সালাহউদ্দিন নীল
প্রকাশিত ০৩ আগস্ট ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
‘নিবন্ধ চলচ্চিত্র’
বিবেককে পীড়ন করবে মনোজগতে অস্বস্তি জাগাবে
সালাহউদ্দিন নীল

দেড়শো পৃষ্ঠার বিষয়বস্তু পাঁচ পৃষ্ঠায় বোঝানো সত্যি কষ্টকর। কারণ লেখকের চিন্তা আর মহাপরিশ্রমের ফসল এক একটা লেখা; অথচ পাঠকের অনেক কিছু বোঝা হয়ে ওঠে না, তারপরও লেখকের মগজে থাকা ভাবনাগুলো খোঁজার ক্ষুদ্র প্রয়াস চালানো হয়। আজকাল মানুষ এতো ব্যস্ত যে, নিজের সঙ্গেই বোঝাপড়ার কোনো সুযোগ তার নেই, অন্যের বই পড়ার সুযোগ তো দূরের কথা; মনোযোগ পাওয়া তো আরো দুষ্কর। আর এই দম বন্ধ করা সময়ে ইকবাল করিম হাসনু--যা একজন মনুষ্য প্রাণীর নাম--যাকে আপনাদের কাছে একজন লেখক হিসেবে পরিচিত করে দেওয়ার জন্য সহজিয়া অভিব্যক্তি ধারণ করেছি। যিনি চলচ্চিত্রের নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন, কাউকে ছোটো করার জন্য নয়, আরো বড়ো কিছু হওয়ার পথগুলো প্রশস্ত করার জন্য। সেই পথ কখনো কখনো বিষয় বৈচিত্র্যে দুর্গম মনে হলেও, শেষে গিয়ে ঠিকই আলোর দেখা মিলেছে। ফলে পথিক হিসেবে আনন্দিত না হয়ে পারা যায়নি। এখন যে সময়ের মধ্যে আমরা আছি, সেই বর্তমানে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়াটাও দুষ্কর, যারা নিজের পথের কথা না ভেবে অন্যের পথ সুগম করে। হাসনুর বই ‘নিবন্ধ চলচ্চিত্র’-তে এই অন্যের পথ সুগম করার একটা চেষ্টা আছে বলে পাঠক হিসেবে মনে হয়েছে। আর সেজন্যই হয়তো ‘নিবন্ধ চলচ্চিত্র’ নিয়ে লিখতে বসা।
শুরুতে বইয়ের নামটাই খটকা লেগেছিলো। তাই প্রথমেই ভাবলাম নামের মাজেজা উদ্ধারে নামা প্রয়োজন। আর তা থেকেই ‘নিবন্ধ চলচ্চিত্র ও সাম্প্রতিক দুটি স্বর’ প্রবন্ধটি পড়তে শুরু করা।
একক দর্শকের সঙ্গে দ্বিরালাপে নিবন্ধ চলচ্চিত্র
‘নিবন্ধ চলচ্চিত্র’ ধারণাটি চলচ্চিত্র সমালোচনা ও অধ্যয়নে লক্ষণীয়ভাবে উল্লেখ হচ্ছে গত শতাব্দীর ৯০-এর দশকের শেষ দিক থেকে। এই ধারণা নিয়ে লেখক নিজেই সন্দেহ পোষণ করেছেন এবং খুব সূক্ষ্মভাবে চলচ্চিত্র তত্ত্ব ও তাত্ত্বিকতা কাদের দখলে সেটাও কৌশলে বলেছেন তার নিজস্ব অভিজ্ঞতায়; যেমন, চলচ্চিত্র সংক্রান্ত আলোচনা ও প্রকাশিত প্রবন্ধ-নিবন্ধ বেশিরভাগই ইংরেজি ভাষা ও সংস্কৃতিনির্ভর। এই সব আলোচনা ছাড়াও আটলান্টিকের দুই পাড়ের মহানগরে বিদ্যায়তনিক চলচ্চিত্র অধ্যয়নে বার বার দেখা মেলে বৃটিশ, ফরাসি, জার্মান, রুশ সাহিত্য ও চলচ্চিত্র তাত্ত্বিকদের। এই চারটি জাতির হাতেই যেনো চলচ্চিত্রের সব আলোচনা বন্দি।
ফরাসি নির্মাতা গি ফিম্যানের ধারণা, মন্তাজ নামক চলচ্চিত্রিক কৌশল ও পরিভাষার জনক রুশ নির্মাতা ও তাত্ত্বিক সের্গেই আইজেনস্টাইন কার্ল মার্কসের ‘ক্যাপিটাল’ নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ সংক্রান্ত যে নোট টুকে রেখেছিলেন, সেখানেই প্রথম নিবন্ধ বা essay ধারণাটির সাক্ষাৎ মেলে। সাহিত্যকর্মের মধ্যে গল্প, কবিতা, উপন্যাস, নাটক, আত্মজীবনী, ভ্রমণকাহিনি, গদ্য ছাড়াও আরেকটি বিশেষ শাখা হচ্ছে প্রবন্ধ বা নিবন্ধ। নিবন্ধের চরিত্র নিয়ে নানা মত থাকলেও সাহিত্য তাত্ত্বিকরা একটি বৈশিষ্ট্যের কথা বলেছে, সেটি হলো, নিবন্ধের মূল প্রবণতা হচ্ছে প্রথা বিরুদ্ধতা। এর উত্থাপিত প্রশ্ন মীমাংসিত হওয়ার বদলে নতুন কোনো সম্ভাবনার কথা বলে। কিছু কিছু তাত্ত্বিক মনে করে, নিবন্ধ চলচ্চিত্র হলো দৃশ্য বা বিষয় সম্পর্কিত চিন্তাভাবনার প্রকাশ অথবা দর্শককে উদ্দেশ করে কোনো কথা।
হাসনু লেখার শুরুতেই মগজে থাকা, তার প্রথম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশগ্রহণের স্মৃতিচারণ করেছেন। সেই উৎসবে আঙ্গিকে ও ধরনের বিশিষ্টতার কারণে দুটি চলচ্চিত্র তার মনে দীর্ঘ রেখাপাত করেছিলো। শিরোনামে ব্যবহৃত ‘নিবন্ধ চলচ্চিত্র’ এর সংজ্ঞা দাঁড় করাতে গিয়ে লেখক জানান, তার ধারণায় লা শিনোয়াজ এবং লোয়াঁ দ্যু ভিয়েতনাম চলচ্চিত্র দুটি ‘নিবন্ধ চলচ্চিত্র’-এর প্রতিনিধিত্ব করে। লোয়াঁ দ্যু ভিয়েতনাম-এর রাজনৈতিক বক্তব্যের সাহসিকতা, নির্মাণশৈলীর অভিনবত্ব এবং বিবেক ও চৈতন্য জাগিয়ে তোলার যে তীব্রতা, তা লেখককে ভীষণভাবে আলোড়িত করে। সাত জনের যৌথ প্রয়াসে নির্মিত লোয়াঁ দ্যু ভিয়েতনাম একটি বহুমাত্রিক নির্মাণ এবং দর্শনজনিত মতামত; যেখানে চলচ্চিত্রনির্মাতা ক্রিস মার্কারের কণ্ঠে ভেসে আসে, ধনী আর গরিবের মধ্যে যুদ্ধটা কখনো শেষ হওয়ার নয়। চলচ্চিত্রটির আরেক নির্মাতা জ্যঁ লুক গদার এ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে একটি অ্যানিমেশনের কথা বলেছেন, যেখানে মার্কিন পতাকাবাহী একটি খেলনা ট্যাঙ্ক সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন এক সারি লাল বই (মাওয়ের বিখ্যাত ‘রেড বুক’) ট্যাঙ্কের গতিরোধ করে এবং বিস্ফোরণের মাধ্যমে সেটাকে উড়িয়ে দেয়। এই দৃশ্যপট নিয়ে স্বয়ং গদারের মন্তব্য--আমি ব্যক্তিগতভাবে আমেরিকান চলচ্চিত্রের বিপক্ষে, কেননা আমেরিকান নন্দনতত্ত্ব, সাম্রাজ্যবাদ, পুরো বিশ্বের চলচ্চিত্রশিল্পকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। তবে লেখকের মত, দর্শকচিত্ত ও চেতনায় অভিঘাত আনতে এই কৌশল প্রথাগত হলিউডি কাহিনিচিত্রে সম্মুখ সমরের বীরত্ব প্রদর্শনকারী বাস্তবানুগ দৃশ্যায়নের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর। উপরের দুইটি চলচ্চিত্রের একটি অভিন্ন বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এখানে প্রথাগত গল্প বলার বদলে উদ্দিষ্ট বিষয় নিয়ে প্রত্যেক একক দর্শককে আলোচনায় টেনে আনা হয়েছে।
এখন প্রশ্ন, এই একক দর্শককে কীভাবে টেনে আনা হয়--এটা দেখানোর জন্য লেখক সাম্প্রতিক দুটি ‘নিবন্ধ চলচ্চিত্রের’ উদাহরণ টানেন। ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে রুশ নির্মাতা আলেকজান্দার সাকুরভের ফ্রাঙ্কোফোনিয়ার প্রদর্শনী হয়। চলচ্চিত্রটির বিষয়ের গুরুত্ব, প্রশ্নের জটিলতা ও নির্মাণশৈলীর অনন্যতা স্বীকার করে নিয়ে সমালোচকরা নানা কথা বলে। তাদের মতে, ইতিহাস, যুদ্ধ, শিল্প এবং শিল্পকর্ম সংরক্ষণের মধ্যকার সম্পর্কের টানাপড়েন নিয়ে নির্মাতা সাকুরভের এই দার্শনিক নিবন্ধের নানা ব্যাখ্যা রয়েছে, যা কেবল বার বার দেখার পর উপলব্ধি করা সম্ভব। ফ্রাঙ্কোফোনিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ল্যুভ জাদুঘরের শিল্পকর্ম রক্ষা নিয়ে বিবদমান দুই ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের (ফ্রান্স বনাম জার্মানি) প্রতিনিধির গোপন সমঝোতার ঘটনা। চলচ্চিত্রে সাকুরভের যে দ্বিরালাপ তার কিছু চৌম্বক মন্তব্য এমন--‘ল্যুভহ ছাড়া ফ্রান্স কিংবা এর্মিতাশ ছাড়া রাশিয়া কারই বা প্রয়োজনে আসবে?’; ‘জাদুঘর আবার ক্ষমতা এবং মানুষের অনুচিত আচরণকে আড়ালও করতে পারে’; ‘শিল্প কেন আমাদের ভবিষ্যজ্ঞান শেখাতে নারাজ?’‘জার্মানি এক জটিল বহুমুখী হানাদার।’ চলচ্চিত্রজুড়ে রয়েছে সাকুরভের এ রকম একাধিক দার্শনিক জিজ্ঞাসা, যা দর্শককে গভীর অভিনিবেশ সহকারে ভাবতে বাধ্য করে, যা নিবন্ধ চলচ্চিত্র হিসেবে পরিগণিত হয়।
এরপরেই লেখক আলোচনা করেন পাত্রিসিও গ্যুছ্মানের এল বটন দে নাকার (দ্য পার্ল বাটন) নিয়ে। গ্রন্থের ২৫ পৃষ্ঠায় এই আলোচনা শুরুর পর ফ্রাঙ্কোফোনিয়ার আলোকচিত্রগুলো পাঠককে ধন্দে ফেলে দেয়। এই আলোকচিত্রগুলো ফ্রাঙ্কোফোনিয়া নিয়ে যে প্রবন্ধে আলোচনা হয়েছে, সেখানে দেওয়াই যৌক্তিক ছিলো। গত শতাব্দীর ৭০-এর দশক থেকে চিলির পাত্রিসিও গ্যুছ্মান বিশ্বখ্যাত প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতাদের একজন হয়ে ওঠেন। গ্যুছ্মানের মনোযোগ চিলির রক্তাক্ত রাজনৈতিক ইতিহাস ও জনমানসে তার স্মৃতিকে কেন্দ্র করে। তার চলচ্চিত্র প্রকল্পের সুর বিবাদমূলক না হয়ে শোকগাঁথার মতো। লেখক, চলচ্চিত্রের এই সুর কীভাবে শোকে পরিণত হলো, তা বিভিন্ন দৃশ্য ও ঘটনাবলি ব্যাখ্যার মাধ্যমে সাজিয়ে দেখিয়েছেন, যা ‘নিবন্ধ চলচ্চিত্র’-এ জায়গা করে নেয়। গ্যুছ্মান তার চলচ্চিত্রে তুলে ধরেন, চিলির আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে কীভাবে বঞ্চিত করা হয়েছে তার চিত্র। যা রাষ্ট্র বরাবর গোপন রেখেছে। অর্থাৎ বিষয় সামাজিক, ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক যাই হোক না কেনো, নির্মাতা এখানে দর্শকগোষ্ঠীর বদলে একক দর্শকের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলাপে প্রবৃত্ত হন। যে প্রশ্ন এখানে নির্মাতা তোলেন, দর্শককে তার সঙ্গে শরিক হওয়ার আহ্বান জানান। আর শেষ পর্যন্ত ‘নিবন্ধ চলচ্চিত্রটি’ এমন এক অবস্থার তৈরি করে, যেখানে উত্থাপিত প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়ার বদলে তৈরি হয় নতুন নতুন প্রশ্ন।
উপরের প্রবন্ধটির গুরুগম্ভীর দার্শনিক আলোচনা শেষে ক্রমিক অনুযায়ী পরের লেখাটি আর পড়া হলো না। কিছুদিন বিরতি নিয়ে কেনো জানি লেখকের কোনো ছোটো লেখা পড়ার জন্য ভিতরের মানুষটা আওয়াজ দিলো। অগত্যা সূচিপত্রে পৃষ্ঠা সংখ্যা দেখে ‘কলকাতায় কত উনুন?’ নির্বাচন করলাম আর তার সুবাদেই আবার লেখাটা শুরু হলো।
দ্রষ্টার ভূমিকায় ‘প্রবন্ধকার’
যে ভাষা বোধগম্য নয়, সে তো ষোল আনাই বৃথা। কিন্তু ভাষা না বুঝলেও ইশারা তো বোঝা যায়, যা নিজেই ভাষা হয়ে যায়। লেখক ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে সেই ইশারাই দিয়েছিলেন, যা বর্তমানে প্রতিষ্ঠিত। সত্য দেখে সত্য ইশারা কজনইবা দেয় বা দিতে পারে। অপর্ণা সেনও যে উনুনের মতো চলচ্চিত্র জগতে জ্বলে উঠেছেন/উঠবেন, তার ইশারা লেখক এই লেখায় করেছিলেন; যা পরে সত্য হয়ে সামনে অবতীর্ণ হয়েছে। অপর্ণা সেনও মানবতাবাদীর উনুন হয়ে জ্বলে দেখিয়েছেন, তার চিন্তার আলো ছড়িয়েছেন। এখানেই লেখকের দূরদৃষ্টির প্রশংসা না করে আর সামনে যাওয়া যায়নি। মৃণাল সেনের চালচিত্র-এর সঙ্গে অপর্ণার থার্টি সিক্স চৌরঙ্গি লেন-এর তুলনায় তার দূরদৃষ্টি ধরা পড়ে। লেখক তুলনার পরিশেষে বলেছেন, ‘[থার্টি সিক্স চৌরঙ্গি লেন] অস্কারে প্রতিযোগিতা করলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই, পুরস্কারটাও পেয়ে যেতে পারে।’ তবে অপর্ণা অস্কার না পেলেও কী করেছেন তা কমবেশি সবারই জানা। তবে আমি তার সম্পর্কে শুধু উড়ো কিছু শব্দ জানি তাও অন্যের মুখে; তাই তাকে নিয়ে আগ্রহটা খুব রগরগে হয়ে উঠলো; ভাবনায় আসতেই মগজ ইশারা দিলো এই বইয়ে ‘অপর্ণার নারীপাঠ’ নামে আরেকটি প্রবন্ধ রয়েছে। ফলে সোজা চলে গেলাম সেখানে, অপর্ণা সম্পর্কে জানার তাগিদেই।
মানবিক মূল্যবোধের ধারক অপর্ণা
২০১৫ খ্রিস্টাব্দে লেখক আরো একবার অপর্ণা সম্পর্কে লিখলেন। চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন সত্য কখনো গোপন থাকে না, সেটা কাল হয়ে এসে পরাধীনতাকে প্রতিরোধ করে, পথ চিনিয়ে দেয় স্বাধীনতার। অপর্ণার নির্মাতা হয়ে ওঠার পিছনে একটা সুস্পষ্ট কারণ দেখিয়েছেন লেখক--সত্যজিতের তিনকন্যায় মৃন্ময়ী চরিত্রে সমাজের পরোয়া না করে নিজের স্বাধীনতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার স্পৃহাকে পর্দায় ফুটিয়ে তোলার যে দায় অপর্ণাকে নিতে হয়েছিলো, তা-ই পরবর্তী সময়ে তার নির্মাতা হিসেবে আত্মপ্রকাশের পাথেয় হয়েছে। এখানে লেখকের দূরদৃষ্টি শুধু নয়, অতীত বিশ্লেষণের দারুণ ক্ষমতার প্রমাণ মেলে। এই প্রবন্ধে লেখক নারী হিসেবে অপর্ণার বোঝাপড়াকে তুলে এনেছেন বিশেষত পুরুষ প্রাধান্যশীল সমাজে নারীর আপন সত্ত্বার বিকাশ, অচরিতার্থ ইচ্ছের বহিঃপ্রকাশ এবং কাম ও যৌনতার প্রশ্নকে তিনি কীভাবে সামনে এনেছেন সে প্রসঙ্গে কথা বলে। তিনি অপর্ণা সেনের কোনো একক সাফল্য, গুণমান বা ঘাটতি যাচাই না করে সার্বিক চলচ্চিত্র পরিক্রমায় একটা বিশেষ প্রসঙ্গের পাঠই করেছেন। আর এই পাঠে তিনি আলোচনা করেছেন অপর্ণার ১০টি চলচ্চিত্র (থার্টি সিক্স চৌরঙ্গি লেন, পরমা, সতী, যুগান্ত, পারমিতার একদিন, মিস্টার অ্যান্ড মিসেস আইয়ার, ফিফটিন পার্ক অ্যাভেনু, দ্য জাপানিজ ওয়াইফ, ইতি মৃণালিনী ও গয়নার বাক্স) নিয়ে। চলচ্চিত্রে অপর্ণার নারীর উপস্থাপন বহুস্তরীয়, যেখানে তিনি নারীকে আত্মপোলদ্ধি ও সক্ষমতা অর্জনের প্রচেষ্টায় দেখিয়েছেন। যদিও অপর্ণা নিজেকে নারীবাদী হিসেবে পরিচয় দিতে আগ্রহী নন। তার বিশ্বাস, নারীবাদ মানবতাবাদের একটা অংশ।
অর্পণা পাঠের পর হঠাৎই প্রবন্ধের একটা টাইটেল নিজের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করে--‘মেফিস্টো : আত্মজ শত্রু’। সাধারণত এ ধরনের টাইটেল খুব একটা চোখে পড়ে না বলেই বোধ হয় এই আগ্রহ। তাই কোনো কিছু চিন্তা না করেই পড়তে শুরু করি।
সঙ্কট মুহূর্তে ইতিহাস পুনরায় অবরুদ্ধ
সময় ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দ, তারিখবিহীন এক শীতের সন্ধ্যা, স্থান : শিশু অ্যাকাডেমি মিলনায়তন, ঢাকা। এখানেই ইস্তভান জাবো’র চলচ্চিত্র মেফিস্টো দেখার পর লেখকের মগজে এই প্রবন্ধের জন্ম। ইস্তভান জাবোর সমাজের একনায়কী স্বৈরাচারের উৎসস্থল অনুসন্ধান করেছেন। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের নিরিখে এ অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে তিনি পশ্চাৎপট হিসেবে বেছে নেন হিটলারের জার্মানিকে। মেফিস্টোতে দেখা যায়, নিরাপত্তার মোহ চলচ্চিত্রের মুখ্য চরিত্র অভিনয়শিল্পী হোফগেন’কে নাৎসিদের দ্বারস্থ করেছিলো। লেখক এখানে সেসময়ের বাংলাদেশের সঙ্গে এর তুলনা করেছেন। তখন বাংলাদেশেও হোফগেন-এর মতো অনেকে খ্যাতি অর্জন করেছিলো ঠিকই, কিন্তু তা স্বৈরাচারী শাসনের সঙ্গে দহরম মহরমের মাধ্যমে। ‘স্বৈরাচারী’ সময় থেকে ‘গণতান্ত্রিক’ সময়ে এসেও বাংলাদেশে একই ঘটনা পরিলক্ষিত হয়। বর্তমান বাংলা সাহিত্যের একজন প্রাণপুরুষ, যিনি আপন প্রতিভায় উজ্জ্বল। দৃশ্যত শিল্প, সাহিত্য ছাড়া অন্য কিছু তার ধ্যান নয়। কিন্তু অন্তরালে খ্যাতি ও সমাদৃত হওয়ায় তার তীব্র বাসনা! তাই ‘গণতান্ত্রিক’ স্বৈরাচারে যখন পুরো সমাজ বন্দি, তখন এই সাহিত্যিক আপন সৃজনকর্মের নিরাপত্তা খোঁজেন ক্ষমতাসীনদের কাছে। ক্ষমতাসীনদের জন্য তার ফরমায়েশি বক্তব্য, তাদের থেকে প্রাপ্ত পুরস্কারের গভীরে যে কাল ও সমাজ নিরপেক্ষতার ছলনা লুকিয়ে আছে, ঘোষণা করা পদক তারই চিত্রিত রূপ। মেফিস্টো তাই শুধু ৮০’র দশক নয়, একবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকেও প্রাসঙ্গিক। লেখক চাইলে এই সময়টাকেও এর সঙ্গে বেঁধে দিতে পারতেন, তাতে আলোচনাটি আরো প্রাসঙ্গিক হতে পারতো।
‘মেফিস্টো : আত্মজ শত্রু’-তে নিমগ্ন ছিলাম সাম্প্রতিক পরিস্থিতির সঙ্গে মিলে যাওয়ার কারণে। তাই এবার ধারাবাহিকতা নষ্ট করতে মন চাইলো না। ঢুকে গেলাম পরের প্রবন্ধ ‘মৃন্ময় প্রাচীর : বার্তুসেলির মৌন প্রতিবাদ’-এ।
মৌন প্রতিবাদ স্বাধীনতা খুঁজে ফেরে
এই প্রবন্ধে আলোচনা করা হয়েছে ফরাসি নির্মাতা জঁ লুই বার্তুসেলির, মৃন্ময় প্রাচীর বা Ramparts of clay চলচ্চিত্র নিয়ে। তিউনিসিয়ার এক প্রত্যন্ত গ্রামের মুসলমান সমাজের গণ্ডিবদ্ধ কুসংস্কারাচ্ছন্ন জীবনযাত্রার সঙ্গে বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজের মিল খুঁজে পেয়ে এ নিয়ে লিখতে বসেছিলেন হাসনু। তিনি অনুভব করেছিলেন, বাংলাদেশের গ্রামেরও একই দশা, যেখানে সভ্যতার আলো বাধাপ্রাপ্ত হয়, সংস্কার আর প্রাচীন মূল্যবোধের দেয়ালে। এ সাদৃশ্য দেখতে পাওয়ার পিছনে অবশ্য যৌক্তিকতা রয়েছে, বার্তুসেলির চলচ্চিত্রে প্রধান নারী চরিত্র রিমা কোনো কথা বলেন না, প্রতিবাদও করেন না। প্রায় সংলাপহীন এই চরিত্রের ভিতর দিয়েই মৌন প্রতিবাদ ওঠে প্রাচীন মূল্যবোধের বিরুদ্ধে। নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা তাড়িত স্বাধীনচেতা রিমা জীবনযাত্রার স্থবিরতা আর নিস্তরঙ্গতার মধ্যে মৃণ্ময় প্রাচীর ঘেরা দুর্গ থেকে পালিয়ে যান। রিমা পালিয়ে যেতে পারলেও বাংলাদেশের বেশিরভাগ নারীকে এখনো বনফুলের ‘নিমগাছ’ হয়েই থাকতে হয়। ফলে হাসনুর আলোচনা আমাকে ভারাক্রান্ত করে, বিশ্ব চলচ্চিত্র নিয়ে নতুন করে ভাবায়। চিন্তা হয়, দেশে দেশে, কালে কালে কতো বিচিত্র বিষয়-চিন্তা সেলুলয়েডে ধারণ করা হয়েছে! তার খুব সামান্যই হয়তো এক জীবনে দৃষ্টিগোচর হয়।
অপর্ণায় মগ্ন থাকতেই সত্যজিতকে পেয়েছিলাম; কিন্তু তখন তার গভীরে যাওয়ার সুযোগ ছিলো না। বিশ্ব চলচ্চিত্রের বৈচিত্র্য দেখে খানিকটা অবাক হয়ে কাছের মানুষের কাছে সেটা খুঁজতে মন চাইলো। আর এই খুঁজতে যাওয়ায় সত্যজিতের চেয়ে আপন কাউকে পেলাম না। তাই কেবল টাইটেল দেখেই ‘রায়ের অভিযোগ’ পড়তে শুরু করা।
প্রশ্ন করেই সিদ্ধিলাভ
এখন পর্যন্ত স্বচ্ছ ও সরল চিন্তাধারী ব্যক্তিরাই অর্থাৎ সব মহৎ ব্যক্তিই আজীবন প্রশ্ন জারি রেখেছে, হোক না তিনি শত শত বছরের আগের সক্রেটিস। প্রশ্ন করেই নতুন পথের সন্ধান শুরু হয়েছে, হয়েছে মানবজাতির মগজের ভিতরে তথ্যের পরিবর্তন। আর তথ্যের পরিবর্তন মানে নতুন চিন্তা, নতুন কিছু; যেটা ঘুরেফিরে প্রশ্ন থেকেই প্রাপ্ত। শিল্পকর্ম নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, শুরু হয় নানা আলোচনা-সমালোচনা, নানা তর্ক-বিতর্কের। তবে সমাজে খুব কম মানুষই আছে, যারা প্রতিষ্ঠিত খ্যাতিমান ব্যক্তিদের কর্ম নিয়ে প্রশ্ন তোলে। কারণ সেখানে তোষামদকারীর পাল্লাই ভারী। আর এই রকম একটা পরিস্থিতিতে হাসনু প্রশ্ন তুলেছেন সত্যজিৎ রায়ের শিল্পকর্ম নিয়ে!
অবশ্য প্রশ্নটি তিনি তরুণ প্রজন্মের দর্শকের হয়ে করেছিলেন। রায়ের বিরুদ্ধে তার অভিযোগ, ‘আমরা কেন সেই ধ্রুপদি চলচ্চিত্রের স্বাদ তাঁর শেষের দিকের ছবিতে পাই না? কেন আমাদের সর্বত্রগামিতার ইন্দ্রিয়কে সজাগ করে দিয়ে করোটির গভীরে খোদাই করে দেয় না তাঁর শেষ-দিককার কোনও ফ্রেম?’ লেখকের মগজে এই প্রশ্নের উদয় হয় সেই সময়, যখন রায়কে বিশেষ অস্কার পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়। রায়ের এই সম্মান লাভের সূত্র ধরে ‘নিউ ইর্য়ক টাইমস’-এর সাংবাদিক তার একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেন। সেখানেই রায়ের কিছু মন্তব্য নিয়ে লেখক লিখতে বসেছিলেন। যা ‘রায়ের অভিযোগ’ নামে ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে নিউ ইর্য়ক-ভিত্তিক ‘পরিচয়’ পত্রিকায় প্রকাশ হয়। বাংলা চলচ্চিত্রে যারা শিল্পরস-সমৃদ্ধ চলচ্চিত্র করেছে তাদের সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে রায় বলেন, ‘এঁরা ছবি করেছেন মুষ্টিমেয় দর্শকের কথা মাথায় রেখে। ছবি করার পরপরই সেগুলো বিদেশে যায় ফেস্টিভ্যালে, পুরস্কারও পেয়ে যায় কিন্তু ভারতীয় সাধারণ দর্শকরা সেসব ছবি দেখার সুযোগ পায় না। আবার এঁরাই নিজেরা নিজেদের ছবি সম্পর্কে পিঠ চাপড়ে বাহবা দেয়।’ এই অভিযোগ নিয়েই লেখক আলোচনাটা এগিয়ে নিয়ে গেছেন, অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করেছেন রায়ের পথ চলার।
রায়ের অভিযোগ যদি এই হয়ে থাকে, তিনি চলচ্চিত্র বৃহত্তর দর্শকের জন্য কাজ করেন এবং অন্য নির্মাতারা তা করে না। তাহলে এখানে বড়ো ধরনের ফাঁক তৈরি হয়। কারণ পথের পাঁচালী কিংবা চারুলতা কিন্তু দর্শকের চাহিদা অনুযায়ী হয়নি, শিল্পের দাবিতেই হয়েছিলো। রায় যখন পথের পাঁচালী দিয়ে যাত্রা শুরু করেন, তখন দর্শক রুচি কী আছে না আছে তা মাথায় রেখে নিশ্চয় চলচ্চিত্রটি করেননি। রায়ের চলচ্চিত্র সম্পর্কে হাসনুর বক্তব্য হলো--‘শ্রেণি হিসেবে ছাপিয়ে উঠেছে মধ্যবিত্ত। যাদের ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা ও সমাজ-সম্পর্কের দোটানায় তাঁর অধিকাংশ চলচ্চিত্র প্রভাবিত। সমকালীন সমাজকে রায় ধরতে চেয়েছেন কিছু কিছু চলচ্চিত্রে, যেমন জনঅরণ্যতে। বাকি চলচ্চিত্রে প্রথম দিককার শৈল্পিক নির্দশন মেলে না।’ লেখক এখানে স্পষ্ট করে বলেছেন, রায়ের পরবর্তী চলচ্চিত্রগুলো যে দর্শক আনুকূল্য পেয়েছে, সেটা তার নামের একটা বাজারি মূল্যের কারণে, চলচ্চিত্রের নিরেট শিল্পগুণের জন্য নয়। সত্যজিৎ পরবর্তী প্রজন্মের নির্মাতাদের কথা বলতে গিয়ে লেখক দাবি করেন, এদের কর্ম শিল্প প্রকরণে নিরীক্ষাধর্মী হওয়ার কারণে বেনিয়া পরিবেশকদের সহযোগিতা পায়নি, তাই দর্শকানুকূল্য জোটেনি। উদাহরণ হিসেবে তিনি গৌতম ঘোষের অন্তর্জলী যাত্রা, বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের ফেরার কথা বলেছেন; যে চলচ্চিত্রগুলো দর্শকের মুখ দেখেনি। তবে হাসনু স্বীকার করেছেন, রায়ের ৫০-এর দশকের চলচ্চিত্রগুলো নিঃসন্দেহে ধ্রুপদী পর্যায়ের, পরেরগুলো সেই স্বকীয়তায় ফিরতে পারেনি। তাই রায়ের অভিযোগের বিরুদ্ধে হাসনুর পাল্টা অভিযোগ কোনোভাবেই ফেলে দেওয়া যায় না।
রায়কে প্রশ্নবিদ্ধ করা এই প্রবন্ধটি পড়ে খানিক সময় পড়ায় ক্ষান্ত দিই। কয়েকদিন ভাবতে থাকি এবার একটু ভিন্ন কিছু পড়া দরকার। বই অন্য দুই-একটা লেখা পড়তে শুরুও করি। কিন্তু মন বসছিলো না। হঠাৎই ‘সহযোগী মাধ্যম ও চলচ্চিত্রকারের দ্বন্দ্ব’ টাইটেলের প্রবন্ধে চোখ আটকে যায়। ভিন্ন কিছু পাবো বলে মনে হয়।
ক্যামেরা নয়, জগৎ সংসারে চোখ চলে
প্রত্যেক মানুষই নিজের অজান্তে এক একজন নির্মাতা, কারণ বিভিন্ন বিষয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে তাকে জীবন পরিচালনা করতে হয়। এখানে ক্যামেরা নয়, মানুষ জগৎ সংসারে চোখ চালায়। জগতে এই চোখ চালাতে গিয়ে কিছু বোধসম্পন্ন মানুষ নিয়মের মধ্যে যে অনিয়ম সেটা ভাঙতে চায়, নতুন নিয়ম গড়তে চায়; আবার ওই নিয়মেই থাকতে চায়। কিন্তু যখন জীবন পরিচালনার বিষয়গুলো পর্দায় উপস্থাপন কারো নেশা বা পেশা হয়ে ওঠে, তখন সে নির্মাতার তকমা পায়। এই কর্ম তার একার নয়, অনেকের। লেখক অবশ্য অন্য কুশলীদের ‘স্বল্প শিল্পী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, যেটা নিয়ে বির্তক থেকে যায়। নির্মাতা এসব সৃষ্টি কর্মকারদের নিয়ে তার চিন্তার সঙ্গে সমন্বয় করে। এই মহৎ কর্ম সাধন করতে গিয়ে তাকে সম্মুখীন হতে হয় নানা প্রশ্নের, নানা পথের। এই পরিস্থিতিতে নির্মাতা নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকবে, নাকি সহযোগীদের পরামর্শ নিবে, এই ভেবে ঘটে নানা বিপত্তি। এই দ্বন্দ্ব নিয়ে হাসনু লিখেছেন, ‘সহযোগী মাধ্যম ও চলচ্চিত্রকারের দ্বন্দ্ব’।
একজন লেখকের লেখনী কিংবা চিত্রকরের তুলি দিয়ে যতো সহজে নিজের সৃষ্টিকর্মকে প্রকাশ করা সম্ভব, একজন নির্মাতার পক্ষে ততোটা সহজ নয়। চলচ্চিত্রের সহযোগী একাধিক শিল্পমাধ্যম সিনেমাটোগ্রাফি, ফটোগ্রাফি, সেট, সঙ্গীত, শব্দ, কাহিনি ইত্যাদি। এরা বিভিন্ন মাধ্যমের শিল্পী, আর এদের নিয়েই নির্মাতার শিল্পকর্মের প্রকাশ। প্রত্যেক শিল্পী যেমন, ক্যামেরা বা সঙ্গীত পরিচালক নিজ নিজ ক্ষেত্রে নিজের উদ্ভাবনী শক্তি বা সৃজন ক্ষমতাকে প্রাধান্য দিতে চায়; তখন অনেক সময় নির্মাতার নিজস্ব ধ্যানধারণার সঙ্গে তাদের দ্বন্দ্ব হয়। লেখক অবশ্য এই দ্বন্দ্বে নির্মাতাকে স্বার্থপর হতে বলেছেন, কারণ নির্মাতা চলচ্চিত্রের নিজস্ব ভাষায় এসবের ব্যবহার করে তার শিল্পকর্মের প্রকাশ করতে চায়; সঙ্গীতের অত্যুৎকৃষ্ট কর্ম বা ফটোগ্রাফির নবসৃষ্টিতে জড়িত হয় না।
প্রবন্ধটি শেষ করে মনে হলো, ভিন্ন বিষয় নিয়ে পড়ার ইচ্ছে থেকে লেখাটি পড়তে শুরু করা মোটেও ভুল সিদ্ধান্ত হয়নি। কারণ চলচ্চিত্র নিয়ে এ ধরনের আলোচনা সচারচর খুব একটা চোখে পড়ে না। তবে অনেক সময় ধরে নিজভূমের বাইরের আলোচনা পড়ে খানিক ক্লান্তি লাগছিলো। এবার তাই নিজভূমে ফেরা--‘তারেক-মিশুক : শিল্পসহোদরে ছেঁড়া সেলুলয়েড’।
সময়সঙ্গীরাই মহানায়কদের পুঁথি রচনা করে
পৃথিবীতে একটা ঘটনা পুনারাবৃত্তি ঘটছে বহুকাল থেকেই--কোনো মানুষের মৃত্যুর পর তার যাপিত জীবন সম্পর্কে তার সময়সঙ্গীদের কাছে জানা--সেই ব্যক্তি সাধারণ কিংবা অসাধারণ যেই হন। সেখানে কোনো ব্যক্তির নানা অজানা তথ্য, নানা বৈশিষ্ট্য পৃথিবীর মানুষ নতুন করে জানতে পারে। লেখক এখানে নিজে সেই কাজটি করেছেন তার স্মৃতি হাতড়িয়ে।
হাসনু এই লেখায় মগজের শিরার উল্টো দিকে যাত্রা করেছেন তার দুই সুহৃদ আলম খোরশেদ ও ব্রাত্য রাইসুর অনুরোধে; উদ্দেশ্য চলচ্চিত্র জগতের দুই মহান মানুষ তারেক-মিশুকের যাপিত জীবন সম্পর্কে কিছু জানানো--যার রাজসাক্ষী তিনি নিজেই। হাসনু চেষ্টা করেছেন, এই দুই শিল্পসহোদরের স্মৃতিগুলোকে জোড়া দিতে। তারেকের সঙ্গে লেখকের পরিচয় চলচ্চিত্র আন্দোলন, চলচ্চিত্র দেখা এবং সেই শিল্পমাধ্যম নিয়ে আড্ডা-আলোচনার সূত্র ধরে। পরবর্তী সময়ে সলিমুল্লাহ খানের হাত ধরে পরিচয়টা আরো নিবিড় হয়েছিলো।
হাসনুর একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থা ছিলো ‘মাধ্যম’ নামে; সেখানে তারেক তার কাছে এসেছিলেন শিল্পী সুলতানের ওপর নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী উপলক্ষে পোস্টার করার অনুরোধ নিয়ে। ‘মাধ্যম’ থেকে পোস্টারটি সুলতানের একটি ছবি নিয়ে করাও হয়েছিলো। জার্মান কালচারাল ইন্সটিটিউটে আয়োজিত ওই প্রদর্শনীতে স্বাগত ভাষণ দিয়েছিলেন আহমদ ছফা। এই প্রদর্শনীতেই আরেক মহান মানুষ আশফাক মুনীর মিশুকের সিনেমাটোগ্রাফির নান্দনিক উৎকর্ষের সঙ্গে লেখকের পরিচয় হয়। এরপরে তারেকের সঙ্গে একান্তে সাক্ষাৎ ও ঘনিষ্ঠ হওয়ার পর্বটা হয় লেখকের কানাডায় বাংলাদেশের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নিয়ে একটি প্রদর্শনী আয়োজনের মাধ্যমে।
তারেক সেই সময় আহমদ ছফার নানা অজানা চালচিত্র রসিয়ে রসিয়ে শোনাতেন। লেখকের বাসায় বসে পরের চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু সম্পর্কে বলতে গিয়ে যে পরিকল্পনা তারেক শুনিয়েছিলেন সেটাই বাস্তবায়ন হয়েছে মাটির ময়নাতে। আর মিশুকের সঙ্গেও সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে কানাডার টরেন্টোতে নরসুন্দর ও মুক্তির কথা প্রদর্শনীর সূত্রে। মিশুক তখন টরেন্টোবাসী, তার সম্পর্কে বলতে গিয়ে লেখক বলেন, ক্যামেরার পিছন থেকে শিল্পসুষমা গড়ার আকর্ষণ মিশুকের কাছে এতো তীব্র ছিলো যে, সাংবাদিকতার শিক্ষকতা এবং সংবাদমাধ্যমের নানা নির্বাহী দায়িত্বও তাকে আটকে রাখতে পারেনি।
তারেক ও মিশুক এক ঐতিহাসিক সময়ের জাতক, যে প্রজন্মটি তার কৈশোরের সীমারেখায় মুক্তিযুদ্ধকে অবলোকন করেছে। সেই প্রজন্ম যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতে শিকার হয় বিকৃত ইতিহাসচর্চার। তারেকের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্যচিত্রগুলো এই তামাশাময় অপস্রোতকে রুখে দেওয়ার প্রয়াস হিসেবে দেখা যায়। স্মৃতিচারণার মাধ্যমে তারেক ও মিশুককে নিয়ে লেখকের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সব মূল্যায়ন পাঠক হিসেবে আমাকে যেমন কষ্ট দিয়েছে, একই সঙ্গে স্বপ্নবান করেছে।
দিনশেষে পাঠকের বয়ান
‘নিবন্ধ চলচ্চিত্র’-এ গ্রন্থভুক্ত ১১টি লেখা রয়েছে, এর মধ্যে উপরের আলোচনায় আটটির শিল্পরস আস্বাদনের চেষ্টা করা হয়েছে; বাকি তিনটি লেখার মধ্যে ‘সত্যজিৎ রায় প্রসঙ্গে অ্যান্ড্রু রবিনসন’ এবং ‘আলেয়ার সঙ্গে আলাপ’ ইংরেজি থেকে ভাষান্তর, সেগুলো পড়েছি কিন্তু ইচ্ছে করেই এ নিয়ে কোনো কথা বলিনি। আর ‘ত্রয়ী চলচ্ছবির আলোকে পুঁজির পিঞ্জর’ যেটি সাধু ভাষায় রচিত, যেখানে হাসনু সাধু বাংলায় গুরুগম্ভীর বিষয়ের সম্ভ্রমভাব প্রকাশ করেছেন, যা অন্য পাঠকের জন্য রাখা হলো প্রকৃত শিল্পরস যেনো তারা আস্বাদন করতে পারে। ‘যেখানে পুঁজির পিঞ্জরে থাকিয়া মনুষ্য জীবনের পরিণতি কী হইতে পারে, তাহার কিঞ্চিৎ পরিচয় লইবার জন্য সম্প্রতিকালের তিন খানা চলচ্ছবির কথা লেখক হাজির করিয়াছেন।’
বইয়ের নাম : নিবন্ধ
চলচ্চিত্র লেখক : ইকবাল করিম হাসনু প্রকাশক : কিউরিয়াস ঢাকা প্রকাশকাল : জানুয়ারি
২০১৮ প্রচ্ছদ : লোয়াঁ দ্যু ভিয়েতনাম
চলচ্চিত্র থেকে মূল্য : ৩০০ টাকা
লেখক : সালাহউদ্দিন নীল, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী। বর্তমানে নিতান্ত পেটের দায়ে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করছেন।
neelanthro@gmail.com
https://www.facebook.com/salahuddin.neel
বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ১৭তম সংখ্যা, জুলাই ২০১৯ এ প্রকাশিত হয়েছে।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন