Magic Lanthon

               

নুরুন্নাহার মাসুদ

প্রকাশিত ২৯ জুলাই ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

চোখ বুজলেই মনে হয় দৌড়ে দৌড়ে আমি তারেককে খুঁজছি

নুরুন্নাহার মাসুদ

ম্যাজিক স্মৃতি

শেষ পর্ব.

তারেকের বিয়েটা আরেক ঘটনা। তারেকের মতো ক্যাথরিনও বিভিন্ন দেশে ঘুরেছে। নানা বিষয় নিয়ে কাজ করতো ক্যাথরিন। একপর্যায়ে বাংলাদেশে কাজ করতে আসলে আহমদ ছফা একদিন ক্যাথরিনের সঙ্গে তারেকের পরিচয় করিয়ে দেন। তখন ক্যাথরিনেরও একজন গাইডের দরকার ছিলো। তারেক তখন ক্যাথরিনকে তার বাসায় থাকার জায়গা দেয়; একই সঙ্গে ওরা অন্যান্য বিষয়েও একে অন্যকে সহায়তা করতো। ক্যাথরিনকে নিয়ে বেশ কয়েকবার আমাদের গ্রামের বাড়িতেও এসেছে তারেক। তারপর আমার বাবার বাড়ি, ওর বোনের শ্বশুরবাড়ির সব আত্মীয়স্বজনের বাসাতেও তারেক ওকে নিয়ে গিয়েছে। বাসায় আসলে আমরা সবাই একসঙ্গে বসে গল্পগুজব করতাম। ক্যাথরিন তখন বাংলা ভালো বুঝতো না। ফলে আমরা কে কী বললাম তারেক সেগুলো আবার ওকে ইংরেজিতে বুঝিয়ে দিতো।


কিছুদিন পর তারেক আর ক্যাথরিন ঢাকার উত্তরায় বাসা নিলো। তখন একদিন আমি, ওর বাবা, বোন সবাই মিলে বেড়াতে গেলাম। বিয়ে ছাড়া তারেকের সঙ্গে ক্যাথরিনের এভাবে মেলামেশাটা তারেকের বাবা একদম পছন্দ করতেন না। কারণ শরিয়তবিরোধী কর্মকাণ্ড তার কাছে অসহ্য ছিলো। ফলে উত্তরার বাসায় গিয়ে তারেকের বাবা ইংরেজিতেই ক্যাথরিনকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি তারেকের সঙ্গে এইভাবে কেনো থাকছো? আসলে তোমার ইচ্ছেটা কী? তখন ক্যাথরিন বললো, বাবা আমি তারেককে বিয়ে করবো। তোমার আত্মীয়স্বজন রাজি? ‘হ্যাঁ, ওকে সবাই পছন্দ করেছে। তাহলে তোমরা চলো কোর্টে বিয়ে করবে, সেখানেই তুমি মুসলমান হও। তারপর ওরা কোর্টে গিয়ে বিয়ে করলো এবং ক্যাথরিন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলো। বিয়ে করে এসে ক্যাথরিন আমাকে বললো, ‘আম্মা, আমি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছি। আমি জিজ্ঞেস করলাম কীভাবে? তখন ক্যাথরিন বললো, আমি বলেছি, নিজের ইচ্ছায় নবীর ধর্ম গ্রহণ করলাম। এখন বলো আমাদেরকে কি খাইতে দিবে? আমি বললাম, এই যে পোলাও, খাসির মাংস রান্না করেছি; এবার এগুলো পেট ভরে খাও।


 কিন্তু আমার মনে হলো, তারেকের আব্বার মধ্যে তখনো একধরনের অস্বস্তি কাজ করছে। তিনি কিছুই না বলে উত্তরার বাসা থেকে একা একা বেরিয়ে কাজী আর মৌলবি খুঁজে নিয়ে এলেন। কারণ কোর্টের বিয়ে তার কাছে পছন্দ হয়নি। তাই ইসলামি নিয়মানুযায়ী তারেকের বিয়ে দিবেন তিনি। তারেক ও ক্যাথরিনকে ডেকে নিয়ে এসে তিনি বসালেন। তখন তারেকের আব্বা কাজীকে বললেন, এক লাখ এক টাকা কাবিন করে বিয়ে পড়ান। ক্যাথরিন বললো, আব্বা কোনো টাকাপয়সা লাগবে না। তারেকের আব্বা বললেন, ‘তুমি থামো, এটা আমাদের নিয়ম। ইসলাম অনুযায়ী আমরা কাবিনে টাকা লিখি। তারপর বিয়ে পড়ানো হলো। বিয়ের পর সে খুব তাড়াতাড়ি বাংলা শিখে ফেললো। গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে আসলে ইট ভাঙতে আসা মহিলাদের কাছ থেকেও বাংলা শিখতো ক্যাথরিন। তারেক এটা নিয়ে প্রায়ই বলতো, আম্মা, দেখো কী অশুদ্ধ বাংলা শিখেছে! ওই ইট ভাঙা মহিলাদের কাছ থেকে জন্মকে জরমো বলা শিখে আসছে। আমি বলতাম, তুই শেখাস না কেনো? এখন ক্যাথরিন দুর্দান্ত বাংলায় কথা বলতে পারে। বাংলা ছাড়া আমাদের সঙ্গে কখনোই সে ইংরেজিতে কথা বলে না।


তারেকের আব্বা ক্যাথরিনকে ভীষণ ভালোবাসতেন। আমাদের বাসায় পরে ক্যাথরিনের মা, ভাই, ভাইয়ের বউ সবাই বেড়াতে এসেছিলো। ক্যাথরিনের মা এসে তারেকের বাবাকে বললেন, আমাদের এখানে আসতে অনেক দেরি হয়ে গেছে। আমাদের বাসায় আপনাদেরও যেতে হবে। তারেকের আব্বাও বললেন, হ্যাঁ, অবশ্যই যাবো। ওদের পুরো পরিবারের সঙ্গে আমাদের খুব ভালো সম্পর্ক হয়ে গেছে। তবে ছেলে ইসলামের পথে না থেকে এই যে সিনেমা নিয়ে পড়ে আছে, সেটা নিয়ে তারেকের বাবার তেমন প্রতিক্রিয়া ছিলো না। মাঝেমধ্যে যখন মনে হতো তখন কেবল আমাকে বলতেন, ‘তারেকের মা ওকে থামাও। মানা করো। দ্বীনের পথে আসতে বলো। একদিন তো তারেককে বলেই ফেললেন--তারেক এই সব ছাতানাতা ছেড়ে দিয়ে আল্লার পথে আসো। তখন তারেক বললো, ‘আব্বা আমি তো আল্লাহর পথেই আছি। তুমি যেমন ধর্ম করো, তেমনই আমি এই সিনেমাকেই ধর্ম বলে মনে করি। তবে ইনশাল্লাহ আমি একদিন না একদিন তোমার দেখানো পথে আসবো। কিছু কাজ আছে সেগুলো শেষ করার পর দ্বীনের পথেই থাকবো। আব্বাকে দাফন করার সময় তারেক হুজুরদের কাছে ওয়াদা করে বলেছে, আমার আব্বা যে পথে ছিলো, আমিও সেই পথে ফিরে আসবো। আমার আব্বা, চাচারা ভীষণ ভালো মানুষ ছিলেন। আমরাও ভালো, আমরা কারো ক্ষতি করিনি। আমার আব্বা মসজিদ মাদ্রাসায় যেভাবে সহযোগিতা করেছেন এখন থেকে আমিই আপনাদের সেভাবে সহযোগিতা করবো। আমি আব্বার লাইনে জীবনযাপন করি না, সেজন্য ভীষণ কষ্ট হয়। আব্বার মতো ইসলাম মেনে চলতে পারলে আমাদের হয়তো এতো কষ্ট হতো না।


আসলেই তারেক যেসব কাজ করেছে, সেগুলো অনেক কষ্টের ছিলো। খেয়ে না খেয়ে সে সুলতানের বাড়িতে পড়ে ছিলো। কতো কষ্ট করে আমার ছেলেটা কাজ করেছে। একবার আদম সুরত-এর শুটিং করে ওই রিলগুলো ব্যাগে নিয়ে এসে উত্তরায় একটা দোকানে রেখে বাড়িতে এসেছে। পরে শুনলো ওই দোকানে আগুন লেগে সবকিছু পুড়ে গেছে; অনেক কষ্টের টাকা ছিলো ওগুলো। তখন কাউকে কোনো কথা না বলে ওই দোকানে চলে গেলো তারেক; গিয়ে ওই ব্যাগ নিয়ে এসে আমাকে বলছে, আম্মা, আল্লা বাঁচাইছে। দুই-তিনটা ব্যাগের মধ্যে রাখার কারণে রিলের কিছুই হয়নি।

আট.

তারেক পরিবারের সবার প্রতিই খেয়াল রাখতো। বাসায় এসে ওর আব্বাকে নিজের হাতে গোসল করাতো। একশো বছরের বেশি বয়স হয়ে যাওয়ায় ওর আব্বা শেষ বয়সে এসে কেমন যেনো হয়ে গেলেন। ঠিক মতো গোসল করতে চাইতেন না, খেতেও চাইতেন না, এমনকি পানিও খেতেন না। তিনি চোখে দেখতেন, হুঁশও ছিলো; সবই বোঝেন কিন্তু এগুলোর কোনোটিই করতে চাইতেন না। এগুলোতে নাকি তার ভীষণ কষ্ট হয়। গরমের মধ্যেও লেপ মুড়ি দিয়ে থাকতেন। একসময় এসব তার অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেলো। তারেক বাড়িতে আসলে আমি বলতাম, তোমার আব্বা কিন্তু খেতে চান না, গোসলও করেন না। তখন তারেক সরষের তেল দিয়ে ওর আব্বার শরীর ম্যাসেজ করে গোসল করিয়ে দিতো। তারেক ঢাকা থেকে ফোনে আব্বাকে বলতো, আব্বা গোসল করো ভালো থাকবা। তখন ওর আব্বা গোসল করতেন। তারেকের কথা ওর আব্বা খুব শুনতেন। 

 

তারেক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় খুব লেখালেখি করতো। ওর টানে আমি বাড়িতে বেশিদিন থাকতে পারতাম না। সেজন্য মাঝেমধ্যে আমি ওর কাছে যেতাম। মগবাজারে ওর চাচার বাসায় দেখতাম সারারাত তারেক কেবল লেখালেখিই করছে। তারেককে বলতাম, তুমি একটু ঘুমাবা না? তারেক বলতো, আম্মা সকাল হয়ে গেছে নাকি? আমি বলতাম, তুমি শোনোনি আজান দিয়ে দিয়েছে। তারেক জীবনে অনেক কষ্ট করেছে। বিদেশে যাওয়ার বিষয়ে তারেক প্রথমে লন্ডনে আমার ভাসুরের ছেলে বেনুর কাছে গিয়ে ওঠে। তারপর সে বিভিন্ন কাজ করে টাকাপয়সা গুছিয়ে ঠিক করে সিনেমা বানাবে। পরে সেখান থেকে সে আমেরিকায় যায়। কিছুদিন পর সেখান থেকে বাংলাদেশে ফিরে আসলেও আবার আমেরিকায় চলে যায় তারেক। তখন তারেককে বেনু বলে, ‘তারেক যুক্তরাষ্ট্রে লিয়ার লেভিন নামের একজন আছে, যে মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের সঙ্গে শুটিং করেছে। তার কাছে অনেক ভিডিও আছে, তুমি দেখো কিছু করতে পারো কি না। কলকাতায় শরণার্থীদের কাছে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সময় বেনু গান গেয়ে সবাইকে মুক্তিযুদ্ধের অনুপ্রেরণা দিতো। ওই সময় সেগুলো ঘুরে ঘুরে লেভিন শুটিং করতো। পরে তারেক আর ক্যাথরিন ওই লেভিনকে অনেক খোঁজাখুঁজি করে বের করলো। তারপর লেভিনের কাছে থাকা সবগুলো ভিডিও দেখলো তারা। আমাকে দেশে এসে তারেক বলেছিলো, আম্মা আমি যখন ওই ভিডিওগুলো দেখলাম মনে হলো আমি যেনো যুদ্ধের মধ্যে বসে আছি। 


লেভিন তখন তারেককে বলেছিলো, তোমরা এগুলো নিয়েও কিছু করতে পারবে না। কারণ তার মধ্যে একধরনের ভয় ছিলো, পাকিস্তান যদি জানে হয়তো কোনো সমস্যা হবে। তারেক তখন বলেছিলো, না এখন কোনো ভয় নেই। আমাদের কোনো সমস্যা হবে না। আমরা ভালো কিছু করতে পারবো, আপনি এগুলো আমাদেরকে দিয়ে দেন। লেভিন তখন এর বিনিময়ে ৬০ লাখ টাকা চেয়েছিলো। তারেক বলেছিলো, ‘আমরা খেয়ে না খেয়ে হলেও এগুলো নিয়ে ছবি করবো। সেগুলো নিয়ে তারেক মুক্তির গান সিনেমা বানালো। সিনেমাটা বাংলাদেশের হলে মুক্তি দিলে অনেক মানুষ দেখেছে। অনেক মানুষ লন্ডন থেকে এসে সিনেমাটি দেখে আবার লন্ডনে চলে গেছে। অনেক মানুষ প্রশংসা করেছে। তারা বলেছে, তারেক বাংলাদেশের দলিল নিয়ে এসেছে। পরে দেশের বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে তারেক মুক্তির গান দেখিয়েছে এবং ওই সিনেমা নিয়ে মানুষের প্রতিক্রিয়া শুটিং করে সিনেমা বানিয়েছে মুক্তির কথা


তারেক বাংলাদেশে প্রথম কোনো চলচ্চিত্র পরিচালক, যে সিনেমা নিয়ে ঘুরে ঘুরে মানুষকে দেখিয়েছে। তারেককে কিন্তু মানুষ ভুলে যায়নি। কাজের জন্যই ওকে মনে রাখতে হবে। তারেকের ইচ্ছে ছিলো আমি বেঁচে থাকবো আর ও চলে যাবে। ও প্রায় বলতো, আমি আজ আছি তো কাল নেই। সর্বশেষ ও যখন আমেরিকা থেকে বাড়িতে আসলো, আসার আগে আমাকে ফোনে বললো, আম্মা আমি কিন্তু আসছি। আমি বললাম, হ্যাঁ বাবা আসো। তখন ও বললো, আম্মা আব্বার পাশেই কিন্তু আমার জায়গাটা রাখবা। আমি বললাম, তাহলে তুমি কি আমাকে মাটি দিবে না? আসলে ওর হয়তো ইচ্ছে ছিলো, তার কাজ মাকে দেখাবে। তা না হলে আমি বেঁচে থাকবো কেনো? এই বিষয়গুলো এখন আমাকে ভীষণ কষ্ট দেয়। কিছুদিন আগে ক্যাথরিন ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করলো, আম্মা আপনি কেমন আছেন? আমি বললাম, ক্যাথরিন, আমার বয়সের যারা তাদের অধিকাংশই মারা গেছে। যারা এখনো বেঁচে আছে, তাদের সবাই বিভিন্ন রোগে অসুস্থ। আমি তারেকের দোয়ায় ভালোই আছি। তারেক চাইতো আমি ভালো থাকি, আমি ভালো আছি।


আমি একটা কথা প্রায়ই বলতাম, আল্লাহ আমার বাচ্চাগুলো মানুষ হবে কি হবে না সেটা তুমিই জানো। আমি তোমার কাছে দোয়া করি ওরা যাতে দুনিয়া ও আখিরাতে সম্মান পায়। আমার কলিজার টুকরাটা আমার সবসময় খোঁজ রাখতো, কোথাও কোনো সমস্যা হলে সেটার সমাধান করে দিতো। সেই ছেলেটা আমার চোখের সামনে থেকে চলে গেলো। আমার প্রায়ই মনে হয়, আমি হয়তো তারেকের জন্যই বেঁচে আছি। তাছাড়া আমার বেঁচে থাকার কথা নয়। আমি এক তারেকের জন্য শত শত সন্তানের মা হয়েছি। কখনো বেশি কষ্ট হলে এটা ভেবেই আনন্দ, সান্ত্বনা পাই। কিছুদিন আগে ফরিদপুরে জসিম হলে তারেকের স্মরণে একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলো। সেখানে সবাই নানা কথা বলছে, তারেক এই ছিলো, তাই ছিলো। সে খুব ভালো লোক ছিলো। একপর্যায়ে আমার হাত দিয়ে পুরস্কার বিতরণ করানোর পর বললো, তারেক ভাইয়ের জন্য আপনি মন খারাপ করবেন না, আমরা সবাই আপনার সন্তান। আমি তাদেরকে বলেছি, আমার তারেকের দেখানো পথে তোমরা চলো, দুনিয়া ও আখেরাতে ভালো থাকবে।

নয়.

তারেক আমাকে কখনোই কষ্ট দিতে চাইতো না। সিনেমার শুটিং করতে আসলে ইউনিটের অতো মানুষকে বাড়িতে আনতো না। কারণ ও ভাবতো তাদের আনলে আমাকে রান্নার জন্য কষ্ট করতে হবে। সেজন্য শুটিং করে সেদিনই চলে যেতো। আবার পরে এসে শুটিং করতো। যদি কখনো দুয়েকজনকে নিয়ে আসতো, আগে থেকেই ফোন করে বলে দিতো, আম্মা দুইটার বেশি তরকারি করবা না। খাওয়ার জন্য মানুষ বাঁচে না, বাঁচার জন্য মানুষ খায়। আমার কষ্ট হবে এটা কোনোভাবেই তারেক চাইতো না। বাড়িতে আসলে আমাকে নিয়েই বসে থাকতো। বাড়ির বাচ্চাদের ভীষণ আদর করতো সে।


তারেকের প্রথম সিনেমা সোনার বেড়ি। সেটা করার পর আমাকে দেখালো। সেখানে ১২ বছরের একটি মেয়ের সারা শরীর সোনার গয়না দিয়ে সাজানো। তাকে ওইভাবে সাজিয়ে বিয়ের পর স্বামীর বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হলো। সিনেমাটা শেষ হওয়ার পর তারেক আমাকে জিজ্ঞেস করলো, আম্মা কী বুঝলা? আমি বললাম, দেখলাম তো সোনা দিয়ে একটা মেয়েকে সাজিয়ে বিয়ে দেওয়া হলো। তারেক বললো, ‘আম্মা, এইভাবে সাজিয়ে চিরদিনের জন্য নিয়ে যাওয়া হলো। তার আর কোনো ইচ্ছে থাকলো না। এই যে সোনার গহনা এগুলো একেকটা শিকল, সোনার শিকল। সিনেমাটা বানিয়ে তারেক জার্মানিতে নিয়ে গিয়ে দেখালো। প্রদর্শনীর পর তারেককে প্রশ্ন করা হলো, ‘তুমি তো মেয়ে না, ছেলে। তাহলে মেয়েদের যে বেদনা, সেটা তুমি কীভাবে বুঝলে? তখন তারেক বলেছিলো, আমি ছোটোবেলায় দেখেছি আমার মা ঘর থেকে কখনো বের হননি, তার ইচ্ছেমতো কোথাও যেতে পারেননি। অধিকাংশ সময় তিনি ঘরেই কাটিয়েছেন। তার সেই পরিস্থিতি থেকেই আমি এটা শিখেছি। ১২ বছরের একটা মেয়েকে বিয়ে করে এনে ঠিক যেভাবে চালায়, তাকে সেভাবেই চলতে হয়। যে কথা বলা হয়, তাকে সেটাই মানতে হয়।

দশ.

তারেক ওর বন্ধুবান্ধবদের ভীষণ ভালোবাসতো। এক কার্পেটের উপর চার-পাঁচ জন শুয়ে থাকতো। মাংস রান্না করেছি জানলে সবাই চলে আসতো। তারেক নিজে বড়ো মাছ আর মুরগির মাংস খেতে খুব ভালোবাসতো। তবে গরুর মাংস তার তেমন পছন্দ ছিলো না। বড়ো রুই মাছ নিয়ে আসলে মাথাটা রেখে দিতো, আমি গেলে সেটা দিয়ে মুড়িঘন্ট করে খাওয়াতাম।


আমার তারেক ছোটোবেলায় কোনো গণ্ডগোল করেনি। শুধু তারেক না, আমার কোনো সন্তানই সেটা করেনি। খেলাধুলা খুব পছন্দ করতো তারেক। ক্রিকেট খেলা, নাচগান তার ভীষণ পছন্দ ছিলো। দুষ্টুমি, খেলাধুলায় তারেক ছিলো সবার লিডার। সবাইকে সে ভালোবাসতো। বাড়িতে যখন আসতো, সব ভাইবোনদের নিয়ে বসে গল্প-আনন্দ করতো। সে সবকিছু ভালো করে গুছিয়ে রাখতো। রান্নাও খুব ভালো করতে পারতো। ক্যাথরিন তেমন সংসারের কাজ করতো না। তারেককে বিয়ে করার জন্য প্রথম যখন আমি প্রস্তাব দিলাম, তখন তারেক বললো, আম্মা, এ রকম একজন মেয়ে খুঁজো যাতে তার মনটা বড়ো হয়। আর সে আমার কাজ করবে, আমি তার কাজ করবো। আমি বললাম, এ রকম মেয়ে কি বাংলাদেশে আছে? অবশেষে ক্যাথরিনকে আল্লাহ মিলিয়ে দিয়েছে। তারেককেও সে সব কাজে সহায়তা করতো। একবার একটা সিনেমা করতে গিয়ে টাকার সঙ্কটে পড়ে গেলো তারেক। তখন ক্যাথরিন বললো, তারেক, এই যে টাকাটা আমি ব্যাংকে রাখলাম, তুমি ভাতের অভাবে যদি মরেও যাও, তবুও টাকাটা তুলবে না। তোমার সিনেমায় লাগাবে। আমি বলেছিলাম, আমার ছেলে ভাতের অভাবে মরে যাবে, তার পরও তোমার টাকা সিনেমার জন্যই খরচ করবে। মিরপুরে সাড়ে তিন কাঠার একটা জমি কিনেছিলো তারেক। সেটাও বিক্রি করে সে সিনেমা বানিয়েছে। তারেক তার মাটির ময়না সিনেমাটা পাকিস্তানে দেখিয়ে সেখানেও পুরস্কার পেয়েছে। ঘরভর্তি পুরস্কার তার। ভাড়া ঘরের মধ্যে তার পুরস্কার আটে না। তারেককে নিয়ে বাড়ির পাশে একটা জাদুঘর হওয়ার কথা ছিলো। সেখানে তারেকের সব স্মৃতি তুলে ধরা হবে। কিন্তু কাজটা এখনো শুরু করা সম্ভব হয়নি।


মাটির ময়না সিনেমা দেখে আমাকে একজন প্রশ্ন করেছিলো, খালাম্মা আপনাকে জীবনে যেভাবে কষ্ট বা অবজ্ঞার শিকার হতে হয়েছে, আপনি কি কখনোই তার প্রতিবাদ করেননি? আমি বললাম, না করিনি। কারণ আমাদের বংশে এটা কখনোই ছিলো না। আমরা সব মেনে নিয়েছি। আমরা মেয়েমানুষ, আমাদের বংশের নাম আছে। আমি প্রতিবাদ কেনো করবো? আমার ভাগ্যে যা ছিলো, তা-ই হয়েছে। তাছাড়া তারেকের বাবা তো সৎ পথে ছিলেন। তবে হ্যাঁ, এর জন্য আমার হয়তো একটু কষ্ট হয়েছে; পর্দার জন্য ঘর থেকে বের হতে পারতাম না; বালতিতে করে পানি নিয়ে এসে গোসলসহ সবকিছু আমাকে ঘরের মধ্যেই করতে হতো। কিন্তু তাতে আমার খুব বেশি অসুবিধা হয়নি। বিয়ের পর আমার ননদ, ভাসুরের ছেলে, পাড়া-প্রতিবেশী দেবরদের সঙ্গে খেলাধুলা করতাম, বাড়িতে জোছনা রাতে আমরা গান শুনতাম। সেই পরিবেশ ছিলো অন্যরকম। তখন তারেকের বাবাও সবাইকে গান শোনাতেন। সেই পরিবেশটা হঠাৎ করে পাল্টে গিয়েছিলো। আমি ঘর থেকে বের হতে পারবো না, আমার ভাসুরের ছেলেদের সঙ্গেও পর্দা করতে হতো। ফলে আমাকে সবসময় ঘরেই বেশি থাকতে হতো। মাটির ঘরের একপাশে গোসল করতাম। অনেক সময় আমার শাশুড়ি এসে আমাকে খুঁজে পেতেন না; মানে পর্দার উপরে পর্দা আর কি। শাশুড়ি বলতেন, তুমি কোথায়? আমি বলতাম, এই যে আম্মা। তারেকের আব্বা আমাকে খুব নিরাপদে রাখতেন। আমি যাতে না বের হই, বাচ্চারা যাতে ছবিওয়ালা কাপড় না পরে, সে ব্যাপারে তিনি সবসময় খেয়াল রাখতেন। অথচ এ রকম একজন মানুষের সন্তানই সিনেমা বানিয়ে তাকেই উল্টো দেখিয়ে দিয়েছে। তবে উনি তাবলিগে চলে যাওয়ার পরও আমি কিন্তু নিয়ম ভাঙিনি। কারণ ওটা আমার স্বামীর হুকুম, আল্লাহর হুকুম। আমরা একসঙ্গে তাহাজ্জুদের নামাজ পড়েছি; আমল করেছি একসঙ্গে। আর তিনি যখন বাড়ি থাকেননি তখন তো আমাকে সন্তানদের নিয়ে থাকতে হতো। তখনো নামাজ-কালাম পড়েছি। এটা তো আমাদের ছোটোবেলার শিক্ষা। বাইরের মানুষদের সঙ্গে কথা বলতাম না। তবে আমার ভাসুরের ছেলেদের সঙ্গে কথা বলা, দেখা করা বন্ধ হয়ে গেলেও পরে আবার সেটা ঠিক হয়ে গেছে। তারেকের বাবাই পরে সেটাতে কিছু বলেননি। এছাড়া সংগ্রামের সময় একসঙ্গে দৌড়াদৌড়ি, এক জায়গাতেই ছেলে-মেয়েরা থেকেছি। আমার মনে হয়, সেজন্যই পরে তিনি পরিবর্তন হয়ে গিয়েছিলেন; কোনো কিছুর বেশি প্রতিবাদ করতেন না।


একবার তাবলিগ থেকে ফিরে এসে তারেকের বাবা দেখলেন, আমার মেজো মেয়ের গায়ে নতুন জামা। সেই জামায় হাঁসের ছবি রয়েছে। উনি ওই জামাটা আমার মেয়ের শরীর থেকে খুলে নিয়ে আগুনে পুড়িয়ে দিলেন। কারণ মুসলমানের জামায় কোনো প্রাণির ছবি থাকতে পারে না। আমার মেয়ে তাতে একটুও কাঁদেনি। বাড়ির সামনে দিয়ে দুর্গাপূজার সময় মূর্তি নিয়ে যেতো। রাস্তা দিয়ে কতো মানুষ খেলনা, বাঁশি, হাড়ি-পাতিল কিনে আনন্দ করতে করতে যেতো। কিন্তু ভাঙায় যেখানে মেলা হয়, সেখানে আমাদের কাউকে তিনি যেতে দেননি। মেলা চলার দুই দিন আমাদের সবাইকে ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে রাখতেন তিনি। বাচ্চাগুলোও এর বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ করেনি। বাবা যা বলেছে, ওরা তাই শুনেছে।

এগারো.

মাটির ময়না সিনেমা দেখার পর তারেকের আব্বা খুব কষ্ট পেয়েছিলেন। তিনি তারেককে ডেকে বললেন, তারেক, আগেকার ডাক্তাররা কিন্তু ওই রকমই চিকিৎসা করেছে। তখন রক্ত আমাশয় হলে ছানা আর বার্লির পানিই খাওয়ানো হতো। আর একবেলা ভাত খেতে দিতো। তবে তারেক এর উত্তরে কিছুই বলেনি। আসলে তারেকের আব্বা ভাবতেন, একবেলার বেশি ভাত দিলে আসমা হয়তো মরে যাবে। ফলে তিনি নিজেও ওই ভয় দেখাতেন। এছাড়া আমারও তখন অল্প বয়স, আমাকে যা বলা হতো আমিও তাই শুনতাম। তবে গ্রামের মহিলারা বলতো ওকে পেট ভরে ভাত দাও। ও ঠিক হয়ে যাবে। আসমার চাচা, চাচাতো ভাইবোন সব ঢাকায় চলে গিয়েছিলো। আমি একা আসমা আর তারেককে নিয়ে এই বাড়িতে ছিলাম। পাশের বাড়িতে অন্য চাচাতো বোনদের সঙ্গেই খেলাধুলা করতো আসমা। ঘুরে ঘুরে সে বলতো, ‘রুবি আপার কাছে গিয়ে পেট ভরে ভাত খেতে দিলেই আমি ভালো হয়ে যাবো। কিন্তু ওর আব্বা বলতেন, ‘না ভাত দেওয়া যাবে না। তুমি ছানা ও বার্লির পানি খাও।


একদিন আমি ছানার পানি তৈরি করে মেয়েটাকে আর খুঁজে পাই না। পরে দেখি উঠানের সামনে একটা গাছের আড়ালে বসে আছে। তাকে দেখে ফেলার পর বলে, তোমরা আমাকে ছানার পানি খাওয়াবে বলে আমি এখানে চলে এসেছি। ওইসব কথা মনে হলে আমার বুকটা ফেটে যায়। সে এক দুর্বিসহ কষ্ট। মাটির ময়নাতেও তারেক দেখিয়েছে, হোমিওপ্যাথি ওষুধ দিতো আনুর বাবা। কারো কাছ থেকে তিনি টাকা নিতেন না। অনেক সময় দেখা যেতো, ডাক্তারের কাছে গিয়ে কারো কারো রোগ ভালো হতো না। কিন্তু তার (তারেকের আব্বার) হোমিওপ্যাথির দুই ডোজ খেয়ে ভালো হয়ে যেতো। এমনও হয়েছে, তার দুয়েক ফোটা ওষুধ খেয়ে ডায়রিয়াও ভালো হয়ে গিয়েছে। তবে আসমা মারা যাওয়ার পর তারেকের বাবা আর কাউকে ওষুধ দিতেন না।


আসমা মারা যাওয়ার আট দিন পর আমার মেজো মেয়ে সালমার জন্ম হলো। সালমার বয়স যখন ছয় মাস তখন আরেকটি ঘটনা ঘটলো। তখন ও হামাগুড়ি দিয়ে দৌড়ে বেড়ায়। একদিন তারেকের সঙ্গে খেলতে খেলতে বাড়ির পিছনে চলে গেলো সালমা। আমি আর তারেকের আব্বা বাড়ির ভিতরে কীসের একটা হিসাব করছিলাম। এমন সময় হঠাৎ একটা শব্দ হলে আমি দৌড়ে গিয়ে দেখি সালমার মুখ একটা মিকচারের মতো কীসে যেনো ভেসে গেছে। হামাগুড়ি দিয়ে বাইরে গিয়ে একটা বোতল পেয়ে সেটা ও মুখে দিয়েছে। আসলে ওটা ওষুধ ছিলো না, ওর মধ্যে সাপ তাড়ানোর একধরনের অ্যাসিড ছিলো। তবে সালমা ওটা খায়নি, কেবলই মুখে দিয়েছে। আর তাতেই সেটার ফ্যানায় মুখ ভেসে গেছে। ওটা দেখতে গোলাপী রঙের ছিলো। তারেকের বাবাকে বললাম, টিউবওয়েলে চাপ দিতে থাকো ও মনে হচ্ছে কিছু একটা খেয়েছে। তিনি টিউবওয়েল না চেপে খুঁজতে গেলেন, সালমা কী খেয়েছে সেটা দেখতে। গিয়ে দেখেন ওটা কার্বলিক অ্যাসিড। এসেই বললেন, ‘আমার মেয়ে মারা গেছে, তোমরা সরে যাও, কালেমা পড়ো। এ কথা বলেই লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ পড়া শুরু করলেন তিনি। আমি বললাম, তুমি সরো, কিছুদিন আগে আমার তিন বছরের মেয়ে মারা গেছে। আমি আর ওকে মরতে দেবো না।


আমার চিৎকার শুনে পাড়ার অন্যান্য মহিলারা চলে আসলো, তখন উনি ওখান থেকে সরে গেলেন। কারণ বেগানা মহিলার সামনে উনি থাকতেন না। আমি আর অন্য মহিলারা তখন সালমার মুখ ধুয়ে মাথায় পানি দিতে লাগলাম। মনে হলো, ওর দম প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। হঠাৎ আৎ করে একটা শব্দ করে চিল্লায়ে কেঁদে উঠলো। আমার ছোটোভাইকে ওই হিন্দু ডাক্তারের কাছে পাঠানো হলো; যাকে পাকিস্তানি আর্মিরা যুদ্ধের সময় সপরিবারে মেরে ফেলেছিলো। উনি এসে ওষুধ দিলে আমার মেয়েটা সুস্থ হয়ে ওঠে। তবে মুখটা একটু পুড়ে গিয়েছিলো। ওই সময় আমি বাধা না দিলে হয়তো, আমার এই মেয়েকেও চার কলেমা পড়ে সত্যি সত্যি মাটি দিতো তারেকের আব্বা! এমনই ছিলো তার বিশ্বাস! তবে যাই বলি না কেনো, আসমা মারা যাওয়ার পর তারেকের বাবা অন্য ছেলে-মেয়েদের কিছু হলে ভীষণ ভয় পেয়ে যেতেন। আমি যা বলতাম, উনি তাই করতেন। ওষুধও এনে দিতেন। হাজার হলেও তিনি তো বাবা! চিকিৎসা করাতে পারেননি সেজন্য তারও তো দুঃখ কম হয়নি।


সত্যজিতের পথের পাঁচালি  সিনেমার সিডি এনে তারেক একবার বাড়ির সবাইকে দেখিয়েছিলো। দেখানোর আগে আমাকে বলে নিয়েছিলো, মা তুমি কাঁদবা না। কারণ ওখানে অপুর বোন দূর্গা মারা গিয়েছে। ঠিক ওরকমই আমার মেয়ে আসমা মারা গিয়েছিলো। তারেক সেটা অনুভব করে ভেবেছে আমি হয়তো কাঁদবো।

বারো.

তারেক আমার কাছে কখনোই তেমন কোনো আবদার করতো না। একবার একটা সমস্যায় পড়ে প্রায় সাত মাস পরে ঢাকা থেকে বাড়ি আসে তারেক। এসেই আমাকে বললো, আম্মা আমি সাত মাস ধরে চাচাদের কাছ থেকে কোনো টাকাপয়সা নিইনি। একটু সমস্যার মধ্যে আছি, আব্বাকে বলো আমাকে কিছু টাকা দিতে। আসলে ওর চাচারা ওই বাসা থেকে তারেককে বের করে দিয়েছিলো। পরে তারেক একটা মেসে থাকা শুরু করে। কিন্তু সেগুলোর কিছুই আমাদের বলেনি তারেক। ওর বাবা তখন একশো ৫০ টাকা দেয়। এতো কম টাকা দিলেও তারেক কিছুই বলেনি। বরং সেখান থেকে আরো ৫০ টাকা বাবাকে দিয়ে বলে যায়, ‘আব্বা তোমার কষ্ট হবে ৫০ টাকা রেখে দাও। এই বলেই তারেক বললো, ‘আমি ঢাকা চলে যাচ্ছি। সেসময় আমি তারেকের জন্য কিছু পিঠা বানিয়ে দিলাম। যাওয়ার সময় তারেক ভাঙায় আমার ভাইয়ের বাসায় একটু বিশ্রাম করে তারপর গিয়েছে। ঢাকায় গিয়ে তারেক আমাকে বড়ো একটা চিঠি লিখে পাঠালো। চিঠিতে সে লিখেছে, আম্মা তোমাদের প্রতি আমার কোনো অভিযোগ নেই। আমার ভীষণ খারাপ লাগে, তোমাদের জন্য আমি কিছুই করতে পারছি না। চিঠির শেষে সে লিখেছে, আসার সময় তুমি আমার জন্য যেসব পিঠা বানিয়ে দিয়েছিলে, আমি ভাঙায় সেসব দুলু মামার বাসায় রেখে এসেছি।


ওর আব্বা পরে বুঝতে পেরেছিলেন আসলেই খুব কম টাকা দেওয়া হয়েছে, তখন গ্রামের আরেকজনকে দিয়ে তিনি আবার টাকা পাঠিয়ে দিলেন। টাকা পাঠানোর কিছুদিন পর আমি ঢাকায় তারেকের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। বাসার সামনে রিকশা থেকে নামার পর আমার এক ভাসুরের মেয়ে আমাকে বললো, ‘আপনি কি খবর পেয়ে এসেছেন? আমি বললাম, কী হয়েছে, কী বলছিস? আমার তারেক কোথায়? ওর কি কিছু হয়েছে? সে আর কোনো কথা বলে না। বাড়ির কেউ কোনো কথা বলে না। ওদের মেয়ে অন্য ছেলের সঙ্গে বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ায়, তারা ভেবেছে তাদের মানসম্মান সব নষ্ট হয়ে গিয়েছে সেজন্য সবাই চুপ। তখন মেয়েকে বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার জন্য সাহায্য করায় তারেককে অনেক কথা বলা হয়েছিলো। ফলে তারেক বাড়ি থেকে বেরিয়ে বাইরে মেসে গিয়ে সাত মাস ছিলো। আমার এক ননদের মেয়ে ওকে তখন গোপনে টাকা দিতো। কিন্তু তারেক সেগুলো নিতো না। পরে তারেককে আমি বললাম, তারেক তুমি এটা কেনো করলে? বাড়ির মানসম্মান নষ্ট করলে কেনো? তখন তারেক বলল, ‘আম্মা তোমরা রুমার কথা একবার চিন্তা করো। বাড়ির সমস্ত ফোন বন্ধ রেখেছে চাচারা, রুমা কাঁদছে। ওর চাওয়া-পাওয়ার কি কোনো মূল্য নেই? পরে ওর চাচারা রুমার সম্পর্ক মেনে নেয়। সবাইকে ডেকে অনুষ্ঠানও করে। রুমাও তারেককে ভীষণ ভালোবাসতো। তারেকের কাছে টাকা থাকতো না, রুমা আমার ব্যাগে টাকা ঢুকিয়ে বলতো তারেককে দিয়ে দিতে। তারেক ওই সময় বেশ কষ্ট করে লেখাপড়া করেছে। কিন্তু ওই কষ্টের কথা আমাকে কখনোই বলেনি। মাদ্রাসায় পড়ার সময়ও সে কষ্ট করেছে, সেগুলোও কিছু জানায়নি।


তবে তারেক কিন্তু আমার কাছে ওর আব্বা কিংবা আমার সম্পর্কে কখনোই কিছু জিজ্ঞেস করতো না; কখনো জানতেও চায়নি। ও যা কিছু জানে সেগুলো মূলত ওর বড়ো চাচা, চাচাতো ভাইবোনদের কাছ থেকে শুনে। সেগুলো দিয়েই সিনেমা বানিয়েছে। ওর ওই চাচাতো ভাইবোনরা সবসময়ই তারেকের আব্বার কাছে থাকতো। ওর আব্বাই ওদেরকে পড়িয়েছেন, গান শিখিয়েছেন। আমার ভাসুর মানে তারেকের বড়ো চাচা ইংরেজদের সময়ে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। একদিন ঘোড়ায় চড়ে যাওয়ার সময় মাথায় আমের ডালের আঘাত পান। তারপর থেকে তিনি মাথার বড়ো ধরনের সমস্যায় ভুগতেন। পরে চাকরিটাও চলে যায়। তিনি কোনো আমিষ খেতেন না। সেই অবস্থায় উনি অনেকদিন বেঁচে ছিলেন। ফলে তার সন্তানদের তারেকের বাবা নিজ হাতে লেখাপড়া করিয়েছেন। ওর চাচাতো ভাইবোনরাও অবশ্য তারেকদের খুব দেখাশোনা করেছে। কখনোই বুঝতে দেয়নি ওরা আপন ভাইবোন না। তবে তারেক আমাদের বিষয়ে যা কিছু শুনেছে সবই সত্য। কোথাও এক ফোঁটা কোনো মিথ্যা নেই। তবে আমি একদিন তারেককে বলেওছিলাম, তুমি এসব বিষয়ে আমাকে জিজ্ঞাসা করোনি কেনো? আমাকে বললে তো আমি তোমাকে আরো কিছু বলতে পারতাম। এর উত্তরে তারেক কেবল মুচকি হেসেছিলো।

তেরো.

তারেকের বাবা যখন মারা গেলেন, তখন আমি প্রায় বেহুঁশ। আমি ঘরে শুয়ে আছি, আমার কাছে তারেক এসে বসলো। কিন্তু আমি যে তাকে বলবো, বাবা তুমি কোনো চিন্তা কোরো না। তোমার আব্বা তো সময় মতো চলে গেছেন; আমি তো আছি, তুমি ভেঙে পড়ো না। আমি এই কথাটুকুও আমার ছেলেটাকে বলতে পারিনি। পরের পাঁচ দিন আমার ছেলেটার কোনো খোঁজও করিনি। আমার ছেলেটা চলে গেলো। আমি ওকে আটকাতে পারিনি। ও যখন গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা গেলো আমাকে কেউ জানায়নি। আমি তখনো ঘরে ঘুমিয়ে আছি; স্বপ্নে দেখছি, আমি জানালার পাশে বসে কোরআন তেলাওয়াত করছি। এ সময় হঠাৎ ওর বাবা জানালার পাশে এসেতারেকের মা বলে একটা ডাক দিলো। আমি চমকে উঠলাম। কারণ পাঁচ দিন আগেই তো উনি মারা গেছেন। পাশে তৈয়বের ফোনের শব্দে আমার ঘুম ভেঙে যায়। তৈয়ব ফোন তুলে বলে, ‘কে মারা গেছে? তারেক ভাই কেমন আছে? আমি অতোটুকুই বলতে পারবো। আর কিছুই স্মরণে নেই।


তারেকের মৃত্যুর দিনেই ওর মরদেহ দেখানোর জন্য আমাকে গ্রাম থেকে গাড়িতে করে ঢাকা নিয়ে যাওয়া হলো। আমি ঢাকায় ওর বাসায় গিয়ে দেখি সেখান থেকে অনেক মানুষ বের হচ্ছে। আমার তখন কথা বলার শক্তিও নেই। কী হচ্ছে, আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। কিছুক্ষণ পর আমার ছোটো ছেলে আর মেয়ে এসে আমাকে বললো, চলো আম্মা নিষাদকে দেখে আসি। ক্যাথরিন আর নিষাদ তখন ড. কামাল হোসেনের বাসায়। সেখানে গিয়ে দেখি ক্যাথরিনের মাথায় লোকজন পানি ঢালছে। আমি তখন ক্যাথরিনকে জিজ্ঞেস করলাম, ক্যাথরিন আমার বাবা কোথায়? ক্যাথরিন বলে, আপনার ছেলেকে ভালো জায়গায় রেখেছি; বলেই সে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো।


পরে সেখান থেকে আমাকে পি জি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো তারেকের মরদেহ দেখানোর জন্য। হাসপাতালের হিমঘরে ওর মরদেহ রাখা ছিলো। ওর মরদেহটা বাক্স থেকে বের করা হলো, আমি তাকিয়ে আছি আর ভাবছি, আমার কলিজার টুকরাটা কতো কষ্ট পেয়ে মারা গেলো! ছেলেটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম। কোথাও কোনো কাটাছেঁড়া নেই। আমার ছেলে মাথায় আঘাত পেয়ে মারা গেছে। ওর বাবা মারা যাওয়ার পাঁচ দিন পরে তারেক চলে গেলো। তারেক চলে যাওয়ার কয়েক দিনের মধ্যে আমি স্বপ্ন দেখলাম, তারেক জানালার পাশ দিয়ে হাঁটছে। আমি বললাম, তারেক ঘরে আসো। ও ঘরে এসে আমার কাছে বসলো। আমি বললাম, কী হয়ে গেলো বাবা। এতো লোক এসে তোমাকে মাটিতে শুইয়ে দিলো। তারেক বললো, না আম্মা, আমি বেঁচে আছি। আমার কী হচ্ছে, কিছুই জানি না। আমি বেঁচে আছি। মৃত্যু, অ্যাকসিডেন্ট বিষয়ে আমি কিছুই বলতে পারবো না।


বাসায় আসলে আমার ছেলে আমাকে ভীষণ সময় দিতো। কিন্তু আমি তাকে সময় দিতে পারিনি। আমি বুঝতে পারিনি, আমার তারেক এতো তাড়াতাড়ি চলে যাবে। যখন ওর ছেলে নিষাদের প্রথম জন্মদিন পালন করলো, তখন গাড়ি পাঠিয়ে আমাকে গ্রাম থেকে নিয়ে গেলো। বিয়ের প্রায় ২৫ বছর পর সন্তান হয়েছে তারেকের। জন্মদিনের আগে সবাইকে বলে দিয়েছিলো, কেউ কোনো গিফ্ট নিয়ে আসবে না। কেউ যদি কিছু একান্তই নিয়ে আসতে চায়, তাহলে ফল নিয়ে আসবে। জন্মদিনের অনুষ্ঠানে বললো, আমার এতোদিনে নাতি-পুতি হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু এখন আমার প্রথম সন্তান হলো। সবাই আমার ছেলের জন্য দোয়া করবেন। আসলে ওই সময় তারা ভেবেছিলো তাদের কোনো বাচ্চাই হবে না। অবশেষে তারা বাচ্চারও মুখ দেখেছে। নিষাদের যখন এক বছর তিন মাস বয়স হলো, তখন তারেক মারা গেলো। সন্তানকে নিয়ে ভীষণ মাতামাতি করতো সে।

চৌদ্দ.

আমার বয়স বাড়লেও এখনো তেমন কোনো রোগবালাই নেই। তবে কেবল মনে হয়, আমি কী যেনো হারিয়ে ফেললাম! তারেককে কেবল আমি একা হারাইনি, বাংলাদেশের সিনেমা কী বটবৃক্ষ হারিয়েছে সেটা একসময় বুঝবে। চোখ বুজলেই মনে হয়, দৌড়ে দৌড়ে আমি তারেককে খুঁজছি। শেখ সাদী যেমন তার কবিতায় বলেছেন, যেদিন তুমি এসেছিলে ভবে, কেঁদেছিলে তুমি আর হেসেছিলো সবে। এমন জীবন তুমি করিবে গঠন, মরিলে হাসিবে তুমি কাঁদিবে ভুবন। আসলেই তারেক সবসময় হেসেছে। ওর প্রতিটি ছবিই হাসি মুখে তোলা। তার এ হাসি মুখ কখনোই কেউ ভুলবে না, ভোলা সম্ভব না।

 

ফরিদপুরের ভাঙা উপজেলার নূরপুর গ্রামে গিয়ে তারেকের মায়ের সঙ্গে ৯ আগস্ট ২০১৮ কথা বলে অনুলিখন করেছেন ইব্রাহীম খলিল।

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন