শফিকুল ইসলাম
প্রকাশিত ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
বাবর ‘ভিলেনই’ রয়ে গেলেন!
শফিকুল ইসলাম

অভিনয়শিল্পী খলিলুর রহমান বাবর অনেকটা নীরবেই চলে গেলেন ২০১৯ খ্রিস্টাব্দের ২৬ আগস্ট। ঢাকাই চলচ্চিত্রের সরব বাবর ছিলেন খল অভিনয়শিল্পী; পাশাপাশি নির্মাতা ও প্রযোজক। জীবনের প্রথম চলচ্চিত্র বাংলার মুখ-এ বাবর ‘নায়ক’ চরিত্রে অভিনয় করেন। তবে সেই নায়ক চরিত্রের চলচ্চিত্রটি শেষ পর্যন্ত মুক্তি পায়নি। দর্শকও তাই বাবরের নায়কোচিত রূপ দেখা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। পত্রপত্রিকার সহায়তায় জানা যায়, এর পর তিনি তিন শতাধিক চলচ্চিত্রে ‘ভিলেনের পার্ট’ করেন। বাংলাদেশে খলচরিত্রে অভিনয় করা শিল্পীদেরকে বেশিরভাগ দর্শক অচেতনে ব্যক্তি জীবনেও এক রকম ‘ভিলেন’ই ভেবে থাকে। কারণ খল অভিনয়শিল্পীদের কাজই পর্দায় নানা ‘খারাপ’ কাজ করা। ফলে সমাজ-রাষ্ট্রের ‘ভিলেনদের’ সত্য-বাস্তব চিত্র তাদের মুখমণ্ডল-শরীরে ফুটিয়ে তুলতে হয়। দর্শকও তাই সমাজের ওই চরিত্রগুলোর সঙ্গে বাবরদের মিলিয়ে প্রশান্তি পায়। পর্দায় তাদের পরাজয়, শাস্তি দেখে আনন্দ পায়। আর এর আড়ালে এই অভিনয়শিল্পী মানে বাবরদের ব্যক্তি জীবন, সেই জীবনের যে ঘাত-প্রতিঘাত তা হারিয়ে যায়; তার খোঁজ দর্শক ও গণমাধ্যম কেউই খুব একটা রাখে না। খল অভিনয়শিল্পী বাবরও এমনই একটি জীবনযাপন করেছেন। সেই যাপনের শেষটা ছিলো বাবরের জন্য সবচেয়ে কষ্টের। সেখানে ছিলো তার না পাওয়ার নানা কষ্ট।
দুই.
খলিলুর রহমান বাবরের পারিবারিক নাম আবু মোহাম্মদ খলিলুর। পারিবারিক ডাকনাম বাবর। জন্ম ঢাকার গেন্ডারিয়ায় ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ৩ ফেব্রুয়ারি। চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে বাবর ছিলেন বয়সের দিক থেকে পরিবারের চতুর্থ সদস্য। গেন্ডারিয়ার আকাশে ছোট্ট বাবর ঘুড়ি উড়াতেন; ক্রিকেট, ফুটবলের পাশাপাশি মার্বেলও খেলতেন। কড়া শাসনের বিপরীতে দুরন্তপনার সেই সময়ে মার্বেল খেলার জন্য কতো মারও খেয়েছেন বাবর! তিনি ঘুড়ির কারিগরও ছিলেন। গরমের দিনে আমগাছের নিচে পাটি বিছিয়ে শুয়ে থাকতেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকৃতি ও মানুষ দেখে দেখে আমি জীবনের অনেক কিছু শিখেছি।
দুরন্ত সেই বাবর খেলার ছলে বাড়ির আঙিনায় মায়ের শাড়ি টানিয়ে স্টেজ সাজাতেন সেই ছোটোবেলাতেই। নিজে মুখে মুখে স্ক্রিপ্ট বানিয়ে নাটকে অভিনয় করতেন। এলাকার বড়োরা সেটা দেখে মজা পেতো ঠিকই; কিন্তু পরিবারসহ কেউই চাইতো না বাবর অভিনয়টা করুক। এই করতে করতে একদিন পেশাদার এক নাটকের দলে শিশু চরিত্রে অভিনয়ের ডাক আসে বাবরের। সেই নাটকে অভিনয় করে তিনি সম্মানী পেয়েছিলেন দুই টাকা। আর প্রতিদিন রিহার্সেলে পেতেন আধ আনা করে। পরিবারের কেউ তখনো জানতো না এই কথা। একদিন লজিং মাস্টারের কাছে তিনি ধরা পড়ে যান। সত্যপ্রিয় ছোট্ট বাবর তখন হড়হড় করে সব বলে দেন শিক্ষকের কাছে। তখনকার প্রেক্ষাপটে বাবরের ধর্মভীরু পরিবার কোনোভাবেই অভিনয়টাকে মেনে নিতে পারছিলো না। কিন্তু বাবর দমেননি চালিয়ে গেলেন। ছোটো বয়সেই পরিবারের সঙ্গে মোটামুটি ফাইটও দিয়েছিলেন।
মাত্র ছয় বছর বয়সেই ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে বাবর প্রথমবারের মতো রেডিওতে অভিনয়ের সুযোগ পান। সেসময় ‘খেলাঘর’ নামে একটি অনুষ্ঠান প্রচারিত হতো; পরিচালনা করতেন কবি সুফিয়া কামাল। এই তো রেডিওতে শুরু, তারপর চালিয়েই গেছেন। পারিবারিক বাধা আর তাকে দমাতে পারেনি। মেট্রিক পরীক্ষার আগে ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে বাবর সুযোগ পেয়ে যান টেলিভিশন নাটকে অভিনয়ের। তখন টেলিভিশনে ‘মিউট ক্যারেকটারে’ অভিনয় করে ৩৯ টাকা করে পেতেন তিনি। বয়স তখন মাত্র ১৫! এই বয়সে এতো টাকা আয়! এই কাজ নিয়মিত চালিয়ে গেছেন দেশ স্বাধীনের পরেও।
তিন.
১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি। শহীদ মিনারে অনেক মানুষের জটলা। বাবর সেখানেই প্রথমবারের মতো দাঁড়ালেন ৩৫ মি মি ক্যামেরার সামনে। স্বাধীনতা যুদ্ধের ওপর আমজাদ হোসেনের বাংলার মুখ চলচ্চিত্রে ‘নায়ক’ চরিত্রে তিনি সুযোগ পেয়ে গেলেন। সেখানে বাবর ছিলেন ‘সেকেন্ড হিরো’। খুবই উৎসাহ আর উদ্দীপনা নিয়ে বাবর এই চলচ্চিত্রে কাজ করেছিলেন। কিন্তু প্রযোজক কোনো এক ‘অজ্ঞাত’ কারণে চলচ্চিত্রটি আর মুক্তি দিলেন না। একপর্যায়ে আমজাদ হোসেনও বেঁকে বসলেন। ফলে চলচ্চিত্রটি দেখতে পেলো না দর্শক। তবে বাবরকে আর খুব বেশি দিন বড়ো পর্দার জন্য অপেক্ষা করতে হয়নি। আমজাদ হোসেনের ওই চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সময়ই অভিনয়শিল্পী রাজ্জাকের চোখে পড়ে যান বাবর। সেই পরিচয়ে তিনি জহিরুল হকের রংবাজ-এ (১৯৭৩) খলচরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান। চলচ্চিত্রটিতে বাবরের আগমন ঘটে রাজ্জাকের সঙ্গে মারপিটের মাধ্যমে। সেই দৃশ্য করতে গিয়ে বাবর সত্যি সত্যিই রাজ্জাকের পায়ে চাকু মেরে দিয়েছিলেন।১ বাবরের ভাষায়, রংবাজই তার জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছিলো। এবং খল অভিনয়শিল্পী হিসেবে তিনি এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমেই নিজেকে গেঁথে ফেলেন। তিনি বলেন, এই চলচ্চিত্রের পরই আমি বুঝতে পেরেছিলাম নায়ক আর ভিলেনের মধ্যে পার্থক্যে।২ এই পার্থক্যে বাকি জীবন বাবরের কাছে ভিলেনই এগিয়ে ছিলো।
চার.
রংবাজ-এ বাবরের অভিনয় দেখে অন্যান্য নির্মাতারা তাকে সুযোগ দিতে শুরু করে। রংবাজ মুক্তি পাওয়ার বছরই তিনি আরো দুটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন--মহিউদ্দিনের দুরন্ত দুর্বার ও কবির আনোয়ারের স্লোগান। চলচ্চিত্র দুটি বাবরকে আরো বেশি পরিপক্ক করে তোলে। পরের বছর রুহুল আমিনের বেঈমান অনেক বেশি আলোচনায় আসে। সেই চলচ্চিত্রে আদিবাসী এক যুবকের ভূমিকায় অভিনয় করেন বাবর। ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে মুক্তি পায় রহিম নওয়াজের আপনজন, এই চলচ্চিত্রে পার্শ্চ খল চরিত্র হিসেবে অভিনয় করেন বাবর। ১৯৭৬-এ আলমগীর কুমকুমের গুণ্ডায় তিনি জমিদারের কেয়ারটেকারের সহকারী হিসেবে অভিনয় করেন। একই বছর অভিনয়শিল্পী, নির্মাতা ও প্রযোজক আজিমের প্রতিনিধি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন তিনি। চলচ্চিত্রটি সেসময় ব্যবসাসফল হয়। এই চলচ্চিত্রে একটি মাত্র সিকোয়েন্সে কামারের ভূমিকায় অভিনয় করে তৎকালীন গুরুত্বপূর্ণ ‘বাচসাস’ (বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি) পুরস্কারে মনোনয়ন পেয়েছিলেন বাবর।
এর পর আর থেমে থাকতে হয়নি বাবরকে। একে একে তিনি অভিনয়ের আলোর ছটা ছড়িয়ে দেন আসামী (১৯৭৮), দাবি (১৯৭৮), সারেং বৌ (১৯৭৮), সংঘর্ষ (১৯৮০), নাগিন (১৯৮০), শেষ উত্তর (১৯৮০), জনতা এক্সপ্রেস (১৯৮১), মহানগর (১৯৮১), বানজারান (১৯৮১), পুরস্কার (১৯৮৩), ভাগ্যলিপি (১৯৮৪), সখিনা যুদ্ধ (১৯৮৪) চলচ্চিত্রে। কোনো চলচ্চিত্রে বস্তির দখলদারের ভূমিকায়, কখনো নায়িকার লম্পট বড়োভাই, কখনো প্রধান খলচরিত্রের বখাটে ছেলে হিসেবে অভিনয় করায় দর্শকের মনে ‘খারাপ মানুষের’ ইমেজ গড়ে উঠতে থাকে বাবরের। তবে অন্যদের থেকে সেখানে খানিকটা আলাদা ছিলেন বাবর--প্রত্যেক চরিত্রে নিজেকে কিছুটা হলেও ভিন্নভাবে পর্দায় হাজির করতে পারতেন তিনি। সেটা তার চলচ্চিত্রগুলো দেখলেই বোঝা যায়।
পাঁচ.
বাবর চলচ্চিত্রে একটানা খুব বেশি দিন অভিনয় করেননি। শুরু হয় ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে; আর ঝড়ের বেগে নিয়মিতভাবে শেষ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে। এরপর চলে আসেন প্রযোজনা ও পরিচালনায়। ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে বাবর ইন্সপেক্টর নামে একটি চলচ্চিত্রের অংশীদার প্রযোজক হিসেবে নাম লেখান। অভিনয়ের বাইরে এই প্রথম চলচ্চিত্রের অন্য ক্যাটাগরিতে তিনি কাজ করেন। বাবর বলেন, তখন আমার নিজের ফিনান্সিয়াল অবস্থা খুব ভালো ছিলো না। আমার পার্টনার ছিলো নকিব উদ্দিন--ও একদিকে বন্ধু, আরেকদিকে ছোটোভাই। ও বললো, বাবর ভাই অভিনয় তো অনেক দিন করলেন, এবার একটা ছবি করেন।৩ চলচ্চিত্রটি সেসময় খুব জনপ্রিয় হয়েছিলো বলে দাবি করেন বাবর। এর পর একই বছর দুর্বল অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়েই বাবর একাই দাগী নামে একটি চলচ্চিত্র প্রযোজনা করেন। চলচ্চিত্রটি বাবরকে বেশ সফলতা এনে দেয়। তারপরও বাবর হারিয়ে গিয়েছিলেন প্রায় এক দশক। সেই হারিয়ে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে কেউই তেমন কিছু বলতে পারে না। বাবরও কাউকে কিছু বলেননি কখনো।
১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দে বাবর আবার চলচ্চিত্রে ফিরে আসেন। তবে এবার অভিনয়শিল্পী কিংবা প্রযোজক হিসেবে নয়। পুরোদস্তুর পরিচালক হিসেবে তাকে দেখা যায়। ওই বছর দয়াবান চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে নির্মাতা হিসেবে তার হাতেখড়ি হয়। দয়াবান খুব বেশি ব্যবসা করতে পারেনি। অভিনয় ছেড়ে নির্মাতা কেনো হলেন, এই প্রশ্নের সম্মুখীন বাবর বহুবার হয়েছেন--‘এতো পরিচালকের সঙ্গে কাজ করেছি। এতো লোকের সঙ্গে মিশেছি। মিউজিক ডিরেক্টরের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। তখন মনে হল, করে দেখিনা, ভালো হলে হলো, না হলে না হলো।’৪ অভিনয়শিল্পী হিসেবে বাবর সফল হলেও নির্মাতা হিসেবে খুব বেশি সফল হতে পারেননি। ফলে ৯৫-এর পর তাকে আর চলচ্চিত্রে দেখা যায়নি।
এরপর বাবর শুরু করেন পোল্ট্রি ব্যবসা। সেই ব্যবসাতেও তিনি অনেক ক্ষতির মুখে পড়েন। ফলে ব্যবসায় আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেননি। ২০০০ খ্রিস্টাব্দের পর বাবর আবার অভিনয়ে হাজির হন; তবে এবার অবশ্য বড়ো পর্দায় নয়, টেলিভিশনে। এ সময় তিনি একটি নাটকও পরিচালনা করেছিলেন--‘বরপক্ষ বনাম কনেপক্ষ’। সর্বশেষ ২০০৭ খ্রিস্টাব্দে আরেক খল অভিনয়শিল্পী মনোয়ার হোসেন ডিপজলের চলচ্চিত্র তের পাণ্ডা এক গুণ্ডায় তিনি শেষবার হাজির হয়েছিলেন। তারপর তাকে আর পর্দায় দেখা যায়নি। তারপর চূড়ান্ত নীরব হয়ে যাওয়ার আগে প্রায় এক যুগ নীরবই ছিলেন বাবর।
ছয়.
চলচ্চিত্রের পর্দার বাইরে বাবরকে খুব কমই দেখা গেছে। তাকে নিয়ে লেখালেখিও হয়েছে অনেক কম। তারপরও বিভিন্ন সময়ে তাকে ডেকেছে টেলিভিশনগুলো। আবার ইউটিউবেও তার কিছু সচিত্র বয়ান রয়েছে। গুগল সার্চ করে যখন একটি লেখা বাদে বাবরকে নিয়ে কোনো আয়োজন চোখে পড়ছিলো না, তখন ইউটিউবে ‘বাবরের সাক্ষাৎকার’ লিখে সার্চ দিয়ে কয়েকটি ভিডিও পাওয়া যায়। সেখানে তিনি কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। কোনোটাতে শৈশবে ফিরে গিয়ে বলেছেন সেই সময়ের কথা। আবার কোনোটাতে এসেছে চলচ্চিত্রে আগমনের স্মৃতি ও সেই সময়ে চলচ্চিত্রিক কোলাহলতা। সেই ৭০—৮০ দশকে অভিনয়শিল্পীরা কেমন পেশাদারী ছিলো, তার সেই সব স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে। বাবরের ভাষায়,
তখন শিল্পীরা রেস্ট নেওয়ার সময় পেতো না। দুই শিফটে কাজ করতে হতো। ছয়—সাত দিন পর আমরা বাড়ি ফিরতে পারতাম। এতো ইনগেইজ ছিলাম আমরা। ... তখন এফ ডি সিতে ফ্লোর তো ভাড়াই পাওয়া যেতো না। ফ্লোরের বাইরে গার্ডেনে, রাস্তাঘাটে ক্যামেরা বসালে বলতো, অন্য সেটের লোকজন আমাদের ফ্রেমে চলে আসছে ক্যামেরা সরান। তখন আমাদেরকে এভাবে কাজ করতে হতো! বহু কষ্টে আমাদেরকে কাজ করতে হয়েছে।৫
বাবর জানান, সেসময় প্রতিটি চলচ্চিত্র নিয়ে লেখালেখি হতো। একটু ভুল হলেই সেগুলো ধরিয়ে দেওয়া হতো। ফলে অভিনয়শিল্পী, নির্মাতা, প্রযোজক সবার নজর ছিলো পত্রিকার লেখালেখির দিকে। কিন্তু এখন চলচ্চিত্র নিয়ে খুব বেশি লেখালেখি হয় না। সেসব নিয়ে আক্ষেপ করে বাবর বলেন, ‘... আমাদের সিনেমা পেপার তখন কয়টা ছিলো--‘চিত্রালী’, ‘পূর্বাণী’, ‘সিনেমা’, ‘বিচিত্রা’--এছাড়া আরো দুই—তিনটা ছিলো। নামগুলো এখন মনে পড়ছে না। এগুলো প্রত্যেক উইকে বের হতো। মানে প্রতি সপ্তাহে শুধু চলচ্চিত্র পত্রিকাই বের হতো চারটা—পাঁচটা। আর এখন সেই পত্রিকা কোথায়, সেই ব্যস্ততা কোথায়?৬ বর্তমানের চলচ্চিত্র নিয়েও নানা প্রশ্ন, নানা অভিযোগ, অভাব বোধ ছিলো তার। বাবরের ভাষায়, আমাদের সময়ে মানসম্পন্ন গল্পের অভাব ছিলো না। সেই গল্পগুলো দর্শক তাদের জীবনে খুব ঘনিষ্ঠভাবে নিতে পারতো। এখনকার চলচ্চিত্রের সবচেয়ে দুর্বল দিক হলো সেই গল্পের অভাব। যারা তখন গল্প লিখতো, তাদের সবাই এখন বয়োবৃদ্ধ; কেউ কেউ অসুস্থ, অনেকেই মারা গেছেন। ... মাঝখানে দুই—একজন গল্পকার বেরিয়ে এসেছিলো কিন্তু তারাও টিকতে পারলো না। দুই—চারটা ভালো গল্প দিয়েই তারা শেষ হয়ে গেলো। মোট কথা সেই সময়ের সঙ্গে বর্তমানের তুলনা করাই বৃথা।৭
এফ ডি সি নিয়ে চরম আবেগ ছিলো বাবরের; অবশ্য এর কারণও আছে--অভিনয়শিল্পী হিসেবে তার বেড়ে ওঠা ওই এফ ডি সিতেই। জীবনের শেষ সময়েও কোনো কারণ ছাড়াই সেই এফ ডি সিতে গিয়ে তিনি বসে থাকতেন। কিন্তু এফ ডি সি আর তাকে ছুঁতে পারতো না। বর্তমানের অভিনয়শিল্পীরাও তাকে খুব একটা মূল্যায়ন করতো না। এ নিয়েও একটা অভিমান ছিলো বাবরের। তার ভাষায়,
এখন এফডিসিতে গেলে মনটা প্রচণ্ড খারাপ হয়ে যায়। একটা চেনা লোকও দেখতে পাই না, কোথাও শুটিংও হয় না। অ্যাকশন-কাট শব্দগুলো কানে আসে না। ডাবিংয়ের জন্য ডাবিং থিয়েটারেও কোনো লোক নেই। ... মনে হয় একটা শ্মশানপুরীতে এসেছি। মনটা খুব খারাপ হয়ে যায়। এখনকার শিল্পীদের কথা আমি বলতে চাই না। আমি নিজেও একজন শিল্পী। একজন শিল্পী হয়ে আরেকজন শিল্পীর বদনাম আমি করতে চাই না।৮
সাত.
বাবর ২০১৯ খ্রিস্টাব্দের ২৬ আগস্ট মারা যান। মারা যাওয়ার পর তাকে নিয়ে খুব বেশি লেখালেখি হয়নি। বেশিরভাগ গণমাধ্যম তার মৃত্যু সংবাদ জাতীয় দায়সারা গোছের খবর প্রকাশ-সম্প্রচার করে। অবশ্য শুধু বাবর নয়, রূপালি পর্দায় জ্বলজ্বল করা বেশিরভাগ প্রবীণ অভিনয়শিল্পীকে নীরবেই চলে যেতে হয়। অথচ একটা প্রজন্মের বার্তা আরেকটা প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া দেশ-রাষ্ট্র-গণমাধ্যমের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। দেশে এই তিন পক্ষের কেউই দায়িত্বটা যথাযথভাবে পালন করছে না। এতে যা হয়, গুণীরা কেবল চলে যায়, জন্মায় না! বাবর সম্পর্কে তার বন্ধু মনজুরুল হক তার মৃত্যুর পর তাকে নিয়ে লিখেছিলেন এভাবে--
... চলচ্চিত্রের খলনায়ক অজান্তেই মানুষের মনে ভীতিকর অনুভূতি এনে দেয় এবং মানুষ পর্দার সেই ব্যক্তিটির সঙ্গে বাস্তবের ব্যক্তির পার্থক্য ভুলে গিয়ে বাস্তব জীবনেও খলনায়ক হিসেবেই তাঁকে ধরে নেয়। এই অনুভূতি বাবরকে অজান্তে ব্যথিত করেছিল কি না, তা আমার জানা নেই। জানা নেই কোন ভাবনায় আপ্লুত ছিল তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলো। ... বাবরের জীবনের অন্তিম দিনগুলো ভালো যায়নি। তাঁর চিকিৎসায় সহায়তার জন্য প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে ধরনা দেওয়া হলেও সাহায্য মেলেনি এবং শেষ পর্যন্ত অনেকটা নীরবেই চলে গেলেন তিনি।৯
মনে হতে পারে, বন্ধু বলেই হয়তো এতো আবেগ মিশিয়ে লিখেছেন মনজুরুল। তবে একটা কথা কিন্তু সত্য, শুধু বাবর নয়, অনেকের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, সেটা হলো শেষ জীবনে এসে শিল্পীদের অনেককেই রাষ্ট্রের কাছে হাত পাততে হচ্ছে। সবাই যে রাষ্ট্রের কাছ থেকে এর বিপরীতে যথাযথ ‘সম্মান’ পাচ্ছে এমন নয়, আবার একেবারে পাচ্ছেও না--পরিস্থিতি এমনও নয়। বাবর প্রথম দলের মানুষ ছিলেন। তিনি রাষ্ট্রের সেই সম্মানটুকু পাননি। এই পাওয়া না পাওয়ার নানা রাজনীতি আছে, রাষ্ট্র পরিচালনায় যেমন সরকার, আবার সেই সরকারের মধ্যেও ছোটো ছোটো ‘সরকার’ থাকে। একজন শিল্পী তো আর সবাইকে খুশি করতে পারে না; অবশ্য সেটা তার দায়িত্বও নয়। তবে শিল্পীরা মানুষের জন্য, যেকোনো ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য, আগামীর সুন্দর স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য কাজ করে--সেই কাজে দল-মত অনেক ক্ষেত্রেই থাকে না; আবার কখনো কখনো ব্যক্তি পর্যায়ে হয়তো থাকে। কিন্তু মানবতার জন্য কাজ করা একজন শিল্পীকে বেঁচে থাকায় সহায়তা করার বিষয়টি নিশ্চয় এই সবকিছুর ঊর্ধ্বে থাকে। অবশ্য সেটা বোঝার ক্ষমতা অনেকেরই থাকে না।
আট.
জীবনের শেষ দিকে এসে বাবর উচ্চ-রক্তচাপ, ডায়াবেটিক, হৃদ্রোগ ও ফুসফুসের সমস্যায় ভুগছিলেন। একপর্যায়ে তার পায়ে গ্যাংগ্রিন হয়। চিকিৎসকের পরামর্শে তার বাঁ পায়ের তিনটি আঙুল কেটে বাদ দেওয়া হয়। সর্বশেষ অস্ত্রোপচার করে কেটে ফেলা হয় তার বাঁ পায়ের হাঁটু থেকে নিচের অংশ। বাবর চিকিৎসার যে ধাপগুলো পাড়ি দিয়েছেন, তা হয়তো খুবই কষ্টকর ছিলো। শেষ পর্যন্ত তার মৃত্যু হয় মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে। গণমাধ্যমের বরাতে জানা যায়, পায়ে অস্ত্রোপচারের পর বাবরকে তিন দিন হাসপাতালে থাকতে বলা হয়েছিলো। কিন্তু আর্থিক সমস্যার কারণে তিনি সোখানে থাকতে পারেননি। ফিরে গেছেন বাসায়। কষ্ট নিয়ে বাবর বলেছিলেন, ‘হাসপাতালে এক দিন থাকলে ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা বিল আসে। এ খরচ বহন করা আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। আমাকে এক মাসের বিশ্রামে থাকতে বলা হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে দুদিন পর পর পায়ের পরীক্ষার জন্য যেতে হচ্ছে হাসপাতালে। আর্থিক সমস্যা না থাকলে তো হাসপাতালেই থেকে যেতাম।’১০
আগেই বলেছি, রাষ্ট্রের কাছে হাত পেতেও বাবর কোনো সাহায্য পাননি। ভয়াবহ অর্থ কষ্ট নিয়েই তাকে চলে যেতে হয়েছে। এসব কথা শুনে কেনো জানি ঢাকাই চলচ্চিত্রের স্টেরিওটাইপ সব আখ্যানের কথা মনে পড়ে যায়। যেখানে বেশিরভাগ কাহিনির শেষ দৃশ্যে নায়কের কাছে ‘জীবন’ দিতে হয় ভিলেনকে কিংবা শত আকুতি-মিনতি করেও ভিলেন প্রাণরক্ষা করতে পারে না। জীবন-চলচ্চিত্রের শেষ দৃশ্য তেমনই ‘নায়ক’ রূপী রাষ্ট্রের কাছেও মিনতি করে জীবন রক্ষা করতে পারেননি বাবর। সেখানেও তিনি যেনো ‘ভিলেনই’ রয়ে গেলেন!
লেখক : শফিকুল ইসলাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্বের শিক্ষার্থী। পাশপাশি তিনি প্রথম আলোর রাজশাহী প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত আছেন।
shafiqulislamru32@gmail.com
https://www.facebook.com/profile.php?id=100008632759356
তথ্যসূত্র
1. http://archive.vn/03QGm; retrieved on: 10.05.2020
2. http://archive.vn/03QGm;retrieved on: 10.05.2020
3. http://archive.vn/YAQJb; retrieved on: 10.05.2020
4. http://archive.vn/YAQJb; retrieved on: 10.05.2020
5. http://archive.vn/e7bDy; retrieved on: 10.05.2020
6. http://archive.vn/e7bDy; retrieved on: 10.05.2020
7. http://archive.vn/e7bDy; retrieved on: 10.05.2020
8. http://archive.vn/e7bDy; retrieved on: 10.05.2020
9. http://archive.vn/HGula; retrieved on: 01.05.2020
10. https://www.banglanews24.com/entertainment/news/bd/715178.details; retrieved on: 13.05.2020
বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ১৯তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২০ এ প্রকাশিত হয়েছে।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন