ইতি সাহা
প্রকাশিত ২০ আগস্ট ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
বুড়ি পিসির চলচ্চিত্রকথা
ইতি সাহা

বাড়ি থেকে কয়েক পা হাঁটলেই আমাদের গ্রামের হাট। নাম ঢোলার হাট। হাটখোলা পেরিয়েই বুড়ি পিসির বাড়ি। একদিন বিকেলে ঘুরতে ঘুরতেই তার বাড়ি যাই। বাড়িতে ঢুকে দেখি তিনি টেলিভিশনের সামনে ‘জি বাংলা’র কোনো একটা সিরিয়াল দেখছেন। অবশ্য পিসি একা নন, সঙ্গে তার বড়ো বোন ও পাশের বাড়ির এক নারীও আছেন। তারা এতো মনোযোগ দিয়ে সিরিয়াল দেখছিলো যে, আমি আর তাদের বিরক্ত না করে পাশে বসে দেখতে শুরু করলাম। যদিও এসব সিরিয়াল দেখতে আমার খুব একটা ভালো লাগে না। তারপরও কিছু করার ছিলো না। বিভিন্ন সময় যে দুই-চারবার আমি এসব সিরিয়াল দেখেছি, তাতে মনে হয়েছে, এগুলোর কাহিনি শুরু হয় খুবই আকর্ষণীয়ভাবে। ফলে সাধারণ দর্শক দুই-এক পর্ব দেখার পরই এর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যায়। এবং নিয়মিতভাবে এতে সময় দিতে থাকে। নানা রঙঢঙ মিলিয়ে চলতে থাকে সিরিয়ালের উদ্দেশ্যহীন যাত্রা। একটা পর্যায়ে এতে আগমন ঘটে খলচরিত্রের। তার আগমনে অবশ্য সিরিয়ালে আরেকটু নতুন মাত্রা যোগ হয়। নায়ক-নায়িকা ও তাদের পরিবারে নেমে আসতে থাকে নানা সঙ্কট। যে সঙ্কট ছুঁয়ে যায় দর্শকের মনোজগতে। দর্শক তখন ব্যস্ত হয়ে পড়ে সেই নাটকীয় জগৎ নিয়ে ভাবতে। অচেতনে দর্শক নিজেকে হারিয়ে ফেলে সিরিয়ালের নাটকীয়তায়।
সেই নাটকীয়তার মধ্যেই হয়তো গভীরভাবে ডুবে ছিলেন বুড়ি পিসি। হঠাৎ তার সেই আচ্ছন্নতায় ছেদ ঘটায় লোডশেডিং! পিসিসহ অন্য দর্শকের চোখে-মুখে তখন প্রচণ্ড বিরক্তি। সিলিং ফ্যানটা বন্ধ হওয়ায় একটু গরম লাগলেও তাদের এই বিরক্তি আমার ভালোই লাগছিলো। লোডশেডিংয়ের কারণে বুড়ি পিসিসহ আমরা বারান্দায় এসে বসি। সারাদিন রোদের প্রখরতা থাকলেও বিকেলের দিকে মৃদু বাতাসে গাছের পাতাগুলো নড়ছিলো। পিসির বারান্দার খাঁচায় বন্দি পাখিটা চুপচাপ কেনো জানি দূরের আকাশে তাকিয়ে ছিলো! পাশের ঘর থেকে ভেসে আসছিলো মোবাইল ফোনসেটে বাজানো গানের আওয়াজ। মনে হলো কোনো এক মা তার সন্তানকে সেই গানে ঘুমপাড়ানোর চেষ্টা করছে। একটু পরে বুঝেছিলাম, শিশুটি বুড়ি পিসির একমাত্র নাতি, সার্থক। এখন অবশ্য মায়েরা তাদের বাচ্চাকে খাওয়াতে, ঘুমপাড়াতে, এমনকি কান্না থামাতেও স্মার্ট মোবাইল ফোনসেট নামের যন্ত্রের দ্বারস্থ হয়। তাই মা-ঠাকুরমা বা মাসির কণ্ঠের সেই ঘুমপাড়ানি গান কিংবা রাজপুত্র-রাজকন্যার রূপকথার গল্প আজ কালের গর্ভে বিলীন প্রায়। অথচ দুই-তিন দশক আগেও এসব ঘুমপাড়ানি গান-গল্প শুনেই ঘুমাতো এদেশের শিশুরা।
যুগের এই জটিলতা থেকে বেরিয়ে একটু আগের সময়ে ফিরে যেতে পিসিকে বললাম, আচ্ছা পিসি, এখন তো সিরিয়াল দেখছো, তোমাদের সেই সময়ে কী দেখতে, কী করতে? পিসিকে এবার অনেক বেশি উৎসুক মনে হলো। তিনি বললেন, ‘সেই যুগে সিনেমাহলে গিয়ে বই (গ্রামের লোকজন এখনো চলচ্চিত্রকে বই বলে) দেখাটা খুবই আনন্দের ব্যাপার ছিলো। অনেকটা উৎসবের মতো। তখন তো আমাদের মধ্যে দুইটা গ্রুপ ছিলো। বুলন, পক্ষা, তাপি (পিসির এই মামাতো বোনেরা বয়সে তার চেয়ে চার-পাঁচ বছরের বড়ো ছিলো) এরা ছিলো একটা গ্রুপ। আর আমরা কয়েকজন ছোটোরা মিলে ছিলাম আরেকটা গ্রুপ। আমরা ওই বড়োদের গ্রুপের সঙ্গে বই দেখার জন্য যেতে চাইলে তারা তো নিয়েই যেতো না, উল্টো ঝাড়ি দিয়ে বসিয়ে রাখতো। কিন্তু ওরাও যে শেষ পর্যন্ত বেঁচে যেতো এমন নয়। পেট্রোল পাম্পের সামনের রাস্তাটা দিয়ে হলে যেতে হতো। আর সেখানে বসে থাকতো মামা। তাই সন্ধ্যায় যখন ওরা বই দেখে বাড়ি ফিরতো, তখন তাদের বকাঝকা করা হতো।’
পিসি বলতে থাকেন, ‘এক রাতে মামা ওদের ডেকে বললো, তোরা আজ সিনেমা দেখতে গিয়েছিলি, না? ওরা তো সেই দম নিয়ে বলে, না, আমরা তো যাইনি! তারপর মামা রেগে গিয়ে বললো, সবার চোখকে ফাঁকি দিতে পারলেও আমার চোখকে ফাঁকি দেওয়া অতো সহজ না। আমি যে দেখলাম, তোরা মাথায় ওড়না পেঁচিয়ে চোরের মতো চুপি চুপি যাচ্ছিস। মামার গালিগালাজ শেষ হওয়ার আগেই ওরা দৌড়ে হাওয়া হয়ে গেলো। আর আমরা পাশেই দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে ওদের বকা দেওয়ার মজা নিচ্ছিলাম। আমাকে অবশ্য কেউ বকা দিতো না। কিন্তু আমার মা সিনেমাহলে গিয়ে বই দেখাটাকে ভালোভাবে নিতো না। এর অবশ্য কারণও ছিলো। তখন আমাদের সংসারে খুব অভাব ছিলো। বাবা সামান্য বেতনে চাকরি করতো। তা দিয়েই কোনোরকমে সংসার চলতো।’
পিসি জানান, তাদের পাড়ায় তখন পাপড় তৈরির একটা কারখানা ছিলো। সেখানে গিয়ে তিনি মাঝেমধ্যে পাপড় বেলতেন (বানানো)। এর থেকে তিনি যে টাকা পেতেন তা দিয়ে যেতেন সিনেমা দেখতে। পিসি বলেন, ‘কিন্তু মা মনে করতো, বই দেখে এই টাকা নষ্ট না করে জামা বানানো বা অন্য কাজে ব্যবহার করা যেতো। আমি অবশ্য তার কথা শুনতাম না। মা একদিন রেগে গিয়ে আমার হাতে খনতি দিয়ে বাড়ি (আঘাত করা) দেয়। কিন্তু তারপরও আমি ঠিকই বই দেখতে যেতাম।’ পিসি জানান, তখন প্রেক্ষাগৃহে মাসে একটা করে সিনেমা আসতো। যতোদূর মনে আছে টিকিটের মূল্য ছিলো ১০-১২ আনার মতো। খুব আবেগ নিয়ে পিসি বলেন, ‘বইগুলো দেখে আমি এতো বেশি প্রভাবিত হতাম যে, স্কুলে গিয়েও সবসময় ওসব নিয়েই ভাবতাম।’
কোন কোন সিনেমাহলে সিনেমা দেখেছেন পিসির কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তখন তো দিনাজপুরে ‘চৌরঙ্গি’, ‘মডার্ন’, ‘কুঠিবাড়ি’, ‘লিলি’, ‘বস্তান’ নামে সিনেমাহল ছিলো। তবে আমি বেশিরভাগ সিনেমা ‘মডার্ন’ ও ‘চৌরঙ্গি’তে গিয়েই দেখেছি। এখন অবশ্য ‘মডার্ন’ ছাড়া অন্য হলগুলো বন্ধ। খানিক কী যেনো ভেবে পিসি বলেন, ‘হলগুলো বন্ধ হবেইবা না কেনো বল? তোরা কি আর এখন হলে গিয়ে বই দেখিস? এখন তো হাতে হাতে মোবাইল, ঘরে ঘরে টিভি, ডিশলাইন। মানুষ তাই আর সময়, টাকা কোনোটাই নষ্ট করে হলে যেতে চায় না। তারচে বরং ঘরে বসেই বই দেখে। কিন্তু যতোই টিভি, মোবাইলে বই দেখুক না কেনো, হলের বড়ো পর্দায় বই দেখার কিন্তু একটা অন্যরকম তৃপ্তি আছে। তখন আমরা এক মনে এক ধ্যানে বসে বই দেখতাম। বিরক্ত করার মতো কেউ থাকতো না। আর ঘরে বসে টিভি দেখলে তো এ বলে ওই চ্যানেল দেখবো, ও বলে ওই চ্যানেল দেখবো। একটুও শান্তি নাই।’
পিসির সাথে আলাপচারিতায় লেখক
পিসির পছন্দের নায়ক-নায়িকার কথা জানতে চাইলে বলেন, “আমার কাছে রাজ্জাক-কবরীর অভিনয় বেশ ভালো লাগতো। ৭০ থেকে ৮০’র দশকে হলগুলোতে বেশি চলতো ওদের সিনেমা। রাজ্জাক-কবরীর আবির্ভাব বইটা আমার দেখা ওই জুটির প্রথম বই। এরপরে তাদের আরো একটা বই হলো রংবাজ। সেবার তো সিনেমাহলে এতো বেশি মানুষ হয়েছিলো যে, অনেক মানুষকে দাঁড়িয়ে থেকে দেখতে হয়েছিলো। সেই বইয়ের একটি গান হলো--‘সে যে কেনো এলো না/ কিছু ভালো লাগে না/ এবার আসুক তারে আমি মজা দেখাবো।’ সেখানে কবরীর যে কী অভিনয় গাল ফুলিয়ে ফুলিয়ে!”
পিসি বলতে থাকেন, ‘আমরা যখন হলে যাওয়া শুরু করি তখন সাদাকালো বই চলতো। এর কিছুদিন পর হলগুলোতে রঙিন বই দেখানো শুরু হলো। তখন শাবানা-আলমগীরের বই আসতো বেশি। ওদের বইগুলোতে পারিবারিক নানা সমস্যা থাকতো, কিন্তু সেগুলোর মধ্যেও জীবনের গভীর অর্থ থাকতো।’ শাবানা-আলমগীরের কিছু চলচ্চিত্রের নাম জানতে চাইলে পিসি এক এক করে ভাত দে, ঘরের বউ, সত্য-মিথ্যা ইত্যাদি নাম বলেন। ভাত দে কিছুদিন আগে কোনো এক চ্যানেলে সম্প্রচার হয়। চ্যানেল পাল্টাতে গিয়ে হঠাৎই সেখানে থেমে যাই। সিনেমাটা তখন একেবারে শেষের দিকে, ভাত চুরির জন্য শাবানার চুল কেটে ফেলা হচ্ছিলো। তখন মনে পড়লো ভাত দে ছোটোবেলায়ও একবার দেখেছি, সবটা অবশ্য মনে নেই। তাই সেদিন যখন হঠাৎই সিনেমাটি দেখলাম, খানিকটা নস্টালজিক হয়ে গেলাম। তখন দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণিতে পড়তাম; প্রতি বৃহস্পতি ও শুক্রবার ‘বি টি ভি’তে সিনেমা দেখানো হতো। আমরা সবাই একসঙ্গে বিকেল হলেই টেলিভিশনের সামনে বসে পড়তাম। সেই সাত-আট বছর বয়সেই আমার শাবানা-আলমগীরকে চেনা হয়।
যাহোক পরে পিসির মুখে ওয়াসিম, ববিতা, অঞ্জু ঘোষ, ইলিয়াস কাঞ্চনের নাম শুনি। এদের নাম বলার সময় একটি সিনেমার কথা পিসি বার বার বলছিলেন--বেদের মেয়ে জোস্না। এসব সিনেমার কথা বলতে বলতে পিসি একটু অহঙ্কারের সঙ্গেই বলে ওঠেন, ‘আগেকার বইয়ের কোয়ালিটিই ছিলো অন্যরকম।’ এবার আমি পিসির কাছে ‘সিনেমার কোয়ালিটি’ নিয়ে প্রশ্ন করি। উত্তরে তিনি বলেন, সেই সিনেমাগুলো নাকি ‘সভ্য’ ছিলো। পিসি আরো যোগ করেন, ‘সেখানে কোনোধরনের খারাপ দৃশ্য দেখানো হতো না। তাই বাবার হাতে কিছু বাড়তি টাকা হলেই সে বাড়ির সবাইকে নিয়ে বই দেখতে চলে যেতো। আমরা সবাই একসঙ্গে বই দেখতাম, হাসতাম, কাঁদতাম। আর এখনকার বই একসাথে দেখা যায় না। নায়িকার গায়ে অর্ধেক কাপড়, খালি নায়ক-নায়িকা জড়াজড়ি করে।’
সবাই যে শুধু সিনেমাহলে গিয়ে বই দেখে তা নয়, এমন অনেক পরিবার ছিলো যারা রেডিও শুনতো। তবে রেডিওর সংখ্যা কিন্তু তখন হাতে গোনা ছিলো। পিসির কথায় সায় দিয়ে আমি বললাম, ‘আমার মায়ের তো তোমার মতো সিনেমাহলে গিয়ে সিনেমা দেখার সুযোগ হয়নি। মা-মাসিরা নাকি প্রতি সন্ধ্যায় রেডিওই শুনতো।’
পিসি বলেন, বেশকিছু দিন পর পাড়ার সরকার বাড়ি আছে না, তারা একটা সাদা-কালো টিভি কিনলো। আর সেদিনই পাড়ার লোক ঝাঁকে ঝাঁকে সরকার বাড়িতে গেলো শুধু টিভিটাকে একবার চোখের দেখা দেখতে। আগের সেই পুরাতন সরকার বাড়ির বিশাল ঘোরানো বারান্দায় টিভিটাকে রাখা হয়েছিলো প্রথম দিকে। যদিও এটা ঘরেই ছিলো কিন্তু অতো লোকের জায়গা সংকুলান না হওয়ায় পরে তারা টিভিটা বারান্দায় রেখে দেয়। তারপর সন্ধ্যায় যখন টিভি চালানো হতো, তখন পাড়ার অনেক মানুষ আসতো এবং আমরা একসাথে বসে টিভি দেখতাম। দেখার ফাঁকে ফাঁকে বিভিন্ন রকম গল্প-গুজবও হতো। পিসির এ কথায় আমার একেবারে ভিন্ন কথা মনে হয়, যে প্রযুক্তি একসময় অনেকগুলো মানুষকে একখানে করেছিলো; মানে টিভি দেখতে, সিনেমা দেখতে মানুষ এক জায়গায় জড়ো হতো; সেই প্রযুক্তিই এখন মানুষকে মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। অনেক মানুষ এক সঙ্গে থাকলেও হাতে হাতে মোবাইল নিয়ে তারা যেনো একে অন্য থেকে অনেক দূরে।
পিসি বলেন, বিয়ের পরেও (ঠাকুরগাঁও সদরের ধর্মপুর গ্রামে) আমি বেশ কয়েকবার তোর পিসার সঙ্গে বই দেখতে হলে গিয়েছি। আমরা একসাথে বেশকিছু বই দেখেছি। তখন আমি বিয়ের কারণে দিনাজপুর ছেড়ে ঠাকুরগাঁওয়ে থাকি। কথা বলার এ পর্যায়ে পিসির মুখে এলাকার জনপ্রিয় যাত্রাপালার কথাও শুনি। পিসি জানান, ২৫-৩০ বছর আগে তার বাসার সামনের স্কুল মাঠে বছরে অন্তত একবার করে যাত্রা হতো। টিকিট কেটে মানুষ দেখতো সেই যাত্রা। চারপাশে রঙিন কাপড়ে ঘেরা এসব যাত্রার প্রথম দিকে হতো বন্দনা গান। তারপর যাত্রাপালা, গান, অভিনয় চলতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা। যাত্রায় নারী-পুরুষ সবাই অভিনয় করতো। শিল্পীরা বাইরে থেকে আসতো। স্থানীয় এক স্কুলের শিক্ষকও সেসময় ওইসব যাত্রায় নায়কের চরিত্রে অভিনয় করতো।
পিসির কাছে যাত্রাগুলোর কাহিনির উৎস সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বাজারে তখন এসব যাত্রার বই পাওয়া যেতো। সেই বইয়ের কাহিনি মঞ্চের পাশে বসে থাকা কেউ পাঠ করতো এবং তা শুনে মঞ্চের অভিনেতারা তাদের অভিনয় চালিয়ে যেতো।’ যাত্রার নায়িকার বর্ণনা দিতে গিয়ে পিসি বলেন, ‘ওই মেয়েগুলো খুব সুন্দর ছিলো। তাদের চেহারার তুলনায় আমাদের চেহারা কিছুই না।’
পিসির সঙ্গে যখন গল্প করছিলাম, কিছুটা দূরেই বসে ছিলো অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া আমার এক ভাতিজি, রিয়া। সে হয়তো চুপিচুপি আমাদের কথাগুলো শুনছিলো। যাত্রার কথা শুনেই রিয়া বলে ওঠে, এই তো পিসি ছয়-সাত দিন আগেই আমাদের স্কুল মাঠে এক যাত্রাপালা হয়ে গেলো। ওটাতেও কিন্তু মার্চ্চেল্লো স্যারই নায়ক ছিলেন। তারপর হঠাৎ করেই সে দৌড়ে ঘরের দিকে যায় এবং তার ফোনটি নিয়ে এসে বলে, আমি অবশ্য ভিডিও করেছি। তুমি দেখো বলেই ফোনটি আমার হাতে ধরিয়ে দেয়। দূর থেকে ভিডিও করায় আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম না। তবুও তার আগ্রহের কথা ভেবে কিছু অংশ দেখলাম। কেটে কেটে দেখতে যেয়ে হঠাৎ করেই বেজে ওঠে ‘দু চোখে ঘুম আসে না/ তোমাকে দেখার পরে’ গানটি। গানটি যাত্রার নায়িকা নিজেই গাইছিলো। তার সেই গানে কেমন জানি একটা আবেগ আছে, যেটা অন্য শিল্পীর মধ্যে কখনো পাইনি।
এই যাত্রাপালার নাম ছিলো ‘কুলিন শকুনী’। এরপর রিয়া আমাকে সংক্ষেপে যাত্রার কাহিনি বলতে থাকে। নায়ক-নায়িকার ছোটোবেলায় কোনো এক কারণে বিয়ে হয় এবং নায়ক মরে যায়। নায়িকা বড়ো হলে এসব স্মৃতি তার মাথায় থাকে না। একটা পর্যায়ে নায়িকার তার বড়ো বোনের দেবরের সঙ্গে প্রেম হয়। বোন তাদের এই প্রেমের কথা জানতে পারলে নায়িকাকে অতীতের কথা মনে করিয়ে দিয়ে তার বিধবা হওয়ার কথা বলে। এতে বিচ্ছেদ ঘটে প্রেমের। শেষে দেখানো হয়, নায়ক আসলে মরেনি। এবং এভাবেই প্রচলিত কাহিনির মতো নায়িকার কাছে ফিরে আসে নায়ক। এর মধ্য দিয়ে যাত্রার সমাপ্তি ঘটে।
রিয়ার কথা শেষ হতে না হতেই পিসি বললেন, ‘ওই দিনের যাত্রাটা তো হঠাৎ করেই হয়েছিলো। তবে হ্যাঁ, দুর্গাপূজার দশমীর দিন রাতে গৌড়লাল বাবুর মন্দিরের পাশের মাঠটায় যে যাত্রা হয়, সেটার কথা তো জানিসই। ওটা কিন্তু নিয়মিতভাবে প্রতিবছরই হয়।’ আমাদের গ্রামের গৌড়লাল বাবুর মন্দিরটি নাকি প্রায় তিন-চার শো বছরের পুরনো। এই মন্দিরটি আসলে ৫০ ফুট উচ্চতার একটি শিব মন্দির, যেটা কিছুদিন আগে মেরামত করা হয়েছে। এবং তার থেকেই খানিকটা দূরে একটা ধ্বংসপ্রায় দুর্গা মন্দির, যেখানে প্রতিবছরই দুর্গাপূজা হয়। শিব মন্দিরের পাশে অবস্থিত পুকুরটি নিয়েও মানুষের মধ্যে একটা মিথ প্রচলিত আছে। গৌড়লাল বাবু যখন পুকুরটি খনন করেন, তখন নাকি স্বাভাবিকভাবে পাতাল থেকে পানি উঠে আসেনি। এ নিয়ে তিনি ভীষণ চিন্তিত ছিলেন। এক রাতে তিনি স্বপ্নে দেখেন, তার ছেলের বউকে বলি দিলেই পুকুরে পানি উঠে আসবে! কী আর করার! সমস্যার সমাধানে শেষমেশ তিনি বলিদান সম্পন্ন করেন। এর সঙ্গে সঙ্গেই নাকি পুকুর পানিতে ভরে ওঠে। ছোটোবেলায় এসব গল্প পিসির কাছে অনেক আগ্রহ নিয়ে শুনতাম।
যাহোক, এখন অবশ্য পিসির আর যাত্রা দেখা হয় না। এখানে যে শুধু যাত্রার আয়োজন হয় তা না; প্রতিবছর দুর্গাপূজার অষ্টমীর দিনে দুর্গার মহিষাসুর বধের লীলাও দেখানো হয়। এ লীলায় গ্রামের মানুষেরা ভিন্ন ভিন্ন সাজ ও চরিত্রে অভিনয় করে, পাশে বসে কণ্ঠ দেয় অন্য কোনো ব্যক্তি। গতবার অবশ্য অষ্টমীর দিনে সাঁওতালি নাচেরও আয়োজন করা হয়েছিলো। তাতে ১৭-১৮ জন নারী পরনে হলুদ শাড়ি ও পাতার তৈরি গহনায় সেজে গান করতে করতে গোল হয়ে কাঁধে হাত রেখে নাচ পরিবেশন করে। তবে এরা কেউই সাঁওতালি নারী নয়, বরং গ্রামের সাধারণ হিন্দু নারী। চৈত্রসংক্রান্তিতে এই শিব মন্দিরের পাশে কবি গানের আসর বসে; সেই কথাও অনেকবার শুনেছি। তাই পিসির কাছে এ সম্পর্কেও জানতে চাইলাম। তিনি বললেন, আগের জীবনে এ রকম কবি গানের কথা জানতাম না। এখানে এসে অবশ্য দেখি যে গ্রামের মানুষেরা কবি গানের অনেক ভক্ত। তবে আমার কখনো কবি গানের আসরে যাওয়া হয়নি। পিসি না গেলেও দু-তিন বছর আগে আমি একবার কবি গান শুনতে যাই। সেবার তো একজন পুরুষ ও একজন নারী কবিয়ালের মধ্যে চরম প্রতিযোগিতা হয়। তাদের সঙ্গে অবশ্য যন্ত্রবাদক ও দোহাররাও ছিলো। এ ধরনের গানে সাধারণত উভয় দল একে অন্যকে প্রশ্ন ও উত্তর করার মাধ্যমে আসর জমিয়ে রাখে।
সেদিন আমরা দুজন গল্পে এতোটাই মজে ছিলাম যে, কখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো বুঝতেই পারিনি। দূর থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসায় হঠাৎ পিসি দাঁড়িয়ে পড়লেন; বললেন, নাহ, তোর সঙ্গে দেখছি বই দেখার গল্প আজ আর ফুরাবে না। আমার আবার সন্ধ্যাবাতি দিতে হবে। অন্য আর একদিন না হয় আসিস। পিসির কাছ থেকে তার জীবনের গল্প শুনতে সত্যিই অনেক ভালো লেগেছিলো সেদিন। অবশ্য পরে কোনোদিন এই গল্প আর শোনা হয়নি।
লেখক : ইতি সাহা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
itisaharu64@gmail.com
https://www.facebook.com/itisaha.saha.14
বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ১৮তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২০ এ প্রকাশিত হয়েছে।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন