Magic Lanthon

               

জাহাঙ্গীর আলম

প্রকাশিত ১০ আগস্ট ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

দৃশ্যগত মাধ্যমে ইতিহাস বদলের রাজনীতি : প্রসঙ্গ ‘মুক্তি’

জাহাঙ্গীর আলম



মুক্তি এবং মুক্তিযুদ্ধ

একাত্তরে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। নয় মাসের এই যুদ্ধের শেষের দিকে ভারত প্রত্যক্ষভাবে এতে জড়িয়ে পড়ে। যা যুদ্ধকে দ্রুত সমাপ্তির দিকে নিয়ে যায়। ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে ইউটিউবে প্রকাশিত মুক্তি : বার্থ অব আ নেশন নামে স্বল্পদৈর্ঘ্যরে চলচ্চিত্রে এই যুদ্ধ সমাপ্তিতে ভারত ও পাকিস্তানের দরকষাকষি ও আপসরফার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

হাতে আর মাত্র ৩০ মিনিট সময়--ভারতের মেজর জেনারেল জে এফ আর জ্যাকব আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষরের আগে পাকিস্তানের লেফটেনেন্ট জেনারেল এ এ কে নিয়াজিকে এভাবেই আল্টিমেটাম দেন। এই চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে যুদ্ধের সমাপ্তি ও স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম ত্বরান্বিত হয়। মুক্তির কাহিনি পাকিস্তানের আত্মসমর্পণের পিছনের ঘটনা নিয়ে আবর্তিত হয়েছে। ইতিহাসে এটাই একমাত্র আত্মসমর্পণের ঘটনা, যা চার ঘণ্টা ধরে জনসাধারণের উপস্থিতিতে সম্পন্ন হয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশের জন্ম ও বিংশ শতাব্দীতে ভারতীয় উপমহাদেশে গুরুত্বপূর্ণ একটি সঙ্কটের সমাপ্তি ঘটে।

মুক্তির সময়সীমা ১৭ মিনিট। এর নির্মাতা মনু চৌবে (Manu Chobe)। প্রযোজক সনিলিভ ও রিয়েলুশন। সনি পিকচারস নেটওয়ার্কের ইউটিউব চ্যানেল সনিলিভে ২০১৭ খ্রিস্টাব্দের ১৪ আগস্ট এটি মুক্তি দেওয়া হয়। চলচ্চিত্রটি প্রকাশের দিনটি ছিলো পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস। এর পরের দিন ১৫ আগস্ট ভারতের স্বাধীনতা দিবস। ২০১৯ খ্রিস্টাব্দের ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত চলচ্চিত্রটি ইউটিউবে ভিউ হয়েছে ২৮ লাখ ৩৬ হাজার বার। একটি মীমাংসিত বিশাল ঘটনা নিয়ে মাত্র ১৭ মিনিটের এই চলচ্চিত্রটির ব্যাপারে আলোচনা-সমালোচনা হওয়ায় মনে প্রশ্ন জাগে। দৃশ্যগত এই মাধ্যমটির যে রাজনীতি সেটা বোঝাও জরুরি হয়ে পড়ে। আর সেই লক্ষ্য থেকেই এই প্রচেষ্টা।

পিছনের ইতিহাস

১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ১৬ ডিসেম্বরে জ্যাকব ও নিয়াজির দরকষাকষিকে কেন্দ্র করে মুক্তি আবর্তিত হয়েছে। যেকোনো কিছু বর্ণনা দিতে গিয়ে আগে-পরের ইতিহাস পর্যালোচনার যে ধরন সেটা নতুন নয়। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কথা বলতে গেলেও তাই ৪৭-এর দেশভাগ, ৫২র ভাষা আন্দোলন, ৬৬র ছয় দফা ও ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান নিয়ে বেশি আলোচনা হয়। এ সময় বাঙালি জাতীয়তাবাদ বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে দ্বিজাতি তত্ত্বের অসারতাও আলোচনায় আসে। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের কথা খুব কমই আলোচিত হয়। এখনকার আলোচনাতেও ওই বিষয় নিয়ে খুব বেশি কথা বলার সুযোগ নেই। কেবল এটাই জানানোর আছে যে, বাংলা অঞ্চলে পাকিস্তান আন্দোলনের দৃঢ় জনভিত্তি ছিলো। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান আন্দোলনের একনিষ্ঠ কর্মী ছিলেন। তার আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে এর প্রমাণ ভালোভাবেই পাওয়া যায়। ওই সময় ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে কেবল বাংলাতেই মুসলিম লীগ সরকারে ছিলো।

ইংরেজ শাসনে ১৯০৫-এ বঙ্গভঙ্গ হয়। কলকাতার এলিট সমাজের প্রবল বিরোধিতার মুখে তা রদ করা হয় ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে। এর প্রায় সাড়ে তিন দশক পর বাংলা ভাগ হলেও ওই এলিট সমাজের তেমন বিরোধিতা আর দেখা যায়নি। বরং তারা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে। এর কারণ কী? আগেই বলেছি, তখন বাংলায় হোসেন সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে মুসলিমরা ক্ষমতায় ছিলো। তাহলে কি অভিভক্ত বাংলায় মুসলিম নেতৃত্ব নিয়ে শঙ্কায় ছিলো কলকাতার এলিট সমাজ? জয়া চ্যাটার্জি তার বাংলা ভাগ হল গ্রন্থে বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন।

পাকিস্তান সৃষ্টির পর পূর্ব বাংলার মানুষের মোহভঙ্গ হতে সময় লাগেনি। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকেরা ২৩ বছর পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) দমন-পীড়ন চালিয়েছে। এ অঞ্চলের মানুষকে বঞ্চিত করা হয়েছে রাজনৈতিক-সামাজিক-অর্থনৈতিক অধিকার থেকে। সমান অধিকার দাবি করলে সামনে আনা হয় ষড়যন্ত্র তত্ত্ব। আওয়ামী লীগের ছয় দফাকে পাকিস্তান ভাঙার ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। যে আশায় বাংলার মানুষ পাকিস্তানের সমর্থক হয়েছিলো, তা পূরণ করার চেষ্টাও হয়নি। এর পরিবর্তে জুটেছে শোষণ-বঞ্চনা।

১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার পরও ক্ষমতা হস্তান্তর করেনি পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকেরা। আলোচনার আড়ালে কালক্ষেপণ ও চক্রান্ত করতে থাকে তারা। হুমকি-ধামকিতে আর কাজ হচ্ছিলো না। হামলার নীল নকশা চূড়ান্ত হয়। ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ রাতে সাধারণ মানুষের ওপর হামলা চালায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী, যা অপারেশন সার্চলাইট নামে পরিচিত। পাকিস্তানের কাপুরুষোচিত হামলার জবাবে বাংলার মানুষের অস্ত্র তুলে নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিলো না। বাঙালি সেনা, ছাত্র, কৃষকসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ নিয়ে গঠিত হয় মুক্তিবাহিনী। মুক্তিতে মাত্র কয়েকবার উচ্চারিত হয়েছে মুক্তিবাহিনীর নাম। মূলত মুক্তিতে মুক্তিযুদ্ধের শেষ অঙ্ক তুলে ধরা হয়েছে।

কী আছে মুক্তিতে

মুক্তি উৎসর্গ করা হয়েছে ভারতীয় সেনাদের উদ্দেশে। কোনো ডিসক্লেইমার নেই; বরং দাবি করা হয়েছে এটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত। শুরু হয়েছে বিক্ষুব্ধ জনতার সড়ক অবরোধের ভিডিও ক্লিপ দিয়ে। পর্দায় লেখা, ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দ ভারতীয় উপমহাদেশের জন্য সমস্যাসঙ্কুল বছর। তবে ওই ভিডিওতে স্থান উল্লেখ করা হয়নি। ধারণা করা যায়, এটি পূর্ব পাকিস্তানের কোনো স্থান। ৬২-এর ছাত্র আন্দোলন, ৬৬র ছয় দফা ঘোষণার প্রতিক্রিয়া, ৬৮র আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ৭০-এর নির্বাচন এবং বিজয়ী আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় পুরো ৬০-এর দশক ঢাকা ছিলো বিস্ফোরন্মুখ।

এরপর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভিডিও ক্লিপ। সেখানে তার পরিচয় হিসেবে লেখা রয়েছে আওয়ামী লীগ নেতা। তার নামের বানান ইংরেজিতে লেখা হয়েছে Sheikh Mujeeb-ur-Rehman. প্রকৃতপক্ষে তার নামের বানান Sheikh Mujibur Rahman। তিনি বলছেন, কারো আগুন নিয়ে খেলা উচিত নয়। আইনত আমিই শাসনকর্তা (অথোরিটি)। কারণ জনগণ আমাকে ভোট দিয়েছে। এই ক্লিপে তারিখ উল্লেখ নেই। তার এই কথায় নির্বাচনে জয়ী হলেও ক্ষমতা না পাওয়ার বিষয়টি ফুটে ওঠে। এ হিসাবে ভিডিওটি ৭০ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বরে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর এবং ২৫ মার্চ অপারেশন সার্চলাইট শুরু হওয়ার আগে কোনো এক সময়ের।

পর্যায়ক্রমে আসে পাকিস্তানের পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বক্তৃতার ভিডিও ক্লিপ। ভুট্টো এক জনসভায় ভারতকে আক্রমণকারী হিসেবে অভিহিত করে বলছেন, তারা (ভারত) তৃতীয়বারের মতো নগ্ন হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে ইন্দিরা গান্ধী এক সাক্ষাৎকারে বলছেন, সেখানকার গণহত্যা বন্ধ হবে, ধর্ষণ বন্ধ হবে। তিনি একপর্যায়ে সাক্ষাৎকারগ্রহীতার প্রতি প্রশ্ন ছুড়ে দেন, আপনি কী ভাবছেন, জনগণ বসে থাকবে? তাদের সামনে নারীদের ধর্ষণ করা হচ্ছে, সেটা বসে বসে দেখবে?

এরপর পর্দায় লেখা ওঠে, ৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ সঙ্কট মারাত্মক আকার ধারণ করে ...। পাকিস্তান হামলা করে ...। এরপর রণতরী থেকে যুদ্ধবিমান উড্ডয়ন ও কামান দাগার ভিডিও ক্লিপ। পর্দায় লেখা আসতে থাকে--যুদ্ধে পরাজয় জেনেও পাকিস্তানকে সমর্থন করতে থাকে আমেরিকা, চাপ দিতে থাকে যেনো অন্তত যুদ্ধ বিরতির মাধ্যমে রক্ষা পাওয়া যায় ...। ১৬ ডিসেম্বর ভারতের এক সেনার কাঁধে দায়িত্ব আসে যুদ্ধবিরতি নিয়ে দরকষাকষি এবং যুদ্ধ শেষ করার ...। সেই সেনা মেজর জেনারেল জে এফ আর জ্যাকবের মাথায় ছিলো ভিন্ন চিন্তা।

জেনারেল জ্যাকব ও তার অধস্তন এক ক্যাপ্টেনের কথোপকথন দিয়ে শুরু হয় মুক্তি। ক্লোজ শটে জ্যাকব লাইটার দিয়ে পাইপ ধরান। যা ১৬ ডিসেম্বরের তপ্ত পরিস্থিতির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। দুজনের কথা থেকে বোঝা যায়, তারা ঢাকায় জাতিসংঘের প্রবিধান অনুযায়ী যুদ্ধবিরতি নিয়ে কথা বলতে এসেছেন। তবে জ্যাকব তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা থেকে সরে এসেছেন। পাকিস্তানি বাহিনী যাতে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়, সে বিষয়ে তিনি পরিকল্পনা করছেন। ইতোমধ্যে তিনি জেনারেল এ এ কে নিয়াজিকে ৩০ মিনিটের আল্টিমেটাম দিয়ে এসেছেন।


ফ্লাশব্যাকে জ্যাকব ও নিয়াজির কথোপকথন থেকে জানা যায়, পাকিস্তানি বাহিনী যুদ্ধবিরতি ও জাতিসংঘের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে প্রস্তুত। ভারতীয় বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণের প্রস্তাবে নিয়াজি বিস্মিত হন। তিনি হুমকি দেন, ঢাকা থেকে বের হয়ে না গেলে একজন ভারতীয় সেনাও জীবন নিয়ে ফিরতে পারবে না। নিয়াজি বলেন, পূর্ব পাকিস্তান আমার কব্জায়। ঢাকা আমার কেল্লা। উত্তরে জ্যাকব বলেন, পূর্ব পাকিস্তান বাঙালিদের দখলে। ইতিহাস থেকে আমরা জানি কেল্লার পতন হয়। ঢাকারও পতন হবে। তিনিও হুমকি দিয়ে বলেন, ৩০ মিনিটের মধ্যে আত্মসমর্পণের চুক্তিতে স্বাক্ষর না করলে তার (নিয়াজি) সৈন্যদের পরিণতির জন্য তিনি দায়ী থাকবেন।

জ্যাকব ও নিয়াজির কথোপকথন


ফ্লাশব্যাক থেকে ফিরে আসা। ফের জেনারেল জ্যাকব ও ক্যাপ্টেনের কথোপকথন। ক্যাপ্টেন প্রশ্ন করেন, এ কেমন যুদ্ধ কৌশল? এখানে সাফল্যের সম্ভাবনা ১০ ভাগের এক ভাগ। এটা বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তবে জ্যাকব তার পরিকল্পনা নিয়ে মরিয়া। তিনি বলেন, যুদ্ধ শেষ হলে শ্যাম (ভারতের সেনা প্রধান শ্যাম মানেকশ) কোর্ট মার্শাল করতে পারে। কিন্তু এখন এটাই করতে হবে। হয় যুদ্ধ শেষ হবে, অথবা আমি আমার জীবনের সবচেয়ে বড়ো ভুলটি করবো। তখন ক্যাপ্টেন জানতে চান আসলেই তিনি নিয়াজিকে কী বলেছেন।

জ্যাকব জানান, তিনি (নিয়াজি) আত্মসমর্পণের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং তাকে তখনই বের হয়ে যেতে বলেছেন। একই সঙ্গে তিনি আগামী এক হাজার বছর যুদ্ধ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। জ্যাকব বলেন, তাদের (পাকিস্তানি বাহিনী) জন্য কোনো সাহায্য আসছে না। বর্তমান  সৈন্য সংখ্যা ও মজুদ গোলাবারুদ দিয়ে বড়োজোর ১০-১২ দিন যুদ্ধ করতে পারবে। ছুরি দিয়ে মাখন কাটার মতো তোমার দিকে মুক্তিবাহিনী এগিয়ে আসছে। তোমার কোনো বিকল্প নেই। এ সময় ভারতের বিরুদ্ধে মুক্তিবাহিনী গঠন, প্রশিক্ষণ ও অস্ত্রপাতি দেওয়ার অভিযোগ করেন নিয়াজি। ভারতের কারণেই পূর্ব পাকিস্তানে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

পাল্টা যুক্তি তুলে ধরে জ্যাকব বলেন, তুমি কীভাবে মুক্তিবাহিনী সৃষ্টির অভিযোগ করো? কে রাজাকার তৈরি করেছে? কে অপারেশন সার্চলাইচ বাস্তবায়ন করেছে? কে ৩০ লাখ বাঙালিকে হত্যা এবং নারীদের ধর্ষণ করেছে? আমরা মুক্তিযোদ্ধা সৃষ্টি করিনি। তোমরা করেছো। জ্যাকব আরো বলেন, যখন তুমি তার আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রত্যাখ্যান করেছো, যখন তুমি তার জমি লুণ্ঠন এবং পরিবারকে হত্যা ও ধর্ষণ করেছ, তখন এটা আর পূর্ব পাকিস্তান নয়। এটা গর্বিত বাঙালি জাতি। তুমি দখলদার বাহিনী ছাড়া আর কিছুই নও। এরপর তাবু থেকে বেরিয়ে আসেন জ্যাকব।

৩০ মিনিট পর ফের নিয়াজির তাবুতে যান জ্যাকব। বিধ্বস্ত হতাশ নিয়াজি আত্মসমর্পণ চুক্তিতে রাজি হন। তবে তিনি ব্যক্তিগত অনুষ্ঠান আয়োজনের কথা বলেন। কিন্তু জ্যাকব জোর দিয়েই বলেন, এই আত্মসমর্পণ হবে জনসম্মুখে। একাত্তরের আগে ও পরে যতোবার ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ হয়েছে, তাতে কেউ আত্মসমর্পণ করেনি। আর সারাবিশ্বে এটাই প্রথম জনসম্মুখে আত্মসমর্পণের ঘটনা।

রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর, নিয়াজির পিস্তল হস্তান্তর, রাস্তায় জনতার উল্লাস ও স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের ভিডিও ক্লিপ দিয়ে ১৭ মিনিটের এই চলচ্চিত্রের সমাপ্তি ঘটে।

প্রামাণ্যচিত্র ও কাহিনিচিত্র : কোনটি সত্য-বাস্তব

চলচ্চিত্রকে বিশ্লেষণের জন্য অনেক বর্গে (ক্যাটাগরি) ভাগ করা হয়। এসব ক্যাটাগরি চিরায়িত কোনো বিষয় নয়। অনলাইন প্লাটফর্মের যুগে চলচ্চিত্রের নতুন ক্যাটাগরির সৃষ্টি হচ্ছে। পুরনো অনেক ক্যাটাগরি বাদ পড়ে যাচ্ছে। ভিডিওচিত্রকে যেসব ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়, তার মধ্যে অন্যতম প্রামাণ্যচিত্র (ডকুমেন্টারি) ও কাহিনিচিত্র (ফিচার ফিল্ম)। সাধারণভাবে মনে করা হয়, প্রামাণ্যচিত্র বাস্তব সত্য ঘটনার চিত্র উপস্থাপন করে। এতে কখনো কখনো কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর আগে ধারণ করা অডিও, ভিডিও, টেক্সট প্রভৃতি ব্যবহার করা হয়। এছাড়া স্ক্রিপ্ট ছাড়াই তাৎক্ষণিকভাবে শুটিংও করা হয়, যেখানে কোনো ঘটনা বা বিষয় সংশ্লিষ্ট বাস্তবের পাত্র-পাত্রী বা চরিত্ররাই থাকে। আর কাহিনিচিত্র হলো ফিকশন, যেখানে নির্মাতা পাত্র-পাত্রী নির্বাচন করে কোনো কল্পিত ঘটনা তুলে ধরে। আবার ডকুমেন্টারি ও ফিচারের মিশ্র সংস্করণও হতে পারে যা ডকুড্রামা হিসেবে পরিচিত।

সময় বিবেচনায় মুক্তি স্বল্পদৈর্ঘ্যরে। এতে ঘটনা সংশ্লিষ্ট আগের ভিডিও ফুটেজ যেমন ব্যবহার করা হয়েছে; আবার পাত্র-পাত্রী নির্বাচন করে শুটিংও করা হয়েছে। তবে মুক্তিকে ঠিক ডকুড্রামাও বলা যায় না। আবার মুক্তির ডিসক্লেইমার হিসেবে বলা হয়েছে, এটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত। সবমিলিয়ে চলচ্চিত্রটিকে খুব সচেতনভাবে, দৃশ্যগত মাধ্যমের যে রাজনীতি তার অংশ করে তোলা হয়েছে। এই রাজনীতি অবশ্য নতুন নয়। সত্য-বাস্তব আর ফিকশনকে এক করে এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করা, যেখানে সত্য-বাস্তবের আড়ালে প্রোপাগান্ডা চালানো যায়। প্রোপাগান্ডায় সবসময়ই কোনো একটি পক্ষের স্বার্থ থাকে।

চলচ্চিত্রে জেনারেল জ্যাকবকে নায়কোচিত, প্রত্যুৎপন্নমতি ও চৌকস সেনা কর্মকর্তা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তার সম্পর্কে বলা হয়েছে, ১৬ ডিসেম্বর ভারতের এক সেনার কাঁধে দায়িত্ব আসে যুদ্ধবিরতি নিয়ে দরকষাকষি এবং যুদ্ধ শেষ করার ...। সেই সেনা মেজর জেনারেল জে এফ আর জ্যাকবের মাথায় ছিলো ভিন্ন চিন্তা। কী সেই ভিন্ন চিন্তা? আত্মসমর্পণের কথা শুনে নিয়াজির এতোটা বিস্মিত হওয়ার কারণ কী? প্রকৃতপক্ষে জ্যাকব ও নিয়াজি দুজনেই আত্মসমর্পণের বিষয়টি জানতেন। নিয়াজির তাবুতে আত্মসমর্পণের যে দলিলে তাকে স্বাক্ষর করতে বলা হয়, সেটি আগেই ভারতের সেনা প্রধান জেনারেল মানেকশ অনুমোদন দেন। এ বিষয়ে আগেই নিয়াজির সঙ্গে তার বার্তা আদান-প্রদান হয়। ১৬ ডিসেম্বর জ্যাকব যখন নিয়াজির কার্যালয়ে আত্মসমর্পণের বিষয়ে কথা বলতে যান, সেখানে একাধিক পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা ছিলো। জ্যাকবের সারেন্ডার অ্যাট ঢাকা : একটি জাতির জন্ম এবং নিয়াজির দ্য বিট্রেয়াল অব ইস্ট পাকিস্তান গ্রন্থে এর সত্যতা মেলে। জ্যাকব তার গ্রন্থে বলেন,

১৬ ডিসেম্বর সকাল সোয়া নটায় জেনারেল মানেকশ ফোনে আমাকে অবিলম্বে ঢাকা গিয়ে সেই দিনই সন্ধ্যার মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের যাবতীয় ব্যবস্থা সম্পন্ন করতে বলেন। আত্মসমর্পণের দলিলের যে খসড়া এর আগে আমরা পাঠিয়েছিলাম, সেটা অনুমোদিত হয়েছে কিনা, এটা জানতে চাইলে প্রশ্নটি তিনি কৌশলে এড়িয়ে যান। আমি তখন জানতে চাইলাম, সুনির্দিষ্টভাবে কোন কোন বিষয়ে কী কাঠামোতে আমি আলোচনা করব। উত্তরে তিনি আমাকে বেশি ঝামেলা বাধাতে নিষেধ করলেন এবং বললেন কী করতে হবে, এটা আমি ভালই বুঝি। ব্রিগেডিয়ার সেথনাকে তিনি প্রয়োজনীয় নির্দেশ পাঠাবেন যাতে টাইপ-করা দলিল অরোরা হাতে করে নিয়ে আসতে পারেন। মানেকশকে আমি জানালাম, আমি একটি রেডিও মেসেজ পেয়েছি এবং তাতে নিয়াজি আমাকে লাঞ্চের নিমন্ত্রণ করেছেন যদিও আমি যেতে তেমন আগ্রহী নই। ... জেনারেল নিয়াজি তাঁর অফিসে আমাকে স্বাগত জানান। আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের উপদেষ্টা মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী, মেজর জেনারেল জামশেদ, নৌবাহিনী প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল শরিফ, বিমান বাহিনীর এয়ার কমোডর ইমাম ও বিগ্রেডিয়ার বকর সিদ্দিকী।

নিয়াজির গ্রন্থে দেখা যায়,

১৯৭১-এর ১৫ ডিসেম্বর রাত সাড়ে ১১টায় আমরা ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল মানেকশের জবাব পাই। তিনি যুদ্ধ বিরতি সংক্রান্ত আমার বার্তা প্রাপ্তির কথা স্বীকার করেন। তবে এ কথা জোর দিয়ে বলেন, জেনারেল ফরমান আলীর কাছে ইতিপূর্বে যে দুটি বার্তা পাঠিয়েছেন সে বার্তার আলোকেই আমাকে আত্মসমর্পণ করতে হবে। ... আমি জেনারেল মানেকশের জবাবের একটি কপি জেনারেল হেড কোয়ার্টার্সে পাঠাই এবং ১৫ ডিসেম্বব সেনাবাহিনী প্রধানের কাছ থেকে একটি সংকেত পাই। এতে আমাকে মানেকশের শর্তে আত্মসমর্পণের পরামর্শ দেওয়া হয়।

নিয়াজি আরেক জায়গায় উল্লেখ করেন,

ভারতীয় প্রতিনিধি দল এসেছিল যুদ্ধবিরতির শর্তাদি নিয়ে আলোচনার জন্য। তবে তাঁরা আলোচনা ছাড়াই আত্মসমর্পণের একটি খসড়া দলিল সঙ্গে করে নিয়ে আসেন। ... ভারতীয় প্রতিনিধি দল আমাকে হুমকি দেয়, আমরা তাদের শর্তে রাজি না হলে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আশ্রয়গ্রহণকারী স্থানীয় অনুগত লোকজন ও আমাদের বেসামরিক অফিসারদের মুক্তিবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হবে এবং মুক্তিবাহিনী তাদের হত্যা করবে। ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ কমান্ড শব্দের ব্যবহার এবং আত্মসমর্পণের স্থান ও ধরন সম্পর্কে আমাদের আপত্তি সত্ত্বেও ভারতীয় প্রতিনিধি দলের এ হুমকিতে আমরা তাদের শর্তে আত্মসমর্পণে রাজি হই।

সত্য ঘটনা অবলম্বনে মুক্তির নির্মাতার যে দাবি তা জ্যাকব ও নিয়াজির ভাষ্যের সঙ্গে কতোটা মিললো? বাস্তব কি ম্যাড়মেড়ে হয়? সেজন্য কি তার সঙ্গে রঙ লাগাতে হয়? নাকি উপস্থাপনার (রেপ্রিজেন্টেশন) ধরনই এমন, সময়-কাল-পাত্রে বদলে যেতে থাকে। পার্থক্য যাই থাকুক না কেনো, চলচ্চিত্র হিসেবে মুক্তি বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। দুই বছর তিন মাসে ইউটিউবে ২৮ লাখের বেশি ভিউ হয়েছে। ঘটনা যখন জানা থাকে, তখন অডিয়েন্সের মনোযোগ ধরে রাখা কিছুটা কঠিন বইকি। সবাই জানে, পাকিস্তান সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে। তারপরও চিত্রনাট্যে টানটান উত্তেজনা। ফ্লাশব্যাকের স্বার্থক ব্যবহার ও ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক শেষ পর্যন্ত আগ্রহ ধরে রাখে। মেদহীন সংলাপে মিলিন্দ সুমন ও যশপাল শর্মার অভিনয় সত্যিই প্রশংসনীয়।

রাডারে সবকিছু ধরা পড়ে না

ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে একাত্তরের যুদ্ধ একটি মাইলফলক ঘটনা। এই যুদ্ধকে উপজীব্য করে বলিউডে বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়েছে। এর মধ্যে অনেকগুলো বেশ জনপ্রিয়তাও পায়। তবে এসব চলচ্চিত্রের বেশিরভাগই ভারতের পশ্চিম সীমান্তে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে নির্মিত। অন্যদিকে পূর্ব রণাঙ্গন, যেখানে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে তা নিয়ে চলচ্চিত্র একেবারেই হাতেগোনা।

১৯৭১-এ রাজস্থান সীমান্তের মরুভূমির যুদ্ধকে কেন্দ্র করে চলচ্চিত্র বর্ডার (১৯৯৭) নির্মাণ করেন জেপি দত্ত। সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্রটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। এটি আইকনিক চলচ্চিত্রের মর্যাদা পেয়েছে। এটি এখনো ভারতের স্বাধীনতা দিবসে টেলিভিশনে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখানো হয়। জেপি দত্ত ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ নিয়ে একাধিক চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। তবে তিনি একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কোনো চলচ্চিত্র নির্মাণ করেননি। এ সম্পর্কে বি বি সি বাংলার এক প্রতিবেদনে মুম্বাইয়ের এই প্রবীণ পরিচালকের মনোভাব জানা যায়। সেখানে তিনি বলেন, বাংলাদেশের যুদ্ধ নিয়ে ছবি বানাতে গেলে গণহত্যা দেখাতেই হবে--কিন্তু পর্দায় সেটা দেখাতে আমি কখনও স্বাচ্ছন্দ বোধ করিনি। আর সেই কারণে আমি বিষয়টা ছুঁয়েও দেখিনি।

তবে ভারতীয় গবেষক ও প্রামাণ্যচিত্রনির্মাতা পঙ্কজ বুটালিয়ার মতে,

আমার ধারণা পশ্চিম সীমান্ত নিয়ে আমাদের মাতামাতিটাই এর বড় কারণ। আমরা ভারতীয়রা সবচেয়ে যাকে ঘৃণা করে, সেটা পশ্চিম পাকিস্তান। নানা কারণে তাদের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কটাই সবচেয়ে জটিল। দেশভাগের পর উত্তর ভারতে যারা শরণার্থী হয়ে এসেছিলেন, তারা কিন্তু এসেছিলেন ওই ভূখণ্ড থেকেই। তাদের চাওয়া-পাওয়াই কিন্তু বলিউডের ন্যারেটিভটা স্থির করে দিয়েছে--আর একাত্তরের যুদ্ধের অন্য ন্যারেটিভটা রয়ে গেছে নজরের বাইরে। বাংলাদেশ সৃষ্টির গুরুত্বটা তারা বুঝতেই পারেনি।

ভারতের বর্ষীয়ান চলচ্চিত্রকারদের মধ্যে শ্যাম বেনেগাল অন্যতম। সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার তাকে বঙ্গবন্ধুর বায়োপিক নির্মাণের জন্য মনোনীত করেছে। তার মতে, যে যাই ভাবুক না কেনো, শেষ বিচারে চলচ্চিত্র কিন্তু দেশের গরিষ্ঠ সংখ্যক মানুষের ইচ্ছারই প্রতিফলন। নইলে সেই চলচ্চিত্র কোনো দিনই চলবে না। চলচ্চিত্র একটা বাণিজ্য তা ভুললে চলবে না, নির্মাতারাও তা থেকে মুনাফাই করতে চান।

এ রকম পরিস্থিতিতে চলচ্চিত্রে আমরা জিতেছি, আমরা হারিয়েছি করে চিৎকার প্রধান হয়ে ওঠে। আর মসলা বা ফরমুলাভিত্তিক চলচ্চিত্রে তো একটা ভিলেন থাকতেই হবে। সেটা যে পাকিস্তান হবে তা বলার অপেক্ষায় রাখে না।

মুক্তিও এর ব্যতিক্রম নয়। চলচ্চিত্রটি শুরুর দিকে (এক মিনিট ৫৫ সেকেন্ড) আমরা নায়কের নাম জানতে পারি, যখন পর্দায় লেখা আসে, ১৬ ডিসেম্বর ভারতের এক সেনার কাঁধে দায়িত্ব আসে যুদ্ধবিরতি নিয়ে দরকষাকষি এবং যুদ্ধ শেষ করার ...। সেই সেনা মেজর জেনারেল জে এফ আর জ্যাকবের মাথায় ছিলো ভিন্ন চিন্তা। নায়ক যখন এসেই গেলো, তখন তো ভিলেন থাকতেই হয়। তিনি হলেন, পাকিস্তানি কমান্ডার এ এ কে নিয়াজি। তিনি তার গ্রন্থে নিজের পরিচয় দিয়েছেন এভাবে--আমার নাম আমির আব্দুল্লাহ খান নিয়াজি, তবে আমি টাইগার নিয়াজি হিসেবে বেশি পরিচিত। চলচ্চিত্রের শুরুতে নিয়াজি চরিত্রের উপস্থাপন ছিলো টাইগারের মতোই। তবে শেষে তিনি হয়ে গেছেন বিড়াল নিয়াজি। জ্যাকব যখন বললেন, জনসম্মুখে আত্মসমর্পণ করতে হবে, তখন নিয়াজির না বলার ক্ষমতাও প্রায় হারিয়ে গিয়েছিলো।

১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ নিয়ে বলিউডে একাধিক চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। গুগলে খোঁজ করলে যেসব চলচ্চিত্রের নাম পাওয়া যায় তার মধ্যে রয়েছে--হিন্দুস্তান কি কসম (১৯৭৩), বর্ডার (১৯৯৭), ১৬ ডিসেম্বর (২০০২), ১৯৭১ (২০০৭), গুন্ডে (২০১৪), চিল্ড্রেন অব ওয়ার (২০১৪), দ্য গাজি অ্যাটাক (২০১৭), রাজি (২০১৮) ও রোমিও আকবর ওয়াল্টার (২০১৯)।

উপরে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ নিয়ে চলচ্চিত্রের যেসব বৈশিষ্ট্যের কথা বলা হয়েছে, এগুলোর মধ্যেও তা কমবেশি রয়েছে। তবে ব্যতিক্রম হিসেবে চিল্ড্রেন অব ওয়ার-এর কথা বলা যায়। মুক্তিযুদ্ধের এক অতি সংবেদনশীল দিক নিয়ে অত্যন্ত সাহসী চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন তরুণ নির্মাতা মৃত্যুঞ্জয় দেবব্রত। পাকিস্তানি সেনারা ধর্ষণকে কীভাবে যুদ্ধের নির্মম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলো, সেটাই চিলড্রেন অব ওয়ার-এর থিম। ধর্ষণের শিকার হয়েও কীভাবে একজন নারী পাশাপাশি স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখতে পারেন, সেই ভাবনা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। অনেক দেরিতে হলেও বলিউডের চলচ্চিত্র সেই মানবিকতার দিকটা স্পর্শ করেছে। তবে উগ্র জাতীয়তাবাদের কালে এ রকম চলচ্চিত্র যে খুব কমই নির্মিত হবে তা বলাই যায়।

শক্তিশালী মাধ্যম চলচ্চিত্রকে শাসক ও তার অনুসারীরা কাজে লাগাবে--নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। তাই চলচ্চিত্র কেবল মুনাফা নির্মাণের হাতিয়ার নয়; এটি কীভাবে শাসকশ্রেণির মতাদর্শ প্রচার করে, কীভাবে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়, তা বুঝে নেওয়া জরুরি হয়ে পড়ে। মুক্তিতে মুক্তিবাহিনীর বীরত্বের কথা বলা হয়েছে। উঠে এসেছে গর্বিত বাঙালি জাতির কথাও। তবে এর প্রধান থিম হয়ে উঠেছে ভারতের জয় ও পাকিস্তানের পরাজয়। এ কথার প্রমাণ মেলে চলচ্চিত্রটির মুক্তির দিনক্ষণের দিকে তাকালেও। মুক্তির ঘটনাকাল ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর। তাই এটি কোনো এক ১৬ ডিসেম্বরে মুক্তি পেতে পারতো! কিন্তু এটি মুক্তি দেওয়া হয়েছে ১৪ আগস্ট পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসে। আর পরদিনই তো ভারতের স্বাধীনতা দিবস।

ইতিহাস বদলে যায়

আগেই বলেছি, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যতোবার যুদ্ধ হয়েছে, তার মধ্যে কেবল ৭১-এ পাকিস্তান আত্মসমর্পণ করেছে। পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ কমান্ডের কাছে। যদিও ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ কমান্ড শব্দের ব্যাপারে আপত্তি ছিলো নিয়াজির। ওই ঘটনার সাড়ে চার দশক পার হয়েছে। বর্তমানে হয়তো ভারত সরকারের কর্তা ব্যক্তিদেরও ওই শব্দের ব্যাপারে আপত্তি রয়েছে। অন্তত তাদের কার্যক্রম সেটাই প্রমাণ দিচ্ছে।

১৯৭১-য়ে যে নির্ভীক সেনারা লড়াই করেছিলেন, আজ বিজয় দিবসে তাদের অদম্য সাহসকে স্মরণ করি। তাদের বীরত্ব আর দেশপ্রেমই আমাদের দেশকে সুরক্ষিত রাখতে পেরেছে। এই মহান আত্মত্যাগ প্রত্যেক ভারতীয়কে চিরকাল অনুপ্রাণিত করবে। ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের ১৬ ডিসেম্বর উপলক্ষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই টুইট করেন। মোদির এই কথায়, বিজয় দিবসের সঙ্গে যে বাংলাদেশের কোনো সম্পর্ক আছে তা বোঝাই যায় না। মোদি সচরাচর তার টুইটে বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানানোর কোনো সুযোগ হাতছাড়া করেন না। কিন্তু উপরের মন্তব্যে বাংলাদেশ শব্দটির উল্লেখ পর্যন্ত নেই।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের ভেরিফায়েড টুইটার অ্যাকাউন্ট থেকে যে পোস্ট দেওয়া হয়েছে, তাতে বিজয় দিবসের সাফল্যের পুরো কৃতিত্ব দেওয়া হয়েছে ভারতীয় বাহিনীকে। সেখানেও মুক্তিবাহিনীর অবদান অনুচ্চারিত। তবে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের বি জে পির মন্ত্রীদের মধ্যে রাজ্যবর্ধন রাঠোরের টুইটে বাংলাদেশের সামান্য উল্লেখ রয়েছে। তিনি বিজয় দিবসের কৃতিত্ব দিয়েছেন শুধু ভারতের সশস্ত্র বাহিনীকে।

জেনারেল জ্যাকব অবশ্য মুক্তিবাহিনীর যথাযথ কৃতিত্ব ও অবদান স্বীকার করেছেন। তিনি তার গ্রন্থে বলেন, মুক্তিবাহিনীকেও তাদের প্রাপ্ত কৃতিত্ব দিতেই হবে। তাঁদের গেরিলা অপারেশনগুলো পাকিস্তানিদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলে, তাদের চলাফেরা বিঘ্নিত করে এবং তাদের আত্মবিশ্বাস ও সাহসের ভিত নাড়িয়ে দেয়। অতএব ভারত-বাংলাদেশ সম্মিলিত বাহিনীর এই বিজয়ে তাদের অবদান বিশাল। মূলত রাজনৈতিক ফায়দা তোলার স্বার্থে নরেন্দ্র মোদিসহ ভারতের ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জয়ের পুরো কৃতিত্ব নিতে চাইছে। একাত্তরের ঘটনাকে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হিসেবে পরিচিত করতে পারলে তাদের লাভ। তারা পাকিস্তানবিরোধী মনোভাব চাঙ্গা রেখে জনগণের আবেগ কাজে লাগাতে চায়, নিজেদের পক্ষে আনতে চায়। একাত্তরের সামরিক কমান্ডাররা যাই বলুক না কেনো, তাদের মনোভাবে পরিবর্তন আসে না। রামরাজ্য প্রতিষ্ঠায় তারা সবকিছুই করবে।

আত্মসমর্পণের পরের কথা

একাত্তরে বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার ১১ এপ্রিল মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানীকে মুক্তিবাহিনী ও বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি হিসেবে ঘোষণা করে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাকে সেনাবাহিনীর জেনারেল পদ মর্যাদা (অক্রিয়) দেওয়া হয়। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না আতাউল গণি ওসমানী। তার অনুপস্থিতিকে কেন্দ্র করে সেসময় নানারকম বিতর্ক হয়। এ সম্পর্কে জেনারেল জ্যাকব তার গ্রন্থে বলেন, দুর্ভাগ্যবশত কর্নেল ওসমানী এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারেননি। তাঁর জন্য পাঠানো হেলিকপ্টার পথিমধ্যে শত্রুর গুলির আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সময়মতো সেটি মেরামত করা সম্ভব হয়নি। তাঁর অনুপস্থিতির ভুল ব্যাখা করা হয় এবং পরে তা অনেক সমস্যার জন্ম দেয়।১০

তবে দুর্ঘটনায় না পড়লেও ওসমানী আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে থাকতেন না বলে জানিয়েছেন সাবেক সেনা প্রধান কে এম সফিউল্লাহ; যিনি মুক্তিযুদ্ধে তিন নম্বর সেক্টরের কমান্ডার ও এস ফোর্সের প্রধান ছিলেন। তিনি বলেন, জেনারেল ওসমানী তখন মৌলভীবাজারে ছিলেন। এ ছাড়া ভারতীয় সেনা বাহিনীর প্রধান স্যাম মানেকশ সেখানে (আত্মসমর্পণের অনুষ্ঠান) ছিলেন না, ছিলেন তার দ্বিতীয় ব্যক্তি জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা। তাই মুক্তিবাহিনীরও দ্বিতীয় ব্যক্তি এ কে খন্দকার আত্মসমর্পণের সময় উপস্থিত ছিলেন।১১


মুক্তিবাহিনীর পরিবর্তে ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে পাকিস্তানি বাহিনী কেনো আত্মসমর্পণ করেছে, তা নিয়েও প্রশ্ন ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের অধীনে মুক্তিবাহিনীর সদর দফতরে তৎকালীন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তার দায়িত্বে ছিলেন নজরুল ইসলাম। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে পরবর্তী সময়ে একাত্তরের রণাঙ্গন অকথিত কিছু কথা নামে একটি বই লিখেন তিনি। তার ভাষ্য অনুসারে, এক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ওসমানী বলেন, বাংলাদেশ জেনেভা কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশ নয়। এই কনভেনশনের স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আমাদের কাছে আত্মসমর্পণ করতে রাজি হবে না। কারণ, তাদের (পাক বাহিনী) ধারণা, আমাদের কাছে আত্মসমর্পণ করলে আমরা তাদের সঙ্গে জেনেভা কনভেনশনে বর্ণিত নীতিমালা অনুযায়ী আচরণ করবো না। যেহেতু আমরা জেনেভা কনভেনশনের আওতায় পড়ি না, তাই জেনেভা কনভেনশনের নীতিমালা মানতে আমরা বাধ্যও নই। আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা তাদের হত্যা করে ফেলবে। ... আমরা তো এখনও ভারতের মাটিতেই রয়ে গেছি। বাংলাদেশই তো আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। আমাদের সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কোনও নিয়মিত সুশৃঙ্খল সেনাবাহিনী নেই। এমনকি পুলিশ বাহিনীও নেই। এ অবস্থায় ৯০ হাজার পাকিস্তানি সৈন্য আমাদের কাছে আত্মসমর্পণ করলে, আমরা তাদের রাখবো কোথায়? তাদের প্রটেকশন দেবো কিভাবে? ৯০ হাজার সৈন্যকে তিন বেলা উন্নত খাবার দেবো কোথা থেকে। দেশে গিয়ে তো আমরাই খাবার পাব না।১২

কে নির্ধারণ করবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান অবিস্মরণীয়। এক কোটির বেশি শরণার্থী আশ্রয় দিয়ে ভারত যে মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলো, তা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। দুটি দেশ আবার প্রতিবেশীও বটে। আর প্রতিবেশীর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে কিছু টানাপড়েনও থাকে। ৭০-এর দশকের মাঝামাঝি ফারাক্কা বাঁধ চালুর মধ্য দিয়ে সম্পর্কের যে ফাটল সৃষ্টি হয়, দিনে দিনে তা বেড়েই চলেছে। দুই দেশের অভিন্ন নদ-নদী পানি বণ্টন চুক্তি ও সীমান্ত হত্যা এই সম্পর্কে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে। ভারত-বিরোধীতার রাজনীতিও এতে প্রভাব ফেলে। তবে ভারত প্রীতি বা বিদ্বেষ নিয়ে বাগাড়ম্বর নয়, বরং বৃহৎ প্রতিবেশীর কাছ থেকে ন্যায্য পাওনা যে আদায় করতে পারবে, সেই বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে।

সময়ের হেরফেরে একই বস্তুর ছায়া কমবেশি হয়। একইভাবে সময়ের পরিবর্তনে ইতিহাসের ব্যাখ্যাও বদলে যায়। নতুন প্রজন্ম ইতিহাস জানবে কি না, নিজেদের অনুকূলে ইতিহাস সৃষ্টি করতে পারবে কি না, তার ওপর নির্ভর করছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। একই সঙ্গে তা নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎও।

লেখক : জাহাঙ্গীর আলম প্রথম আলোয় সহ-সম্পাদক হিসেবে কর্মরত।

alamrumcj@gmail.com

https://www.facebook.com/jahangir.alam.9887117

 

তথ্যসূত্র

১. জেকব, লে. জেনারেল জে এফ আর (২০১৭ : ১১৩-১৪) সারেন্ডার অ্যাট ঢাকা : একটি জাতির জন্ম; অনুবাদ : আনিসুর রহমান মাহমুদ, দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ঢাকা।

২. নিয়াজি, লে. জেনারেল এ এ কে (২০১৬ : ২২১-২২২); দ্য বিট্রেয়াল অব ইস্ট পাকিস্তান; অনুবাদ : মিজানুর রহমান কল্লোল, আফসার ব্রাদার্স, ঢাকা।

৩. প্রাগুক্ত; নিয়াজি (২০১৬ : ২৬৬)।

4.https://bbc.in/2rqa252; retrieved on: 25.11.2019

5.https://bbc.in/2rqa252; retrieved on: 25.11.2019

6. https://bit.ly/33fjSUw; retrieved on: 23.11.2019

7. https://bit.ly/33fjSUw; retrieved on: 23.11.2019

8. https://bit.ly/33fjSUw; retrieved on: 23.11.2019

৯. প্রাগুক্ত; জেকব (২০১৭ : ১৩৬)।

১০. প্রাগুক্ত; জেকব (২০১৭ : ১২১)।

১১. ‘নিয়াজিকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করেছিলেন জ্যাকব’, প্রথম আলো ৩১ জানুয়ারি ২০১৬।

১২. ইসলাম, নজরুল (২০১৫); একাত্তরের রণাঙ্গন, অকথিত কথা; অনুপম প্রকাশনী, ঢাকা। উদ্ধৃত :https://bit.ly/2Dl8jAy; retrieved on: 28.11.2019

 

পাঠ সহায়িকা

১. রহমান, শেখ মুজিবুর (২০১৭); অসমাপ্ত আত্মজীবনী, দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ঢাকা

২. চ্যাটার্জি, জয়া (২০১৪); বাঙলা ভাগ হল : হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা ও দেশ-বিভাগ ১৯৩২-১৯৪৭; অনুবাদ : আবু জাফর, দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ঢাকা।

বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ১৮তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২০ এ প্রকাশিত হয়েছে।

 

 

 

 

 

 

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন