Magic Lanthon

               

সুশান্ত সিনহা

প্রকাশিত ০১ জুলাই ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

ভুল আর অসঙ্গতিতে ভরা দেবী

সুশান্ত সিনহা

 

‘দেবীর আবির্ভাব’

মাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্র অত্যন্ত শক্তিশালী। এবং শ্রেণি-পেশা-বয়স-জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে বৃহত্তর পরিসরের সবার কাছে, প্রযুক্তির বদৌলতে একদম ঘরের ভিতরে পৌঁছানোর এর চেয়ে কার্যকরী মাধ্যম আর একটিও নেই। তাইতো যুগের পর যুগ দেশে দেশে বই-পুস্তকের পাশাপাশি চলচ্চিত্রও সমাজের অগ্রসর বাহক হিসেবে কাজ করে আসছে। শিক্ষা, সাহিত্য, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি, রাজনৈতিক চিন্তাগুলো ছড়িয়ে দিতে এর জুড়ি মেলা ভার। চলচ্চিত্র এতোটাই শক্তিশালী মাধ্যম যে, ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির হওয়ার পরও শৈল্পিক উপস্থাপন আর নান্দনিক শব্দ-ছবির বিন্যাসে দর্শক এতে বুঁদ হয়ে থাকে। চলচ্চিত্রের ভাষা এতোটাই শক্তিশালী যে, যুগ পেরোলেও তার আকর্ষণে চোখ ফেরানো যায় না। অনেকটা মাধ্যাকর্ষণ শক্তির মতো প্রবল শক্তিতে সব বয়সি মানুষকে আটকে রাখার ক্ষমতা রাখে চলচ্চিত্র। দেশ বা সংস্কৃতি সম্পর্কে জানা-বোঝাসহ প্রত্যেক যুগের বার্তাবাহক বলা যায় এটাকে। তাইতো ‘ভালো’ চলচ্চিত্র দেশ-কালের সীমানা-গণ্ডি পেরিয়ে ঢুকে পড়ে ভিনদেশে। আলোড়িত করে নতুনকে।

   বাংলাদেশেও চলচ্চিত্রের একটা সুবর্ণ সময় ছিলো। কিন্তু রাষ্ট্রীয় অবহেলা, চলচ্চিত্র শিক্ষার অভাব, ভালো কাহিনির আলোকে চিত্রনাট্য তৈরি না করা ও নির্মাণগত দুর্বলতা, দেহসর্বস্ব নাচগান, স্থূলতা আর যৌন সুড়সুড়িমূলক উপস্থাপন, সর্বোপরি এফ ডি সি চত্বরকেন্দ্রিক চলচ্চিত্র নির্মাণের কারণে খাদের কিনারায় পৌঁছে গেছে দেশীয় এই মাধ্যমটি। দর্শক মুখ ফিরিয়ে নেওয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে সারাদেশের শত শত প্রেক্ষাগৃহ। হাল আমলে সেই ‘শূন্যতা’ পূরণের অংশ হিসেবে ‘সিনেপ্লেক্স’-কেন্দ্রিক বেশকিছু চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়েছে এবং হচ্ছে। যদিও এসব চলচ্চিত্রের মূল লক্ষ্য দেশের আপামর সাধারণ মানুষ নয়, মধ্যবিত্ত, উচ্চ-মধ্যবিত্ত ও বিত্তশালী মানুষ। তাদের চাওয়া-পাওয়া আর পছন্দ-অপছন্দকেন্দ্রিক ‘সিনেপ্লেক্স চলচ্চিত্রের’ সংখ্যা বাড়ছে। এর মধ্যে অনেকগুলো দেশ-বিদেশে বেশ দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছে। কয়েকটি রীতিমতো ব্যবসাসফলও হয়েছে। যার সবশেষ উদাহরণ দেবী । সাম্প্রতিককালে সিনেপ্লেক্সগুলোতে রমরমা ব্যবসা করেছে এমন চলচ্চিত্রের অন্যতম অনম বিশ্বাসের দেবী

   সরকারি অনুদানে নির্মিত এই চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য অভিনয়শিল্পী ও এর প্রযোজক জয়া আহসান পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। চলচ্চিত্রে জয়ার অভিনয়, শব্দব্যবস্থাপনা ও সঙ্গীত নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। তবে হুমায়ূন আহমেদের ‘মিসির আলি’র কাহিনিকে উপজীব্য করে নির্মিত দেবী শিল্পের গুণে-মানে কতোটা চলচ্চিত্র হয়ে উঠেছে তা বিশ্লেষণের উদ্দেশ্যেই এই লেখা। তবে ভুল ধরার উদ্দেশ্যে নয়, বরং শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে নতুন ধারার বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের অগ্রযাত্রার পথকে ত্রুটিমুক্ত করে এগিয়ে নেওয়ার জন্য এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা।

এক লাফে দুইশো ৬১ বছর!

চলচ্চিত্রের সঙ্গে সময়ের সম্পর্কটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জোরালো। ভূমিকার সংক্ষিপ্ত আলোচনায় আগেই উল্লেখ করা হয়েছে কীভাবে একেকটি সময়, ঐতিহাসিক ঘটনা, সমাজ-সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করে চলচ্চিত্র। একটা নির্দিষ্ট গল্প-কাহিনি বা ঘটনাকেন্দ্রিক চিত্রনাট্য নিয়ে নির্মাতারা চলচ্চিত্র নির্মাণ করে ওই সময়ের আর্থসামাজিক অবস্থার আলোকে। একেকটি দৃশ্য ও ঘটনার সঙ্গে পরের দৃশ্যগুলোর সম্পর্ক থাকে; তাই বিচ্ছিন্ন, বিক্ষিপ্তভাবে কোনো দৃশ্য উপস্থাপনের সুযোগ নেই। কোনো যোগসূত্র ছাড়া কিছু দেখানো হলে চলচ্চিত্র তার স্বকীয়তা হারায়। ক্যামেরার কাজ, শব্দশৈলী, অভিনয় যতোই শক্তিশালী হোক না কেনো, তা যদি দর্শকের কাছে স্পষ্ট না হয়, চলচ্চিত্র ‘সার্থকতা’ পায় না। প্রতিটি দৃশ্যে সবকিছুই যে দেখানো হবে এমন নয়, কিন্তু এমনভাবে চিত্রায়ণ ও উপস্থাপন করতে হয়, যাতে ‘না বলা কথাগুলোও’ অনুধাবন করতে পারে দর্শক।

এক অর্থে চলচ্চিত্র নির্মিত বাস্তবতা। যেখানে বাস্তবতাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে হয়। তেমনই এক লাফে একশো বা দুশো বছর আগের বা পরের অবস্থায় যেতে হলেও অনেক পট পরিবর্তনের বিষয়টি মাথায় না রাখলেই নয়। হ্যাঁ, নির্মাতা চাইলে দেখাতেই পারেন, কিন্তু তাতে জোড়াতালি ছাড়া আর কিছু হবে না। বিচ্ছিন্ন, বিক্ষিপ্ত কিছু চলন্ত ছবি মানেই চলচ্চিত্র নয়। দেবীর নির্মাতা অনম বিশ্বাস কিন্তু এক লাফে হিমালয় পর্বত ডিঙ্গানোর মতো ১৭৫৭ থেকে ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে পৌঁছে গেছেন। মহাঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবের মতো এক শটে অতিক্রম দুইশো ৬১ বছর! সেই সঙ্গে ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে মানুষ বলি দেওয়ার দৃশ্য দেখানোর মাধ্যমে কী বোঝাতে চেয়েছেন নির্মাতা, সেই প্রশ্নও থেকে যায়।

   আবার বলি দেওয়ার ক্ষেত্রেও উপস্থাপনগত দুর্বলতা চোখে পড়ে। প্রথমত যাকে বলি দেওয়া হচ্ছে--তা মানুষ বা প্রাণী যাই হোক না কেনো--সানন্দে নিশ্চয় গলা বলির মঞ্চে দিয়ে রাখবে না। সাধারণত বলি কাষ্ঠে মাথা ঢোকানোর পর কাঠ বা শিক দিয়ে তা আটকে দেওয়া হয়, যাতে মাথা সরিয়ে নিতে না পারে। কিংবা মানুষজন বলি দেওয়া প্রাণীটিকে ধরে রাখে। কিন্তু দেবীতে দেখা যায়, যিনি বলি দিতে বিশাল রামদা তুলেছেন, তিনিই মেয়েটির পিঠে পা দিয়ে চেপে ধরে আছেন। অর্থাৎ এক পায়ে দাঁড়িয়ে অন্য পায়ে বলির বস্তুর উপর পা রেখে বলি দিতে গেলে নিজেরই দ্বিখণ্ডিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বলি আর বটি দিয়ে মাছ কাটাকুটি যে এক জিনিস নয়, সেটাও হয়তো ভুলে গেছেন নির্মাতা। ‘ন্যাশনাল জিওগ্রাফি’র ‘সায়েন্স অব স্টুপিড’ নামে বাংলা অনুষ্ঠান দেখলেও অন্তত তিনি এই ভুলটা এড়াতে পারতেন। একটু ভালোভাবে খেয়াল করলেই এ রকম নানা ভুল, অসঙ্গতি এবং দৃশ্যের ধারাবাহিক পরম্পরার ব্যত্যয় দেবীতে চোখে পড়ে। এছাড়া দেবতার উদ্দেশে উৎসর্গকৃত কোনো প্রাণীকে বলি দেওয়ার সময় এভাবে তার উপর পা তুলে চেপে ধরা যথাযথ কি না তা নিয়েও প্রশ্ন আছে!

   নির্মাতা কঠিন-কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে চলচ্চিত্রের প্রতিটি শট্ সাজিয়ে তোলেন, যতোটা সম্ভব নির্ভুলভাবে। কেননা একজন নির্মাতার পরিশ্রমের ওপরই নির্ভর করে তার সৃষ্টির গুণ-মান। তাই শুধু ‘স্টুডিয়ো ফ্লোরের মধ্যে চেয়ারে বসে স্টার্ট আর কাট বলে ছবি করা যায় না। বাইরে বেরুতে হবে সব বাধা দূর করে। বিভিন্ন ছবিতে বিভিন্নভাবে প্রকৃতি আর মানুষকে ধরতে হবে। চাই ক্লান্তিহীন পরিশ্রম। অটুট স্বাস্থ্য। সতেজ মন।’

পরিশ্রম না করে শর্টকাট মেথডে যেনোতেনোভাবে শেষ করলে অবয়বে চলচ্চিত্র হবে ঠিকই, কিন্তু তাতে অসংখ্য ভুল আর অসঙ্গতি ঢুকে পড়ার আশঙ্কা থাকে। দেবীজুড়েই এমন সমস্যা চোখে পড়েছে। যেমন, দেবীর শুরুতে মন্দিরে দেবীর যে মূর্তি দেখানো হয় তার মুখাবয়বটা দেবী দূর্গার মতো মনে হয়েছে। যদিও চলচ্চিত্রের একেবারে শেষ দিকে মিসির আলি রানুকে বলেন, ‘পুরানো মন্দিরটা ছিলো বিষ্ণু মন্দির।’ বিষ্ণু দেবতা হলে দেবীর মূর্তি দেখানো হলো কেনো? হ্যাঁ, নামকরণের সার্থকতায় যদি দেবী রাখতে হয়, তাহলে শেষে বিষ্ণু মন্দির বলার দরকার ছিলো কি? বাংলাদেশসহ বাংলা ভাষাভাষী সনাতন ধর্মাবলম্বীরা বিষ্ণুর পূজা করে। কিন্তু বিষ্ণুর কোনো মন্দির দেখা যায় না। যেমন নেই ব্রহ্মার মন্দিরও।

   চলচ্চিত্রের প্রতিটি অংশে কোন ধরনের ইমেজ, কেনো ব্যবহার হচ্ছে, তা সম্পর্কে তৎকালীন পরিপ্রেক্ষিত জানা জরুরি। একইভাবে সমাজ-বাস্তবতা সম্পর্কে, প্রচলিত রীতিনীতি-আচার-অনুষ্ঠান সম্পর্কে সম্যক ধারণা ছাড়া শিল্পসম্মত চলচ্চিত্র উপহার দেওয়া যায় না। আর একজন ভালো নির্মাতা মানে ভালো গবেষক; মানুষের সেন্টিমেন্ট নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তাকে পোশাক, সাজসজ্জাসহ সবকিছু সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকতে হয়। একই বিষয়ে আগে কোনো কথা থাকলে পরের কথাও একই সুরে ধ্বনিত হতে হয়। কিন্তু তার ব্যত্যয় ঘটেছে দেবীতে।

ভুলে ভরা সাইনবোর্ড

মাথা খাটানোর মতো পরিশ্রমটুকুর অভাব রয়েছে দেবীজুড়ে। ঘরে কমোড বসানো নিয়ে মিসির আলি ও কমোড মিস্ত্রির কথাবার্তা হয়। ঠিক এ সময় মিসির আলিকে খুঁজতে তার ডেরায় ঠিকানা লেখা সম্বলিত কাগজ নিয়ে হাজির হন রানুর স্বামী আনিস। কাগজটি চেয়ে নিয়ে মিসির আলি ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন এবং খানিক দূরের একটি আয়ুর্বেদিক ওষুধের দোকান দেখিয়ে ওখানে যাওয়ার পরামর্শ দেন আনিসকে। কেনো তিনি নিজের নাম-ঠিকানা গোপন করলেন, সেই প্রশ্নের উত্তর কমোড মিস্ত্রির মতোই দর্শকও পায় না।

   পরের দৃশ্যে দেখা যায়, ঠিকানা নিয়ে ওই দোকানে আনিস হাজির। সাইনবোর্ডে লেখা ‘মঘা ইউনানী ওষুদালয়, বেগুনবাড়ী, তেজগাও, ঢাকা-১২০৭।’ লাল সাইনবোর্ডে লেখা সাতটি শব্দের মধ্যে রয়েছে বানান ভুলসহ বিভ্রান্তিকর তথ্য। বাংলাদেশজুড়েই দেখা মেলে বিভিন্ন নামে ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক ঔষধালয়। কিন্তু চলচ্চিত্রে দেখানো সাইনবোর্ডে লেখা হয়েছে ‘ওষুদালয়’। ব্যঙ্গ অথবা হাস্যরসের জন্যই কি ঔষধালয়ের মতো পরিচিত শব্দের এমন বানান লেখা হয়েছে? নাকি একটি মাত্র শট্ দেখানো হবে তাই ‘গুরুত্বহীনভাবে’ তা উপস্থাপন করা হয়েছে। এক্ষেত্রে নির্মাতার উদাসীনতাই প্রকাশ পেয়েছে। কারণ গুরুত্বপূর্ণ বানান ভুলের পাশাপাশি ওই সাইনবোর্ডের ঠিকানায় দেখানো ‘তেজগাও, ঢাকা-১২০৭’ তথ্যটিও সঠিক নয়। পোস্টাল কোড অনুযায়ী, ঢাকা-১২০৭ হলো মোহাম্মদপুর এলাকা। তেজগাঁও শিল্প এলাকার পোস্টাল কোড ১২০৮ এবং তেজগাঁও টি এস ও’র কোড ১২১৫। তাহলে কী বেগুনবাড়ির অবস্থান মোহাম্মদপুরে!

   আর যদি তেজগাঁওয়ে হয়, তাহলে মোহাম্মদপুরের পোস্টাল কোড কেনো ব্যবহার করা হলো? নির্ভুল ঠিকানার জন্য দেশ-বিদেশে সবখানেই পোস্টাল কোড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তা উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক। কোড দেখে উদ্ধার করা হয় কোন এলাকায় এটা। তাই কোড ভুল করার কোনো সুযোগ নেই। আজকের দিনে ইন্টারনেটে খোঁজ করলে ২০ সেকেন্ডেই পাওয়া যায় কোন এলাকার কোড কতো বা ব্যবহৃত তথ্যটি ঠিক আছে কি না। কিন্তু তা খতিয়ে দেখা হয়নি। ফলে মারাত্মক এই ভুল তথ্যটি দেশ-বিদেশে মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে।

এখানেই শেষ হলে ভালো হতো। ‘মঘা ইউনানী ওষুদালয়ে’ দোকানের সহকারীর পিছনে একটি পর্দা দেখা যায়। অথচ আনিসের চলে যাওয়ার সময় দোকানের সহকারী আগের জায়গায় বসে থাকলেও পর্দাটা আর দেখা যায় না। অর্থাৎ এখানেও জোড়াতালি দিয়ে শেষ পর্যন্ত মেলাতে পারেননি নির্মাতা। শুধু চলে যাওয়ার সময় নয়, দোকানে আনিস প্রবেশের সময়কার লঙ শটেও পর্দা চোখে পড়ে না। মাঝখানে পর্দার আবির্ভাব ঘটেছে হয়তো সিনেমাটোগ্রাফারের প্রয়োজনে। ক্যামেরা ফ্রেম ঠিক রাখতে গিয়ে হয়তো পিছনের কিছু একটা ঢাকার বা আড়াল করার উপায় হিসেবে পর্দা জুড়ে দিয়েছেন নির্মাতা। দোকানে প্রবেশ ও বের হওয়ার শটে যে সেটা নেই তা আর কেউই খেয়াল করেনি। একই দোকানে মাত্র ৫৫ সেকেন্ডের দৃশ্যে কেনো এতো বিভ্রান্তি! নির্মাতাই হয়তো এ নিয়ে ভালো বলতে পারবেন।

যৌন সুড়সুড়ি : আপনার কোনটা?

যৌন সুড়সুড়ি দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্মাতার আগ্রহের কমতি ছিলো না বলা যায়। এক্ষেত্রে বরং মনোযোগ একটু বেশিই চোখে পড়ে। বিষয়টা অনেকটা ‘ভাত দেওয়ার মুরোদ না থাকলেও কিল মারার গোঁসাই’-এর মতো মনে হয়েছে। কুসংস্কার, পশ্চাৎপদতা আর ধর্মান্ধতার কারণে যৌনরোগকে চিকিৎসকের কাছে আড়াল, গোপন করার প্রবণতা থাকে সমাজে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের সহায়তা নেওয়ার বদলে তথাকথিত লোকলজ্জার ভয় কাজ করে। ফলে যৌনরোগের বিষয়টি অন্য কারো সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে না বেশিরভাগ মানুষই। কিন্তু দেবীতে সচেতনভাবে সেই যৌন সুড়সুড়ি দেওয়া এবং তথাকথিত যৌনরোগের অপচিকিৎসার বিজ্ঞাপন করা হয়েছে অন্য রোগীর কথার মাধ্যমে। শুধু প্রশ্নেই শেষ নয়, যৌনরোগ সম্বলিত অত্যন্ত রগরগে লিফলেট দেখিয়ে দর্শকের সামনে তুলে ধরা হয়েছে বিষয়গুলো। ঘটনার পরম্পরায় এই দৃশ্য ও কথোপকথন কতোটা প্রয়োজন ছিলো তা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন।

   তবে দর্শক বিড়ম্বনায় পড়বে কি না সে বিষয়ে হয়তো নির্মাতার ভ্রুক্ষেপই ছিলো না। অবশ্য নির্মাতা দর্শককে মাথায় রেখে চলচ্চিত্র নির্মাণ করবেন কি না সেটা ভিন্ন বিষয়। তবে শিল্প তো মানুষের জন্যই। সেই বিচারেও ঘটনা জিইয়ে রেখে আরো রসালো করার চেষ্টা করা হয়েছে পরিকল্পিতভাবে। তাইতো নির্বিকার ও ভাবলেশহীন ‘ওষুদালয়’ থেকে পাওয়া চটুল লিফলেটটি বাড়ি বয়ে নিয়ে যান আনিস। এমনকি পরদিন তা অফিসে পর্যন্ত নিয়ে গিয়ে তার সহকর্মী আপেল সাহেবকে হাসতে হাসতে ফলাও করে দেখান। ফলে সচেতনভাবেই যে যৌন সুড়সুড়ি দিতে এসব বিষয় টেনে আনা হয়েছে তা বুঝতে মোটেও কষ্ট হয় না।

   দেবীর ৩৩ মিনিটে রানু তার শৈশবের ঘটনা মিসির আলিকে বলার সময়ও বার বার পায়জামা খোলার প্রসঙ্গ আসে। সেখানে কথা বলার সময় মিসির আলির এক বসাতেই তিন বার পায়জামা খোলার কথা বলেছেন। যতোবারই কথাটা শুনেছি ততোবারই ভীষণভাবে কানে লেগেছে। যেনো চলচ্চিত্রের মূল বিষয়ই ছিলো পায়জামা খোলার বিষয়টি! মনে হয়েছে বার বার বিষয়টি বলার মাধ্যমে দর্শককে যৌনতার মোহে আটকে রাখতে চেয়েছেন নির্মাতা। দর্শকের কাছে কল্পনায় নারীর নগ্ন শরীরকে তুলে ধরতেই কি এমন কৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন নির্মাতা? বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার পরও মিসির আলিও বেশ রসিয়ে রসিয়ে বলেছেন সেই কথাগুলো। চলচ্চিত্রে সব দৃশ্য হুবহু বলে বা ছবি দেখিয়ে বলতে হয় না। ক্যামেরা ও শব্দযন্ত্রের ব্যবহারের মাধ্যমে অনেক বিষয় না দেখিয়েও বোঝানো যায়। আর এটাই চলচ্চিত্রের ক্ষমতা।

   এছাড়া দেবীর শেষ দিকে যেভাবে মন্দির প্রাঙ্গণে জালাল উদ্দিনের হাতে রানুর শ্লীলতাহানি দেখানো হয়, তা কদর্যপূর্ণ ও রুচিহীন মনে হয়েছে। কারণ তা শিশু, বিশেষ করে মেয়েশিশুর ওপর শারীরিক নির্যাতনের বিষয়টিকে মুখরোচক করে তোলে। যা প্রকারান্তে শিশু নির্যাতনের সামিল। শিশুটির ওপর এর প্রভাব, তার মানসিক বিপর্যয়ের বিষয়গুলো বিবেচনা না করে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যাতে নির্যাতিত আরেক দফা সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্নই হয়।

আন্ডারওয়ার, শাড়ি ও মোবাইল ফোনসেট কাহিনি

দর্শক কোনো চলচ্চিত্রের কতোটা গভীরে ঢুকবে, বুঁদ হয়ে দেখবে, তা যেমন ভালো কাহিনি ও অভিনয়ের ওপর নির্ভর করে; তেমনই সেই চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে প্রপস, পোশাক, সাজসজ্জা, ক্যামেরার কাজ, শব্দ, সঙ্গীত ও আলোক প্রক্ষেপণসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয়। সঙ্গে ‘সময়’কে গুরুত্ব সহকারে মাথায় রাখতে হয়। এসবের কোনো একটার কমতি বা বেশি হলে কোনো কিছু যথাযথ উপস্থাপনে ছেদ ঘটে। দেবীতে মিসির আলির গলায় ঝোলানো হয়েছে কমপক্ষে এক দশক আগের ‘নোকিয়া ১১০০’ মডেলের মোবাইল ফোনসেট। বর্তমানে এ ধরনের ফোনসেট খুঁজে পাওয়া যায় না বললেই চলে। ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে এসে ‘যাদুঘরে’ রাখার মতো মডেলটি কেনো মিসির আলির গলায় দেখানোর প্রয়োজন পড়লো তাও পরিষ্কার নয়। মজার ব্যাপার হলো, দেবীতে মিসির আলিকে মোবাইল ফোনসেটে মাত্র দুই বার কথা বলতে দেখা যায়। একবার আনিসের ফোন ধরতে গিয়ে মিসির আলি কালো রঙের একটি মোবাইল ফোনসেট প্যান্টের পকেট থেকে বের করেন। এছাড়া রানুদের গ্রামে গিয়ে কথা বলার প্রয়োজন হলে তিনি নিজের ফোনসেট বাদ দিয়ে গ্রামের বটতলায় দোকানদারের ফোন থেকে কথা বলেন। নিজের মোবাইল ফোনসেট থাকার পরও কেনো ব্যবসায়িক ফোন ব্যবহারের প্রয়োজন পড়লো তাও স্পষ্ট নয়! এখানেও সেই খাপছাড়া ঘটনার পরম্পরাহীন দৃশ্যায়ন। মোবাইল ফোনসেটে চার্জ না থাকলে দোকানে গিয়ে ফোনে কথা বলা যেতে পারে। কিন্তু এই সময়ে এসে ‘প্রতি মিনিট ২ টাকা’ রেটে কথা বলাটা একেবারেই বেমানান! তাছাড়া এ ধরনের ব্যবসাও বন্ধ হয়েছে অন্তত এক যুগ আগে।

   দুপুর গড়িয়ে নামে সন্ধ্যা। ক্লাস থেকে ফিরে ঘরে বসে চ্যাটিং করছেন নীলু। দেবীর ১৩ মিনিট ৩ সেকেন্ড। নিজেদের গাড়ি হাইজ্যাক হয়েছে এই ‘খুশির’ খবরটি ছুটতে ছুটতে এসে জানান নীলুর ছোটোবোন বিলু। হাস্যোজ্জ্বল মুখে তার বলার ধরন দেখলেই বোঝা যায়, কতোটা আনন্দের খবর গাড়ি হাইজ্যাক হওয়ার ঘটনাটি। গাড়িতে তার আপু থাকলে তাকেও হাইজ্যাক করে মুক্তিপণ চাইতো এবং ঘটনাটি কতোটা এক্সসাইটিং হতো, তাও বলেন বিলু। তবে সবচেয়ে ন্যাক্কারজনক ঘটনা হলো, ‘রহিম ড্রাইভার আন্ডারওয়ার পরে ফিরছে।’ প্রশ্ন হচ্ছে, হাইজ্যাকার গাড়ি নিয়ে গেলে চালকের কাপড়-চোপড় কেনো কোনো কারণ ছাড়াই খুলে নেবে। এটা খানিক অবান্তর লেগেছে। গাড়ি হাইজ্যাক হওয়ার ঘটনা জানাজানি হয় সন্ধ্যা বেলায়, যখন মোবাইল ফোনসেটে চ্যাটিং করছিলেন নীলু। তখন হাঁপাতে হাঁপাতে আবহে টগবগ টগবগ শব্দের সঙ্গে পায়ের আওয়াজ মিশ্রিত কণ্ঠে বিলুর আপু-আপু চিৎকার শোনা যায়। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর যখন তিনি নীলুর ঘরে দাঁড়িয়ে কথা বলেন, তখন তাকে একদম ঠাণ্ডা গলায় কথা বলতে দেখা যায়। বিলু যে হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে এলেন তার কোনো প্রভাব পাওয়া যায় না তার কণ্ঠে। মুহূর্তেই বিলুর কণ্ঠের এতো পরিবর্তন অবাক করার মতো!

ব্যর্থ মনোরথে বাসে করে আনিস যখন ফিরছিলেন তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। রানু বাড়িতে দোতলার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। পরনে অফ হোয়াইট রঙের শাড়ি। ক্লোজ শটে দেখা যায়, পাশের ভবনের মাঠে জনমানবহীন তিনটা দোলনা দুলছে জোরেসোরে। অদ্ভুত ব্যাপার, তার পরের শটেই রানুকে দোতলায় দেখানো হলো ম্যাজেন্টা রঙের শাড়িতে। হিন্দি চলচ্চিত্রে গানের দৃশ্যে বহুবার নায়ক-নায়িকার পোশাক বদল দেখানো হয়। কিন্তু তারও একটা নিয়ম থাকে, সময় থাকে। একই জায়গায় একই সিকোয়েন্সে দুই ধরনের পোশাকের ব্যবহার করা হয় না। আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো, হুট করেই শাড়ির অফ হোয়াইট রঙ হয়ে গেলো ম্যাজেন্টা। আরো একটি অসঙ্গতি চোখে পড়ে চলচ্চিত্রের ৫৬ মিনিট ১০ সেকেন্ডে দেখা যায়, বাড়ির ছাদে রানু বসে আছেন, সঙ্গে একটি পেঁচা। পেঁচা এমন এক পাখি যা দিনের বেলায় ঘোরাফেরা করে না। মানুষের কাছে তো আসেই না। অথচ সেই পেঁচা রানুর পাশে বসে থাকা অস্বাভাবিকই মনে হয়েছে। পেঁচার মতো বানরের গায়ে হাত বুলিয়ে দেওয়ার দৃশ্য আছে দেবীতে।

ইয়াসিন-জিতু এবং গৃহভৃত্য

মিসির আলির ডেরায় অতিথি এলে চা দেওয়ার জন্য ডাক পড়ে ইয়াসিনের। বয়স ১০-১১ বছর, পরনে পথশিশু বা সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের স্কুল ইউনিফর্ম। মা-বাবাহীন শিশুটি খুবই ভালো হওয়ায় তাকে নিজের বাসায় রেখে স্কুলে ভর্তি করানোর কথাও জানান মিসির আলি। কিন্তু চলচ্চিত্রজুড়ে ইয়াসিনকে কেবল দোকানের মতো চা পরিবেশন করতেই দেখা যায়। কয়েক দফায় ইয়াসিনকে চা দিতে বলেন মিসির আলি। কথা বলার ধরন দেখে বোঝা যায়, চা-সিগারেট আনা নেওয়াই ইয়াসিনের দায়িত্ব! এমনকি তার গায়ের জামাও প্রমাণ করে মিসির আলির ব্যক্তিগত ফুট ফরমায়েশ খাটার জন্যই তাকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। সমস্যা হলো মিসির আলির মতো একজন ব্যক্তির বাসায় ফুট ফরমায়েশ খাটা কোনো শিশুর গৃহকর্মীর বাইরে কোনো পরিচয় পাওয়া যায় না।

   ইয়াসিনের সমবয়সি আরেক শিশু জিতু মিয়া; তাকেও আনা হয় রানুর সহায়তাকারী হিসেবে। মিসির আলির পরামর্শে আনা জিতুরও পোশাক ছিলো পথশিশুদের মতোই। ঘরে আশ্রয় পেলেও ইয়াসিন-জিতুরা যে ‘পথশিশু বা সুবিধাবঞ্চিত শিশু’ তা সচেতনভাবেই আঙুল দিয়ে দেখানো হয়, যা অত্যন্ত অবমাননাকর। শিশুদের এমন গৃহভৃত্যের মতো উপস্থাপনা শিশুশ্রমকে উসকে দেয়, শিশুদের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা জন্ম দেয়।

   এছাড়া শিশু দুটির অভিনয় যথাযথ মনে হয়নি। আড়াই হাজার শিশুর অডিশন নেওয়ার পর আলোচিত তারে জমিন পার-এর মূল চরিত্র ঈশানকে বেছে নেওয়া হয়েছিলো। দারসিল সাফারি নামের শিশুটি নিশ্চয় আগে থেকে এমন দুর্দান্ত অভিনয় করতো না। তাকে কাহিনির প্রয়োজনেই প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করা হয়েছিলো। কিন্তু দেবীর শিশু দুটির অভিনয় দেখে এমন কিছু করা হয়েছে বলে মনে হয়নি।

সিগারেট-গাঁজা-হুক্কা এবং আইনের লঙ্ঘন

পোস্টার থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত ধূমপানের দৃশ্য ছিলো দেবীর আলোচিত বিষয়। অনেকটা অপ্রয়োজনে সিগারেট সেবনের দৃশ্য দেখিয়ে তরুণদের ধূমপানে আকৃষ্ট করার পুরনো কৌশলের অভিযোগের প্রমাণ আছে দেবীর বিরুদ্ধে। সরকারি অনুদান পাওয়া চলচ্চিত্র সরকারেরই করা আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পদে পদে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন লঙ্ঘন করেছে। যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এক-দুই বার নয়, অন্তত ১২ বার আইন ভেঙেছেন নির্মাতা। বাংলাদেশের ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা-২০১৫ আইনে চলচ্চিত্র, নাটক ও প্রামাণ্যচিত্রে তামাকজাত দ্রব্য সেবনের প্রচার ও প্রদর্শন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কাহিনির প্রয়োজনে দেখাতে হলে বা পুরনো দিনের বা বিদেশি চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে ধূমপানের দৃশ্য থাকলে কী করতে হবে তাও সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে আইনে। আইনের ৫(ক) ধারায় বলা হয়েছে, “তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারের দৃশ্য প্রদর্শনকালেও পর্দার মাঝখানে পর্দার আকারের অন্তত এক-পঞ্চমাংশ স্থান জুড়িয়া কালো জমিনের ওপর সাদা অক্ষরে বাংলাভাষায় ‘ধূমপান/তামাক সেবন মৃত্যু ঘটায়’ শীর্ষক সর্তকবাণী প্রদর্শন করিতে হইবে এবং উক্তরূপ দৃশ্য যতক্ষণ চলিবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সর্তকবাণী অব্যাহত রাখতে হইবে।” কিন্তু দেবীতে কমপক্ষে ১২ বার দেখানো হয়েছে মিসির আলির ধূমপানের দৃশ্য। এছাড়া চলচ্চিত্রের ৫৪ মিনিট ৩২ সেকেন্ডে রানুদের গ্রামে এক যুবককে হাতের তালুতে মাদক সেবনের মতো করে ঢলতে দেখা যায়। এমনকি রানুদের গ্রামে গিয়ে মিসির আলিকে হুক্কা টানতেও দেখা গেছে। কোথাও আইন অনুযায়ী সর্তকবাণী দেয়নি। নিজেদের মতো করে শুধু স্ক্রিনের নিচে সর্তকবাণী দিয়েই দায় সেরেছে।

দৃশ্য শুরুর আগে ও পরে ২০ সেকেন্ড ধরে বিধিধারা নির্দেশিত সর্তকবাণী প্রচারও বাধ্যতামূলক। কিন্তু এসব আইনকে পায়ে দলে দেবীতে ইচ্ছেমতো ধূমপানের দৃশ্য উপস্থাপন করেছেন নির্মাতা। তা এমনভাবে দেখানো হয়েছে, যেনো সিগারেট ও মিসির আলি একে অন্যের পরিপূরক।

   আইন লঙ্ঘনের পাশাপাশি চলচ্চিত্রে একটি বিদেশি কোম্পানির বিশেষ ব্র্যান্ডের সিগারেটের ‘বিজ্ঞাপন’ও করা হয়েছে। রানুর বাসায় মিসির আলি আসলে খুবই কৌশলে বেশ লম্বা সময় ধরে সিগারেটের প্যাকেটটি দেখানো হয়। এভাবে কৌশলে কোনো পণ্যের বিজ্ঞাপন করা অবশ্য চলচ্চিত্রের পুরনো রোগ।

তারপরও ...

দিনশেষে নির্মাণ ত্রুটি, চিন্তাভাবনা ছাড়াই দৃশ্যায়ন ও বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপন, অহেতুক পশুপাখি হাজির করাসহ সবদিকের আলোচনায় বলা যায়, দেবী কায়িক ও মস্তিষ্কের পরিশ্রমহীন এবং ভুলে ভরা এক চলচ্চিত্র। যেখানে বিচ্ছিন্ন, বিক্ষিপ্তভাবে কিছু দৃশ্য জোড়াতালি দিয়ে তা চলচ্চিত্রাকারে উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু চলচ্চিত্রের রূপ-রস-গন্ধ-সৌন্দর্য ফুটে ওঠেনি। শেষ করবো প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় নির্মিত দেবী সম্পর্কে দু-একটি কথা দিয়ে। এই চলচ্চিত্রটি সম্পর্কে সমালোচক অসীম সোম বলেন, “সত্যজিতের এক অসামান্য সৃষ্টি ‘দেবী’ ছবির এক দিকে ধর্মান্ধতা ও কুসংস্কার, অন্য দিকে যুক্তিবাদ ও আলোকিত চিন্তাধারা। একটির প্রতিভূ জমিদার কালীকিঙ্কর, অন্যটির প্রবক্তা পুত্র উমাপ্রসাদ। মাঝে আরোপিত দেবী-মাহাত্ম্যে বিপর্যস্ত পুত্রবধূ দয়াময়ী। ... কাহিনীর ভরকেন্দ্র বিশ্বাসের সংঘাত, বাস্তবতা এ ছবির সর্বাঙ্গে। কোনও কোনও দৃশ্য যেন ছবি দিয়ে লেখা কবিতা।’’ সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে তুলনা নয়, নামকরণের কারণেই প্রাসঙ্গিকভাবে দুই দেবীর মধ্যে চিন্তার ফারাক-উপস্থাপনগত দৈন্য বোঝাতেই এই আলোচনা। আগামীর চলচ্চিত্রগুলো এসব ত্রুটি-বিচ্যুতি মুক্ত থাকবে এবং সত্যিকার অর্থে শিল্প-বিনোদন মাধ্যম হিসেবে দাঁড়াবে; কোটি দর্শককে করবে চলচ্চিত্রমুখী, এটাই প্রত্যাশা। 

 

লেখক : সুশান্ত সিনহা, বেসরকারি টেলিভিশন যমুনা টেলিভিশন-এর বিশেষ প্রতিনিধি ও মিডিয়া সমালোচক।

sinhasmp@yahoo.com

sinhaspb@gmail.com

https://www.facebook.com/sushanta.sinha.56

 

তথ্যসূত্র

১. গুপ্ত, সেবাব্রত (২০০৯ : ৪৭৬); ‘তপন সিংহের চলচ্চিত্র’; শতবর্ষে চলচ্চিত্র দ্বিতীয় খণ্ড; সম্পাদক : নির্মাল্য আচার্য ও দিব্যেন্দু পালিত; আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লি., ভারত।

২. সোম, অসীম (২০০৯ : ৪৪৭); ‘সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা’; শতবর্ষে চলচ্চিত্র দ্বিতীয় খণ্ড; সম্পাদক : নির্মাল্য আচার্য ও দিব্যেন্দু পালিত; আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লি., ভারত।

বি:দ্র: প্রবন্ধটি জুলাই-২০১৯ (১৭ সংখ্যা) ম্যাজিক লণ্ঠন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন