মো. মুজাহিদুর ইসলাম; ভূমিকা ও সাক্ষাৎকার গ্রহণ : ইসলাম রাজু
প্রকাশিত ২৯ জুন ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
‘মানুষের ছবি আঁকতে গেলে যদি চেহারা না মিলে, তাহলে তো মানুষ মারবে’
মো. মুজাহিদুর ইসলাম; ভূমিকা ও সাক্ষাৎকার গ্রহণ : ইসলাম রাজু

একটা সময় ছিলো যখন এদেশের রাজপথ ছিলো একেকটা ‘চলন্ত গ্যালারি'। সেই গ্যালারির মূল আকর্ষণ ছিলো রিকশার পেছনের উজ্জ্বল, কড়া রঙের কারুকাজ। লাল, নীল, হলুদ আর সবুজের মিশ্রণে ফুটে উঠতো গ্রামীণ জনজীবন, পৌরাণিক দৃশ্য, শস্য শ্যামল বাংলা কিংবা স্বপ্নের তাজমহল। একইসঙ্গে ফুটিয়ে তোলা হতো সমসাময়িক জনপ্রিয় সব চলচ্চিত্রের নায়ক-নায়িকাদের প্রতিকৃতি। তখন জনমানুষের কাছে প্রিয় তারকাদের আকাশচুম্বি জনপ্রিয়তার কারণে রিকশার পেছনের সেই ক্ষুদ্র পরিসরটিই কখনো হয়ে উঠেছিলো চলমান প্রেক্ষাগৃহ। কাজেই তখন রিকশা আর্ট শুধু যানবাহনের সাজসজ্জাই ছিলো না; ছিলো এদেশের শিল্প-সংস্কৃতির এক জীবন্ত ঐতিহ্য।
এই শিল্পের পেছনে রয়েছে সুদীর্ঘ ইতিহাস, তবে সেই ইতিহাস এই আলোচনার বিষয় নয়। কথা বলবো এই শিল্পের এক শিল্পীকে নিয়ে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পেও রিকশা চিত্রশিল্পীদের অবদান ছিলো অনন্য। প্রেক্ষাগৃহের সামনে যে বিশাল সব রঙিন ব্যানারগুলো দর্শককে আকৃষ্ট করতো, তার নেপথ্যের কারিগর ছিলো এই শিল্পীদের অনেকেই। মাত্র কয়েক ইঞ্চির নমুনা ছবি দেখে বিশাল ক্যানভাসে নায়ক-নায়িকার অবয়ব ফুটিয়ে তোলার যে জাদুকরী ক্ষমতা, আজকের ডিজিটাল প্রিন্টিংয়ের যুগে তা রূপকথার মতো মনে হতে পারে।
যাইহোক, সময়ের অতল গহ্বরে হারিয়ে যাওয়া রুপালি চলচ্চিত্রের সেই ব্যানার সংস্কৃতি, রিকশা পেইন্টিংয়ের কারিগরি রহস্য আর একজন বহুমাত্রিক শিল্পীর যাপিত জীবনের অব্যক্ত কথা তুলে ধরার জন্য এই আয়োজন। সেই গল্পই শুনেছি রিকশা পেইন্টিং শিল্পী মো. মুজাহিদুর ইসলাম (মুজাহিদ আর্ট) এর মুখ থেকে। মুজাহিদুরের জন্ম ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে রাজশাহীর নিউ মার্কেট এলাকায়। মুজাহিদ শুধু রিকশার বডিতে আর্টই করেননি, তার কাজের পরিসর ঢাকার এফ ডি সি থেকে শুরু করে উত্তরবঙ্গের আনাচে-কানাচে। তার জীবন যেনো বর্ণিল এক কোলাজ। তার শিল্পসত্তা শুধু রিকশা আর চলচ্চিত্রের ব্যানারে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর বাইরে তিনি মঞ্চ নাটকে অভিনয় করেছেন, গান শিখেছেন, বিভিন্ন কোম্পানির বিজ্ঞাপনে ছবি এঁকেছেন। গত এপ্রিল ও মে ২০২৬-এ মুজাহিদুরের সঙ্গে নানা সময়ের আলাপে উঠে আসা কথা তুলে ধরা হলো ম্যাজিক লণ্ঠন-এর পাঠকের জন্য।
ম্যাজিক লণ্ঠন : আসসালামু আলাইকুম, মুজাহিদ ভাই। কেমন আছেন? এখন কাজের চাপ কেমন?
মো. মুজাহিদুর ইসলাম : ওয়ালাইকুম আসসালাম। একটু ব্যস্ততার মধ্যে আছি ভাই। কাজের চাপ বলতে তেমন নেই, তবে ঈশ্বরদী [পাবনার ঈশ্বরদী] থেকে কিছু কাজের অর্ডার এসেছে। সেগুলো আজকেই ডেলিভারি দেওয়ার কথা। ওগুলো নিয়েই আছি।
ম্যাজিক লণ্ঠন : মুজাহিদ ভাই, আর্টিস্ট হিসেবে আপনার বর্ণিল জীবনের গল্প একটু শুনতে চাই। যদিও আপনি একটু ব্যস্ত!
মুজাহিদুর : সমস্যা নাই ভাই, বলেন।
ম্যাজিক লণ্ঠন : ভাই, আপনার এই কাজের শুরুটা কীভাবে করলেন? মানে কীভাবে, কোন বাস্তবতায়, কী মনে করে এই রিকশা আর্ট শেখা এবং এই লাইনে আসা?
মুজাহিদুর : আমার ছোটোবেলা কেটেছে রাজশাহীর নিউ মার্কেট এলাকায়। ওখানে স্কুলে পড়তাম। স্কুল থেকে ফেরার পথে শিরোইল কলোনির বাসায় যাওয়ার সময় দেখতাম রাস্তার ধারে এক ওস্তাদ [রিকশা আর্টিস্ট] খুব মনোযোগ দিয়ে আর্ট করছেন। ওনার কাজ দেখে আমি প্রায়ই স্কুল থেকে আসার পথে দাঁড়িয়ে যেতাম। ভাবতাম কীভাবে একজন মানুষ এতো সুন্দর ডিজাইন মুহূর্তেই ফুটিয়ে তুলছে! তখন মনে হতো, আমি যদি শিখতে পারতাম এই কাজ! একদিন সাহস করে ওস্তাদকে গিয়ে বলেই ফেললাম, ‘আমি এই কাজ শিখতে চাই আপনার কাছে।' ওস্তাদ তখন আমার আব্বার নাম জিজ্ঞেস করলেন। নাম বললাম, উনি চিনে ফেললেন এবং আব্বাকে সঙ্গে নিয়ে আসতে বললেন। পরের দিন আব্বাকে নিয়ে গেলাম। আব্বা বলে দেওয়ার পর ওস্তাদ আমাকে তার দোকানে কাজ শেখাতে রেখে দিলেন। তারপর পড়াশোনার পাশাপাশি আমি আর্টের কাজ শিখতে শুরু করলাম।
ম্যাজিক লণ্ঠন : শুরুর দিকে ওস্তাদের সঙ্গে কী ধরনের কাজ করতেন?
মুজাহিদুর : আমি যখন কাজ শুরু করি, তখন সাহেব বাজার আলুপট্টিতে বাস টার্মিনাল ছিলো। সেখানে বাসের গায়ে রঙ করার কাজ দিয়ে আমার হাতেখড়ি। ওস্তাদের সঙ্গে রোদে পুড়ে ঘষামাজার কাজ করতে হতো। প্রায় দুই বছর শুধু এই কাজই করেছি। যখন ওস্তাদ দেখলেন আমার হাতের তুলি সচল হয়েছে, তখন আমাকে গ্লাসের পেছনে [বাস, ট্রাকের সামনের বড়ো গ্লাস] লেখার দায়িত্ব দিলেন। এটা খুব কঠিন কাজ ছিলো, কারণ গাড়ির সামনের গ্লাসে উল্টো দিক থেকে লিখতে হতো, যেনো সামনে থেকে মানুষ সোজা দেখতে পায়। এই সূক্ষ্ম কাজ শিখতে অনেক ধৈর্য লাগে। এছাড়াও দোকানে তখন পিতলের ব্লক, স্ক্রিন প্রিন্ট আর সাইনবোর্ডের কাজও করা হতো। আমি সেগুলোও শিখি ওস্তাদের কাছে।
রিকশা পেইন্টিং শিল্পী মো. মুজাহিদুর ইসলাম
ম্যাজিক লণ্ঠন : এরপর রিকশার আর্টে কখন থেকে পুরোপুরি মন দিলেন?
মুজাহিদুর : ১৯৮৫-৮৬ সালের দিকে ওস্তাদের কাছ থেকে একটু পাকাপোক্ত হয়ে ’৮৮ সালের দিকে আমি নিজের বাসাতেই রিকশার আর্ট শুরু করলাম।
ম্যাজিক লণ্ঠন : কেমন ছিলো হাতে আঁকার সেই দিনগুলো?
মুজাহিদুর: সেই দিনগুলোর কথা ভাবলে এখনো মনে আনন্দ লাগে! তখন সিনেমাহল আর ভোটের ব্যানারের খুব চাহিদা ছিলো। ভোটের সময় আমরা চাটাই বা শীতল পাটির উপর ব্যানার লিখতাম। আর রিকশা আর্টের জন্য আট আনা বা এক টাকা দিয়ে নায়ক-নায়িকাদের ভিউকার্ড [নায়ক-নায়িকাদের ছবি সম্বলিত পোস্টকার্ডের মতো দেখতে] কিনে আনতাম। সেই ছবিগুলো কার্বন কপি করে রিকশার পেছনের টিনে নায়ক-নায়িকাদের ছবি আঁকতাম।
ম্যাজিক লণ্ঠন : শুনেছি জীবনের একটা সময় আপনাকে সংসারের হাল ধরতে গিয়ে বিভিন্ন জেলায় জেলায় ঘুরে কাজ করতে হয়েছে।
মুজাহিদুর : '৮৯ সালে আমার আব্বা যখন প্যারালাইজড হয়ে গেলেন, তখন সংসারের পুরো দায়িত্বটা আমার ওপর চলে আসলো। তিন বোন আর তিন ভাইয়ের মধ্যে আমি দ্বিতীয় ছিলাম, মানে এক বোনের পর আমি। সংসারে এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি হলো যে, এক জায়গায় বসে থাকা আর চললো না। গ্যারেজে গ্যারেজে গিয়ে কাজ খুঁজতাম আর করতাম। সেই সময়ে আমার হাতের আঁকা ডিজাইন সবার খুব পছন্দ হতো। ’৯২ সালের দিকে রাজশাহী ছাড়িয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, ঈশ্বরদী, পাবনা, ঠাকুরগাঁও, নওগাঁয় আমার খুব পরিচিতি ছিলো রিকশা আর্টের জন্য। কাজের চাপ সামলাতে আমি, আমার ভাই সিরাজুল আর শ্যালক জামালসহ প্রায় ৮-১০ জন ছেলেকে এই কাজ শিখিয়েছিলাম। এই হাতের কাজের ওপর ভর করেই আমি আমার তিন বোনের বিয়ে দিয়েছি। তখন একটা বিয়ে দিতে এক লাখ টাকার ওপরে খরচ হতো।
ম্যাজিক লণ্ঠন : এরপর যখন হঠাৎ করে মেশিনে ছাপা ডিজিটাল ব্যানার আসা শুরু হলো, তখন আপনাদের কাজের ওপর কেমন প্রভাব পড়েছিলো?
মুজাহিদুর : বাংলাদেশে ২০০৩-২০০৪ সালের দিকে ডিজিটাল ব্যানার আসা শুরু হলে আমাদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা হয়। এতো বছরের সাধনা আর কর্মসংস্থান; দ্রুতই কাজ কমতে থাকে। সেই সময়টা ছিলো খুব কঠিন, সংসার চালানোই মুশকিল হয়ে পড়েছিলো! কিন্তু পরবর্তী সময়ে যখন ব্যাটারি চালিত চার্জার রিকশা এলো বাজারে, তখন আবার নতুন করে কাজের সুযোগ তৈরি হলো। রাজশাহীতে ‘নাহার অটো’র হাত ধরে চার্জার রিকশার বডিতে আর্ট করার মাধ্যমেই আমরা আবার ঘুরে দাঁড়ালাম। তবে আগের মতো মানুষের ছবি এখন আর আঁকা হয় না, এখন বেশি চলে পাহাড়, জঙ্গল বা সিনারি [বিভিন্ন ল্যান্ডস্কেপ]।
আগে রিকশায় মানুষের ছবি বেশি আঁকতে হতো, এতে খুব পরিশ্রম হতো, কিন্তু টাকা কম ছিলো। মানুষের ছবি আঁকতে গেলে যদি চেহারা না মিলে, তাহলে তো মানুষ মারবে! সিনারি আঁকা একটু সহজ; এক টানে জঙ্গল হয়ে যায়, আরেক টানে পাহাড়। এতে খাটনিও কিছুটা কম, আবার আয়ও মন্দ না।
ম্যাজিক লণ্ঠন : এবার একটু ভিন্ন আলাপে আসি মুজাহিদ ভাই। শুনেছি একসময় আপনার অভিনয়ের খুব শখ ছিলো। আর্ট করার পাশাপাশি এই জগতের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত হলেন?
মুজাহিদুর : শখ তো ছিলোই। আগে রাজশাহীতে নিয়মিত মঞ্চনাটক হতো। ওখানে একজনের মাধ্যমে নাটকে যোগ দিই। তারপর ‘বনলতা সাংস্কৃতিক বিদ্যালয়ে’ গানও শিখেছি কিছুদিন। শখের বশে কাজের ফাঁকে ঢাকা পর্যন্ত গেছি। ওখানে ইমদাদুল হক চঞ্চল আর মিলন ভাইদের সঙ্গে মিউজিক ভিডিও আর টেলিফিল্মেও কাজ করেছি। এছাড়া এফ ডি সিতে সিনেমার বিভিন্ন দৃশ্যে বড়ো বড়ো ব্যাকগ্রাউন্ড আঁকার কাজেও ঢাকা গিয়েছিলাম। এফ ডি সিতে তখন শুটিংয়ের জন্য বড়ো বড়ো ব্যাকগ্রাউন্ড আঁকতে হতো। তখন নায়ক মান্না ভাইসহ অনেককে সেখানে দেখেছি। মান্না ভাই খুব ভালো মানুষ ছিলেন, ওনার কথাবার্তা আর ব্যবহার ছিলো অমায়িক।
ম্যাজিক লণ্ঠন : এফ ডি সির মতো জায়গায় আর্টের কাজ করতে যাওয়ার সুযোগটা ঠিক কীভাবে হলো? মানে কার মাধ্যমে ওখানে গিয়েছিলেন?
মুজাহিদুর : অনেক দিন আগের কথা তো, ঠিক মনে পড়ছে না। তবে এই লাইনে আমাদের বড়ো বড়ো আর্টিস্টদের সঙ্গে পরিচয় ছিলো। মূলত টেন্ডার বা কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে কাজগুলো ওই পরিচিত ওস্তাদদের কাছে আসতো। তারপর আমাদেরকে বলা হতো। এভাবেই ঢাকার সিনেমার লোকজনের সঙ্গে আমার সরাসরি এক ধরনের যোগাযোগ তৈরি হয়।
ম্যাজিক লণ্ঠন : এফ ডি সিতে গিয়ে আপনি ঠিক কী ধরনের কাজ করতেন? আমরা তো পর্দায় শুধু নায়ক-নায়িকাদের দেখি, কিন্তু পর্দার আড়ালের সেটের কাজগুলো কেমন হতো?
মুজাহিদুর : আমি মূলত শুটিং সেটের ভেতরে আর্টের কাজগুলো বেশি করতাম। বড়ো বড়ো সেট বানাতে হতো। এছাড়া ধরেন, সিনেমায় একটা দৃশ্য আছে যে নায়ক একজন বড়ো আর্টিস্ট, সে বিরহে বসে বসে নায়িকার ছবি আঁকছে। এখন নায়ক তো আর আসল আর্টিস্ট না, সে তো আর ছবি আঁকতে জানে না! তখন আমাদের ডাক পড়তো। আমরা আগে থেকেই হার্ডবোর্ডের ওপর নায়িকার একটা হালকা স্কেচ বা ড্রয়িং করে রাখতাম। নায়ক যখন তুলি হাতে ক্যামেরার সামনে বসতো, সে তখন আমাদের করা সেই হালকা দাগগুলোর ওপর শুধু একটু রঙ ঘষতো। আমরা শুটিংয়ের সুবিধার জন্য কয়েকটা বোর্ড রেডি রাখতাম; একটা শুধু খালি ড্রয়িং করা, একটা হালকা রঙ করা, আর একটা একদম কমপ্লিট করা মাল [ছবি]। এডিটিংয়ের সময় এই কয়েকটা বোর্ড মিলিয়ে দেখানো হতো যে নায়কই সবটা আঁকছে।
ম্যাজিক লণ্ঠন : ঢাকার বাইরে রাজশাহীর সিনেমাহলগুলোতে কখনো ব্যানারের কাজ করেছেন?
মুজাহিদুর : রাজশাহীর ‘বর্ণালী’ সিনেমাহলে আমি অনেক কাজ করেছি। এছাড়া আমাদের কাজের কদর ছিলো গোটা উত্তরবঙ্গে। তখন তো আর মোবাইলের যুগ ছিলো না যে, এক নিমিষেই সব হবে। হলের মালিকরা তাদের লোকজন পাঠাতো, তারা এসে আমাদের অর্ডার দিয়ে যেতো। অনেক সময় কোনো সিনেমা রিলিজ হওয়ার একদিন আগে আমাদের তুলে নিয়ে চলে যেতো। একদিনে পুরো কাজ তুলে দেওয়া খুবই কষ্টকর ছিলো। তারপরও আমরা বৃহস্পতিবার রাত জেগে ব্যানার তৈরি করে দিয়ে আসতাম।
মো. মুজাহিদুর ইসলামের সঙ্গে আলাপচারিতায় সাক্ষাৎকারগ্রহীতা
ম্যাজিক লণ্ঠন : ব্যানার করেছেন এমন দুই-একটা সিনেমার নাম মনে পড়ছে এখন?
মুজাহিদুর : মনে তো আছেই। বিশেষ করে নাচ নাগিনা নাচ [নির্মাতা দেলোয়ার জাহান ঝন্টু], রুবেল ও হুমায়ুন ফরীদি ভাইয়ের সতর্ক শয়তান [নির্মাতা শহীদুল ইসলাম খোকন]; রাজ্জাক, শবনম-এর যোগাযোগ [নির্মাতা মইনুল হোসেন] সহ আরো অনেক সিনেমার ব্যানারে কাজ করেছি। অনেক দিন আগের কথা তো, তাই ঠিকঠাক মনে নাই।
ম্যাজিক লণ্ঠন : এই যে বিশাল সব ব্যানার আঁকতেন, এগুলোর জন্য কি কোনো ছবি আপনাদের দেওয়া হতো? নাকি নিজেদের বুদ্ধি খাটিয়ে আঁকতে হতো?
মুজাহিদুর : আমাদেরকে দেওয়া হতো ছয় বাই ছয় ইঞ্চির একটা ফটো। ওইটুকু ছবি দেখেই আমরা বিশাল কাপড়ে হুবহু চেহারার মিল রেখে ছবি ফুটিয়ে তুলতাম। আমরা শুধু হুবহু আঁকতাম না, বরং ছবিটাকে আরো আকর্ষণীয় করার জন্য নিজে থেকেও অনেক কিছু করতাম। ধরেন, ক্যামেরার ছবিতে হয়তো অতোটা কালার আসেনি, কিন্তু আমরা যখন ব্যানার আঁকতাম তখন নায়িকার গালটা হালকা গোলাপি করে দিতাম। চোখের ভ্রু বা মেকআপগুলো একদম নিখুঁত করে তুলতাম, যেনো হলের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় মানুষের নজর কাড়ে।
ম্যাজিক লণ্ঠন : একটু আগে তো বললেন, ব্যানার আঁকার পাশাপাশি মিউজিক ভিডিও এবং টেলিফিল্মের ছোটো ছোটো দৃশ্য অভিনয় করেছেন?
মুজাহিদুর : জি। মঞ্চনাটক করার অভিজ্ঞতা তখন কিছুটা কাজে দিয়েছিলো। বিষয় হচ্ছে, শুরুতে ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে খুব লজ্জা লাগতো। হাজার হাজার মানুষের ভিড়ের মধ্যে ডায়ালগ দেওয়া, অভিনয় করা খুব কঠিন ছিলো। তাছাড়া অভিনয় হতে হতো একদম স্বাভাবিক; যদি বোঝা যায় অভিনয় করছি, তাহলে তো হলো না। আমাদের স্ক্রিপ্ট দেওয়া হতো, কার সঙ্গে কী অভিনয় সেটা মুখস্থ করতে হতো আগেই। জাস্ট ওই মুডটা নিজের মধ্যে নিয়ে আসতে হতো যেনো অভিনয়টা ন্যাচারাল মনে হয়।
ম্যাজিক লণ্ঠন : আপনাদের সময়ে যে ধরনের গল্পের সিনেমা হতো, আর পরে যে কাটপিস বা অন্যরকম সিনেমা আসা শুরু হলো, এই পরিবর্তনটা আসলে কীভাবে হলো?
মুজাহিদুর : সিনেমার এই পরিবর্তনটা আসলে যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়েই হয়েছে বলে আমার মনে হয়। আগের দিনে সিনেমার একটা আলাদা আবেদন ছিলো। পরে যখন কাটপিস বা অশ্লীল দৃশ্য যুক্ত হতে শুরু করলো, তখন সাধারণ মানুষ পরিবার নিয়ে সিনেমা দেখা কমিয়ে দিল এবং হলের ব্যবসাও মার খেলো। অনেকে বলে যুগের চাহিদার কারণে ড্রেসআপ বা দৃশ্যে পরিবর্তন আনতে হয়েছে। হয়তো আরো কারণ থাকতে পারে! যাইহোক, সেই সময়ে সিনেমা দেখার যে পরিবেশ ছিলো সেটা নষ্ট করে দিয়েছিলো ওই কাটপিস।
ম্যাজিক লণ্ঠন : পরবর্তী সময়ে আপনি অভিনয় থেকে সরে আসলেন, কেনো?
মুজাহিদুর : পরিবার থেকে আসলে সিনেমার কাজগুলো তেমন একটা পছন্দ করতো না। ছেলেমেয়েরা যখন বড়ো হলো, তখন ভাবলাম এই কাজ নিয়ে যেনো সংসারে কোনো অশান্তি না হয়। তাই অভিনয়ের ঝোঁকটা একদম বাদ দিয়ে দিলাম। তবে আর্ট বা আঁকাআঁকির কাজটা আমি আজ পর্যন্ত পেশা হিসেবে ধরে রেখেছি, এটা ছাড়িনি, যতোদিন শরীর চলবে ততোদিন করে যাওয়ার ইচ্ছা আছে।
ম্যাজিক লণ্ঠন : আপনি তো রিকশাতে, সিনেমার ব্যানারে রঙ করেছেন। রিকশার পেছনের ছবিগুলো তো খুব উজ্জ্বল আর কড়া রঙের হয়। সিনেমার ব্যানারেও কি আপনারা রিকশার মতোই ওই কড়া রঙ ব্যবহার করতেন, নাকি ওখানে আলাদা কোনো নিয়ম ছিলো?
মুজাহিদুর : রঙের ক্ষেত্রে বড়ো একটা পার্থক্য ছিলো। রিকশায় আমরা ব্যবহার করি সিন্থেটিক এনামেল পেইন্ট, এগুলো খুব উজ্জ্বল আর কড়া হয়। কিন্তু সিনেমার ব্যানার হতো কাপড়ে, সেখানে আমরা ব্যবহার করতাম ওয়াটার কালার বা পাউডার রঙ। হলের বিশাল ব্যানারগুলো করার জন্য আলাদা রঙ ব্যবহার করা হতো।
ম্যাজিক লণ্ঠন : মুজাহিদ ভাই, আপনি কি জানেন, রিকশার পেছনে আঁকাআঁকির কাজটাকে সারা পৃথিবীর মানুষ এখন অনেক সম্মান দিচ্ছে—ইউনেস্কো স্বীকৃতি? সারা জীবন যে কাজটা করলেন, সেটা আজ এতো বড়ো সম্মান পেয়েছে, এ নিয়ে আপনার অনুভূতি যদি বলতেন?
মুজাহিদুর : হ্যাঁ, আমি জানি। এটা আমাদের মতো ডিজাইনারদের জন্য অনেক বড়ো গর্বের বিষয়। ইউনেস্কো থেকে এই স্বীকৃতি পাওয়ার পর ঢাকার শিল্পকলা একাডেমিতে আমাদের ডাকা হয়েছিলো। সুলতান শেখ পরিচালক থাকাকালীন আমাদের নিয়ে সেই বড়ো অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানে আমাদের সার্টিফিকেট আর বিশেষ কার্ড দেওয়া হয়েছিলো। সারা জীবন যে অবহেলিত শিল্পকে নিয়ে কাজ করলাম, তার এমন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেখে অনেক ভালো লাগছে। এটা আমাদের কাছে একটা স্থায়ী দলিল হয়ে থাকলো। এখন শুধু চাওয়া, সরকার যদি আমাদের মতো পুরনো শিল্পীদের জন্য কোনো ভাতার ব্যবস্থা করে, যেমনটা মুক্তিযোদ্ধারা পায়, তবে আমরা শেষ জীবনে একটু শান্তিতে থাকতে পারবো।
ইসলাম রাজু, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্বের শিক্ষার্থী।
rajubdmcj@gmail.com
http://www.facebook.com/md.rajuislam.7505468এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন