Magic Lanthon

               

ইব্রাহীম খলিল

প্রকাশিত ৩০ জুন ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

ইউটিউবে মুক্তি আর স্বাধীনতার স্বাদ খুঁজছেন নির্মাতারা

ইব্রাহীম খলিল

ছবি : এ আই দিয়ে তৈরি করা 

কনটেন্টের গহ্বর ইউটিউব

ইউটিউব গুগলের মূল প্রতিষ্ঠান আলফাবেটের ভিডিও প্রকাশ, প্রচার আর সংরক্ষণের একটি ওয়েবসাইট। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি, দর্শক-শ্রোতা প্রতি মিনিটে এখানে যুক্ত করে নতুন নতুন ভিডিও। ধারণা করা হয়, বর্তমানে প্রতি মিনিটে ৫০০ ঘণ্টারও বেশি ভিডিও ইউটিউবে প্রকাশ হয়। ফলে আপনি যদি এক ঘণ্টা ইউটিউব দেখেন ততোক্ষণে ইউটিউবে সময়ের হিসাবে ৩ দশমিক ৪ বছরের ভিডিও যোগ হয়ে যায়। ইউটিউবে এখন পর্যন্ত মোট কতো ভিডিও রয়েছে সেটার নির্দিষ্ট সংখ্যা জানা দুরূহ। কারণ ইউটিউব কখনোই এ সংখ্যা প্রকাশ করে না। তবে বিভিন্ন গবেষণা ও পরিসংখ্যান সংস্থার অনুমানের ভিত্তিতে ২০২৪ খ্রিস্টাব্দের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউটিউবে মোট ভিডিওর সংখ্যা পাঁচ হাজার কোটিরও বেশি। ইউটিউবে একদিনে যতো ভিডিও আপলোড হয়, সব দেখে শেষ করতে আপনার ৮২ বছর সময় লেগে যেতে পারে! ২০২৫ খ্রিস্টাব্দের এক হিসাবে বলা হয়, প্রতিদিন ইউটিউবে ২৬ লাখ ভিডিও আপলোড হচ্ছে।

সারাবিশ্বে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার কারণে সহজেই ভিডিও নির্মাণ ও প্রকাশ করা যায়। ফলে ইউটিউব হয়ে উঠেছে তথ্য ও বিনোদনের এক বিশাল ভান্ডার। ইউটিউব উন্মুক্ত মাধ্যম হওয়ায় ভিডিওর সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। যেকেউ এখানে ভিডিও আপলোড করতে পারে। ফলে প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের কনটেন্টের মধ্যে শিক্ষামূলক ভিডিও, বিনোদন, সংবাদ, গান, গেমিং, ভ্লগসহ নানা ধরনের ভিডিও যোগ হচ্ছে। এর পাশাপাশি ইউটিউব শর্টস ও লাইভ স্ট্রিমিংয়ের মতো নতুন সুবিধাগুলোও কনটেন্টের পরিমাণ আরো দ্রুত বাড়াচ্ছে। ইউটিউবে দ্রুত ভিডিও বৃদ্ধির অন্যতম কারণ কনটেন্টের নির্মাতা বা ভিডিও আপলোডকারী ভিউয়ের ওপর ভিত্তি করে এখান থেকে অর্থ উপার্জন করতে পারে। পাশাপাশি জনপ্রিয় হওয়ারও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ফলে বিনোদনের অংশ হিসেবে সারাবিশ্বের পাশাপাশি বাংলাদেশেও চলচ্চিত্র ও নাটক নির্মাতারা ইউটিউবকেন্দ্রিক ব্যবসা গড়ে তুলেছে। যারা বিভিন্ন ধরনের কনটেন্ট বা নাটক নির্মাণই করে ইউটিউবের জন্য।

‘কী সন্ধানে যায় সেখানে'

ইউটিউব একটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ভিডিও আদানপ্রদানের ওয়েবসাইট। এটা ২০০৫ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি যাত্রা শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্রের লেনদেন প্রতিষ্ঠান পেপ্যালের তিন সাবেক কর্মী স্টিভ চেন, চ্যাড হার্লি ও জাওয়াদ করিম এই কোম্পানি নিবন্ধন করে। কোম্পানির সদরদপ্তর ক্যালিফোর্নিয়ার সান ব্রুনোতে। ২০০৫ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে সীমিত সংস্করণে সাইটটি চালু হলে তখন প্রতিদিন কমপক্ষে ৩০,০০০ দর্শক ইউটিউব দেখতো। ২০০৫ খ্রিস্টাব্দের ১৫ ডিসেম্বর ইউটিউব আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হওয়ার সময় প্রতিদিন ২০ লাখেরও বেশি ভিডিও ভিউ ছিলো। ২০০৬ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারিতে ভিডিও দেখার সংখ্যা আড়াই কোটি ছাড়িয়ে যায়।

ইউটিউবে যে কেউ ভিডিও দেখতে পারে। যদি কারো জিমেইলে একটি অ্যাকাউন্ট থাকে তিনি চাইলেই ইউটিউবে একটি চ্যানেল খুলতে পারেন। একটি চ্যানেলে আপলোড করা ভিডিওগুলো যদি ১২ মাসের মধ্যে ৪,০০০ ঘণ্টা (বা এক কোটি শর্টস ভিউ) সময় ভিউ হয় এবং পাশাপাশি চ্যানেলে যদি কমপক্ষে এক হাজার সাবস্ক্রাইবার থাকে, তাহলেই সে মনিটাইজেশন পাবে। মানে ওই চ্যানেল থেকে অর্থ উপার্জন করতে পারবে। ভিডিওর দৈর্ঘ্য, কোয়ালিটি আর তথ্যের ওপর নির্ভর করে ওই ভিডিও এবং চ্যানেল থেকে কতো অর্থ উপার্জন হবে। ১০ লাখ ভিউয়ের জন্য আয় কতো হবে, তা ভিডিওর সি পি এম (Cost Per Mille) ও আর পি এম (Revenue Per Mille) এর ওপর নির্ভর করে।

সি পি এম বলতে বোঝায়, প্রতি ১,০০০ বিজ্ঞাপন ইম্প্রেশনের জন্য বিজ্ঞাপনদাতারা কতো টাকা দেয়। এটা ভিডিওর কোয়ালিটি, দর্শকের অবস্থান এবং বিজ্ঞাপনদাতাদের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়। যেমন ফাইন্যান্স ও ব্যবসাবিষয়ক চ্যানেলে সি পি এম সাধারণত ২০ থেকে ৫০ ডলার, আর বিনোদন বা গেমিং চ্যানেলে এটা দুই থেকে ১০ ডলারের মধ্যে হয়। গড় হিসেবে ইউটিউব এক মিলিয়ন বা ১০ লাখ ভিউয়ের জন্য ১,০০০ থেকে ৫,০০০ মার্কিন ডলার দেয়। টাকার হিসাবে এটা এক লাখ ২০ হাজার থেকে ছয় লাখ টাকার বেশি। এই আয় ভিডিও ভেদে কমবেশি হতে পারে।

তবে সাধারণত ফাইন্যান্স, স্বাস্থ্য বা প্রযুক্তিবিষয়ক ভিডিও বা চ্যানলেগুলোতে এই অঙ্ক অনেক বেশি হয়। কারণ এসব ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপনদাতারা বেশি অর্থ ব্যয় করে। অন্যদিকে আর পি এম হলো কনটেন্ট ক্রিয়েটরের আসল আয়ের গড় হিসাব। যেখানে ইউটিউব থেকে পাওয়া সব ধরনের আয় ধরা হয়। যেমন মোট ভিউ এক লাখ হলে সেটা থেকে আয় ২০০ ডলার। এখানে আর পি এম = (২০০ × ১,০০,০০০) × ১,০০০ = ২ ডলার। অর্থাৎ প্রতি ১,০০০ ভিউয়ে আপনার আয় দুই ডলার। এটাই আর পি এম।

সার্বিকভাবে যেসব ভিডিওতে ওয়াচ টাইম, অডিয়েন্স রিটেনশন এবং এনগেজমেন্ট (লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার) বেশি থাকে, সেগুলো সাধারণত বেশি আয় করে। কারণ এ ধরনের ভিডিওতে উচ্চমূল্যের বিজ্ঞাপন দেখানো হয়। পাশাপাশি যদি কোনো ক্রিয়েটরের অতিরিক্ত আয়ের উৎস থাকে, যেমন স্পন্সরশিপ বা অ্যাফিলিয়েট লিংকতাহলে ১০ লাখ ভিউ থেকে তাদের আয় আরো উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে। ইউটিউব পার্টনার প্রোগ্রামে অনুমোদন পাওয়ার পর ক্রিয়েটররা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে সরাসরি পাওয়া বিজ্ঞাপন, সুপার চ্যাট, সুপার স্টিকার, চ্যানেল মেম্বারশিপ এবং ইউটিউব প্রিমিয়াম থেকে আয় করতে পারে। তবে ইউটিউব তাদের মাধ্যমে পাওয়া বিজ্ঞাপন থেকে আয়ের একটি অংশ রেখে দেয়। সাধারণত কনটেন্ট ক্রিয়েটররা আয়ের ৫৫ শতাংশ পায় এবং ইউটিউব ৪৫ শতাংশ রেখে দেয়।

ফলে বর্তমানে নির্মাতারা ইউটিউবকেন্দ্রিক নাটক, চলচ্চিত্র নির্মাণে ঝুঁকছে। কারণ আগে যেখানে নির্মাতা ও প্রযোজকরা এককালীন টাকা পেতো সেখানে ইউটিউব থেকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থ উপার্জনের সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি কনটেন্ট বিক্রির জন্যও তেমন ঝামেলা পোহাতে হয় না। আবার চলচ্চিত্র, নাটক ও বিভিন্ন কনটেন্ট নির্মাণ করে বড়ো ধরনের লোকসানের আশঙ্কাও কম। বরং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসা ও মুনাফার জন্যও নির্মাতাদের ভরসার জায়গা হয়ে উঠেছে ইউটিউব।

ইউটিউবকেন্দ্রিক নাটক ও ভিউ কালচার

একসময় টেলিভিশনে সম্প্রচারের জন্য নাটক নির্মাণ হতো। ইউটিউব আসার পরে সেই নাটকগুলো টেলিভিশনে সম্প্রচারের পর ইউটিউবে প্রকাশ করা হতো। কিন্তু বর্তমানে ইউটিউবের জন্যই নাটক নির্মাণ হচ্ছে। সেই নাটক কখনো কখনো একবার প্রচারের জন্য টিভি চ্যানেলে বিক্রির চেষ্টা চলে। কারণ টেলিভিশনে বিক্রি হলে সেখান থেকে এককালীন একটা অর্থ পায় প্রযোজক। পরে ইউটিউবে প্রকাশ করে সেখান থেকেও অর্থ উপার্জন করা হয়। বর্তমানে শুধু টেলিভিশনের জন্য নাটক নির্মাণে যেখানে খরচ হয় দেড় লাখ থেকে আড়াই লাখ টাকা, সেখানে ইউটিউবের জন্য নির্মিত বেশিরভাগ নাটকের বাজেট টিভি নাটকের চেয়ে অনেক বেশি। কখনো কখনো আট থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করে প্রযোজকেরা। কারণ নাটকটি যদি টেলিভিশনে বিক্রি না-ও হয় তাতেও সমস্যা নেই। সেটা যাতে দীর্ঘমেয়াদে ইউটিউব থেকে আয় করতে পারে সেটাই মাথায় রাখা হয়।

বর্তমানে অধিকাংশ প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল রয়েছে। এদের মধ্যে মোশন রক এন্টারটেইনমেন্ট, সিনেমাওয়ালা, ধ্রুব টিভি, সিডি চয়েস ইউটিউব, ওজন এন্টারটেইনমেন্ট, এসএস মাল্টিমিডিয়া, গোল্লাছুট, সিএমভি, ক্লাব ইলেভেন, ঈগোল উল্লেখযোগ্য। নাটক নির্মাণের পর টেলিভিশনের কাছে বিক্রির কারণে প্রযোজকের বিনিয়োগের কিছু টাকা আগেই উঠে আসে। টেলিভিশনও সম্প্রচারের জন্য কম মূল্যে নাটক পায়। ফলে আপাতত চ্যানেল ও প্রযোজক দুই পক্ষেরই সুবিধা হয়।

অন্যদিকে ইউটিউবকেন্দ্রিক মুনাফা বেশি হওয়ায় প্রতিটি টিভি চ্যানেল নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল চালু করেছে। ফলে টেলিভিশনের চেয়ে ইউটিউবের নাটকে বাজেট বেশি হওয়ায় জনপ্রিয় শিল্পীদের ইউটিউব চ্যানেলগুলোর প্রতি আগ্রহ বেশি। কারণ তারাও মনে করে ইউটিউব বর্তমানে জনপ্রিয় নাটকের প্লাটফর্ম এবং এতে প্রচারিত নাটক দ্রুত সময়ে কোটি ভিউ পার করে। যার মাধ্যমেও কে বেশি জনপ্রিয় সেটার একটা বায়বীয় নির্ণায়ক তৈরি হয়।

কিন্তু সমস্যা হলো, নাটকের সঙ্গে বিজ্ঞাপন এজেন্সিগুলো যুক্ত হওয়ার পর এখন নির্মাতা বা চ্যানেল নয়, এজেন্সি ঠিক করে দেয় নাটকে অভিনয়শিল্পী ও গল্প কেমন হবে। কারণ প্রতিষ্ঠিত প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান, নির্মাতা শুধু ইউটিউবের ভিউ নয়, সরাসরি বিজ্ঞাপন থেকে আয়েও আগ্রহী। ফলে তারা অধিক উপার্জন করতে গিয়ে নাটকের কোয়ালিটির সঙ্গে সমঝোতা করছে বলে মনে হয়েছে।

প্রথমদিকে ইউটিউবের নাটকে কয়েকজন পরিচিত ও জনপ্রিয় অভিনয়শিল্পীকে প্রাধান্য দেওয়া হতো। বাজেটে না কুলালে অন্তত একজন পরিচিত অভিনয়শিল্পীকে রাখার চেষ্টা করে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলো। যাতে তাকে দেখে দর্শক নাটকটি দেখতে আগ্রহী হয়। কিন্তু ইউটিউব, ফেইসবুকসহ নানা ধরনের জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শর্টস ভিডিও, রিলস কিংবা নাটকের চমকপ্রদ ছোট্ট ভিডিও প্রকাশ করে দর্শককে সহজেই আকৃষ্ট করার সুযোগ থাকায় বর্তমানে নাটকে অভিনয়শিল্পীকেও তেমন গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। কারণ তাদের অধিকাংশেরই উদ্দেশ্য থাকে ইউটিউবে মুক্তি ও ভিউ ব্যবসা।

এছাড়া ইউটিউবে যেহেতু অবাধ স্বাধীনতায় লাগাম ছাড়া কাজ করা সম্ভব, ফলে এই সুযোগে কিছু নির্মাতা প্রযোজক, নাট্যকার এবং অভিনয়শিল্পী বিতর্কিত, ভাষার বিকৃতকখনো কখনো কুরুচিপূর্ণ নাটক পরিবেশন করছে। এই নাটকগুলো কাহিনির প্রয়োজনে নয়, একেবারেই সস্তা বিনোদনের গল্পে নির্মাণ করে দ্রুত জনপ্রিয় হওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। ইউটিউবে সরাসরি দর্শক প্রতিক্রিয়া জানাতে পারলেও, সেটা নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হলেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে আরো দর্শকের কাছে। কারণ দর্শক কী প্রতিক্রিয়া (কমেন্ট) দিচ্ছে সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, কতো দর্শক প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে সেটাই এ ধরনের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো অধিক দর্শকের কাছে পৌঁছে দিতে আমলে নেয়! ফলে যতো বিতর্কিত গল্প ততো ভিউ, ততো দ্রুত ভাইরাল, ততো ডলার আয়!

গল্পের চেয়ে স্বত্ব-স্বার্থ ও ভিউয়েই আগ্রহ

২০২৪ খ্রিস্টাব্দে গণমাধ্যম মারফতে জানা যায়, দেশে সবচেয়ে বেশি দেখা হয় ইউটিউব। গুগল, ফেইসবুক, ইনস্টাগ্রামকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশের মানুষ ইউটিউব বেশি দেখে। চাইলেই ঘরে বসে মোবাইল ফোনসেট, স্মার্ট টিভি, কম্পিউটার বা ল্যাপটপের মাধ্যমে বিনোদনমূলক নানা আয়োজনের পাশাপাশি নাটক এবং চলচ্চিত্র দেখতে পারে। শুধু ডিভাইসে ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেই হলো। দর্শক-শ্রোতা যতো বেশি দেখে ততোই ভিউ বাড়ে। আর সে কারণেই বিনোদন অঙ্গনের প্রায় সবাই সরব ইউটিউবেও।

ইউটিউবে বিনোদনের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে যাদের যতো কনটেন্ট তাদের ততো আয়। কারণ একবার কোনো নাটক বা ভিডিও থেকে আয় শুরু হলে সেটা থেকে অর্থ আসতেই থাকবে। ফলে টেলিভিশনগুলোও টিভি স্বত্ব কিনে নিয়েই এখন সন্তুষ্ট থাকছে না। অধিকাংশ টেলিভিশন বর্তমানে ইউটিউব স্বত্বতেও অংশীদারিত্ব চাচ্ছে। অবশ্য এটা করতেও টেলিভিশন চ্যানেলগুলো কিছুটা বাধ্য করেছে। কারণ কিছু টেলিভিশন জানিয়ে দেয়, তাদের অংশীদারিত্বের শর্তে রাজি না হলে ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশের জন্য নির্মিত নাটক টেলিভিশনে প্রচার করবে না! যদিও এর মাধ্যমেও বিনিয়োগকারীরা তাদের লগ্নি করা অর্থ কিছুটা ফেরত পায়, কিন্তু একটু বেশি লাভের সুযোগ এতে নষ্ট হয়। সে কারণে অনেকে ইউটিউবকেই নাটক মুক্তির একমাত্র মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে। আবার এমন অনেকগুলো প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে, যারা আর টেলিভিশনে সম্প্রচারের জন্য নাটক দেয়ই না। তারা কেবল ইউটিউবেই মুক্তি দেওয়ার জন্যই নাটক নির্মাণ করে। অনেকে আবার সুযোগ ও মুনাফা বেশি পেলে পেইড সাবস্ক্রিপশন মডেলের ওটিটি প্লাটফর্মে বিক্রি করে দেয়।

অবশ্য বর্তমানে অধিকাংশ টেলিভিশন চ্যানেল ও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের প্রধান লক্ষ্য ভিউ। গল্প কেমন সেটার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সেটার ভিউ কেমন হবে। এমন অনেক ভালো গল্পের নাটক আছে, যার ভিউ একেবারেই কম। আবার অনেক গল্পহীন ও বিতর্কিত নাটকের ভিউ কোটি কোটি। ফলে যাদের নাটক ইউটিউবে কোটি ভিউ হচ্ছে তাদেরকেই প্রাধান্য দিচ্ছে তারা। ইউটিউব ভিউকে স্ট্যান্ডার্ড হিসেবে নির্ধারণ করা হচ্ছে। কিন্তু আসলেই কি একটি নাটক বা একজন অভিনয়শিল্পীর ভিউ দিয়ে তার অভিনয় বা ভালো-মন্দ বিচার করা যায়? যারা টিকটক করে, তাদেরও ভিউ কোটি। তাহলে তারাও কি ভালো অভিনয়শিল্পী? টিকটকের ভিউ দেখে যাদেরকে নাটক, চলচ্চিত্রের জগতে নিয়ে আসা হয়েছিলো, তারা কি টিকে আছে? টিকতে পেরেছে? তার মানে অর্থ উপার্জনে ভিউ সাহায্য করলেও সেটা টিকে থাকার জন্য সহায়ক নয়।

দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে হলে ভালো গল্প, অভিনয়শিল্পী নিয়ে কাজ করতে হবে। না হলে কোটি কোটি ভিউ পেয়েও হারিয়ে যাওয়া বর্তমানে মামুলি বিষয়। ভিউর জন্য নির্মিত সস্তা কমেডি, যৌনতা, সুড়সুড়ি মার্কা প্রেমের গল্পে দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকা অসম্ভব। সেটা ব্যবসা, সুনাম কিংবা আইডেন্টিটি নির্মাণসবক্ষেত্রেই। যদিও অনেক ‘ভিউ নির্মাতারা’ মনে করেন, তারা তরুণ প্রজন্ম যা দেখতে চায়, সেটাই নির্মাণ করছে। কিন্তু বর্তমানের জেনজি প্রজন্ম-তরুণরা কী চায়, কেনো চায়, কোন সময়ের জন্য চায়, সেটা বিশ্লেষণ করাও জরুরি। নাহলে ভিউয়ের লোভে কিছু মানহীন গল্প দিয়ে কিছু স্লো-মোশন শট্, গান, চোখাচোখি দেখিয়ে নির্মাণ করলে, সেটা চলচ্চিত্র কিংবা নাটক কিছুই হবে না। কেবলই কনটেন্টই থেকে যাবে। আবার কখনো কখনো নিজের নির্মিত কনটেন্ট খণ্ডিতভাবে প্রকাশ হয়ে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়লেও নিজের বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে!

বর্তমানে ইউটিউবে সবচেয়ে বেশি ভিউ পাওয়া ১০টি নাটকের মধ্যে ছয়টিই অভিনয়শিল্পী নিলয় আলমগীরের। এগুলো হলো, শ্বশুর বাড়িতে ঈদ, মামার বাড়ি, সংসার আমার ভাল্লাগেনা, গরিবের বড়লোক চাকর, চাচা ভাতিজা জিন্দাবাদএকটুখানি ভুল। বাকী চারটির মধ্যে একটি জিয়াউল ফারুক অপূর্বর বড় ছেলে, মুশফিক আর ফারহান-এর ভুলো না আমায়, ফারহান আহমেদ জোভান-এর তোমাদের গল্প এবং মোশারফ করিমের ‘জামাই বউর মাথা গরম

নাটকগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সবগুলোর টার্গেট অডিয়েন্সই মূলত নিম্নবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণি এবং এগুলো তাদের জীবনের দৈনন্দিন সঙ্কটকে কেন্দ্র করে নির্মিত। এখানে মধ্যবিত্ত, উচ্চ-মধ্যবিত্তের গল্প নেই। ফলে এগুলো অনেকটা একপেশে বিনোদনের কনটেন্ট হয়ে গেছে। সমাজের একটা বড়ো অংশের এই অনুপস্থিতি এবং গতানুগতিক গল্পের উপস্থাপনের পেছনে রয়েছে সমাজের আরেক অংশের ভিউয়ের আকাঙ্ক্ষা। আর ভিউ মানেই অর্থ উপার্জন। ফলে ইউটিউবের অধিকাংশ কনটেন্টে একটি শ্রেণির কল্পিত জীবনকে বারবার পুনরুৎপাদন করা হয়েছে। যেখানে ভাষার ব্যবহার, নারীর উপস্থাপন, নিম্নবর্গের মানুষের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। একইসঙ্গে প্রান্তিক মানুষের চিত্রায়ণের নামে তাদেরকে ভোগ্য, বিকৃত, হাস্যকর এবং নৈতিকভাবে অবমাননাকর উপস্থাপন করা হয়েছে বলেও প্রতীয়মান হয়েছে।

প্রশ্ন উঠতে পারে, মানুষ তাহলে কেনো দেখে এসব কনটেন্ট? এতো ভিউ কীভাবে হয়? আসলে এসব কনটেন্ট যাদের উদ্দেশ্যে নির্মাণ হয়, তারা যে এটা দেখে তাতে হয়তো কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তাদের অনুভূতি-আবেগ নিয়ে যে ব্যবসা হয়, সেই বোধহয় এসব দর্শকের সীমিত বলেই মনে হয়েছে ইউটিউবে নাটকের নিচে তাদের কমেন্ট দেখে। প্রতিক্রিয়ায় তারা যেসব মতামত দেয়, তার বিরাট অংশজুড়েই নারীর প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি, কথিত ধর্মীয় উন্মাদনা ও পুরুষতান্ত্রিক চিন্তাধারার প্রতিফলন রয়েছে। যেখানে অনেকে নারী চরিত্রকে অশ্লীল ভাষায় গালাগালিও করেছে। এতে যতো গালাগালি দেওয়া হয়, অবান্তর মতামত দেওয়া হয়, ইউটিউবের অ্যালগরিদম ততো মানুষের কাছে তা পাঠিয়ে দেয়। এতে ভোক্তার ইনগেইজমেন্ট বাড়ে, ভিউ বাড়ে। ফলে ভিউ-ই সাফল্যের মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়।

নির্মাতা-প্রযোজকের মুখোমুখি

উপরের আলোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে দেশে ইউটিউবে সবচেয়ে বেশি ভিউ পাওয়া ১০টি নাটকের মধ্যে ছয়টিই অভিনয়শিল্পী নিলয় আলমগীরের। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা নাটক হলো শ্বশুর বাড়িতে ঈদ। নাটকটি ৭৩ মিলিয়ন মানুষ দেখেছে। তারা ষষ্ঠ তম বেশি দেখা নাটক একটুখানি ভুল দেখেছে ৪৯ মিলিয়ন মানুষ। এখান থেকে মিলিয়ন প্রতি উপার্জনের হিসাব মেলালে নিলয়ের আয়েরও একটি খতিয়ান সম্পর্কে সহজেই ধারণা পাওয়া যায়। এসব নাটকের একটি ছাড়া সবগুলোর প্রযোজক নিলয় নিজে এবং সবগুলোই নিজের ইউটিউব চ্যানেল এনএএফ (নিলয় আলমগীর ফিল্মস) ইন্টারটেইনমেন্টে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। এসব নাটকের অধিকাংশই কোনো না কোনো টেলিভিশনে এককালীন দেখানোও হয়েছে। ফলে যারা ইউটিউবকেন্দ্রিক নাটক নির্মাণ করে, তাদের পরিধি সহজেই আন্দাজ করা যায়।

সম্প্রতি অভিনয়শিল্পী ও প্রযোজক নিলয় আলমগীর তার কনটেন্ট নিয়ে এক টেলিভিশনে সাক্ষাৎকারে বলেন,

আমরা যে কনটেন্টগুলোতে অ্যাক্টিং করি বা করার চেষ্টা করি, সেখানে মোটামুটি আমরা সবাই একটা জিনিসে ফোকাস করি, মানে এই সিনগুলো বা গল্পটা যাতে খুব মানুষকে রিলেট করে। মনে হয় যেনো একদম মানে আমার চোখের সামনে ঘটছে। কোনো অ্যাক্টিং হচ্ছে না। এ রকম একটা প্র্যাকটিস করে যাচ্ছি। ... কিন্তু ঝামেলাটা দর্শকরাই করে ফেলে। দেখা গেলো খুব ভালো একটা গল্পের কাজ হলো। সেটা না দেখে ওই যে ক্রিসপি কাজটা, সেটাই দেখলো। তো এতে করে আসলে ভালো গল্প যারা বলতে চায় তাদের জন্য একটু সমস্যা হয়ে যাচ্ছে কাজ করতে। আগে তো নাটকের ভিউ দেখা গেলো এক সপ্তাহ ১০ দিনে এক মিলিয়ন হতো, দুই মিলিয়ন হতো, তাতেই মানুষ অনেক খুশি থাকতো। বাট এখন দেখা যায়, একদিনে তিন-চার মিলিয়ন। তো ভিউটা আমি ফোকাস করছি না। আমার এই ভিউ মানে হচ্ছে যে, মানুষ দেখছে তার মানে নাটক বেশি মানুষ দেখছে। প্লাস দেখতে চাচ্ছে। তার মানে এটা ধ্বংস হওয়া বা সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির মতো হয়ে যাওয়ার কোনো কারণ নাই। দিন দিন বাড়ছে। আমার মনে হয় আরো বাড়বে।

নিলয়কে বর্তমানে সফল নাটকের সফল প্রযোজক বলা যায়। একইসঙ্গে ইউটিউবকেন্দ্রিক ব্যবসার ক্ষেত্রেও। যিনি ইউটিউবে সফলতা পেয়ে আর অন্য প্রযোজকমুখী না হয়ে নিজেই প্রযোজক বনে গেছেন। কিন্তু সব নির্মাতা ও প্রযোজকদের অভিজ্ঞতা একইরকম নয়। তেমনই এক তরুণ নির্মাতা ও প্রযোজক হাসান তারেক। যিনি প্রযোজক ও টেলিভিশনের দ্বারে দ্বারে ঘুরে ব্যর্থ হয়ে ইউটিউবে থিতু হওয়ার চেষ্টা করছেন। ইতোমধ্যে পাঁচটি নাটক ও টেলিফিল্ম নির্মাণ করেছেন। তিনি মনে করেন, বর্তমানে ইউটিউব কনটেন্ট নির্মাতাদের জন্য অনেক নিরাপদ প্লাটফর্ম। তিনি আরো বলেন, আমরা তরুণ নির্মাতারা যে মূল সমস্যাটা ফেস করি, সেটা প্লাটফর্মের সমস্যা। আমি শুরুতে যখন টেলিফিল্ম ও নাটক নির্মাণ করেছি, তখন কোনো ভালো প্লাটফর্ম পাইনি। প্লাটফর্মগুলো অনেক বায়াসড আচরণ করেছে। শুনতে খারাপ শোনা যায়, আমি চ্যানেলে যাওয়ার পর সবাই রায়হান রাফীর গল্প করে। এখন আমাকে কাজ দিলে, করতে করতে তো রাফীর মতো কাজ করবো। আমরা যারা নতুন আছি তাদেরকে নিয়ে কেউ রিস্ক নিতে চায় না। নতুন শুনলে ওরা বলে আপনার কী কাজ আছে, আপনি কী করছেন, আপনি কাজ করেননি আপনাকে কেনো টাকা দিবো? আপনি চলে যান এই টাইপের কথাবার্তা বলে। ওদের ব্যাপারটা আমি যেটা দেখেছি ওরা স্টোরি না শুনে কি রকম জানি একটা ইভালুয়েশন করে। খুবই অদ্ভুত টাইপের ইভালুয়েশন। সেক্ষেত্রে ইউটিউব নতুন নির্মাতাদের ক্ষেত্রে একটা ভরসার জায়গায় পরিণত হয়েছে। কোথাও না বিক্রি হলে সেটা ইউটিউবে দিয়ে দেওয়া যায়। বর্তমানের জেনারেশন আবার ইউটিউবের দিকে ঝুঁকে গেছে। আমি পাঁচটা প্রজেক্ট বানিয়েছি। কোনো সেলিব্রিটি নেই। ইউটিউবে এখন কোনো সেলিব্রিটি লাগে না। মানে এটা কোনো কিছুই ম্যাটার করে না। এটাই হলো একটা সুবিধা।

তিনি আরো জানান, ইউটিউব ও ফেইসবুকে কনটেন্ট মুক্তি দিলে দুই জায়গা থেকেই আয় হয়। যেটা প্রতিষ্ঠিত কোনো মিডিয়ার কাছে গেলে তারা স্বল্প দামে কিনে নিতে চায়। যেটা এখন আর নির্মাতা বা প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের জন্য লাভজনক না। ফলে স্বাধীনতার জায়গা থেকে নির্মাতাদের ইউটিউবের প্রতি একটা ভালোবাসাও তৈরি হয়ে গেছে। কারণ একটা নাটক তৈরিতে গড়ে দুই থেকে তিন লাখ টাকা লাগে। যেটা ইউটিউবে ছাড়লে খুব দ্রুতই সেই টাকা চলে আসছে। কখনো কখনো ১০ থেকে ১৫ লাখও আসে। কারো কোনো কথা না শুনে নিজের ইচ্ছা মতো কাজ করে লাভবান হওয়া যাচ্ছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে নতুন নির্মাতারা শুধু ইউটিউবকেন্দ্রিক হচ্ছে না, পুরনো নির্মাতারাও হচ্ছে। একইসঙ্গে নির্মাতাদের কাজগুলো কোথাও দিতে না পারলে কিন্তু ইউটিউব ছাড়া কোনো গতিও নেই। আগে লোকসান দিতে দিতে নির্মাতারা পথে বসে যেতো। এখন অন্তত সেই পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হচ্ছে কিছুটা হলেও। ফলে বর্তমানে বড়ো বড়ো টেলিভিশন চ্যানেলগুলোও ইউটিউব রাইট রেখে দিতে চায়। এটার একটা স্পেসিফিক কারণ হলো, লং টার্মে ওই কনটেন্ট থেকে বিজনেস করা।

তবে তরুণ নির্মাতা শরীফ নাসরুল্লাহর ভাষ্য ভিন্ন। তিনি মনে করেন, নাটকের ক্ষেত্রে আগে যে ধরনের বাজেট দেওয়া হতো সেটা এখন প্রযোজক, টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রিগুলো কমিয়ে দিয়েছে। কারণ তারা নাটকে আগের মতো স্পন্সর পাচ্ছে না। আবার টেলিভিশনে নানা ধরনের যে বিধিনিষেধ থাকে সেটা ইউটিউবে না থাকায় স্বস্তির পাশাপাশি মিলিয়ন মিলিয়ন ভিউয়ের মাধ্যমে অনেক বড়ো অঙ্কের টাকা ইনকাম করতে পারছে। ফলে বর্তমানে টিভির দিকে না ছুটে নির্মাতা ও প্রযোজক দুই গ্রুপই ইউটিউবের দিকে ছুটছে বলে তিনি মনে করেন।

দ্বিতীয়ত, ইউটিউবমুখী হওয়ার অন্যতম আরেকটি কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, আগের মতো এখন মানুষ আর তেমন টিভি দেখে না। যারা টিভিতে নাটক নেয়, তারা  ইউটিউবের জন্যও সেটা কিনতে চায়। আবার অনেকে একবার টিভিতে কিছু টাকার বিনিময়ে দেখিয়ে পরে নিজের ইউটিউব ও ফেসবুক পেইজে সেটা রিলিজ করে। ইউটিউব এখন টেলিভিশনের চেয়ে বেশি মানুষ দেখে। ফলে এখান থেকে একটা বড়ো অংশের টাকা চলে আসে। লোকসানের ভয় কমে গেছে। ফলে ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর কারণেই বর্তমানে নাটক ও কনটেন্ট ক্রিয়েটাররা আরো আগ্রহী হয়ে উঠছে। ইউটিউবে প্রযোজক, নির্মাতারা অনেক বেশি স্বাধীন। টাকা ইনকামের ক্ষেত্রে, আবার খরচ করার ক্ষেত্রেও।

তবে নির্মাতা হাসান নাসরুল্লাহ মনে করেন, পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র মুক্তি দেওয়ার জন্য ইউটিউব এখনো উপযুক্ত প্লাটফর্ম হয়ে ওঠেনি। কারণ ইউটিউবের মাধ্যমে ফিচার ফিল্মের বাজেট দ্রুত উঠানো সম্ভব না। তিনি বলেন, একটা ফিচার ফিল্ম নির্মাণ করতে ৭০ লাখ টাকা লাগে মিনিমাম। যদি আপনি নরমালও ধরেন। কিন্তু সেইটা ইউটিউব থেকে উঠানো কঠিন। যেটা হয় সেটা হলো ইউটিউবের রাইটস দিয়ে দেওয়া। যেমন চ্যানেল আই টিভি চ্যানেলেও দেখালো আবার তাদের ইউটিউব চ্যানেলেও মুক্তি দিয়ে দিলো। আবার কেউ কেউ বিকল্প চলচ্চিত্র নির্মাণ করছে, সেগুলো অন্য কোথাও বিক্রি করতে না পেরে ইউটিউব চ্যানেলে দিয়ে দিচ্ছে কিছু টাকার বিনিময়ে বা নিজেদের ইউটিউব চ্যানেলে মুক্তি দিচ্ছে। তবে ইউটিউব নিঃসন্দেহে তরুণ নির্মাতাদের জন্য সহায়ক হিসেবে কাজ করছে। তাই ইউটিউবের কনটেন্ট গল্প, ভাষা ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার দিকে আলাদা নজর দেওয়া জরুরি। কারণ ভিউয়ের পেছনে ছুটতে গিয়ে নির্মাতারা দেখে কোন বিষয়ে মানুষের আগ্রহ; সেগুলোতে ঝুঁকতে গিয়ে সৃজনশীলতা হারিয়ে অনুপস্থিত থেকে যাচ্ছে।

চলচ্চিত্র নির্মাণের কৌশল বদলে দিচ্ছে পশ্চিমা ইউটিউবাররা

হলিউডে সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে ব্যাকরুমসঅবসেশন নামের দুটি আলোচিত চলচ্চিত্র। হলিউড বক্স অফিসে রমরমিয়ে ব্যবসা করছে বিশোর্ধ্ব দুই তরুণের এই দুই চলচ্চিত্র। যারা মূলত ইউটিউবে ভিডিও বানিয়েই চলচ্চিত্রে নেমেছে। গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা যায়, অপেক্ষাকৃত কম বাজেটে তৈরি এসব চলচ্চিত্রের প্রচার চালানো হয়েছিলো অনলাইনেই। চলচ্চিত্র দুটি মুক্তির পর দেখা গেছে, যেসব কিশোর-তরুণ সাধারণত চলচ্চিত্র দেখতে প্রেক্ষাগৃহে যায় না, তারাও এখন এই চলচ্চিত্রগুলো দেখতে দলে দলে প্রেক্ষাগৃহে ছুটছে। বিষয়টি হলিউডের বাঘা বাঘা নির্মাতা-প্রযোজকদেরও নজর কেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছে, বড়ো বড়ো স্টুডিওগুলো এখন এই ইউটিউবারদের চলচ্চিত্র নির্মাণের মডেলই অনুকরণ করবে।

২৬ বছর বয়সি কারি বার্কার পরিচালিত অবসেশন প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় ২০২৫-এর ১৫ মে। মাত্র সাড়ে সাত লাখ ডলার বাজেটে নির্মিত এই ডার্ক কমেডি হরর চলচ্চিত্রটি এখন পর্যন্ত প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ফোকাস ফিচারস এবং ব্লামহাউস প্রোডাকশনের জন্য এটা একটি অভাবনীয় ব্যবসায়িক সাফল্য। এরপর মুক্তি পায় ২০ বছর বয়সি কেইন পার্সনস পরিচালিত ব্যাকরুমস। সাইকোলজিকাল হরর ঘরানার এই চলচ্চিত্রটি উইকএন্ডের বক্স অফিসে শীর্ষস্থান দখল করে নেয়। এটা উত্তর আমেরিকায় প্রায় ৮০ মিলিয়ন এবং বিশ্বজুড়ে ১২০ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে। এই চলচ্চিত্র দেখতে মূলত নতুন প্রজন্মের দর্শকরাই বেশি ভিড় করেছে।

বেশিরভাগ চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রেই আয়ের বড়ো অংশ আসে মুক্তির প্রথম সপ্তাহে, এরপর টিকিট বিক্রি ধীরে ধীরে কমতে থাকে। কিন্তু অবসেশন-এর ক্ষেত্রে উল্টো ঘটনা ঘটছে। বড়োদিনের ছুটির সময় মুক্তি পাওয়া চলচ্চিত্রগুলো বাদ দিলে, ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দের পর অবসেশন প্রথম কোনো চলচ্চিত্র, যার দ্বিতীয় ও তৃতীয় সপ্তাহে বক্সঅফিস আয় আগের চেয়ে বেড়েছে। এর পেছনে বড়ো কারণ হলো নতুন প্রজন্ম এসব তরুণ ইউটিউবারদের কাজের সঙ্গে নিজেদের মেলাতে পারে। ফলে অনেকেই মনে করে, এই অভাবনীয় সাফল্য দেখে হলিউডের বড়ো স্টুডিওগুলো এখন পরবর্তী সেরা নির্মাতাকে খুঁজতে অনলাইন ভিডিও সাইটগুলোতে চষে বেড়াবে। এমনকি এর ফলে স্টুডিওগুলোর কর্তারা হয়তো চেনা ফ্র্যাঞ্চাইজ বা সিক্যুয়ালের বদলে নতুন বা মৌলিক কনসেপ্টের ওপর বেশি কাজ করবে। দ্য হলিউড রিপোর্টার-এর স্টিভেন জেইচিক-এর ভাষ্য, ইউটিউবারদের এই সাফল্যগুলো হলো পুরোনো ধাঁচে চলা স্টুডিও ব্যবস্থার পতনের প্রথম ইঙ্গিত বা অন্তত এর নড়বড়ে অবস্থার প্রমাণ।

কিন্তু বাংলাদেশে এ পরিস্থিতির সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থা চলছে। ইউটিউবাররা চলচ্চিত্রে আসার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠিত অনেক নির্মাতা, অভিনয়শিল্পী, প্রযোজকরাই ইউটিউবমুখী হচ্ছে। যদিও বাস্তবতার নিরিখে চলচ্চিত্রের ক্ষুদ্র-বাজার, প্রেক্ষাগৃহ ও অর্থের সঙ্কট থাকলেও তাদের চেষ্টায় যে ঘাটতি রয়েছে, সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। একইসঙ্গে পশ্চিমা ইউটিউবাররা ইউটিউবকে চলচ্চিত্রনির্মাতা হওয়ার প্রাথমিক প্লাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করলেও দেশের নির্মাতারা সেটাকে দ্রুত অর্থ উপার্জনের ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করছে বলেই মনে হয়েছে।

তবে তা-ই হোক

প্রযুক্তির উন্নয়নে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো চলচ্চিত্র-নাটক-কনটেন্ট নির্মাতাদের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে দেখা দিয়েছে। একসময় অর্থের অভাবে অনেকে সারাজীবন একটি চিত্রনাট্য নিয়ে ঘুরে বেড়ালেও সেটা নির্মাণ ও দর্শকের কাছে নিয়ে যেতে পারেনি। কিন্তু বর্তমানে সেই পরিস্থিতি বদলেছে। ফলে চিত্রনাট্য ভালো হলে সেটা দর্শকের কাছে নিয়ে যাওয়ার সুযোগও তৈরি হয়েছে। বড়ো বড়ো প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের প্রতিষ্ঠানের প্রমোশনের জন্য চলচ্চিত্র-নাটক-কনটেন্ট নির্মাতাদের সঙ্গে চুক্তি করছে। একটা শটে নিজেদের পণ্যের প্রদর্শনের জন্য পুরো কনটেন্ট নির্মাণে অর্থায়ন করছে। কারণ তারাও দ্রুত ব্যাপক দর্শকের কাছে পৌঁছানোর মাধ্যম হিসেবেই ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে একটি উপায় হিসেবে মনে করে। কিন্তু ভিউয়ের চক্করে সবকিছুই একটা খাতে পড়ে গেছে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র-নাটক নির্মাতারাও সামাজিক মাধ্যম হিসেবে ইউটিউবকে যথেষ্ট ইতিবাচক হিসেবে ব্যবহার করতে পারেনি।

মনে রাখা জরুরি, এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো ব্যবহার করেই দেশে স্বৈরাচারমুক্ত করা সম্ভব হয়েছে। এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে নেপালের মতো বিভিন্ন দেশের সরকারেরও পতন হয়েছে। ফলে এই মাধ্যমগুলো ব্যবহার করেও ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান বিনোদনজগতে নিজের ও স্বদেশের আইডেন্টিটি গড়ে তুলতে পারে। নতুবা সময়ের ব্যবধানে নির্মিত কনটেন্ট কেবল ফুটেজ ছাড়া আর কিছুই গণ্য হবে না। আর এ জন্য গল্পে জীবনবোধ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুস্থ বিনোদনের বিষয়েই জোর দেওয়া জরুরি। আর ইউটিউব যেহেতু দীর্ঘমেয়াদি প্লাটফর্ম, ফলে ভিউ ও অর্থ এমনিতেই ধরা দিবে। সেটা কেবল সময়ের অপেক্ষা!

লেখক : ইব্রাহীম খলিল, চলচ্চিত্রবিষয়ক লেখক, সাংবাদিক ও গবেষক।

ibrahimrumcj@gmail.com

https://www.facebook.com/ibrahimmcj


তথ্যসূত্র ও টীকা

১. খান, জাহিদ হোসাইন; ইউটিউব দেখে শেষ করতে কত দিন লাগবে; প্রথম আলো; দেখুন : https://www.prothomalo.com/technology/cyberworld/98y99nrqzu; retrieved on: 10.12.2025

২. প্রাগুক্ত; খান।

৩. How Much YouTube Pays for 1 Million Views in 2026?’; দেখুন : https://www.nexlev.io/youtube-pay-per-1-million-views; retrieved on:10.12.2025

৪. ‘Most Viewed Bangla Natok (10+ Million …’; দেখুন : https://www.youtube.com/playlist?list=PLizEqzsgQvPrPpVN1KXRHTw9GdHSKmFII; retrieved on:10.12.2025

৫. নাটকে বেশি অভিনয়ের কারণ জানালেন নিলয় আলমগীর; দেখুন https://www.youtube.com/watch?v=nwcazQats6g; retrieved on:10.12.2025

৬. এ প্রবেন্ধর জন্য তরুণ নির্মাতা ও প্রযোজক হাসান তারেকের সঙ্গে গত ১৯ জুন ২০২৬ বেলা ১১টায় দীর্ঘ আলাপ করেন লেখক।

৭. লেখক এ প্রবন্ধের জন্য নির্মাতা শরীফ নাসরুল্লাহর সঙ্গে গত ১৯ জুন ২০২৬ দুপুর তিনটায় এই সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। যেখানে ইউটিউবকেন্দ্রিক চলচ্চিত্র-নাটক নির্মাণ নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়।

৮. “‘ব্যাকরুমস, অবসেশন: হলিউড বক্স অফিস কাঁপাচ্ছেন জেনজি ইউটিউবাররা, বদলে দিচ্ছেন সিনেমা তৈরির চেনা পথ; দেখুন https://www.tbsnews.net/bangla/entertainment/news-details-496951; retrieved on:24.06.2026



এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন