মোহসিবা মোস্তারী
প্রকাশিত ০২ আগস্ট ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
নির্মাতা গুইসেপে ও দেশে দেশে হাজারো মানুষের স্মৃতির প্রেক্ষাগৃহ
মোহসিবা মোস্তারী

বিশ্ব হারিয়েছে এক ‘আজব ঘর’
নানা দেশের মানুষকে চেনা-পড়ার নানা মাধ্যম রয়েছে। এই মাধ্যমগুলোতে উঠে আসে তাদের রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, আবেগ, ভালোবাসা। মাধ্যমগুলোর অন্যতম চলচ্চিত্র। সারাবিশ্বেই একসময় মানুষ প্রেক্ষাগৃহে একত্র হতো চলচ্চিত্র দেখাকে কেন্দ্র করে। তখন জনজীবন ও সংস্কৃতির অনেকটা জুড়েই ছিলো সেই প্রেক্ষাগৃহগুলো। একসময় মানুষের কী যে আবেগ ছিলো চলচ্চিত্র দেখাকে কেন্দ্র করে; তা হয়তো এখনো দেখা যায় কোথাও কোথাও; তবে সেই পরিসরটা অনেকখানিই কমে এসেছে। প্রাযুক্তিক সুবিধা নিয়ে মানুষ আজও চলচ্চিত্র দেখে, কখনো হিমঘরে বসে পপকর্ন খেতে খেতে আবার কখনো হাতের ছোট্ট স্ক্রিনের মোবাইল ফোনসেটে কিংবা ল্যাপটপে। নানা শ্রেণির বৃহৎ মানুষের সঙ্গ নিয়ে চলচ্চিত্র দেখার সেদিন এখন কেবলই স্মৃতি।
প্রেক্ষাগৃহে এই একত্র হওয়া একসময় সম্প্রীতির দ্বার খুলে দিয়েছিলো। মানুষের হাসি-কান্না মোড়ানো নানা বিষয় সেই জায়গায় প্রকাশ হতো নির্দ্বিধায়। ফলে বাস্তব জীবনের অনেক টানাপড়েন সেখানে নিভৃতে কিছুটা হলেও ধুয়ে-মুছে যেতো। কিন্তু মানুষ এখন আর তাদের সেই পারস্পরিক বোধ সেভাবে ভাগাভাগি করতে পারে না। ফলে যাপিত জীবনের নানারকম চাপা ভালোবাসা, রাগ, অভিমান, মত, দিনের পর দিন আরো চাপা পড়ে মনে। আজকের দিনে মানুষের মনের যে হতাশা, বেড়ে যাওয়া ক্ষোভ, সেগুলোর জন্য কিছুটা হলেও হয়তো প্রেক্ষাগৃহহীন এই পরিস্থিতিটা দায়ী।
এই প্রেক্ষাগৃহগুলোকেই দিনের পর দিন সন্তানের মতো আগলে রেখেছিলো কিছু মানুষ। তাদের ভালোবাসা আর কর্মনিষ্ঠার কারণেই এতো গুরুত্বপূর্ণ একটা প্রতিষ্ঠান হয়তো প্রাণ পেয়েছিলো এতোদিন। তবে সেই ভালোবাসারও পতন ঘটে একসময়। সেই পতনেই কিন্তু সব শেষ হয়ে যায় না। গুইসেপে টোরানটোরের চলচ্চিত্র সিনেমা প্যারাদিসো’র গল্পটা তেমনই একটি প্রেক্ষাগৃহের। যাতে উঠে এসেছে একটি প্রেক্ষাগৃহকে ঘিরে কিছু মানুষের সুখ-দুঃখ-আবেগের গল্প। সেই প্রেক্ষাগৃহের চিত্রায়ণ করেই যেনো নির্মাতা সারাবিশ্বের প্রেক্ষাগৃহের বর্তমান অবস্থাকে রিপ্রেজেন্ট করেছেন; সঙ্গে বিশ্বের দরবারে তিনি নিজের জাত চিনিয়েছেন। এই প্রবন্ধ গুইসেপে টোরানটোরে ও তার সিনেমা প্যারাদিসোকে নিয়েই এগোবে।
গুইসেপে টোরানটোরের চলচ্চিত্রযাত্রা
দক্ষিণ ইতালির দ্বীপ শহর সিসিলি’র পালার্মো নদীর তীরে বাঘোরিয়ায় ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে ২৭ মে জন্ম নির্মাতা গুইসেপে টোরানটোরের। শিল্প-সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ শহর সিসিলিতে বেড়ে ওঠেন গুইসেপে। তবে তার পরিবারে শিল্প-সাহিত্যের কোনো আবহই ছিলো না সে অর্থে। বাবা পেপিনো ও মা ম্যারিন্না টোরানটোরের ঘরে জন্মানো গুইসেপের ছোটোবেলা থেকেই ফটোগ্রাফির ওপর প্রবল আগ্রহ ছিলো। সেই আগ্রহ থেকে প্রথম জীবনে জীবিকা হিসেবে বেছে নেন ফটোগ্রাফিকে। ফ্রিল্যান্সার হিসেবে একাধিক প্রতিষ্ঠানে কাজের পাশাপাশি প্রকাশ করেন ফটোগ্রাফির ওপর অসংখ্য ম্যাগাজিন। এ কাজ করতে করতে তিনি ঢু মারেন নাটকপাড়ায়। সেখানে মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি বিখ্যাত ইতালিয়ান নাট্যকার লুইজি পিরান্ডেলো’র নাটকে অভিনয়শিল্পী এডুয়ার্ডো ডি ফিলিপ্পো’র সঙ্গে অভিনয় করেন। নাটক থেকে একসময় চলচ্চিত্রের পথে পা বাড়ান গুইসেপে।
তবে এর মধ্যে ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি রাই-এ (RAI¾Italy's national television network) কিছু অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। টিভি অনুষ্ঠান পরিচালনার অভিজ্ঞতা নিয়ে ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে গুইসেপে নির্মাণ করেন প্রামাণ্যচিত্র ইথিনিক মাইনোরিটিস ইন সিসিলিস (Le minoranze etniche in Sicilia)। এতে নিজ শহর সিসিলির একটি বাস্তব বর্ণনা তিনি তুলে ধরেন। এ কাজটিই প্রথম তাকে কিছুটা পরিচিতি এনে দেয়। প্রামাণ্যচিত্রটি ইতালির ‘সালেনো ফেস্টিভাল’ এ পুরস্কার জিতে নেয়। এরপর বেশ কয়েকটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেন তিনি এবং ওয়ান হান্ড্রেড ডেস ইন পালার্মো (১৯৮৪)-র চিত্রনাট্য রচনা করে কাহিনিচিত্রের জগতে কাজ শুরু করেন।
গুইসেপে তার প্রথম কাহিনিচিত্র দ্য গ্যাংস্টার (Il Cammorrista) নির্মাণ করেন ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে। এই পথে তার প্রথম কাজটিই চলচ্চিত্র বোদ্ধাদের মনোযোগ আকর্ষণসহ কয়েকটি পুরস্কার জিতে নেয়। এরপর দুই বছর বিরতি দিয়ে নির্মাণ করেন কালজয়ী চলচ্চিত্র সিনেমা প্যারাদিসো (১৯৮৮)। কাহিনিচিত্র হলেও ডকুফিল্মের মতো এখানেও তিনি সিসিলি শহরের ঐতিহ্যকেই ধারণ করেন। এই চলচ্চিত্রটি মুক্তির পর গুইসেপে সারা পৃথিবীতে পরিচিতি পান। চলচ্চিত্রটি মুক্তির পর আর তাকে পিছনে ফিরতে হয়নি। সিনেমা প্যারাদিসো বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড জিতে নেয় ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে। চলচ্চিত্রটি নিয়ে আজও সমানতালেই আলোচনা হয় পৃথিবীজুড়ে। গুইসেপে এরপর একে একে নির্মাণ করেন দ্য প্রফেসর (১৯৮৬), এভরিবডি ইজ ফাইন (১৯৯০), লা ডেমিনিকা স্পেশালিস্ট (১৯৯১), স্পেস অন সান ডে (১৯৯১), অ্যা পিয়র ফর্মালিটি (১৯৯৪), দ্য স্টার মেকার (১৯৯৫), দ্য আননোন ওম্যান (২০০৬), বারিয়া (২০০৯), দ্য বেস্ট অফার (২০১৩), দ্য করেসপন্ডেস (২০১৬)-এর মতো চলচ্চিত্র।
গুইসেপের অধিকাংশ চলচ্চিত্রই খুবই সাধারণ, প্রচলিত ও প্রগতিশীল; অনেকক্ষেত্রেই তার নিজ শহর সিসিলিকে ছুঁয়ে যায়। সিসিলি যেনো চলচ্চিত্র নির্মাণের একটি উর্বর ভূমি। সিসিলিয়ানদের মধ্যে থাকা ফ্যাসিবাদের প্রভাব ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সংক্রান্ত বিষয়গুলোকে গুইসেপে তার চলচ্চিত্রে নানাভাবে ধারণের চেষ্টা করেছেন, করে যাচ্ছেন।
গুইসেপে টোরানটোরেকে বলা হয় ‘পরিচালকের পরিচালক’। কারণ তার প্রতিটি চলচ্চিত্র নির্মাতাদের নতুন করে ভাবায়, শেখায়। তবে নিজের কথা বলতে একেবারে না-রাজি গুইসেপে; সাক্ষাৎকার দিতে মোটেও পছন্দ করেন না। তিনি বিশ্বাস করেন, তার কাজই কথা বলবে। তবে এটা ঠিক, মানুষের কাজই কথা বলে, মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। গুইসেপেও হয়তো ঠিক সেই পথ ধরেই এগোচ্ছেন।
যে গল্পের ইতিহাস সিনেমা প্যারাদিসো
একটি প্রেক্ষাগৃহকে ঘিরে দুজন মানুষের জীবনের গল্প উঠে এসেছে সিনেমা প্যারাদিসোতে। চলচ্চিত্রের শুরুতে বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা সালভাতোর (ডাকনাম টোটো) বাড়ি ফিরলে তার বান্ধবী জানান, তার মা ফোন করে জানিয়েছেন আলফ্রেডো নামে এক লোক মারা গেছেন। সঙ্গে ওই বান্ধবী কৌতূহল নিয়ে জানতে চান, কে এই আলফ্রেডো? সালভাতোর তখন বান্ধবীকে আলফ্রেডোর গল্প বলতে শুরু করে। ফ্ল্যাশব্যাকে শুরু হয় আলফ্রেডো আর টোটোর গল্প।
টোটোর বাবা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মারা গেলে সে মায়ের কাছে বড়ো হতে থাকে। খুবই দুষ্টু ও সমান বুদ্ধিমান টোটোর পড়াশোনা করতে মোটেও ভালো লাগে না। তবে ভালো লাগে বাড়ির পাশে প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে চলচ্চিত্র দেখতে। ‘সিনেমা প্যারাদিসো’ নামের ওই প্রেক্ষাগৃহেই পড়ে থাকতে দেখা যায় টোটোকে। তবে চলচ্চিত্র দেখা সেসময় তার জন্য মোটেও সহজ ছিলো না। এজন্য তাকে মধ্যবয়সি প্রজেক্টর চালক আলফ্রেডোর সঙ্গে কৌশলে খাতির জমাতে হয়। একদিন এক মজার ঘটনা ঘটে। টোটো যে স্কুলে পড়ে, সেখানে আলফ্রেডোও পড়েন। পরীক্ষায় আলফ্রেডো কিছুই লিখতে না পেরে কয়েক বেঞ্চ সামনে বসা টোটোর কাছ থেকে শিখে নিতে চান। এ পরিস্থিতির মোক্ষম ব্যবহার করে টোটো প্রজেক্টর চালানো শেখার শর্ত জুড়ে দেয় আলফ্রেডোকে। নিরুপায় আলফ্রেডো এ প্রস্তাবে রাজি হন। প্রেক্ষাগৃহে ফিরে শুরু হয় আলফ্রেডোর কাছে টোটোর প্রজেক্টর চালানো শেখার পালা।
যথারীতি একদিন প্রেক্ষাগৃহে চলচ্চিত্র প্রদর্শনী চলছে; হাউসফুল দর্শক; বাইরে অপেক্ষমান আরো দর্শক। ভিতর থেকে ভেসে আসছে দর্শকের উল্লাস, চিৎকার; বাইরে টিকিটের জন্য আকুতি। প্রজেক্টর কক্ষের বারান্দায় দাঁড়িয়ে এসব দেখছিলেন আলফ্রেডো ও টোটো। হঠাৎ-ই বাইরের দর্শকের জন্য আলফ্রেডোর মন গলে যায়। তিনি টোটোকে বলেন, ‘কেমন হয় যদি এদেরকে সিনেমা দেখার সুযোগ করে দিই?’ টোটোও তাতে সায় দেয়। মুহূর্তেই প্রজেক্টরের আলো প্রবাহ ঘুরিয়ে দেন আলফ্রেডো। প্রজেক্টরের আলো গিয়ে পড়ে প্রেক্ষাগৃহের পাশে এক বাড়ির দেয়ালে। দেয়ালে এমন দৃশ্য দেখে বাইরে থাকা দর্শক উল্লাসে ফেটে পড়ে। ভিতরে দর্শকের মধ্যে শুরু হয় হইচই। তবে এ পরিস্থিতি বেশি সময় চলে না, হঠাৎ-ই রিলে আগুন ধরে পুড়ে যায় পুরো প্রজেক্টর কক্ষ। আলফ্রেডোকে মুমূর্ষু অবস্থায় টোটো উদ্ধার করে। প্রাণে বেঁচে গেলেও আলফ্রেডোর দুটো চোখ নষ্ট হয়ে যায়। দুর্ঘটনার অল্প দিন পরই চিচিও নামক এক ব্যক্তি চালু করেন ‘সিনেমা প্যারাদিসো’। তখন এলাকায় অন্ধ আলফ্রেডো বাদে আর কেউ নেই প্রজেক্টর চালানোর মতো। তবে আর একজন আছে, পাঁচ বছরের টোটো, যাকে এই কাজটি শিখিয়েছিলেন আলফ্রেডো। শেষ পর্যন্ত এই দায়িত্ব পড়ে টোটোর ওপর। স্কুলে পড়া আর প্রজেক্টর চালানোর কাজ একসঙ্গে চালাতে থাকে টোটো।
এই পরিস্থিতিতে অন্ধ আলফ্রেডোর সঙ্গে টোটোর সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ হতে থাকে। টোটো নানা ব্যাপারে উপদেশ, পরামর্শ নিতে থাকে আলফ্রেডোর কাছে। তবে এসব কিছুর মধ্যেও আলফ্রেডো কেনো জানি সবসময় টোটোকে বড়ো হয়ে চলচ্চিত্রনির্মাতা হওয়ার ব্যাপারে উৎসাহ দিতেন। সময় যায়, টোটো বড়ো হতে থাকে। একপর্যায়ে শহরের এক ধনাঢ্য ব্যাংকারের মেয়ে এলেনার প্রেমে পড়ে সে। বিষয়টি জানাজানি হলে এলেনার বাবা কিছুতেই এই সম্পর্ক মেনে নেয় না। শহর ছেড়ে চলে যেতে হয় এলেনাকে। এতে টোটো মানসিকভাবে খুবই ভেঙে পড়েন। সবকিছু ছেড়ে এবার সে সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়। প্রশিক্ষণ শেষে ঘরে ফেরা টোটোকে আলফ্রেডো বলেন, এই শহর তার স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য খুবই ছোটো। তার উচিত এই শহর ছেড়ে চলে যাওয়া এবং অতীতকে ধরে না থাকা। আলফ্রেডোর কথায় এবার নতুন স্বপ্নের খোঁজে বাড়ি ছাড়েন টোটো। নিজের শহরে ফিরে আসেন ৩০ বছর পর আলফ্রেডোর মৃত্যুর খবর শুনে। চলচ্চিত্রের কাহিনি এবার ফ্ল্যাশব্যাক থেকে বর্তমানে ফিরে আসে।
আলফ্রেডোর স্বপ্ন পূরণ হয়েছে, ছোটো টোটো এখন বিখ্যাত নির্মাতা। তবে সেই ছোটো শহর এখন অচেনা, এর অবয়ব, রঙ পাল্টে গেছে। আলফ্রেডোর বাড়িতে গেলে তার স্ত্রী টোটোকে জানান, আলফ্রেডো তার জন্য দুইটা জিনিস রেখে গেছেন--একটি পুরনো রিল ও সেই ছোট্ট টুলটি। যার উপর দাঁড়িয়ে ছোটো টোটো প্রজেক্টর চালাতো। তিনি আরো জানান, টোটোর সাফল্যে সবসময়ই খুব গর্বিত হতেন আলফ্রেডো। শেষকৃত্য শেষ করে টোটো ফিরে যান রোমে এবং সেখানে গিয়ে তিনি আলফ্রেডোর রিলটি দেখতে শুরু করেন। বোঝা যায়, এগুলো সেইসব রোমান্টিক দৃশ্য, যা চার্চের ভয়ে সেসময় প্রেক্ষাগৃহে দেখানো যেতো না। সেগুলোই এতো বছর আগলে রেখে টোটোর জন্য রেখে গেছেন আলফ্রেডো। তা একই সঙ্গে যেমন অকৃপণ ভালোবাসা, একখণ্ড ইতিহাসও।
হাজারো স্মৃতির সিনেমা প্যারাদিসো
সিনেমা প্যারাদিসোকে নিয়ে যে ধরনের আবেগ-ভালোবাসা কিংবা স্মৃতির কথা টোটোর মাধ্যমে উঠে এসেছে, তা যেনো দেশে দেশে থাকা অধিকাংশ প্রেক্ষাগৃহকেই রিপ্রেজেন্ট করে। এমন অসংখ্য ‘সিনেমা প্যারাদিসো’র কথা লোকমুখে-ইতিহাসে কান পাতলেই শোনা যায়। যেগুলোতে একসময় ভিড় করতো হাজারো মানুষ।
টোটো স্কুল ফাঁকি দিয়ে প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে নিয়মিত চলচ্চিত্র দেখে। এজন্য তাকে মারও খেতে হয় মায়ের হাতে। তবুও তার চলচ্চিত্র দেখার নেশা কাটে না। এই যে স্কুল পালিয়ে চলচ্চিত্র দেখার স্মৃতি, তা একটা সময় বাংলাদেশের বেশিরভাগ শিশু-কিশোরেরও ছিলো। যে স্মৃতি এখনো অনেকে হাতড়ে বেড়ায়। তবে টোটো যে আবেগ দিয়ে প্রেক্ষাগৃহে যেতো, সেই দিন এখন আর নেই। আর সেই আবেগ থাকলেও, সেই প্রেক্ষাগৃহ নেই। সারা পৃথিবীতেই সময়ের সঙ্গে, প্রযুক্তির বদৌলতে ক্রমাগত কমে গেছে সেইসব একক প্রেক্ষাগৃহ। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়, যদিও কিছু ভিন্ন কারণও আছে।
একসময় প্রেক্ষাগৃহগুলোর গুরুত্ব কিছুটা কমিয়ে দিয়েছিলো ভি সি আর, সি ডি প্লেয়ার, আরো পরে স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল। এখন টেলিভিশন চ্যানেলের সঙ্গে আরো শক্তিশালীভাবে যুক্ত হয়েছে কম্পিউটার, ল্যাপটপ, সর্বশেষ স্মার্ট মোবাইল ফোনসেট। এসব ফোনসেটে ইন্টারনেট সংযোগে মুহূর্তেই মানুষ সারা পৃথিবীর চলচ্চিত্রে ঢু মারতে পারে। সেই সঙ্গে ইউটিউবের পাশাপাশি চলচ্চিত্র দেখার জনপ্রিয় মাধ্যম হয়ে উঠেছে নেটফ্লিক্স, আইফ্লিক্স, বঙ্গবিডির মতো অনলাইন ভিডিও প্লাটফর্ম। সেগুলোর বাজার বাংলাদেশেও জোরেসোরে গেঁড়ে বসেছে। আর টেলিভিশনে প্রতিবেশী দেশের বিভিন্ন সিরিয়াল তো আছেই। এসব কারণে একদিকে প্রেক্ষাগৃহ যেমন কমেছে, আবার প্রেক্ষাগৃহে মানুষের আগমনও কমে গেছে। গত দুই দশকে বাংলাদেশে দর্শক না থাকা কিংবা ভালো চলচ্চিত্র না নির্মাণের অজুহাতে শত শত প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ করে দিয়েছে মালিকরা। যেখানে একসময় বাংলাদেশে হাজারের উপরে প্রেক্ষাগৃহ ছিলো, সেখানে ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে এসে দাঁড়িয়েছে একশো ৭৪ এ।১ দেশের অনেক জেলায় এখন প্রেক্ষাগৃহই নেই। যে প্রেক্ষাগৃহগুলো ঐতিহ্যের স্বাক্ষর বহন করে, ‘সিনেমা প্যারাদিসো’র মতো সেগুলোও রক্ষা করা যাচ্ছে না।
আসলে হাজারো স্মৃতির প্রতিনিধিত্ব করে সিনেমা প্যারাদিসো। এর এক ঘণ্টা ৫৬ মিনিটে দেখা যায়, প্রেক্ষাগৃহের সামনে তার দিয়ে নিরাপত্তা বেষ্টনী দেওয়া হয়েছে। যাতে করে ডিনামাইট বিস্ফোরণে প্রেক্ষাগৃহটি ভেঙে ফেলার সময় মানুষজন এর কাছাকাছি না যেতে পারে। টোটোসহ আরো অনেকেই শেষবারের মতো ‘সিনেমা প্যারাদিসো’ দেখার জন্য এর সামনে হাজির হয়। বেষ্টনীর এপারে হাজারো স্মৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো তাকিয়ে থাকে স্মৃতির ভারে নত ‘সিনেমা প্যারাদিসোর’ দিকে। মাথায় পাকা চুল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গুটিকয়েক নারী-পুরুষ, নানা বয়সি আরো অনেকে হঠাৎ বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে, এদের সবাই যেনো অসহায়; নিমিষেই চোখের সামনে ভেঙে পড়ে তাদের স্মৃতির ইমারত। স্মৃতির মৃত্যুতে অনেকেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারে না। কেউ কেউ পরম আত্মীয়ের পতনের এ দৃশ্য না দেখতে পেরে চোখ বন্ধ রাখে। ইট-পাথরের তৈরি একটা ইমারত যেনো ক্ষণিকের জন্য মানবচরিত্র নিয়ে হাজির হয়।
সেন্সরশিপের একাল-সেকাল; পার্থক্য কতোটুকু
রাষ্ট্র থাকলে সেন্সর থাকবেই, কারণ এটা শোষণেরই আরেক রূপ। তবে কোনো সেন্সর, কোনো আইনই স্থায়ী হয়নি। শাসক তার স্বার্থগত কারণে ও সময়ের সঙ্গে ক্রমাগত তা পরিবর্তন করেছে। সিনেমা প্যারাদিসোতে প্রেক্ষাগৃহ ‘সিনেমা প্যারাদিসো’ একটা সময় চলচ্চিত্র প্রদর্শন করতে গিয়ে নানাধরনের সেন্সরের মধ্য দিয়ে যায়। চলচ্চিত্রের নয় মিনিট ২০ সেকেন্ডে দেখা যায়, গির্জার এক যাজক এসে প্রেক্ষাগৃহের ভিতরে ঢুকে চলচ্চিত্রে থাকা ‘রোমান্টিক’ দৃশ্যগুলো আলফ্রেডোকে বাদ দিতে বলেন। গির্জা নিয়ন্ত্রিত সেই ব্যবস্থায় যাজকের নির্দেশে ওই দৃশ্যগুলো কেটে রেখে চলচ্চিত্র প্রদর্শন শুরু হয়। আলফ্রেডো মৃত্যুর আগে কেটে ফেলে দেওয়া সেই দৃশ্যগুলো জোড়া লাগিয়ে একটি রিল টোটোর জন্য রেখে যান; যেগুলো ওই প্রেক্ষাগৃহে তখন চালানো যায়নি। এই রিলটি সেই সময়ের চলচ্চিত্রের সেন্সরশিপের প্রতিনিধিত্ব করে।
চলচ্চিত্রের ওপর সেই খড়গ বর্তমানেও আছে। এখনো নির্মাতারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীক ক্ষমতাকাঠামোর সঙ্গে মানানসই হয়েই চলচ্চিত্র নির্মাণ করে। যাজকের জায়গা বর্তমানে দখলে নিয়েছে রাষ্ট্র। আগে তো চলচ্চিত্র প্রেক্ষাগৃহে আসার পর সেন্সর হতো, এখন সেন্সর হয়েই প্রেক্ষাগৃহে যায়। এমনকি কোনো চলচ্চিত্র মুক্তি পাবে কি না, সেটাও তারাই নির্ধারণ করে। যদিও তথ্যপ্রযুক্তির অপ্রতিরোধ্য এই সময়ে রাষ্ট্রীয় সেন্সরের ক্ষমতা কিছুটা হলেও হ্রাস পেয়েছে; কিন্তু তার প্রতাপ কমেনি। তারপরও কিছু মানুষ আলফ্রেডোর মতো আগামীর টোটোর কাছে সেন্সরকে প্রকাশ করে যায়। যদিও ‘সিনেমা প্যারাদিসো’ থাকে না, কিন্তু আলফ্রেডোরা একটা সেন্সরহীন সময়ের প্রত্যাশা করে।
লেখক : মোহসিবা মোস্তারী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাফিক্স ডিজাইন, কারুশিল্প ও শিল্পকলার ইতিহাস বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
mohsibamostary@gmail.com
https://www.facebook.com/mohosibamustari.mim.3
তথ্যসূত্র
1.https://bit.ly/2J02BZS; retrieved on: 13.02.2019
পাঠ সহায়িকা
১. রহমান, মুম (২০১০); বিশ্বসেরা ৫০ চলচ্চিত্র; ভাষাচিত্র, ঢাকা।
2.https://www.amazon.com/Giuseppe-Tornatore-Emotion-Cognition-Cinema/dp/1847187706; retrieved on: 04.02.2019
3.http://www.washingtonpost.com/wp-srv/style/longterm/movies/videos/cinemaparadisonrhowe_a0b255.htm?noredirect=on; retrieved on: 04.02.2019
4.http://thehollywoodinterview.blogspot.com/2014/11/giuseppe-tornatore-hollywood-interview.html; retrieved on: 04.02.2019
বি.দ্র. এই সাক্ষাৎকারটি ম্যাজিক লণ্ঠন ১৭তম সংখ্যা, জুলাই ২০১৯ এ প্রকাশিত হয়েছে।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন