জাহাঙ্গীর আলম
প্রকাশিত ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
তিনি আনা কারিনা, ফরাসি নবতরঙ্গের আইকন
জাহাঙ্গীর আলম

প্যারিসে ম্যাগাজিনের জন্য ফটোশুট করতে গিয়েছিলেন এক তরুণী। মেকআপ-এর ফাঁকে কথায় কথায় মেকআপ-শিল্পীকে বলেছিলেন, মডেল নয়, অভিনয়শিল্পী হওয়ার খুব ইচ্ছে তার। ঠিক সেই মুহূর্তে গ্রিনরুমে ঢুকে পড়েন এক নারী; জিজ্ঞাসা করেন, ‘কী বললে, কী হতে চাও?’ তরুণী অসঙ্কোচে জানান, ‘অভিনয়শিল্পী হতে চাই।’ ওই নারী এবার জিজ্ঞাসা করেন, ‘কী নাম তোমার?’ তরুণী জানায়, হানে কারিন বায়ার। স্মার্ট সেই নারী বলেন, ‘অভিনয়শিল্পী যদি হতেই চাও তোমার নাম হওয়া উচিত আনা কারিনা।’ এরপর থেকে ওই তরুণী পরিচিতি পায় আনা কারিনা নামে। হঠাৎই গ্রিনরুমে ঢোকা ওই নারী ছিলেন মূলত ফ্রান্সের কিংবদন্তি ফ্যাশন ডিজাইনার কোকো শানেল মানে শানেল ব্র্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা। আর ওই তরুণী হলেন, পরে ফরাসি নবতরঙ্গ ধারার বিখ্যাত অভিনয়শিল্পী আনা কারিনা।
মডেলিং দিয়ে শুরু হলেও বিখ্যাত চলচ্চিত্রনির্মাতা জ্যঁ লুক গদার-এর চলচ্চিত্রে অভিনয় করে আনা কারিনা হয়ে উঠেন ফরাসি নবতরঙ্গ ধারার আইকন। পরবর্তী সময়ে চলচ্চিত্রনির্মাতা, লেখক ও কণ্ঠশিল্পী হিসেবেও তিনি সুনাম কুড়ান। ৭৯ বছর বয়সে ২০১৯ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ডিসেম্বর প্যারিসের একটি হাসপাতালে আনা কারিনা জীবনমঞ্চ ত্যাগ করেন। এই প্রবন্ধটি আনা কারিনার স্মৃতির উদ্দেশ্য নিবেদিত।
ভালোবাসাহীন শৈশব
আনা কারিনার জন্ম ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দের ২২ সেপ্টেম্বর, ডেনমার্কের সলবার্গে। তার বাবা ছিলেন জাহাজের ক্যাপ্টেন। আনা ছোটো থাকতেই মাকে ছেড়ে চলে যান তার বাবা। চার বছর পর্যন্ত আনা তার নানার কাছে বেড়ে ওঠেন। আট বছর বয়সে তার বসবাস শুরু হয় সৎ বাবার পরিবারে। ভালোবাসাহীন শৈশবে প্রায়ই আনা বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতেন। আনার ভাষ্যমতে, ‘নিজ শহর থেকে বহু দূরে সুইডেন, এমনকি আমেরিকাতেও পালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা হতো আমার।’
কেনো জানি সেই ছোটোবেলা থেকেই অভিনয়শিল্পী হওয়ার স্বপ্ন ছিলো আনার। চেষ্টাও করেছেন নানাভাবে। কিন্তু সমস্যা হলো ডেনমার্কে ২১ বছরের কম কোনো শিক্ষার্থীকে ড্রামা-স্কুলগুলো ভর্তি করতো না। এমনও হয়েছে এজন্য আনা দেশ ছেড়ে পর্যন্ত চলে যেতে চাইতেন। স্কুলেও তার উপস্থিতি ছিলো খুবই কম। কিন্তু পরীক্ষার ফলাফল বরাবরই ছিলো ভালো। স্কুল কর্তৃপক্ষ বিশ্বাস করতে চাইতো না, এই মেয়ে স্কুলে না এসে, ঠিক মতো ক্লাস না করে এতো ভালো ফল করে কীভাবে! এসব কথা নানাভাবেই কানে আসতো আনার। বিষয়গুলোকে শেষ পর্যন্ত তিনি ভালোভাবে নিতে পারেননি। ফল হিসেবে তিনি ১৪ বছর বয়সেই স্কুল ছেড়ে দেন। অভিনয়শিল্পী হিসেবে স্বপ্ন দেখা আনা কাজ নেন শপিং মলের লিফট অপারেটর ও ইলাস্ট্রেটর কাজ করে এমন একজনের সহকারী হিসেবে।
আনা কারিনা
এই কাজও বেশি দিন করতে পারেননি আনা। এবার তিনি স্বপ্নের কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করেন। কাজ শুরু করেন চলচ্চিত্রের জুনিয়র আর্টিস্ট (এক্সট্রা) হিসেবে। পরের কয়েক বছর আনা জুনিয়র আর্টিস্ট হিসেবেই কাজ করেন। এ সময় তিনি দ্য গার্ল অ্যান্ড দ্য সুজ (১৯৫৯) নামের একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে প্রধান চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান। আনার এই কাজ মোটেও ভালোভাবে নিচ্ছিলেন না তার সৎ বাবা। ফলে সৎ বাবার পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছিলো। একপর্যায়ে তিনি সেই বাড়ি ছাড়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন। এবার দাদার কাছ থেকে ১৫ ডলার সমমূল্যের অর্থ নিয়ে প্যারিসের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়েন আনা। অভিনয়ের সুবাদে তার পরিচিত অনেকেই তখন সেখানে জুনিয়র আর্টিস্ট হিসেবে কাজ করছিলো। তার আশা ছিলো, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিশ্চয় প্যারিসে কোনো একটা কাজ জুটিয়ে নিতে পারবেন।
‘অলৌকিক’ জীবনের শুরু
১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দের গ্রীষ্মে প্যারিস পৌঁছান আনা। তখন তার বয়স সবে ১৭। ফ্রেঞ্চ জানেন সামান্যই। অচেনা শহর, চেনা-জানা লোকেরা খুব বেশি সহায়তা করতে পারছিলেন না। সঙ্গের সামান্য টাকা শেষ; বাসা ভাড়ার অর্থ নেই; অনাহারে-অর্ধাহারে এখানে-সেখানে, এমনকি রাস্তাতেই দিন কাটতে থাকে তার। তবে খুব বেশি দিন কষ্ট করতে হয় না তাকে। হঠাৎ করেই তিনি মডেলিংয়ে সুযোগ পেয়ে যান। এরপর খুব দ্রুতই চলচ্চিত্রে তার আগমন ঘটে। সেই সময়ের কথা স্মরণ করে ‘নিউইয়র্ক টাইমস’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আনা বলেন,
১৭ বছর বয়সে আমি প্যারিস চলে আসি। একদিন লাতিন কোয়ার্টারে ‘লা দ্যু মাগো’ নামে এক ক্যাফেতে বসেছিলাম। এক নারী আমার দিকে এগিয়ে এসে বললেন, ‘ফ্যাশনের জন্য ছবি তুলতে চাও? শুনে ঘাবড়ে গেলাম। বললাম, যদি তিনি অনেক লোক নিয়ে আসেন, তাহলে রাজি আছি। জু দ্যু ফ্রান্স নামের একটি পত্রিকায় সেই ছবিগুলো ছাপা হলো। সেসময় টাকার দরকার ছিলো আমার। কিন্তু ছবি ছাপা হওয়ার আগ পর্যন্ত তারা আমাকে কোনো টাকাই দেয়নি। তাই ছবিগুলোর কপি হাতে নিয়ে, কোনো জুতো ছিলো না বলে নোংরা হয়ে যাওয়া সাদা হাই-হিলটা পরেই হেঁটে ‘এলে’ ম্যাগাজিনের অফিসে হাজির হলাম। এর কিছুদিন পর, ‘এলে’র কাভারে জায়গা পেলাম; এর পর সবাই আমাকে চাইতে লাগলো। এ যেনো এক অলৌকিক ব্যাপার!১
ঠিক এই সময়েই আনার সঙ্গে পরিচয় হয় ফ্রান্সের কিংবদন্তি ফ্যাশন ডিজাইনার শানেল ব্র্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা কোকো শানেলের সঙ্গে। আগেই বলেছি, এই কোকো শানেলই তার নাম পাল্টে রাখেন আনা কারিনা।
ভীষণ আজব লোকের সঙ্গে সাক্ষাৎ
চলচ্চিত্রের ইতিহাসের শুরু থেকেই চলচ্চিত্রনির্মাতারা তাদের স্ত্রী বা প্রেমিকাকে অভিনয়ের সুযোগ দিয়েছে--এমন উদাহরণ নতুন নয়। যেমন, জোসেফ ভন স্টারবার্গ—মেরলিন ডায়েটরিচ ও রোবের্তো রোসেলিনির-ইনগ্রিড বরিমান এর কথা বলা যায়। অবশ্য ৬০-এর দশকে ফরাসি নবতরঙ্গের সময় নির্মাতা আর তারকাদের মধ্যে সম্পর্ক ছিলো ভিন্ন এক মাত্রার। এ সময়ের জুটিদের মধ্যে ছিলেন লুই মাইল-জেন মহো, ক্লদ শ্যাব্রল-স্টেফান অড্রেন, ফ্রাঁসোয়া ত্রুফোর তো সেই সময়ে কয়েকজন জনপ্রিয় অভিনয়শিল্পীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিলো আর ছিলো জ্যঁ লুক গদার-আনা কারিনা প্রমুখ। এদের মধ্যে সিনেমাটিক ও ব্যক্তিগত সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি অন্তরঙ্গ ছিলো জ্যঁ লুক গদার ও আনা কারিনা। গদারের হাত ধরেই আনার চলচ্চিত্রে যাত্রা শুরু হয়। গদারের সঙ্গে প্রথম দেখা হওয়া সম্পর্কে আনার ভাষ্য ছিলো এমন--তিনি (গদার) আমাকে ব্রেথলেস-এ একটি ছোটো চরিত্রে অভিনয় করতে ডেকেছিলেন। তারপর বললেন, তোমাকে নগ্ন হতে হবে। আমি কিন্তু সেসময় মোটেও তা হতে চাইনি। শুনে তিনি বললেন, ‘কিন্তু একটা সাবানের বিজ্ঞাপনে তোমাকে তো আমি তেমনটাই দেখেছি!’ তাকে বললাম, ‘আমি নগ্ন ছিলাম না। এটা তোমার কল্পনা। তুমি আমার কাঁধের সামান্য অংশ দেখেছো মাত্র; তার নিচে আমার বাথিং স্যুট পরা ছিলো।’ যেহেতু চলচ্চিত্রটি আমি করবো না, তাই সেদিন চলে এসেছিলাম। তিন—চার মাস পর নতুন একটি টেলিগ্রাম পেলাম গদার ও প্রোডাকশন কোম্পানি থেকে। এবার সম্ভবত কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগের প্রস্তাব। ভাবলাম নিশ্চয় ইয়ার্কি করছে। বন্ধুদের টেলিগ্রামটা দেখালাম। ওরা বললো, ‘তুই কি পাগল! সবাই তাকে (গদার) চেনে। তার ব্রেথলেস এখনো মুক্তি পায়নি। এতে জ্য সেবার ও জ্য বেলমদো অভিনয় করেছে। তারা সবাই বলছে, চলচ্চিত্রটা দারুণ হয়েছে। তোর উচিত তার সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া।’ তাদের কাছে আমি নিশ্চিত হওয়ার জন্য জানতে চেয়েছিলাম, কালো চশমা পরা লোকটাই গদার কি না? কারণ তাকে ভীষণ আজব লোক মনে হয়েছিলো আমার।২
আনার প্রথম কাহিনিচিত্রের নাম দ্য লিটল সোলজার (১৯৬০)। এটি ছিলো গদারের দ্বিতীয় চলচ্চিত্র। আলজেরিয়ার যুদ্ধ নিয়ে চলচ্চিত্রটিতে পরস্পর বিরোধী মতামত রয়েছে--এমন অজুহাতে সেটি নিষিদ্ধ করে ফ্রান্সের তথ্য মন্ত্রণালয়। অবশ্য ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায়। এদিক থেকে আনার প্রথম মুক্তি পাওয়া চলচ্চিত্র আ ওম্যান ইজ আ ওম্যান (১৯৬১)। এটি ছিলো মিউজিকাল কমেডি। অ্যাঞ্জেলা নামের হোটেল নর্তকীর চরিত্রে অভিনয় করেন আনা। সন্তানের জন্য উদগ্রীব অ্যাঞ্জেলা তার ছেলেবন্ধুকে একপ্রকার জোর করে বিয়ে করেন এবং সন্তানের পিতৃত্ব আদায় করেন। প্রথম মুক্তি পাওয়া চলচ্চিত্রেই মাত করেন আনা, অনবদ্য অভিনয়ের জন্য ১১তম বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা অভিনয়শিল্পীর পুরস্কার পান তিনি।
১৯৬০ খ্রিস্টাব্দের পর গদার নির্মিত মোট আটটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন আনা। চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে--মাই লাইফ টু লিভ (Vivre Sa Vie, 1962), ব্যান্ড অব আউটসাইডারস (Bande à part, 1964), পিয়েরোট দ্য ম্যাডম্যান (Pierrot le Fou), আলফাভিলে (Alphaville, 1965), মেইড ইন ইউএসএ (১৯৬৬) ও দ্য ওল্ডেস্ট প্রফেসনস (Le Plus Vieux Métier du monde,1967)। অবশ্য শেষের চলচ্চিত্রটি ছয় নির্মাতার অমনিবাস চলচ্চিত্র। এতে গদার নির্মিত অংশে অভিনয় করেন আনা।
কাজপাগল মানুষের সঙ্গে সংসার
গদারের চলচ্চিত্রে আনা নেই এটা কল্পনাই করা যেতো না। আবার গদার ছাড়া আনাও খুব ভালো কিছু করতে পারছিলেন না। অনেক নামী নির্মাতার সঙ্গেই সেসময় আনা কাজ করেছিলেন। কিন্তু গদারের চলচ্চিত্রের বাইরে তাকে তেমন খুঁজে পাওয়া যায় না। অবশ্য গদার নির্মিত চলচ্চিত্রে আনা বর্তমানেও সমানভাবে আলোচিত। চলচ্চিত্রে কাজের মধ্য দিয়েই তাদের সম্পর্কটা গড়ে ওঠে। আনার ভাষ্য মতে,
ধীরে ধীরে আমরা পরস্পরের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ি। আমাদের মধ্যে ভীষণ রকম বিশেষ কিছু ছিলো, যা থেকে পালানোর উপায় ছিলো না। এটা অনেকটা চুম্বকের মতো। এসব শুরু হয় দ্য লিটল সোলজার-এর শুটিং থেকেই। ... [শুটিং শেষে] আমরা দুইজন প্যারিসে চলে এলাম। গদার আমাকে জিজ্ঞাসা করলো, ‘তাহলে তুমি এখন কোথায় যাবে? মানে কোথায় নিয়ে যাবো তোমাকে?’ আমি বললাম, ‘তুমি আমাকে কোথাও নিয়ে যেতে পারবে না; আমাকে তোমার সঙ্গেই থাকতে হবে। আমার আর কোথাও যাওয়ার নেই!৩
১৯৬১ খ্রিস্টাব্দেই গদার ও আনা বিয়ে করেন। চলচ্চিত্রে গদার ও আনার রসায়ন সবার মন জয় করলেও সংসার জীবন ছিলো অস্থিরতায় ভরা। চার বছরের মাথায় ১৯৬৫-তে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়। গদার মূলত কাজপাগল মানুষ। এমনও হয়েছে, সিগারেট কেনার কথা বলে হয়তো বাইরে গেছেন। সেখানে গিয়ে কোনো কাজের কথা মনে হয়েছে, ফলে আর বাড়ি ফেরেননি; কাজ নিয়েই ব্যস্ত হয়ে গেছেন। দুই—তিন সপ্তাহ খোঁজ নেই। সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে এক সাক্ষাৎকারে আনা বলেন,
পরে বুঝতে পেরেছি, কখনো কখনো সে ইতালি চলে যেতো রোবের্তো রোসেলিনির সঙ্গে দেখা করতে, কিংবা বার্গম্যানের সঙ্গে দেখা করতে সুইডেনে, কিংবা নিউ ইয়র্কে চলে যেতো উইলিয়াম ফকনারের সঙ্গে দেখা করতে। সবখানেই বন্ধু ছিলো তার। সে এভাবেই যাতায়াত করতো। সঙ্গে সবসময়ই নিজের পাসপোর্ট রাখতো সে। সে ঠিক কোথা থেকে ঘুরে এলো, বাড়ি ফিরলেই আমি বুঝে যেতাম। কেননা পাসপোর্টে স্টাম্পস দেখতাম। তাছাড়া যেখানেই যাক আমার জন্য সবসময়ই ছোটোখাটো উপহার নিয়ে আসতো।৪
তবে তখন রাগ-অভিমান থাকলেও পরবর্তী সময়ে গদারের প্রশংসাই করেছেন আনা। তার খুব সরল উক্তি ছিলো--এমন মানুষের সঙ্গে সংসার করা সত্যিই কঠিন! তবে এজন্য তিনি গদারকে মোটেও দোষারোপ করেননি। বরং সবসময় তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। আনার ভাষায়, ‘সারাজীবনই ভীষণ কৃতজ্ঞ আমি তার কাছে। নিশ্চয়ই সে (গদার) একজন বিশেষ মানুষ। তবে এমন একজনের সঙ্গে জীবন কাটানো কঠিন ছিলো।’৫
গদারের সঙ্গে বিচ্ছদের পর আরো তিনবার বিয়ে করেন আনা। সবশেষ ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে তিনি আমেরিকান নির্মাতা ডেনিস বেরিকে বিয়ে করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তারা একসঙ্গেই ছিলেন।
আন্তর্জাতিক তারকা
৬০-এর দশকেই আনা একজন প্রতিষ্ঠিত অভিনয়শিল্পীর মর্যাদা পান। গদারের সঙ্গে বিচ্ছেদের পর তার অন্য নির্মাতাদের সঙ্গে আরো বেশি বেশি কাজের সুযোগ তৈরি হয়। বিখ্যাত কণ্ঠশিল্পী ও গীতিকবি সের্গেই গেইন্সবার্গ আনাকে নিয়ে টিভি মিউজিকাল নির্মাণ করেন। আনা শিরোনামের এই চলচ্চিত্রে আনা কারিনার দুটি গান ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। জনপ্রিয় কাল্টে পরিণত হন তিনি।
ফ্রান্সের বাইরে থেকেও আনার কাছে চলচ্চিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব আসতে থাকে। পরবর্তী কয়েক বছর আনা বিশ্বের স্বনামধন্য নির্মাতাদের সঙ্গে কাজ করেন। এর মধ্যে রয়েছেন লুকিনো ভিসকোন্তি (The Stranger, 1967), গাই গ্রিন (The Magus, 1968), জন লি থম্পসন (Before Winter Comes, 1969), টনি রিচার্ডসন (Laughter in the Dark, 1969), ভলকার স্লিয়েনডর্ফ (Michael Kohlhaas – Der Rebell, 1969) এবং জর্জ কুকর (Justine, 1969)। তবে দুঃখের বিষয় হলো, এসব চলচ্চিত্র সম্ভাবনাময় হলেও দর্শক ও সমালোচকদের প্রত্যাশা মেটাতে পারেনি। যদিও প্রতিটি চলচ্চিত্রেই আনার অভিনয় প্রশংসিত হয়েছে।
৭০ দশকে আনার বেশকিছু চলচ্চিত্র মুক্তি পায়। এছাড়া ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি নিজে নির্মাতা হিসেবে আবির্ভূত হন। লিভিং টুগেদার (Vivre ensemble) চলচ্চিত্রটিতে মুক্তমনা এক নারীর প্রেমে পড়েন সাদাসিধে অধ্যাপক। একপর্যায়ে চাকরি হারানোর পাশাপাশি ওই অধ্যাপক মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন। এই চলচ্চিত্রটি নিয়ে সমালোচকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। তবে সামাজিক অসঙ্গতি সৎ ও স্পষ্টভাবে তুলে ধরার জন্য নির্মাতা হিসেবে আনা প্রশংসিত হন।
৮০’র দশকেও কয়েকটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন আনা। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য রাউল রুইজ-এর ট্রেজার আইল্যান্ড (L’Ile autrésor, 1985) ও আন্দ্রে ডেলভো’র দ্য অ্যাবিস (L’Oeuvre au noir, 1988)। এছাড়া এ সময় সেলুলয়েডের চেয়ে ইঙ্গমার বার্গম্যানের থিয়েটার ‘ভার্সন আফটার দ্য রিহার্সেল’-এ আনার অভিনয় সবার নজর কাড়ে।
কেবল নবতরঙ্গের আইকনই নন
দীর্ঘ বিরতির পর ১৯৯৫ এবং ২০০৫ খ্রিস্টাব্দে দুটি চলচ্চিত্রে আনাকে এক ঝলক দেখা যায়। সর্বশেষ ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে আনার নির্মিত, লেখা ও অভিনীত মিউজিকাল রোড চলচ্চিত্র ভিক্টোরিয়া মুক্তি পায়।
অভিনয় ছাড়াও কণ্ঠশিল্পী হিসেবেও আনা সফলতা পেয়েছিলেন। ২০০০ খ্রিস্টাব্দে তিনি “উনে হিস্টরি ডি’আমর” (Une histoire d’amou) নামে গানের সিডি প্রকাশ করেন। এতে আনার সহশিল্পী ছিলেন ফিলিপ ক্যাথরিন। এর ধারাবাহিকতায় তিনি কনসার্ট ট্যুর করেন এবং তা ব্যাপক সফলতা পায়। এছাড়া আনার লেখা চারটি উপন্যাসও রয়েছে।
লেখক : জাহাঙ্গীর আলম প্রথম আলোয় সহ-সম্পাদক হিসেবে কর্মরত।
alamrumcj@gmail.com
https://www.facebook.com/jahangir.alam.9887117
তথ্যসূত্র
1. https://www.nytimes.com/2016/05/05/t-magazine/entertainment/anna-karina-actress-interview-film-forum.html; retrieved on: 01.05.2020
2. https://www.vogue.com/article/anna-karina-jean-luc-godard-films-marriage ; retrieved on: 30.04.2020
3. https://www.vogue.com/article/anna-karina-jean-luc-godard-films-marriage; retrieved on: 01.05.2020
4. https://www.vogue.com/article/anna-karina-jean-luc-godard-films-marriage ; retrieved on: 01.05.2020
5. https://www.vogue.com/article/anna-karina-jean-luc-godard-films-marriage; retrieved on: 01.05.2020
বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ১৯তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২০ এ প্রকাশিত হয়েছে।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন