আলি আহমেদ নিশান
প্রকাশিত ২৮ আগস্ট ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
রাষ্ট্রীয় টানাপড়েন নিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় প্রশ্ন তোলা চলচ্চিত্র ‘হাউসফুল’
আলি আহমেদ নিশান

পৃথিবীটা নাকি ছোটো হতে হতে ...
পৃথিবীটা যেনো ছোটো হতে হতে একেবারেই চলে আসছে হাতের মুঠোয়। স্যাটেলাইট, ক্যাবল আর বোকাবাক্সকে ছাড়িয়ে পুরো পৃথিবী এখন ছোট্ট স্মার্ট যন্ত্রটির মধ্যে হাজির। আবেগ-ভালোবাসা-কষ্ট-আনন্দ-অভিমান-হতাশা সব চলেছে এই যন্ত্রটির সঙ্গে। যোগাযোগের নাকি হাজারো দরজা খুলে গেছে। দরজা অবশ্য খুলেছে, তবে মানুষে-মানুষে নয়, যন্ত্রের সঙ্গে যন্ত্রের যোগাযোগের। সবাই যেনো যান্ত্রিকতার এক মহাসাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে, বিশাল এক যন্ত্রের ছোটো ছোটো অংশে পরিণত হচ্ছে। আলাদা আলাদা হয়ে পড়ছে। একই পরিবারের মধ্যে থেকেও সবাই যেনো একা। ভার্চুয়ালি কয়েক হাজার বন্ধুওয়ালা মানুষটারও বাস্তবে কোনো বন্ধুই নেই! মানবীয় চাওয়া-পাওয়া-অভাব-অভিযোগের ভাষাটা মানুষ ভুলতে বসেছে। মানুষের মুখে মুখে ফিরছে ভিন্ন এক ভাষা--পুঁজির ভাষা, রাষ্ট্রের ভাষা, আধিপত্যের ভাষা। সবাই যেনো একই সুরে কথা বলা শুরু করেছে। সবাই ছুটে চলেছে। কিন্তু জানে না সে পথের শেষ কোথায়। প্রশ্ন তোলার অবসরও হয় না কখনো।
তারপরও উল্টোধারার মানুষও যে নেই তা নয়। তবে সংখ্যায় হাতেগোনা। তারা চেষ্টা করে ‘নিজের’ ভাষায় কথা বলার। বিশাল ‘যন্ত্র’টাকে পর্যবেক্ষণ করার, প্রশ্ন তোলার। তারা লড়াইটা চালিয়ে যেতে চায়। কিন্তু মানুষ তো মানব ভাষা বোঝার অবস্থাতেই নেই। তাই বিকল্প পথের এই মানুষগুলো তথা তাদের এই পথটা যেনো অবোধগম্যই থেকে যায়। আর তারা ভোগেন সবকিছুকে মুখ বুঁজে মেনে না নেওয়ার অস্বস্তিতে। এই মানুষদের একজন ভারতীয় নির্মাতা বাপ্পাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায়। যিনি সবকিছুর মধ্যে থেকেও কিছুটা ‘নিজের’ ভাষায় কথা বলতে চেয়েছিলেন চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে। বাপ্পাদিত্য ২০০৯ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ করেন হাউসফুল। এই গল্পে দেখা মেলে নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায় নামের একজন নির্মাতার, যার কোনো চলচ্চিত্রই বাণিজ্যিক সফলতা পায় না। তারপরও তিনি ভেঙে পড়েন না; নতুন করে শুরু করেন। নিখিলের এই চলচ্চিত্রযাত্রার মধ্য দিয়েই উঠে আসতে থাকে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র্রের নানা সমস্যা-সঙ্কট আর ‘নিজের’ ভাষায় কথা বলার চেষ্টা।
হাউসফুল-এর আখ্যান ও কিছু কথা
কলকাতা শহর থেকে দূরের কোনো গ্রামের এক প্রেক্ষাগৃহে কাঁটাতার নামে একটি চলচ্চিত্রের শো চলছে। চলচ্চিত্রের গল্পটা এমন যে, কিছু মানুষ নিজেদের স্বার্থগত কারণে একজন নারীকে তার নিজের অজান্তে জঙ্গি কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে ফেলে। পরে ওই নারীকে জঙ্গি হিসেবে কারাভোগ পর্যন্ত করতে হয়। এই গল্পের কাঁটাতার দেখতে খুব বেশি মানুষ প্রেক্ষাগৃহে আসে না। চলচ্চিত্রের নির্মাতা নিখিল বন্দোপাধ্যায় নিজেই টিকিট কিনে প্রেক্ষাগৃহের শো বন্ধ হওয়া আটকাতে থাকেন। নিখিলের সহকারী ও প্রেক্ষাগৃহের ম্যানেজারের মধ্যে কথাবার্তা শোনা যায়--নিখিলের চলচ্চিত্রগুলো ব্যবসা করতে তো পারেই না, কখনো পুরস্কারও পায় না। এতে ম্যানেজার প্রশ্ন করে বসেন, যে চলচ্চিত্র ব্যবসাও করে না পুরস্কারও পায় না,--সে চলচ্চিত্র তাহলে বানায় কেনো!
কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখা যায়, কাঁটাতার-এর নায়িকা চরিত্রে অভিনয় করা মেয়েটি একটি বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্রে কাজ করতে শুরু করেছেন (১৯ মিনিটে)। সেই চলচ্চিত্রের নির্মাতা নায়িকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে, তাকে ভোগ করতে চায়। নায়িকাও যেনো নিজের অস্তিত্বের চিন্তাতেই এই পরিস্থিতিকে সায় দেন। চলচ্চিত্র শিল্প-ব্যবসার জায়গা থেকে সরে গিয়ে হয়ে ওঠে শরীর বেচাকেনার হাটবাজার! এ শুধু বাপ্পাদিত্যের হাউসফুল-এ দেখানো রূপকল্প নয়। একটু মনোযোগী হলেই দেখা যাবে, চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে এ রকম যৌনসন্ত্রাস কিংবা হয়রানির ঘটনা ভূরিভূরি। যার ফলস্বরূপ ভয়াবহ রূপ-চেহারা নিয়ে সামনে আসে ‘হ্যাশট্যাগ মি ঠু’র মতো আন্দোলন।
যাহোক, গ্রামের সেই প্রেক্ষাগৃহ থেকে কলকাতায় ফিরতে ফিরতে নিখিলের ভোর হয়ে যায়। এতো দেরিতে বাড়ি ফেরায় স্ত্রী রাগারাগি করতে থাকেন। সন্দেহ করেন, তিনি হয়তো তার নায়িকার সঙ্গেই রাত কাটিয়ে আসলেন। নিখিলকে স্ত্রীর ভুল ভাঙাতে দেখা যায় না, স্ত্রীর রাগ ভাঙানোর চেষ্টাও তিনি করেন না। ছোটো ছোটো অনেক সাংসারিক ব্যাপার থেকে নিখিলকে পালিয়ে বেড়াতে দেখা যায়। সংসারধর্ম তাকে আন্দোলিত করতে পারে না। তার স্ত্রী একপর্যায়ে মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে যান। অথচ নিখিল থাকেন নিজের জগৎ নিয়ে, চলচ্চিত্র নিয়ে।
যদিও বাইরে হাজারো নকল আর রিমেইক চলচ্চিত্রের হুড়োহুড়ি, জয়জয়কার। কিন্তু নিখিলকে তার অবস্থান থেকে নড়তে দেখা যায় না, চোখে পড়ে না মাথা নোয়ানোর বিন্দুমাত্র প্রবণতা। যেনো স্ট্রাগলই নিখিলের জীবনের আরেক নাম। চলচ্চিত্রের ৪০ মিনিটের দিকে নিখিল একটি ক্লাবে যান মদপান করতে। সেখানেই নিখিল খুঁজে পান তার পরবর্তী চলচ্চিত্রের গল্প। তার সহকারীকে গল্পটি শোনান নিখিল--নায়ক মুখে রঙ মেখে জোকার সেজে রাস্তায় লিফলেট বিলি করেন। সেই লিফলেটে থাকে রাষ্ট্র, আইন, পুলিশ আর সন্ত্রাসের কথা; থাকে যুদ্ধ, আত্মহত্যা আর লাশের কথা। এই লিফলেট বিলি করেই তিনি মানুষকে কোনো এক চিন্তার খোরাক দিতে চান হয়তো, ঠিক যেমন নিখিল (তথা বাপ্পাদিত্য) চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে মানুষকে কোনো না কোনোভাবে ভাবাতেই চান, অস্বস্তিতে রাখতে চান (যে অস্বস্তিতে থাকেন তিনি নিজেও)। একদিন রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে নায়কের প্রস্রাবের চাপ আসে, প্রস্রাবখানার দেয়ালে তিনি এক যৌনকর্মীর ফোন নম্বর দেখতে পান। সেই নম্বরে কল করে তিনি দেখা করতে যান যৌনকর্মীর সঙ্গে। ধীরে ধীরে যৌনকর্মীর সঙ্গে নায়কের প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়। এর মধ্যেই হঠাৎ একদিন নায়ক যৌনকর্মীকে গুলি করে মেরে ফেলেন। তারপর আকাশে উড়িয়ে দেন হাতে থাকা সবগুলো লিফলেট। আপাত দৃষ্টিতে এমন ঘটনার পিছনে কোনো কার্যকারণই খুঁজে না পাওয়া গেলেও তা নিখিলের পরের চলচ্চিত্রের গল্প।
হাউসফুল-এ নিখিল চরিত্রটিও কখনো কখনো এমনই দুর্বোধ্য। নিখিলকে মাঝে মাঝে সহকারী সমীর বাবুর সঙ্গে কথা বলার সময় ‘অদ্ভুত’, ‘উদ্ভট’ যুক্তিতেও দেখা যায় ‘হুম’ মানে সায় দিয়ে। দর্শক হিসেবে তখন বোঝার উপায় থাকে না, নিখিল আসলে একমত হলেন নাকি প্রসঙ্গটি এড়িয়ে যাওয়ার জন্য এমন করলেন। যার ফলে চলচ্চিত্রের শেষের দিকে এসে সহকারী যখন আরো একবার দক্ষিণি চলচ্চিত্র রিমেইকের ব্যাপারটি বলেন, নিখিলকে ‘হ্যাঁ’ বলতে শোনা যায়। দর্শক হিসেবে তখন নিখিলের সেই ‘হ্যাঁ’ এর মর্ম খানিকটা ধোঁয়াশার মতোই মনে হয়।
তবে চলচ্চিত্রের একেবারে শেষে লালনের যে গানটি বাপ্পাদিত্য ব্যবহার করেছেন, তাতে অনেক কিছু পরিষ্কার হয়--‘আমার এ ঘরের চাবি পরের হাতে/ কেমনে খুলিয়ে সে ধন দেখবো আমি দুই চোখেতে ...’। বাংলা ভাষাতে তথা এই রিজিওনেই যখন গল্পের ঝুলি পড়ে আছে, এতো ঐশ্বর্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, তখন অন্যের কাছে ধার চাওয়া আর নিজের ঘরের চাবি অন্যের হাতে তুলে দেওয়া তো একই কথা। শেষের অংশে নিখিলের ‘হ্যাঁ’ ধোঁয়াশা তৈরি করলেও চলচ্চিত্রের পুরো সফরে নিখিলকে তার নিজস্বতার ব্যাপারে সচেতন হিসেবেই মনে হয়েছে। আর বলতে গেলে সেই সচেতন হওয়ার সময় এসে গেছেও বটে। নইলে ঘটমান অস্থির পরিস্থিতিতে ‘জনমকানা’র মতো না দেখতে দেখতে ‘আপন ঘরের বোঝাই সোনা’ কিছু সময়ের মধ্যেই অন্যের লেনাদেনার কারবারে পরিণত হবে। ইতোমধ্যেই হয়তো অনেকখানি হয়েও গেছে।
হাউসফুল-এ নিখিল দ্বিতীয় যে চলচ্চিত্রটির কাজ শুরু করেন, তা শেষ হওয়ার আগমুহূর্তে এবার নায়িকাকে পুলিশ জঙ্গি সন্দেহে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। অর্থাৎ নিখিলের আগের চলচ্চিত্র কাঁটাতার-এর নায়িকা সেই চলচ্চিত্রের আখ্যানের মধ্যে আর দ্বিতীয় চলচ্চিত্রের নায়িকা কাহিনির বাইরে জঙ্গি সন্দেহে গ্রেপ্তার হন। চলচ্চিত্রের কাহিনির ভিতরে ও বাইরে দুই নায়িকার একই পরিণতি চোখে পড়ে। শেষ পর্যন্ত দুজনই বন্দি, ঠিক যেমন বাংলা চলচ্চিত্র একটি অদৃশ্য শিকলে বন্দি।
সন্ত্রাস, নজরদারি, আধিপত্য : সিস্টেমের হাতে ইন্ডিভিজ্যুয়ালের মৃত্যু
চলচ্চিত্রের নয় মিনিটে দেখা যায়, সংবাদ উপস্থাপক মিস মিত্রকে জঙ্গি সন্দেহে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পুলিশ মিস মিত্রকে খুঁজে বের করে বোমা হামলাকারী মজিদের ফোনের কল-লিস্টের সূত্র ধরে। বলে রাখা ভালো, বাপ্পাদিত্যের হাউসফুল-এ দেখানো সময়কালটা বেশ পুরনো। তখন পর্যন্ত সবার হাতে হাতে মোবাইল ফোনসেট আসেনি, ইন্টারনেট আর কম্পিউটার তখনো ভারতে খুব বেশি প্রভাব বিস্তার করেনি। টেলিফোন দিয়েই বেশিরভাগ মানুষকে কাজ চালাতে হয়। এদিকে টেলিফোনে কে কার সঙ্গে কথা বলে, কতোক্ষণ বলে, কখন কখন কথা বলে সব রেকর্ড রাখা হয়। জঙ্গি মজিদের রেকর্ড যেমন সংরক্ষণ করা হয়, মিস মিত্রের মতো সাধারণ মানুষেরও রাখা হয়। সন্দেহ তালিকার বাইরে কেউ নয়। টেলিফোন কোম্পানি আবার চাহিবামাত্র সেই রেকর্ড পুলিশ, সি বি আই বা অন্যান্য সংস্থা তথা কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেয়।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তি অনেকটা পথ এগিয়েছে। ডানা ছড়িয়েছে পুঁজিবাদ। এখন সবার হাতে হাতে স্মার্টফোন, পার্সোনাল কম্পিউটার তথা ইন্টারনেট। প্রতিদিনই মানুষ অনেকটা সময় এগুলোর সঙ্গে কাটায়। দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে এগুলো একেবারে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে। একেকটা ফোন বা কম্পিউটারই হয়ে উঠেছে একেকটা বাড়ি, অফিস, বাজার। কথা বলাও এখন আর শুধু অডিওতে থেমে নেই। ভিডিও কল, মেসেজিং এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে গণমাধ্যম পর্যন্ত সবকিছুই হাতের এই ডিভাইসটির মধ্যেই চলে এসেছে। যার ফলে কোনো একজন মানুষ তার স্মার্টফোন বা ল্যাপটপটি কীভাবে ব্যবহার করে, কোন কোন ওয়েবসাইটে যায়, কার কার সঙ্গে যোগাযোগ করে, এই তথ্যগুলো জানতে পারলে পুরো ব্যক্তি সম্পর্কেই একটা সম্যক ধারণা পাওয়া সম্ভব। আর তখন ব্যক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা আরো সহজ হয়ে যায়। তাই তথ্য সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ। আবার ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখতে সেই তথ্য গোপন করা বা উল্টেপাল্টে প্রকাশ-প্রচার করাও কর্তৃপক্ষের জন্য জরুরি হয়ে পড়ে।
ক্ষমতার আদিম, মূল ও চরম উৎস একটিই। তার নাম সত্যগোপন বা ইনফরমেশন-হাইডিং। মানুষের ওপর শাসন চালাতে গেলে, রাজত্ব করতে গেলে, সত্যগোপন করা একান্তই জরুরি হয়ে পড়ে। যে সমাজে উঁচু-নিচু বিভাজন আছে, ধনী-দরিদ্র আছে--গোপনীয়তা ছাড়া সেই সমাজে রাজত্ব চালানো একেবারেই অসম্ভব।১
এজন্য রাষ্ট্র নানাভাবে ব্যক্তি সম্পর্কে নানারকম তথ্য সংগ্রহ করতে থাকে। তারপর তাদের একেকটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করার চেষ্টা করে। কারণ রাষ্ট্র এক জাতীয় মানুষ চায়, সে বৈচিত্র্য পছন্দ করে না। যতো বেশি বৈচিত্র্য, মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা ততো বেশি কঠিন। তারপর রাষ্ট্র সে তথ্যকে কাজে লাগিয়ে তাদেরকে নানারকম গোত্রের মধ্যে ভাগ করে ফেলে। যেমন, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মচারী, শ্রমিক, কৃষক, দোকানি, করদাতা, ভূমিমালিক, ভূমিহীন ইত্যাদি। এভাবে পাঁচশো জন আলাদা আলাদা ব্যক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার চেয়ে পাঁচশো জনের একটা গোত্রকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়। আর সেজন্যই রাষ্ট্রের প্রয়োজন ব্যক্তি সম্পর্কে তথ্য।
অন্যদিকে পুঁজিবাদ তথা করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোরও তথ্য প্রয়োজন। কোনো একজন ব্যক্তি কেমন অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্যে বাস করে, তার খাদ্যাভ্যাস, তার সম্পর্কের ধরনগুলো কেমন, সে কী ধরনের বিনোদন পছন্দ করে ইত্যাদি তথ্য থাকলে সেই ব্যক্তিকে কোনো কিছুতে সম্পৃক্ত করা সহজ হয়ে যায়। তার মন ভোলানোর মতো রঙচঙে বিজ্ঞাপন দেওয়া সহজ হয়ে যায়। সহজ হয়ে যায় তাকে নিয়ে ব্যবসা করা। যার ফলস্বরূপ ১০ টাকার একটি সংবাদপত্র কিনে খুব খুশি মনে বাড়ি ফেরেন ‘গৃহকর্তা’। কিন্তু তিনি জানতেই পারেন না, শত শত বিজ্ঞাপনের বিনিময়ে করপোরেট সংস্থাগুলোর কাছে ‘গৃহকর্তাকে’ আগেই বিক্রি করে রেখেছে সংবাদপত্র। অতঃপর সেই রঙচঙে বিজ্ঞাপনগুলো দেখে ‘গৃহকর্তাকে’ আবার ছুটতে হয় বাজারে। তখন বাড়িতে ‘কোলগেট’ আর চলে না, ‘পেপসোডেন্ট’ই কিনতে হয়; ‘কমপ্ল্যান’ চলে না, ‘হরলিক্স’-ই কিনতে হয়। এভাবে বাজারে গিয়ে আরেক দফা বিক্রি হয় গৃহকর্তা। একই উদাহরণ টেলিভিশনের বেলায় যেমন খাটে, স্মার্টফোনের অ্যাপের বেলাতেও তেমনই খাটে। আর তাই যে ব্যবসায়িক সংস্থার কাছে যতো বেশি তথ্য, সে সংস্থা ততো বেশি সমৃদ্ধ। আর এই ফাঁদে পড়ে ব্যক্তি ভীষণ রকমের অসহায় হয়ে পড়ে। চারদিক থেকে তাকে থাকতে হয় ‘নজরবন্দি’। তার প্রত্যেকটি পদক্ষেপ নিয়ন্ত্রণ করে অন্য কেউ। অথচ মজার ব্যাপার হলো, ব্যক্তি জানতেই পারে না সে কোন অথৈ জলে ডুবে আছে। তার সামনে এমন একটা আবহ তৈরি করা হয়, যেনো নিয়ত জয় তারই হচ্ছে।
ভালো করে খেয়াল করলে মিস মিত্রের ঘটনাটাও উপলব্ধি করা যাবে। চলচ্চিত্রে দেখা যায়, মিস মিত্র আর পাঁচ জনের মতো সাধারণের মধ্যে মিশে যাওয়ার মতোই একজন মানুষ। তিনি ভাবতেই পারেননি, যে প্রযুক্তি এতো নিশ্চিন্তে ব্যবহার করে যাচ্ছেন, তার গণ্ডগোলে পড়ে পুরো জীবনের মানচিত্রটাই পাল্টে যাবে। সব সাধারণ মানুষের মতো তিনিও ভাবেননি, তার নিজের টাকায় কেনা টেলিফোনটিও তার নিয়ন্ত্রণে নেই, নজরদারি চলছে। যেমন, আজকে কম্পিউটার, স্মার্টফোন বা অ্যাপের ওপর নেই সাধারণ মানুষের নিয়ন্ত্রণ, স্বাধীনতা। শ্রম মানুষের, শ্রম দিয়ে কেনা প্রযুক্তি মানুষের, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ অন্য কারো।
গণমাধ্যমে জঙ্গি--চলচ্চিত্রে জঙ্গি
হাউসফুল-এ দুই ধাপে জঙ্গিবাদের উপস্থাপন লক্ষ করা যায়। চলচ্চিত্রটির প্রধান চরিত্র নির্মাতা নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায় একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন ‘কাঁটাতার’ নামে। এটি চলচ্চিত্রের মধ্যে চলচ্চিত্র। সেখানে দেখা যায়, সংবাদ উপস্থাপক মিস মিত্রকে তার ভক্ত পরিচয় দিয়ে একজন অচেনা মানুষ দেখা করার অনুরোধ করেন। মিস মিত্র পরদিন সন্ধ্যায় লোকটির সঙ্গে একটি রেস্তোরাঁয় দেখা করেন। রেস্তোরাঁয় বসে অচেনা লোকটির মোবাইল ফোনসেটে একটি কল আসে। কিন্তু লোকটি কল ধরতে পারেন না এবং ফোনে চার্জ নেই বলে আফসোস করতে থাকেন। মিস মিত্রকে জানান, তার সঙ্গে সাক্ষাতের উত্তেজনায় সব ভুলে গেছেন। মিস মিত্র তখন নিজের ফোনটি তার দিকে এগিয়ে দেন। তার ঠিক দুই মিনিট পরে অর্থাৎ চলচ্চিত্রের আট মিনিট ছয় সেকেন্ডে, টেলিভিশনে সংবাদ সম্প্রচার হয়--‘শহরের একাধিক জায়গায় বিস্ফোরণ। পর পর বিস্ফোরণে কেঁপে উঠলো শহরের একাধিক এলাকা ... কোনো জঙ্গি সংগঠন এই ঘটনার দায় এখনো স্বীকার করেনি। তবে এই ঘটনার পেছনে কোনো মৌলবাদী জঙ্গি সংগঠনের হাত রয়েছে বলে মনে করছেন গোয়েন্দারা।’
পরের শটেই পুলিশ দলবল নিয়ে মিস মিত্রের বাড়িতে হাজির হয় এবং তাকে গ্রেপ্তার করে। একপর্যায়ে তিনি জানতে পারেন, বিস্ফোরণের ঠিক দুই মিনিট আগে বিস্ফোরণকারী মজিদের মোবাইল ফোনসেটে তার ফোন থেকে একটি কল যায়। সেই সূত্র ধরেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরিস্থিতি এমন হয় যে, মিস মিত্রকে কোনো আইনজীবী বা মানবাধিকার সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেওয়া হয় না। সরাসরি তাকে পাঠানো হয় নারকো অ্যানালিসিস টেস্টের জন্য। সেখানে তাকে প্রশ্ন করা হয়, আপনি গত বছর বাংলাদেশে গিয়েছিলেন; সেখানেই কি মজিদের সঙ্গে আপনার পরিচয়; ইত্যাদি ইত্যাদি।
নির্মাতা বাপ্পাদিত্য এখানে হয়তো দেখাতে চেয়েছেন, সন্ত্রাস, বোমা হামলা তথা জঙ্গিবাদ নিয়ে চলচ্চিত্র ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক মাধ্যমগুলোর উপস্থাপন কেমন। এই উপস্থাপনে খুবই পরিচিত একটি বিষয় চোখে পড়ে--জঙ্গি মানেই যেনো মুসলমান। নাইন ইলেভেনের পর থেকে পশ্চিমের প্রায় সব চলচ্চিত্রে জঙ্গির ইমেজ মানেই মুসলমান। তবে গত দুই দশকে তা ইউরোপ-আমেরিকা ছেড়ে ভারতের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি বলিউড, কলিউড, টলিউড এমনকি টালিগঞ্জের চলচ্চিত্রেও ঢুকে পড়েছে। ভারতের অন্যসব ভাষার ইন্ডাস্ট্রির চলচ্চিত্রেও বেছে বেছে ধ্বংসাত্মক, জঙ্গি, হিংস্র, সন্ত্রাসী, খুনি তথা ‘খারাপ’ চরিত্রগুলো এখন মুসলমানের। যেনো মুসলমানের বাইরে আর কোনো ‘খারাপ’ মানুষ নেই! হঠাৎ করে ভারতীয় সেই চলচ্চিত্রগুলো দেখে যে কারোরই মনে হতে পারে, যেনো কিছু মুসলমান তাদের ব্যক্তিগত আক্রোশ মেটাতে বা স্বার্থসিদ্ধির জন্য জঙ্গিবাদে জড়িত। অথচ পুরো রাজনৈতিক বাস্তবতাটা এতো সরল নয়। জঙ্গিবাদের যে বিশাল রাজনীতি আছে, তার কোনো ইঙ্গিতই থাকে না বেশিরভাগ চলচ্চিত্রে।
পুলিশ মিস মিত্রকে প্রশ্ন করছেন, ‘আপনি গত বছর বাংলাদেশে গেছিলেন?’ এই প্রশ্নের উদ্দেশ্য খুবই পরিষ্কার। ৯৫ শতাংশ মুসলমানের দেশ বাংলাদেশ। তাই বাংলাদেশে জঙ্গি থাকবে না, এ কি হতে পারে! অথচ পাশেই মিয়ানমার বা নেপাল, তাদের নাম কিন্তু নেওয়া হয়নি। কারণ সেখানে মুসলমান প্রাধান্য নেই। আর এই রকম একটি বাস্তবতা নির্মাণে গণমাধ্যমও চলে হাতে হাত মিলিয়ে। কোনো রকম অনুসন্ধান ছাড়াই পুলিশ বা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দেওয়া বিবৃতি প্রকাশ করতে পারলেই যেনো তাদের রেহাই মেলে। ফলে জঙ্গিবাদের মতো এতো বিধ্বংসী ও ভয়াবহ প্রসঙ্গ নিয়ে মানুষের কোনো সঠিক ধারণাই তৈরি হয় না।
এই আলোচনার শুরুতেই বলা হয়েছে, বাপ্পাদিত্যের হাউসফুল-এ জঙ্গিবাদের উপস্থাপন দুই ধাপে হয়েছে। প্রথম ধাপ চলচ্চিত্রের মধ্যকার চলচ্চিত্র অর্থাৎ কাঁটাতার-এ জঙ্গিবাদের উপস্থাপন নিয়ে কথা হলো। এবার হাউসফুল-এ বাপ্পাদিত্য যে বাস্তবতা নির্মাণ করেছেন সেটা নিয়ে কথা বলা জরুরি।
অনেকেই বলে, হাউসফুল বাপ্পাদিত্যের আত্মজীবনীমূলক চলচ্চিত্র। কিন্তু চলচ্চিত্রটি ভালোভাবে খেয়াল করলে এই ধারণা ফিকে হয়ে যায়। চলচ্চিত্রের প্রধান চরিত্র নিখিল আর নির্মাতা বাপ্পাদিত্যর বোঝাপড়া অনেকটাই ভিন্ন। হাউসফুল-এ মিস মিত্রের মতো নিখিলও একদিন একটি উড়ো ফোন পান। অচেনা এক লোক দেখা করতে চান নিখিলের সঙ্গে। সাক্ষাতে তার নাম জানা যায় সুভাষ মণ্ডল। সুভাষ মণ্ডল হিন্দু নাকি মুসলমান তা বোঝার কোনো উপায়ই থাকে না। নিখিলকে তার পরের চলচ্চিত্রটির জন্য টাকার অফার করেন সুভাষ। বিনিময়ে সুভাষের বান্ধবী নন্দিতাকে নায়িকা বানাতে হবে। নন্দিতাকে নিয়ে নিখিলের চলচ্চিত্রের শুটিং শুরু হয়। শুটিং-এর মধ্যে একদিন সুভাষ আসে। সে নন্দিতাকে ডাকে সুজাতা নাম ধরে।
হাউসফুল-এর এক ঘণ্টা ২৫ মিনিটে আরো একবার টেলিভিশনে সংবাদ সম্প্রচারিত হতে দেখা যায়। এবার ‘জঙ্গি’ হামলার আগেই। সংবাদে বলা হয়, ‘জঙ্গি হামলাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে শহরজুড়ে ... কিছুক্ষণ আগেই পুলিশের কাছে একটি উড়ো ফোন আসে। তাতে বলা হয়, শহরের বেশকিছু এলাকায় নাশকতা ঘটানো হবে। ফোনটি কোথা থেকে এসেছে খতিয়ে দেখছে পুলিশ।’ এই রকম একটি ভয়াবহ সংবাদ প্রকাশের পর জনগণের মধ্যে হইচই, অস্থিরতা শুরু হওয়াই স্বাভাবিক। এতে করে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। জীবনযাত্রা হয়ে পড়ে দুর্বিষহ। কিন্তু গণমাধ্যম কোনো রকম বাছবিচার না করেই এমন একটি সংবাদ ধুমধাম প্রকাশ করে ফেলে। তাতে তাদের টি আর পি’ও বাড়ে নিঃসন্দেহে।
হাউসফুল-এ সংবাদ সম্প্রচারের একটি দৃশ্য
বাস্তবেও গণমাধ্যমের ভূমিকা খুব বেশি আলাদা নয়।
... এখানে গণমাধ্যমে জঙ্গিদের নির্মাণ ভয়ঙ্করভাবে নেতিবাচক, আংশিক ও প্রচারণায় ভরপুর। প্রচারণার বাইরে গণমাধ্যমের দিক থেকে অনুসন্ধানের কোনো আগ্রহ এ পর্যন্ত দেখা যায়নি। পুলিশ ও র্যাব যে ন্যারেটিভ সরবরাহ করে, তার বাইরে তারা খুব একটা যায় না। যখন কোনো পরিবার দাবি করে, কেউ হারিয়ে গেছে, পাওয়া যাচ্ছে না, তখন একটা ফলো-আপ রিপোর্ট হয়। তার পর ওই ঘটনা হারিয়ে যায়।২
চলচ্চিত্রের এক ঘণ্টা ৪২ মিনিটের দিকে দেখা যায়, জঙ্গি হামলার পর সুভাষ মণ্ডল ধরা পড়েছে। টেলিভিশনে সংবাদটি দেখার পরই নিখিল দ্রুত নন্দিতার কাছে ছুটে যান। নন্দিতার কাছে জানতে পারেন, যোগাযোগের জন্য সুভাষ তার পরিচয় দিয়ে তোলা সিমকার্ড ব্যবহার করতো, সেই সিমকার্ড দিয়ে সে বিদেশেও ফোন করতো। নন্দিতার এই বক্তব্য থেকে কিছুটা হলেও বোঝা যায়, সুভাষের দেশের বাইরে যোগাযোগ ছিলো। অর্থাৎ তিনি হয়তো এই হামলার পিছনের আসল ব্যক্তি নন। অর্থাৎ পুরো ঘটনার সঙ্গে একটি আন্তর্জাতিক ব্যাপার সক্রিয় আছে।
বাপ্পাদিত্য যে বাস্তবতা নির্মাণ করলেন, সেখানে ‘জঙ্গিবাদ’ ধারণাটি কোনোভাবেই বিশেষ কোনো দেশ, অঞ্চল বা জাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটা আর পাঁচটা মারামারি বা দাঙ্গা-হাঙ্গামার মতো সাধারণ ঘটনাও নয়। জঙ্গিবাদীদের কোনো ধর্ম থাকে না, নাম-পরিচয় থাকে না। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি, সাম্রাজ্যবাদ এবং বাণিজ্যের মতো কঠিন কঠিন কিছু অনুষঙ্গ যুক্ত থাকে। এই ধারণার আড়ালে লুকিয়ে থাকে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো তথা কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে দুর্বল রাষ্ট্র ও তার সম্পদকে গিলে ফেলার গল্প। লুকিয়ে থাকে ভয়াবহ শোষণ ও নিপীড়নের গল্প।
অন্যদিকে সেই শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদকে বৈধতা দেওয়ার জন্য নির্মিত হয় নানাবিধ বাস্তবতা। তারা ধারণ করে ধর্মের ছদ্মবেশ, জাতি-বর্ণের ছদ্মবেশ। আবার কখনো কখনো তারা ‘অশিক্ষিত’, ‘অরক্ষিত’ জাতিগোষ্ঠীকে শিক্ষা দিতে, নিরাপত্তা দেওয়ার নাম করে আসে। দেশে দেশে তাদের মিলিটারি ক্যাম্প তৈরি হয়, কাউন্টার টেরোরিজম স্কোয়াড তৈরি হয়। আর চলতে থাকে জঙ্গি জঙ্গি খেলা। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ প্রসঙ্গটি ক্রমশই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। কারণ ইদানীং ‘জঙ্গি’ হামলা বলে বেশকিছু হামলার নাম শোনা যাচ্ছে। পুলিশ ফাঁড়িতে গিয়ে হামলা করা হচ্ছে এবং রব উঠছে, এগুলো বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশবিশেষ হয়তো। এর মধ্যেই ২০১৬ খ্রিস্টাব্দের ১ জুলাই গুলশানে হলি আর্টিজান হামলার মতো একটি ঘটনা ঘটে যায়।
হলি আর্টিজানের ঘটনা ‘সি এন এন’-এ লাইভ হচ্ছে, অথচ বাংলাদেশের টেলিভিশনগুলোতে সম্পূর্ণ ব্ল্যাক আউট। এ ঘটনা তুমি কীভাবে ব্যাখ্যা করবে? এটার উদ্দেশ্য কী ছিলো? এই যে হিউজ কাভারেজ। এর উদ্দেশ্য কী? সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক অর্থাৎ ইসলামি সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের সঙ্গে বাংলাদেশকে যুক্ত করা। এভাবে যুক্ত করলে কার লাভ বেশি? আমাদের মিলিটারির বেশি। মিলিটারির একটা বড়ো অংশের লাভ বেশি। আমাদের প্রতিবেশীদের বেশি। বাইরের কারো স্বার্থ বেশি। বৈশ্বিক সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক বাংলাদেশকে যুক্ত করার ক্ষেত্রে স্বার্থটা কোথায় বেশি? আমাদের দক্ষিণ দিকে, সাগরে--সাগরের সম্পদ দখল, বন্দর করার জন্য, ঘাঁটি করার জন্য। এখানে আই এস আছে, প্রমাণ করতে পারলে, এগুলো করার ন্যায্যতা তারা প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে।৩
‘রিমেইক ছাড়া বাংলা ছবি চলে না দাদা’
হাউসফুল-এ নিখিলের একের পর এক চলচ্চিত্র বাণিজ্যিকভাবে ব্যর্থ হতে থাকে। কোনো চলচ্চিত্র থেকেই পয়সা উঠে আসে না, গাড়ির ই এম আই (গাড়ি ঋণের কিস্তি) পরিশোধ করতে পারেন না, বাড়ি মর্টগেজ রাখতে হয়। নির্মাতা হিসেবে বিশেষ কোনো নাম-ডাকও তখন তার হয়নি। নিখিলের সহকারীর ভাষায়--‘ওসব সন্ত্রাস, রাজনীতি, দারিদ্র্য কেউ পয়সা দিয়ে টিকিট কেটে দেখতে চায় না। দর্শক মিষ্টি প্রেমের গল্প চায়।’ অন্যদিকে ঠিক সেই সময় টালিগঞ্জের অন্যান্য নির্মাতারা তামিল-তেলেগু চলচ্চিত্রের হুবহু রিমেইক বা নকল করে, হালকা প্রেমের গল্পের ওপর ভর করে, ধুমধাম মারামারি দেখিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করে চলে। বেশিরভাগ চলচ্চিত্রেই সমাজ বা রাষ্ট্রের কোনো সমস্যা-সঙ্কটের ইঙ্গিত থাকে না। মানুষকে ‘শিক্ষিত’ বা ‘রুচিশীল’ করার ন্যূনতম প্রচেষ্টাও থাকে না। চলচ্চিত্র জীবনের অংশ হয় না, থাকে শুধুই বিনোদন। তবে সেইসব চলচ্চিত্র বাণিজ্যিক সফলতাও পায়। নির্মাতা-প্রযোজকরাও হয় ফুলে-ফেঁপে কলাগাছ।
বাস্তবেও বলতে গেলে চলচ্চিত্র দেখার মানুষ তো কমেনি, বরং বহুগুণে বেড়েছে। কারণ চলচ্চিত্র শুধু একটি বিনোদন মাধ্যম নয়, মানুষের জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশও। এবং এর প্রভাব মানুষের জীবনে ব্যাখ্যাতীত। তবে জনমানুষ এবং জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের মনস্তত্ব ও সম্পর্কটা বেশ জটিল। এ সম্পর্কের মাঝখানে চলে আসে দর্শক-মানস, দর্শক-চরিত্র, তার রুচি, সংস্কৃতি, স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা ও অবদমনের প্রসঙ্গ।
“সত্তরের দশকে মুম্বাইয়ে ‘নব তরঙ্গ’-এর ঢেউ বলিউডের বাণিজ্যিক প্রাতিষ্ঠানিকতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমেছিলো, এবং শেষ অবধি পরাজয় অথবা নির্লজ্জ আত্মসমর্পণ ছাড়া তাদের সামনে কোনও বিকল্প ছিলো না।”৪ কয়েকজন নির্মাতার হাত ধরে ভারতবর্ষে বুদ্ধিদীপ্ত ‘আর্টফিল্ম’ ঘরানার চলচ্চিত্রগুলো ব্যবসা করতে শুরু করে। কিন্তু সে পথ খুব বেশি প্রশস্ত হওয়ার সুযোগ পায়নি। হাজারো রকমের বিজ্ঞাপন, চকমকে পোশাক, বিশাল বিশাল সেট, বড়ো বড়ো স্টার আর কোনোরকমে সেন্সর পার করা রগরগে যৌনতার সঙ্গে ব্যবসার লড়াইয়ে ‘আর্টফিল্ম’ এক রকম মুখ থুবড়েই পড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় অবাধে ভারতীয় সংস্কৃতির মধ্যে ওয়েস্টার্ন কালচারের আমদানি। “বলিউড তাই ‘ডিস্কো’-র সঙ্গে পাঞ্জাবী ‘ভাঙড়া’ কিংবা গুজরাতী ‘কাঠি-নৃত্য’ মিশিয়ে দুর্দান্ত কক্টেল বানিয়ে ফেলে অনবদ্য নিপুণতায়। ফাস্ট ফরওয়ার্ড’-এর সঙ্গেই পাল্লা দিয়ে সুপার-হিট হয় ‘ড্যান্স-ড্যান্স’।”৫
পশ্চিমি পণ্য-সংস্কৃতি তার সমস্ত ‘অস্ত্রসম্ভার’ সাজিয়ে ভারতাভিযানে বেরিয়ে পড়ে। শুরু হয় প্রযুক্তি বিপ্লব, আরো নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে ‘টেলি-বিপ্লব’। উপগ্রহের মাধ্যমে আরো বেশি বেশি অঞ্চল দূরদর্শনের সম্প্রচারের আওতায় আসে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে পানি না পৌঁছালেও পৌঁছে যায় টেলিভিশন। আর সেই টেলিভিশনে ভর করেই শহর থেকে গ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে আধুনিক বিপণন-বিজ্ঞাপন শিল্প। টেলিভিশন ভেসে যায় সাবান, ক্রিম, শ্যাম্পু, সুগন্ধি তেল, আইসক্রিম, চকলেট, কোকা কোলা, মোটর গাড়ি, ফ্রিজ, টেলিভিশন, ভি সি আর, অডিও সেটের বিজ্ঞাপনে। এর মধ্য দিয়ে কিন্তু চলচ্চিত্র আসতে থাকে মানুষের হাতের নাগালে। আর এক শ্রেণির দর্শক প্রেক্ষাগৃহ ছেড়ে ঘরে বসেই টেলিভিশন, ভি সি আর-এ চলচ্চিত্র দেখতে শুরু করে। তবে চলচ্চিত্র থেমে থাকেনি। ১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দে হাম আপকে হ্যায় কৌন যখন লন্ডনের প্রেক্ষাগৃহে বছর-ভর রমরমিয়ে চললো, তারপর থেকেই বলিউড স্বপ্ন দেখতে শুরু করে ‘ওয়ার্ল্ড-লিডার’ হওয়ার। ২০০৮-এ এসেও স্বপ্ন অনেকটা দূরে ছিলো। তবে আজ ২০১৯-এ এসে বলিউড পরিণত হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে।৬
একটা সময় টালিগঞ্জেরও ভালো অবস্থা ছিলো। বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্র ব্যবসা করেছে দারুণ। মানুষ ভিড় করে প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে চলচ্চিত্র দেখেছে। বিনোদন মাধ্যম বলতে মানুষের সামনে তখন খুব বেশি সুযোগও ছিলো না। বছরে ৩০-৩৫টার মতো চলচ্চিত্র মুক্তি পেতো, আর মানুষের মুখে মুখে ফিরতো সেসব চলচ্চিত্রের গান ও সংলাপ। বাংলা ইন্ডাস্ট্রিকে রোল মডেল করে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছে ভারতের অন্যান্য আঞ্চলিক ইন্ডাস্ট্রিগুলো।৭ আর সেসময় নায়কের সংজ্ঞাই যেনো ছিলো প্রসেনজিৎ, তাপস পালরা। তখন কাহিনি তৈরি হয়েছে ‘ভালো’র দলে থাকা নায়কদের হাতে ‘খারাপ’ ভিলেনদের পরাস্ত করানোর জন্য। দর্শক সেই ন্যারেটিভ পছন্দ করেছে। তবে এই ঘরানার বাইরেও একটি ঘরানা একটু একটু করে অঙ্কুরিত হচ্ছিলো। সেই ঘরানাকে লালন করে চলচ্চিত্র নির্মাণ করে চলেছিলেন বুদ্ধদেব-গৌতম-অপর্ণা কিংবা ঋতুপর্ণের মতো নির্মাতারা। সময়ের পালাবদলে অঞ্জন-কৌশিকদের হাত ধরে প্রবাহিত হয়েছে এই ধারা, বেশিরভাগ মানুষের অলক্ষ্যে। কখনো মূলধারাকে চ্যালেঞ্জ না করে একটু একটু করে বড়ো হয়েছে এই ধারা। মূলধারার উদ্বৃত্ত টাকা বেশিরভাগ সময় এই চলচ্চিত্রগুলোর চালিকাশক্তি হয়েছে।৮ ‘ভালো-খারাপ’-এর সমীকরণটা অতো সহজ এখানে নয়। ‘নায়ক’ আর ‘ভিলেন’-এর এতো সহজ সংজ্ঞায়নও এখানে মেলে না তাই। সময়ের সঙ্গে মানুষ এই ধারাকে বুঝতে শুরু করে। আর মানুষ যতো বুঝতে থাকে, এই ধারার স্রোত ততোই বাড়তে থাকে। তবে এই ট্রানজেকশন অনেকেই বোঝেনি। যার ফলে বেশিরভাগ নির্মাতা ও প্রযোজকরাই মার-দাঙ্গা-নায়ক-ভিলেন গণ্ডির মধ্যেই আবদ্ধ থেকেছে। অন্যদিকে প্রসেনজিৎ-ঋতুপর্ণাদের মতো কিছু মানুষ হয়েছে পরিবর্তনের অংশ। আবার ঋত্বিক চক্রবর্তী, ঋদ্ধি বা রাইমা সেন বা ইশা সাহাদের মতো নতুন প্রজন্মের অভিনয়শিল্পী এবং অতনু-সৃজিতের মতো নির্মাতাও বেরিয়ে এসেছে। আর ধীরে ধীরে মূলধারার আলোচনায় পটপরিবর্তন হয়ে গেছে, যাচ্ছে। পুরো ইন্ডাস্ট্রিই যেনো শিফ্ট হয়ে গেছে। তাই দর্শকও ২০১৯-এ এসে জিৎ কিংবা দেবের নয়, অপেক্ষা করে সৃজিৎ কিংবা কৌশিকের চলচ্চিত্রের।
অন্যদিকে মূলধারার বাংলা ইন্ডাস্ট্রিই দুর্বল হয়ে পড়েছে। শূন্য দশকের কিছুকাল পর থেকেই তামিল-তেলেগু-মালায়লাম ইন্ডাস্ট্রিগুলোতে শিল্প ও বাণিজ্য উভয় দিক থেকেই যখন ভালো ভালো চলচ্চিত্র নির্মাণ করে সামনের দিকে এগিয়েছে; ইন্ডাস্ট্রি আরো বড়ো হয়েছে, বাংলায় তখন একের পর এক চলচ্চিত্র বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রি থেকে তুলে এনে রিমেইক করা হয়েছে; কখনো কখনো নকল করা হয়েছে। দুর্দশার এ সময়ে এসেও অনেকের মাথায় চলচ্চিত্রের এই ট্রানজেকশনটা ঢোকেনি। তাই হাউসফুল-এর ১৮ মিনিটে এক নির্মাতাকে বলতে শোনা যায়, ‘প্রোডিউসার কোত্থেকে এক আর্টফিল্মের ক্যামেরাম্যানকে ধরে এনেছে। সারাদিন শুধু আলো ঠিক করে--রাতের আলো, দিনের আলো। আরে বাবা, দর্শক হিরোইনকে না দেখে যদি ব্যাকগ্রাউন্ড আর আলো দেখে, তাহলে ছবি করে কী লাভ!’ শুধু ‘হিরোইন’ দেখানো চলচ্চিত্রও মানুষ একটা সীমা পর্যন্ত দেখেছে। তবে এখন সবার হাতে হাতে স্মার্টফোন, কম্পিউটার, ইন্টারনেট। যে কেউ চাইলেই যেকোনো দেশের, যেকোনো নির্মাতার ভালো ভালো চলচ্চিত্র খুব সহজেই দেখে ফেলতে পারে। ফলে নকল, কমেডির নামে ভাঁড়ামো আর কিছু ফরমুলার ওপর দাঁড়িয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র মানুষকে আর গেলানো যায় না। তাদের খিদে বদলাচ্ছে এবং খিদে অনুযায়ী ‘খাবার’ সার্ভ করতে হবে। তা না হওয়ার ফলে প্রেক্ষাগৃহে দর্শক কমছে। প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে সিঙ্গল স্ক্রিন প্রেক্ষাগৃহগুলো ভেঙে তৈরি হচ্ছে সিনেপ্লেক্স, মাল্টিপ্লেক্স। আর ‘বড় প্রযোজক সংস্থা, বড় ব্যানার, বড় পুঁজির প্রাতিষ্ঠানিকতার বিরুদ্ধে, মাল্টিপ্লেক্সে-এর এক ছাদের তলায় চারটি বা ছ-টি হলের প্রদর্শন ব্যবস্থা, কম বাজেটে বুদ্ধিদীপ্ত ছবির অক্সিজেন।’৯ এর ফলে ৯০-এর দশকে ঘরের মধ্যে টেলিভিশন, ভি সি আর-এ চলচ্চিত্র দেখা দর্শক আবার প্রেক্ষাগৃহে ফিরছে। ইন্ডাস্ট্রিও ধীরে ধীরে প্রেক্ষাগৃহের তৃতীয় শ্রেণির দর্শকের জন্য চলচ্চিত্র নির্মাণ কম করছে। আর ‘আর্টফিল্ম’ ঘরানার চলচ্চিত্রের দিন আবার ফিরছে। নিখিলের সহকারীর--রিমেইক ছাড়া বাংলা ছবি চলে না দাদা--সেই বক্তব্য ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসে। নিখিল সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ-প্রাইভেসির মতো জটিল বিষয় নিয়ে নির্মিত কাঁটাতারও সমাদর পায়। মৃণাল বা মনি কাউলদের মতো নিখিলদের কদর ২০১৯-এ এসে আবার বাড়ে।
মাল্টিপ্লেক্স সংস্কৃতি বলিউডের তথাকথিত গণ-বিনোদনের চরিত্রটাই পাল্টে দিচ্ছে। ফ্রন্ট স্টলের একদা চোখের মণি, আত্মার ‘শাহেনশা’ অমিতাভ বচ্চনও তার ক্যারিয়ারে নতুন ইনিংসে, বদলে যাওয়া বলিউডের নতুন পিচে, নতুন করে স্টান্স নিচ্ছেন।১০ এই বক্তব্য আজকে শুধু বলিউড কিংবা অমিতাভের নয়, টালিগঞ্জে এসে প্রসেনজিৎ কিংবা যীশু সেনগুপ্তদেরও।
বৃক্ষ তোমার নাম কী, ফলে পরিচয় ...
হাউসফুল-এর ৩৫ মিনিটে নিখিল তার বাবাকে বলছেন, ‘বাইরে একটা যুদ্ধ চলছে বাবা। সবার হাতে পিস্তল-রিভলবার--আমার হাত ফাঁকা, কিচ্ছু নেই।’ পৃথিবীর বিরুদ্ধে যেনো আলাদা এক যুদ্ধই ঘোষণা করেছিলেন নিখিল। কীসের যুদ্ধ সেটা পরিষ্কার নয়। কখনো পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, আবার কখনো প্রথা আর কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে। কখনো তো নিজের বিরুদ্ধেই তার যুদ্ধ। ঢাল-তলোয়ার বা বারুদ-কামান নেই। কিন্তু জিততে হবেই। ভেবেছিলেন চলচ্চিত্রকে অস্ত্র বানিয়ে যুদ্ধে জিতে যাবেন। বুকে সাহস আর মনের জোরের অভাব ছিলো না কোনোদিন। যার কারণে একের পর এক ‘ব্যর্থতার’ পরও দমে যাননি। নতুন শক্তিতে আবার জ্বলে উঠেছেন। শুধু হাউসফুল-এর নিখিল না, কথা হচ্ছে নির্মাতা বাপ্পাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়েও। ২০১৩-তে নায়িকা সংবাদও যখন ব্যবসায়িক সাফল্য পেলো না, একটু লম্বা ছুটি নিয়ে তিনি নতুন উদ্যমে আবার ফিরে আসলেন। নিজেই প্রোডাকশন হাউস খুলে বসলেন। শুরু হলো সোহরা ব্রিজ। শুটিং যখন শেষের দিকে বাপ্পাদিত্য তখন বেজায় অসুস্থ। জেদি বাপ্পাদিত্যকে জোর করেই হাসপাতালে ভর্তি করানো হলো। অবস্থা ভালো ছিলো না। মারাত্মক নিউমোনিয়া। কতো কতো টেস্ট, ইনজেকশন আর ওষুধপত্র দিয়েও তাকে ফেরানো গেলো না। তিনি চলে গেলেন ৭ নভেম্বর ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে, বয়স তখন মাত্র ৪৫। শেষ চলচ্চিত্র সোহরা ব্রিজ তখন পোস্ট প্রোডাকশনে।
বাপ্পাদিত্যকে বোঝার জন্য হাউসফুল একবার মনোযাগ দিয়ে দেখা যাক। এখানে আলাদা এক অদ্ভুত জগতে বাস করেন চলচ্চিত্রনির্মাতা নিখিল। একের পর এক ব্যর্থতার কষ্ট তাকে স্পর্শ করে কিন্তু আঁকড়ে ধরতে পারে না। তিনি সবসময় চুপচাপ থাকেন, ভাবেন। অভাব তাকে জেঁকে বসে। নিজের মানুষগুলোর কাছেও যেনো অচেনা হয়ে যান ধীরে ধীরে। কেউ যেনো আর আপন থাকে না, সংসার ভেঙে যায়। চলচ্চিত্রের ২৫ মিনিটে তার স্ত্রী মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছে--এই দৃশ্য ক্যামেরায় কেমন দেখাবে সেই চিন্তায় মগ্ন নিখিল। ঠিক সেসময় নিখিলের টি-শার্টটায় চোখ পড়ে দর্শকের। টি-শার্টে একটি ডিরেক্টর চেয়ারের ছবি, যাতে লেখা আছে ‘গড’। মানে ঈশ্বরের সংসার যখন ভেঙে চুরমার হচ্ছে, তখনো তিনি সৃষ্টি সুখের উল্লাসে মত্ত। বাস্তবতার কাছে ঈশ্বরও যেনো বড়ো অসহায়!
অন্যদিকে বাপ্পাদিত্যের সংসারই হয়নি কখনো। মারা যাওয়ার সময় তিনি বাবা-মা-ভাই আর অনেকগুলো চরিত্র রেখে গেছেন। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ খুব বেশি পাননি। তাইতো হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে শেষ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার ইউনিটে সবাই মাতাল, ফ্যামিলি হবে কী করে!’১১ ৫ এপ্রিল ২০১৫ বাপ্পাদিত্য ফেইসবুকে হেমেন্দ্রনাথের একটা লেখা শেয়ার করেন। সেখানে একটি বাক্য ছিলো, ‘... শিল্পের মুখ্য উদ্দেশ্য--লোকশিক্ষা।’ চলচ্চিত্র যদি শিল্প (art) হয়, তাহলে বাপ্পাদিত্য মানুষকে যেনো শিক্ষিত করতে নেমেছিলেন। তিনি চমকে দিতে ভালোবাসতেন। এমন সব গল্প তিনি তুলে আনতেন, যা শুনে মানুষ আঁতকে ওঠে--এমন গল্পও হতে পারে! তার নির্মিত চরিত্র নিখিলের মতো অতোটা হতভাগা নিজে ছিলেন না বাপ্পাদিত্য। নিখিল যখন চলচ্চিত্র বানিয়ে পয়সা বা পুরস্কার কোনোটাই পাচ্ছেন না, কোনো পরিচয়ও তৈরি হচ্ছে না। তার আশপাশের লোকজন তখন সবাই নকল আর রিমেইক করে নাম-টাকা কামাই করছে। অন্যদিকে ১৯৯৯-এ সম্প্রদান থেকে যদি চিন্তা করা যায়--শিল্পান্তর, কাঁটাতার কিংবা কাল--বাপ্পাদিত্যের চলচ্চিত্রগুলো সেই অর্থে ব্যবসাই করতে পারেনি। কিন্তু একটা শ্রেণির মানুষ তার জাত চিনতে শুরু করে। সমালোচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে শুরু করেন বাপ্পাদিত্য। বিশেষ করে কাল দেখার পর মানুষ অবাক হয়ে ভাবতে শুরু করে, এমন ‘রিয়েলিটি’ও সম্ভব! শিল্পান্তর ও কাঁটাতার চলচ্চিত্রগুলোর মাধ্যমে দেশ-বিদেশ থেকে নানা পুরস্কার আসতে শুরু করে। তার একেকটি গল্প শৈল্পিক দৃষ্টি বিবেচনায় যেনো একেকটি মাইলফলক। কিন্তু সেই মাইলফলককে পয়সা কিংবা পুরস্কারের এককে বিচার করা সম্ভব না। মৌলিকতার দিক থেকে তার প্রত্যেকটি চলচ্চিত্র অনন্য। মাত্র ১০টি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন মানুষটি।
২০০৯-এ এসেও যে চলচ্চিত্রগুলো ব্যবসাসফল হয়--সাত পাকে বাাঁধা, চ্যালেঞ্জ, পরাণ যায় জ্বলিয়া রে--তার বেশিরভাগই বিভিন্ন জায়গা থেকে নকল করা। তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে সেই বছর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার আসে হাউসফুল-এর ঘরেই, যদিও ব্যবসার হাঁড়ি ফাঁকা। প্রখ্যাত নির্মাতা সৃজিত মুখার্জি একবার একটি সাক্ষাৎকারে বলেন, চলচ্চিত্র ‘হিট’-এর অনেক রকমের সংজ্ঞা হতে পারে। একটা হলো পারসেপশন হিট--প্রচুর মানুষ চলচ্চিত্র দেখছে, সেটা নিয়ে কথা হচ্ছে, জরুরি নয় যে পয়সাও উঠে আসছে। কিছু আবার ফিনান্সিয়াল হিট। আর কিছু চলচ্চিত্র আছে যেগুলো দুদিক থেকেই হিট।১২ এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বাপ্পাদিত্যের চলচ্চিত্রগুলো পয়সা তুলতে পারেনি, কিন্তু পারসেপশন হিট তো অবশ্যই।
২০১৯-এ এসে আজ যখন পুরো ইন্ডাস্ট্রিই একটা ট্রানজেকশনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের দৃষ্টিভঙ্গি যখন পাল্টে যাচ্ছে, তখন বাপ্পাদিত্যের চলচ্চিত্রগুলো যেনো আরো প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। মনে হয় বাপ্পাদিত্য যেনো অনেকদিন আগেই আজকের সময়টা দেখে ফেলেছিলেন। এই ধারণা আরো প্রকট হচ্ছে যে, আজ বাপ্পাদিত্য বেঁচে থাকলে তিনি সবদিক থেকেই ‘সফল’ হতেন।
নায়িকার চোখ দিয়ে দেখা
বাপ্পাদিত্যের একেকটি চলচ্চিত্র যেনো তার পুরো জীবন সফরের একেকটা মোড়। প্রত্যেকটি চলচ্চিত্রে থাকে সামনের পথের হদিস। তাই সবগুলো চলচ্চিত্রকে একত্রে করলে হয়তো একটা পুরো মানচিত্র পাওয়া সম্ভব বাপ্পাদিত্যের জীবন-দর্শনের। ঠিক যেমন হাউসফুল-এ ভালো করে মনোযোগ দিলে খুঁজে পাওয়া যায় নায়িকা সংবাদ-এর হদিস। নায়িকা সংবাদ-এ দর্শক দেখতে পায়, নায়িকা হতে গেলে একটি মেয়েকে কী কী ধরনের ধাপ পার করতে হয়, তার স্ট্রাগলটা কেমন; আবার নায়িকা হওয়ার পরে তার জীবন কেমন হয়, স্ট্রাগল কেমন হয়; আশপাশের জগৎ নিয়ে নায়িকার দৃষ্টিভঙ্গি, সাধারণ মানুষের নায়িকা সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হয়। শুধু পুঁজির স্বার্থকে নিজের লাভ মনে করে এক শ্রেণির নারী ‘নায়িকা’ হওয়ার দৌড়ে মত্ত থাকে, যদিও ফলাফলের খাতাটা কখনো খুলে দেখার সময়ই পায় না। আগ্রহী পাঠকের জন্য বলিউডেরও দুটো চলচ্চিত্রের কথা এখানে উল্লেখ করা যেতে পরে--ফ্যাশন ও হিরোইন।
হাউসফুল-এর ৫০ মিনিটের দিকে নিখিল তার পরের চলচ্চিত্রের নায়িকা নির্বাচনের অডিশন রাখেন। বেশ কয়েকজন নারী আসে অডিশন দিতে। তাদের সঙ্গে নিখিলের কথোপকথন শুনে দর্শক মোটামুটি আন্দাজ করতে পারেন, বাংলা চলচ্চিত্র নিয়ে নায়িকা তথা অভিনয়শিল্পীদের দৃষ্টিভঙ্গি। ৫২ মিনিটে একজন নারী আসেন অডিশনে। কথায় কথায় নিখিল প্রশ্ন করেন, চলচ্চিত্রে শরীর দেখাতে হলে তার কোনো সমস্যা আছে কি না? উত্তরে সেই নারী বলেন, ‘বাংলা ছবিতে শরীর বলতে তো শুধু খোলা পিঠ আর পা। এর বেশি আর কী দেখাবেন?’ এই সংলাপের মধ্য দিয়ে যেনো উঠে আসে বাংলা চলচ্চিত্র নিয়ে শিল্পী এবং সাধারণ মানুষ উভয়ের দৃষ্টিভঙ্গি। বাংলা চলচ্চিত্রে এখনো যেনো মানুষের শরীর একটি নিষিদ্ধ বস্তু, ‘অশ্লীল’। আর সমাজকে, সমাজের মানুষকে এই অশ্লীলতার হাত থেকে উদ্ধার করার মহান দায়িত্ব নিয়ে হাজির হয় সেন্সর বোর্ড। ‘নোংরামি’ দেখানো যাবে না, ‘ভায়োলেন্স’ দেখানো যাবে না, কোনো ব্যক্তি বা জাতিকে আঘাত করা যাবে না, ধর্ম নিয়ে, রাষ্ট্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে না--আরো কতো শত বায়না সেন্সর বোর্ডের! অথচ একুশ শতকের বিশ্বে মানুষ চাইলেই যা কিছু দেখতে পারে, জানতে পারে। এমনকি শিশুদের ভিডিও গেইমও সেক্স কিংবা ভায়োলেন্সের বাইরে নয়। অথচ চলচ্চিত্রের মতো এমন পরিণত মাধ্যমকেও--যে মাধ্যমকে ‘লার্জার দ্যান লাইফ’, ‘ক্লোজ টু দ্য রিয়েলিটি’ বলা হয়--জীবনের কাছাকাছি পৌঁছানোর আগেই জটিল শিকলে বেঁধে রাখা হয়। চলচ্চিত্র যদি একটি যোগাযোগ মাধ্যম হয়, তাহলে সে যোগাযোগের স্বাধীনতার কথা চিন্তা করলে সেন্সর বোর্ডের অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে পড়ে। বাইরের দেশে তথা হলিউড বা অন্যান্য বড়ো ইন্ডাস্ট্রিগুলোতে এই স্বাধীনতা অনেক বেশি।
হাউসফুল-এ অডিশনের একটি দৃশ্য
৫৩ মিনিটের দিকে দুটো মেগা সিরিয়ালে অভিনয় করা আরেক নারী আসেন অডিশনে। একই সঙ্গে তিনি টেলিফিল্ম করেন আবার একটি নাচের রিয়েলিটি শো’তে বিচারক হিসেবে কাজও করেন। নিখিল যখন তাকে প্রশ্ন করেন, আপনি সিনেমার জন্য সময় দিতে পারবেন? উত্তরে তিনি বলেন, ‘আই উইল ম্যানেজ। অসুবিধা হবে না বলেই মনে হয়।’ যেনো চলচ্চিত্রে অভিনয় করাটা নেহাতই অপশনাল একটি কাজ। অথচ চলচ্চিত্র নিজেই একটা ধর্ম, এ ধর্ম পালন করতে গেলে দিনের পর দিন সাধনা করতে হয়, সময় নিয়ে চলচ্চিত্রকে বুঝতে হয়, চরিত্রকে বুঝতে হয়। তারপর অভিনয়শিল্পীর ভিতর থেকে চরিত্র নিজেই কথা বলে, শুধু অভিনয় করলে চলে না। আর তার জন্য সময় দিতে হয়, ভাবতে হয়, প্রস্তুতি নিতে হয়। সেটা কালক্ষেপণ নয়, পেশাদারিত্ব। বাংলাদেশের প্রখ্যাত অভিনয়শিল্পী রোকেয়া প্রাচী এই পেশাদারিত্বের ব্যাপারটি বোঝান এভাবে,
চরিত্রের সঙ্গে সম্পর্কের একটা প্রয়োজন রয়েছে। চরিত্রের সঙ্গে আমার সম্পর্ক হবে, চেনাপরিচয় হবে, দেখা হবে। আমরা পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে গল্প করবো; অনেকটা বন্ধুত্বের মতো চা-কফি খাওয়া হবে, হাত ধরাধরি হবে, মনের মধ্যে শিহরণ হবে, প্রেম হবে, ভালোবাসা হবে। চরিত্রটা আমার মাথার মধ্যে সারাক্ষণ ব্যাঙ-ব্যাঙ করবে; আমাকে বিরক্ত করবে, আমার সঙ্গে থাকবে; তবেই চরিত্রটা আমার হবে। তারপরই আপনি আমার মধ্যে চরিত্রটা দেখতে পাবেন।১৩
আর সে কারণেই হয়তো তিনি ২০ বছরের ক্যারিয়ারে ২০টা চলচ্চিত্রও করেননি, যেখানে অনেকের হয়ে গেছে দুশোটা।
নিখিল বেশ কয়েকটা ‘অন্তরঙ্গ’ দৃশ্যের কথা উল্লেখ করলে অডিশন দিতে আসা ওই নারী অত্যন্ত চটে যান এবং বলেন, বাংলার দর্শক এগুলো পছন্দ করে না। তিনি নিজেও পরিবারের সবাইকে নিয়ে প্রেক্ষাগৃহে চলচ্চিত্র দেখেন। তখন নিখিল প্রশ্ন করেন, স্বামীর সঙ্গে আলাদা করে কোনো চলচ্চিত্র দেখেন কি না। এই প্রশ্নে তিনি আরো খেপে যান এবং নিখিলকে ধমকাতে ধমকাতে বেরিয়ে যান। চলচ্চিত্রকে বাস্তবের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার জন্য নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নানা রকম দৃশ্যের অবতারণা করতেই হয়। বড়ো কথা হলো, কেউ যদি বিশেষ কোনোধরনের চলচ্চিত্র দেখতে না চায়, দেখবে না। দর্শককে কেউ বেঁধে তো রাখে না। আর দর্শক ক্রমাগত না দেখতে থাকলে সে চলচ্চিত্র এমনিতেই চলবে না। সেই ধাঁচের চলচ্চিত্র তখন এমনিতেই নির্মাণ হওয়া বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু ‘বাস্তবসম্মত’ এই ধরনের চলচ্চিত্রের চাহিদা বাড়ছেই।
এরপর ৫৬ মিনিটে আসেন তৃতীয় জন, নাম পিয়ালি। তার আবার বাংলায় একটু গণ্ডগোল। নিখিলের আগে নির্মিত চলচ্চিত্রগুলো সম্পর্কে তার কোনো ধারণাও নেই। চিত্রনাট্য, কাহিনি বা চরিত্রের গভীরতা নিয়েও তার মধ্যে কোনো আগ্রহ দেখা যায় না; আগ্রহ দেখা যায় শুধু চরিত্রটা নায়িকার কি না তা নিয়ে। পিয়ালি কিছুদিন আগেই ব্রেস্ট ইমপ্লান্ট করিয়েছেন। অভিনয়ের জন্য কী প্রস্তুতি নিতে হবে সে ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন তার নেই, তবে নাকটা ঠিক আছে কি না সেটা নিয়ে তার দুশ্চিন্তা। এবার নাকে প্লাস্টিক সার্জারি করাবেন বলেও জানান। অথচ চলচ্চিত্র হচ্ছে একটি ডিরের্ক্টস মিডিয়াম। এখানে নির্মাতাই সর্বেসর্বা। কোন চরিত্রকে কেমন দেখাবে, সেটা তিনিই ঠিক করবেন। এই সাধারণ জ্ঞানটুকুরও দেখা মেলে না পিয়ালির মধ্যে। বাস্তবেও এই দৃষ্টিভঙ্গি হরহামেশাই চোখে পড়ে। বেশিরভাগের চিন্তাই যেনো থাকে চলচ্চিত্রে কাজ করা মানে গ্ল্যামারাস হওয়া। অভিনয়শিল্পী রোকেয়া প্রাচী এ বিষয়ে তার অভিজ্ঞতার কথা বলেন এভাবে--
পরিচালক আমাকে বললেন, এই চরিত্রে আপনি লিপস্টিক দিতে পারবেন না। কিন্তু আমি ধরে নিলাম, না আমাকে তো লিপস্টিক না দিলে সুন্দর লাগবে না, আমাকে তো গ্ল্যামারাস লাগবে না। ... এটা হচ্ছে আমার অভিনয়শিল্পী হিসেবে যেমন অসততা, তেমনই পেশাদারিত্বেও অসততা।১৪
শেষের কথা
আর পাঁচটা বাংলা চলচ্চিত্রের মতো সাদাসিধে ন্যারেটিভ হাউসফুল-এ অনুপস্থিত। দুয়েকজন ছাড়া তথাকথিত ‘স্টার’ তকমা এখানে অনুপস্থিত; হাজির ভিন্ন রকমের ন্যারেটিভ। এখানে গল্পের যেমন কোনো নির্ধারিত ধারাবাহিকতা নেই, তেমনই একটি নির্দিষ্ট প্লটের মধ্যে আটকেও থাকে না। একেকবার একেক গল্পে সাবলীলভাবে লাফ দেয় হাউসফুল। এটি একই সঙ্গে প্রেমের, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের এবং একজন নির্মাতার টিকে থাকার লড়াইয়ের চলচ্চিত্র। একেক সময় মনে হয় চলচ্চিত্র জগতের পিছনের গল্প নিয়ে চলচ্চিত্র। যেখানে হাজির লোকচক্ষুর আড়ালে চলতে থাকা রাষ্ট্র-সমাজের নানাবিধ সঙ্কট, যে সঙ্কট বিশেষ কোনো দেশ বা জাতির নয়--সামগ্রিক, সবার। আগেও আলোচনা হয়েছে, এই চলচ্চিত্রের মধ্যে চলতে থাকে আরেকটি চলচ্চিত্র। তবে এখানে চলচ্চিত্র আর বাস্তবকে আলাদা করা কঠিন। চলচ্চিত্র নাটকীয়তা আর বাস্তবের রূঢ়তা সব যেনো মিলেমিশে একাকার। সময় যতো এগোয় এই মিশ্রণ আরো ঘন হতে থাকে, সঙ্কট হতে থাকে আরো প্রবল। নির্মাতা বাপ্পাদিত্য যেনো এই একটি চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়েই তার মনের ভিতর জমে থাকা সব কথা বলে দিতে চেয়েছেন। আলো ফেলতে চেয়েছেন সমাজ-সংসারের সব অসঙ্গতির ওপর। চেয়েছেন সবার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিতে। তার কাছে একেকটা চলচ্চিত্র যেনো একেকটা মাইলফলক। পরবর্তী সময়ে বাপ্পাদিত্যের মধ্যে সেই মাইলফলককে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা লক্ষ করা যায়। এ যেনো নিজের সঙ্গে নিজেরই লড়াই, প্রতিযোগিতা।
লেখক : আলি আহমেদ নিশান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
nissan.mcj26@gmail.com
https://www.facebook.com/profile.php?id=100007251015129
তথ্যসূত্র
১. খান, কলিম (২০০০ : ২৩-২৬); ফ্রম এন্লাটেন্মেন্ট টু ইমোশনাল বন্ডেজ : জ্যোতি থেকে মমতায়; হাওয়া ঊনপঞ্চাশ প্রকাশনী, কলকাতা।
২. মামুন, আ-আল (২০১৯ : ২৬); রাষ্ট্র গণমাধ্যম ও জঙ্গিবাদ; ম্যাজিক লণ্ঠন প্রকাশন, রাজশাহী।
৩. প্রাগুক্ত; মামুন (২০১৯ : ২১)।
৪. চক্রবর্তী, শান্তনু (২০০৮ : ৩৫); ‘জনপ্রিয় চলচ্চিত্র-চর্চা’; বলিউডের জন-গণ-মন, একটি সাংস্কৃতিক পাঠ; উর্বী প্রকাশন, কলকাতা।
৫. প্রাগুক্ত; চক্রবর্তী (২০০৮ : ২৯)।
৬. প্রাগুক্ত; চক্রবর্তী (২০০৮ : ২৯-৩২)।
7. youtube.com/watch?v=XKenyMP4CFM; retrieved on: 07.10.2019
8. youtube.com/watch?v=XKenyMP4CFM; retrieved on: 07.10.2019
৯. প্রাগুক্ত; চক্রবর্তী (২০০৮ : ৩৪)।
১০. প্রাগুক্ত; চক্রবর্তী (২০০৮ : ৩৫)।
11. shorturl.at/bdrR1; retrieved on: 07.10.2019
12. https://www.youtube.com/7.10.19watch?v=0N025MCnWcI; retrieved on: 07.10.2019
১৩. প্রাচী, রোকেয়া; ‘কথামালা-৬ : অভিনয় ও পেশাদারিত্ব’; ম্যাজিক লণ্ঠন; সম্পাদনা : কাজী মামুন হায়দার; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, সংখ্যা ১৩, জুলাই ২০১৭; পৃ. ২৮৩।
১৪. প্রাগুক্ত, প্রাচী (২০১৭ : ২৮৬)।
বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ১৮তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২০ এ প্রকাশিত হয়েছে।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন