তানজীদ তনয়
প্রকাশিত ২৯ জুন ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
বিশ্ব চলচ্চিত্রে নতুন হাওয়া : সিনেমাটিক ইউনিভার্সের উত্থান
তানজীদ তনয়

ভূমিকার পরিবর্তে
গত দুই দশকে বিশ্ব চলচ্চিত্রে যে পরিবর্তনটি সবচেয়ে দৃশ্যমান, তা হলো ‘সিনেমাটিক ইউনিভার্স’ নামের এক নতুন গল্প বলার পদ্ধতির আবির্ভাব। একটা সময় একটি চলচ্চিত্র মানে একটি গল্পের শুরু থেকে শেষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো। কখনো তার সিক্যুয়াল, প্রিক্যুয়াল হতো। কিন্তু আধুনিক সময়ে চলচ্চিত্র তার সেই গৎবাঁধা সীমানা ভেঙে এক বিশাল, আন্তঃসংযুক্ত জগতের রূপ নিতে শুরু করেছে। যেখানে প্রতিটি চরিত্র, প্রতিটি ঘটনা, এমনকি একটা ছোট্ট দৃশ্যও বৃহত্তর কোনো গল্পের সঙ্গে সম্পর্কিত। যেনো এক বিশাল মহাবিশ্ব, যার প্রতিটি নক্ষত্রই একটা আলাদা চলচ্চিত্র, আর সবগুলোকে মিলিয়ে তৈরি হয়েছে পুরো মহাকাশ।
এই ধারণাই আজ ‘সিনেমাটিক ইউনিভার্স’ নামে পরিচিত। এটা কেবল গল্প বলার কৌশল নয়; পুরো এক কাল্পনিক দুনিয়া নির্মাণ, যা দর্শকের অভিজ্ঞতাও পাল্টে দিয়েছে। আগে দর্শক কোনো একটা চলচ্চিত্র দেখে বেরিয়ে এসে সেই অভিজ্ঞতাকে একটা বাক্সে তুলে রাখতো। এখন তারা একটি চলচ্চিত্র দেখে সেই অভিজ্ঞতাকে মাথায় রাখে বৃহত্তর গল্পের একটা খণ্ড, একটা সূত্র বা একটা ইঙ্গিত হিসেবে; যা ভবিষ্যতের আরো অনেক ঘটনার সঙ্গে যুক্ত। ফলে চলচ্চিত্র দেখা নিছক কোনো সাময়িক বিনোদন হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই। এটা পরিণত হয়েছে অনুসন্ধানের, অপেক্ষার এবং চরিত্রদের সঙ্গে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতায়।
হলিউডে এই ধারার সূচনা ঘটেছে কমিক্সভিত্তিক সুপারহিরো গল্পের হাত ধরে। মার্ভেল সিনেমাটিক ইউনিভার্স (M C U) এর অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়ে দিয়েছে, পরিকল্পনা ও ধারাবাহিকতার মাধ্যমে একাধিক চলচ্চিত্রকে এক বৃহত্তর ন্যারেটিভ বা গল্পে জুড়ে রাখা সম্ভব। দর্শকের আগ্রহও এতে বেড়ে যায়, কারণ তারা একদিকে একটা পরিচিত জগতের মধ্যেই বিভিন্ন মাত্রার চরিত্র ও গল্পের স্বাদ পায়, অন্যদিকে এক ক্রমবর্ধমান বৃহত্তর গল্পের বুননে জড়িয়ে যায়। নতুন চরিত্র, নতুন সংঘাত এবং ভবিষ্যতের রহস্য তাদের কৌতূহল বাঁচিয়ে রাখে। ডি সি ইউনিভার্স (D C U), ইউনিভার্সাল পিকচার্স-এর মনস্টার ইউনিভার্স কিংবা কনজ্যুরিং সিরিজ, এর সবই প্রমাণ করে যে সিনেমাটিক ইউনিভার্স বৈশ্বিক গল্প বলার এক আলাদা ঘরানা হয়ে উঠেছে।
বিশ্বায়নের ফলেই কিনা হলিউডের সেই হাওয়া এসে লেগেছে এশিয়ার চলচ্চিত্রাঙ্গনের পালেও। ভারত, জাপান, থাইল্যান্ড সব জায়গায়ই এখন নিজেদের সংস্কৃতি, পুরাণ, ইতিহাসকে কেন্দ্র করে নির্মিত হচ্ছে নতুন নতুন মহাবিশ্ব। লোকেশ কানাগারাজ-এর লোকেশ সিনেমাটিক ইউনিভার্স (L C U) কিংবা রোহিত শেঠির কপ ইউনিভার্স—এসব উদাহরণ দেখায় যে কেবল অনুকরণ বা অবলম্বন নয়, বরং আঞ্চলিক ইন্ডাস্ট্রির ভেতর থেকেও জন্ম নিচ্ছে স্বতন্ত্র সব ইউনিভার্স। বাংলাদেশও এই প্রবণতা থেকে দূরে নয়। যদিও এখানকার চলচ্চিত্রশিল্প এখনো পরিকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে চলছে, তবে ওটিটি (OTT) প্লাটফর্মের উত্থান গল্প বলায় নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। তরুণ দর্শক এখন এম সি ইউ, ডি সি ইউ কিংবা ভারতীয় সিনেমাটিক ইউনিভার্সগুলোর সঙ্গেও পরিচিত। ফলে তাদের মধ্যে গল্পের ধারাবাহিকতা, চরিত্রের পুনরাবির্ভাব, আর একটা বৃহত্তর জগতের প্রতি আকর্ষণ জন্মেছে। বাংলা সাহিত্য, মুক্তিযুদ্ধ, লোককথা, সমসাময়িক থ্রিলার কিংবা শহুরে ড্রামা সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশেরও রয়েছে নিজের একটা সিনেমাটিক ইউনিভার্স গড়ে তোলার সম্ভাবনা।
সবমিলিয়ে সিনেমাটিক ইউনিভার্স কেবল চলচ্চিত্রশিল্পের নতুন পথই নয়, এটা আধুনিক মানুষের কল্পনারও নতুন ঠিকানা। যেখানে দর্শক শুধু গল্প দেখে না; গল্পের ভেতর প্রবেশ করে, চরিত্রদের সঙ্গে পথ হাঁটে, আর অপেক্ষা করে সেই মহাবিশ্বের পরবর্তী ভোরের।
সিনেমাটিক ইউনিভার্স কী
চলচ্চিত্র জগতে কোনো একটি চরিত্রের সেই চলচ্চিত্রের গল্পকে ছাপিয়ে যাবার ব্যাপার নতুন নয়। ধীরে ধীরে অনেক চরিত্রই দর্শক মহলে আলাদা একটা জনপ্রিয়তা তৈরি করে। অনেক চলচ্চিত্রের গল্পের মূল লক্ষ্যই থাকে প্রধান চরিত্রের জীবনের চড়াই-উৎরাই তুলে ধরা। কিন্তু যখনই দেখা যায়, একই চলচ্চিত্রের একাধিক চরিত্রকে নিয়ে একাধিক চলচ্চিত্র নির্মাণ হচ্ছে, কিংবা একাধিক চলচ্চিত্রের কেন্দ্রীয় চরিত্র একই দুনিয়ায় অবস্থান করছে, তখন সেই চলচ্চিত্রগুলো হয়ে ওঠে এক আলাদা জগৎ বা দুনিয়ার অংশ। ধীরে ধীরে তৈরি হয় সিনেমাটিক ইউনিভার্স। উদাহরণ টানতে গেলে সবার আগেই আসবে বর্তমান সময়ের অত্যন্ত জনপ্রিয় মার্ভেল সিনেমাটিক ইউনিভার্স। ধীরে ধীরে হলিউডে বিস্তার লাভ করছে এমন অসংখ্য ইউনিভার্স বা চলচ্চিত্রের দুনিয়া। এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশের পাশাপাশি ভারতেও ব্যাপক হারে ইউনিভার্স গড়ে উঠছে। সাম্প্রতিক বাংলাদেশের চলচ্চিত্র তাণ্ডব (২০২৫) এর শেষ দৃশ্যে আরেকটি চলচ্চিত্র সুড়ঙ্গ (২০২৩) এর সঙ্গে যে যোগাযোগ দেখানো হয়েছে, তাতে এখানে যে একটা সিনেমাটিক ইউনিভার্স তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
সিনেমাটিক ইউনিভার্সের উৎপত্তি খুঁজতে গেলে প্রসঙ্গ আসবে কমিক্স ইউনিভার্সের; যেখানে একাধিক সুপারহিরো একই দুনিয়ার অংশ। শুধু তাদের কাজের এলাকা আলাদা। যেমন ব্যাটম্যান যেখানে গথ্যামে বিচরণ করে, সুপারম্যান-এর কাজের এলাকা মেট্রোপলিস। এই দুই কাল্পনিক শহর গথ্যাম আর মেট্রোপলিস কিন্তু একই দুনিয়ার অংশ। মার্ভেল সিনেমাটিক ইউনিভার্সের সূচনাও কিন্তু হয়েছে মার্ভেল কমিক্স ইউনিভার্সকে সিনেমার পর্দায় আনার মাধ্যমেই।
মার্ভেল সিনেমাটিক ইউনিভার্স একের পর এক সুপারহিরোকে নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণে প্রথমেই দাবার বোর্ড সাজিয়ে নিয়েছিলো। তারপরে অ্যাভেঞ্জার্স চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো এক চলচ্চিত্রে এতো বড়ো ক্রসওভার১ করিয়ে সিনেমাটিক ইউনিভার্সের চাল দিয়েছিলো। সেইসঙ্গে চলচ্চিত্রের দুনিয়ায় শুরু হলো এক নতুন প্রচলন। কয়েকটি চলচ্চিত্রের মূল চরিত্র আলাদা, তাদের নিজস্ব গল্পগুলো আলাদা, চলার পথও আলাদা, কিন্তু কোথাও না কোথাও তাদের চলার পথে কিছু মুহূর্তের জন্যেও এক হয়ে যাচ্ছে। কিংবা তারা অন্য কোনো চলচ্চিত্রে পার্শ্বচরিত্রের ভূমিকায় চলে আসছে কিছু মুহূর্তের জন্য। আবার ক্রসওভার হলেই সেখানে অফিসিয়ালি ইউনিভার্স তৈরি হয় না। তবে চরিত্রগুলো যে একই ইউনিভার্সের অংশ, সেইটা স্পষ্ট হয় ক্রসওভারের মাধ্যমেই। আবার স্পিনঅফ২ আর সিনেমাটিক ইউনিভার্সের মধ্যকার সীমারেখা নিয়েও একটা ধোঁয়াশা রয়েই যায়। ঠিক কোন মুহূর্তে স্পিনঅফ সিনেমাটিক ইউনিভার্সে পরিণত হয়, তাও একটা বড়ো প্রশ্ন।
তবে সিনেমাটিক ইউনিভার্স কেনো এতোটা জনপ্রিয়, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাটাই সম্ভবত বেশি জরুরি। বলা হয়, সিনেমাটিক ইউনিভার্সে গল্প বলার ধরনে একটা সামঞ্জস্যতা থাকে। সেইসঙ্গে ছোটো ছোটো অসংখ্য গল্পকে এক জায়গায় এনে বড়ো একটা গল্প সাজিয়ে ফেলা যায়। কিন্তু ইউনিভার্স নির্মাণের জায়গায় চলচ্চিত্রের গল্প বলার চেয়ে বিপণনের জায়গা থেকে চিন্তা করলেই বরঞ্চ ভালোভাবে বোঝা যাবে। যেখানে একটা চলচ্চিত্রের মাধ্যমে কয়েকটি চলচ্চিত্রের মায়াজালে দর্শককে অনেকটা সহজভাবে বেঁধে ফেলা যায়।
ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম সিনেমাটিক ইউনিভার্স নির্মাণের ঘোষণা আসে নির্মাতা রোহিত শেঠি’র কাছ থেকে। কিন্তু তার ইউনিভার্সের সূচনা হয়েছিলো দক্ষিণ ভারতের একটি চলচ্চিত্রের রিমেক থেকে। স্বকীয়তার জায়গা থেকে তাই এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। অন্যদিকে তুলনামূলক পরে ঘোষণা দিলেও যশ রাজ ফিল্মস (Y R F) এর চেয়ারম্যান আদিত্য চোপড়া’র হাতে নির্মিত ওয়াই আর এফ স্পাই ইউনিভার্স সেই তুলনায় অনেক বেশি সফলতা এবং জনপ্রিয়তা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলো। স্বকীয়তার দিক থেকেও এর কোনো সমস্যা ছিলো না। তাদের শুরুটা হয়েছিলো এক থা টাইগার (২০১২) দিয়ে, যার সিক্যুয়াল টাইগার জিন্দা হ্যায় মুক্তি পায় ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে। এরপর ওয়াই আর এফ-এর ব্যানারে আসা ওয়ার (২০১৯), যার সঙ্গে টাইগার চরিত্রের গল্পের কোনো সম্পর্ক তখনো ছিলো না। স্পাইদের জীবনের রোমাঞ্চকর সব গল্প তুলে ধরতে আদিত্য চোপড়া নিয়ে আসেন পরবর্তী চলচ্চিত্র পাঠান (২০২৩)। কিন্তু এর মধ্যেই তার মাথায় চলে এসেছিলো ইউনিভার্স বানিয়ে ফেলার আইডিয়া। পাঠান মুক্তি পাবার আগেই তিনি ঘোষণা দেন যে, তার তিন স্পাই টাইগার, কবির আর পাঠান একই দুনিয়ার অংশ। তার ফলস্বরূপ দর্শক পাঠান-এ দেখতে পায় টাইগার-এর সক্রিয় ভূমিকা।
আবার পাঠান চলচ্চিত্রের খলনায়ক জিম চরিত্রের দক্ষতা বোঝানোর জন্য তার সঙ্গে তুলনা করা হয় ওয়ার-এর কেন্দ্রীয় চরিত্র কবির-এর। মোটামুটি পর্যায়ে তিনটি চলচ্চিত্রের কাহিনির পাশাপাশি সহাবস্থানের ব্যাপারটাও পরিষ্কার হয়ে আসে। এই তিনটি চলচ্চিত্র যে একই ইউনিভার্সের অংশ, সেটা দর্শকের মাথায় রাখার জন্যই হয়তো আবার টাইগার থ্রি (২০২৩) এর মধ্যে টাইগারকে উদ্ধারে আনা হয় পাঠানকে। সেইসঙ্গে পোস্ট-ক্রেডিট সিনে৩ কবিরকে দেখানোর মাধ্যমে ওয়ার টু (২০২৫) এর একটা প্রমোশনও হয়ে যায়।
মূলত ব্যাপারটি এখানে এসেই দাঁড়ায় যে, সিনেমাটিক ইউনিভার্স নির্মাণের মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রগুলো আর কেবল চলচ্চিত্র থাকে না, একটা ফ্র্যাঞ্চাইজি বা ব্র্যান্ডে পরিণত হয়। আবার শেয়ার্ড ইউনিভার্সের মতো বেশকিছু গল্পের খাপছাড়া সম্পর্কের থেকে সিনেমাটিক ইউনিভার্সের সামঞ্জস্যপূর্ণ গল্প দর্শকের কাছে বেশি আকর্ষণ তৈরি করে।
সামঞ্জস্যতার জায়গা থেকেই কিনা, কিংবা গল্প বুননের জায়গা থেকে সিনেমাটিক ইউনিভার্সের চাকচিক্য কিছুটা বেশি। এখন গল্প বুননের কৌশল চলচ্চিত্র আর তার নির্মাতার ওপরে নির্ভর করে। কিন্তু সিনেমাটিক ইউনিভার্সের মাধ্যমে একটা বড়ো পরিসরের গল্পকে সাজানোর অনেকটা সময় পাওয়া যায়। একটা চলচ্চিত্রে বড়ো গল্পকে চাপিয়ে বলার চেয়ে কয়েকটা চলচ্চিত্রে সময় নিয়ে ক্ষেত্র সাজিয়ে নির্মাণ করাটা নির্মাতা আর দর্শক উভয়ের জন্যেই আরামদায়ক হয়। তবে প্রশ্নটা সিনেমাটিক ইউনিভার্সের তকমাগত জায়গায়। বিভিন্ন চরিত্রের একই দুনিয়ায় অবস্থান অর্থাৎ শেয়ার্ড ইউনিভার্স, আর ক্রসওভারের ব্যাপারটা তো নতুন নয়। সেক্ষেত্রে আলাদাভাবে সিনেমাটিক ইউনিভার্সের নামে ক্ষেত্র সাজানোর উদ্দেশ্য শুধু গল্প বলা—সেই যুক্তিটা আর খাটছে না।
মার্ভেল যখন সিনেমাটিক ইউনিভার্স তৈরি করলো, তখনই কিন্তু তার প্রতিযোগীদের মধ্যে সেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। কিন্তু অ্যাভেঞ্জার্স (২০১২) মুক্তি পাবার সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যপট পাল্টে যেতে দেখা যায়। ধীরে ধীরে অন্যান্য প্রযোজনা সংস্থাও এই প্রতিযোগিতায় নেমে যায়। ওয়ার্নার ব্রাদার্স নেমে পড়ে তাদের ডি সি এক্সটেন্ডেড ইউনিভার্স নির্মাণে। কমিক্সের দুনিয়ায় ডি সি এগিয়ে থাকলেও মার্ভেলের কাছে চলচ্চিত্র জগতে ইউনিভার্স ডেভেলপমেন্টে পিছিয়ে পড়তে হয়। এই পিছিয়ে পড়ার ক্ষেত্রেও লক্ষণীয় যে জিনিসটা কাজ করেছে, তা হলো মুনাফার অঙ্ক। লাভের জায়গা থেকে ডি সি বাজারে সেই জায়গাটা সেভাবে ধরতেই পারেনি; যে জায়গাটা মার্ভেল দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় ধরতে সমর্থ হয়েছে। যদিও ডি সি তাদের হাল ছাড়ছে না। কিন্তু তাদের চলচ্চিত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবটা স্পষ্ট। আর সিনেমাটিক ইউনিভার্সের এই প্রতিযোগিতায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে দর্শক মহলে উত্তেজনা রাখাটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একটি চলচ্চিত্র মুক্তি পাওয়ার পর থেকে আরেকটি মুক্তি পাওয়ার মধ্যকার লম্বা সময়টায় দর্শকের মধ্যে আলাদাভাবে কোনো আকর্ষণ বা উত্তেজনা ধরে রাখার প্রয়োজন পড়ছে না। একই ইউনিভার্সের অংশ তিন চরিত্রের গল্প পরপর চলচ্চিত্র আকারে মুক্তি পাচ্ছে। দর্শকের উত্তেজনাতে তেমন একটা ভাটা পড়ছে না। সেইসঙ্গে চলচ্চিত্র হয়ে উঠছে ব্যবসাসফল।
এই জায়গা দেখতে গেলে সিনেমাটিক ইউনিভার্স নির্মাণ ও প্রচারের মূলে গল্প বলার উদ্দেশ্যের থেকেও বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য বেশি ছিলো বলা যায়। সেদিক থেকে চিন্তা করতে গেলে সিনেমাটিক ইউনিভার্সের বিপণনের দিকগুলো আরেকটু পরিষ্কার হয়ে উঠে। আগেই বলা হয়েছে, এ পদ্ধতিতে ইউনিভার্সগুলো শুধু আর চলচ্চিত্র থাকছে না, ব্র্যান্ড হয়ে উঠছে। তাদের প্রদর্শনীতেও তার ছাপ সুস্পষ্ট। ইউনিভার্স হিসেবে আত্মপ্রকাশের আগ পর্যন্ত ওয়াই আর এফ স্পাই ইউনিভার্সের চলচ্চিত্রগুলোতে তার কোনো ছাপ দেখা যায়নি। কিন্তু পাঠান (২০২৩) এর শুরুতেই ইউনিভার্সের নাম ঘটা করে দেখানোর মাধ্যমে এই প্রচলন শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে টাইগার থ্রি (২০২৩) ও ওয়ার টু (২০২৫) চলচ্চিত্রেও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হয়েছে। যদিও এইভাবে প্রতিটি চলচ্চিত্রের শুরুতে সিনেমাটিক ইউনিভার্সের নাম ঘোষণার চল মার্ভেলের-ই আছে। এখন এসে দেখা যাচ্ছে, একবার ইউনিভার্সের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে তার প্রতিটি চলচ্চিত্রের শুরুতে সেই ইউনিভার্সের সিল বা লোগো প্রদর্শনের মাধ্যমে চলচ্চিত্রটির একটি ভিন্ন আইডেন্টিটি তৈরি করে দিচ্ছে। অথবা বলা যায়, একটা কালেক্টিভ আইডেন্টিটির৪ অংশ হিসেবে সেই চলচ্চিত্রকে প্রদর্শন করছে। এখন এই কালেক্টিভ আইডেন্টিটিকে ব্র্যান্ডের থেকে কোনো অংশেই কম করে দেখার সুযোগ নেই।
অবশ্য ব্র্যান্ড নিয়ে কথা তুলতে গেলে সেখানে মার্কেট, মুনাফা আর কনজিউমারের একটা সমীকরণ চলে আসবে। চলচ্চিত্র ব্র্যান্ডের অংশ হয়ে গেলে তখন দর্শক আর শুধু দর্শক থাকে না, সে হয়ে ওঠে ভোক্তা। চলচ্চিত্র থেকে সিনেমাটিক ইউনিভার্স হয়ে উঠলে দর্শকের মধ্যে একটা ব্র্যান্ডভিত্তিক আনুগত্য চলে আসে। একে ফ্যানডম৫ হিসেবে ধরা গেলেও দিনশেষে সেখানেও আনুগত্যতাই থাকে। দর্শক তখন আর চলচ্চিত্র দেখতে যায় না, তারা একই সুতোয় বাঁধা গল্পের সম্প্রসারণ দেখতে যায়। তার মধ্যে গল্প জানার যে আগ্রহ থাকে, তা এক্ষেত্রে ধীরে ধীরে পরিণত হয় চাহিদা আর প্রত্যাশায়। ব্র্যান্ড হয়ে ওঠা সিনেমাটিক ইউনিভার্সের ওপরে তখন চাপ বাড়তে থাকে গল্প বলার ধরন এবং মান বৃদ্ধি না করলেও অন্তত যা ছিলো তা ধরে রাখার। সিনেমাটিক ইউনিভার্সের সবচেয়ে বড়ো দুর্বলতাও হয়তো এখানেই। দর্শকের মধ্যে অর্থাৎ মার্কেটে যে চাহিদা বা উত্তেজনা তারা তৈরি করছে, তা অনুযায়ী চলচ্চিত্র না নির্মাণ করলে তা ফ্লপের আশঙ্কা বেড়ে যায়। মার্ভেল সিনেমাটিক ইউনিভার্সের সাম্প্রতিক চলচ্চিত্র থান্ডারবোল্টস (২০২৫) ও ওয়াই আর এফ স্পাই ইউনিভার্সের ওয়ার টু (২০২৫) দুইটিই বক্স অফিসে ফ্লপ করেছে। অর্থাৎ সিনেমাটিক ইউনিভার্সের সবচেয়ে বড়ো দুর্বলতা তার গড়ে ওঠার মধ্যেই লুকিয়ে আছে। তবে ইউনিভার্স নির্মাণের অন্যতম উদ্দেশ্য যেহেতু দর্শককে ধরে রাখা, ফলে দুই-একটা চলচ্চিত্রের ফ্লপ হওয়ার মাধ্যমে ইউনিভার্সের মুখ থুবড়ে পড়ার ব্যাপারটা সুনিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
এদিক থেকে মার্ভেল ও ওয়াই আর এফ’কে এক কাতারে আনা যায় না। মার্ভেল সফলভাবে তাদের প্রথম সাগা৬ (২০০৮-২০২২) সম্পন্ন করার পরে দ্বিতীয় সাগার মাঝামাঝি সময়ে থান্ডারবোল্টস (২০২৫) নিয়ে হাজির হয়। নতুন প্রজন্মের সুপারহিরোদের একটা সংঘবদ্ধ দলকে সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্যই এটা তারা করেছে। ক্রসওভারের জায়গা থেকে দেখতে গেলে এটা অ্যাভেঞ্জার্স (২০১২) এর থেকে কোনো অংশেই কম নয়। কিন্তু তবুও বক্স অফিসে ফ্লপ। কারণ দর্শকের মধ্যে মার্ভেলের চলচ্চিত্র নিয়ে যে চাহিদা আর প্রত্যাশা, তা পূরণে এটা ব্যর্থ হয়েছে। সামঞ্জস্য আর বুননের জায়গায় গল্পটা সেভাবে দর্শকের মনে জায়গা করে নিতেই পারেনি। তবে মার্ভেল যেভাবে তাদের মাল্টিভার্স সাগাকে নিয়ে এগোচ্ছে, তাতে এই চলচ্চিত্র ফ্লপ করলেও পরবর্তী চলচ্চিত্রের সফলতার পেছনে হয়তো ভূমিকা রাখতে পারবে।
অন্যদিকে ওয়ার টু (২০২৫) স্পাই ইউনিভার্সের এক কেন্দ্রীয় চরিত্রের দ্বিতীয় গল্প মাত্র। কিন্তু এই গল্প কোনোভাবেই দর্শকের মনে জায়গা করে নিতে পারছে বলে মনে হচ্ছে না। গল্প বলার ধরন এবং গল্পের ধরনের জায়গায় এর ব্যর্থতা এতোটাই বেশি ছিলো যে, হৃতিক রোশন ও এন টি রামা রাও জুনিয়র-এর মতো জনপ্রিয় অভিনয়শিল্পীর উপস্থিতি শুরুর দিকে সাড়া তুললেও তা খুব দ্রুতই হারিয়ে যায়। তবে একটা চলচ্চিত্রের ব্যর্থতায় পুরো ইউনিভার্স ডুবে যাবে, ব্যাপারটা তাও না। মার্ভেলের মতো করে না হলেও ওয়াই আর এফ স্পাই ইউনিভার্সও হয়তো তার পরবর্তী চলচ্চিত্রগুলো থেকে মুনাফা তুলে আনবে।
সিনেমাটিক ইউনিভার্সের গঠন-প্রক্রিয়া
সিনেমাটিক ইউনিভার্সের ইতিহাস দেখতে গেলে তার উৎপত্তি খুঁজে পাওয়া যাবে শেয়ার্ড ইউনিভার্সের ধারণা থেকে। মূলত শেয়ার্ড ইউনিভার্স গড়ে ওঠে যখন একাধিক চলচ্চিত্র বা গল্পের পটভূমির অবস্থান একই ইউনিভার্সে হয়। যেমন ব্যাটম্যান ও সুপারম্যান একই দুনিয়ার দুই শহরে নিজেদের কাজ করে। ব্যাটম্যানের গল্প বলার সময় তার নির্মাতা বা লেখক বা কমিক আর্টিস্টের মূল ফোকাস ব্যাটম্যানের ওপরেই থাকছে। কিন্তু গল্পের স্বার্থে কিংবা ঘটনাক্রমে ওই ইউনিভার্সে থাকা অন্যান্য চরিত্রকে আনা হচ্ছে, কিংবা নাম উল্লেখ করা হচ্ছে। চরিত্রের এই ক্রসওভারের মাধ্যমেই মূলত এটা নিশ্চিত করা হয় যে, সেই চরিত্ররা এক বৃহত্তর শেয়ার্ড ইউনিভার্সের অংশ।
কিন্তু ক্রসওভার হলেই যে সেটা শেয়ার্ড ইউনিভার্স হবে, ব্যাপারটা তাও না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ক্রসওভার শুধু ক্ষণিকের জন্য হলেও, পরবর্তী সময়ে যুক্তিতর্ক দিয়ে আর দুই গল্পের সবকিছুকে মেলানো যায় না। শেয়ার্ড ইউনিভার্সের ক্ষেত্রে সব গল্পের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকাটা বাধ্যতামূলক। যদি কোনো কারণে সামঞ্জস্যতা একেবারেই আনা সম্ভব না হয়, সেক্ষেত্রে যুক্তিযুক্ত ব্যাখ্যা দিয়ে তা আনতে হবে। যেমন, কোনো এক চরিত্রের গল্পে সূর্য নীল হলে, সেই চরিত্রের সঙ্গে যোগসাজশের মাধ্যমে গড়ে ওঠা শেয়ার্ড ইউনিভার্সের অন্যান্য গল্পেও সূর্য নীল-ই হবে। এক্ষেত্রে অন্য গল্পে সূর্য হলুদ করলে যুক্তি দিয়ে দেখাতে হবে যে দুই গল্পের অবস্থান দুই ভিন্ন গ্যালাক্সিতে, অথবা দুই ভিন্ন ডাইমেনশন৭-এ। কমিক্স ইতিহাসবিদ ডন মার্কস্টেইন ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে CAPA-alpha-এর এক আর্টিকেলে৮ সর্বপ্রথম শেয়ার্ড ইউনিভার্সের শর্তাবলি তুলে ধরেন। তার মতে, একটি শেয়ার্ড ইউনিভার্স নির্মাণে পাঁচটি নিয়ম মেনে চলতে হবে :
প্রথমত, চরিত্র ‘ক’ এর সঙ্গে যদি ‘খ’ এর পারস্পরিক যোগাযোগ হয় এবং চরিত্র ‘খ’ এর সঙ্গে যদি ‘গ’ এর যোগাযোগ হয়, তাহলে সেই সূত্র ধরে ‘ক’ এবং ‘গ’ একই ইউনিভার্সের অংশ।
দ্বিতীয়ত, চরিত্রদের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনের ক্ষেত্রে বাস্তব জীবনের কোনো মানুষের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক হিসাব করা যাবে না। তা না হলে এই তর্ক চলে আসবে যে সুপারম্যান আর ফ্যান্টাস্টিক ফোর একই ইউনিভার্সের অংশ; কেননা, সুপারম্যানের সঙ্গে একসময়ের বিখ্যাত মার্কিন প্রেসিডেন্ট কেনেডির দেখা হয়েছে; কেনেডির সঙ্গে আবার নীল আর্মস্ট্রং-এর দেখা হয়েছে; আর্মস্ট্রং-এর সঙ্গে ফ্যান্টাস্টিক ফোরের দেখা হয়েছে। এ রকমের যুক্তি গ্রহণযোগ্য না। কিন্তু এই কাজ করলে বাস্তব চরিত্রযুক্ত যেকোনো গল্প এক ইউনিভার্সে চলে আসবে।
তৃতীয়ত, একাধিক চরিত্রের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনের ক্ষেত্রে এমন কোনো চরিত্রের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা যাবে না, যা একই প্রকাশকের মাধ্যমে সৃষ্ট হয়নি। এর মাধ্যমে পৌরাণিক চরিত্রদের নিজেদের গল্পে কোনো সমস্যা ছাড়াই ব্যবহার করা যাবে। এ নিয়মের বাইরে গেলে তর্ক চলে আসবে যে, যেহেতু সুপারম্যান আর ফ্যান্টাস্টিক ফোরের উভয়ের সঙ্গেই হারকিউলিস-এর সাক্ষাৎ হয়েছে, তাই এদের একই ইউনিভার্সের অংশ হিসেবে ধরা যায়।
চতুর্থত, বাস্তব মানুষের নির্দিষ্ট কাল্পনিক সংস্করণ—যেমন বাস্তব জীবনের কমেডিয়ান জেরি লুইস-এর সঙ্গে ডি সি কমিক্সের দ্য অ্যাডভেঞ্চার অব জেরি লুইস-এ থাকা জেরি লুইসের বিস্তর ফাঁরাক আছে—এমন চরিত্রকে যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। এর উদাহরণ হচ্ছে, মার্ভেল কমিক্সের হারকিউলিসের চরিত্র।
পঞ্চমত, চরিত্রদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ হয়েছে, এটা তখনই ধরা হবে, যদি তারা কমিক্সের একই গল্পের প্যানেলে উপস্থিত থাকে।
শেয়ার্ড ইউনিভার্স যেকোনো মাধ্যমেই অর্থাৎ গল্প, কমিক্স, উপন্যাস, টিভি সিরিজ, অ্যানিমেটেড সিরিজ, কিংবা চলচ্চিত্র—এর যেকোনোটিই হওয়া সম্ভব। সিনেমাটিক ইউনিভার্সের গণ্ডি অবশ্য অডিও-ভিজ্যুয়াল মিডিয়া অর্থাৎ চলচ্চিত্র, অ্যানিমেটেড সিরিজ ও টিভি সিরিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ। শেয়ার্ড ইউনিভার্সের কথা চিন্তা করলে উপন্যাসেই এর শুরু খুঁজে পাওয়া যায়। কমিক্সের দুনিয়ায় এর অস্তিত্ব ১৯৬০-এর দশকে শুরু। শেয়ার্ড ফিকশনাল ইউনিভার্সের আধিক্য টেলিভিশন মাধ্যমে বেশি দেখা গেলে তাকে ‘টেলিভিশন ইউনিভার্স’ বলা যায়। ইন্টারকানেক্টেড ওয়েব সিরিজগুলো এর সবচেয়ে বড়ো উদাহরণ। একইভাবে শেয়ার্ড ইউনিভার্স চলচ্চিত্র পর্যায়ে বেড়ে উঠলে তাকে বলা হয় সিনেমাটিক ইউনিভার্স। কিন্তু বর্তমানে সিনেমাটিক ইউনিভার্সের জনপ্রিয়তার কারণে টেলিভিশন ইউনিভার্সের বৃহত্তর গল্পের কোনো অংশ চলচ্চিত্র হিসেবে আসলে, তা ধীরে ধীরে সিনেমাটিক ইউনিভার্সের দিকেই চলে যায়। আবার সিনেমাটিক ইউনিভার্সের সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেও টেলিভিশন ইউনিভার্সের ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ করা যায়। এম সি ইউ থেকে শুরু করে ভারতীয় সিনেমাটিক ইউনিভার্সেও এর নিদর্শন খুঁজে পাওয়া যায়।
অর্থাৎ সরলভাবে বললে, শেয়ার্ড ইউনিভার্স যখন চলচ্চিত্র পর্যায়ে গড়ে ওঠে, তখন তাকে সিনেমাটিক ইউনিভার্স বলা যায়। সেই সূত্র ধরে সব সিনেমাটিক ইউনিভার্সই একেকটি শেয়ার্ড ইউনিভার্স, কিন্তু সব শেয়ার্ড ইউনিভার্স সিনেমাটিক ইউনিভার্স নয়। শেয়ার্ড ইউনিভার্সের নিয়মগুলো চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে অনেকটা গুরুতরভাবেই মেনে চলা হয়। এমনকি একজন অভিনয়শিল্পীর একই ইউনিভার্সের দুই চরিত্রে অভিনয় করাটাও সিনেমাটিক ইউনিভার্সের নিয়মের পরিপন্থি বলা যায়। যদিও নির্মাতারা অনেক সময় এই নিয়ম মানতে ব্যর্থ হয় এবং এর ফলে দর্শকের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
সিনেমাটিক ইউনিভার্সের গড়ে ওঠার জায়গাটা অবশ্য খুবই কৌতূহল উদ্দীপক। মার্ভেল বা ডি সির ক্ষেত্রে এর উৎস ধরা যায় এর কমিক্সে থাকা শেয়ার্ড ইউনিভার্সকে। অর্থাৎ এক্ষেত্রে এই গল্পের শেয়ার্ড ইউনিভার্স আগে থেকেই ছিলো। ধীরে ধীরে চলচ্চিত্রের পর্দায় এই গল্পগুলো চিত্রায়িত হওয়ার মাধ্যমে সিনেমাটিক ইউনিভার্সে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে ইউনিভার্সাল মন্সটার্স-এর ক্ষেত্রে এই উৎস হচ্ছে বিভিন্ন লেখকের উপন্যাস এবং লোকমুখে প্রচারিত গল্প। উভয়ক্ষেত্রেই শেয়ার্ড ইউনিভার্স চলচ্চিত্রের পর্দায় স্থানান্তরিত হওয়ার মাধ্যমে সিনেমাটিক ইউনিভার্স গড়ে উঠেছে। এই প্রক্রিয়া আবার একদিক থেকে ট্রান্সমিডিয়েশন প্রক্রিয়ার মধ্যেও পড়ছে। কিন্তু সিনেমাটিক ইউনিভার্স গড়ে ওঠার এটাই একমাত্র পন্থা নয়। অনেক সময়ে এর উৎস হয় নির্মাতা বা নির্মাতাদের মাথায় গড়ে ওঠা গল্প। অর্থাৎ একেবারেই নতুন গল্প কয়েকটি চলচ্চিত্রে বেড়ে উঠে ধীরে ধীরে বৃহত্তর গল্পে পরিণত হয়। সাধারণ শেয়ার্ড ইউনিভার্সের সঙ্গে সিনেমাটিক ইউনিভার্সের একটা পার্থক্যও কিন্তু এখানেই। শেয়ার্ড ইউনিভার্সের অসংখ্য চরিত্র ও গল্প একসঙ্গে থাকলেও একটা বৃহত্তর গল্পে তারা একসঙ্গে হবে সেই উদ্দেশ্যে তাদের গল্প সাজানো হয় না। তাদের গল্প নিজেদের মতোই চলতে থাকে। কিন্তু সিনেমাটিক ইউনিভার্সের সেই চরিত্রদের নিজেদের গল্প দেখানো হলেও দিনশেষে তা বৃহত্তর গল্পের গাঁথুনি হিসেবেই ব্যবহৃত হয়।
ট্রান্সমিডিয়েশনের সংজ্ঞা খুঁজতে গেলে সবচেয়ে সরল অর্থ পাওয়া যায়—কোনো এক মাধ্যমের কনটেন্টকে অন্য মাধ্যমে রূপান্তরিত করা। যেমন বই থেকে চলচ্চিত্র বা নাটক নির্মাণ, কিংবা কমিক্স থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণ। অর্থাৎ এক মিডিয়া থেকে কোনো গল্পের একাধিক মিডিয়ায় ছড়িয়ে যাওয়া। এটাকে মোটাদাগে ট্রান্সমিডিয়া স্টোরিটেলিং বলা যায়, যেখানে একাধিক মিডিয়াতে একই গল্পের সম্প্রসারণ ঘটে। মার্শাল ম্যাকলুহান যেখানে বলছেন, ‘মাধ্যমই হলো বার্তা’৯, সেখানে একই গল্পের বিভিন্ন মাধ্যমে বেড়ে ওঠা অনেকটাই ভিন্ন ভিন্ন প্রভাব তৈরি করে। ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর ক্ষেত্রে সেগুলো বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে ট্রান্সমিডিয়া স্টোরিটেলিং থেকে ট্রান্সমিডিয়া ফ্র্যাঞ্চাইজির দিকে সরে যায়।
যদিও স্টোরিটেলিংয়ের ক্ষেত্রে মূল ফোকাস থাকে ন্যারেটিভ বা গল্পের সম্প্রসারণ, আর ফ্র্যাঞ্চাইজির পুরোটা জুড়েই থাকে ব্যবসায়িক স্বার্থ। দুইটি বিষয় অনেকটাই আলাদা এবং একইসঙ্গে ওভারল্যাপিং। আবার ফ্র্যাঞ্চাইজির ক্ষেত্রে একই জিনিসের পুনরাবৃত্তিই চলতে থাকে। যার কারণে ভিন্ন ভিন্ন মাধ্যমে ঘুরেফিরে একই গল্পের অবলম্বনই দেখা যায়। ট্রান্সমিডিয়া স্টোরিটেলিংয়ের ক্ষেত্রে অবলম্বনের থেকে গল্পের সম্প্রসারণেই বেশি ফোকাস দেওয়া হয়। মার্ভেল সিনেমাটিক ইউনিভার্সের ক্ষেত্রে কিন্তু একই ব্যাপার দেখা গেছে। চলচ্চিত্রের পাশাপাশি ওয়েব সিরিজ আকারেও গল্প সম্প্রসারিত হয়েছে এবং হচ্ছে। ভারতে রোহিত শেঠির কপ ভার্সের সম্প্রসারণে ওয়েব সিরিজের উপস্থিতিও লক্ষণীয়। সেই দিক থেকে দেখতে গেলে সিনেমাটিক ইউনিভার্স একইসঙ্গে স্টোরিটেলিং থেকে ফ্র্যাঞ্চাইজি, উভয়েরই অংশ। ব্যবসায়িক স্বার্থের দিক থেকে ফ্র্যাঞ্চাইজি, আর গল্পের গভীরতা ও সম্প্রসারণের দিক থেকে স্টোরিটেলিং।
তবে ট্রান্সমিডিয়া ফ্র্যাঞ্চাইজির সঙ্গে সিনেমাটিক ইউনিভার্সের বেশকিছু গুরুতর পার্থক্যও আছে। ফ্র্যাঞ্চাইজি সিস্টেমে গল্প বিভিন্ন মাধ্যমে বিভিন্নভাবে বলা হলেও, তাদের মধ্যে কোনো সূত্র বা যুক্তিযুক্ত যোগসাজশ নাও থাকতে পারে। যেমন ব্যাটম্যান কমিক্সের কোনো গল্পের ওপরে চলচ্চিত্র, উপন্যাস কিংবা অ্যানিমেটেড সিরিজ নির্মাণ হতেই পারে। ফ্র্যাঞ্চাইজি সিস্টেমে এদের মধ্যে কোনো কানেকশন থাকে না সাধারণত। ব্যাটম্যান ট্রিলজির সঙ্গে তাই তার আগের বা পরের ব্যাটম্যানভিত্তিক চলচ্চিত্রের গল্পের তেমন কোনো সম্পর্ক কিন্তু খুঁজে পাওয়া যায় না। কিন্তু সিনেমাটিক ইউনিভার্স একাধিক মাধ্যমে সম্প্রসারিত হলেও, তাদের মধ্যে কানেকশন থাকা অবশ্যম্ভাবী। অর্থাৎ একই ইউনিভার্সের অংশ হিসেবে চলচ্চিত্রে যা ঘটেছে, সিরিজে (অ্যানিমেটেড, ওয়েব, কিংবা উভয়েই) তার রেশ অবশ্যই থাকবে। সবকিছুই হবে এক বৃহত্তর গল্পের অংশ।
ফ্র্যাঞ্চাইজির গল্প বলার ধরন হয় কেন্দ্রীভূত, একটা গল্পকেই টেনে লম্বা করার মতো। এক্ষেত্রে স্পিন-অফের ব্যবহার দেখা যায় বেশি। অন্যদিকে সিনেমাটিক ইউনিভার্সের গল্প বলা হয় বিকেন্দ্রী অবস্থায়, অনেকটা মাকড়সার জালের মতো। অনেকগুলো চলচ্চিত্রের আলাদা চরিত্রে ফোকাস করা ছোটো গল্পের বুননে বৃহত্তর গল্প গড়ে ওঠে। এক্ষেত্রে ক্রসওভার, শেয়ার্ড-ইভেন্ট আর কমন চরিত্রের ব্যবহার বেশি দেখা যায়। তবে অনেক সময় নির্মাতা আর প্রযোজনা সংস্থা চাইলে ফ্র্যাঞ্চাইজির সংযোগহীন গল্পকেও যুক্তিতর্কের দোহাই দিয়ে সিনেমাটিক ইউনিভার্সের বৃহত্তর গল্পের সুতোয় বেঁধে ফেলতে পারে। এর সবচেয়ে বড়ো উদাহরণ স্পাইডারম্যান : নো ওয়ে হোম (২০২১)। স্পাইডারম্যান ফ্র্যাঞ্চাইজির তিন ভিন্ন সিরিজের গল্পকে মাল্টিভার্সের যুক্তিতে এক চলচ্চিত্রের পর্দায় একসঙ্গে আনার মাধ্যমে সিনেমাটিক ইউনিভার্সে ফ্র্যাঞ্চাইজিকে আত্মীকরণের নতুন পন্থা উন্মোচন করে দিয়েছে।
ফ্র্যাঞ্চাইজির ক্ষেত্রে দর্শক যেকোনো চলচ্চিত্র দিয়েই শুরু করতে পারে। কিন্তু সিনেমাটিক ইউনিভার্সের নির্দিষ্ট ক্রম থাকে, যা না মেনে চলচ্চিত্র দেখতে গেলে অনেক কিছুই দর্শকের জন্য বোঝা দুষ্কর হয়। ট্রান্সমিডিয়া ফ্র্যাঞ্চাইজির সবচেয়ে বড়ো উদাহরণ ধরা যায় স্টার ওয়ার্সকে; যেখানে সিনেমাটিক ইউনিভার্সেও সবচেয়ে বড়ো উদাহরণ হচ্ছে মার্ভেল সিনেমাটিক ইউনিভার্স। মার্ভেলের আগেও চলচ্চিত্রে শেয়ার্ড ইউনিভার্স দেখা যেতো ক্রসওভারের মাধ্যমে। সেক্ষেত্রে চলচ্চিত্রের গল্প বলার ধরন অনেকটাই ফ্র্যাঞ্চাইজি স্টাইলে ছিলো। যেমনটা দেখা যায় ইউনিভার্সাল মন্সটার্স-এর ক্ষেত্রে। ১৯১৩ থেকে ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এই শেয়ার্ড ইউনিভার্সের ৩০টির উপরে চলচ্চিত্র থাকলেও কোনো বৃহত্তর গল্প ছিলো না। যার কারণে এদের মধ্যে সামঞ্জস্যতার অনেক বড়ো অভাব দেখা গেছে। মার্ভেল প্রথম সিনেমাটিক ইউনিভার্সের কনসেপ্ট সাজানোর মাধ্যমে ট্রান্সমিডিয়া স্টোরিটেলিংয়ের নতুন মাত্রা সৃষ্টি করে দিয়েছে। এবং ট্রান্সমিডিয়া ফ্র্যাঞ্চাইজির দিক থেকে দেখতে গেলে বৃহত্তর গল্পভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রথার সূচনা করেছে।
সিনেমাটিক ইউনিভার্সের প্রতিযোগিতা বা ট্রেন্ড কেনো?
সিনেমাটিক ইউনিভার্সের হঠাৎ এতোটা জনপ্রিয়তার কারণ কী, আর কেনোইবা বিশ্বের বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রিতে এই ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে সবার আগেই আসবে দর্শকের মধ্যে বিদ্যমান এর তুমুল জনপ্রিয়তা। আরেকটু সরলভাবে বললে, মার্ভেল সিনেমাটিক ইউনিভার্স পুরো বিশ্বে যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে; এর পরে একদিকে দর্শকের মধ্যে যেমন এই ধরনের চলচ্চিত্রের আকাঙ্ক্ষা বেড়েছে, অন্যদিকে নির্মাতা এবং প্রযোজনা সংস্থাগুলোর মধ্যেও তৈরি হয়েছে আগ্রহ। দর্শকের মধ্যে এই প্রবল আগ্রহের একটা বড়ো কারণ অবশ্য গল্প বলার ধরন। দেখা যাচ্ছে, সিনেমাটিক ইউনিভার্সে একের পর এক চলচ্চিত্র একদিকে যেমন ছোটো ছোটো চরিত্রকেন্দ্রিক গল্প তুলে ধরে, অন্যদিকে সেইসব চরিত্রকে একসঙ্গে এনে বৃহত্তর গল্প নির্মাণ করে।
একই গল্পের একাধিক অবলম্বনের ক্ষেত্রে যেমন একই চরিত্রে একাধিক অভিনয়শিল্পীকে দেখা যায়, সিনেমাটিক ইউনিভার্সে তা হয় না। এখানে একটা চরিত্রের জন্য একজন অভিনয়শিল্পীকেই দেখা যায়, যদি না হুবহু ওই চেহারার অন্য কোনো চরিত্র থেকে থাকে। সায়েন্স ফিকশনের আশ্রয় নেওয়া ইউনিভার্সগুলো অবশ্য মাল্টিভার্সের যুক্তি দেখিয়ে কোনো অভিনয়শিল্পীকে একাধিক চরিত্রে দেখাতে পারে, অথবা একাধিক অভিনয়শিল্পীকে একই চরিত্রের জন্য এক পর্দায় আনতে পারে। যেমনটা স্পাইডারম্যান চরিত্রের তিন কিংবদন্তি অভিনয়শিল্পীকে স্পাইডারম্যান চরিত্রেই মাল্টিভার্সের যুক্তিতে এক চলচ্চিত্রে আনা হয়েছে। তিন অভিনয়শিল্পীর অভিনয়ে স্পাইডারম্যান চরিত্রে যে তিন ভিন্ন মাত্রা তৈরি হয়েছিলো, তা এক পর্দায় একসঙ্গে আসার কারণে দর্শকের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করতে সমর্থ হয়।
সিনেমাটিক ইউনিভার্সের এই গল্প বলার আর বুননের ধরন ধীরে ধীরে লোর (Lore)১০ তৈরির পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। প্রতিটি ইউনিভার্সের আলাদা ফ্যানডম গড়ে উঠছে, যেখানে দর্শক আর কেবলই দর্শক নয়; আরো এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে ফ্যান বা ভক্ত হিসেবে পরিচয় পাচ্ছে। ফ্যানডমে থাকা প্রত্যেক ভক্ত শুধু চিত্তবিনোদনে আকৃষ্ট হয়, তাই নয়। সেইসঙ্গে তাদের মধ্যে একটা সেন্স অব বিলঙ্গিংও গড়ে ওঠে। বাস্তব জীবনের ঘটনার থেকেও তারা বেশি গুরুত্ব দেয় সিনেমাটিক ইউনিভার্সের গল্প, ঘটনাবলি, রাজনৈতিক অবস্থা, এবং চরিত্রদের জীবনের খুঁটিনাটি মনে রাখতে। জঁ বদ্রিয়ার’র ভাষায় একে মিথ্যা বাস্তবতা (False Reality)১১ বলা যেতেই পারে। এবং এই মিথ্যা বাস্তবতার প্রভাব এতোটাই গুরুতর যে, আসল বাস্তবতার সঙ্গে এই মিথ্যা বাস্তবতার সীমারেখা অনেকটাই ঝাপসা হয়ে যায়। যদিও সিনেমাটিক ইউনিভার্স বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তার কল্পকাহিনি হওয়ার বৈশিষ্ট্য বহন করে, কিন্তু দর্শকের মধ্যে এর অবস্থা অনেকটাই অধিবাস্তবতা (Hyperreality)১২ এর মতো। এই অধিবাস্তবতাকে সচল রাখার প্রচেষ্টা নির্মাতা ও দর্শক, উভয় দিক থেকেই চলমান। ব্যবসা সফলতাসহ আরো অনেক কারণে প্রতিবছর অন্তত একটি হলেও চলচ্চিত্র মুক্তি পাচ্ছে গল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আর এর মধ্যের সময়ে দর্শকের দিক থেকেও সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা, রিভিউ, ক্রিটিসিজম, মিমস বা ফ্যান থিউরির মাধ্যমে সচলতা থাকছেই। যার কারণে দর্শক বা ভক্তদের মধ্যে সিনেমাটিক ইউনিভার্সের প্রভাব নিয়ে খুঁজতে গেলে সিমুল্যাক্রাম১৩ এর সন্ধান পাওয়া যাবে বললে ভুল হবে না।
এখন তত্ত্বীয় জায়গা থেকে সিমুল্যাক্রাম বলা হোক, কিংবা সাধারণ ভাষায় দর্শকের মাঝে বিদ্যমান প্রবল আগ্রহ বলা হোক, এর ফলস্বরূপ সিনেমাটিক ইউনিভার্সের সংখ্যা বেড়েই চলছে। এতে সবচেয়ে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে প্রযোজনা সংস্থাগুলো। মার্ভেলের ব্যাপক ব্যবসা সফলতা সবার মধ্যেই আগ্রহ তৈরি করেছে এই ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণে। হলিউডের প্রযোজনা সংস্থার দিকে তাকালে দেখা যায়, বড়ো পাঁচটি সংস্থা—ইউনিভার্সাল পিকচার্স, ওয়ার্নার ব্রাদার্স, ওয়াল্ট ডিজনি, সনি পিকচার্স ও প্যারামাউন্ট পিকচার্স—এদের প্রত্যেকেরই সিনেমাটিক ইউনিভার্সের চলমান প্রকল্প অথবা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আছে। মার্ভেল সিনেমাটিক ইউনিভার্সের প্রযোজনা সংস্থা মার্ভেল স্টুডিওজ কিন্তু ওয়াল্ট ডিজনি স্টুডিওজ-এরই একটা অংশ। ওয়ার্নার ব্রাদার্সের হাতে ডিসি ইউনিভার্স, গডজিলার মন্সটার ইউনিভার্স, ভৌতিক কঞ্জুরিং ইউনিভার্সের বাইরেও হ্যারি পটার-এর উইজার্ডিং ওয়ার্ল্ড ও ম্যাট্রিক্স-এর মতো ফ্র্যাঞ্চাইজি আছে। ইউনিভার্সাল স্টুডিওজের কাছে আছে পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো সিনেমাটিক শেয়ার্ড ইউনিভার্স, ইউনিভার্সাল মন্সটার্স। মার্ভেল কমিক্সের স্পাইডারম্যান সম্পর্কিত সব চরিত্র নিয়ে সনি পিকচার্স নিজেদের আলাদা স্পাইডারভার্স নির্মাণের চেষ্টা করে যাচ্ছে।
প্রযোজনা সংস্থাগুলোর এমন উদ্দীপনা কিন্তু শুধু হলিউডেই সীমাবদ্ধ নয়। ভারতের দিকে তাকালে ওয়াই আর এফ-এর তাদের টাইগার ফ্র্যাঞ্চাইজিকে সিনেমাটিক ইউনিভার্সে যুক্ত করা; নির্মাতা রোহিত শেঠির কপ-ভিত্তিক চলচ্চিত্রের সিরিজকে বর্ধিত করে সিনেমাটিক ইউনিভার্সে রূপ দেওয়া; ম্যাডক ফিল্মসের নিজস্ব সিনেমাটিক ইউনিভার্স নির্মাণের কাজ শুরু করা; কিংবা লোকেশ সিনেমাটিক ইউনিভার্সে একাধিক প্রযোজনা সংস্থার সম্মিলিত কাজ—সবকিছুই এর উদাহরণ। প্রযোজনা সংস্থাগুলোর এমন কর্মকাণ্ডের মূলে দুইটি কারণ খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। প্রথমত, সিনেমাটিক ইউনিভার্স দর্শকের মধ্যে যে ব্যাপক সাড়া জাগায়, এবং তার ফলস্বরূপ বক্স অফিসে যে ব্যবসা সফলতা আসে, তাতে প্রযোজনা সংস্থাগুলোর জন্য সিনেমাটিক ইউনিভার্স বিরাট আশীর্বাদ স্বরূপ। দ্বিতীয়ত, বৃহত্তর গল্পের সুবাদে দর্শকের মধ্যে থেকে ফ্যানবেজ নির্মাণ এবং তার সুবাদে নিজেদের কাজের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিস্তার করা যায়।
ফ্যান শব্দের বাংলা ভক্ত হলেও ইংরেজিতে এর উৎস ‘ফ্যানাটিক’ শব্দ থেকে; যার অর্থ ‘অন্ধবিশ্বাসী’। ফ্যানডম ক্ষেত্র বিশেষে একটা মানুষকে সেই পর্যায়েই নিয়ে যেতে পারে। সামাজিক মাধ্যম আর ডিজিটাল মিডিয়ার কল্যাণে ফ্যানডম গড়ে ওঠা আর একজন মানুষের সেই ফ্যানডমের অংশ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটাও সহজ। অধিবাস্তব হোক বা না হোক, তার পছন্দের সিনেমাটিক ইউনিভার্স, তার গল্প, কিংবা এর কোনো চরিত্র হয়ে ওঠে অনেক বেশি আপন। ভালো লাগার জায়গা থেকেই হোক, কিংবা আনুগত্যের জায়গা থেকেই হোক, সেই সিনেমাটিক ইউনিভার্সের চিহ্নযুক্ত কোনো পণ্যও তার কাছে বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। দর্শক থেকে ফ্যান হওয়ার সঙ্গে সে ভালো ভোক্তাও হয়ে ওঠে।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় দর্শককে আকৃষ্টের অনেক পন্থার মধ্যে একটি হলো সেই চলচ্চিত্রের কলাকুশলীর উপস্থিতি। এক্ষেত্রে প্রযোজনা সংস্থাগুলো ব্যবহার করে নির্মাতা আর তারকাদের। এমন সব নির্মাতাদের সঙ্গে তারা কাজ করে, যাদের কাজ দর্শককে আকৃষ্ট করবে। অনেক সময় জনপ্রিয় কোনো নির্মাতার উপস্থিতিও একটা বিজ্ঞাপনের কাজ করে। আবার জনপ্রিয় তারকাদের উপস্থিতিতে একদিকে যেমন তাদের অভিনয়ের দক্ষতায় চলচ্চিত্রগুলো গুরুত্ব পায়; অন্যদিকে সিনেমাটিক ইউনিভার্সের একটি নির্দিষ্ট চরিত্র হিসেবে তাদের আইডেন্টিটি দর্শকের মধ্যে তৈরি হয়। ঠিক এ কারণেই ‘থর’ বললে নায়ক ক্রিস হেমসওর্থ, বা ‘টাইগার’ বললে সালমান খানের চিত্র দর্শকের মাথায় চলে আসে। অভিনয়শিল্পীর অভিনয়ের নিজস্বতার ছোঁয়ায় চরিত্র হয়ে ওঠে তারই প্রতিচ্ছবি। তাই পাঠান চরিত্রে সালমান খান, কিংবা টাইগার চরিত্রে শাহরুখ খানকে কল্পনা করাটাও দর্শকের জন্য দুরূহ হয়। তারকাদের জন্যেও এটা অনেক বড়ো সুযোগ দর্শকের মনে জায়গা করে নেওয়ার ক্ষেত্রে। তবে বিশাল মাপের তারকাদের চলচ্চিত্রে নিতে গিয়ে বাজেট বেড়ে যায়। এক্ষেত্রে প্রযোজনা সংস্থাগুলো অনেকটাই বাজি খেলার মতো বিনিয়োগ করে।
বাজি বলার কারণ এ রকমের চলচ্চিত্র দুনিয়া নির্মাণ সোনার ডিম পাড়া হাঁসের মতো নয়। সব সিনেমাটিক ইউনিভার্স মার্ভেলের মতো সফল হয়নি। অনেক ইউনিভার্সে বেশ কয়েকটি ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র আসলেও মাঝেমধ্যেই দুই-একটা বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়ে। আবার কিছু সিনেমাটিক ইউনিভার্স স্ট্রাগল করেই যাচ্ছে, এখন পর্যন্ত সেভাবে ব্যবসা করতে পারেনি। কিন্তু তারপরেও প্রচেষ্টা চলমান। চলচ্চিত্রের জগতে নিজেদের সুদূরপ্রসারী পদচিহ্ন রাখার জন্য হলেও গল্প বলার এ সিস্টেমকে নির্মাতা এবং প্রযোজনা সংস্থাগুলো সাদরে বরণ করে নিচ্ছে।
সিনেমাটিক ইউনিভার্সের ইতিহাস
সিনেমাটিক ইউনিভার্সের ঐতিহাসিক সূচনা খুঁজতে গেলে দেখা যায়, এর মূলে আছে ক্রসওভার। চলচ্চিত্র জগতে প্রথম ক্রসওভার দেখা যায় ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে ড্যানিশ নির্মাতা ভিগো লার্সেন নির্মিত আর্সেন লুপিন কন্ট্রা শার্লক হোমস নামের চলচ্চিত্রে। বৃটিশ লেখক আর্থার কোনান ডয়াল-এর সৃষ্ট চরিত্র গোয়েন্দা শার্লক হোমস, আর ফ্রেঞ্চ লেখক ম্যরিস লেব্লান-এর সৃষ্ট চরিত্র চোর আর্সেন লুপিন-এর লুকোচুরির গল্প উঠে আসে এই চলচ্চিত্রের পর্দায়। যদিও এই দুই চরিত্রকে এক পর্দায় আনবার আইডিয়াও ম্যরিসের নিজের। তার পর দীর্ঘ ৩০ বছর চলচ্চিত্র জগতে ক্রসওভার আর দেখা যায়নি। ৪০-এর দশকে মুক্তি পাওয়া ফ্রাঙ্কেনস্টাইন মিটস দ্য উল্ফ ম্যান-এ (১৯৪৩) আবারও দেখা মেলে ক্রসওভারের। এবারে আরো সুবিস্তৃত অবস্থায়। এই চলচ্চিত্রে তার আগের দুই বছরে মুক্তি পাওয়া দুটি চলচ্চিত্রের দুই প্রধান চরিত্র উল্ফম্যান আর ফ্রাঙ্কেনস্টাইনকে এক পর্দায় আনার মাধ্যমে চলচ্চিত্র জগতে শেয়ার্ড ইউনিভার্সের ধারণার প্রয়োগ করা হয়। বর্তমানে সিনেমাটিক ইউনিভার্স বলতে যা বোঝানো হয়, তার সঙ্গে এই শেয়ার্ড ইউনিভার্সের খুব একটা পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যায় না।
এদিকে জাপান চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে কিং কং (১৯৩৩) আর গডজিলার (১৯৫৪) সাফল্যের পরে তাদের মূল চরিত্রকে এক পর্দায় আনে প্রযোজনা সংস্থা তোহো কোম্পানি লিমিটেড। ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে তাদের হাত ধরে কিং কং ভার্সেস গডজিলা মুক্তির পর থেকেই ব্যাপক সফলতার মুখ দেখে। কিছুদিনের মধ্যেই তৎকালীন ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আয়কারী চলচ্চিত্রে পরিণত হয়। এই অভাবনীয় সফলতার কারণে পরবর্তী সময়ে আরো বেশকিছু ক্রসওভার চলচ্চিত্র নির্মাণ হয় সেই প্রযোজনা সংস্থার হাত ধরে। গডজিলা বা কিং কং-এর মতো আরো বৃহদাকৃতির মন্সটার নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ ও তাদের এক পর্দায় এনে ক্রসওভার চলতে থাকে।
ক্রসওভার থেকে এগিয়ে শেয়ার্ড ইউনিভার্স নিয়ে এগোনোর কারণটা কিন্তু এক্ষেত্রে গল্প বলা নয়। মূল উদ্দেশ্যের পুরোটাই ব্যবসা। অন্যদিকে উল্ফম্যান আর ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের মন্সটারে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রযোজনা সংস্থা ইউনিভার্সাল স্টুডিও একের পর এক চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করে। যেখানে ক্রসওভারের মাধ্যমে আনা মন্সটাররা এক পর্দায় এক গল্পের বুননে এগিয়ে যায়। ধীরে ধীরে সেখানে যুক্ত হয় আরো অনেক মন্সটার। ক্রসওভার দিয়ে শুরু হওয়া শেয়ার্ড ইউনিভার্স কীভাবে বড়ো হয়, তাও এই চলচ্চিত্রগুলোতে বোঝা যায়।
বৈশিষ্ট্যগত দিক থেকে সিনেমাটিক ইউনিভার্সের সূচনা কিন্তু তাহলে ইউনিভার্সাল স্টুডিওর হাত ধরে সেই ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে। কিন্তু ‘সিনেমাটিক ইউনিভার্স’ নামটার প্রবর্তন মার্ভেলের আগে কেউ করেনি। মোটামুটি ঘোষণা করেই তারা মার্ভেল সিনেমাটিক ইউনিভার্স শুরু করে। ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে যাত্রা শুরু করে অ্যাভেঞ্জার্স-এ প্রথম সব সুপারহিরো চরিত্রকে এক পর্দায় আনার মাধ্যমে মার্ভেল স্টুডিও সিনেমাটিক ইউনিভার্সের এক মডেল বা কাঠামো নির্মাণ করে। বর্তমানে যে কাঠামোতে সিনেমাটিক ইউনিভার্স চিন্তা করা হয় বা এই ইউনিভার্সের যে বিশেষ কিছু নিয়ম আছে, তাও কিন্তু মার্ভেলের হাত ধরেই এসেছে। সেদিক থেকে বলা যায়, শেয়ার্ড ইউনিভার্সের বিক্ষিপ্ত ধারণাকে সুসংগঠিত করে মার্ভেল ‘সিনেমাটিক ইউনিভার্স’ এর প্রচলন করে দিয়েছে। আবার মুক্তি পাওয়া চলচ্চিত্রগুলোকে গল্পের হিসেবে ভাগ করে সাগা হিসেবে এগিয়ে যাবার ব্যাপারটাও মার্ভেলই শুরু করে। যার কারণে ‘সিনেমাটিক ইউনিভার্স’-এর প্রসঙ্গ আসলে মার্ভেলের নামই সবার আগে চলে আসে।
মার্ভেলের শেয়ার্ড ইউনিভার্সকে সুপরিকল্পিত আর সুসংগঠিত সাজিয়ে সিনেমাটিক ইউনিভার্সে রূপ দেওয়ার মাধ্যমে যেনো এক প্রতিযোগিতার শুরু হয়। ২০০৮-এ যখন কেবল এম সি ইউ-এর যাত্রা শুরু হয়, তখন মার্ভেল কমিক্সের সব থেকে বড়ো প্রতিদ্বন্দ্বী ডি সি নিজেদের ইউনিভার্স আরম্ভের পরিকল্পনা করে। তারা এর অংশ হিসেবে আনে সুপারহিরো চলচ্চিত্র গ্রিন ল্যানটার্ন (২০০৮)। কিন্তু বক্স অফিসের ব্যর্থতা ডিসির সেই স্বপ্নকে শুরুতেই বিরাট ধাক্কা দেয়। যদিও হাল না ছেড়ে ডি সি পরবর্তী সময়ে ফিরে আসে ম্যান অব স্টিল (২০১৩) চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে। নির্মাতা জ্যাক স্নাইডার মোটামুটিভাবে একটা বৃহৎ পরিসরে পরিকল্পনা নিয়ে ডি সি এক্সটেন্ডেড ইউনিভার্স (D C E U) নামে সিনেমাটিক ইউনিভার্স নির্মাণে নেমে পড়েন। কিন্তু তার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও শেষ পর্যন্ত ইউনিভার্সের ব্যবসায়িক সফলতা এনে দিতে হোঁচট খেতে থাকে। ব্যাটম্যান ভার্সেস সুপারম্যান : ডন অব জাস্টিস-এ (২০১৬) দুই কিংবদন্তি সুপারহিরো চরিত্র ব্যাটম্যান আর সুপারম্যানকে আনা সত্ত্বেও চলচ্চিত্রটি দর্শকের মধ্যে আশানুরূপ সাড়া জাগাতে ব্যর্থ হয়। যার কারণে প্রযোজনা সংস্থা তাদের পরিকল্পনা নিয়ে ভাবতে বাধ্য হয়। এবং ‘সাইবর্গ’, ‘দ্য ফ্ল্যাশ’ ও ‘গ্রিন ল্যান্টার্ন কোর’ এর গল্পকে চলচ্চিত্রের পর্দায় আনার প্রকল্প পিছিয়ে দেয়।
পরবর্তী সময়ে অ্যাকোয়াম্যান (২০১৮), ওয়ান্ডার ওম্যান (২০১৭) আর শাজাম (২০১৯) এর মতো ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র ডি সি এক্সটেন্ডেড ইউনিভার্সকে আবার তাদের আগের গতিতে ফিরিয়ে আনে। কিন্তু সিনেমাটিক ইউনিভার্সের কিছু নিয়মের মধ্যে একটি হলো, দর্শকের মধ্যে দিনশেষে গল্প কোনদিকে এগোচ্ছে তা নিয়ে পরিষ্কার ধারণা থাকা। এক্ষেত্রে তা খুব একটা দেখা যায়নি। ২০১৩ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত মুক্তি পাওয়া এই ইউনিভার্সের ১৬টি চলচ্চিত্রের গল্পের মধ্যে কিছুটা অসামঞ্জস্য দৃশ্যমান ছিলো। আবার মার্ভেলের ক্ষেত্রে সৃষ্টিশীলতার জায়গায় নির্মাতা কেভিন ফিজ-এর নেতৃত্ব ছিলো—জ্যাক স্নাইডার সেভাবে ডি সি এক্সটেন্ডেড ইউনিভার্সকে সাজাতে পারেননি। ফলে সবকিছু মিলিয়ে দর্শকের মধ্যে জনপ্রিয়তাও কমে এসেছিলো। ওয়ার্নার ব্রাদার্স তাই তাদের পুরো ইউনিভার্সকে ঢেলে সাজানোর কথা ভাবতে বাধ্য হয়। নির্মাতা জেমস গান-এর হাত ধরে নতুন করে তারা ডি সি ইউনিভার্স নামের আরেকটা ইউনিভার্স নির্মাণের কাজ শুরু করে। কিংবা বলা যায়, এটা আগের ইউনিভার্সকে ঢেলে সাজানোর একটা প্রক্রিয়া মাত্র। দ্য ফ্ল্যাশ (২০২৩) এ টাইম-ট্রাভেল এবং তার কারণে বাস্তবতা পাল্টে যাওয়ার মতো বিষয়গুলোকে এনে তারা এই নতুন ইউনিভার্সকে আগের ইউনিভার্সের সঙ্গে কিছুটা হলেও জুড়ে দিয়েছে। আবার আগের ইউনিভার্সের ফ্যানদেরও হাতে রেখেছে।
অন্যদিকে, ডি সি এক্সটেন্ডেড ইউনিভার্সের চলচ্চিত্র যখন মুক্তি পাচ্ছিলো, ঠিক সেই সময়েই ডি সি কমিক্সের বেশকিছু চরিত্রকে নিয়ে নির্মাণ হওয়া চলচ্চিত্র দর্শকের মধ্যে এক ধরনের বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। কারণ জোকার (২০১৯) এর মতো চলচ্চিত্রগুলো জনপ্রিয় হলেও সিনেমাটিক ইউনিভার্সের বৃহত্তর গল্পে কোনো প্রভাব বা ভূমিকা রাখছে না। জেমস গান তার ডি সি ইউনিভার্স ঘোষণার সময় এই চলচ্চিত্রগুলোকে আর আলাদা না রেখে এল্সওয়ার্ল্ড (Elseworld)১৪ নামের দুনিয়ার অংশ হিসেবে ঘোষণা দেন। এর সঙ্গে ডি সির গল্প যেসব টিভি সিরিজ বা অ্যানিমেটেড সিরিজ বা অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্রে উঠে এসেছে, সেগুলোকেই এই এল্সওয়ার্ল্ডের অংশ হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। এতে করে ভবিষ্যতেও কোনো স্ট্যান্ডঅ্যালোন (স্বয়ংসম্পূর্ণ) চলচ্চিত্র মুক্তি দিলে সিনেমাটিক ইউনিভার্সের হিসেবে তার অবস্থান দর্শকের কাছে আরো পরিষ্কারভাবে উপস্থাপন করা যাবে। সুপারম্যান-এর (২০২৫) সঙ্গে অফিশিয়ালি ডিসি ইউনিভার্স ডি সি ইউ-এর যাত্রা শুরু হয়ে গেছে। সেইসঙ্গে আরো পাঁচটি চলচ্চিত্র নির্মাণের ঘোষণার মাধ্যমে সিনেমাটিক ইউনিভার্সের দৌড়ে মার্ভেলের প্রতিযোগী হিসেবে ডি সির শক্তপোক্ত ভাবে ফিরে আসা দৃশ্যমান হয়।
মার্ভেল আর ডি সি যেখানে তাদের কমিক্সের গল্পকে সিনেমার পর্দায় এনে সিনেমাটিক ইউনিভার্স তৈরি করছে, সেখানে অন্য কমিক্সগুলোও বসে নেই। ৮০’র দশকে যাত্রা শুরু করা ভালিয়ান্ট কমিক্স তাদের নিজস্ব সুপার হিরো নিয়ে আলাদা ইউনিভার্স নির্মাণের কাজে নেমে পড়ে। এক্ষেত্রে তাদের প্রযোজনা সংস্থা ছিলো সনি এন্টারটেইনমেন্ট। কিন্তু প্রথম চলচ্চিত্র ব্লাডশট (২০২০) বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়ে। গল্পের গাঁথুনিতে বিস্তর সমস্যা আর কোভিড-১৯ এর প্রকোপের কারণে চলচ্চিত্রটি দর্শকের মধ্যে সমালোচনা ছাড়া অন্য কোনো রকমের প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে ব্যর্থ হয়। অবস্থা বেগতিক দেখে প্রযোজনা সংস্থা সনি, ভালিয়ান্ট কমিক্সের আরেক চরিত্র ‘হারবিঞ্জার’র স্বত্ব বিক্রি করে দেয় প্রযোজনা সংস্থা প্যারামাউন্টের কাছে। যার ফলে সিনেমাটিক ইউনিভার্স নির্মাণের আগেই তা মুখ থুবড়ে পড়ে। যদিও পরবর্তী সময়ে প্যারামাউন্টের হাত ধরে নতুন ভাবে এই ইউনিভার্সের ফিরে আসার একটা সম্ভাবনা আছে। কিন্তু ব্যবসায় অসফল এই প্রজেক্টকে আপাতত মৃত বললে ভুল হবে না।
সিনেমাটিক ইউনিভার্সের দৌড়ে কমিক্সের সঙ্গে যোগ হয়েছে বইয়ের সিরিজও। লেখক স্টিফেন কিং-এর বই সিরিজ ‘ডার্ক টাওয়ার’ এর ওপরে পুরোদস্তুর এক সিনেমাটিক ইউনিভার্স নির্মাণের জল্পনা কল্পনা চলছে অনেকদিন ধরেই। বলা হয়, মার্ভেল সিনেমাটিক ইউনিভার্স আসার এক দশক আগে থেকে চলছে এই ভাবনা। কিন্তু সেভাবে কখনোই তা আমলে নেওয়া হয়নি। ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে ডার্ক টাওয়ার চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তারা এই পরিকল্পনাকে বাস্তবায়নের চেষ্টা করে। কিন্তু দর্শকের মধ্যে চলচ্চিত্রটি সাড়া জাগাতে ব্যর্থ হয়। এমনকি বই সিরিজের ফ্যানরা পর্যন্ত সিনেমাটিকে ভালো ভাবে হজম করতে পারেনি। একদিকে বক্স অফিসে ব্যবসায় মন্দা, আরেকদিকে দর্শক, ফ্যান আর ক্রিটিকদের মধ্যে চলচ্চিত্রের বিরূপ প্রতিক্রিয়া। সবমিলিয়ে এ নিয়ে পরবর্তী সব পরিকল্পনা বাতিল করা হয়। যদিও শোনা যাচ্ছে, নির্মাতা মাইক ফ্ল্যানাগন-এর হাত ধরে ওটিটি প্লাটফর্ম ‘অ্যামাজন’-এ এই সিরিজ ফিরে আসার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু সিনেমাটিক ইউনিভার্স হিসেবে এই প্রজেক্টও শুরুর সঙ্গেই শেষ হয়ে গেছে বলে ধরা যায়।
সিনেমাটিক ইউনিভার্স নির্মাণের ব্যর্থ প্রচেষ্টাগুলো তালিকা করতে গেলে এর পরেই চলে আসবে ‘কিং আর্থার’ এর কথা। ওয়ার্নার ব্রাদার্সের পরিকল্পনা ছিলো ইংলিশ ফোক হিরো রাজা আর্থার আর তার নাইটসদের গল্পকে চলচ্চিত্রে তুলে ধরার। কিংবদন্তির প্রতিটি গল্পকে আলাদা চলচ্চিত্রে দেখিয়ে শেষে অ্যাভেঞ্জার্স –এর (২০১২) মতো ক্রসওভার করিয়ে নিজেদের একটি সিনেমাটিক ইউনিভার্স সাজিয়ে ফেলা যাবে। কিন্তু প্রথম চলচ্চিত্র কিং আর্থার : লিজেন্ড অব দ্য সোর্ড (২০১৭) তাদের মারাত্মক ব্যর্থতার মুখে ফেলে দেয়। প্রায় ২০ কোটি মার্কিন ডলার বাজেটের চলচ্চিত্রটি বক্সঅফিসে মাত্র ১৪.৮ কোটির ব্যবসা করে। অবশ্য মুক্তির অনেক আগে থেকেই দর্শকের মধ্যে এই চলচ্চিত্র নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছিলো, যা বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমের আলোচনায় পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিলো। বক্স অফিসে এমন ব্যর্থতা ওয়ার্নার ব্রাদার্সকে বাধ্য করে তাদের পরিকল্পনাকে বিসর্জন দিতে।
সিনেমাটিক ইউনিভার্স নির্মাণের প্রচেষ্টা-ব্যর্থতা-প্রচেষ্টার এই তালিকায় আরো যুক্ত হবে সনি’র স্পাইডারভার্স আর ফক্স স্টুডিওর সিনেমাটিক ইউনিভার্স। মার্ভলের কিছু চরিত্রকে চলচ্চিত্রের পর্দায় আনার স্বত্ব ফক্স স্টুডিও আর সনি স্টুডিওর কিনে নেওয়া ছিলো অনেক আগে থেকেই। মার্ভেল সিনেমাটিক ইউনিভার্সের পুরোটাই যেখানে মার্ভেল কমিক্সের ওপরে নির্ভরশীল, সেখানে কিছু চরিত্রের স্বত্ব না থাকাটা মার্ভেলের জন্য কিছুটা সমস্যার। ফক্স স্টুডিও, যা বর্তমানে টুয়েন্টিথ সেঞ্চুরি স্টুডিও হিসেবে চলমান আছে, ১৯৯০-এর দশকে মার্ভেল কমিক্সের বেশকিছু চরিত্রের স্বত্ব কিনে নেয়। যার মধ্যে সব থেকে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে মার্ভেলের সব মিউটেন্ট চরিত্র, যেমন উল্ভারিন, এক্সম্যান, ডেডপুল; এর বাইরে ফান্টাস্টিক ফোর-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চরিত্রগুলো—ইলেক্ট্রা ও ডেয়ারডেভিল। ২০০০ খ্রিস্টাব্দে এক্সম্যান চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে তারা মার্ভেল কমিক্সের একাধিক চরিত্রকে একসঙ্গে রুপালি পর্দায় তুলে ধরে। পরবর্তী সময়ে তারা এই সিরিজের আরো সাতটি চলচ্চিত্র নিয়ে আসে—এক্স-টু (২০০৩), এক্স-ম্যান : দ্য লাস্ট স্ট্যান্ড (২০০৬), এক্স-ম্যান অরিজিন্স : উল্ভারিন (২০০৯), এক্স-ম্যান : ফার্স্ট ক্লাস (২০১১), উল্ভারিন (২০১৩), এক্স-ম্যান : ডেজ অব ফিউচার পাস্ট (২০১৪), এক্স-ম্যান : অ্যাপোক্যালিপ্স (২০১৬) ও ডার্ক ফিনিক্স (২০১৯)। ২০০৫ এ মুক্তি পাওয়া ফান্টাস্টিক ফোর-এ তারা আরো কিছু চরিত্রকে একসঙ্গে এনে ঠিক একইরকম কাজ করার চেষ্টা করে। পরবর্তী সময়ে ফান্টাস্টিক ফোর: রাইজ অব দ্য সিল্ভার সার্ফার (২০০৭) বাজেভাবে ফ্লপ করায় ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে তারা রিবুট হিসেবে ফান্টাস্টিক ফোর নামে আরেকটি চলচ্চিত্র আনে। এর বাইরে ডেয়ারডেভিল (২০০৩), ইলেক্ট্রা (২০০৫), আর ডেডপুল (২০১৬), ডেডপুল ২ (২০১৮) চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তারা দর্শকের মধ্যে সাড়া ফেলে।
মার্ভেল সিনেমাটিক ইউনিভার্সের বাইরে ফক্স তাদের নিজস্ব ছোটোখাটো সিনেমাটিক ইউনিভার্স তৈরি করে ফেলছিলো। কিন্তু ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে ঘোষণা দিয়ে ২০১৯-এ ওয়াল্ট ডিজনি স্টুডিও কোম্পানি ফক্সকে অধিগ্রহণ করে নেয়। যার ফলে ফক্সের হাত ধরে আসা চলচ্চিত্রগুলো দিয়ে আলাদা সিনেমাটিক ইউনিভার্স নির্মাণের স্বপ্ন শেষ হয়ে যায়। তবে এর দ্বারা মার্ভেল কমিক্সের চরিত্রদের আর আলদা করে দুইটি ভিন্ন সিনেমাটিক ইউনিভার্সে দেখা যাবে না। এতোদিন ধরে ফক্স যে চলচ্চিত্রগুলো বানিয়েছে, তার সঙ্গেও মার্ভেল সিনেমাটিক ইউনিভার্সের একটা যোগসাযোগ করা হচ্ছে। স্পাইডার-ম্যান : নো ওয়ে হোম (২০২১) চলচ্চিত্রে ফক্সের ডেয়ারডেভিল (২০১৫-২০১৮) সিরিজের মূলচরিত্র ডেয়ারডেভিলকে আনার মাধ্যমে অফিশিয়ালভাবে ফক্সের ইউনিভার্সকে বৃহত্তর মার্ভেল সিনেমাটিক ইউনিভার্সের অংশ করে নেওয়ার কাজ এগিয়েছে।
এদিক থেকে স্পাইডার-ম্যানের প্রসঙ্গ আসলে আলাপ চলে যাবে সনি পিকচার্সের নিজস্ব স্পাইডারভার্সের দিকে। ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে স্পাইডার-ম্যান এবং এই সংশ্লিষ্ট সব চরিত্রের চলচ্চিত্রের পর্দার স্বত্ব সনির কাছে ছিলো। নির্মাতা স্যাম রাইমি’র হাত ধরে ২০০২ খ্রিস্টাব্দে স্পাইডার-ম্যান মুক্তি পায়, যা পরবর্তী সময়ে আরো দুইটি সিকুয়ালের মাধ্যমে ট্রিলজিতে রূপ নেয়। বেশ কিছু অভ্যন্তরীণ ঝামেলার কারণে নির্মাতা রাইমি নির্মাতার জায়গা থেকে সরে দাঁড়ান। যে কারণে সিরিজের চতুর্থ চলচ্চিত্র আসার কথা থাকলেও তা ট্রিলজি হিসেবেই থেকে যায়। সনিও রিবুটের মাধ্যমে নতুন করে স্পাইডার-ম্যান চরিত্রকে পর্দায় আনার কথা ভাবা শুরু করে। দ্য অ্যামেজিং স্পাইডার-ম্যান (২০১২) আর দ্য অ্যামেজিং স্পাইডারম্যান ২ (২০১৪) সেই পরিকল্পনারই অংশ। কিন্তু দ্বিতীয় চলচ্চিত্রটি আশানুরূপ ব্যবসা না করায়, এবং পারিপার্শ্বিক আরো বেশকিছু কারণে এই সিরিজ ও আর এগোয়নি। এর মধ্যে মার্ভেলের সঙ্গে সনির চুক্তির কারণে স্পাইডার-ম্যান চরিত্রকে মার্ভেল সিনেমাটিক ইউনিভার্সের অংশ হিসেবে দেখা যায়। ক্যাপ্টেন আমেরিকা : সিভিল ওয়ার (২০১৬) এ স্পাইডার-ম্যান চরিত্রের নতুনভাবে দেখা মেলে। তারপরে স্পাইডার-ম্যান : হোমকামিং (২০১৭) এর মাধ্যমে স্পাইডার-ম্যানের আলাদা চলচ্চিত্রের শুরু। সিরিজের পরবর্তী চলচ্চিত্র স্পাইডার-ম্যান : ফার ফ্রম হোম (২০১৯) এক বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ব্যবসা করে। তৃতীয় চলচ্চিত্র স্পাইডার-ম্যান : নো ওয়ে হোম-এ (২০২১) এ মাল্টিভার্সের ধারণা এনে আগের দুই সিরিজের স্পাইডার-ম্যান চরিত্রদের এক চলচ্চিত্রে আনা হয়। ২০০০ খ্রিস্টাব্দের পর থেকে এই চরিত্রে যারা অভিনয় করেছে তাদের অভিনয় আর গল্পের ওপরে ভিত্তি করে স্পাইডার-ম্যান চরিত্রের ফ্যানদের মধ্যে একটা বিভক্তি ছিলো। স্পাইডার-ম্যান : নো ওয়ে হোম সেই বিভক্তি দূর করে সব ধরনের ভক্তের মন জয় করে। যার প্রভাব দেখা যায় বক্স অফিসের অসাধারণ ব্যবসা সফলতায়। আবার এর মাধ্যমে সেই ২০০২ খ্রিস্টাব্দ থেকে চলে আসা স্পাইডার-ম্যানের সব গল্প হয়ে ওঠে বৃহত্তর মার্ভেল সিনেমাটিক ইউনিভার্সের অংশ। সেইসঙ্গে এই সিনেমাটিক ইউনিভার্সের সম্প্রসারণ মাল্টিভার্স পর্যায়ে চলে যায়।
সনি কিন্তু নিজস্ব সুপারহিরো ইউনিভার্সের প্ল্যান একেবারে বিসর্জন দেয়নি। স্পাইডারম্যান সংশ্লিষ্ট বেশ কিছু চরিত্রের স্বত্বাধিকার এখনো তাদের কাছেই আছে। ভেনম চরিত্রকে নিয়ে তারা শুরু করে ভেনম সিরিজ। তার অংশ হিসেবে আসে ভেনম (২০১৮), ভেনম : লেট দেয়ার বি কার্নেজ (২০২১), ভেনম : দ্য লাস্ট ড্যান্স (২০২৪)। এর বাইরে মর্বিয়াস (২০২২), মাদাম ওয়েব (২০২৪), আর ক্র্যাভেন দ্য হান্টার (২০২৪) এর মাধ্যমে তারা নিজেদের জায়গা করার চেষ্টা করে। কিন্তু ক্র্যাভেন দ্য হান্টার বক্স অফিসে খুবই বাজেভাবে ফ্লপ করার পর সনি পরবর্তী সময়ে এই চরিত্রদের নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের সব পরিকল্পনা সরিয়ে ফেলে। দিনশেষে ফক্স আর সনি, উভয়ের হাতে থাকা মার্ভেল কমিক্সের চরিত্রের চলচ্চিত্রগুলো গিয়ে যুক্ত হয় মার্ভেল সিনেমাটিক ইউনিভার্সের দুনিয়ায়।
সিনেমাটিক ইউনিভার্স নির্মাণের এই প্রতিযোগিতায় একেবারে শুরুর দিকে সৃষ্টি হওয়া শেয়ার্ড ইউনিভার্সগুলোও পিছিয়ে ছিলো না। সেভাবে দেখতে গেলে ‘ইউনিভার্সাল মন্সটার’ আর ‘গডজিলার মন্সটার ইউনিভার্স’ই সবথেকে পুরনো দুই ইউনিভার্স। ড্রাকুলা, ফ্রাঙ্কেস্টাইন-এর মন্সটার, কিংবা উলফম্যানের মতো চরিত্র নিয়ে এই ইউনিভার্স গড়ে উঠেছে সেই ১৯৩০-এর দশকে। যদিও শুরুটা আরো আগে ডক্টর জেকিল অ্যান্ড মিস্টার হাইড-এর (১৯১৩) হাত ধরে। মার্ভেলের হাত ধরে সিনেমাটিক ইউনিভার্সের চল শুরু হলে এই পুরনো ইউনিভার্সকেও পুনরুজ্জীবিত করার প্রচেষ্টা শুরু হয়। ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় ৩৪টি চলচ্চিত্রের বিশাল বহর নিয়ে নির্মিত এই শেয়ার্ড ইউনিভার্স আবারও ফিরে আসার চেষ্টা করে ড্রাকুলার (১৯৭৯) মাধ্যমে। ১৯৭৯ থেকে ২০১০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এই সিরিজের আরো সাতটি চলচ্চিত্র মুক্তি পায়। ২০১০-এ মুক্তি পাওয়া উল্ফম্যান বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়লে প্রযোজনা সংস্থা ইউনিভার্সাল পিকচার্স তাদের এই প্রচেষ্টার সমাপ্তি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়।
এর মধ্যে মার্ভেলের সিনেমাটিক ইউনিভার্সের নির্মাণ এবং সেগুলোর ব্যবসায়িক সফলতার কারণে ইউনিভার্স নির্মাণের যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়, তাতে ইউনিভার্সাল পিকচার্স তাদের ৪০-এর বেশি চলচ্চিত্রের গল্পকে নতুনভাবে এনে সিনেমাটিক ইউনিভার্স নির্মাণের আরেকটি প্রচেষ্টা শুরু করে। ভ্যাম্পায়ার চরিত্র কাউন্ট ড্রাকুলার গল্প নিয়ে নির্মিত ড্রাকুলা আনটোল্ড (২০১৪) ছিলো সেই প্রচেষ্টারই প্রারম্ভ। বক্স অফিসের সফলতায় উৎসাহিত হয়ে ২০১৭-তে তারা আনে দ্য মামি। এর কেন্দ্রীয় চরিত্রে টম ক্রুজ দর্শকের মধ্যে খুব বেশি সাড়া ফেলতে পারেনি। সেইসঙ্গে তার ক্যারিয়ারের সব থেকে বাজে পারফর্ম চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যেও এটাকে উপরের দিকেই ধরা যায়। বক্স অফিসে ৪১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করার পরেও প্রায় ৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের মতো লোকসান হয়। ফলে ইউনিভার্সাল পিকচার্সকে তাদের এই প্রজেক্ট নিয়ে কিছুটা ভাবতে হয়। এই চলচ্চিত্রের একটা বিশেষ দিক ছিলো, এখানে ইউনিভার্সাল মন্সটারের চরিত্রে ডক্টর জেকিলকে ডার্ক ইউনিভার্সের পার্শ্বচরিত্র হিসেবে আনা হয়। বক্স অফিসের ব্যর্থতা তাদের পরিকল্পনার পথে বিশাল বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
২০২০ খ্রিস্টাব্দে দ্য ইনভিজিবল ম্যান-এর মাধ্যমে এই ইউনিভার্স আবারও একটু উঠে দাঁড়ায়। স্বল্প বাজেটে নির্মিত এই চলচ্চিত্র একদিকে যেমন বক্স অফিসে ব্যবসা সফল হয়, অন্যদিকে এর জন্য নির্মাতা লি ওয়ানেল সমালোচকদের প্রশংসা পায়। এর পরে রেনফিল্ড (২০২৩) আবারও বক্স অফিসে ভয়ানকভাবে ব্যর্থ হয়। এই সফলতা আর ব্যর্থতার ঢেউয়ে উল্ফম্যান (২০২৫) আরেকটি ফ্লপ হিসেবে যুক্ত হয়। সবথেকে পুরনো ইউনিভার্স দেখেই হয়তো ইউনিভার্সাল পিকচার্স এখনো তাদের ইউনিভার্স নির্মাণের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
সফলতার দিক থেকে পুরনো অন্য ইউনিভার্সটির অবস্থা কিন্তু ঠিক তার বিপরীত। আবার এইটাকে সেই পুরনো ইউনিভার্সও বলা চলে না। ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে নির্মাতা ইশিরো হোন্ডার হাত ধরে যে মিডিয়া ফ্র্যাঞ্চাইজি জাপানে শুরু হয়, তা থেকে বর্তমানের মন্সটার ভার্স অনেকটাই আলাদা। এর সব থেকে বড়ো কারণ, এই মন্সটার ইউনিভার্স জাপানিজ ফ্র্যাঞ্চাইজির মিডিয়া রিবুট১৫। শুরুটা হয় গডজিলার(২০১৪) মাধ্যমে। একই ইউনিভার্সের আরেক চরিত্র কং-কে নিয়ে ২০১৭ তে মুক্তি পায় কং : স্কাই আইল্যান্ড। গডজিলা : কিং অব মন্সটার্স (২০১৯) চলচ্চিত্রের মাধ্যমে আরো বৃহতাকার মন্সটারদের আনা হয়, যা পরবর্তী সময়ে এই ফ্র্যাঞ্চাইজিকে সিনেমাটিক ইউনিভার্সে পরিণত করার পথ সুগম করে। গডজিলা ভার্সেস কং (২০২১) চলচ্চিত্রকে বলা যায় সেই অর্থে সিনেমাটিক ইউনিভার্স নির্মাণের মতো ক্রসওভার।
ব্যবসা সফলতা এবং দর্শকমহলে ব্যাপক সাড়া ফেলার কারণে এই ফ্র্যাঞ্চাইজির ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো সংশয় তৈরি হয়নি। পরবর্তী চলচ্চিত্র গডজিলা এক্স কং : দ্য নিউ এম্পায়ার (২০২৪) প্রায় ১৩৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাজেটে নির্মিত হলেও ৫৭২ মিলিয়ন ডলারের মতো ব্যবসা করে। ডার্ক ইউনিভার্সের মাধ্যমে ইউনিভার্সাল মন্সটারে ফিরে আসাটা অনেকটা কঠিন প্রতীয়মান হলেও মনস্টারভার্সের ক্ষেত্রে এ রকমটা দেখা যাচ্ছে না। বরঞ্চ দর্শকমহলে নিজের শক্তপোক্ত অবস্থান করে নেয় এই ইউনিভার্স। যার ফলাফল এবং প্রমাণ হিসেবে বলা যায়, একটা সফলভাবে চলমান সিনেমাটিক ইউনিভার্স। যদিও মাল্টিমিডিয়া ফ্র্যাঞ্চাইজি হিসেবেও এর পরিচিতি এবং অগ্রসরতা চোখে পড়ার মতো। পরবর্তী পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৭ খ্রিস্টাব্দের মার্চে পরের চলচ্চিত্র গডজিলা এক্স কং : সুপারনোভা মুক্তির ঘোষণা দিয়েছে প্রযোজনা সংস্থা লিজেন্ডারি পিকচার্স। চলচ্চিত্রের ডিস্ট্রিবিউশন রাইট অবশ্য ওয়ার্নার ব্রাদার্সের।
তবে সায়েন্স-ফিকশন নির্ভর সিনেমাটিক ইউনিভার্স নির্মাণে ওয়ার্নার ব্রাদার্সের এটাই একমাত্র চেষ্টা নয়। তাদের আরেক প্রচেষ্টা ছিলো ‘প্যাসিফিক রিম’। গডজিলা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে চিত্রলেখক ট্রেভিস বিচাম ‘কাইজু’ নামক বৃহদাকৃতির মন্সটারের প্রতিরোধে মানুষের প্রচেষ্টার গল্প নিয়ে আসে প্যাসিফিক রিম (২০১৩) চলচ্চিত্রে। চলচ্চিত্রটির ব্যবসা সফলতা ওয়ার্নার ব্রাদার্সকে আলাদা ইউনিভার্স গঠনে উদ্বুদ্ধ করে। তবে এই সিরিজের দ্বিতীয় চলচ্চিত্র প্যাসিফিক রিম : আপরাইজিং (২০১৮) দর্শকের মধ্যে জনপ্রিয়তা অর্জনে খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি। ফ্র্যাঞ্চাইজি হিসেবে মার্কেটে ভালো ব্যবসা করলেও চলচ্চিত্র জগতে চলার পথে বড়ো একটা হোঁচট হিসেবে ধরা যায় এটাকে। অবশ্য অ্যানিমেটেড সিরিজ হিসেবে গল্প বলাটা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। যার কারণে ভবিষ্যতে সিনেমাটিক ইউনিভার্স নির্মাণের আরেক প্রচেষ্টা আবারও দেখা যাবে বললে ভুল হবে না।
প্যাসিফিক রিম-এর ক্ষেত্রে অবশ্য সিনেমাটিক ইউনিভার্সের ব্যাপারটা কিছুটা অন্যদিকে যায়। সিনেমাটিক ইউনিভার্সে সাধারণত বিভিন্ন চলচ্চিত্রে বিভিন্ন চরিত্রের দিকে ফোকাস দিয়ে শেষে একটা বৃহত্তর গল্পে সবাইকে আনা হয়, যা অনেকটাই শেয়ার্ড ইউনিভার্সের ধাঁচে পড়ে। শেয়ার্ড ইউনিভার্সের সঙ্গে সিনেমাটিক ইউনিভার্সের মূল পার্থক্য হচ্ছে তাদের ফোকাসে। শেয়ার্ড ইউনিভার্সের চরিত্র আর গল্প ওভারল্যাপ করলেও বৃহত্তর গল্পের অস্তিত্ব থাকাটা বাধ্যতামূলক নয়। কিন্তু এখন সিনেমাটিক ইউনিভার্স বলতে মার্ভেলের মডেল অনুসরণ করা হয়, যেখানে বৃহত্তর গল্পের নির্মাণ ও প্রসারণ হয় প্রতিটি চলচ্চিত্রের অংশ হিসেবে।
কিন্তু শাব্দিক দিক দিয়ে দেখতে গেলে যেকোনো চলচ্চিত্রের সিরিজের আলাদা দুনিয়া তৈরি হয়ে গেলেই সেটাকে সিনেমাটিক ইউনিভার্স বলা যায়। সাইন্স ফিকশন বা ফ্যান্টাসি চলচ্চিত্রের সিরিজগুলোকে সেই অর্থে একেকটি সিনেমাটিক ইউনিভার্স বলা যায় শাব্দিক দিক থেকে যুক্তির মারপ্যাঁচের মাধ্যমে। প্রতিটা চলচ্চিত্র সিরিজের অংশ হিসেবেই কাজ করে। বৃহত্তর গল্পের নির্মাণ বা তার জন্য কিছু নির্দিষ্ট চরিত্রে আলাদা করে কোনো ফোকাস দেওয়া হয় না। তাই এদের বেড়ে ওঠার ধরন অনেকটা মিডিয়া ফ্র্যাঞ্চাইজির ধাঁচে হয়।
মিডিয়া ফ্র্যাঞ্চাইজির সংজ্ঞায়নে ওয়াল্ট ডিজনি কোম্পানির সিইও বব আইগার বলেন, ‘এটা এমন কিছু, যা দীর্ঘ সময় নিয়ে একাধিক এলাকা এবং একাধিক ব্যবসায় ভ্যালু তৈরি করে।’ সেই অর্থে প্রতিটি সিনেমাটিক ইউনিভার্স বা শেয়ার্ড ইউনিভার্সকে একেকটি মিডিয়া ফ্র্যাঞ্চাইজি বললে ভুল হবে না। মিডিয়া ফ্র্যাঞ্চাইজির নির্মাণে প্রায়শই ক্রস-প্লাটফর্ম মার্কেটিংয়ের দরকার পড়ে। বিভিন্ন প্লাটফর্মের মধ্যকার এই বৈচিত্র্য একদিকে যেমন বাণিজ্যিকভাবে লাভের সম্ভাবনা বৃদ্ধি করে; অন্যদিক ভোক্তাদের মধ্যে পণ্য নিয়ে আইডেন্টিটি নির্মাণ এবং মালিকানার অনুভূতিকে দৃঢ় করে। এই ভোক্তাদের সমন্বয়েই ধীরে ধীরে ফ্যানডম গড়ে ওঠে। সোশাল মিডিয়া এবং ইন্টারনেটের প্রচার ও প্রসারের সুবাদে বর্তমানে ফ্যানডমগুলো বিশালতা লাভ করেছে।
ট্রান্সমিডিয়া বা মাল্টিমিডিয়া পর্যায়ে ফ্র্যাঞ্চাইজি গড়ে ওঠা গল্প একইসঙ্গে বিভিন্ন মাধ্যমে বেড়ে উঠতে থাকে, যাতে প্রতিটি মাধ্যমেই সর্বোচ্চ পরিমাণ ভোক্তা বা ফ্যানডম রাখা যায়। সিনেমাটিক ইউনিভার্স একদিকে যেমন একাধিক চলচ্চিত্রে একই গল্পের সম্প্রসারণ করে, অন্যদিক অন্যান্য মাধ্যম যেমন অ্যানিমেটেড সিরিজ, ভিডিও গেম, এবং অ্যাডভার্টাইজিং দুনিয়াতেও ছড়িয়ে যাচ্ছে। মার্ভেল সিনেমাটিক ইউনিভার্সকে সেক্ষেত্রে কমিক্স থেকে জন্ম নেওয়া মাল্টিমিডিয়া ফ্র্যাঞ্চাইজি বলা যায়।
ফ্র্যাঞ্চাইজির দিক থেকে সব থেকে পুরনো বলা যায় ‘স্টার ওয়ার্স’ সিরিজকে। মাল্টিমিডিয়া ফ্র্যাঞ্চাইজির চল ডিজনি শুরু করলেও চলচ্চিত্রের পর্দায় নিজেদের আলাদা ইউনিভার্স নির্মাণ করে ফ্র্যাঞ্চাইজির শুরু হয় নির্মাতা জর্জ লুকাস-এর স্টার ওয়ার্স-এর(১৯৭৭) মাধ্যমে। তিন চলচ্চিত্রের ট্রিলজির মাধ্যমে শুরু করা ইউনিভার্স বেড়ে ওঠে পরবর্তী সময়ে প্রিকুয়েল হিসেবে দ্বিতীয় ট্রিলজিতে আরো তিনটি চলচ্চিত্র আনে ১৯৯৯-২০০৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে। ২০১৫ থেকে ২০১৯-এর মধ্যে তারা আরেকটি ট্রিলজি আনে। এর বাইরে স্ট্যান্ডঅ্যালোন হিসেবে মুক্তি পাওয়া রোগ ওয়ান : আ স্টার ওয়ার্স স্টোরি (২০১৬) এবং সোলো : আ স্টার ওয়ার্স স্টোরি (২০১৮) নামের দুইটি চলচ্চিত্র বক্স অফিসে সফলতার ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়। ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে প্রথম চলচ্চিত্র ব্যবসাসফল হওয়ার পর থেকেই কিন্তু স্টার ওয়ার্স ধীরে ধীরে মাল্টিমিডিয়া ফ্র্যাঞ্চাইজি হিসেবে বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ফ্র্যাঞ্চাইজির এই তালিকায় আরেক বিখ্যাত নাম লেখক টোলকিন-এর ‘লর্ড অফ দ্য রিংস’ উপন্যাস সিরিজ। ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে দ্য হবিট নামের অ্যানিমেটেড সিরিজের মাধ্যমে উপন্যাসের পাতা থেকে গল্প চলে আসে টেলিভিশনের পর্দায়। পরবর্তী সময়ে লর্ড অব দ্য রিংস : দ্য ফেলোশিপ অব দ্য রিং (২০০১) চলচ্চিত্রের মাধ্যমে এই সিরিজের সূচনা হয়। টোলকিনের উপন্যাস চলে যায় ধীরে ধীরে ট্রান্সমিডিয়া বা মাল্টিমিডিয়া ফ্র্যাঞ্চাইজির পর্যায়ে। এই তালিকায় আরো অসংখ্য নামের মধ্যে হ্যারি পটার, ট্রান্সফর্মার্স, স্টার-ট্রেক উল্লেখযোগ্য।
এশিয়ার চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে সিনেমাটিক ইউনিভার্স
ইউরোপের চলচ্চিত্রের ইন্ডাস্ট্রিতে শেয়ার্ড ইউনিভার্স বা ইন্টারকানেক্টেড চলচ্চিত্রের চল বেশ আগে থেকেই আছে। হয়তো সে কারণেই নতুন করে সিনেমাটিক ইউনিভার্সের চল সেখানে এখনো দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু এই জ্বর খুবই মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে এশিয়ার ইন্ডাস্ট্রিগুলোতে। মালয়েশিয়া, চায়না, জাপান, ভারতে ছড়িয়ে পড়ার পর সেই জ্বরের প্রাদুর্ভাব এখন দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতেও। এর মধ্যে সংখ্যার দিক থেকে এগিয়ে আছে অবশ্য ভারতের ইন্ডাস্ট্রি।
এশিয়াতে সেই অর্থে প্রথম সিনেমাটিক ইউনিভার্স কোনটা, বা কোথায় গড়ে উঠেছে; এই প্রশ্নের উত্তর কিছুটা জটিল। টাইমলাইন ধরে দেখতে গেলে সিনেমাটিক ইউনিভার্সের অংশ হিসেবে ধরা হয়, এমন চলচ্চিত্র সব থেকে পুরনো ভারতীয় ইন্ডাস্ট্রিতেই। কিন্তু সেক্ষেত্রে এগুলোকে সিনেমাটিক ইউনিভার্সের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার ঘোষণা তুলনামূলক অনেকটা পরে। এশিয়ায় ঘোষণা দিয়ে সিনেমাটিক ইউনিভার্স আনার হিড়িক পড়ে যায় ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে। ইন্দোনেশিয়ায় নির্মাতা জোকো আনোয়ার গুন্ডালা (২০১৯) চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ‘বুমিলাঙ্গিত কমিক্সে’র গল্পকে চলচ্চিত্রের পর্দায় আনার প্রকল্প শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে আরো তিনটি চলচ্চিত্র শ্রী আসি (২০২২), ভার্গো অ্যান্ড দ্য স্পার্কলিংস (২০২৩) এবং গোডাম অ্যান্ড টিরা (২০২৫) চলচ্চিত্রের মাধ্যমে এই ইউনিভার্সকে আরো সম্প্রসারিত করা হয়। বুমিলাঙ্গিত কমিক্সের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ে তারা মোট সাতটি চলচ্চিত্র আনবে। দর্শকের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা এবং বক্সঅফিসে ব্যবসা সফলতার কারণে এই সিনেমাটিক ইউনিভার্সকে আপাতত আর পেছনে ফিরে তাকাতে হচ্ছে না।
তবে ইন্দোনেশিয়ার দর্শকের মধ্যে নির্মাতা জোকো আনোয়ারের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে ওঠে। দর্শকমহলে গুঞ্জন আছে যে, তার হরর জনরার তিনটি চলচ্চিত্র পেঙ্গাব্দি সেটান (২০২২), সিক্সা কুবুর (২০২৪) ও পিন্টু টেরালাং (২০০৯) এর মধ্যেও যোগসাজশ আছে। তার সিক্সা কুবুর (২০২৪) আর পেঙ্গাব্দি সেটান ২ : কমিউনিওন (২০২২) চলচ্চিত্রে একই গাছ ও কবরস্থানের দৃশ্য দর্শকের নজর এড়ায়নি। যার ফলে এখানে একটা নতুন সিনেমাটিক ইউনিভার্স থাকার সম্ভাবনা আছে, এই কথা দর্শকের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করে। আনোয়ার নিজে অবশ্য এই ব্যাপারে এমন কিছু নিশ্চিত করেননি। তবে তার চলচ্চিত্রে থাকা ইস্টার এগ১৬-এর কথাও অস্বীকার করেননি। তবে এভাবে ইস্টার এগ রেখে পরবর্তী সময়ে সিনেমাটিক ইউনিভার্স নির্মাণের ব্যাপারটা একেবারেই নতুন কিছু নয়। তাই হয়তো দর্শকমহলে একটা আশা রয়েই গেছে।
২০১৯ খ্রিস্টাব্দে ইন্দোনেশিয়ার পাশাপাশি চিনেও সিনেমাটিক ইউনিভার্স তৈরির প্রকল্প শুরু হয়। এক্ষেত্রে এই ইউনিভার্সের বৈশিষ্ট্য ছিলো, এর পুরোটাই অ্যানিমেটেড। ‘ফেংশিন ইয়ানভি’ নামের চাইনিজ উপন্যাস থেকে বিভিন্ন চরিত্রকে চলচ্চিত্রের পর্দায় আনার মাধ্যমে এই ইউনিভার্স দর্শকমহলে উল্লেখযোগ্য জনপ্রিয়তা পায়। এ পর্যন্ত এই ইউনিভার্সের অংশ হিসেবে মুক্তি পাওয়া চলচ্চিত্রের সংখ্যা মাত্র তিনটি—নে ঝা (২০১৯), জিয়াং জিয়া (২০২০) ও নে ঝা ২ (২০২৫)।
এদিকে মালয়েশিয়ার প্রযোজনা সংস্থা অ্যাস্ট্রো শ ২০২৪ খ্রিস্টাব্দে তাদের নিজস্ব সিনেমাটিক ইউনিভার্স শুরুর ঘোষণা দিয়েছে। পুলিশ ইভো (২০১৫) দিয়ে শুরু হওয়া পুলিশ ইভো সিরিজের তিনটি চলচ্চিত্র, ২০২৩-এ মুক্তি পাওয়া ‘প্রজেক্ট : হাই কাউন্সিল’ নামের টিভি সিরিজ, এবং কেলুয়াং ম্যান (২০২৫) মিলিয়ে তারা তাদের অ্যাস্ট্রো শ সিনেমাটিক ইউনিভার্স গঠন করেছে। এ ব্যাপারে এস্ট্রো শ’র কর্ণধার রাজা জাস্টিনা বলেছেন, ‘গ্লোবাল বক্সঅফিস গুরুত্বপূর্ণ হলেও আমাদের উচিত মার্চেন্ডাইজিং, ব্র্যান্ড ইন্টিগ্রেশন এবং এক্সপ্যান্ডেড প্লাটফর্মের মতো নতুন লাভজনক পন্থা অন্বেষণ করা।’১৭ নতুন নির্মাতাদের জন্য সুযোগ নির্মাণ এবং মালয়েশিয়ান চলচ্চিত্র ইকোসিস্টেমের উন্নয়নে তাদের এই পদক্ষেপ কার্যকরী হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
সিনেমাটিক ইউনিভার্সের ছোঁয়া এশিয়াতে কিছুটা ভিন্নভাবে লেগেছে বলা যায়। ইন্দোনেশিয়া যদিও কমিক্স থেকে গল্প নিয়ে ইউনিভার্স নির্মাণ করেছে, চিন আশ্রয় নিয়েছে তাদের পৌরাণিক উপন্যাসের। মালয়েশিয়া চেষ্টা করেছে ফ্র্যাঞ্চাইজির জায়গা থেকে দেখার। আর থাইল্যান্ড সেখানে নিজেদের হরর এবং ফোকলোরের ওপরে নির্ভর করে নিজেদের ইউনিভার্স নির্মাণ করছে। ২০২৪ খ্রিস্টাব্দে থাইল্যান্ডে সিয়াম নামের হরর সিনেমাটিক ইউনিভার্স নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছে প্রযোজনা সংস্থা প্রানাকন ফিল্মস। প্রথম সিনেমা র্যাং ওয়াত সাকেত, প্রেত ওয়াত সুঠাত-এর নির্মাণ কাজ চলছে।
একই ধারাবাহিকতায় জাপানেও সিনেমাটিক ইউনিভার্স প্রকল্প শুরু হয়েছে ২০২২-এ। চার প্রযোজনা সংস্থা তোহো, খারা, সুবুয়ারা এবং তোয়েই-এর সম্মিলিত প্রকল্প হিসেবে এই ইউনিভার্সের পথ চলার শুরু হয়। নির্মাতা হাদেয়াকি আন্নো চার প্রযোজনা সংস্থার চার ফ্রাঞ্চাইজি গডজিলা, আল্ট্রাম্যান, ইভ্যাংগেলিয়ন ও কামেন রাইডার-এর সব চরিত্রকে এক ছাতার নিচে এনেছেন।
এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় ভারতীয় চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি সংখ্যা ও বৈচিত্র্যের দিক থেকে বরাবরই সমৃদ্ধ। এর ছাপ দেখা যায় সিনেমাটিক ইউনিভার্সের ক্ষেত্রেও। ভারতের বাইরে পুরো এশিয়াতে যেখানে সিনেমাটিক ইউনিভার্সের সংখ্যা পাঁচটি, শুধু ভারতেই সেই সংখ্যা সাত।
ভারতীয় চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে কথা উঠলে সবার আগেই উঠে আসে তার বৈচিত্র্যের কথা। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে শুধু সংস্কৃতি আর রীতিনীতির জায়গা থেকেই নয়, বরং চলচ্চিত্রের দর্শন আর গল্প বলার ধরনেও আছে বিস্তর ফারাক। যে কারণে এক দেশের মধ্যেই বিভিন্ন রাজ্যে বিভিন্ন চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠেছে। কেন্দ্রে থাকা বলিউডে সিনেমাটিক ইউনিভার্স গড়ে উঠেছে সিক্যুয়াল আকারে বেড়ে ওঠা চলচ্চিত্র সিরিজ থেকে। তাই সব থেকে পুরনো সিনেমাটিক ইউনিভার্স কোনটা, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাও মুশকিল। সাল হিসাব করে দেখতে গেলে পুরনো ইউনিভার্স হচ্ছে রোহিত শেঠির কপ-ভার্স, বা কপ ইউনিভার্স। কিন্তু সেক্ষেত্রেও স্বকীয়তার এক প্রশ্ন এখানে রয়েই যায়।
রোহিত শেঠির কপ-ভার্সের শুরুটা হয়েছিলো ২০১০ খ্রিস্টাব্দে মুক্তি পাওয়া দক্ষিণের চলচ্চিত্র সিঙ্গাম-এর (২০১০) রিমেক সিংহাম-এর মধ্য দিয়ে। রিমেক হলেও দর্শকের মধ্যে ভালো সাড়া ফেলে চলচ্চিত্রটি। চরিত্রের স্বত্ব কিনে নিয়ে মূল চলচ্চিত্রের গল্প থেকে আলাদা হয়ে নিজের চলচ্চিত্রের পরের গল্পকে নিজের মতো সাজিয়ে দ্বিতীয় চলচ্চিত্রে আনেন রোহিত শেঠি। যার কারণে সিংহাম-এর (২০১০) সিক্যুয়াল সিংহাম ২-এর (২০১৩) গল্প থেকে সিংহাম রিটার্ন্স (২০১৪) এর গল্প মূল চরিত্রের বাইরে পুরোটাই আলাদা। অবশ্য তখনো রোহিত শেঠির কাছ থেকে সিনেমাটিক ইউনিভার্সের কোনো ঘোষণা আসেনি। তবে পরবর্তী সময়ে সিম্বা (২০১৮) এবং সুরিয়াভানশি (২০২১) চলচ্চিত্রের মাধ্যমে রোহিত শেঠি তার সিনেমাটিক ইউনিভার্সের মাঠ মোটামুটি পর্যায়ে সাজিয়ে ফেলেন।
২০২৪-এ মুক্তি পাওয়া সিংহাম এগেইন-এর মাধ্যমে পরিপূর্ণভাবে সিনেমাটিক ইউনিভার্সের ক্রসওভার নিয়ে আসেন রোহিত। মহাকাব্য ‘রামায়ণ’-এর গল্পের আদলে সাজানো এতে, নতুন কিছু চরিত্র সংযোজনের পাশাপাশি তিনি এই সিনেমাটিক ইউনিভার্সের ভবিষ্যতও গুছিয়ে নেন। রোহিত শেঠির ইউনিভার্সের মূল লক্ষ্যই ছিলো দুর্নীতি ও অপরাধের বিরুদ্ধে লড়ে যাওয়া পুলিশ কর্মকর্তাদের এক আলাদা সিনেমাটিক ইউনিভার্স। গল্পের সম্প্রসারণে ‘অ্যামাজন প্রাইম’-এ ২০২৪ খ্রিস্টাব্দে মুক্তি পেয়েছে ‘ইন্ডিয়ান পুলিশ ফোর্স’ ওয়েব সিরিজ। মাসালা সিনেমার১৮ আদলে নির্মিত এই ইউনিভার্সের সর্বশেষ মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র সিংহাম এগেইন-এর পোস্ট-ক্রেডিট দৃশ্যে দাবাং (২০১০) চলচ্চিত্রের মূল চরিত্র চুলবুল পান্ডেকে দেখানো হয়েছে। এই ক্রসওভারের মাধ্যমে দাবাং ফ্র্যাঞ্চাইজিকে কপ-ভার্সের অংশ করে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছে বললে ভুল হবে না। এর সঙ্গে প্রযোজনা সংস্থাগুলোর মধ্যেও এই ইউনিভার্সের পরবর্তী কাজগুলোর জন্য নতুন চুক্তি হচ্ছে বলেই শোনা যায়। নেটিজেনদের মধ্যে ‘প্রজেক্ট চুলবুল সিংহাম’ নামের নতুন চলচ্চিত্রের গুঞ্জনও শোনা যাচ্ছে।
তবে সিনেমাটিক ইউনিভার্স হিসেবে সামঞ্জস্যতার যে নিয়ম খুবই গুরুতরভাবে মেনে চলা হয়, শেঠির কপ-ভার্সে তার সামান্য হলেও অনুপস্থিতি লক্ষণীয়। প্রথম চলচ্চিত্র সিংহাম-এ থাকা নায়িকার দ্বিতীয় চলচ্চিত্রে অনুপস্থিতির কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। সেদিক থেকে কিছুটা একই সময়ে গড়ে ওঠা সব থেকে জনপ্রিয় সিনেমাটিক ইউনিভার্স হচ্ছে যশ রাজ ফিল্মসের হাত ধরে বেড়ে ওঠা যশ রাজ স্পাইভার্স বা স্পাই ইউনিভার্স। ২০১২ খ্রিস্টাব্দে মুক্তি পাওয়া এক থা টাইগার নামক স্পাই থ্রিলারের মাধ্যমে এই ইউনিভার্সের গল্পের সূচনা। এরপরে টাইগার জিন্দা হ্যায় (২০১৭) ও ওয়ার (২০১৯) আলাদা চলচ্চিত্র হিসেবে মুক্তি পায়।
ওয়ার-এর পরে অবশ্য এই গুঞ্জন শোনা যায়, টাইগার ও ওয়ার-এর পাশাপাশি আরেকটি চলচ্চিত্র ফ্র্যাঞ্চাইজি যুক্ত করে নতুন সিনেমাটিক ইউনিভার্স নির্মাণের পরিকল্পনা চলছে। ইউনিভার্স হিসেবে ঘোষণা আসে অবশ্য পাঠান -এর (২০২৩) মাধ্যমে। পরবর্তী সময়ে টাইগার ৩ (২০২৩) ও ওয়ার ২ (২০২৫) মাধ্যমে সিনেমাটিক ইউনিভার্স হিসেবে এর অগ্রগতি একদিকে যেমন দর্শককে মাতিয়ে রেখেছে, অন্যদিকে বক্স অফিসে সফলতার ধারাবাহিকতাও অব্যাহত রেখেছে। এই ইউনিভার্সের পরবর্তী চলচ্চিত্র আলফা ২০২৫-এর ডিসেম্বরে মুক্তির কথা থাকলেও তা জুলাই ২০২৬-এ পিছিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
হরর আর কমেডির সংমিশ্রণে ম্যাডক ফিল্মসের হাত ধরে নির্মিত হয়েছে ম্যাডক হরর কমেডি ইউনিভার্স। স্ত্রী : মার্দ কো দার্দ হোগা (২০১৮) এর মধ্য দিয়ে এই ইউনিভার্সের পথচলা। কর্ণাটকের ‘নালা বে’ ফোকটেলের ওপরে নির্মাণ করা এই চলচ্চিত্র দর্শকের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। পরবর্তী সময়ে অরুণাচল প্রদেশের ফোকটেল ‘ইয়াপাম’ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নির্মিত ভেড়িয়া : জাঙ্গাল মে কান্ড (২০২২) সেই সফলতার ধারা অব্যাহত রাখে। স্থানীয় ফোকটেলকে চলচ্চিত্রের পর্দায় তুলে আনার মাধ্যমে সিনেমাটিক ইউনিভার্স নির্মাণের এই ভাবনা একেবারেই আলাদা এবং অসাধারণ বলা যায়। পরবর্তী চলচ্চিত্রগুলোতেও একই পন্থাই অবলম্বন করা হয়েছে। মুঞ্জা (২০২৪) চলচ্চিত্রে ভারতের কোঙ্কান এলাকার মারাঠি ফোকটেল এর ‘মুঞ্জা’ চরিত্র উপস্থাপন করা হয়।
একই বছরে মুক্তি পাওয়া স্ত্রী ২ : সারাকাটা কা আতাঙ্ক-এ উপস্থাপন করা হয়েছে বাঙালি ফোকটেল ‘স্কন্ধকাটা’ চরিত্র। সর্বশেষ মুক্তি পাওয়া থামায় (২০২৫) যদিও ভারতীয় ফোকটেল চরিত্র ‘বেতাল’দের ভ্যাম্পায়ার হিসেবে দেখানো হয়, কিন্তু সেইসঙ্গে এই ইউনিভার্সে তাদের উৎপত্তির গল্পও তুলে ধরা হয়েছে। এই ইউনিভার্সের অংশ হিসেবে ২০৩০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত আরো নয়টি চলচ্চিত্র মুক্তির পরিকল্পনা এবং ঘোষণা দেওয়া হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী মার্ভেলের অ্যাভেঞ্জার্স -এর মতো গ্র্যান্ড ক্রসওভার করে দুইটি চলচ্চিত্র আসার কথাও আছে। এ পর্যন্ত ভারতে নির্মিত হওয়া সিনেমাটিক ইউনিভার্সের মধ্যে সামঞ্জস্যতার দিক থেকে পারফেক্ট ইউনিভার্স বলা যায় এটাকে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, সিনেমাটিক ইউনিভার্সে কিছু কমন চরিত্র থাকে, যাদের উপস্থিতির কারণে সেই ইউনিভার্সের সব চলচ্চিত্রের মধ্যে থাকা যোগসূত্র দর্শকের কাছে পরিষ্কার থাকে। সিনেমাটিক ইউনিভার্সের ভাষায় এদের বলা হয় কানেক্টিভ থ্রেড (Connective Thread)। ম্যাডক হরর কমেডি ইউনিভার্সের সব চলচ্চিত্রে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ থাকার মাধ্যমে ‘জানা’ নামের চরিত্র এই ভূমিকা পালন করে।
বলিউডের বাইরে তামিল ইন্ডাস্ট্রিতে ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে নির্মাতা লোকেশ কাঙ্গারাজ-এর হাত ধরে শুরু হয় লোকেশ সিনেমাটিক ইউনিভার্স; যা দর্শকের মধ্যে লোকিভার্স হিসেবে পরিচিত। কাইথি (২০১৯), ভিক্রাম (২০২২) এবং লিও (২০২৩) এর মাধ্যমে দর্শকের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। ড্রাগস আর ক্রাইম সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে লড়ে যাওয়া কিছু চরিত্রের গল্পকে একসঙ্গে আনার মাধ্যমে এই ইউনিভার্সকে সম্প্রসারণ করা হয়। প্রত্যেক চলচ্চিত্রে তামিল ইন্ডাস্ট্রির বাঘা সব অভিনয়শিল্পীকে আনা হয়। কাইথিতে কার্থি, ভিক্রাম-এ কমল হাসান, আর লিওতে থালাপতি বিজয়কে কেন্দ্রীয় চরিত্রে দেখা গেছে। সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ খ্রিস্টাব্দে মুক্তির ঘোষণা দেওয়া পরবর্তী চলচ্চিত্র বেঞ্জিতে রাঘব লরেন্স’কে দেখা যাবে।
দক্ষিণ ভারতের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির আরেক সম্ভাব্য সিনেমাটিক ইউনিভার্স হচ্ছে হিট ইউনিভার্স। সম্ভাব্য বলার কারণ, এখন পর্যন্ত মুক্তি পাওয়া তিনটি চলচ্চিত্র অনেকটাই সিরিজ আকারে মুক্তি পেয়েছে। প্রতিটি চলচ্চিত্রে হিট অর্থাৎ হোমিসাইড ইন্টারভেনশন টিম নামের পুলিশের এক বিশেষ দলের কর্মকর্তাদের অপরাধের বিরুদ্ধে লড়ার গল্প তুলে ধরা হয়েছে। যদিও তিনটি চলচ্চিত্রের মূল চরিত্রগুলো আলাদা, কিন্তু প্রত্যেকটাতেই আগের চলচ্চিত্রের মূল চরিত্রের ক্যামিও দৃশ্যমান ছিলো। ফলে প্রচার মাধ্যমে এবং দর্শকের মধ্যে একে ইউনিভার্স হিসেবে নেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
সিনেমাটিক ইউনিভার্সের কাতারে পড়ার মতো আরেকটি ইউনিভার্স বলা যায় পশ্চিমবঙ্গের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি টালিউডের সৃজিত মুখার্জির কপ ইউনিভার্স। বাইশে শ্রাবণ (২০১১) এর মাধ্যমে শুরু হওয়া ইউনিভার্সে মূলত পুলিশের কেস সল্ভ করার গল্প দেখানো হয়। চারটি চলচ্চিত্রের গল্প ভিন্ন হলেও, চরিত্ররা একই দুনিয়ারই অংশ। যেমন বাইশে শ্রাবণ-এর অভিজিৎ প্রকাশি চরিত্রের গল্পকে সিকুয়াল আকারে আনা হয়েছে দ্বিতীয় পুরুষ (২০২০) এর গল্পে। আরেক চরিত্র প্রবীরের অতীতের গল্প টানা হয়েছে দশম অবতার (২০২৩) চলচ্চিত্রে। সেখানে প্রবীরের সঙ্গে থাকা দ্বিতীয় মূল চরিত্রকে আবার দেখা যায় ভিঞ্চি দা (২০১৯) এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে। সবমিলিয়ে এই ফ্র্যাঞ্চাইজিকে সিনেমাটিক ইউনিভার্স না বলা গেলেও, শেয়ার্ড ইউনিভার্স থেকে পরবর্তী সময়ে সিনেমাটিক ইউনিভার্স হয়ে ওঠার প্রবল সম্ভাবনা রয়েই যায়। নির্মাতা সৃজিত মুখার্জি অবশ্য এই ইউনিভার্সের আরো দুইটি চলচ্চিত্র নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।
ভারতীয় চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে সিনেমাটিক ইউনিভার্সের সর্বশেষ সংযোজন মালায়লাম ইন্ডাস্ট্রির লোকাহ ইউনিভার্স। লোকাহ চ্যাপ্টার ওয়ান : চান্দ্রা (২০২৫) চলচ্চিত্রের মাধ্যমে এর পথচলার শুরু। অভিনয়শিল্পী দুলকার সালমান-এর প্রযোজনা আর নির্মাতা ডমিনিক আরুন-এর নির্দেশনায় নির্মিত এই চলচ্চিত্র মাত্র ৩০ কোটি রূপির বাজেটে প্রায় ৩০০ কোটি রূপির ব্যবসা করে। মূলত পৌরাণিক মন্সটারদের সুপারহিরো পর্যায়ের কার্যক্রম দেখানোর মাধ্যমে এই ইউনিভার্সের মধ্যে অ্যাভেঞ্জার্স-এর কিছুটা ছাপ দেখা যাচ্ছে। ২০২৫-এর সেপ্টেম্বরে এই ইউনিভার্সের দ্বিতীয় চলচ্চিত্র লোকাহ চ্যাপ্টার ২-এর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যেখানে প্রথম চলচ্চিত্রের পার্শ্বচরিত্র ‘চেত্থান’ মূল চরিত্র হিসেবে থাকছে।
বাংলাদেশে সিনেমাটিক ইউনিভার্সের সম্ভাবনা
সিনেমাটিক ইউনিভার্সের ঢেউ হলিউডে শুরু হলেও এশিয়ায় তা বিস্তৃত হয়ে ভারত ছাপিয়ে বাংলাদেশে পৌঁছেছে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির নির্মাতা ভিকি জাহেদ, শিহাব শাহীন আর রায়হান রাফী নিজেদের মতো করে ইউনিভার্স নির্মাণে নেমে পড়েছে। ভিকি জাহেদ তার নাটকের সিরিজ ‘পুনর্জন্ম’-এর মাধ্যমে দর্শকের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টির পর তার চলচ্চিত্র শুক্লপক্ষ (২০২২) এর সঙ্গে সেই সিরিজের কানেকশন দেখানোর মাধ্যমে শেয়ার্ড ইউনিভার্স নির্মাণ প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছেন। ২০২২-এর সেপ্টেম্বরে ‘বাংলা ট্রিবিউন’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নির্মাতা জাহেদ তার পুনর্জন্ম ইউনিভার্স নির্মাণের পরিকল্পনা ব্যক্ত করেন। আপাতত তার এই প্রজেক্ট শেয়ার্ড ইউনিভার্স অবস্থায় থাকলেও পরবর্তী সময়ে সিনেমাটিক ইউনিভার্স হয়ে ওঠার প্রবল সম্ভাবনা রয়েই যায়।
অন্যদিকে নির্মাতা রায়হান রাফীর চলচ্চিত্র তাণ্ডব (২০২৫) এর মাধ্যমে সেই অর্থে বাংলাদেশে প্রথম সিনেমাটিক ইউনিভার্স শুরু হয়ে গেছে। যদিও এই চলচ্চিত্রে পোস্ট ক্রেডিট সিনে রাফীর আগের এক চলচ্চিত্র সুড়ঙ্গ-এর মূল চরিত্র মাসুদকে আনা হয়েছে। যার ফলে এই ইউনিভার্সের প্রথম চলচ্চিত্র বলা যায় সুড়ঙ্গকে। তাণ্ডব নিয়ে নির্মাতা রাফী বলেন, ‘এই সিনেমায় আমি এমন একটা পৃথিবী তৈরি করতে চাই, যেখানে দর্শকরা একেবারে নতুন ধরনের অ্যাডভেঞ্চার এবং ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে গল্পটি উপভোগ করতে পারবেন। এটি শুধু একটা সিনেমা নয়, এটি আমার সিনেমাটিক ইউনিভার্সের প্রথম ধাপ।’ চলচ্চিত্রের আরেক চরিত্র ‘আরমান মনসুর’ এর উপস্থাপন থেকে এটা অনেকটাই স্পষ্ট যে, এই ইউনিভার্সের পরবর্তী চলচ্চিত্রের মূল চরিত্র হয়তো তিনি! এর বাইরে নির্মাতা মেহেদী হাসান হৃদয় নির্মাণ করছেন তার নিজস্ব সিনেমাটিক ইউনিভার্স। এই ইউনিভার্সের দুইটি চলচ্চিত্র বরবাদ (২০২৫) ও রাক্ষস (২০২৬) কে একই সুতোয় বাঁধা হয়েছে জিল্লুর নামের পার্শ্বচরিত্রের মাধ্যমে। ব্যবসা সফলতার কারণে হোক, কিংবা তুমুল জনপ্রিয়তার কারণেই হোক, এই সিনেমাটিক ইউনিভার্সের সম্প্রসারণে সামনে হয়তো আরো কিছু চলচ্চিত্র দেখতে পাওয়া যাবে।
এদিকে ওয়েব সিরিজের দুনিয়াতেও এমন ইউনিভার্সের প্রতাপ দেখা যাচ্ছে। নির্মাতা শিহাব শাহীনের ‘সিন্ডিকেট’ (২০২২) এর চরিত্র ‘অ্যালেন স্বপন’ তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করলে পরবর্তী সময়ে ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে ‘মাইসেলফ অ্যালেন স্বপন’ এবং ২০২৫-এ ‘মাইসেলফ অ্যালেন স্বপন ২’ নামের দুইটি সিরিজ আসে। স্পিনঅফ হিসেবে শুরু হলেও ‘ক্যাকটাস’ (২০২৬) ওয়েব সিরিজের মাধ্যমে এখন এটা স্বতন্ত্র ইউনিভার্স হিসেবে নিজের অবস্থান শক্ত করে নিয়েছে। এই ধারাবাহিকতায় সামনে আরো বেশ কয়েকটি ওয়েব সিরিজের দেখা মিলবে বললে ভুল বলা হবে না বোধহয়।
সিনেমাটিক ইউনিভার্সের ভবিষ্যৎ
প্রযোজকদের বিনিয়োগ, নির্মাতা এবং চলচ্চিত্রের অন্যান্য কলাকুশলীদের পরিশ্রম আর মেধাশ্রমে গড়ে ওঠা প্রত্যেকটি সিনেমাটিক ইউনিভার্সই অনন্য এবং গল্প বলার জায়গা থেকে দর্শকের মধ্যে শক্তপোক্ত জায়গা করে নিচ্ছে প্রতিনিয়ত। তাই সুদূর ভবিষ্যতে এর প্রভাব ও প্রসার দেখা যাবে। তবে এর কিছু ঝামেলাও আছে। গল্প যতো বাড়তে থাকে, সেই গল্প আর অভিনয়ের মান নিয়ে দর্শকের মধ্যে আকাঙ্ক্ষা আর চাহিদা বাড়তেই থাকে। যার কারণে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত কোনো সিনেমাটিক ইউনিভার্সের গল্পের মান ধরে রাখার পাশাপাশি দর্শকের আকর্ষণ ধরে রাখাটা চ্যালেঞ্জের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। আবার ফ্যানডমে হতে থাকা আলোচনা আর জল্পনা-কল্পনাও সেই চ্যালেঞ্জকে আরো গুরুতর করে তোলে। মার্ভেল সিনেমাটিক ইউনিভার্সের বর্তমান ফেইজে এসে এই সমস্যারই সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
অ্যাভেঞ্জার্স ও এন্ডগেম-এর মতো চলচ্চিত্রের পরে, পরবর্তী বৃহত্তর গল্পের জন্য চলচ্চিত্র নির্মাণ এবং দর্শকের মধ্যে আগের মতো জনপ্রিয়তা ধরে রাখার জন্য নির্মাতাদের কিছুটা হলেও হিমশিম খেতে হচ্ছে। সব থেকে পুরনো সিনেমাটিক ইউনিভার্স হবার সুবাদে এই সমস্যার সমাধানও মার্ভেলকেই প্রথম করতে হবে। মার্ভেল এ সমস্যার আপাত সমাধান করতে পারলেও অন্যান্য সিনেমাটিক ইউনিভার্স সেই পর্যায়ে গিয়ে কতোটা সামলাতে পারবে, তাও দেখার বিষয়। কারণ গল্পের সামঞ্জস্যতা আর মান ধরে রাখার পাশাপাশি দর্শকের মধ্যে আকর্ষণ ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ মার্ভেল নিজে কতো পারবে—তার চেয়েও বড়ো প্রশ্ন, কতোদিন বা কতো বছর পারবে। একটা সময় গিয়ে হয়তো মার্ভেলকেও থেমে যেতে হবে। সিনেমাটিক ইউনিভার্সের যাত্রাপথ পর্যবেক্ষণের রাখা গবেষণার বিষয়।
আবার সিনেমাটিক ইউনিভার্স নিজে যেখানে শেয়ার্ড ইউনিভার্স থেকে একধাপ এগিয়ে নতুন একটা সিস্টেমে পরিণত হয়েছে; ঠিক একইভাবে সিনেমাটিক ইউনিভার্স থেকে বেড়ে ভবিষ্যতে নতুন রকমের চলচ্চিত্রের সিস্টেম বা গল্প বলার ধরন আসবে, সেটাও নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। তবে এক্ষেত্রে অর্থনৈতিক দিকটা ভুলে গেলে চলবে না। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, আর আকর্ষণীয় সব তারকার এক পর্দায় আনার প্রচেষ্টা সিনেমাটিক ইউনিভার্সগুলোকে ব্যয়বহুল প্রকল্প করে রেখেছে। যার কারণে বড়ো প্রযোজনা সংস্থা ছাড়া ভবিষ্যতে কম বাজেটে সিনেমাটিক ইউনিভার্স নির্মাণের পরিকল্পনা কঠিন হয়ে যাবে। যদিও সাম্প্রতিক লোকাহ চ্যাপ্টার ওয়ান : চান্দ্রা কম বাজেটে অনেক ভালো ব্যবসা করেছে, আগের রেকর্ড হিসেবে পরবর্তী চলচ্চিত্রের বাজেট বেড়ে যাবার সম্ভাবনা প্রবল।
হলিউডের ক্ষেত্রে প্রযোজনা সংস্থাগুলো তাদের ট্রান্সমিডিয়া ফ্র্যাঞ্চাইজির পাশাপাশি সিনেমাটিক ইউনিভার্স নির্মাণের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। এশিয়াতেও চলচ্চিত্র নির্মাণের এই ধরন জনপ্রিয়তা লাভ করছে। সেইসঙ্গে পূর্ব এশিয়া আর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইন্ডাস্ট্রিগুলোতে এর প্রসার দেখা যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে আরো বাড়বে বললে ভুল হবে না। ভারতীয় চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে বলিউড থেকে শুরু করে অন্যান্য রাজ্যের ইন্ডাস্ট্রিগুলোতেও ইউনিভার্স নির্মাণের প্রতিযোগিতা বেড়ে চলেছে। সাম্প্রতিক মালায়লাম ইন্ডাস্ট্রিতে শুরু হওয়া লোকাহ ইউনিভার্স তারই সাক্ষ্য দেয়। এই ধরনের চলচ্চিত্রের ব্যাপক জনপ্রিয়তার কারণে অদূর ভবিষ্যতে আরো কয়েকটি সিনেমাটিক ইউনিভার্সের উদয় হয়তো দেখা যাবে। এর পাশাপাশি, চলমান ইউনিভার্সগুলোও বেড়ে উঠতে থাকবে। বক্স অফিসে ব্যর্থতার কারণে হলিউডে বেশ কয়েকটি ইউনিভার্সের পথ চলা নিয়ে যে শঙ্কা দেখা দিয়েছে, পুরো এশিয়া অঞ্চলে, বিশেষ করে ভারতে এমন কিছু এখনো দেখা যায়নি। কোনো চলচ্চিত্র বাজে পারফর্ম করলে তা আবার পরের দুই-এক চলচ্চিত্রের মধ্যেই শক্তভাবে ফিরে এসেছে।
বাংলাদেশে সেই তুলনায় সিনেমাটিক ইউনিভার্সের অস্তিত্ব একেবারেই নতুন। ভিকি জাহেদের হাতে গড়ে ওঠা পুনর্জন্ম ইউনিভার্স এখনো সেই অর্থে সিনেমাটিক ইউনিভার্স হয়ে উঠতে পারেনি। সেই পর্যায়ে যেতে আরো অনেকটা সময় লাগবে, এটা অন্তত পরিষ্কার। অন্যদিকে রাফীর সুড়ঙ্গ-তাণ্ডব ইউনিভার্সে কেবল দুইটি চলচ্চিত্র এসেছে। এখনো সব চরিত্রের গল্প বলা শুরু হয়নি। বৃহত্তর গল্পের ব্যাপারে অবশ্য একটু হলেও আভাস চলে এসেছে। অদূর ভবিষ্যতে এই ইউনিভার্স যে সফলতার সঙ্গে বাংলাদেশের প্রথম সিনেমাটিক ইউনিভার্স হিসেবে বাড়তে থাকবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। নির্মাতা হৃদয়ের বরবাদ-রাক্ষস ইউনিভার্সের গল্পও কেবল দুইটি চলচ্চিত্রে কিছুটা বেড়ে উঠছে। এই দুই চলচ্চিত্রের বাইরে আরো চরিত্রের সংযোজন, বা চলচ্চিত্রের মূল চরিত্রদের মধ্যে সম্পর্কের বুনন হবার জায়গা এখনো আছে। সেই অর্থে এই ইউনিভার্সের পূর্ণ একটা রূপ আসতে খানিক সময় দরকার এমনটা অনুমান করে বললে অত্যুক্তি হবে না। তবে এই সিনেমাটিক ইউনিভার্সের জোয়ার শুধু জাহেদ, রাফী, কিংবা হৃদয়েই সীমিত থাকবে, এমনটাও না। সমসাময়িক বেশকিছু চলচ্চিত্র এবং ওয়েব সিরিজের গল্পে তাদের সিক্যুয়াল আসার পাশাপাশি তাদের থেকে সিনেমাটিক ইউনিভার্স গঠিত হওয়ার ভালো সম্ভাবনা দেখা গেছে। সেগুলো দিনশেষে সেদিকে যাবে কিনা, তার পুরোটাই নির্ভর করছে নির্মাতা আর প্রযোজনা সংস্থার ওপরে।
বাংলাদেশের ইন্ডাস্ট্রিতে সিনেমাটিক ইউনিভার্স যদি জনপ্রিয়তার তুঙ্গে চলে যায়, তাহলে নির্মাতাদের হাত ধরে আরো অনেক ইউনিভার্সের দেখা মিলবে। শিহাব শাহীনের ‘সিন্ডিকেট’-‘অ্যালেন স্বপন’-‘ক্যাকটাস’ ইউনিভার্স সেই তালিকায় ইতোমধ্যেই জায়গা করে নিয়েছে। সবমিলিয়ে সিনেমাটিক ইউনিভার্সের গল্প বলার প্রভাব কতোটা হবে, কিংবা এদেশে সেই প্রভাব কতোটা বিস্তার করতে সমর্থ হবে, তাই দেখার বিষয়। এক্ষেত্রে সময়ই একমাত্র বলে দেবে সিনেমাটিক ইউনিভার্স এদেশে কতোটা শক্তভাবে প্রচার ও প্রসার করতে সক্ষম।
তবে এখন পর্যন্ত আসা সব সিনেমাটিক ইউনিভার্স অ্যাকশন, হরর, কমেডি আর কল্প-বিজ্ঞানের ঘরানাতেই গল্প বলে যাচ্ছে। দর্শকের কাছে এই ধরনের চলচ্চিত্রের জনপ্রিয়তার জায়গা থেকেই হয়তো এর বাইরে এখনো কেউ যায়নি। কিন্তু তত্ত্বীয় দিক থেকে দেখতে গেলে গণমানুষের গল্পকেও এভাবে বলা যেতে পারে। হয়তো সুদূর কিংবা অদূর ভবিষ্যতে কোনো নির্মাতা গণমানুষের গল্পকে সিনেমাটিক ইউনিভার্সের ধরনে তুলে ধরবে চলচ্চিত্রের রূপালি পর্দায়।
লেখক : তানজীদ তনয়, পড়ালেখা করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে। বর্তমানে বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছেন।
tonoy723@gmail.com
https://www.facebook.com/tanzid.tonoy
তথ্যসূত্র ও টীকা
১. ক্রসওভার : একাধিক স্বতন্ত্র চলচ্চিত্র বা টেলিভিশন সিরিজের চরিত্র, প্লটলাইন অথবা প্রেক্ষাপট একটি কমন গল্পে বা নতুন একটি প্রযোজনায় একত্রিত হলে এই ঘটনাকে ক্রসওভার বলে। এক্ষেত্রে এক চরিত্র অন্য চরিত্রের গল্পে পার্শ্বচরিত্র হিসেবেও আসতে পারে, আবার দুই চরিত্র একসঙ্গে গল্পের মূল চরিত্রের ভূমিকা পালন করতে পারে।
২. স্পিনঅফ : এমন একটি নতুন চলচ্চিত্র বা টেলিভিশন সিরিজ, যা আগের কোনো মূল চলচ্চিত্র বা সিরিজের একটি নির্দিষ্ট চরিত্র, ঘটনা বা ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। তবে তা মূল চলচ্চিত্র বা সিরিজ থেকে আলাদা কোনো গল্পে নির্মিত হয়। যদিও এর ভিত্তি বা কিছু চরিত্র মূল কাহিনি বা সিরিজ থেকেই নেওয়া হয়।
৩. পোস্ট-ক্রেডিট সিন : এটা একটি ছোটো ভিডিও ক্লিপ বা দৃশ্য, যা চলচ্চিত্রের মূল কাহিনি শেষ হওয়ার পর এবং য়েন্ড ক্রেডিট চলাকালীন বা একেবারেই শেষে দেখানো হয়। এই দৃশ্যটি সাধারণত দর্শকের জন্য একটি চমক হিসেবে কাজ করে, অথবা আসন্ন কোনো সিক্যুয়াল বা একই ইউনিভার্সের পরবর্তী চলচ্চিত্রের কাহিনি সম্পর্কে ইঙ্গিত বা টিজার দেয়।
৪. কালেক্টিভ আইডেন্টিটি : এটা সামাজিক বিজ্ঞানের একটি ধারণা, যা দিয়ে একদল মানুষের মধ্যে বিদ্যমান সম্মিলিত ‘belongingness’-এর অনুভূতিকে বোঝায়। যখন কোনো গোষ্ঠী (যেমন : একটি জাতি, ধর্মীয় সম্প্রদায়, রাজনৈতিক দল বা সামাজিক আন্দোলন) নিজেদেরকে অন্যদের থেকে আলাদা এবং স্বতন্ত্র মনে করে, তখন এই সামষ্টিক পরিচয়বোধ তৈরি হয়। এটা সাধারণ লক্ষ্য, মূল্যবোধ, ইতিহাস বা অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠে এবং গোষ্ঠীর সদস্যদের মধ্যে সংহতি ও ঐক্যবদ্ধ আচরণ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৫. ফ্যানডম : কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে (যেমন : চলচ্চিত্র সিরিজ, বই, টেলিভিশন শো, সঙ্গীতশিল্পী বা খেলাধুলা) প্রবল অনুরাগী লোকজনের সমষ্টি। এরা তাদের পছন্দের বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা, বিশ্লেষণ, ফ্যান ফিকশন লেখা, ফ্যান আর্ট তৈরি এবং বিভিন্ন কনভেনশনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে একটি সামাজিক বন্ধন তৈরি করে। এটা একটি উপ-সংস্কৃতি (subculture) হিসেবেও বিবেচিত হয়।
৬. সাগা : একাধিক চলচ্চিত্রের একটি সিরিজ (series/franchise), যেখানে একটি প্রধান প্লটলাইন বা মূলভাবনা বহু বছর ধরে বা চরিত্রদের একাধিক প্রজন্ম ধরে চলতে থাকে। এটা সাধারণ সিক্যুয়ালের চেয়েও বড়ো পরিসরের হয় এবং এতে গভীর চরিত্রায়ণ ও বিস্তারিত বিশ্ব তৈরি করা হয়।
৭. মাল্টিভার্সের তত্ত্বে ‘ডাইমেনশন’ সম্পূর্ণ একটি স্বতন্ত্র বাস্তবতা (separate reality) বা সমান্তরাল মহাবিশ্বকে বোঝায়, যা মানুষের পরিচিত বিশ্ব থেকে সম্পূর্ণ আলাদা নিয়ম, ইতিহাস বা ঘটনার ভিন্নতার ওপর ভিত্তি করে বিদ্যমান। একটি মাল্টিভার্স হলো এই অসংখ্য ভিন্ন ভিন্ন ডাইমেনশন বা বিশ্বের সমষ্টি।
৮. Markstein,Don; ‘THE MERCHANT OF VENICE meets THE SHIEK OF ARABI’; CAPA-alpha #71, September 1970; archived at Don Markstein’s Toonopedia.
৯. McLuhan, M. (1964); Understanding media: The extensions of man; McGraw-Hill.
১০. লোর বলতে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী, সংস্কৃতি বা বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত ঐতিহ্যগত জ্ঞান, গল্প, কিংবদন্তি ও লোককাহিনিকে বোঝায়।
১১. মিথ্যা বাস্তবতা : ফরাসি দার্শনিক জঁ বদ্রিয়ার মতে, এটা এমন একটি অবস্থা যেখানে বাস্তব ও কাল্পনিক বা কৃত্রিমের মধ্যে পার্থক্য সম্পূর্ণরূপে মুছে যায়।
১২. অধিবাস্তবতা : জঁ বদ্রিয়ার মতে, এটা এমন একটি সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিস্থিতি, যেখানে বাস্তবতা নিজেই অসংখ্য প্রতীক, ছবি এবং সিমুলেশন (অনুকৃতি) দিয়ে প্রতিস্থাপিত। এখানে মূল বাস্তবতা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে এবং কৃত্রিমভাবে তৈরি করা জগতটিই আসল বলে গণ্য হয়। হাইপাররিয়ালিটির মূল বৈশিষ্ট্য হলো আসল ও নকলের মধ্যকার সীমারেখা বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া। যার ফলে মানুষ কৃত্রিম অভিজ্ঞতাকেই প্রকৃত সত্য বলে মেনে নেয় (যেমন : রিয়ালিটি শো বা ভার্চুয়াল রিয়ালিটির জগৎ)। দেখুন : Baudrillard, J. (1994: 1); Simulacra and simulation; Trans: S. F. Glaser; University of Michigan Press.
১৩. বদ্রিয়ার মতে, সিমুল্যাক্রাম হলো বাস্তবতা বা সত্যের এমন একটি প্রতিচ্ছবি বা অনুলিপি, যার কোনো মূল ভিত্তি বা বাস্তব উৎস নেই। তার অধিবাস্তবতা তত্ত্বে, সিমুল্যাক্রাম নিজেই সত্য বলে গণ্য হয় এবং আসল সত্য অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। দেখুন : প্রাগুক্ত; Baudrillard (1994: 6).
১৪. এল্সওয়ার্ল্ড বলতে ডি সি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে বেড়ে ওঠা এমন এক অল্টারনেট রিয়ালিটি বা বিকল্প বাস্তবতাকে বোঝায়, যেখানে ডি সি’র মূল ধারাবাহিকতা বা ক্যাননের বাইরে গিয়ে গল্প বলা যায়। এল্সওয়ার্ল্ডের গল্পগুলো স্বয়ংসম্পূর্ণ (standalone) হয় এবং মূল কাহিনির ওপর কোনো প্রভাব ফেলে না। মূল কাহিনির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকায় নির্মাতারা চরিত্রগুলোকে নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষার এবং অপ্রচলিত গল্প বলার স্বাধীনতা পায়।
১৫. মিডিয়া রিবুট : কোনো প্রতিষ্ঠিত কাল্পনিক ইউনিভার্স, চলচ্চিত্র সিরিজ বা টিভি শোকে নতুন করে শুরু করা, যেখানে পূর্ববর্তী ধারাবাহিকতা বাদ দিয়ে চরিত্র, কাহিনি ও পটভূমি একেবারে সমূলে পুনর্নির্মাণ করা হয়। এর মাধ্যমে কোনো পুরনো ফ্র্যাঞ্চাইজিকে ‘রিব্র্যান্ড’ বা আধুনিক রূপ দেওয়া হয়। এর সমার্থক শব্দ হিসেবে রিমেক, রিইমাজিনিং, রিভাইভাল বা রিলঞ্চ ব্যবহার করা হয়।
১৬. ইস্টার এগ (Easter Egg) : চলচ্চিত্রে ইস্টার এগ হলো নির্মাতাদের দ্বারা কোনো ফিল্ম, ভিডিও গেম বা শো-এর ভেতরে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে লুকিয়ে রাখা গোপন বার্তা, ইঙ্গিত, কৌতুক বা রেফারেন্স। এগুলো খুব সূক্ষ্মভাবে দৃশ্যের পেছনে বা প্রেক্ষাপটে রাখা হয়, যা সাধারণ দর্শকের চোখ এড়িয়ে যায় এবং শুধু তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণকারী ভক্তদের জন্য একটি বিশেষ উপহার বা চমক হিসেবে কাজ করে। যেমন : আয়রন ম্যান (২০০৮) চলচ্চিত্রে যখন টনি স্টার্ক তার আর্মার খোলার চেষ্টা করছিলেন, তখন ব্যাকগ্রাউন্ডে একটি টেবিলের উপর ক্যাপ্টেন আমেরিকার অসমাপ্ত শিল্ড দেখা গিয়েছিলো। এটা ছিল পুরো এমসিইউ-এর প্রথম দিককার ইস্টার এগ।
১৭. দেখুন : https://malaysia.news.yahoo.com/welcome-astro-shaw-cinematic-universe-011728366.html; retrieved on: 20.11.2025
১৮. মাসালা সিনেমা : ভারতীয় উপমহাদেশের (প্রধানত বলিউড ও দক্ষিণ ভারতীয়) চলচ্চিত্রের একটি জনপ্রিয় ঘরানা, যা একইসঙ্গে অ্যাকশন, কমেডি, রোমান্স, ড্রামা ও গানের সংমিশ্রণ ঘটায়। রান্নায় যেমন বিভিন্ন মশলা মিশিয়ে স্বাদ বাড়ানো হয়, তেমনি এই চলচ্চিত্রগুলোতে বিনোদনের সব উপাদান একসঙ্গে মিশিয়ে দর্শকের মনোরঞ্জন করা হয়।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন