মোহসিবা মিম
প্রকাশিত ২৯ আগস্ট ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
ভয়ঙ্কর ক্ষমতা-কাঠামোর মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসার উঁকিঝুঁকি দেয় ‘হামিদ’
মোহসিবা মিম

জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে
জন্মগতভাবেই মানুষ স্বাধীনতাপ্রিয়। স্বাধীন থাকার প্রবল ইচ্ছা তাকে তাড়িত করে সবসময়। তবে কখনো কখনো অন্যায় আর শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সে স্বাধীনতা রক্ষা হয় না। তাই বলে মানুষ থেমে থাকে না। যুগে যুগে অন্যায় আর শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে মানুষ। কখনো সফল হয়েছে, কখনো পরাজিত; কখনো বরণ করেছে মৃত্যুকে। তবুও থেমে থাকেনি সে লড়াই; আর সেই মৃত্যু হয়েছে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য দিশারি। গত কয়েক দশকে বিশ্ব-রাজনীতির অন্যতম আলোচিত ইস্যু ভারতের কাশ্মির। দিনের পর দিন সেখানে বেড়ে চলেছে অসহায় মানুষের হাহাকার। রাষ্ট্র ক্ষমতার আড়ালে চাপা পড়ে গেছে কাশ্মিরিরা। রাষ্ট্র তার নিজের জায়গা পাকাপোক্ত করতে নানা সময় কাশ্মিরিদের ওপর অন্যায়ভাবে চাপিয়ে দিয়েছে শোষণ আর অত্যাচার। স্বাধীন হওয়ার প্রবল ইচ্ছা থেকেই দিনের পর দিন জীবন দিয়েছে কাশ্মিরিরা। কিন্তু দিনশেষে জয় আর আসেনি। ক্ষমতাসীনদের শোষণে চাপা পড়া কাশ্মিরি এক শিশুর গল্প নিয়ে নির্মাতা এজাজ খান নির্মাণ করেছেন চলচ্চিত্র হামিদ (২০১৯)। শিশু হামিদ, তার পরিবার এবং স্বজন হারানো কাশ্মিরিদের কথা নিয়ে এই চলচ্চিত্র। সঙ্গে আছে কাশ্মিরে নিয়োজিত ভারতীয় সেনাবাহিনীর সর্বময় ক্ষমতাবান হয়ে ওঠার গল্প। একই সঙ্গে পাশে থাকার নামে তারা যে আধিপত্য বিস্তার করেছে/করছে সে কথাই প্রতীকী ভাষায় তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন নির্মাতা।
কাশ্মির যখন যার তখন তার
১৮৪৬ খ্রিস্টাব্দ। শিখ রাজাদের সঙ্গে লাহোর চুক্তি এবং জম্মু শাসকদের সঙ্গে অমৃতসার চুক্তি অনুযায়ী দুই দু’বার ৭৫ লাখ রুপিতে কাশ্মিরকে ‘কিনে নেয়’ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। এরপর বৃটিশরা আবার নতুন করে কাশ্মিরকে জম্মু শাসক গুলাব সিং-এর কাছে বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়। এ নিয়ে কঠোর প্রতিবাদও করেন শিখ রাজা ইমাম উদ্দীন, কিন্তু তাতে খুব একটা লাভ হয় না। বৃটিশদের ছত্রছায়ায় গুলাব সিং হয়ে ওঠেন জম্মু-কাশ্মিরের একক শাসক। দিনের পর দিন তিনি অত্যাচারী শাসক হিসেবে আবির্ভূত হন এবং বেড়ে যায় মুসলমানদের ওপর অত্যাচার।১ অবশেষে বৃটিশরা কাশ্মিরে নজরদারির জন্য একজন ‘রেসিডেন্ট অব দ্য স্টেট’ নিয়োগ করেন; তাতেও কমে না মুসলমানদের ওপর অত্যাচারের মাত্রা। ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজ্যের সশস্ত্র বাহিনী কিংবা প্রশাসনিক কাজে হিন্দু রাজবংশীয় বাদে স্থানীয় মুসলমানদের চাকরির সুযোগও ছিলো না। এভাবেই বৃটিশের হাত ধরে সৃষ্ট এই সঙ্কট পরবর্তী সময়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধেরও প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ভারত স্বাধীন হওয়ার আগ পর্যন্ত কাশ্মিরের শাসক ছিলেন রাজা হরি সিং। ৪৭-এ ভারত বিভাজনের সময় বৃটিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, হরি সিং স্বেচ্ছায় ভারত বা পাকিস্তানে যোগ দিতে পারবেন; অথবা স্বাধীনভাবে শাসনকার্য পরিচালনা করার অধিকারও তার আছে। এমন পরিস্থিতিতে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে কাশ্মিরের আত্মপ্রকাশের অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন হরি সিং। যা পাকিস্তান মেনে নিলেও ভারত মেনে নেয় না। যদিও ভারত-বিভক্তি পরিকল্পনা অনুযায়ী মুসলিম অধ্যুষিত কাশ্মিরকে পাকিস্তানের কাছেই হস্তান্তরের কথা ছিলো। কিন্তু ভারত ওই বছর বৃটিশ সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় কাশ্মিরে হামলা চালালে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ব্যাহত হয়।২
এরপর নানা চড়াই-উৎরাইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে থাকে কাশ্মির। ১৯৬৫, ১৯৭১ ও ১৯৯৯ তিন বারের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের দুটিরই কারণ ছিলো এই কাশ্মির। আর দুই দেশের বিরোধ, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং উভয় দেশের কৌশলগত অবস্থানের কারণে সৃষ্ট এই সঙ্কটের বলি হতে থাকে কাশ্মিরিরা। তাই মুসলিম অধ্যুষিত কাশ্মিরবাসী আলাদা রাষ্ট্রের দাবি জানালেও ভারত চায় কাশ্মিরিদের পাকিস্তানের দোসর বানিয়ে, বিচ্ছিন্নতাবাদী আখ্যা দিয়ে নির্যাতন চালিয়ে যেতে; কাশ্মিরকে নিজেদের কুক্ষিগত করে রাখতে। সেই লক্ষ্যে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দেই জম্মু-কাশ্মিরে সেনা মোতায়েন করে ভারত; সঙ্গে মোতায়েন করে গুম, খুন, মৃত্যুর আহাজারি! এভাবেই ধীরে ধীরে কাশ্মির দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সঙ্কটপূর্ণ অঞ্চল হয়ে ওঠে। ভূস্বর্গ কাশ্মির পরিণত হয় ‘সেনার স্বর্গে’।
অন্যদিকে থেমে থাকেনি পাকিস্তানও। ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দের পর থেকে পাকিস্তান নিজেদের দখলে রেখেছে কাশ্মিরের ১৩ হাজার ২৯৭ বর্গকিলোমিটার এলাকা, যা পাক অধিকৃত কাশ্মির বলে পরিচিত। ২০১৭ খ্রিস্টাব্দের হিসাব অনুসারে পাক অধিকৃত কাশ্মিরের জনসংখ্যা ৪০ লাখ।৩ পাক অধিকৃত কাশ্মির এবং পাকিস্তানের গিলগিট বাল্টিস্তান দুটোই ইসলামাবাদ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হলেও কোনোটিই পাকিস্তান সরকারের তালিকাভুক্ত নয় বরং স্বায়ত্ত্বশাসিত এলাকা। পাকিস্তান অবশ্য চায়ও না সেই অর্থে এই ভূখণ্ডকে নিজেদের মানচিত্রে যোগ করতে। কারণ এই এলাকা নিজেদের আয়ত্তে নিলে তাদের নিজেদের বিতর্কের মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এদিকে ভারতের দাবি অনুসারে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ থেকেই পাক অধিকৃত কাশ্মির এবং গিলগিট বাল্টিস্তান ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এভাবেই দুই দেশের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে কাশ্মিরের জনগণ হারাতে বসেছে সবকিছু। কাশ্মিরে নিজস্ব সংবিধান, পৃথক পতাকা, এমনকি জাতীয় সঙ্গীতও ছিলো। কাশ্মিরের রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্যের প্রতীক ভারতীয় সংবিধানের দুটি অনুচ্ছেদ ৩৫-ক এবং ৩৭০।
৩৫-ক অনুসারে কাশ্মিরে স্থায়ী বাসিন্দা নির্ধারণ এবং সেখানে ভূমির মালিকানা নেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধ আছে। আর ৩৭০ অনুসারে প্রতিরক্ষা, যোগাযোগ, পররাষ্ট্রনীতি ছাড়া রাষ্ট্র পরিচালনার বাইরে অন্য যেকোনো সিদ্ধান্ত জম্মু কাশ্মিরে বাস্তবায়ন করতে গেলে ভারত সরকারকে স্থানীয় আইনসভার কাছে সম্মতি নিতে হবে। কিন্তু বর্তমানে এই দুই সংবিধানই বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারতের মোদি সরকার। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ক্ষমতালোভী রাজা হরি সিংকে সঙ্গে নিয়ে যে নিধনযজ্ঞ শুরু করেছিলো হিন্দুত্ববাদী সংঘ পরিবার (আর এস এস); বর্তমানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যবহার করে কাশ্মির থেকে ৩৫-ক এবং ৩৭০ বাতিলের মধ্য দিয়ে তারা তাদের পূর্বপরিকল্পিত গোলক ধাঁধার সমাধানই করলো কি না তা হয়তো সময়ই বলবে!
এক পলকে দেখা হামিদ
চলচ্চিত্রটি নয় বছরের শিশু হামিদকে নিয়ে। বাবা-মাকে নিয়ে হামিদদের ছোটো পরিবার। বাবা রহমত আলি, মা ইসরাত আলি। বাবা নৌকা বানানোর কারিগর হলেও স্বভাবে কবি। তার কবিতায় উঠে আসে সমাজ-রাষ্ট্রের অন্ধকার দিকের কথা। একদিন কারখানা থেকে বাড়ি ফেরার পথে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সামনে পড়েন তিনি। তল্লাশিতে কাঠের কাজের জন্য জিনিসপত্র রাখা বাক্সের মধ্যে তারা খুঁজে পায় একটি কবিতা লেখা ডায়েরি। ডায়েরির পাতাগুলো ছিঁড়ে ফেলে তারা রহমতকে ছেড়ে দেয়। বাড়ি ফিরে রহমত স্ত্রী ও ছেলে হামিদের সঙ্গে কথা বলে একটা কাজে তখনই বাইরে বেরিয়ে যান; তারপর তিনি আর ফিরে আসেননি।
হামিদের সঙ্গে বাবার সম্পর্ক ছিলো মধুর। বাবাই তাকে স্কুলে এগিয়ে দিতো, কবিতা শোনাতো। ফলে বাবার এই হারিয়ে যাওয়া ছোটো হামিদ কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলো না। হামিদ সবসময় বাবার ছবি পকেটে করে নিয়ে ঘোরে। হামিদ জানে না তার বাবা ঠিক কোথায় গেছে। এদিকে থানায় নতুন কোনো মৃতদেহ আসলে হামিদের মায়ের কাছে ফোন আসে। মা থানায় ছুটে যান লাশের মধ্যে থেকে হামিদের বাবাকে খুঁজতে। এক অদ্ভুত অনুভূতি হামিদের মায়ের মধ্যে কাজ করে! একদিকে ভয়াবহ অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে নির্মমতা।
পকেটে থাকা বাবার ছবি দেখে স্কুলে সহপাঠী আর শিক্ষকরা হামিদকে জানায়, তার বাবা আল্লাহর কাছে চলে গেছে। হামিদ তখন বাবার খোঁজ নিতে আল্লাহর ঠিকানা জানতে চায়। একপর্যায়ে সে মায়ের কাছে জানতে পারে ‘৭৮৬’ আল্লাহর নম্বর; আরো অনেকেই তাকে একই কথা বলে। এরপর সে খুঁজতে শুরু করে আল্লাহর সঙ্গে কথা বলার রাস্তা। বাবার পুরনো মোবাইল ফোনসেটে রিচার্জ করে নম্বর সাজিয়ে হামিদ ফোন দেয় ৭৮৬-এ। সেই ফোন নম্বর মিলে গিয়ে কল যায় এক ভারতীয় সেনা সদস্যের কাছে। তাকেই আল্লাহ ভেবে সে কথা শুরু করে। ওই সেনা প্রথমে হামিদের কথা বুঝতে না পেরে বিরক্ত হয়। একপর্যায়ে বাবাকে নিয়ে হামিদের আবেগ তাকে স্পর্শ করে। তিনি হামিদের সঙ্গে কথা বলতে থাকেন। হামিদ তার বাবাকে নিয়ে সব অনুভূতি তার কাছে বলতে শুরু করে। বাবাকে উদ্দেশ করে লেখা চিঠিও তাকে পড়ে শোনায়।
হামিদ -এর একটি দৃশ্য
হামিদের বিশ্বাস, আল্লাহকে জানালেই শুনতে পারবে তার বাবা। শুরুর দিকে বিরক্ত হলেও ওই সেনা ধীরে ধীরে হামিদকে মেলাতে শুরু করেন তার নিজের সন্তানের সঙ্গে; দুর্বল হয়ে পড়েন তার প্রতি। থানায় গিয়ে রহমতের খোঁজ করতে শুরু করেন। এভাবে চলতে চলতে একসময় বাবাকে পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে হামিদ, জেদ করতে থাকে ‘আল্লাহর’ সঙ্গে। ওই সেনা একপর্যায়ে হামিদকে জানিয়ে দেয়, তিনি আল্লাহ নন, ভারতীয় সেনা সদস্য। এবং তার বাবাকে মেরে ফেলা হয়েছে। এই কথায় এক নিমিষে সব আশা-ভরসা শেষ হয়ে যায় হামিদের, বাড়ি ফিরে সে বাবার ফোনসেটটাও ভেঙে ফেলে। এরপর ভাঙা ফোন, থানার কাগজপত্র আর বাবার ছবি একসঙ্গে নিয়ে কবরস্থানে গিয়ে মাটিচাপা দেয় হামিদ।
কাশ্মিরিরা ‘আগ্রাসী’
বিশাল পাহাড়ের গায়ে তুষারের আচ্ছাদন, তার কোল ঘেঁষে বয়ে চলেছে ঝর্ণা। হাজার রকমের ফল-ফুল আর অপরূপ সৌন্দর্যে ভরপুর কাশ্মির। যার সৌন্দর্যে অভিভূত হয়ে মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর তার নামকরণও করেন ‘ভূস্বর্গ কাশ্মির’। স্বর্গের প্রতি সবারই আলাদা এক টান থাকে। যুগে যুগে দেবতা, দানবদের মধ্যেও এ নিয়ে লড়াই বেঁধেছে বার বার। ‘ভূস্বর্গ’ কাশ্মিরেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। সেখানে দিনের পর দিন চলছে যুদ্ধ-সংঘাত, কাশ্মিরিরা হয়ে উঠেছে আগ্রাসী। ভূস্বর্গ কাশ্মির এগিয়ে চলেছে মৃত্যু উপত্যকার দিকে।
হামিদ-এর ১৬ মিনিটে দেখা যায়, সেনাবাহিনীর দুই সদস্য দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করছে। এমন সময় ১০-১২ বছরের এক বালক তাদের লক্ষ্য করে ঢিল ছুড়ে দৌড় দেয়। সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাকে ধাওয়া দিয়ে ধরে এবং এক সদস্য মারধর শুরু করে। অন্য একজন সেনা এতে বাধা দেয় এবং বলতে থাকে, ‘তুমি কি পাগল হয়ে গেছো, এরা ছোটো বাচ্চা, এদের মেরো না, ছেড়ে দাও।’ এমনকি ওই বালক তাদের ভয়ে পায়জামায় প্রস্রাব করে দেয়। ১৯ মিনিটে এক কাশ্মিরি সেনাবাহিনীর একটি গাড়ি আটকে রাস্তার উপর লেখেন ‘গো ইন্ডিয়া গো ব্যাক’। এতে সেনাবাহিনীর ওই সদস্য (যিনি আগে বালককে মারধর করেছিলেন) রেগে গিয়ে চালককে তার ওপর গাড়ি চালিয়ে দিয়ে মেরে ফেলার কথা বলেন। এ পরিস্থিতিতে চালকসহ অন্যরা সবাই তাকে শান্ত করে এবং শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধ সৃষ্টি করা ওই লোকটিকে কিছু করতে দেখা যায় না। পরের দৃশ্যে দেখা যায়, কিছু সংখ্যক জনগণ রাস্তায় আগুন জ্বালিয়ে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছে। এবং তারা মাঝেমধ্যেই সেনাবাহিনীকে লক্ষ্য করে ঢিল ছুড়ছে। এক ঘণ্টা ১০ মিনিটে জুম্মার নামাজ শেষে কাশ্মিরিদের আবারও বিক্ষোভরত অবস্থায় দেখা যায়; সেখানেও তারা সেনাবাহিনীর গাড়ি লক্ষ্য করে ঢিল ছুড়তে থাকে। এক ঘণ্টা ২৯ মিনিটে দেখা যায়, মুখ্যমন্ত্রী আসবেন সে কারণে কাশ্মিরিরা মিছিল করছে, আর সেনা সদস্যরা তার নিরাপত্তা দিচ্ছে। এমন সময় এক কাশ্মিরি বালক এগিয়ে আসলে তাকে খুব মারধর করে সেনাবাহিনীর এক সদস্য। এই সময়ও সেনাবাহিনীর অন্য এক সদস্যকে বলতে শোনা যায়, এরা ছোটো বাচ্চা ছেড়ে দাও এদের।
হামিদের বাবাসহ আরো কয়েকজন কাশ্মিরি হারিয়ে যাওয়া আর কয়েকজন কাশ্মিরিকে মারধর করা ছাড়া চলচ্চিত্রজুড়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীর তেমন কোনো কার্যক্রম দেখানো হয় না। আর এই হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলো যে সেনাবাহিনীর কারণেই হারিয়ে গেছে তাও চলচ্চিত্রে পরিষ্কার করা হয় না। এর বিপরীতে কাশ্মিরিদের বিক্ষোভ আর আগ্রাসী মনোভাবই কেবল চোখে পড়ে। এবং কাশ্মিরিদের এই আগ্রাসী মনোভাবকে খানিকটা বিচ্ছিন্নভাবেও দেখানো হয়। কেনো, কী কারণে তারা ঠিক এতোটা আগ্রাসী, কেনোইবা তারা সেনাবাহিনীর গুলির বিপরীতে ঢিল ছোড়ে, তারও কোনো পরিষ্কার দৃশ্যায়ন চলচ্চিত্রে নেই।
অথচ ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে কাশ্মিরের বিধানসভার এক লিখিত প্রশ্নোত্তরে জানা যায়, সর্বশেষ তিন বছরে পুলিশের প্রতি পাথর নিক্ষেপের অপরাধে আটক তরুণের সংখ্যা ১৪ হাজার দুইশো ১০ জন।৪ একটু পিছনে ফিরলে দেখা যায়, ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি থেকে পরবর্তী তিন দশকে প্রায় ৯৫ হাজার দুইশো ৩৮ জন কাশ্মিরিকে হত্যা করেছে ভারতীয় সেনাবাহিনী; কারাবন্দি করেছে সাত হাজার একশো ২০ জনকে। কাশ্মিরি গ্লোবালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাশ্মিরের ১১ হাজার একশো সাত নারী ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এক লাখ নয় হাজার একশো ৯১টি আবাসিক ভবন ও স্থাপনা করা হয়েছে ধ্বংস। এমনকি ২০১৯ খ্রিস্টাব্দেও পিএইচ ডি গবেষক, প্রকৌশল বিদ্যার শিক্ষার্থীসহ তিনশো ৫০ জনকে হত্যা করেছে তারা। শিশু, তরুণ, শিক্ষার্থী ও নারীসহ প্রায় দুই হাজার তিনশো ৪৮ জনকে আটক করা হয়েছে।৫ ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে আটক এক হাজার দুইশো ৯৬ জনের সাক্ষাৎকারে ছয়শো ৮১ জনই নির্যাতিত হওয়ার কথা জানায়। অন্যদিকে কাশ্মিরিদের নির্যাতনের এই ঘটনা শতকরা ৯৫ ভাগ মিথ্যা বলে দাবি করেন ভারতীয় সেনাপ্রধান ভি কে সিং (২০১০-২০১২)।৬ তার কথার মতোই কাশ্মিরের এই ভয়াবহ পরিস্থিতির কোনো চিহ্নই খুঁজে পাওয়া যায় না চলচ্চিত্রজুড়ে। উল্টো দেখানো হয়, সেনাবাহিনীর ওপর কাশ্মিরিদেরই আগ্রাসী মনোভাব!
পাহাড়ের ওপারের আতঙ্ক!
হামিদ-এর এক ঘণ্টা ছয় মিনিটে দেখা যায়, এক ব্যক্তি জনগণকে আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করতে শিশুদের সঙ্গে নিয়ে লিফলেট তৈরি করছেন। এ সময় হামিদকে দেখতে পেয়ে তাকে ডেকে নেন ওই ব্যক্তি এবং খেজুর খেতে দেন। তিনি হামিদকে বলেন, ‘শুনলাম, তুমি আল্লাহর পথে দান করছো। তুমি কি জানো আল্লাহ কাশ্মিরের মুক্তি চায়? এই মুক্তির জন্য তোমাকে আজাদিদের সঙ্গে শামিল হতে হবে। আর আজাদিদের সঙ্গে শামিল হতে চাইলে তোমাকে পাহাড়ের ওপারে যেতে হবে।’ এরপর তিনি হামিদের হাতে কিছু লিফলেট ধরিয়ে দেন এবং সেগুলো রাস্তার মানুষজনকে দিতে বলেন। লোকটির এই কথা যে হামিদের শিশুমনে প্রভাব ফেলে তার প্রমাণ মেলে এক ঘণ্টা ১২ মিনিটে। হামিদ যখন আর কোনোভাবে বাবাকে ফিরে পাওয়ার সুযোগ দেখে না, তখন সে ‘আল্লাহকে’ (সৈনিককে) সরাসরি বলে ফেলে, ‘আল্লাহ মিয়া তুমি যদি আব্বুকে তাড়াতাড়ি ফিরিয়ে না দাও, আমি কিন্তু পাহাড়ের ওপারে চলে যাবো’। এরপর এক ঘণ্টা ১৭ মিনিটে দেখা যায়, একটি ঘরে কাশ্মিরের তরুণদের চলচ্চিত্র দেখিয়ে বিক্ষোভে উদ্বুদ্ধ করছেন ওই ব্যক্তি। তিনি হামিদকে চলচ্চিত্র দেখার কথা বলেন। হামিদ রাজি হয় না এবং বলে, ‘বাড়ি যেতে দেরি হলে মা বকবে।’ তখন ওই ব্যক্তি বলেন, চলচ্চিত্র না দেখলে যে আল্লাহ নারাজ হবে। অবশেষে হামিদ চলচ্চিত্র দেখতে যায়।
আর যারা এই স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন, সংগ্রাম করছে তাদেরকেই ‘জঙ্গি’ আখ্যায়িত করে ভারত সরকার। কিন্তু এটা জানা দরকার যে, কাশ্মিরের ওই ব্যক্তির আন্দোলন করা এবং শিশু-তরুণদের আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করার পিছনে কারণটা আসলে কী। কেনো তারা কথিত জঙ্গি হয়ে উঠছে? একটু খতিয়ে দেখলে দেখা যায়, নিজ ভূখণ্ডে কাশ্মিরিরা হারিয়ে ফেলেছে তাদের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের অধিকার। দিনের পর দিন লঙ্ঘিত হচ্ছে তাদের মৌলিক চাহিদা, পরাধীনতায় ঢাকা পড়ছে তাদের জীবন। তাদের প্রতিটি সকাল শুরু হয় অনিশ্চতার মধ্য দিয়ে। আর এরাই যখন নিজেদের অধিকার আদায়ে রাস্তায় নামে, তখন তাদের ওপর লাগানো হয় ‘জঙ্গি’ সিলমোহর। শুধু অধিকার আদায়ের লড়াই নয়, নিজ মাতৃভূমিতে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার ক্ষমতাও তাদের নেই। এর নজিরও মেলে অনেক ক্ষেত্রে; বাড়ি থেকে মাত্র দুইশো গজের মধ্যে মসজিদ হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘ আট বছর মসজিদে গিয়ে জুম্মার নামাজ আদায় করতে পারেননি সৈয়দ আলী শাহ গিলানী। এভাবেই গৃহবন্দি করে রাখা হয় ৮৮ বছর বয়সি কাশ্মিরের আজাদি আন্দোলনের এই প্রধান নেতাকে। অবশেষে ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের ৩০ মার্চ শুক্রবার, তাকে মসজিদে নামাজ আদায়ের অনুমতি দেওয়া হয়।৭ এতো কিছুর পরও অধিকার আদায়ে একজন মানুষ স্বাধীনতার জন্য মরিয়া হয়ে আন্দোলনে নামলে তিনি হয়ে যান ‘জঙ্গি’। বছরের পর বছর ধরে হিযবুল মুজাহিদীন, জে কে এল এফ নামে সংগঠনগুলো স্বাধীন কাশ্মিরের লক্ষ্যে আন্দোলন করে চললেও সেগুলো ‘জঙ্গি সংগঠন’! যে কারণে ২০১৭ খ্রিস্টাব্দের জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি হিযবুল মুজাহিদীনকে সন্ত্রাসী সংগঠন এবং এর নেতা সাইয়্যেদ সালাউদ্দিনকে সন্ত্রাসী হিসেবে তালিকাভুক্ত করার পরামর্শ দেন।৮ কিন্তু কেনো তারা জঙ্গি হয়ে উঠলো সে বিষয়টা এড়িয়ে যান মোদি ও তার দোসররা।
অথচ কেবল গিলানী নয়, পুরো কাশ্মিরই অবরুদ্ধ-বন্দি। এর মধ্যে যারা স্বাধীনতার দাবিতে আন্দোলন করে চলে, গুম-খুনের হাত থেকে রক্ষা পেতে আত্মগোপন করে চলে, তারাই হয়ে যায় পাহাড়ের ওপারের বাসিন্দা; পাহাড়ের আতঙ্ক। কাশ্মিরের ইতিহাসের সেই শুরু থেকে আজ অবধি পাকিস্তানের দোসর-বিচ্ছিন্নতাবাদী আখ্যা দিয়ে যাদের ওপর সাঁড়াশি অভিযান চালানো হচ্ছে; বাধ্য হয়ে একপর্যায়ে প্রতিরোধ গড়ে তুললেই তারা হয়ে দাঁড়ায় আতঙ্কের কারণ। আর সহজে-কোনো প্রশ্ন ছাড়াই যাতে তাদের দমন করা যায়, সেই লক্ষ্যে নামকরণ করা হয় জঙ্গি-পাহাড়ি-পাকিস্তানি দোসর। কিন্তু এটা পরিষ্কার যে, ভারতের অভ্যন্তরীণ সমস্যা কিংবা রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বৈষম্যের ন্যায় পাহাড়ি আতঙ্কও ভারতেরই সৃষ্ট; যেখানে বেশিরভাগ সময়ই সব সমস্যা কিংবা ষড়যন্ত্রের মূল হিসেবে দায়ী করা হয় পাকিস্তান তথা মুসলমানদের। তাহলে কি ভারত রাষ্ট্র নিজেদের সব অন্যায় ঢেকে রাখার ফন্দি আঁটতেই অন্যের কাঁধে বন্দুক রেখে শিকারের রাস্তা খোঁজে মুসলমান-পাকিস্তান-পাহাড়ি আতঙ্ককে সামনে রেখে।
নিরাপত্তা-নিরাপত্তা ডাক পাড়ি
মানুষ গেলো কোন বাড়ি
ভারতের অন্য যেকোনো প্রদেশের চেয়ে জম্মু ও কাশ্মিরে সেনা মোতায়েন সংখ্যা সর্বোচ্চ। সেখানে প্রতি বর্গমাইলে কমপক্ষে একশো জন ভারতীয় সৈনিক কর্মরত। প্রতি ১০ জন বেসামরিক নাগরিকের বিপরীতে কোনো না কোনো বাহিনীর একজন সৈনিক আছেই। অথচ ভারতের অন্যান্য জায়গায় যার অনুপাত ৮০০ : ১। জম্মু কাশ্মিরের ৪২ হাজার বর্গমাইল এলাকায় সাত লাখ সৈন্য সবসময় পাহারায় থাকে। এমনকি ভারতীয় সেনাবাহিনীর সমগ্র শক্তির অর্ধেকই মোতায়েন করা হয়েছে সেখানে। অথচ এই রাজ্যটি ভৌগোলিকভাবে সমগ্র ভারতের ৩২ ভাগের এক ভাগ এবং জনসংখ্যা বিচারে ৯৫ ভাগের একভাগ।৯ তবে কেনো এতো সামরিকায়ন, কেনো এতো অস্থির অবস্থা আর কেনোইবা এতো নিরাপত্তার প্রয়োজন পড়ে ছোটো এই ভূখণ্ডে। এই প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যায় হামিদ।
কাশ্মিরের মানুষের কাছে সবচেয়ে বড়ো আতঙ্কের নাম হলো ‘গুম’। এর পাশাপাশি বেসামরিকভাবে নারী-পুরুষ নির্যাতনের ঘটনাও নতুন নয়। এতো গুম, খুন নির্যাতনে প্রতিনিয়ত আতঙ্কিত থাকতে হয় কাশ্মিরিদের। ‘জম্মু ও কাশ্মির কোয়ালিশন অব সিভিল সোসাইটি’ নামে একটি সংগঠনের হিসাবে, কাশ্মিরে এখনো প্রায় আট হাজার মানুষ নিখোঁজ। প্রিয়জন হারানোর প্রতিবাদে প্রত্যেক বছরের ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস পালন করে কাশ্মিরিরা। স্বজন হারানো পরিবারের সদস্যদের নিয়ে একটি সংগঠনও আছে কাশ্মিরে ‘এসোসিয়েশন অব প্যারেন্টস অব ডিসঅ্যাপির্য়াড পার্সন’।১০ যার দেখাও মেলে হামিদ-এ। এক ঘণ্টা ২৮ মিনিটে হামিদের মাসহ স্বজন হারানো অন্যান্যরা ছবি, ব্যানার, ফেস্টুন হাতে নিয়ে এই ব্যানারে আন্দোলনে বসে। যারা কেউই জানে না স্বজনদের আর কোনো দিন ফিরে পাবে কি না! এমনকি কাশ্মিরজুড়ে প্রায় সাত হাজার অজ্ঞাত কবর রয়েছে, যাদের পরিচয় আজও শনাক্ত করা যায়নি।
এছাড়া চলচ্চিত্রে ১৮ মিনিটে দেখা যায়, হামিদের মাসহ আরো কয়েকজন হাতে ফাইল নিয়ে বসে আছে থানার সামনে। সবার চোখে-মুখে প্রিয়জন হারানোর ছাপ। একজন নারী চলে যাওয়ার সময় ভুল করে হামিদের বাবার ফাইলের সঙ্গে ফাইল বদলে ফেলেন। এ সময় হামিদের মা বলেন, ‘ওইটা আমার ফাইল, এটা আপনার’। উত্তরে ওই নারী বলেন, ‘তোমার ফাইল আর আমার ফাইলে কোনো পার্থক্য নাই। কারণ, ঘুণেই তো খাবে সব।’ সত্যিই সব ঘুণে খেয়ে ফেলছে; বছরের পর বছর ধরে কাশ্মির হয়ে উঠেছে মানবাধিকার লঙ্ঘনের এক বিশাল ক্ষেত্র। কুখ্যাত ‘আর্মড ফোর্সেস স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্ট’ (এ এফ এস পি এ) এ কোনো রকম জবাবদিহিতা ছাড়াই কাশ্মিরে যেকোনো ধরনের অপারেশন পরিচালনা করতে পারে সেনাবাহিনী। এই অ্যাক্ট চালু হওয়ার পর ১৯৮৯ থেকে ২০১৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ২৮ বছরে কাশ্মিরে প্রায় লক্ষাধিক ব্যক্তি সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়। যদিও ভারত সরকার এই সংখ্যা ৫০ হাজারেরও কম বলে দাবি করে।১১ তবে এই সংখ্যা স্বীকার করে নিলেও শেষ পর্যন্ত এর দায় চাপিয়ে দেওয়া হয় কাশ্মিরি জঙ্গি সংগঠনগুলোর তৎপরতার ওপরই।
একই সঙ্গে সেই রাষ্ট্রীয় ধারকরাই দাবি করেন, এখানে জঙ্গি তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে এবং বর্তমানে (২০১৯) তাদের সংখ্যা মাত্র একশো ৫০ থেকে দুইশো ৫০ জন। অথচ ১৯৯০-এর পর থেকে সরকারি হিসাবেই জম্মু ও কাশ্মিরে নিহত ‘জঙ্গির’ সংখ্যা ২১ হাজার!১২ এখন প্রশ্নটা হলো, জঙ্গি তকমা দিয়ে যাদের হত্যা করা হলো তারা আসলে কারা? সাধারণ মানুষ! তাহলে আপাতদৃষ্টিতে কাশ্মিরজুড়ে যে নিরাপত্তার চাদর বিছিয়ে রাখা হয়েছে, তা আসলে কতোটা নিরাপত্তা দিচ্ছে কাশ্মিরের মানুষদের? চলচ্চিত্রে সেই প্রশ্ন না তুলে বরং দেখানো হয়েছে সেনাবাহিনীর নিরপেক্ষভাবে পাশে থাকার দৃশ্য। নিরাপত্তাই যদি থাকে তাহলে কেনো নিখোঁজ হয় রহমত আলী, কেনো স্বজন হারানো পরিবারের লম্বা লাইন বাড়তেই থাকে থানার সামনে। দর্শক এর উত্তর খুঁজে পায় না; খুঁজে পায় না দিনের পর দিন লঙ্ঘিত হতে থাকা কাশ্মিরের মানুষের অধিকার; হারিয়ে যাওয়ার তালিকায় নতুন করে যোগ হতে থাকে কাশ্মিরিদের নাম। স্বাধীনতা/নিরাপত্তা দেওয়ার নামে চলে কাশ্মিরিদের বেঁচে থাকার অধিকারটুকু কেড়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্র; যার ছিটেফোঁটা চলচ্চিত্রের কোথাও নেই।
কাশ্মিরের ‘আল্লাহ’ তো সেনাবাহিনী
রাষ্ট্রের উৎপত্তিই হয়েছে ঈশ্বর ধারণাকে সম্বল করে। অতীতে প্রত্যেকটি রাষ্ট্র যেখানে ছিলো ঈশ্বরের প্রতিনিধিরূপে, আধুনিককালে ঠিক সেই রাষ্ট্রই যেনো মানুষের কাঁধে চেপে বসেছে খোদ ঈশ্বর হয়ে। রাষ্ট্র উৎপত্তির ঐশ্বরিক মতবাদ অনুযায়ী, শাসক তার শাসনকার্যের জন্য দায়ী থাকে শুধুই ঈশ্বরের কাছে। যেখানে ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসেবে তিনিই মানুষের হর্তাকর্তা, ভাগ্যের নিয়ন্ত্রক। এমনকি ঈশ্বরকে যেমন অবমাননা করা যায় না, তেমনই অবজ্ঞা করা যায় না তার প্রতিনিধিকে। ঈশ্বর ছাড়া কারো কাছে তার জবাবদিহির কোনো দায় নেই। ভারতের মতো উঠতি পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলো একালে এসে ঈশ্বরের সেই প্রতিনিধিত্বকে অতিক্রম করে নিজেই হয়ে গেছে ঈশ্বর। ঈশ্বরের বাইরে গিয়ে তারা কায়েম করে নতুন এক রাষ্ট্রীয় শাসন। সেই শাসনে রাষ্ট্রকর্তারা ক্ষমতার জোরে বেঁধে রাখে কাশ্মিরিদের মতো হাজারো মানুষকে। তাই কাশ্মিরবাসীরা সঙ্কটের জোয়ারে ভাসতে ভাসতে ঈশ্বরকে ডেকেও যখন কোনো সুরাহা পায় না, তখন তারা নব্য ঈশ্বররূপী ভারতকেই ডেকে চলে। তাদের মতে, সেই ‘ঈশ্বর’ হয়তো সব বিপদ থেকে রক্ষা করবে, দূর করবে তাদের জীবনের অন্ধকারাচ্ছন্ন অবস্থা। কিন্তু,দৈবত্ব যত মহৎ হয়েছে মানবতা তত দুর্দশাগ্রস্থ অবস্থায় পতিত হয়েছে। এটাই হলো সকল ধর্মের ইতিহাস। স্বর্গীয় আইনকানুনের নিষ্ঠুর ইতিহাস! অর্থাৎ ইতিহাসে ঈশ্বর হলো সেই ভয়ানক সংঘের সভাপতি, যার নাম দিয়ে স্বর্গীয় দ্যুতিপ্রাপ্ত মহৎ গুণের অধিকারী সমস্ত মহাপুরুষেরা সাধারণ মানুষের মুক্তি, সম্মান, কার্যকারণ এবং উন্নতি কেড়ে নিয়েছে।১৩
যুগে যুগে আর্বিভাব ঘটেছে তেমনই ক্ষমতালোভী মহাপুরুষদের, যারা তাদের মহৎ গুণে কেড়ে নিয়েছে সাধারণ মানুষের ভাগ্য। ঠিক যেমন করে মহাপুরুষ ‘মোদির’ সরকারও তার মহৎ গুণে কেড়ে নিয়ে চলেছে হাজারো কাশ্মিরির স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার আনন্দটুকু। এর কিছুটা চিত্র উঠেও এসেছে হামিদ-এ।
চলচ্চিত্রজুড়ে হামিদের সঙ্গে ‘আল্লাহর’ কথোপকথন দৃশ্য দেখা যায় অনেকবার। এবং প্রত্যেকবার ফোন দেওয়ার আগে মাথায় টুপি পড়তে দেখা যায় হামিদকে। এভাবেই ‘আল্লাহরূপী’ সেনাবাহিনীকে সম্মান করা এবং সেনাবাহিনীর পাশে থাকার চিত্র দেখা যায় চলচ্চিত্রে। এক ঘণ্টা ১৩ মিনিটে হামিদ ‘আল্লাহ’কে জানায় তাদের খুবই অভাব চলছে। বাবাকে হারিয়ে তার মা সেলাই করে যে পারিশ্রমিকটুকু পাওয়ার কথা; সে টাকাও ঠিকঠাক পাচ্ছেন না। সব শুনে তিনি হামিদের কাছে সেই খরিদ্দারের ফোন নম্বর চান। পরদিন সকালে সেই খরিদ্দার বাড়িতে এসে হামিদের মায়ের সব টাকা পরিশোধ করে যান। হামিদ আল্লাহর নামে শুকরিয়া আদায় করে; নতুন করে ‘আল্লাহর’ প্রতি আরো ভরসার জায়গা তৈরি হয় তার মনে। এক ঘণ্টা ছয় মিনিটে সেই সেনা সদস্য রহমত আলীর খোঁজে থানায় যান। নিখোঁজ হওয়া নিয়ে কথা বলেন পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে। এরপর এক ঘণ্টা ১০ মিনিটে হেঁটে যেতে যেতে সেনা সদস্যের সঙ্গে ফোনে কথা বলে হামিদ। পাশেই চলতে থাকে বিক্ষোভ। তখন সেনা সদস্য সাবধান করে হামিদকে দ্রুত বাড়ি ফিরতে বলেন। চলচ্চিত্রজুড়ে সেনাবাহিনীর এমন পাশে থাকার দৃশ্য দেখা গেলেও বাস্তবের কাশ্মিরের চিত্র কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন। পাশে থাকার নামে তারা পুরো ভূখণ্ডকে এমনভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে যে, তাদের হুকুম ছাড়া সেখানে কিছুই করার সাধ্য নেই। এককথায় কাশ্মিরিদের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না বলতে গেলে ভাগ্যও নির্ধারণ করে সেনাবাহিনী। তাই সবশেষে হামিদ যখন জানতে পারে ফোনের ওপারের কণ্ঠটা ‘আল্লাহ’ নয় ভারতীয় সেনাবাহিনীর, তখন সে সবার আগে মাথা থেকে টুপিটা খুলে ফেলে। যে ‘আল্লাহ’ সব বিপদে পাশে থাকে, এমনকি বাবাকে ফিরিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দেয়, যাকে এতো সম্মান করে হামিদ, তাকেই সেনাবাহিনী হিসেবে জানার সঙ্গে সঙ্গে সব শ্রদ্ধা যেনো শেষ হয়ে যায় এক নিমিষে। মুহূর্তেই তার চোখে-মুখে ফুটে ওঠে রাগ ক্ষোভ আর প্রতিশোধের ছাপ। সেনাবাহিনীই যে কাশ্মিরিদের জীবনের সবচেয়ে বড়ো অভিশাপ এই দৃশ্যের মধ্যে দিয়ে ফুটে ওঠে সেটাই।
লাল রঙটা শেষ পর্যন্ত আর লাল থাকলো না
চলচ্চিত্রে এক ঘণ্টা এক মিনিটে দেখা যায়, হামিদ তার বাবার জন্য একটি নৌকা বানিয়ে তাতে লাল রঙ করতে চায়। লাল রঙের দাম অন্যান্য রঙের চেয়ে বেশি হওয়ায় সে প্রতি সপ্তাহের বেতন থেকে কিছু টাকা বাঁচানো শুরু করে। কথা প্রসঙ্গে হামিদ এ কথা ফোনে ‘আল্লাহ’কে জানায়। এরপর অনেকটা সময় পেরিয়ে যায়।
হামিদ-এর শেষের দিকে এক ঘণ্টা ৪২ মিনিটে হামিদ ও তার মা জানতে পারে, তার বাবা আর বেঁচে নেই। এতে তাদের শেষ আশাটুকু ধূলিসাৎ হয়ে যায়। কিন্তু এতোদিনে হামিদ আর সেই ছোটোটি নেই। হামিদ বাবার মৃত্যুর খবর শুনে প্রতিবাদে মুখে রুমাল বেঁধে সেনাবাহিনীর গাড়িতে ঢিল ছোড়ে। আল্লাহ মনে করে যে ফোন দিয়ে সেনা সদস্যের সঙ্গে কথা বলতো সেটিকেও কবর দেয়। সবকিছুর পরও হামিদ ঘুরে দাঁড়াতে চায়। শোকার্ত মাকে সে অনুরোধ করে পরের দিন নৌকার কারখানায় যাওয়ার জন্য। কারণ বাবার জন্য যে নৌকাটি সে বানানো শুরু করেছিলো সেটার কাজ শেষ হয়েছে। পরদিন মা-ছেলে মিলে কারখানায় যায়।
আগেই বলেছি হামিদের ইচ্ছে নৌকায় লাল রঙ করার। রঙের কথা উঠতেই কারখানার মালিক তাকে জানান, তার নামে কুরিয়ারে কী যেনো একটা এসেছে। হামিদ প্যাকেটটি খুলে দেখে সেখানে দুটো লাল রঙের কৌটা। কৌটা দেখে কারখানার মালিক হামিদকে প্রশ্ন করে, রঙটা তাহলে কিনে ফেললে? উত্তরে হামিদ বলে, ‘আমি কিনিনি। আল্লাহ পাঠিয়েছে।’ অর্থাৎ সেই সেনা সদস্য পাঠিয়েছে। কথা হলো, যে ভারতীয় সেনারা কাশ্মিরকে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি সামরিকায়িত অঞ্চল বানিয়েছে; যাদের কারণে হামিদের বাবা নিখোঁজ ও পরে মারা গেছেন; যাদের কারণে গড়ে ছয় জনে একজন কাশ্মিরি নির্যাতিত১৪; শেষ পর্যন্ত সেই সেনায় কিনা হামিদের জন্য পাঠালো লাল রঙ। প্রচলিত অর্থে যে রঙ কিনা বিপ্লবের, প্রতিবাদের প্রতীক! তার মানে দিনেশেষে তালগাছের মালিকানাটা সেনাদের হাতেই রাখেন নির্মাতা!
দুঃখে তাদের জীবন ভরা
জীবন এক অদ্ভুত রঙ্গমঞ্চ। সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না সবমিলিয়েই জীবন। জীবনে সবকিছুরই আগমন ঘটে পালাক্রমে, কখনো সুখ আগে কখনো পরে। তবে কাশ্মিরিরা হয়তো জন্মগতভাবে এক অনিশ্চয়তা নিয়ে জন্মায়। তাদের জীবনে সে সুখ মরীচিকার মতো। দিনের পর দিন তারা ছুটতে থাকে সেই মরীচিকার পিছনে। কাশ্মিরি শিশু হামিদও তার বাইরে নয় ; সেও ছুটে চলে সুখ নামক মরীচিকার পিছনে। হামিদের স্কুলে যাওয়ার জুতো ছিঁড়ে গেছে এবং সেই জুতো নিয়ে সে হাঁটতে পারছে না। ৩৩ মিনিটে দেখা যায়, হামিদ তার বাবার যন্ত্রপাতির বাক্স খুলে সব জিনিসপত্রের মধ্যে হাতুড়ি আর পেরেক পায়। সেই পেরেক লাগায় তার ছিঁড়ে যাওয়া জুতোয়। এরপর সে ওই জুতো নিয়েই চলতে থাকে। ৩৮ মিনিটে দেখা যায়, জুতো থেকে পেরেকটা খুলে যাচ্ছে, হাঁটতে পারছে না হামিদ। উপায় না পেয়ে সামনে থাকা পাথরকেই সে বেছে নেয় হাতুড়ি হিসেবে। এভাবেই কয়েকবার এই জুতো ছিঁড়ে যাওয়ার দৃশ্য অনেকটা মোটিভ আকারে ব্যবহৃত হয় চলচ্চিত্রে। প্রথমবার হাতুড়ি দিয়ে পেরেক ঠিক করতে দেখা গেলেও পরবর্তী সময়ে সেই হাতুড়ির জায়গা দখল করে নেয় পাথর। যে পাথর ছুড়ে কাশ্মিরিরা তাদের অস্তিত্বের জানান দেয়, সেই পাথর দিয়েই জুতো ঠিক করতে দেখা যায় হামিদকে। কাশ্মিরের প্রকৃতির উপাদান পাথরকেই তারা বেছে নেয় প্রধান অস্ত্র হিসেবে। নিরুপায় কাশ্মিরিরা যেমন দিশেহারা হয়ে জীবন রক্ষার তাগিদে সেনাবাহিনীর ওপর পাথর ছোড়ে, তেমনই হামিদও চলার রাস্তা কিছুটা স্বাভাবিক করতে বেছে নেয় সেই পাথরকেই। আপাতদৃষ্টিতে সবটা স্বাভাবিক মনে হলেও এই পেরেক কাশ্মিরিদের জীবনে ঘটে যাওয়া সব ক্ষতের চিহ্ন এবং হাতুড়ির জায়গা দখল করা পাথর হয়ে ওঠে তাদের অস্তিত্বের প্রতীক।
হামিদ-এর বলা না বলা
কাশ্মিরিদের জীবনের গল্প নিয়ে হামিদ নির্মিত হলেও চলচ্চিত্রজুড়ে দেখানো হয় দিনের পর দিন সেনাবাহিনীর ‘আল্লাহ’ হয়ে ওঠা। তাদের বিপর্যস্ত পরিস্থিতি তুলে ধরার পাশাপাশি সেখানে সেনাবাহিনী রাষ্ট্রীয় শাসন কায়েমের দৃশ্যও ফুটে উঠেছে। এর আগেও কাশ্মির নিয়ে নির্মিত হয়েছে নানা ধরনের চলচ্চিত্র। ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে মনিরত্নম নির্মাণ করেন সাড়া জাগানো চলচ্চিত্র রোজা। রোজার কাশ্মির কখনোই কাশ্মিরিদের কথা বলেনি, বলেছে ভারত রাষ্ট্রের কথা। ২০১৪-তে আরেক নির্মাতা বিশাল ভরদ্বাজ করলেন আরেক আলোচিত চলচ্চিত্র হায়দার। সেখানেও কাশ্মির, তার জনগণ, তাদের দুঃখবেদনা সবই থাকলো ঠিকই, কেবল তালগাছের মালিকানাটা ভারত রাষ্ট্রের কাছে থাকলো।
তবে হায়দার কিংবা রোজা যা বলেনি, তা কিছুটা হলেও বলার চেষ্টা করেছে হামিদ। কাশ্মিরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর মূল্যায়ন করতে গিয়ে এতোদিন যে কথাটি কেউ বলার ‘সাহস’ করেনি; সেই কথাটি অবলীলায় বলে ফেলেছেন নির্মাতা এজাজ খান। হামিদ নিয়ে অনেক নেতিবাচক সমালোচনা থাকলেও শুধু এইটুকুর জন্যও এজাজ প্রশংসা পাওয়ার দাবি রাখেন। কারণ কাশ্মির ইস্যুতে ভারতের মতো আগ্রাসী রাষ্ট্রের ভিতরে থেকেও এজাজ দিনশেষে চলচ্চিত্রে ‘আল্লাহ’রূপী যে সেনাবাহিনীকে তুলে ধরেছেন, তা হামিদকে অনন্যতা দিয়েছে।
লেখক : মোহসিবা মিম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাফিক ডিজাইন, কারুশিল্প ও শিল্পকলার ইতিহাস বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
mohsibamostary@gmail.com
https://www.facebook.com/mohsibamim
তথ্যসূত্র
1. https://roar.media/bangla/main/history/kashmir-freedom-movement-brief-history-and-first-mass-movement/; retrieved on: 25.09.2019
২. পারভেজ, আলতাফ (২০১৯ : ১৬); এথনো-পলিটিক্স ইন সাউথ এশিয়া : দুই : কাশ্মীর ও আজাদীর লড়াই; ঐতিহ্য, ঢাকা।
3. https://bit.ly/2IQOrIH; retrieved on: 14.10.2019
৪. প্রাগুক্ত, পারভেজ; (২০১৯ : ৭২)।
5.https://bit.ly/2IN7uUe; retrieved on: 14.10.2019
৬. পারভেজ, আলতাফ (২০১৯ : ৭১); এথনো-পলিটিক্স ইন সাউথ এশিয়া : দুই : কাশ্মীর ও আজাদীর লড়াই; ঐতিহ্য, ঢাকা।
৭. মানিক, এ এইচ; ‘ভারতীয় সম্প্রীতির রোজা : জাতীয়তাবাদের জয়গানে শিল-পাটার কিছু না হলেও মরিচের দফারফা’; ম্যাজিক লণ্ঠন; সম্পাদনা : কাজী মামুন হায়দার; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়; সংখ্যা ১৫, জুলাই ২০১৮; পৃ.২২৯।
৮. প্রাগুক্ত, পারভেজ; (২০১৯ : ৫২)।
৯. প্রাগুক্ত, পারভেজ; (২০১৯ : ৭৬)।
১০. প্রাগুক্ত, পারভেজ; (২০১৯ : ৭১)।
১১. প্রাগুক্ত, পারভেজ; (২০১৯ : ৭০)।
১২. প্রাগুক্ত, পারভেজ; (২০১৯ : ৭৭)।
১৩. বাকুনিন, মিখাইল (২০১৯ : ব্যাক কভার); ঈশ্বর ও রাষ্ট্র; ভাষান্তর : সৌরভ দাস, প্রবাল রায় প্রান্ত ও রাগীব হাসান; অঙ্কুর প্রকাশনী, ঢাকা।
১৪. সেতু, মাহামুদ; ‘‘বলিউডের সেইসব চলচ্চিত্র : ‘দেশপ্রেম’-এর আড়ালে নগ্ন জাতীয়তাবাদ’’; ম্যাজিক লণ্ঠন; সম্পাদনা : কাজী মামুন হায়দার; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়; সংখ্যা ৯, জুলাই ২০১৫; পৃ. ৮৫।
বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ১৮তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২০ এ প্রকাশিত হয়েছে।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন