ভূমিকা ও ভাব-ভাষান্তর : প্রিয়াংকা দেবনাথ
প্রকাশিত ০১ আগস্ট ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
ভিম ভিন্ডার্স
কোনো কিছু আবিষ্কার করতে চাইলে প্রথমে সিনেমাটোগ্রাফারের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক তৈরি করতে হবে
ভূমিকা ও ভাব-ভাষান্তর : প্রিয়াংকা দেবনাথ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হেরে জার্মানি তখন দুই ভাগে বিভক্ত। পশ্চিম জার্মানি আমেরিকার ছায়ায়, আর পূর্ব জার্মানিতে সমাজতন্ত্রের ছোঁয়া। দুই জার্মানির মাঝখানে দৃশ্যতই নির্মাণ হয় প্রাচীর। সেই প্রাচীর শুধু জার্মানির মানুষকেই বিভক্ত করেনি, ভাগ করে দেশটির এতো দিনের শিল্প-সংস্কৃতিকেও। মানে এক অংশ পুঁজিবাদের আসরে গিয়ে হাবুডুবু খায়, অন্য অংশ সাম্যবাদের মন্ত্রে দীক্ষিত হতে থাকে। দুই মন্ত্রই জার্মানির মানুষের জীবনাচরণ, সাহিত্য, সংস্কৃতি, আচার-আচরণ, সঙ্গীত, চলচ্চিত্রের ওপর বিশাল প্রভাব ফেলে।
অনেকগুলো ছোটো ছোটো ঘটনা তখন ঘটতে থাকে জার্মানিজুড়ে। নিজের অস্তিত্ব, পরিচয়টুকু নিয়ে সেসময় মানুষের মধ্যে যেনো একধরনের শঙ্কা তৈরি হয়। এমনই এক প্রতিকূল পরিবেশে তৎকালীন পশ্চিম জার্মানিতে বেড়ে ওঠেন চলচ্চিত্রনির্মাতা ভিম ভিন্ডার্স (Wim Wenders)। ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের ১৪ আগস্ট পশ্চিম জার্মানির রাইন প্রদেশে ক্যাথলিক পরিবারে জন্ম নেওয়া ভিন্ডার্সকেও ‘অন্য সংস্কৃতি’ গ্রহণ করতে হয়। পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে তা চিন্তা-চেতনায়-মননে তিনি চর্চাও করেন। যার ছাপ লক্ষ করা যায় তার চলচ্চিত্রে।
ছোটোবেলায় দূরন্ত ভিন্ডার্স কখনো কখনো একাই চলে যেতেন রেইক্স জাদুঘর দেখতে। সেখানেই তার পেইন্টিং দেখার হাতেখড়ি, তখন থেকেই শিশু ভিন্ডার্সের মনে একটা অদৃশ্য ভালোলাগা, ভালোবাসা জন্মাতে থাকে পেইন্টিং নিয়ে। পশ্চিম জার্মানিতে তার মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক পড়াশোনা শেষ হয়। বাবা পেশায় চিকিৎসক হওয়ায় ভিন্ডার্সও কিছুদিন চিকিৎসা বিজ্ঞান নিয়ে পড়েন। এরপর দর্শন নিয়ে ভর্তি হন বিশ্ববিদ্যালয়ে। ছোটোবেলায় পেইন্টিং দেখে দেখে ঘুরে বেড়ানো ভিন্ডার্স শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ ছেড়ে ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে চিত্রশিল্পী হওয়ার নেশায় পাড়ি জমান প্যারিসে। অবশ্য এই সিদ্ধান্তকে পরে তার বাবাও সমর্থন করেন। শিল্প-সংস্কৃতির শহরে পেইন্টিং নিয়ে কাজ করতে গিয়ে একসময় তার মনে হয়, ‘শুধু পেইন্টিংয়ের মাধ্যমে সময়টাকে ধারণ করা কষ্টসাধ্য ব্যাপার।’ তাই হাতে তুলে নেন ক্যামেরা। যদিও খুব অল্পবয়সেই ক্যামেরা নাড়াচাড়ার সৌভাগ্য হয়েছিলো তার। এবার প্যারিসে তার প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে ফটোগ্রাফিকে ভিন্ডার্স এক করে ফেলেন। পরবর্তী সময়ে পেইন্টিংয়ের বিস্তৃত রূপ হিসেবেই তিনি ক্যামেরাকে ব্যবহার করেন। পরে ভিন্ডার্স চলচ্চিত্রের দিকে ধাবিত হন এবং এ নিয়ে পড়াশুনা শুরু করেন। সেসময়ে তিনি প্যারিসের একটি প্রেক্ষাগৃহে দিনে পাঁচটি করে চলচ্চিত্র দেখতেন। একসময় ভিন্ডার্স খেয়াল করলেন, তার প্রিয় আলোকচিত্রীরা অনেকেই চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করেছে। তখন চলচ্চিত্রে শক্তভাবে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। শুরুতেই তিনি নন-ন্যারেটিভ একটি চলচ্চিত্রও নির্মাণ করে ফেলেন। একপর্যায়ে কাহিনিচিত্রে মাথা দেন। প্যারিসে বসে নির্মাণ করেন সামার ইন দ্য সিটি (১৯৭০)। পরে জার্মানিতে ফিরে দ্য গোলকিপারস ফেয়ার অব দ্য পেনাল্টি (১৯৭২), দ্য স্কালেট লেটার (১৯৭৩) নির্মাণের পাশাপাশি তিনি ‘নিউ জার্মান সিনেমা’ আন্দোলনে যুক্ত হন। এরপর তিনি ‘রোড মুভি’ ঘরানার চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করেন। এলিস ইন দ্য সিটিস (১৯৭৩) তার প্রথম রোড মুভি।
১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে হেমেট (১৯৮২) নামে চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য ভিন্ডার্স প্রথম আমেরিকায় যান। প্যারিস, টেক্সাস (১৯৮৪) চলচ্চিত্রটি সেখানেই নির্মাণ করেন। ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে আবার ফিরে আসেন জার্মানিতে। তার উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলো হলো--এলিস ইন দ্য সিটিস (১৯৭৩), দ্য রঙ মুভ (১৯৭৫), দ্য আমেরিকান ফ্রেন্ড (১৯৭৭), প্যারিস, টেক্সাস (১৯৮৪), উইংস অব ডিজায়ার (১৯৮৭), দ্য মিলিয়ন ডলার হোটেল (২০০০), দ্য সোল অব ম্যান (২০০৩), ডোন্ট কাম নকিং (২০০৫), সাবমেরেন্স (২০১৭)।
২০১৪ খ্রিস্টাব্দে অনলাইনভিত্তিক ম্যাগাজিন ‘দ্য টকস’ এবং ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে আমেরিকান অনলাইন ‘ইন্টারভিউ’-এর পক্ষে ভিম ভিন্ডার্সের সঙ্গে কথা বলেন কলিন কেলসি (Colleen Kelsey)। সাক্ষাৎকার দুইটি ম্যাজিক লণ্ঠন-এর পাঠকের জন্য ভাব-ভাষান্তর করা হয়েছে।
প্রথম অংশ
দ্য টকস : ভিন্ডার্স, আপনি কর্মজীবনের শুরুর দিকে একসময় বলেছিলেন, চিত্রশিল্পী হিসেবে কাজের মধ্য দিয়েই সময়টাকে প্রকাশ করতে চান। আপনি কি এখনো সেই বিষয়টি মাথায় রেখেই চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন?
ভিম ভিন্ডার্স : আমি মূলত চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করেছিলাম পেইন্টিংকে বিস্তৃত করার জন্য। আমি প্রথমে চিত্রশিল্পী হিসেবেই কাজ করতাম, আর একজন চিত্রশিল্পী হতেও চেয়েছিলাম। কিন্তু পরে বুঝলাম, শুধু পেইন্টিংয়ের মাধ্যমে সময়ের নানা উপাদানকে ধারণ করা কষ্টসাধ্য ব্যাপার। তখন একজন চিত্রশিল্পীর জায়গা থেকে ক্যামেরা ব্যবহারের জন্য যথেষ্ট বোঝাপড়ার প্রয়োজন ছিলো। ৬০-এর দশকের শেষের দিকে আমি চলচ্চিত্রনির্মাতা হিসেবে কাজ শুরু করি; তখনো কিন্তু ভিডিওগ্রাফি সেভাবে আসেনি। সেসময় চলচ্চিত্রে অভিনয় করার মতো সেরকম কোনো অভিনয়শিল্পীও ছিলো না। আমেরিকান কয়েকজন অভিনয়শিল্পী ছিলো, যারা অভিনয়টা পরীক্ষামূলকভাবে করতো। এদের মধ্যে সম্ভবত নামকরা ছিলেন অ্যান্ডি ওয়ারহল। আমার তখন মনে হতো, তিনিই হয়তো আমাদের ভবিষ্যৎ।
তবে এখন আর আমি নিজেকে চিত্রশিল্পী মনে করি না। ফটোগ্রাফি কিংবা চলচ্চিত্র নির্মাণ যেখানেই বলি, এককথায় আমি এখন গল্পকথক। সবকিছুই আমার জন্য গল্প, আমি শুধু গল্পটা বলার চেষ্টা করি। আর এটাই আমার শক্তির মূল জায়গা।
দ্য টকস : তবে আপনার চলচ্চিত্রে চিত্রকলার ছাপ কিন্তু যে কেউ-ই লক্ষ করবে। এমনকি চলচ্চিত্রের কিছু কিছু ফ্রেমে তো ল্যান্ডস্কেপ পর্যন্ত দেখা যায়।
ভিন্ডার্স : অবশ্যই আমি এখনো গল্প বলার জন্যই ফ্রেম বানাই, প্রত্যেকটা ফ্রেমেই গল্পের একটা কার্যকর সম্পর্ক থাকে। আমার প্রথম চলচ্চিত্রটা (শর্টফিল্ম) কিন্তু কাহিনিনির্ভর ছিলো না। সেখানে কোনো গল্প ছিলো না, ঘটনা ছিলো না, এমনকি কোনো অভিনয়শিল্পীও ছিলো না। চিত্রশিল্পী হওয়ার কারণে হোক আর পরবর্তী সময়ে নির্মাতা হিসেবেই হোক, আমি আগ্রহী ছিলাম ল্যান্ডস্কেপ দৃশ্যের প্রতিই। তবে দিনশেষে আমি একজন গল্পকথক।
দ্য টকস : কেনো আপনি আখ্যাননির্ভর চলচ্চিত্রের দিকে ঝুঁকলেন?
ভিন্ডার্স : আমি যখন চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করি, তখন খুব দ্রুতই লক্ষ করলাম, ভ্রমণের সময়ও চলচ্চিত্র নির্মাণ সম্ভব। এর জন্য স্টুডিও প্রস্তুত করা লাগে না, ক্যামেরা নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়লেই হয়। এই কাজ করতে গিয়ে আমি আবিষ্কার করলাম, এ ধারার (রোড মুভি) চলচ্চিত্র-সংক্রান্ত কিছু চিন্তাভাবনা আগে থেকেই আছে। যদিও এই ধারার চলচ্চিত্র ইউরোপের চেয়ে আমেরিকাতে বেশি জনপ্রিয় ছিলো। ফলে আমি যতো দ্রুত সম্ভব ক্যামেরা নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। অল্প সময়ের মধ্যে বুঝতে পারলাম কোনো কিছু প্রকাশের একটি পথ আমি খুঁজে পেয়েছি এবং যার মধ্যে আমি সত্যিই নিজেকে মানিয়ে নিয়েছি।
দ্য টকস : আপনার নির্মিত অধিকাংশ ভালোলাগা চলচ্চিত্রই ‘রোড মুভি’। চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য এই ধারাটাকে কেনো নিজের জন্য যথাযথ মনে হলো আপনার?
ভিন্ডার্স : সম্ভবত এই ধারণাটা আমার মনে গেঁথে গিয়েছিলো সেই শৈশবে, যখন আমি পশ্চিম জার্মানিতে বেড়ে উঠছিলাম। সেই জায়গাটায় নানা দিক দিয়েই খুবই কম সুযোগ-সুবিধা ছিলো; টিকে থাকাও খুব কঠিন ছিলো, চারদিকে ছিলো নানাধরনের প্রতিবন্ধকতা। এমনকি সেখানকার মানুষগুলোও অনেকটা সংকীর্ণমনা ছিলো। সেসময় আমিও খুব সংকীর্ণতা বোধ করতাম। সুতরাং তখন শিশু হিসেবে আমার একমাত্র প্রেরণার ও তৃপ্তির জায়গা ছিলো ভ্রমণ। পাঁচ বছর বয়সে প্রথম আমি একা ট্রেন ভ্রমণ করি। সেটা আমার জীবনের চমৎকার একটি দিন ছিলো। আমি ট্রেনে একাই বসেছিলাম আর কেউ আমাকে দেখছিলো না।
দ্য টকস : কোথায় যাচ্ছিলেন আপনি?
ভিন্ডার্স : নানির বাড়িতে। সেসময় মা অন্তঃসত্ত্বা হওয়ায় আমার সঙ্গে আসতে পারলেন না। তবে তিনি স্টেশনে আমাকে তুলে দিতে আসলেন। আর ট্রেনে আমার আশপাশে মানুষ খোঁজা শুরু করলেন, যে আমাকে সফরজুড়ে দেখে রাখবে। এটা আমার একেবারেই সহ্য হয়নি। এ নিয়ে সেদিন মায়ের সঙ্গে রাগারাগিও করেছি। মাকে সোজাসুজি বলে দিয়েছি, কারোর আমাকে দেখে রাখার দরকার নেই। ভাগ্য ভালো, মা সেদিন এমন কাউকে খুঁজেই পাননি। ফলে সেদিন নিজের মতো করে ভাবতে ভাবতে গিয়েছি; সেদিনই খেয়াল করেছি, নিজের মতো করে একা সফর করা আমার জীবনে খুবই গুরুত্ববহ।
দ্য টকস : আপনার কথামতো আমেরিকান সংস্কৃতির সঙ্গে রোড মুভির প্রাথমিকভাবে সম্পৃক্ততা আছে। আপনার কাজের মধ্যেও সেই সংস্কৃতির ছাপ বিভিন্নভাবে চোখে পড়ে। তাছাড়া আপনি সেখানে দীর্ঘ সময় ছিলেনও। কখন থেকে আপনি আমেরিকার সংস্কৃতিতে অনুপ্রাণিত হলেন?
ভিন্ডার্স : এই ব্যাপারটা আসলে একদিনে ঘটেনি। যখন আমি বেড়ে উঠছিলাম, তখন প্রথম যে জিনিসটা আমাকে বিমোহিত করেছিলো, তা হলো আমেরিকান সাহিত্য। সেসময় প্রতিদিনই আমি একটি করে বই পড়তাম। এবং খুব দ্রুতই মার্ক টোয়েনের ‘টম সাওয়ার’ ও ‘হাকলেবেরি ফিন’ বই দুইটি আমার খুব ভালো লেগে যায়। এছাড়া কমিক স্ট্রিপও খুব পছন্দের ছিলো আমার। তবে জার্মানিতে এগুলোর তেমন প্রচলন ছিলো না বললেই চলে; কিন্তু আমি সেগুলো সংগ্রহ করতাম। এমনকি ‘মিকি মাউস’ থেকে ‘সুপারম্যান’-এর সব কমিক স্ট্রিপ সংগ্রহ করতাম (যেগুলো পাওয়া যেতো)। ১০-১২ বছর বয়স থেকেই আমি গান (Rock `N’ Roll) শুনতাম। তবে এর আগে পর্যন্ত আমার কাছে গান অতোটা আগ্রহের বিষয় ছিলো না। কারণ যখন আমার মা রেডিওতে জার্মান গান শুনতেন, সেগুলো আমার কাছে একেবারেই ভালো লাগতো না। কিন্তু যখন এই গানগুলো শুনলাম, মনে হতো এটাই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গান। তবে মজার ব্যাপার হলো, পরে বুঝেছিলাম এই গানগুলো আমেরিকান ছিলো! সুতরাং আমার বেড়ে ওঠার সঙ্গে আমেরিকার একটা প্রভাব ছিলোই।
দ্য টকস : এসব নিয়ে আপনার মা-বাবার চিন্তাভাবনা ঠিক কেমন ছিলো?
ভিন্ডার্স : আমি ওইসব গানের সব রেকর্ডিং সংগ্রহ করতাম। কিন্তু আমার মা-বাবা এই গানগুলো পছন্দ করতেন না। এজন্য আমি রেকর্ডগুলো বন্ধুর বাড়িতে রেখে দিতাম। কিন্তু বিষয়টা হলো, আপনি যে বিষয়টাকে পছন্দ করেন, তাতে কেউ বাধা দিলে আগ্রহ আরো বেড়ে যায়। আর যেটাকে আমি খুব ভালোবাসি, তার ওপর যাবতীয় আগ্রহ একান্তই আমার নিজের। মা-বাবা আমার পছন্দ করা কমিক স্ট্রিপস্, গান অপছন্দ করতো। এমনকি তারা যখন দেখলো, আমি চলচ্চিত্রের দিকে ঝুঁকছি, তখনো তারা এতে বাধা দিলো। তাই আমাকে সবসময় বাধা ডিঙিয়েই কোনো কিছু পছন্দ করতে হয়েছে।
দ্য টকস : কী ধরনের চলচ্চিত্র দেখতেন আপনি?
ভিন্ডার্স : আমি প্রথমে আমেরিকান চলচ্চিত্রগুলো খুঁজে পাই; বিশেষ করে জন ফোর্ড অভিনীত আমেরিকান চলচ্চিত্রগুলো তখন দেখতাম প্যারিসের প্রেক্ষাগৃহে। সেসময় এই চলচ্চিত্রগুলোর প্রতি আমার একধরনের টান তৈরি হয়। এই চলচ্চিত্র থেকে আমি অনেক কিছু শিখেছি। আপনার নিজের অনুভূতির খুব গভীরে যাওয়ার ক্ষমতা ছিলো এই চলচ্চিত্রের।
দ্য টকস : এজন্যই কি আপনি এলিস ইন দ্য সিটিস (১৯৭৩)-এ রডিগার ভোগলার’কে (Rüdiger Vogler, জার্মান চলচ্চিত্র ও মঞ্চ অভিনয়শিল্পী) দিয়ে তার (জন ফোর্ডের) মৃত্যু সংবাদ পড়ার মর্মস্পর্শী দৃশ্যটি ধারণ করেছিলেন?
ভিন্ডার্স : হ্যাঁ, এলিস ইন দ্য সিটিস নির্মাণের সময় যখন জন ফোর্ড মারা যান; তখন আমি খুবই কষ্ট পেয়েছিলাম। কারণ তখন আমি ভাবছিলাম, আর কখনোই তার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ থাকলো না। তার প্রতি সম্মান জানাতেই চলচ্চিত্রে আমি এই দৃশ্যটি করি। একটা কথা মনে রাখবেন, আপনি যদি কোনো কিছুকে খুব ভালোবাসেন, সেটা প্রকাশের জন্য আপনি সবকিছুই করতে পারবেন।
দ্য টকস : ৭০-এর দশকের শেষ দিকে আপনি আমেরিকায় গেলেন; সেখানকার সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা থেকেই কি গেলেন?
ভিন্ডার্স : জীবনে আমি দুই বার আমেরিকায় যাওয়া এবং ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমি সেখানে একবার ১৯৭৭-১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় আট বছর ছিলাম; এরপর ফিরে আসি। প্রথমবার আমেরিকায় কাটানো সময়টা আমার তেমন ভালো ছিলো না। হেমেট (১৯৮২) চলচ্চিত্রের সূত্র ধরে আমি সেখানে যাই। চলচ্চিত্রটি নির্মাণে বেশ সময় লেগেছিলো; কিন্তু সেই তুলনায় সেটা নিয়ে আমি সন্তুষ্টির জায়গায় পৌঁছাতে পারিনি। তারপর আমি প্যারিস, টেক্সাস (১৯৮৪)-এর মতো চলচ্চিত্রও সেখানে নির্মাণ করি; আর এই চলচ্চিত্রই আমাকে ফিরে আসার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিলো। কারণ আমি কোনোভাবেই পরাজিত হয়ে সেখান থেকে ফিরতে চাইনি। আমি সেখান থেকে কিছু নিয়েই তবে ফিরতে চেয়েছিলাম।
দ্য টকস : নিশ্চিতভাবেই আপনি ভালো করেছিলেন। তাই হয়তো আপনি ওই বছরই কান উৎসবে পাম ডি’ অর পুরস্কারটি পেয়েছিলেন।
ভিন্ডার্স : প্যারিস, টেক্সাস শেষমেষ আমেরিকান চলচ্চিত্র হয়ে উঠেছিলো। চলচ্চিত্রটির কাজ আমি আমেরিকাতেই করতে চেয়েছিলাম। এরপর আমি ইউরোপে ফিরে আসি; আর এর মধ্যে দিয়ে ইতি ঘটে আমার রোমাঞ্চকর প্রথম আমেরিকা ভ্রমণের। ১২ বছর পর ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে আমি আবার সেখানে যাই।
দ্য টকস : আপনি দ্বিতীয়বার সেখানে কেনো গেলেন?
ভিন্ডার্স : সেই সময়টাতে বার্লিন আমার ভালো লাগছিলো না। ৯০-এর দশকে দুই জামার্নির মিলনের পর আমার মধ্যে একটা হতাশা কাজ করেছিলো। এমনকি সেসময় সেখানে নতুন কিছু তৈরি করার মতো পরিবেশও ছিলো না। নানা কারণে সেসময় আমার মাথায় আমেরিকা আসতে থাকে এবং আমি সেখানে ফিরে যাই। তবে এই যাত্রায় আমি সঙ্গে নিয়েছিলাম অনেকগুলো নতুন নতুন চিন্তা এবং ভিন্ন ধরনের কিছু প্রত্যাশা। কারণ সেসময় কিন্তু আমি মোটেও একেবারে তরুণ কিংবা সাদাসিধে কোনো চলচ্চিত্রনির্মাতা ছিলাম না।
দ্য টকস : তারপর তো আবার আপনি বার্লিনে ফিরে এলেন?
ভিন্ডার্স : আমাকে যে ফিরে আসতে হবে, সেটা আমি জানতাম। যদিও জার্মানি, অস্ট্রিয়ার অনেক নির্মাতাই আছে, যারা আমেরিকায় গিয়ে আর ফিরে আসেনি। তবে আমার জন্য এটা একেবারে ভিন্ন চিন্তা ছিলো। আমি বিশ্বাস করি, জীবনে সবসময় সমান্তরাল দুটি ধারা থাকবেই। আমি আরো অনেক জায়গাতেই থাকতে পারতাম। আমি আমেরিকাকে তখন অনেক পছন্দও করতাম, এখনো করি। তবে তা সত্ত্বেও আমার সমস্ত কিছু জুড়েই তো ইউরোপ। এই জায়গাটাকেই আমি ধারণ করি।
দ্বিতীয় অংশ
কলিন কেলসি : সম্প্রতি আপনার আগের কয়েকটি চলচ্চিত্রের নতুন সংস্করণের (Restore) কাজ করেছেন। ৪০ বছর আগে নির্মিত সেই চলচ্চিত্রগুলো সম্পর্কে ঠিক এখন আপনার মনোভাব কী? আপনি কি এখনো গভীরভাবে সম্পৃক্ত চলচ্চিত্রগুলোর সঙ্গে?
ভিন্ডার্স : আমাকে শুধু এই চলচ্চিত্রগুলোর সঙ্গেই সম্পৃক্ত হতে হয়নি, ১৯৭১-এর সমসাময়িক বা তারপরের চলচ্চিত্র নিয়েও আমাকে কাজ করতে হয়েছে। প্রথম আমি পুনরুদ্ধার করি দ্য গোলি’স অ্যাঙজাইটি অ্যাট দ্য পেনালটি কিক (১৯৭১), যার জন্য ১৯৭২ এর জানুয়ারিতে আমাকে প্রথম নিউ ইয়র্ক যেতে হয়েছিলো নতুন নির্মাতাদের নিয়ে ‘মোমা’র (MoMA¾The Museum of Modern Art) আয়োজনে একটি অনুষ্ঠানে। তখন আমি সেই অর্থে একেবারেই ছোটো ছিলাম। নির্মাণের ৪৩ বছর পর কোনো চলচ্চিত্র নতুন করে নির্মাণের দায়িত্ব আমার ওপর ছিলো; বুঝতেই পারছেন সেটা কিন্তু খুব সহজ ছিলো না। তবে কোনো চলচ্চিত্র পুনর্নির্মাণ হয় সাধারণত এর নাম আর অবস্থানের দিক থেকে; সেখানে নতুন করে আপনি তেমন কিছু করতে পারবেন না। আপনি শুধু এটাকে একটু ঘষামাজা করতে পারবেন। সঙ্গে আমাকে এটাও মাথায় রাখতে হয়েছিলো যে, আমি মূলত চলচ্চিত্রে একটা সময়কে বলতে চাই। তাই এটাকে পরিবর্তন করা থেকে বিরত থাকতে হয়েছে। তবে মজা করে কখনো আপনি নিজেকেই প্রশ্ন করতে পারেন--নরকে থেকে কীভাবে এই কাজ আমি করলাম? এ রকম আরো অসংখ্য প্রশ্ন আসবে অবশ্যই। তবে এর উত্তর একদমই সাদাসিধে।
৪০ বছর পর আপনাকে একই কাজ করতে হচ্ছে এবং একেবারে ভিন্নভাবে। তবে এর মাধ্যমে একটি চমৎকার জিনিস আপনি আবিষ্কার করতে পারবেন; কারণ এই কাজ করতে গিয়ে কখনো কখনো আপনি নিজের ভুলগুলো পরিষ্কারভাবে দেখতে পারবেন; মজার ব্যাপার হলো, সেই ভুলগুলোর ব্যাপারে আপনি আর এখন কিছুই করতে পারবেন না।
কেলসি : এলিস ইন দ্য সিটিস সত্যিকার অর্থেই আপনার প্রথম রোড মুভি। প্রচলিত ধারনা ভেঙে আপনার কাছে চলচ্চিত্র নির্মাণের সেই অভিজ্ঞতাটা কেমন ছিলো?
ভিন্ডার্স : সত্যি কথা বলতে কী, আমি বিদ্যমান রীতিগুলো সম্পর্কে তেমন জানিই না। তবে এর জন্য আমাকে কিছু চলচ্চিত্র দেখতে হয়েছিলো। আমার মনে পড়ে, আমি ডিটর (১৯৪৫) দেখেছিলাম; কিন্তু কখনো আমি এটাকে কোনো রীতি কিংবা নিয়মের মধ্যে ফেলিনি। অবশ্য আমার পাশ্চাত্য চলচ্চিত্র নিয়ে কিছুটা ধারণা ছিলো। এই ধরনের চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে যদি কোনো একটি চলচ্চিত্রকেও অগ্রগামী হিসেবে দেখা হয়, তা অবশ্যই পশ্চিমা চলচ্চিত্র। কিন্তু আমি এটা জানতাম না যে, ভ্রমণের সময়ও চলচ্চিত্র নির্মাণ করা যায়। আমি এটাও জানতাম না, রোড মুভি নির্মাণের জন্য একটি গাড়ি দরকার; একটি গল্প শুরু করে, একটি ভ্রমণপথ ঠিক করতে হয়।
এলিস ইন দ্য সিটিস নির্মাণের সময় আমি এটা উপলব্ধি করি। আমার জন্য সেটা একেবারেই অস্বস্তিকর বিষয় ছিলো। আর এটাই হচ্ছে চলচ্চিত্র নির্মাণ, হয়তো এ কাজ করার জন্যই আমি জন্মেছি। এটা আপনাকে অবিশ্বাস্য একটি স্বাধীনতা এনে দিবে, কারণ এটি কালানুক্রমিক শৃঙ্খলা চলচ্চিত্র ধারণ করতে শেখায়। রোড মুভি নির্মাণের ক্ষেত্রে আপনাকে কয়েকটি ধাপের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। প্রথমে ‘এ’ ধাপ শুরু করে পরে পর্যায়ক্রমে ‘বি’, ‘সি’, ‘ডি’ ধাপ পাড়ি দিয়ে হয়তো একটা নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছাবেন আপনি। আমার কাছে এটা অবিশ্বাস্য লাগতো, কারণ এই জিনিস আপনাকে এমন একটি সুযোগ দিবে যেখানে আপনি স্বাধীন--এমনকি চলচ্চিত্রের গতিও পাল্টে ফেলতে পারেন।
তবে প্রথাগত ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে আপনি এই সুযোগ কখনোই পাবেন না। কেননা চলচ্চিত্র নির্মাণের যে পরিস্থিতি এবং প্রায় সবসময়ই শুরুর দৃশ্যের আগেই আপনাকে শেষ দৃশ্য ধারণ করতে হয় এ ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে। এখানে আপনার হাতে কোনো কিছু বদলানোর জন্য সামান্য সুযোগটুকুও থাকে না। রোড মুভির ক্ষেত্রে বিষয়টি একেবারেই উল্টো; এখানে আপনার সার্বিক স্বাধীনতা থাকে। এটা আপনাকে ডানপন্থি থেকে বামপন্থি নীতিতে যেতে সাহায্য করবে। এটা আপনার লেখা স্ক্রিপ্ট বদলানোতে উৎসাহ দিয়ে নতুন চিন্তার জন্ম দিতে সাহায্য করবে। আর এই বিষয়টাকেই আমি ভালোবাসি। আমি আমার সামনের পাঁচ-ছয়টা চলচ্চিত্র এভাবেই নির্মাণ করতে চাই।
কেলসি : তখন কি আপনি ওই কাঠোমোতেই আবেগী ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে কাল্পনিক চরিত্রগুলোকে যথাযথভাবে সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন?
ভিন্ডার্স : সেগুলো প্রবাহতাড়িত ছিলো এবং কিছু একটা খুঁজতো। জার্নিটা তাদের কাছে ছিলো ‘মনের রাজত্ব’। আর একজন চলচ্চিত্রনির্মাতা হিসেবেও এই জার্নিটা হলো কাজের একটা পথ, যেটা তাকে চলচ্চিত্র বিষয়ে একটি সম্যক অভিজ্ঞতা দেয়। দর্শকের কাছে কোনো কিছু উপস্থাপনের নতুন এক অভিজ্ঞতা চলচ্চিত্র আপনাকে দেবে। চলচ্চিত্রকর্মীদের অধিকাংশ অ্যাডভেঞ্চার চলচ্চিত্র নির্মাণ করলেও তারা এটা করতে চায় না। তারা আসলে অ্যাডভেঞ্চারের ভান করে মাত্র। কিন্তু আপনি রোড মুভির ক্ষেত্রে সত্যিকারের রোমাঞ্চে যেতে পারবেন। আপনি অজানার মধ্য দিয়ে যেতে পারবেন। এমনকি হতে পারবেন অজানার মুখোমুখিও। আপনি শুধু এটা নির্মাণই করেন না; এটা আপনি অনুভবও করছেন। আমি ওটাকেই বেশি পছন্দ করি, কেননা দর্শক এর মধ্যে সম্পৃক্ত হতে পারে। এটা অনেকখানি প্রমাণ হয় যে, আপনি প্রকৃতপক্ষেই এটা করেছেন। এটা এক অসাধারণ অনুভূতি!
প্রথমে আমি এসবের কিছুই জানতাম না। তবে জানার আগেই আমি তিনটা চলচ্চিত্র নির্মাণ করে ফেলি। এগুলো আমি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এলোপাথাড়ি শুট করেছিলাম। সেখানে আমার কোনো স্বাধীনতা ছিলো না। যদিও আমি কিছু বদলাতে পারতাম, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটা পারিনি। কারণ তার আগেই আমি ওই চলচ্চিত্রের অন্য দৃশ্যগুলো শুট করে ফেলেছিলাম। একেবারে স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে কাজ করা আমার প্রথম চলচ্চিত্র এলিস ইন দ্য সিটিস। সেটা অসাধারণ ছিলো, আর এটাই আমার প্রথম রোড মুভি। আমি আসলে বুঝতামই না, চলচ্চিত্রটি কীভাবে শেষ করতে হবে। আপনি চাইলেই এ ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে পারেন। এটা খুবই স্বাধীন একটি ধারা এবং একই সঙ্গে আনন্দের। আমরা চাইলে এখনো শুটিং করতে পারি। এটা এতোটাই মজাদার যে, আমরা কখনোই তা শেষ করতে চাইতাম না।
কেলসি : সত্যিই কি ওয়াকার ইভান-এর ফটোগ্রাফির সঙ্গে এলিস ইন দ্য সিটিস-এর কোনো সম্পর্ক ছিলো?
ভিন্ডার্স : এটা কিঙ অব দ্য রোড (১৯৭৬)-এর সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে এলিস ইন দ্য সিটিস নির্মাণের সময় আমি তার সম্পর্কে পড়িনি। কিন্তু কিঙ অব দ্য রোড নির্মাণের সময় আমার কাছে তার কিছু বই ছিলো। ওয়াকার ইভান ওই চলচ্চিত্রের জন্য একজন বড়ো তারকা ছিলেন।
কেলসি : সিনেমাটোগ্রাফার রবি মুলার’কে নিয়ে আপনি যেসব চলচ্চিত্র করেছেন, সেখানে তার সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কেমন ছিলো? কীভাবে আপনারা এগোলেন?
ভিন্ডার্স : রবি আর আমি একসঙ্গে ১০টি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছি। সত্যি কথা বলতে আমরা একসঙ্গে অনেক কিছু শিখেছি। রবি তার প্রথম চলচ্চিত্র আমার সঙ্গেই করে। কখনো ভাবতেই পারি না, রবি ছাড়া অন্য কোনো সিনেমাটোগ্রাফারকে নিয়ে আমি কাজ করছি! ১০ বছর আমরা সব কাজ একসঙ্গে করেছি। শুরুতে আমাদের ঠিক করা ছিলো, আমি শট্ নিতে বসবো আর রবি ক্যামেরা ও লাইটিংটা দেখবে। আমি লাইটিংয়ের দিকটা কখনোই দেখতাম না। তবে ফ্রেমিংয়ের বিষয়টা আমার দায়িত্বে থাকতো। আমি মূলত ওইটার ওপরই জোর দিতাম। তবে আমার প্রথম চলচ্চিত্রটি (শর্টফিল্ম) আমার মতো করেই করেছি। যখন রবি আসলো তখন এটা আমাদের মধ্যে পরিষ্কারভাবে সিদ্ধান্ত ছিলো যে, ফ্রেমটা আমার কাজ আর লাইটিংয়ের কঠিন কাজটা রবির। আমরা দারুণভাবে ১০টি চলচ্চিত্রে কাজ করেছি। এমনকি পরিকল্পনা নিয়ে আমাদের মধ্যে খুব বেশি কথা বলারও দরকার হয়নি। প্যারিস, টেক্সাস (১৯৮৪)-এর অনেক শটই ১২ বছর আমাদের একসঙ্গে কাজ করার ফল। আমরা এক রকম জমজ ভাইয়ের মতোই ছিলাম।
পরে আমি অবশ্য অন্য জায়গায় চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করি। তখন রবিকে সবসময় পাওয়া যেতো না। সেসময় আমি অন্য সিনেমাটোগ্রাফারের সঙ্গে আর রবি অন্য নির্মাতার সঙ্গে কাজ করে। রবি সবসময় জিম জারমাস-এর (James Robert Jarmusch, আমেরিকান নির্মাতা, প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার, সম্পাদক ও অভিনয়শিল্পী) সঙ্গে কাজ করতে চাইতো। তবে এখনো রবির সঙ্গে আমার খুব ভালো একটা সম্পর্ক আছে, একজন সিনেমাটোগ্রাফারের সঙ্গে যেমন সম্পর্ক থাকা দরকার। সত্যিই কোনো কিছু আবিষ্কার করতে চাইলে প্রথমে সিনেমাটোগ্রাফারের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। আমি আর রবি অনেক জিনিসই নতুন করে খুঁজে বের করেছিলাম। প্রথমবার কাজ করার আগে সত্যিই আমরা জানতাম না কীভাবে এটা করতে হয়।
কেলসি : কখন থেকে আপনি ফটোগ্রাফি শুরু করলেন? এটা চলচ্চিত্র নির্মাণের পূর্বপ্রস্তুতির কোনো অংশ ছিলো নাকি অন্যকিছু ভেবে শুরু করেছিলেন?
ভিন্ডার্স : ফটোগ্রাফি ব্যাপারটা আমার শৈশবেই শুরু হয়েছিলো। ছয় বছর বয়সেই আমার একটি ক্যামেরা ছিলো। আমার বাবা আলোকচিত্রী হিসেবে খুব বেশি দক্ষ ছিলেন না। এজন্য তিনিও সবসময় আমার মধ্যে সেই ঝোঁকটা বাড়াতে চাইতেন। মনে হয় সেই সূত্র ধরেই আমার হাতে ক্যামেরাটি আসে। আমি আমার সমস্ত জীবনই ফটোগ্রাফি করেছি। গান শোনা, গোসল, খাওয়ার মতো করেই আমি ফটোগ্রাফিটাকে নিয়েছিলাম। আমার সব কাজেরই একটা অংশ ছিলো ফটোগ্রাফি।
১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দের পর থেকে আমি এটাকে আরো গুরুত্ব সহকারে নিতে শুরু করি এবং নিজের জন্য ফটোগ্রাফি শুরু করি। যখন আমি আমেরিকার পশ্চিমাঞ্চলে প্যারিস, টেক্সাস (১৯৮৪)-এর কাজে যাই; সেই সময়টা পুরোটাই আমার ছিলো। আমি ফটোগ্রাফি করতাম শুধু নিজের জন্য; চলচ্চিত্রের জন্য প্রস্তুতির কোনো ব্যাপার ছিলো না। কিন্তু নিজেকে পাশ্চাত্যের রঙ আর লাইটিংয়ের জন্য প্রস্তুত করার একটা ব্যাপার ছিলো। তবে শুধু ফটোগ্রাফার হিসেবে সেটাই ছিলো আমার প্রথম ভ্রমণ; এমনকি ফটোগ্রাফি আর চলচ্চিত্রকে বিচ্ছিন্ন করাও। আমার জীবনের অর্ধেকটাই যুক্ত ছিলো আমার ফটোগ্রাফির সঙ্গে, এটার সঙ্গে আমার চলচ্চিত্রের কোনো সাযুজ্যতা ছিলো না। ফটোগ্রাফিকেই আমি একটি জার্নি হিসেবে নিয়েছিলাম। আমার কাছে এটা ছিলো একটি আলাদা পেশা।
সূত্র :http://the-talks.com/interview/wim-wenders/; retrieved on: 23.01.2019
https://www.interviewmagazine.com/film/wim-wenders; retrieved on: 23.01.2019
প্রিয়াংকা দেবনাথ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
priyankadebnath422@gmail.com
https://www.facebook.com/priyanka.debnath.31521
বি.দ্র. এই সাক্ষাৎকারটি ম্যাজিক লণ্ঠন ১৭তম সংখ্যা, জুলাই ২০১৯ এ প্রকাশিত হয়েছে।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন