ফারুক আলম
প্রকাশিত ১১ জুলাই ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
'মান্টো’র নগ্নতা ও বিভাজনের বিবসন
ফারুক আলম

বোল কে লাব আযাদ হে তেরে
বোল জুবা আব তাক তেরি হ্যায়,
তেরা সুতওয়া জিসম হে তেরা-
বোল কে জাঁ আব তাক তেরি হ্যায়।।
দেখকে আহাংগারকি দুকা মে
তুন্ডহে সোলে সুরখ হ্যায় আহান,
খুলনে লাগে কুফলোকে দাহানে,
ফাইলা হার ইক জাঞ্জির কা দামান।
বোল, ইয়ে থোড়া ওয়াক্ত বহত হ্যায়,
জিসম-জুবা কি মওত সে পেহেলে;
বোল, কে সাচ জিন্দা হ্যায় আব তাক-
বোল যো কুচ কেহনা হ্যায় কেহে লে!
মান্টোর শেষাংশের তিন মিনিট পঞ্চাশ সেকেন্ড (এক ঘণ্টা ৫০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা ৫৩ মিনিট ৫০ সেকেন্ড)। ফয়েজ আহমদ ফয়েজ-এর কবিতা থেকে গান। আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ’র ভাষায়, ‘জিহ্বায় উচ্চারিত প্রতিটি সত্য শব্দ কবিতা।’
সত্য শব্দের রূপকার শিল্পী সত্ত্বা কখনো মরে না। তাকে মেরে ফেলা যায় না। সে বেঁচে থাকে অনাদিকাল। দিন যতো যায় ততো তার ব্যাপ্তি বাড়তে থাকে, ছড়িয়ে পড়ে তার আবেদন। নতুন নতুন বাস্তবতায় সে মাটি ফুড়ে উঠে এসে বলে, বলেছিলাম না, তোমাদের এই পাগলামি তোমাদেরকে আরো অনিরাময়যোগ্য পাগলে রূপান্তরিত করবে।
এ কথা খুব কড়াভাবে বলেছেন, সাদাত হাসান মান্টো। বলতে গিয়ে সমাজ-সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছেন। বিপন্ন হয়েছে তার সংসার, কর্ম ও জীবন। তার জীবনের বেদনাভরা ট্রাজেডি যেনো দেশভাগের এক বিয়োগান্ত নাটক। এ নাটকের ক্লাইমেক্স আধুনিক ট্রাজেডির শ্রেষ্ঠ স্রষ্টা শেক্সপিয়র রচিত ট্রাজেডিকেও হার মানিয়েছে। বিভক্তির রক্তক্ষরণে রক্তাক্ত ভারতের ক্রন্দন মান্টোর জীবনের সঙ্গে মিশে গেছে। নন্দিতা দাস আরো একবার চলচ্চিত্রে মান্টোর জীবন দান করলেন। এখানে মান্টো শুধু একজন মানুষ নয়, একজন গল্পকার নয়, নিজেই ভারত নামের দেশ। সে দেশ কিন্তু ধর্মের জাতীয়তাবাদীদের দ্বি-জাতি তত্ত্বের ওপর ভাগ করা পাকিস্তান বা হিন্দুস্তান না। সে দেশ হলো অখণ্ড স্বদেশ। স্বাধীন মানুষের বসবাস উপযোগী শান্তি সমৃদ্ধির মুক্ত ভারত।
মান্টোর ওপর বহু দিন গবেষণা করেছেন নন্দিতা। বলা যায়, কৈশোর পেরিয়েই মান্টোর বর্ণিল কর্মের সঙ্গে তার পরিচয়। কলেজ জীবনে মান্টোর গল্পের নাট্যরূপ উপভোগ করেন ও পড়েন। সংগ্রহ করেন পাঁচ খণ্ড মান্টো রচনা সংকলন। সবচেয়ে বড়ো কথা নন্দিতার বাবা একজন শিল্পী। তিনি মান্টোর অনুরক্ত ছিলেন ও তার মতোই জীবনযাপন করতেন। অভিনয়শিল্পী ও নির্মাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর মান্টোর জীবন নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন নন্দিতা। বেছে নিয়েছেন মান্টোর জীবনের চার বছর। ১৯৪৬ থেকে ১৯৫০। দেশভাগের আগে ও পরের চার বছর। সাক্ষাৎকারে নন্দিতা বলেছেন, এটা পুরোপুরি বায়োপিক নয়, পুরো ফিকশনও না। তিনি এ নিয়ে কাজ করেছেন ২০০৮ থেকে ২০১৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। মান্টোর মেয়েদের সঙ্গে আলাপ করতে লাহোরে গিয়েছেন। থেকেছেন নিঘাত বশির প্যাটেলের সঙ্গে তার বাড়িতে। নিঘাত মান্টোর বড়ো মেয়ে। মান্টোর মৃত্যুর সময় তার বয়স ছিলো নয়। বাবার স্মৃতি তার মানসপটে অম্লান হয়ে আছে। আলাপ করেছেন ড. আয়শা জালালের সঙ্গে। যিনি মান্টোর ওপর বিশেষ গবেষণা করেছেন। নন্দিতা এ কাজের জন্য বহু লোকের সান্নিধ্যে গিয়েছেন। অনেকে তাকে বলেছে, ‘প্রেম চন্দর বা ইসমত চুগতাই নিয়ে কাজ করেন না কেনো?’ নন্দিতা বলেছেন, ‘আমি তো মান্টো নিয়ে কাজ করবোই।’
সাদাত হাসান মান্টো নিয়ে কথা বলতে গেলে অসম্ভব একগুয়ে উন্মাদ কবি, সাহিত্যিক কাজী নজরুল ইসলাম ও নির্মাতা ঋত্বিক ঘটকসহ বেশকিছু মানুষের কথা আপনা-আপনি মনে পড়ে। তারা নগ্নকে বিবসন দেখাতে একটুও দ্বিধা করেননি। নজরুল বলেন, ‘জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত জালিয়াত খেলছে জুয়া।’ ‘কাচের গ্লাস ভাঙলো বলে খুকুর উপর রাগ কর, তোমরা যে সব ঢেড়ে খোকা ভারত ভেঙে ভাগ কর।’ কবি জীবনের শুরুতেই ছিলেন কিংবদন্তি। ছিলেন জনপ্রিয় বিদ্রোহী কবি; প্রেমের কবি। কবিতার বই ছাপানোর সঙ্গে সঙ্গে সরকারি নিষেধাজ্ঞা, মামলা, গ্রেপ্তার মোকাবিলা করতে হয়েছে তাকে। অভাবের শেষ সীমা অতিক্রম করেও নিজের রাস্তা ছাড়েননি তিনি। তিনি ছিলেন দারিদ্র্যের কবি ‘হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে করেছ মহান।’
আর ঋত্বিক রীতিমতো দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম করে জীবন কাটিয়েছেন। ধনীর দুলাল মাইকেল মধুসূদনও অমিতব্যয়িতার স্বভাবে দারিদ্র্যপীড়িত ছিলেন। অভাবী ঘরের সন্তান এস এম সুলতান অর্থকে অবহেলা করে অভাবী থেকেছেন। সুকান্ত ভট্টাচার্য, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় যেমন বিখ্যাত-জনপ্রিয়, তেমনই অভাবী। অভাব যেনো সাহিত্য ও শিল্প সাধনার অনুষঙ্গ। শিল্পীর নিত্য সঙ্গী। ঋত্বিককে সবাই মনে রেখেছে, রাখবেও। তার যুক্তি তক্কো আর গপ্পো দারিদ্র্য ও জীবন সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। দেশভাগের পর উদ্বাস্তুদের নিয়ে সুবর্ণরেখা চলচ্চিত্রে দেখা যায়, উদ্বাস্তুদের জন্য তৈরি স্কুল ছেড়ে বন্ধুর ব্যবসায় যোগ দিয়েছেন উদ্বাস্তু ঈশ্বর। আজীবন ঠিকানার সন্ধান; ঘরের সন্ধানে ভবঘুরে। বোন সীতা ও তার খেলার সাথি এতিম বাচ্চা অভিরামকে নিয়ে পাহাড়ি এলাকায় চাকরি ও বসবাস। দুজনকে মানুষ করতে হবে। বস্তুত বিভক্ত ভারতের সবাই ঘরছাড়া। কেউ আর মানুষ থাকতেই পারলো না।
সাদাত হাসান মান্টো বিভক্ত ভারতের ট্রাজেডির নায়ক। গল্প, নাটক, চিত্রনাট্য, প্রবন্ধসহ তার নিজের জীবন হয়েছে শোষণ বঞ্চনার প্রতিবাদী চলচ্চিত্র। সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তের প্রতিবাদ। প্রতিবাদ দেশভাগের বিরুদ্ধে। প্রতিবাদ জাতীয়তাবাদীদের মাতৃভূমি নিয়ে রাজনৈতিক প্রকল্পের বিরুদ্ধে। তারা তাদের হীন স্বার্থে মাতৃভূমিকে একদিকে মা রূপে বন্দনা করছে, অন্যদিকে সেই মাকে বেশ্যার মতো ব্যবহার করছে। মান্টো তার গল্পে, লেখায় যা স্পষ্ট করেছেন। ভণ্ডামির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বাস্তবকে মেনে নিতে বাধ্য করেছেন। সমাজ-রাষ্ট্র তার জীবদ্দশায় তাকে নাকচ করেছে। কমিউনিস্ট বলে, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী বলে, রাষ্ট্রীয় প্রচার মাধ্যম থেকে, পত্রিকা, চলচ্চিত্র থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। মামলা দিয়ে, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দিয়ে হেনস্তা করেছে। স্বাধীন দেশে পরাধীন হয়ে থেকেছেন তিনি। একজন লেখককে, একজন সত্যিকার শিল্পীকে, সাহিত্যিককে, আলোকিত মানুষকে, বাতিঘরকে তারা অস্বীকার করেছে, অপমান করেছে; আবার তার মৃত্যুর পর পরম মর্যাদায় গ্রহণ করেছে। এটা মনে হয়, এই উপমহাদেশেই সম্ভব। এখানে লেখা ও লেখক দণ্ডিত হয়। মান্টোকে ‘কালো সালোয়ার’, ‘উপর নিচে আউর দারমিয়ান’, ‘ঠাণ্ডা গোশ্ত’, ‘বু’, ‘ধোঁয়া’, ‘খোল দো’ গল্পের জন্য ছয় বার মামলার ঝামেলা পোহাতে হয়। তাকে লড়তে হয় আইনের সঙ্গে। তার লেখা বাজেয়াপ্ত হয়। নিম্ন আদালতে আর্থিক দণ্ড দেওয়া হয়। কোনো কোনো বার আর্থিক দণ্ডের সঙ্গে কারাদণ্ডও দেওয়া হয়। তাকে সহ্য করতে হয় আর্থিক ও মানসিকভাবে প্রচণ্ড নিষ্পেষণ। তবে তিনি দমে যাননি; লেখা ও আইনি লড়াই চালিয়েছেন। পত্রিকার অফিসের পাশাপাশি উচ্চ আদালতেরও শরণাপন্ন হয়েছেন। উচ্চ আদালত তার লেখায় ‘অশ্লীলতা’ খুঁজে পাননি এবং জরিমানাসহ দণ্ড মওকুফ করেছেন।
মজার ব্যাপার, জীবদ্দশায় যাকে ‘অশ্লীল’, নারী বিদ্বেষী, সমাজ বিরোধী ও পরিত্যাজ্য ঘোষণা করা হয়েছিলো, মৃত্যুর পর তাকে উর্দু সাহিত্যের বাতিঘর বলা হয়। ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে মান্টো স্বভাবসিদ্ধ বিদ্রুপে লিখেছিলেন, ‘একদিন হয়তো পাকিস্তানের সরকার আমার কফিনে একটা মেডেলও পরিয়ে দেবে। সেটাই হবে আমার চরম অপমান।’ সত্যিই তাই হলো। ২০০৫ খ্রিস্টাব্দের ১৮ জানুয়ারি ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকীতে মান্টোর ছবি সম্বলিত পাকিস্তানি ডাকটিকিট ছাড়া হয়। ২০১২ খ্রিস্টাব্দের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান জন্মের ৬৫ বছর উপলক্ষে সাদাত হাসান মান্টোকে ভূষিত করা হয় ‘নিশান-ই-ইমতিয়াজ’ উপাধিতে।
দুই.
মান্টো ছিলেন প্রগতিবাদী ও রাজনীতি সচেতন। তিনি নান্দনিক শিল্প-সাহিত্যের বিষয়ে বিন্দুমাত্র ছাড় দেননি। বাস্তবতার মধ্যে বিচরণ করেছেন। মিথ্যার মধ্যে অনুসন্ধান করেছেন সত্যকে। সত্যভ্রষ্ট হননি। আপন ভুবনে থেকেছেন। প্রগতিশীল লেখক সংঘের নামে রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলার রুচি তার হয়নি। সাজ্জাদ জহিরদের অনুসারী বা প্রগতিশীলতার ছত্রছায়ায় বৃত্তাবদ্ধ হননি। সৃষ্টিকর্মের সৃজনশীলতাকে বিসর্জন দিয়ে প্রগতিবাদী বা প্রতিক্রিয়াশীলদের ফরমায়েশি কলমবাজী তিনি করেননি। ‘কালো সীমানা’ বইয়ের পরিশিষ্টে ‘কাফনের গলা’ শিরোনামে মান্টো অকপটে মনের কথা বলেছেন। বলেছেন নিজের সম্পর্কে। তার প্রিয় শহর মুম্বাই নিয়ে, প্রগতিশীল লেখক, রাজনীতিবিদ, দেশ বিভাগ ও মানবতার বিপর্যয়ের ওপর খোলা মনে মতামত প্রকাশ করেছেন।
প্রথমে জানা দরকার, মান্টো কে? এ শিরোনামে উনি নিজেই লিখেছেন, ‘সাদাত হাসান মান্টো সম্পর্কে অনেক কিছু বলা ও লেখা হয়েছে, তার বিরুদ্ধে বেশি, যতো না তার পক্ষে। ... সাদাত হাসান মান্টো মরে গেলো, কিন্তু মান্টো মরলো না।’ সত্যি তাই, যতো দিন যাচ্ছে, ততোই বেশি প্রাসঙ্গিক হচ্ছেন মান্টো। ছোট্ট একটা জীবনকে এতো বড়ো করে গেছেন যে, তিনি সবসময় নাড়া দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলছেন, ‘মান্টো হলো এক নম্বরের চালাক, শয়তান, ধুরন্ধর লোক, যার তুলনা আমি আর জীবনে পাইনি। একের সঙ্গে দুই যোগ করলে তিন হয় আর ত্রিকোণ সম্পর্কে মান্টোর জ্ঞান ছিলো বিস্তর, ...।’
শিকারি যেমন জাল পেতে প্রজাপতি ধরতে ছোটে, মান্টো তেমনই ভাষার পিছনে তাড়া করে বেড়ান। আর ভাষা তাকে ফাঁকি দিয়ে আঙুলের ফাঁক দিয়ে গলে যায়। তাই তার লেখায় কোনো সুললিত ঝঙ্কার নেই। বরঞ্চ ছত্রে ছত্রে হাতুড়ির আঘাত রয়েছে, যতো আক্রমণ জীবনের কাছ থেকে তিনি পেয়েছেন, সব তিনি গ্রহণ করে নিয়েছেন মাথা পেতে। তার হাতুড়ির ঘা হিংস্র হলেও এলোপাথাড়ি নয়। বরং তার নিশানা অব্যর্থ। তিনি এক পাকা তীরন্দাজ।
মান্টোর লেখাপড়া নিয়ে শিক্ষিত মহলের কটাক্ষের জবাব দিয়েছেন তিনি নিজেই। নজরুল যেমন বলেন, ‘‘বিলেত ফেরনি?’ ... ‘এই তব বিদ্যে, ছি!’’ মান্টো বলেন, ‘মান্টো অশিক্ষিত। কেননা সে মার্কস পড়েনি। ফ্রয়েডের লেখা চোখেও দেখেনি। ... মান্টো অন্য কারোর চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত হতে ঘেন্না করে।’
তার সুদূরপ্রসারী চিন্তা আজও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তথাকথিত বন্দে মাতারম জাতীয়তাবাদকে নাকচ করে, ভারত বিভাজনকে পাগলামি মনে করে। এক রাতের দেশভাগ দুই লাখ সাধারণ মানুষকে হত্যা করেছে, প্রায় দুই কোটি মানুষকে ঘর ছাড়া, দেশ ছাড়া করেছে। প্রাণবন্ত সংবেদনশীল জীবন্ত মানুষেরা পরিণত হয়েছে জীবন্ত লাশে। পাকিস্তানের স্বপ্নদ্রষ্টা তথাকথিত মহাকবি ইকবালের বিপরীতে দাঁড়িয়েছিলেন ইসলামের সত্যিকারের সেবক, মানবতাবাদী সুফি সাধক মওলানা হুসেন আহম্মেদ মাদানী। তিনি বলেছিলেন, ‘হিন্দুস্তান-পাকিস্তান ভাগ হলে দুটি ঘটনা ঘটবে, মুসলিম হত্যা হবে হিন্দুস্তানে আর ইসলাম হত্যা হবে পাকিস্তানে।’ নজরুল বলেছিলেন, ‘পাকিস্তান হবে ফাঁকিস্থান।’ অনেকে বলেছিলেন, নাপাকস্থান। এই ভবিষ্যদ্বাণীর ভয়াবহতার কথা মান্টো তার গল্পে উপস্থাপন করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, সাম্রাজ্যবাদের তল্পিবাহক ভারতীয় জাতীয়তাবাদীরা ভারত মাতার সন্তান হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে, শুধু রাজনৈতিক ও ব্যক্তিস্বার্থে। আসলে তারা দেশ মাতৃকাকে বানিয়েছে বারবণিতা। তাকে ধর্ষণ করেছে নির্মমভাবে। একজন বেশ্যার সঙ্গে মানুষ যে আচরণ করে, স্বদেশের সঙ্গে তার থেকে বাজে আচরণ করেছে তারা। প্রকৃতপক্ষে দেশ বিভাজনের ঘটনার মধ্য দিয়ে সারা ভারতের সব স্বাভাবিকতা নস্যাৎ হয়েছে। ধূলিসাৎ করা হয়েছে মানবতা। নষ্ট করা হয়েছে সব ধর্ম।
প্রগতিশীলতা ধর্মকে নাকচ করে মানবতা দিয়ে। আর বুর্জোয়া রাজনীতি, পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ নির্বিচার বিস্তার লাভ করে ধর্ম ও মানবতাকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে। তারা ধর্মকে ব্যবহার করে মানবতার বিরুদ্ধে। মান্টোর ‘লোকসান’ গল্প। যেখানে দুই বন্ধু মিলে ১০-২০ জন মেয়ের মধ্য থেকে একজনকে বেছে ৪২ টাকায় কিনে নেয়। রাত শেষ হলে এক বন্ধু সেই মেয়েকে জিজ্ঞেস করে, ‘তোমার নাম কী?’ মেয়ে তার নাম বলে। নাম শুনে সেই বন্ধু হতবাক। সে বলে, ‘ওরা তো আমাদের বললো, তুমি অন্য ধর্মের।’ মেয়েটি জবাব দেয়, ‘ওরা মিথ্যে বলেছে।’ এই কথা শুনে বন্ধুর কাছে ছুটে গিয়ে সে বলে, ‘ওই হারামজাদারা আমাদেরকে ধোঁকা দিয়েছে। চল মাল ফিরিয়ে দিয়ে টাকা নিয়ে আসি।’
নিশ্চয় মান্টোকে চিনতে আর কারো ভুল হওয়ার কথা নয়। বৃটিশ শাসক ভুল করেনি। তিন বার মামলা দিয়েছে। বৃটিশদের প্রেতাত্মা এ দেশীয় কলোনিয়াল শাসকও ভুল করেনি। তারাও তিন বার মামলা দিয়েছে। মান্টোর প্রথম গল্প ‘তামাশা’। নিজেই বলেছেন, ইংরেজদের গ্রেপ্তারি এড়াতে বেনামে লেখা। প্রকাশিত অমৃতসর থেকে। বিষয় জালিয়ানওয়ালাবাগ (১৯১৯ খ্রিস্টাব্দ) তাণ্ডব। এই ট্রাজেডি তার দিব্য চক্ষু খুলে দিয়েছিলো।
কালক্রমে, বৃটিশ-ভারতের লাহোর ও মুম্বাইতে (বোম্বে) তার লেখক জীবন শুরু। তিনি সংবাদপত্রে ও ‘অল ইন্ডিয়া রেডিও’তেও লিখতেন। ২২ বছরের কর্মকালে তার অনন্য সৃষ্টিকর্ম তিনশো গল্প নিয়ে ২২টি ছোটো গল্পের সংকলন, একটি উপন্যাস, সাতটি রেডিও নাটকের সংগ্রহ; যাতে আছে একশোটি নাটিকা, তিনটি প্রবন্ধ সংকলন, চেনা মানুষদের নিয়ে দুটি ব্যক্তিগত স্মৃতিকথা, কিছু চিঠিপত্রসহ সাতটি চিত্রনাট্য।
বর্তমানে মান্টো বিশ্বনন্দিত ছোটোগল্পকার হলেও জীবদ্দশায় রাষ্ট্র ও সমাজের কাছে নিন্দিত ও নির্দয় নিপীড়নের শিকার ছিলেন। ১৯৪৭-এ দেশভাগের আগে প্রিয় শহর মুম্বাইতে তিনি ১২ বছর কাটিয়েছিলেন, কাজ করেছিলেন; পরে অসংখ্য বন্ধুবান্ধব ভক্ত রেখে পাকিস্তানের লাহোরে তিনি পাড়ি জমান। লাহোরে দারুণ অর্থ কষ্ট, দেশ বিভক্তির মানসিক যন্ত্রণা ও অনিশ্চিত জীবনে দিশেহারা মনে হলেও তিনি বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন। পানাভ্যাস তার ছিলো জীবনের শুরু থেকে; লাহোরের জীবনে তিনি পানাসক্ত হয়ে পড়েন। মদ্যপান নিয়ে তার একটা গল্প আছে। মান্টোর এক বন্ধু তাকে বললেন, ‘মান্টোজী, আপনি এতো মদ পান করেন কেনো? দেখেন আমিও আপনার মতো পান করি। তবে আমার টেবিলে আমি ঘড়ি রেখে পান করি। এক ঘণ্টায় আমি এক পেগ।’ মান্টো বললেন, ‘আপ ঘড়ি রাখকে পিতে হ্যায়। হাম ঘড়া রাখকে পিতে হে।’ (আপনি ঘড়ি রেখে খান, আমি ঘড়া রেখে খাই)।
অধিক মদ্যপানের কারণে লিভার সিরোসিসে মাত্র ৪২ বছর বয়সে ১৮ জানুয়ারি ১৯৫৫ তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার জীবন ও কর্ম নিয়ে ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে নির্মাতা সারমান সুলতান খুসাত ও ২০১৮-তে নন্দিতা দাস মান্টো নির্মাণ করেন। তার গল্প অবলম্বনে বেশকিছু নাটক ও চলচ্চিত্র হয়েছে। ‘কালি সালোয়ার’, ‘ঠাণ্ডা গোশ্ত’, ‘খোল দো’, ‘টোবাটেক সিং’ গল্প নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।
২০১২ খ্রিস্টাব্দে তার জন্ম শতবার্ষিকী উদযাপনের পরে তাকে নিয়ে পৃথিবীজুড়ে বক্তৃতা, লেখালেখি ও গবেষণা কর্ম নতুন মাত্রা যুক্ত করে। বিষয়, কাঠামো ও উপস্থাপনায় উত্তরাধুনিকতার পথিকৃত হিসেবে তিনি স্বীকৃত হন। মান্টোর ওপর অসাধারণ বক্তৃতা করেছেন আয়শা জালাল, জাবেদ হুসেন, সলিমুল্লাহ খান প্রমুখ। বিভিন্ন টিভি শো’তে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন নন্দিতা দাস ও নওয়াজউদ্দীন সিদ্দিকী। আলাপ করেছেন, ‘এস এ টিভি’র ‘দেশ দেশান্তর’ অনুষ্ঠানে সম্পাদক শামীম হানাফী, অনুবাদক ড. রোকসান্দা জলিল ও প্রকাশক সাদত। এছাড়া তর্ক-বিতর্ক করেছেন বিভিন্ন লেখক ও প্রকাশকগণ। তারা তাকে নতুন করে আবিষ্কার করেছেন, নতুন প্রজন্মের পথ প্রদর্শক হিসেবে বিনির্মাণ করেছেন।
তিন.
অভিনয়শিল্পী ও নির্মাতা হিসেবে অনেকেরই ভালোলাগার তালিকায় আছেন নন্দিতা।
অভিনয়শিল্পী হিসেবে তিনি দ্য আর্থ, ফায়ার-এ আলোচিত হয়েছেন। অভিনয় ও চলচ্চিত্র নির্মাণ নিয়ে তার তিরস্কার ও পুরস্কারের ঝুড়ি অনেকখানি ভর্তিই বলা চলে। মান্টো দিয়ে তিনি কেবল একজন বিতর্কিত ও সমাদৃত লেখক শিল্পীকে তুলে ধরেননি, নতুন করে ভারতের ইতিহাসকে পড়তে-দেখতে-ভাবতে শিখিয়েছেন।
লেখাটা শুরু হয়েছিলো মান্টো দিয়ে। শেষাংশের তিন মিনিট পঞ্চাশ সেকেন্ড। ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে মুক্তি পাওয়া এক ঘণ্টা ৫৩ মিনিট ৫৫ সেকেন্ডের এই চলচ্চিত্রটির কাহিনি, পরিচালনা ও প্রযোজনা নন্দিতা নিজেই করেছেন। নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছেন নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকী ও বন্ধু শ্যামের ভূমিকায় তাহির রাজ বশির, স্ত্রী সাফিয়া হয়েছেন রসিকা দুগ্গাল, বান্ধবী ও সহকর্মী ইসমত চুগতাই হয়েছেন রাজশ্রী দেশপান্ডে, অন্যান্য চরিত্রে ঋষি কাপুর, পরেশ রাওয়ালসহ আরো অনেকে। মান্টো প্রথম মুক্তি পায় কান চলচ্চিত্র উৎসবে ১৩ মে ২০১৮ এবং ভারতে ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮।
চার.
মান্টো পরিবারের প্রতি সহৃদয় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ দিয়ে মান্টোর শুরু। প্রথম দৃশ্যে মেয়েলি পায়ের ‘কিতকিত’ খেলা। খেলাচ্ছলে জমিন, মানুষ, সংস্কৃতি দখল। বার বার ভারত যেভাবে চলে গেছে পরদেশিদের কব্জায়। এ দেশের মানুষ নিজ দেশে থেকেছে পরদেশি।
‘দশ রুপি’ গল্প দিয়ে চলচ্চিত্র শুরু। মুম্বাই বস্তির সারিতার গল্প। সে ১৫ বছরের মেয়ে। তার মা পাড়ার প্রসিদ্ধ দালাল কিশোরীর কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন। খদ্দের এসেছে। মেয়েকে দরকার। খুঁজে পাচ্ছেন না। বকাবকি করছেন। লম্বা গলির মাথায় বড়ো বাজারের পাশে হলুদ গাড়ি নিয়ে খদ্দের বসে আছে। গাড়ির কথা শুনে সারিতা ঘরে এসে দ্রুত সাজপোশাক পরে নেয়। মা তাকে সাহায্য করে। সারিতা অতোশত জানে না, শেঠজীদের সঙ্গে গাড়িতে ঘুরবে। কয়েক মিনিটের মধ্যে নীল জর্জেট শাড়ি পরে বেরিয়ে আসে সারিতা। অজানা আশঙ্কায় কিছুটা জড়োসড়ো। মা তাকে সাবধান করেন। কিশোরীও সাবধান করে। এ সাবধানতা তার নিজের জীবনের নিশ্চয়তার জন্যে নয়, খদ্দেরের সন্তুষ্টির জন্যে। পয়সা পাবার পথ নষ্ট না করার সাবধানতা।
সারিতার বাবা রেলওয়েতে চাকরি করতো। তুচ্ছ কারণে সাহেব তাকে গালি দিলে তিনি সাহেবের মুখে ঘুষি মারেন। সাহেব দিবালোকে চোখে সরষে ফুল দেখেন। কিন্তু তিনি দমবার পাত্র ছিলেন না। সারিতার বাবার পিঠে আর্মি বুটের লাথি মেরে রেল লাইনে ফেলে তল পেট ফাটিয়ে দেয়। হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। আদালতে মামলা হয়। সাহেবের পাঁচশো টাকা জরিমানা হয়। সারিতার মা সে পাঁচশো টাকায় লটারি কাটে। ভাগ্য এতো খারাপ যে ছয় মাসের মধ্যে তারা কপর্দক শূন্য হয়ে পড়ে। তা না হলে, তিনি তো সারিতাকে লেখাপড়া শিখিয়ে ভালো পয়সার কোনো কেরানির সঙ্গে বিয়ে দিতে পারতেন।
খদ্দেররা সারিতাকে দেখে অবাক হয়। মন্তব্য করে ‘এতো ছোটো মেয়ে!’ দালাল কিশোরীকে তবুও তারা বকশিশ দেয়। পিছনের আসনে আনোয়ার আর সাহেবের মধ্যে সারিতাকে বসায়। গাড়ি স্টার্ট হয়। শহর পেরিয়ে গ্রামের পাশ দিয়ে দ্রুত চলে। সারিতা জানালা দিয়ে মাথা বের করে। ঝড়ো বাতাসে চুল উড়তে থাকে। ওর কচি পেটের চামড়ায় কাতুকুতু দেওয়ার চেষ্টা করে লোক দুটো। মেয়েটা কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে পিছনের আসন ডিঙিয়ে সামনে চালকের পাশের আসনে বসে। গান করে। চালকের সঙ্গে কথা বলে--‘তুমহারা নাম কিয়া হ্যায়? মেরা নাম কিফায়াত হ্যায়।’
চালক তাকে ১০ টাকা দিলে সে তা তার কাপড়ের ভাজের ভিতর গুজে রাখে। সমুদ্র সৈকতে খদ্দেরের সঙ্গে দৌড়াদৌড়ি করে। খেলা করে সমুদ্রের পানি নিয়ে। নিজেই বলে, ‘বহত মজা আয়ে।’ বিয়ারের ফেনার তেতো সাধ চেখে দেখে তা খেতে অস্বীকার করে। চালক গাড়ি নিয়ে আবার সারিতার বাড়ির কাছে তাকে নামিয়ে দেয়। আনোয়ার ও সাহেব নেশাগ্রস্ত হয়ে গাড়ির পিছনের আসনে বসা। আজব ঘটনা তখনই ঘটে। তামাম দুনিয়া যখন টাকার পিছনে দৌড়াচ্ছে, সারিতা তখন কিফায়াতের দেওয়া ১০ টাকাকে অবজ্ঞা করে সামনের বসার আসনের উপর রেখে দেয়। বলে, এ পয়সা সে নেবে কেনো? সারিতা ফিরে আসে। সাহেব ও আনোয়ার কাগজের নোটের মতো পড়ে থাকে। সারিতা গণিকা হতে চায় না। মানুষের মতো বাঁচতে চায়। কিন্তু এই দেশ, সমাজ, শহর, পুঁজি তাকে দেহ পসারিনি না বানিয়ে ছাড়বে না।
১৯৪৬, মুম্বাই। মান্টোর স্ত্রী সাফিয়া বেগম ‘দশ রুপি’ গল্পটা পড়া শেষ করেন। মান্টো বাবার ছবিটা পরিষ্কার করতে করতে স্ত্রীর সঙ্গে আলাপ করেন তাকে নিয়ে। বাচ্চাটা কেঁদে ওঠে। পারিবারিক মান্টোর দরদি আচরণ। বাচ্চার কাছে যান। এক হাতে কলম অন্য হাত বাচ্চার গায়ে। সাফিয়া বাচ্চাকে কোলে তুলে নেন। মান্টো কলমের বাক্সে কলম খুঁজতে থাকেন।
বাড়ির নিচে কেশব দাসের লন্ড্রি। তার সঙ্গে কথা বলে মান্টো ভবনের সামনে খোলা জায়গায় বাচ্চাদের খেলার জায়গা পার হয়ে টমটমে চড়ে বসেন। মুম্বাই শহরের প্রশস্ত রাস্তায় টমটম চলতে থাকে। মান্টো একটি চলচ্চিত্র স্টুডিওতে ঢোকেন। সেখানে নির্দেশনা ও অভিনয় চলছে। নিজের টিত্রনাট্যে সংলাপ পরিবর্তনে মান্টোর কোনো অনুমতিই নেওয়া হয় না। তিনি আপত্তি জানান। শেঠজীর কাছে যান। তিনি দুটি নতুন মেয়ের শরীর থেকে কাপড় সরিয়ে দেখছেন, কাকে দিয়ে তার কাজ হবে। মান্টো তার পাওনা টাকা দিতে বলেন। দুই হাজার আটশো রুপি। শেঠজী ব্যস্ত। সংক্ষেপে বলেন, এক হাজার আটশো। মান্টোর টাকা দরকার। তিনি টাকা চান। শেঠজী বলেন, মানডে। মান্টো আপত্তি করলে শেঠজী বলেন, মান্টো সাব মর্জি আপ। নগদ আজ এক হাজার দুইশো অর মানডে এক হাজার আটশো। ‘দূরের বাদ্য লাভ কি শুনে মাঝখানে তার বেজায় ফাঁক/ নগদ যা পাও হাত পেতে নাও বাকির খাতায় শূন্য থাক।’ মান্টোর যেনো ওমর খৈয়ামের এ বাণী মুখস্থ ছিলো, নাকি প্রয়োজন তাকে তাড়া করে ফিরছিলো বোঝা যায় না। তিনি দ্রুত হাত পাতেন এবং টাকা নিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবেশ থেকে মুক্তি পান।
আদালতের দৃশ্য। ইসমত চুগতাই ও মান্টো। চুগতাইয়ের ‘লিহাব’ ও মান্টোর ‘বু’ নিয়ে ‘অশ্লীলতার’ মামলার শেষ দিন। দুজনের মামলা খারিজের আনন্দে পার্টি। চুগতাই বলেন, ‘মেরা তো ইয়ে পেহলা অর আখরি মুকাদমা থা। মুঝে মান্টোকি তারহা কোর্ট-কাচারি কে চক্কর কাটনে কি কোয়ি শখ নাহি হ্যায়।’ অনেক আলোচনার মধ্যে প্রগ্রেসিভ অ্যাসোসিয়েশনে জয়েন করার কথা ওঠে। দুজন লেখকই আপত্তি জানান। ইংরেজ শোষণের বিরুদ্ধে মান্টোর লড়াকু ভূমিকার কথা আরেকবার স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়।
মুম্বাই শহরের বসতির বর্ণনা নিয়ে কথা ওঠে। ‘নাঙ্গনি আওয়াজিন’। অবিবাহিত ভাগ্য অন্বেষক যুবক ও তার বড়ো ভাইয়ের গল্প। আরো অনেক মানুষের সঙ্গে গরিবের জন্য তৈরি ভিড়ে ভরা বসতিতে তাদের ঠাঁই। নগপদা, বাইকলার, মুম্বাই। টিনের কার্টনের তৈরি নিম্ন আয়ের মানুষের আবাসন। খোপগুলোয় একেকটা পরিবারের বাস। আড়ালের ওপারে দম্পতিদের প্রেমময় মুহূর্ত দেখে যুবক নিজের ভবিষ্যতের দিনগুলো নিয়ে স্বপ্ন দেখে। সত্যি একদিন নববধূর সঙ্গে মধু যামিনি যাপনের সুযোগ এলো। কিন্তু যৌবন তাকে ফাঁকি দিয়েছে। এ নিয়ে মান্টোর সঙ্গে ইসমতের কথোপকথন বেশ মজাদার।
ইসমত : বন্ধ দরজার ওপাশে কী হয়ে থাকে আপনি খিড়কি দিয়ে কীভাবে দেখলেন?
মান্টো : আপনি আমার সঙ্গে চলেন। নিজেই দেখে নিন।
কথায় কথায় মান্টো রেগে বেরিয়ে গেলে সাফিয়াকে ইসমত বলেন, ‘তুম ফিকর মাত কর সাফিয়া। ও ক্লে রোড যায়েঙ্গে, এক সিগরেট ফুকেঙ্গে, অর এক ফির নায়ি কাহানি জেইব মে লা কার ওয়াপাস লট আয়েঙ্গে।’ মান্টো ক্লে রোডে গেলে এক যৌনকর্মী তাকে বলেন, ‘তুমি উপরে আসবে নাকি আমি নিচেই আসবো?’
অন্য আরেক ঘরে ক্লান্ত যৌনকর্মী ঘুমিয়ে আছেন। এক দালাল তার ঘুম ভাঙানোর চেষ্টা করেন। খদ্দের এসেছে। টাকাওয়ালা লোক। মওকা ছাড়লে না খেয়ে মরতে হবে। যৌনকর্মী কিছুতেই উঠবেন না। তিনি জোর আপত্তি জানান--‘খোদা কে লিয়ে রহম কর মুঝ পে।’ (খোদার দোহাই, আমার ওপর দয়া কর) জোরাজুরি ধস্তাধস্তিতে যৌনকর্মী দালালকে মেঝেতে ফেলে দেন। মাথায় বাড়ি খেয়ে তিনি অজ্ঞান হয়ে যান। ক্লান্ত যৌনকর্মী শুয়ে শুয়ে দালালের অজ্ঞান শরীর দেখতে থাকেন।
মান্টোর গল্প অতি সাধারণ মানুষদের নিয়ে। যৌনকর্মী নারী ও তাদের দালাল তার গল্পে উঠে এসেছে। এরা সবাই তৎকালীন মুম্বাই শহরের বাসিন্দা। এরা অন্য পাঁচটা সাধারণ নারীর মতো সংসার যন্ত্রণায় পিষ্ট নয়। এরা ব্যতিক্রমী। জীবন যন্ত্রণায় জর্জরিত। এরা সারারাত জেগে থাকে, সারাদিন ঘুমায়। ঘুম থেকে চমকে জেগে ওঠে। এই বুঝি তার বয়স শেষ হয়ে গেলো। এই বুঝি তার আয় রোজগারের পথ বন্ধ হয়ে যাবে। তবু সে প্রতিবাদী, তবু সে স্বমতে ফুসে ওঠা নাগিন।
রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে মান্টো এখানে আপসের রাজনীতির তীব্র কটাক্ষ করছেন। দেশ মাতৃকার বন্দনার নামে যারা ভারতীয় জাতীয়তাবাদের জন্ম দিয়েছে, তারা যে দেশটাকে বিশ্ব পুঁজিবাদের হাতে তুলে দিচ্ছে, তিনি তা বুঝতে পেরেছিলেন। তাই তার গল্পের যৌনকর্মী নায়িকা বলেন, ‘খোদা কে লিয়ে রহম কর মুঝ পে।’ তারা যে দেশটার সঙ্গে বেশ্যার চাইতে খারাপ আচরণ করবে, তা তিনি জানতেন। তিনি একবার রটিয়েছিলেন, বৃটিশরা তাজমহলটাকে আমেরিকার কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। আমেরিকা যন্ত্রপাতি নিয়ে তাজমহল তুলে নিয়ে যাবে। আক্ষরিক অর্থে সত্য না হলেও বিষয়টা তাৎপর্যপূর্ণ। বাস্তবে তো তাই হয়েছে। গোটা ভারত আমেরিকার হাতের মুঠোই।
সাদাত হোসেন মান্টো
কবরস্থানে বসেও মান্টো লিখছেন। স্ত্রী সাফিয়া সেখানে তার সঙ্গে আছেন। মায়ের প্রতি মান্টোর ভালোবাসা বোঝা যায়। কবরস্থান থেকে বেরোবার পথে মান্টো তার সেই বিখ্যাত উক্তিটি করেন, ‘এই মাটির তলায় মান্টো ঘুমিয়ে যাবে, মান্টো। কে জানে, সে বড়ো গল্প লেখক নাকি খোদা?’ নিজের গল্প লেখা নিয়ে তার এই অহংকার, আত্মবিশ্বাস ছিলো তার আজীবনের সঙ্গী।
পাঁচ.
স্টেশন। শ্যামের সঙ্গে দেখা। অন্তরঙ্গ বন্ধু। দুজনে টিকিট করে ট্রেনের অপেক্ষায়। মিছিল চলছে। ভারত ছাড় আন্দোলন। সাফিয়ার সঙ্গে পার্কে বসে গল্প করে সময় কাটানো। মান্টোর ফটোগ্রাফির অভ্যাস। তার প্রতিটি লেখার বর্ণনাও যেনো বাস্তবের চিত্রায়ণ।
ইসমত চুগতাইয়ের সঙ্গে সপরিবারে কেনাকাটা। জুতার দোকানদার বলছেন, সবাই বলছেন, হিন্দু-মুসলমান ভাই ভাই। বাস্তবে তো হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়েছে। একজন বলছে, আমার পূর্বপুরুষকে এই মাটিতে দাফন করা হয়েছে, আমিও এখানে থেকে যাবো। আরেকজন বলছে, আমি তো করাচি চলে যাবো। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে, ধর্ম নিয়ে রাজনীতির খেলা শুরু হয়েছে। রাজনীতির যে অংশ ধর্মীয় সম্প্রীতি গড়তে যাচ্ছে, মাঠ তাদের নাগালের বাইরে। আবার জনসাধারণ না চাইলেও ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা ছড়িয়ে পড়ছে।
চুগতাই এখানে মান্টোর পায়ের সঙ্গে নিজের পায়ের তুলনা করছেন। মান্টোর পা অনেক সুন্দর ভদ্রোচিত, অথচ তার নিজের পা দেখে মাতম করতে ইচ্ছে করে। মান্টো বলেন, আমার পাটা দেখতে তো আরো খারাপ, একেবারে মেয়েদের মতো। দাঙ্গা শুরু হয়। দোকানদার তাদেরকে আগে থেকে চেনে। তিনি তাদেরকে বলেন, ‘আপলোগ ঘাবরাইয়ে মাত’। (আপনারা ভয় পাবেন না) তিনি তাদের গোপন পথে নিরাপদে ফেরার ব্যবস্থা করেন।
সময় আসে ১৯৪৭ এর ১৫ আগস্ট। সাফিয়াকে মান্টো ঘুম থেকে ডেকে তোলেন। তাদের আসন্ন সন্তান একটি স্বাধীন দেশে জন্মাবে, এটা তাদের বিরাট পাওনা। মান্টোর আবেগঘন অনুভূতির প্রকাশে সাফিয়ার হাসি মুখ আনন্দ দেয়।
মান্টোর ৩০ মিনিটে চলচ্চিত্র জগতের তারকাদের নিয়ে অনুষ্ঠান। হ্যাপি ইন্ডিপেনডেন্স ডে। রতন বাঈ মান্টোদের খোঁজখবর নেন। সাফিয়া বোনের বিয়েতে লাহোর যাবেন। মান্টো কিছুতেই মুম্বাই ছেড়ে কোথাও যাবেন না। তিনি এখানে একেবারে ঠিক আছেন। প্রখ্যাত অভিনয়শিল্পী অশোক কুমার ঘোষণা করছেন, ‘বিশ্বাসই হয় না যে আমাদের দেশ স্বাধীন হয়েছে। সত্যি বলতে এখানে আমাদের কোনো হাত নেই, আমাদের কোনো লেনাদেনা নেই।’ তিনি রতন বাঈয়ের সঙ্গীত পরিবেশনার ঘোষণা দেন। ‘আব কিয়া বাতাউ মে, তেরে মিলনে সে কিয়া মিলা ...।’ (তোকে পেয়ে কী পেলাম, কীভাবে বলি)
ফেরার পথে অশোক কুমারের সঙ্গে আলাপ। লোকজন স্টুডিও জ্বালানোর হুমকি দিয়েছে। অশোক কুমার বলেন, ‘রিলাক্স, রিলাক্স মান্টো। ইয়ে সব পাগালপান হ্যায়, খতম হো যায়েগা।’ রাস্তায় মুসলমান এলাকা দিয়ে যাওয়ার সময় মান্টো টুপি বের করেন। অশোক কুমার তাকে শান্ত হতে বলেন। দেখা যায়, ভালোবাসার নায়ককে দেখতে জনতার ভিড় জমে। সামনে রাস্তা বন্ধ, তাই তারা নিরাপদ রাস্তা দেখিয়ে দেয়। বাড়িতে ফিরে সাফিয়ার সঙ্গে একই আলাপ। মান্টো বলেন, তিনি টুপি যোগাড় করেছেন। হিন্দু টুপি, মুসলমান টুপি। হিন্দু এলাকায় হিন্দু টুপি আর মুসলমান এলাকায় মুসলমান টুপি পরবেন! সাফিয়ার একা লাহোরে যেতে খারাপ লাগছে। তিনি বলছেনও। কিন্তু মান্টো এড়িয়ে যাচ্ছেন। তোমার সঙ্গে নিঘবি অর্থাৎ বড়ো মেয়ে নিঘাত তো যাচ্ছে।
ছয়.
শ্যাম উঠতি নায়ক। দূর থেকে মান্টো দেখেন রিহার্সেলে তার মনোযোগ নেই। নির্মাতা নওশাদ রিহার্সেল শেষ করেন। শ্যামকে মান্টো তার মন খারাপের কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, তার চাচা আক্রান্ত হয়ে রাওয়ালপিন্ডি থেকে পালিয়ে এসেছেন। ট্রামে শ্যামের সঙ্গে কথোপকথনে মান্টোর মন ভেঙে যায়। যখন শ্যাম বলেন, তিনি হয়তো এই দাঙ্গায় গেলে প্রিয় বন্ধু মান্টোর প্রাণও নিয়ে নিতে পারেন। তৎক্ষণাৎ মান্টো তার সিদ্ধান্ত বদলে ফেলেন। মানুষ যেখানে অমানুষ হয়ে গেছে, সেখানে তার ভালোবাসার কোনো দাম নেই। মুম্বাই তথা হিন্দুস্থানে থাকার কোনো মানে নেই। পরে অবশ্য বন্ধু শ্যাম তাকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু মান্টো জিনিসপত্র নিয়ে রওনা দেন। মান্টোর এক পাওনাদারের দেনা পরিশোধ করতে চান শ্যাম। মান্টো বলেন, এই শহরের কাছে তিনি ঋণী থাকতে চান। মান্টোর ৪২ মিনিট ১০ সেকেন্ড। মুম্বাই বন্দর। একমাত্র বন্ধু শ্যাম উপস্থিত। অনেক মানুষের মধ্যে কোনো পরিচিত লোক নেই। কাউকে না জানিয়ে মান্টো চলেছেন লাহোর। বিভক্ত ভারতের নয়া দেশ পাকিস্তান। দুই বন্ধু অপরাপর দেশের নামে জিন্দাবাদ দেন। পানপাত্র খুলে শেষ চুমুক দিয়ে চিয়ার্স করেন। সেই ‘হিফটাল্লা’ বলে বিদায় হন।
এর পরই লহোরের দৃশ্য। বিষণ্ন মান্টো আর কখনো প্রসন্ন হয়ে ওঠেন না। গান্ধী হত্যার সংবাদ শোনার পর কেনা খাবারটা আর খেতে পারেন না; দিয়ে দেন এক অভুক্তকে।
দেশ বিভাগের সময় দাঙ্গার পরিপ্রেক্ষিতে লেখেন বিখ্যাত গল্প ‘খোল দো’। খুলে দাও। সিরাজউদ্দীনের মেয়ে সাকিনা দাঙ্গা হাঙ্গামায় হারিয়ে গেছে। তিনি সবার কাছে মেয়ের বর্ণনা করেন। দেখতে সুন্দর। কালো কালো চুল। এতো লম্বা। বড়ো বড়ো চোখ ইত্যাদি। কয়েক যুবকের সঙ্গে তার দেখা। তারা তাকে সাহায্য করতে চায়। অবশেষে সিরাজ ধর্ষিতা সাকিনাকে হাসপাতালের বিছানায় পেয়ে যান। চিকিৎসক জানালা দেখিয়ে বলেন, খোল দো। সাকিনা বিছানায় শুয়ে নিজের পায়জামার দড়ি খুলতে থাকে। তার সঙ্গে যা করা হয়েছে, বাবার সামনে শুধু নয়, সারা পৃথিবীর সামনে সে জঘন্যতম কাহিনি আর অনাবৃত থাকে না। আশ্চর্যের বিষয় হলেও অনাকাঙ্ক্ষিত নয়, এই গল্প নিয়ে সমস্যা তৈরি করেন কবি আল্লামা ইকবালের ছেলে জাস্টিস জাবেদ ইকবাল। তিনি নাকি এই গল্পে প্রবল যৌনতার সুড়সুড়ি পেয়েছেন। তাই পাঠককে ধর্ষক হওয়া থেকে রেহাই দেওয়ার জন্য তিনি গল্পটিকে নিষিদ্ধ করেন।
মান্টো পারিবারিক পরিবেশে মেয়ের সঙ্গে গল্প করছেন। ভাগ্নে হামিদ মামাকে খাবার টেবিলে ডাকেন। মামাকে চাকরি খুঁজে দিতে চান। মান্টো আপত্তি জানান। শাশুড়ি লেখালেখির কথা বলেন। মান্টো পরিস্থিতি বর্ণনা করেন। তারপর সাফিয়াকে বলেন, এমন লিখবো যাতে সাফিয়ার কোনো অভাব না থাকে। কিন্তু সাফিয়ার মুখ দিয়ে সত্যটা বেরিয়ে আসে--এই লেখার জন্য তাকে না খেয়ে মরতে হবে। মান্টো খাবার ছেড়ে উঠে পড়েন, পাশে গিয়ে মদ পান করতে থাকেন।
পাকিস্তানে মান্টোর লেখা প্রকাশের লোক পাওয়া মুশকিল। এক সম্পাদককে ৫০ টাকা দিয়ে তার লেখা নিতে বললে তিনি বলেন, লেখাটা রেখে যান। আগামী দিন এসে ২০ টাকা নিয়ে যাবেন। মান্টো তাকে বলেন, দিবেন ২০ টাকা, তাও নেওয়ার জন্য আপনার পিছে দুবার ঘুরতে হবে! কী ধরনের পরিস্থিতি তাকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে তা এতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
‘সিয়া হাসিয়ে’ নিয়ে মান্টো বক্তৃতা করেন। হিন্দুস্তান জিন্দাবাদ, পাকিস্তান জিন্দাবাদ। চিল্লায়ে চিল্লায়ে গলা ফাটাচ্ছে। যে গোলাম সে স্বপ্ন দেখছে স্বাধীনতার। সে স্বাধীন, সে কীসের স্বপ্ন দেখছে? মানুষ কেনো অনবরত মারা যাচ্ছে? এর এক হিন্দুস্তানি জবাব আছে, আছে এক পাকিস্তানি জবাব। এক হিন্দু জবাব, এক মুসলমানি জবাব। কেউ ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে উত্তর খোঁজে, কেউবা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে দোষী সাব্যস্ত করে। এমনও কেউ আছে, যে মোঘল শাসনের অবসানকে এই সমস্যার কারণ মনে করে। মান্টো বক্তৃতায় বলেন, ‘... হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গায় রক্তক্ষরণ হচ্ছে। আমি একজন শিল্পী, আমি এই জখম ও ঘা একদম পছন্দ করি না।’
মান্টো তার নতুন বই ‘সিয়া হাসিয়ে’ থেকে পড়তে চান। দুটো গল্প। ‘ব্লাক মার্কেট’ ও ‘আরামকে জরুরত’। উপস্থিত শ্রোতাদের প্রশ্ন করতে বলা হলে এক যুবক উঠে দাঁড়ান। নাম আনসার। এই যুবক পরবর্তী সময়ে মান্টোর সঙ্গে অনেক সময় দেন। মান্টো সভাস্থল ত্যাগ করলে, যুবক সঙ্গে হাঁটতে থাকেন। মদের বোতল এগিয়ে দেন এবং ‘ঠাণ্ডা গোশ্ত’ নিয়ে প্রশংসা করেন। তার সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে তার কলেজে আমন্ত্রণ জানান। কলেজে জয়েন করলে মান্টোর আর্থিক সমস্যার সমাধান হবে। মান্টো উল্টো প্রশ্ন করেন, যাওয়ার আগে প্রিন্সিপালের কাছে জেনে নিবেন, তিনি মদ খেয়ে কলেজে যেতে পারবেন কি না। হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি পৌঁছে যান। সেখানে পুলিশ তার বাড়িতে খানা তল্লাশি করে। আবার সেই পুলিশি ঝামেলা। কোর্ট-কাচারি। মান্টো মুষড়ে পড়েন। কিন্তু লেখা ছাড়েন না।
সাত.
মান্টোতে ‘ঠাণ্ডা গোশ্ত’-এর চিত্রায়ণ। শিখ দম্পতির কাহিনি। দাঙ্গায় অংশগ্রহণকারী শিখ যুবক তার যৌন জীবনের স্বাভাবিকতা হারিয়ে ফেলেছেন। ইতোমধ্যে স্ত্রী কালবন্ত তার শীতল আচরণে ক্ষেপে যান। স্ত্রী মনে করেন, তার স্বামী অন্য কোনো মেয়ের পাল্লায় পড়েছে। তাই তার সঙ্গে কাঙ্ক্ষিত ব্যবহার করতে পারছে না। তিনিও জেদি, রাগি নারী। কৃপাণখানা খুলে নিয়ে শাঁ করে এক কোপ বসিয়ে দেন স্বামীর ঘাড়ে। মরণাপণ্ন স্বামী তার এই পরিস্থিতির কারণ ব্যাখ্যা করেন। তিনি যৌন কামনা চরিতার্থের জন্য এক যুবতীকে নিয়ে যান নদীর পাড়ে ঝোপের ধারে। যুবকের ভাষায়, ‘মেয়েটা ছিলো মরা। একটা মেয়ের লাশ। একদম ঠাণ্ডা গোশ্ত।’
‘ঠাণ্ডা গোশ্ত’-এর বিরুদ্ধে মামলা হয়। পাকিস্তানে আদালতের বিবরণে আইনজীবী এই গল্পকে খুব বাজে ভাষায় সমালোচনা করেন এবং অভিযোগ করেন, এই গল্প পড়ে যুব সমাজ বরবাদ হয়ে যাবে। মান্টোর হ্যালুসিনেইশন হতে থাকে। তিনি মনে করেন, যদি ইসমত চুগতাই আজ পাশে থাকতো, তবে সহজে পরিস্থিতির মোকাবিলা করা যেতো। আদালতের বারান্দায় এক নারীকে দেখে তার ইসমত মনে হয়। তার দুই বাহু ধরে আলাপের চেষ্টা করেন মান্টো। সাফিয়াসহ অন্যরা তার এই কাজে বাধা দেয়।
মান্টো বাড়িতে ফিরে ইসমতের চিঠি দেখেন, যার একটাও এতো দিন তিনি খুলে দেখেননি। সাফিয়া একটা চিঠি খুলে পড়তে থাকেন। ‘মান্টো মেরে দোস্ত, মেরে দুশমন। ... আমার তো সেই ক্ষমতা নেই যে তোমাকে আমার পাশে ডাকবো, কিন্তু কমপক্ষে চিঠির জবাব তো দিতে পারো।’
মান্টোর এক ঘণ্টা ১৯ মিনিট ২৪ সেকেন্ড আদালতে মওলানা তাহিরকে মান্টো সরাসরি প্রশ্ন করেন; গালিবের কবিতা আবৃত্তি করে শোনান। সঙ্গত কারণেই মওলানা এসবের অর্থ বুঝতে পারেন না। মান্টো বলেন, এই হলো সমস্যা, যিনি যা বোঝেন না, তাই নিয়ে মামলা করতে এসেছেন। মান্টো নিজেই তার পক্ষে আদালতে মামলা লড়ার অনুমতি নিয়ে প্রিন্সিপাল আবিদ আলীকে ডাকেন। প্রিন্সিপাল আবিদ বলেন, লেখকের লেখা পড়ে বোঝার জন্য, লেখককে বোঝার প্রয়োজন আছে। তিনি বলেন, তিনি এবং তার মেয়ে দুজনই এ গল্প পড়েছেন। কোথাও তাদের অশ্লীল মনে হয়নি। বিচারক বললেন, আজ এ পর্যন্তই।
মান্টোর এক ঘণ্টা ২২ মিনিটি ৫০ সেকেন্ডে শ্যাম আসেন পাকিস্তানে। তিনি এখন নামকরা স্টার। মান্টো দেখেন, তার প্রিয় বন্ধু প্রেক্ষাগৃহে ভক্তদের আমন্ত্রণে অনুষ্ঠান করতে যাচ্ছেন। বাইরে একজন সাধারণ মানুষ মান্টোর লেখা ‘শ্যাম চাচার চিঠি’ পড়ছেন। যে চিঠির শেষাংশে মান্টোর জীবনের শুধু নয়, ভারতের ট্রাজেডি ফুটে উঠেছে। ‘আমি এমন জায়গায় জন্মালাম যা আজ হিন্দুস্তান। যেখানে আমার প্রিয় আম্মার কবর, আমার আব্বারও। আমার প্রথম ছেলে আরিফেরও। আজ ও আমার দেশ না, আমার দেশ পাকিস্তান। এ কেমন স্বাধীনতা। যে স্বাধীনতা মানুষকে তার প্রিয় জন্মভূমিকে পর করে দেয়!’
শ্যামের সঙ্গে তার হোটেলে দেখা করেন মান্টো। প্রশ্ন করেন, তিনি কেমন আছেন? সঙ্গে আর একটি প্রশ্ন, ‘অর মেরা মুম্বাই?’ মান্টোকে শ্যাম জিজ্ঞাসা করেন, তিনি কেনো চিঠির জবাব দেন না? ইসমতসহ সবাই খুব অখুশি। মান্টোর উত্তর, লেখার কিছু নেই।
শ্যাম তাকে মুম্বাই ফিরে যেতে বলেন। বলেন, মুম্বাই তার জন্য অপেক্ষা করে। দুজন মদ গ্লাসে ঢেলে পানের আগে বলেন, ‘হিপটাল্লা।’ এক ঘণ্টা ২৭ মিনিট ২৭ সেকেন্ডে শ্যাম বলেন, এই সেই লাহোর যাকে তিনি খুব ভালোবাসেন। যেখানে তিনি ভালোবাসতে শিখেছেন। সেই সিগারেট খাওয়ার দৃশ্য। ম্যাচ জ্বালানোর দৃশ্য। এ যেনো সেই আগুন যার কোনো শেষ নেই। মান্টোর হাতের সস্তা সিগারেটটা টেনে ফেলে দিয়ে শ্যাম দামি সিগারেট দেন তাকে। আগে যেমনটা মান্টো তার সঙ্গে করতেন। শ্যাম গোটা প্যাকেট দিলে মান্টো তা ফিরিয়ে দেন। টাকা দিলে তাও ফেরত দেন। বিধ্বস্ত অভিমানী মান্টোকে রেখে আয়োজকদের পীড়াপীড়িতে উঠতে হয় শ্যামকে। তুমি কোথাও যাবে না। আমি তোমাকে এখানে পেতে চাই--মদ খেয়ে মান্টো টলতে থাকেন। পড়ে যেতে যেতে উঠে দাঁড়ান। এই তো পাকিস্তানের মান্টো। এখানে তার দেহ মন জীবন সবই টলছে। সবই অস্থির।
পার্কে মেয়ে খেলছে। বাবার কাছে সে কাগজের তৈরি ফুল ও সাপ ঠিক করে নেয়। এ এক কাগজের খেলনা। জীবনটাও। দেশটাও। মেয়ে অভিযোগ করে তার মুখ থেকে বাজে গন্ধ বেরোচ্ছে। সাফিয়া আলাপ করেন। স্বামীর প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেন। মান্টোর মুখে কবিতা শুনে বলেন, গালিব শোনার মতো তার অবস্থা নেই। পান করে আর লিখে জীবন চলে না। মান্টো বলেন, এই জন্য তিনি বেঁচে আছেন। সাফিয়া বলেন, আর যারা আপনার ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছে, তাদের কী হবে?
সাফিয়া : আমি সেই মানুষ চাই, যাকে আমি বিয়ে করেছিলাম।
মান্টো : কিন্তু আমি আগেও মদ খেতাম, আর এ ব্যাপারে তোমার বাবাকে প্রথম সাক্ষাতেই পরিষ্কার করেছি।
সাফিয়া : হ্যাঁ খেতেন, কিন্তু এভাবে নয়। এখন তো না সকালে হুঁশ থাকে, না সন্ধ্যায়।
সাফিয়ার হাতে একটা ক্ষত দেখতে পান মান্টো। জিজ্ঞাসা করেন, কী হয়েছে। সাফিয়া রাগ অভিমানে হাত ঢাকেন। মান্টো বলেন, তোমার যদি এতোই খারাপ লাগে তবে আমাকে ছেড়ে দাও। সাফিয়া আরো অভিমানী হয়ে ওঠেন। ঠিক আছে, যদি তাই চাও, তবে তাই হবে। মামলা শেষে চলে যাবো।
চলচ্চিত্রের এক ঘণ্টা ৩২ মিনিট ৫৬ সেকেন্ডে আদালতে ‘ঠাণ্ডা গোশ্ত’ নিয়ে বক্তব্য দেন মান্টো। বলেন, ‘আমি তাই লিখি যা আমি জানি, যা আমি দেখি।’ বিচারক তিনশো টাকা জরিমানা করেন এবং অনাদায়ে তিন মাস কারাদণ্ডের ঘোষণা দেন। আবারও মান্টোর হ্যালুসিনেইশন হতে থাকে। সাফিয়া তাকে সান্ত্বনা দেন। তিনি আপিল করবেন। মান্টো বলেন, ‘মুজে মাফ কর দে সাফিয়া, মুজে মাফ কর দে।’ ছোটো মেয়েকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘মুজে মাফ করদে নানহে ফেরেশতা।’
অসুস্থ মান্টো পত্রিকা অফিসের দরজায় বসে থাকেন। সম্পাদক জামাল হুসেনের কাছে লোক পাঠান টাকার জন্য। টাকা না পেয়ে ক্ষেপে যান। পত্রিকায় ছাপানোর জন্য পাঠানো লেখা ছিঁড়ে বাড়ি ফিরে আসেন। বাড়িতে অসুস্থ মেয়ে। আবারও অসুস্থ অবস্থায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। টেলিগ্রাম অফিস থেকে শ্যামের নামে পাঠানো তার বার্তা নিয়ে আসেন। মদ পান করেন। আবার বাড়ি এসে দেখেন, মেয়ে খুবই অসুস্থ। শাশুড়ি বলেন, ওষুধের জন্য অপেক্ষা করে করে মেয়েটা ঘুমিয়ে পড়েছে। মান্টোর অসুস্থ দেহ যেনো ভেঙে পড়ে। বসে পড়েন তিনি। ভাগ্নে এসে তাকে ওঠায়। সাফিয়া নির্বাক। মান্টো বলেন, আমাকে হাসপাতাল নিয়ে চলো। আমি মদ ছেড়ে দেবো। মান্টো মুষড়ে পড়েন। লাহোর মানসিক হাসপাতালের মাদক নিরাময় কেন্দ্রে তিনি ভর্তি হতে রাজি হন।
সাফিয়া : সুস্থ হয়ে ফিরে আসেন। বাচ্চাদের জন্য।
মান্টো : তোমার জন্য ফিরে আসবো।
আট.
মানসিক হাসপতালে এসে মান্টো লেখেন ‘টোবাটেক সিং’। দেশভাগের দুই-তিন বছর পর হঠাৎ কোনো এক কারণে কর্তৃপক্ষের মনে হলো, পাগলখানার পাগলদের মধ্যে যারা মুসলমান তাদের পাকিস্তানে আর যারা হিন্দু-শিখ তাদের হিন্দুস্তানের পাগলখানায় থাকা উচিত। এ নিয়ে পাগলদের মধ্যে মহা হুলুস্থুল। তাদের প্রশ্ন, পাকিস্তান কী, হিন্দুস্থান কী? তারা যে পত্রিকা পড়তো, তাতে যা লেখা থাকতো, তা পড়ে তাদের পাকিস্তান বা হিন্দুস্তান সম্পর্কে কোনো ধারণা হয়নি। তাছাড়া পাহারাদাররাও অশিক্ষিত হওয়ায় এ বিষয়ে বিশেষ কিছু বলতে পারতো না। গারদের এক শিখ পাগল, নাম বসন সিং। অদ্ভুত কিছিমের পাগল। তিনি গত ১৫ বছর দুই পায়ের উপর দাঁড়িয়ে কাটিয়েছেন। এতে তার পা ফুলে গেছে। তিনি ঘুমান না, স্নান করেন না। তাই তার দাড়ি চুলে জট পাকানো। অদ্ভুত চেহারা। তিনি সবসময় নিজের ভাষায় বিড় বিড় করেন--‘উপাড় দি গুড়গুড় দি এনেক্সি দি বেঢ়িয়ান মুঙ দি দাল ...।’ তিনি টোবাটেক সিং থেকে এসেছেন বলে সবাই তাকে ওই নামে ডাকে। সেখানে নাকি তাদের জমিদারি আছে। আরেক পাগল নিজেকে খোদা বলে দাবি করেন। বসন সিং তার কাছে প্রশ্ন করেন, টোবাটেক সিং কোথায়, পাকিস্তানে না ভারতে? তিনি বলেন, আমি তো এখনো হুকুম দিইনি। বসন সিং রেগে গালি দিতে থাকেন। নিশ্চয় তিনি মুসলমানের খোদা, শিখদের ভগবান হলে তার কথা শুনতেন। তার প্রতিবেশী এক মুসলমান ভাই নাম ফজলউদ্দিন। তিনি ফল-মিষ্টি নিয়ে তার সঙ্গে দেখা করেন। ফজল জানান, তার মেয়েকে নিয়ে তার পরিবারের সবাই হিন্দুস্থান চলে গেছে। তারা তাকে অনুরোধ করেছে, তিনি যেনো তার সঙ্গে দেখা করে এটা জানান। তাই তিনি জানাতে এসেছেন। তার মেয়েটা বেশ সুন্দর হয়েছে। বসন সিং তাকে প্রশ্ন করেন, টোবাটেক সিং কোথায়? তিনি বলেন, যেখানে ছিলো সেখানে। আবার জিজ্ঞাসা করেন, পাকিস্তানে না হিন্দুস্থানে? তিনি বিপদে পড়েন। যাহোক, পাগলেরা এই ভাগাভাগি পছন্দ করছিলো না।
মান্টোতে পাগল ভাগাভাগির দিন সব পাগলকে গাড়িতে উঠানো নিয়ে খুবই ঝামেলা হয়। তারপরও সবাইকে উঠানো গেলো, কিন্তু টোবাটেক সিং উঠতে চান না। তিনি জিজ্ঞাসা করেন, টোবাটেক সিং কোথায়? এক প্রহরী উত্তর দেন, হিন্দুস্তানে। সেখানে তাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তিনি তখন তাড়াতাড়ি গাড়িতে উঠে পড়েন। বর্ডারে গিয়ে পাগল ভাগ করার সময় আরেক সমস্যা। কেউ কথা শুনতে চায় না। অনেক পাগল পাকিস্তান জিন্দাবাদ আবার অনেক পাগল পাকিস্তান মুর্দাবাদ স্লোগান দিচ্ছে। ফলে দু-তিন বার গোলমাল বাঁধতে যেয়েও বাঁধে না।
এবার বসন সিং-এর পালা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা তার নাম রেজিস্ট্রারে লিখছিলো। তখন টোবাটেক সিং জিজ্ঞাসা করেন, টোবাটেক সিং কোথায়? কর্মকর্তা হেসে জবাব দেন পাকিস্তানে। তিনি পাকিস্তানে থাকবেন। সঙ্গীদের সঙ্গে যেয়ে দাঁড়ান। পুলিশ তাকে পাকড়াও করে ওপাশে নিয়ে যেতে চায়। তিনি সীমান্তের মধ্যবর্তী স্থান ছেড়ে আর যাবেন না। যেহেতু তিনি ক্ষতিকর ছিলেন না, তাই তাকে সেখানে রাখা হলো। ভোরে সূর্যোদয়ে সময় আর্তচিৎকার শুনে সবাই দৌড়ে যায়। বসন সিং নো ম্যান্স ল্যান্ডে হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছেন। যে মানুষটা গত ১৫ বছর নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে ছিলো, এবার তিনি মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে আছেন। ‘কাঁটাতারের ঘেরার এপাশে হিন্দুস্থান, ওপারে পাকিস্তান। মাঝখানে নাম-গোত্রহীন এলাকার ওপর টোবাটেক সিংয়ের মরদেহ পড়ে আছে।’
দেশ বিভাজনের পাগলামি নিয়ে মান্টোর এই লেখা বসন সিংকে কি জাগাতে পারবে? যারা নিজেদের খোদা বলে মনে করে, তারা কি কোনো দিন তাদের ভুল শোধরানোর চেষ্টা করবে?
পৃথিবীর নানা প্রান্তে মান্টো নিয়ে যে কাজ শুরু হয়েছে নন্দিতা দাসের কাজটি নিশ্চয় তার ভিতর গুরুত্বপূর্ণ। তবুও চলচ্চিত্রটি দেখতে দেখতে যে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়, তার আলোচনা জরুরি হয়ে পড়ে। এ প্রসঙ্গে শাবানা আনসারির লেখা ‘একশো বছর পর আজও মান্টো কেন জরুরি’ থেকে উদ্ধৃতি দেওয়া চলে--‘সম্প্রতি লেখকের কাজ নিয়ে নতুন নাটক মঞ্চায়নের রূপরেখা নিয়ে আলোচনা করতে লাহোরে মান্টোর তিন কন্যার সাথে আলোচনায় বসেন নাসিরুদ্দিন শাহ। তিনি আয়েশা জালালের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, পাকিস্তানে মান্টোর মতো একজন উর্দু লেখকের মদে ডুবে যাওয়ার কাহিনির পেছনে রয়েছে এক করুণ উপাখ্যান। তিনি মান্টোর নিষ্কলঙ্ক হৃদয়ে সাত বছরের নরক যন্ত্রণার বর্ণনা দেন। এ সাত বছরে মান্টোর শোক ও যন্ত্রণা সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল।’ সেই শোক ও যন্ত্রণা কি নন্দিতার মান্টো ধারণ করে? করে। কিন্তু তার উপস্থাপনা আমাদেরকে নিয়ে যায় নতুন ভাবনায়। নতুন ইতিহাসের সন্ধানে। আমরা জানি, এ দেশে মুসলিম শাসকেরা ঢুকেছে ৭১২ খ্রিস্টাব্দে মীর কাসিমের তরবারির জোরে। এটা কিন্তু রাজনৈতিক প্রবেশ। ধর্মীয় প্রবেশ ইসলামের ঊষালগ্নে। ৬২৯ খ্রিস্টাব্দে। নমুনা, কেরালায় চেরামান জামে মসজিদ (ভারতের প্রথম মসজিদ)। মুসলিম শাসকদের সঙ্গে বহু পীর আউলিয়া এখানে আসে এবং ধর্ম প্রচার করে। একদিকে ধর্মীয় উদারতা অন্যদিকে সাধারণ মানুষ বর্ণবাদের সামাজিক নিষ্পেষণ ও রাষ্ট্রীয় রাজন্যবর্গের শোষণ মুক্তির রাস্তা হিসেবে প্রসারমান ইসলাম ধর্মকে গ্রহণ করেছিলো। ভারতে ইসলাম ছিলো প্রগতিশীল ও মানবতাবাদী। ভারতের বাস্তবতায় মুসলিমদের পৃথক রাষ্ট্র দাবির কোনো প্রয়োজন ছিলো না। বৃটিশ-ভারতে শাসকদের উস্কানিতে ও বর্ণবাদী হিন্দু নেতৃত্বে সাম্প্রদায়িকতা ছড়িয়ে পড়েছিলো। বিশ্লেষণে বলা যায়, ভারত ভাগের বাস্তবতা তৈরি করেছিলো বর্ণবাদী হিন্দু নেতৃত্ব; এবং পরিস্থিতির কারণে মুসলমান নেতৃত্ব (মুসলিম লীগ) এই দাবিতে মাঠে নামতে বাধ্য হয়েছিলো। তখনকার পরিস্থিতি এতোটাই নাজুক ছিলো যে, নিম্নবর্গের হিন্দুরা আলাদা রাষ্ট্রের দাবি করলে তা অতি স্বাভাবিক হতো। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হকসহ অনেক মুসলিম নেতৃত্ব একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র নির্মাণে সচেষ্ট ছিলেন। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৫ আগস্ট জিন্নাহর বক্তৃতাও স্মরণযোগ্য--‘আমরা আজ হতে কেউ মুসলমান না কেউ হিন্দু না, আমরা সবাই পাকিস্তানি।’ ঘটনাক্রমে, পিউরিটার্নিজম পাকিস্তানকে গ্রাস করেছিলো। রাজনৈতিক সঙ্কীর্ণতায় সাম্রাজ্যবাদ নির্ভরতার কারণে সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র পরিণত করেছিলো একটি গণবিরোধী সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে।
প্রকৃতপক্ষে, হিংসা এতোদূর পর্যন্ত ছড়িয়েছিলো যে, শেষ পর্যন্ত অহিংস আন্দোলনের পথিকৃৎ মহাত্মা গান্ধীর মতো সর্বাঙ্গীন হিন্দু নেতা--যিনি জীবদ্দশায় পরমাত্মা ও দেবতা হয়ে উঠেছিলেন--হিন্দুত্ববাদী দলের লোকজন তাকে হত্যা করতেও পিছপা হয়নি। নন্দিতা এ কথা স্বীকার করার পরেও চিত্রায়ণ করলেন এমন সব গল্প যাতে দর্শক ভেবেই নেবে ভারত বিভক্তির কারণ হলো মুসলমানরা। তিনি ফলাফল দেখালেন, কারণ দেখালেন না। মান্টোয় যতোগুলো দাঙ্গার দৃশ্য দেখা গেলো, সবই মুসলিম তলোয়ারবাজদের নেতৃত্বে। অশোক কুমার, শ্যাম এমনকি মান্টোও এ সমস্যা মোকাবিলা করলেন। ইংরেজদের ষড়যন্ত্র আড়ালেই রয়ে গেলো। আমাদের পরিচিত নন্দিতার এই অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের কোনো ব্যাখ্যা জানা নেই। তবে বি জে পি’র উত্থানের সঙ্গে এর দূরবর্তী সম্পর্ককে কষ্ট-কল্পের প্রকল্প বলে যদি কেউ ধরে নেয়, তাকে দোষ দেওয়া যাবে না।
মান্টো কেনো স্বদেশ মুম্বাই ছেড়ে পাকিস্তানের লাহোরে গেলেন? ধর্মীয় কারণে? নিশ্চয় না। জন্মসূত্রে মুসলিম হলেও তিনি অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ ছিলেন। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়লে তিনি চেয়েছিলেন একটি অসাম্প্রদায়িক জনকল্যাণকামী রাষ্ট্র। উর্দু লেখক হিসেবে তিনি উর্দু ভাষার একটি নিরাপদ জনপদ চাইতেই পারেন। উর্দু, পাসতালিক ও হিন্দি দেব-নাগরি ভাষায় লেখা হলেও, শব্দ, অর্থ ও বাক্যগঠন প্রায় কাছাকাছি। ‘মান্টো কা মজামিন’ গ্রন্থে মান্টো ‘হিন্দি না উর্দু’ এই শিরোনামে লিখেছেন--‘হিন্দি হিন্দুদের আর উর্দু মুসলমানের ভাষা এভাবে দেখাটা ভুল। মানুষের প্রয়োজনে যে ভাষার জন্ম হয়েছে তার বিনাশ হয় না।’ তিনি উর্দু ভাষাকে ভালোবাসতেন, লিখতেন এবং তাই তার ভবিষ্যতের ওপর দেশ বিভাগের সুদূরপ্রসারী প্রভাবের কথা ভেবেছিলেন। পাকিস্তান যদি সাম্রাজ্যবাদের পৃষ্ঠপোষকতা মুক্ত হতো, পিউরিটার্নিজম মুক্ত হতো, মানুষের সত্যিকার আবাস হয়ে উঠতো, তবে আমরা অন্য এক মান্টোকে পেতে পারতাম। উর্দু ভাষা নিয়ে মান্টোর ভাবনা নন্দিতা আমলে আনলেন না। নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে এড়িয়ে তিনি একপেশে হয়ে গেলেন; দর্শককে বেশ বিপদের মধ্যে ঠেলে দিলেন; রাষ্ট্র সীমানার বিপরীতে দাঁড়িয়ে এক বিশ্বের লড়াইয়ে হয়ে গেলেন অবিশ্বস্ত।
নয়.
শুরুতে বলেছিলাম, মান্টোর ট্রাজেডি ভারতের ঐতিহাসিক ট্রাজেডি। ভারতের ইতিহাস পর্যালোচনা থেকে দেখা যায়, ১৬১৫ খ্রিস্টাব্দে বৃটিশ ব্যবসা-বাণিজ্যের কারণে অন্যান্য ইউরোপিয়ানদের মতো ভারতে প্রবেশ করে। মোঘল সম্রাটের আনুকূল্যে তারা তাদের ব্যবসার দ্রুত বিস্তার ঘটায়। ১৬৯৩ খ্রিস্টাব্দে পত্তনী নেয় বাংলা মুল্লুকে। সমুদ্রপাড়ের তিন গ্রামের একটি জায়গা--কলিকাতা, সুতানুটি ও গোবিন্দপুর, যা আজকের কলকাতা। ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধে এ দেশীয় বিত্তবানদের সহযোগিতায় ও কৌশলে নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে পরাজিত করে এবং কার্যত এরপর তারা আর পিছন ফিরে তাকায়নি। কালক্রমে বাংলাসহ সমগ্র ভারতবর্ষের শাসনভার তারা দখল করে নেয়। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে সিপাই বিদ্রোহ দমনের মাধ্যমে তারা দিল্লির মসনদ থেকে শেষ মোঘল সম্রাট বাহাদুর শাহকে উৎখাত করে। অবশ্য শুরু থেকেই স্বাধীনতার সংগ্রাম চলতে থাকে। ইংরেজরা তা দমন করেছে সিদ্ধহস্তে। বহু নির্মম নিষ্ঠুরতার ভিতর দিয়ে তাদের শোষণ-শাসন চালিয়ে গিয়েছে। বহুধা বিভক্ত ভারতকে একত্র করে আধুনিক প্রশাসনিক শাসন দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছে শোষণের শক্তিশালী রাষ্ট্র। শাসন করে প্রায় দুশো বছর। ১৭৫৭ থেকে ১৯৪৭।
বৃটিশ ভারতের সাম্রাজ্যবাদী শাসন কাজ পরিচালনার স্বার্থে প্রথম থেকে তারা নানা কৌশলের আশ্রয় নেয়। দেশব্যাপী ইংরেজ-বিরোধী মনোভাবের বিস্তৃতি থাকলেও অনুগত বিশ্বাস ঘাতকদের খুঁজে পেতে তাদের বেগ পেতে হয়নি। শাসন কাজ পরিচালনার স্বার্থে ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠার পর তারা এ দেশীয় শিক্ষিত চাকুরে তৈরির কাজে মনোনিবেশ করে। এই শিক্ষিতরা হবে অবয়বে ভারতীয় আর মনেপ্রাণে ইংরেজ। ফলে জন্ম লাভ করে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির। এদিকে ১৮৪০-এর দিকে কলকাতায় ‘বৃটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন’ ও ‘বোম্বাই প্রেসিডেন্সি অ্যাসোসিয়েশন’ সক্রিয় হয়। এ ধরনের সংগঠন ধীরে ধীরে বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে উঠতে থাকে। মূলত এরা ধনিক, বণিক, মুৎসুদ্দি, বুর্জোয়া ও জমিদার শ্রেণিজাত উচ্চস্তরের বুদ্ধিজীবীদের স্বার্থ রক্ষা করতো। এই শ্রেণি একদিকে সুবিধা আদায়ে নানান ফন্দিফিকিরে ব্যস্ত থাকে, অন্যদিকে শাসন ক্ষমতাকে নির্বিঘ্ন রাখার জন্য রাজনীতি শুরু করে।
১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে মিউনিসিপাল পরিষদের অধিকাংশ সদস্য বিত্তশালীদের ঊর্ধ্বতন ও ইংরেজ অনুগতদের দিয়ে পূর্ণ করা হয়। এই সময় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘আনন্দ মঠ’-এ লিখলেন বন্দে মাতারাম। ১৮৮৩-১৮৮৪ তে জাতীয়তাবাদীদের একটি সর্বভারতীয় সংগঠন তৈরির প্রথম উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। অ্যালান হিউম-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এ দেশের সংগ্রাম গণসংগ্রামে রূপান্তর হতে পারে এবং তা ক্রমান্বয়ে বামপন্থিদের হাতে চলে যেতে পারে। বিষয়টি তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড ডাফলিন আমলে আনেন। শেষ পর্যন্ত ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে মুম্বাইয়ে জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম সম্মেলন আহ্বান করা হয় এবং সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয় হিউমকে। এই রাজনীতিতে আপামর জনসাধারণকে সম্পৃক্ত করার জন্য জাতীয়তাবাদী ফরমুলা আমদানি করা হয়। ভারতীয় জাতীয়তাবাদের নামে প্রথমে একটি ভারতীয় জাতি প্রকল্প তৈরি করা হয়। যদিও গোটা বিষয়টি ধার করা, তবুও তা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের নেতৃত্বে ও বৃটিশ অভিভাবকত্বে ভালোই কল্কে পায়।
১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে তিলকের উদ্যোগে হিন্দুদের দেবতা গণেশ ও মারাঠাদের জাতীয় বীর শিবাজীর সম্মানে গণউৎসব আয়োজন হয়। এর ভিতর দিয়ে সশস্ত্র আন্দোলন গড়ে ওঠে। গড়ে ওঠে জননী জন্মভূমি স্বর্গাদপী গরিয়সী স্লোগান দিয়ে ‘অনুশীলন সমিতি’ ও ‘যুগান্তর গোষ্ঠী’। চরমপন্থি নেতাদের মধ্যে লালা রাজপথ রাই, বাল গঙ্গাধর তিলক, বিপিন চন্দ্র পাল ও অরবিন্দ ঘোষসহ আরো অনেকে এতে বিশেষ অবদান রাখে। তারা স্বাধীনতাকে কেন্দ্র করে প্রথম স্বরাজের দাবি তোলে। অন্যদিকে ১৮৭০-এর পর ইংরেজ পৃষ্ঠপোষকতায় মুসলিম সংস্কৃতির বিকাশ সাধিত হতে থাকে। আলীগড় ও দেওবন্দ কেন্দ্রিক মুসলিম শিক্ষা সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে ওঠে। বলা বাহুল্য, এই শিক্ষিত মুসলিমরাও ইংরেজদের অনুগত ছিলো। ফলে বৃটিশ পলিসি, ‘ডিভাইড এন্ড রুল’ বাস্তবায়ন হয় সফলতার সঙ্গে।
১৯০৬ খ্রিস্টাব্দের শরতে কলকাতায় জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে সভাপতি পদে চরমপন্থিদের প্রার্থী তিলকের নাম প্রস্তাবিত হলেও নির্বাচন এড়াতে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের অবিসংবাদিত নেতা দাদাভাই নওরোজীকে অধিষ্ঠিত করা হয়। তবে এই অধিবেশনে স্বরাজের দাবি উত্থাপিত হয়। বৃটিশ ভারতের সব মানুষকে এক জাতি করতে যেয়ে উপমহাদেশের নানান জাতিগোষ্ঠীকে অবজ্ঞা ও অস্বীকার করা হয়। সেই গ্রামভিত্তিক কৌম সভ্যতাকে ভুলে গিয়ে উচ্ছেদ করা হয় এলাকার বৈচিত্র্যকে। ৭০০-৩০০ খ্রিস্টপূর্ব সময়ে গড়ে ওঠা ষোড়শ মহাজনপদ ও গণমানুষের যে অহিংস নিস্তরঙ্গ জীবন প্রবাহ তাতে জীবনমুখী আন্দোলনের বিপরীতে অবাস্তবতা ও অসত্য দিয়ে ডগমা তৈরি করা হয়। শিক্ষা বিস্তারের বৃটিশ কৌশলকে কাজে লাগিয়ে ছড়িয়ে দেওয়া হয় উগ্র জাতীয়তাবাদ। যার জন্য মানুষ অনায়াসে জীবন বাজি রাখতে পারে; নেতা ও রাজনীতির জন্য জীবন দান করতে পারে, তেমন রূপকল্প তৈরি করে ঔপনিবেশিক শাসন উচ্ছেদের স্বপ্ন ছড়ানো হয়। মানুষের ভাত, কাপড়, বাড়িঘর কিছু চাইনে, চাই স্বরাজ। কিন্তু ‘ক্ষুধাতুর শিশু চায় না স্বরাজ, চায় একমুঠো ভাত একটু নুন।’
দশ.
গড়ে উঠলো ভারতীয় জাতীয়তাবাদ। ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আমদানি করা হলো মোহন দাস করম চাঁদ গান্ধীকে। যিনি মহাত্মা গান্ধীতে রূপান্তরিত হলেন। ক্রমান্বয়ে ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলন দানা বেঁধে উঠলো। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিশ্ব বাস্তবতায় বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদেরও দিন ফুরিয়ে আসছিলো। ভারত ছাড় আন্দোলনের ভিতর দিয়ে স্বাধীন ভারতের জন্ম হলেও তা সাধারণের জন্য এক অভিশাপ হিসেবে দেখা দেয়।
উগ্র জাতীয়তাবাদ ইতোমধ্যে উগ্র সাম্প্রদায়িকতায় রূপান্তরিত হয়। বহুজাতিক গণতন্ত্রের মাধ্যমে অবিভক্ত ভারতের পরিবর্তে ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ করা হয়। ঘটনাক্রমে আগস্ট ১৯৪৭, বৃটিশ স্বাধীনতার স্বীকৃতি দেয়। লন্ডনে গোলটেবিল বৈঠকসহ কয়েকবার সভায় বসে কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হতে না পারলেও, তারা দেশ বিভাজনে র্যাডক্লিফ কমিশন গঠন করে। র্যাডক্লিফ সাহেব মানচিত্রের উপর লাল কালির দাগ দিয়ে বিভাজন রেখা টেনে দেন। অবশেষে বৃটিশ ভারত দুই ভাগে ভাগ হয়। হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠের জন্য হিন্দুস্তান এবং একইভাবে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠের জন্য পাকিস্তান। রাজনীতির ঝাণ্ডাধারীরা ও ইংরেজরা জানতো, জনগণ সহজে তার পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে অন্য কোথাও যাবে না। এমনকি বেহেশতেও না। বাঁধিয়ে দেওয়া হলো হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা। বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হলো। সব চাইতে মারাত্মক রূপ নিলো অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে সব চাইতে বিকশিত দুই রাজ্যে--পাঞ্জাব ও বাংলায়। এক রাতে খুন হয়ে গেলো দুই লাখ মানুষ। ভিটে ছাড়া, দেশ ছাড়া হলো দুই কোটির বেশি।
মান্টো এই দুই কোটি মানুষের একজন। তার দ্রোহ কান্না ব্যথাতুর হৃদয় সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়েছে। মানুষ এই দানবীয় রাষ্ট্র যন্ত্রের শোষণ থেকে মুক্তি চায়। চায় একটা মুক্ত বিশ্ব। বিশ্বায়নের নামে যে পুঁজিবাদের মুক্ত বাজার অর্থনীতি চালু হয়েছে, তার বিপরীতে শ্রমিকদের জন্য চাই সীমানা মুক্ত শ্রম বাজার। মানুষের জন্য চাই রাষ্ট্রীয় বেড়াজাল মুক্ত পৃথিবী। ‘সিয়া হাসিয়ে’ (কালো সীমানা) থেকে নেওয়া মান্টোর একটা গল্প দিয়ে শেষ করতে চাই,
আগুন লাগল যখন, সারা মহল্লা জ্বলে ছাই হলো ... কেবল একটা দোকান বেঁচে গেল, সেই দোকানের ওপর সাইনবোর্ড তখনো পড়া যাচ্ছিল ...
‘এখানে বাড়ি বানানোর মাল-সামাল পাওয়া যায়।’
পৃথিবীর মানুষ এখন মান্টোর সেই দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
লেখক : ফারুক আলম, সাহিত্যিক ও ছড়াকার। তিনি খুলনায় একটি কলেজে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য পড়ান। তার প্রকাশিত ছড়ার বই ‘গোলাপ-কাঁটা’।
falamsmc@gmail.com
পাঠ সহায়িকা
১. আন্তোনভা, কোকা, বোন্গার্দ-লেভিন, গ্রিগোরি ও অন্যান্য (১৯৮২);ভারতবর্ষের ইতিহাস; অনুবাদ : মঙ্গলাচরণ চট্টপাধ্যায়, দ্বিজেন শর্মা; প্রগতি প্রকাশন, মস্কো।
২. মান্টো, সাদত হাসান (২০১৯);কালো সীমানা; অনুবাদ : জাভেদ হুসেন; প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা।
৩. মান্টো, সাদত হাসান (২০১৫); টোবাটেক সিং ও অন্যান্য গল্প; অনুবাদ : জাফর আলম; প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা।
4. https://www.youtube.com/watch?v=OC7sWWC4-B8; retrieved on: 20.05.2019
5. https://www.youtube.com/watch?v=UHC1Clrlg1w; retrieved on: 22.05.2019
6. https://www.youtube.com/watch?v=Kq8uzGmroyI; retrieved on: 24.05.2019
7. https://www.youtube.com/watch?v=6qUXbZif9es; retrieved on: 25.05.2019
8. https://www.youtube.com/watch?v=LAK_a61fw_0; retrieved on: 30.05.2019
বি:দ্র: প্রবন্ধটি জুলাই-২০১৯ (১৭ সংখ্যা) ম্যাজিক লণ্ঠন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন