Magic Lanthon

               

আনতারা সোনিয়া

প্রকাশিত ২৬ আগস্ট ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

অতনুর ‘ময়ূরাক্ষী’

নশ্বর মানবশরীর, সম্পর্ক আর উত্তরাধিকারে ভাটা ফেলে মোহ

আনতারা সোনিয়া



শুরুর কথা

নিষিক্ত ডিম্বাণু থেকে মাতৃগর্ভে একটু একটু করে পূর্ণ হয় মানবশরীর। ধারাবাহিক কতোগুলো পর্যায় পার করে মানবশিশুর জন্ম হয়। ধীরে ধীরে সেই শিশু বড়ো হয়ে ওঠে। শৈশব-কৈশোর-তারুণ্য পেরিয়ে একসময় বার্ধক্যে পৌঁছায়। জন্মিলে মরিতে হবে--স্বাভাবিক নিয়মে মরতে হলে বার্ধক্যকে বরণ করতে হয়। রোগ, শোক বা দুর্ঘটনায় অনেকে বার্ধক্যের আগেই চলে যায়। তবে এর বাইরে বার্ধক্য এমন এক উপস্থিতি যেখানে কমবেশি সবাইকেই পা রাখতে হয়; যেখানে মানবশরীর হয়ে পড়ে অক্ষম। যৌবনের সিঁড়ি বেয়ে চলা জীবনে যখন ঠিক বার্ধক্য চলে আসে, তখন সময় আসে পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্র থেকে ব্যক্তিমানুষের কিছু পাওয়ার। যে মানুষটা সারাজীবন কোনো না কোনোভাবে সমাজকে দিয়েছে; তার বার্ধক্যটাও সমাজের জন্য প্রয়োজন। বার্ধক্য থেকেও অনেক কিছু পায় সমাজ। সবচেয়ে বড়ো কথা, বার্ধক্যকে বোঝার জন্যও বার্ধক্যটা দরকার। অথচ এই পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্র বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বার্ধক্য চায় না; অবহেলা করে। বার্ধক্যে পৌঁছানো মানুষটাকে নিষ্প্রয়োজন-অকেজো মনে করে। সারা পৃথিবীতে গড়ে ওঠা হাজারো বৃদ্ধাশ্রম বোধহয় তারই সাক্ষ্য বহন করছে।


অথচ এই বার্ধক্যেই আপনজনের আশ্রয় অনেক বেশি দরকার পড়ে ব্যক্তিমানুষের। কেউ কেউ আপনজনের সান্নিধ্য পেলেও অধিকাংশের বার্ধক্য কাটে একাকীত্বে। যে একাকীত্ব খুবই করুণ। তখন শরীরই কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মাটির দেহে আর গৌরবের সুগন্ধ মেলে না। অথচ ফেলে আসা কর্ম, যাপিত জীবন আর উত্তরাধিকারের সৌরভ থাকে চিরকাল। বার্ধক্যের আগের অবস্থাটাও তাই বেশ জরুরি। শুধু নিজের জন্য না বেঁচে, জরুরি সঠিক উত্তরাধিকার তৈরি করা। যে উত্তরাধিকার ব্যক্তিমানুষকে পৌঁছে দেয় বহুদূর। এই উত্তরাধিকার সবসময় কেবল আইনি উত্তরাধিকারকেই নির্দেশ করে না। এ উত্তরাধিকার হতে পারে চেতনার, আদর্শের। লেখক, দার্শনিক সিমোন দ্য বোভোয়ার কোনো সন্তান ধারণ করেননি; কিন্তু রেখে গেছেন অসংখ্য উত্তরাধিকার। যারা এতো বছর পরেও সিমোনকে ধারণ করে। সিমোনের এই উত্তরাধিকারই হয়তো তাকে বাঁচিয়ে রাখবে যুগের পর যুগ।


তবে অধিকাংশ মানুষই পৃথিবীতে এসে আত্মকেন্দ্রিকতায় নিজেকে নিবদ্ধ রাখে। বন্দি হয়ে পড়ে বিভিন্ন সামাজিক সিস্টেমে। এই সিস্টেম তথাকথিত উন্নত জীবনের ধুয়া তুলে মানুষের জীবনকে আচ্ছন্ন করে যান্ত্রিকতায়। মানুষের মধ্যে কৃত্রিম অভাব সৃষ্টি করে। সেখানে থাকে মোহের ফাঁদ। মানুষও খুব সহজে সেই ফাঁদে পা দিয়ে তৃপ্ত থাকতে চায়। জীবনের চাহিদা মেটাতে মেটাতে একসময় নেমে আসে ক্লান্তি। জীবনে শুরু হয় হাহাকার। সারাজীবন আমার আমার করে এসেও শেষবেলায় কিছুই আমার হয়ে ওঠে না। সেখানে থাকে কেবল শূন্যতা; ঘিরে থাকে দুঃখ-কষ্ট আর না পাওয়ার যন্ত্রণা। অথচ জীবনের তোড়ে সবকিছু বেমালুম ভুলে না গিয়ে, উত্তরাধিকারের প্রতি দৃষ্টি রাখলে তাতে হয়তো কিছু ফল মিলতো। কেননা এক হতেই যে দুইয়ের জন্ম।


হালকা ছন্দে ময়ূরাক্ষীর গল্প

এমন একসময়ের মধ্য দিয়ে পৃথিবী যাচ্ছে, যখন বুড়ো বয়সে বাবা-মাকে বাড়ির বাইরে বৃদ্ধাশ্রমে রাখা হয়। যেখানে সবকিছুকে বিচার করা হয় অর্থের হিসাবে। মানুষ যা করছে সব যেনো স্বার্থের জন্যই। স্বার্থ ছাড়া যেনো কেউ এক পাও ফেলতে চায় না। ঠিক অস্থির এই সময়ে নির্মাতা অতনু ঘোষ নির্মাণ করলেন ময়ূরাক্ষী। চলচ্চিত্রটি ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায়। বার্ধক্য, বাবা-ছেলের সম্পর্ক এবং একটা স্থবির সময়কে উপস্থাপন করে ময়ূরাক্ষী। এই লেখায় চলচ্চিত্র ময়ূরাক্ষীকে একটু ভিন্নভাবে দেখার প্রয়াস থাকবে।


কিছু অসুখী মানুষ আর ৮৪ বছরের এক বৃদ্ধকে ঘিরে আবর্তিত হয় ময়ূরাক্ষী। এখানে বৃদ্ধাশ্রম না থাকলেও বৃদ্ধের কোনো পরিবার নেই; যেনো বৃদ্ধাশ্রমের এক নতুন সংস্করণ। বয়স বেড়ে গেলে মানুষের মস্তিষ্কের নিউরন অক্ষম হয়ে পড়ে। হিউম্যান জুওলজি বলে বার্ধক্যে নিউরন ১০ শতাংশ সঞ্চালন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। প্রতিদিন একটু একটু করে বৃদ্ধ হয় শরীর। ক্রমশ ক্ষুধামন্দা বাড়ে। কমে যায় মূত্রাশয়ের মূত্র ধারণ ক্ষমতা। ধীরে ধীরে হাঁটা-চলার শক্তি হারিয়ে যায়। অথচ সারাজীবন শরীরের মিথ্যে গৌরব করে মানুষ বাঁচে। একসময় সেই শরীরই অসুখের মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এমনই এক বৃদ্ধ সুশোভনের গল্প বলে ময়ূরাক্ষী। যে মানুষটি এখনো প্রিয় শিক্ষার্থী ময়ূরাক্ষীকে খুঁজে বেড়ান; যাকে তিনি ছেলের বউ করতে চেয়েছিলেন। চলচ্চিত্রে ময়ূরাক্ষীই যেনো বাবা-ছেলের বন্ধন। ময়ূরাক্ষী, যে সবার সুখের জন্য নিজের সুখ বলিদান করে। কিন্তু ময়ূরাক্ষীকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। এই স্বার্থের দুনিয়া থেকে ময়ূরাক্ষী হারিয়ে গেছেন। এই অসহায় বৃদ্ধের ময়ূরাক্ষীকে দেখা আমৃত্যু সাধ।


জীবনের এই অসহায় লগ্নে যখন সুশোভনের পাশে আপনজন বলতে কেউ নেই, তখন শুধু হাউজকিপার আর কাজের লোকের সঙ্গেই তার বাস। প্রাণখুলে কথা বলার মতোও কেউ তার পাশে নেই। বার্ধক্যে একাকীত্ব, অসহায়ত্ব, শারীরিক অক্ষমতা একজন মানুষকে কীভাবে গ্রাস করে তা বোঝা যায় সুশোভনকে দেখে। একজন বৃদ্ধ শিশুর থেকেও অসহায়। কারণ শিশুদেরকে আদর করে তবুও মানুষ কোলে তুলে নেয়, খেলা করে। কিন্তু বৃদ্ধের কাছে কেউ ঘেঁষতে চায় না। বয়সের কারণে এই জনবিচ্ছিন্নতা বড়োই যাতনার। ওই বয়সে উপনীত হওয়ার আগে তা বোঝা প্রায় অসম্ভব। নির্মাতা অতনু ঘোষ বার্ধক্যের সেই অসহায়ত্ব তুলে আনার প্রয়াস চালিয়েছেন ময়ূরাক্ষীতে। শুধু তাই নয়, চলচ্চিত্রজুড়েই বিরাজ করে ভয়াবহ বিচ্ছিন্নতা। প্রত্যেকটি মানুষই কেমন যেনো অসুখী। সবাই কেবল ছুটছে। কেউ অর্থ উপার্জনের জন্য প্রবাসে থেকে বাবার জন্য লোক ঠিক করে ভালোবাসা কিনছে। কেউ অর্থের জন্য সন্তানকে বঞ্চিত করে ভালোবাসা বিক্রিও করছে। বাবা-ছেলের সম্পর্ক হেরে গেছে টাকার কাছে। সেই টাকা আবার কেউ অবলীলায় লুটাচ্ছে; যদিও সে টাকা স্বামীর উপার্জিত। আবার কেউ ভালো অবস্থানে থেকেও আরো একটু বিলাসী জীবনযাপনের জন্য পাড়ি জমাতে চায় আমেরিকায়। আবার দীনতার কারণে এক বাবা নিজের মেয়েকে নির্মমভাবে বিদেশে পাঠাতে চায়। অভাবের কষাঘাতে কখনো প্রলেতারিয়েত সেই বাবাই কথা বলে পুঁজির বিরুদ্ধে। এছাড়া শক্তিশালী সামাজিক প্রতিষ্ঠান বিবাহ, দাম্পত্য নিয়ে নানা জটিলতা তো আছেই। দিনশেষে প্রতিটি মানুষই যেনো অসুখী, অসহায়, ক্লান্ত।


এ দেহ যে পঁচা দেহ গৌরব কীসের ভাই

বৃদ্ধ সুশোভনের শারীরিক অক্ষমতা বেশ ভালোভাবেই প্রতীয়মান ময়ূরাক্ষীতে। তিনি পেশায় ছিলেন অধ্যাপক। যৌবনে সুশোভন হয়তো শিরদাঁড়া টান টান করে বুক ফুলিয়ে শিক্ষার্থীদের পড়াতেন। তার তুখোড় মেধার জোরে অভিভূত হতো হাজারো শিক্ষার্থী। বয়সের ভাটি পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রতাপশালী সুশোভনের শিরদাঁড়াও বাঁকা হওয়ার উপক্রম। যে নিউরনের কর্মক্ষমতায় অবাক হতো মানুষ। সেই নিউরনও ধ্বংসের পথে। যিনি সবাইকে সাহস দিয়ে বেড়াতেন, তার কণ্ঠে আজ শিশুর আকুলতা। চলচ্চিত্রের একপর্যায়ে মল্লিকাকে উদ্দেশ করে সুশোভনকে বলতে শোনা যায়, তুমি কোথায় চলে গিয়েছিলে, একা একা আমার বড্ড ভয় করে। এই কণ্ঠস্বরের দ্যোতনায় ফুটে ওঠে গভীরতম ভীরুতা। একটুখানি আঁধারের ভয়ে আঁতকে ওঠেন তিনি। যে শরীর-শৌর্যের অহংকার তাকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছিলো, তা কুঁকড়ে মুচড়ে পদে পদে তার অসহায়ত্ব জাহির করে চলছে।


বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে টান টান চামড়ায় ভাঁজ পড়ে, মাংসপেশি নরম হয়ে যায়, চুলে পাক ধরে, কণ্ঠে জড়তা আসে। মানুষের শরীর ক্ষণস্থায়ী, নশ্বর। অথচ মিথ্যে গৌরব আর গায়ের জোরের পাল্লা দিয়ে চলে মানুষ। পর্দায় যে সুশোভনকে দেখা যায়, সেই অবস্থার মুখোমুখি সবাইকেই হতে হবে। কিন্তু মানুষ স্বভাবত তার মুখোমুখি হতে চায় না। কাউকে যদি বুড়িয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়। সে সেটা মানতেই চায় না। শারীরিকভাবে কেউ একটু অস্বাভাবিক হলে, সুঠাম দেহের মালিকরা নানাভাবে তাকে খোঁচা দেয়। কেউ কখনো ভাবে না শেষবেলার কথা। চলচ্চিত্রে নজর দিলে দেখা যায়, যে কয়টি চরিত্র আছে, সবাই সুশোভনের জন্য হা-হুতাশ করে। কিন্তু কেউ সেই বয়সে উপনীত হওয়ার কথা ভাবে না। চলচ্চিত্রের এক ঘণ্টা সাত মিনিট ৪০ সেকেন্ডে গৃহকর্মী রবিকে বলতে শোনা যায় বাবু কি পাগল হয়ে যাচ্ছে। বাবুর অসহায়ত্ব দেখে সবার কষ্ট হয়, ভয় হয়। অথচ কারো মধ্যেই বাবুর বয়সে যাওয়ার উপলব্ধি নেই। চিকিৎসক যদিও বলেন, বুড়ো হলে সবারই এমন হয়। কিন্তু চিকিৎসকের কথা মুখ অবধিই থাকে; গভীরে পৌঁছায় না। অবশ্য শরীরে যখন উজান থাকে, তখন এসব মনে হওয়ার কথাও নয়।


সময় ও পুঁজির টানে জীবন সম্পর্কের চোরাবালি

জন্মের পর বাবা-মা তাদের সন্তানকে কোলে তুলে নেয়। সবটুকু স্নেহাশিস দিয়ে বড়ো করে তোলে। সন্তানদের বড়ো করতে গিয়ে বিসর্জন দিতে হয় কতো শখ, আহ্লাদ। অথচ একটা সময় পর নাড়িছেঁড়া এই বন্ধনও যেনো হালকা হতে থাকে। দূরত্ব তৈরি হয় সেই সম্পর্কে। ঠিক যেমনটা হয়েছিলো সুশোভন ও ছেলে আর্যের মধ্যে। সুশোভন বুকে আগলে বড়ো করে তোলেন আর্যকে। আর্যের সুখই যেনো সুশোভনের সুখ। বৃদ্ধ বয়সে এসেও তিনি সন্তানের জন্য ভাবেন, ব্যথিত হন। সন্তানকে ভালো রাখতে সব ব্যবস্থা করতে চান।


চলচ্চিত্রের এক ঘণ্টা ৩৬ মিনিট ১৭ সেকেন্ডে বসে ছবি আঁকেন সুশোভন। তার ছবি আঁকা দেখে গৃহকর্মী মল্লিকা ও রবি দৌড়ে আসে। সুশোভনকে উদ্দেশ করে মল্লিকা বলেন, এই মেঘ থেকে কি বৃষ্টি পড়বে? উত্তরে সুশোভন বলেন, না, ছেলের স্কুলে আঁকতে দিয়েছে। তিনি জানালা আঁকতে আঁকতে আরো বলেন, এখানে একটা জানালা এঁকে দিলাম, ওর মন কেমন করলে ও এখানে এসে বসবে। ঠিক সেই মুহূর্তে পর্দায় ভেসে ওঠে আর্যের মুখাবয়ব। যেখানে আমেরিকাগামী বিমানে জানালার পাশে বসা আর্যের মুখে এক টুকরো আলো পড়ে। এই আলোই যেনো এক অর্থে সন্তানকে বাবার দেওয়া পৃথিবী দেখার সুযোগকে নির্দেশ করে।


এদিকে বিমানে আর্যের পাশে বসে থাকা একটি শিশুকে উঁকি দিয়ে আকাশ দেখার চেষ্টা করতে দেখা যায়। আর্য বুঝতে পারেন শিশুটি হয়তো জানালার পাশে বসে আকাশ দেখতে চায়। নির্মাতাও যেনো এই পরিস্থিতিতে সন্তান আর্যকে বাবার ভূমিকায় বসান। আর্যের বাবা যেমন তাকে জানালা দিয়েছেন, তিনিও তেমনই ওই শিশুকে একটা জানালা দিতে চান। শিশুটিকে তিনি জায়গা ছেড়ে দিয়ে জানালার পাশে বসার সুযোগ করে দেন। যুগে যুগে হয়তো এই হয়, বাবা থেকে সন্তান, আবার সন্তান থেকে বাবা। বাবারা জায়গা ছেড়ে দেয়। তবে বাবারা দেয় আর সন্তান নেয়, এই পরম্পরা চললেই তো হয় না। বাবাদেরও কিছু পাওয়ার সময় আসে। সেই সময়ে আর্য বাবাকে সেই অর্থে কিছুই দিতে পারেন না; নিঃসঙ্গ বাবাকে তিনি রেখে যান গৃহকর্মীর কাছে। অথচ তখন সুশোভনের জন্য আর কিছু নয়, শুধু আর্যকেই দরকার। চিকিৎসক-চিকিৎসা, ঔষধ, সেবা-যত্নের কোনো কমতি নেই; ঘাটতি কেবল একটুখানি ভালোবাসার, সঙ্গ দেওয়ার। অন্যভাবে ভাবলে মনে হতেই পারে, আমেরিকা-প্রবাসী আর্যের তো বাবার কাছে থাকা অসম্ভব! তখন প্রশ্ন ওঠে, কেনোইবা আর্য দেশ ছেড়ে প্রবাসে? কী আছে সেই জীবনে! যেখানে উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর নিজের অগোছালো জীবনের দায় ছাড়া আর কিছুই খুঁজে পাওয়া যায় না।


ময়ূরাক্ষীতে আর্যেরও একটা সন্তান আছে। সেই সন্তান দেরাদুনে হোস্টেলে থেকে পড়ালেখা করে। প্রবাসে থাকার কারণে সন্তানের সঙ্গে তার থাকা হয়ে ওঠে না। আসলে থাকার উপায়ও নেই। দূরে থাকলেও তিনি অনেক ভালোবাসেন, আদর করেন সন্তানকে। কেবল একসঙ্গে থাকেন না বলে প্রতিদিন সন্তানকে স্পর্শ করে আদর করা হয়ে ওঠে না। সন্তানের পাশাপাশি থাকা; প্রতিদিন স্পর্শ দিয়ে আদর করা; এগুলো বাবা হিসেবে আর্যের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। আর এভাবেই ধীরে ধীরে উত্তরাধিকার প্রবাহিত হয়। হয়তো আর্যের বাবা যেমনটা করেছেন তাকে। তারপরও দিনশেষে কোনো কিছুর মোহে সেই উত্তরাধিকারেও ভাটা পড়েছে!


একদিন আর্য তার বান্ধবী সাহানাকে নিয়ে হাসপাতালে সুশোভনকে দেখতে যান। সুশোভনের অবস্থা দেখে সাহানা মর্মাহত হন। একই সঙ্গে শঙ্কিতও হন নিজের কথা ভেবে। চিন্তিত মনে এক ঘণ্টা নয় মিনিটে আর্যকে সাহানা বলেন, আমার যদি কখনো এ রকম হয়; আমার কী হবে; আমার মেয়ে যে সেনসেটিভ, বলবে মা পাগল হয়ে গেছে, বাড়ি থেকে বের করে দাও। মা কতো কষ্ট করে বড়ো করেন সন্তানকে। পরিস্থিতিতে (বার্ধক্য) পৌঁছানোর আগেই যদি সেই মা ভবিষ্যতের শঙ্কা করেন; তাহলে বুঝতে আর বাকি থাকে না সে সম্পর্কের বোঝাপড়া।   


ময়ূরাক্ষীতে দাম্পত্য সম্পর্কগুলোও একটু অন্যরকম। আর্য দুইবার ডিভোর্সের পর আর বিয়ে করেননি। একাই থাকেন। আবার যে বিয়ে করবেন তাও মনে হয় না। অন্যদিকে আর্যের বান্ধবী সাহানা বিবাহিত। কিন্তু স্বামীর সঙ্গে পারস্পরিক বোঝাপড়াটা নেই। শৈশবের বন্ধুর সঙ্গে স্বামী-সন্তান নিয়ে নানা গল্প করেন সাহানা। কথা বলতে বলতে চলচ্চিত্রের এক ঘণ্টা ১০ মিনিটে সাহানাকে বলতে শোনা যায়, আমার কিছু হলে আমার স্বামী বলবে এর ওপর ইনভেস্টমেন্ট করা গ্রেট লস, বিজনেসম্যান না! একটা সম্পর্ক কি এমন হতে পারে! দুজন মানুষ একসঙ্গে থাকতে থাকতে তো একটা বন্ধন তৈরি হয়। সৃষ্টি হয় পারস্পরিক আস্থা। বিপদে-আপদে সঙ্গীর পাশে থাকার অনুভূতি তৈরি হয়। আর সাহানাদের সম্পর্কে তৈরি হয়েছে ইনভেস্টমেন্টের হিসাব; যেনো সাহানাকে তার সঙ্গী অর্থের মানদণ্ডে পাশে রেখেছেন। সামাজিকতা মেনে সুস্থতা আর সৌন্দর্য যেনো সাহানার সম্পদ। এর বাইরে তিনি কিংবা এই সম্পর্ক শূন্য! তাহলে পরিবার, দাম্পত্য সম্পর্কগুলো নিয়ে কি ভিন্ন কোনো ইঙ্গিত করছেন নির্মাতা। যা স্বামী-স্ত্রী, সন্তানের আইনি উত্তরাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলে।


কেনো এলো ময়ূরাক্ষী

ময়ূরাক্ষী দেখে বেশকিছু জায়গায় ঘোর লাগে। চলচ্চিত্রজুড়ে শরীরী উপস্থিতি না থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ময়ূরাক্ষী। চলচ্চিত্রের নামকরণও তার নামে। হঠাৎ করে ঘুমের ঘোরে সুশোভনের মুখে ময়ূরাক্ষীর নাম শোনা যায়। এরপর শুরু হয় ময়ূরাক্ষীর গল্প। প্রায়শ তিনি ময়ূরাক্ষীর নাম করতে থাকেন, তাকে ডেকে দিতে বলেন। অবশেষে জানা যায়, ময়ূরাক্ষী সুশোভনের একসময়ের শিক্ষার্থী, যার সঙ্গে তিনি ছেলে আর্যের বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। সুশোভনের জীবনে হঠাৎ ময়ূরাক্ষীর এই উপস্থিতির ব্যাখ্যা খোঁজার জন্য সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মনোসমীক্ষণ তত্ত্বের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। কারণ মানব মন নিয়ে এতো অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ ফ্রয়েড ছাড়া কেউই করতে পারেননি। মানব মনের যে অচেতন স্তরের কথা ফ্রয়েড বলেছেন, সুশোভনের মনের সেই স্তরেই আসলে ময়ূরাক্ষীর বাস। অচেতন স্তরে জন্মগত প্রবৃত্তি বা ইচ্ছাসমূহ অবস্থান করে। এছাড়া কিছু অতীত অভিজ্ঞতা, আবেগ, আদিম কামনা-বাসনা আছে, যেগুলো মনের অচেতনে নির্বাসন দেয় মানুষ। ময়ূরাক্ষীও তার অতীত অভিজ্ঞতার ফসল।



অচেতন স্তরের ওপর মানুষের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। অচেতন ছাড়া ফ্রয়েড বর্ণিত মানব মনের বাকি দুটো স্তর হলো চেতন ও প্রাক-চেতন। মানুষের ব্যক্তি জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো জমা হতে থাকে প্রাক-চেতন স্তরে। মানুষ চাইলে অনেক সময় প্রাক-চেতনের ঘটনা স্মরণ করতে পারে। তবে প্রাক-চেতনে অনেক বেশি ঘটনা জমা হয়ে গেলে; সেখান থেকে কিছু অংশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে অচেতনে চলে যায়। কারণ প্রাক-চেতন স্তরের নির্দিষ্ট ধারণ ক্ষমতা রয়েছে।  ফ্রয়েডের  ভাষ্যমতে, মানব মনের তৃতীয় অর্থাৎ চেতন স্তর হলো মানুষের নিয়ন্ত্রিত স্তর। মানুষ প্রত্যহ সচেতনভাবে যা কিছু করে সবই চেতনের অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ ঘটমান সময়ে মানুষ যা করে সবই চেতনে করে। চলচ্চিত্রে দেখানো হয় সুশোভন প্রাক-চেতন ও চেতন স্তরের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছেন। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেটা তার অচেতনের ঘটনাগুলো একে একে বেরিয়ে আসছে। সুশোভনের চিকিৎসক বলছেন, ইতিহাসের শিক্ষক সুশোভনকে দীর্ঘ জীবনে মস্তিষ্কে প্রচুর তথ্য জমা রাখতে হয়েছে। এছাড়াও তার মস্তিষ্কের স্মৃতিধারণ ক্ষমতাও অনেক বেশি; সাহিত্য, চলচ্চিত্র, খেলা, গান একসঙ্গে তিনি সবই মাথায় রেখেছেন। তাই এই পর্যায়ে এসে তার মস্তিষ্কের স্মৃতিকোষগুলো অনেকটা অকার্যকর হয়ে পড়েছে। তার মানে সুশোভনের চেতন ও প্রাক-চেতন স্তর অন্যান্য মানুষের চেয়ে অনেক বেশি সক্রিয় ছিলো। আর তারই ফল হয়তো এই নিয়ন্ত্রণহীনতা।


এদিকে হঠাৎ করেই এক রাতে ময়ূরাক্ষীর নাম করতে থাকেন সুশোভন। অথচ যে ময়ূরাক্ষীকে তিনি ছেলের বউ করতে চেয়েছিলেন তাকে তিনি ভুলে গেছেন অনেক আগেই। বিয়েটা হয়নি। তিনি হয়তো অনেক কষ্ট পেয়েছিলেন। কিন্তু মানব মন কষ্ট মনে রাখে না। ফ্রয়েডের ভাষায়, নির্জ্ঞান মনে দুই ধরনের উপাদান রয়েছে, একটি হলো মানুষের প্রবৃত্তিগত চাহিদা এবং অন্যটি অবদমিত বাসনা-কামনা। এই দুটি অংশের নাম দেওয়া হয়েছে অদস। ফ্রয়েডের মতো করে বললে, প্রবৃত্তিগুলো জৈবিক এবং অন্ধভাবে সুখ প্রাপ্তির লক্ষ্যে ধাবিত হয়। তাই অদস বাস্তবের ধার ধারে না। আর এজন্য ফ্রয়েড আরেকটি নিয়মের কথা বলেছেন, ÔThe pleasure principle strives to fulfill our most basic and primitive urges, including hunger, thirst, anger, and sex.Õ সুশোভনও নিশ্চয় ময়ূরাক্ষীকে নিয়ে যে কষ্ট পেয়েছিলেন তা থেকে মুক্তির জন্য সেটা অবদমন করে অচেতনে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। ফলে ময়ূরাক্ষী গভীর অচেতনে হারিয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু প্রশ্ন হলো কী এমন হলো যে, এই বৃদ্ধ বয়সে সুশোভনের অচেতন থেকে ময়ূরাক্ষী বেরিয়ে আসলো।


বৃদ্ধ বয়সে খুব করে চাওয়ার পরও একমাত্র ছেলেকে কাছে পাচ্ছেন না সুশোভন। অথচ তার জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মানুষ তার একমাত্র ছেলে আর্য। এই বয়সে সুশোভনের পাশে থাকা তার একান্ত জরুরি কর্তব্যও বটে। চলচ্চিত্রের এক ঘণ্টা ১২ মিনিট ৪৫ সেকেন্ডে আর্যকে উদ্দেশ করে চিকিৎসক বলেন, ওনার সঙ্গে কথা বলে বুঝলাম, ইউ আর অ্যা মোস্ট ইম্পর্ট্যান্ট থিং ইন হিজ লাইফ, আর আপনি এখানে থাকেন না, ইটস অ্যা বিগ ইস্যু। তার মানে সেই ইম্পর্ট্যান্ট থিং সুশোভনের পাশে নেই। একমাত্র ছেলের এই অনুপস্থিতি হয়তো তার মনে একধরনের ক্ষোভ, কষ্টের বোধ সৃষ্টি করেছে। সব থাকার পরও যেনো প্রিয়জনের একটা কোমল হাত প্রত্যাশা ছিলো সুশোভনের। সেই প্রত্যাশা, সেই কষ্টই হয়তো শেষ জীবনে ময়ূরাক্ষীকে হাজির করেছে সুশোভনের জীবনে। এটাই হয়তো অচেতনে থাকা ময়ূরাক্ষীকে বের করে আনার নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। অবাধ্য মন তো এটা ভাবতেই পারে যে, ময়ূরাক্ষী থাকলে এই সায়াহ্নে আর্য তাকে ছেড়ে দূরে চলে যেতো না। ময়ূরাক্ষীও হয়তো তাকে পরম ভালোবাসায় আগলে রাখতো, পরম মমতায় একাকীত্ব দূর করে দিতো।


আর্যের মতো হাজারো সন্তান প্রতিনিয়ত মা-বাবাকে ফেলে সুখের সন্ধানে এগিয়ে যায়। একবারও হয়তো তারা ভাবে না, তাদের অবর্তমানে কেমন থাকবে তাদের পরমাত্মীয় মা-বাবা। সুশোভনের মতো প্রত্যেক মা-বাবাই হয়তো একা, অসহায়। বার্ধক্য তাদেরকেও সুশোভনের মতো শিশু করে রেখেছে। আদরের সন্তানের অবর্তমানে হয়তো তারাও কাজের লোকের সাহচর্যে দিনানিপাত করছে। চলচ্চিত্রে যেমন গৃহকর্মী রবি আর হাউজকিপার মল্লিকা সুশোভনের আপনজন। ঔষধ, যত্ন-আত্তির কোনো কমতি নেই তার; অভাব কেবল ভালোবাসার, পরম মমতার। তাই তো কেনা ভালোবাসায় সুশোভনের হয়তো মন ভরে না। অচেতনে ময়ূরাক্ষীকে মনে পড়ে, ময়ূরাক্ষী ফিরে ফিরে আসে।


ভাটির টান, কেউ যেনো ভালো নেই

ময়ূরাক্ষীর সবাই কেমন যেনো একা; নিঃসঙ্গ; যেনো কেউই ভালো নেই। মনে হয় জীবন হয়তো এ রকমই; হয়তো এ রকম নয়। তারপরও সবাই বেঁচে থাকে, স্বপ্ন দেখে, এগিয়ে যায়। চলচ্চিত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র সুশোভন। জীবনের পাওয়া না পাওয়ার হিসাবনিকাশের শেষ পাতায় এসে শূন্যে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। বার্ধক্যের ফেরে তিনি বড়ো অসহায়। বার্ধক্যে হয়তো প্রতিটি মানুষই তাই। সবকিছু থাকার পরও সুশোভনের যেনো কিছুই নেই।


সুশোভনের ছেলে আর্য। দুবার ডিভোর্সের পর একা থাকেন আমেরিকায়। বড়ো কোম্পানিতে কাজ করেন। অনেক টাকা রোজগার করা আর্যের দায়-দায়িত্বও অনেক। বাবার ভরণপোষণ, একমাত্র ছেলের লেখাপড়া, নিজের খরচ, এমনকি দ্বিতীয় ডিভোর্সি বউকেও টাকা দিতে হয় তার। টাকাপয়সার অভাব না থাকলেও তার কীসের যেনো অভাব! চলচ্চিত্রের ৫২ মিনিট ১২ সেকেন্ডে শৈশবের বান্ধবীর সঙ্গে আলাপ করতে করতে ঘুমে ঢলে পড়েন আর্য; বান্ধবী কথা বলতেই থাকে। হঠাৎ করে আর্যের এই ঘুমিয়ে পড়া কেবল শরীরী ক্লান্তির কারণে নয়। বৈবাহিক জীবনে আর্য সুখী ছিলেন না; সঙ্গীহীন জীবনে শৈশবের ঘনিষ্ট বান্ধবীকে কাছে পেয়ে তাই চাপা কষ্ট চেপে রাখতে পারেন না; চান একটুখানি মুক্তি। তাইতো ক্লান্ত-জীর্ণ শরীর-মনটাকে নিজের অজান্তেই তার মতো ছেড়ে দেন। খানিক নিরাপদ অবসরের এই ঘুম যেনো জীবন নদী পাড়ি দিতে দিতে ভাসমান-অসহায় হয়ে পড়ার আরেক রূপ; যেনো নিঃসঙ্গতার সঙ্গে অসম্ভব বাস। কেবল ব্যক্তি আর্যই নয়, ক্লান্ত তার যাপিত জীবন তার চারপাশ।


এরপরে দেখা যায়, শিকাগোতে ফেরার সময় বিমানবন্দরে বসে হাউমাউ করে কাঁদছেন আর্য। তার এই কান্না যেনো জীবনে অনেক কিছু পেয়েও না পাওয়ার হাহাকার। বাবাকে একা ফেলে শিকাগোতে যেতে হয়তো ভালো লাগে না তারও। তবুও কোনো কিছুর কাছে হেরে তাকে ফিরতে হয়। যে রাষ্ট্রীয় সিস্টেমের মধ্যে আর্য থাকেন, তা এমনিতেই মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। তার ওপর স্ত্রী-সন্তানের ভালোবাসা থেকেও তিনি অনেক দূরে। তাই দিনশেষে চোখের জলটুকু নিজেকেই মুছতে হয় আর্যের।


আর্যের বান্ধবী সাহানা। স্বামী বড়ো ব্যবসায়ী। নিজেকে সবকিছু থেকে ভুলিয়ে রাখতে স্বামীর টাকা দুহাতে ছড়িয়ে তিনি সুখের পিছনে ছোটেন। সন্তান, স্বামীর সঙ্গে এক বাড়িতে থাকলেও তারা প্রত্যেকে একা। একই পরিবারে থেকেও সবাই বিচ্ছিন্ন। স্বামীর সঙ্গে সম্পর্কটা এমন--যেনো স্বামী তাকে সবকিছু দিলেও তার কোনো বিষয়ে তিনি হস্তক্ষেপ করতে পারবেন না। স্বামীও তার কোনো কাজ নিয়ে কথা বলেন না। শুধু সামাজিকতা রক্ষার জন্যই যেনো একসঙ্গে থাকা। একই ছাদের নিচে থেকেও আলাদা বসবাস। সাহানার পারিবারিক সম্পর্কে কোনো বন্ধন বা অনুভূতি ছিলো না। নিজের পরিবারের মধ্যে নিজের কোনো আস্থার জায়গা তিনি পাচ্ছিলেন না। সবমিলিয়ে হয়তো সুখী ছিলেন না সাহানা। তাই কষ্ট ভুলে থাকার জন্য নিজেকে সবসময় ব্যস্ত রাখতে চান তিনি। কখনো রেস্টুরেন্ট দেন; কখনো ভোটে দাঁড়াতে চান। তবে এসবের রসদটাও জোগাড় হয় স্বামীর টাকায়। তাই তাকে আরেকবার মাথা নোয়াতে হয় স্বামীর কাছেই।


হাউজকিপার মল্লিকাও ভালো নেই। সঙ্গীহীন জীবনে সব দায়ভার তারই কাঁধে। স্বামীর অবর্তমানে সমাজে টিকে থাকাটা হয়তো তার কাছে যুদ্ধের মতোই কঠিন। জীবনের দায় মেটাতে তিনি একমাত্র যক্ষের ধন সন্তানকে ছেড়ে থাকেন। সন্তানকে ছেড়ে থাকার যন্ত্রণার কথা শুধুই মা-ই বুঝতে পারেন! তারও নিশ্চয় কষ্ট হয়। দিনশেষে ছেলের স্পর্শ না পাওয়া, আদর করতে না পারায় মল্লিকার মন হয়তো ভার হয়। কেননা তার আপনজন বলতে যে শুধু ছেলেটিই। কাকার এক ছেলেকে আর্যের সঙ্গে দেখা যায়। তিনি দেশে ভালো চাকরি করেন। বোঝা যায়, জীবনযাপনের জন্য মোটামুটি যা দরকার, সবই তার আছে। তবুও তার আমেরিকায় যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। এই আকাক্সক্ষা তার মধ্যে একধরনের কৃত্রিম অভাব তৈরি করে। এই অভাবই তাকে প্রভাবিত করে দেশ ছাড়তে। যেনো দেশ ছেড়ে গেলেই এই অভাব ঘুচে যাবে; তিনি আরো ভালো থাকতে পারবেন। অথচ এই অভাব কখনোই ঘোচে না।


আর্য দেশে ফিরে তার শিকাগোর এক সহকর্মীর ভাইয়ের বাড়িতে একটি পার্সেল দিতে যান। দরিদ্রতার ছাপ যেনো আর্যের সহকর্মীর সেই ভাইয়ের চোখেমুখে লেগে আছে। বোঝা যায়, অভাবী সংসারের তোড়ে তিনি হিমশিম খাচ্ছেন। পরিস্থিতি এমন যে, অবস্থা পরিবর্তনে যেকোনো মূল্যে তার মেয়েকে বিদেশে পাঠানোর প্রস্তাব করেন আর্যের কাছে। সেই চাওয়াটার মধ্যে অবশ্য কোনো ভালোবাসা নেই, আছে কর্কশ এক নির্মমতা। যেনো কোনোভাবে মেয়েটাকে ঘাড় থেকে নামিয়ে ফেলতে পারলেই অন্তত একজনের অন্নসংস্থান নিয়ে চিন্তা করতে হবে না।


বাবার জন্য ময়ূরাক্ষীকে খুঁজতে আর্য এক বাড়িতে যান। কারণ এই বাড়ির ঠিকানা থেকেই ময়ূরাক্ষীর শেষ চিঠিটি এসেছিলো সুশোভনের কাছে। দরজায় কড়া নাড়তেই হুইল চেয়ারে বসা এক নারী দরজা খোলেন। ভিতরে গিয়ে বসার পর কথোপকথনের একপর্যায়ে তিনি আর্যকে জানান ময়ূরাক্ষী এখানে ছিলো, কিন্তু এখন নেই। ময়ূরাক্ষীকে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে নিজের কথাও বলেন তিনি। আর্যকে উদ্দেশ করে বলেন, মদ খেয়ে ছাদ থেকে পড়ে গিয়ে আমার পা দুটো অচল হয়ে গেছে। তার কথাবার্তায় উঠে আসে দুর্ঘটনার আগের জীবনের কথা। তখন অনেকটা অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করতেন। জীবন নিয়ে একটু বেশিই বাড়াবাড়ি করে ফেলেছেন তিনি। দুর্ঘটনার আগের যাপিত জীবন নিয়ে তিনি অনুশোচনা করেন।


ময়ূরাক্ষী সম্পর্কে তিনি বলেন, ময়ূরাক্ষী তাকে সারিয়ে তুলতে চেয়েছিলো। কিন্তু তিনি ভেবেছিলেন ময়ূরাক্ষীর জীবনের কথা। তাইতো ময়ূরাক্ষীকে জোর করে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছেন। যেনো ময়ূরাক্ষী তার মতো মদ্যপের পিছনে সময় নষ্ট না করে। কথোপকথনের শেষ পর্যায়ে আর্য তাকে জিজ্ঞেস করেন, এখন কেমন আছেন? উত্তরে তিনি বলেন, সামনের দিকে তাকালে কিছু একটা দেখতে পাই। তার মানে হুইল চেয়ারে বসেও তিনি এখনো জীবনের স্বপ্ন দেখেন। একটু দেরিতে হলেও হয়তো তিনি জীবনের প্রকৃত মানে বুঝতে পেরেছেন।


ময়ূরাক্ষীর একমাত্র আশাবাদী মানুষটিও হুইল চেয়ারে বসা। তিনি হয়তো জীবন দিয়ে বুঝেছেন, জীবনটা ফেলনা নয়। বুঝেছেন জীবনের প্রকৃত মানে। হুইল চেয়ারে বসে, সামনের দিকে কিছু একটা দেখতে পাওয়া ওই মানুষটি ছাড়া ময়ূরাক্ষীতে সবার ভিতরে কেমন জানি হাহাকার। সবাই কেমন জানি না পাওয়ার বেদনায় ক্লান্ত। হঠাৎই দেখে মনে হয়, যার যার অবস্থানে কেউ ভালো নেই! অথচ বাস্তবতা কী এমন! আসলেই কি ভালো থাকার মতো অবস্থা নেই? নাকি মানুষ এক অজানা আকাঙ্ক্ষার পিছনে ছুটে নিজেই নিজেকে খারাপ রাখছে প্রতিনিয়ত। এই খারাপ থাকায় তো সময়ের চেয়ে মানুষের দায় বেশি। ব্যক্তিমানুষ কেবল নিজেদের স্বার্থে সমস্যায় ফেলছে/ফেলেছে নিজেকে, সঙ্গে অন্যদেরকেও। যদিও এ ধরনের কোনো ইঙ্গিত নির্মাতা চলচ্চিত্রজুড়ে কোথাও করেননি। ফলে যেটা হয়, দর্শক হিসেবে অনেক সময় ময়ূরাক্ষী দেখে বিভ্রান্ত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়।   


আহারে জীবন, আহা জীবন

জীবন কখনো কখনো দায় হয়ে যায়। তখন শুরু হয় মৃত্যুর জন্য অপেক্ষার পালা। বসে বসে প্রহর গুনতে হয় কখন মৃত্যু আসবে। শারীরিক অসহায়ত্ব আর বার্ধক্য কখনো কখনো আত্মাকে বন্দি করে ফেলে। এই বন্দি দশা থেকে হয়তো কেবল মৃত্যুই মুক্তি দিতে পারে আত্মাকে। কারণ মৃত্যু মানে সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়া নয়।


মানুষ কখনো কখনো বেঁচে থেকেও মৃতের মতো হয়ে যায়। সেই বেঁচে থাকাটা হয়ে ওঠে যন্ত্রণার। ময়ূরাক্ষীতে যেমন সুশোভন। জীবনটা তার কাছে বোঝা হয়ে গেছে। একসময়ের গৌরবের সুঠাম দেহ, বুদ্ধিমত্তা এখন তার নিয়ন্ত্রণে নেই। তার জীবন যেনো থমকে গিয়েছে। অন্যদিকে দীর্ঘদিনের অসুস্থতায় আপনজনেরাও ক্লান্ত হয়ে ওঠে। সম্পর্কে দেওয়া-নেওয়ার পাল্লাটা হালকা হলে আবেগও ধীরে ধীরে কমতে থাকে। আবার কখনো কখনো আবেগকে ধামাচাপা দিয়ে জীবনকে এগিয়ে নিতে হয়। ময়ূরাক্ষীতে যেমন আর্য। বাবার প্রতি অফুরন্ত ভালোবাসার পরেও তাকে শিকাগো ফিরতে হয়। যদিও তিনি জানেন, পরবর্তী সময়ে বাবার সঙ্গে দেখা হওয়াটা অনিশ্চিত। তবুও আর্য ফিরে যান। আচ্ছা, আর্যদের ফেরাটা কি খুবই জরুরি। কেনো আর্যদের ফিরে যেতে হয়। যদিও যাপিত জীবনে আর্যরা এমন এক পরিস্থিতিতে বন্দি; যেখানে অনেক অপ্রয়োজনীয় চাহিদা; অনেক আকাঙ্ক্ষা। যে পরিস্থিতি অর্থের মোহে মানুষকে বন্দি রাখে; বর্তমানের আর্যরা সেসব পরিস্থিতির স্বীকার। কিন্তু আর্যরা উত্তরাধিকার তৈরি করতে চায়; সুযোগ পেলে করেও। উত্তরাধিকার তৈরির সঠিক রাস্তাটা হয়তো তারা পেয়ে ওঠে না। নির্মাতা কেনো জানি আর্যদের সেই পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার রাস্তাটা বাতলে দিলেন না। অথচ আর্যরা চাইলে এই পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসতে পারে।

 

লেখক : আনতারা সোনিয়া, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রপ সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।

soniaislam.kgc@gmail.com

https://www.facebook.com/profile.php?id=100010523371229

 

তথ্যসূত্র

১. রহমান, ডক্টর মুহাম্মাদ হাবিবুর (২০০২ : ৯৪); বয়োবৃদ্ধির প্রক্রিয়ায় শারীরিক পরিবর্তন; সামাজিক জরাবিজ্ঞানের ভূমিকা; শুভেচ্ছা প্রেস এন্ড পাবলিকেন্স, ঢাকা।

২. মিত্র, মাধবেন্দ্রনাথ (২০০৯ : ৮৩); মনঃসমীক্ষণ; নির্বাচিত ধ্রুবপদ-২; সম্পাদনা : সুধীর চক্রবর্তী; গাঙচিল প্রকাশন, কলকাতা। 

3. https://www.verywellmind.com/what-is-the-pleasure-principle-2795472; retrieved on: 08.10.2019

 

বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ১৮তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২০ এ প্রকাশিত হয়েছে।

 

 

 

 

 

 

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন