Magic Lanthon

               

তানিয়াহ্ মাহমুদা তিন্নি

প্রকাশিত ৩১ আগস্ট ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

বোরখার ভিতরে বসে লিপস্টিকের আকাঙ্ক্ষা শেষ পর্যন্ত পুরুষতান্ত্রিক স্বপ্নই নয় কি?

তানিয়াহ্ মাহমুদা তিন্নি


লিপস্টিক আন্ডার মাই বোরখা

আমি চেয়েছিলাম নারীদের বন্দিত্ব ও বন্দিদশা অর্থাৎ মুক্তির আকাঙ্ক্ষার অনুভবকে আরো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে। এটি এমন কিছু যা অনেক নারীই আঁকড়ে থাকে। এখানে বোরখা ব্যবহৃত হয়েছে রূপক অর্থে, ঠিক যেভাবে নারীরা তাদের আকাঙ্ক্ষাগুলোকে পর্দার আড়ালে লুকিয়ে রাখে। আমরা যা চাই অনেক ক্ষেত্রেই তা করতে পারি না, আকাঙ্ক্ষাগুলোকে দমন করি। এটি অবরোধ আতঙ্কের একধরনের প্রকাশ, অনেক নারীই এই আতঙ্ক নিয়ে বেঁচে থাকে।


এক সাক্ষাৎকারে লিপস্টিক আন্ডার মাই বোরখা সম্পর্কে এই কথাগুলোই বলেছিলেন নির্মাতা অলঙ্কৃতা শ্রীবাস্তব। চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের কেউ হয়তো বলতেই পারে, বর্তমান বাজার অর্থনীতিতে লিপস্টিক একটি অন্যতম প্রসাধনী দ্রব্য, এক অর্থে এটিকে পুরুষতান্ত্রিক ও পুঁজিবাদের ফল বলা যেতে পারে। এ প্রসঙ্গে নির্মাতা বলেছেন,


আমি নিজে কখনো লিপস্টিক পরি না। আমার কাছে লিপস্টিক মানে খুব সাধারণ, ছোটো ছোটো কিছু আকাঙ্ক্ষা। এটা এমন নয় যে, এর মাধ্যমে তারা বড়ো ধরনের কোনো পরিবর্তন বা বিপ্লব ডেকে আনবে। লিপস্টিক হলো ছোটো কিছু প্রত্যাশা যা নারীরা তাদের জীবন থেকে চায়, এক টুকরা স্পেস (জায়গা)। তাদের জীবনে অল্প একটু রঙের ছোঁয়া।


লিপস্টিক আন্ডার মাই বোরখাকে নির্মাতা ভিন্নভাবে উপস্থাপন করেছেন দর্শকের কাছে। এই চলচ্চিত্রে দেখা যায়, অবদমন ও নিপীড়ন সহ্য করেও কীভাবে চার জন স্বাধীনচেতা নারী পর্দার আড়ালে স্বাধীনতার স্বাদ গ্রহণের চেষ্টা করে নিজেদের মতো করে। একই সঙ্গে তারা দুইটি জীবন যাপন করে। একটি জীবনে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের সবধরনের বেড়াজালে তারা আবদ্ধ, অন্য একটি জীবনে (যা একান্তই তাদের নিজস্ব, গোপন) তারা মুক্ত বিহঙ্গের মতোই স্বাধীন। নারী জীবনের এই দ্বৈত রূপই প্রকাশ হয়েছে চলচ্চিত্রের নামকরণের ভিতর দিয়ে। বহিরাবরণ বোরখা আবৃত থাকলেও ভিতরে রঙিন লিপস্টিক পরার স্বপ্নে বিভোর নারীদের গল্প এটি।


ভূপালের চার রোজি

লিপস্টিক আন্ডার মাই বোরখা চার নারীর জীবনকথা; যারা মধ্যপ্রদেশের ভূপালের ছোট্ট একটা শহরের হাওয়াই মঞ্জিল নামক বাড়ির বাসিন্দা। চার জন নারী জীবনের গল্প সমান্তরালে বর্ণনা করলেও পর্দার আড়াল থেকে উৎসারিত একটি উপন্যাসের মাধ্যমে একই সুতোয় গাঁথা হয়ে যায় চারটি জীবন। এই চার নারীর নারী জীবনের আকাঙ্ক্ষাই যেনো প্রকাশ হয় উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র রোজির জীবনীতে।


এক. রিহানা

পর্দার আড়াল থেকে ভেসে আসে--ওই মুহূর্ত তো সব মেয়ের জীবনেই আসে, যখন তার ভিতরে নারী হয়ে ওঠার ইচ্ছে প্রবল হয়। রোজির ইচ্ছে দিনে দিনে আরো প্রবল হচ্ছিলো, জীবনের খাঁচার বাইরে দূরের স্বপ্ন ওকে উতলা করছিলো। আর শরীরের বাগানে রোজির যৌবন কাঁটার মতো বিদ্ধ করছিলো ওকে। জানলার এ পাশে দাঁড়িয়ে সে দূরবীন দিয়ে শহরের উজ্জ্বলতা দেখতো। জিন্স পরা মেয়েরা মোটর সাইকেলের পিছনে প্রেমিককে জড়িয়ে ধরে সবার সামনে ঘুরছে। আর পর্দায় দৃশ্যমান হয় বোরখা পরিহিত এক তরুণী। যাকে বোরখার আড়ালে শপিং মলে লিপস্টিক চুরি করতে দেখা যায়। এরপর তিনি বোরখা পরেই কলেজে প্রবেশ করেন। কিন্তু কলেজে ঢোকার পর লুকিয়ে বোরখা খুলে জিন্স-টপ্স পরতে দেখা যায় তাকে চলচ্চিত্রের দুই মিনিট ৩০ সেকেন্ডে। পরে সেই তরুণীকে দেখা যায় কলেজের ব্যান্ড দলে অডিশন দিতে। দর্শক জানতে পারে তরুণীর নাম রিহানা। পরের দৃশ্যগুলোতে ইংরেজি গানের প্রতি তার তীব্র ঝোঁকের ব্যাপারটি স্পষ্ট হয়।


রিহানা কট্টর মুসলিম পরিবারের মেয়ে। বোরখা সেলাই করে তার পরিবার জীবিকা নির্বাহ করে। বোরখা পরেই বাড়ির বাইরে পা ফেলে ওই পরিবারের নারীরা। কিন্তু এই জীবন রিহানার ভালো লাগে না। বাড়ি থেকে বোরখা পরে বের হলেও কলেজে গিয়ে খুলে ফেলে জিন্স-টপ্স পরেন। রিহানা কলেজ যাওয়ার পথে একদিন খবরের কাগজে দেখতে পান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারী শিক্ষার্থীদের জিন্স পরার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। অন্য সহপাঠীর সঙ্গে তিনিও প্রতিবাদী হয়ে মিছিলে যোগ দেন, স্লোগান তোলেন--জিন্স কা হাক, জিনে কা হাক (বাঁচার অধিকার চাই, জিন্স পরার অধিকার চাই)। এই স্লোগান শুনে যে কেউ হয়তো বাড়াবাড়ি মনে করতেই পারে। ভাবতে পারে, জিন্স পরার মতো এতো ছোটো একটা বিষয়কে এতো বড়ো করে দেখার কী আছে! কিন্তু জিন্স পরতে চাওয়ার দাবিটা যে এতোটা ঠুনকো নয় তা বোঝা যায় রিহানার দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে।

লিপস্টিক আন্ডার মাই বোরখা এর একটি দৃশ্য


চলচ্চিত্রের ২৪ মিনিট ৩৭ সেকেন্ডে ভিডিও ভ্লগ-এর জন্য একজন সাক্ষাৎকার নিতে আসলে রিহানা বলে ওঠেন, নারীদের জীবন তো শুধু বিধিনিষেধে ভরা। গান গাওয়া যাবে না , নাচা যাবে না, এভাবে হেঁটো না লোকে দেখবে, চোখ নামিয়ে কথা বলো লোকে কী ভাববে, নিঃশ্বাসও ধীরে নাও মানুষের নজর তোমার বুকের দিকে চলে যাবে, লিপস্টিক পরো না প্রেম হয়ে যাবে, জিন্স পরলে লোকে এ নিয়ে কথা বলবে। আমি শুধু প্রশাসনকে জিজ্ঞেস করতে চাই, এগুলো করলে এমন কী হয়ে যাবে? আমাদের স্বাধীনতায় আপনারা এতো ভয় পান কেনো? আমাদের বাঁচার অধিকার আছে কি নেই? আমাদের অধিকার চাই। জিন্স কা হাক, জিনে কা হাক।


রিহানার এই পুরো বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তার নিজের জীবনের বন্দিত্ব, নিপীড়ন, ইচ্ছে আকাঙ্ক্ষার অবদমনের চিত্র উঠে আসে। তিনি চাইলেও নিজের ইচ্ছেমতো পোশাক পরতে পারেন না, গান গাইতে পারেন না, বাড়ির কোনো বিয়ের আসরে অন্যদের সঙ্গে আনন্দে নেচে উঠলে পরিবারের লোকজনের গালমন্দ শুনতে হয়। কিন্তু এতো বিধিনিষেধের ভিড়েও রিহানা নিজের জন্য একটা আলাদা জগৎ তৈরি করে নেন। ঘরের দেয়ালে Education is the key to victory লেখা পোস্টার, এর উল্টো দিকে থাকে প্রিয় রকস্টারের ছবি। ঘরের দরজা বন্ধ করলেই তা হয়ে ওঠে তার একান্ত নিজের একটা পৃথিবী। রাতে লুকিয়ে লুকিয়ে ফ্যাশন ম্যাগাজিন দেখে পছন্দ মতো পোশাক তৈরি করে বোরখার আড়ালে সেটা পরে বের হন। বন্ধুদের সঙ্গে পার্টিতে যোগ দেন রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে। ধ্রু নামে ক্যাম্পাসের এক সিনিয়রের প্রেমে পড়েন। ইচ্ছে পূরণ করতে গিয়ে বাড়িতে ভদ্র, অতি চুপচাপ হয়ে থাকা মেয়েটিই শপিং মল থেকে কখনো লিপস্টিক, কখনো জুতো চুরি করেন। যেহেতু এসব কেনার জন্য বাড়ি থেকে তাকে টাকাপয়সা দেওয়া হবে না। এতো কিছু করে বাড়ির লোকজনের চোখ ফাঁকি দিতে পারলেও শপিং মলের সি সি ক্যামেরাকে ফাঁকি দিতে পারেন না তিনি। ধরা পড়ে যান একদিন। অপমানিত হতে হয় প্রেমিকের কাছে, পরিবারের কাছে।


দুই. লীলা

আরেক রোজি বিউটিফিকেশন কর্মী লীলা। নিজে একটি পারলার চালান, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী। কিন্তু ভূপালের মতো ছোট্ট একটা শহরে থাকতে চান না তিনি। তাইতো তিনি ফটোগ্রাফার প্রেমিকের সঙ্গে পালিয়ে যেতে চান মুম্বাই বা দিল্লীর মতো বড়ো কোনো শহরে। এই ছোট্ট গণ্ডি থেকে বের হওয়ার জন্য তারা পরিকল্পনা করে মধুচন্দ্রিমায় যাওয়া কাপলের প্যাকেজ-এর সঙ্গে বিউটিশিয়ান আর ফটোগ্রাফার হিসেবে জুড়ে যাওয়ার। ট্র্যাভেল এজেন্সিগুলোর সঙ্গে তাদের পরিকল্পনা শেয়ারও করে। কিন্তু বার বার তারা তাদের বোঝাতে ব্যর্থ হয়।


এরই মধ্যে মা লীলার বিয়ে ঠিক করে মনোজ নামের এক ছেলের সঙ্গে, এই শহরেই যার বাড়ি। লীলার বিনা অনুমতিতে বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করা হয়। এ নিয়ে লীলা যখন মাকে জিজ্ঞেস করেন, মা উত্তর দেন তার অর্থনৈতিক নিরাপত্তার কথা ভেবেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি তখন মাকে জানান, নিজে ব্যবসা করে তিনি ঘর চালাবেন। তার মা উত্তর দেন, তুমি (লীলা) যতোই আয় করো না কেনো, একটা ঘর তো আর কিনতে পারবে না, কিন্তু মনোজ তোমার জন্য ঘর কিনবে। অর্থাৎ লীলার মা চান, মেয়ের নির্ঝঞ্ঝাট, নিরাপদ জীবন। যে জীবন তিনি নিজে পাননি। তাই লীলা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হলেও তার মা মেয়ের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা।


তবে অন্য রোজিদের মতো লীলা সবকিছু সহ্য করার মেয়ে নন। বাগদানের দিনেও তিনি প্রেমিকের সঙ্গে সঙ্গমে লিপ্ত হন নিজের বাড়িতেই। মা সেটা দেখে ফেললেও তিনি থাকেন নির্বিকার। নারীসুলভ লজ্জা নিয়ে তিনি জীবনযাপন করতে চান না। নিজের যৌন জীবন নিয়ে তার ভিতরে নেই কোনো সংস্কার। তাইতো নিজের অতি ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবিও তাকে ভিডিও করতে দেখা যায় চলচ্চিত্রের ১৩ মিনিট ৫৪ সেকেন্ডে। নিজের স্কুটি বিক্রি করে প্রেমিকের সঙ্গে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। কারণ তিনি জানেন মনোজকে বিয়ে করলে নিরাপদ জীবন হয়তো পাবেন, কিন্তু স্বাধীনতা হয়তো পাবেন না তাদের যৌথ পরিবারে। লীলা চান অবারিত স্বাধীনতা; ভূপালের ঘিঞ্জি গলি, সরু রাস্তায় তার দম বন্ধ হয়ে আসে। তাই রাতের অন্ধকারে প্রেমিকের মেসে গিয়ে হানা দেন পালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রেমিককে রাজি করাতে। সেখানে গিয়ে তিনি তার পালিয়ে যেতে চাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করেন। আবার নিজের যৌন আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ ঘটান নির্দ্বিধায়।


এই খোলামেলা কুণ্ঠাহীন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যই লীলার প্রতি অন্যদের ভর্ৎসনার কারণ হিসেবে কাজ করে। চলচ্চিত্রের এক ঘণ্টা ৩০ মিনিট ১৫ সেকেন্ডে দেখা যায়, সঙ্গম আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ ঘটানোয় প্রেমিক তাকে প্রত্যাখ্যান করেন, কুরুচিকর মন্তব্য করে বসেন--তোর সেক্স করার এতো ইচ্ছা? চারটা ছেলেকে ভরে দিই? তার মানে নারীদের ইচ্ছা হলেও তাদের যৌন আকাঙ্ক্ষা অবদমন করতে হবে। যে সেটা পারবে না, সমাজ তাকে যৌনকর্মীর কাতারে নামিয়ে দেবে। প্রেমিকের কাছে প্রত্যাখ্যাত হয়ে অভিমানে বাগদত্তার সঙ্গে ভালোবাসার অভিনয় করেন লীলা। এমনকি লীলাই আগে বাগদত্তাকে আমন্ত্রণ জানান শারীরিক সম্পর্কের। অর্থাৎ লীলার কাছে শরীর ও যৌনতা নিয়ে কোনো ট্যাবু নেই।


এ রকম স্বাধীনচেতা নারী হয়েও লীলা তার স্বপ্নকে ছুঁতে পারেন না। তাকে তার মা, প্রেমিক কিংবা বাগদত্তা কেউই বোঝার চেষ্টা করে না। পার্লারে কাজ করতে করতে শিরিন আসলামের সঙ্গে কথোপকথনের একপর্যায়ে লীলা বুঝতে পারেন শিরিনকেও তার স্বামী বোঝে না। তাই শিরিনকে লীলা বলেন, জানো দিদি, আমাদের সব থেকে বড়ো ভুল কোনটা? আমরা খুব বেশি স্বপ্ন দেখি।


তিন. শিরিন আসলাম

শিরিন আসলাম, বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ করেন। তার সৌদি ফেরত বেকার স্বামী জানে না, তার স্ত্রী রোজগার করেন। শিরিনের স্বামী আসলাম বিল্ডারদের এজেন্ট হিসেবে কাজ করার চেষ্টা করলেও কোনো সুবিধা করতে পারেননি। নিজে বেকার হলে কী হবে, তিনি স্ত্রীকে বাইরে কাজ করতে দিতে চান না কোনো মতেই। তাই সংসার চালানোর জন্য স্বামীকে লুকিয়েই কাজ করতে হয় শিরিনকে। আর টাকাপয়সার ব্যাপারে কথা বলতে গেলেই শিরিনকে আসলাম বলেন, টাকাপয়সার ব্যাপারে তুমি কোনো কথা বলবে না, এটা জটিল। এর মানেই হলো, মেয়েরা অর্থনৈতিক ব্যাপার কম বোঝে। অথচ চলচ্চিত্রে দেখা যায়, ঘরে যতোই স্বামীর অধীনে থাকুক না কেনো, ঘরের বাইরে বিক্রয়কর্মী হিসেবে শিরিন অত্যন্ত সফল। তিনি সহজেই গ্রাহকদের সন্তুষ্ট করতে পারেন। এ কারণে কোম্পানি থেকে জিতে নেন সেরা বিক্রয়কর্মীর পুরস্কারটিও। কোম্পানি থেকে তাকে প্রস্তাব দেওয়া হয় বিক্রয়কর্মীদের প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করার। কাজের স্বীকৃতির কথা স্বামীকে বলতে গিয়েও বলতে পারেন না শিরিন।


বিক্রয়কর্মী হিসেবে যতোটাই সফল শিরিন, ব্যক্তিগত জীবনে ততোটাই ব্যর্থ। সংসারের কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তার নেই; নিজের শরীরের ওপর নেই কোনো অধিকার। তার বিনা অনুমতিতে স্বামী তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হন। শিরিনের শারীরিক কোনো অসুবিধা থাকলেও স্বামী কোনো নিষেধ মানেন না বরং ব্যক্তিগত সম্পত্তির মতো নিজের ইচ্ছেমতো শিরিনের শরীর ব্যবহার করেন। আবার স্থাপন করেন অনিরাপদ যৌন সম্পর্কও। যার জন্য ভুক্তভোগী হতে হয় শিরিনকেই। বাধ্য হয়ে শিরিনকে শরণাপন্ন হতে হয় গর্ভনিরোধক পিল অথবা গর্ভপাতের। অথচ এতে রয়েছে মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকি।


ভারতের বিভিন্ন নারী সংগঠন এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা মূলত তিনটি কারণে এই গর্ভনিরোধক পিলগুলোর বিরোধিতা করে থাকে। প্রথমত, এগুলোর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় অনিয়মিত মাসিক, উচ্চ রক্তচাপ, স্নায়বিক দুর্বলতা, বমি বমি ভাব, ওজন বৃদ্ধির মতো সমস্যাগুলো দেখা দেয়। দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন গর্ভনিরোধক পদ্ধতি গ্রহণের জন্য যেসব প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণের দরকার পড়ে তা এখানে অপ্রতুল। তৃতীয়ত, এই ওষুধগুলো ভারতের নারীদের শরীর উপযোগী করে তৈরিই হয় না; একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মানুষের শরীরের জন্য এ ধরনের ওষুধ প্রস্তুত করতে হলে অবশ্যই তাদের ওজন, খাদ্যাভ্যাস, ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় epidimological এবং biochemical গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে, সেটা ভারতের নারীদের ওপর করা হয় না।


শিরিন চিকিৎসকের কাছে গেলে তিনি তার স্বামীকে কনডম ব্যবহারের পরামর্শ দেন। কিন্তু শিরিন জানে তার স্বামী এটি ব্যবহার করবেন না। তার পরেও দোকান থেকে তিনি কনডম কিনে নিয়ে যান। চলচ্চিত্রের ৩৮ মিনিট ২০ সেকেন্ডে দেখা যায়, শিরিন তার স্বামীকে কনডম ব্যবহার করতে দিলে তার স্বামী সেটা ছুঁড়ে ফেলে দেন। অর্থাৎ নিজের যৌন চাহিদা পূরণ করতে শিরিনকে অরক্ষিত-অনিরাপদ রাখেন। বেস্ট সেলস গার্ল অ্যাওয়ার্ড পাওয়া শিরিন নিজের স্বামীকে কনডমের গুরুত্ব বোঝাতে ব্যর্থই থেকে যান।


এরই ফাঁকে শিরিন একদিন আসলামের খোঁজে বিল্ডার কোম্পানিতে গিয়ে জানতে পারেন তিনি সেখানে চাকুরিই করেন না। হাওয়াই মঞ্জিল নামে যে বাড়িতে তারা থাকে, সেটি যদি বিল্ডারদের হাতে তুলে দিতে পারেন, তবেই আসলামের চাকরি হবে নইলে নয়। সেখান থেকে ফেরার পথে তিনি আসলামকে রেস্টুরেন্টে এক নারীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখে ফেলেন। এতোদিন নিপীড়নের শিকার শিরিন একটি সাহসী কাজ করে ফেলেন এবার। স্বামীর প্রেমিকাকে ফলো করে তার বাড়িতে ম্যাজিক ললিপপ বিক্রির উদ্দেশ্যে ঢোকেন। যেটার মাধ্যমে অনুশীলন করলে গালে রিংকেল (wrincle) থাকবে না। শিরিন তার স্বামীর প্রেমিকাকে  তার ব্যবহৃত ললিপপ মুখে নিতে বলেন। আসলামের প্রেমিকা বলে ওঠেন, এটা তো মনে হয় আপনি কিছু আগে মুখে নিয়েছিলেন। উত্তরে শিরিন বলেন, তাহলে আপনি আমার জিনিস কীভাবে মুখে নিতে পারেন? তারপর নিজের পরিচয় দেন শিরিন, তিনিই আসলামের স্ত্রী। পাঠক, এখানেও কিন্তু শিরিন তার স্বামীকে কিছু বলতে পারেন না। বরং বেছে নেন স্বামীর প্রেমিকাকে।


চার. ঊষা

ঊষা, হাওয়াই মঞ্জিলের মালিক। সবাই যাকে বুয়াজি বলে ডাকে। এলাকায় তিনি বুয়াজি হিসেবে এতো বেশি পরিচিত যে, নিজের নামটাই ভুলে গেছেন। কেউ নাম জিজ্ঞেস করলেও তিনি নিজেকে বুয়াজি হিসেবেই পরিচয় দেন। স্বামী মারা যাওয়ার পর এই হাওয়াই মঞ্জিল ভাড়া দিয়েই তিনি জীবন ধারণ করছেন, ভাইয়ের ছেলেদের মানুষ করেছেন। এই বাড়িটি তার বলেই হয়তো ভাইয়ের ছেলেরা এবং এলাকার লোকজন তাকে বেশ সমীহ করে।


দীর্ঘ বৈধব্যে ঊষা ভীষণ একা। এই একাকিত্ব দূর করতেই তিনি ধর্মীয় বইয়ের আড়ালে রোমান্টিক প্রেমের উপন্যাস পড়েন। সমাজের চোখে যেগুলো বাজারি এবং অবশ্যই ৫৩ বছর বয়সি বিধবা নারীর জন্য নিষিদ্ধ। উপন্যাসের চরিত্র রোজির মতো তিনিও একসময় স্বপ্ন দেখা শুরু করেন; প্রেমে পড়তে চান। কিন্তু এই সমাজে ৫৩ বছর বয়সি বিধবার জন্য প্রেমের স্বপ্ন দেখা বা বিয়ে করা নিষিদ্ধ। অথচ একই সমাজে ৫৬ বছর বয়সি পুরুষ অনায়াসে বিয়ে করতে পারে তার অর্ধেক বয়সি নারীকে, কখনো তারও কম। চলচ্চিত্রের ১৭ মিনিটে দেখা যায়, লীলার বিয়ের অনুষ্ঠানে আসা এক নারী তার ৫৬ বছর বয়সি ভাইয়ের জন্য ৩৫-৪০ বছর বয়সি বিয়ের পাত্রী খুঁজছেন।


ঊষার নিস্তরঙ্গ জীবনে হঠাৎ করেই বড়ো ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে। একবার সুইমিং পুলে সাঁতার কাটতে গিয়ে নাতি ডুবে যেতে লাগলে বুয়াজি উদ্ধার করতে নামেন। কিন্তু তিনি নিজেই সাঁতার জানতেন না বলে ডোবার উপক্রম হন। এক তরুণ সাঁতার প্রশিক্ষক তাকে উদ্ধার করেন এবং পরামর্শ দেন সাঁতার শেখার। ঊষা সাঁতার শিখতে সেখানে ভর্তি হন এবং ধীরে ধীরে প্রেমে পড়ে যান সেই তরুণ প্রশিক্ষকের। মিথ্যে পরিচয় দিয়ে তিনি ওই তরুণের সঙ্গে ফোনে কথা বলতে শুরু করেন। সেই তরুণের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে এতো দিনের অবদমিত যৌন চাহিদা জেগে ওঠে ঊষার। ফোনে প্রেম একসময় ফোন সেক্সে গড়ায়। ফোনের অন্য প্রান্তে থেকে তরুণ প্রেমিক ভাবতে থাকেন কোনো এক তরুণীর সঙ্গেই তিনি সম্পর্কে জড়িয়েছেন। ঊষাও ভুলে যান এই সমাজে বৃদ্ধ বিধবার প্রেম করতে মানা। কিন্তু তিনি যে রোজির মতো স্বপ্ন দেখতে শিখেছিলেন।


চারে মিলে একাকার

নির্মাতা চার নারীর সমান্তরাল গল্প এক বিন্দুতে মিলিয়ে দেন চলচ্চিত্রের শেষ অংশে দিওয়ালির রাতে। একই রাতে রিহানা প্রেমিকের সঙ্গে পার্টিতে যান, কিন্তু শপিং মলে চুরির দায়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। শিরিনের স্বামী জানতে পারেন, বিক্রয়কর্মী হিসেবে তার স্ত্রী লুকিয়ে চাকুরি করেন। লীলার বাগদত্তা মনোজের হাতে লীলা আর তার প্রেমিকের ব্যক্তিগত ভিডিও ধরা পড়ে যায়। তরুণ সাঁতার প্রশিক্ষক জেনে যায়, তিনি তার প্রেমিকা হিসেবে যে সুন্দরী তরুণীকে কল্পনা করেছেন, তিনি আসলে ৫৩ বছর বয়সি এক বৃদ্ধ নারী। সেই তরুণ এতো দিনের সবকিছু ঊষার ভাতিজাদের কাছে বলে দেন এবং বাড়ি এসে অপমান করে যান ঊষাকে। ঊষার পরিবার তাকে সেই রাতেই বাড়ি থেকে বের করে দেন। শিরিনের স্বামী রাগে তাকে আবার ধর্ষণ করেন প্রতি রাতের মতোই। এই ঘটনায় আরো স্পষ্ট হয়, যৌনতার ওপর কর্তৃত্ব নারীর ওপর কর্তৃত্ব স্থাপনের অন্যতম মাধ্যম। রিহানা ও লীলা দুজনই অপমানিত হয় কাছের মানুষদের কাছে। চার নারীর জীবনের গল্পই যেনো একটি গল্প; একই দমন, নিপীড়ন, কর্তৃত্ব স্থাপনের গল্প।




নারীর কাম থাকতে নেই

পুরুষ নারীর কামকে নিরুদ্ধ করার জন্য নারীকে অবরোধে, পর্দায় জেনানায় বন্দী করেছে, তাকে সূর্যের আলো দেখতে না দিয়ে তার নাম রেখেছে অসূর্যস্পশ্যা, তার ভগাঙ্কুর ছিন্ন করেছে, তাকে সতীত্ববন্ধ পরিয়েছে; কিন্তু নিজের কামের তৃপ্তি খুঁজেছে নারী থেকে নারীতে। যুগে যুগে নারীর কামকে অবদমনের উদ্দেশ্যে পুরুষতন্ত্র নারীকে করেছে বন্দি। পোশাক, ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা, প্রত্যাশিত আচরণের মাধ্যমে পরিয়েছে বেড়ি, কখনোবা জেন্ডারভিত্তিক শ্রমবিভাজন দ্বারা বেঁধে রেখেছে ঘরে। সাহিত্যিক হুমায়ুন আজাদ আধুনিক নারীবাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক সিমোন দ্য বোভোয়ার-এর সেকেন্ড সেক্স অনুবাদ করেন দ্বিতীয় লিঙ্গ নামে। যেখানে প্রেম ও কাম নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে সিমোন দেখিয়েছেন কীভাবে পুরুষতন্ত্র কৌশলে নারীর জন্য প্রেম রেখেছে, যদিও তা হতে হবে বৈধ প্রেম এবং পুরুষের জন্য কাম। কামের নিন্দা তখনই হয়, যখন নারী কামুক হয়ে ওঠে, অথচ পুরুষের জন্য কামুক হওয়াটা স্বাভাবিক।


লিপস্টিক আন্ডার মাই বোরখার প্রতিটি নারীর জীবনেও এই একই ন্যারেটিভের পুনরুৎপাদন দেখা যায়। রিহানার পোশাক বা প্রত্যাশিত আচরণের শৃঙ্খলে বন্দি থাকা, শিরিনের বাইরে কাজের অনুমতি না পাওয়া, এর সবগুলোর পিছনের কারণ একটাই নারীকে নিয়ন্ত্রণ। নারী শুধু যে নিজেকে, নিজের কামকে নিয়ন্ত্রণ করবে তা নয় বরং নারীর যেকোনো প্রকার আচরণের দ্বারা যাতে পুরুষ কামুক হয়ে না ওঠে সে ব্যাপারেও নারীকেই থাকতে হয় সদা সতর্ক। রিহানার বক্তব্যে তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে-- নিঃশ্বাসও ধীরে নাও মানুষের নজর তোমার বুকের দিকে চলে যাবে।


শিরিন ও আসলামের যৌন জীবনের দিকে লক্ষ করলে দেখা যায়, শিরিন মানুষ কিংবা নারীও নয়, একটা সেক্স অবজেক্টের মতো ব্যবহৃত হচ্ছে আসলামের দ্বারা। বহু আগেই সিমোন বলেছিলেন, নারীকে বিদ্ধ ও উর্বর করা হয় তার যোনি দিয়ে, যা শুধু পুরুষের মধ্যবর্তিতার ফলেই পরিণত হয় কামকেন্দ্রে, এবং এটি সব সময়ই এক ধরনের বলাৎকার। শিরিন প্রতিনিয়ত তার নিজের স্বামীর দ্বারা ধর্ষিত হতে থাকে। কিন্তু ভারতের আর্থসামাজিক অবস্থায় শিরিন হয়তো ম্যারিটাল রেপ সম্পর্কে সচেতনই নয়। এই সঙ্গমে তার নেই কোনোধরনের তৃপ্তি। শিরিনের অনন্য কামপ্রত্যঙ্গ ভগাঙ্কুর একেবারেই উপেক্ষিত থেকে যায় এই সঙ্গমে। চলচ্চিত্রের ৫৯ মিনিটে লীলা যখন শিরিনকে জিজ্ঞেস করেন, আসলাম কখনো শিরিনের ভগাঙ্কুরে চুমু খেয়েছে কি না, শিরিন নিরুত্তর থাকে। বিভিন্ন সমাজে নারীর কামকে কী পরিমাণ উপেক্ষা করা হয়, তার একটি বড়ো উদাহরণ শিরিন।


সেই সমাজে নারীদের বসবাস যেখানে আসলাম জোর করে শিরিনের সঙ্গে সঙ্গমে লিপ্ত হলে অথবা শিরিনের অনিচ্ছা সত্ত্বেও তার হাত দিয়ে শিশ্নকে উত্তেজিত করে তোলার চেষ্টা করলেও তাকে কোনো নিন্দের কাঁটায় বিদ্ধ হতে হয় না। অথচ একই সমাজে সঙ্গম আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ করায় তাকে নামিয়ে আনা হয় চরিত্রহীনার কাতারে। ঊষার পরিচিত ৫৬ বছরের বৃদ্ধ তার অর্ধেক বয়সি নারীকে বিয়ের কথা ভাবতে পারে অনায়াসে, অথচ ঊষা নারী হওয়ায় তার থেকে কম বয়সি পুরুষের সঙ্গে প্রেম করলে নিগৃহীত হয় সামাজিকভাবে।


জন্ম নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা থাকলেও নেই শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ

নির্মাতা অলঙ্কৃতা বিভিন্ন ধরনের পরিবার কল্যাণ এবং জন্ম নিয়ন্ত্রণ প্রোগ্রামগুলোকে প্রশ্নের সম্মুখীন করেছেন এই চলচ্চিত্রের কয়েকটি দৃশ্যের মাধ্যমে। Planned Parenthood Foundation (IPPF) অথবা The Population Council এর মতো সংগঠনগুলোর কর্মসূচি লক্ষ করলে দেখা যায়, তারা জন্ম নিয়ন্ত্রণ পিলের ব্যবহার সম্পর্কে প্রচারণা চালানোর সময় বিশ্বে চলমান নারী আন্দোলনগুলোর মূল দাবিগুলোকেই ব্যবহার করে এই পণ্যগুলোর বাজারজাত করে। তাদের মূল এজেন্ডাগুলোর মধ্যে রয়েছে নারী জীবন, নারীর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ও পছন্দ, গোপনীয়তা রক্ষা, স্বায়ত্তশাসন, ক্ষমতায়ন ইত্যাদি। এমনকি কখনো কখনো নিজেদের নারীর পক্ষে বা নারীবাদী হিসেবে জাহির করে, এমন অনেক গবেষকের বক্তব্যেও এটা মনে হয় যে, রক্ষণশীল সমাজব্যবস্থায় জন্ম নিয়ন্ত্রক পিল নারীকে সক্রিয় এবং নারীর ক্ষমতায়নকে গতিশীল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এসব ক্যাম্পেইনের মূল বক্তব্যই হলো, গর্ভনিয়ন্ত্রক ও গর্ভপাতকারক পিল অনেক সামাজিক এবং আইনি নিষেধাজ্ঞা পাশ কাটিয়ে নারীর নিজের শরীরের প্রতি নিয়ন্ত্রণ আনার পাশাপাশি গোপনীয়তাও রক্ষা করতে সক্ষম। তাদের মতে, একটা পিলের থেকে গোপনীয় আর কী হতে পারে? রাষ্ট্র কীভাবে একজন নারীর পিল গিলে ফেলা আটকাবে? (যেহেতু অনেক দেশেই গর্ভপাত আইনত নিষিদ্ধ)।


আবার ভারতে Norplant and Net-Oen (গর্ভ নিরোধনে নারী শরীরে দীর্ঘদিনের জন্য স্থাপন করা যায় এমন বিশেষ ড্রাগ) এর প্রবক্তারা বলে যে, এই জাতীয় জন্মনিয়ন্ত্রকগুলো ব্যবহার করলে নারীদের নিয়মিত কিছু করতে হয় না আবার এটা সঙ্গমেও কোনো সমস্যা ঘটায় না। তারা এটাও বলে যে, ভারতের নারীদের জন্য এ ধরনের ড্রাগগুলো জন্মনিয়ন্ত্রক পিলগুলোর বিকল্প হিসেবে হাজির হয়। আবার নারীরা স্বামীর সহায়তা ছাড়াই নিজে নিজে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে। অর্থাৎ নারীদের বেছে নেওয়ার ক্ষমতা এবং গোপনীয়তা রক্ষা দুটোই টেনে আনছে তারা।


উপরের ন্যারেটিভগুলো এই ধারণাই পোক্ত করে, এখন যে অবস্থায় নারীরা গর্ভধারণ করছে তার ওপরে তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণই নেই। সুসি থারু এবং তেজস্বিনী নিরঞ্জনা একটি প্রবন্ধে এটিই দেখিয়েছেন, ভারতীয় সমাজে এখনো নারী-পুরুষ দুজনে আলোচনা সাপেক্ষে জন্মনিয়ন্ত্রক ড্রাগ গ্রহণ করতে পারে না। আবার বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নারীর শারীরিক সম্পর্ক প্রত্যাখ্যান করার কোনো অধিকারই নেই। তাহলে পরিবার কল্যাণ নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো নারীর যে ক্ষমতায়ন এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের কথা বলছে, সেগুলো ঠিক কী ধরনের ক্ষমতায়ন! প্রাইভেট পরিসরের লৈঙ্গিক রাজনীতি নিয়ে তারা একেবারে নীরব। আবার তারা এই প্রসঙ্গেও সরব নয়, সংসারটা যেহেতু দুজনেরই, নারী-পুরুষ উভয়েই আলোচনার ভিত্তিতে জন্ম নিরোধক ব্যবস্থা গ্রহণ করতেই পারে।


লিপস্টিক আন্ডার মাই বোরখায় শিরিন ও আসলামের সম্পর্কের মধ্য দিয়ে এই লৈঙ্গিক রাজনীতির সম্পূর্ণটাই দর্শকের দৃষ্টিগোচর হয়; কর্তৃত্বমূলক যৌন সম্পর্ক কীভাবে একজন নারীকে অর্থনৈতিক, শারীরিক ও মানসিকভাবে পর্যুদস্ত করে।.


বোরখা কিংবা লিপস্টিক একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ

অলঙ্কৃতা শ্রীবাস্তবের একটি সাক্ষাৎকার দিয়ে লেখাটি শুরু হয়েছিলো যেখানে চলচ্চিত্রের নামকরণে বোরখা এবং লিপস্টিক ব্যবহারের কারণ তিনি উল্লেখ করেছেন। তার মতে, বোরখা হলো নারীদের আকাঙ্ক্ষাগুলোকে ঢেকে রাখা এবং লিপস্টিক নারীদের ছোটো ছোটো আকাঙ্ক্ষা অর্থে ব্যবহার হয়। কিন্তু একটু সূক্ষ্মভাবে খেয়াল করলে দেখা যায়, এই চার নারীর আকাঙ্ক্ষা গুলোও কোনো না কোনোভাবে পুরুষতন্ত্রের বেড়াজালেই আবদ্ধ। রিহানার বোরখা কিংবা চুরি করে লিপস্টিক পরতে চাওয়া বা না চাওয়ার পিছনের কারণ কী? বোরখা সে তো পুরুষের থেকেই নিজেকে আড়াল করে রাখা, আর লিপস্টিক বা প্রসাধনীর ব্যবহার কি পুরুষের চোখে আকর্ষণীয় হওয়ার বাসনায় নাকি নিজের জন্য? এ বিষয়টি অলঙ্কৃতা স্পষ্ট করেননি।


আবার লীলার মতো একজন স্বাধীনচেতা-আত্মনির্ভরশীল নারী চাইলেই যে কিনা একা একা পালিয়ে যেতে পারে তার পছন্দের শহরে, তাকেও বার বার তার প্রেমিকের কাছেই ফিরে আসতে দেখা যায়। এমনকি তাকে নোংরাভাবে অপমান করার পরেও। ঊষা নিজের জন্য নয়, যুবক প্রেমিকের চোখেই আকর্ষণীয় হতে স্লিভলেস ব্লাউজ, রঙিন শাড়ি, খোঁপায় ফুল গোঁজেন। শিরিন ঘর করতে থাকেন নির্যাতক স্বামীরই। অন্য নারীর সঙ্গে সম্পর্ক দেখেও নিজের স্বামীকে কিছু বলার সাহস দেখান না বরং স্বামীর প্রেমিকাকে অপমান করে আসেন।


শেষের দৃশ্যে চার নারীকে একত্রিত হতে দেখা যায় বটে, কিন্তু প্রতিরোধ বা এই অবস্থা থেকে বের হয়ে আসার কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। এই চার নারীর ছোট্ট আকাক্সক্ষাগুলোও যখন পুরুষতন্ত্রের দ্বারাই আবর্তিত হতে থাকে, তখন নির্মাতার উপস্থাপিত বোরখা আর লিপস্টিকের মধ্যকার প্রভেদরেখাও অস্পষ্ট থেকে যায়। চার নারীর ভিতর থেকে উঠে আসা হাহাকার হাম সাপ্নে বহত দেখতিহে ম্লান লাগে। আসলে কীসের স্বপ্ন দেখে তারা, মুক্তির নাকি পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর ভিতরেই থেকে ছোটো ছোটো চাওয়া পূর্ণ করে ঊনমানুষের মতো বেঁচে থাকার?

 

লেখক : তানিয়াহ্ মাহমুদা তিন্নি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী। বর্তমানে ভারতের জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে স্নাতকোত্তর পর্বে অধ্যয়ন করছেন।

taniahtinni@gmail.com

https://www.facebook.com/taniah.tinni

 

তথ্যসূত্র

1. https://www.thehindu.com/features/metroplus/lipstick-under-my-burkha-and-burqa-boxers-in-film-bazaar/article7892410.ece; retrieved on: 02.12.2019

2.https://www.thehindu.com/features/metroplus/lipstick-under-my-burkha-and-burqa-boxers-in-film-bazaar/article7892410.ece; retrieved on: 02.12.2019

3.Tharu, Susie and Niranjana, Tejaswini. (1994). `Problems for a Contemporary Theory of Gender’; Social Scientist, Vol. 22, No. ¾ (Mar-April), p. 101.

৪. বোভোয়ার, সিমোন দ্য (১৯৯৮ : ১৭৫) দ্বিতীয় লিঙ্গ; অনুবাদ : হুমায়ুন আজাদ; আগামী প্রকাশনী, ঢাকা।

৫. প্রাগুক্ত; আজাদ (১৯৯৮ : ১৭৯)।

6.Ellen Goodman, `What could be more private than taking a pill, how could a state control swallowing?’;Tharu, Susie (1994 : 102); `Problems for a Contemporary Theory of Gender’; Social Scientist, Vol. 22, No. ¾ (Mar-April).

7.Tharu, Susie and Niranjana, Tejaswini. (1994). `Problems for a Contemporary Theory of Gender’; Social Scientist, Vol. 22, No. ¾ (Mar-April), p. 101-105.

 

বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ১৮তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২০ এ প্রকাশিত হয়েছে।

 

 

 

 

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন