২০১৯, পৃ.৭৫।

10. https://bbc.in/2VMUoxq; retrieved on: 20.03.2020

১১. ব্যোভওয়া, সীমন দ্য ও অন্যান্য (২০০০ : ৩২); সীমন দ্য ব্যোভওয়া-এর সঙ্গে কথোপকথন : দ্বিতীয় লিঙ্গের পরে; ‘আমি নারীবাদী’; অনুবাদ : অদিতি ফাল্গুনী ও সায়েমা খাতুন; গ্রন্থনা ও সম্পাদনা : আলম খোরশেদ, খনা, চট্টগ্রাম।


বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ১৯তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২০ এ প্রকাশিত হয়েছে।

 

 

 

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন