Magic Lanthon

               

ইব্রাহীম খলিল

প্রকাশিত ১৩ আগস্ট ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

ডিসকভারি’র ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ড

মোদি’র ‘ঈশ্বর’ হয়ে ওঠার পথে আরো এক ধাপ

ইব্রাহীম খলিল


ঈদ মানে খুশি, ঈদ বেদনা

ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে ২০০৬ খ্রিস্টাব্দের ৩১ ডিসেম্বর ভোরে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। দিনটি ছিলো মুসলমানদের সবচেয়ে বড়ো ধর্মীয় উৎসব ঈদ উল আজহার দিন। যখন ইরাকের মানুষ ঈদের নামাজ পড়ায় ব্যস্ত, তখন এক কথিত বিচারের রায়ে তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়। জাতিসংঘ এই বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে শুরু থেকেই আপত্তি তোলে, মুসলিম বিশ্বের মানুষও প্রতিবাদ জানায়; কিন্তু তা কোনো কাজে আসেনি। নিজ দেশে তুমুল জনপ্রিয়তা থাকলেও দখলদার মার্কিন বাহিনীর ভয়ে সাদ্দামের সমর্থনে কেউ টু শব্দও করেনি। যার ফলে আই এস-এর মতো ভয়াবহ জঙ্গিগোষ্ঠীর সহিংসতার সাক্ষী হয়েছে মানুষ।

সাদ্দামের ফাঁসি হওয়ার ঠিক ১৩ বছর পর ২০১৯ খ্রিস্টাব্দের ঈদ উল আজহার দিন আরেকটি টু শব্দ না করার বড়ো ঘটনা ঘটে। অবশ্য  সেটা এবার ইরাকে নয়, প্রতিবেশী দেশ ভারতে। কাশ্মিরের বিশেষ স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার পর মানুষ যখন রাস্তায় নেমে আসে; তখন সারা পৃথিবী থেকে এক রকম কাশ্মিরকে বিচ্ছিন্ন করে, তাদের ওপর গুলি, নির্যাতন করে দমিয়ে রাখা হয়। ঈদের নামাজ পড়ারও অনুমতি দেওয়া হয়নি তাদের। অথচ সরকার নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে পরিস্থিতি স্বাভাবিক, কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। ঈদের দিন কাশ্মিরে বিক্ষোভ থামাতে দমনপীড়নের খবর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পেলেও ঠিক সেই দিনই ডিসকভারি চ্যানেলে দেখানো হয় বেয়ার গ্রিলসের সঙ্গে মোদির জঙ্গল অভিযানের গল্প ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ড। যার নাম দেশটির আনন্দবাজার পত্রিকা দিয়েছে মোদির বন কি বাত

মোদির বন কি বাত

ডিসকভারি চ্যানেলের আলোচিত ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ড অনুষ্ঠানের দুঃসাহসী অভিযাত্রী বেয়ার গ্রিলস। বন-জঙ্গল, বরফের পাহাড়ে হারিয়ে গেলে বা বিপদে পড়লে কীভাবে একা দুঃসাহসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে, পোকা-মাকড় খেয়ে নিরাপদে ফিরে আসা যায়, সেটাই তিনি করে দেখান। সেই দুঃসাহসী অভিযানেরই এবার সঙ্গী ছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। অনুষ্ঠানের শুরুতেই ভারতের উত্তরাখণ্ডের পাঁচশো ২০ বর্গ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে অবস্থিত জিম করবেট জাতীয় উদ্যানে হেলিকপ্টারে করে নামেন বেয়ার। একটু পরই বৃটিশ সেনাবাহিনীর সাবেক সদস্য বেয়ার হাতির মল শুঁকে বিপজ্জনক পরিবেশ সম্পর্কে আভাস দেন। একই সঙ্গে মোদি না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী মোদিকে বহনকারী গাড়ি সেখানে আসতেই তাকে স্বাগত জানান বেয়ার। এরপর দুজনে মিলে বাঘ, সিংহসহ অসংখ্য হিংস্র প্রাণীর অভয়ারণ্যে হাঁটতে শুরু করেন। পথে চলতে চলতে মোদি নিজের জীবনের নানা গল্প, দর্শন, পরিবেশ-প্রকৃতি সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্কট ও পর্যটন সম্ভাবনার কথা শোনান বেয়ারকে। গল্পের মাধ্যমে হাঁটতে হাঁটতে দুজন এগিয়ে যান জঙ্গলের পথ ধরে; নদী পার হন বাঁশ, কাঠ আর প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি ভেলায় চেপে।

বেয়ারের সঙ্গে কথোপকথনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী শুনিয়েছেন ছোটোবেলায় বাড়ির কাছের জলাশয় থেকে কুমিরছানা ধরে আনার গল্প। জন্মস্থান গুজরাটে বৃষ্টি হলে বাবা কীভাবে আত্মীয়দের কাছে চিঠি লিখে আনন্দ প্রকাশ করতেন সেই স্মৃতিও স্মরণ করেছেন। অনুষ্ঠানের শেষ দিকে মোদিকে আইকনিক বিশ্বনেতা বলে উল্লেখ করেন বেয়ার। পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রের দেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদির জন্য শুভকামনা জানান তিনি। এরপর প্রধানমন্ত্রী মোদিকে অক্ষত অবস্থায় সিক্রেট সার্ভিস-এর সদস্যদের হাতে তুলে দেন বেয়ার। একপর্যায়ে একে অন্যের ভূয়সী প্রশংসার মধ্য দিয়ে শেষ হয় ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ড উইথ বেয়ার গ্রিলস অ্যান্ড প্রাইম মিনিস্টার মোদিডিসকভারি চ্যানেলটি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হলেও ভারতে এর শাখা অফিস রয়েছে। সবমিলে এ অনুষ্ঠানটি বিশ্বের একশো ৬৫টি দেশে স্থানীয় ভাষায় ডাবিং করে সম্প্রচার করা হয়।

গাছেরও জীবন আছে, কেতাবেই তা রয়ে গেছে?

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে পরিবেশে অবদানের জন্য জাতিসংঘের সর্বোচ্চ সম্মানজনক পুরস্কার চ্যাম্পিয়ন্স অব দ্য আর্থ অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হন। তার নেতৃত্বে ভারত আন্তর্জাতিক সৌর জোটে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে; একই সঙ্গে ২০২২ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ভারত থেকে তিনি ওয়ানটাইম প্লাস্টিক দূর করার ঘোষণা দিয়েছেন--তারই কৃতিত্বে মোদিকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ডের বিশেষ এ পর্বে মোদি বলেন, পরিবেশকে রক্ষা করা প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব। তবে আমাদের জীবনযাপন এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড়ো সমস্যা। আমাদের আনন্দের জন্যই আমরা প্রকৃতি ধ্বংস করি। এ সময় বংশগতভাবেই তিনি যে পরিবেশবাদী তাও স্মরণ করিয়ে দেন। অনুষ্ঠানের ২৫ মিনিটে মোদি জানান, বাল্যকালে একবার তিনি বাড়ির পাশের পুকুরে গোসল করতে গিয়ে একটি কুমিরছানা নিয়ে এসেছিলেন। বাড়ি যাওয়ার পর মা বলেন, এটা কেনো নিয়ে এসেছো? এটা তো পাপ। তোমার এটা করা উচিত হয়নি। এখনই এটা যেখানে ছিলো সেখানে রেখে এসো। তখন কুমিরছানাটি তিনি আগের জায়গায় রেখে আসেন। এরপর মোদি আরো বলেন,

আমার দাদি কোনো লেখাপড়া করেননি, আমার মাও তা-ই। আমরা অনেক গরিব ছিলাম। সুতরাং রুটি-রুজির জন্য কিছু অর্থ উপার্জন করা ভীষণ জরুরি ছিলো। তো আমার চাচা ঠিক করলেন তিনি কাঠ কেটে বিক্রি করবেন। তখন তিনি একটি জায়গা খুঁজে দোকান বসিয়ে দাদিকে জানালেন। কিন্তু দাদি বললেন, আমরা না খেয়ে মরে যাবো, প্রয়োজনে আরো কঠোর পরিশ্রম করবো, তবুও কাঠ বিক্রি করবো না। কারণ গাছেরও প্রাণ আছে, ফলে আমরা কাঠ কাটবো না। এরপর দাদি আমার পরিবার ও চাচাকে কখনোই এ বিষয়ে অনুমতি দেননি। খেয়াল করলে দেখবেন পরিবেশ আমাদের জীবনের অংশ। ... আমরা প্রতিটি গাছকে ভগবান হিসেবে দেখি।

সনাতন ধর্মাবলম্বীরা গাছকে ঈশ্বর হিসেবে দেখতেই পারেন। কিন্তু মোদিও কি বাস্তবিকই গাছকে ঈশ্বর জ্ঞান করেন! কারণ তার বিরুদ্ধে বনাঞ্চল ধ্বংস, পরিবেশের ক্ষতি করে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে অসংখ্য আন্দোলন হয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনকে ধ্বংসের পরিকল্পনার সঙ্গেও জড়িত তিনি। বাংলাদেশের ঢাল হিসেবে পরিচিত সুন্দরবন থেকে মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরে যে কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের কাজ চলছে, সেটার চুক্তিও মোদি স্বয়ং করেছেন। সুন্দরবন দীর্ঘদিন যে ইকোসিস্টেমের মধ্য দিয়ে চলে আসছে, সেটা সামান্য ব্যাহত হলেই পুরো জীবপ্রক্রিয়া ধ্বংসের মুখে পড়বে। বাল্যকালে মোদি মায়ের আদেশে একটি কুমিরছানা ছেড়ে দিলেও পরিণত বয়সে সেই কুমিরছানাকে সমূলে উৎপাটনের ব্যবস্থাই করেছেন!

মোদির এ ধরনের কার্যকলাপের পিছনে কাজ করেছে তার ব্যবসায়িক ও ঔপনিবেশিক লোলুপ দৃষ্টিভঙ্গি। কারণ এক হাজার তিনশো ২০ মেগাওয়াটের এ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে যে ১৭ হাজার কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে, তার অর্থায়ন করছে ভারত। আবার বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির নির্মাণ কাজ করছে দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি ভারত হেভি ইলেকট্রিক্যালস (বি এইচ ই এল)। শুধু তাই নয়, জ্বালানি হিসেবে যে কয়লা ব্যবহার হবে সেটাও সরবরাহ করবে ভারত। ফলে মোদি যতোই নিজেকে পরিবেশবাদী, গাছপ্রেমিক বলে অভিহিত করুক, তার উদ্দেশ্য আসলে ব্যবসা। আর কথিত এ পরিবেশ রক্ষকের সিদ্ধান্তের কারণে সুন্দরবনের কুমির, ঘড়িয়াল, ডলফিন, বাঘ, মাছ, হরিণ, কাঁকড়াসহ সবধরনের জীববৈচিত্র্য বিলীন হতে পারে বলে উভয় দেশের পরিবেশবাদীরা জানালেও কোনো ভ্রুক্ষেপ করেননি তিনি। মজার বিষয় হলো, বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারতের অংশে থাকা সুন্দরবনও কিন্তু এ ঝুঁকির বাইরে নয়। ফলে গাছকে ভগবান বলে কিংবা বাল্য বয়সে কুমিরছানাকে ছেড়ে দেওয়ার গল্প শুনিয়ে তিনি যতোই পরিবেশবাদীর মুখোশ পরেন, তাতে আসলে শেষ রক্ষা হয় না। কারণ ভারত কেবল বাংলাদেশেই কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করছে না, ইতোমধ্যে শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপেও দেশটির জাতীয় তাপবিদ্যুৎ করপোরেশন একই প্রকল্প হাতে নিয়েছে।

তবে অবাক করা বিষয় হলো, মোদি কেবল সুন্দরবনে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করেই ক্ষান্ত হননি। তার এ সিদ্ধান্ত নিয়ে বাংলাদেশে যারা উচ্চস্বরে কথা বলেছে তাদের ওপরও তিনি নাখোশ! সুন্দরবন বাঁচাও আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকায় সম্প্রতি ভারতের রোষানলে পড়েছেন বাংলাদেশের মানবাধিকার কর্মী এবং সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল। সুন্দরবন বাঁচাও আন্দোলন করায় ভারত তাকে ভিসা দেয়নি বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন তিনি। যারাই সুন্দরবন বাঁচানোর আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত তাদেরকেই ভারতের পক্ষ থেকে খারাপভাবে দেখা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। সুলতানা কামাল বলেন, স্বাধীনতার আগে পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণ করে যেভাবে পাকিস্তান ক্ষতি সাধন করতো, বর্তমানে ঠিক একই আচরণ করছে ভারত। ফলে ভারতের এই যে আমাদের সার্বভৌমত্বের ওপর হস্তক্ষেপ করা ...। আমাদের জাতীয় ইস্যু নিয়ে যখন কথা বলছি, সেটার মধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে একটা পরিস্থিতি তৈরি করা, এগুলো যদি তারা করতে থাকে, একে একে অনেক মানুষই ভারতবিরোধী হয়ে যাবে। বিশেষ করে ভারতের আগ্রাসী, অযৌক্তিক এবং দাদাগিরির ... কারণে।

ভারতবর্ষের সম্রাট যখন গুজরাটের কসাই

অনুষ্ঠানের শুরুর দিকে আট মিনিট ৩৭ সেকেন্ডে ভারত সম্পর্কে বেয়ারকে তথ্য দিতে গিয়ে মোদি জানান, করবেট জাতীয় উদ্যান ভারতের অন্যতম বিখ্যাত পর্যটন স্থান। যারা বন্যপ্রাণী সম্পর্কে জানতে আগ্রহী তাদের জন্য এ উদ্যান একটি আকর্ষণীয় জায়গা। যেখানে পাহাড়, প্রকৃতি, নদী, পুকুর সবই আছে। যারা বাস্তুসংস্থান সংক্রান্ত তথ্য জানার জন্য উদগ্রীব তারাও এ উদ্যানে আসতে পারে; এককথায় প্রকৃতির মধ্যে যা যা প্রয়োজন তার সবকিছুই করবেট উদ্যানে রয়েছে। একই সঙ্গে প্রকৃতির মতো ভারতও এক বৈচিত্র্যপূর্ণ দেশ। এখানে শতাধিক ভাষা ও একহাজার ছয়শো উপভাষা রয়েছে। সুতরাং সহজেই কল্পনা করা যায়, ভারত কতোটা বৈচিত্র্যের অধিকারী। মোদির এসব কথায় ভারতকে যেনো নতুন করে আবিষ্কার করেন বেয়ার। কথা বলতে বলতে একসময় তারা রয়েল বেঙ্গল টাইগারের এলাকায় চলে যান। এ সময় আত্মরক্ষার জন্য (যদিও ক্যামেরার পিছনে সার্বক্ষণিক সিক্রেট সার্ভিসের সদস্যরা ছিলেন) বাঘ এলে কাজে লাগবে বলে বেয়ার হাতে বানানো একটি বল্লম ধরিয়ে দেন মোদিকে। মোদি তখন বলেন, আমি যে সংস্কৃতিতে বড়ো হয়েছি, তাতে কাউকে মারতে পারবো না। মোদির এমন স্পর্শকাতর উত্তর শুনে তখনই বল্লমটি ফেরত নিতে চান বেয়ার। এ সময় প্রধানমন্ত্রী মোদি চটপট জবাব দেন, আপনার হয়ে এটা আমার হাতেই রাখছি।

ভারত অনেক বৈচিত্র্যময় তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সেখানে শতাধিক ভাষা, উপজাতি রয়েছে সেটাও ঠিক। এটা চিরসত্য, একই সঙ্গে ঐতিহাসিক। কিন্তু নানা বৈচিত্র্য ও ভিন্ন জনগোষ্ঠীকে কতোটা মূল্যায়ন করছে ভারত রাষ্ট্র? বৈচিত্র্যের কথা বলে ভারত কি কেবলই অহংবোধে ভোগে নাকি ভিন্নতার সমাদরও করে? যদিও বাস্তব পরিস্থিতি খুবই নিষ্ঠুরতার কথা বলে। কারণ যে মোদি বাঘ মারতে পারবেন না বলে চতুরতার সঙ্গে বল্লমটি নিজের হাতে রেখে দেন, তাকে আর যাই হোক কখনো বিশ্বাস করা যায় না। কারণ ইনিই সেই নরেন্দ্র মোদি যিনি গুজরাটের কসাই বলে খ্যাত; যার বিরুদ্ধে ২০০২ খ্রিস্টাব্দে গুরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন এক হাজারের বেশি মানুষকে হত্যার পিছনে ইন্ধনের অভিযোগ রয়েছে। এমনকি দেশটির সংখ্যালঘু মুসলমানদের হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতনের অভিযোগে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পাননি। একই সঙ্গে স্পষ্ট প্রমাণ থাকার পরও কেবল নিজের দলের সদস্য হওয়ায় গুজরাটের সেই গণহত্যার মামলা থেকে অধিকাংশ অভিযুক্তকে মুক্তি দিয়েছে মোদির সরকার।

অন্যদিকে ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে ভারতের অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের স্থলে রামমন্দির থাকার দাবি করে মুঘল আমলের মসজিদটি ভাঙায় সৃষ্ট দাঙ্গায় দুই হাজারের বেশি মুসলমানকে হত্যা করে কট্টরপন্থি হিন্দুত্ববাদীরা। ২৭ বছর আগে মোদির দল বি জে পির তখনকার শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতিতে হিন্দু করসেবকরা ওই মসজিদ ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছিলো। সম্প্রতি দেশটির সর্বোচ্চ আদালত ওই মসজিদের স্থলে রামমন্দির নির্মাণের রায় দিয়েছেন। তবে অবাক করা বিষয় হলো, দুই হাজার মানুষ হত্যার জন্য কাউকে অভিযুক্ত করেননি আদালত! অথচ বাবরি মসজিদ ভাঙার ঠিক ১০ মাসের মাথায় ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবরে বি জে পি, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরং দল প্রভৃতি সংগঠনের ৪০ জন শীর্ষ নেতাকে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র দাখিল করে ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সি বি আই। যাদের মধ্যে লালকৃষ্ণ আদভানি, মুরলিমনোহর জোশির মতো নেতাদের নাম রয়েছে। যদি দুই হাজার মুসলিম হত্যার শিকার হয়ে থাকে এবং সি বি আই অভিযোগপত্রও দিয়ে থাকে, তাহলে অভিযুক্তদের শাস্তি হলো না কেনো! আর যদি হত্যায় অভিযুক্তরা জড়িত না হয়ে থাকে, তাহলে তাদেরকে কারা হত্যা করেছে, তার কোনো জবাবও দেয়নি মোদির সরকার।

অন্যদিকে ভারতের সংবিধানের ৩৭০ ধারা বিলোপের মাধ্যমে দীর্ঘ ৬৯ বছর ধরে জম্মু-কাশ্মির যে বিশেষ মর্যাদা ভোগ করে আসছিলো সেটা সম্প্রতি বাতিল করেছে মোদি ও তার সরকার। এই সংশোধনের মাধ্যমে জম্মু-কাশ্মির ও লাদাখ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ কাশ্মিরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ হয়েছে ব্যাপক। পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাশ্মিরে হাজার হাজার সৈন্য মোতায়েনের পাশাপাশি ইন্টারনেট, স্কুল-কলেজ-বাজার বন্ধ করে দেয় ভারত। একই সঙ্গে এ পর্যন্ত দুইশোর বেশি মানুষকে হত্যার পাশাপাশি নির্যাতন, ধর্ষণেরও অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া সেনাদের ওপর পাথর মারার অভিযোগে বড়োদের পাশাপাশি হাজার হাজার শিশু কিশোরদেরও আটকে রেখেছে ভারতীয় বাহিনী। এসব শিশু কিশোরের পরিবারের কাছ থেকে তাদের খাবারের মূল্যও আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার পর গত একশো দিনে কাশ্মির পরিস্থিতির কোনোধরনের পরিবর্তন হয়নি।

আসলে কট্টর হিন্দুত্ববাদী মোদির কাছে মানুষের জীবনের কোনো মূল্যই নেই। তার রাজনৈতিক জীবনের অধিকাংশই রক্তে লাল হয়ে আছে। ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই ভারতের বিভিন্ন জায়গায়, ঘরে গরুর মাংস রাখার অভিযোগে অথবা সন্দেহে এখনো মুসলিমদের পিটিয়ে হত্যা করে চলেছে তার দল বি জি পি ও অনুসারীরা। এদিকে কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের আগে থেকেই সবধরনের টেলিভিশন সম্প্রচার বন্ধ রাখায় ওই উপত্যকার বাসিন্দারা বেয়ারের সঙ্গে মোদির ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ড অনুষ্ঠানটি দেখার সুযোগ পায়নি। বাঘ হত্যা করতে পারবেন না বলে বেয়ারের সঙ্গে তিনি যে আলাপ করেন, তাতে দর্শক হিসেবে লজ্জা পেলেও কাশ্মিরিদের অনুভূতি জানা সম্ভব হয়নি। তবে ভারতে কিছু মানুষ যে মোদির এহেন কার্মকাণ্ডে লজ্জিত-অপমানিত কিংবা ঘৃণা বোধ করে না, বিষয়টি মোটেও তেমন নয়। আর সেজন্যই পশ্চিমবঙ্গের প্রখ্যাত প্রামাণ্য চলচ্চিত্রনির্মাতা সৌমিত্র দস্তিদার হেঁয়ালির ছলে বলেন,

ত্রিপুরায় ক্ষমতায় আসার পরে পরেই তুমি লেনিন মূর্তি ভেঙ্গেছিলে আমি মনে রেখেছি। প্রদেশ কংগ্রেসের সদর দপ্তরে তোমার লুম্পেন বাহিনী হামলা করেছে যা এদেশে আর কখনো হয়নি। তাও আমাদের ক্রুদ্ধ করেছে। তুমি একতরফা সিদ্ধান্ত নিয়ে কাশ্মীরকে বধ্যভূমি করে তুলেছো তাও মনে মনে আমরা মেনে নিইনি। তুমি এন আর সির নামে ঘুষপেটিয়া বলে একটা সম্প্রদায়ের ওপর অলিখিত যুদ্ধ ঘোষণা করেছো, বিচলিত বোধ করেছি। দেশের অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে তোমার জন্য। আর আজ জে এন ইউএর তরুণদের বিরুদ্ধে তুমি সন্ত্রাস নামিয়ে এনেছো। তুমি রাষ্ট্র। অন্ধ ধৃতরাষ্ট্র। অন্ধ না হলে প্রতিবাদী মিছিলের দীর্ঘ সারি চোখ এড়াতো না।

দারিদ্র্যের গল্প বিক্রির ফেরিওয়ালা মোদিজী

২০১৪ খ্রিস্টাব্দের ২৬ মে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর পাঁচ বছরের মধ্যে একবারও দেশটির সাংবাদিকদের মুখোমুখি হননি নরেন্দ্র মোদি। স্বাধীনতার পর গণতান্ত্রিক ভারতের তিনিই প্রথম প্রধানমন্ত্রী, যিনি সরকারের মেয়াদকালে একটি সংবাদ সম্মেলনও করেননি! সর্বশেষ লোকসভা নির্বাচন চলার শেষ পর্যায়ে এসে সাংবাদিকদের সামনে উপস্থিত হলেও লিখিত বক্তব্য দেওয়ার পর প্রশ্নোত্তরপর্বে মুখে কুলুপ এঁটে ঠাঁই বসে ছিলেন তিনি। তার হয়ে সংবাদ সম্মেলনে জবাব দেন তৎকালীন বি জে পি দলের সভাপতি অমিত শাহ। প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্নের উত্তর না দেওয়ায় দেশটির প্রভাবশালী সংবাদপত্র টেলিগ্রাফ ১৮ মে দিনের প্রধান খবরের জায়গা ফাঁকা রেখে পত্রিকা প্রকাশ করে! পত্রিকার প্রথম পাতার ফাঁকা জায়গায় বড়ো করে নৈঃশব্দের একটি সাঙ্কেতিক চিহ্ন ব্যবহার করে নিচে লিখে দেয়--১ হাজার ৮১৭ দিন অপেক্ষার পর যে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে তাতেও নিঃশব্দ নেমে এসেছে। এরপর ছোটো ছয়টি ছবি পাশাপাশি রেখে সংবাদ সম্মেলনে মোদির অভিব্যক্তি কী ছিলো সেটা প্রকাশ করেছে টেলিগ্রাফ। এতে দেখা যায়, যখন প্রশ্নোত্তর পর্ব শুরু হয়, তখন গালে হাত দিয়ে আনমনা হয়ে ছিলেন মোদি। কখনো দেয়ালের দিকে আবার কখনো ছাদের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। ভিন্ন ছয়টি ছবির নিচে টেলিগ্রাফ ছয়টি ক্যাপশন দেয়। এই ছবিগুলোর নিচে একটি বক্স এঁকে ফাঁকা জায়গা রেখে নিচে পত্রিকাটি লিখেছে, এ ফাঁকা জায়গাটি টেলিগ্রাফ সংরক্ষণ করে রেখেছে। যখন প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নের উত্তর দেবেন তখন এ জায়গা পূরণ করা হবে। সুতরাং ফাঁকা জায়গায় চোখ রাখুন!

কিন্তু প্রশ্ন হলো, যে মোদি নিজের জীবনের কষ্টের কথা বলতে পছন্দ করেন, দারিদ্র্যের কথা উল্লেখ করে বেয়ারকে বিমোহিত করেন এবং মানুষকে উৎসাহ দেওয়ার চেষ্টা করেন(?), তার মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন হচ্ছে, ইয়োগার প্রসার চলছে, সেটা প্রচারও করতে ভালোবাসেন; একই সঙ্গে যিনি ভীষণ আত্মপ্রচারমুখী তিনি সাংবাদিকদের মুখোমুখি হতে ভয় পান কেনো? এর কারণ, তিনি হয়তো কারো কথা শুনতে পছন্দ করেন না। রেডিও, টেলিভিশনে ও মঞ্চে বক্তব্য দিতে ভালোবাসলেও সবকিছুরই যে একটি প্রতিউত্তর আছে তিনি হয়তো সেটা মেনে নেন না। যেমনটা কাশ্মির, আসামের জনগণের সঙ্গে করছেন। ফলে তিনি কেবল নিজের কথাই বলে যান, কাউকে শুনতে চান না। কাশ্মির, গুজরাট, ধর্ষণ, হত্যা, অর্থনীতি, দাম্পত্য জীবন, আসামের এন আর সি, নকশালদের ওপর দমনপীড়ন, নাগাল্যান্ডে বৈষম্য, দলিতদের অধিকারসহ নানা বিতর্কিত ইস্যু নিয়ে প্রশ্নের সম্মুখীন হওয়ার ভয়েই হয়তো মোদি সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন না--সেটা মোটেই অমূলক নয়। ফলে দেশের মানুষ কী জানতে চায়, সেটা তার কাছে মুখ্য বিষয় নয়; তিনি কেবল জোর করেই তার দারিদ্র্য, চা বিক্রি, হিমালয়ে কাটানোর গল্প করে হিন্দুত্ববাদীদের কাছ থেকে আরো সহানুভূতি আদায় করে ক্ষমতায় থাকতে চান। আর সে কারণেই মোদির শিশুকাল থেকে সব তথ্য সাধারণ মানুষ জানলেও তার কৃতকর্মের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে তাদের জানার সুযোগ হয় না। ফলে নিজের কর্মকাণ্ডের জন্য গণমাধ্যম নামক আয়নার সম্মুখীন না হয়ে, তিনি কতোদিন দারিদ্র্যের গল্প বিক্রি করে মানুষকে বিভোর রাখতে পারেন সেটাই দেখার বিষয়।

বিষয়টা হাস্যকরই বটে

শুরুতেই বলেছি, ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে পরিবেশে অবদানের জন্য জাতিসংঘের চ্যাম্পিয়ন্স অব দ্য আর্থ অ্যাওয়ার্ড পান নরেন্দ্র মোদি। ভারতের আন্তর্জাতিক সৌর জোটে অন্তর্ভুক্ত হওয়া এবং ২০২২ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ভারত থেকে ওয়ানটাইম প্লাস্টিক দূর করার ঘোষণা দেওয়ায় তাকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়। প্রশ্ন হলো, যে দুই উদ্যোগের জন্য মোদি এ পুরস্কার পেলেন সেগুলোর বর্তমান অবস্থা কী? এককথায় উত্তর দিলে ভয়াবহ! কারণ সৌর জোটে ভারত অন্তর্ভুক্ত হলেও দেশটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বের হওয়ার চেয়ে বরং আরো জড়িয়ে পড়ছে। অন্যদিকে ২০২২ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ওয়ানটাইম প্লাস্টিক নিষিদ্ধের প্রক্রিয়া কেবল মোদির ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। ভারতে প্রতিবছর যে ৯৫ লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয়, তার ৪৩ শতাংশই ওয়ানটাইম প্লাস্টিক। যেগুলো কোকোকোলাসহ বড়ো বড়ো প্রতিষ্ঠান উৎপাদন করে। আর এসব প্রতিষ্ঠানের চাপেই পরিবেশবাদী মোদিজী তার অবস্থান থেকে সরে এসেছেন। ফলে ২০২২ খ্রিস্টাব্দের লক্ষ্যমাত্রা নিকটে এগিয়ে আসলেও এ বিষয়ে তিনি নীরবতা পালন করছেন। অন্যদিকে তিনি যে কাজের জন্য পুরস্কার পেলেন, সেটা পূরণে ব্যর্থ হলেও পুরস্কার ফিরিয়ে নেওয়ার বিধান না থাকায় আপাতত তার ট্রফি হারানোর ভয় নেই!

অন্যদিকে অনুষ্ঠানজুড়ে মোদি ভারতের জাতীয়তাবাদ, প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য, দেশপ্রেম নিয়ে মুখে ফেনা তুলে ফেললেও দেশটির বিরোধী দল কংগ্রেস অভিযোগ করেছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে পুলওয়ামার হামলায় নিহত ৪০ জন জওয়ানের দেহাংশ যখন শনাক্ত করতে গোটা দেশ হিমশিম খাচ্ছিলো, তখন প্রধানমন্ত্রী নৌকায় চড়ে ক্যামেরার সামনে ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ডের জন্যই শুটিং করছিলেন! হামলার খবর পাওয়ার পরও তিনি শুটিং চালিয়ে গিয়েছেন। কংগ্রেসের মুখপাত্র রণদীপ সিং সুরজেওয়ালা বলেন, জঙ্গি নাশকতায় ৪০ জন সিআরপিএফ জওয়ানকে হারিয়ে গোটা দেশ যখন শোকে বিহ্বল, তখন প্রধানমন্ত্রী শুটিংয়ে ব্যস্ত ছিলেন, বিশ্বের কোথাও এমন প্রধানমন্ত্রী আছেন? এ ধরনের আচরণ দেশের প্রধানমন্ত্রীর থেকে কি কাম্য? সে সময় অবিলম্বে নিরাপত্তা নিয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক না করে শুটিং করছিলেন। তবে কংগ্রেসের অভিযোগের জবাবে বি জে পি সভাপতি অমিত শাহ বলেন, প্রধানমন্ত্রী দিনে ১৮ ঘণ্টা কাজ করেন। দেশের নিরাপত্তায় তার দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুললে তা দেশবাসীর মনে কোনো প্রভাব ফেলবে না। কিন্তু দেশভক্ত বলে নিজেকে পরিচয় দেওয়া মোদি সেসময় আসলেই পুলওয়ামায় হামলা চলার পরও শুটিং চালিয়ে যাচ্ছিলেন কি না সেটা পরিষ্কার করেননি অমিত শাহ। ফলে কেউ ১৮ ঘণ্টা কাজ করলেই সমস্ত দায়বদ্ধতার ঊর্ধ্বে উঠে যাবেন, বিষয়টি মোটেও তেমন নয়। আর কেউ যদি নিজেকে দেশপ্রেমিক হিসেবে প্রচার করতে ভালোবাসে তার ক্ষেত্রে বিষয়টি তো আরো গুরুতর।

অন্যদিকে ৪১ মিনিট ২৩ সেকেন্ডের অনুষ্ঠান ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ড সম্প্রচারের আগে ব্যাপক প্রচারের কারণে বিশ্বব্যাপী বিপুলসংখ্যক দর্শক অনুষ্ঠানটি উপভোগ করে। বিষয়টি বুঝতে পেরে মোদিও পুরো অনুষ্ঠানে নিজের ব্র্যান্ডিং করেন। মোদি আসলে বরাবরই চমক দেখাতে পছন্দ করেন। ধারণা করা হচ্ছে, এই চমক দেখানোর জন্যই তিনি এ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা দুঃসাহসী অভিযাত্রী বেয়ারের সঙ্গী হয়েছিলেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমবান্ধব মোদি টুইটারে বেশ সক্রিয়। টুইটারে তার অনুসারী চার কোটি ৯০ লাখ। ৬৮ বছর বয়সি মোদি নিয়মিত যোগব্যায়াম করেন এবং সেই ভিডিও পোস্ট করতে পছন্দ করেন। তবে অনুষ্ঠানজুড়ে পরিবেশের কথা বললেও করবেট জাতীয় উদ্যানে হেলিকপ্টার ও গাড়ি নিয়ে গিয়ে মোদি বন্য প্রাণীর অবাধ চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করেছেন বলে অভিযোগ করেছে দেশটির প্রাণী বিশেষজ্ঞরা। বন্য প্রাণী সংরক্ষণে পদ্মশ্রী পুরস্কারজয়ী প্রশান্ত কুমার সেন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এই অনুষ্ঠান নিছকই পর্যটনের প্রচার। এর সঙ্গে বন, বন্য প্রাণী সংরক্ষণের সম্পর্ক আছে বলে মনে হয় না। এছাড়া দেশটির বাঘ বিশেষজ্ঞ বিশ্বজিৎ রায়চৌধুরী অভিযোগ করেন, মোদি উল্টো বনের নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করেছেন।

গল্পগুজব, নানা অভিজ্ঞতা বিনিময়ের পর অনুষ্ঠান শেষে বেয়ার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে সিক্রেট সার্ভিস-এর লোকজনের হাতে তুলে দেন। বোঝা যায়, রোমাঞ্চকর পরিবেশ তৈরিতে বেয়ার একটু পর পর বাঘের কথা তুললেও গোটা অনুষ্ঠানজুড়ে ক্যামেরার পিছনে কলাকুশলীরা ছাড়াও সিক্রেট সার্ভিসের প্রশিক্ষিত সদস্যরাও ছিলো। সবমিলে গোটা অনুষ্ঠান কেবল নির্ধারিতই নয়, অত্যন্ত সুপরিকল্পিতও বটে। ফলে বেয়ার যখন মোদিকে প্রশ্ন করেন, কখনো প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখেছেন কি না--তখন তিনি সেটা কেবল উন্নয়নের দিকে নিয়ে যান। মোদি বলেন,

আমি সবসময় জাতির উন্নয়নের প্রতি জোর দিয়েছি। আমি প্রথমে একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ছিলাম। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে আমি ১৩ বছর কাজ করেছি। সেটা আমার জন্য নতুন যাত্রা ছিলো। এরপর দেশ আমাকে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমি এই দায়িত্ব পাঁচ বছর পালন করেছি। তবে সবসময় একটা বিষয়ের ওপরই জোর দিয়েছি, সেটা হলো উন্নয়ন। আমি আমার কাজে সন্তুষ্ট।

ইউটোপিয়াই ডিসটোপিয়া

২০১৮ খ্রিস্টাব্দে অনলাইন স্ট্রিমিং প্লাটফর্ম নেটফ্লিক্সে রাধিকা আপ্তে অভিনীত তিন পর্বের ওয়েব সিরিজ ঘুল (Ghoul) মুক্তি পায়। সিরিজের শুরুতে স্ক্রিনে লেখা ওঠে, অদূর অভিষ্যতের ভারতকে দেখানো হচ্ছে। রাধিকা আপ্তে এখানে নিদা রহিম নামে এক মুসলিম নারীর চরিত্রে অভিনয় করেন। নিদা ভারতে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য স্থাপিত ন্যাশনাল প্রটেশন স্কোয়ার্ড (এন পি এস) থেকে ট্রেনিং নেন। একদিন নিদার বাবা গাড়ি চালিয়ে নিদাকে অ্যাকাডেমিতে পৌঁছে দিতে গিয়ে আলোচনা করেন দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে। মুসলিম মহল্লায় রাতে পুলিশ কীভাবে মানুষের জিনিসপত্র, বিশেষ করে বিভিন্ন বই বের করে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে, দিনের পর দিন স্কুল-কলেজ বন্ধ রাখছে, বাড়ির পুরুষ সদস্যদের অজ্ঞাত স্থানে তুলে নেওয়া হচ্ছে সেই বিষয়ে মন্তব্য করেন। বাবার এসব কথা শুনে নিদা জানান, দেখো রাষ্ট্র যখন কোনো কিছু করে, তখন সেটার কোনো না কোনো মানে থাকে, শুধু শুধু কাউকে গ্রেপ্তার করে না। কেবল নিরীহ, নির্দোষ মানুষকেই গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাচ্ছে সেটা ঠিক নয়। নিশ্চয় ওরা কিছু করেছিলো যেটা তুমি জানো না।

কথা বলতে বলতে নিদা তাকিয়ে দেখেন তার বাবা গাড়িতে কিছু বই নিয়ে যাচ্ছেন। নিদা অবাক হয়ে প্রশ্ন করেন, বাবা তুমি বই নিয়ে যাচ্ছো মানে কি? না ওখানে কিছু লেকচারের নোট রয়েছে। তার মানে তুমি এখনো সিলেবাসের বাইরের বিষয় পড়াও? এটা যে নিষিদ্ধ তুমি জানো না? তুমি কি কখনো ভালো হবে না? এ কথা বলতে বলতে রাস্তায় রুটিন চেকপোস্টে পুলিশ তাদের গাড়ি থামিয়ে আই ডি কার্ড দেখতে চায়। নিদার বাবার কার্ডে মুসলিম নাম দেখে পুলিশ তাকে গাড়ি থেকে নামতে বলে। একই সঙ্গে গাড়িতে করে অস্ত্র, গরুর মাংস নাকি অন্য কোনো নিষিদ্ধ পণ্য বহন করছে সে বিষয়ে জানতে চায়। তখন নিদার বাবা জানান, তার সঙ্গে বিদ্বেষপূর্ণ আচরণ করা হচ্ছে, দেশের নাগরিক হিসেবে তার সব জায়গায় যাওয়ার অধিকার রয়েছে। একপর্যায়ে গাড়ি থেকে নামতে দেরি হওয়ায় জামার কলার ধরে নামাতে গেলে নিদা গাড়ি থেকে নেমে নিজের পরিচয় দিলে পুলিশ দুঃখ প্রকাশ করে তাদেরকে ছেড়ে দেয়। রাস্তায় যেতে যেতে নিদার মনে পড়ে, অ্যাকাডেমিতে এক ভাষণের কথা। তার উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তা তাদেরকে বলেন, উগ্রপন্থি কখনো বাইরে থেকে আসে না। উগ্রপন্থি তোমাদের ভিতরেই আছে। সেটা তোমাদের বন্ধু, প্রতিবেশী এমনকি তোমাদের পরিবারের সদস্যও হতে পারে; সুতরাং তাদের প্রতি নজর রাখো। যদি কেউ সন্দেহজনক আচরণ বা কাজ করে, আমাদের কাছে রিপোর্ট করো। কারণ দেশের চেয়ে বড়ো বন্ধু, আত্মীয় আর কেউ নেই।

নিদা কিছুক্ষণ ভেবে তার বাবাকে ইন্টারোগেশন বাহিনীর হাতে তুলে দেন; ভেবেছিলেন বাবাকে ভয় দেখালে তিনি হয়তো লাইনে চলে আসবেন। কিন্তু তাদের হাতে তুলে দেওয়ার পর তার বাবার আর খোঁজই মেলে না। একপর্যায়ে নিদাও ওই ইন্টারোগেশন টিমে যোগ দেন। সেখানে কিছুদিন থাকার পর বুঝতে পারেন, সেখান থেকে কেউ আর ফিরে যায় না। তার বাবা সাধারণ একজন অধ্যাপক হওয়ার পরও তাকে হত্যা করা হয়েছে। সবকিছু জানার পর নিদার মনে হয়, রাষ্ট্রকে যতোটা কল্যাণকর মনে করে তিনি এতোদিন পূজা করছিলেন, রাষ্ট্র আদৌ তেমনটা নয়। এরই মধ্যে সেখানে একজনের ওপর পিশাচ ঘুল ভর করে। যে একে একে সবাইকে হত্যা করে। এ সময় পিশাচের প্রভাবে সবাই নিজেদের দুঃস্বপ্ন দেখতে থাকে। দর্শক হিসেবে একপর্যায়ে প্রশ্ন জাগে, পিশাচ ঘুল আসলে কে? সন্ত্রাসবাদী আসলে কে? আর রাষ্ট্রইবা কে? ঘুল ওয়েব সিরিজ একটি ডিস্টোপিয়া শো; ডিস্টোপিয়া হলো ইউটোপিয়ার বিপরীত। ইউটোপিয়া হলো একটি কল্পিত পৃথিবী যেখানে সবকিছু ভালো। ফলে ডিস্টোপিয়া হলো, সেই কল্পিত পৃথিবী যেখানে সবকিছুই খারাপ। অনেকের কাছে কোনো কিছু ইউটোপিয়া হলেও অনেকের কাছে তা ডিস্টোপিয়া হওয়া অস্বাভাবিক নয়।১০ ফলে মোদির ভারতের অধিকাংশ গণমাধ্যমে যা কিছু কল্যাণকর, ইউটোপিয়া বলে প্রচার হয়, তা আসলেই ডিস্টোপিয়া বই কিছুই নয়।

 

লেখক : ইব্রাহীম খলিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ব্যুরো অব ইকোনোমিক রিসার্চের টোব্যাকো ট্যাক্স প্রজেক্টের প্রকল্প কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত।

ibrahimrumcj@gmail.com

https://www.facebook.com/ibrahimrumcj

 

তথ্যসূত্র

1.https://bit.ly/37gX0am; retrieved on: 01. 11. 2019

2.https://www.amadershomoy.com/bn/2019/10/06/989057.htm; retrieved on: 01. 11.2019

3.https://www.amadershomoy.com/bn/2019/10/06/989057.htm; retrieved on: 01. 11.2019

4.https://bbc.in/2r9R9D2; retrieved on: 01. 11. 2019

৫.লাইনগুলো সৌমিত্র দস্তিদারের ফেইসবুকের টাইমলাইনhttps://www.facebook.com/permalink.php?story_fbid=2265239557099588&id=100008406968120 থেকে নেওয়া হয়েছে। যেটি তিনি চলতি বছরের ১৯ নভেম্বর পোস্ট করেছেন।

6.https://bengali.indianexpress.com/politics/congress-on-pulwama-attack-pm-modi-shooting-film-76923/#; retrieved on: 01. 11.2019

7.https://bengali.indianexpress.com/politics/congress-on-pulwama-attack-pm-modi-shooting-film-76923/#; retrieved on: 01.11.2019

8.https://bit.ly/2D0frCa; retrieved on: 01. 11.2019

9.https://bit.ly/2D0frCa; retrieved on: 01. 11.2019

10.https://www.youtube.com/watch?v=nQ0MJWC-CVc&t=444s; retrieved on: 01. 11.2019

 

বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ১৮তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২০ এ প্রকাশিত হয়েছে।

 

 

 

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন