অনুপম হায়াৎ
প্রকাশিত ৩১ জুলাই ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
ব্যক্তির মত অনেক সময় বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য
অনুপম হায়াৎ

চলচ্চিত্রের বাণিজ্যিক পথচলা লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয়ের হাত ধরে শুরু হওয়ার মধ্য দিয়ে যে ইতিহাসের জন্ম হয়েছিলো, তা পরম্পরায় এক মহাসমুদ্রে রূপ নিয়েছে। ভারতবর্ষে প্রথমবারের মতো ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দের ৭ জুলাই লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয় চলচ্চিত্র প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে যে ইতিহাস রচনা করেন, সেই ইতিহাস তৎকালীন পূর্ববঙ্গে রচিত হতে সময় লেগেছিলো মাত্র এক বছর নয় মাস। ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দের ৪ এপ্রিল পূর্ববঙ্গে প্রথম চলচ্চিত্র প্রদর্শন হয় এবং তা করেন এ ভূখণ্ডেরই হীরালাল সেন। এরপর ধীরে ধীরে এ অঞ্চলে চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু হয়ে ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়। কিন্তু দুভার্গ্যজনক হলেও সত্য, ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে চলচ্চিত্র অনেক দূর এগিয়ে গেলেও এদেশের চলচ্চিত্রের পথচলাকে লিপিবদ্ধ বা ইতিহাসের মর্যাদায় উন্নীতকরণের প্রচেষ্টা দেখা যায়নি।
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম সবাক কাহিনিচিত্র মুখ ও মুখোশ নির্মাণের ১৩ বছর পর বিখ্যাত চলচ্চিত্রনির্মাতা, শিক্ষক, সংগঠক আলমগীর কবির লেখেন ‘সিনেমা ইন পাকিস্তান’ নামের বই। তবে সে বইয়ে পূর্ব পাকিস্তানের চলচ্চিত্র ইতিহাসের অতোটা উল্লেখ ছিলো না। দেশ স্বাধীনের দেড় দশক পার হয়ে গেলেও পূর্ববঙ্গ, পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সেই ইতিহাস রচনায় কেউ এগিয়ে আসেনি। বিভিন্ন জায়গায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র লেখা প্রকাশ হলেও এ নিয়ে কোনো সামগ্রিক প্রচেষ্টা চোখে পড়ে না। বৃহৎ এই কর্মযজ্ঞ সম্পাদনে যে মানুষটি সর্বাগ্রে এগিয়ে এসেছিলেন, তিনি অনুপম হায়াৎ। দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময় ধরে অনুপম হায়াৎ চলচ্চিত্রবিষয়ক নানা বিষয় নিয়ে লেখালেখি করছেন।
অনুপম হায়াতের আসল নাম মতিউর রহমান ভূঁইয়া; চলচ্চিত্রকে ভালোবেসে নিজের নামটিই তিনি বদলে ফেলেন; রাখেন অনুপম হায়াৎ। ৭০-এর দশক থেকে ‘চিত্রালী’, ‘বিচিত্রা’র মতো সাময়িকীতে তিনি লেখালেখি শুরু করেন। এরপর বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের পরিসরকে নানাভাবে সমৃদ্ধ করছেন তিনি। সে বিবেচনায় তার রচিত চলচ্চিত্রের ইতিহাসবিষয়ক ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস’ বইটি এদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস পঠন-পাঠন ও বিশ্লেষণে তথ্যকোষ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। অন্য সব বাদ দিলে এই একটি বই দিয়েই অনুপম হায়াৎ বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হয়ে আছেন। তিনি একাধারে সাংবাদিকতা, গবেষণা ও শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে অনুপম বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইন্সটিটিউটে (তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন) শিক্ষকতা করছেন। এর আগে শিক্ষকতা করেছেন স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি ও গ্রিন ইউনিভার্সিটির ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া বিভাগে। নানা সময় দায়িত্ব পালন করেছেন ফিল্ম আর্কাইভ, চলচ্চিত্র সেন্সরবোর্ড ও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার কমিটিতে। তিনি ‘চলচ্চিত্রের খোলা জানালায়’, ‘প্রথম বাঙালি চলচ্চিত্রকার : হীরালাল সেন ও অন্যান্য’,‘চলচ্চিত্র জগতে নজরুল’, ‘পুরানো ঢাকার সংস্কৃতি : নানা প্রসঙ্গ’, ‘চলচ্চিত্রবিদ্যা’, ‘চলচ্চিত্র সমালোচনা’, ‘জহির রায়হানের চলচ্চিত্র : পটভূমি, বিষয় ও বৈশিষ্ট্য’, ‘রবীন্দ্রনাথ ও চলচ্চিত্র’সহ ৪৬টি বই রচনা করেছেন। অনুপম হায়াতের সঙ্গে ম্যাজিক লণ্ঠন-এর হয়ে কথা বলেছেন রুবেল পারভেজ। চলতি সংখ্যায় এই আলোচনার শেষ পর্ব প্রকাশ করা হলো।
রুবেল পারভেজ : জহির রায়হানের প্রস্থান এবং আলমগীর কবিরের মৃত্যু--কার চলে যাওয়া বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলে মনে করেন?
অনুপম হায়াৎ : না না, এভাবে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়। কারণ পৃথিবীতে একেক জনের ভূমিকা একেক রকম। জহির রায়হান ও আলমগীর কবির দুজন দুই ধরনের। তারা তাদের নিজস্ব প্রতিভা দিয়ে কাজ করেছেন। তবে দুজনের মধ্যে সুসম্পর্ক ছিলো। দুজন একই সঙ্গে লড়েছেন, পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন, মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। আলমগীর কবির মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন জহির রায়হানের নেতৃত্বে। তারা ইচ্ছাকৃতভাবে দুজন মুক্তিযুদ্ধে কাজ করেছেন দুই ফ্রন্টে, শুটিং করতে করতে, ভাবতে পারেন? কাজেই দুজনের চিন্তাধারায় মিল ছিলো। যে কারণে দুজনের চলে যাওয়াতেই অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে এ দেশের চলচ্চিত্রের।
রুবেল : আলমগীর কবির একজন নির্মাতা, তাত্ত্বিক, সংগঠক। তার মৃত্যুর পর বাংলাদেশের চলচ্চিত্র একটা দীর্ঘ সময় পার করেছে। তারপর নায়ক সালমান শাহ, মান্নার মতো অভিনয়শিল্পী ও তারেক মাসুদের মতো নির্মাতা অকালে চলে গেছেন। কোনো একটা পরিবর্তন যখন স্থায়ী হওয়ার পথে, ঠিক তখনই ‘মৃত্যু’ শব্দটি এদেশের চলচ্চিত্রে হানা দিয়েছে এবং চলচ্চিত্রশিল্প থমকে গেছে। এ নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
অনুপম : পৃথিবীতে সামাজিক, সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে একেকজন একেক ভূমিকা নিয়ে জন্মায়। জয়নুল আবেদীন সাহেব শিল্পচর্চা করেছেন চিত্রকলার মাধ্যমে। আবার কাজী নজরুল ইসলাম কাব্যের প্রতিভা নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছেন। জহির রায়হান, আলমগীর কবির, তারেক মাসুদরা বিরাজমান সমাজে প্রবাদ সৃষ্টি করেছেন। তাদের প্রস্থানে তো ক্ষতি হয়েছেই; একজনের শূন্যস্থানে হয়তো আরেকজন আসবে আরেক ভূমিকা নিয়ে। এখন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যে অবস্থা, তাতে আপাতত নতুন কোনো আশা দেখছি না। যদিও আমি ভীষণ আশাবাদী মানুষ, কিন্তু তারপরও সেই মাপের কাউকে দেখা যাচ্ছে না; মোরশেদুল ইসলাম, তানভীর মোকাম্মেল এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। তাদের বাইরে যে প্রতিভার কথা আমরা বলছি--আলমগীর কবির, জহির রায়হান ও তারেক মাসুদ--নানা কারণে এদের মতো প্রতিভা তৈরি হচ্ছে না।
রুবেল : বাদল রহমান, সৈয়দ সালাউদ্দীন জাকী পুনে ফিল্ম ইন্সটিটিউটে পড়তে গেলেন, তারা মেধাবী ছিলেন। তাদের নিয়ে সবখানে এই কথা প্রচলিত যে, চলচ্চিত্রে তাদের অবদান অনেক। আবার কারো কারো কথা, তারা চলচ্চিত্রে অনেক কিছু করতে পারতেন, অনেক ধরনের এক্সপেরিমেন্টাল কাজ উপহার দিতে পারতেন। বাদল-জাকী আসলে কী দিলেন চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিকে?
অনুপম : প্রত্যাশা অনেক থাকে, কিন্তু পারিপার্শ্বিক বা জাগতিক যাই বলেন, প্রত্যেকেরই আবার সীমাবদ্ধতা আছে। প্রথম হলো ব্যক্তিক কারণ। অনেক সময় ব্যক্তির ইচ্ছা বড়ো হয়--আমি হিমালয়ে যাবো। বঙ্গবন্ধু যেমন দেখতে চেয়েছিলেন বাঙালি জাতির শৌর্যবীর্য--আর যদি একটা গুলি চলে, বা এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম--এই যে কমিটমেন্ট, এটা কিন্তু সবাই করতে পারে না; আবার ওই উচ্চতায় যেতে পারে না অনেকে। আমাদের প্রত্যাশা ছিলো স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা নতুন করে চলচ্চিত্রশিল্পের যাত্রা করবো এবং যোগ্য কারো নেতৃত্বে তা এগিয়ে যাবে। কিন্তু জহির রায়হান আগেই হারিয়ে গেলেন, বাদল-জাকী ভাইয়েরা শুরু করেছিলেন; সাংস্কৃতিক বিনিময় চুক্তির অধীনে তারা পুনে ফিল্ম ইন্সটিটিউটে পড়তে গেলেন। তারা কিন্তু কিছু একটা কাজ করেছিলেন, রাষ্ট্রও তাদের সহায়তা করেছে। বাদল রহমানকে অনুদান দেওয়া হয়েছিলো রঙিন ছবি করার জন্য। আবার জাকী ভাইকে এফ ডি সি’র দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু সামগ্রিক সামাজিক প্রেক্ষাপটে তারা অগ্রসর হতে পারেননি। হয়তো তাদের ব্যক্তিগত কারণ থাকতে পারে। আমি তো বলেছিই, প্রত্যেক মানুষ সীমাবদ্ধ ক্ষমতা নিয়ে জন্মায়। নজরুল সমস্ত প্রতিকূলতাকে জয় করেছেন, সবাই তো আর তা পারে না। সবাই আলমগীর কবির হতে পারে না। প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ নানা কারণে আমাদের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি, যতোটুকু পূরণ হয়েছে তারপর থেকে আর অগ্রসর হওয়াও সম্ভব হয়নি।
রুবেল : আপনি আগে বলেছিলেন, মূল যখন চরিত্র হারায় তখন বিকল্পই মূল হয়ে দাঁড়ায়।
অনুপম : এটা হলো, সরদার ফজলুল করিম স্যারের কথা। আমরা অস্কার বলি আর যাই বলি, মূল ছাড়া পাতা নিয়ে নড়াচড়া করলে তো হবে না। বিকল্প দরকার আছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আপনাকে আসতেই হবে মূলে।
রুবেল : এই যে বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলার প্রচেষ্টা, এ বিষয়টিকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
অনুপম : বিকল্পধারা আমাদের এখানে শুরু হয়েছিলো মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়ের কনসেপ্টে। সারা পৃথিবীতেই এটা ঘটেছে; কিন্তু বিকল্পধারা কখনোই মূলধারা হয়ে যায় না। কারণ আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট। অধিকাংশ দর্শক চায় সস্তা বিনোদন। আর বিকল্প এ কনসেপ্টের বিরুদ্ধে। বিকল্পধারাকে জিইয়ে রাখতে গেলে যে সামাজিক প্রেক্ষাপট, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা, মেধা ও মননশীলতা দরকার, সেটা কিন্তু আমাদের সমাজে নেই; সমাজ সেটাকে সমর্থন করেনি। সমাজ যদি সমর্থন করতো, তাহলে হুড়হুড় করে সূর্যদীঘল বাড়ী দেখতে আসতো সবাই। এতে করে কিন্তু আরো দশটা সূর্যদীঘল বাড়ী নির্মাণ হতো। হুড়হুড় করে দর্শক যদি মাটির ময়না দেখতো, তাহলে আরো দশটা মাটির ময়না তৈরি হতো। যদি দর্শক মেঘের অনেক রং, দুখাই, নদীর নাম মধুমতি দেখতো, তাহলে কিন্তু এ রকমভাবে সিনেমা তৈরি হতো আরো। কাজেই আমাদের দর্শক তো এগুলোকে সেভাবে গ্রহণ করেনি। অধিকাংশ দর্শক কেবল টাকার বিনিময়ে বিনোদিত হতে চেয়েছে।
আমাদের মূলধারা হলো সিনেমাহলকেন্দ্রিক। সেই হলওয়ালারাও এগিয়ে আসেনি। আমি শুনেছি তারেক মাসুদের মাটির ময়নার আয়ের অর্থ হলওয়ালারা তাকে দেয়নি। আবার রাষ্ট্রও ওই সিনেমাগুলোকে কর মুক্ত করেনি। এখন অনুদান দিচ্ছে ভালো কথা। কিন্তু এই সিনেমাগুলোর ক্ষেত্রে, একমাত্র বোধহয় গেরিলাকে করমুক্ত করা হয়েছে। অন্যগুলো করেনি। সরকার এটা করার সঙ্গে সঙ্গে যদি নকল সিনেমা বন্ধ করতো, তাহলে বিকল্পধারা বেগবান হতো। আসলে আমাদের সামাজিক মনস্তত্বের অবস্থা এমনই যে, এখন একই এলাকার একদিকে মদের দোকান আরেক দিকে দুধের দোকান থাকলে, লোকজন মদের দোকানেই বেশি ঝুঁকছে।
বিকল্পধারা শুরু হয়েছিলো অনেক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে। কিন্তু তা সামাজিক, রাষ্ট্রীয়ভাবে লালন-পালন হয়নি। সামাজিক পৃষ্ঠপোষকতা বলতে বোঝাতে চাইছি, যারা এগুলো নিয়ন্ত্রণ করে তাদের। বার বার বলবো, রাষ্ট্রীয় সমর্থন ছাড়া কোনো কিছুই সম্ভব নয়। রাষ্ট্রীয় সমর্থনেই কিন্তু বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা হয়েছিলো।
রুবেল : আপনার যতো লেখালেখি, গবেষণা, কাজকর্ম, তা বিকল্পধারার চেয়ে এফ ডি সি’কেন্দ্রিক বা বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের দিকে আগ্রহ বেশি দেখা যায়। আপনার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস’-এও এ বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। আপনার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু মূলধারা, তাইতো?
অনুপম : না, এটা ঠিক নয়। তুমি দেখবে, আমার বইয়ে স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমা নিয়েও আলোচনা আছে। কিন্তু আমাদের মূল বেগবান ধারা তো এটাই (মূলধারা)। এখন শেকড় যদি এটা হয়, তাহলে বিকল্পধারা তো একটা পাতার মতো। পাতা যতোটুকু এসেছে ততোটুকু নিয়ে আমি কাজ করেছি এবং আপনি ‘বিচিত্রা’য় আমার লেখা দেখবেন। একবার ‘বিচিত্রা’র সম্পাদক আমাকে বললেন, ‘তুমি শুধু ওদের (জাকী-বাদল-আলমগীর) নিয়ে আছো কেনো? মূলধারায় যারা আছে, তাদের নিয়ে কাজ করো।’ আমি তো পুনে থেকে যারা পড়ে এসেছে, চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন করতো, বিকল্পধারা, স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র আন্দোলন করতো--সাংবাদিকতা করতে গিয়ে তাদের কথা লিখেছি বেশি করে। চলচ্চিত্রে তাদের যতোটুকু অবদান ততোটুকু তুলে আনার চেষ্টা করেছি।
তবে একটা দুঃখজনক কথাও বলতে চাই, এটা আমার ক্ষোভেরও কারণ। বিকল্পধারার প্রথম সিনেমা আগামীর রিপোর্টিং আমার হাতে করা। এবং যখন স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ফোরাম গঠিত হয়, তখনো আমি প্রথম রিপোর্ট করি। কিন্তু ওরা আমাকে ওইভাবে গ্রহণ করেনি। উৎসব কমিটি যখন হয়, তখন আমাকে সেখানে রাখা হয়নি। আমাকে না জানিয়ে আমার বইয়ের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে, নামটা পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। তারপরও আমি কিন্তু চেষ্টা করেছি ওদের সাহায্য করার। বাংলাদেশে সরকারিভাবে চলচ্চিত্রবিষয়ক যতো পাঠ্যপুস্তক বের হয়েছে, সেখানে দেখবেন স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র আগামী ও হুলিয়ার পূর্ণাঙ্গ চিত্রনাট্য আমি দিয়েছি। তো হাউ! আপনি কী করে বলছেন, আমি শুধু মূলধারা নিয়ে কাজ করি? আমি চেষ্টা করেছি, কিন্তু কী কারণে জানি না আমি ওদের কাছে উপেক্ষিত রয়ে গেছি। যদিও আমি চেষ্টা করেছি ওদেরকে বুকে ধারণ করতে। তবে মোরশেদুল ইসলাম আমাকে যথেষ্ট মূল্যায়ন করেছেন। তার কাছে নানাভাবেই আমি কৃতজ্ঞ, তিনি আমার পাশে থেকেছেন সবসময়। প্রয়াত তারেক মাসুদ ছিলো আমার পথচলার সঙ্গী।
রুবেল : ভালো চলচ্চিত্রের সঙ্কটের কারণেই তো ৯০ দশকের শেষের দিকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে ‘অশ্লীলতা’ আসতে শুরু করে।
অনুপম : প্রথমত, তখন স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলো এসে গেছে, এরপর ‘একুশে টিভি’, ‘চ্যানেল আই’, ‘এটিএন বাংলা’ খুলে গেলো; তখন মানুষ ঘরে বসে সিনেমা দেখা শুরু করলো। ২১ শতকে প্রযুক্তির উল্লম্ফনে যদি ঘরে বসে সিনেমা দেখা যায়, তাহলে দর্শক সিনেমাহলে কেনো যাবে? এখন সিনেমার টিকিটের দাম বেশি, অথচ পরিবেশ নেই। সিনেমাহলগুলো ভেঙে এখন শপিং কমপ্লেক্স হচ্ছে। তাছাড়া এতোদূর যাওয়া-আসা, যানজট, রিকশা ভাড়া--বহু সঙ্কট। আমরা সিনেমা দেখতে গুলিস্তানে চলে যেতাম, তখন ‘রূপমহল সিনেমাহলে’ বেশি সিনেমা দেখতাম। তখন পারিবারিকভাবে একসঙ্গে দলবেঁধে সিনেমা দেখতে যেতাম। অনেকে গ্রাম থেকে আসতো কেবল সিনেমা দেখতে। এখন কীভাবে আসবে বলেন? যাত্রাবাড়ি থেকে গুলিস্তান যেতে এক ঘণ্টা সময় নষ্ট। ধকলের এ প্রভাব তো স্বাভাবিকভাবেই পড়বে।
রুবেল : অশ্লীলতা-কাটপিসের জন্য আপনি তাহলে এসবকে দায়ী করছেন?
অনুপম : এজন্য সিনেমাহল মালিকরা দায়ী। এর মধ্য দিয়ে মধ্যবিত্ত, সুশীলরা সিনেমাহলে যাওয়া বন্ধ করে দিলো। তো সিনেমার ইতিহাসই তো মূলকেন্দ্রিক।
রুবেল : ১৯৯৯-২০০০ এর আগে দর্শক প্রেক্ষাগৃহে যেতো পরিবারসহ। এরপর কাটপিস, অশ্লীলতা ঢুকে যাওয়ায় পরিবারের সবার যাওয়া বন্ধ হয়ে গেলো। তারপরও প্রেক্ষাগৃহ কিন্তু চলছিলো। এরপর এর বিরুদ্ধে আন্দোলন এবং তারপর এগুলো বন্ধ হওয়ায় প্রেক্ষাগৃহ ফাঁকা হওয়া শুরু হলো। এরপর থেকে ত্বরান্বিত হলো প্রেক্ষাগৃহ বন্ধের গতি। এটা বন্ধ করা কি যৌক্তিক ছিলো?
অনুপম : পৃথিবীতে অনেক কিছুই ঘটে, তার ওপর কারো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও প্রাযুক্তিক পরিবেশ এসে পরিবর্তন ঘটিয়ে দেয়। এর কোনো ব্যাখ্যা থাকে না। তাই আবারও বলছি, চলচ্চিত্র যখন তার মূল হারিয়ে ফেললো, তখন তো সাধারণরা আর সিনেমাহলে যাবে না। সিনেমাহলওয়ালারা বাধ্য হয়ে গোডাউন বানিয়ে দিলো। তারপর উচ্চহারে কর--সবকিছুর মূলে হলো সরকার, বাকিদের কিছু করার নেই। আগে ঈদের দিন ৮-১০টি সিনেমা মুক্তি পেতো। এই প্রেক্ষাপটেই তো এফ ডি সি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিলো। ওই সময়ের ক্রাইসিসটা নিয়ন্ত্রণের জন্য। আমাদের দেশের প্রতিভাকে বিকশিত করার জন্য এটা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিলো সরকারিভাবে। আর এখন!
রুবেল : এখন এফ ডি সি’তে নির্মিত একটি চলচ্চিত্রের বিপরীতে পাঁচটি বিদেশি চলচ্চিত্র মুক্তি পায়!
অনুপম : হ্যাঁ, দেশি সিনেমা সংখ্যা কমে গেছে। আরো একটি কারণ হলো আমাদের এখানে আকাশ খুলে গেছে। এখন ঘরে বসে সিনেমা দেখা যায়। ইরান এটা নিয়ন্ত্রণ করছে, ওরা কীভাবে করেছে? এই নিয়ন্ত্রণটা এখানেও করা দরকার।
রুবেল : আমাদের এখানকার চলচ্চিত্র আকাশ-সংস্কৃতির কারণে প্রচণ্ডভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে--এমন কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু আমাদের টেকনোলজি তো ইউরোপ-আমেরিকার চেয়ে বেশি সমৃদ্ধ নয়। তারা হাজারো সুযোগ-সুবিধা পাওয়া সত্ত্বেও ঠিকই প্রেক্ষাগৃহে যাচ্ছে।
অনুপম : ওখানকার সমাজব্যবস্থা অন্যরকম। নিত্যনতুন ভায়োলেন্সকে ওরা পর্দায় নানাভাবে উপস্থাপন করছে; যৌনতাকে হাজির করছে অন্যভাবে। আমাদের এখানে সেন্সরওয়ালারা এর অনুমতি দেবে না। ওখানকার দর্শকের টলারেন্স লেভেল স্বাভাবিকভাবেই বেশি। স্টিভেন স্পিলবার্গের সিনেমাগুলো কী? তুমি নিশ্চয় দেখেছো, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি। আমাদের এখানে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি বানানো সম্ভব হচ্ছে না; ভায়োলেন্সকে সেন্সরবোর্ড অনুমতি দিচ্ছে না। সেক্সকে ডিজঅ্যালাউ করছে। সে কারণে ওই সমাজের সঙ্গে আমাদের সমাজকে সমান্তরালে চিন্তা করলে মুশকিল হবে। কেননা, ওদের টলারেন্স, শিক্ষা, আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট আমাদের চেয়ে একেবারেই আলাদা।
রুবেল : আমাদের তো একটা সময় প্রচুর গল্প ছিলো।
অনুপম : হ্যাঁ, আমাদের অবশ্যই মূলের কাছে যেতে হবে। আমাদের গল্প, বিষয়বস্তুকে স্বতন্ত্র করে তুলতে হবে নির্মাণ কুশলতায়। দেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট, সাইকোলজিকাল প্রেক্ষাপট বিচার করে নির্মাণ করতে হবে সিনেমা। দর্শক কী চায় তা বার বার বুঝতে হবে।
রুবেল : আমাদের সুপারহিট চলচ্চিত্রের গল্প এবং এখনকার বস্তাপচা চলচ্চিত্র নিয়ে নিশ্চয় আপনার ধারণা আছে। সেই সুপারহিট চলচ্চিত্র, গল্প, চিত্রনাট্য আজ শূন্যের কোঠায়!
অনুপম : এখন মেধাহীনদের উপদ্রব! মেধাহীন ও দায়িত্বহীনরাই সবকিছুর নিয়ন্ত্রক।
রুবেল : এটা কেনো?
অনুপম : অতিরিক্ত লোভ, দুর্নীতিগ্রস্ততা; রাজনীতি তো আরো কলুষিত। সকালে একদল করছি তো বিকেলে মন্ত্রী হচ্ছি আরেক দলের হয়ে। মাছের পচন ধরে মাথা থেকে, আমাদের যে আপার ক্লাস, ‘শিক্ষিত-সমাজ’ তা দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে গেছে। জাতির পিতাকে পর্যন্ত হত্যা করা হলো। আমাদের মূল্যবোধের অবক্ষয় এমনভাবে হয়েছে! আমাদের শৃঙ্খলা ভেঙে গেছে। আগে উদাহরণ দিয়েছি যে, রেশনের চালের জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছি, অথচ ১০টার মধ্যে গুদাম শেষ। কারণ চোরাই পথে সব আগেই বিক্রি হয়ে গেছে। এই যে নব্য ধনিক শ্রেণির অতিরিক্ত লোভ, তা রাজনীতি, আমলাতন্ত্র, চলচ্চিত্র-প্রযোজকদের ক্ষেত্রেও ছিলো--এসবই দর্শকের মনের মধ্যে একধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। ঘরের মধ্যে বসে সহজেই একটা সেলফোনে অশ্লীল, যৌনতায় ভরপুর সিনেমা দেখা যায়। তো কেনো সিনেমাহলে যাবো? সব কথার শেষকথা, মূলে ফিরতে হলে আপনাকে সৃজনশীল গল্পের দিকে যেতেই হবে। দেশীয় সামাজিক প্রেক্ষাপটে বানাতে হবে সিনেমা। সুতরাং-এর কথাই বলি, ওই সময় এ সিনেমা মুক্তি পেয়েছিলো মুম্বাই, কলকাতার সিনেমার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। ওটা এক লাখ ২৫ হাজার টাকায় বানিয়ে সাড়ে আট লাখ টাকা ব্যবসা করেছিলো।
তাহলে? কারণ ওই সিনেমার বিষয়বস্তু ছিলো; ওটা ব্যতিক্রমধর্মী ছিলো; উপস্থাপনাশৈলী ছিলো অন্যরকম। নতুন নায়ক-নায়িকা এবং গানগুলো ছিলো দেশীয় প্রেক্ষাপটে। অবুঝ মন আবেগ-নির্ভর সিনেমা। বাঙালি দর্শক আবেগ-নির্ভর বিষয়বস্তু পছন্দ করে। তাই আমাদেরকে ওখানেই যেতে হবে। এটা দোষের নয়। বাঙালি দর্শকের আবেগকে আপনি কী করবেন? এখানে যুক্তি দিয়ে পার পেতে পারবেন? বাঙালি কথায় কথায় কাঁদে, কথায় কথায় হাসে। এখানে আবেগ আবহাওয়ার মতো পরিবর্তিত হয়। সকালে ফকফকা আলো তো বিকেলে ঝড়-তুফান-বৃষ্টি। বাঙালির মন এ রকমই!
রুবেল : মানে দর্শকের মনস্তত্বকেই সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিতে হবে?
অনুপম : ইয়েস, সেটাকেই ধরতে হবে। দর্শকের আবেগ, মনকে ধরতে হবে। আয়নাবাজি সিনেমায় কিন্তু সেই বিষয়টি আছে, লক্ষ করবেন। অজ্ঞাতনামা, মনপুরায়ও আছে। চলচ্চিত্রকে বাঁচাতে হলে এসব নিয়ে ভাবতে হবে।
রুবেল : আপনি যখন পুরো মাত্রায় চলচ্চিত্র নিয়ে পড়াশোনা শুরু করলেন, সেই ৭০-এর দশকটা বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দশক--একাত্তরের যুদ্ধ, ৭৫-এর ১৫ আগস্ট, সামরিক সরকার। মানে ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ একটা দশক। এমন পরিস্থিতিতেও কিন্তু চলচ্চিত্র হয়েছে, সুপারহিট চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়েছে। সামরিক সরকারের সময় ‘গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি’র চেয়ে বেশি চলচ্চিত্র লালিত হয়েছে!
অনুপম : এটা একটা ভালো আলোচনার বিষয়। আসলে এর প্রতিবাদেই তো আসলো বিকল্পধারা। ৭৫-এর পর তো ডার্ক পিরিয়ড শুরু হলো, ওই সময় সুপার-ডুপার সিনেমা কম হয়েছে। তারপরও হয়েছে। নয়নমনি, গোলাপী এখন ট্রেনের কথা বলা যায়; ওই সময় এগুলো সুপার-ডুপার হিট। কিন্তু ৮০’র দশকে একটু স্থবিরতা শুরু হলো। এ সময়ই ভি সি আর এলো। টেকনোলজির ছোঁয়া লাগা শুরু হলো। আর হতাশার জায়গা থেকে মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধও পরিবর্তিত হতে লাগলো। তুমি লক্ষ করো, ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারই দেওয়া হয়নি। ওই সময় একটা উল্লেখযোগ্য সিনেমা ছিলো সৈয়দ হাসান ইমাম ভাইয়ের লাল সবুজের পালা । মরুভূমি কতোটা উদোম হলে একটা বছর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার দেওয়া হয় না, ভাবো! কারণ, তখন মানসম্মত সিনেমাই পাওয়া যায়নি।
এই শুরু হলো আর কি; চূড়ান্তভাবে। ৭৯-তে আলোচিত সিনেমা ছিলো সূর্যদীঘল বাড়ী, এর আগের বছর গোলাপী এখন ট্রেনে । এরপর আর তেমন কিছু নেই। পরের দশকে ফোক-ফ্যান্টাসিনির্ভর একটি সিনেমা সুপার-ডুপার হিট হয়--বেদের মেয়ে জোস্না (১৯৮৯)। ৬০ লাখ টাকা বাজেটের এই সিনেমা কোটি কোটি টাকা ব্যবসা করেছে। চিন্তা করো একটা ফোক আইডিয়া। অথচ এ সিনেমার বিষয়বস্তু ছিলো রূপকধর্মী, এরশাদবিরোধী। তখন কিন্তু রাজনীতি নিয়ে প্রতীকী সিনেমা হয়েছে। আর একটা সিনেমা ভালো ব্যবসা করেছিলো--কেয়ামত থেকে কেয়ামত। সিনেমাটা কিশোর প্রেমের কাহিনি নিয়ে; নতুন নায়ক-নায়িকা আসলো। মূলত এটা ছিলো রিমেক সিনেমা।
এখনকার আয়নাবাজি দেখো, সেটাও কিন্তু একধরনের রূপক। যাহোক, গণতান্ত্রিক সরকার আসলো ৯০-এর দশকে। তখন অনুদান দেওয়া শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা নির্মাণে। আগুনের পরশমনি, পদ্মা নদীর মাঝি হলো। আবার চাঁদনীতে আসলো শাবনাজ-নাঈম জুটি। নতুন নায়ক-নায়িকা, বিষয়বস্তুও নতুন। মূলধারাকে আবার ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হলো। ৯০-এর দশকে আগে আসলো দুখাই; ব্যতিক্রমধর্মী সিনেমা। এ সময় একাত্তরের যীশু, হাঙর নদী গ্রেনেড, দূরত্ব, চাকা তৈরি হয়েছে। বিকল্পধারাও চাঙ্গা ছিলো। তারপর একসময় নতুন প্রযুক্তি, কাটপিস এসে গেলো। একসময় তা আবার চলেও গেলো।
রুবেল : মুখ ও মুখোশ নির্মাণের পর অনেকগুলো রাজনৈতিক উত্থান-পতন ঘটে গেছে। আপনার কাছে কী মনে হয়, এগুলো বড়ো নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে আমাদের দেশীয় চলচ্চিত্রের আকার-আকৃতি পরিবর্তনে?
অনুপম : অবশ্যই প্রভাব পড়েছে। ধরো, ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে মুখ ও মুখোশ-এর পরে ৫৮-তে সামরিক সরকার এলো মানে আইয়ুব খানের আমল। তখন উর্দু ভাষার প্রচণ্ড প্রভাব। নানা কারণে বিশেষ করে ব্যবসায়িক কারণেই কিন্তু উর্দু ভাষায় সিনেমা নির্মাণ হয়েছে। যদিও জাগো হুয়া সাভেরা ছিলো আলাদা। পাকিস্তান না হলেও কিন্তু ঢাকায় উর্দু ভাষায় সিনেমা হতো না। এবং পাকিস্তান না হলে কিন্তু ছাত্র মারা যেতো না, ভাষা আন্দোলন হতো না, হতো?
রুবেল : না, হতো না।
অনুপম : তাহলে, এগুলো দৃশ্যমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। পাকিস্তান হয়েছে বলে ভাষা আন্দোলন হয়েছে, ছাত্র শহীদ হয়েছে, উর্দু ভাষায় সিনেমা হয়েছে। এমনকি উর্দু ভাষায় ‘চিত্রালী’ পত্রিকাও প্রকাশ হয়েছে। তারপর চান্দা (১৯৬২) তৈরি হলো। উর্দু ভাষায় জহির রায়হানও সিনেমা করেছেন। তাহলে রাজনৈতিক একটা ব্যাপার আছে। পশ্চিম পাকিস্তানেরও একটা বাজার ধরা যাবে, এই কারণে করা হয়েছিলো ওটা। বিপরীতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা না পেয়েও বাঙালি সংস্কৃতির চিন্তা-চেতনায় সমৃদ্ধ হয়ে তারা আবার বাংলা ভাষায় সিনেমা নির্মাণ করেছে। রূপবান (১৯৬৫) এর বড়ো উদাহরণ, সিনেমাটি সুপার-ডুপার হিট হয়। তারপর আবার রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে সিরাজউদ্দৌলা হলো। সিরাজউদ্দৌলার মাধ্যমে বাংলার মানুষের মুক্তির চেতনা আবার তুলে ধরা হলো। তারপর নির্মাণ হলো তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা। রাজনৈতিক আন্দোলন না হলে কিন্তু এগুলো হতো না।
৬০-এর দশক থেকে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে হয়তো জনগণ জেগে উঠেছিলো, ক্ষমতায় পাকিস্তানিরাই ছিলো। তাই না? এরপর হলো জীবন থেকে নেয়া । এভাবে স্বাধিকার আর গণ আন্দোলনকেন্দ্রিক সিনেমা হয়েছে। বাংলার মুখ নামে আমজাদ হোসেন একটা সিনেমা বানানোর চেষ্টা করেন। শহীদ আসাদের নামে সিনেমা বানানোর ঘোষণাও আসে। ঈশা খাঁকে নিয়েও সিনেমা বানানো হয়েছে। তুমি ভাবতে পারো, ৬৮-এর ছাত্র আন্দোলন, ৬৯-এর আন্দোলন, ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধও সিনেমা নির্মাণে প্রেক্ষাপট হিসেবে এসেছে। তার মানে, মুক্তিযুদ্ধ না হলে কি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সিনেমা হতো? জীবন থেকে নেয়ার কথা নিশ্চয় মনে আছে। ১৯৬৮-১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দের ছাত্র ও গণআন্দোলন নিয়ে ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে জহির রায়হান বানান রাজনৈতিক সিনেমা জীবন থেকে নেয়া । এ এক মহাকাব্যিক উদাহরণ।
রুবেল : হুম।
অনুপম : এগুলো নিয়ে কিন্তু ওইভাবে কখনো গবেষণা হয়নি। ৭১-এ তো মুজিবনগরেই শুরু হয়েছিলো মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণ। জহির রায়হান, আলমগীর কবিররা প্রামাণ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করলেন। তারা চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে গিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা শুরু করেছিলেন। জহির রায়হান একটা পলিসি দিয়েছিলেন নতুন দেশে চলচ্চিত্রের রূপরেখা কী হবে, তা নিয়ে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কাহিনি নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়েছে। এটা পটপরিবর্তনের ফল। এরপর বঙ্গবন্ধু হত্যা আরেকটা পরিবর্তন আনে। তখন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কোনো কথাই বলা যেতো না। উল্টো মুক্তিযুদ্ধকে মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছে। সিনেমার মধ্যে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কিছু থাকলে তা কেটে ফেলা হয়েছে; মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে কোনো কথা বলা যায়নি। হোয়াট ইজ দিস! আবার এরশাদের সময় একটা অবরুদ্ধ পরিবেশ ছিলো। এগুলোর তো একটা প্রভাব পড়েই। আসলে রাজনীতিই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। তবে কষ্টটা হলো, ভারতে যখন জরুরি অবস্থা জারি হয় ইন্দিরা গান্ধীর সময়, তখন সত্যজিৎ রূপকভাবে হীরক রাজার দেশে নির্মাণ করেন। আমাদের দেশে সেই ধরনের সিনেমা নির্মাণের সুযোগ ঘটেনি। এটা দুঃখজনক ঘটনা।
রুবেল : কেনো এমন হলো?
অনুপম : আমাদের দেশে সে ধরনের নির্মাতা নেই। আবার আমাদের দেশে ভারতের মতো সহনশীলতাও নেই। ইন্দিরা গান্ধী কিন্তু সেই সময় সিনেমাটা নিষিদ্ধ করেননি। অথচ এদেশে বঙ্গবন্ধুর ছবি মুছে ফেলা হয়েছে।
রুবেল : সেন্সরবোর্ডের এখনকার পরিস্থিতি নিয়ে আপনার কী মনে হয়?
অনুপম : আমার সময়ে (২০০৭-২০০৮) আমি কখনোই নকল সিনেমাকে অনুমোদন দিইনি। এসব নিয়ে এখন কথা বলতে চাই না। নিশ্চয় বর্তমানে যারা সেন্সরবোর্ডে আছে, তারা যোগ্য ব্যক্তি। তারা তাদের জ্ঞান মেধা দিয়ে কাজ করছে। এবার ঈদেও (২০১৮ খ্রিস্টাব্দে) শট্ টু শট্ হুবহু নকল সিনেমা ছাড়পত্র পেয়েছে। ক্যাপ্টেন খান ভারতের আনজান সিনেমার নকল। আবার নকল সিনেমাও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছে। এর ব্যাখ্যা সেন্সরবোর্ডের সদস্যরাই দিতে পারবে।
রুবেল : নকল সিনেমা করা যাবে না, এমন নির্দেশনা/আইন তো আছে?
অনুপম : সেন্সরবোর্ডের এ বিষয়ক নীতিমালা অবশ্যই আছে। আর রিমেক করতে গেলে তো অনুমোদন লাগে। তবে এতোটুকু বলতে পারি, নকল সিনেমাকে ছাড়পত্র দেওয়া মানে অপরাধকে প্রশ্রয় দেওয়া। এর মাধ্যমে কোনো অপরাধকে সরকারি পর্যায়ে প্রশ্রয় দেওয়া হয়। আবার এটা তো শুধু রাষ্ট্রের দোষ নয়। এর সঙ্গে সেন্সরবোর্ডের সদস্যদের বিচার-বিবেচনা-বুদ্ধি-জ্ঞান জড়িত; সঙ্গে তাদের অজ্ঞতাও। এছাড়া প্রযোজক, নির্মাতা, শিল্পী ও কলাকুশলীরাও দায়ী।
রুবেল : বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিস্থিতি একেক সময় একেক ইতিহাসকে মুছে ফেলেছে। যেমন, বঙ্গবন্ধুর নাম থাকা সংলাপ কেটে ফেলা হয়েছে। ইতিহাসের এই যে হারিয়ে যাওয়া, তা আমাদের চলচ্চিত্রের ইতিহাসের জন্য কতোটা সঙ্কটের?
অনুপম : চলচ্চিত্রনির্মাতারা নানাভাবে ইতিহাস বিকৃত করছে। ইতিহাস বিকৃতির জন্য শুধু নির্মাতা নয়, রাষ্ট্রও সমানে দায়ী। রাষ্ট্রের ক্ষমতা দায়ী। যাদের হাতে পার্টি-ক্ষমতা তাদের কারণেই এটা ঘটছে। সাংবিধানিক যে কাঠামো, সেই নিয়মকানুন কেউ মানছে না। সংবিধান তো বড়ো জিনিস, তাই না? এজন্য আমরাও দায়ী। মুক্তিযুদ্ধের কথা বলা যাবে না, আবার বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করা যাবে না। জিয়াউর রহমান, কর্নেল আবু তাহের, কাদের সিদ্দিকীর নাম উচ্চারণ করা যাবে না। এটা ঠিক নয়। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক কিছু কি তাহলে থাকবে না? ইতিহাস বিকৃতি যদি কেউ করে, তাহলে তা রাষ্ট্রের মদদেই হয়েছে। ক্ষমতাসীনরা নিজেদের স্বার্থে ইতিহাস বিকৃত করে। সেটা পর্দায় হোক আর পর্দার বাইরে হোক।
রুবেল : এই সময়ের চলচ্চিত্র পঠন-পাঠন বা অ্যাকাডেমিক পরিসরে আমাদের কীভাবে এগোনো উচিত বলে আপনি মনে করেন?
অনুপম : পঠন-পাঠনের কাজটি যারা করে থাকে, তারা এ সমাজের সচেতন এবং দায়িত্বশীল শ্রেণি। এই শ্রেণি যদি কোনো কারণে ভুল করে, তাহলে পরবর্তী প্রজন্মও ভুল করবে। আমি যদি এরশাদ আমলে বঙ্গবন্ধুর ছবিকে ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস’ (১৯৮৭) গ্রন্থে না প্রকাশ করতাম, তাহলে কিন্তু ইতিহাস চাপাই পড়ে থাকতো। এটা লক্ষ করতে হবে, বর্তমানে জাতীয় চলচ্চিত্র দিবস পালিত হচ্ছে সরকারিভাবে, এখানেও আমার সামান্য ভূমিকা আছে।
ওই গ্রন্থে প্রকাশের জন্য আমি বঙ্গবন্ধুর ছবি দিয়েছিলাম। আমরা বলেছিলাম, বঙ্গবন্ধুর ছবি ওখানে ছাপতেই হবে। শুরুতে আমরা অনেক বাধার মুখে পড়েছিলাম। এরপর যখন কর্মকর্তাদের বোঝাতে সক্ষম হলাম, তখন তারা রাজি হলো। কাজেই এসব বিষয় নিয়ে যারা লেখে, পঠন-পাঠন করে তাদেরও দায়িত্ব সমান। আগে থেকেই আমি লেখক বা পাঠক হিসেবে যদি অসৎ হয়ে যাই, তাহলে প্রশাসনের দোহাই দিয়ে লাভ নেই। এসব ব্যাপারে সবসময় শুধু প্রশাসন দায়ী নয়। আমি কিন্তু ঠিকই তাদের বুঝিয়ে আমার কাজটি করে নিয়েছি। আমি আমার দায়িত্ব সর্বোচ্চ পালনের চেষ্টা করেছি। কাজেই অন্যদেরও উচিত দায়িত্বটুকু নিজের কাঁধে নেওয়া।
গ্যালিলিও ফাঁসির মঞ্চে গিয়েছিলেন, কিন্তু যারা তখন তার বিচার করেছিলো তারা আজ মিথ্যা। অথচ গ্যালিলিও আজও সত্য। গ্যালিলিও সূর্যের মতোই দীপ্যমান আছেন এখনো। আর পাদ্রীরা তো কোথায় হারিয়ে গেছে। নজরুল তার কবিতায় বলেছিলেন, ‘রাজার বাণী বুদ্বুদ। আমার বাণী সমুদ্রসম।’ তার ‘রাজবন্দির জবানবন্দী’তে এ কথা আছে।
রুবেল : আপনি বলেছিলেন, যা ঘটেছে আপনি শুধু তাই তুলে ধরেছেন। এক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তিগত অভিমত, পক্ষপাতিত্ব বা আপনার নিজস্ব কোনো বিশ্লেষণ যোগ করেননি?
অনুপম : হ্যাঁ, আমি ডকুমেন্ট দেওয়ার চেষ্টা করেছি।
রুবেল : এ নিয়ে যারা সমালোচনা করে, নানা দিক থেকে দেখার চেষ্টা করে, সেটাকে কী বলবেন?
অনুপম : সমালোচনা অবশ্যই হবে, আমার বইটি নিয়ে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের অধিকার পাঠকের আছে। তাদের মতামতকে আমি শ্রদ্ধা করি। এবং এর ফলে আমি লাভবান হচ্ছি। তবে সমালোচকদের কেউ কেউ হয়তো আমি কোন প্রেক্ষাপটে, কোন লক্ষ্য নিয়ে গ্রন্থটি লিখেছি, তা বুঝতে পারেনি। তারা হয়তো তাদের অবস্থান থেকে আমাকে বিচার করছে। আমার কাজটা ছিলো প্রাসঙ্গিক তথ্য ও সত্যভিত্তিক।
রুবেল : কেউ কেউ গ্রন্থটিকে বর্ণনাত্মক গবেষণানির্ভর বলেছেন।
অনুপম : ফাহমিদুল হক (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ও চলচ্চিত্র গবেষক) বোধহয় তার কোনো এক আর্টিকেলে লিখেছিলেন এ কথা। এছাড়া আরো অনেকে বলেছে।
রুবেল : সমালোচনাত্মক গবেষণা ও বর্ণনাত্মক গবেষণাকে কীভাবে আলাদা করবেন?
অনুপম : প্রত্যেক লেখকের একটি লক্ষ্য থাকে। আমার লক্ষ্য ছিলো--আমি দেখলাম আলমগীর কবির ভাইয়ের ‘সিনেমা ইন পাকিস্তান’ (১৯৬৯) বইয়ে হীরালাল সেন একেবারেই নেই, নামটি পর্যন্ত নেই। অথচ হীরালাল সেন আমাদের জন্য কতোটা গুরুত্বপুর্ণ! চিন্ময় মুৎসুদ্দীর বইয়েও হীরালাল সেন সম্পর্কে বিস্তারিত নেই। আমি সেই ডকুমেন্টটা খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছি--হ্যাঁ, বাংলাদেশ ও বিশ্বচলচ্চিত্রের ইতিহাসে আরো একজন বাঙালি আছেন। এখন তাদের বইয়ে হীরালাল সেন নেই বলে তো তাদের আমি নিন্দা করতে পারি না। উনারা উনাদের জ্ঞান দিয়ে লেখার চেষ্টা করেছে। আর আমি আমার জ্ঞান থেকে ওই সময়ের প্রেক্ষাপটে বাংলা, বাঙালির চলচ্চিত্র, সেই হারানো সম্পদটাকে তুলে আনার চেষ্টা করেছি। তো আপনি কীভাবে দেখছেন, না দেখছেন তা একান্তই আপনার দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপার।
আরেকটা দিক হলো, চিন্ময় মুৎসুদ্দীর বইটি হচ্ছে বিশ্লেষণনির্ভর। তার ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে সামাজিক অঙ্গীকার’ এবং আলমগীর কবিরের বইয়েও কিছুটা এ রকম আছে। যার ফলে উনাদের মতবাদগুলো উনাদের ব্যক্তিগত হয়ে গেছে। অন্যদিকে আমি যদি বলতাম হীরালাল সেন সবাক ফিল্ম তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছেন, তাহলে এটা বলা বোকামি হতো না? ওসময় তো সাউন্ডই আসেনি। বাংলাদেশের একজন স্বনামধন্য পণ্ডিত ব্যক্তি পর্যন্ত মন্তব্য করেছেন, নবাবরা তো উর্দু সিনেমা করে গেছে। আমি তাকে বলেছিলাম, সিনেমাটা তো নির্বাক ছিলো। তখন উনি হা করে আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, ‘তাইতো অনুপম, আমি তো এটা খেয়াল করিনি!’ এ কারণে ব্যক্তির মত অনেক সময় বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য। সেজন্য আমি ওই জিনিসটি পরিহার করেছি সচেতনভাবে। আমি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য গবেষণার তথ্য ও সত্যনির্ভর ভিত তৈরি করে দিয়েছি।
রুবেল : আপনার রচিত গ্রন্থের সংখ্যা ৪৫টির মতো। সবগুলোতেই কি এভাবে এগোনোর চেষ্টা করেছেন?
অনুপম : না, যেগুলোর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ জরুরি সেগুলোই করেছি। তবে আমি ডকুমেন্টকে সর্বপ্রথম প্রাধান্য দিয়ে থাকি। আমি যে জিনিস দেখিনি, যা সম্পর্কে জানি না, তা নিয়ে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করতে চাই না। কারণ আমি যদি বলে ফেলি, নজরুলের কোনো অবদান নেই চলচ্চিত্রে, সত্যজিৎ রায়ের যেটা আছে। এটা বোকামি হবে না? আপনাকে চিন্তা করতে হবে, নজরুল কোন প্রেক্ষাপটে জন্ম নিয়েছিলেন। এজন্য আমি তারিখ-সনকে গুরুত্ব দিই। নজরুল যখন জন্ম নিয়েছিলেন তখন কেবল সাউন্ড আসে, তখন সাউন্ড নিয়ে নজরুলের কিছু করার ছিলো না। কিন্তু সাউন্ডের চেয়ে অনেক বেশি কিছু উনি চলচ্চিত্রে করে দিয়ে গেছেন। কারণ তিনি তখন চলচ্চিত্রে গান ব্যবহার করেছেন। নিজে সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন। শব্দ কিন্তু সঙ্গীতেরই অংশ। কাজেই উনি সিনেমাকে জনপ্রিয় করেছেন ১০-১৫টি গান ব্যবহার করে এবং উনার সিনেমা সেসময় লাহোরে পর্যন্ত চলেছে। কাজেই আপনি একালের চোখ দিয়ে যদি দেখেন, চলচ্চিত্রে উনার কোনো অবদান নেই, তা তো হলো না। এজন্য এভাবে বলতে আমি নারাজ। আমি সেকালের চোখ দিয়ে নজরুলকে দেখেছি।
রুবেল : ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দে ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস’ লিখেছেন। এখন সেটির বয়স ৩০ বছরেরও বেশি। এই তিন দশকে চলচ্চিত্রের ইতিহাস তুলে আনা ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে আপনার ভিতরের পার্থক্যগুলো কীভাবে এসেছে? সেই প্রক্রিয়াগুলো কেমন ছিলো?
অনুপম : মুক্তিযুদ্ধের পর যে আবেগ, যে তারুণ্য নিয়ে নবনির্মাণের সূচনা হয়, সেই নবনির্মাণের পালা থেকে আমি সিনেমায় সামান্য অবদান রাখার চেষ্টা করেছি। তা চলচ্চিত্র ইতিহাস তুলে আনা ও পঠন-পাঠনের মাধ্যমে। ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দেই লিখেছিলাম, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে চলচ্চিত্রের পঠন-পাঠন চাই শিরোনামে। ২০১৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত আমার ডকুমেন্টগুলো রাখা আছে।
রুবেল : যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য আরো কীভাবে ভাবা যায়?
অনুপম : আমার মনে হয়, পঠন-পাঠনের সঙ্গে প্রায়োগিক ও প্রযুক্তিগতভাবেও সবকিছু দেখা উচিত। আর নির্মাণের ব্যাপারে এখন আরো সুবিধা এসেছে। পথের পাঁচালীতে হরিহর ঢোকার পথে বাধা, তারপর মেঘলা আকাশ, এভাবে একটা পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিলো। মহানগর-এ দেখো, অমল ঘরে ঢুকছে, বাইরে ঝড় হচ্ছে। অর্থাৎ সেই পরিবারে ঝড় নামলো। এই সিম্বলগুলো এখন দেখানোর সুযোগ হয়েছে এবং এভাবে দেখানো উচিত। শুধু সত্যজিৎ রায়দের সিনেমা নিয়ে কাজ করলেই হবে না, বেদের মেয়ে জোস্নাকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে, দেখাতে হবে।
রুবেল : ইতিহাসকে ধরে রাখার ব্যাপারে আপনার পরামর্শ কী?
অনুপম : এখন এসব কাজ ভিজ্যুয়ালি হতে পারে। কাগজের পাশাপাশি ভিজ্যুয়ালি তা সংরক্ষণ করতে হবে। তাছাড়া এখন তো অনেকেই ছাপা বই পড়ে না, ইন্টারনেটে পড়ে।
রুবেল : বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এখন চলচ্চিত্র নিয়ে পড়াশোনা চালু হয়েছে। কিন্তু দেখা যায়, এদেশে চলচ্চিত্র নিয়ে পড়াশোনার বেশিরভাগটাই পুঁথিগত বিদ্যায় বন্দি।
অনুপম : না, শুধু পুঁথিগত বিদ্যায় কোনো কিছু করা সম্ভব নয়। প্রায়োগিকের ওপর জোর দিতে হবে; ভিজ্যুয়ালের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। আমি ঋত্বিক ঘটক পড়াচ্ছি, তখন হয়তো তার একটা সিনেমা দেখাচ্ছি। এতে কোনো বিষয় আত্মস্থ হয় তাড়াতাড়ি। আর আমাদের এখানকার পড়াশোনার মুশকিলটা হলো--ওই যে আগেই বলেছি, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণির রেজাল্ট থাকলেই সাইকোলজির ছাত্র সিনেমার ইতিহাস, ক্যামেরা নিয়ে পড়ায়। দল-পার্টি করে শিক্ষক হয়ে আসে, প্রাইভেট সেক্টরে কাজ করা ভাগ্নি জামাইকে ফিল্ম ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যান বানানো হয়। আবার প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার অভিজ্ঞতা দিয়ে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো চাকরি নিয়ে চলে যাচ্ছে কেউ কেউ। বিশাল অঙ্কের টাকা খরচ করছে বা উনার হয়তো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা আছে। অথবা ভাইস চ্যান্সেলর কিংবা কোনো মন্ত্রী তার আত্মীয়। নাটকে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়েছে, তো চলচ্চিত্র কেনো পড়াতে পারবে না? পরিস্থিতি এই হলে শিক্ষার্থীদের তারা কী পড়াবে? এখন অনেকেই চলচ্চিত্র বিষয় নিয়ে পি এইচ ডি করছে, এমন গবেষক গাইড হচ্ছে, তার নিজের পি এইচ ডি অন্য বিষয়ে। পর্দার ওখানে আলো কম কেনো, এ ব্যাখ্যা কি নৃতত্ত্বের গবেষক বুঝবে? যেমনটা বুঝবে এ বিষয়ে পড়াশোনা করা কোনো লোক।
রুবেল : উচ্চতর ক্ষেত্রে বা চলচ্চিত্র নিয়ে পি এইচ ডি করার ক্ষেত্রে আমাদের বেহাল অবস্থা কেনো?
অনুপম : এই বেহাল অবস্থার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষই দায়ী। আবারও বলছি, এখানে লাভ ও লোভের ব্যাপার আছে। আমি আমার কথাই বলি, আমি ফেলোশিপ করেছি ফিল্ম আর্কাইভে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র নিয়ে। গবেষণা কিন্তু অনেক ধরনের হয়, ইতিহাস, বর্ণনা, বিশ্লেষণ ও প্রতীকধর্মী। আমি কি তা নিয়ে গবেষণা করে ভুল করেছি? বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কতোগুলো সিনেমা হয়েছে তা কেউ জানেই না। আমি এটা জানাতে চেয়েছি, মুক্তিযুদ্ধের সব সিনেমার বিষয়গুলোকে একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তুলে ধরে। এখানে যারা গবেষণার তত্ত্বাবধায়ক হয়, তাদের তো এ ব্যাপার কোনো ধারণা নেই; কাজেই আমি মনে করি এটা একধরনের পাপ। যারা যে বিষয়ে অভিজ্ঞ নয়, তারা সে বিষয়ের তত্ত্বাবধায়ক হওয়া গর্হিত অপরাধ। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় পি এইচ ডি দিচ্ছে--রাজশাহী, ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর--যাচাই করার জন্য কারো কাছে পাঠানো হচ্ছে না। অনেকে গাইড হচ্ছে সামান্য টাকার জন্য। বাংলা বিভাগের অধ্যাপক মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রের পি এইচ ডি প্রার্থীর ভাইভা নিচ্ছে, ভাবা যায়!
তাহলে কী করে জ্ঞানের ক্ষেত্রে নতুন কিছু যোগ হবে; সিনেমা এগিয়ে যাবে? বাংলাদেশের সিনেমা নিয়ে অনেকে বিদেশি তত্ত্বাবধায়কের কাছে পি এইচ ডি করছে। হাউ ফানি! বিদেশি অধ্যাপক কী করে জানবে বাংলাদেশের সিনেমার সামগ্রিক প্রেক্ষাপটের কথা। তারা কেবল একটি ঘটনার তারিখ জানবে, কিন্তু সেদিনের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট কী ছিলো, তা কীভাবে জানবে! আবার আমার সংগৃহীত তথ্য অনেকে নির্দ্বিধায় ব্যবহার করছে, অনুমতি পর্যন্ত নিচ্ছে না। আবার এও দেখছি, আমার সংগৃহীত ভুল তথ্যটিও অনেকে গ্রহণ করছে। কারণ তারা কখনো আমার দেওয়া তথ্যটি যাচাই-বাছাই করে দেখেনি, সেটা আদৌ ঠিক আছে কি না।
রুবেল : আপনি পি এইচ ডি করতে চেয়েছিলেন?
অনুপম : হ্যাঁ, চেয়েছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার বিভাগ থেকে। কিন্তু আমাকে তা করতে দেওয়া হয়নি। ভর্তি কমিটিতে ছিলেন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, অধ্যাপক আবদুল মোমেন চৌধুরী; উনারা নাকি আমাকে ভর্তি হতে দেয়নি। আমি যদি তখন পি এইচ ডি করতে পারতাম, তাহলে আমিই হয়তো চলচ্চিত্র নিয়ে দেশের প্রথম পি এইচ ডি গবেষক হতাম।
রুবেল : সেটা কতো খ্রিস্টাব্দের ঘটনা?
অনুপম : ৮০’র দশকে, এফ ডি সি থেকে বইটি বের হওয়ার সময়। আমার বইয়ের তারা খুব প্রশংসা করে কিন্তু আমাকে পি এইচ ডি করার সুযোগ দেয়নি। তবে ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমি সহায়তা পেয়েছি, অধ্যাপক আবুল হাসান চৌধুরী আমার গাইড হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নানা কারণে তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।
রুবেল : আপনি আপনার প্রচেষ্টায় চলচ্চিত্র নিয়ে এগিয়েছেন। সেটাকে আপনি অ্যাকাডেমিক জায়গায় নিয়ে আরো বেশি প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু অ্যাকাডেমিক অল্প-বিস্তর নম্বরের কারণে আপনি তা করতে পারেননি। যিনি সত্যিকারের ইতিহাসবিদ হতে চান, সত্যিকারের কাজ করতে চান এবং যিনি অ্যাকাডেমিক পরিসরকে এগিয়ে নিতে চান, সামান্য এই নম্বরের কারণে তার সে স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে না?
অনুপম : দেখো, এগুলো অযথা ফানি থিঙ। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের প্রথম পাঠ্যপুস্তকটি আমার লেখা--‘চিত্রনাট্য কলা’--সম্পাদনা করেছি আমি। গ্রন্থটির থার্ড এডিশন হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার গ্রন্থ পড়ানো হয়, অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ে এসব নিয়ে আমার কাজ করার সুযোগ নেই। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী। আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ড. সাখাওয়াত আলী খান। তিনি প্রায়ই আফসোস করেন, তার বিভাগে আমাকে শিক্ষক হিসেবে নিতে পারেননি বলে!
রুবেল পারভেজ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী। বর্তমানে তিনি বণিক বার্তায় সহ-সম্পাদক হিসেবে কর্মরত।
rubelmcj@gmail.com
https://www.facebook.com/rubel.pervez.14
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন